আর্কাইভগল্প

গল্প : বিকেলের তেলচিত্র : হামিম কামাল

এলিস, একটা অনুরোধ করতে পারি ?

এলিস মেয়েটি কলম থামিয়ে তাকাল। তার চোখে কোনও প্রশ্ন, কৌতূহলও নেই। শুধু বিভ্রান্ত আর বিব্রত ভাব। কারণ বোঝা কঠিন না। সৌভিকের সঙ্গে বাংলায় কথা বলতে হচ্ছে। সুতরাং এ নিয়ে মন একটু অপ্রস্তুত। মেয়েটাকে এ পরীক্ষা থেকে নিষ্কৃতি দেওয়া যাক।

সৌভিক এবার ইংরেজিতে বলল, ছাদে যাওয়া যাবে ? তবে কোনও অসুবিধা হলে থাক।

এলিসের সংকোচ কেটে গেল। এবার কৌতূহল নিয়ে বলল, নিচে মোতিলাল আছে, তার কাছে চাবি। ওর কাছে ফোন নেই। আমি উঠছি।

প্লিজ আপনি উঠবেন না, সৌভিক বলল। আমার প্রয়োজন, আমিই যাচ্ছি। আপনি বসুন।

সৌভিক সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে গেল। ছোট গ্যারেজে টুলের ওপর বসে মতিলাল তার চশমার কাচ পরিষ্কার করছে। সৌভিককে দেখে দাঁড়াল না। সে এ অফিসের কেউ নয়, দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই।

মতিলাল দাদা ?

দাদা ডাক বোধহয় লোকটা আশা করেনি। পুরু চশমার আড়ালে তার বড় বড় চোখ দিয়ে পিটপিট করে তাকাল।

মোটাসোটা গড়ন। ষাটের কোঠায় বয়স। চশমার সবুজাভ কাচে অনেক আঁচড় পড়েছে।

ছাদের চাবি আপনার কাছে ? বলল সৌভিক। দেওয়া যাবে ? একটু ছাদে যাব, বিশেষ দরকার।

মতিলাল এবার নেমে দাঁড়ায়। চাবি তো আমার কাছে নেই বাবু। চাবি রূপলাল নিজের কাছে রাখে। আমাকে বলে, ছাদে গেলে জ্যাঠা তুমি যখন তখন কিনার গলে নিচে পড়ে যাবে, এ জিনিস আমার কাছেই থাক।

লোকটা পুরান ঢাকার উর্দুভাষী।

সৌভিক বলল, ঠিক আছে। তাহলে ডাকুন রূপলালকে।

ওর শিফট তো এখনও আসেনি বাবু।

কখন আসবে ?

ছয়টায়। শীতকাল। রাত নেমে যাবে।

সৌভিক এলিসের কাছে ফিরে এল। চাবি রূপলালের কাছে এলিস। ওর আসতে আরও ঘণ্টাখানেক। তাহলে আর যাওয়া হলো না।

এলিসের চোখে সহানুভূতি। বিশেষ কোনও কাজ ছিল মিস্টার সৌভিক ?

বিশেষ বলতে বিকালের সূর্য একটু ভালোভাবে দেখতে ইচ্ছা করছিল। আর একটু স্বাভাবিক সূর্যাস্ত দেখতে চাচ্ছিলাম। এত ভবনের ভেতর দিয়ে না। আজ আমার সূর্যাস্ত দেখার দিন।

কথাটা এলিসকে বলার কোনও দরকার ছিল না। মেকি ভাবতে পারে।

এলিসের চোখেমুখে সত্যিকার কৌতূহল ফুটল। সূর্যাস্ত দেখার দিন ? অদ্ভুত তো!

সৌভিক বলল, হ্যাঁ একটু নাটকীয়। বিশেষ কিছু না।

বরং উলটো, মিস্টার সৌভিক। কলম খাপবদ্ধ করল এলিস। নাটকীয়তা নেই। কিন্তু বিশেষত্ব পুরোপুরি আছে। চাবি যেহেতু রূপলালের কাছে, ছাদে যাওয়া যাবে না। কিন্তু বিকল্প একটা পথ আমার জানা আছে।

তাই বুঝি।

ছাদের মতো পরিবেশ না। তবে আপনার খারাপ লাগবে না আশা করি। অন্তত এই জানালার চেয়ে ভালো লাগবে।

সৌভিক জানালা থেকে একটু পেছাল। সূর্য একটা ভবনের আড়াল থেকে বের হয়ে আসায় জানালাটাকে হঠাৎ মিউজিয়ামের দেয়ালে ঝোলানো একটা তেলচিত্রের মতো লাগছে। অবধারিতভাবে টার্নারের আঁকা।

টার্নারকে একদিন তার এক বন্ধু এসে বলল, জানো সেদিন সাগরধারে আশ্চর্য এক বিকেল দেখলাম। ঠিক তোমার ছবির মতো সুন্দর।

টার্নার বললেন, সত্যি দেখেছো ? নিশ্চয়ই বাড়িয়ে বলছো তুমি।

বন্ধু বললেন, তোমার বিনয়ী হওয়ার দরকার নেই। মিথ্যা বলছি না একটুও। অবিকল তোমার ছবির মতো।

টার্নার বললেন, কিসের বিনয়! প্রকৃতি আমার আঁকার মতো সুন্দর হতেই পারে না।

সৌভিক এই গল্প শুনেছিল মুস্তাফা তুষারের কাছে। প্রবীণ শিল্পী মুস্তাফা তুষার একটা বেতের চেয়ারে বসে বাঘ আঁকছিলেন। সবাই তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল।

এলিস! যদি কোনওদিন আমি একটা বাড়ি বানাতে পারি, জানালাগুলো এমনভাবে বানাব, বাইরের দৃশ্য দেখে মনে হবে কোনও চিত্রকর্ম দেখছি। ভেতর, বাহির দুদিক থেকেই।

এলিসকে এ কথা বলার দরকার ছিল না। ভাবালু ভাবতে পারে। বা ভাবতে পারে তার মন আকর্ষণের চেষ্টা করছি।

সৌভিকের শরীরের সামনের ভাগ বিকেলের আলোয় সোনালি। দৃষ্টি বিকেল ছাড়িয়ে আরও দূরে কোথাও। কল্পনায় কি তার বাড়িটা দেখতে পারছে ?

এলিস বলল, আপনার স্বপ্ন সত্যি হোক।

সৌভিক তাড়াতাড়ি বলল, চলুন, আপনার সেই জায়গা থেকে দেখি। সূর্য পালিয়ে যাচ্ছে। আপনি বলেছেন যখন নিশ্চয়ই এর চেয়ে সুন্দর হবে।

আমার ভয় হচ্ছে মিস্টার সৌভিক। হয়তো আপনার পছন্দ হবে না।

চলুনই না!

এলিস দেরাজের ভেতর থেকে কালো সিরামিকের বোতল বের করল। বোতলের মুখ খুলে বলল, একটু গলা ভিজিয়ে নিই। চুমুক দিয়ে বাড়িয়ে দিল সৌভিকের দিকে। চলবে আপনার ?

সৌভিক চোখে প্রশ্ন নিয়ে হাসল। পানি ?

এলিসের গাল খানিকটা লাল। পানিই। তবে একটু জাদু আছে। জ্যাক ড্যানিয়েল।

সৌভিক হেসে হাত বাড়িয়ে দিল। মিষ্টি ঘ্রাণ। খানিক গলায় ঢেলে ফিরিয়ে দিল।

দুজন একটা করিডোর ধরে পূর্ব দিকে এগোচ্ছে। বাঁ পাশে কাচের দেয়াল। ডান দিকে ডেস্কের সারি। অফিসের সময় শেষ হয়ে এসেছে। লোকজন কম। মেঝেতে জুতোর শব্দ উঠছে।

হঠাৎ দক্ষিণ দিকে একটা গলি। এলিসের পেছন পেছন সৌভিক মোড় ঘুরল। হাতের ডানে এখন ভাঁড়ার ঘরের দেয়াল। সামনে বন্ধ কাঠের দরজা। এলিসের হাতে চাবি রিনরিনিয়ে উঠেছে। রুপালি নবে মোচড় দিতেই এক ঝলক বাতাস ছুটে এল।

দরজার বাইরে তাকিয়ে যা দেখল সৌভিক তার জন্যে প্রস্তুত ছিল না। সোনালি আগুন জ্বলা বিকেল। বহুদূর পর্যন্ত রুক্ষ লাল মাটি। কোথাও কেউ নেই। অফিসপাড়ার শেষ ভবন বিভুর, এটা জানা ছিল। কিন্তু ওপাশে কী তা জানা হয়নি। ঘিঞ্জি শহর, ভেবেছিল বাড়ি ঘন ঘন বস্তি থাকবে। সেসব কিছুই নেই। মনে হচ্ছে বাইরে আরেক গ্রহ। এ গ্রহ মোবিয়াসের আঁকা।

এলিস ঘুরে তাকাল। চুলে আলো ধরে গেছে। হাসল। নাম এলিস শুনে বিভুকে সৌভিক প্রশ্ন করেছিল, কোথায় পেলি ওকে ? বিভু বলেছিল, ওয়ান্ডারল্যান্ডে। মনে হচ্ছে ওর কথা সত্যি।

এলিস, বিকেলটা কেমন লাগছে জানেন ?

এলিস চুপ। উত্তরের অপেক্ষায় আছে। সৌভিক বলল, শৈশবের কোনও একটা হারানো বিকেলের মতো লাগছে। যে বিকেল বাস্তবে কখনও ছিল না।

কোথায় ছিল ?

কোনও বিদেশি গল্পের পাতায়! পাতায় পাতায় যুদ্ধশিহরণ জাগানো কোনও জগৎ। যেখানে মৃত্যু আছে, হাসি আনন্দ আছে। হারানো বন্ধুরা আছে, যারা বইয়ের পাতাতেই থাকে। মানুষের বয়স বাড়ে, তাদের বয়স কোনওদিন বাড়ে না। যখনই সেই জগতে মানুষ ফিরে যায়, ওরা তার পাশে পাশে হাঁটে আর, আর এমনভাবে কথা বলে যেন মানুষটা কোনওদিন তাদের ছেড়ে যায়নি। একটু চোখের আড়ালে শুধু ছিল। আবার চলে এসেছে।

আপনি অন্যরকম মানুষ।

সৌভিক সবটা বলেনি। সেই বইয়ের পাতায় একটি মেয়ে আছে। যে মেয়েটির চেয়ে ভালো সে আর কখনও কাউকে বাসেনি। এলিসের সঙ্গে তার কোথায় যেন মিল। বেশ মিল।

ওরা ব্যালকনিতে এল।

দিগন্তে যেখানে শহরের শেষ, বন পাহাড়ের শুরু, সূর্য সেখানে শোবে বলে এক টুকরো জায়গা করে নিয়েছে। আকাশময় তার কমলা আদর ছড়ানো। কত পাখি! পাখিদের বাড়ি সূর্যের অপর দিকে।

এলিস, মানুষ কি কোনও দূর পৃথিবীতে অন্য কোনও সূর্যকে এভাবে হাজার বছর ডুবতে দেখেছিল ?

জানা নেই যে।

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button