
ইউসুফ সাহেবের বয়স তখন কত ছিল, তা আজ আর মনে পড়ে না। এইটুকু তার মনে আছে, মা বলেছিলেন, সাত বছর বয়সে তার স্কুল শুরু হয়েছিল। ওই হিসাবে তার বয়স তখন ছয় বছর হওয়ার কথা। শুধু মনে পড়ে, সেদিন শীতের সকালে বিপুল সমুদ্রের হাওয়ার মতো একটা গানের সুরে তার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। মায়ের হাত ধরে আঙিনায় দাঁড়িয়ে নগ্ন পায়ে শরীর কাঁটা দেওয়া শীতের শিশিরভেজা ঘাসে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন তিনি সারিবদ্ধ হয়ে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের ধীর লয়ে হেঁটে যাওয়া।
‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…’
মা, ওরা কোথায় যায় ?
ওরা প্রভাতফেরি করে বাবা।
আপা কই ?
তোমার আপাও ওখানে আছে।
আমি যাই ?
না বাবা। এখন না। বড় হয়ে যেয়ো।
তার জেরিন আপু তখন ক্লাস সেভেনে পড়ত। মায়ের কথামতো বড় হয়ে যাওয়া আর হলো কই! সকাল নয়টার দিকে জেরিন বাড়িতে ঢুকতেই শিশু ইউসুফ জেরিনের হাত ছাড়লই না―
আপা, আমাকে প্রভাতফেরিতে নিয়ে চল।
প্রভাতফেরি তো শেষ রে ভাই!
ওই যে স্কুলে গান শোনা যায়।
হ্যাঁ, স্কুলে আজ সারা দিন অনুষ্ঠান হবে।
আমি যাব।
এই ‘আমি যাব’ কথাটার শক্তি মা টের পেয়ে ইউসুফকে শুধু নাশতাটুকু করিয়ে দিতে পেরেছিলেন। তারপর এক দৌড়। জেরিন দ্রুত হেঁটেও ছোট ভাইটার নাগাল ধরতে পারল না। ফুলে ফুলে সজ্জিত শহিদ মিনারের সামনে এসেই ইউসুফ স্থির দাঁড়িয়ে থাকে।
ওদিকে স্কুলের বড় হলরুমে চলছে একের পর এক দেশাত্মবোধক গানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এই শিশুর শ্রবণ ওদিকে থাকলেও তার চোখ ফুলে ফুলে সজ্জিত শহিদ মিনারে। মিনারের গায়ে লাল-সবুজে লেখা অ আ ক খ। মাঠের এক প্রান্তে উঁচু এক দণ্ডে উড়ছে পতাকা―নারকেলগাছে ঘেরা―সবুজের মাঝে লাল সূর্য।
একপর্যায়ে বেজে ওঠে ‘ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি আমার দেশের মাটি’। শিহরণ! শিহরণ! শিহরণ!
বাংলার শরীরে এই প্রথম আলিঙ্গন। সামনে শহিদ মিনার। অ আ ক খ। সময়ের স্নিগ্ধতা। বাংলার শক্তি। এই মাটির ‘আমি’। এই ঘাস নদী আলো বাতাসের ‘আমি’। এভাবে কতক্ষণ কেটে গেল খেয়াল নেই। জেরিন এসে বলল―
চল বাড়ি যাই। অনুষ্ঠান এখন বিরতি। বিকেলে আবার শুরু হবে।
অনুষ্ঠান শেষ! না, এই অনুষ্ঠান কখনও শেষ হওয়ার নয়। বাংলার ঘাসে গাছে নদীর ঢেউয়ে বহমান এই অনুষ্ঠান। বিপুল নীরবতার মাঝেও নিরন্তর এই সঙ্গীতের অনুরণন।
বাড়িতে আসার পথে এই ইউসুফ যেন অন্য কেউ। দু চোখে স্বপ্ন বাংলাময়। বাড়ির আঙিনায় বেলগাছটার তলে সে একটা শহিদ মিনার করবে। পাশে ওই উঁচু জামগাছটাতে উড়বে পতাকা। কয়েক দিনের মধ্যেই কাদামাটি দিয়ে তৈরি হয়ে গেল মিনার।
এই ছেলে দিনে দিনে বড় হয়। বোনের কাছে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস শোনে। মায়ের কাছে শোনে মুক্তিযুদ্ধের গল্প। আঙিনায় শহিদ মিনার, গাছে উড়ন্ত পাতাকা। পড়ার ঘরের জানালা দিয়ে ওই দৃশ্যের দিকে তার চেয়ে থাকা। যা পড়ে, তা-ই মনে থাকে, ভালো লাগে। সালাম ও বরকতের ছবি, বীরশ্রেষ্ঠদের ছবি, লাল-সবুজ পতাকা পেনসিলে আঁকা, সাজানো তার টেবিল, ঘরের দেয়াল। এসব দৃশ্য চোখের সামনে এনে জাতির হৃদয়গহিনে প্রচণ্ড শক্তি তার অনুভবে ধরা পড়ে।
একজন মানুষ যেমন বিপুল সংগ্রামের ভেতর দিয়ে বড় হয়, তেমনি একটা জাতিও এই সংগ্রামের ভেতর দিয়েই বড় হয়, বিকশিত হয়, বিশ্বের বুকে গৌরবে মাথা তুলে দাঁড়ায়। হৃদয়ে ভাষার বিকাশ। শুরু হয় তার বিশ্বের ইতিহাস পড়ার প্রবণতা। স্বাধীনতা কী এবং কেন, স্বাধীনতা নষ্ট হয় কখন, উপনিবেশের বিভিন্ন রূপ।
এভাবেই ইউসুফ একদিন এসএসসি পাস করে। মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করা রেজাল্টে শেষ হয় এইচএসসি। ততদিনে মিনারটি পাকা হয়। গ্রামের বাজার থেকে কেনা ছোট্ট পতাকাটি পরিবর্তন হয়ে এখন অনেক বড়। প্রতিটি জাতীয় দিবসে যথাযথ সম্মানে উড়ানো হয় পতাকা। জীবনের টানে ইউসুফ একদিন শহরে চলে আসে। চাচাতো ভাই মঈনকে শহিদ মিনার দেখভাল এবং যথাযথ নিয়মে পতাকা টাঙানোর দায়িত্ব দেয়।
মঈন মিনারটি দেখভাল করে আর দিবসগুলোয় পতাকা উড়ায়।
ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স শেষ করে একটা সরকারি হাইস্কুলে শিক্ষকতা শুরু করে ইউসুফ। শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকা অবস্থায় ইউসুফের ছেলে অপুর বয়স যখন ছয় আর ছোট মেয়ে নিপুর বয়স তিন বছর, ঠিক এমনই একদিন তার বাবা মারা যায়। স্বামীহারা মায়ের একান্ত অনুরোধ ছিল ইউসুফ যেন তার বাবার নামে একটা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে। মাদ্রাসার ছাত্ররা কোরআন পড়বে। এই সওয়াব কবরে রুহানিরা পাবে। ফলে এই বাড়ির কবরবাসী সব মুরব্বির গোর আজাব আল্লাহ মাফ করবেন।
ইউসুফের স্ত্রী আনিতা এ বিষয়ে নীরব। দুই ছেলে-মেয়েকে ভালোভাবে পড়াশোনা করাতে গেলে খরচ অনেক। এখন এই মাদ্রাসা টানতে গেলে সংসারের ওপর আরেকটা অতিরিক্ত চাপ এসে পড়বে। ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সবচেয়ে বড় কথা, গ্রামের বাড়িতে দু হাত ভরে খরচ করায় সাময়িক আনন্দ আছে হয়তো, তবে ওই খরচের কোনও পজিটিভ আউটকাম নেই। ধর্মের নামে কখনও ব্যবসার মূলধন, কখনও-বা চিকিৎসার খরচ, মেয়ের বিয়ে, ছেলের বিদেশ, এই বিপদ, ওই বিপদ। নাকেমুখে মিথ্যা বলা মানুষগুলো পারে শুধু শহরে স্ট্রাগল করা আত্মীয়স্বজনের জীবন অতিষ্ঠ করতে। কাজের কাজ কিছুই হয় না। ওরা যেমন তেমনই থাকে, কোনও পরিবর্তনের ছোঁয়া তাদের জীবনে লাগে না।
মায়ের সেই একই অনুরোধ। এদিকে ইউসুফ এ বিষয়ে ভেবে কোনও কূলকিনারা পায় না। মাদ্রাসা করলেই তো হবে না, বিশাল খরচের ব্যাপার। কে করবে পরিচালনা, কোত্থেকে আসবে এত টাকা ? জীবনভর সৌন্দর্যপিয়াসী আত্মমগ্ন নির্ঝঞ্চাাট ইউসুফ এ বিষয়ে ভাবতেই যেন ভয় পাচ্ছে। মহল্লার ইমাম সাহেবের সাথে পরামর্শ করলে তিনি সোজা কথায় জবাব দিলেন, ‘জি, মাদ্রাসা দিবেন, আল্লাহ কবুল করুক। চলানোর মালিক তো আল্লাহ।’
ইউসুফের সভাপতিত্বে তাদের বাড়ি থেকে প্রায় দুই শ মিটার দূরে পারিবারিক গোরস্থানের পাশের শাকসবজি চাষের জমিটাতে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। ইমাম সাহেব ঠিকই বলেছিলেন। আর্থিক টানাপোড়েন ক্রমেই কমে আসে। এলাকার ধর্মপ্রাণ লোকজনের পাশাপাশি প্রবাসীরা প্রচুর দান করে। প্রথমে অল্প কয়েকজন ছাত্র নিয়ে শুরু। তারপর ছাত্রীরাও ভর্তি হতে শুরু করে। প্রথম দিকে ইউসুফকে মাদ্রাসা দেখভাল করতে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই গ্রামের বাড়ি আসতে হতো। ছয় মাসের মধ্যেই নির্ভর করার মতো একজন হুজুর পাওয়া গেল। ক্রমেই হেফজখানার পাশাপাশি কিতাব বিভাগও চালু হয়। এভাবেই মাদ্রাসা চলছে। মাদ্রাসার কাজে মঈন সময় দেয়। এদিকে ইউসুফেরও সমাজে মূল্যায়ন বেড়ে যায়, বেড়ে যায় সামাজিক পরিচিতি। বর্তমানে তাকে বিভিন্ন সভা-মজলিসে, ওয়াজ মাহফিলে সভাপতি, কখনও-বা বিশেষ অতিথি হিসেবে ডাকা হয়। যখন সুবিধা হয় যোগ দেন, সুযোগ করতে না পারলে সবিনয়ে ক্ষমা চেয়ে নেন।
অন্যদিকে আঙিনায় তার সেই শৈশবের স্মৃতিময় মিনারটি অযত্ন-অবহেলায় পড়ে রয়েছে। আস্তরণ খসে শ্যাওলা পড়ে অক্ষরগুলো আর দেখা যায় না। বাড়িঘর ঝাড়ু দেওয়া ময়লা-আবর্জনার স্তূপে মিনারটি এখনও কোনও রকম টিকে আছে। এদিকে পতাকাটা রান্নাঘরে লাকড়ির স্তূপের পাশে ছাই-ময়লায় মুখ থুবড়ে পড়ে জীবনীশক্তি হারিয়েছে বহু আগেই। ইউসুফের হৃদয়ে নিবু নিবু হয়ে জ্বলে থাকা শৈশবের স্মৃতিটুকু ব্যস্ততার চাপে এখন আর দেখাই যায় না। প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে তার মনে পড়ে, আহা আমার শহিদ মিনার! আজ আপা নেই। সেই কুয়াশার তরঙ্গে ভেসে আসা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…’
মনে মনে বলেন, আচ্ছা ঠিক আছে। এবার বাড়ি গিয়ে মঈনকে নিয়ে আমি নিজেই পরিষ্কার করব মিনারটি। একটা রাজমিস্ত্রি ডাকলেই সংস্কার করে দেবে। কতক্ষণ আর লাগবে! আর এই মঈন গাধাটা কী যে করে বুঝি না। বউ-সন্তান নিয়ে আমাদের বাড়িতে থাকিস অথচ বাড়ির মেয়েরা যে এভাবে ছাই-অবর্জনা ফেলে শহিদ মিনারের বেহাল অবস্থা করে রেখেছে, এই বোধটুকু পর্যন্ত নেই।
শীঘ্রই একদিন সংস্কার করে উজ্জ্বল করা হবে শহিদ মিনারটি। মৃদু আলোর মতো হলেও ইচ্ছাটা ইউসুফের হৃদয়ে আছে। এই তো একটা পতাকা আর কত টাকা! স্টেডিয়ামের মোড়ে পতাকা ফেরিওয়ালার অভাব নেই, রাস্তাঘাটে কত দেখা যায়! একটা পতাকা নিয়ে সামনের মাসেই বাড়ি যাব।
অবশেষে তাই হলো। যথাসময়ে কাজটি সমাধা করে ইউসুফের খুব ভালো লাগল। মনের আনন্দে বাড়ির আঙিনায় পতাকা উড়িয়ে তিনি সাথে করে নিয়ে যাওয়া একটা ফুলের তোড়া মিনারের পাদদেশে রাখলেন। এরপর অশ্রুজলে পরলোকগত বাবা আর জেরিন আপাকে স্মরণ করে বাবার হাতে লাগানো বেলগাছটির তলে বিছুক্ষণ বসে রইলেন। মনে মনে স্থির করলেন, আগামী ভাষা দিবসটি তিনি আনিতা, অপু আর নিপুকে নিয়ে বাড়িতে তার এই শৈশবের স্মৃতির ভেতর উদ্যাপন করবেন। এখন তো আর স্কুলে আগের মতো করে একুশের অনুষ্ঠান হয় না। না হোক। আমরা আমাদের মতো একুশকে স্মরণ করব। আসন্ন একুশ আরও বেশ কয়েক মাস দেরি। এ নিয়ে তিনি বাসায় গল্প করেন।
জুলাই ২০২৪। হঠাৎ করেই একদিন বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার পর ইউসুফের ক্লাস এইটে পড়ুয়া মেয়ে নিপু কান্নাজড়ানো গলায় বলল―
বাবা, মাদ্রাসার ছাত্র আর এলাকার লোকজন মিলে আমাদের শহিদ মিনারটা ভেঙে ফেলছে।
ইউসুফ সাথে সাথে মাদ্রাসার বড় হুজুরকে কল দেন―
হুজুর, আমার বাড়ির আঙিনার শহিদ মিনারটা আপনারা ভাঙছেন ?
আরে সভাপতি সাব, আপনার বাড়ির আঙিনায় এই শিরিকি কারবার, আমি তো জানতাম না।
ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্স করলাম, আর আপনি আমার সাথে দেন ফতোয়া! আমার এত সাধের শহিদ মিনার আপনাদের কাছে শিরিকি!
আত্মীয়ের অধিক এই মসজিদের ইমাম আর মাদ্রাসার হুজুর। দিনরাত কত পরিশ্রম, উৎকণ্ঠা আর ব্যয় হলো এ জীবনের কতটা সময়! নিজের জীবনে শখ, স্ত্রী-সন্তানের সাধ―সবকিছু সংকুচিত করে কত সহযোগিতা, কত সৌহার্দ্য! এই তার ফল ? আজ তারা এ কী রূপ দেখাল আমায়!
মুঠোফোনটা ফ্লোরে আছাড় মেরে ইউসুফ চিৎকার দিয়ে বললেন, ‘আমার বিরাট বড় ভুল হয়ে গেছে রে মা, সর্বনাশ হয়ে গেছে!’
সচিত্রকরণ : রজত



