আর্কাইভগল্প

গল্প : তিতির : মৌরী তানিয়া

সাইফুলের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে হিমেল বরফের মতো শীতল কণ্ঠে বলে, তিতিরকে তুমি কোথায় পেয়েছো ? সত্যি করে বলো ?

তিতির হামার বোনের ছল। সাইফুল গোঁয়ারের মতো বলে ওঠে।

মিথ্যে কথা! একদম মিথ্যে কথা! তিতির আমার বোন তিন্নির মেয়ে! হিমেল এবার গর্জে ওঠে তিতিরের দিকে হাত বাড়ায়।

সাইফুল ছোঁ মেরে তিতিরকে বুকে জড়িয়ে নেয়, হামার বোন হামিদার বেটি তিতির।

তোমার বোন কোথায় ?

মরিচে।

কীভাবে ?

তিতিরক জন্ম দিবার যায়ে।

তিতিরের বাবা কোথায় ?

তিতিরের জন্মের মাস তিনেক আগে গাড়ির তলে চাপা পড়ে মরিচে।

সব বানোয়াট গল্প। সব মিথ্যে। তিন্নিরই মেয়ে তিতির।

কীসব আজেবাজে বকছি! হিমেল নিজেকে শান্ত করে। দমকা বাতাসে লেকের পানির ঢেউয়ের উঠানামা একমনে দেখে, তিন্নির কোনও সন্তান তো পৃথিবীর মুখ দেখেনি। রাফির সঙ্গে বিয়ে হয়েছে প্রায় ছয় বছর হলো। পর পর তিনটি বাচ্চা অ্যাবরশন হওয়ার পর ডাক্তার জানিয়েছে, তিন্নি কোনওদিন আর মা হতে পারবে না।

তাহলে কি রাফির সঙ্গে বিয়ের আগে কোনও ছেলের সঙ্গে ওর প্রেম ছিল ? যার সঙ্গে এমন দুর্ঘটনা―! না, তা কখনও হতে পারে না। আম্মার মতো ভয়ংকর রাগী আর সুদক্ষ পাহারাদারের চোখ ফাঁকি দিয়ে এমন কিছু করা তিন্নির পক্ষে কখনওই সম্ভব নয়। ছেলে হয়েও আমি প্রেম করার এক মাসের মাথায় ধরা খাই এবং আম্মার শাসনের কাছে সেই মেয়েকে ছাড়তে বাধ্য হই। শেষে আম্মার পছন্দের মেয়ে বীণাকেই বিয়ে করি। অবশ্য আম্মা যাদেরকে পছন্দ করে তারা একশতে একশই বলা যায়। বীণাকে বিয়ে করে আমি সুখী। রাফিকে পেয়েও তিন্নি খুব সুখী হয়েছিল।

তিন্নি ছেলেবেলা থেকেই শান্তশিষ্ট, খুব লক্ষ্মী স্বভাবের মেয়ে। তিন্নির সঙ্গে আম্মা সারাক্ষণ আঠার মতো লেগে থাকত। স্কুল, কলেজ, প্রাইভেট, কোচিং সব জায়গায় আম্মা ওর সঙ্গে যেত, আসার সময় সঙ্গে করে আনত। কোনও ফ্রেন্ড বা কোনও আত্মীয়স্বজনের বাসায় কোনওদিন ওকে যেতে দেয়নি আম্মা। আম্মার কাছে প্রেম একটা ঘৃণার বিষয়। প্রেম করা পাপ, মহা পাপ। তার অপরূপ সুন্দরী মেয়ে আর ছেলে যেন কোনওভাবেই প্রেম করতে না পারে সেজন্য সারাক্ষণ তার প্রাণান্ত চেষ্টা। সে কারণেই ইন্টারমিডিয়েট পাসের পরেই তিন্নিকে রাফির সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেয় আম্মা।

ছেলেমানুষ আমি, আমাকে তো আর অল্প বয়সে বিয়ে দিতে পারেনি, তবে বিয়ের আগের দিন পর্যন্ত চোখে চোখে রেখেছে প্রেম যেন না করতে পারি। দেশে থেকেও আম্মা আমেরিকায় থাকা আমার সবকিছু দিব্য চোখে দেখতে পেত। একটু ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করতে না করতেই ধরা। আম্মার সব আবদার, সব জুলুম আমরা দু ভাই-বোন মাথা পেতে নিয়েছি। আমাদের ছেলেবেলাতেই আব্বা মারা যায়। আম্মা সেই অল্প বয়সেই আর বিয়ের পিঁড়িতে না বসে সমাজ আর পরিবারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আমাদেরকে মানুষ করার লড়াই চালিয়েছে। আব্বা ঢাকাতেই সরকারি চাকরি করত। ঢাকার সেরা স্কুল-কলেজে পড়িয়েছে আমাদের। তিন্নি খুব ভালো ছাত্রী ছিল। আম্মার জেদের কাছে হার মেনে বিয়েতে রাজি হয়। অবশ্য রাফি কথা দিয়েছিল আমেরিকাতে যেয়ে ওর পড়াশোনা চালিয়ে যাবে। আর সে কারণেই আম্মা রাফির সঙ্গে বিয়েটা দিয়েছিল। অপরূপ সুন্দরী তিন্নির চারপাশে অজস্র যুবক ঘোরাঘুরি করত বলে আম্মা খুব ভয় পেত, যদি মেয়ের পা পিছলায়। আব্বা মারা যাওয়ায় এক ভয় সারাক্ষণ আম্মাকে তাড়া করেছে, বাবা না থাকলে সন্তানরা শাসনের অভাবে মানুষ হয় না। আর সে কারণেই আমরা দু ভাই-বোন আম্মার শাসনে এক্কেবারে চিঁড়েচ্যাপ্টা!

যাই হোক আমেরিকায় যাওয়ার পর তিন্নি পড়াশোনা শুরু করেছিল। কিন্তু এক বছরের মাথায় প্রথম বাচ্চা কনসিভ করার পর নানা জটিলতা দেখা দেয়ায় ডাক্তার একদম বেড রেস্টে থাকতে বলে, সে কারণে পড়াশোনাটা চালিয়ে যেতে পারেনি তিন্নি। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে আমেরিকায় স্কলারশিপ নিয়ে যাই। এখন আমেরিকাতে চাকরি করছি।

এবার লেকের পানি থেকে চোখ সরিয়ে ফুটপাথের ওপরের পলাশ গাছের টকটকে লাল ফুলগুলোর দিকে তাকায় হিমেল। গাছে একটি পাতাও নেই। পুরো গাছে যেন আগুন লেগেছে। ওর খালার বাসার সামনে এমন একটি পলাশ গাছ ছিল। শীতের শেষে যখন খালার বাসায় যেত তখন ফেরার সময় তিন্নি ব্যাগভর্তি পলাশ ফুল নিয়ে এসে মালা গাঁথত, খেলত। খালার বাসা ঢাকাতেই। খালা নিঃসন্তান ছিলেন। তিন্নির শুধু খালার বাসায় থাকার অনুমতি ছিল। তিন্নির বিয়ের কয়েক মাস আগে খালা মারা যায়।

হিমেলের চোখজোড়া এবার তিতিরের দিকে। আম্মার চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রেম করাই অসম্ভব, সেখানে এমন দুর্ঘটনা তো কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। তাছাড়া একটা বাচ্চাকে পৃথিবীতে আনতে হলে কমপক্ষে সাত-আট মাস পেটে ধারণ করতে হয়। মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোনও মেয়ের পক্ষে একটা বাচ্চাকে পৃথিবীতে আনা সম্ভব নয়, পৃথিবীর সবার চোখকে ফাঁকি দিতে পারলেও একটা মেয়ে তার মাকে কখনও ফাঁকি দিতে পারবে না। সেখানে আম্মার মতো প্রশিক্ষিত পাহারাদার ও দিব্যদৃষ্টিসম্পন্ন মাকে ফাঁকি দিয়ে তিন্নির পক্ষে একটা বাচ্চাকে পৃথিবীতে আনা অসম্ভব। আম্মাকে আমি সবসময় প্রশিক্ষিত পাহারাদারই মনে করি। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত আমি আম্মার চোখকে ফাঁকি দিয়ে কোনও কাজ করতে পারিনি। সেটা যত সূক্ষ্ম কাজই হোক। আম্মার চোখে ধরা পড়বেই। আর আম্মা দিব্যদৃষ্টিসম্পন্ন মহিলা না হয়ে পারেই না। কারণ আম্মা আমার দিকে তাকালেই আমার মনের সব কথা বলে দিতে পারে। জীবনে আম্মাকে না জানিয়ে একটু দুঃখও করতে পারিনি। এক বুক ভরা দুঃখ নিয়ে হাসি হাসি মুখে আম্মার সামনে দাঁড়ালে আম্মা ঠিকই টের পায় আমার বুকের ভেতর দুঃখ মোচড় দিচ্ছে।

সেই আম্মাকে ফাঁকি দিয়ে তিন্নি একটা বাচ্চাকে পৃথিবীতে এনেছে ? না না, এটা হতে পারে না। তাহলে ? তিতির ?

তিতির জন্মায় এক অমাবস্যার রাতে। একটা রক্তমাখা কাঁথায় জড়ানো তিতিরের মুখটা অন্ধকার রাতে পূর্ণিমার চাঁদের মতো আলো ছড়াচ্ছিল। সেই রাতে তিতির একটুও ঘুমাতে পারছিল না। মগবাজারে রাস্তার ধারে ময়লার ভাগাড়ের পাশে সাইফুলের কোলে শুয়ে শুয়ে বড় বড় গাড়ি, ট্রাক আর রিকশার চলাচলের শব্দে তিতির বার বার চমকে উঠে চিৎকার করে কাঁদছিল, সারা রাত সে ঘুমাতে পারছিল না। পরদিন সকালেই সাইফুল লাঠিতে ভর দিয়ে ল্যাংড়াতে ল্যাংড়াতে তিতিরকে সেই রক্তমাখা কাঁথায় বুকে জড়িয়ে কিছুটা নিরিবিলি লেকের পাড়ের এই ফুটপাথে চলে আসে। সোনারগাঁও হোটেলের পেছন দিয়ে হাতিরঝিল লেকের একটা অংশ নিউ ইস্কাটনের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে। লেকের পাশ দিয়ে একটি রাস্তা চলে গিয়েছে। এই রাস্তার শেষ মাথায় ফুটপাথের উপরে বড় একটা কাঠবাদাম গাছের তলায় একটি ছাপড়াঘরে সাইফুল তিতিরকে নিয়ে থাকতে শুরু করে। পাশেই ময়লা আবর্জনার স্তূপ। এখানে গাড়ি আর রিকশা চলে, তবে বেশ কম। বাস, ট্রাক চলে না। আর রাতে গাড়ি, রিকশাও তেমন চলে না।

তিতির দিনে দিনে বড় হতে থাকে। সাইফুল সেই রক্তমাখা কাঁথাটা কুড়িয়ে পাওয়া একটা কাঠের বাক্সে সযত্নে রেখে দেয়।

সকালের সূর্যটা পুব আকাশের পর্দা ভেদ করে মুখ বের করে হাসছে। তিতির বস্তির ওর বয়সী কজন সঙ্গীর সঙ্গে পাশে জড়ো হওয়া ময়লার স্তূপের মধ্যে এটা-ওটা ঘাঁটছে। হঠাৎ তিতির দেখতে পায় ময়লার স্তূপের মধ্যে এক টুকরো সূর্য যেন উঁকি দিচ্ছে। তিতির ঘাড় ঘুরিয়ে পুব আকাশে একবার তাকিয়ে ময়লার স্তূপের সূর্যটার দিকে হাত বাড়ায়। ওর হাতে উঠে আসে একটা ভাঙ্গা আয়না। আয়নাটা হাতে নিতেই আয়নার মধ্যে ওর চেহারাটা ঝলমল করে ওঠে। জন্মের পর কোনওদিন সে নিজের চেহারা দেখেনি। আয়নাটা মুখের সামনে ধরে সে স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ এক লাফে সাইফুলের কাছে এসে বলে ওঠে, ও মামু হামার মা দেখতে ক্যাংকা।

সাইফুল ওর ছাপড়াঘরের সামনে বসে উলটা দিকের ছাতিম গাছটার দিকে আনমনে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ এমন প্রশ্নে সে চমকে উঠে তিতিরের মায়াবী মুখটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে, তোর মা দেখতে এক্কেবারে তোর লাকানই।

তিতির নিজেকে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে বলে, সত্যি কওচিন মামু ?

তিতিরের মায়াবী মুখটার দিকে স্থির তাকিয়েই সাইফুল বলে, হয় রে ছুঁড়ি, হয়। তুই দেখতে এক্কেবারে তোর মার লাকান।

এক সকালে তিতিরকে নিয়ে সাইফুল মগবাজারের ময়লার ভাগাড়ের দিকে যেতে থাকে। যখনই মায়ের কথা মনে পড়ে, মায়ের শরীরের গন্ধ নিতে ইচ্ছে করে তখনই সাইফুল মগবাজারের এই ময়লার ভাগাড়ের পাশে এসে চুপ করে বসে থাকে।

এই ভাগাড়ের বাতাসে মায়ের শরীরের ছোঁয়া পায় বলে সে বিশ বছর বয়স পর্যন্ত অন্য কোনও জায়গায় কখনও যায়নি, এখানেই ছিল। তিতিরের জন্ম না হলে বাকি জীবনটা সে হয়তো এই ভাগাড়েই কাটিয়ে দিত। বাবার কথা ওদের দু ভাই-বোনের মনে নেই। পিঠাপিঠি দু ভাই-বোনের একদম ছেলেবেলাতেই বাবা মারা যায়। বাবা নাকি অন্ধ ছিল। ওর মা ল্যাংড়া ছিল। মায়ের মতোই সাইফুলের ডান পা সরু, বাঁকা আর অকেজো। সাইফুল আর ওর মা লাঠিতে ভর দিয়ে থালা হাতে সারা দিন ভিক্ষা করত। ওর বোন হামিদা ওদেরকে রাস্তা পারাপার ও অন্যান্য কাজে সাহায্য করত। ভিক্ষা শেষে এই ময়লার ভাগাড়ে এসে ময়লা ঘেঁটে যা পায়, খেয়ে দেয়ে পাশেই ঘুমায়। সাইফুলের দশ বছর বয়সে কদিনের জ্বরে মা একদিন মারা যায়।

সাইফুল আজ কারওয়ান বাজার থেকে মাছের কান, বড় আঁশ, মাছের পাখনা কুড়িয়ে এনেছে। পঁচা পিঁয়াজ মরিচের স্তূপ থেকে কিছু মরিচ পেঁয়াজ বেছে এনে পাশেই তিনটি ইট দিয়ে একটা চুলা বানিয়েছে। কুড়িয়ে আনা দইয়ের মাটির ভাঁড়ে করে সেগুলো রান্না করছে। পাশে বসে তিতির খুব মনোযোগ দিয়ে আয়নায় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিজের মুখ দেখছে। ক্যারে ছুঁড়ি সারা দিন আয়নাত লিজের ঢপ (চেহারা) দেখা লাগে ক্যা তোর ? গাছের ডাল, পাতা এনা কুড়ে আনা পারিস না ? সাইফুল নিভু নিভু চুলায় কাগজের টুকরো ফেলে দিয়ে ফুঁ দিতে দিতে বলে।

হামি লিজের ঢপ দেকিচ্চি না। আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতেই বলে তিতির।

তালে কাক দেকিচ্চু রে ছুঁড়ি ?

হামার মাক দেখিচ্চি হামি।

মাক আবার কোন্টে পালু তুই ? ছুঁড়ির খালি আকাশ লাথ্থানা কতা। সাইফুল নিজেই উঠে আশপাশ থেকে কিছু ডাল পাতা কুড়িয়ে এনে চুলায় দেয়।

আয়নায় নিজের চেহারা দেখতে দেখতে তিতির হঠাৎ জানতে চায়, ও মামু হামার নামডা কে থুছে ?

ক্যা, সেডা জানার তোর কী দরকার ?

বস্তির ব্যাবাকেই খালি কয়, হামার নামডা বলে খুউব সোন্দর! কে থুছে মামু হামার নামডা ?

তোর মা থুছে। সাইফুলের কানে বেজে ওঠে অন্ধকার ছিন্নভিন্ন করা সেই করুণ কণ্ঠ, তিতির, তিতির সোনা!

সাইফুলের ছাপড়া ঘর থেকে একটু দূরে রাস্তার পাশে বীণাদের  দোতলা সুন্দর ডুপ্লেক্স বাড়ি। লেকের পাড় ঘেঁষে এই রাস্তার পাশে বেশ কিছু বস্তিঘর রয়েছে। বীণাদের বাড়ির সামনে একটা উঠান। বিশাল কারুকাজ করা গেটের এই বাড়িতে বীণা তার বাবা-মাসহ থাকে। ঢাকা শহরে এমন উঠানওয়ালা বাড়ি বিরল। বীণা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে চাকরি করে। কদিন পর একমাত্র মেয়ে বীণার বিয়ে বলে বাড়িতে খুশির বন্যা বইছে।

বিয়ের ধুমধাম শেষ। বীণার স্বামী হিমেল মাসখানেক বীণাদের বাসায় থেকে চলে যাবে আমেরিকা। এরপর সব ব্যবস্থা শেষে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আবার এসে বীণাকে সঙ্গে নিয়ে যাবে। বিয়ের এক সপ্তাহ পর এক সকালে জানালা দিয়ে লেকের পাড় ঘেঁষে এঁকেবেঁকে চলা নিরিবিলি রাস্তার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে হিমেল বীণাকে বলে, চলো লেকের পাড় ধরে হাঁটি। বাসা থেকে বের হয়ে দুজন লেকের পাড় ধরে হাঁটতে শুরু করে। হিমেল সাইফুলের ছাপড়াঘরের সামনে থমকে দাঁড়ায়।

হিমেলের চোখজোড়া এবার তিতিরের সারা মুখে ঘোরাঘুরি করে, সেই চোখ, সেই নাক, সেই ঠোঁট, সেই রং! তিন্নির মেয়ে ছাড়া এ কেউ নয়। সাইফুল মিথ্যে কথা বলছে। আর নামটা! তিতির! বিয়ের পর পরই তিন্নি নাকি রাফিকে বলেছিল, আমাদের মেয়ে হলে নাম রাখব, তিতির। বাংলাদেশ ছেড়ে তিন্নি আমেরিকা যেতে চায়নি। রাফিকে সে অনেক অনুরোধ করেছে দেশে থাকার জন্য। কিন্তু রাফির ছেলেবেলা থেকে স্বপ্ন ছিল আমেরিকায় সেটেলড হবে। তিন্নির বাসা থেকে এক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে হিমেলের বাসায় আসতে হয়। তিন্নি আমেরিকা আসার পরপরই হিমেল মাকে নিয়ে এসেছে আমেরিকায়।

তিনটি বাচ্চা অ্যাবরশনের পর ডাক্তার যখন জানায়, তিন্নি কখনও আর মা হতে পারবে না, তখন থেকেই ওর মানসিক সমস্যার শুরু। একদিন একটা মেয়ে পুতুল কিনে এনে রাফিকে বলে, দেখ আমার মেয়ে তিতির। ওকে খাওয়ায়, গোসল করায়, ঘুম পাড়ায়। ধীরে ধীরে তিন্নির মানসিক সমস্যা বাড়তে বাড়তে এখন সারাক্ষণ তিতির নামের সেই পুতুলটাকে বুকে জড়িয়ে বিড়বিড় করে। কারও সঙ্গে কোনও কথা বলে না। বড় বড় মানসিক ডাক্তার দেখানো হয়েছে। ডাক্তারদের একটাই কথা, নিজের সন্তান জন্ম দিতে পারলেই তিন্নি সুস্থ হয়ে উঠবে। কয়েক মাস হলো হিমেল তিন্নিকে নিজের বাসায় নিয়ে এসেছে। রাফি খুব ভালো ছেলে। ও তিন্নিকে আসতে দিতে চায়নি। কিন্তু ওর তো জীবন আছে। তিন্নির কারণে রাফির জীবনটা নষ্ট হোক তা হিমেল চায় না।

হিমেলের চোখ এবার তিতিরের বাম গালের তিলের উপর স্থির হয়, এমনকি তিলটা পর্যন্ত! বাম গালে নাকের আধা ইঞ্চি দূরত্বে তিলটাও হুবহু তিন্নির মতো!

এ তিন্নির মেয়ে না হয়ে পারেই না। তিন্নি ওকে পেলেই সেরে উঠবে। হাসিখুশি তিতিরের দিকে তাকিয়ে হিমেল যেন ছেলেবেলার তিন্নিকেই দেখতে পাচ্ছে। কই হারিয়ে গেল আমার সেই হাসিহাসি মুখের বোনটা! কতদিন ও হাসে না! যে করেই হোক আমি ওর মুখের হাসি ফিরিয়ে আনব। তিতিরকে পেলেই তিন্নি হাসবে। তিন্নি যেদিন ডাক্তারের কাছ থেকে এসে জানায় ও কোনওদিন মা হতে পারবে না, ওর মানসিক অবস্থার কথা ভেবে, সেদিনই আমি আর মা ডিসিশন নিই একটা বাচ্চা এডপ্ট করার। কিন্তু তিন্নিকে কোনওভাবেই রাজি করাতে পারিনি। ধীরে ধীরে ওর অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তারপরও আমরা বাচ্চা এডপ্ট করার কথা ভাবি। হয়তো একটা বাচ্চা পেলে ও সুস্থ হয়ে উঠবে। এডপ্ট করার কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে পুতুলটিকে বুকে জড়িয়ে তিন্নি বলে, আমার মেয়ে তিতির থাকতে আমি অন্যের বাচ্চা এডপ্ট করব কেন! আম্মা চোখের পানি মুছতে মুছতে বলে, এ কেমন পাগলামো আমার মেয়ের! যে মেয়ের কোনও বাচ্চা পৃথিবীর মুখ দেখতে পারেনি, যার কোনওদিন আর বাচ্চা হবে না, সেই মেয়ে বলে ওর বাচ্চা আছে! খোদা এ কেমন বিচার তোমার!

গত বছর হিমেল ওর এক কাজিনের এক মাসের ছোট্ট বাচ্চা মেয়েকে তিন্নির কোলে দিয়ে বলেছিল, তিন্নি দেখ তোর মেয়ে তিতিরকে এনেছি আমরা। ও সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাটাকে কোল থেকে সরিয়ে দিয়ে, মাথা দু দিকে দুলিয়ে বুঝিয়ে দেয়, এটা তিতির নয়। এরপর ওর পুতুল তিতিরকে বুকে চেপে ধরে থাকে।

তিতিরের দিকে তীক্ষè চোখে তাকিয়ে হিমেল বিড়বিড় করে, তিতিরকে পেলেই তিন্নি সুস্থ হয়ে উঠবে। এ তিন্নিরই মেয়ে তিতির।

আর তিন্নির মেয়ে না হলেও সমস্যা নেই। হয়তো তিন্নির মেয়ে নয় তিতির। একই রকম দেখতে পৃথিবীতে অনেক মানুষই আছে। তিন্নির মেয়ে না হয়েও তিতির দেখতে হুবহু তিন্নির মতোই হয়েছে। আর নামটা কাকতালীয়ভাবে মিলে গেছে। হুবহু তিন্নির মতো দেখতে বলে তিতিরকে তিন্নি হয়তো নিজের মেয়ে ভেবেই বুকে টেনে নিয়ে সুস্থ হয়ে উঠবে। একটা ভারী পাথর কেউ হিমেলের বুক থেকে টেনে তুলে ফেলে দিল। হ্যাঁ, তিতিরকে পেলে তিন্নি সুস্থ হবে! সাইফুলকে যেভাবেই হোক রাজি করাতে হবে। তিতিরের বিনিময়ে যত টাকা সাইফুল চায়, দেব। যে করেই হোক তিতিরকে চাই আমি।

কারও বাপেরও ক্ষমতা নাই তোক হামার কাছত থাকে লিয়ে যাবার পারবে। হামি তোক কোনও জাগাত যাবা দিমু না, কারও কাছে যাবা দিমু না। সাইফুল ওর ছাপড়াঘরে ভাঙা জোড়া দেয়া চৌকির উপর শুয়ে তিতিরকে বুকে আঁকড়ে ধরে ধরা গলায় বলে ওঠে। হামি কালকা সকালেই তোক লিয়ে এটি থাকে চলে যামো। অরা আর হামাগরক খুঁজে পাবে না। ওরকরে টাকাত হামি থুতা মারি, সাইফুল চিত হয়ে শুয়েই থু থু করে আকাশের দিকে থুথু ছিটায়। সেই থুথু ওর মুখ-চোখের উপরেই এসে পড়ে। হামার ট্যাকা পসা কেচ্চু লাগবে না। খালি তুই থাকলেই হামার হবে। পিতিবীর ব্যাবাক ধনসম্পত্তি একটে করে হামাক দিলেও হামি তোক কোন্টে যাবা দিমু না।

তুমি ক্যাংকা কতা কওচিন মামু ? তিতির সাইফুলের বুক থেকে তিড়িং করে উঠে ল্যাটা পেড়ে বসে ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে বলে, হামাক লিয়ে যাবার চালে হামি যামো ক্যা ? তুমি যাবা দিলে হামি যামো ক্যা ? তোমাক ছাড়ে হামি দুনিয়ার কোনও জাগাত যামো না। তোমাক ছাড়ে হামি কোনও জাগাত থাকা পারমো না মামু।

তিতির এবার সাইফুলকে জড়িয়ে ধরে ঠুস করে ঘুমিয়ে পড়ে। খুব কনকনে না হলেও শীত এখনও আছে। ছেঁড়া কম্বলটা তিতিরের গায়ে জড়িয়ে দেয়। নিজে ছেঁড়া কাঁথাটা টেনে গায়ে দেয়। ছাপড়া ঘরের পলিথিনের ফাঁক দিয়ে চাঁদটার দিকে তাকিয়ে থাকে সাইফুল।

তুই খুব স্বার্থপর সাইফুল! লিজের ভাগনির ইংকা সব্বনাস করিচ্চু! সাইফুলের ভেতরের আমিটা বলে চলে, কত্ত বড় সুযোগ তোর ভাগনির জন্যি! তুই এনা ভাবে দেখ! পিথিবীর মদ্যে এক্কেবারে এক লম্বর দ্যাশত তোর ভাগনি থাকপে! কত্ত সুখত থাকপে তোর ভাগনি! অরা লিয়ে যাবা চাওছে যাবা দে। সত্যি সত্যি যদি তুই তোর ভাগনিক ভালোবাসিস তাহলে যাবা দে সাইফুল। দেখিস না বড়লোকেকরে এডা ছল হলেও ওরকরে সুখের জন্যে, ভালোর জন্যে মাও বাপ কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিদাশত পাঠে দেয়। বেটা বেটিরা সুখত থাকে আর মাও বাপ একলা  একলা দ্যাশত পচে মরে!

চুপ! এক্কেবারে চুপ হারামজাদা! সাইফুল ভেতরের আমিটার উপর ক্ষুব্ধ হয়, হামি স্বার্থপর! ইংকা কতা কওয়া পারলু তুই! হামার ছল হামাক ছাড়ে থাকা পারবে ? কোনওদিনও পারবে না। হামি না হয় বুকত পাথর চাপা দিয়ে ছলক ছাড়ে থাকপার পারমো। কিন্তু হামার ছল হামাক ছাড়ে থাকলে মরেই যাবে। জন্মের পর থাকে যেই ছল হামাক ছাড়ে ঘুমাবা পযযন্ত পারে না। হামি ওর ধারত না শুতলে বলে অর ঘুমই আসে না, সেই ছল অত দূর দ্যাশত যায়ে হামাক ছাড়ে থাকপার পারবে ? পারবে না, কোনওদিনও পারবে না। এক্কেবারে মরেই যাবে হামার ছল!

হা হা হা! তুই এডা গদ্দভ! এক্কেবারে গদ্দভ রে! আরে গরুডা তোর ছলক তুই বিয়া দিবু না। অবশ্য তোক দেওয়া লাগবে না। এখন তো অর বয়স ছয় বচ্ছর আর কডা বছর যাবা দে, তোর ছলই কোনও মরদের সাথত তোক ফেলে চলে যাবে। বছর ছয় মাসেও তোক দেখপার আসপে না। বেটিছলের কাছে স্বামীই সব। কয় বছর পর তোর ছল তোক ছাড়ে তো চলে যাবেই। এই কডা বছরের জন্য তুই অর জীবনডা লষ্ট করবার চাওচো। অর সুখী হওয়ার পথত বাধা দাওচো। আমেরিকাত গেলে তোর ছল কত শিক্কিৎ হবে, সেডাও এনা ভাবে দেখ দিনি। লিজেই কত ট্যাকা কামাই করবে, সেডা ভাবেক দিনি। যে সুন্দরী তোর ভাগনি, এটি থাকলে বস্তির কোনও গরিব, ফকিন্নি, নেশাখোর মরদ ফুঁসলে ফাঁসলে লটঘট করে দুদিন পর বিয়া করবে, তারপর তিনবেলা খাবা পাবে না, কপালত জুটপে খালি লাথিথ কদই। তাই লয় কি। ভাবে দ্যাক সাইফুল, ভালো করে এনা ভাবে দ্যাক তুই!

রাত এগারোটা। তিতির নামের পুতুলকে বুকে চেপে হিমেলের হাত ধরে তিন্নি বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করল। বীণা তার মা- বাবাসহ এয়ারপোর্টে ওদেরকে নিতে গিয়েছে। গাড়িতে উঠে বীণা হাত বাড়িয়ে তিতিরকে নিতে চাইল কিন্তু তিন্নি আরও শক্ত করে বুকে চেপে ধরল পুতুলটিকে। হিমেল খুব উদ্বেগের মধ্যে আছে। তিন্নির সুস্থ হওয়ার শেষ সুযোগটা কাজে লাগবে তো! তিতির নামের সেই মেয়েটিকে তিন্নি নিজের মেয়ে ভেবে বুকে টেনে নেবে তো! যদি না নেয়! হিমেল আর ভাবতে পারে না। একটা ভারী পাথর ওর বুকে চেপে বসল। বাসায় ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হলো ওদের। হিমেল টেনশনে সারা রাত দু চোখের পাতা এক করতে পারছে না। হিমেল তিন্নির পাশে বসে একটার পর একটা সিগারেট টানছে। বীণা হিমেলের পাশে বসে তিন্নির ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ঘুমন্ত অবস্থায়ও তিন্নি এক মুহূর্তের জন্য পুতুলটিকে বুক থেকে নামায়নি।

পরদিন বীণা, হিমেল আর তিন্নি বাসার বিশাল বড় গেটটার সামনে এসে দাঁড়ায়। হিমেল তিন্নির হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে সাইফুলের ছাপড়াঘরের দিকে। চারিদিকটা যেন কেউ সাদা কাচ দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে, মুড়িয়ে রেখেছে। সূর্যটা যেন একটা সুতার খনি। সেখান থেকে শত সহস্র রং-বেরঙের ঝকমকে সুতা বেরিয়ে আসছে অবিরত। চারপাশের গাছের পাতারা দুলে দুলে নাচছে। সোনালু গাছ থেকে যেন সোনা ঝরে ঝরে পড়ছে। চারিদিকে তাকিয়ে হিমেলের মনে হলো প্রকৃতিটা ঝলমল করে হাসছে। হিমেলের মনে আশা জাগছে, তিন্নি এবার সত্যি সত্যি সুস্থ হয়ে উঠবে। ওরা তিনজন সাইফুলের ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়। সাইফুল উদাস হয়ে সামনের ছাতিম গাছটার দিকে তাকিয়ে আছে। তিতির ওদের দিকে পিঠ ফিরে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে। হঠাৎ প্রকৃতির ঝলমলে হাসি কেউ যেন কেড়ে নিল। হিমেলের আশাও যেন দপ করে নিভে গেল। আশাহত মুখে তাকিয়ে হিমেল দেখল, সূর্যটা মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়েছে। বীণা দুরুদুরু বুকে তিতির, তিতির বলে ধীরে ধীরে ডাকছে। বীণার ডাকে তিতির নড়াচড়া শুরু করেছে। তিন্নি ওর বুকের তিতিরকে আরও শক্ত করে চেপে ধরেছে। হিমেলের বুকে একটা ভারী পাথর অবিরত উঠছে আর নামছে। সাইফুল যেন এ জগতে নেই। ও যেন কাউকে দেখছে না, কিছু শুনছে না। ও তন্ময় হয়ে ছাতিম গাছের দিকে তাকিয়ে আছে। তিন্নি মুগ্ধ হয়ে লেকের পানির দিকে তাকিয়ে আছে।

তিতির এবার চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসল। সবাইকে দেখে সে প্রথমে খুব ভ্যাবাচ্যাকা খেল। এরপর ওর চোখ আটকে গেল তিন্নির মুখের উপর। এক ঝটকায় সে ওর বালিশের নিচে রাখা আয়নাটা তুলে, নিজের মুখের সামনে ধরল। কিছুক্ষণ স্থির চোখে আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকল। এরপর মা বলে ছুটে গেল তিন্নির কাছে। তিন্নি চমকে তাকাল তিতিরের দিকে। বড় বড় চোখে তিতিরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। ওর বুকের মধ্যে চেপে ধরে থাকা পুতুল তিতির মাটিতে পড়ে গেল। সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ল তিতির। আমার তিতির! আমার তিতির মানিক, আমার তিতির সোনা―! তিন্নি তিতিরের মুখটি দু’হাতে ধরে হিমেলের দিকে তাকিয়ে, ভাইয়া দেখ, এই যে আমার তিতির, আমার মেয়ে তিতির! আমার তিতির মানিক―!

সাইফুল আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়াল, যেন এতক্ষণ সে ঘুমিয়ে ছিল। ঘরের কোণে রাখা কাঠের বাক্সটি খুলল। ওর ভেতর থেকে রক্তমাখা কাঁথাটি বের করল। কাঁথাটি বুকে জড়িয়ে ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করল।

মামু, ও মামু, মামু, ও মামু―, তিতির একহাতে তিন্নিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে, অন্য হাতটি বাড়িয়ে দিয়েছে সাইফুলের দিকে।

সাইফুল ধীরে, খুব ধীরে হাঁটতে হাঁটতে একসময় অদৃশ্য হয়ে যায়।

মামু, ও মামু, মামু, ও মামু―হাতিরঝিলের লেকের পানি, কাঠবাদাম, ডাব, সোনালু, কৃষ্ণচূড়া, পলাশ গাছে তিতিরের ডাকটি গুমরে গুমরে ঘুরে বেড়ায়। লেকের পাড়ে দাঁড়িয়ে কান পাতলে এখনও শোনা যায়, তিতির যেন কখনও কোকিলের বেশ ধরে, কখনও ঘুঘু পাখি হয়ে, কখনও ডাহুক পাখি হয়ে কোনও এক গাছের ডালে বসে গুমরে গুমরে ডেকে চলেছে, মামু, ও মামু, মামু, ও মামু―!

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button