
কুন্তিভোজ বুঝে গিয়েছেন, আর কোনও দিন পিতৃত্বের স্বাদ পাবেন না তিনি। যদুশ্রেষ্ঠ শূর এ খবর জানার পর প্রিয় কন্যা পৃথাকে দান করলেন তাঁর পিসতুতো ভাই কুন্তিভোজকে। নিঃসন্তান কুন্তিভোজ কন্যা পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়লেন। কন্যার নাম রাখলেন নিজের নামে―কুন্তী।
এক দিন মহাতেজস্বী ঋষি দুর্বাসা এলেন শূরের বাড়িতে। মনপ্রাণ ঢেলে অতিথির সেবাযত্ন করলেন কুমারী কুন্তী। মুগ্ধ হলেন দুর্বাসা। শিখিয়ে দিলেন একটি বিস্ময়মন্ত্র। সেই বিস্ময়মন্ত্র উচ্চারণ করে কোনও দেবতাকে ডাকলে সেই দেবতা চলে আসবেন সঙ্গে সঙ্গে। আর সেই দেবতার মাধ্যমে অসম-সাহসী বীরপুত্র লাভ করতে পারবেন কুন্তী। অল্প বয়সের কৌতূহল হলো সর্বগ্রাসী পাহাড়ি ঢলের মতো। কুমারী কুন্তীও সেই বাঁধভাঙা কৌতূহল দমন করতে না পেরে মন্ত্র উচ্চারণ করে ডেকে বসলেন সূর্যদেবকে।
কৃষ্ণনয়না কুন্তীর কাছে এসে সূর্যদেব বললেন, ‘কী চাও হে সুন্দরীনয়না ?’
কুন্তী সূর্যদেবকে মনে করিয়ে দেন দুর্বাসা মুনির কথা।
সূর্যদেব কুন্তীর গর্ভে দান করলেন একটি বীরপুত্রের ভ্রƒণ। কিন্তু কুন্তী তো কুমারী! সূর্যদেব আশ্বাস দিলেন, পুত্রের জন্মের পরও কুন্তী কুমারীই থাকবেন।
তবু কুন্তীর ভয় যায় না। কুমারিত্ব হারানোর কলঙ্কের ভয়ে কুন্তী তাঁর সদ্যোজাত পুত্রকে একটি পাত্রে রেখে ভাসিয়ে দেন জলে। কুন্তী ভাসেন অথই জলে।
২
টিংটং করে ঘন ঘন কলিংবেল বেজে চলেছে।
চৈত্রের এই ভরদুপুরে কে এল আবার ? পৃথা বিরক্ত হয়ে দরজার ছিটকিনি খুলতেই মন্দ্রা ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর।
কতদিন পর দেখা দুজনের! তেরো বছর! তেইশ আর তেরো, দুজনের বয়স এখন ছত্রিশ। তেইশ বছর বয়সে এমএ শেষ করে মন্দ্রা চলে গেল হেলসিঙ্কিতে, পিএইচডি করতে। আর পৃথা ঢুকে পড়ল সংসারে। বিয়ে হলো প্রাংশুর সঙ্গে। আঠাশে জন্ম হলো অর্জুনের।
মন্দ্রা আসবে, বলেছিল আগেই। পৃথার দিনক্ষণটা খেয়াল ছিল না।
ঠাম্মার ঘরে ঘুমিয়ে ছিল অর্জুন। অচেনা মানুষের হট্টগোল আর হাসির রিনিঝিনিতে ঘুম ভেঙে যায়। গুটি গুটি পায়ে এসে মায়ের কোল ঘেঁষে দাঁড়ায় সে। মন্দ্রা নাক টিপে দেয়, ‘কত বড় হয়ে গেছে আমাদের স্বর্ণকুমার বাবু ?’
অর্জুন রাগ করে বলল, ‘আমি স্বর্ণকুমার না, আমার নাম অর্জুন। থ্রিতে পড়ি।’
‘ও মা তাই নাকি! আমি ভেবেছিলাম তুমি পড়ো ওয়ানে। কীসের যেন দারোয়ান! সরি সরি! ভুল হয়ে গেছে।’ হেলসিঙ্কি থেকে আনা চকলেটের বাক্সটা অর্জুনের হাতে দেয় মন্দ্রা। তারপর নিচু হয়ে গাল পেতে বলে, ‘একটা চুম্মু দেবে না অর্জুন সোনা ?’
অর্জুন সোনাঝরা হাসি দিয়ে মন্দ্রার গালে আলতো করে চুমু দেয়।
‘তুমি ঠাম্মার ঘরে ঘুমিয়ে থাকো বাবা।’ পৃথা অর্জুনকে আবার ওর ঠাম্মার ঘরে পাঠিয়ে দেয়। দুই বন্ধু একান্তে শয়নকক্ষে এসে বসে।
মন্দ্রা বলল, ‘ওর তো পড়ারই কথা ছিল না।’
পৃথা অবাক হয়ে বলল, ‘কেন ?’
‘কেন আবার! অর্জুনের তো জন্মই হওয়ার কথা ছিল না। না জন্মালে পড়বে কী করে ?’
‘তাই তো!’ হাসল পৃথা।
‘অবশ্য অর্জুন দারুণ গুল্লু গুল্লু আর ইন্টিলিজেন্ট দেখতে হয়েছে।’ মন্দ্রা ঈর্ষার চোখে দেখল চারপাশ। কত রকমের আর্টওয়ার্ক ঝুলছে দেওয়ালে। ঘরের পূর্ব দিকে অর্জুনের হাসিমুখভরা বড় একটা ছবি। ঈশান কোণে ঝুলছে চওড়া ফ্রেমে বাঁধানো লিওনার্দোর লাস্ট সাপার। সেদিকে তাকিয়ে মন্দ্রা বলল, ‘আনলাকি থার্টিন বছর পর তোর সঙ্গে দেখা। হেল থেকে একেবারে হ্যাভেনে চলে এসেছি। কী বলিস ?’
‘আনলাকি থার্টিন ?’ তন্দ্রার দৃষ্টি অনুসরণ করে লাস্ট সাপারের দিকে তাকাল পৃথা, ‘ও আচ্ছা। জেসাস যখন সেই রাতে জীবনের শেষ খাবার খায়, তখন তেরোজন মানুষ ছিল। আর ঐ দেখ―তেরো নম্বর সিটে বসে আছে জেসাসকে হত্যার ষড়যন্ত্রকারী।’
মন্দ্রা বলল, ‘তুই মুখে মুখে বিপ্লবের কথা বলিস। কিন্তু বাস্তবে তুই একটা ভেড়া।’
‘কেন লাস্ট সাপার ঘরে রেখেছি বলে ? ওটা তো লিওনার্দোর ছবি।’
‘লিওনার্দোতে আপত্তি হবে কেন ? আপত্তি কোথায় তুই তা জানিস।’ মন্দ্রা ঘুরতে ঘুরতে অর্জুনের দুই বছর বয়সের একটি ছবির সামনে এসে দাঁড়াল।’
‘অর্জুনকে পাবার জন্য আমি হাজারবার ভেড়া হতে রাজি।’
‘কিন্তু আমাদের তো বিয়ে করারই কথা ছিল না! তোর সেই ফাইনাল ডিবেটের দিনটা মনে আছে ?’ মন্দ্রা পায়চারি করতে লাগল, ‘ইউনিভার্সিটিতে আমরা তখন সকাল-বিকাল বড় বড় ফিলোসোফারদের তত্ত্ব নিয়ে কচকচাতাম, নিজেদেরও মনে করতাম এলেমদার দার্শনিক। কাঁটাছেঁড়া করতাম জগৎ পালটে দেওয়া সব ধর্মতত্ত্ব নিয়ে।’
‘রাখ সেসব কথা। সময় সব কিছু উড়িয়ে দেয়।’ পৃথা মন্দ্রাকে থামাতে চাইল।
‘কেন রাখব এসব কথা ?’ মন্দ্রা যেন বিচার চাইতে এসেছে, ‘নিজেকে তুই আমাদের সবার আগে সংস্কারমুক্ত করলি। তুই গর্ব করে বলতে শুরু করলি―পৃথা এখন প্রথার বাইরে। নিটশের বিয়েতত্ত্ব নিয়ে একদিন লাইব্রেরিতে তোর সঙ্গে আমার কত তর্ক! পরের দিন তুই বিগ থিঙ্কের মেরিনা অ্যাডশেড আর্টিকেল নিয়ে এলি। দুজনে সেসব নিয়ে মেতে উঠলাম। আমাদের সব সংস্কার একে একে ভেঙে পড়ছে আর আমরা যেন এক একজন ভাস্কো-দা-গামা, কলোম্বাস। নতুন নতুন পথ আর জায়গা আবিষ্কার করছি।’
‘কিন্তু এখন আমি বুঝেছি, বোঝার তখন আরও অনেক বাকি ছিল।’ পৃথা অন্যমনস্ক হয়ে কিছু একটা ভাবতে লাগল।
‘বোঝার তো বাকি থাকবেই। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত বোঝাপড়া চলতে থাকে।’ মন্দ্রা যেন কিছু একটার মীমাংসা করতে এসেছে, ‘তোর মনে আছে, সব কিছু তখন আমরা যুক্তির কড়া অ্যাসিডে পুড়িয়ে দেখতে শুরু করলাম। অ্যাসিড টেস্টে দেখি―টিকছে না তেমন কিছুই। সামান্য কিছুই টিকছে, তাও সন্দেহের লিস্ট থেকে পুরোপুরি বের হচ্ছে না। আমরা অবাক হয়ে ভাবলাম, এ কোন জগতে আমরা বাস করছি!… কী রে, শুনছিস ?’
অন্যমনস্ক অবস্থায় পৃথা বলল, ‘হ্যাঁ শুনছি।’ হেসে মন্দ্রার চোখে চোখ রেখে বলল, ‘আমরা বাস করছি নির্জলা লক্ষ কোটি মিথ্যা-গল্পের ফ্যান্টাসিময় জগতে। হলো ? তুই চুপ কর। কী খাবি বল ? দুপুরে তো খাসনি মনে হয় ?’
‘না, দুপুরে খাই না। সালাদ করে দিতে পারিস। আর কফি।’
পৃথা হেঁসেলখানায় গেল, আর সেই ফাঁকে মন্দ্রা নির্নিমেষ চোখে তাকিয়ে রইল অর্জুনের ছবিটির দিকে।
সালাদের একটা প্লেট মন্দ্রার হাতে ধরিয়ে আরেকটা প্লেট নিয়ে সোফায় বসল পৃথা। রোমান হরফ এল আকারের সোফা। তার অন্য পাশে বসে মন্দ্রা কাঁটা চামচ দিয়ে সালাদ মুখে তুলে বলল, ‘তোর নিশ্চয়ই মনে আছে পৃথা, ইউনিভার্সিটির ফাইনাল ইয়ারে আমাদের ডিবেটের বিষয় ছিল―বিয়ে এক বিষাক্ত প্রতিষ্ঠান। তুই পক্ষে। আমি বিপক্ষে। আর সেই তুই বিয়ে করে বসলি ?’
‘বিতর্ক আর বাস্তব জীবন কি এক ? বিতর্কে জেতার জন্য কত কিছুই তো বলতে হয়।’
‘কিন্তু তুই তো দারুণ লজিকে প্রমাণ করে দিলি―বিয়ে মানে হলো মানসিক দমন, মনস্তাত্ত্বিক পীড়ন। বিয়ে হলো বন্দিশেকল, নরকবাস। অথচ তুই-ই এখন নরকের বাসিন্দা হয়ে গেলি।’
‘নরকে না নামলে স্বর্গের স্বাদ ভালো করে বুঝব কী করে ?’ পৃথা হেসে বলল।
‘কিন্তু আমরা ঠিক করলাম―বিপ্লব করব। বড় বিপ্লব করার তো মুরোদ নেই, সেজন্য ছোটখাট হলেও বিপ্লব করব। বিপ্লবের শুরু হয়েছিল বিয়ে না করার সিদ্ধান্তের ভেতর দিয়ে। তুই ভুলে গেলি ?’
‘ভুলিনি।’ পৃথা ছোট্ট করে বলল।
মন্দ্রা পায়চারি করতে করতে বলল, ‘আমার সব স্পষ্ট মনে আছে; তুই ছিলি পক্ষদলের ক্যাপ্টেন, আমি বিপক্ষের। আমি বিয়ের পক্ষে শক্ত শক্ত যুক্তি দিলাম। কিন্তু তুই কড়া যুক্তির ধারালো তরবারি দিয়ে আমার বলা যুক্তিগুলো ফালা ফালা করে কাটতে লাগলি। তুই বললি, বিয়ের দরকার ছিল। নিশ্চয়ই দরকার ছিল। কিন্তু কখন ? যখন আদিম মানুষ এক পর্যায়ে অস্তিত্ব রক্ষার বিপদে পড়ে। ধরা যাক, পায়ে কাঁটা বিঁধেছে, এ জন্য আরেকটি কাঁটা দিয়ে পায়ের কাঁটা তুলতে হবে। তারপর কাঁটা তোলা হয়ে গেলে দুটো কাঁটাই একসঙ্গে ছুড়ে ফেলে দিতে হবে। মানুষ তার বিপন্ন হওয়ার কাঁটাখানি তুলতে গিয়ে বিয়ের কাঁটা আবিষ্কার করল। তারপর একসময় বিপন্নতা কাটল। কিন্তু কাঁটাটাকে ফেলল না। এখন তো মানবপ্রজাতি অস্তিত্ব সংকটে নেই। বরং অন্য সব প্রাণির সংকটের কারণ হয়ে উঠেছে। সুতরাং এখন তো বিয়ে-কাঁটার দরকার নেই। অথচ বিয়ের কাঁটা এখনও রয়ে গেল। আর সেই কাঁটা এখনও মানবজাতিকে খুঁচিয়ে যাচ্ছে। কী, খোঁচা খাচ্ছিস না ?’
‘খাচ্ছি। আমি এখন সেই কাঁটার খোঁচায় দিওয়ানা।’ পৃথা মুচকি মুচকি হাসল।
‘অথচ আমরা ঠিক করেছিলাম কাঁটার খোঁচা খাব না। কারণ আমাদের কোথাও কাঁটা ঢোকেনি যে সেই কাঁটা বের করতে আরেকটা কাঁটা লাগবে।’ মন্দ্রা সুপারফাস্ট এক্সপ্রেসের মতো বলতে থাকল, ‘তুই সেদিন রিসার্চ রেফারেন্স দিয়ে বললি, ৫ মিলিয়ন থেকে পৌনে দুই মিলিয়ন বছর আগে পর্যন্ত আদি মানুষের বিয়ের কোনও দরকার ছিল না। কিন্তু এরপর মানুষ দেখল, প্রতিকূল পরিবেশে তাদের বাচ্চারা শুধু মায়ের কাছে থাকলে মরে যাচ্ছে। কিন্তু চার-পাঁচ বছর বাবারা যদি মায়ের পাশে থাকে, তা হলে সেসব বাচ্চার বেঁচে যাওয়ার সুযোগ বাড়ছে। এভাবে শুরু হলো আদিম সময়ে এক সঙ্গে থাকার। কিন্তু ঐ বাচ্চার বয়স চার-পাঁচ হতেই কথিত বাবা-মা কিন্তু আবার আগের মতো আলাদা হয়ে যেত। কারণ মানুষ আসলে বহুগামী। অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই মানুষের মধ্যে রয়েছে বহুগামীর বৈশিষ্ট্য।’
পৃথা হেসে বলল, ‘তুই থাম। আমার সব মনে আছে।’
‘আবার নতুন করে শোন। নিজের কথাগুলোই শোন। তুই যখন বললি―মানুষ বহুগামী না হলে এখন এই ডায়াসে দাঁড়িয়ে বিতর্ক করার মতো আমরা কেউই থাকতাম না―তখন আমি চমকে গেলাম। ভাবলাম―কী সাংঘাতিক খারাপ কথা বলছে এই মেয়েটি। তুই রেফারেন্স দিয়ে বললি, এগুলো কাল্পনিক কথা নয়। ঘটনাটা ৭৪ হাজার বছর আগে। ইন্দোনেশিয়ার টোবা আগ্নেয়গিরি প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে ভয়ংকর অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। ভয়ংকর পরিবর্তন ঘটে পৃথিবীর জলবায়ুর। আর তাতে করে ক্রমশ বিলুপ্তির দিকে চলে যেতে থাকে অন্য অনেক প্রজাতির সঙ্গে মানুষও। এক পর্যায়ে সারা পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা নেমে আসে মাত্র তিন থেকে দশ হাজারে! সেই মহাবিপন্নের সময় মানুষের জিনে যদি বহুগামীর গুণাবলি না থাকত, তাহলে আমরা ডাইনোসরের মতো এই পৃথিবীতে এখন কেবল ফসিল হয়েই থাকতাম। আসলে জিন নীতিনৈতিকতা বোঝে না। জিন বোঝে শুধু বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে অস্তিত্ব রক্ষার মরিয়া চেষ্টা। মানুষ সেই কারণে প্রবলভাবে যৌনতাড়িত। এর মধ্যেই প্রোথিত করা আছে সবচাইতে বড় মাদক, সবচাইতে বড় এন্টারটেইনমেন্ট। আর সেই সুযোগে গড়ে উঠেছে যৌনসংক্রান্ত যত ব্যবসা আর নীতি।’
পৃথা হাসল, ‘তোর দেখি সব মুখস্ত! আমি কিন্তু তোর কথা মনে রেখেছি।’
‘আমার কী কথা ?’ মন্দ্রা মনে করতে চেষ্টা করল।
পৃথা কফি মেকার চালু করল, ‘তোর চিনি চলবে ? নাকি ছেড়ে দিয়েছিস ?’
‘আমার সুগার নেই। তারপরও নো সুগার। ওটা নাকি হোয়াইট স্লো পয়জন!’
‘বেশ! প্রাংশুও সুগার সহ্য করতে পারে না। আমি অত সচেতন নই। ভালো লাগাটাই আসল।’
‘তা বটে। জীবনটাই তো স্লো পয়জনের মতো। বিষাক্ত হতে হতে সবাই মৃত্যুর দিকে যাচ্ছি। সবই বিষ। অমৃত বলে কিছু নেই। দে, আমাকেও একটু সুগার দে।’
‘তুই সেদিনের ডিবেটে পরিবারের বন্ধনের কথা বললি।’ পৃথা কফি মগে ঢালতে লাগল, ‘ব্রোকেন পরিবারের বেশির ভাগ শিশুরা কত অসহায় হয়, কত অভাগা হয়, কত সহজে উচ্ছন্নে যায়―তার পরিসংখ্যান দিলি। আর প্রেমময় দাম্পত্য এই পৃথিবীতে কীভাবে স্বর্গ নামিয়ে আনতে পারে, তার উদাহরণ দিলি। তোর বাবা-মায়ের অপূর্ব ভালোবাসার সম্পর্কের কথা বললি। ঠাম্মা-ঠাম্মির বৃদ্ধ বয়সের সঙ্গী হিসেবে কীভাবে দাদুরা বটচ্ছায়া হয়ে আছে, তার কাব্যিক বর্ণনা দিলি। কী দারুণ সব খুনসুটির কথা বললি। সবাই তো হেসে খুন। কী যে হাততালি পেলি। আর বললি, আমরা এত নির্বোধ নই নিশ্চয়ই। তা হলে স্বার্থপরের মতো চুন থেকে পান খসলেই কিংবা একটুখানি মনোমালিন্য হলেই কেন মনে করব―সব শেষ হয়ে গেল ? ভাঙা সহজ। আছাড় মারো, ছুড়ে ফেলে দাও, ভাঙো সব বন্দিশালা। অথচ তিল তিল করে গড়ে তোলা কত কঠিন পরিশ্রমের। সেটাকে রক্ষা করাও পরিশ্রমের। আমরা আসলে পরিশ্রম করতে চাই না। স্যাক্রিফাইস করতে চাই না। তাই সম্পর্ক রক্ষাতেও যত্নবান হই না।’
‘বলেছিলাম বটে।’ মন্দ্রা সারেন্ডার করে বলল, ‘পক্ষে বলতে হবে, তাই বলেছিলাম। কিন্তু বিষবৃক্ষতুল্য সম্পর্ক যত্ন করে রক্ষা করার কী দরকার ?’
পৃথা হাসে, “তুই এটাও বলেছিলি, ‘এখন আমরা অনেকেই আমাদের সঙ্গীর ওপর আর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল নই। এই জন্য অনেকেই মনে করে, কেন স্যাক্রিফাইস করব ? অথচ একটুখানি স্যাক্রিফাইস কিংবা মানিয়ে চলতে পারলে দাম্পত্যের জমিনে আমরা অমরাবতী তৈরি করতে পারি। যেমনটি আমাদের অনেকেরই বাবা-মা পেরেছেন। সেই অমরাবতী কল্পিত স্বর্গের চেয়েও সুন্দর। আমরা সেসব স্বর্গতুল্য পরিবারে বড় হয়েছি।’ … জানিস মন্দ, তোর এসব কথা শুনে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। যদিও আমার জিভের তরবারি দিয়ে তোর লজিকগুলো সপাং সপাং করে কাটতে দ্বিধা করিনি। আমি বিপক্ষ দলের অধিনায়ক, সুতরাং আমাকে তো বিয়ের বিপক্ষে থাকতেই হবে।”
মন্দ্রা হাসল, ‘তুই তো তখন প্রাংশুর প্রেমে গলা পর্যন্ত ডুবে ছিলি, তাই না ?’
‘শুধু ডুবে ছিলাম ? রীতিমত ক্রেজি ছিলাম। প্রাংশুর দিকে কোনও মেয়ে তাকালে তাকে খুন করতে ইচ্ছে করত। প্রাংশু কোনও সহপাঠী মেয়ের সঙ্গে হেসে কথা বললে হিংসেয় জ্বলে উঠতাম।’ পৃথা কফিতে চুমুক দিয়ে একটুখানি থেমে বলে, ‘কিন্তু তোর লজিক শোনার পর আমি বাড়িতে এসে অ্যানসিয়েন্ট হিউম্যান নিয়ে বিস্তর পড়ালেখা করি। ইন্টারনেট ঘেঁটে ঘেঁটে নিজেই ঘণ্ট হয়ে যাই। ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরি থেকে এই সংক্রান্ত কত যে বই তুলি! সেসব পড়ে মাথা খারাপ হয়ে যায়। ছয় মাস পর অন্য মানুষ হয়ে যাই।’
‘তারপরই কি তুই বুঝতে পারলি―তুই আসলে প্রাংশুকে না, আমাকে ভালোবাসিস ?’ মন্দ্রা কফিতে চুমুক দিল।
চমকে ওঠে পৃথা, মন্দ্রার দিকে তাকিয়ে বিহ্বল হাসি দেয়, ‘না। কী জানি! হয়তো বা। কিন্তু কেন জানি এর পর প্রাংশুকে দেখলে রাগ হতো। পার্কে বসে প্রেম করার সময় প্রাংশু আদর করতে এলে অসহ্য লাগত। ঠোঁটে ঠোঁট বন্দি করতে চাইলে আপত্তি করতাম। অথচ আগে এসব কতই না ভালো লাগত! সারা শরীরে শিহরণ খেলত। ক্রমশ মনে হতে লাগল আমি বন্দি হয়ে গেছি। কারণ, আরও এক বছর আগেই আমরা গোপনে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করেছি যে! চাইলেই তো আর প্রাংশুকে ছেড়ে দিতে পারি না।’
‘প্রাংশুর সঙ্গে তোকে দেখলে আমার কিন্তু ভীষণ রাগ আর হিংসে হতো। কিন্তু কী আর করার।’ মন্দ্রা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
পৃথা চুপচাপ কফিতে চুমুক দিতে লাগল। মন্দ্রা ফোন বার করে ইউটিউব ঘেঁটে মৃদু ভলিউমে একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়ল―‘কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া/তোমার চরণে দিব হৃদয় খুলিয়া/চরণে ধরিয়া তব কহিব প্রকাশি/গোপনে তোমারে, সখা, কত ভালোবাসি।’
পৃথার হাত ধরল মন্দ্রা। যেন বিদ্যুতের শক খেল―শিউরে উঠল পৃথা।
‘ভেবেছিনু কোথা তুমি স্বর্গের দেবতা,/কেমনে তোমারে কব প্রণয়ের কথা।/ভেবেছিনু মনে মনে দূরে দূরে থাকি/ চিরজন্ম সঙ্গোপনে পূজিব একাকী―/কেহ জানিবে না মোর গভীর প্রণয়,/কেহ দেখিবে না মোর অশ্রুবারিচয়।’
গান বন্ধ করল মন্দ্রা।
কফির মগ বেসিনে রাখতে রাখতে পৃথা বলল, ‘দূরে দূরে থাকার ইচ্ছাতেই কি তুই পিএইচডি করতে ফিনল্যান্ড চলে গেলি ?’
‘হ্যাঁ। কী বোকা ছিলাম! তাই না ?’
‘বোকা ? তাই তো! আরও পরে বুঝলাম, স্বাধীনতাই শেষ কথা। সব ধরনের বন্ধন থেকে মুক্ত হতেই হবে’, একটু নাচের মুদ্রায় হাত নাচিয়ে বলল পৃথা, ‘আমরা চঞ্চল, আমরা অদ্ভুত।/ আমরা বেড়া ভাঙি,/আমরা অশোকবনের রাঙা নেশায় রাঙি,/ ঝঞ্ঝার বন্ধন ছিন্ন করে দিই―আমরা বিদ্যুৎ।’
মন্দ্রা মুগ্ধ হলো, ‘এখনও কী সুন্দর আবৃত্তি করিস তুই! বেড়া ভাঙতে যখন আপত্তি নেই, বন্ধন ছিন্ন করতেও; তা হলে প্রাংশুকে এখনও ধরে রেখেছিস কেন ?’
‘এমনিই। ছাড়তে পারি কিন্তু কেন ছাড়ব ?’
‘বন্ধন-মুক্ত হতে।’
‘আমরা তো বন্ধন মুক্তই। আমরা দুজনেই মুক্ত। কেউ কারও স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করি না।’
‘কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক একটা বন্ধন তো থেকেই যায়, তা-ই না ?’
‘না। তাও নেই।’
‘তা হলে অ্যাসিড টেস্ট হয়ে যাক।’
‘কী অ্যাসিড টেস্ট ?’
মন্দ্রা উঠে দেয়ালে টানানো অর্জুনের ছোটবেলার ছবিটার দিকে এগিয়ে গেল, ‘আমি সিঙ্গেল মাদার হতে চাই। অনেক দিনের শখ মাতৃত্বের স্বাদ নেব। অর্জুনকে খুব পছন্দ হয়েছে আমার। প্রাংশুকে কয়েক দিনের জন্য দিবি আমার গর্ভধারণের জন্য।’
‘প্রাংশুর সিমেন নিবি, বেশ তো। আমার আপত্তি কীসের ? এটা প্রাংশুর ব্যাপার।’ পৃথা হাসল।
‘প্রাংশুর সিমেন আর আমার এগ নিয়ে ল্যাবরেটরিতে জাইগোট তৈরি করব না। ন্যাচারাল ভাবে করতে চাই। তাতে প্রাংশুর সঙ্গে যতদিন সহবাস করতে হয় আর কী!’ মন্দ্রা যেন বোমা ফাটাল।
কিন্তু পৃথার মনের মধ্যে বোমাটা ফাটল না। পৃথা হাসল, ‘একটু পরেই প্রাংশু আসবে অফিস থেকে। ওকেই জিজ্ঞেস করিস, ও রাজি কি না!’
‘তোর আপত্তি নেই তো!’
অর্জুন এই সময় ঘরে ঢুকে পৃথাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘খিদে লেগেছে মাম্মি।’
পৃথা অর্জুনকে জড়িয়ে ধরে দুলতে দুলতে মন্দ্রার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘একদমই না। তুমি মোর পাও নাই পরিচয়।’
‘আমার খিদে লেগেছে, সত্যি বলছি মাম্মি।’
পৃথা হাসল, ‘জানি বাবা। চল খাবে।’
৩
বসন্তের দিনান্তে, মধ্যপ্রহরে নিরিবিলি বৃক্ষছায়াঢাকা ছাদ যেন এক টুকরো বিজন দ্বীপ হয়ে যায়। সেই বিজন দ্বীপে তারা তিন জন এসে মাদুর পেতে বসে। সঙ্গে রাশিয়ান ভোদকা। মন্দ্রা এনেছে ফিনল্যান্ড থেকে। সবাই এক পেগ পান করতেই কল্পনার ডানা অল্প অল্প করে মেলতে শুরু করল। প্রাংশু মোবাইলে গান ছাড়ল―‘আহা, আজি এ বসন্তে এত ফুল ফুটে,/ এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়…।’
পৃথা বলল, ‘গান বন্ধ করো প্রাংশু।’
প্রাংশু সুবোধ বালকের মতো গান বন্ধ করল।
মন্দ্রা দ্বিতীয় পেগ ঢালতে ঢালতে বলল, ‘আজ একটা খেলা খেলব। ক্যানডিড গেম। অকপট সত্য প্রকাশের খেলা। আমাদের সবার জীবনেই অনেক গোপন কথা আছে। গোপন অনুভূতি আছে। একেকটা বোমা। সেগুলো ফাটাব আজ।’
প্রাংশু বলল, ‘না। গোপন কথা গোপন থাকে বলেই আমরা সমাজে মুখ দেখাতে পারি।’
মন্দ্রা পানীয় বিলি করতে করতে বলল, ‘আমরা তো মাইকে চিৎকার করে কাউকে শোনাচ্ছি না। অটোবায়োগ্রাফিও লিখছি না। কিন্তু কতখানি সংস্কারমুক্ত হলাম, নিজেদের কতখানি মুক্তপ্রাণ ভেবে আত্মশ্লাঘা বোধ করি, তার একটা রিহার্সেল হয়ে যাক, যদি সেই সাহস আমাদের থাকে।’
পৃথা বলল, ‘আমার সাহস নেই। আমি ভীতু।’
প্রাংশু ভ্রƒ কুচকে পৃথার দিকে তাকাল। কী ভাবল। তারপর লম্বা একটা চুমুক দিয়ে বলল, ‘আমি খেলব।’
মন্দ্রা হেসে বলল, ‘পৃথার গোপন কথা জানতে চাও, তাই না প্রাংশুদা ?’
‘না, সবাই সবার পাপ জানতে চাই।’
পৃথা বলল, ‘এখানে আমার আপত্তি আছে গোপন কথাকে পাপ বলতে। পৃথিবীর কেউই পাপ করতে চায় না। সুতরাং পাপ বলে কিছু নেই। যা করে সেটা হলো―ভুল। ভুল তো ভুলই।’
‘খুনও কি তা হলে ভুল ?’ প্রাংশু গ্লাসে রসিয়ে এক চুমুক দিয়ে জানতে চাইল।
‘ভুল তো বটেই। ভয়ংকর ধরনের ভুল। আসলে পাপের সঙ্গে পুণ্যের সম্পর্ক, পাপ-পুণ্যের সঙ্গে স্বর্গ-নরকের সম্পর্ক, যার পুরোটাই আদিম ফ্যান্টাসি।’
মন্দ্রা বলল, ‘রাইট। পাপ বলে কিছু নেই। আমরা যা করি, ভালো মনে করেই করি। কিন্তু পরে যদি বিবেকের দংশন হয়, তখন বুঝতে পারি ভুল করেছি।’
প্রাংশু নিজেই আরেক পেগ ঢেলে নিল। তারপর আরও লম্বা চুমুক দিয়ে বলল, ‘তা হলে সংশোধন করে বলি―আমাদের জীবনে যেসব ঘটনায় আমাদের বিবেকের দংশন হয়েছে, সেসব ঘটনা আমরা অকপটে বলব। তাই তো মন্দ্রা ?’
‘হ্যাঁ প্রাংশুদা। তা হলে চলো―আমরা শপথ করি। তোমরা সামনে শুধু হাত নাও, বলতে হবে না। আমি শপথবাক্য বলছি―আমরা শপথ করছি যে, এই বিশ্বজগতে আমাদের কারও কোনও পিছুটান নেই, কারও কোনও দায়বদ্ধতা নেই। আমরা কেউ কারও প্রতি অনুরাগ বা বিরাগবশত পক্ষপাতদুষ্ট কিংবা বৈরী মনোভাবাপন্ন নই। আমাদের কোনও ভয় নেই, পুরস্কার নেই, তিরস্কারও নেই। যতদূর ডানা মেলা যায় তত দূর পর্যন্ত আমরা আজ স্বাধীন ভাবনার ডানা মেলব। মুক্ত বিহঙ্গের মত উড়ব আকাশের যে কোনও প্রান্তে। জোরজবরদস্তি নেই, শাসন-শোষণ-নিষ্পেষণ, মনস্তাত্ত্বিক চাপ নেই। আমরা আজ মুক্ত। যার যা ভালো লাগে, তা-ই করব। আমরা আমাদের তথাকথিত পাপের কথা বলব, বিবেক দংশনের কথা বলব। তা হলে শুরু করা যাক। প্রথমে প্রাংশুদা বলবে।’
প্রাংশু আপত্তি করল, ‘আমি প্রথমে না, শেষে। পৃথা প্রথমে।’
পৃথা বলল, ‘মন্দ্রার আইডিয়া, মন্দ্রাই শুরু করুক।’
মন্দ্রা হেসে বলল, ‘ঠিক আছে। ক্লাস টেনে পড়ার সময় কম্পিউটারে গোপনে অনেকগুলো নীলছবি দেখে নেশার মতো হয়ে যায়। একদিন কৌতূহল মেটাতে গিয়ে…।’
পৃথা থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘সেক্সুয়াল ব্যাপারে সবারই নানা ঝামেলা থাকে। এটা বাদ। এটা বাদ দিয়ে অন্য বিষয়ে।’
প্রাংশু বলল, ‘না, এটা বাদ যাবে না।’
পৃথা বিরক্ত হলো, ‘তা হলে তোমারটা আগে বলো শুনি।’
প্রাংশু বলল, ‘আমার তখন দশ বছর বয়স। মামাবাড়ি ছিল বিজন পাড়াগাঁয়ে। কার্তিকের সন্ধ্যায় সমবয়সী মামাতো ভাই শুভ্রর সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেঁজুর গাছ কাটা দেখছি। একজন গাছি উঠেছে খেঁজুরের রসের হাঁড়ি টানাতে। আর সেই গাছের নীচেই দুটো কুকুর-কুকুরী কামকলায় মত্ত হয়ে আছে। শুভ্র ফিচফিচ করে হাসতে থাকে। আমি তখন জেনে গেছি, কেন ওরা অমন করছে। শিহরিত হতে থাকি। একটু পর দেখি কুকুর-কুকুরী লক হয়ে গেছে। শুভ্র ঢিল মারে। ওরা ক্যাউ ক্যাউ করে, কিন্তু পালাতে পারে না। আমরা আরও মজা পেয়ে যাই। আরও ঢিল ছুড়ি। গাছি কাকু নেমে এসে বলে, ঢিল ছুড়তে নাই বাবারা, ওদের আনন্দ করতে দাও। এই বলে গাছি অন্য গাছে উঠল। আর সেই সময় আমার মাথায় ভয়ানক একটা দুর্বুদ্ধি খেলে গেল। ঐ গাছির আরেকটা কাস্তে এক গাছা দড়ির মাঝখানে মাটির ওপর রাখা ছিল। আমি কাস্তেটা নিয়ে দৌড়ে গিয়ে কুকুর দুটোর মাঝখানে গিয়ে ওদের লক কেটে দিলাম, মানে কুকুরের পেনিস কেটে দিলাম। মেয়ে কুকুরটা পালাল। আর ছেলে কুকুর ত্রাহি চিৎকার করতে করতে অদূরে গিয়ে ছটফটাতে লাগল। আমি দেখলাম, কেমন বেদনার্ত তার দৃষ্টি। যেন অভিশাপ দিচ্ছে আমায়! গাছি কাকু নেমে এসে কাস্তেতে রক্ত আর অদূরে কুকুরের ছটফটানি দেখে অবাক হয়ে গেলেন। বললেন, কী করেছিস তুই ? আমি ভয় পেয়ে চুপ করে রইলাম। কাকু আমার হাত থেকে কাস্তে ছিনিয়ে নিয়ে বললেন, মহাপাপ করলি। মহাপাপ করলি। উনি মাথা দোলাতে দোলাতে চলে গেলেন। পরের দিন আমি মামাবাড়ি থেকে চলে আসি। সপ্তাহখানেক পর শুভ্র টেলিফোন করে জানাল কুকুর দুটো মারা গেছে। আমার ভীষণ খারাপ লাগল। পৃথা তোমারটা বল।’
পৃথা হাসল, ‘ঠিক আছে। তরতাজা ঘটনা শোনাই তা হলে। শোনো, মন্দ্রা সিঙ্গেল মা হতে চায়। তোমার সিমেন চায়। সরাসরি সহবাস করে দেবে, নাকি সিমেন ডোনেট করবে ?’
প্রাংশু হাসল, ‘কী বলছ এসব ?’
মন্দ্রা বলল, ‘হ্যাঁ প্রাংশুদা। অর্জুনকে আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। মা হতে চাই, আমি সরাসরি তোমাকে চাইছি। প্রাকৃতিক উপায়ে।’
প্রাংশু বিব্রত হলো, ‘আরে না না। তাই হয় নাকি ? বড় জোর সিমেন ডোনেট করতে পারি। সব নিয়ম মেনে। পৃথা তোর একটা ঘটনা বল।’
পৃথা হাসল, ‘একবার স্বপ্নে দেখলাম আমার খুব পছন্দের একজন পুরুষের সঙ্গে ভীষণ ঘনিষ্ঠ হয়ে আছি। অপূর্ব পুলকে সারা শরীর শিউরে উঠছে। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়, দেখি, প্রাংশু আমার সঙ্গে ধস্তাধস্তি করছে। মেজাজটা খারাপ হয়ে যায়।’
প্রাংশুর মুখ কালো হয়ে যায়। মন্দ্রা হো হো করে হেসে ওঠে। বলে, ‘আমি কিন্তু প্রাংশুদার কথা ভেবে সেক্সচুয়াল ফ্যান্টাসি করেছি অনেক বার।’
প্রাংশুর মুখ এবার লাল হয়ে যায়।
হঠাৎ পৃথার ফোন বেজে ওঠে। শাশুড়ি মা জানাল, অর্জুনের পেট ব্যথা করছে। মা মা করছে।
পৃথা লাফ দিয়ে উঠল, ‘আমি যাই।’
সুর কেটে গেল আড্ডার। মন্দ্রা বলল, ‘আমরাও যাই।’
প্রাংশু বলল, ‘আমি আরেকটু ছাদে থাকি, কবিতার কয়েকটা লাইন মাথায় এসেছে, তোমরা যাও।’
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মন্দ্রা বলল, ‘প্রাংশুদা কবিতা লেখে নাকি ?’
পৃথা শুধু ‘হু’ বলল।
মন্দ্রা বলল, ‘তুই কি মাইন্ড করেছিস আমার ওপর ?’
‘আরে না। পাগল নাকি। মাইন্ড করব কেন ? তবে আমি কিন্তু জানতাম প্রাংশু সরাসরি সেক্সে রাজি হবে না।’
‘কেন ? তোর ভয়ে ?’
পৃথা হাসল, ‘মোটেই না। পরে তোকে বলব।’
৪
অন্ধপুত্র ধৃতরাষ্ট্রকে জন্ম দেওয়ার পর অম্বিকা পুনরায় ঋতুমতী হন। মহর্ষি ব্যাসের রূপ দেখে অম্বিকার সতিন অম্বালিকা ভয়ে পাণ্ডুবর্ণ হয়ে গিয়েছিলেন। অম্বিকা তাই ভাবলেন, নিজে না গিয়ে অপরূপ দেখতে এক দাসীকেই বরং পাঠিয়ে দেওয়া যাক। অপ্সরার মতো সুন্দরী সেই দাসীকে দেখে ব্যাস মুগ্ধ হলেন। দাসীর ব্যবহার ও পরিচর্যায় দারুণ তুষ্ট হলেন। ব্যাসের অনুগ্রহে সেই দাসীর গর্ভে জন্ম নিলেন ধর্মদেব, নাম রাখা হলো বিদুর।
কিন্তু কেন ধর্মদেবকে দাসীগর্ভে শূদ্র হয়ে জন্ম নিতে হলো ? এটা জানতে হলে আমাদের আরেকটি কাহিনির অলিন্দে হাঁটতে হবে―সেটি হলো ঋষি মাণ্ডব্যের কাহিনি।
তপস্বী মাণ্ডব্য সবসময় চুপচাপ থাকেন। একবার চোরদের ধরতে গিয়ে রক্ষীরা চোরসমেত মাণ্ডব্যকেও ধরে নিয়ে রাজার বিচারালয়ে নিয়ে আসে। মৌনব্রত মাণ্ডব্য মগ্ন থাকেন তার তপস্যায়। অথচ মাণ্ডব্যকে অপরাধী মনে করে চোরদের সঙ্গে শূলে চড়ানো হয়। কিন্তু মাণ্ডব্য তো অপরাধী নন, ঋষি, সুতরাং শূলে চড়ানো হলেও তিনি বেঁচে থাকেন। অবাক হয়ে যায় উপস্থিত সবাই। রাজা মাণ্ডব্যের পরিচয় জানতে পেরে লজ্জিত হন। তাঁকে শূল থেকে নামানো হয়। কিন্তু শূলের অগ্রভাগ ভেঙে গেঁথে থাকে মাণ্ডব্যের দেহের সঙ্গে। তার নাম হয়ে যায় অণী মাণ্ডব্য। অর্থাৎ শূলের অগ্রভাগবিদ্ধ মাণ্ডব্য।
কী এমন অপরাধ করেছেন অণী মাণ্ডব্য, যার জন্য তাঁকে এমন শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে ?
ধর্মদেবের সঙ্গে দেখা হলে মাণ্ডব্য যখন এই প্রশ্ন করেন, তখন ধর্ম জানান, ‘বাল্যকালে আপনি একটি পতঙ্গের পুচ্ছদেশে তৃণ গেঁথে দিয়েছিলেন, সেই অপরাধে শূলের অগ্রভাগ ভেঙে গেঁথে রয়েছে আপনার দেহের সঙ্গে।’
মাণ্ডব্য এ কথা শুনে ক্ষিপ্ত হলেন। বললেন, ‘আপনি আমাকে লঘুপাপে গুরুদণ্ড দিয়েছেন। এজন্য আমার অভিশাপে আপনি দাসীগর্ভে শূদ্র হয়ে জন্মগ্রহণ করবেন। আর আজ আমি এই বিধান দিচ্ছি, বারো বছর বয়সের আগে কেউ কিছু করলে তা পাপ বলে গণ্য হবে না।’
৫
মন্দ্রা মা হতে পেরে যেন নতুন জীবনে প্রবেশ করল। নতুন অনুভূতির জীবনে। এমন অপূর্ব জীবনানন্দ উপলব্ধি করা যায় না, মা হওয়ার সরাসরি অভিজ্ঞতা না থাকলে। হেলসিঙ্কিতেই অব্যয়ের জন্ম হয়। এক বছরের ছোট্ট অব্যয়কে নিয়ে পৃথার বাড়িতে আবার এসেছে মন্দ্রা। প্রায় দুই বছর পর দুজনের আবার দেখা। জরুরি একটা বার্তা দিতে এসেছে মন্দ্রা। ফোনে বলা যেত তবে বার্তাটা সরাসরিই দেওয়া ভালো।
অব্যয়ের জন্য পুরো একটা ঘর সাজিয়ে রেখেছে পৃথা। সেই ঘর থেকে অর্জুন সরতেই চাইছে না। ওর বয়স এখন দশ। ছোট্ট অব্যয়কে কোলে নিয়ে বসে আছে, কিছুতেই ছাড়তে চাইছে না। পৃথা বলল, ‘তুই কিন্তু ওর দাদা। দাদা হয়ে ভাইকে ব্যথা দিস না যেন।’
মন্দ্রা হাসল, ‘তুই বাচ্চা দেখলে আদর করতে ছুটে যেতি। এখনও তেমনই আছিস।’
‘পৃথিবীর সব শিশু আমার সন্তান। রাস্তার পাশে ধুলোমাটি মাখা শিশুদের দেখলে আমার বুকটা হু হু করে। মনে হয় আমার সন্তানই তো! ওরা কেন কষ্ট করছে ? আমি কেন ওদের ফেলে নিজের সাজানো ঘরে চলে যাচ্ছি ? আমি কীসের মা ?’ পৃথা চোখ মুছল। তারপর কফি মেকার চালু করে বলল, ‘তুই কী যেন বলতে চাস ? আমি কিন্তু এখনও বাচ্চাদের মতো, কৌতূহল দমন করতে পারি না।’
‘বাচ্চাদের মতো না, তুই এখনও বাচ্চাই হয়ে আছিস। শোন, চমকে উঠিস না, আমি প্রাংশুর মাধ্যমে আবার কনসিভ করতে চাই। এবার সরাসরি কনসিভ করব। প্রাংশুকে একবার টেস্ট করে দেখতে চাই।’
পৃথা হাসল, ‘তুই এতদিন কত জন পুরুষকে টেস্ট করেছিস ?’
‘অসংখ্য। গুনে দেখিনি। পৃথিবীর সুপুরুষরা হলো ফুলের বনের মতো। ফুলের বনে যার পাশে যাই তারেই লাগে ভালো। বিশেষ করে হেলসিঙ্কিতে।’
‘আমাকে এখন আর তোর ভালো লাগে না ?’ পৃথা কফির মগ এগিয়ে দিল মন্দ্রার দিকে।
‘আগে লাগত, এখন অতটা লাগে না। মন চেঞ্জ হয়েছে।’ মন্দ্রা কফিতে চুমুক দিয়ে বলল।
‘তাই তো! মন তো চেঞ্জ হবেই। মরে গেলে মানুষ ছাই হয় অথবা পচে যায়। আর বেঁচে থাকলে নাকি বদলায়।’
‘আমি তোকে আমার এক বয়ফ্রেন্ডের কথা বলতে পারি। মৃণাল। দুর্ধর্ষ সুপুরুষ। ওকে টেস্ট করে দেখ।’ পৃথা কফিতে শব্দ করে চুমুক দিয়ে তৃপ্তির ভঙ্গিতে কথাটা বলল। তারপর একটুখানি কী যেন ভাবল―কফিতে আরেকবার চুমুক দিয়ে বলল, “যদিও আমার একটু হিংসে হবে। কিন্তু মৃণাল রমনীমোহন, ওর অনেক সঙ্গিনী। আমি একদিন ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোর অন্তরঙ্গ গার্লফ্রেন্ড কত জন রে ? ও যা বলেছে, তা শুনে আমি হেসে খুন। মজার ব্যাপার কী জানিস, নীল আলোয় আমরা নীল সৈকতে ভাসছিলাম আর হালকা ভলিউমে গান বাজছিল―চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে। ও শীর্ষসুখে কেঁপে কেঁপে উঠে গানের তালে বলল, ‘ফুলের বনে যার পাশে যাই তারেই লাগে ভালো।’ তারপর বলল, ‘আমার লৌহদণ্ড-বাবাজিকে দিয়ে শত শত বান্ধবীর ভেতরে এত বেশি শান দিয়েছে, যদি লৌহদণ্ড-বাবাজি সত্যিকারের লোহার হতো তা হলে এত দিনে ক্ষয় হয়ে সুচের সাইজ হয়ে যেত।’ মৃণালের কথা শুনে আমি হেসেই খুন।”
মন্দ্রা হো হো করে হেসে উঠল, ‘সত্যিই মানুষের জিনে কী ভাবে গেঁথে রয়েছে মানব অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অব্যর্থ ওষুধ। প্রকৃতির বিরুদ্ধে আমরা যাব কী করে, বল ?’
‘প্রকৃতির বিরুদ্ধে যাব না, ঠিক আছে। কিন্তু বিশ্বাসও ভঙ্গ করা উচিত না। পৃথিবীতে মানুষ একমাত্র প্রাণি যাদের জন্ম হয় জন্তু হিসেবে, কিন্তু দেশ-সমাজ-পরিবেশ আর শিক্ষার মাধ্যমে যাদের ক্রমশ মানুষ হয়ে উঠতে হয়। যদিও সব সুযোগ পেয়েও অনেকেই শেষ পর্যন্ত মানুষ হতে পারে না। বিশ্বাস রক্ষা হলো মানুষ হওয়ার প্রধান শর্ত।’ পৃথা বলল।
‘নিশ্চয়ই। তুই কি প্রাংশুর বিশ্বাস ভঙ্গ করছিস না ? বিয়ে করা মানেই বিশ্বাসের দাসত্ব, আর বিশ্বাসভাজন থাকার মানসিক যন্ত্রণা।’ মন্দ্রা পুনরায় বিয়ের যন্ত্রণা মনে করিয়ে দেয়।
‘না। প্রাংশুর সঙ্গে আমার কোনও বিশ্বাস ভঙ্গের ব্যাপার নেই। কারণ আমাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে অনেক আগেই। আমরা ডিভোর্স দিয়ে লিভ টুগেদার করি। দুজনেই স্বাধীন। কারণ বিয়ে মানে একটি অসুখী দাম্পত্যে আটকা পড়া, বিয়ে মানে সঙ্গীর ওপর নির্ভরশীলতা, বিয়ে মানে সময়ের সাথে সাথে আকর্ষণ কমতে থাকা, বিয়ে মানে ব্যক্তিত্বকে ক্ষতবিক্ষত করা। এটা দুজনেরই। সে জন্য আমরা মুক্ত হয়ে এক সঙ্গে থাকি। কারও কোনও পিছুটান নেই। আমরা কেবল বিশ্বস্ত বন্ধু। প্রাংশু এমনিতে খুব ভালো ছেলে।’
‘তা হলে প্রাংশু কেন রাজি হয় না আমার সঙ্গে সরাসরি সহবাসে ?’ মন্দ্রা কফিতে শেষ চুমুক দেয়।
পৃথার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, ‘সেটা আমি তোকে বলতে পারব না। তবে তোকে সাবধান করে রাখি, তুই ভুলেও প্রাংশুর সঙ্গে এ কাজ করিস না। বিপদে পড়বি।’
৬
গহিন অরণ্যে কিমিন্দম মুনি ও তাঁর স্ত্রী সন্তান লাভের ইচ্ছায় হরিণ-হরিণীরূপ ধারণ করে মিলিত হলেন। সর্বশরীরের যেন ইন্দ্রিয়সুখ ছড়িয়ে পড়ছে তাঁদের। বিচিত্রবীর্যের কনিষ্ঠ সন্তান পাণ্ডু মৃগয়ায় বেরিয়ে দুটি হরিণ একসঙ্গে পেয়ে শর ছুড়ে মারেন। সঙ্গমরত কিমিন্দম মুনি ছিটকে পড়লেন শরাঘাতে। বিস্ময়াহত চোখে পাণ্ডুকে দেখে বললেন, ‘তুমি এটা কী করলে ? কোনও ধীমান পুরুষ মৈথুনরত মৃগ-দম্পতিকে হত্যা করে না।’
কিমিন্দম মুনির নাভিশ্বাস উঠল, তিনি শেষ কথা বললেন, ‘তোমাকে অভিশাপ দিলাম, স্ত্রী সঙ্গমকালে তোমারও মৃত্যু হবে।’
পাণ্ডু ভয় পেয়ে যান। এ কী ভয়াবহ অভিশাপ! বিলাপ করতে থাকেন তিনি―সন্ন্যাস নেবেন, সংসার ত্যাগ করবেন। মৃগয়া থেকে ফিরলে পাণ্ডুর নিকট সব শুনে তাঁর স্ত্রীদ্বয় বললেন, আমরা ইন্দ্রিয় সংযম করব। কিন্তু ঋষিরা বললেন, পাণ্ডুর দেবতুল্য পুত্রসন্তান হবে। সেটা কীভাবে সম্ভব ? পাণ্ডু নির্জনে এক দিন কুন্তীকে বললেন, ‘আপৎকালে স্ত্রীলোক উত্তমবর্ণের পুরুষের মাধ্যমে পুত্রলাভ করতে পারে। তুমি জানো, আমি বিচিত্রবীর্যের পুত্র হলেও মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন থেকে আমার জন্ম হয়েছে। সুতরাং তুমি সন্তানলাভের চেষ্টা করো।’ পাণ্ডুর ইচ্ছানুযায়ী কুন্তী দুর্বাসার দেওয়া মন্ত্রবলে দেবতাদের আহ্বান করে একে একে পঞ্চপাণ্ডবের জন্ম দিলেন। পাণ্ডুর দ্বিতীয় স্ত্রী দেখলেন, তার সতিন কুন্তীই কেবল মা হচ্ছেন। তার তা হলে কী হবে ?
একদিন একান্তে মাদ্রী স্বামী পাণ্ডুকে বললেন, ‘আপনি কুন্তী রানিকে বলুন তিনি যেন আমাকেও কোনও দেবতার মাধ্যমে সন্তান লাভের ব্যবস্থা করেন।’
পাণ্ডুর অনুরোধে কুন্তী মন্ত্র শিখিয়ে দিলেন মাদ্রীকে। কিন্তু মাদ্রী লোভে পড়ে একসঙ্গে যমজ দেবতাকে ডাকলেন। জন্ম হলো নকুল-সহদেবের। এরপর মাদ্রী আরও পুত্র চায়। মাদ্রীর ইচ্ছার কথা পাণ্ডু আবারও জানালেন কুন্তীকে। কুন্তী এবার বেঁকে বসলেন। বললেন, ‘মহারাজ। আমাকে আর অনুরোধ করবেন না। মাদ্রী আমাকে প্রতারিত করেছে। সে এক দেবতাকে না ডেকে একসঙ্গে দুজনকে ডেকেছে। সে মিথ্যাচারী।’
কিন্তু মাদ্রী তখন আরও সন্তানলাভে মরিয়া।
একদিন নির্জন বেলায় মাদ্রী পাণ্ডুকে একা পেয়ে তাঁর মোহিনীরূপ ধারণ করল। মাদ্রীর অপূর্ব রমনীয় রূপে পাণ্ডুর সংযমের বাঁধ ভেঙে গেল। এবং সর্বনাশ যা হওয়ার হলো। মৈথুনকালে মৃত্যু হলো পাণ্ডুর।
কুন্তী এসে দেখলেন দিগম্বরী মাদ্রী কাঁপছে, পাশে পড়ে আছে পাণ্ডুর নিস্পন্দ দেহ। শোকাহত মাদ্রী স্বামীহত্যার অনুতাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে সহমরণে উঠে গেলেন পাণ্ডুর চিতায়।
৭
বাড়িতে পুলিশ এবং সাংবাদিকে ছেয়ে গেছে। এরা যেন পিঁপড়ের মতো! উলটে যাওয়া আরশোলার গন্ধ কোথা থেকে যে পায়! পৃথা যতটা সম্ভব শক্ত থাকার চেষ্টা করছে। অর্জুন আর অব্যয়কে দু পাশে বুকে জড়িয়ে রেখেছে।
সাংবাদিকরা বিচিত্র সব প্রশ্ন করে চলেছে―
‘প্রাংশু এবং মন্দ্রা কী করে এক সঙ্গে মারা গেল, আপনার কোনও ধারণা আছে ?’
‘না।’
‘তাদের ইন্টারকোর্স করা অবস্থায় মৃত পাওয়া গেছে। কারণ কী ?’
‘প্রাংশু ইম্পোটেন্ট ছিল।’
‘ইম্পরট্যান্ট।’
‘ইম্পরট্যান্ট না ইম্পোটেন্ট।’
‘তা হলে ? কারণটা কী ?’
‘কী করে বলব ?’
‘পুলিশ কড়া যৌনবর্ধক ওষুধের খোসা পেয়েছেন। আপনার কি মনে হয় হার্ট অ্যাটাক করেছে ?’
‘সেটা পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলবে।’
‘তা হলে আপনার বন্ধু মন্দ্রা কেন মারা গেল ?’
‘সেটাও পুলিশকে জিজ্ঞেস করুন। আমাকে একটু একা থাকতে দিন প্লিজ।’
পৃথা আর কোনও কথা বলল না। হঠাৎ মনে পড়ল, মন্দ্রার ভাবগতিক দেখে গতকাল সন্ধ্যায় মন্দ্রার হোয়াটসঅ্যাপে একটা জরুরি মেসেজ পাঠিয়েছিল পৃথা। সেটা পুলিশের হাতে পড়লে ঝামেলা হতে পারে। মন্দ্রা মোবাইলে হোয়াটসঅ্যাপ খুলল। যা ভেবেছিল তা-ই, মেসেজটা মন্দ্রা দেখেইনি, আনসীন। মন্দ্রা কেন মেসেজটা দেখল না ? তা হলে মরতে হতো না। মেসেজটা আনসেন্ড করতে হবে।
রিমুভ করার আগে আরেকবার পড়ল মন্দ্রা―‘আমার মন্দ, তুই এত ভালো যে তোকে ভালো না বেসে থাকা যায় না। তোকে সাবধান করেছিলাম প্রাংশুর ব্যাপারে। প্রাংশু বিছানায় ভীষণ দুর্বল। নপুংশক বলা যায়। হীনম্মন্যতা থেকে বছর পাঁচেক আগে একবার কার পরামর্শে কড়া যৌনবর্ধক ওষুধ খেয়ে আমার সঙ্গে মিলতে আসে। তার আগে কয়েক পেগ খেয়ে নেশাচ্ছন্ন ছিল। ওষুধের প্রভাবে এক ঘণ্টার মধ্যে ও যেন অসুর হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আমি ছটফট করতে থাকি। যতই বলি ছাড়ো, ততই আমাকে ফালাফালা করতে থাকে। এক পর্যায়ে আমার গলা টিপে ধরে। বলে, সুদীপার মতো আমাকেও মেরে আমার মৃতদেহের ওপর সারারাত অত্যাচার করবে। (সুদীপার ঘটনা হলো, সুদীপার প্রেমিক তাকে মেরে সেই মৃতদেহের ওপর সারারাত অত্যাচার করেছিল। খবরটা সেসময় বেশ তোলপাড় ফেলেছিল। তখনই জেনেছিলাম, এটা এক ধরনের মানসিক রোগ, পোশাকি নাম―নেক্রোফিলিয়া।) সে সময় হঠাৎ প্রাংশুর মোবাইল ফোন বেজে ওঠে। আমি বললাম, তোমার বসের ফোন। ও ফোন ধরতে যেতেই আমি দৌড়ে বাথরুমে লুকাই। সারা রাত বাথরুমেই লুকিয়ে থাকি। পরের দিন ও একদম স্বাভাবিক। তুই বলতে পারিস, এরপরও কেন ওর সঙ্গে থাকি ? ওই ঘটনার পর ওর সঙ্গে এক দিনও থাকতে চাইনি। কিন্তু ও কান্নাকাটি করে, ক্ষমা চায়। পা জড়িয়ে ধরে বসে থাকে টানা আধ ঘণ্টা। বলে কোনও দিনও আর এমন করবে না। নেশা করে ওর মাথা ঠিক ছিল না। এমনিতে প্রাংশু ভালো ছেলে। ভালো বন্ধু। উপকারি বন্ধু। তাই ক্ষমা করে দিই। আরেকটা কথা, অর্জু কিন্তু প্রাংশুর সন্তান নয়, মৃণালের। এমনকি তোর অব্যয়ও মৃণালের সন্তান। কারণ প্রাংশু শুধু ইম্পোটেন্ট নয়, ওর সিমেনও খুব দুর্বল। অর্জুকে তোর ভালো লেগেছিল বলে অর্জুনের বায়োলজিক্যাল বাবার সিমেনই তোকে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলাম। সুতরাং প্রাংশু থেকে সাবধান। ওর নেক্রোফিলিয়া রোগ আছে।’
পৃথা মেসেজটা মুছল। মোছার পর বুঝল, ভুল করে শুধু ডিলিট করেছে, আনসেন্ড করেনি। মেসেজটা মন্দ্রার হোয়াটসঅ্যাপে রয়েই গেল। পুলিশ নিশ্চয়ই সেটা সিজ করবে।
যা হবার হোক। এসব যন্ত্রণা আর ভালো লাগে না পৃথার। অর্জুন-অব্যয়কে জড়িয়ে ধরে অশ্রুভেজা মুখখানি লুকাল সে।
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



