আর্কাইভপ্রবন্ধ

প্রবন্ধ : বাংলাদেশের উপন্যাস : একটি রেখাচিত্র : স্বপন নাথ

বিশ্বের সকল প্রান্তেই গল্প বলার ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আমরা তো জানি, মানুষ ইশারা, প্রতীক, চিহ্নে যা-ই বলুক, এর মাঝে অনেক গল্প লুকিয়ে থাকে। সকলেই বলেন যে, ইউরোপের অনুসরণে বাংলা উপন্যাসের যাত্রা শুরু। অনুকরণ, অনুসরণ যা-ই হোক, বিশ্বের নানা প্রান্তে কাহিনি-কথনের চর্চা বহমান। জীবনের জটিলতা যত বেড়েছে, গল্প বলার ধরন বদলে গেছে। আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, ভূমিব্যবস্থা, মানুষের চিন্তা ও কল্পনার গড়ন নির্ধারণ করে দিয়েছে। ফলে এখানে মহাকাব্য, গীতিকবিতা, ভাবান্দোলন, লোকসাহিত্য, কবিতা যেভাবে সমাদৃত, ঠিক ততখানি শক্তিশালী হয়নি গদ্যসাহিত্য। এ যেন এক অনিবার্য নিয়তি। বস্তুত অনেক প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও উনিশ শতকীয় চিন্তা ও এর আলোকে মধ্যবিত্তের বিকাশ এবং গদ্যচর্চা মানতে হয়। ফলে বাংলা কথাসাহিত্যের শক্তি, সামর্থ্য ও শিল্পবোধ দুর্বল কি না, ভাবতে হচ্ছে। বিকল্প চিন্তার অভাব বলেই অনুসরণীয় পথ চলমান। আখ্যানচর্চার শুরুতে যে-সকল নাম উচ্চারিত হয়, হ্যানা ক্যাথারিনা ম্যালেন্স, প্যারিচাঁদ মিত্র, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মীর মশাররফ হোসেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এরপর তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সমরেশ বসু। এরপর স্বল্পপ্রজ অথচ ঢেউ তুলেছেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, শহীদুল্লা কায়সার, শওকত ওসমান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। আরও রয়েছেন, তবে সঙ্গত কারণে উল্লেখ করা হলো না। এ দীর্ঘ পথে বাংলাদেশে অনেক উপন্যাস রচিত হয়েছে, কিন্তু পাঠকসমাজে বারবার উচ্চারণের নাম খুব বেশি নেই। কারণ এদিক-ওদিক পেণ্ডুলাম ঘোরানো ছাড়া, বিষয়বস্তু ওই একই। গল্প বলার ভাষা নিয়ে যত বিতর্ক, উপস্থাপনে কী এমন পরিবর্তন এসেছে, যা উদাহরণতুল্য ? আবার সাহিত্য সংশ্লিষ্ট ভাষাবিতর্কের সাংস্কৃতিক সীমানার বন্ধন দৃষ্টিকটু মনে হয়। এর আলোকে আখ্যানে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবন ও বৃত্তান্ত। কারণ আমরা দীর্ঘকাল ভাগ্যান্বেষী, যাযাবরীয়, বণিকীয়, কাঠামোবদ্ধ, ফেরিওয়ালা, দখলদার ইত্যাদি রং-রকমের উপনিবেশের শিকার হয়েছি। মূলত স্ব-শাসনের ভেতর না থাকার ফলে এখানে বিচিত্র সংস্কৃতির দোকান তৈরি হয়েছে।

উল্লেখযোগ্য যে, পর্যায়ক্রমে যাপন করেছি সামন্ত, লগ্নিপুঁজি ও অন্ধত্বের শাসন। ফলে ওই অর্থে সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিসর এখানে নেই। যা আছে, লেখা না বলে আত্ম-আবিষ্কারের লড়াইয়ের অংশ বিবেচনা করা যায়। ফলত উপন্যাসের বিষয়বস্তু আবর্তিত হচ্ছে―সামন্তকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত, দারিদ্র্য, প্রকৃতি, আমিত্ব ও সাংস্কৃতিক মতাদর্শে। যে সংস্কৃতির বয়ানে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র নির্মাণের কোনও ভূমিকা নেই। এ অপ্রয়োজনীয়, নিরর্থক, মূল্যহীন পণ্য নিয়ে আমরা ঘুরছি কেবল। এ বক্তব্যের আলোকে স্পষ্ট প্রশ্ন করা যেতে পারে, যা হয়েছে তাতে ক্লাসিক কিছু হওয়ার সম্ভাবনা ছিল কি না। যে পরিপ্রেক্ষিতে এ-দেশের কথাসাহিত্য―উপন্যাসের আলোচনা করতে হবে। বাংলাদেশে কোনও উপন্যাস বা ফিকশন যে লেখা হয়নি, তা বলা যাবে না; তবে কাহিনি লেখা হয়েছে বেশি। হয়তো সংক্ষুব্ধ হবেন কেউ। কোনও তুলনা করছি না, প্রশ্ন উত্থাপন মাত্র। বিশ্বসাহিত্যের মেজাজ সামনে রেখে বিষয়টি ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। সকলেই জরিপ রেখেছেন ১৯৪৭ থেকে; আমরাও ধরে নিচ্ছি। তারপর ভাষা আন্দোলনের চেতনায় ভাষাভিত্তিক শক্তির উত্থান লক্ষ্য করি; ভাষা নির্মাণেরও। একই সঙ্গে স্মরণীয় উপনিবেশ থেকে ক্ষমতার পালাবদলে গ্রাম-নগরকেন্দ্রিক একটি উন্মূল ও পরজীবী শ্রেণির সৃষ্টি হয়। ক্রম-ভঙ্গুর গ্রাম ভেঙে গড়ে উঠতে থাকে শহর। ঘাট ভেঙে তৈরি হতে থাকে স্টেশন, মল ইত্যাদি। ক্ষুদ্র শিল্প ও বাণিজ্যকেন্দ্রিক পুঁজির প্রসারণে উচ্চবর্গের সঙ্গে নিম্নবর্গের চারিত্র্য বদলে যায়। এ বিবর্তন সকলের চোখে তেমন ধরা পড়েনি। যদিও অনেকেই পুঁজির বিকাশ ও নগরায়ণের প্রকল্প গবেষণা এবং সাহিত্যে ভাঙনের চরিত্রায়ণ করেছেন। আমরা লক্ষ্য করি সর্বত্র সর্বগ্রাসী দালাল, ফটকাবাজ, কমিশনভোগী শ্রেণির উত্থান ঘটেছে। এখন বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি বিকাশের ফাঁকে তারা নেটওয়ার্কভিত্তিক সুবিধায় সমূহ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর প্রভাবে সামাজিক অস্থিরতার প্রতিষ্ঠা ও স্থিতি। আমরা সাধারণ কথায় বলি অবক্ষয় ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্র ও সমাজের জটিল ও পশ্চাৎপদ বিন্যাস। যেক্ষেত্রে উপন্যাসের আখ্যানে এসব উপাদানের সমন্বিত কথাবস্তুর উপস্থিতি এক অনিবার্য বাস্তবতা। সময় পরিবর্তনের সাপেক্ষে সবকিছুর মধ্যে দ্রুত বাঁকবদল হলেও কথাসাহিত্যে ঘটছে ধীর লয়ে।

জীবনের মানচিত্র

যে কোনও সৃজনশীল ব্যক্তি সংবেদনশীল ও কাল সচেতন। ওই ব্যক্তি, লেখকগণই নান্দনিকতার পথে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে চলেন, এটাই স্বাভাবিক। এ-অর্থে একজন ঔপন্যাসিক সমাজকাঠামো ও অন্তর্গত বাস্তবতারই প্রতিনিধি। তবে শুধু সংশ্লিষ্ট সমাজের বিবরণ লেখা ঔপন্যাসিকের দায় নয়। কারণ একটি সমাজকাঠামোতে থাকে অনেক স্বর ও প্রান্ত। এ-বহুবর্ণিল স্বর ও প্রান্তের শিল্পরূপ সৃষ্টিতেই তার স্বতন্ত্র পরিচয় নিহিত। সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন বলেছেন, ‘ঔপন্যাসিকের বিষয়জ্ঞান প্রকৃতপক্ষে তার সমাজজ্ঞান, ইতিহাসজ্ঞান এবং ব্যক্তিমানসের জ্ঞান এই সমস্তের সারাৎসার।’ ফলে সমাজস্থিত মানুষের অস্তিত্ব সংকট, জিজ্ঞাসার উৎস ও প্রতিষেধ নির্মাণই ঔপন্যাসিকের লক্ষ্য।

বস্তুত গ্রামীণ সমাজকাঠামোর ভাঙন ও চলমানতার তরঙ্গ প্রভাবিত করেছে বলেই কথাসাহিত্যে গ্রাম-নগরের নিম্নবর্গীয় মানুষের চরিত্রায়ণ সাফল্য লক্ষণীয়। উল্লেখ্য যে, উপনিবেশ থেকে উপনিবেশে স্থানান্তরের নিবর্তনে লেখকদের মধ্যে প্রতিরোধের স্পর্ধা জন্মে। এ-সংক্ষুব্ধতা অনিবার্য। একই সঙ্গে বহমান কত বিপরীত উপাদান―রুদ্ধতা, চরম দারিদ্র্য, শোষণ, দমন-পীড়ন ইত্যাদি। ফলে সকলের মধ্যেই কমবেশি দ্রোহভাব লক্ষণীয়। অনেকক্ষেত্রে সরাসরি না হলেও তারা বলেছেন রূপক, প্রতীক ও ইঙ্গিতে।

বিশেষত ১৯৪৭-পূর্ব ও উত্তরকালের বাস্তবতা বিবেচনায় রাখতে হবে। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও স্বাধীনতার লড়াই যখন ঘনীভূত হয়েছে তখন লেখক শিল্পী সংগ্রামীরা ঐক্যবদ্ধ এবং রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের সঙ্গে একাত্ম হয়েছেন। সকলের মনে একই আকাক্সক্ষা―ভাষার অধিকার, মুক্তি, স্বায়ত্তশাসন-স্বাধীনতা। শিল্পসাহিত্যে কথাবস্তুর আবর্তনের উৎসসূত্র যেখানে নিহিত। আর্থ-সামাজিক তথ্যের খোঁজ নিলে দেখা যাবে ১৯৭১-এর আগে প্রায় অধিকাংশ মানুষই ছিল দারিদ্র্যসীমার নিচে; ছিল মৌলিক চাহিদার সংকট। এর ওপর শোষণ-শাসনের খড়গ। সঙ্গত কারণে আমাদের দেশের সাহিত্য পাঠ ও শিল্পের অবলোকনে পাওয়া যায় শুধু দারিদ্র্য ও হাহাকারের প্রতিচ্ছবি। বাস্তবতা এমনই নিষ্ঠুর, অভাব, দারিদ্র্য-চক্রের নির্মমতায় জনমানুষ জানতই না―এ জীবনের মানে আসলে কী। এসব বিষয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি জড়িয়ে আছে কূপমণ্ডূকতা ও অন্ধত্বের শৃঙ্খল। এত সমস্যা একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ওপর চিরায়ত বৈশিষ্ট্যে বিদ্যমান। অস্বীকারের তো উপায়ও নেই।

এ-রাষ্ট্র ও সমাজের উত্থান-পতনের পর্যবেক্ষক, কথাসাহিত্যে অবদান রাখা কয়েকজন ঔপন্যাসিক হলেন : মোহাম্মদ নজিবুর রহমান, কাজী আবদুল ওদুদ, হুমায়ুন কবির, আবুল ফজল, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, শহীদুল্লা কায়সার, আবু  ইসহাক, আলাউদ্দীন আল আজাদ, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, সরদার জয়েনউদ্দীন, শওকত ওসমান, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, আবু জাফর শামসুদ্দীন, সত্যেন সেন, অজয় ভট্টাচার্য, আবুল মনসুর আহমদ, আনোয়ার পাশা, জহির রায়হান, শওকত আলী, রিজিয়া রহমান, রাবেয়া খাতুন, দিলারা হাশেম, আবু রুশদ, রশিদ করিম, রাহাত খান, আহমদ ছফা, মাহমুদুল হক, হাসান আজিজুল হক, সেলিনা হোসেন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সৈয়দ শামসুল হক, আবুবকর সিদ্দিক, হরিপদ দত্ত, হুমায়ূন আহমেদ, সুশান্ত মজুমদার, মঞ্জু সরকার, হুমায়ুন আজাদ, সুব্রত বড়ুয়া, বুলবুল চৌধুরী, আনোয়ারা সৈয়দ হক, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, মঈনুল আহসান সাবের, হাসনাত আবদুল হাই, হরিশংকর জলদাস, ইমদাদুল হক মিলন, মঈন আহমেদ, মোহিত কামাল, মামুন হুসাইন, শহীদুল জহির, আকিমুন রহমান, ঝর্না রহমান, তাপস মজুমদার, নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর, ওয়াসি আহমেদ, শাহাদুজ্জামান, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, জাকির তালুকদার, আবুল কাসেম, পারভেজ হোসেন, নাসরীন জাহান, আহমাদ মোস্তফা কামাল, পাপড়ি রহমান, শাহীন আখতার, প্রশান্ত মৃধা, ইমতিয়ার শামীম, মাসরুর আরেফিন, সিরাজুল ইসলাম মুনির, আবদুল মান্নান, সালেম সালাউদ্দিন, মজিদ মাহমুদ, মোজাম্মেল হক নিয়োগী, সাঈদ আজাদ, সাব্বির জাদিদ, মঈন শেখ, স্বকৃত নোমান, মোজাফফর হোসেন, মহি মুহাম্মদ, হামিম কামাল, হামিম কামরুল হক, মাসউদ আহমদ, হারুন পাশা, আশান উজ জামান, মোস্তফা কামাল, মনি হায়দার, জয়দীপ দে, সাদত হোসাইন, সুহান রিজওয়ান, মাহবুব ময়ূখ রিশাদ, ইমরান খান, প্রমুখ। এছাড়া সক্রিয় রয়েছেন আরও অনেকে। এ সীমিত পরিসরে সকল নাম এখানে উল্লেখ করা গেল না।

এ-ভূগোলের জীবন তো কৃষিভিত্তিক; ফলে অধিকাংশ উপন্যাসে বিষয়, ঘটনা উপস্থাপনে বিন্যস্ত হয়েছে কৃষিজীবনের সংস্কৃতি, সামাজিক সংকট, বহুবর্ণিল সীমাবদ্ধতার বৃত্তে পীড়িত জীবন। তারা আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন ক্রম-ক্ষয়িষ্ণু, বিবর্তিত গ্রামীণ পরিবেশ থেকে নগরে তাড়িত, স্থানান্তরিত এবং দেশান্তরিত হওয়া মানুষ। সকলেই জানেন এ ভূমি বারবার বিপর্যস্ত হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী, খাদ্যসংকট, মন্বন্তরে। অনেক উপন্যাসের কথাবস্তু নির্মিত হয়েছে উল্লিখিত এসব বিষয়ের উপকরণে। এ ছাড়াও ঔপনিবেশিক সংক্রমণ শুধু নয়, কতক অপবিশ্বাস, সাংস্কৃতিক বিতর্কে আমাদের মধ্যে আস্তিত্বিক, আত্মঘাতী প্রশ্নের উদ্ভব ঘটে। এসব প্রশ্নের অপনোদনে ঔপন্যাসিকেরা আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি ও বিচলিত হয়েছেন। ভেতরে ভেতরে দ্বন্দ্বে নিপতিত হয়েছেন অনেকে। এসব ঘাত-প্রতিঘাতে রক্তক্ষরণ এবং ইতিহাস, ঐতিহ্যের নান্দনিক বুনন ও উপস্থাপন রয়েছে বাংলা উপন্যাসে। এর মধ্যে লক্ষ্য করি প্রত্ন-লোকায়ত বাংলার নিবিড় পুনর্পাঠ, নির্মাণ, বিনির্মাণ ও রূপায়ণ। চলতিপথে কখনও ধাক্কা দিয়েছে ইউরোপ থেকে আগত, আহৃত সাহিত্য-দর্শনের বিবিধ তথ্য ও তত্ত্ব। এসব তত্ত্বের নিরীক্ষা ও প্রয়োগ চমকিত করেছে; যাতে আপন সীমাবদ্ধতা অতিক্রমণের চেষ্টা রয়েছে। কখনও বাংলা কথাসাহিত্যের আড়ষ্টতা ভুলে যাবার নিশানা সৃষ্টি হয়েছে উপর্যুক্ত নিরীক্ষায়। দ্রুত নগরায়ন, ডেটা নিয়ন্ত্রিত সমাজ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকা বদলে দিয়েছে মানুষের সামগ্রিক জীবনাচরণ; ফলে এসবই এখন চলমান উপন্যাসের বিষয়বস্তু। এসব বিষয়ের প্রয়োগ-সাফল্য সরিয়ে দিয়েছে ঔপন্যাসিকের প্রথাগত চিন্তা। একই সঙ্গে আন্দোলিত করেছে পাঠকসমাজকেও। এ-অভিজ্ঞান লেখক-পাঠক উভয়েরই। স্মরণীয় নেটওয়ার্ককেন্দ্রিক জীবন ও সমাজব্যবস্থা বিকাশমান হলেও আমরা এখনও গ্রামীণ কাঠামো সংশ্লিষ্ট অর্থনীতি, জীবনাচার থেকে বিযুক্ত হতে পারিনি। ফলে উপন্যাস সাহিত্যে বারবার আবর্তিত হয়েছে ওই গ্রামীণ জীবন ও সামাজিক নকশা। এমন কি নাগরিক জীবনে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হওয়া বিবিধ কর্মকাণ্ড কথাসাহিত্যে চিত্রিত করেছেন কথাশিল্পীরা।

বিশেষত দেশভাগ, দাঙ্গা, কৃষক-শ্রমিক বিদ্রোহ, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নির্মাণে কোনও কোনও লেখক অসামান্য দক্ষতার প্রমাণ রেখেছেন। একই সঙ্গে এ-ভূখণ্ডের জাতিগঠন, নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস, বহিরাগত আক্রমণ ও এর পরিণাম, রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক কাঠামো পরিবর্তন এবং সংস্কৃতির ইতিহাস শিল্পিত হয়েছে বিভিন্ন আখ্যানে। লক্ষ্যণীয় যে, এ অঞ্চলে আকাক্সক্ষা থাকলেও কখনওই বৈষম্যহীন সমাজের ভাবনা বাস্তবায়িত হতে দেখি না। কারণ পশ্চাৎপদ সাংস্কৃতিক চিন্তা ও অন্ধত্ব; বহুধাবিভক্ত সামাজিক বিন্যাস সাম্যচিন্তার সুযোগই দেয়নি।

সঙ্গত কারণে মুক্তিযুদ্ধপূর্ব উপন্যাসে এ দেশে গ্রামীণ, সাধারণ ও নিম্নবর্গীয় মানুষের জীবনই চিত্রিত হয়েছে। তখন তো একমাত্র ঢাকা বাদ দিলে সে অর্থে নগর বা শহর গড়ে ওঠেনি। যদিও অনেক গ্রাম্য বাজারকেও শহর বলা হয়েছে। যা হোক কয়েকটি উপন্যাসে আবার গ্রাম ও নগরের যৌগ বিন্যাস লক্ষ করি। বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে কথাশিল্পীদের অনেকেই আন্তর্জাতিক নানা তত্ত্বে সজাগ ও সচেতন ছিলেন। তবে মার্কসবাদ ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শে প্রভাবিত ছিলেন বেশি। এ দেশেও এর প্রভাব রয়েছে। ফলে সামন্তকাঠামোর সমাজ চিত্রিত হলেও শ্রেণিদৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বৈষম্যহীন সমাজ কামনায় সাহিত্যচর্চা করেছেন অনেক লেখক। অন্যদিকে দেশভাগের ফাঁকে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠিত হলে অল্প সময়ের ব্যবধানে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র নির্মাণ ও মুক্তির লক্ষ্যে জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ঘটে। এ জাতীয়তাবাদের পরিণতি হলো ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা। সামূহিক সংস্কৃতিচর্চায় একই দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করি।

এসব উপন্যাসে বিষয়বস্তু, পটভূমি আসলে কী। মহীবুল আজিজের মূল্যায়ন হলো, ‘…পূর্ববঙ্গের উপন্যাসকে তিনটি প্রধান শ্রেণীতে ভাগ করা যায়―গ্রামীণ জীবন-নির্ভর, নগর-জীবন-নির্ভর এবং গ্রাম-নগরের যৌথ জীবন-নির্ভর। … বাংলাদেশের সাহিত্যের সূচনালগ্নে এত অধিক সংখ্যক গ্রাম-প্রধান সমাজকাঠামো… যেসব উপন্যাস শিল্পসাফল্যে ভাস্বর, সেগুলোর প্রধান উপজীব্য বিষয় গ্রাম এবং গ্রামের নিম্নবর্গ মানুষ।’ যেমন, শওকত ওসমানের জননী, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র লালসালু, চাঁদের অমাবস্যা, কাঁদো নদী কাঁদো। শহীদুল্লাহ কায়সারের সংশপ্তক, সারেং বৌ, শামসুদ্দীন আবুল কালামের কাশবনের কন্যা, কাঞ্চনমালা; আবু ইসহাকের সূর্যদীঘল বাড়ি, কাজী আফসারউদ্দীন আহমদের চর-ভাঙা-চর, আবদুল গাফফার চৌধুরীর চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান ইত্যাদি।

উপনিবেশ থেকে উপনিবেশে স্থানান্তরের কারণে এখানে স্ব-নিয়ন্ত্রিত পুঁজির বিকাশ ঘটেনি। মূলত সেকালের বাণিজ্যপুঁজি ও ব্রিটিশ উপনিবেশাশ্রিত সামান্তবাদী বাস্তবতায় পূর্ববাংলায় পুঁজি বা কোনও উদ্যোগ প্রতিষ্ঠা পায়নি। উপনিবেশজাত অবক্ষয়িত বাস্তবতার কারণে লক্ষ করি অন্তমুর্খিতা, আত্মপ্রচার, আত্মসর্বস্বতার বিবরণ। এর মধ্যে সমাজে প্রতিপত্তি ও স্থিতি লাভ করে অজ্ঞতার সংস্কৃতি। উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন ও দেশভাগে সাম্প্রদায়িকতা আরও গভীর হয়ে সমাজের অলিগলিতে অধিষ্ঠান ও ক্ষত সৃষ্টি করে। তবে ভাষা আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উত্থানে সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনীতি বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

একদিকে রাষ্ট্র ও সামাজিক নিবর্তন, ঔপনিবেশিক শাসনক্ষমতার দাপট, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকটে মানুষের জীবনে শোষণ ও নির্যাতন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। ফলে এখানে সাম্প্রদায়িক শক্তির নতুনভাবে উত্থান ও অগণতান্ত্রিক শাসনকাঠামো প্রায়-স্থায়িত্ব লাভ করে। এ বাস্তবতায় ঘটে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। একই সঙ্গে যুক্ত হয় খাদ্যাভাব, দুর্ভিক্ষ। অনিবার্যভাবে এতসব নেতির বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের অস্তিত্ব অস্থিরতায় আক্রান্ত হয়। আমাদের নিয়তি হলো এসব নেতিবাচক বিষয়ের বিবরণ লিখতে হয় দিনের পর দিন। দেশভাগোত্তর কালে অধিকাংশ উপন্যাসে এসেছে এদেশের প্রকৃতি, ব্যক্তি-প্রেম, সামাজিক বর্ণ ও শ্রেণিগত দ্বন্দ্ব,  কৃষকসমাজের জীবন, গ্রামীণ শোষণ, সামন্ত শাসন, ধর্মকেন্দ্রিক কথা উপকথা। আমাদের বিবেচনায় রাখতে হয়―স্বাধীনতা উত্তরকালেও নাগরিক মধ্যবিত্ত শ্রেণিচ্যুতির আকাক্সক্ষা। ‘মরি অরি পারি যে কৌশলে’ এমন তাড়াহুড়ো বিকৃতির জন্ম দেয়। মূলত আবাসনে নগরের অধিবাসী হলেও তারা নাগরিক-মধ্যবিত্ত হতে পারেনি। পরিণামে যে সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের চর্চা উঁকি দিয়েছিল, তা অতি দ্রুত লয়ে আবার নিক্ষিপ্ত হলো অন্ধত্বের গিলোটিনে। আবার সামর্থ্যহীন এ-মধ্যবিত্ত নাগরিক হতে গিয়ে কখনও আত্মবিসর্জনও দিয়েছে। ফলে এ-উল্লম্ফন শ্রেণির প্রতিক্রিয়া লক্ষ করি। এমন পরিস্থিতিতে উদ্ভূত সমস্যাবলি কথাকারগণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পুঁজি, বাণিজ্যপুঁজি, এনজিও-পুঁজির দাপট গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ফলে গ্রামীণ সমাজের ভাঙন ঠেকানো যায়নি। এ অর্থনীতির প্রবাহ থেকে উৎসারিত মানুষের দ্বন্দ্ব, সংঘাত, নৈঃসঙ্গ, বিচ্ছিন্নতা, মানবজীবনের নানা জটিলতা, রাষ্ট্র ও সমাজের জটিল গ্রন্থি উন্মোচন, সামাজিক চরিত্র রূপায়িত উপন্যাস সমকাল ও উত্তরকালের পাঠকের মনোযোগ আকৃষ্ট করেছে। উল্লিখিত কথাসাহিত্যিকগণের সাহিত্য যে সর্বজনীনভাবে স্থান করে নিয়েছে, এমন নয়। এক্ষেত্রে পাঠোত্তীর্ণ, কালোত্তীর্ণ বা মানসম্মত এমন শব্দ বা শব্দগুচ্ছ ব্যবহার অতিশয়োক্তিও বটে। এসব আরোপিত সমালোচনাধর্মী, জনপ্রিয় কথামালার বাইরে আমাদের মনোযোগ রাখতে হয়।

প্রসঙ্গত লালসালু উপন্যাসের শিল্পরূপ আলোচনায় সৈয়দ আকরম হোসেনের মন্তব্য বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের সারার্থ উপলব্ধিতে সহায়ক হয়ে ওঠে। তিনি বলেছেন, ‘শ্রেণীবিভক্ত ও শোষণমূলক সমাজে আর্থ-উৎপাদনকাঠামোর নেতিবাচক রূপ মানুষকে করে দেয় উন্মূলিত, নিরস্তিত্ব। এই নির্মম বাস্তবতা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে মানুষ যখন খাদ্য আহরণের মাধ্যমে জীবনরক্ষার কিংবা অস্তিত্ববান হওয়ার চেষ্টা করে, তখন তাকে শোষণের প্রক্রিয়াকেই অবলম্বন করতে হয়। শোষণের এই প্রক্রিয়া দ্বিবিধ রূপে প্রকাশ পায় : এক. অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে; দুই. কুসংস্কার-বিশ্বাস ও ধর্মভীতির সাহায্যে। অস্তিত্বের প্রশ্নে নিশ্চল জনজীবনে এই শোষণ চলতে থাকে অব্যাহত গতিতে। শোষণ-প্রক্রিয়া ও অপশক্তিকে নির্মূল করতে হলে প্রয়োজন নির্ভীক সত্তায় উচ্চকিত হয়ে ওঠা। এই নির্ভীকতাই মানবীয় উজ্জীবনের বীজমন্ত্র।’ 

এর ফলে করতে হলো নিজের কাছে প্রত্যাবর্তন। সংস্কৃতির কাছে ফেরা এবং আত্মজাগরণের লক্ষে সাহিত্যের সে জাগরণের প্রতিফলন অথবা জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্দীপ্ত হওয়ার অনুপ্রেরণা রয়েছে উপন্যাসে। বলা বাহুল্য যে, শুধু কথাবস্তুতে নয়, শিল্পরূপেও আবর্তন লক্ষ করি। যে কারণে সাহিত্যের ইতিহাস আলোচনায় অসংখ্য উপন্যাসের উল্লেখ করা গেলেও পাঠযোগ্য শর্তে নির্ধারিত হয়ে যায় মাত্র কয়েকটি। অর্থাৎ আলাদাভাবে পর্যাপ্ত উপন্যাসের নাম উল্লেখ করা যায় না। তবে সকল সীমাবদ্ধতার মধ্যেও জনজীবনের শিল্পিত প্রতিবেদন রয়েছে বাংলা উপন্যাসে। শামসুদ্দীন আবুল কালামের উপন্যাস আলমনগরের উপকথা উপন্যাস থেকে অল্পাংশ পর্যবেক্ষণ করা যায়। 

‘এই দেশ ‘ধনে-ধান্যে-পুষ্পে ভরা’ বলিয়া কীর্তিত হইয়া আসিয়াছে; ইহার ক্ষীরের মত মাটি, তরঙ্গ-চঞ্চল নদী ও বিল, গাঁ-এর সীমানায় সীমানায় বহমান শান্ত খাল-নালা এবং আকাশের উদার নীলিমার পরিবেশ ইহার অধিবাসীদের জীবন যোগাইয়াছে। তাহারও বন্যা, অজন্মা, দুর্ভিক্ষ, জঙ্গলের জন্তু-জানোয়ার ও বহিরাগত লোভী দস্যুর সহিত অপরাজেয় সংগ্রাম করিয়া সারা দেশের আহার জোগাইয়াছে; অন্ন-সন্ধানী দূরাগত অতিথিও আত্মীয়ের মর্যাদা লইয়া তাহাদের মাঝে বসতি করিয়াছে।’

শহীদুল্লা কায়সার সংশপ্তক উপন্যাসে লিখেছেন প্রান্তীয় জীবনের বাস্তবতা। এপিকের বৈশিষ্ট্য আছে বলেই লেখক ও উপন্যাসের সবগুলো সূচক স্বতশ্চল এগিয়ে যায় সামনের দিকে। চরম শোষণ, অন্ধকার, সমাজদ্বন্দ্ব, দীর্ঘ নিবর্তনের অবসানে মানুষের স্বপ্নের কথা বলেছেন। যেক্ষেত্রে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে। উপন্যাসের আখ্যানে অন্তর্বাস্তবতা ও বহির্বাস্তবতার সমন্বিত প্রতিবেদন পাঠককে আকৃষ্ট করে। তা ছাড়াও এ-উপন্যাসে লেখক চিত্রিত করেছেন অলঙ্ঘ্যনীয় এক বাস্তবতা; যা প্রজন্মান্তরে বহমান; অথচ নিপীড়িতজনই পালন করে নীরবতা। তবে বলতে দ্বিধা নেই, বিশ্বসাহিত্যের মর্যাদায় অভিষিক্ত উপন্যাস―সংশপ্তক।

‘ওই যে দেখছ দখিনের ক্ষেত ? অজস্র গুলগুলির খোপের মতো,  হাজার আলের কাটাকাটি, ওসব থাকবে না। গোটা দখিন ক্ষেতে থাকবে বড়জোর চারপাঁচটা সীমানা। চাষ চলবে কলের লাঙ্গলে। ফসল উঠবে যারা চাষ করবে তাদেরই ঘরে। জমিদার-তালুকদার-মহাজনের বখরাদারি চলবে না। ডায়নামো বসবে। বিজলীবাতি জ¦লবে গাঁয়ের ঘরে ঘরে। ক্লাব থাকবে, রেডিও থাকবে গাঁয়ে গাঁয়ে। স্কুল থাকবে প্রতি গ্রামে, কৃষকের মেয়েরা লেখাপড়া শিখবে বিনা মাইনেয়। বলতে বলতে অনাগত সেই স্বপ্নটা যেন ছায়া ফেলে যায় জাহেদার চোখের কোলে। তা কি সম্ভব ? জাহেদের কল্পিত ছবিটি এত সুন্দর আর আকর্ষণীয় বলেই যেন বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় না সেকান্দরের।’  

বাংলা উপন্যাস সম্পর্কে যা কিছু বলা হোক না কেন, কয়েকটি উপন্যাসকে সরিয়ে রেখে আলাপ সম্পাদন করা যাবে না। ঐতিহাসিক তাৎপর্য, কৃষক আন্দোলন, লোকায়ত বাংলা, ব্যক্তি ও সামষ্টিক স্তরে রহস্যগল্প, ম্যাজিকের মতো কেচ্ছা, শ্রেণিভিত্তিক দ্বন্দ্ব ইত্যাদি সব মিলিয়ে নির্মাণ করেছেন খোয়াবনামা। বস্তুত কুহকভাষ্যে নির্মিত এ উপন্যাস।

‘… জমি তৈরি হলে সেখান থেকে চারা এনে ধান রোপার ধুম পড়ে যাবে। আহা, কাল সারা রাত বৃষ্টি হলো, জমি হয়ে আছে মাখনের মতো, লাঙল ছোঁয়াতে না ছোঁয়াতে ঢুকে যাচ্ছে দুনিয়ার অনেক ভেতরে, তমিজ সেখান থেকে পানি পর্যন্ত টেনে আনতে পারে। শান্তাহারের গাড়ির ধোঁয়ায় আসমানে এখন আবার লেখা হয় ধনিজমির ছবি। কী জমি গো।… জোতদাররা এসেছে পুলিস নিয়ে। রেলগাড়ি ভরা পুলিস স্টেশনে স্টেশনে, নেমে ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। তারা সব কলেরার মতো নামে, গুটিবসন্তের মতো নামে। চাষারা তাদের তাড়া করছে কাস্তে নিয়ে, শালারা উর্ধ্বশ্বাসে পালাবার আর পথ পাচ্ছে না।’

হরিশংকর জলদাস ভিন্ন ধারার একজন লেখক। বাংলাসাহিত্যে সমুদ্রকেন্দ্রিক উপন্যাস না থাকার অভাব পূরণ করেছেন হরিশংকর। নোনাজলের জীবন তাঁর প্রথম পর্বের উপন্যাসের উপজীব্য। যদিও তিনি প্রাচ্যপুরাণের দিকে মনোযোগী হয়েছেন। তাঁর প্রতিবেদনে পাওয়া যায় একেবারে মাটিবৃত্ত সম্প্রদায়ের যাপিত জীবনের নিরঙ্কুশ রূপরেখা। আমরা স্মরণ করি জেলেজীবনের কথা অন্যান্য উপন্যাসেও এসেছে। যেমন, ধীবর ও নদীকেন্দ্রিক জীবনের কথা বলেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, অদ্বৈত মল্লবর্মণ, সমরেশ বসু, সাধন চট্টোপাধ্যায় ও ঘনশ্যাম চৌধুরী। তারপর জলকেন্দ্রিক প্রান্তিক মানুষের কথা অকৃত্রিমভাবে তুলে ধরেছেন হরিশংকর। জলপুত্র তাঁর প্রথম উপন্যাস। 

‘ঝড়ো হাওয়ার বিপুল বিক্রমে সকালটা এলোমেলো। বাইরে বাউণ্ডুলে সন্ত্রাসী বৃষ্টি ঝরে যাচ্ছে। ভুবনের বারান্দার নড়বড়ে দরজাটা সামান্য খোলা। সেই খোলা অংশ দিয়ে ভুবন বাইরে তাকিয়ে আছে। তার চোখে গভীর উৎকণ্ঠা। সকাল হয়ে গেছে, গঙ্গা ফিরেনি। টাউঙ্গাজাল বাইতে গেলে সাধারণত ভোরের আজানের আশপাশ গঙ্গা বাড়ি ফিরে। আজ এত বেলা হয়ে গেছে, গঙ্গা ফিরেনি। অজানা আশঙ্কায় মায়ের বুক দুরুদুরু করে ওঠে। বউটি কখন তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ভুবন টের পায়নি। কানের পাশে দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনে ভুবন বউয়ের দিকে ফিরল। দেখল―সুমিত্রার মুখ মলিন। সন্তানধারণের কারণে এমনিতেই তার চেহারা পাণ্ডুর হয়ে গেছে। তার ওপর দুশ্চিন্তার ছাপে সেই পাণ্ডুরতার রং গভীরতর হয়েছে। এক সময়ে অনেকটা স্বগতকণ্ঠে ভুবন বলল, ‘বিয়ান অইসে বউ তখন অই গেইয়ে। আইজো গঙ্গা নো ফিরিল। বউ, আঁরে জুঁইরগান দওতো, আঁই কদ্দুর পথ উজাই চাই আই’।’

প্রাকৃতিক দুর্যোগেও সব হারানো মানুষের যুদ্ধ করতে হয় বহুবর্ণিল বিপক্ষের সঙ্গে। একদিকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, তার ওপর হঠাৎ ঝড় বন্যা হলে ভাসিয়ে নিয়ে যায় ভিটেমাটি। খাদ্যাভাব, দারিদ্র্য জড়িয়ে রাখে সাধারণ মানুষের জীবন; যা উপকূলের নিয়তি। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রযন্ত্রের চিরন্তন উদাসীনতা; রাষ্ট্র স্বীকারই করে না মানুষের মৌলিক অধিকার। এই বঞ্চিত, নিরাশ্রয়ী সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রবিচ্ছিন্নতা, হতাশা ও লড়াই চিত্রিত করেছেন আবুবকর সিদ্দিক জলরাক্ষস উপন্যাসে।

‘হাজার হাজার বিপুল সর্বনাশের পাশে এ সব ছোটোখাটো শোকের বাড়াবাড়ি দেখে গোনজোরালির চিঁড়ে ব্যাঙ খাওয়া চমৎকার মেজাজ একটু একটু করে টকে যায়। এতগুলো ভুক্তভোগী একসঙ্গে ভুগে ভুগে একটা সমাজ গড়ে তুলেছে। তাই তাকেও সামাজিক ডোবাডুবিতে ভাগ নিতে হয়েছিল। … দেশে যিনি খোদ মোড়ল তাকে চোখেই দেখেনি। দেখার ভরসা আছে বলেও বিশ্বাস নেই। এমনকি সাগরেদরাও হাতের বাইরে। পানিমন্ত্রী আকাশে ওড়ে, পানিতে নামে না। মাটিমন্ত্রী আছে কি না জানা নেই। থাকলেই বা মাটির কী এসে যায়। তার মতো সর্বহারার একমাত্র ব্যক্তিগত সম্পত্তি এদেশের অপরিকল্পিত সৃষ্টির সূত্রে জন্মানো অজস্র পরনির্ভরশীল মেয়েজাতের যে কোনো একটির গোটা শরীর।’

মিথ, ঐতিহ্যের ভাঙাগড়া

সংস্কৃতিসমৃদ্ধ জাতিগোষ্ঠীর বর্তমান ও আগামীর নির্মাণ-বিনির্মাণে প্রত্ন-ইতিহাস, ঐতিহ্য নতুন সংজ্ঞার্থে ফিরে আসে। লক্ষ্যণীয় মিথ, ঐতিহ্য না থাকলে সাহিত্য সমৃদ্ধ হয় না; কথাশিল্প তো বটেই। গ্রহণ-অযোগ্য শক্তির দাপট, চাপে যখন চলমান বাস্তবতাকে নির্দেশ করা যায়নি, তখনই মিথ-পুরাণের উপকরণ হয়েছে একান্ত আশ্রয়। মঙ্গলকাব্য, বাউল-ফকিরি গান, কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নজরুল ইসলামের সাহিত্য এ সাক্ষ্য বহন করে। স্মরণীয় ঔপন্যাসিক মার্কেস খ্যাত হলেন মিথ ও লোককথার বিনির্মাণে। অর্থাৎ জেগে ওঠা, সংকটে আত্ম-উদ্ধার, জাগরণে মিথ-পুরাণই শক্তির আধার। এ বিষয়ে সৈয়দ আকরম হোসেন বলেছেন, ‘লক্ষ্য করবার বিষয় পাক-আমলের পশ্চিম এশীয় পুরাণকথা এখন পরিত্যক্ত। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতীকী উৎসের গুরুত্ব পেয়েছে বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকপুরাণ। এ-সব রচনার শতমূল সঞ্চারিত হয়েছে চর্যাপদের জীবনে, মনসা-মঙ্গলের ঐতিহ্য-ভূমিতে, বাংলার প্রদোষলগ্ন থেকে ধাবমান কালে, উত্তরবাংলার আদি জনপদ ও সাঁওতাল বিদ্রোহে। ছিনিয়ে নেয়া এবং অবরুদ্ধ জাতিসত্তার গোপন টেনসন বা সংঘর্ষে উদ্ভূত হয়েছে ঔপন্যাসিকদের বিষয়-প্রকরণ।’

বস্তুত আলোচিত এ নিবন্ধে উল্লিখিত ও আলোচিত উপন্যাসমূহে ইতিহাসের উপকরণই বেশি। মিথ-পুরাণ প্রসঙ্গ কম। এটাকি মিথ-পুরাণের প্রতি অনাগ্রহ নাকি প্রসঙ্গবদ্ধ না হওয়ায় আখ্যানে আসেনি, যা হোক না-থাকাই স্বাভাবিক। অনেক ক্ষেত্রে মিথ ও ঐতিহ্যের উপদানসমূহ প্রতীকীভাষ্যে উপস্থাপন করা হয়। তা নির্ভর করে লেখকের ওপর। জাদুবাস্তবতার উপকরণ হিসেবে মিথ-পুরাণকে ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন জাদুবাস্তবতা এখন কথাসাহিত্যে অনতিক্রম্য পরিভাষা ও প্রত্যয়। কখনও ব্যক্তি, সমাজ ও রাজনীতির জটিল গ্রন্থি উন্মোচনে ইতিহাস, মিথ-ঐতিহ্যের উপাদানকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। উল্লেখযোগ্য যে, বিষয়বস্তু নির্বাচনে স্বাতন্ত্র্য পছন্দ। সাধারণত আমরা পেয়ে থাকি নিয়তির ঝাপটায় পর্যুদস্ত, বাস্তবতার শিকার এমন চরিত্র। অন্যদিকে ইতিহাসের উপকরণ প্রয়োগ বা সহযোগে কালিক বাস্তবতাকে উপস্থাপন করেন অনেকেই। চলমান সময়ের প্রেক্ষাপটে স্থাপন করা হয় ঐতিহ্যিক বিষয় বা চরিত্র। যেক্ষেত্রে আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন, অনাহুত বিতর্ক বারবারই সংকটে ফেলেছে। এসব তর্কের অপনোদনে কথাশিল্পীরা হয়েছেন পুরাণ-ঐতিহ্য আশ্রয়ী। ওই অপ্রত্যাশিত প্রশ্নের অবসান না হওয়ায় কথাবস্তুর আবর্তন লক্ষ করছি। তবে এ আবর্তনের বিষয় এখন সীমিত হয়েছে। বস্তুত বহমান ভূগোলের আকরণে লেখক বিকল্প ভূগোল বা ‘ইমাজিনড কমিউনিটি’ তৈরি করেন। এ বিষয়ে কতদূর এগিয়েছি, তা হলো ভবিতব্যের জিজ্ঞাসা। তবে মিথ-ঐতিহ্যের পরম্পরা অস্বীকারে প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়াও বেশ জোরালো। ফলে এসব তর্ক উত্থাপিত হয় মাঝে মাঝে। আমরা জানি ইতিহাসের বর্ণনা উপন্যাস নয়; তর্ক উসকে দেওয়াও নয়, বরং কৌতূহলজাত জিজ্ঞাসার সুযোগ সৃষ্টি করা সাহিত্যের কাজ।

ইতিহাস, মিথ, ঐতিহ্য উপস্থাপন ও রূপায়ণে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উপন্যাস হলো : আবু জাফর শামসুদ্দীনের পদ্মা মেঘনা যমুনা, ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান; আবুল কালাম শামসুদ্দীনের সংকর সংকীর্তন; সরদার জয়েনউদদীনের বিধ্বস্ত রোদের ঢেউ; অজয় ভট্টাচার্যের অরণ্যানী, বৃত্ত; সত্যেন সেনের কুমারজীব, অভিশপ্ত নগরী, পাপের সন্তান, বিদ্রোহী কৈবর্ত; রিজিয়া রহমানের বং থেকে বাংলা, একাল চিরকাল; শওকত ওসমানের ক্রীতদাসের হাসি, রাজা উপাখ্যান; শওকত আলীর প্রদোষে প্রাকৃতজন; সেলিনা হোসেনের নীল ময়ূরের যৌবন, চাঁদবেনে, কাঁটাতারে প্রজাপতি; হরিপদ দত্তের চিম্বুক পাহাড়ের জাতক; হুমায়ূন আহমেদের বাদশাহ নামদার, হরিশংকর জলদাসের দুর্যোধন, কর্ণ, একলব্য, উপেক্ষিত সীতা, ঘটোৎকচ; আবুল কাসেমের মৌর্য, অনার্যজন; জাকির তালুকদারের পিতৃগণ, মুসলমানমঙ্গল; পারভেজ হোসেনের সুবর্ণপুরাণ; শাহীন আখতারের সখী রঙ্গমালা, ময়ূর সিংহাসন;  মঈন আহমেদের বাদ্যি, মোহিত কামালের লুইপার কালসাপ; ইমতিয়ার শামীমের শঙ্খগহন সলপকাল ইত্যাদি।   

আমাদের আলোচিত উপন্যাসসমূহের কথা ও ভাববস্তু নির্মিত এবং চিত্রিত হয়েছে নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস, প্রোটো-বাঙালি, নৃ-গোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতি, লোকায়ত বাংলা, প্রত্ন-পেশা, বৃত্তি, কৌম-জনসমাজ, প্রাচীন ইতিহাস, সংস্কৃতির বৈচিত্র্য, শক্তি-শাসন-ক্ষমতার চরিত্র, সমাজদ্বন্দ্ব, প্রাত্যহিক জীবনাচার, পার্বণ ইত্যাদি। কথাশিল্পীরা ইতিহাস, মিথ-ঐতিহ্য-পুরাণের বিস্তার করেছেন কখনও বর্তমানের প্রেক্ষাপটে, অতীত ও বর্তমানের সেতুবন্ধে, অপ্রকাশ্য বয়ানের প্রতিস্থাপনে, ইঙ্গিতমূলক বক্তব্যে, রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির প্রতিবেদনে এবং রূপক-প্রতীকী উপস্থাপনে। এসব থেকে সহজেই বলা যায়, তারা সচেতন ও সংবেদনশীল আত্মপরিচয় এবং ইতিহাস রূপায়ণে। কয়েকটি উদাহরণ দ্রষ্টব্য :

১. ‘রাজসভায় উমাপতি ধোয়ী এবং জয়দেবের কাব্যগীতির সুললিত মূর্ছনায় সভাস্থল বিমুগ্ধ। জয়দেবের কৃষ্ণলীলার বর্ণনা শ্রবণে সভাসদবর্গ তুরীয়ানন্দে বিহ্বল, ধোয়ীর পবনদূতের বর্ণনায় কামকলানিপুণা রমণীকূলের উল্লেখে শ্রোতৃবর্গ অহো অহো উল্লসিত স্বর উচ্চারণ করে উঠেছেন।… তথাপি প্রজাকূল সুখী। ব্রাহ্মণ সুখী, কায়স্থ সুখী, বৈশ্য সুখী। কেবল ব্রাত্য শূদ্রদের গৃহে অন্ন নেই, দেহে বস্ত্র নেই।’ [প্রদোষে প্রাকৃতজন]

২. ‘সন্ন্যাসীর থানের নিচে বসতেই, গাঁজায় দম না দিয়েও সে শুনতে পায় একই গান :

সন্ন্যাসী শোণিতে রাঙা মানাসের জল।

বিবাহের চেলি পরি করে ঝলমল―

                                     …

গান শুনতে শুনতে এবং তার সঙ্গে নিজের বেসুরো গলা মেলাতে মেলাতে ভবানী পাঠকের মহাপ্রয়াণ ও সংসারে তার বৈরাগ্য বৈকুণ্ঠের চোখে জলের জোয়ারে নামলে তার নুনের ধকে চোখমুখজিভ খরখর করে। … সেই জগজ্জননী মা কেবল নামের জোরে ভবানী পাঠকের স্থান দখল করার লোভে চড়ে বসেছে নায়েববাবুর ঘাড়ে। বেজাতের মানুষের পাপের দণ্ড দিতে নায়েব সন্ন্যাসীকে উৎখাত করে সেখানে বসাবে দুর্গা মা ঠাকুরণকে ? তা হলে পোড়াদহের পূজার স্থানে বেজাতের মানুষের আসাটা বন্ধ হয়ে যাবে, … বাঙালি নদীর কোলে বউডোবা দ’য়ে মানাসের চোখের জলটুকু পর্যন্ত ঠাকুরের বেদখল হয়ে যাবে,…’  [খোয়াবনামা]

৩. ‘… ভিল-শবর-রাজবংশীরা বুঝতে পারছে। বুঝতে পারছে হিন্দুধর্মীরাও, যারা মনে করে শত শত বছর আগে তাদের পূর্বপুরুষ আর্যাবর্ত থেকে এসেছিলেন বটে; কিন্তু এখন আর্যাবর্ত তাদের অনেক অনেক অতীত জীবনের স্মৃতি। তারা মনে করে গৌড়-বরেন্দ্রী-পুণ্ড্রবর্ধনই তাদের পিতৃভূমি ও মাতৃভূমি। তারা সবাই অনায়াসে বুঝতে পারে এই নতুন সমন্বয়ের ভাষা। কিন্তু কেউ জানে না এই ভাষার নাম কী ?’ [ পিতৃগণ]

৪. ‘দিনের বেলায় ইন্দ্রিয় সজাগ থাকা অবস্থায় বস্তুজগতের নানা রকম বাধা-বিপত্তি, পরিণতি দেখে দেহকাম-বাসনা সংকুচিত থাকে, আড়ালে লুকিয়ে থাকে। এমনকি দিনের বেলায় কাকের শব্দেও ভয় পাওয়া বধূ রাতের বেলায় ইন্দ্রিয়রাজ্য তরঙ্গহীন আর সুষুপ্ত হলে নিজের শুদ্ধ-পরিশুদ্ধ দেহের ভাঁজ থেকে জেগে ওঠা কামতৃষ্ণায় দিশেহারা হয়, বিক্ষিপ্ত হয়। তখন মহাসুখ সংগমের নেশায় অভিসারী হতেও সে দ্বিধা করে না। ভয় পায় না। কী নেশা বড় ? দেহের টান ? আত্মার মগ্নতা ঠেলেই বেরিয়ে আসে সে-টান, বেপরোয়া চাপ।’ [লুইপার কালসাপ]  

মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন

১৯৭১সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের গৌরবজনক পর্ব; স্বাধীনতা তুলনারহিত অর্জন। বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অলঙ্ঘনীয় বাস্তবতা, রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক পর্বান্তরে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। এটা সাবজেকটিভ বিষয় নয়;  কোনও জাতির জীবনে এমন অবজেকটিভ লড়াই খুব কমই লক্ষ করা যায়। লেখনী, বক্তৃতা, বিবৃতিতে প্রায়ই শোনা যায়―এখন পর্যন্ত ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনন্য কথাসাহিত্য রচিত হয়নি― এটা পুরোপুরি সত্য নয়; তবে সীমাবদ্ধতা স্বীকার্য। চমৎকার সাহিত্য রচিত হয়নি, এমন বলা যাবে না। জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অভিলক্ষ্য ও চেতনাবিস্তারের পরিসীমা কম নয়। বিবিধ উত্থান-পতন মেনে নিয়ে হাজার বছর ধরে দীর্ঘ সংগ্রামের ঐতিহ্য বহন করছে বাঙালি। ইতিহাসের ভাঙাগড়া তো আছেই। আমরা যদি এক্ষেত্রে গবেষণাহীন পর্যবেক্ষণ লক্ষ করি। প্রথমত, যা কিছু বাঙালির মহৎ অর্জন, সকল ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রশ্নে বিদ্ধ করেছি আমরাই; বাইরের কেউ নয়। দ্বিতীয়ত, আত্মসত্তা বিসর্জনে তৎপরতা; ইতিহাস-ঐতিহ্য ধ্বংস-প্রবণতা; বিনির্মাণ প্রশ্নে যথেষ্ট সংশয়ী। তৃতীয়ত, নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া যথেষ্ট দুর্বল; ফলে উপস্থাপন-সামর্থ্য ক্রম-অপস্রিয়মাণ। চতুর্থত, যা-কিছু করছি, তাতে অপরিমেয় সন্তুষ্টি। মূলত পণ্যায়নের কবলে পড়ে পাঠকপ্রিয়তার লক্ষ্যে শুধু আত্মপ্রবঞ্চনা; ‘স্বাধীনতায় কী হলো’ এমন হতাশা, নেতিবাচক প্রচার, সুড়সুড়িসুলভ নির্যাতনের বিবরণ, সস্তা কার্নিভাল মনোভাবে আঁকা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের খণ্ডাংশ। পরিণামে এখানে সৃজনশীলতার চেয়ে উদ্দেশ্যমূলক রচনাই আমরা লক্ষ করি।

প্রসঙ্গত ১৯৭১-এর আগের রচনাগুলোতে প্রকাশিত মুক্তির স্পৃহা ও তাগিদ পরবর্তী পরিণতি লাভ করে আশাভঙ্গের টুলস-এ। আমরা ভুলে যেতে থাকি―মুক্তির লক্ষ্যে দীর্ঘকালের লড়াই সংগ্রামের বাস্তবতার চূড়ান্ত পরিণাম হলো মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধোত্তর কালের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, অর্জনের অস্বীকৃতি, সন্দেহ, সংশয়, বিচ্যুত হওয়ার ফলে জাতীয় জীবনে স্বপ্নভঙ্গের ফল লক্ষ করি সাহিত্য সংস্কৃতির আঙিনায়। বাঙালির এ দীর্ঘ পরিক্রমণ যে কোনও জীবনে অভিঘাত তৈরি করতে সক্ষম। ফলে সাহিত্যে এর প্রতিফলন অনিবার্য। সাহিত্যে আরও বেশি ঘনীভূত হয়েছে যখন প্রশ্ন জেগেছে আইডেনটিটির। যা বিতর্ক না বলে অপতর্কই বলা যেতে পারে। মূলত রাষ্ট্রক্ষমতার চরিত্র, দৃষ্টিভঙ্গি, সমাজ সংস্কৃতির চালচিত্র নির্দেশ করে। ইতিহাসও অনেকাংশে ক্ষমতাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলক হয়ে উঠেছে।

নিকট-অতীত থেকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে অবান্তর-প্রশ্ন, অপব্যাখ্যাও উত্থাপিত হচ্ছে। ফলে লেখকদের সংবেদনায় রক্তক্ষরণের উত্তাপ আমরা লক্ষ করি। কালান্তরে সচেতন ও অবচেতনে প্রবহমান ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নবতর শিল্পিত প্রতিক্রিয়া রয়েছে। একই সঙ্গে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের রূপায়ণে ভ্রান্তিও আছে। লক্ষ করি―প্রশ্নের অবতারণায় হঠাৎই প্রসঙ্গহীন বিষয় উত্থাপন-বৈশিষ্ট্য। তারপরও এ রূপায়ণ ও নির্মাণকে আমরা ইতিবাচকভাবেই বিবেচনা করি। এক্ষেত্রে ১৯৭১-এর পূর্ব ও পরবর্তী রচিত কয়েকটি উপন্যাসের নাম অবশ্যই স্মরণীয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বে গণঅভ্যুত্থান রূপায়ণে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস রচিত হয়েছে। যেমন, চিলেকোঠার সেপাই ও ওঙ্কার। প্রসঙ্গত ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তর পর্যন্ত সাহিত্যচর্চার মধ্যে চিন্তা, বিষয় নির্বাচন, ভাষা ও গঠনকৌশলে পরম্পরা সম্পর্ক রয়েছে। একাত্তরে এসে নতুন বাস্তবতায় রাষ্ট্র ও সমাজের অন্য বিষয়াদির সঙ্গে সাহিত্যেও পরিবর্তন লক্ষ করি। এ-বাস্তবতার আলোকে দেখা যায় ভাষা ও চিন্তার লড়াই; তবে বাঁক পরিবর্তনে অর্থহীনতার প্রবহমানতা। যে ভাষার জন্য জাতীয় চেতনার উন্মেষ, উত্তরকালে সমূহ বিচ্যুতি প্রবলভাবে ঝাঁকুনি সৃষ্টি করে। আমরা হয়তো ভুলে যাই যে, যুদ্ধ আর চলচ্চিত্র এক বিষয় নয়। যুদ্ধের মতো এত নিষ্ঠুর, নির্মম বিষয় আছে বলে মনে হয় না। যেখানে পেলবতার কোনও স্থান নেই। উপন্যাস লিখতে গিয়ে চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা সম্ভব নয়।

অনেক দিক অবারিত হলেও ক্রম-বিচ্যুতি, নতুনভাবে উত্থাপিত জটিলতায় রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কিত বিভ্রান্তির কবলে এখন প্রায় সকলেই আক্রান্ত। বলা বাহুল্য কথাসাহিত্যেও এর প্রতিফলন লক্ষ্যণীয়। বৈচিত্র্যের প্রসারণ হলেও এর মধ্যে অংশত সদর্থক সৃজনশীলতা অনুপস্থিত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সার্বভৌম ভূগোলে বাঙালি জাতিসত্তা ছাড়াও কয়েকটি নৃ-জনগোষ্ঠীর বসবাস। বস্তুত বাঙালি জাতিসত্তা, বাংলাদেশের সকল মানুষের আত্মপরিচয়ের দিশা দিয়েছে একাত্তর। একাত্তরের অর্জন ঘিরে রয়েছে দীর্ঘকালের ঔপনিবেশিক নির্যাতনের ইতিবৃত্ত ও মুক্তির লড়াই। ফলে সকল আবেগ, উপলব্ধির প্রকাশ রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যে।

এ ছাড়াও বিশাল ক্যানভাসে অর্থাৎ প্রাক-ব্রিটিশ, ব্রিটিশ উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এমন উপন্যাসও রয়েছে। বাংলাদেশের সাহিত্য আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধ চর্চা, এর পরিপ্রেক্ষিতে রচিত সাহিত্য বিশেষ বিবেচনায় রাখতেই হয়। কারণ মুক্তিযুদ্ধ এ-দেশের অস্তিত্বের স্মারক ও প্রবহমানতার চালিকাশক্তি। এত রক্তক্ষয়, ত্যাগ, জাতীয় ঐক্য বাংলাদেশের জনমানুষের মধ্যে আর কখনও দেখা যায়নি। মুক্তিযুদ্ধ মূলত তুলনাঅতিক্রমী এক মহৎ অর্জন। তা হলে কেন এ নিয়ে বিশ্ব-অভিঘাতী কোনও উপন্যাস রচিত হলো না ? সাধারণ মানুষের মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিভ্রান্তির ছোবলে আক্রান্ত হয়েছেন লেখকসমাজও। ফলে পাক্ষিক-আসক্তি বড় কিছু সৃষ্টির অন্তরায় তৈরি করেছে। রফিকউল্লাহ খানের বিবেচনা প্রণিধানযোগ্য, ‘যুদ্ধরত সমগ্র জাতিসত্তার প্রাণস্পন্দনকে শিল্পমণ্ডিত করতে গেলে যে গভীর জীবনাসক্তি এবং শৈল্পিক নিরাসক্তি প্রয়োজন, কতিপয় ব্যতিক্রম বাদে আমাদের উপন্যাসে সেই অনিবার্য সমন্বয় তেমন লক্ষ্য করা যায় না। সংখ্যা-বিচারে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত উপন্যাস প্রচুর। কিন্তু অভিজ্ঞতা, অভিজ্ঞান ও জীবনবোধের রাসায়নিক সংশ্লেষের পরিচয় সেখানে দুর্লক্ষ্য। সম্ভবত অভিজ্ঞতার দৈন্য অথবা মধ্যবিত্তের যুদ্ধোত্তর স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ এই সীমাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। তবে ঔপন্যাসিকের জীবনচেতনা ও সমাজবোধের গভীরতা কোনও কোনও উপন্যাসকে তীব্র, তীক্ষè, গূঢ়ভাষী শিল্পকর্মে পরিণত করেছে।’ 

সুতরাং সামগ্রিক বিবেচনায় মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস পর্যবেক্ষণযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসে বিধৃত হয়েছে যুদ্ধে উপনীত হওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস, মুক্তি-অন্বেষায় চেতনার উদ্বোধন, উদ্দেশ্য, জীবনবোধ, সাংস্কৃতিক সংঘাত, বিভিন্ন ধাপের প্রস্তুতি ও লড়াই, ব্যক্তি অভিজ্ঞতা, কোনও কোনও ব্যক্তির যুদ্ধে অংশগ্রহণের টানাপোড়েন, প্রেম, বিচ্ছেদ, ব্যক্তি ও সামষ্টিক জীবনের  ভাঙন, রাজনীতির প্রশ্ন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি নিবেদিত আবেগ, আর্থ-সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, পাকিস্তানি শাসক ও সহযোগী দল-গোষ্ঠীর ভয়াবহ পাশব বর্বরতা, নির্যাতন, প্রতিরোধ ও সম্মুখযুদ্ধের বিবরণ। আন্তর্জাতিক পরিসরে যুদ্ধ-তৎপরতা, হিংসা, নারীর প্রতি সহিংসতা, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাপন, শরণার্থী জীবন ইত্যাদি। তবে মুক্তিযুদ্ধের দহন যন্ত্রণার এমন ঘটনাও রয়েছে, যেসব ভাষা ও সাহিত্যের বয়ানে ধরা যায় না; এসব শুধু উপলব্ধি ও অনুভবের বিষয়। দেশ-মাটির প্রতি দরদ, ভালোবাসা, প্রেম সামনে রেখে কয়েকটি উপন্যাস উল্লেখ করা যায়।

আনোয়ার পাশার রাইফেল রোটি আওরাত; শওকত ওসমানের জাহান্নাম হইতে বিদায়, নেকড়ে অরণ্য, দুই সৈনিক, জলাঙ্গী;  আবু জাফর শামসুদ্দীনের দেয়াল; রশীদ করীমের আমার যত গ্লানি; সৈয়দ শামসুল হকের নীল দংশন, নিষিদ্ধ লোবান, মৃগয়ায় কালক্ষেপ, বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ; শওকত আলীর যাত্রা; রাবেয়া খাতুনের ফেরারী সূর্য, বাগানের নাম মালনিছড়া, ৭১-এর নয় মাস, ৭১-এর নিশান; মাহমুদুল হকের জীবন আমার বোন, খেলাঘর; রশীদ হায়দারের খাঁচায়, অন্ধ কথামালা; আমজাদ হোসেনের অবেলায় অসময়; আহমদ ছফার অলাতচক্র; শামসুর রাহমানের অদ্ভুত আঁধার এক; সুকান্ত চট্টাপাধ্যায়ের জীবনতরু;  সেলিনা হোসেনের  হাঙ্গর নদী গ্রেনেড, যুদ্ধ; হারুন হাবীবের প্রিয়যোদ্ধা প্রিয়তম; বেগম জাহান আরার অয়নাংশ; আফসান চৌধুরীর রক্তের মেহেন্দি দাগ; হুমায়ূন আহমেদের শ্যামল ছায়া, আগুনের পরশমণি, ১৯৭১, অনিল বাগচীর একদিন, জোছনা ও জননীর গল্প; ইমদাদুল হক মিলনের কালো ঘোড়া, ঘেরাও; মঈনুল আহসান সাবেরের পাথর সময়, কবেজ লেঠেল; শহীদুল জহিরের জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা; শাহীন আখতারের তালাশ; হরিপদ দত্তের ঈশানে অগ্নিদাহ, অন্ধকূপে জন্মোৎসব; মঞ্জু সরকারের তমস, প্রতিমা উপাখ্যান; আনিসুল হকের মা, বীর প্রতীকের খোঁজে, জননী সাহসিকা, রক্তে আঁকা ভোর; মনি হায়দারের কিংবদন্তির ভাগীরথি; পরিতোষ হালদারের চুকনগর ইত্যাদি।

মুক্তিযুদ্ধে বিসর্জনের বাস্তবতা উপলব্ধির জন্য হাঙর নদী গ্রেনেড উপন্যাস স্মরণ করি। যেখানে মুক্তিকামী এক মা মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ষায় নিজের সন্তানকে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দিয়েছেন।

‘বুড়ি অনুভব করে ওর কলজেটা খাবলে নিয়ে ওরা চলে যাচ্ছে। বুড়ি দরজা ছেড়ে বারান্দায় নামে।… বুড়ি কিছুই শুনতে পায় না। ওদের ভিড় সরিয়ে উঠানের শেষ মাথায় আসে। এবং পরক্ষণেই শুনতে পায় গুলির শব্দ। বুড়ি দৌড়ে বের হয়। কালীমের লাগানো জামরুল গাছের নিচে রইস রক্তের স্রোতে ভাসছে। ও বেড়া আঁকড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। মনে হয় বুকের ভেতরের পুলটা দুম করে ভেঙে পড়লো। রইস একটা টকটকে লাল তাজা বোমা। চারজন সৈনিক সদম্ভে মাটি কাঁপিয়ে ক্যাম্পের দিকে চলে যাচ্ছে।… বুড়ি রইসের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে। জনযুদ্ধে উপেক্ষিত ছেলেটার উষ্ণ তাজা রক্ত হাত দিয়ে নেড়ে দেখে। রইসের ঠোঁটের কোণে লালা নেই। লালচে ক্ষীণ রেখা গড়াচ্ছে।’ 

নিষিদ্ধ লোবান উপন্যাসের উপান্তে বিলকিসের ভূমিকা সবকিছু ছাপিয়ে হয়ে ওঠে তাৎপর্যময়। বিলকিস নিজে জ¦লে, তখন সে নিজেই আগুন; আর আগুনসহ আলিঙ্গন করে ও ঝাপটে ধরে পাকিস্তানি মেজরকে। আত্মবিসর্জনের ভিন্ন এক দৃষ্টান্ত, যা প্রতীকী সংবেদনায় পাঠকের মগজে হলকা প্রজ¦লিত করে।

‘সে আলিঙ্গনে বিস্মিত হয় মেজর। পর মুহূর্তে বিস্ফারিত দুই চোখে সে আবিষ্কার করে, রমণী তাকে চিতার ওপর ঠেসে ধরেছে, রমণীর চুল ও পোশাকে আগুন ধরে যাচ্ছে, তার নিজের পীঠ বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। রমণীকে সে ঠেলে ফেলে দিয়ে লাফিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে পারত। কিন্তু রমণীকে আগুন দিয়ে নির্মিত বলে এখন তার মনে হয়। তার স্মরণ হয়, মানুষ মাটি দিয়ে এবং শয়তান আগুন দিয়ে তৈরি। জাতিস্মর আতঙ্কে শেষবারের মতো শিউরে ওঠে। মশালের মতো প্রজ¦লিত সমস্ত শরীর দিয়ে তাকে ঠেসে ধরে রাখে বিলকিস।’ 

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাস্তবতা নিবিড়ভাবে অবলোকিত শহীদুল জহিরের উপন্যাস―জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন এবং স্বাধীন দেশে সামাজিক মনস্তত্ত্বের ব্যবধান অনেক লেখককে পীড়িত করেছে। বিরোধী শক্তি  প্রবল দাপটে আবার কুটিল ষড়যন্ত্রে ফিরে আসে মাঠে। মুক্তিযুদ্ধ-উত্তরকালে আত্মপরিচিতির সংকট বিশাল দ্বন্দ্বে ফেলে দেয় কি না। কেউ না বুঝলেও, শহীদুল জহির উপলব্ধি করেছেন আইডেনটিটি প্রশ্ন। আর এ সময়ে পুঁজি, ক্ষমতার সঙ্গে অপূর্ব সুন্দর যোগ্যতা অর্জন করে অন্ধত্ব। একাত্তর সালে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ আবার ফিরে আসে ভিন্ন ভঙ্গিতে। বস্তুত রাজনৈতিক বাস্তবতা গিলে ফেলে চৈতন্যের স্মারক ও শক্তি।

‘সেই অন্ধকারের ভেতর জবাইয়ের ঔজ্জ্বল্য দেখে বুঝতে পারে,…ইসমাইল হাজামসহ আবদুল গণি তিনটে তালিকার একুশজনকে শনাক্ত করতে পারে এবং জানায় যে, এদের সকলেই মৃত। তার কাছ থেকে শোকাহত এবং ক্রুদ্ধ লোকেরা জানতে পারে যে, এদের প্রত্যেককে জবাই করে দেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং মস্তকহীন ধড় রাতের বেলায় রিকশা ভ্যানে করে নিয়ে গিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দেয়া হয় এবং ছিন্ন মুণ্ডু নিয়ে গিয়ে খ্রিষ্টানদের কবরস্থানে পুঁতে রাখে।’

এ চরম বাস্তবতাও মানুষ যে ভুলে যায় সংশয়ী কুহকের ঘাত-অভিঘাতে। ফলে মোমেনাসহ অসংখ্য নারী ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা কেবলই শ্রুতির বিষয় হয়ে ওঠে; এখন কোনও প্রতিক্রিয়া তৈরি করে না।

ভাষা আন্দোলনের উপন্যাস

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন পূর্ববাংলার (পূর্ব পাকিস্তান) সংস্কৃতি, রাজনীতি ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বস্তুত এ আন্দোলন ও রক্তদান মানুষের চিন্তাস্তরে রাজনীতি, সংস্কৃতি, সাহিত্যে নতুন ভাবনা সঞ্চারিত  করে। যা থেকে তৈরি হয় উদ্যম ও স্পৃহা; আড়ষ্ট জীবনে ঘটে নবজীবনের সঞ্চার। ওই চেতনাপ্রবাহের বিস্তার চলমান থাকে বাঙালির জীবনযজ্ঞে। মতাদর্শগত বিরোধ ও শ্রেণিদ্বন্দ্ব জায়মান থাকলেও একুশের চেতনায় সাহিত্যশিল্পে শুধু নয়, স্বাধীন জাতিগঠনের সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ হয় বাঙালি জাতি। যে-প্রতিফলন স্পষ্টত লক্ষ্য করি সাহিত্যশিল্পের সকল সরণিতে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে সূচিত হয় এ-দেশের সাধারণ মানুষের স্বপ্নভঙ্গ; অতঃপর আন্দোলনে যেতেই হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্র যখন ভাষাসহ অন্যান্য বিষয়ে সামন্তরীতি ও ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা আরোপ করে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর, তখন ঝাপটা সামলাতে হয় বিদ্রোহ, বিক্ষোভে। এর মধ্যে এদেশের জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষা বাংলাকে নির্বাসন দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম থেকে বাংলা ভাষা অপসারণের উদ্যোগের কারণেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত। তবে এ আন্দোলন হঠাৎ করে হয়নি। ভেতরে ভেতরে বীজ বপন হয়েছিল অনেক আগেই। মনে রাখতে হয়, আন্দোলনের মধ্যবিত্ত শ্রেণি সামন্ত শাসনাধীন পরিবেশ থেকে ওঠে আসা। তৎকালীন নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্র ওই সামন্ত মনস্তত্ত্ব থেকে বের হতে পারেনি। ফলে ভাষার সঙ্গে শ্রেণিদ্বন্দ্ব ও শোষণমুক্তির লড়াই সামনে চলে আসে। ফলে আন্দোলন বাঁক নেয় অন্যদিকে। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলার এ মধ্যবিত্ত শ্রেণি, সাধারণ মানুষ চেয়েছে একটি আধুনিক গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে। এ জন্য বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনকে বলা হয় বাঙালির উত্থান ও প্রত্যাবর্তনের কাল। এ আন্দোলনের ভেতর থেকে বিভিন্ন স্বপ্ন উঁকি দিতে থাকে। পূর্ববাংলার মানুষ বাংলাভাষা চর্চার সঙ্গে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, শোষণমুক্তি, সাংস্কৃতিক জাগরণ, স্বাতন্ত্র্য নিয়ে চিন্তা ও চর্চা শুরু করে। অবশ্যই এ-আন্দোলন যতটা না ছিল ভাষার অধিকার অর্জনের জন্য, তার চেয়ে বেশি ছিল সাংস্কৃতিক অধিকারের লড়াই। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বিবেচনা করেছে, সংস্কৃতির শক্তি প্রকাশ পায় ভাষার মাধ্যমে; এবং এ ভাষাতেই রচিত হয়েছে মহাকাব্য, গীতিকবিতা, রোমান্টিক গীতিকা, বিচিত্র গান, কবিতা, পুথি, বাউল-ফকির-সাধু-বৈষ্ণবের গান। মূলত বাংলা ভাষা শুধু একটি জাতিগোষ্ঠীর ভাষা নয়; সংশ্লিষ্ট জাতি, জাতীয়তা ও সংস্কৃতির প্রাণশক্তি। বাংলা ভাষার অসামান্য ধারণশক্তির কারণে সংস্কৃতির বৈচিত্র্য এসেছে। যে-কারণে বাংলা ভাষার চর্চা বন্ধ করতে পাকিস্তানি শাসকরা বলপ্রয়োগ করে বাংলাভাষীদের ওপর। পরিণামে ভাষাবিষয়ক রক্তঝরা আবেগ ছড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্যে। লক্ষণীয় ভাষাবিরোধী তৎপরতা চলমান ছিল ভাষা আন্দোলনের পরেও। কারণ পাকিস্তানপন্থার রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ ছিল একপক্ষীয়। এর মধ্যে আবার বৈশ্বিক চিন্তা ভাবনার সাহিত্য, শিল্পচর্চা ছিল না। ছিল শুধু বন্দনা ও প্রার্থনামূলক চর্চা। ফলে বৈসাদৃশ্যের সংস্কৃতি ক্রম-বিভাজন তৈরি করে। যা এমনিতেই তৈরি হয়ে যায়। সকলেই জ্ঞাত, সাহিত্যের প্রগতিশীল ধারা শক্তি অর্জন করে চল্লিশের দশকে, ভাষা আন্দোলনের আগেই। শিল্পরুচির বিবেচনায় পঞ্চাশের আগেই উৎকৃষ্ট ও অসামান্য উপন্যাস রচিত হয়―জননী, লালসালু ও সূর্যদীঘল বাড়ি। বরং ভাষা আন্দোলনের পর ওই উচ্চতার উপন্যাস তখনও পাওয়া যায়নি। এ জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে ষাটের দশক পর্যন্ত।

বলা বাহুল্য যে, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তুল্য আর কেউ কি এসেছেন ? এ প্রশ্ন রাখাই যায়। বায়ান্নর অব্যবহিত পর যে উচ্চারণযোগ্য সাহিত্য রচিত হয়নি এর কারণ বিচারে আহমদ রফিক বলেছেন, ‘পাকিস্তান-আন্দোলনের সময় যে-ঔপন্যাসিকেরা তরুণ ছিলেন, তাঁরাই বিশেষভাবে অপরিস্রুত; আর বায়ান্নোর চেতনা বুকে জ্বালিয়ে ঔপন্যাসিকরূপে আবির্ভূত হন যে-তরুণেরা, তাঁরা অনেক বেশি আধুনিক। আবুল ফজল, আবু জাফর শামসুদ্দীন বা সরদার জয়েনউদদীনের সাথে জহির রায়হান, আলাউদ্দিন আল আজাদ বা সৈয়দ শামসুল হককে তুলনা করলে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অবশ্য বয়স্কদের মধ্যে ব্যতিক্রমী যে কেউ নেই, তা নয় : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমানকে বয়স্ক আধুনিকরূপে গ্রহণ করতে হয়।’ এসব বিতর্ক, প্রশ্ন তোলাই যায়। তবে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন রাজনীতি, সংস্কৃতিতে প্রবল প্রতাপে প্রভাব সৃষ্টি করছে, তা স্বীকার্য; না হলে চমৎকার সাহিত্য রচিত হওয়ার কথা নয়। ভাষা আন্দোলনকেন্দ্রিক উপন্যাসগুলো হলো : জহির রায়হানের আরেক ফাল্গুন, শওকত ওসমানের আর্তনাদ, সেলিনা হোসেনের যাবিত জীবন, শামসুদ্দীন আবুল কালামের পিঙ্গল আকাশ। ভাষা আন্দোলনের প্রসঙ্গ এসেছে আরও উপন্যাসে। যেমন, দিলারা হাশেমের ঘর মন জানালা; আবু রুশদের নোঙর; আনিস সিদ্দিকীর মন না মতি; রাবেয়া খাতুনের রাজারবাগ শালিমার বাগ; আবদার রশীদের লঘুমেঘ; মনি হায়দারের ফাগুনের অগ্নিকণা; আহমেদ মাওলার আগুন ঝরা ফাগুন দিনে ইত্যাদি। উপন্যাসগুলোতে কী বার্তা দেওয়া হয়েছে ? মূলত, আর্থ-সামাজিক বিবরণ, স্মৃতিচারণ, শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি, আন্দোলনের শ্রেণিচরিত্র, বিভিন্ন মাত্রা, সরকারের দমনমূলক ভূমিকা, ভাষাসংগ্রামীদের মনোভঙ্গি, দেশভাগপূর্ব ও পরের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, শোষণবঞ্চনার চরিত্র, প্রভাতফেরি, বায়ান্ন পরবর্তী শহিদ মিনার প্রতিষ্ঠার লড়াই, দিবস উদযাপন, সাধারণ মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের রাষ্ট্রভাবনা ইত্যাদি। মূলত ভাষা আন্দোলনের ওপর পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস হলো আরেক ফাল্গুন। এ জন্য কিছুদিন অপেক্ষা করতে হয়। লেখক জহির রায়হান নিজেও এ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। এক্ষেত্রে জহির রায়হানের সকল কর্মে আসামান্য ত্যাগ ও দক্ষতা লক্ষ্যণীয়।

চমৎকার গীতল ভাষার উপন্যাস আর্তনাদ। আখ্যানে লেখক ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণে তুলে ধরেছেন দেশবিভাগোত্তর জটিলতা। বস্তুত দেশভাগ যে অবশেষে মানুষের মুক্তি দিতে পারেনি, বরং ভিন্ন সংকটে নিপতিত করেছে, তা দেখিয়েছেন লেখক এ উপন্যাসে। রয়েছে পাকিস্তানের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের কাহিনি। উচ্চকিত হয়েছে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী বক্তব্য। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাঙালির ওপর অন্যায় আচরণকেও তারা পাকিস্তান ও ধর্মের ঢালে বৈধতা দিতে শুরু করে। লেখক স্মরণ করেছেন, ভাষা আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাধারণ কৃষকসমাজের অংশগ্রহণ এবং শ্রেণিগত দাবি একীভূত হওয়ার বাস্তবতা। এ ছাড়াও লেখক ইঙ্গিতে বলেছেন প্রগতিশীল রাজনীতির কথা। কথাবস্তুর মূলে উচ্চকিত হয়েছে ভাষা সংগ্রামীর মৃত্যু এবং ব্যক্তির মাধ্যমে সামষ্টিক পূর্ববাংলার আর্তনাদ। 

‘আর কোথাও―কোনো রক্তাক্ত রাজপথে, কি কোনও শোক-বিধুর গৃহ-প্রাঙ্গণে নির্বাক থেমে গেছে। সমস্ত বাংলাদেশের গাছপালা খাল-বিল ছায়াপথ বনজঙ্গল পার হয়ে, … বর্বরতার সম্মুখে স্তব্ধ মিছিলের লক্ষ চোখের দৃষ্টির সঙ্গে মিশে গেছে―… মৌন পূর্ববঙ্গ যেন ঐখানে জ¦লে-জ¦লে জিজ্ঞাসা করছে; … তোমাদের ভাষা কোথায় ? … চোখের দৃষ্টি অপলক, বৃদ্ধ এইবার ডুকরে আর্তনাদ করে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে চুরমার হয়ে গেল নীরবতার জগদ্দল।―‘কী দোষ করেছিল আমার ছেলে ? ওরা কেন তাকে গুলি করে মারল ? কী দোষ―কী দোষ করেছিল সে ? আহা!’

জহির রায়হান উপন্যাসে ফ্লাশব্যাক-এ বর্ণনা করেছেন বায়ান্নর ঘটনাবলি। মূলত চলচ্চিত্রের ফর্ম ‘কাট-টু-কাট’ পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। তবে তাঁর ভাষায় ওই সময়ের ঘটনাবলি বাস্তব রূপ পেয়েছে। বস্তত ‘দৃশ্যশিল্প এবং শব্দশিল্পের অন্তর্ময় সংযোগ-সাধনের প্রয়াসই তাঁর উপন্যাসসমূহকে স্বতন্ত্রমাত্রিক ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে।’ ওই সময়ের দ্রোহ, ক্ষুব্ধতার রূপায়ব বিবৃত করেছেন আরেক ফাল্গুন উপন্যাসে। এর নমুনাংশ এখানে দেখা যেতে পারে। 

‘মেডিকেলের পশ্চিম পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা অ্যাসেম্বলি হাউস হয়ে রেসকোর্সের দিকে চলে গেছে সে রাস্তার মোড়ে, জিপগাড়িসহ জনৈক এম. এল. এ-কে তখন ঘিরে দাঁড়িয়েছে একদল ছেলে। বেচারা এম. এল. এ তাদের হাতে ধরা পড়ে জলে ভেজা কাকের মতো ঠকঠক করে কাঁপছিলো আর অসহায়ভাবে তাকাচ্ছিলো এদিক সেদিক। আশেপাশে যদি একটা পুলিশও থাকত। ছেলেরা জীপ থেকে নামালো তাকে। একটা ছেলে তার আচকানের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে হেঁচকা টানে চিড়ে ফেলল পকেটটা। আরেকটা ছেলে চিলের মতো ছোঁ মেরে তার মাথা থেকে টুপিটা তুলে রাস্তায় ফেলে দিল। লোকটা মনের ক্ষোভ মনে রেখে বলল, আহা! করছেন কি ? করছেন কি ?’

উপন্যাসে দেশভাগের বয়ান

উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামে উপমহাদেশে স্বাধীনতা, স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠন, স্বনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক সামন্ত শাসনের উচ্ছেদসহ অনেক কিছুই অর্জিত হয়। এ অর্জনের মূল প্রশ্ন ছিল শ্রেণি অধিকারের, তবে তা চাপা পড়ে যায় সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত স্রোতে। স্বাধীনতা ও রাষ্ট্র অর্জনের ফাঁকে দেশভাগও একটি বাস্তবতা। ইতিহাসের উপকরণ, রাজনৈতিক বাস্তবতা বলে দেয় দেশভাগ ছিল অনিবার্য। সে-কালে রাজনীতির ক্রিয়াকর্ম সে-পথেই এগিয়েছে। সমাজসূত্রও জনগণকে এমন বিভাজনে প্ররোচিত করে। ফলে দেশভাগে আনন্দ, উৎসবই হওয়ার কথা। কিন্তু এর ফলে যে ক্ষত তৈরি হয়েছে এর রক্তক্ষরণ, দহন এখনও চলমান। নিষ্প্রভ হয়ে যায় স্বাধীনতা লাভের উল্লাস। দেশ বিভাজনজাত দেশান্তর, হিংসা, ক্রোধ, হত্যা, বিপর্যয়ে যে ক্ষতি হয়েছে; তা এখনও পূরণ করা যায়নি। স্মৃতিকাতরতা, কান্নায় এখনও মানুষ আপ্লুত হয়; সেই বিপন্ন বিস্ময়, কষ্ট বহন করে চলছে সাধারণ মানুষ। এ পথ খুব দীর্ঘ; মনে হয় শেষ হওয়ার নয়।

উপমহাদেশের এ হিংসাত্মক ঘটনা রাজনীতি, সংস্কৃতির মাত্রাও নির্ণয় করে দিয়েছে। এই নির্ণিত রেখাচিত্রের ছায়াতলে আমাদের জীবন অতিক্রান্ত হচ্ছে, এর প্রভাব কোথায় গিয়ে ঠেকে; তা অনিশ্চিত। সাঈদ ফেরদৌস চধৎঃরঃরড়হ ১৯৪৭: খবংংড়হং বি হববফ ঃড় ঁহ/ষবধৎহ শিরোনামে দৈনিক স্টার-এ প্রকাশিত নিবন্ধে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। যা অবশ্যই পাঠককে ভাবতে সাহায্য করে। দেশভাগকেন্দ্রিক আলোচনা একসময় কেন্দ্রীভূত থাকলে এখন তা বিকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। যে কেন্দ্রীকতা সামূহিক বিষয় ও ঘটনাবলিকে বহুদিন দূরে রেখেছিল। ৃ রহফড়পবহঃৎরংস রং বারফবহঃ রহ চধৎঃরঃরড়হ ঝঃঁফরবং পড়হপবঢ়ঃং ষরশব ‘ংঁৎমবৎু’ ধহফ ‘ঢ়ৎড়ষড়হমবফ চধৎঃরঃরড়হ’. ঞযব সবঃধঢ়যড়ৎ ড়ভ ‘ংঁৎমবৎু’ ফৎধংি ঁঢ়ড়হ ধ সড়ৎঢ়যড়ষড়মরপধষ বীঢ়ষধহধঃরড়হ ড়ভ হধঃরড়হ ধং ঃযব নড়ফু ঃযধঃ ৎবয়ঁরৎবং ধসঢ়ঁঃধঃরড়হ ড়ভ রঃং রহভবপঃবফ ষরসন. ওঃ রহফরপধঃবং ঃযধঃ ঃড় ংধাব ঃযব হধঃরড়হ, ৃ ঈৎড়ংং-নড়ৎফবৎ সড়নরষরঃু ধহফ ঢ়বড়ঢ়ষব ষরারহম ঃৎধহংনড়ৎফবৎ ষরাবং রং ধ ৎবধষরঃু ধষড়হম ঃযব ইবহমধষ নড়ৎফবৎষধহফ ধহফ ‘ঢ়ৎড়ষড়হমবফ চধৎঃরঃরড়হ’ রং ঃযবৎবভড়ৎব ধ ড়িৎঃযযিরষব রফবধ. ঐড়বিাবৎ, রহংঃবধফ ড়ভ পড়হভরহরহম ঃযরং পড়হপবঢ়ঃ ঃড় ড়হব ংঢ়বপরভরপ রহংঃধহপব, রঃ ংযড়ঁষফ নব ংঃৎবঃপযবফ ঃড় ড়ঃযবৎ ধংঢ়বপঃং―ঃযবৎব ধৎব ধ ভবি সড়ৎব রংংঁবং ঃযধঃ পধহ নব ঁহফবৎংঃড়ড়ফ ধং ‘ঢ়ৎড়ষড়হমবফ চধৎঃরঃরড়হ’.

সাব-অলটার্ন আলোচনায় এ দুটো ধারণা―‘সার্জারি’ ও ‘প্রোলংড পারটিশন’ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যা এককেন্দ্রিক আলোচনায় ছিল না। বলা বাহুল্য যে, এ সার্জারি ও প্রোলংড পারটিশনের সারার্থ এখনও সকলের কাছে স্পষ্ট নয়। বিশেষত রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের কাছে। বস্তুত মানুষের অন্তঃসলিলে বহমান থাকবে দহনের দানাদার বুদ্বুদ।  তবে বিপরীত ভাবার্থে বলা কী অন্যায় হবে উপমহাদেশের রাজনীতি ভিন্ন আঙ্গিকে এ-প্রোলংড ধারণাকে জায়মান রেখেছে। ফলে উপর্যুক্ত ধারণার কোনও প্রতিফলন সাহিত্য বা চলচ্চিত্রে এখনও সেভাবে আসেনি। যদিও গুরুত্বপূর্ণ অনেক সাহিত্য ও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশে এমন সিরিয়াস কাজে মনোযোগ কমই বলতে হবে। না হলে উদাহরণ উপস্থাপনে অনেক কষ্ট করতে হতো না। আমাদের শিল্পীসমাজ কোনও বিভ্রান্তির কবলে আছেন, পড়েছিলেন বা পড়তে পারেন। এমন সম্ভবনার কারণে হয়তো আমরা এখনও অপেক্ষমান।

সাঈদ ফেরদৌস আরও তাৎপর্যময় কথা বলেছেন ওই নিবন্ধে। তিনি বলেছেন, ১৯৪৭ সম্পর্কে শুধু পাওয়া যায় কান্না, কষ্ট, বিচ্ছেদ, রক্তপাত, দহন, ভাঙনের কথা। এমন গল্প বলতে বলতে এড়িয়ে যাই দেশভাগের আরও অনেক বিষয়। যদিও এ দহন, ক্ষত ভুলে যাবার নয়। আমাদের সাহিত্যে এর প্রতিফলনই লক্ষ করি। অন্যদিকে পূর্ববঙ্গের মানুষের কাছে নতুন দেশের জন্য ছিল আনন্দময় ঘটনা। অপ্রিয় হলেও সত্য পূর্ববঙ্গে ছিল নতুন দেশ ও পরিস্থিতির অভ্যর্থনা। তবে এর ফাঁকে সামাজিক স্তরে যৌথ পরিবারের ভাঙন, দেশভাগের ক্ষত মানুষের মনস্তত্ত্বে গভীর দাগ সৃষ্টি করে। আবার সাম্প্রদায়িক মনস্তাত্ত্বিক যে ভূগোল ও রাষ্ট্র তৈরি হয়, এর মীমাংসা করা যায়নি। সহজ কথায়―এই দেশভাগে জন্মমাটি থেকে বিচ্যুত এবং নিঃস্ব হয়েছে মানুষ। এর চেয়ে বড় ব্যাপার হলো দেশভাগ মানুষকে নাগরিকত্বহীন করে দিয়েছে। এই দেশহীনতা, নাগরিকত্বহীনতার সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে উপমহাদেশের রাজনীতি। বরং সমস্যাকে প্রলম্বিত করেছে। পরস্পর হিংসা, ঘৃণা, বিদ্বেষ, সংঘাত যেন স্থায়ী আবাস গড়েছে এ অঞ্চলে।   

এর পরিপ্রেক্ষিত, ঘটনাবলি, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র, চিত্রকর্ম, সঙ্গীত ও সাহিত্য। ইতিহাসচর্চার সঙ্গে সৃজিত হয়েছে অসামান্য কথাসাহিত্য। সাদত হাসান মান্টো, খুশবন্ত সিং, গুলজার তো আছেনই। আসলে এ হিংসাজাত দূষণের বাইরে লেখক-শিল্পীরাও থাকেননি। গলদ ছিল বলেই মানুষের মনস্তাত্ত্বিক স্তরে দ্বন্দ্বের নিরসন হয়নি। বস্তুত এসব টানাপোড়েনের বাইরে সাহিত্য সংস্কৃতি-চর্চা হয় না। যে কারণে বিভিন্ন বিদ্যায়তনে এর প্রতিক্রিয়া লক্ষ করি। এ-ভূগোলে এমন ধারণা তৈরি হলো―পাকিস্তান রাষ্ট্র অবশেষে পশ্চিম পাকিস্তানেরই। অনেক প্রশ্ন, তর্ক মেনে নিয়ে বলা যায়, যে কারণে পূর্ব বাংলা (পূর্ব পাকিস্তান)-র মানুষ মেনে নিতে পারেনি। এ বিষয়টি সাহিত্য-সংস্কৃতিতেও প্রতিফলিত হয়েছে।

এ বিষয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস রয়েছে। আবার বিশাল ক্যানভাসে রচিত কয়েকটি উপন্যাসের উপাখ্যান হিসেবে মূল আখ্যানের সঙ্গী হয়েছে দেশভাগ। দেশভাগের বিপরীতে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া মানুষের মনোজগতে যে ট্রমা তৈরি হয়েছিল, এর কিছু গল্পও রয়েছে অনেক উপন্যাসে। এর প্রতিক্রিয়া রয়েছে এমন উদাহরণ হিসেবে আমরা―আহমাদ মোস্তফা কামালের নিরুদ্দেশ যাত্রা উপন্যাসের উল্লেখ করতে পারি। মূলত ইতিহাসখ্যাত হত্যা, রক্তযজ্ঞ, বিষাদান্তক বিবরণ কোনও মাধ্যমেই প্রদর্শন ও ভাষায় প্রকাশযোগ্য নয়। বিষয়জালে আটকা না থেকে অনন্য কয়েকটি উপন্যাস রচিত হয়েছে, তা স্বীকার্য। আহমেদ মাওলা দেশভাগনির্ভর উপন্যাসের বিষয় বিন্যাস করেছেন যেভাবে। তা হলো : ক. স্মৃতি, স্মরণ ও বিষাদময়তা, খ. দাঙ্গা, ধর্ষণ-নারীত্বের অবমাননা, গ. হত্যা, ধর্ষণ-নারীত্বের অবমাননা, ঘ. উদ্বাস্তু সমস্যা, ক্ষুধা-দারিদ্র্য, অবক্ষয়।

এ ট্রাজিক পরিণামের অন্য ইতিবাচক দিক হলো, ঢাকাকেন্দ্রিক নতুন উদ্যম ও সৃষ্টিশীলতার স্বপ্ন। কিন্তু এটাও আরেক উপনিবেশে হওয়ায় অনেকটাই স্বপ্নভঙের পরিপ্রেক্ষিত তৈরি হলো। সকলেই জানেন, ক্ষত সহজে নিরাময়যোগ্য নয়।  দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িকতার উৎসজাত স্মৃতিকাতরতা, আত্মপরিচয় ও আত্মনির্মাণের সংকট প্রসঙ্গে লিখিত হয়েছে কয়েকটি শিল্পিত উপন্যাস। বিষয়বস্তু ও পরিধি আলোচনায় অনেকগুলোর কথা আগেও উল্লেখ করা হয়েছে। উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে, জীবনানন্দ দাশের জলপাইহাটি, বাসমতির উপাখ্যান; আবুল ফজলের রাঙা প্রভাত; রাজিয়া খানের বটতলার উপন্যাস; আবু ইসহাকের সূর্যদীঘল বাড়ি; শহীদুল্লা কায়সারের সংশপ্তক; সত্যেন সেনের পদচিহ্ন, আবুল মনসুর আহমদের জীবন ক্ষুধা; সরদার জয়েনউদদীনের অনেক সূর্যের আশা, আনোয়ার পাশার নীড় সন্ধানী, মাহমুদুল হকের কালোবরফ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা; হাসান আজিজুল হকের আগুনপাখি; শওকত আলীর ওয়ারিশ; সেলিনা হোসেনের যাপিত জীবন, গায়ত্রীসন্ধ্যা, সোনালি ডুমুর, কাঁটাতারে প্রজাপতি; তানভীর মোকাম্মেলের কীর্তিনাশা, চিত্রানদীর পারে, দুই নগর; চন্দন আনোয়ারের অর্পিত জীবন ইত্যাদি।

প্রসঙ্গত দেশভাগের অনিবার্য সঙ্গী, বাস্তবতা ছিল মন্বন্তর। যা এ-উপমহাদেশের কলঙ্কজনক অধ্যায় বলে জানি। ফলে উদ্বাস্তু ও মন্বন্তর এ-দুয়ের যৌগ সংকটে উপমহাদেশের মানুষ পর্যুদস্ত ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। দুই বিপদই একসঙ্গে হাত ধরাধরি করে নেমেছিল এ-দেশের মানুষের ওপর। এর ঘাত এখনও মন-মগজ-মননকে অস্থির করে রেখেছে। এখন পর্যন্ত যত উপন্যাস রচিত রয়েছে এ বিষয়ে, প্রতি উপন্যাসেই এসেছে দেশভাগের নির্মমতা, উদ্বাস্তু সমস্যা, স্মৃতিময় কান্না, হিংসা, সাম্প্রদায়িকতা, সাংস্কৃতিক সংঘাত, নির্যাতন ও অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। যেহেতু দেশভাগের পরিণামের সঙ্গে এসেছে মন্বন্তর; ফলত উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে তাড়িত, উন্মূল মানুষের জীবন। কিন্তু অংশত যা অনুপস্থিত রয়েছে কথাসাহিত্যে, এ-ভাঙন, সামাজিক ব্যাকরণ, রাজনৈতিক খেলার মৌল রহস্য, উগ্র সাম্প্রদায়িক জাতিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা [পরস্পর হিংসা ও নেতি অর্থে], দাঙ্গা, হিংসার উৎস; আবার সাম্প্রদায়িকতার বিপরীতে ব্যক্তি-উদ্যোগ ও সম্প্রীতির বিবরণ।

যে ক্ষমতা কাঠামো, গোষ্ঠীতান্ত্রিক স্বার্থ ওইসব নেতিবাচকতাকে উসকে দেয়, সেসব গূঢ় বিষয়ে শিল্পমাধ্যমে কেউ প্রশ্ন তোলেন না। কেবলই খাড়া থাকে অজুহাত। যে অজুহাতে উপন্যাসের আখ্যান, উপাখ্যান সীমিত হয়ে গেল এককেন্দ্রিক বিবেচনা―হিন্দু-মুসলমান সমস্যায়। এ বিষয়ে হাসান আজিজুল হকের প্রাজ্ঞোক্তি ‘শ্রেণী, শ্রেণীস্বার্থ, শোষক, শোষকশ্রেণীর সমাজ, রাষ্ট্র―এইসব বহুব্যবহৃত শব্দ বা শব্দবন্ধ ব্যবহার না করে কথাটাকে আমি এইভাবে বলবার চেষ্টা করেছি যে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কসহ এই জাতীয় সকল সম্পর্কই আসলে অজুহাত। মূল লক্ষ্য আড়ালে রাখার জন্যই এইসব অজুহাত খাড়া করা হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির জন্য এত রক্তপাত সেকি শুধু মাত্র হিন্দু-বিদ্বেষ ও মুসলিম প্রীতি, নাকি হিন্দুমুক্ত মুসলিম দেশের অপ্রতিহত অগ্রগমনের শুভেচ্ছা ? … ইতিহাসে মানুষকে কোন দিন সমাজ, রাষ্ট্র, উৎপাদন ও উৎপাদন-সম্পর্কের পরে তুলে নির্বিশেষে মানুষ হিসেবে দেখা সম্ভব হয়নি।’ স্বীকার্য যে সামাজিক অবস্থান ও চাপে অনেক সময় আসল কথা বলা যায় না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উপন্যাসের কিঞ্চিৎ উদাহরণ থেকে অনুধাবন করা সম্ভব।

১. ‘জন নেই, মানুষ নেই, কোথাও এতটুকু কোলাহল নেই। বড় বড় দালানগুলো দাঁড়িয়ে আছে বসতিহীন, শ্রীহীন, শোভাহীন; যেন প্রাগৈতিহাসিক কংকালের সারি, সভ্যতার কোন লুপ্ত যুগের স্মারক।’ [সংশপ্তক]

২. ‘সত্যি বলছি বাবা, আমি ক্যানে তোমাদের সাথে দেশান্তরী হব এই কথাটি কেউ আমাকে বুঝুইতে পারে নাই। পেথম কথা হচে, তোমাদের যি একটো আলেদা দ্যাশ হয়েছে তা আমি মানতে পারি না। একই দ্যাশ, একইরকম মানুষ, একইরকমের কথা, শুদু ধম্মো আলেদা সেই লেগে একটি দ্যাশ যেতে যেতে একটো জায়গা থেকে আলেদা আর একটো দ্যাশ হয়ে গেল, ই কি কুনোদিন হয় ? এক লাগোয়া মাটি, ইদিকে একটি আমগাছ একটি তালগাছ, উদিকেও তেমনি একটি আমগাছ, একটি তালগাছ! তারা দুটো আলেদা দ্যাশের হয়ে গেল ? কই ঐখানটোয় আসমান তো দুরকম লয়। শুদু ধম্মোর কথা বোলো না বাবা, তাইলে পিথিমির কুনো দ্যাশেই মানুষ বাস করতে পারবে না।’ [আগুনপাখি]

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে বাংলাদেশের উপন্যাসের স্বরূপ যথার্থ অনুধাবন সম্ভব নয়। সীমাবদ্ধতার হিসেব মনে রেখে আমরা একটি রেখাচিত্র উপলব্ধি করেছি মাত্র। ইতিহাসের বহুবর্ণিল পথে, ঐতিহাসিক ঘটনাবলির বাঁকে বাঁকে উদ্ভূত বিষয়ে এ-দেশের উপন্যাসের কথাবস্তু নির্মিত হয়েছে। ফলে একটা সময় পর্যন্ত বিষয়বস্তু নির্বাচন ও আখ্যানে সরলরৈখিক আবর্তন লক্ষ করেছি। বিষয়ে বৈচিত্র্য এসেছে মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে। উপন্যাসের আঙ্গিক, থিম ও ভাষায় এসেছে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন। এ জন্য বৈশ্বিক অভিঘাত অবশ্যই বিবেচনাযোগ্য। কালের নিরীক্ষা, বহুমাত্রিক বিবেচনা, চিন্তার বহুস্বরিত স্বভাবে এ-দেশের উপন্যাস অগ্রসরমান। 

তথ্যপঞ্জি

অর্জুন গোস্বামী। ২০২২। দেশভাগ বিতর্কে দুই বাংলা। কলকাতা : খড়ি প্রকাশনী

আহমেদ মাওলা । ২০২৫। দুই বাংলার উপন্যাসে দেশভাগ। ঢাকা : মাওলা ব্রাদার্স

…………। ২০১৮। ভাষা আন্দোলনের সাহিত্য। ঢাকা : পরিবার পাবলিকেশন্স

কামরুদ্দীন আহমদ। ২০২২। পূর্ববাংলার সমাজ ও রাজনীতি। ঢাকা : মাওলা ব্রাদার্স

মহীবুল আজিজ । ২০০২। বাংলাদেশের উপন্যাসে গ্রামীণ নিম্নবর্গ। ঢাকা : জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন

রফিকউল্লাহ খান। ১৯৯৭। বাংলাদেশের উপন্যাস : বিষয় ও শিল্পরূপ। ঢাকা : বাংলা একাডেমি

শওকত হোসেন [সম্পাদক]। জানু-মার্চ ২০১০। হালখাতা― বাংলাদেশের উপন্যাস বিষয়ক প্রবন্ধ সংখ্যা। ঢাকা

সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৭১। বাংলা উপন্যাসের কালান্তর। কলিকাতা : সাহিত্যশ্রী 

সৈয়দ আকরম হোসেন । ১৯৮৫। বাংলাদেশের সাহিত্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ। ঢাকা : বাংলা একাডেমি

……….। ২০১০। প্রসঙ্গ : বাংলা কথাসাহিত্য। ঢাকা : মাওলা ব্রাদার্স

স্বপন নাথ । ২০১৯। কথার বুনন। ঢাকা : জিনিয়াস পাবলিকেশন্স।

 লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button