
গল্প কখনও বিস্তৃত নদীর মতো, আবার কখনও বিজলির ঝলকের মতো মুহূর্তে আঘাত হানে। ঝলকগল্প ঠিক এমনই।
প্রথমেই বলতে চাই, সাম্প্রতিক ইউরোপ-আমেরিকার গবেষণার স্বতন্ত্রধারা অনুযায়ী ফ্ল্যাশফিকশন আর অণুগল্প এক নয়। প্রচলিত বাংলা সাহিত্যচর্চায় এ নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি রয়েছে। এই নিবন্ধে বিষয়টি খোলাসা করার চেষ্টা করব।
ফ্ল্যাশফিকশন
ইংরেজিতে লিখতে Flash fiction দুটো শব্দকে আলাদা করে লেখা হয়। অথচ বিদেশি যৌগশব্দকে বাংলায় একত্রে লেখার প্রবণতা খুব সাধারণ। যেমন ফেসবুক, ইউটিউব, ওয়েবসাইট, সায়েন্সফিকশন, সাইবারক্রাইম, হররফিল্ম ইত্যাদি। ‘ফিকশন’ যুক্ত শব্দ বাংলায় একত্রে লেখার ব্যবহার বহুদিনের। ফলে ‘ফ্ল্যাশফিকশন’ও বাক্যতাত্ত্বিকভাবে স্বাভাবিক। আর তাই এখানে শব্দটি একত্রে ব্যবহার করা হয়েছে।
ফ্ল্যাশফিকশন বলতে কী বুঝব?
একটিমাত্র মুহূর্ত, টুইস্ট বা দৃশ্যকে অত্যন্ত তীক্ষèভাবে ধরাই ফ্ল্যাশফিকশনের লক্ষ্য। ‘ফ্ল্যাশ’ শব্দের মতোই এটি ঝটপট আঘাত করে; স্পার্কিং বা বিস্ফোরণের মতো ছোট, কিন্তু প্রভাব গভীর। অনলাইনে বিশ্বজুড়ে এ ধারাটি এখন বেশ পাঠকপ্রিয়।
‘ফ্ল্যাশফিকশন’, বাংলায় ‘ঝলকগল্প’। এর আকার হবে ছোট কিন্তু ‘গল্প’, ৫০০ থেকে ১,০০০ শব্দের একটি গ্রহণযোগ্য নির্দেশিকা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইউরোপ-আমেরিকার সাহিত্য গবেষণায়। তবে কিছু জার্নাল ও সম্পাদকীয় চর্চায় ৩০০-৫০০ শব্দকেও ফ্ল্যাশফিকশনের প্রান্তিক আয়তন হিসেবে গ্রহণ করা হয়। উক্ত নির্দিষ্ট শব্দসংখ্যার মতো বর্তমানে এই ধারায় ফ্ল্যাশফিকশনে ‘ক্ষুদ্র আর্ক’ এবং আলাদা narrative demand বা বয়ানও গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়েছে।
‘ক্ষুদ্র আর্ক’ (Micro-Arc) বলতে কী বোঝায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে এটি গল্পের কাহিনি-বিকাশের খুব ছোট আকারের বাঁক। এখানে ক্ষুদ্র পরিবর্তন ঘটে কিংবা ছোট সংঘাতের উত্তরণ হয়, অথবা চরিত্রের ভেতরে একটা ক্ষুদ্র উপলব্ধি সৃষ্টি হয় কিংবা অন্তর্গত ভাবনার ট্রান্সফরমেশন ঘটে। সাধারণ উপন্যাস বা পূর্ণাঙ্গ গল্পে আর্ক মানে:
শুরু → সংঘাত → উত্তরণ → সমাধান → পরিণতি। কিন্তু Flash Fiction-এর সীমিত (৫০০-১০০০) শব্দে পুরো আর্ক রাখা অসম্ভব। তাই এখানে থাকে compressed বা mini-arc। অর্থাৎ ‘ক্ষুদ্র আর্ক’, মানে ছোট জায়গায় ছোট পরিবর্তন। এটি তিন রূপে প্রকাশিত হয়:
ঘটনার ছোট পরিবর্তন: একটা ক্ষুদ্র ঘটনার আগে-পরে অবস্থা বদলে যায়, সিদ্ধান্ত বদলে যায়। এটি ছোট event arc।
মনস্তাত্ত্বিক ছোট উপলব্ধি: চরিত্র বাইরে খুব কম বদলায়, কিন্তু ভেতরে ক্ষুদ্র ‘realization’ হয়।
যেমন: মা মারা যাওয়ার পর ছেলে পুরোনো ওড়না গোছাতে গিয়ে বুঝল সে কখনও মায়ের কথা পুরোপুরি শোনেনি।
এটি আবেগের বাঁক (emotional arc)।
দৃষ্টিভঙ্গির সামান্য পরিবর্তন (Shift of perception)।
শেষ প্যারাগ্রাফে চরিত্র বা পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গি এক ডিগ্রি বদলে যায়।
উদাহরণ: একজন নিরাপত্তাকর্মী ভাবত অফিসের সবাই তাকে উপেক্ষা করে।
শেষ লাইনে সে জানতে পারে অফিসের ছেলেটি প্রতিদিন তার জন্য বাড়তি চা রেখে দেয়।
এটি ক্ষুদ্র কিন্তু শক্তিশালী perception arc। প্রচলিত একটি উদাহরণ।
কেন এটিকে আর্ক বা বাঁক বলা হয়?
কারণ গল্পে এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থার যাত্রা ঘটে, যদিও তা খুব ছোট পরিসরে। মানে Flash Fiction-এ এই ‘যাত্রা’ খুবই সংক্ষিপ্ত: ন্যূনতম সেটআপ, ন্যূনতম সংঘাত, ন্যূনতম টার্ন, ন্যূনতম উপলব্ধি। তবু একটি গতি, একটি বাঁক থাকে। তাই বলা যায়, ‘ক্ষুদ্র আর্ক হলো ছোট ঘটনা বা উপলব্ধির ভেতর দিয়ে চরিত্র বা পরিস্থিতির সামান্য কিন্তু অর্থবহ পরিবর্তন।’
এখানে অবশ্যই গল্পের গঠন থাকে। যেমন চরিত্র, সংঘাত, পরিবর্তন বা উল্লিখিত বাঁক-মোচড় এবং একটি সরল প্লটও। এর কাঠামো ব্যবচ্ছেদ করে বলা যায় ফ্ল্যাশফিকশনে সাধারণত ‘miniature short story’ পাওয়া যায়। শুরু-মধ্য-শেষ অবশ্যই থাকে, তবে সংকুচিত, বা ছোট আকারে।
দুই
সাহিত্যপত্রিকা শব্দঘর সম্পাদনার অভিজ্ঞতা ও অধ্যয়ন থেকে উপলব্ধি করি, কাফকা কিংবা বাংলা ভাষার গুরুত্বপূর্ণ লেখক বনফুল যে ধরনের ছোটগল্প লিখেছেন, তা কখনও ফ্ল্যাশফিকশনের পরিসরে, আবার কখনও অণুগল্পের কাছাকাছি চলে আসে। বিশ্বসাহিত্যে Microfiction নামে যে ক্যাটাগরি আছে, সেটিকে বাংলায় আমরা অণুগল্প বলেই জানি। আবার কেউ কেউ ফ্ল্যাশফিকশনকেও অণুগল্প বলেছেন, যদিও পশ্চিমের গবেষণার আলোকে শ্রেণি-বিভাজনের দিক থেকে তা ঠিক নয় বলে মনে হয়েছে। তবে Minimalism শব্দটা সাহিত্যসৃজনে গ্রহণযোগ্য। এর অর্থ হলো এমন এক গদ্যশৈলী নির্মাণ করা যা অণুগল্প ও ফ্ল্যাশফিকশন, দুটোতেই প্রভাব ফেলে। সমকালীন গল্প-উপন্যাসেও। শব্দ বা বাক্যের বাহুল্য কাটছাঁট করে গদ্যকে পরিশীলিত করার চলমান বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে আমাদের সাহিত্যে ব্যবহৃত ‘পরিমিত’ শব্দটার মিল আছে; বাহুল্য বর্জনের যে-কথা প্রচলিত আছে, তার সমার্থকই এই শব্দ। “ফ্ল্যাশফিকশন সম্প্রতি বিশ্বসাহিত্যের একটি পাঠকপ্রিয় শাখা হিসেবেও বিদ্বজ্জনদের নজর কেড়েছে।
“গত সাত আট বছর ধরে ব্রিটেনে ‘ফ্ল্যাশফিকশন ডে’ পালিত হয়ে আসছে। নিউজিল্যান্ডেও ‘জাতীয় ফ্ল্যাশগল্প দিবস’ পালিত হয়। ফ্ল্যাশ ও মাইক্রোফিকশনের জন্য বিশ্বব্যাপী আলোচিত মার্কিন লেখক লিডিয়া ডেভিস ২০১৩ সালে Man Booker International Prize পান তাঁর সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ। অন্যদিকে ছোটগল্পের পাশাপাশি ফ্ল্যাশফিকশন চর্চাকারী কথাসাহিত্যিক রবার্ট ওলেন বাটলার অর্জন করেন পুলিৎজার পুরস্কার।”
“বার্টলার ও ডেভিসের অনেক আগে ছোটগল্পের পাশাপাশি ফ্ল্যাশফিকশন লিখে বিখ্যাত হয়েছেন জাপানের প্রথম নোবেলজয়ী ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা। বিখ্যাত ফ্ল্যাশফিকশন লেখকদের মধ্যে রয়েছেন নীল গাইমান, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, মার্গারেট অ্যাটউড, কাফকা, আর্থার সি ক্লার্ক, নাগিব মাহফুজ, ডোনাল্ড বার্থলেম, অ্যাব্রুস বিয়ার্স, কেট শপ্যাঁ প্রমুখ। মার্কিন কথাসাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে প্রায় ৯০০ শব্দে ‘ক্যাট ইন দ্য রেইন’ ফ্ল্যাশফিকশনটি লেখেন। এটি ১৯২৫ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় তাঁর In Our Time গল্পসংগ্রহ গ্রন্থে।
‘চীনা সাহিত্যে ফ্ল্যাশফিকশনের শব্দসীমা ‘স্মোক লং’ হিসেবে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। একটা সিগারেট শেষ করতে যে সময় লাগবে, তার মাঝেই ক্ষুদে গল্প শেষ করতে হবে।
আধুনিক বাংলাসাহিত্যে ফ্ল্যাশফিকশনের ধারায় রবীন্দ্র-নজরুল-সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ-বনফুলসহ প্রতিষ্ঠিত অনেক গল্পকারই গল্প লিখেছেন। সম্প্রতি বাংলা ভাষায় অনেকেই ফ্ল্যাশফিকশন লিখছেন। পত্র-পত্রিকায় স্থানাভাবে যে সব অতি ছোট আকারের গল্প প্রকাশিত হচ্ছে, সেসবের অনেক গল্পই ফ্ল্যাশফিকশনের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।”
‘ফ্ল্যাশ’ ইংরেজি শব্দটির বাংলা হলো ঝলক আর ‘ঝলক’ মানে আলোকের বা বিদ্যুতের ক্ষণিকের দ্যুতি, দীপ্তি, অথবা কোনও কিছুর একটি সংক্ষিপ্ত বা আংশিক দৃশ্য বা আভাস। তাই প্রাবন্ধিক আবু সাঈদ কামালের ‘ফ্ল্যাশফিকশন’ শব্দটির অনুবাদ ‘ঝলকগল্প’ এবং উদ্ধৃতি যথার্থ বলে মনে করি। এই নিবন্ধে শব্দটি গ্রহণ করা হয়েছে।
সাহিত্যের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে বলা যায়, নানা ধারা, নানা মতবাদ, নানা বিষয়-আশয় এসেছে সৃজনশীল কথাশিল্পে। প্রত্যেক বিষয় নিয়েই তর্ক-বিতর্ক আছে, ভালো-মন্দের বিচারে কোনও ধারাই কেবল প্রশংসাধন্য বলা যায় না; সমালোচনারও ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু কোনও ধারাই উচ্ছেদ হয়ে যায়নি; আপন মহিমায় আলো ছড়াচ্ছে।
শব্দসংখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকলেও ঝলকগল্পে মূল দীপ্তিচ্ছটাই প্রধান বিবেচ্য বিষয় বলে মনে হয়েছে। ঝলকের মতো গল্পের আয়ু সংক্ষিপ্ত হতে পারে, কিন্তু প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। পাঠকের অনুভূতিতে যদি এক মুহূর্তের বিদ্যুৎ-স্পন্দনও জাগাতে পারে, তাহলেই ঝলকগল্প তার লক্ষ্য অর্জন করবে।
তিন
ফ্ল্যাশফিকশন ও মাইক্রোফিকশন
দুইয়ের পার্থক্য শব্দসংখ্যা দিয়ে কিছুটা বোঝা যায়, কিন্তু আসল পার্থক্য গল্পের গঠন, উদ্দেশ্য এবং অভিঘাতের ধরনে বা বৈশিষ্ট্যে লুকিয়ে আছে।
মাইক্রোফিকশন
মাইক্রোফিকশন বাংলায় অণুগল্প। মূল বৈশিষ্ট্য হলো এর অতি ছোট আকার। শব্দসংখ্যা ১০-৩০০। সবচেয়ে প্রচলিত হলো ৫০-১৫০ শব্দের অণুগল্প। তবে অণুগল্পের শব্দসংখ্যা ৩০ থেকে ১৫০ হওয়া উচিত বলেও মনে করেন অনেকে।
পশ্চিমের ধারায় ১০০ শব্দের নিচে, কখনও বা ৩০০। এটি পূর্ণাঙ্গ গল্প না-ও হতে পারে; বরং একটি ‘কোর আইডিয়া’ বা অভিজ্ঞতার স্ন্যাপশট। কখনও কখনও মাইক্রোফিকশনকে ‘ঘটনাহীন গল্প’ হিসেবেও ধরা হয়।
কাঠামোটাও গুরুত্বপূর্ণ। বিগিনিং বা শুরুর পর্ব, মিডল বা মধ্য অংশ, এন্ড বা শেষ না-ও থাকতে পারে। প্রায়ই কাট-শট, ইমেজ, চেতনার টুকরো, একটি স্ন্যাপশটই মূল বিষয়।
কোথায় পার্থক্য?
মাইক্রোফিকশন একটি ইমপ্রেশন তৈরি করে। রেফারেন্স হিসেবে তুলে ধরা যায় আর্নেস্ট হেমিংওয়ের নামে প্রচলিত ৬-শব্দের গল্পটি: ‘For sale: baby shoes, never worn.’ প্রকৃত অর্থে গল্পটির লেখকের নাম অজানা রয়ে গেছে। তবে মাইক্রোফিকশন হিসেবে গৃহীত হয়েছে। এখানে কোনও ঘটনার বিবরণ নেই, কিন্তু পাঠকের মনে চারপাশের শূন্যস্থান নিজেই বিস্তার লাভ করে। এটাই মাইক্রোফিকশন।
লিডিয়া ডেভিস (Lydia Davis) -এর মাইক্রো-স্টোরিগুলো প্রায়ই কয়েকটি বাক্যেই শেষ, যেখানে ঘটনা কম, ভাষার ঘনত্ব বেশি। মাইক্রোফিকশন মূলত literary minimalism-এর অংশ।
কোথায় সবচেয়ে বড় পার্থক্য?
ফ্ল্যাশফিকশন একটি গল্পের অভিজ্ঞতা দেয়। সংক্ষিপ্ত পরিসরে মনের মধ্যে ঝলক-অনুভূতি ছড়িয়ে দিতে সক্ষম।
স্টুয়ার্ট ডাইকসট্রা, ক্যারোলিন অ্যান্ডারসন ও ইটগার কারেটদের অনেক গল্প ফ্ল্যাশফিকশন ধাঁচের; দ্রুত, টাইট, মোচড়যুক্ত। ফ্ল্যাশফিকশন মূলত compressed storytelling -এর অংশ।
সবচেয়ে সহজ পার্থক্য কী?
মাইক্রোফিকশন কবিতার মতো ‘সংকেত’ কিংবা অনুভবে একটি ধারণার ‘চিহ্ন’ বসিয়ে দেয় আর ফ্ল্যাশফিকশন হলো গল্পের ক্ষুদ্র সংস্করণ। এখানে ঘটনা ঘটে। চরিত্র পরিবর্তিত হয়। প্রায়ই একটা অনাকাক্সিক্ষত, ব্যঙ্গাত্মক বা আবেগঘন টুইস্টে ঝলক দিয়ে শেষ হয়, যা পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এর মূল শক্তি হলো তীক্ষèতা ও সংক্ষিপ্ত বয়ান। এটি দ্রুত এমন এক আবহ তৈরি করে যেখানে পাঠক নিজে ফাঁকা জায়গাগুলো পূরণ করে নেয়।
ছোটগল্প
সংক্ষেপে বলা যায় ছোটগল্প তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত আকারের। এর কলেবর সাধারণত ১,০০০ থেকে ১০,০০০ শব্দ পর্যন্ত হতে পারে। এতে চরিত্রায়ণ, পরিবেশ নির্মাণ, সংঘাত, উত্তরণ এবং সমাপ্তি―গল্পের সব উপাদানই যথেষ্টভাবে বিকশিত হয়। ছোটগল্প একটি সম্পূর্ণ জগৎ তৈরি করতে পারে। চরিত্রের মনস্তত্ত্ব থেকে সামাজিক বাস্তবতা, সবকিছুই জায়গা পায়। ছোটগল্প হলো কথাসাহিত্যের সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত ও চর্চিত রূপ, যেখানে লেখকের শৈলী ও কাহিনির গভীরতা প্রকাশের সুযোগ বেশি।
এক ঝলকে তিন ফর্মের পার্থক্য কী?
মাইক্রোফিকশন হলো সবচেয়ে ক্ষুদ্র, একটা নিঃশ্বাস।
ফ্ল্যাশফিকশন সামান্য বিস্তৃত এক দ্রুত ঝলক।
ছোটগল্প পরিপূর্ণ, এক সম্পূর্ণ যাত্রা।
চার
বিতর্ক ও সিদ্ধান্ত : প্রসঙ্গ অণুগল্প, ফ্ল্যাশফিকশন ও মাইক্রোফিকশন
বাংলা সাহিত্য-আলোচনায় ‘অণুগল্প’ শব্দটি বহু বছর ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে; কিন্তু এর কোনও নির্দিষ্ট শব্দসংখ্যা বা কাঠামোগত সংজ্ঞা নেই বা নির্দিষ্ট হয়নি। কেউ বলেন ১০০ শব্দ, কেউ ৩০০, কেউ ৫০০, আবার কেউ ১০০০ শব্দ পর্যন্তকেও অণুগল্প মনে করেন। অর্থাৎ, এটি মূলত একটি umbrella word। এর ভেতরে বিভিন্ন মাত্রার সংক্ষিপ্ত গল্পকে জায়গা দেওয়া হয়।
অন্যদিকে Flash Fiction and Microfiction ―দুটিই আন্তর্জাতিকভাবে মান্য স্বতন্ত্র genre ‘জঁর’ বা ভিন্ন উচ্চারণে ‘জনরা’) হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
ইংরেজি বানান Genre-এর উচ্চারণ ঝঁ/ বা /ঝান-/-এর মতো। বিতর্ক থাকলেও বাংলায় ‘জঁর’ বলা ঠিক। এটাই প্রচলিত। জঁর মানে হলো একটি বিশেষ সাহিত্যিক বা শিল্পধারার ধরন, যার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, নিয়ম ও গঠন থাকে।
যেমন: উপন্যাস, গল্প, কবিতা, সায়েন্সফিকশন, ম্যাজিক রিয়ালিজম, ফ্ল্যাশফিকশন ইত্যাদি।
বাংলা ভাষার অনেক সাহিত্যিক ফ্ল্যাশফিকশনকে অণুগল্প হিসেবে অনুবাদ করেছেন। এটি ভাষাগত নমনীয়তা হিসেবে দেখা যায়; ভুল নয়।
কিন্তু জনরা বা জঁরগতভাবে অণুগল্প আর ফ্ল্যাশফিকশন একই, এ কথাটা সঠিক নয়। কারণ আমরা দেখেছি অণুগল্পের শব্দসীমা অস্পষ্ট, আর ফ্ল্যাশফিকশন সুসংজ্ঞায়িত, পশ্চিমা গবেষণায় স্বীকৃত। কিন্তু মাইক্রোফিকশনকে অণুগল্প বলা যায়। এটাই প্রচলিত বাংলা সাহিত্যে।
স্পষ্ট শ্রেণিবিন্যাস কীভাবে?
ফ্ল্যাশফিকশন: ঝলকগল্প (৫০০-১০০০ শব্দ)।
মাইক্রোফিকশন: অণুগল্প (১০০ শব্দের নিচে, কখনও বা ৩০০)।
বাংলায় সাহিত্যচর্চায় ‘অণুগল্প’ umbrella word (ছাতা-ধর্মী শব্দ) যার ভেতর উভয়টিই রয়েছে। কেউ আবার ফ্ল্যাশফিকশনের বিভাজন বাংলা সাহিত্যে বাড়তি ঝামেলার শ্রেণিবিন্যাস হিসেবে দেখে থাকেন। তাঁদের ধারণা এসব বিভাজন টিকবে না। উড়ে যাবে। তাঁরা জোর দিয়ে বলতে চান, ‘ফ্ল্যাশফিকশন’ আর অণুগল্প একই; সব ক্যাটাগরিই অণুগল্প। সাহিত্যে কোনও ব্যাকরণগত শর্ত নেই, আলাদা শ্রেণিকরণ করে বাড়তি ঝামেলার প্রয়োজন নেই বলেও তাঁরা জোরালোভাবে মনে করেন।
দেশের সাহিত্যচর্চা ধরলে তেমনটা ভাবা ভুল নয়। তবে যখন আমাদের কোনও লেখক বিশ্বসাহিত্য অঙ্গনে প্রবেশ করার চেষ্টা করবেন তখনই তাঁকে জেনেশুনে জনরা বা জঁরভুক্ত হয়েই অগ্রসর হওয়া সঠিক হবে, মনে করি।
পাঁচ
কীভাবে কমানো যায় সাহিত্য-অনুরাগীদের বিভ্রান্তি?
গায়ের জোর কিংবা চেয়ারের ক্ষমতাবলে কোনও কথা প্রচলন করা ঠিক নয় বলেই বিশ্বাস করি। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়াও যৌক্তিক বলে মনে করি।
আসুন প্রিয় বন্ধু, যুক্তির আলোকে উপরোক্ত আলোচনার ভেতর থেকে একটু অনুসন্ধান করে দেখি।
যুক্তি (০১): ‘অণুগল্প’ বাংলায় প্রচলিত শব্দ। কিন্তু বাংলায় অণুগল্পের কোনও নির্দিষ্ট শব্দসীমা নেই। ৩০০ থেকে ১০০০ শব্দ পর্যন্ত, ভিন্ন ভিন্ন মত আছে। তাই এটি জঁর নয়, umbrella term।
যুক্তি (০২): Flash Fiction আন্তর্জাতিকভাবে সংজ্ঞায়িত। ইউরোপ-আমেরিকার সাহিত্য-গবেষণায় Flash Fiction মানে ৫০০-১০০০ শব্দের structural short-short story।
যুক্তি (০৩): Microfiction সাধারণত ৬-১০০ শব্দের। এটি ফ্ল্যাশফিকশনের subset, সমার্থক নয়।
যুক্তি (০৪): বাংলা অনুবাদের সমস্যা―ভাষাগতভাবে ‘অণুগল্প’ শব্দটি ক্ষুদ্রগল্পের ধরন বোঝাতে সুবিধাজনক। এক শব্দ দিয়ে সব ক্যাটাগরিকে বোঝালে ঝামেলামুক্ত হওয়া যায় কিন্তু সাহিত্যতাত্ত্বিকভাবে ফ্ল্যাশফিকশন ও অণুগল্প এক জিনিস নয়।
যুক্তি (০৫): আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে পৃথকীকরণ দরকার। বাংলাভাষী তরুণ লেখকরা আন্তর্জাতিক anthologies-এ যে অংশ নিতে পারবে না, তা তো নয়।
Anthology বলতে বাংলায় বোঝায় সঙ্কলন, সংগ্রহ বা সাহিত্য-সঙ্কলন। বিভিন্ন লেখকের বা একই লেখকের নির্বাচিত কিছু লেখা (যেমন কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ) একত্র করে বই আকারে প্রকাশ করা হয়, সাধারণত একই বিষয় বা একটি নির্দিষ্ট থিম বা সাহিত্যরূপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক ফ্ল্যাশফিকশন কিংবা মাইক্রোফিকশন সংকলনে আমাদের লেখকদের অংশগ্রহণ করতে হলে নির্দিষ্ট থিম বা সাহিত্যরূপ মেনে চলতে হবে। বর্তমান কিংবা পরবর্তী প্রজন্ম contests- এ অংশ নেবে, আশাবাদী হতে দোষ কোথায়?
পুরনো ধারণার শ্রেণিবিন্যাস পাঠক-সম্পাদক-লেখক সবার জন্য বিভ্রান্তিকর। তবে যাঁরা পুরানো ধাঁচের অণুগল্প কিংবা এ বিষয়ে প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন, তাঁরা যে ভুল করেছেন, তা নয়।
পুরনোকে বরণ করে আমরা কি নতুন ধারার সঙ্গে তাল মেলাতে পারি না?
বিভ্রান্তির ধোঁয়াশা থেকে বেরিয়ে আসতে পারি না?
এই চাওয়া স্থায়ী হবে কি না জানি না, তবে বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারি, দোষ কী।
আমরা লক্ষ করি পৃথিবীতে কোনও কিছুই স্থায়ী নয়। সবকিছু বদলায়। তবে সবকিছু উচ্ছেদ হয়ে যায় না। একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে পারলে উত্তর-প্রজন্মের সাহিত্যিকেরা বিশ্বমানের সাহিত্যচর্চায় সুনির্দিষ্ট স্থায়ী পথ খুঁজে পাবে, বিশ্বাস করি। ভুল পথে থাকলে বিশ্বসাহিত্য অঙ্গনে তাঁরা অংশ নেওয়ার সুযোগই পাবে না, পেলেও মূল্যায়িত হবে না। এমন ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
যুক্তি (০৬): সমার্থক করলে জনরা বা জঁরের বৈশিষ্ট্য ঝাপসা হয়ে যায়।
আগেই বলেছি, ফ্ল্যাশফিকশন আলাদা ‘ক্ষুদ্র আর্ক’, আলাদা শব্দসংখ্যা ও আলাদা narrative demand রাখে।
‘বাঁকের কারণে ছোট ঘটনা বা উপলব্ধির ভেতর দিয়ে চরিত্র বা পরিস্থিতির সামান্য কিন্তু অর্থবহ পরিবর্তন ঘটে।’
যুক্তি (০৭) : এত সব কারণে বাংলা শব্দ এবং আন্তর্জাতিক জঁর, উভয়ের মিল করা উচিত।
ফ্ল্যাশফিকশন = ঝলকগল্প
মাইক্রোফিকশন = অণুগল্প
এতে বাংলা শব্দও থাকে, আন্তর্জাতিক স্বচ্ছতাও থাকে।
ছয়
তাহলে মূল সিদ্ধান্ত কী হতে পারে?
Flash Fiction = ৫০০-১০০০ শব্দ।
[ইউরোপ-আমেরিকার সাহিত্য গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত নির্দেশিকা।]Flash Fiction প্রন্তিক সীমা: ৩০০-৫০০ শব্দ।
[কিছু জার্নাল ও সম্পাদকীয় চর্চায় স্বীকৃত।]Microfiction = ৫০-৩০০ শব্দ (অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য <১০০ শব্দ)।
এই দুটোকে এক-ছাতার নিচে রেখে দেশীয় শব্দ ‘অণুগল্প’চর্চা চলমান আছে। কিন্তু এই ধারা আন্তর্জাতিকভাবে মান্য সংজ্ঞার আলোকে নয়।
কারণ বাংলা সাহিত্যচর্চায় ‘অণুগল্প’ শব্দটি বহু দশক ধরে ব্যবহৃত হলেও এর কোনও নির্ধারিত সংজ্ঞা বা শব্দসীমা স্থির হয়নি। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সাহিত্যতত্ত্বে সংক্ষিপ্তগল্পের এই ছোট ফর্মগুলো সুস্পষ্টভাবে বিভাজিত। Flash Fiction এবং Microfiction , দুটিই বিশ্বসাহিত্যে মান্য ও স্বতন্ত্র জঁর। এদের শব্দসীমা, গঠন, আখ্যানের প্রকৃতি এবং উদ্দেশ্য সবই নির্ধারিত।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বৈশিষ্ট্যময় জঁর বর্তমান কিংবা উত্তর-প্রজন্মের বাংলা সাহিত্যিকদের জন্য কি সুনির্দিষ্ট হতে পারে?
ধোঁয়াশা কাটাতে হলে বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রাঙ্গণের প্রবণতা কি আমরা মেনে চলব, নাকি নিজেদের ইচ্ছামতো সাহিত্যচর্চা করব?
এই প্রবণতা টিকবে না-ভেবে আন্তর্জাতিক পথ পরিহার করব?
এসব প্রশ্নের এখনই সমাধান হওয়া উচিত।
সাত
‘ফ্ল্যাশফিকশন পঁচিশ তারার ঝলক’ গ্রন্থে ২৫টি ঝলকগল্প লেখার চেষ্টা করেছি। শব্দসংখ্যা ৫০০-১০০০-এর মধ্যে রেখে পশ্চিমা ধারাটা বজায় রেখেছি। আমার মতে, এই নির্দিষ্ট রূপই গ্রহণ করা উচিত আমাদের।
মূল্যায়নের ভার প্রিয় পাঠক, আপনাদের ওপর। বোদ্ধাদের বিচারে গৃহীত হলে শ্রম সার্থক হয়েছে মনে করব।
উদাহরণ : মোহিত কামালের তিনটি ‘ঝলকগল্প’ পত্রস্থ হলো
কাফকার শব্দকুঠার
টেবিলের ওপর ঝুঁকে ঘাড় গুঁজে লিখছিলাম আমি। কলমের নিব কাগজের শরীর ছুঁয়ে শব্দ বানাচ্ছিল। কিন্তু শব্দগুলো যেন হাঁটছিল না, কেবল পড়ে থাকছিল। জানালার পাল্লা আধখোলা। বাইরে কোনও বাতাস নেই, তবু পর্দা কাঁপছিল। ঘরজুড়ে ছিল এক ধরনের ঘন নিস্তব্ধতা। তবে ঘড়ির টিকটিক, দূরের গাড়ির হর্ন, পাতা ওল্টোনোর শব্দ ছিল। কিন্তু গভীরতা ছিল না। তখনও আমি বুঝিনি, শব্দ আর গভীরতা এক জিনিস নয়।
হঠাৎ শুনলাম দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ হচ্ছে।
জোরে নয়, তাড়াহুড়োরও না, ঠিক এমন এক ছন্দে, যা লেখার ভেতর ঢুকে পড়ে ছন্দ ভেঙে দেয়। মনে হলো, এই শব্দটা আমার ভেতরেই কোথাও ছিল, শুধু বাইরে থেকে অনুমতি নিয়ে ঢুকল।
আমি কি দরজা লক করে রেখেছি? মনে জেগে ওঠা প্রশ্নটার কারণে মাথা ঘুরিয়ে দেখি হুক লাগানো।
হুকের ওপর আলো পড়ে একটা ক্ষুদ্র ছায়া তৈরি করেছে, যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে, আবার নেইও।
না-উঠেই জিজ্ঞেস করলাম,
‘কে?’
‘আমি কাফকা।’
কলমটা থেমে গেল।
‘কোন কাফকা?’
‘চেক লেখক―ফ্রানৎস কাফকা।’
নিজের ভেতরেই হাসলাম।
‘অসম্ভব। কাফকা ১৮৮৩ সালে জন্মেছেন, ১৯২৪ সালে মারা গেছেন।’
একটু থেমে সে বলল,
‘কে বলল আমি মারা গেছি?’
ঘরের আলো হঠাৎ যেন একটু ফিকে হয়ে এল।
বাতির নিচে টেবিলের ছায়া লম্বা হলো, আবার সঙ্কুচিত।
‘দরজা খোলো,’ কণ্ঠ বলল।
‘তুমি কীভাবে ওপারের পৃথিবী থেকে এলে? ভূত নাকি?’
‘ভূত নই,’ শান্ত, প্রায় নির্লিপ্ত কণ্ঠ।
‘আমি শব্দস্রোতে ভেসে থাকি। কখনও উজানে ফিরে আসি তোমাদের দ্বারে, কখনও ভাটিতে চলে যাই গভীর সাগরের দিকে। সেখানে পাঠক নেই, শুধু নীরবতা।’
‘তুমি কবিতার স্বরে কথা বলছো,’ আমি বললাম।
‘কারণ গদ্যও এক ধরনের কবিতাই,’ সে উত্তর দিল।
‘শুধু ছন্দটা লুকানো থাকে।’
‘মাথা তুলে সামনে তাকাও।’
আমি তাকালাম।
সে ছিল। আবার ছিল না।
আমার টেবিলের ওপর রাখা কাফকার ফ্ল্যাশফিকশন ও অণুগল্পের অনুবাদ বইগুলো অদ্ভুতভাবে ধুলোবালিমুক্ত হয়ে সাজানো। যেন কেউ দীর্ঘ সময় ধরে ওগুলো ছুঁয়ে গেছে। কোনও মানবমূর্তি নেই। চেয়ার খালি। বাতাসও স্থির।
‘দেখছো আমাকে,’ কণ্ঠ বলল।
‘হ্যাঁ,’ আমি ফিসফিস করলাম।
‘কিন্তু তুমি কোথায়?’
‘আমার শব্দ, অনুবাদে। একেবারে চোখের সামনে আছি।’
আমি উঠে দরজা খুললাম।
বাইরে কেউ নেই। করিডোরে বাতির আলো নিঃসঙ্গ। মনে হলো, দেয়ালগুলোও কান পেতে আছে।
‘কই তুমি?’
‘আমি তো তোমার টেবিলেই।’
‘সেখানে তো বই ছাড়া কিছু নেই। তোমার কোনও ছবিও না।’
‘আছে,’ সে বলল।
‘মলাট ওল্টাও। ছবি পাবে। কিন্তু ওই ছবির ভেতরে আমার কোনও প্রাণ নেই।’
আমি বইয়ের মলাট ওল্টালাম। কাফকার চেনা মুখ, গভীর চোখ, কঠিন নীরবতা। ছবিটা যেন তাকিয়ে আছে, কিন্তু দেখছে না।
‘তাহলে প্রাণ কোথায়? তুমি কীভাবে কথা বলছো? একবার দরজার বাইরে, আবার টেবিলের ভেতর থেকে?’
‘ওটাই আমার বৈশিষ্ট্য,’ কাফকা বলল।
“আমার প্রাণ লুকিয়ে আছে আমার সৃষ্ট শব্দের ভেতর। ওরা ‘আমি-হয়ে’ কথা বলে। লেখক মরে, কিন্তু শব্দ আত্মহত্যা করে না।”
আমি তাকিয়ে রইলাম বুকশেলফে রাখা কাফকার অনূদিত অণুগল্পের গ্রন্থটির দিকে।
মনে হলো, বইয়ের পাতাগুলো খুব ধীরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। প্রতিটা গল্প যেন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে ব্যস্ত।
‘এখন কেন জেগে উঠলে? আমার টেবিলেই বা কেন?’
‘কারণ তোমার লেখার মগ্নতায় ফাঁক আছে,’ সে বলল।
‘দরজার শব্দ তোমার মনোযোগ ভেঙেছে। মানে তুমি গভীরে ডুবে যাওনি। জীবনের উপরিভাগে ভেসে থাকলে ভেতরের তলে নামা যায় না। লেখালেখি আর পানিতে নামা এক জিনিস? পা ভিজিয়ে সমুদ্র বোঝা যায়?’
আমি নীরব রইলাম।
মনে পড়ল―কতবার শব্দ লিখেছি, শব্দ নিয়ে নাড়াচাড়া করেছি কিন্তু ভেতরে ঢুকিনি।
‘এই কথাটাই বলতে এসেছি,’ সে বলল।
‘কলমকে কুঠারে পরিণত করো। তোমার শব্দকুঠার মানুষের মগজে আঘাত করুক।’
‘নরম মগজ থেঁতলে যাবে,’ আমি বললাম।
‘আমি নিষ্ঠুর নই।’
‘এটা নিষ্ঠুরতা নয়,’ কাফকা বলল।
‘এটা প্রয়োজন। তোমার শব্দকুঠার থেকে ধারালো বই জন্ম নেবে। মানুষ যখন তা পড়বে, তাদের ভেতরে জমে থাকা নিষ্ঠুরতা আর হিংস্রতার জমাট বরফ ফাটতে শুরু করবে।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
‘তোমার শব্দকুঠার কি পেরেছে মানুষের হিংস্রতা কমাতে?’
দীর্ঘ নীরবতা।
এবার নীরবতাটা ভারী।
‘চুপ কেন?’
‘বিশ্বজুড়ে এত হিংস্রতা কেন এখনও?’
‘আমি দুঃখিত,’ সে ধীরে বলল।
‘আমার শব্দ পৃথিবীর হিংস্রতা কমাতে পারেনি। কিন্তু অনেক লেখককে জাগিয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ নোবেল পেয়েছেন। কেউ কেউ নিঃশব্দে পৃথিবীর মানচিত্র বদলে দিয়েছেন। আর কেউ কেউ শুধু একজন মানুষকে বদলাতে পেরেছেন, সেটাও কম নয়।’
‘সবার ব্যাপারে কি তুমি আশাবাদী?’
‘হ্যাঁ,’ সে বলল।
‘কারণ যারা এখনও লিখছে, তারা এখনও হাল ছাড়েনি। শব্দ যতদিন লেখা হচ্ছে, ততদিন মানুষ পুরোপুরি হারেনি।’
কণ্ঠ মিলিয়ে গেল।
রয়ে গেল শব্দ।
ঘরের নিঃশব্দতা এবার আর ফাঁপা লাগল না। ওটা পূর্ণ।
আমার কলম এখন আর আগের মতো নেই। মনে হচ্ছে এটা একটা কুঠার।
‘হ্যাঁ ঠিক মনে করেছো। এখন কুঠার চালাতে হবে, ধারালো শব্দ নির্মাণ করতে হবে। নতুন শব্দ দিয়ে পৃথিবীর মানুষের হিংস্রতা দূর করতে হবে’, দীপ্ত কণ্ঠে বলল কাফকা।
ফড়িং-জীবনের কাব্য
লন্ডনে বেড়ানোর দিনগুলোর স্মৃতিময় ছবিগুলো একে একে ফিরে আসছে ফেসবুক মেমোরিতে। সময় যেন পেছন থেকে কাঁধে হাত রেখে ডাকছে। ফোনের স্ক্রিনে ছবিগুলো ঝলমল করছে―হাসি, আলো, চলমান নদী, ছায়াঘেরা রাস্তা, ব্রিজের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা নিশ্চিন্ত মুখ। চোখের আলো উপেক্ষা করে মনের আলো দিয়ে তাকিয়ে রইলাম ওদের দিকে। এই দেখাটার মধ্যে কেবল দেখা নেই, আছে এক ধরনের দীর্ঘশ্বাস।
হঠাৎ মনে হলো ছবিগুলো কাঁপছে। খুব সূক্ষ্মভাবে, ঠিক যেমন পাতার ডগায় শিশির কাঁপে। ওদের চোখের পাপড়িও যেন নড়ে উঠল। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত একটা আন্দোলন। কিছু যেন বলতে চায়।
কী বলতে চায়?
নিজের মনে জেগে ওঠা প্রশ্নটা শুনে ফেলল প্রাণহীন ছবির গভীরে লুকিয়ে থাকা সজীব প্রাণ।
ধমক দিয়ে বলল, ‘সবকিছু কি মুখ ফুটে বলতে হয়? সব কথা বলা যায়?’
ধমক খেয়ে আমি চুপ হয়ে গেলাম। তবু চোখ ফেরাতে পারলাম না। আশ্চর্য, ধমকের মধ্য দিয়েও যে মুগ্ধতা ছড়িয়ে যেতে পারে, এই প্রথম টের পেলাম।
ছবিগুলো আবার বলতে শুরু করল―এবার একসঙ্গে, এক যোগে, যেন কোরাসের মতো, ‘না-বলা কথার ভেতরেও কথা থাকে। আনন্দময় অধ্যায় লুকিয়ে থাকতে পারে বুকের গহিনে। লুকানো আনন্দ খুঁজে নিতে হয়, অনুভব করতে হয়। অনুভবহীন মনের কোনও মূল্য আছে? মূল্যবান ঐশ্বর্যকে মূল্যহীন করে রেখেছো মস্তিষ্কে। নিজেকে অযোগ্য আর নিষ্ক্রিয় করে রেখেছো।’
প্রশ্নের পর প্রশ্ন। প্রশ্নবাণে আবারও আক্রান্ত হলাম।
প্রশ্নের ভেতর থেকে লুকানো তিরটা এসে আঘাত হানল মাথায়। কিন্তু অপমান আর অভিমানে আহত হলাম না। বরং অদ্ভুত এক প্রশান্তি পেলাম। সত্য উচ্চারণ বুক পেতে নিলাম। নিভৃতে অনুভব করতে লাগলাম পুরোনো স্মৃতি খুঁড়ে পাওয়া নতুন আনন্দময় ঐশ্বর্য―যেগুলো এতদিন উপেক্ষিত ছিল।
একটা ছবি এগিয়ে এল, টেমস নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা আমারই এক পুরানো আমি। কণ্ঠে প্রশংসার ছোঁয়া,
‘ভেরি গুড। সত্য মেনে নিয়েছো। নির্মম, নিষ্ঠুর কিংবা হিংস্র হলেও সত্যকে মেনে নেওয়া বড় গুণ। সেই গুণ পুরোপুরি অর্জন করতে না পারলেও পরীক্ষার প্রথম ধাপ উত্তীর্ণ হয়েছ।’
থেমে গিয়ে আবার বলল, ‘বাকি ধাপগুলো উতরে যেতে হলে কী করতে হবে জানো?’
মাথা নত করে তাকিয়ে রইলাম। উত্তর জানা নেই, কিংবা জানা থাকলেও স্বীকার করার সাহস নেই।
ছবিগুলোর ভেতর টগবগ করতে থাকা তারুণ্যময় প্রাণের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যেতে লাগল আমার প্রাণে। বুকের ভেতর কোথাও একটা উষ্ণতা জমতে শুরু করল।
এবার শান্ত অথচ গভীর কণ্ঠ শুনলাম, ‘মুখোমুখি হতে হবে। নির্মম সত্যের মুখোমুখি হতে হবে। পালিয়ে যাওয়া বা লুকিয়ে থাকার নাম জীবন নয়। মাথা উঁচিয়ে সামনে চলার নামই জীবন, জীবনকাব্য।’
ফোন নামিয়ে রাখলাম। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম।
দেখলাম ঘাসফড়িংয়ের দল মগ্ন আছে খাবার জোগাড়ে। ওদের ছোট ছোট লাফ, ব্যস্ততা, সতর্ক চোখ সবকিছুতেই একটা সরল আনন্দ। বেঁচে থাকার আনন্দ। এটা ওদের জীবনযাপনেরই অংশ, কোনও দর্শন ছাড়াই।
হঠাৎ পাশের আমগাছের ডালে বসে থাকা একটা চড়ুই পাখি উড়ে এসে চট করে একটা ঘাসফড়িং নিয়ে চলে গেল।
প্রচণ্ড একটা ঝাঁকি খেলাম।
এই দৃশ্যের মধ্যে কোনও ভূমিকা নেই, কোনও করুণা নেই, নেই কোনও নৈতিক ব্যাখ্যা। শুধু বাস্তবতা। মনের ভেতর তৎক্ষণাৎ নতুন প্রশ্ন মোচড় দিয়ে জেগে উঠল: এটাই কি নির্মম আর হিংস্র বাস্তবতা? আমরা প্রত্যেকেই কি প্রত্যেকের খাবার, এই প্রকৃতিতে? একজনের বেঁচে থাকা কি আরেকজনের হারিয়ে যাওয়ার বিনিময়েই সম্ভব?
ছবিগুলোর কথা আবার মনে পড়ল। সত্যের মুখোমুখি হওয়ার ডাক। হয়তো এটাই জীবনকাব্য। ফড়িংয়ের মতো ক্ষণস্থায়ী, চড়ুইয়ের মতো নির্মম, আবার মানুষের মতো প্রশ্নবিদ্ধ।
নিজের ভেতরেই উত্তর খুঁজতে থাকলাম: এটাই কি ফড়িং-জীবনের নতুন সংজ্ঞা? এটাই কি তার আসল কাব্য?
মুখোমুখি ব্ল্যাকহোল ও হোয়াইট হোল
মহাবিশ্বের গভীর অন্ধকারে আলোও নিজের অস্তিত্বের কথা ভুলে যায়। অথচ সেখানেই দুটি সত্তা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে।
একটা অন্ধকারে ভরা। অসীম, ভারী ও নিশ্চুপ।
সে-ই ব্ল্যাকহোল।
আরেকটি ঠিক তার বিপরীত; উজ্জ্বল, অথচ অদৃশ্য।
সে-ই হোয়াইট হোল।
ব্ল্যাকহোল গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘আমি প্রমাণিত। আমি গণিতে লেখা, টেলিস্কোপে ধরা। স্টিফেন হকিং আমাকে সমীকরণে বেঁধেছেন। আমার ইভেন্ট হরাইজন আছে, সিঙ্গুলারিটি আছে। আমার কেন্দ্রের এই ক্ষমতাধর বিন্দুর ঘনত্ব, মহাকর্ষ বা স্থান-কালের বক্রতা অসীম হয়ে যায়। আর তাই আমি বাস্তব।’
এক মুহূর্ত থেমে সে যোগ করল, ‘আর তুমি? তুমি শুধুই কল্পনা। তত্ত্বের ফাঁকফোকরে জন্ম নেওয়া এক ভূত।’
হোয়াইট হোল হাসল। হাসিটা আলোয় ভরা, কিন্তু তাচ্ছিল্যের নয়।
‘প্রমাণই কি সবকিছু? একসময় পরমাণুও কল্পনা ছিল।’
ব্ল্যাকহোলের গলায় অহংকার জমে উঠল। ভারী গলায় বলল, ‘আমাকে দেখো। নক্ষত্র গিলে খাই। আলো পর্যন্ত পালাতে পারে না। আমি মহাবিশ্বের সত্যিকারের ক্ষমতা।’
হোয়াইট হোল ধীরে উত্তর দিল, ‘ক্ষমতা মানেই গ্রাস করা নয়।’
‘তোমার কোনও অস্তিত্ব নেই। কোন বিজ্ঞানী তোমাকে দেখেছেন? কোন ডিটেক্টর তোমার ছায়া ধরেছে?’ তীক্ষè গলায় প্রশ্ন করল ব্ল্যাকহোল।
‘কার্লো রোভেল্লি’, হোয়াইট হোল শান্তভাবে জবাব দিল।
‘তাঁর তত্ত্ব পড়েছো ? লুপ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি? জানো ব্ল্যাকহোল, মানে তুমি, একদিন ভেতর থেকে ভেঙে পড়ে কী হয়ে উঠতে পারো, কী দশা হতে পারে তোমার, জানো?’
প্রশ্নের তীব্র ঝাঁকিতে ব্ল্যাকহোল চুপ হয়ে গেল। এক সময় নীরবতা ভেঙে বলল,‘তত্ত্ব মানেই সত্য নয়।’
হোয়াইট হোল কণ্ঠের জোর বেড়ে গেল, ‘আর সত্য মানেই চিরস্থায়ী নয়।’
সে আরও একধাপ এগিয়ে বলল, ‘তুমি হকিং রেডিয়েশন ছাড়ো। কিন্তু তা নিজেকে ধ্বংস করে না, শুধু ধীরে ধীরে ক্ষয় করে। তুমি কিছুই বাইরে দিতে পারো না। সবকিছুই গিলে ফেলো।’
‘এটাই আমার শক্তি’, ব্ল্যাকহোল বলল।
‘না, এটা শক্তি নয়, তোমার সীমাবদ্ধতা।’
‘থামো তোমরা।’
হঠাৎ দূর থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল। অন্ধকারের ভেতর থেকে আবির্ভূত হলেন এক মানুষ; চেয়ারে বসা, কিন্তু চিন্তায় দাঁড়িয়ে থাকা, স্টিফেন হকিং।
‘ব্ল্যাকহোল নিখুঁত কারাগার নয়।’
তিনি আরও যোগ করলেন,‘আমি দেখিয়েছি, কোয়ান্টাম প্রভাবের কারণে সে বিকিরণ করে। সে চিরস্থায়ী নয়।’
হোয়াইট হোল মাথা নাড়ল।
‘ঠিক তাই। ভেতরের কিছু না কিছু একদিন বেরোতেই হবে। প্রশ্ন হলো কীভাবে?’
আরেকটি কণ্ঠ ভেসে এল; তরুণ, উজ্জ্বল, কৌতূহলে ভরা। তিনি কার্লো রোভেল্লি।
‘আমরা এখনও হোয়াইট হোল দেখিনি। কিন্তু ব্ল্যাকহোলের ভেতরে সময় যদি উল্টোভাবে চলে, তবে একদিন তার ভেতরের সব তথ্য, সব আলো বিস্ফোরিত হয়ে বেরিয়ে আসতে পারে।’
ব্ল্যাকহোল গর্জে উঠে বলল,
‘তুমি কী বলতে চাও?’
‘একদিন তুমি উল্টে যাবে, নিজেই হোয়াইট হোল হয়ে উঠতে পারো।’ বললেন রোভেল্লি।
হঠাৎ নীরবতা নেমে এল। মহাবিশ্ব থমকে গেল।
হোয়াইট হোল ধীরে ধীরে বলল, ‘আমি অন্ধকার জগতের বিপরীত নই। আমি তার পরিণতি।’
‘আমি প্রমাণিত’, ব্ল্যাকহোল ফিসফিস করল, যেন নিজেকেই বোঝাচ্ছে।
হকিং বললেন, ‘প্রমাণ সময়ের ব্যাপার।’
রোভেল্লি যোগ করলেন, ‘আর সময় নিজেই একদিন উল্টে যেতে পারে।’
হঠাৎ মহাবিশ্বের গভীরে একটি ক্ষুদ্র আলোর কণা জন্ম নিল। কেউ জানে না, সেটা কোথা থেকে এসেছে। কোনও নক্ষত্র নয়, কোনও গ্যালাক্সি নয়। এটি এক নতুন আলো।
হোয়াইট হোল ফিসফিস করল,
‘একদিন এই আলোয় অসীম সৌরজগৎ আলোকিত হবে।’
ব্ল্যাকহোল তাকিয়ে রইল। তার দেহের অন্ধকারে প্রথমবারের মতো একটা ফাটল দেখা দিল।
সেই আলো যেন শুধু আলোক কণা নয়, স্মৃতি বহন করছে। হারিয়ে যাওয়া নক্ষত্রের, গ্রাস হয়ে যাওয়া সময়ের, মুছে যাওয়া সম্ভাবনার স্মৃতিচিহ্ন। মহাবিশ্ব প্রথমবার বুঝতে পারল, সব অন্ধকার আসলে শূন্য নয়, কিছু অন্ধকার ভবিষ্যৎকে জমিয়ে রাখে।
ফাটলের ভেতর থেকে ভেসে উঠল প্রশ্ন,‘যদি সবচেয়ে উজ্জ্বল বস্তুটি আসলে অন্ধকারের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে?’
মহাবিশ্ব কোনও উত্তর দিল না।
কিন্তু আলো বাড়তে লাগল, ছড়িয়ে যেতে লাগল চারপাশে, সৌরজগৎ জুড়ে।
হোয়াইট হোল ভাবতে লাগল, নিশ্চয়ই একদিন মানবগোষ্ঠীর মনের গুরুতর অন্ধকার জগৎ আলোময় হয়ে উঠবে ওরই নিজস্ব উজ্জ্বলতায়।
লেখক : কথাসাহিত্যিক, বাংলা একাডেমি ফেলো
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



