ফেয়ারওয়েল পার্টি : মূল : অনিতা দেশাই

বিশ্বসাহিত্য : অনূদিত গল্প
বাংলা অনুবাদ : নূর কামরুন নাহার
[অনিতা দেশাই (জন্ম : ১৯৩৭) ভারতীয় ঔপন্যাসিক। মা জার্মান অভিবাসী টনি নাইম এবং বাবা বাঙালি ব্যবসায়ী ডি এন মজুমদার। ইংরেজিতে তিনি তাঁর সাহিত্যকর্ম প্রকাশ করেছেন। তবে হিন্দি, বাংলা এবং জার্মান ভাষায়ও পারদর্শী ছিলেন। তিনবার বুকার পুরস্কারের জন্য সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত হয়েছেন। ১৯৭৮ সালে উপন্যাস ফায়ার অন দ্য মাউন্টেন-এর জন্য পেয়েছেন সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনা হচ্ছে, ক্রাই, দ্য পিকক, ইন দ্য সিটি (১৯৬৩), এবং ছোটগল্পের সংকলন গেমস অ্যাট টোয়াইলাইট। তাঁর রচিত ইন কাস্টোডি অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র ১৯৯৪ সালে সেরা ছবির জন্য ভারতের রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক জিতে নেয়। তিনি রয়েল সোসাইটি অফ লিটারেচার, আমেরিকান একাডেমি অফ আর্টস অ্যান্ড লেটার্সের একজন ফেলো এবং কেমব্রিজের গির্টন কলেজের সম্মানসূচক ফেলো। ‘ফেয়ারওয়েল পার্টি’ গল্পটি ইংরেজি ভাষায় লিখিত তাঁর গল্প ‘দ্য ফেয়ারওয়েল পার্টি’র বাংলা অনুবাদ।]পার্টির আগে সে একটু দ্বিধাগ্রস্ত মনে একটি তালিকা তৈরি করে এবং অপরিহার্য কাজগুলোতে টিক চিহ্ন দেয়―সিগারেট, সফট ড্রিঙ্ক, বরফ, কাবাব এবং এরকম আরও কিছু। তবে, আলোর ব্যবস্থার বিষয়টি ভুলে যায়। পার্টিও আয়োজন করা হয়েছে লনে : গ্রীষ্মের এই শুষ্ক মৌসুমের রাতগুলোতে কয়েক সপ্তাহ আগে পার্টির পরিকল্পনা করলে নিশ্চিত থাকা যেত যে আবহাওয়া ভালোই থাকবে। সে খুশি মনে ভেবেছিল, কত সুন্দর করে গোলাপের ঝাড়ে গোলাপ ফুটে থাকবে, আকাশে তারা এবং হয়তো কয়েকটি জোনাকি ঝিকিমিকি করবে, সবকিছু খুব বিচক্ষণতার সাথে সজ্জিত হবে―সবকিছু অতিথি আপ্যায়নের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ও প্রতিভাকে সুন্দরভাবে তুলে ধরবে। কিন্তু তার মাথায় একবারের জন্যও আসেনি সেদিন চাঁদ থাকবে না, ফলে লনটি গাঢ় অন্ধকারে ডুবে থাকবে।
অনেকগুলো লণ্ঠনের মতোই বারান্দা, পোর্টিকো আর ঘরের সব আলো জ্বলছিল, উজ্জ্বল তামাটে বাতিগুলো অসাধারণ ঔজ্জ্বল্য নিয়ে জ্বলছিল অদ্ভুত সুন্দর, যেন তারা খুব শীঘ্রই এ বাড়ি শূন্য হয়ে যাওয়ার বিষয়ে অবগত। আর আলোগুলো যেন শেষ কয়েক দিনের পারিবারিক জীবনের উষ্ণ আলোকসজ্জা। কিন্তু তারপরও কালির ঘাসের স্থির হ্রদের মতো বিশাল বিস্তৃত লনের প্রশস্ত অন্ধকারকে খুব সামান্যই আলোকিত করতে পেরেছিল ।
এক হাতে পানীয়ের গ্লাস আর অন্য হাতে চিজ বিস্কুটের প্লেট নিয়ে লনের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে সে মাঝে মাঝেই হকচকিয়ে উঠছিল, যখন অন্ধকার থেকে কেউ হঠাৎ করে উদয় হতো। তাদের মুখ প্রথমে অস্পষ্ট এবং অবয়বহীন মনে হলেও ধীরে ধীরে তা পরিচিত হয়ে উঠত। আর সে সেদিন সন্ধ্যায় বারবার বিস্ময়ে আর অনভ্যস্ত আন্তরিকতায় বলে উঠছিল, ‘ওহ! তুমি কখন এলে ? আমি তো তোমার খোঁজ করছিলাম।’ আর সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত করত, অপ্রত্যাশিত আন্তরিকতায়। (এই আন্তরিকতা কি তার দ্বিতীয় গ্লাস জিন ও লেবুর কারণে, নাকি এই উষ্ণতা তখন নিরাপদ মনে হচ্ছিল, যেহেতু তারা শিগগিরই এই শহর ছেড়ে চলে যাবে ?) অতিথিরাও, যারা এরই মধ্যে বালসাম আর টোরেনিয়ার ফুলের গন্ধ মেখে কয়েক গ্লাস পান করে লনে প্রবেশ করেছিল, উচ্ছ্বাসের সঙ্গে সাড়া দিচ্ছিল।
কখনও কেউ তার হাত চেপে ধরছিল বা কেউ তার খোলা পিঠ বেয়ে হাত নামিয়ে দিচ্ছিল―তার পিঠ ছিল অ্যাথলেটিক, কারণ সে একসময় টেনিস খেলত এবং বেশ ভালোই খেলত। একবার কেউ বলল, ‘আমি এই কোনায় বসে লুকিয়ে তোমাকে দেখছিলাম।’ আরেকজন তো এতদূর পর্যন্ত বলল, ‘তুমি সত্যিই আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছ, বীণা ? তুমি এত নিষ্ঠুর হতে পারো কীভাবে ?’ অতিথি যদি কোনও নারী হতেন, তাদের কথাগুলো আরও আবেগপূর্ণ শোনাত। পুরো পরিবেশটা ছিল মাদকতাময়, বিস্ময়কর।
এটি বিস্ময়কর ছিল, কারণ বীণা ছিলেন এক নিঃসঙ্গ ও বন্ধুহীন নারী। তার বয়স পঁয়ত্রিশ। পনেরো বছর ধরে তিনি তার সন্তানদের মানুষ করছিলেন, বিশেষ করে বড় ছেলেটিকে, যে গুরুতর শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় ভুগছিল। এই সন্তানটির প্রতি তার যত্ন এবং দায় এতটাই গভীর এবং অসহায় ছিল যে, হাসপাতালে চিকিৎসক ও বিভাগের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেবল পেশাগত মাত্রায় সীমাবদ্ধ ছিল। এই পরিবার এবং হাসপাতালের বৃত্তের বাইরে―যা যেন কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা এবং একমাত্র বন্য আলোয় আলোকিত―বীণার জীবনে আর কিছুই ছিল না।
শহর তাকে খুব একটা চিনত না, কারণ শহরের জীবন ছিল আরও আনন্দময় পরিবেশে মগ্ন―মাহজং, ব্রিজ খেলা, কফি পার্টি, ক্লাবের সন্ধ্যা আর মাঝে মাঝে রেড ক্রসের সহায়তায় আয়োজিত দাতব্য অনুষ্ঠানে। বীণার কাছে এসবের প্রতি এক ধরনের বিষণ্ন অবজ্ঞা ছিল, এবং তার কাছে এইসবের জন্য সময় ছিল না। লম্বা, ফ্যাকাশে, ভারী হাড়ের এবং মলিন মুখের এই নারীটির এক অদ্ভুত উপস্থিতি ছিল, একটি নীরব মর্যাদা। শহরের মানুষ, যারা তার প্রতিবন্ধী সন্তানের কথা শুনেছিল, তাকে পছন্দ করত, এমনকি সম্মান করত। কিন্তু বীণা নিজে কখনও ভাবেননি যে তার কোনও বন্ধু আছে। অথচ আজ রাতে, সেই অন্ধকার থেকে যেন তরঙ্গের পর তরঙ্গ মানুষের আগমন ঘটছে, যা তাকে পুরোপুরি অভিভূত করে দিয়েছে।
এখন, কমিশনারের স্ত্রী মিসেস রায়, তার ঝমঝমে এমব্রয়ডারি করা অর্গানজার পোশাকে হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বললেন, ‘আপনারা এত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছেন কেন, মিসেস রমন ? এখানে তো আপনারা মাত্র দুই বছরই আছেন, তাই না ?’
‘পাঁচ,’ বিস্ময়ে বড় বড় চোখ করে বললেন বীণা, যেন নিজেই এত দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে অবাক হচ্ছেন। যদিও তাদের বাড়িতে সময় যেন কর্কশ গতিতে চলত, প্রতিটি দিন যন্ত্রণাদায়ক এবং ধীর। এই পাঁচটি বছর এত কঠিন ছিল যে, কখনও কখনও রাতে বীণা ভাবতে পারতেন না, কীভাবে একটি দিন পেরিয়েছেন এবং কীভাবে আরেকটি দিন পার করবেন। পুরোপুরি নির্ভরশীল সন্তানের ভার এবং তিনটি ছোট সন্তানের চাহিদায়, যারা সবসময়ই তাদের প্রাপ্য মনোযোগের জন্য তাগাদা দিত, বীণার পিঠ যেন প্রায় আক্ষরিক অর্থেই ভেঙে পড়েছিল।
তবু, এখন এই পাঁচ বছর যেন এক মুহূর্তে সংকুচিত হয়ে গেল। তারা শেষ। রমন পরিবার চলে যাচ্ছে, আর তাদের সময় এখানে ফুরিয়ে গেছে। হাসপাতাল, মেয়েদের স্কুল, ছেলেদের স্কুল, পিকনিক, বর্ষা, জন্মদিনের পার্টি, হাম―সবকিছু যেন একটি মুঠোয় গুটিয়ে গেছে। বীণা তার হাতের দিকে তাকালেন, যা গ্লাস এবং প্লেট শক্ত করে ধরে ছিল। ‘সময় যেন উড়ে গেছে,’ তিনি ফিসফিস করে বললেন, যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না।
‘ওহ, আপনারা যদি আরও কিছুদিন থাকতেন, মিসেস রমন,’ বলে উঠলেন কমিশনারের স্ত্রী। তিনি বীণার হাত আলতো করে চেপে ধরলেন, আর তার সুগন্ধি ট্যালকম পাউডার যেন তার সাদা চকচকে কাঁধ থেকে হালকা হয়ে উড়ে এসে বীণার গায়ে বসে গেল। এতে বীণা হাঁচি দিলেন। ‘আপনার মতো একটা পরিবার এখানে থাকা সত্যিই দারুণ। এ তো ছোট শহর, করার মতো তেমন কিছু নেই। অন্তত কিছু ভালো বন্ধুই তো থাকা দরকার…’
কমিশনারের স্ত্রীর এমন আন্তরিক কথায় বিস্মিত হয়ে বীণা চোখের পলক ফেললেন। এই ভদ্রমহিলার সঙ্গে তার দেখা হয়েছে বড়জোর দুই বা তিনবার। বীণা ও তার স্বামী কখনও সমাজজীবনে খুব একটা মিশতেন না। তাদের প্রথম সন্তানের জন্মের ধাক্কা তাদের দুজনকে প্রায় উদ্ভট রকমের অভিভাবকে পরিণত করেছে। তবে বীণা জানে, তাদের জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে সবাই তেমন করে অনুভব করে না। বরং অনেক সময় ‘সামাজিক দায়িত্ব’ সম্পর্কে তাদের উদাসীনতার প্রতি এক ধরনের তির্যক দৃষ্টিতে তাকানো হয়। বীণা সবসময়ই মনে করতেন যে, রেড ক্রস মেলার কাজে সাহায্য করতে তার অস্বীকৃতির জন্য কমিশনারের স্ত্রী বিরক্ত হয়েছিলেন। যে নীরব বিরহে তার অস্বীকৃতি মেনে নেওয়া হয়েছিল, তাতে ‘সামাজিক দায়িত্ব’-র গুরুত্ব বোঝানো হয়েছিল, যা বীণা বোঝার চেষ্টাও করেননি।
তবু, এই একটি সন্ধ্যা, এই শেষ পার্টি, যেন তাদের স্বীকৃতি এবং উদযাপনের জন্যই আয়োজন করা হয়েছে। ‘ওহ, সবাই, সবাই এসেছে,’ উচ্ছ্বসিতভাবে বলে উঠলেন কমিশনারের স্ত্রী। তার চোখ এক মুখ থেকে আরেক মুখে ঘুরছিল, যেন ভিড়ের এই অ্যাকোয়ারিয়ামে কারা কারা উপস্থিত আছে খুঁজে বের করছেন। আরও উচ্চস্বরে তিনি বললেন, ‘রেণু, মাহজং পার্টিতে আজ সকালে তো তোমাকে দেখিনি ?’ তারপর আরেকটি ট্যালকম পাউডারে মোড়া অর্গানজার আলিঙ্গনের দিকে এগিয়ে গেলেন। যেন রাতের অন্ধকার থেকে একটি পোকা উড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল এবং আবার লনের ছায়ার মধ্যে হারিয়ে গেল।
বীণা এমন একটি হাসি দিলেন যা ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষদের কাছে ঠাট্টাসূচক মনে হতে পারে, একটু বেশি আত্মবিশ্বাসী, এমনকি কিছুটা তাচ্ছিল্যপূর্ণ। গ্লাসে থাকা জিন ও লেবুর দিকে তাকিয়ে, তিনি অন্য দিকে হাঁটলেন। মিনিটখানেকের মধ্যেই তিনি নিজেকে খুঁজে পেলেন এক মোটাসোটা কিন্তু খানিকটা রাজকীয় চেহারার ব্যক্তির সামনে, বোস―যিনি স্থানীয় জাদুঘরে কাজ করেন। তার পরনে মোটা রেশম আর হোমস্পুনের পোশাক, যার সঙ্গে ছিল এক ধরনের ক্লান্তি আর সংস্কৃতিহীনতার ছাপ। বীণা তাকে আগেও দু-একবার দেখেছেন শিশুদের আর্ট প্রতিযোগিতা বা প্রদর্শনীতে। এমন অনুষ্ঠানে তিনি তার সন্তানদের নিয়ে যেতে পছন্দ করতেন, তারা আগ্রহী থাকুক বা না থাকুক। তিনি বলতেন, ‘এইটুকু তো একটু পরিবর্তন।’
‘মিসেস রমন,’ কালচার-বিহ্বল বাঙালির সেই সুরেলা গলায় তিনি শুরু করলেন, ‘আপনাকে ছাড়া পরের আর্ট প্রতিযোগিতাগুলো কীভাবে হবে! আপনি ছিলেন আমার প্রধান অনুপ্রেরণা―’
‘অনুপ্রেরণা ?’ বীণা অবিশ্বাসের হাসি হাসলেন, কিছুটা পানীয় একটু ছলকে পড়ল। তার হাতে থাকা চিজ বিস্কুটের প্লেটটি সে এগিয়ে দিল। বোস তা এমনভাবে নিলেন, যেন তিনি সোনা বা মূল্যবান রত্ন অফার করেছেন।
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, অনুপ্রেরণা,’ বোস বললেন, তার মুখ চিজ বিস্কুটে পূর্ণ হলেও গলা আরও সুরেলা হয়ে উঠল। ‘ভাবুন তো, আমি একা, দুর্ভাগা একজন আয়োজক, চারপাশে মায়েরা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকারা, আর তিন, চার, পাঁচশো বাচ্চা। আর বিচারকেরা! সবচেয়ে ঝামেলা তো তারাই তৈরি করে। আর তখন আমি তাকাই আপনার দিকে―এমন শান্ত, এমন নিয়ন্ত্রিত। সন্তানদের কী চমৎকারভাবে সামলাচ্ছেন, আর এমন দারুণ ফলাফল তাদের। আপনিই আমার অনুপ্রেরণা!’
এমন এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে নিজেকে দেখে বীণা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। নিজের মুখটি আড়াল করতে খানিকটা ঘুরে দাঁড়ালেন, যেন বোসের কাছ থেকে দূরে সরে অচেনা নিজেকে নতুনভাবে চিনতে পারেন। কিন্তু তিনি তার প্রতিফলন কোথাও খুঁজে পেলেন না―‘কুইন অফ দ্য নাইট’-এর ভৌতিক সাদা ঝোপেও নয়। বরং বোসের কলকল কণ্ঠধ্বনিই তার কানে বাজতে লাগল, বোসের সেই অভিযোগ, তাকে এমন এক সাংস্কৃতিক মরুভূমিতে ফেলে তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য, যেখানে তার ভাগ্য যেন অন্ধকারের মধ্যে দগ্ধ হচ্ছে। এখানে তিনি একজন প্রাদেশিক জাদুঘরের রক্ষক, এমন একটি জায়গা যেখানে কেবল স্কুলের শিক্ষিকারা বাচ্চাদের নিয়ে আসেন আর সরকারি কর্মকর্তারা মাঝে মাঝে এসে তাকে নতুন সমস্যায় ফেলেন। কর্মকর্তারা তাদের আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি জানান দেন অজন্তার দেয়ালচিত্রের কপি বা সিন্ধু সভ্যতার সিলমোহরগুলোর ক্যাবিনেটের সামনে, (যেগুলোর ছাঁচ ধরা বা খসে পড়া অংশও যত্ন করে মেরামত করা আছে)
বীণা সহানুভূতির স্বরে কিছু সান্ত্বনার কথা বলে বোসকে রেখে এলেন ইতিহাসের এক বিষণ্ন তরুণ অধ্যাপকের কাছে, যিনি আরেকটি প্রাদেশিক প্রতিষ্ঠানের হতাশার মধ্যে আটকে আছেন। সেই অধ্যাপকের স্ত্রী প্রায়ই সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়েন। বীণা ধীরে সরে গেলেন, এখনও বোসের কথায় নিজের একটি অপ্রত্যাশিত ছবি দেখে অস্বস্তি অনুভব করছেন, যা তার নিজের বাস্তব চেহারার সঙ্গে একদমই মেলে না।
তিনি এগিয়ে গেলেন আরেকটি গোষ্ঠীর কাছে, যেখানে ছিলেন ‘কোম্পানি স্ত্রীরা’, যারা বরাবরের মতো একটি বৃত্তে জড়ো হয়ে কিচিরমিচিরে মগ্ন ছিলেন। এরা এমন একটি বৃত্ত তৈরি করেছিল যা গাছের নিচে জড়ো হওয়া ‘গার্ডেন বাবলার’ পাখিদের মতো, যেখান থেকে সামাজিক কটাক্ষের শব্দ উঠছিল। বীণা তাদের এভাবে বহুবার দেখেছেন, কিন্তু সবসময়ই বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়েছেন, কঠিনভাবে হাসি ধরে রেখেছেন কিন্তু যোগ দেওয়ার ইচ্ছা করেননি এবং তাদের অতিরিক্ত উৎসাহের আমন্ত্রণও নীরবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এই নারীরা ছিলেন শহরের বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যেমন ইম্পিরিয়াল টোব্যাকো, ব্রুক বন্ড, এসো ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের স্ত্রী। বাইরে থেকে যে কোনও অপরিচিত ব্যক্তির কাছে তাদের বেশ মিল আর একই রকম দেখালেও, তাদের মধ্যকার সামাজিক অবস্থানে গুরুত্বের পার্থক্য ছিল সূক্ষ্ম। স্বামীর কোম্পানির মর্যাদা অনুসারে এই গুরুত্বের স্তর নির্ধারিত হতো, যা কেবল তারা নিজেরাই বুঝতেন। বীণা অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই গোষ্ঠীর একজন সদস্য। তার স্বামীও একটি কোম্পানিতে কাজ করতেন, কিন্তু বীণা এই সামাজিক পার্থক্যগুলোকে স্বীকার করতে বা মানতে সবসময়ই অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে।
তারা জানে, তাদের মধ্যে উপস্থিত থাকলেও বীণার নীরবতায় একটি নির্দিষ্ট বিরক্তি এবং একগুঁয়েমি রয়েছে। তারা তাকে অদ্ভুত, অহংকারী, বিরক্তিকর এবং কঠিন স্বভাবের বলে মনে করে। তবে তারা এটাও মনে করে, তিনি তাদের এই বৃত্তের অংশ―তিনি সেটা পছন্দ করুন বা না করুন।
বীণা সঙ্কোচ নিয়ে এই বৃত্তে প্রবেশ করে। তার ইচ্ছে করছিল যদি আরও কিছুক্ষণ মনোরম বোসের সঙ্গেই থাকত (কেন সে থাকল না ? কী এমন ছিল তার মধ্যে যা বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগ থেকে তাকে দূরে সরিয়ে রাখল ?)। কিন্তু সে অবাক হয়ে গেল যখন দেখল, সেই বৃত্তটিও তাকে জায়গা করে দিতে সরে গেল, আর সবাই তাকে স্বাগত জানিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল, যদিও সেই উচ্ছ্বাসে ‘গার্ডেন বাবলার’ পাখির কিচিরমিচিরের মতো কর্কশতা কমেনি।
‘বীণা, বোম্বেতে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি কেমন লাগছে তোমার ?’
‘প্যাকিং কি শুরু করেছ, বীণা ? আহা, কষ্টের ব্যাপার। ওহ, দিল্লি থেকে প্যাকিং কর্মী এনেছো তো ? তাহলে খুব একটা খারাপ হবে না।’
বীণার সঙ্গে এমন প্রাণবন্ত বা উষ্ণভাবে তারা কখনও কথা বলেনি। এরা এমন নারী, যাদের জীবনে সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনা ছিল হয় একটি সোনার কানের দুল বাথরুমের সিঙ্কে পড়ে যাওয়া, অথবা শাশুড়ির আকস্মিক আগমন, কিংবা অতিথি আসার আগে আয়ার পালিয়ে যাওয়া। বীণার জীবন, তার সংগ্রামের ব্যাপারে তারা কী-ই বা জানত ? তিনি তাদের হাতে থাকা পানীয়ের দিকে নজর দিলেন। বেশির ভাগই ছিল কমলার শরবত। কেবল এসোর স্ত্রী, যিনি অপেশাদার নাট্যাভিনয়ে অংশ নেন এবং একটি বুটিক চালান, যিনি বাকিদের চেয়ে খানিকটা লম্বা এবং সাহসী। তার হাতে হুইস্কি এবং সোডা। এতটা উষ্ণতা কি শুধু কমলার শরবত থেকে আসতে পারে ? অসম্ভব।
কিছুটা দ্বিধার সঙ্গে, বীণা চিজ বিস্কুটের অবশিষ্ট অংশ তাদের এগিয়ে দিল, এবং তাদের সাথে চড়ুইভাতির মতো কথাবার্তা শুরু করল। ঘরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকা প্যাকিং বাক্সগুলোর অসুবিধার কথা, বোম্বেতে তাদের ফ্ল্যাট এসব নিয়ে আলোচনায় জড়িয়ে পড়ল। তবু, ভেতরে ভেতরে চাপা উদ্বেগে সে ঘামছিল। এমন সময় লনের তরল অন্ধকারের প্রান্ত থেকে আরেকটি পরিচিত মুখ ভেসে উঠতে দেখলেন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে অন্যদিকে সরে গেল, বলল, ‘মিসেস ডিসুজা! তুমি এত দেরি করলে কেন, তবে আমি ভীষণ খুশি।’
মিসেস ডিসুজা ছিলেন তার মেয়ের কনভেন্ট স্কুলের শিক্ষিকা, এবং স্পষ্টতই তিনি আগে কোনও ককটেল পার্টিতে যাননি। তার স্কুলজুতা-ঘষা চেহারা এবং চায়ের পার্টির সেরা পোশাক দেখে বীণার সমস্ত সহানুভূতি জেগে উঠল। এই সরল সত্যের বাইরেও, বীণা তার মধ্যে খুঁজে পেল এমন একটি সৎ ব্যক্তিত্ব, সুন্দর সজ্জিত ও পরিপাটি ‘গার্ডেন বাবলারদের’ মধ্যে একেবারেই অনুপস্থিত ছিল, যাদের ব্যক্তিত্ব তাদের স্বামীদের কোম্পানির রাবারের স্ট্যাম্পের মতো সমতল।
বীণা তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল মিসেস ডিসুজার জন্য উপযুক্ত পানীয় খুঁজে দিতে। ‘শেরি ?
ওহ, হ্যাঁ, আমি ব্যবস্থা করতে পারব।’
বীণা একটু অবাক হলো এমন অপ্রত্যাশিত রুচি দেখে। তারপর কিছুটা অস্পষ্ট এবং মিথ্যা মিশিয়ে বলল, ‘আর হ্যা আমি দেখব মিস তারা কাছাকাছি আছে কি না। সে তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছিল।’
মনে মনে ভাবলো বীণা মিসেস ডিসুজাকে ককটেল পার্টিতে আমন্ত্রণ না জানালেই ভালো হতো।।
গোলাপের বাগানের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎ সে দেখলে, প্রশংসাকারী বোস তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। সন্ধ্যর মতো সেই অদ্ভুত অন্তরঙ্গতায় তাকে জড়িয়ে ফেললেন। কিন্তু এবার বীণা হালকা মেজাজে সরে গেল টেবিলের দিকে, যেখানে তার স্বামী ভেজা সাদা ইউনিফর্ম পরা ভাড়াটে ওয়েটারদের সাহায্যে পানীয়ের স্রোত সামলাতে ব্যস্ত ছিলেন। ইউনিফর্মের পকেটগুলোতে লাল হরফে ওয়েটারদের রেস্তোরাঁর নাম লেখা।
ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত, আর পায়ের তলা জ্বালাপোড়া করা অবস্থাতেও রমন খুশি ছিলেন যে তিনি এতটা ব্যস্ত। এই ব্যস্ততা তাকে অতিথিদের রংবেরঙের ভিড়ের সঙ্গে কথা বলার ক্লান্তিকর চাপ থেকে মুক্তি দিচ্ছে। তার সামাজিক দক্ষতা তার স্ত্রীর চেয়ে বেশি নয়। টেবিলক্লথের ওপর বরফ গলে গলে স্যাঁতসেঁতে কাদায় পরিণত হয়েছে, আর তিনি বোতলগুলোর হিসাব রাখতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। এই বোতলগুলো নতুন কেনা ডজনখানেক বিয়ারের বোতল এবং ব্ল্যাক নাইট হুইস্কি ছাড়াও এই শহরে পাঁচ বছরে তাদের জীবনযাপনের স্মৃতি।
এগুলোর মধ্যে ছিল বন্ধুদের বিদেশ থেকে আনা বোতল, সেনাবাহিনী বা বিমানবাহিনীর ‘যোগাযোগ’ থেকে কম দামে কেনা বোতল এবং কিছু দুষ্প্রাপ্য মূল্যবান পানীয়, যা তারা বার্ষিকী উদযাপনের জন্য কিনেছিলেন। প্রায় পুরোপুরি ভরা একটি ভ্যাট ৬৯ বোতল, যার তলায় ক্রেম দ্য মেন্থের লেগে একটু চটচটে হয়ে গেছে, বাদামি শেরির একটি বোতল যার তলায় মরচে পড়া সেডিমেন্ট জমে আছে, হায়দ্রাবাদের লাল গোলকোন্ডা ওয়াইন, এবং একটি রেমি মার্টিন বোতল, যা তিনি লজ্জাজনকভাবে নিজের জন্য তুলে রেখেছিলেন। তিনি সেখান থেকে সামান্য পরিমাণে নিজের পাশে রাখা হুইস্কির গ্লাসে ঢালছিলেন এবং অতিথিদের জন্য অদ্ভুত সব ককটেল তৈরি করার ফাঁকে ফাঁকে এক চুমুক গিলে নিচ্ছিলেন।
পার্টিতে এমন কেউ ছিলেন না যাঁর সঙ্গে তিনি এটি ভাগ করে নিতে পারেন। হয়তো ডাক্তারদের একজন, কিন্তু তারা কোথায় ? তারা হয়তো সবুজ ঘাসে হারিয়ে গেছেন, রাতের আঁধারে ডুবে আছেন, কাচের গ্লাসে বরফের টুংটাং আর বিস্কুটে দাঁতের কামড় দিচ্ছেন। টুকরো টুকরো ভাঙা বিস্কুট আর পানীয়ের তলানি এবং এনামেল আর সোনার দাঁতের সঙ্গে দাঁতের সংঘর্ষ হচ্ছে। সবকিছু যেন একরকম ডুবে আছে, ভেজা রাতের স্রোতে ভাসছে পানীয়ের তরল শব্দ, পানির গন্ধ, বরফ আর রাত।
তার মনে হলো, পার্টির আয়োজককেই যেন সবাই ভুলে গেছে। ওয়েটারদের মাঝে নিজেকে বসিয়ে রাখাটা হয়তো তার ভুল হয়েছে। তার উচিত ছিল বাইরে গিয়ে অতিথিদের সঙ্গে মিশে যাওয়া। কিন্তু তিনি নিজেকে একেবারে ডুবে যেতে দিলেন রেমি মার্টিন, সবুজ ঘাস আর পার্পল টোরেনিয়ার সীমানায়, এক অসহায় কিন্তু আনন্দময় মাদকতায়।
তারপর তাকে আবিষ্কার করল তার ছেলে, যে অতিথি ও ওয়েটারদের ভিড় ঠেলে ছুটে এসে বাবার গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং জিজ্ঞেস করল, সে কি নতুন বিটলস রেকর্ডটি চালাতে পারে, তার বন্ধুরা তা শুনতে চেয়েছে।
রমন সুযোগ নিয়ে আরেক গ্লাস মূল্যবান রেমি মার্টিন ঢাললেন এবং দ্রুত চুমুক দিয়ে গিললেন। ‘ঠিক আছে,’ তিনি কয়েক মুহূর্ত চিন্তাভাবনা করে বললেন, ‘কিন্তু ভলিউম কম রাখবে। সবাই শুনতে চাইবে না।’ তিনি যোগ করলেন না যে, তিনিই শুনতে চাইতেন না, কারণ তার পছন্দ ছিল ধীর লয়ের বিষণ্ন সুর, সবচেয়ে সহজ-সরল লোকগীতি।
তবু, তিনি আলোকিত ঘরের দিকে একবার তাকালেন, যেখানে তার সন্তান এবং প্রতিবেশীদের ও অতিথিদের সন্তানরা একত্র হয়েছিল। তারা ফান্টা আর কোকা-কোলায় হালকা মাতাল হয়ে গেছে। মেয়েরা রঙিন পোশাকে হাসতে হাসতে গুছিয়ে বসেছে, আর ছেলেরা যেন ককটেল পার্টির অভিজ্ঞ অতিথির মতো স্টাইল করে রেকর্ড প্লেয়ারের চারপাশে ঘুরছে, হাতে বোতল নিয়ে স্বচ্ছন্দ ভঙ্গিতে হাঁটছিল। রমন হেসে ফেললেন এবং ভাবলেন, ‘পার্টির ভেতর এই পার্টি’তে প্রবেশের জন্য তার জন্য যদি আলাদা কোনও টিকিট বা পাসপোর্ট এর ব্যবস্থা থাকত! কিন্তু ভয়ংকরভাবে এটা পরিষ্কার যে, তার কাছে তা নেই!
তিনি আরও দেখলেন, তাদের এই মাতামাতির বড় একটি অংশের কারণ হলো তারা ওয়েটারদের ট্রে থেকে খাবার লুফে নিচ্ছিল, যেগুলো লন থেকে ঘরের ভেতর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। খাবারের ট্রেগুলো প্রায় অর্ধেক খালি হয়ে বের হচ্ছিল। তিনি জানতেন তার উচিত ছিল ভেতরে গিয়ে বিষয়টি দেখা, কিন্তু তার সাহস বা ইচ্ছা কোনওটাই ছিল না। তিনি সেই পার্টিতে যোগ দিতে পারলেন না, তবে তা নষ্ট করতেও চাননি। তাই কেবল একজন ওয়েটারের সঙ্গে কথা বললেন এবং বললেন, খাবারের ট্রেগুলো সরাসরি রান্নাঘর থেকে লনে নিয়ে যাওয়া হোক, ড্রইংরুম দিয়ে নয়। এরপর তিনি ওয়েটারটিকে সেই দলটির কাছে নিয়ে গেলেন, যাদের কাছে খাবার ছিল না। কিন্তু পরে দেখলেন, সেটি ছিল সেই ‘কোম্পানি নির্বাহী’দের দল, যাদের তিনি সবচেয়ে অপছন্দ করেন।
তিনি নিজেই হালকা গর্জন করলেন, তারপর ভুল বুঝতে পেরে অল্পস্বরে হেঁচকিও তুললেন। কিন্তু তখন আর দিক পরিবর্তন করার উপায় ছিল না। পরে নিজেকে এটাই বোঝালেন যে খাবার বিতরণে কোনও সমস্যা বা ভুল করা যাবে না, সবার জন্যই নিশ্চিত করতে হবে।
অসহায় রমন কোম্পানির পদমর্যাদার ক্রমে নিচের সারিতে ছিলেন। তিনি কোনও ব্রিটিশ সংস্থার অংশ ছিলেন না, এমনকি কোনও আমেরিকান সহযোগী সংস্থারও না, বরং শুধুই একটি ভারতীয় সংস্থার। অবশ্য এটি দীর্ঘকাল ধরে প্রতিষ্ঠিত, সমৃদ্ধ এবং মজবুত একটি কোম্পানি ছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও, এটি কেবলই ভারতীয়। যে সিগারেটগুলো তিনি অতিথিদের মধ্যে বিলি করছিলেন, সেগুলো তার নিজের কোম্পানির তৈরি। এই পরিশীলিত পুরুষদের কাছে, যারা স্বাধীনতা দিবসের আগের রাত এবং নববর্ষের সন্ধ্যায় ক্লাবে নাচত, পার্টিতে অন্তত একটি বিদেশি দম্পতিকে আমন্ত্রণ জানাত এবং প্রকাশ্যে তাদের সাজানো স্ত্রীদের ‘ডার্লিং’ বলে ডাকত, সিগারেটগুলো কোনওভাবে খারাপ স্বাদের ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
অসহায় রমন কখনওই এই পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারেননি। এটি সকলের কাছেই স্পষ্ট ছিল, এমনকি তার নিজের কাছেও, যখন তিনি বাজারে দারুণ বিক্রি হওয়া সেই অতি সাধারণ সিগারেটগুলো বিলি করছিলেন। এটি প্রথম থেকেই স্পষ্ট ছিল, পাঁচ বছর আগের সেই দুর্বিষহ ডিনার পার্টি থেকেই। সেই পার্টি এই হাস্যরসিক ভদ্রলোকদের জন্যই আয়োজিত হয়েছিল।
ননো পুরো পার্টি জুড়ে কেঁদেছিল, বীণা সন্ধ্যাটা দৌড়াদৌড়ি করেই কাটিয়েছিল। একবার উপরে বাচ্চাদের স্নান এবং শোয়ার আয়োজন করতে, আবার নিচে নেমে অতিথিদের মুখোমুখি হতে। আর যে ভাড়াটে রাঁধুনি তারা নিয়োগ করেছিলেন, তিনি মাতাল হয়ে দুটি মুরগি চুরি করেছিলেন। ফলে টেবিলে খাবার পর্যাপ্ত ছিল না। কেউ এক মুহূর্তের জন্যও আরাম করেনি, কিংবা একটি সেকেন্ডও উপভোগ করেনি। এটি এতটাই দুঃখজনক এবং ক্লান্তিকর ছিল যে, এটি একটি ভালো গল্প বা বলার মতো মজার ঘটনাও ছিল না। সবাই একে চুপচাপ ভুলে যেতে চেয়েছিল। সেই সময় থেকেই শনিবার বিকেলে গলফ খেলার বা রবিবার সকালে ব্রিজ খেলার আমন্ত্রণগুলো কৌশলে প্রত্যাখ্যান করা শুরু হয়েছিল।
তার ওপর ছিল রমনের সেই বিরক্তিকর শখ, তার অসম্ভব দীর্ঘ হাঁটা আর কাঠের টুকরো কুড়িয়ে নিয়ে এসে তা ঘষে-মেজে চিসেল করা, যেগুলোকে সে ‘কাঠের ভাস্কর্য’ বলে। এমন একজন মানুষের সঙ্গে কী করা যায় ? রমন নিজেও নিশ্চিত ছিলেন না, তিনি এই অদ্ভুত শখগুলি পালন করতেন, কারণ তিনি সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য ছিলেন, নাকি এই অদ্ভুত বিষয়গুলোর কারণেই তিনি এমন একা হয়ে গেলেন। আর সেই সাথে তার প্রতিবন্ধী সন্তানের কথাও তো আছে, যা ভাবতেও তার মন সঙ্কুচিত হয়ে যায়।
তাই এটা আশ্চর্যের কিছু নয় যে, রমন তাদের দিকে এমন ইতস্তত ভঙ্গিতে এগিয়ে গেলেন, যেন তিনি ঘাসের উপর দিয়ে নয়, বরং জলের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। তিনি সিগারেটগুলো এমন ক্ষমাপ্রার্থনার ভঙ্গিতে বিলি করছিলেন, যেন কোনও ভুল করে ফেলেছেন।
তবে, শেষমেষ, এই ইতস্তত-ভাব এবং ক্ষমাপ্রার্থনা অপ্রয়োজনীয় প্রমাণিত হলো। তাদের মধ্যে একজন―তিনি কি পলসনস কফি না ব্রুক বন্ড চা ? রমনের কাঁধে আলতো করে হাত রাখলেন, যেমন ভদ্রলোকেরা সাধারণত দেখা হলে করে। উষ্ণ কণ্ঠস্বর একত্রে উঠল, তাকে তার ‘প্রমোশন’-এর জন্য অভিনন্দন জানাল (যদিও এটি প্রমোশন ছিল না, বরং একটি স্থানান্তর, এবং তারা তা জানত)। তারা তার মেট্রোপলিসে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে হিংসা প্রকাশ করল।
তারা এমনভাবে কথা বলছিল, যেন তারা বহু বছর ধরে একে অপরকে চেনে, যেন স্কুলের মজার স্মৃতি একসঙ্গে ভাগ করেছে। একজন, তিনি কি ভোল্টাস না সিবা ? উইলিংডনে গলফ খেলার কথা বলছিলেন, যেন রমন প্রায়ই সেখানে তার সঙ্গে খেলেছেন। আরেকজন পার্টির পর রাস্তায় কাবাব খাওয়ার কথা বলছিলেন, যেন রমন সেই দলেরই একজন।
রমন বিস্মিত এবং কৃতজ্ঞ বোধ করলেন, যেন কোনও স্কুলছাত্র বন্ধু-গোষ্ঠীতে প্রবেশের অনুমতি পেয়েছে। তিনি মাথা নেড়ে কিছু সাবধানী মন্তব্য করলেন, সিগারেটগুলো সরিয়ে রাখলেন, একজন ওয়েটারকে ডেকে তাদের গ্লাস পুনরায় ভরে দেবার অনুরোধ করলেন এবং দ্রুত সরে গেলেন ঘড়ির কাঁটা বারোটা বাজার আগে, যাতে সোনার রথ কুমড়োতে এবং তিনি নিজে ইঁদুরে রূপান্তরিত না হন। কারণ তিনি ইঁদুর একদমই পছন্দ করতেন না।
পিছিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রমন সরাসরি মিস দত্তর নরম প্রতিবন্ধে গিয়ে ধাক্কা খেলেন, যিনি বিলাসবহুল মাদ্রাজ সিল্কে আবৃত ছিলেন।
‘সরি, সরি, মিস দত্ত, আমি তো ভাল্লুকের মতো বেখেয়ালি,’ ক্ষমা চাইলেন রমন। তবে, এখানে ক্ষমা চাওয়ার দরকার ছিল না, কারণ মিস দত্ত এই ধাক্কায় স্পষ্টতই আনন্দিত হয়েছিলেন।
‘প্রিয় মিস্টার রমন, পুরো শহরটাকে পার্টিতে আমন্ত্রণ করলে এমনটাই তো হওয়ার কথা, তাই না ?’ তিনি বললেন সেই তীক্ষè স্বরে, যা প্রায়ই তার সঙ্গীদের কণ্ঠকে সচেতনভাবে নামিয়ে আনত। ‘তুমি আর বীণা এত জনপ্রিয়, তোমাদের ছাড়া আমরা কী করব ?’
সাদা হয়ে আসা গ্লাসটি আঙুলে চেপে ধরে রমন ভাবতে লাগলেন, এমন কী করেছেন তিনি বা বীণা, যা মিস দত্ত মিস করবেন। আসলে, মিস দত্ত সবকিছু একা সামলাতে জানতেন এবং সামলাতেন। তিনি ছিলেন শহরের ব্যস্ততম মানুষ, যত কমিটি রয়েছে তার চেয়ে বেশি কমিটির তিনি সচিব ও চেয়ারম্যান ছিলেন। তার কমিটিগুলোর তালিকায় ছিল ফিল্ম সোসাইটি থেকে ব্লাড ব্যাংক, রেড ক্রস থেকে মিউজিয়ামের বন্ধু সংঘ―মিস দত্ত ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী।
‘আপনাকে আমাদের সিনেমা প্রদর্শনীতে খুব একটা দেখিনি, অবশ্য,’ তার কণ্ঠ ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল, রমন কাঁধের ওপর দিয়ে লুকিয়ে দেখে নিলেন কেউ শুনছে কি না। ‘তবে এটা জানাই ভালো ছিল যে আপনি শহরে আছেন এবং আমি আপনার ওপর নির্ভর করতে পারি। এখানে এমন কম মানুষ আছেন যারা সত্যিই কিছু নিয়ে ভাবেন।’ বলেই তিনি তার আরামদায়ক মধ্যবয়সী শরীরটি স্নেহপূর্ণ ভঙ্গিতে রমনের গায়ে ঠেকিয়ে দিলেন, কারণ কেউ পাশ কাটাতে গিয়ে তাদের ছুঁয়ে গেল।
রমনের মনে পড়ল যে, একবার তিনি শুনেছিলেন, মিস দত্তকে ‘পুরুষখেকো’ বলা হয়েছিল। তিনি ভাবলেন, কোন পুরুষটিকে তিনি খেয়েছেন ? এমনকি একটি মুহূর্তের জন্য ভেবেও দেখলেন, হয়তো তার পাউডার লাগানো ক্রিমি বাহুগুলোর ভাঁজে কোনও আকর্ষণ ছিল, যা তার ক্লান্ত ও জীর্ণ স্ত্রীর হাড়ের মতো তীক্ষè কোণগুলোকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে বা ছাড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু কোনও কষ্ট ভোগ করলে শরীর এত কোণঠাসা হয়ে যায় ? নিজেই নিজেকে এমন নির্দয় প্রশ্ন করলেন তিনি।
কিন্তু যখন মিস দত্ত তার গ্লাস ধরা হাতের ওপর নিজের হাত রেখে, পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে রমনের কানে কিছু বলতে গেলেন, তখন তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি এতদিন তীক্ষè কোণগুলোর সঙ্গে অভ্যস্ত হয়েছেন যে, এমন নির্লজ্জ আরামপ্রিয়তায় নিজেকে বদলানোর ইচ্ছা নেই।
তিনি তার কনুইটি ধরে আলতো করে সরিয়ে ধরে (আহ, আঙুল কত গভীরে ডুবে যায়!) তাকে স্ত্রী বীণার দিকে নিয়ে গেলেন। বীণা তখন টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে অদক্ষভাবে নিজের জন্য আরেক গ্লাস জিন আর লেবু ঢালছিলেন।
‘এটা আমার তৃতীয়,’ তাড়াহুড়ো করে স্বীকার করলেন বীণা। ‘আর কীভাবে এটা আমাকে এত আনন্দিত করে তুলেছে, তা বলতে পারব না। সবাই যা বলে, সবকিছুতেই হাসি পাচ্ছে।’
‘ভালো,’ বললেন রমন, মুহূর্তের জন্য হলেও বীণার সেই চাপা উদ্বেগ এবং চিন্তাভাবনা হারানোর দৃশ্য দেখে এক ধরনের উষ্ণ স্বস্তি অনুভব করলেন।
‘তাহলে শোনাও তোমার সেই হাসি,’ বললেন তিনি, তার গ্লাসে আরও খানিকটা জিন ঢালতে ঢালতে।
‘ওই দেখো বাচ্চাদের,’ বীণা চিৎকার করে বলল, এবং তারা দাঁড়ালেন বালসামের বাগানে, যা এখন পায়ে পিষে চূর্ণ-বিচূর্ণ। তারা আলোকিত ড্রইং রুমের ভেতরে তাকালেন, যেখানে তাদের মেয়ে ঠিক সেই মুহূর্তে সব তরুণ চোখের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে এক বানরসদৃশ নাচে লিপ্ত হয়েছে। ‘এটা কী নাচ, মিস দত্ত ?’ বিস্মিত মা জানতে চাইলেন। ‘আপনি তো সর্বশেষ ফ্যাশন সম্পর্কে আমার চেয়ে বেশি জানেন―এটা কি টুইস্ট, রক নাকি জঙ্গল ?’
তিনজনই মুগ্ধ হয়ে দেখলেন, যতক্ষণ না তারা হঠাৎ টলতে টলতে নিজের বানরসদৃশ মাধুর্য হারিয়ে, তার চিৎকাররত বান্ধবীদের ওপর ভেঙে পড়ে।
তাদের মেয়ের এই অপ্রতিরোধ্য উচ্ছৃঙ্খলতায় খানিকটা বিব্রত হয়ে, বাবা-মা মিস দত্তের সঙ্গে আলোচনা করলেন, যিনি নিজের বক্তব্যে স্বীকার করেছিলেন যে তার আঙুল সবসময় তরুণ প্রজন্মের নাড়ির ওপর সঠিকভাবে রয়েছে। তরুণ সংস্কৃতির সর্বশেষ প্রবণতা নিয়ে মিস দত্ত একটি নিখুঁত সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করলেন (যা তিনি সেই দিনই হোম সায়েন্স কলেজের সমাবর্তনে উপস্থাপন করেছিলেন, এবং আরও নিখুঁতভাবে পুনরাবৃত্তি করলেন)।
রমন অস্বস্তির সঙ্গে ভাবতে লাগলেন, কীভাবে তাদের পরিবারে এই পরিবর্তনের জোয়ার এল, তার স্ত্রী জিনের প্রভাবে হাসিখুশি হয়ে উঠেছে, আর তার মেয়ে চাবি চেকারের রেকর্ডে বুনো নাচ করছে। এসব কি চারপাশের ঘন অন্ধকারের কারণে ? যেন মঞ্চের ভারী পর্দার মতো সেই অন্ধকার, যা তাদের এই অল্প সময়ের জন্য আলোকিত মঞ্চে বাধাহীনভাবে অভিনয় করতে উৎসাহিত করল। নাকি এটি ছিল সেই পানীয়, যা ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঢালাওভাবে পরিবেশিত হচ্ছিল ?
রমন নিজেই তার ‘সেলার’ পরিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন―যা আসলে তার ড্রেসিং রুমের সাইডবোর্ডের অর্ধেক এবং শীর্ষ তাক। সেখান থেকে বিভিন্ন পানীয় মিশ্রণ করে অদ্ভুত এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক ককটেল তৈরি করছিলেন, আর মাপ না করেই উদারভাবে হুইস্কি ঢালছিলেন।
তবে এগুলো প্রতিদিনের ব্যাখ্যা। কিন্তু এই পার্টি রমনের কাছে কিছু অদ্ভুত এবং অপ্রত্যাশিত ছিল। সাধারণত এত সাদামাটা এবং জনপ্রিয়তাহীন পরিবারে এমন প্রাণবন্ত পরিবেশ বিরল। তিনি সত্যিকারের কারণ জানতেন এটি ছিল ‘বিদায় পার্টি’। সবাই জানত, এটি শেষ পার্টি। রমন পরিবার শহর ছেড়ে চলে যাবে, এবং তারা আর দেখা করবে না। এই পার্টির পরিবেশ ছিল ঠিক সেই রকম, যেমন ভ্রমণের সমাপ্তির আগে, জাহাজের শেষ রাতের পার্টি।
এটা এমন এক অনুভূতি, যখন সবাই একে অপরের প্রতি সহজ এবং উষ্ণ হয়ে ওঠে। তাদের আচরণে বাঁধনহীনতা এবং অন্তরঙ্গতার অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে, যা আগে দেখা যায়নি। কারণ সবাই জানত, এটি শেষ সময়। পরের দিন তারা বিচ্ছিন্ন হবে। সব শেষ হয়ে যাবে। তারা আর একত্র হবে না, এই মুহূর্তের কথা মনে করিয়ে দেবে না, কিংবা এটি পুনরাবৃত্তি করার জন্য আর কখনও বাধ্য হবে না।
এই নতুন ‘সিন্ডারেলার বল’-এর মতো বন্ধুত্বপূর্ণ এবং আনন্দময় পরিবেশকে আরও স্পষ্ট করে তুলতেই যেন রমনদের বাড়ির বাম পাশে থাকা দম্পতি, ডান পাশের দম্পতি এবং রাস্তাপারের দম্পতি একসঙ্গে ঢুকে পড়লেন (তাদের পায়ে পিষ্ট হয়ে তিনটি কচিয়া গাছ মরে গেল, যা মালিকে ক্রুদ্ধ ও শোকাহত করল)। তারা সবাই চিৎকার করে বলল, ‘দুঃখিত, এত দেরি হলো, কিন্তু এত দূর থেকে আসতে আমাদের সময় লেগে গেল,’ যা শোনার পর সবাই একইরকমভাবে হাসল, একই রকম রসিকতায়।
তাদের চেহারা এবং বয়সের বৈষম্য থাকা সত্ত্বেও তাদের একটি অদ্ভুত মিল ছিল। এক দম্পতি ছিল খুব তরুণ, আরেকজন মধ্যবয়সী, আর তৃতীয়জন ছিল দাদু-দিদা। এক অর্থে, তারা কোম্পানির নির্বাহী ও তাদের স্ত্রীদের মতোই একজাতীয় লেবেল বহন করত, যদিও সেটি কিছুটা কম ভয়াবহ ছিল: তাদের লেবেল ছিল ‘প্রতিবেশী’। কারণ তারা প্রতিবেশী এবং যদিও তারা কখনও একে অপরের সঙ্গে বেড়ার ওপর দিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে দেখা করা, চলন্ত গাড়ি থেকে হাত নাড়া বা সন্তান, কুকুর, ফুল বা বাগানের বাইরে অন্য কিছু নিয়ে কথা বলেনি, তাদের কথাবার্তায় ছিল সরল ও আন্তরিক একটি তীক্ষèতা, যা সরাসরি হৃদয় ছুঁয়ে যেত।
‘ডায়মন্ড তোমাদের ভীষণ মিস করবে। সে পুরোপুরি ভেঙে পড়বে,’ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সেই দাদু-দিদা, যারা একটি কালো ল্যাব্রাডরের সঙ্গে একা থাকেন। সেই ল্যাব্রাডর যখনই তরুণ সঙ্গ চেয়েছে, লনের ওপর খেলাধুলা করতে চেয়েছে, বা বেআইনি একটি বিস্কুট খেতে চেয়েছে, তখনই রমনদের বাড়ি আসার অভ্যাস গড়ে তুলেছিল।
‘আমার ছেলে ডায়মন্ড ছাড়া কী করবে, আমি জানি না,’ বীণা সদ্য পাওয়া আন্তরিক উষ্ণতায় জবাব দিল। ‘ও নিশ্চয়ই আমাকে নিজের একটা কুকুর নিতে বাধ্য করবে, আমি জানি। কিন্তু বোম্বের ফ্ল্যাটে কুকুর কীভাবে রাখব ?’
‘কবে এই দুষ্টু বাচ্চাগুলোকে বের করে দিচ্ছ ?’ একজন বাবা রমনকে জিজ্ঞেস করলেন, ভেতরে উৎসবমুখর শিশুদের দিকে ইশারা করে। ‘আমার ছেলের কাল পরীক্ষা আছে, জানো, কিন্তু ও বলেছে, তার পরীক্ষার দিকে কোনও ভ্রƒক্ষেপ নেই। তাকে রমনদের বিদায় পার্টিতে যেতেই হবে।’
একজন মা বীণার কাছে একটি গোপন কথা শেয়ার করলেন, যা বীণার হৃদয় চিরতরে জয় করে নিল। “তোমরা চলে যাচ্ছ বলে এবার বলছি, জানো কি, আমার ভিনোদ তোমার তারাকে নিয়ে মুগ্ধ ? গত রাতে যখন আমি ওকে শুইয়ে দিচ্ছিলাম, ও বলল, ‘মা, আমি বড় হলে তারাকে বিয়ে করব। আমি সাদা ঘোড়ায় চড়ে যাব, পাগড়ি পরব আর কোমরে তরবারি নিয়ে তারাকে বিয়ে করতে যাব।’ কী করব আমরা এ নিয়ে, বলো তো ? বয়সের ব্যবধান তো মাত্র দশ বছর, তাই না―না কি বারো ?”
এই বলে দুই নারী একসঙ্গে হাসিতে মেতে উঠলেন।
পার্টি তার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল, যেন একটি উজ্জ্বল উৎসবমুখর জাহাজ, যাত্রার শেষ রাতের জন্য আলোকিত ও কোলাহলপূর্ণ। এখন এর আর কিছুই করার ছিল না, শুধুই ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাওয়া। যেন সবাই একযোগে, একমত হয়ে বিদায় নিতে শুরু করলো (কমিশনার এবং তার স্ত্রী প্রথমে রওনা দিলেন, ঠিক রাজকীয় ভঙ্গিতে), এবং অতিথিরা ধীরে ধীরে ড্রাইভওয়ের দিকে এগিয়ে গেলেন, যেখানে গাড়িগুলো বাম্পার টু বাম্পার দাঁড়িয়ে ছিল, এত গাড়ি যা গত পাঁচ বছরে রমনদের বাড়িতে একসঙ্গে দেখা যায়নি।
পোর্টিকোর আলো বীণার গর্ব এবং আনন্দের উৎস, একটি চীনা কমলা গাছের ওপর পড়ল, যার ছোট ছোট ফলগুলো সোনালি লণ্ঠনের মতো ঝলমল করছিল। চারদিকে বিদায় নেওয়ার গুঞ্জন এবং কোলাহল উঠল (ছোট বাচ্চারা, যারা এরই মধ্যে পায়জামা পরে ফেলেছে, ওপরে অন্ধকার জানালা থেকে বিস্ময়ে হাঁ করে দেখছিল)।
এসো এবং ক্যালটেক্স একসঙ্গে বাড়ি ছাড়ল, একজন আরেকজনের কাঁধে হাত রেখে এবং চুরুট ফুঁকতে ফুঁকতে, যেন কোনও কৌতুক নাটকের চরিত্র। মিস দত্ত বোসের হাত শক্ত করে ধরে রাখলেন, যখন তারা মাথা নুইয়ে, দুলে দুলে, পা হড়কাতে হড়কাতে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন।
বীণাকে জড়িয়ে ধরা হলো, তার গালে চুমু খাওয়া হলো, দুল তার গাল ছুঁয়ে গেল, এবং ট্যালকম পাউডারের গন্ধে তার নাক কুটকুট করল। রমনকে এতবার পিঠ চাপড়ে দেওয়া হলো যে, তিনি যেন একটি বীণার মতো ধ্বনি তুললেন এবং তার শরীর কম্পিত হলো।
মনে হচ্ছিল, অবশেষে বীণা এবং রমন একা থেকে যাবে। বিদায়গুলো জানানো হয়েছে, এখন আর কিছুই করার নেই, তাদের শুধু জিনিসপত্র গুছিয়ে শহর ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া বাকি। কিন্তু না, সেই মুহূর্তে হাসপাতালের ভালো ডাক্তারেরা বেরিয়ে এলেন, যারা সারা সন্ধ্যা সবচেয়ে অন্ধকার কোণে নিজেদের প্রায় অদৃশ্য করে রেখেছিলেন। এখন তারা গৃহকর্তার কাঁধে এবং গৃহকর্ত্রীর হাতে আলতোভাবে হাত রেখে বললেন, ‘আহ, এখন অবশেষে আমরা তোমাদের সঙ্গে থাকতে পারব। এবার তোমাদের পার্টি শুরু হতে পারে।’
এটা প্রকাশ করল যে, যদিও এই প্রথমবার তারা পেশাগত কারণ ছাড়া রমনদের বাড়িতে এসেছেন, তারা শুধুই বন্ধুত্বপূর্ণ নন, তারা যেন আত্মরক্ষামূলক এই পরিবারের এক অংশ। তাদের সহানুভূতির গভীরতা পরিবারটির সবচেয়ে কাছের ছিল। রমন এবং বীণা নিজেদের ভেতরে এক ধরনের উষ্ণ, স্নিগ্ধ কোমলতার বিস্তার অনুভব করলেন। এই কোমলতা, যা আজ পর্যন্ত তারা কেবল নিজেদের পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন, যেন ভয়ে যে এটি অসীম নয়। কিন্তু আজ, এর সীমানা বিস্তৃত হলো, এক ধরনের বিস্ময়ের সঙ্গে।
ডাক্তাররা ঠিক যেমন বলেছিলেন, সত্যিকার অর্থে পার্টি তখনই শুরু হলো। বারান্দা থেকে বেতের চেয়ারগুলো এনে লনে রাখা হলো। সেগুলো এক বৃত্তে সাজানো হলো, ফুলে ভরা ‘কুইন অফ দ্য নাইট’ গাছের পাশে। রাতের হাওয়ার প্রতিটি মৃদু স্পর্শে গাছটি সাদা সুবাসের ঢেউ ছড়িয়ে দিচ্ছিল।
বীণা তখন তার সবচেয়ে জরুরি দুটি কাজ করতে ঘরের ভেতর ছুটে গেল, মশার কামড়ে ভরা হাত-পায়ে সিট্রোনেলা মাখা এবং ননোকে কোলে বসানোর জন্য নিয়ে আসা, যেন ননোও পার্টির অংশ হতে পারে। স্বনামধন্য ডাক্তাররা এবং তাদের স্ত্রীরা ননোর দিকে ঝুঁকে পড়লেন এবং তাকে যে মনোযোগ দিলেন, তাতে বীণা ও রমনের গলা কৃতজ্ঞতায় টনটন করছিল।
রমন জোর দিয়ে বললেন, সবাইকে রেমি মার্টিনের একটি করে গ্লাস নিতে হবে। ‘আজই সব শেষ করতে হবে,’ তিনি বললেন এবং ওয়েটারদের বরফ বা গ্লাস সরাতে দিলেন না। তারা সবাই বারান্দার সিঁড়িতে বসে ধূমপান করছিলেন এবং মাঝে মাঝে হাই তুলছিলেন।
এরপর জানা গেল, ড. ব্যানার্জির স্ত্রী, যিনি ঢাকার শাড়ি এবং স্টিলের ফ্রেমের চশমা পরেছিলেন, শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করেছেন। তার স্বামী এবং তার সহকর্মীদের অনুরোধে, তিনি রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে মধুর এবং বিষণ্ন গানগুলো গাইতে শুরু করলেন। তার কণ্ঠ ভাঙা হৃদয়ের মতো শোনাচ্ছিল, যেন দূরের কোনও জায়গা থেকে আসছে, অন্ধকারের স্যাঁতসেঁতে কোণগুলো থেকে, যেখানে জোনাকিরা উড়ে বেড়াচ্ছিল।
ঘাসে ঢাকা, অন্ধকারে ডুবে থাকা সেই শব্দহীনাদের চোখ, যাদের হৃদয় তার সুরে টানটান হয়ে গিয়েছিল, মদ, স্বস্তি এবং অনুশোচনার মিশ্রণে জলভরা হয়ে উঠল।
সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ



