আর্কাইভপ্রবন্ধ

প্রবন্ধ : কবর কবিতার শতবর্ষ, জসীমউদ্দীনের মৃত্যুর পঞ্চাশ : মফিজ ইমাম মিলন

বাংলা কবিতার ঐতিহ্যবাহী ধারায় যে-কটি কবিতা যুগান্তকারী জনপ্রিয়তার উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত, ‘কবর’ কবিতাটি নিঃসন্দেহে তাদের মধ্যে অন্যতম। ১৯২৫ সালে প্রকাশিত এই কবিতাটি কেবল তৎকালীন পাঠকমনে আলোড়নই তোলে নাই, বরং এক শতাব্দী পেরিয়ে আসার পরেও এর আবেদন এতটুকু ম্লান হয়নি। এর পূর্বে ১৯২২ সালে রচিত নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কিংবা পরে ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’Ñকবিতার মতোই ‘কবর’ নিজস্ব এক কাব্যভুবনের দিগন্ত নির্মাণ করে।

তবে ‘কবর’-এর খ্যাতির নেপথ্যে ছিল এক মহৎপ্রাণ মনীষার সচেতন সহযোগিতা। তিনি দীনেশচন্দ্র সেন। ঊনবিংশ শতকের শেষ ভাগ থেকে বিশ শতকের সূচনায় বাংলা গদ্য ও সাহিত্যের যে গভীর ব্যঞ্জনা সৃষ্টি হয়েছিল, তার অন্যতম পথিকৃৎ তিনি। ‘কবর’ কবিতার প্রতি তাঁর সমর্থন ও প্রশংসা কেবল কবিতাটির গুণগ্রাহিতার স্বীকৃতিই ছিল না, ছিল এক যুগের সাহিত্যরুচিকে নতুন অভিমুখে পরিচালনার সাহসী প্রয়াস। এই সমর্থনই কবিতাটিকে পাঠকের চেতনায় প্রোথিত করতে এক অনিবার্য ভূমিকা পালন করে।

‘কবর’ একদিকে যেমন গ্রামীণ জীবনের অনুপম চিত্ররূপ, তেমনি অন্যদিকে বেদনা ও স্মৃতির এক কালোত্তীর্ণ অভিজ্ঞান। পল্লীকবি জসীম উদ্্দীন প্রমিত বাংলার সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষার যে অন্তরঙ্গ সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন, তাতে কবিতাটি হয়ে উঠেছে জীবনঘনিষ্ঠ, ভাষার সরলতা নয়, বরং সেই সরলতার মধ্যে নিহিত আবেগ, স্মৃতি ও লোকজ ভাবনার প্রাচুর্য কবিতাটিকে দিয়েছে এক আলাদা গাম্ভীর্য ও প্রভাবময়তা। এর প্রতিটি পঙ্ক্তি যেন এক একটি জাগ্রত শোকস্তবক, যার প্রতিধ্বনি পাঠকের হৃদয়ে চিরকালীন বেদনাবিধুর আবেশ সৃষ্টি করে।

‘কবর’ শুধু বিখ্যাত ও জনপ্রিয় কবিতাই নয়, অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী, সংবেদনাময় ও করুণ আর্তি মেশানো শোককবিতা। এই কবিতার বর্ণনা ও বিষয়বিন্যাস এতটাই সাবলীল ও অনায়াস ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে, যা কবিতাটিকে অনন্যসাধারণ করে তুলেছে। এক গ্রামীণ প্রবীণ ব্যক্তি তার এক  নাতিকে নিকটজনের মৃত্যুর বর্ণনা দিয়েছেন, যা পাঠান্তে পাঠকমাত্র অশ্রুসিক্ত হন। নিজের স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, পুত্রবধূ ও নাতনির মৃত্যুর ভেতর দিয়ে প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছে কবিতার। ১৯২৫ সালে রচিত কবিতাটি একই বছর প্রকাশিত হয় কল্লোল পত্রিকায়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় যে কবিতাটি ‘গ্রাম্য কবিতা’ নামে প্রকাশিত হয়। জসীম উদ্দীনের ক্ষেত্রে সেই অবহেলার ধারাটি কিন্তু এখনও বর্তমান আছে, তাঁকে ‘পল্লীকবি’ আখ্যায়িত করে খণ্ডিত করা হয়। এমন ধারার কবিতা যদি বিশ্বের অন্য কোনও ভাষায় লিখিত হতো, তাহলে তা বিশ্বজনীন হতে সময় লাগত না; এবং আজকের বিশ্বের ল্যাটিন কিংবা আফ্রিকান সাহিত্য কিংবা একদা ফরাসি কিংবা ইংরেজি সাহিত্যের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত। এই পোস্ট-কলোনিয়াল অত্যাচার-নিগ্রহের কালে, এই উত্তর-আধুনিক মনন বাস্তবতায় কিংবা অধুনাবাদী চিন্তাচেতনায় সমসাময়িক সমৃদ্ধ সাহিত্য মূলত স্বদেশীয় ঐতিহ্য-সংস্কৃতিনির্ভর, মৃত্তিকালগ্ন ও প্রথাহীন অভিযাত্রায় বিশেষায়িত। এদিক বিবেচনায় কবি জসীম উদ্দীন বাংলা ভাষার কবি হিসেবে, বাঙালির স্বকীয়তা ও বাংলাদেশের নৈসর্গিক বৈচিত্র্যের বাইরে তেমন একটা বিচরণ করেননি। যে কারণে তাঁর ‘কবর’ কবিতা থেকে নক্সী কাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট কিংবা যে কোনও কাহিনিকাব্য, লোককবিতা ও গানের সংগ্রহ এবং ভ্রমণ কাহিনি ও আত্মজৈবনিক রচনাগুলো নিঃসন্দেহে অধুনাবাদী সাহিত্যের মর্যাদা পায়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে উত্তর-আধুনিক তাত্ত্বিকগণ তাদের তত্ত্ব তালাশে যদি জসীমউদ্দীনের রচনাসাগরে অবগাহন করে দেখেন, তাহলে সেখান থেকে শূন্য হাতে ফিরে আসার কোনও সুযোগ নেই। পোস্টমডার্ন ভাবনায় যে মূল বা শেকড়ে ফেরার গল্প আমরা পাঠ করি, জসীমউদ্দীন তাঁর প্রতিটি কবিতায় সেই গল্পের মালা গেঁথেছেন।

মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত কবি জসীমউদ্দীনের ‘কবর’ কবিতাটি একটি দীর্ঘ কবিতা হলেও এটি পাঠ করতে পাঠকের ন্যূনতম পরিশ্রম করতে হয় না, গড়গড় করে পড়ে যেতে পারেন, এবং আরও পাঠের আগ্রহ তৈরি হতে থাকে। এর অন্যতম কারণ জসীম উদ্দীনের ছন্দ ও ভাষার ওপর দক্ষতা, অন্ত্যমিলের দুর্দান্ত সমন্বয়, বিষয়ের গভীরতা, ভাবনার স্পর্শকাতরতা, প্রকৃতির স্বভাববৈচিত্র্য দিয়ে অলঙ্করণ, সম্পর্কের নৈকট্যসহ কবির কাব্যপরিমিতিবোধ।

এ কবিতার আরও যে বিষয়টি আশ্চর্যান্বিত করে, তা হলো খুব সহজ ও আটপৌরে ভাষায় কঠিন সত্যটি উচ্চারণের ক্ষমতা। এ কবিতার অধিকাংশ জায়গায় ব্যাপারটি ঘটেছে। এমন দু-একটি জায়গা যেমনÑ

এই মোর হাতে কোদাল ধরিয়া কঠিন মাটির তলে,

গাড়িয়া দিয়াছি কত সোনামুখ নাওয়ায়ে চোখের জলে।

অথবা

এইখানে তোর বাপজি ঘুমায়ে, এইখানে তোর মা,

কাদছিস তুই? কী করিব দাদু! পরান যে মানে না।

এমন গভীর শোকার্ত উচ্চারণ কবিতার বিষয়-পরিণতি থেকে পাঠককে বিচ্ছিন্ন করতে ব্যর্থ হয়ে তাকে আরও মনোযোগী করে তোলে এবং কবিতার শেষ লাইনটি পর্যন্ত পাঠ না করে উপায় থাকে না। ‘কবর’ জসীমউদ্দীনের শ্রেষ্ঠ কবিতা, এতে সন্দেহ নেই। তবে তাঁর অন্যান্য কবিতা ও আখ্যানেও তিনি এমন নিপুণভাবে গ্রাম্য-সহজ-সরল বিষয়াবলিকে উপস্থাপন করেছেন, পাঠক একবার পাঠের আস্বাদ পেয়ে গেলে আর তা থেকে বিচ্যুত হতে পারেন না।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘১৪০০ সাল’ কবিতায় লিখেন, ‘আজি হতে শতবর্ষ পরে কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি কৌতূহল ভরে’। রবিঠাকুরের মতো এমন কোনও আকুতি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে না রাখলেও জসীমউদ্দীনের বিখ্যাত ‘কবর’ কবিতাটির মর্মস্পর্শী আবেদন শতবর্ষ পরে আজও বিশ্বের বাংলাভাষী মানুষের মানসপটে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে। বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী ‘কবর’ কবিতাটি অমরত্ব লাভ করে শতবর্ষ পরেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত ও প্রশংসা-ধন্য হয়ে উজ্জ্বল আলো বিকিরণ করে চলেছে।

‘কবর’ কবিতাটি কবি জসীমউদ্দীন বিরচিত বাংলা সাহিত্যের একটি বহুল পঠিত, চর্চিত কবিতা। কবিতাটি কবির রাখালী কাব্যের অন্তর্গত। ‘কবর’ কবিতাটি বাংলা সাহিত্যে কবি জসীমউদ্দীনের এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। অগণিত পাঠকের হৃদয়জয়ী এ কবিতাটি চলতি বছরে শতবর্ষে পদার্পণ করেছে।

কবিতার শুরুতে ‘এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম-গাছের তলে/তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।’ এবং শেষ দুই পঙ্ক্তিÑজোড়হাত দাদু মোনাজাত করি, আয় খোদা! রহমান/ভেস্ত নাজেল করিও সকল মৃত্যু-ব্যথিত প্রাণ’। একদিকে স্বজন হারানোর তীব্র মনোকষ্ট অন্যদিকে মৃত্যুপরবর্তী অনন্ত জীবনে আত্মার ঊর্ধ্বগামী উত্তরণের আকুতির কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা কবিতাটিকে করে তুলেছে প্রার্থনা সঙ্গীত।

কবিতাটির প্রতিটি ছত্র পাঠকের অনুভূতিকে নাড়া দিয়ে করুণ হৃদয়ার্তির মন ছোঁয়া রসায়নে যেভাবে দ্রবীভূত করে তা এক কথায় অসাধারণ।

উল্লেখ্য, বিএ ক্লাসের ছাত্রাবস্থায় জসীমউদ্দীন ১১৮ পঙ্ক্তির ‘কবর’ কবিতাটি রচনা করেন। কালজয়ী সৃষ্টি ‘কবর’ কবিতাটি জসীমউদ্দীনকে সামাজিক পরিচিতির দ্বার উন্মোচক কবিখ্যাতি এনে দেয়। অগণিত পাঠকের হৃদয়জয়ী এ কবিতাটি এ বছর জন্মের শতবর্ষে পদার্পণ করেছে। ১৯২৫ সালে ‘কবর’ কবিতাটি কল্লোল পত্রিকার তৃতীয় বর্ষের তৃতীয় সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়। কবিতাটি ড. দীনেশচন্দ্র সেন, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখের মনোযোগ আকর্ষণ করে।

দীনেশচন্দ্র সেন ‘অ্যান ইয়াং মোহামেডান পোয়েট’ প্রবন্ধ ফরওয়ার্ড পত্রিকায় প্রকাশ করে কবি ও কবিতাটি অভিনন্দিত করেন। তাঁর চেষ্টায় কবিতাটি নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়। ছাত্রাবস্থায় এমন দুর্লভ প্রাপ্তি তরুণ কবির জন্য এক অসামান্য প্রাপ্তি। ড. দীনেশচন্দ্র সেনের তত্ত্বাবধানে তরুণ কবি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য লোকগাথা সংগ্রহের কাজে যোগদান করে গ্রাম বাংলার আনাচে-কানাচে ঘুরে লোকগীতির পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক বাউল, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, জারি, সারি, লোকগান সংগ্রহ করে প্রবন্ধাকারে পত্রিকায় প্রকাশ করেন। এ সময় মুর্শিদি গানবিষয়ক প্রবন্ধ কল্লোল পত্রিকায় প্রকাশ করে কবি বিদগ্ধ মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ‘মোহামেডান কবি’ থেকে অচিরে হয়ে উঠেন গ্রামবাংলার মানুষের প্রিয়জন ‘পল্লীকবি’। তিনি আবহমান বাংলার লোকজ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে নগর সংস্কৃতির সাথে হ্যান্ডশেক করার সফল যোগ্য কারিগর হিসেবে পরিগণিত হয়ে পল্লীকবি অভিধায় চির-পরিচিতির স্থায়ী আসনে অভিষিক্ত হন।

উল্লেখ্য, কবির বাসভবনের সিঁড়ির পাশের ডালিম গাছের নিচে রয়েছে কাহিনীকার ‘বৃদ্ধ দাদু’ বর্ণিত শতাব্দীর সাড়া জাগানো জসীমউদ্দীনের কবরটি। স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ, নাতনি ও মেয়ে হারানোর গভীর বিয়োগ ব্যথায় শোকাচ্ছন্ন ‘দাদু’ কণ্ঠে স্বীয় জীবনের দুঃখ ভারাক্রান্ত মনের মর্মযাতনার যে করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে তা সকল স্বজনহারা মানবমনের চিরন্তন অবিভাজ্য চিত্র।

মৃত্যু মানবজীবনের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। বিশ্বের কবি, সাহিত্যিক, মরমি সাধক, দার্শনিক মৃত্যুকে কত না ভাবে চিত্রিত করেছেন। এত কিছুর মাঝেও জীবনের পরিণতি নিয়ে আমরা কজন পল্লীকবির বৃদ্ধ দাদুর মতো ভাবনা-তাড়িত হই? ‘কবর’ কবিতাটি হয়ে উঠেছে আপনজন হারানোর তীব্র মনোকষ্টজনিত অসহনীয় মানসিক অভিব্যক্তির কালজয়ী প্রকাশ।

কবি সফলভাবে স্বজনহারার শোকসন্তপ্ত হৃদয়ানুভূতি, মানব মনে অংকুরিত আত্মপোলব্ধি কীভাবে আত্মদর্শনে রূপান্তরিত হয়ে ধায় তার এক মর্মস্পর্শী চিত্র নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলে কবিতাটিকে করে তুলেছেন কালোত্তীর্ণ।

পবিত্র কোরআনুল করীমে মহান সৃষ্টিকর্তার অমোঘ ঘোষণা : ‘কুল্লু নাফসিন জায়েকাতুল মউত’ অর্থাৎ সকল ‘নফস’ মৃত্যুর অধীন। আমরা গোরস্থানের বিভিন্ন কবরগাত্রে এই বাক্যটির বহুল ব্যবহার দেখতে পাই। অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুকে নিয়ে সারা বিশ্বের কবি, সাহিত্যিক, মরমী সাধক, দার্শনিক, চিন্তাবিদ বিরামহীনভাবে রচনা করে চলেছেন অনুভূতি।

বাংলার যে লোককাহিনি ও গল্প বলার শৈলী সাহিত্যের সমৃদ্ধ অতীত ও ঐতিহ্যস্বরূপ, জসীম তা সফলভাবে ব্যবহার ও প্রয়োগ করেছেন ‘কবর’ কবিতায়। কাহিনি বর্ণনাকারী এক গ্রামীণ বৃদ্ধ দাদু। আর শ্রোতা হলো তদীয় নাতি। যে পাঁচজন স্বজন হারানোর ব্যথা বৃদ্ধ দাদু এক এক করে বর্ণনা করেছেন, তারা হলো : বৃদ্ধের স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ, নাতনি ও মেয়ে। এরা নাতির দাদি, পিতা, মাতা, বুজি ও ছোট ফুপু। মৃত্যুর কারণ ও অন্যান্য তথ্য কবিতায় বলা হলেও তা ছিল ঔপনিবেশিক নিপীড়িত বাংলার অবহেলিত কৃষক সমাজের ভাগ্যলিপি।  ব্রিটিশ বাংলার জমিদারশাসিত পূর্ববঙ্গ তথা আজকের বাংলাদেশের প্রান্তিক ও কোণঠাসা জনজীবনের ছাপও কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে সত্যনিষ্ঠ বর্ণনায়।

এক মর্মস্পর্শী বেদনায় ঋদ্ধ ‘কবর’ কবিতার শেষ অধ্যায় বাংলা সাহিত্যের ধ্রুপদীর আসনে অভিষিক্ত উচ্চাঙ্গের কাব্যকীর্তি ও প্রাঞ্জল প্রকাশভঙ্গির কারণে : ‘ওই দূর বনে সন্ধ্যা নামিছে ঘন আবীরের রাগে/অমনি করিয়া লুটায়ে পড়িতে বড় সাধ আজ জাগে/মজিদ হইতে আজান হাঁকিছে বড় সকরুণ সুরে/মোর জীবনের রোজকেয়ামত ভাবিতেছি কত দূরে/জোড়হাতে দাদু মোনাজাত করি, ‘আয় খোদা! রহমান/ভেস্ত নাজেল করিও সকল মৃত্যু-ব্যথিত-প্রাণ।’

‘কবর’ জসীমউদ্দীন বিরচিত বাংলা সাহিত্যের একটি বহুল পঠিত কবিতাই শুধু নয়, মানবিক সংবেদনশীলতার উচ্চতম উপমাও। বাঙালির প্রাণের আবেগ অতি নিবিড়ভাবে মিশে আছে এ শোক-প্রকাশক কবিতাটির পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে। এটি একটি ড্রামাটিক মনোলগ বা একাকী কথন। নাতিকে উদ্দেশ করে বৃদ্ধ দাদু তাঁর জীবনের সকল প্রিয়জনকে হারানোর আকুতি ক্রমে ক্রমে ব্যক্ত করেছেন। বৃদ্ধের কাছে মনে হয় জীবনের নির্মম পথ তিনি আর চলতে পারেন না। তিনি নাতিকে বলছেন : ‘ওই দূর বনে সন্ধ্যা নামিয়ে ঘন আবীরের রাগে/অমনি করিয়া লুটায়ে পড়িতে বড় সাধ আজ জাগে।’ মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত এ কবিতাতে সৃষ্ট হয়েছে বিষাদকরুণ সাঙ্কেতিকতা। ১৯৩০-এর দশকে যখন ইউরোপীয় আধুনিক কাব্যের আদলে বাংলা কাব্যে আধুনিক কবিতার সূত্রপাত হয় একই সময়ে জসীম উদ্দীন রচনা করেছিলেন ‘কবর’। এই কবিতারই শেষ লাইনে তিনি স্থাপন করেছেন মরমিবাদের এক আধ্যাত্মিক দৃষ্টান্ত, যা কাল-কালান্তরের পটভূমিতে কালজয়ী কবিদের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে : ‘জোড়হাতে দাদু মোনাজাত করি, ‘আয় খোদা! রহমান/ভেস্ত নাজেল করিও সকল মৃত্যুব্যথিত প্রাণ।’

‘কবর’ শুধু একটি কবিতা নয়Ñএটি বাঙালির মাটি, সংস্কৃতি ও ভালোবাসার প্রতীক। এর প্রতিটি চরণে ধ্বনিত হয় মানুষের প্রতি মানুষের মমতা, জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং মৃত্যুর অনিবার্যতা। জসীমউদ্দীন তাঁর সহজ, প্রাঞ্জল ভাষায় এমন এক বেদনাভরা সৌন্দর্য নির্মাণ করেছেন, যা পাঠককে কান্নায় ভাসায়, আবার একই সঙ্গে ভালোবাসার পবিত্রতায় ভরিয়ে দেয়। দাদু ও নাতির এই কথোপকথনের ভেতর দিয়ে কবি যেন জীবনের চূড়ান্ত সত্য শিখিয়েছেনÑমৃত্যু অনিবার্য, কিন্তু ভালোবাসা চিরন্তন। এভাবেই ‘কবর’ কবিতা হয়ে উঠেছে বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য শোকগাথা, যেখানে অশ্রু, স্মৃতি ও প্রেম মিলেমিশে সৃষ্টি করেছে এক অমর মানবিক কাব্য।

জসীমউদ্দীনের ‘কবর’ কবিতাটি বাংলার গ্রামীণ সমাজজীবনের এক মর্মস্পর্শী দলিল, যেখানে এক বৃদ্ধ তার প্রিয়জনদের হারানোর বেদনাকে কেন্দ্র করে জীবনের নিত্য বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। সমাজতাত্ত্বিকভাবে এই কবিতাটি কেবল একটি ব্যক্তির শোকগাথা নয়, বরং গ্রামীণ সমাজের আবেগ, সম্পর্ক ও জীবনের অনিবার্য পরিবর্তনের প্রতিফলন। কবিতায় ফুটে উঠেছে বাংলার মাটির মানুষদের সরল জীবন, যেখানে পরিবারই জীবনের কেন্দ্রবিন্দু, আর সেই পরিবার ভেঙে গেলে মানুষের মানসিক জগতে যে গভীর শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তা কবি অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে প্রকাশ করেছেন। বৃদ্ধের বর্ণনায় যে একাকিত্বের ছাপ পাওয়া যায়, তা কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং সমাজের এক বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতীক।

সময়ের প্রবাহে প্রিয়জনদের হারানো, সম্পর্কের অবসান এবং মৃত্যুর অনিবার্য উপস্থিতি গ্রামীণ সমাজে জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কবিতাটি সেই বাস্তবতাকে নিঃসংকোচে সামনে এনেছে। নাতির সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে নিজের জীবন, ভালোবাসা ও ক্ষতির ইতিহাস বর্ণনা করেন, যা সমাজে প্রবীণদের অবস্থান, তাদের স্মৃতিময় একাকিত্ব এবং প্রজন্মান্তরের দূরত্বের একটি সূক্ষ্ম চিত্র এঁকে দেয়। এভাবে কবিতাটি শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রকাশ নয়, বরং সমাজের পরিবর্তন ও মানসিক অবস্থার সমাজতাত্ত্বিক প্রতিফলনও বটে।

গ্রামীণ সমাজে শোক, মৃত্যু ও বিচ্ছেদ কেবল দুঃখের নয়, সামাজিক বন্ধনের অংশও। পরিবারে মৃত্যুর পরও জীবিতরা সেই স্মৃতিকে ধারণ করে রাখেন, যা সমাজে মানবিক সংযোগের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে। কবিতাটি পাঠকের হৃদয়ে গভীর আবেগ সৃষ্টি করে, কারণ এটি সাধারণ মানুষের জীবনের এমন এক দিককে প্রকাশ করে, যা সর্বজনীন ও চিরন্তন। জসীমউদ্দীন এই কবিতায় সমাজের নিম্নবিত্ত ও সাধারণ মানুষের জীবনের দুঃখ, ভালোবাসা এবং স্মৃতির অনন্ত প্রবাহকে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে, এটি সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

জসীমউদ্দীনের ‘কবর’ কবিতাটি বাংলার গ্রামীণ সমাজজীবনের গভীর ট্র্যাজেডি, মানবিক সম্পর্কের মর্মস্পর্শী চিত্র ও সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতার এক অনন্য শিল্পরূপ। এ কবিতায় কবি এক প্রবীণ বৃদ্ধের কণ্ঠে গ্রামীণ জীবনের মৃত্যু, দারিদ্র্য, ভালোবাসা, পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক নিঃসহায়তার চিত্র এঁকেছেন। কবিতাটি কেবল ব্যক্তিগত শোকগাথা নয়; এটি সমাজের প্রান্তিক মানুষের অস্তিত্বসংকটের সমাজতাত্ত্বিক জীবনধারার নিদর্শনও বটে।

কবিতার শুরুতেই দাদুর কণ্ঠে উঠে আসে এক কৃষক পরিবারের জীবনের মর্মস্পর্শী ইতিহাসÑ‘এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম-গাছের তলে, তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।’ এই পঙ্ক্তিতে যেমন ব্যক্তিগত শোকের গভীরতা আছে, তেমনি সমাজের এক সাধারণ কৃষকের সীমাহীন মমতা, অসহায়তা ও দীর্ঘদিনের বঞ্চিত জীবনের প্রতিফলনও আছে। গ্রামীণ মানুষদের কাছে কবর, মাটি, গাছÑএসব শুধু প্রকৃতি নয়, জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কবি এই সম্পর্ককে সমাজের শ্রেণিগত বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেছেনÑএখানে ধন-সম্পদ, শহুরে আরাম বা আধুনিকতার গন্ধ নেই; আছে কৃষকের মাটি, শ্রম ও মৃত্যু।

‘শাপলার হাটে তরমুজ বেচি দু’পয়সা করি দেড়ী, পুঁতির মালার একছড়া নিতে কখনও হত না দেরি।’Ñএই পঙ্ক্তিগুলো গ্রামীণ অর্থনৈতিক জীবনের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। ক্ষুদ্র আয়ের এই মানুষদের কাছে সামান্য পয়সাও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেটাই তাদের ভালোবাসা প্রকাশের একমাত্র উপায়। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এখানে আমরা দেখি কৃষকশ্রেণির অর্থনৈতিক অসাম্য ও শ্রমনির্ভর জীবনের তীব্র বাস্তবতা।

দাদুর জীবনের প্রতিটি মৃত্যু যেন সমাজের প্রান্তিক জীবনের প্রতীকÑএক এক করে প্রিয়জনেরা হারিয়ে যায়, আর প্রতিটি কবর যেন সমাজের অন্যায়ের, দারিদ্র্যের ও নিয়তির বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ। যেমন, ‘এইখানে তোর বাপজি ঘুমায়, এইখানে তোর মা, কাঁদছিস তুই? কী করিব দাদু! পরান যে মানে না।’ এখানে কেবল পরিবারের করুণ ইতিহাস নয়, বরং এক প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা দরিদ্র মানুষের জীবনসংগ্রামের চিত্র ফুটে ওঠে।

জসীমউদ্দীনের সমাজচেতনা এখানেই সবচেয়ে গভীরÑতিনি সমাজের নিচুতলার মানুষদের কণ্ঠ দিয়েছেন। এরা সেই সব মানুষ, যাদের জীবন রাষ্ট্র বা সমাজব্যবস্থার মূলধারায় অনুল্লিখিত থাকে। ‘গলাটি তাদের জড়ায়ে ধরিয়া কাঁদিত তোমার মা, চোখের জলের গহীন সায়রে ডুবায়ে সকল গাঁ।’Ñএই বর্ণনায় এক কৃষক পরিবারের শোক যেন গোটা সমাজের প্রতীক হয়ে ওঠে, যেখানে প্রকৃতি, মানুষ ও বেদনা একাকার।

কবিতায় দারিদ্র্য ও বঞ্চনার পাশাপাশি নারীর অবস্থানও এক গুরুত্বপূর্ণ সমাজতাত্ত্বিক দিক হিসেবে প্রতিভাত। বুজীর বিয়ের পরের বর্ণনায় দেখা যায়, নারীর প্রতি সমাজের নিষ্ঠুরতা ও পিতৃতান্ত্রিক শোষণÑ‘এত আদরের বুজীরে তাহারা ভালবাসিত না মোটে, হাতেতে যদিও না মারিত তারে শত যে মারিত ঠোঁটে।’ এখানে কবি এক গ্রামীণ নারীর দাম্পত্যজীবনের নিপীড়নের মাধ্যমে সমাজের নারীবিরোধী মনোভাব ও বৈষম্যকে নগ্নভাবে উন্মোচন করেছেন।

এ কবিতায় সমাজের ধর্মীয় অনুষঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ। মৃত্যুর পর দোয়া, ‘ভেস্ত নাজেল হয়’ প্রার্থনাÑএসব দেখায়, সমাজের মানুষ মৃত্যুকে যেমন নিয়তির অংশ হিসেবে মেনে নেয়, তেমনি তা থেকে মুক্তির আশাও রাখে ধর্মীয় বিশ্বাসে। সমাজতাত্ত্বিকভাবে এটি প্রমাণ করে, গ্রামীণ জীবনে ধর্ম কেবল আচার নয়, বরং বেঁচে থাকার মানসিক আশ্রয়।

শেষাংশে কবির মানবতাবাদী দৃষ্টি পরিপূর্ণতা পায়Ñ

‘জোড়হাত দাদু মোনাজাত কর, আয় খোদা! রহমান।

ভেস্ত নাজেল করিও সকল মৃত্যু-ব্যথিত প্রাণ।’

এ প্রার্থনা কেবল দাদুর নয়, গোটা দরিদ্র কৃষিজীবী সমাজের প্রার্থনা। কবির চোখে এ সমাজের প্রতিটি মানুষই এক একটি ব্যথিত প্রাণ, যারা মৃত্যুর মধ্য দিয়েই খুঁজে পেতে চায় মুক্তি ও শান্তি।

সব মিলিয়ে ‘কবর’ কেবল এক ব্যক্তিগত শোকগাথা নয়; এটি এক সমাজতাত্ত্বিক দলিল, যেখানে বাংলার কৃষকসমাজের অর্থনৈতিক বঞ্চনা, সামাজিক অনাচার, নারীর অবস্থান, ধর্মীয় বিশ্বাস ও মানবিক বন্ধনের প্রতিফলন ঘটেছে। জসীমউদ্দীন তাঁর লোকজ ভাষা, গ্রামীণ প্রতীক ও সহজ আবেগের ভেতর দিয়ে সমাজের প্রান্তিক মানুষদের জীবনের নৈরাশ্য ও মর্যাদাকে এমনভাবে ফুটিয়েছেন, যা তাকে কেবল ‘পল্লীকবি’ নয়, বরং এক গভীর মানবতাবাদী সমাজদ্রষ্টা কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

কবি জসীমউদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের এমনই একজন অসাধারণ প্রতিভাবান কবি, যিনি গ্রামীণ জীবনের কবি হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। তাঁর সাহিত্যকর্মে বাংলার মাটি, মানুষ, সংস্কৃতি, আবেগ এবং চিরায়ত গ্রামীণ জীবনধারার নিখুঁত ও হৃদয়স্পর্শী প্রতিফলন পাওয়া যায়। কবি জসীমউদ্দীনের কৃতিত্বের মধ্যে রয়েছে গ্রামীণ বাংলার জীবনের কাব্যিক প্রকাশ ঘটানো। জসীমউদ্দীন বাংলা কবিতায় গ্রামবাংলার ভাষা, সংস্কৃতি ও চিত্র এত গভীরভাবে ও মমতাপূর্ণভাবে তুলে ধরেছেন যে তাঁকে ‘পল্লীকবি’ বলা হয়। বৃহত্তর বাংলা সাহিত্যে আর কেউ এককভাবে এমন মর্যাদা ও বিশেষণ লাভ করতে পারেননি। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হলো : নক্সী কাঁথার মাঠ (১৯২৯), সোজন বাদিয়ার ঘাট (১৯৩৩)। তবে, তাঁর প্রতিটি রচনাই গ্রাম-বাংলার পটভূমিতে বাংলা ও বাঙালির বাস্তবতাকে ঘিরে রচিত।

সফলভাবে তিনি কৃষিবাংলার লোকজ সাহিত্যকে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে উত্তীর্ণ করেছেন। তিনিই প্রথমবারের মতো লোকসাহিত্য ও কাব্যকে আধুনিক কাব্যধারার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর কবিতায় লোকগান, পালাগান, ধাঁধা, প্রবাদ ইত্যাদির সংমিশ্রণ ছিল। তিনি বাংলা কবিতায় পল্লীজীবনের সৌন্দর্য, বেদনা, প্রেম, শ্রদ্ধা, ও মানবিকতাকে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন যে তাঁকে ‘পল্লীকবি’ উপাধিতে ভূষিত করা সার্থক হয়। তদুপরি, বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করার জন্য তাঁকে অনেক সম্মানে ভূষিত করা হয়।

কবি জসীমউদ্দীন ছিলেন বাংলা সাহিত্যের গ্রামীণ সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতিনিধি। তিনি কেবল একজন কবিই ছিলেন না, ছিলেন বাংলার আত্মার কণ্ঠস্বর। তাঁর কাব্যে যেমন রয়েছে পল্লীর সরলতা, তেমনি রয়েছে গভীর সামাজিক বার্তা ও মানবিক আবেদন। আর তাঁর ‘কবর’ কবিতা শতবর্ষেও অম্লান রচনা, যা মানুষের মর্মবেদনা ও সমাজের রূঢ় বাস্তবতাকে মূর্ত করেছে।

১৯৭৬-এর ১৪ মার্চ আমার দেখা ‘কবির কবর’

‘কবর’ যে শুধু শোকের প্রতীক কবিতা নয়, শোককে বুঝবার কবিতা, শোকের সান্ত্বনা খুঁজে ফিরবার নয়, শোক উপলব্ধি করার কবিতা সে কথা হৃদয় দিয়ে বুঝতে পারলাম ’৭৬-এর ১৪ মার্চ কবির নিজের মৃত্যু ঘিরে।

কবির মৃত্যুসংবাদ ইতিমধ্যে রেডিও-তে প্রচার করা হয়েছে। সকলের মুখে একটাই প্রশ্ন ছিল, ‘কবির মৃতদেহ ফরিদপুর আনবে তো?’ তামাম জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটলো যখন কবির লাশবাহী হেলিকপ্টার পুলিশ লাইনের ওপর দিয়ে চক্কর খেতে লাগল। স্কুল জীবনে শোনা শ্রী শ্রীশচন্দ্র ঘোষ স্যারের সেই আওয়াজ : ‘কবি এসেছে, কবি এসেছে’ প্রতিধ্বনি শুনতে পেলাম!

কবির প্রাণহীন হিমশীতল দেহ নামানো হলো গাড়ি থেকে গোবিন্দপুরের পৈতৃক বসতবাড়িতে। কবর খোঁড়া হয়েছে। শহরের বহু মানুষ হেঁটে রওনা দিয়েছে কবিকে শেষ-দেখা দেখতে। ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক তখন আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী, দাঁড়িয়ে আছেন কবিকে শেষশ্রদ্ধা জানানোর জন্য। কবির বড় জামাতা মওদুদ আহমেদ এসপি সাহেবকে খুঁজছিলেন কবিকে গার্ড অব অনার দেবার আয়োজন করা যায় কি-না। সে সময়ে টিএসআই পদবিধারী একজন এসে জানায় যে এ মুহূর্তে এসপি পোস্ট ফাঁকা রয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নগরকান্দায় ছিলেন, তিনি রওয়ানা হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কবির অনেক কবিতা রয়েছে, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে দীর্ঘ কবিতা লিখেছেন। ভাষা আন্দোলনে জড়িত ছিলেন, তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হোক এমন দাবিই তুলেছিলেন মওদুদ আহমেদ। শেষ পর্যন্ত কবিকে কবরে নামানো হলো। ইয়াছিন কলেজের অধ্যাপক এম এ সামাদ কবরে নামানোর দোয়া জোরেশোরে পড়তে শুরু করলেন চিরাচরিত স্বভাবে। কবিপরিবারের অনেকেই উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কাদের মোল্লা নামে একজন মাতব্বর কিসিমের লোক মিলাদ পড়ানোর ঘোষণা করলেন। মোল্লা বাড়ির মৃত জসীম-এর মিলাদ পড়ানোর কথা নিয়ে নানা গুঞ্জন শোনা গেল।

কবি জসীমউদ্দীনের কবর যেদিন দেওয়া হয় তখন কবরস্থান ছিল অনেক নিচু জায়গায়, উঠান সমান সমান। সেখানে আগেই কবরশয্যা পেতেছেন কবির পিতা আনছার উদদীন মোল্লা (২৬ নভেম্বর, ১৯৪৩), মা আমেনা খাতুন (রাঙা ছুটুবিবি) স্বামীর মৃত্যুর দশ বছর পরে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন (১৯৫৩)। কবির ছোট বোন নুরুন্নাহার সাজুর মৃত্যু হয়েছে ১৯৫০ সালের ১০ নভেম্বর। বড়ভাই মফিজ উদ্দিন আর ছোটভাই অধ্যাপক নুরউদ্দীন আহম্মদ এক বছর আগে-পরে মৃত্যুবরণ করেছেন, একজন ১৯৬৩ আরেকজন ১৯৬৪-তে। কবির মেজোভাই সাঈদ উদ্দিন আহম্মদ মারা গিয়েছেন কবির মৃত্যুর এক বছর আগে ১৯৭৫-এর ২৪ মার্চ রাতে। এদের সকলের কবর আগে থেকেই একই স্থানে পাশাপাশি দেওয়া ছিল।

কবির লেখা ‘কবর’ কবিতা আট লাইন মুখস্থ, শব্দার্থ লিখো অথবা ব্যাখ্যা লিখো এমন কতভাবেই না শৈশবে পাঠ্যপুস্তকে পড়েছি, পরীক্ষা দিয়েছি। সেই ‘কবর’ কবিতার লেখক কবিকে স্বচক্ষে কবর দেওয়া দেখে সমস্ত শরীরে শিহরণ লাগে। মেঘের ওপরে সুতীব্র নীল আকাশ, চারপাশে পরিব্যাপ্ত উত্তালতায় বাতাস বইছে। চোখ জুড়ানো মরাপদ্মা পাড়ে দাঁড়িয়ে হিলছে কাশবন―তারই মাঝখানে দাঁড়িয়ে কী অপূর্ব ঘোষণা অম্বিকাপুর কোনও এক মসজিদের ইমাম সাহেবের ‘আগামী রোজ শুক্রবার কবির মৃত্যু উপলক্ষ্যে কবর প্রাঙ্গণে মওলুদ শরীফের ব্যবস্থা থাকবে; আপনাদের শরীক হইবার নিমন্ত্রণ।’

জসীমউদ্দীন তাঁর নিমন্ত্রণ কবিতায় শহরবাসীকে গ্রামে যাবার নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আর সেদিন ইমাম সাহেব কবির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান ও দোয়া করার জন্য মুসুল্লিদের নিমন্ত্রণ জানান।

মনের ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠল, ফিরে চল বাড়ির পথে, আর নয় কবরের পাশে। একদিন তোমারও ঠাঁই হবে এমনি কবরের মাঝে।

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button