
গোল্ডেন গেট’ স্কুলের চার তলার নবম শ্রেণিকক্ষের দরজায় প্রবেশের আগেই ছাত্রদের অঙ্ক শিক্ষাদানরত তরুণ শিক্ষক শোয়েব তাসনুভাকে থামালেন। তার ক্লাসে কেউ দেরি করতে পারে―তা সে ভাবতেই পারে না। ইউটিউবে ‘দশ মিনিটে অঙ্ক শেখা’ চ্যানেল তৈরি করে সে সারা দেশে পরিচিতি পেয়েছে। সেটা নিয়ে আবার বইমেলায় একটা বই প্রকাশ করার পর তার অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য হাজার হাজার অটোগ্রাফ-প্রত্যাশী ছাত্র-ছাত্রী বইমেলার স্টল প্রায় ভেঙেই ফেলেছিল।
তার জনপ্রিয়তা এমন যে, ক্লাসে অঙ্কে মনোযোগের বদলে স্টুডেন্টরা ক্লাস শেষে কীভাবে একটা ছবি তুলে তা ফেসবুকে পোস্ট করে নিজেকেও সেলিব্রেটি করে তুলবে―সেই চিন্তায় মগ্ন থাকে। অথচ এই মেয়েটা তার ক্লাসে লেট! তার সেলিব্রেটি ইমেজ ধাক্কা খেল। সে চরম বিরক্ত কণ্ঠে বলল,
বেয়াদব মেয়ে, প্রতিদিন ক্লাসে লেট করে আসো। এতদিন কলেজে পড়ার কথা, চার চারটা ট্রেন মিস করে আদুভাইয়ের মতো জুনিয়রদের সাথে এবারও তুমি ক্লাস নাই…
যে মেয়েটা এক সময় ক্লাসে প্রথম হতো, তাকে এভাবে হেনস্থা হতে দেখে শ্রেণিকক্ষের ভেতর হাসির রোল উঠল। দরজায় দাঁড়িয়ে সহপাঠীদের খিল খিল হাসির শব্দ তাসনুভার স্নায়ুতন্ত্রে কেমন কাঁপন তুলল। ঠোঁটের ফাঁকে তাদের দাঁতগুলোকে নেকড়ের দাঁত বলে তাঁর ভুল হতে থাকল। মেরুদণ্ড বয়ে ঘামের সূক্ষ্ম রেখা তাসনুভার জামার পেছনটুকু ভিজিয়ে তুলল। তার কপালে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ফেব্রুয়ারির শীতেও মেয়েটা ওভাবে ঘামছে কেন―তা ঠিক শোয়েবের বোধগম্য হলো না। শ্রেণিকক্ষের ছাত্র-ছাত্রীদের হাসির রোল ক্রমশ বাতাসে মিলিয়ে গেল। তাসনুভার মনে হলো, বাইরে প্রবল বেগে ছুটে আসা একটা পিক আপ যেন ব্রেক কষেও পিছলে গেল। পিক আপটার বনেট কাভারে একটা বৃত্তাকার নকশা। নকশার মাঝখানে উভয় দিকে ‘ধানের শীষ’ দিয়ে মোড়ানো ‘জাতীয় স্মৃতিসৌধে’র মাথায় বাংলাদেশের জাতীয় ফুল ‘শাপলা’ আঁকানো। এর সবুজ জমিনে সূর্যোদয়ের ‘লালিমা’। স্মৃতিসৌধের নিচে লাল সবুজের দেশটির অগ্রগতির প্রতীক একটি ধাতব ‘চাকা’।
তাসনুভার চোখের সামনে এই মনোগ্রামটা ভেসে উঠতেই তার স্নায়ুতন্ত্রে যেন হাজার টনের বজ্রপাত হলো। সূর্যোদয়ের লালিমাকে থেঁতলে যাওয়া কোনও মানুষের রক্তপ্লাবন, স্মৃতিসৌধকে একটা বন্দিশালা, ধানের শীষগুলোকে এক একটা বিষধর গোখরার ফণা, আর ধাতব চাকাটাকে ট্রেনের অথবা ট্রাকের চাকা বলে মনে হলো।
তাসনুভার মনে হলো পিক আপটা গতি নিয়ন্ত্রণ না করতে পেরে জীবন্ত কোনও মানুষের শরীর থেঁতলে দিয়ে গেল। থেঁতলে যাওয়া শরীরের মানুষের কণ্ঠস্বর তাসনুভা স্পষ্টই শুনল,
তা… স… নু… ভা। মা… আ… আ… আ…। বাড়ি যাও, বাড়ি যাও মা… আ… আ…
আকুল হয়ে ডাকা ‘মা’ শব্দটার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি ভেঙে ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে বাতাসে উড়ে উড়ে, ভেসে ভেসে হারাতে হারাতে আবার কোথাও ধাক্কা খেল। কোথায় ?
তাসনুভার পায়ের নিচ থেকে মেঝেটা যেন সরে যাচ্ছে। শরীরের ওজন ধরে রাখতে দুই বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে সে প্রাণপণ চেষ্টায় টাইলস করা মেঝে আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইল। তার সামনের ধোঁয়াশাময় জগৎটা দুলছে তো দুলছেই। তার মগজের মধ্যে কে যেন চাকু চালিয়ে দিয়েছে। তার যন্ত্রণার চেয়ে নিচে পড়ে যাওয়ার অনুভূতি তাকে আরও বিপন্নবোধে আক্রান্ত করছে। পায়ের দুই বৃদ্ধাঙ্গুলিতে সেই পিক আপটার সমান ওজনে চাপ দিল যেন সে পড়ে না যায়। অঙ্কের শিক্ষক শোয়েব বললেন,
কী হলো ? মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছো কেন ? ভেতর এসো ? বলে তিনি শ্রেণিকক্ষের ছাত্রদের দিকে ঘুরে বললেন,
মূর্তির শরীরও ঘামে―কী অদ্ভুত কাণ্ড!
শোয়েব ভেবেছিল, তার ব্যঙ্গাত্মক কথায় মেয়েটাকে নিয়ে সবাই আবার হাসাহাসি করবে এবং এভাবে একটু অপদস্থ করলে এরপর থেকে সে সময়মতো ক্লাসে আসবে। কিন্তু তার এ কথায় শ্রেণিকক্ষে ছাত্র-ছাত্রীদের কারও এবার কোনও প্রতিক্রিয়া হলো না। সে ভেবেছিল, জনপ্রিয়তা একটা বিরাট শক্তি। তা দিয়ে সমাজকে শাসানো যায়। কিন্তু তার কথার বিরুদ্ধে যেন সবাই চলে গেছে। ছাত্র-ছাত্রীরা হঠাৎই কেন তার ভূমিকাটুকু গ্রহণ করল না, কেন তারা তাসনুভাকে নিয়ে বিদ্রƒপের হাসি হাসি হাসল না―তা নিয়ে সে বিরক্ত হয়ে উঠল। তার পক্ষে থাকা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আর ইউটিউবের শক্তিটুকু যেন হাওয়ায় ফানুসের মতো উড়ে গেছে ভেবে সে ভেতরে ভেতরে স্টুডেন্টদের প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল।
শিক্ষকের ক্লাসে প্রবেশের নির্দেশ তাসনুভার কানে দূর থেকে ভেসে ভেসে আসা এক একটা অক্ষর হয়ে ধীরে ধীরে জোড়া লাগল। কিন্তু হঠাৎই তার মনে হলো, শ্রেণিকক্ষের ভেতর মৃত সব ছাত্র-ছাত্রীরা বসে আছে। ফ্যানের বাতাসে তাদের মমিমূর্তির মাথার চুলগুলো কেন কাঁপছে―তাসনুভা তা বুঝতে পারল না। মৃত কিশোর-কিশোরীরা শোয়েব স্যারের কাছে কেন অঙ্ক শিখতে এসেছে ? আর অঙ্কের এই স্যার কী অঙ্ক শেখাবে ?
যে রাষ্ট্রে জীবন বাঁচে না সেই রাষ্ট্রে এই বোকা শিক্ষক কেন জীবনের স্বপ্ন দেখার জন্য একটা কড়াইতে দশটা ডিম কত মিনিটে সেদ্ধ করা যায়―এসব ফালতু অঙ্কের ক্লাস নেয় ? সে প্রাণপণ চেষ্টায় পায়ের দুই বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে পায়ের নিচ থেকে সরে যাওয়া মেঝেতে তার আটান্ন কেজি ওজনের শরীরকে ধরে রাখতে দুই বিন্দুর উপর সব ভর এবং চাপ দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করতেই থাকে।
সেই পিক আপটা এল মনে হয় আবার। তাসনুভা চারতলা থেকে ৬২৫ মিটার দূরে চার নাম্বার রাস্তার দিকে তাকানোর চেষ্টা করে। কী আশ্চর্য! বেলা ডুবল কখন ? আধো অন্ধকারে সে স্পষ্ট দেখল তার বাবা কয়েকজন বন্ধুর সাথে দাঁড়িয়ে আড্ডায় খুব হাসছেন। হাসিতে তার শরীর কাঁপছে। বাবার হাসি দেখে তাসনুভার আত্মাটা যেন এতক্ষণ পর প্রশান্তিতে ডুবে গেল। বাবার সেন্স অফ হিউমার প্রবল। উইট করে বলা তার অনেক কথা মনে পড়ল। তাসনুভার মুখের হাসি এবার স্মিত থাকল না। সেও শব্দ করে হাসল। হাসতেই থাকল, শোয়েব অবাক হলেন। একটু আগে ভয়ে বিহ্বল, শীতেও ঘামতে থাকা মেয়েটা এভাবে হাসিতে মেতে উঠেছে কেন ? তার চোখের সামনে এসব কী হচ্ছে ? তিনি হুংকার দিলেন,
তাসনুভা! এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে না থেকে তোমার পাগলা গারদে যাওয়া উচিত।
তাসনুভা শিক্ষকের কথা ঠিক শুনল না। তখন আর একটা গাড়ির ব্রেক কষার শব্দে সে চমকে উঠল। দ্রুত তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে এবার চিৎকার করে বলল,
বাবা, দ্রুত পালাও… মসজিদের মোড় থেকে চার নাম্বার রোডে পিক আপটা পৌঁছাতে মাত্র তিয়াত্তর দশমিক তিন সেকেন্ড সময় নেবে… চলে যা… ও, বাবা। প্লিজ বাবা। বা… বা… আ… আ…
তাসনুভা দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় অজ্ঞান হয়ে গেল এবং সটান মেঝেতে পড়ে গেল। তার কপাল ফেটে রক্ত গড়াল। ক্লাসের সবাই দৌড়ে এসে তাসনুভাকে কোলে-বুকে জড়িয়ে ধরল। জান্নাত দেখল তাসনুভার কপাল থেকেই শুধু রক্ত ঝরছে না, তার কেডসের আঙুলের দিকটা রক্তে ভিজে গেছে। সে দ্রুত তাসনুভার কেডস আর মোজা খুলে দিল। সবাই অবাক হয়ে দেখল তাসনুভার টুকটুকে পা রক্তে ভেজা। তার দুই বৃদ্ধাঙ্গুলি কীভাবে অমন করে ফেটে গেল ? যেন কোনও কারের চাপা খেয়ে তার সামনে থেঁতলে গেছে।
স্কুল কর্তৃপক্ষ দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ডাকলেন। আর এই খবর আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল ক্যাম্পাসে। সবাই বলাবলি করল, শোয়েব স্যারের অপমানে তাসনুভা অজ্ঞান হয়ে গেছে। ছাত্র-ছাত্রীরা এক একজন বারুদ হয়ে উঠল। তারা রাস্তায় নেমে গেল। স্লোগান দিল,
ছাত্রী উত্যক্তকারী শোয়েবের বিচার চাই। বিচার চাই।
স্কুলের অনেক শিক্ষক আজ প্রতিশোধ গ্রহণের দারুণ এক সুযোগ পেলেন। দুই পয়সার অঙ্ক না জেনেই প্রতারকটা অঙ্ক নিয়ে সেলিব্রেটি হয়ে ওঠায় তাদের বুকের দাউ দাউ হিংসার আগুন এবার তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল। আন্দোলন সংক্রামক। তা ব্যক্তি থেকে শ্রেণি, শ্রেণি থেকে গোত্র, গোত্র থেকে অঞ্চল, অঞ্চল থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্র, রাষ্ট্র থেকে পুরো দেশে ছড়ায়। যে সোশ্যাল মিডিয়া দিয়ে শোয়েব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল সেই সোশ্যাল মিডিয়া শোয়েবের জীবনের জন্য ঝুঁকিপুর্ণ হয়ে উঠল। কে বা কারা শত শত মামলা করল শোয়েবের নামে। তার মধ্যে ‘দশ মিনিটে অঙ্ক’ শেখার বই নামে ভুয়া বই লিখে কোমলমতি বাচ্চাদের সাথে প্রতারণার অভিযোগ আনল। শোয়েবকে অ্যারেস্ট করার জন্য আদালত অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট জারি করল।
২
আদালতে তাসনুভার মাই শোয়েবকে বাঁচালেন। তিনি বললেন,
শোয়েব কখনওই আমার মেয়েকে খারাপ কোনও ইঙ্গিত দেয়নি। আমার মেয়েটা মানসিকভাবে অসুস্থ। বাবাকে হারানোর পর থেকে ওর বারবার প্যানিক অ্যাটাক হয়। সেদিন ক্লাসে ঢোকার সময়ও তার শরীরের পুরো নার্ভাস সিস্টেম ব্রেকডাউন হয়ে গিয়েছিল। মাননীয় আদালত, শোয়েব ভাইয়ের প্রতি আমার কোনও অভিযোগ নেই।
তাসনুভার ঘটনায় ছাড়া পেলেও দশ মিনিটে অঙ্ক শেখা নামের বই লিখে ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে প্রতারণা করার জন্য শোয়েবের তিন মাস জেল হলো।
এই তিন মাসে প্রবল অনুতাপ শোয়েবকে জীবন নিয়ে সত্য চেনাতে সাহায্য করল। নিজের জনপ্রিয়রতা আর উত্থানের সময়টুকু তার চোখের সামনে যত স্পষ্ট হলো, ততই সে লজ্জিত হয়ে উঠল। জেল থেকে বের হয়ে সে জীবনের চরম সত্যটাকে আরও আবিষ্কার করল। স্কুলগুলোতে চাকরির আবেদন করলেও মাসের পর মাস তাকে কোনও স্কুলই আর ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকল না।
কী করবে সে ভেবে পেল না। তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তখনও লাখ তিনেক টাকা। হঠাৎ তার মনে হলো, সে একটা মোটর সাইকেল কিনে ‘পাঠাও’ চালাবে। কাজটা শুরুর দুই সপ্তাহ পর কীভাবে কীভাবে যেন আনমনেই শোয়েব বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় পাঠাও চালাতে ঢুকল। হারানো কর্মস্থল স্কুলটার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তার বুকের ভেতর হু হু করে উঠল। একটা নির্জন গলির মুখে উদাস দৃষ্টিতে প্রাণচাঞ্চল্য জেগে ওঠা স্কুলটার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল।
শুধু স্কুল এবং শিক্ষকতা জীবনটাকে মিস করার কারণে নয়। বরং তাসনুভার ক্লাসের প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে থাকার সেই দৃশ্যটা মনে পড়ে তার ভেতরটা কেঁদে উঠল। তার কেন যেন চোখ ভিজে উঠছে। কয়েকবার সে চোখ মুছল। কিন্তু তাসনুভা সেদিন অমন করল কেন ? এই প্রশ্নটা তাকে কুরে কুরে খেল। না, এই প্রশ্নের উত্তর তার জানা প্রয়োজন।
ভাই, যাবেন ?
শোয়েব ভদ্রলোককে তার গন্তব্য জিজ্ঞাসা করার আগেই দেখল, একদল ছাত্র-ছাত্রীরা স্কুলে ঢুকছে। তার দুই চোখ আকুল হয়ে তাসনুভাকে খুঁজল। না, এত ছাত্র-ছাত্রীদের ভিড়ে মেয়েটাকে আলাদা করে চেনা যাচ্ছে না। সে কি আর একটু স্কুলটার দিকে এগিয়ে যাবে ?
না ভাই, আমি আপাতত কোথাও যাব না।
সে বাইক স্টার্ট দিল। এন ব্লকের বড় মসজিদটার দক্ষিণে একটা নিরিবিলি খালের পাড়ে বড় একটা গাছের ছায়ায় সে বসল। পানিতে সূর্যের আলোর ঝিকিমিকি। নীল আকাশটা নিশ্চল পানিতে কেমন এক নিস্তব্ধ জীবনের প্রতিবিম্ব এঁকেছে। শোয়েবের অনেক দিন পর মনে হলো―শহরের কোলাহল, যানজট আর তীব্র শব্দের জীবন ছেড়ে, এই ঢাকা শহরকে বিদায় জানিয়ে সে গ্রামে ফিরে যাবে। না, নিজেদের গ্রাম নয়। এমন কোনও গ্রাম―যেখানে তাকে কেউ চেনে না। ধনী লোকদের কাছে ধরনা দিয়ে সেখানে একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করবে। আর বাচ্চাদের সত্যিকারার্থেই অঙ্ক শেখাবে। জীবনের অঙ্ক। শান্ত, বুদ্ধের অহিংসা-শান্তি আর নিরিবিলি একটা জীবনের প্রত্যাশার চেয়ে মানুষের জীবনে আসলে বড় কোনও অঙ্ক নেই―তাদের সে তাই-ই শেখাবে।
হঠাৎ তার চোখ গেল পি ব্লকের দিকে চলে যাওয়া চার লেনের রাস্তায়। গোল্ডেন গেট স্কুলের পোশাক পরা একটা মেয়ে রাস্তার ধার দিয়ে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে। বড্ড দ্রুত তার হাঁটার গতি। চারপাশের জগৎ-প্রকৃতি কোনও কিছুর দিকেই মেয়েটার খেয়াল নেই। দূর থেকেই শোয়েব বোঝার চেষ্টা করল―কে এই সময়, এই ঠা ঠা রোদ্দুরে পিচঢালা নির্জন পথে হেঁটে যাচ্ছে ? সে মোটর সাইকেলের কথা ভুলে মেয়েটার পিছু নিল। দ্রুত হাঁটল শোয়েব। কিছুটা কাছাকাছি হতেই সে চমকে উঠল―তাসনুভা ?
স্কুল সময়ে কোথায় যাচ্ছে মেয়েটা ? না, আজ এই রহস্যটুকু তার জানতেই হবে। সে চুপচাপ তার পেছনে দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটতে থাকল। তাসনুভা ঘেমে ভিজে গেছে। তাসনুভা সোজা নদীর দিকে চলে যাওয়া রাস্তা ধরে হেঁটেই চলছে। কী যেন বিড়বিড় করে বলছে। তারা এক সময় পি ব্লক পার হলো। রাস্তা যেখানে শেষ হয়েছে―ঠিক সেখান থেকে মাঠের ভেতর দিয়ে সোজা পথেই চলল তাসনুভা। সে ঠিক নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। স্থির দৃষ্টিতে মেয়েটা নদীর স্রোতের দিকে মাছরাঙার দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। এক সময় তাসনুভা মাটিতে বসে পড়ল। আনমনে ব্যাগটা রাখল ধুলাবালির উপর। গভীর মনোযোগ দিয়ে নদীর বয়ে চলা স্রোতের দিকে চোখ রাখল। শোয়েব অনেকক্ষণ পর বুঝল ধীরলয়ের স্রোতের ভেতর যা কিছু ভেসে যাচ্ছে সেদিকেই তাসনুভা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে। একটু পর দ্রুতবেগে একটা ছোট নৌকা নিয়ে একজন তাসনুভার কাছে এল। বলল,
মাগো, আজক্যা আবার আইছো, মা ? তোমার মোবাইল নম্বর নিয়া রাখছি না, মা ? আমি নদীতেই দিন-রাত পাহারা দিই। পাইলেই তুমারে ফোন দিমোনে মা ? সোনা বাচ্চা। বাড়ি যাও, বাবা।
কী অদ্ভুত ব্যাপার! তাসনুভাকে এসব কী বলছে মাঝি লোকটা ? শোয়েব আরও বেশি অবাক হলো তাসনুভার প্রত্যুত্তরে। সে দেখল মেয়েটার গণ্ডদেশ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে যাচ্ছে,
নদীতে একটা ভেসে যাওয়া লাশ খুঁজে পেতে তোমার চার বছর লাগে, চাচা ? তুমি ভালো করে দেখেছো ?
হ, মা… দেখছি মাগো… দেখতেছি… তুমি ভাইব্য না, বাবা!
সত্যিই তুমি আমার বাবাকে দেখনি। কিন্তু, লাশগুলো ওরা নদীতেই ফেলে দিত… টিভিতে শুনতেছো না ? কেন আমি আমার বাবাকে খুঁজে পাই না, চাচুকে… না ? অনেক দিন আমি আমার বাবাকে দেখি না…
তাসনুভা দু পা ছড়িয়ে অবশ ভঙ্গিতে ধপ করে বসে পড়ল। তার বুকফাঁটা নিশ্চুপ আর্তনাদ নদীর স্রোতে যেন কাঁপন তুলল। মাঝি দ্রুত নদী থেকে উঠে এসে তাসনুভার পায়ের কাছে বসে তার দু হাত ধরে বলল,
মা রে! তোমারে শক্ত হতে হবে, মা জীবন এমন বাচ্চা… আমি আমার ছেলেটারেও এই নদীত খুঁজতে খুঁজতে এই নদীর বুকে জীবন গড়েছি মা। আল্লাহয় য্যান তুমারে এত ক্ষামতা দেয় যে, মোগেরে বুক আর বাপহারা আর সন্তানহারা কেউ করবার না পারে… মা… মা…
এই দৃশ্য আর সহ্য হচ্ছিল না শোয়েবের। তার বুক, চোখ সব কিছু ফেটে যেন অশ্রু আসতে চাইছে। সে তার মোটর সাইকেলের কাছে দ্রুত গেল। স্টার্ট দিয়ে নদীর পথ ধরতেই দেখল তাসনুভা পি ব্লকের রাস্তা ধরে চোখ দুটো বারবার মুছতে মুছতে দ্রুতগতিতে হাঁটছে। জগতের কোনও কিছুর তার আর খেয়াল নেই। যেন এই জগৎ আর জীবনের সাথে তার সব লেনাদেনা চুকেবুকে গেছে।
শোয়েব তাসনুভার কাছে মোটর সাইকেল নিয়ে থামতেই তাসনুভা ভয় পাওয়া হরিণীর মতো চমকে উঠল। কিন্তু মাস দুয়েক রোদে রোদে আর জীবনসংগ্রামে বদলে যাওয়া চেহারার শোয়েবকে একেবারেই সে চিনতে পারল না। শোয়েব শুধু বলল, ভয় নেই, মা। তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দেব।
‘মা’ শব্দটাও কি জাদু মাখা আছে যে তাসনুভা চুপ করে শব্দটা হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করল। তার চোখমুখের সব ভয় দূরীভূত হয়ে অদ্ভুত এক আস্থা ভর করল।
ওঠ, মা…
মন্ত্রমুগ্ধ ভঙ্গিতে তাসনুভা তার পেছনে উঠে বসল। বাড়ির পথটুকু তাসনুভা চিনিয়ে দিল। কে ব্লকের ১৩০০ স্কয়ার ফিটের একটা বাসার সামনে নামল তাসনুভা।
শোয়েব ঢোক গিলে জীবনের সব নোনতা স্বাদটুকু গলাধঃকরণ করে নিল। তারপর সে বাড়ির ভেতর ক্রমশ হারিয়ে যাওয়া তাসনুভার দিকে তাকিয়ে থাকল।
তাসনুভার ‘বাবা-রহস্য’টুকু না জানা পর্যন্ত শোয়েবের বুকের কাছে যেন একটা দরজা আটকে আছে। সেটা না খুলে যাওয়া পর্যন্ত কিছুতেই তার স্বস্তি হচ্ছে না। আজ কেমন বিবশ আর অবশ ক্লান্তিতে শরীর-মন যেন কিছুতেই নড়তে-সরতে চাইছে না। জীবন কেন এমন হয় ? কেন মানুষের জীবন এমন হয়!
৩
তাসনুভার বাড়ির উলটা দিকের গলিতে তখনও অনেক প্লট ফাঁকা। গাছ আর ঘাসে ঢাকা। গাছের ছায়ায় মোটর সাইকেলের ওপর কয়েক দিন শোয়েব শুধু বসেই থাকল। তাসনুভার মায়ের সাথে তার দেখা করা দরকার। কীভাবে দেখা করলে শোভন দেখাবে তা নিয়ে সে শুধু কয়েক দিন ভাবল। না, জীবনে সে আর কোনও মিথ্যা, ছল, চাতুরির আশ্রয় নিতে চায় না। তাতে মৃত্যু এলেও তাও সই। অবশেষে তার মাথায় সরল চিন্তাটাই এল। একদিন সাহস করে দারোয়ানদের তাসনুভার প্রাক্তন শিক্ষকের পরিচয়েই সে তাসনুভার মায়ের সাক্ষাৎ চাইল। তাঁর অনুমতি মিলল।
তাসনুভার মাকে শোয়েব আদালতে দেখেছিল। খুব বয়স না হলেও জীবনের ভারে কেমন নুয়ে পড়েছেন তিনি। শোয়েবকে তিনি নাস্তা দিলেন। শোয়েবের নাস্তার দিকে মন নেই।
আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি, আপা।
না, ভাই। আমার মেয়ের এমনিতেই প্যানিক অ্যাটাক হয়।
কিন্তু কেন তা হয় ? কেন সে বাবাকে খুঁজতে নদীর কাছে গিয়ে… আসলে তাসনুভার এই বাবারহস্য নিয়ে আমি ভীষণ বিপন্ন। কেন যেন আমার ভেতর থেকে আমি… আসলে আপা, আমি ঠিক… বুঝিয়ে বলতে পারছি না।
আপনি আমার ছোট ভাইয়ের মতো। বলি তবে। তাসনুভার বাবা গুম হয়েছে চার বছর হলো। ঘটনাটা ঘটেছে আমার মেয়ের সামনে। বাবার খুব আদরের মেয়ে ছিল তাসনুভা। মেয়েকে ছাড়া সে কিছুই বুঝত না। বলত, জানো আমার মেয়েটার অঙ্কের মাথা ঠিক আমার মতো… জীবনে কোনওদিন আমি অঙ্কে একশ মার্কসের নিচে স্কোর করিনি। আমার মেয়ে এই বয়সেই কী সব অদ্ভুত সংখ্যার সমীকরণ বানায়। কিন্তু একটা ইডিয়ট অঙ্কের টিচার মনে হচ্ছে, সব শেষ করে দেবে…
শোয়েবের বুকের ভেতর ধক করে উঠল। এই তাসনিম সাহেবের সাথেই কি তার তর্ক হয়েছিল ? তিনি একদিন শোয়েবকে ফোন করে বাচ্চাদের অঙ্ক নিয়ে তামাশা করার জন্য শাসিয়েছিল ?
স্মৃতি-ক)
আমি তাসনিম। আর্কিটেক্ট। ভাই, আপনি এসব কী আবোল-তাবোল অঙ্ক শেখানোর বুদ্ধি বের করছেন ? দশ মিনিটে অঙ্ক শেখানোর তামাশা বন্ধ করেন…
আরে মিয়া অঙ্ক দিয়েই যে লোক সারা দেশে বিখ্যাত তার সাথে এভাবে কথা বলার সাহস আপনাকে কে দিল ?
ওহ, আপনার মতো লোকের সাথে কথা বলতে সাহস থাকা লাগবে ?
শোয়েবের কণ্ঠ―
তারপর ?
তাসনিম বুয়েটের সেরা ছাত্রদের একজন ছিল। এ দেশে অনেক বড় বড় স্থাপনার ডিজাইনার সে। তাসনিম কোনও অপরাধ করতে পারে না। যদি আমার মেয়ের সামনে ঘটনাটা না ঘটত, তাহলে হয়তো আমার মেয়েটা একটু সুস্থ থাকত কথা বলতে বলতে হাঁপিয়ে উঠলেন মিসেস তাসনিম। তার দীর্ঘশ্বাসটুকু কোথায় যেন হারিয়ে যায় এবং তিনি খেই হারিয়ে ফেলেন। এক কথা থেকে আরেক কথায় চলে যান।
স্মৃতিÑখ)
দেশের একজন সেলিব্রেটি টিচারের সাথে কথা বলতে অবশ্যই আপনার ভদ্রতাজ্ঞান থাকা লাগবে। আপনি কি জানেন, স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী আমার দেখা পেলে ধন্য হন। আর প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত আমাকে চেনে ?
এ কথায় ফোনের অপর প্রান্ত থেকে শোয়েব এমন তাচ্ছিল্যের হাসি শুনেছিল যে তার অন্তরাত্মায় প্রচণ্ড আক্রোশ আর ঘৃণা ছড়িয়ে পড়েছিল।
মিসেস তাসনিমের কণ্ঠ―
হ্যাঁ, সেদিন সন্ধ্যায় তাসনুভা বারান্দায় গিয়েছিল। সে দেখল, তার বাবা কয়েকজন বন্ধুর সাথে আড্ডায় হাসছে। তাসনুভা চার তলার বারান্দা থেকে তাকে ডাকল,
বাবা, বাড়ি এসো। তোমার সাথে চা খাব…
আসছি মা। পাঁচ মিনিট, প্লিজ।
স্মৃতি-গ)
শোয়েব কল রেকর্ডিং অপশন চাপল। তাসনিমকে উসকে দিল,
আপনি জানেন, আমার কাছে কারা কারা তাদের বাচ্চাকে অঙ্ক শেখাতে ডাকে ? মহাপরিচালক হাসান স্যারের ছেলে…
ওসব ইতরদের অবৈধ পয়সায় তাদের গর্দভ বাচ্চারা তোমার মতো ছাগলকেই ঘাস খাওয়াবে। এতে আর আশ্চর্য হওয়ার কী আছে! যেমন শিক্ষক, তেমন সে দেশের শিক্ষামন্ত্রী। তেমন সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। তাসনিম বলেই যাচ্ছিলেন,
অল আর ব্লাডি ইডিয়ট।
ওই মিয়া। আপনি আমার নেত্রীকে ইডিয়ট বলছেন।
ধ্যেত বেটা ছাগল, তোমার নেত্রী যেমন তুমিও তার উচ্ছিষ্ট গোবর। তোমার নামে আমি স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করব। আমার মেয়ে তোমার অঙ্ক শেখানো নিয়ে হাসাহাসি করে।
তোমার মেয়ের নাম কী ?
আমার মেয়ের কেউ ক্ষতি করুক, আমি তো তা চাইব না।
তুমি, জানো ? আমার হাত কত লম্বা ? তুমি অভিযোগ করবা স্কুলের মাস্টার মশাইদের কাছে, আর আমি অভিযোগ করব, তোমার জীবনের বিদায় স্টেশনে।
মিসেস তাসনিমের কণ্ঠ―
ঠিক সে সময় একটা পিক আপ দ্রুত গতিতে এসে সেখানে প্রচণ্ড শব্দে ব্রেক কষে। এখন মনে হয়, ওরা খুব সম্ভবত তাসনিমের মোবাইল লোকেশন ধরে সেখানে এসেছিল। কালো পোশাক আর অস্ত্রসজ্জিত লোকগুলো গাড়ি থেকে নেমেই বলতে থাকে তোর নাম তাসনিম ? তুই শালা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যড়যন্ত্র করিস ? বলেই পাশে পড়ে থাকা একটা লোহার রড দিয়ে তাসনিমকে তারা এলোপাথাড়ি মারধর শুরু করে।
স্মৃতি-ঘ)
শোয়েবের মনে পড়ল,
তোমারে ধরে এমন পিটানি দেওয়াব, বাপের নাম ভুলে যাবা।
মিসেস তাসনিমের কণ্ঠ―
আমার মেয়েটা ‘বাবা’, ‘বাবা’, চিৎকার করতে করতে দৌড়ে নিচে যায়। সে তার বাবাকে আঁকড়ে ধরে,
আপনারা বাবার সাথে কেন এমন করছেন ? বাবাকে ছেড়ে দিন। আপনাদের এত্ত বড় সাহস, আমার বাবার গায়ে হাত তোলেন!
তাসনিমের বন্ধুরা তখন সবাই পালিয়ে গেছে। মেয়েটা একাই একটা বাহিনীর লোকদের হাত থেকে বাবাকে বাঁচানোর জন্য তাকে আঁকড়ে ধরে থাকে। এরপর তারা আমার মেয়েকেও আঘাত করে। মেয়েটার ঠোঁট আর কপাল ফেটে রক্ত গড়াতে থাকে। তাসনিম বলে,
মা, বাড়ি চলে যাও। আমি ফিরে আসব, যাও মা!
আমি ততক্ষণে নিচে গেছি। আমার মেয়েটা হাতজোর করে তখন তাদের কাঁদতে কাঁদতে বলে,
আঙ্কেল প্লিজ। লিসন টু মি। মাই ফাদার ইজ অ্যান ইননোসেন্ট, গ্রেট ম্যান। হি ক্যান্ট ডু সামথিং রং। ইউ ক্যান্ট অ্যাটাক অ্যান্ড পিক হিম উইদাউট অ্যানি ওয়ারেন্ট ফ্রম দ্য কোর্ট প্লিজ লিভ হিম অর এলস আই ইউল স্যু অ্যা কেস অ্যাগনেইস্ট অল অফ ইউ, অ্যাগনেইস্ট এভেন দ্য ভেহিক্যাল ইউ আর ইউসিং টু অ্যাবডাক্ট মাই ফাদার।
তখনই তারা ধাক্কা দিয়ে আমার মেয়েকে ফেলে দেয়। তাসনিমের চোখ-মুখ ফাঁসির আসামির মতো ঢেকে তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে যায়। আমার রক্তাক্ত, আহত মেয়ে আর আমার আহাজারিতে চার নাম্বার রাস্তার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। কিন্তু ঐ এলাকা যেন শ্মশানভূমি। কেউ তো এগিয়ে আসেই না, বরং সবাই দিন দিন আমাদের এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। যেন আমাদের সাথে কথা বললেই তারা বিপদে পড়বে।
তাসনিমের কেনা এবং সাজানো ২১০০ স্কয়ার ফিটের দামি ফ্ল্যাট বিক্রি করে সেই টাকায় সঞ্চয়পত্র আর বন্ড কিনেছি, ভাই। তা দিয়েই ভেবেছিলাম মেয়েটাকে বড় করে তুলব। কিন্তু আমার মেয়েটার এত প্যানিক অ্যাটাক হয় যে, সমাজ তাকে এখন পথে-ঘাটে চলতে ফিরতে টিটকারি করে ‘পাগলি’ বলে। ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া আমার মেয়েটা আর কোনওদিন কোনও পরীক্ষায় পাসই করে না। গুম কমিশনের রিপোর্টগুলো ছড়িয়ে পড়ার পর হয়েছে নতুন সমস্যা। আমার মেয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে নদীর দিকে যায়। সেখানে একজনকে আমি পেয়েছি যার সন্তানও জঙ্গি তকমায় নিখোজ। বেচারা, গরিব মানুষ। তাকেই বলেছি, তাসনুভা কখনও নদীর পাড়ে গেলে খেয়াল রাখতে। তাকে আমি এর জন্য মাসিক কিছু টাকা-পয়সা দেই।
মিসেস তাসনিম দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তার দু চোখ বেয়ে সমানতালে গড়ানো অশ্রু তিনি মুছেই চলছেন। এই দৃশ্যের সামনে শোয়েব আর টিকতে পারছে না। তার হৃদয় ভেঙে আসছে। তাসনুভার বাবাকে নাই করে দেওয়ার কুশীলবকে এতদিন পর সে খুঁজে পেয়েছে।
স্মৃতি-ঙ)
হাসান সাহেবের গর্দভ ছেলেকে অনেক টাকার বিনিময়ে সে অঙ্ক শেখাতো। তাকেই একদিন সে বলেছিল,
স্যার, সরকারের বড় শত্রু আমার মতো সেলিব্রেটিরা নয়, বরং এইসব বুয়েট-ফুয়েট আর বিদেশ থেকে উচ্চ ডিগ্রিধারী ক্রিমিনালরা। শোয়েবের কথায় হাসান যেন স্মেলড র্যাট করলেন। তিনি টেবিলের উপর দুই হাতে শরীরের ভর দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,
এমন কোনও ক্রিমিনালকে জানো নাকি ?
শোয়েব এক পাশে ডেকে নিল মহাপরিচালক হাসানকে। তার মোবাইল ফোনে রেকর্ড করা তাসনিম নামের একজনের ভয়েস শোনাল। হাসান ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন,
এই মাদারচুত আমার প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে মন্তব্য করে! দাও, এক্ষুনি ওর ফোন নাম্বার দাও…
শোয়েব তার ‘দশ মিনিটে অঙ্ক শেখা’ বিষয়টাকে তাচ্ছিল্য করা লোকটাকে শায়েস্তা করতে পারবে ভেবে উল্লসিত হয়ে তাকে নাম্বারটা দিয়েছিল।
মাঝে মাঝে মধ্যরাতে মেয়েটা আমার বাসার চাবি খোঁজে, দরজা খুলে নদীর দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে। একটাই স্বপ্ন সে দেখে―নদীতে তার বাবার লাশ ভেসে যাচ্ছে…
সচিত্রকরণ : রজত



