আর্কাইভকবিতা

কবিতা

মতিন বৈরাগী

বিশ্বাসের আলো

যখন মধ্যরাত্র

সমস্ত আলোর ঝলক একটু একটু করে শুষে নিচ্ছে আমার আঁধার

তখন দাঁড়িয়েছিল বাতাস বাতাবিলেবুর ডালে, ফিরবে দক্ষিণে

আর হাসনাহেনার গন্ধে মাতাল ইতিহাসের সেই সব রব

থমকে দিল অজ্ঞাত রক্তচক্ষু

 জেগে উঠল শব্দশরীর পুরাতন রক্ষাব্যূহ ভেঙে

সংকেত-সুরে গেয়ে উঠল তিনটি অক্ষরে মিলিত শব্দ

নানা শব্দের অর্থদ্যোতক মঙ্গলাকাক্সক্ষা প্রারম্ভ

দীর্ঘ বয়ানের।

আসমান টুটে গেল

নক্ষত্রলোকের আলোকবর্ষগতি সময়ের এক্সিলেটর ফ্রিজ করে দিয়ে

হাবলের দুরবিন হয়ে গেল

যোজন যোজন ব্যাপ্ত অজানা অচেনা অসংখ্য সংকেত

উপমা রূপক বিরোধাভাস

উন্মুক্ত হলো পরতে পরতে আকাশের গুণ্ঠন গুটিয়ে

আর মহলের সব দরজা খুলে গিয়ে ঠুকল চৌকাঠে ডুকরে ওঠা

নিশীথ কপাট

ধ্বনিত হলো সেই শব্দ হৃদয়-তারে অজানার সুরে

শুরু হলো আকাশের পথ;

তখন সেই চোখ থেকে হাজার হাজার কোটি সংখ্যাতীত

বিচ্ছুরিত আলোর ঝলকে

ওলটপালট হয়ে যাওয়া পাহাড়চূড়ায় প্রজাপতি ফেলে গেল

পাখার রেণু

উড়ল মহিমার দ্যুতিমালা, লাল-সবুজে লৌহ-মাহফুজে

আর মরা নদীর ভাটায় ডাকল বান ভবিষ্য-দিকের

তখন

কেউ বলল, চেনো আমাকে, তোমার অন্তর্গত আলোর শব্দতরঙ্গ

ঝুলে আছে বিশ্বাসের গাছে

শত-সহস্র কোটি নক্ষত্রমালার বিরামহীন জেগে থাকা

ন্যায়ের অটুট নির্মাণ

ছুঁয়ে দাও জীবনচেতনা; আর কোনও অলৌকিক নেই।

…………………………………………………………….

আবিদ আনোয়ার

অবিনশ্বর

পাখিদের কাছে শিখেছি উড্ডয়ন,

ফুলেদের কাছে শিখেছি প্রমিত ফুটে উঠবার কলা;

লক্ষ্যভেদের দীক্ষা দিয়েছে স্বয়ং বৃহন্নলা,

আগল শেখালো নিয়ম-ভাঙার বিশুদ্ধ ব্যাকরণ।

উত্তরণের কৃতিতে-বিভোর স্বঘোষিত কিছু পাখি

গানের মধ্যে কাশি দিয়ে বলে; ভাবি না উনিশ-বিশে, 

অতি-ব্যবহারে রীতি-নীতি সব হয়ে গেছে বড় ‘ক্লিশে’―

শূন্য থেকেই শুরু করি চলো আধুুনিক ডাকাডাকি!

অনাদি কালের প্রজনন-রীতি ভুলেছে কি প্রাণিকুল ?

প্রেমাকাক্সক্ষার বারোয়ারি পাপ তোমার ভেতরে খেলে,

হেলেনের মতো ফুলবানুরাও শয়ানে পাপড়ি মেলে, 

জরায়ুরা চায় প্রচল বীর্য, পরাগে তৃপ্ত ফুল!    

…………………………………………………………..

মাহবুব বারী

জড়ো করি ঝড়ো রাতের তারা

১. আবর্তন

পৃথিবী যেমন সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে

আমিও তোমাকে কেন্দ্র করে

তেমনি আবর্তিত হই

কিন্তু কিছুতেই কাছে যেতে পারি না

এমনকি দূরেও।

২. অপেক্ষা

মেঘলা দিন, মন খারাপ হয়ে যায়

কারও তো আসার কথা ছিল না

তবু কেন অপেক্ষায় দিন কাটে!

৩. মাত্রাছাড়া

সত্যেনের মতো আমি ছন্দের জাদুকর নই

এমনকি সাধারণ ছন্দজ্ঞানও নেই

কোনও মাত্রা মানে না আমার মন

আর তোমার ব্যাপারে তো মাত্রাছাড়া।

৪. মোনাফেক

হায়! আমার হৃদয়! সেও যদি আমার হতো!

সে আমার কথা অন্যকে বলে

আর আমাকে হাস্যকর করে তোলে

এমন মোনাফেক আর কে আছে বন্ধু

যার জন্য সমাজে মুখ দেখানো বন্ধ।

৫. শিউলি ফুল

শিউলি ফুলের মতো ভোরের আগেই ঝরে পড়তে চাই

যেন সূর্যালোকে এই বিপন্ন মুখ কেউ না দেখে

৬. একজন মৃত

তোমার শরীর আর আত্মার সৌন্দর্য, বন্ধু

যে দেখে নাই তার কাছে কী বর্ণনা দেব আমি

একজন মৃত কি স্মরণ করতে পারে কোনও কিছু!

৭. বসন্ত

বসন্ত বসন্ত করে কারা চিৎকার করে

তারা কি জানে না প্রেমের কোনও ঋতু নেই!

৮. শাশ্বতী

শাশ্বতী, তুমি এসে দেখে যাও

এখানে মানুষ কেমন করে বাঁচে

যুদ্ধ করতে করতে রক্তাক্ত

                      আবার প্রেমেও।

…………………………………………

শিহাব সরকার

শ্যুটিং থেকে

মানুষ বৃক্ষলতা মেঘ পাহাড় সব রাখি

একটিই শটে। ক্যামেরাম্যানের হাতে জাদুচাবি।

ফ্লোর থেকে ফ্লোরে কে ছোটে আজ

দূরের আবছায়ায় কুয়াশা-ঢাকা পল্লিচ্ছবি

এদিকে ওদিকে, আউটডোরে কত রক্তস্রোত।

তবু ঘরে ঘরে ভালোবাসা থেমে নেই

ছোট ছোট ছবিঅলারা সিটি দিয়ে দূরের পথ ধরে

প্রযোজক বসে আছেন বোবা, অন্ধকার ঘরে

স্বপ্নপুঞ্জ এলোমেলো, প্রিয় ফটোগুলোতে ধূলি।

কুরোশাওয়া, কুবরিকের অবয়বে পোকামাকড়ের বাসা

আউটডোরে বা ইনডোরে এক শটেই মহাকাব্য লিখে

স্বপ্নে দ্যাখে ফিলিমগ্রস্ত তরুণ কান কিংবা মস্কোর মালা।

মাত্র একটিই শট একটিই প্যানে।

ফরোয়ার্ড জুম, জুমব্যাক, মন্তাজ

শেষ দৃশ্যে স্লো মোশানে উড়ে উড়ে দূরে,

প্যাক আপ। ভেঙে দাও কাঠের বাড়িঘর

মুছে দাও এ-আইয়ে বানানো হাট-বাজার সার্কাস।

ছুরিতে ধার দিয়ে শ্যাওড়াতলায় একপাশে

দাঁড়িয়েই আছেন আলো-ছায়ার হিচকক, কক্ত্যু

দূরে নয় হারাকিরি, সুপুকু।

………………………………………………….

নাসির আহমেদ

বৃষ্টিবিনাশী তুমি

কার পাপে বৃষ্টি এসে ফিরে যায় বারবার!

আউশ-বোরোর ক্ষেত জলহীন অপেক্ষায় পোড়ে।

নদীকে করেছে নিঃস্ব―কে ?

নিসর্গ নিধনকারী―কে!

নৃশংসতার দায় কাকে দেবে তুমি ?

উত্তর অজানা নয়―অভিশপ্ত! নিসর্গের খুনি

নিজেই নিজের হন্তারক।

একদিন তোমার জোনাকি ছিল, পাখি ছিল,

ফুলেফলে সুশোভন লতাগুল্মে সাজানো উদ্যান।

আজ কোনও পাখি নেই, ফলাহার নেই।

আলোকায়নের অঙ্গীকারে একদিন

পিতৃপুরুষের এই ঐতিহ্যের রক্ষাকারী ছিলে

এখন নিজেই তুমি অঙ্গীকার ভঙ্গকারী মরু নাগরিক!

জোনাকিরা অভিমানে নিভিয়ে দিয়েছে নিসর্গের বাতিঘর।

যন্ত্রসভ্যতার কাছে জিম্মি তুমি করেছো স্বাধীন প্রকৃতিকে

বাঘের খাঁচার মুখ খুলে দিলে হরিণ-উদ্যানে!

কী করে তাহলে বৃষ্টি নামে জীবনানন্দের প্রিয়

রূপসী বাংলায়!

পাতার ঝালরে আনো রোদ-বৃষ্টি সম্মিলিত

নৈসর্গিক সুর

আসবে আবার বৃষ্টি সঙ্গীতের মূর্ছনায়

শ্রাবণের রাত্রি আর সকাল দুপুর।

………………………………………………….

মঈনউদ্দিন মুনশী 

বিশ্বাস 

একবার আমার কোমল সুর, স্পন্দন, তন্দ্রায়

গিয়েছিল ঈশ্বরের ভাগ্য বিতরণ সভায়।

বৃষ্টি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পুরোনো গান

তীক্ষèধার, অনুরঞ্জক, পৃথিবীর প্রাণ।

বিস্তীর্ণ পতিত ভূমি প্রদীপ-ডানার নিচে

মেঘদল কখনও যায়নি ছেড়ে তার শান্ত হৃদয় চিরতরে।

আমি জানতাম, আলো আরও হবে উজ্জ্বল

আমার বন্ধ চোখে,

আমি জানতাম, প্রশান্ত মহাসাগর শেখাবে আমায়

কীভাবে হতে হয় শান্ত অগ্নিশিখার মুখে।

এখন আমি পদ্মরাগমণির শেষে,

বিন্দু বিন্দু হারিয়ে ফেলছি আরেকটা সূর্যোদয়

তোমার হাতের উষ্ণতার মধ্যে।

……………………………………………..

আবদুর রাজ্জাক

মাঠের দিকে শুধু এক অস্পষ্ট ধু ধু

শব্দ করে না, পাথরের হাসি শীতের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে,

শব্দের প্রতীয়মানতা ডানা মেলে উড়ে যায়

উঁচু পাহাড়ের দেশে, বাকিটা পেকে যাওয়া লাল শস্যক্ষেতে

অশ্রু ঝরানো।

আমাদের ভিতরে কোনও কলহ হয়নি, বিবাদ হয়নি,

আমরা দুঃখিত হইনি, কেউ দুঃখ প্রকাশও করিনি।

মনে রাখা ভালো, দুঃখ মুছে দেওয়ার ক্রীড়াও আমাদের ভিতরে ছিল।

ইউটোপিয়া বলো আর যা-ই বলো একটি সহজ প্রকারে

আমরা বিপন্ন হয়েছি, ঝরাপাতা হয়েছি, গোলকধাঁধার মতো

থেকে গেছি মধ্যপ্রকাশে।

লুপ্তদশার একটি বিষণ্ন শ্রাবণ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

মাহফুজা নামের এক শ্যামা মেয়ে যার নিক নেম মিশু সে প্রায়শ

আফসোস করে, চাকরির আশায় গলা ফেটে চিৎকার করে:

বলে, ভিলেজ পলিটিক্সের কী বোঝো তুমি ?

বোঝো একটি ঘোড়ার ডিম। শাদাকালো নীল একটি অতিশয় ডিম।

সেই ট্রিক্সে আমি আশ্রয়হীনা, আশা এবং হতাশার দুই পাড়ে

মধ্যপ্রকাশের এক নিবিষ্ট অতীত আমি।

………………………………………………………………………

হাসান হাফিজ

মুছিয়ে দিয়ো না স্মৃতি

মুছতে করে না ইচ্ছা

তারপরও অনিচ্ছায় মুছে ফেলতে হয়।

প্রকাশিত হলে পরে যে মহাপ্রলয়

অন্ধকার করে দেবে চারিদিক,

আছে সেই আতঙ্ক ও ভয়।

কিন্তু হৃদয়ের তৃষা

অফুরন্ত অতৃপ্তি পিপাসা

নদীভাঙা টালমাটাল তেজি হাহাকার

জলপথ আরও ভেজা এলায়িত একাকার

প্রবেশে লুকোনো আছে নিশ্চিত মরণ

টের পাওয়া যায় না গো, যাবেও না

আলুথালু নিভৃতির সে কষ্ট ক্ষরণ,

না-পাওয়ার জ্বলুনিতে দাউ দাউ পুড়ে যায় বুক

বিরহে সুদৃঢ় হয় আলিঙ্গন আনন্দ ও মিলনের সুখ।

………………………………………………………

জাহিদ হায়দার

বেঁচে থাক সুবর্ণ অসুখ

‘তুমি আসবে, তুমি আসবে’ বলা টিপ পরেছিলে।

প্রেমিকা মানেই

                যখন সে হাত ধরে

                চৌচির-বিস্তারে নেমে।

প্রেমিক মানেই সারাদিন ডুবন্ত

                বর্ণনাপ্রধান প্রেমে। 

মেট্রোরেলে গড়ে ওঠা

                দেখাদের কথাগুলি

                                ধাবমান চন্দ্রিমা-সম্মুখ। 

নদীয়ায় ‘বিরহ’ নামের এলাকায়

অসময়ে বৃষ্টি পড়ে আজও।         

বেঁচে থাক সুবর্ণ অসুখ।

…………………………………………….

মাহমুদ কামাল

দাগ

দাগ দৃশ্যমান হলে সহজেই মুছে ফেলা যায়

দেয়ালে কার্নিশে এমনকি স্রোতের চিহ্নও

মুছে ফেলা যায়

দাগ ও চিহ্নের মাঝে কিছুটা পার্থক্য আছে

চিহ্ন ক্ষণস্থায়ী কখনও কখনও দাগ দীর্ঘসূত্রে বাঁধা

অক্ষয়ও ক্ষয় হয় প্রকৃতির নিপুণ ছোঁয়ায়।

দৃশ্যমান দাগগুলো মুছে ফেলে মনে হয়

যে দাগ অন্তঃস্থলে প্রকৃতির অনেক গভীরে

তাকে মুছে ফেলা খুব একটা সহজ নয়

অনুভবে প্রতিদিন সেই দাগ অন্ধকারে

আলোকিত হয়।

…………………………………………..

দুখু বাঙাল

বিরহ আর ভালোবাসা অক্ষত থাক   

আমি যখন তোমাকে শুভ রাত্রি বা শুভ সকাল জানাই 

তখন নিজেকে বড় বেশি দীনহীন বলে মনে হয়

স্বাগত জানানোয় বিস্তৃত হতে থাকে আমার যত ফর্মালিটি

এমনকি ধন্যবাদ জানানোর সময়ও মনে হয় দরিদ্রই আমি

আসলে এই সব মামুলি শব্দে হয় না আমার। 

আমি যখন সম্ভাষণে জানতে চাই―কেমন আছো ?

এই জিজ্ঞাসায়ও ছড়িয়ে পড়তে থাকে পরিহাসের ঘ্রাণ

‘দখলদার’ আর ‘বর্বর’ বলতে ইসরায়েলকে বোঝালেও

এই শব্দদুটিও বিস্তৃত হতে পারত মারণাস্ত্রের শক্তির সমান

আসলে এই সব মামুলি শব্দে হয় না আমার। 

আমার জন্য তুলে আনো সেই সব শব্দ কিংবা শব্দসংকেত

যার প্রকাশে মুহূর্তেই নির্ণীত হয়ে উঠবে হিমালয়ের ভার

যার ব্যঞ্জনায় সহসাই বোঝা যাবে সমুদ্রের অতলতল তল

যার আর্তনাদে ধরা দেবে আকাশের হাহাকার কতটা গভীর 

কেবল বিরহ আর ভালোবাসা শব্দদ্বয় পৃথিবীতে অক্ষত থাক।   

আসলে এইসব মামুলি শব্দে হয় না আমার।

……………………………………………………….

রোকেয়া ইসলাম

নীরবতার স্থাপত্য

কোনও অসমাপ্ত স্থাপত্যের ভেতর

ঝুলে থাকা এক ছায়া।

আমি হাত বাড়ালাম তোমার দিকে,

সময়ের দেয়াল ভেঙে

সেখানে কেবল শব্দের ভ্রƒণ

আর অনুচ্চারিত কিছু উষ্ণতা।

ভালোবাসা তখন 

স্রোতধারা নয়,

পৌষে প্রবল ঠান্ডা গ্লাস

প্রখর তৃষ্ণায়ও করতল মুষ্টিবদ্ধ

তবু ভেসে যাই।

আমরা দুই অস্তিত্ব

দূরত্বে নয়,

আমার ভাষার শেষ চিহ্ন।

তবুও কোথাও

একটি অক্ষর নিঃশব্দে জ্বলে

যেন প্রতিটি না-ফেরার মাঝেও

একটি ফেরার সম্ভাবনা বেঁচে থাকে।

………………………………………..

কামরুল হাসান

শিরোনামহীন

১.

তুমি কি পাখি এবং উড়ে আসা ডাক কুহকের ?

ঘুরে দাঁড়ানো গাছ এবং পেছনের দৃপ্ত বনভূমি,

অচঞ্চল আঁশপাখায় জড়ানো জ্যোৎস্নাপূর্ণ নদী,

আনগ্ন সমুদ্রের বুক থেকে ভাসা গোলাপের ঢেউ ?

২.

চোখ যে তোলোনি তাতে মনে হলো গভীর তাকিয়েছো,

ঐ চোখ মর্মমূলে, সংসারের ভেতরে চমকায়!

আজ নম্র, অচঞ্চল স্থাপিত হতে গিয়ে তীব্র তাকিয়েছে;

আর পাহাড়ের মতো চতুর্পাশে সীমা তুলে দেয়

চলচ্ছবিময় প্রোথিত দর্পণে, বনে বনে অনুরণিত:

ঘরের ভিতরে তার চলাচল, মননের গহিন ভিতর।

৩.

তুমি যখন পৌঁছলে গিয়ে চাঁদে

              আমি তখন হুমড়ি খাচ্ছি খাদে

গভীর খানাখন্দে তবু জ্যোৎস্না এসে পড়ে।

তুমি যখন ডুবলে গিয়ে নদে

              আমি তখন জড়িয়ে গেছি ফাঁদে

চর-ভাসানের পিঠে তবু জোয়ার এসে পড়ে।

৪.

বাড়িটিকে স্মৃতির ভিতর থেকে তুলে আনি,

                              যেখানে বসাই

বাড়িটি তো সেখানে আর নাই

হু হু হাওয়া উত্তরের দিকে বয়ে যায়

দক্ষিণমুখো বাড়িটির স্মৃতিকাতরতায়…

এভাবে অতীত-বাড়ি অতিথির কোষে রয়ে যায়।

………………………………………………………….

মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক

চিহ্ন

তবু জেগে থাকে পদচিহ্ন ধূলিঝড়ে ওড়ে রাজপথ মিছিলের ছায়ারা মিলিয়ে যায় অন্ধকার ঠিকানায় নারীদের নেকাবের দিকে প্রশ্নের পালঙ্কে বসে উৎকণ্ঠিত দু চোখে তাকিয়ে থাকে বৃষ্টিস্নাত রোদেলা সকাল হাঁসা আর হাঁসিদের অবাধ সঙ্গমে খসে পড়ে কুমারীর কাব্যিক সৌষ্ঠব বোষ্টমির সুরাঙ্গনে সাঁতারের প্রতিযোগিতায় মগ্ন নগ্ন দেবতার দিশেহারা রাঙাবউ রিখটার স্কেলে ওঠানামা করে কম্পন কম্পাস তবুও যায় না মুছে সময়ের পদচিহ্ন পায়ের প্রণীত ছাপে বারবার জেগে ওঠে জীবনের মানচিত্র।

………………………

রেজাউদ্দিন স্টালিন

কফি কাপ

অবহেলায় পড়ে থাকা কফি কাপ

আমাকে নাড়িয়ে দিল

তা শুধু স্মৃতি নয় বরং এমন গল্প

যা ফুরায় না কোনওদিন―

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম

এত নিঃসঙ্গ পড়ে আছো কেন

কাপ নড়েচড়ে বসলো―আর শুরু করল অবরুদ্ধ সময়ের গল্প:

সেই নারী যে ভালোবাসতো

তোমাকে―সে তার ঠোঁটের তুলিতে রংধনু এঁকেছিল কপালে

ধূসর আকাশ আর বিষণ্ন সময়ে আমি ছিলাম তোমার সাথে―কথাগুলো বলতেই কাপের বুক থেকে মুক্তি পেল এক পরিযায়ী পাখি―

কাপের পেছনে আঁকা জলপ্রবাহ ছলকে উঠল―

এই শূন্যতা থেকে মুক্তি চাই

এই স্মৃতির উদ্দেশ্যহীন

জীবন থেকেও

মনে হলো এখানে আমি বেমানান

কাপের দেহে বন্দি স্মৃতির মুক্তিই আমাকে বসিয়ে দিল আয়নার দাঁড়ে

আমি এক স্মৃতিমুগ্ধ পর্যটক

কুয়াশা আর মরীচিকার মাঝখানে বসে কথা বলছি অতীতের সাথে

কখনও ইশারা কখনও অস্ফুটে

কেউ যেন বুঝতে

না পারে কান্না

আমি কি নির্বাসনের

পথ বেছে নেব―আহ সেই জলকন্যা যদি জানতো―

আমি তাকে ভেবে কাপের গলদেশে এখনও চুম্বন করি আর তাকিয়ে থাকি নীরবতার দিকে

………………………………..

জুয়েল মাজহার

অনলুকার

ভোরবেলা ঝাঁপ খুলি, দেখি―

পেলব একটি তারা খসে পড়ে ধীর-শান্ত নদীর গেলাসে

নদীর খাঁড়ির পাশে রৌপ্যজয়ী মোহনাভ বক―

উড়ে উড়ে কাছে আসে

উড়ে উড়ে দূরে চলে যায়

রাতে যারা শুয়েছিল সাদা-রং ঘুমের কফিনে

তাদের দলে তো, হায়, আমিও ছিলাম!

ঘুমের কফিন থেকে এইবার আমরা সবাই

ঢুকে পড়ব একে একে

হাটখোলা অন্য এক বিরাট কফিনে

সাদা সেই বক এসে বলবে, শাসাবে―

মাত্র কয়েক ঘণ্টা। ঠিক তারপর

তোমাকে আবার গিয়ে ঢুকতে হবে ঘুমের কফিনে

কফিনের ডালা আর খুলবে কি না, তুমি তা জানো না

ততক্ষণে আরও একটি ছোট তারা

খসে পড়বে নদীর গেলাসে

…………………………………..

শাহীন রেজা

অনুপম ইতিহাস

প্রতিটি হত্যা আমাকে বেদনার্ত করে, রক্তাক্ত করে

হোক তা মানুষ কিংবা অন্য কোনও প্রাণি

এমন সংবাদ শোনার পর আমি কাঁদতে থাকি আর আমার ঈশ্বরকে বলতে থাকি,

না প্রভু না এটাই হোক শেষ অঙ্ক 

এই নাটকের

মুগ্ধ, আবু সাইদ কিংবা ফারহান

তোমরা তো আমাদেরই সন্তান

তোমাদের হত্যাগুলোয় আমি নির্বাক; আসমানের দিকে তাকিয়ে শুধু জানতে চেয়েছি, হে বিধাতা কেন এত নিষ্ঠুর  তুমি ?

ফ্যাসিনীর বুলেট তোমাদের বুকগুলো বিদীর্ণ করলে আমার চোখ দিয়ে অশ্রু নয় ফিনকি দিয়ে বেরিয়েছিল রক্ত

আমি জন্মের ভোরে মৃত্যু আঁকতে আঁকতে সকল লাশের পাশে এঁকে দিলাম মানচিত্র এক আর তার কফিন ঢেকে দিলাম লাল সবুজ পতাকায়

হে ঈশ্বর

এইসব মৃত্যুতে তোমার আত্মা কি কাঁপেনি এতটুকু

তোমার দয়াবৃক্ষ থেকে কি ঝরে পরোনি একটাও করুণার ফল ?

ও আমার সন্তানেরা

চলে যাবার মিছিল কত দীর্ঘ

আমি এই মিছিলে শরিক হতে পারিনি বলে ক্রমশ নুয়ে পড়ছি ভেঙে পড়ছি;

যে রক্ত ছুঁয়েছে আমার মাটি

সেই উর্বর বুকেই তোমরা ছড়াও সাহসের বীজ আর হয়ে ওঠো এক করুণ ত্যাগের অনুপম ইতিহাস।

…………………………………….

মারুফ রায়হান

আগুনসাগরে সাঁতার

নীরব বাদ্যের অবয়ব দেখে কে বুঝবে

তার দেহে জমে উঠছে আলাপ, ঘন আর উত্তেজক

মৌন যৌনতার মধ্যে ডুবে আছে আপাত নিরীহ সন্ধ্যা

নিয়ে যাই তাকে আলোড়িত রাত্রির গন্তব্যে

সরস সংলাপে, গানে আলিঙ্গনে, স্পর্শের বিদ্যুতে

কলহবিলাসী বিশ্বে আমরাই যেন একমাত্র জোড়

দুই বিপরীত সৃষ্টি―সৃজনছন্দের তুঙ্গ সম্মিলন।

চড়েছি চূড়ায় কাঞ্চনজঙ্ঘার

    উড়েছি ছাড়িয়ে মেঘ আকাশে আকাশে

          কেটেছি সাঁতার আগুনসাগরে

                পিষ্ট শয্যা থেকে সুখ-শূন্যে

অবশেষে রাগ ছায়ানট টানে যতি

নির্বাপিত শরীরের কোষে স্নিগ্ধ নিস্তব্ধতা

শ্রান্তি ও প্রশান্তি নিয়ে বাইরে দাঁড়াই এসে

অন্ধকারে বৃষ্টির শব্দ, আর কী এক হাহাকার

আমি নির্ভার, তবু কোত্থেকে আসে মনোভার

অজ্ঞাত অবাক অনুভব, আর অশনাক্ত অসহায়ত্ব!

ডাকি তাকে, কী ছিল আমার কণ্ঠস্বরে

দ্রুত ছুটে এসে আমার হাতটি ধরে শায়িতা সঙ্গিনী

তার দশ আঙুলের স্নায়ু থেকে বিচ্ছুরিত সঞ্জীবনী

আমার হৃদয় ধুয়ে দেয়, জোছনা যেমন এ গ্রহকে

মনে হলো পরম প্রকৃত প্রেম ছুঁয়ে গেল

মনে হলো হয়ে উঠলাম বরমাল্যবান।

………………………..

শাহ মোহাম্মদ সানাউল হক

থিবসের পথে ওডিপাস

থিবসের পথ ধরেই এইসব হেঁটে যাওয়া

অথবা হাঁটেনি কেউ কোথাও, কখনও!

পথের ওপর দিয়ে হেঁটে যায় পথ

পথই প্রশ্ন করে; ধুলো উড়িয়ে

জবাব দেয় পথ ধুলোর গন্তব্যে!

একটা মোড়েও থামে না নিয়তির রথ; ভ্রান্তিগুলো

একটা দেহের ভেতর হত্যা হয়ে জমা হতে থাকে;

যদিও আলোর খোঁজে

মানুষ আজও চোখ বেঁধে পথ হাঁটে, কেন না

জেনে ফেলার শেষ প্রান্তে চোখ রাখা যায় না;

থিবসের অন্ধকার শেষে

পথের আলোতে একেকটা বিস্ময় ফোটে

হঠাৎ নিজের মুখ দেখে

মানুষের মনে আরেকটা হত্যা জাগে!

……………………………..

রওনক আফরোজ

এভাবে কেন!

এভাবে চলে গেলে কেন

বলে তো যেতে পারতে!

তুমি তো জানতে তোমাকে খুঁজব

মিসকলে, টেক্সটে, মেসেঞ্জারে

স্বাস্থ্যকথায়, ক্রেজি ব্যস্ততায়,

উপদেশে, প্রসন্ন অবসরে।

তুমি তো জানতে তোমাকে খুঁজব

সঞ্চিতার প্রচ্ছদে

জীবনানন্দের নক্ষত্রভরা রাতে

গীতবিতানের পাতায় পাতায়,

এখন একা ছন্দ খুঁজে খুঁজে নিজেকে হারাই

নিজস্ব অবচেতনায়।

তুমি তো জানো তোমাকে খুঁজব

সান্ধ্য কফির ঠান্ডা কাপে,

ভালোবাসায়, অবাধ অনুতাপে।

তোমাকে খুঁজবো অতীত মন্থনে

স্বচ্ছ ও দুরন্ত জলখেলায়

স্বপ্নফানুসের  হ্রস্ব উড়ে চলায়,

তুমি তো জানতে,

তারপরও এভাবে কি কেউ মরে যায়!

তুমি তো জানতে

আমাদের এখন-আজ ছিল না তাই

তোমাকে খুঁজব আদি-আগামীর

নীলাভ্র বেদনায়।

তুমি তো জানতে,

তুমি তো সবকিছু জানতে,

এভাবে হঠাৎ চলে গেলে কেন ?

বলে তো যেতে পারতে!

………………………………….

খালেদ হামিদী

পরিচয়

তুমি কে আমার চাও পরিচয় ?

কে তুই আমাকে দিস অর্ধচন্দ্র ? 

কী শেখাতে চাস উড়ে এসে জুড়ে বসে ?  

তোদের গল্পেরও ঢের আগে আমি হেঁটেছি উয়ারী 

বটেশ্বরে, ঘণ্টাধ্বনি শুনে নয়, না মাটিতে লুটিয়ে মস্তক। 

মুদ্রার ঝনঝনানিতে বিভোর না হয়ে

পথ থেকে সড়কে সেখানে হেঁটে গেছি বহুদূর। 

বহিরাগতের সাথে লড়াইয়ের অকল্পিত কাল আগে আমি

গন্ডকীতে ভাসাইনি গন্ডোলা। শুধু তীর ধরে এগিয়েছি মানুষ হিসেবে।

খোঁজ নিয়ে দেখো পারলে সমতট, গৌড় কিংবা রাঢ়ে লেগে আছে 

এখনও আমার যত ঘামের শিশির।

কীর্তিস্তম্ভ ? কম নেই তাও।

কী তবু শোনাতে কিংবা মাথায় ঢোকাতে চায় আমাদের, কারা ?

এক রাস্তার পানাম দিয়ে আমি বেরিয়ে এলেও

ফুরায়নি এখনও জেনো সত্তার সুরভি। 

কার তবে কোনও অঙ্গ ভেসে যায় বিতস্তার জলে ?

এদিকে সম্যক চলি পথ

নিজেকে হারাই না বলে। 

……………………………………….

বদরুল হায়দার

সময় বিক্রির গল্প

সময় বয়ে গেলে কালো জ্যোৎস্নার রং গাঢ় হয়। শব্দের স্লিপারে চিত হয়ে থাকা বেদনার ওপর কেবলই গতির অন্তর জুড়ে যন্ত্র-মানবের আনাগোনা।

গতির দূরত্ব জুড়ে সমগ্র শহর পোড়ানো ক্লেদ আর যন্ত্রণাকে ঘিরে প্রজাপতি পাথরের সবুজাভ দেহে জল চোষে, তৃষ্ণার অসুখ গিলে খায় স্মৃতি।

ঘাসে ফুল ফোটে। আমি আদি-অন্ত বেঁচে থাকি। রত্নের সন্ধানী মানুষেরা তবু শ্বেত নির্মাণের সাজানো বাগানে স্বপ্নপাখির উড়াল দেখে।

ভালোবাসার অজান্তে অনায়াসে আলো অন্ধকারে সীমানার কাঁটাতার ছিঁড়ে ফেলে আমি বদলি স্বভাবে পঞ্জিকার বাঁকা চাঁদে দৃষ্টির ঢালাই করে বিনির্মাণ করি দেশ রাষ্ট্র ও শাসন।

সময় বয়ে গেলে কালো জ্যোৎস্নারা সাদা হয়। ধাঁধা হয়। অলীক মানুষ তবু বেঁচে থাকে চেতনায় অতিক্রম করে ভবিষ্যৎকে।

সময় বয়ে যায়, মানুষেরা তবু বেঁচে থাকে পাখির উড়াল দেওয়া বেদনার মতো।

সাদা জ্যোৎস্নার রং কালো হয়। গল্প বদলায়। মানুষ সময় কেনে। মানুষ সময় বেচে দেয়।

………………………………………

শিহাব শাহরিয়ার

ব্যবধান

তুমি যখন স্কুলবালিকা―তখন

পিসিমা তোমার হাতের রেখা দেখেছিল

কিন্তু ভবিষ্যতের কথা কিছু বলেননি―তখন

একান্নবর্তীতে দুধের সরের মতো গ্রামীণ-ঘ্রাণ ছিল

তুমি যখন কলেজ কিশোরী―তখন

ঋতুস্রাবের লজ্জায় লুকিয়ে রেখেছিলে মুখ

পিসিমা ঠিকই তোমার চুলে বেণী করে দিয়েছিলেন

কিন্তু কখনও তাকাননি তোমার নিচের নখের দিকে

এখন বিউটি পার্লারে নখের যত্ন নিতে যাও

আর বাড়ি ফিরে ঘুমের ভেতর দেখো ঘোড়ার খুর!

বাহ, বড় হওয়ার কী দুর্দান্ত লক্ষণ!

তাহলে অযথাই বেলুনের আয়নায় ফেলে রাখো পা

অথচ পায়েরা পছন্দ করে চিলেকোঠার দূর্বাঘাস!

বেলকনিতে রোদ খোঁজো না

আমি ? ঘরের পিছনের মচমচে পাতায়

পা রেখে শিহরিত হই

শিহরণ ? কী ও কেন ?

সংজ্ঞা খোঁজো তার

মুখস্থ কর নামতার শরীর

বয়সগুলো পিছনে পড়ে আছে…

অভিমানিনী―

এখন ছাদের নিচে অনেক ব্যবধান ?

…………………………………….

মুস্তফা হাবীব

শাওয়ালের চাঁদ

সুস্থ সবল সব মানুষই স্বপ্নের জাল বোনে 

অবিশ্রাম সুখী সমৃদ্ধ জীবনের ছক এঁকে সম্মুখে যায়,

কারও স্বপ্ন রূপায়িত হয় সাতরং সিস্টেমে

স্বপ্নের জালে ধরা পড়ে সোনালি-রুপালি মাছ।

কারও স্বপ্ন মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে এলোমেলো

পথের বাঁকে, খাদের কিনারে

ডানাভাঙা-আশাহত পাখির মতো ছটফট করে

গোপনে একাকী বয়ে বেড়ায় বিপন্ন জীবনের স্বরলিপি।

আবার কিছু কিছু মানুষ পরাজয় মানে না

বীর-বীরাঙ্গনা স্বভাবে রৌদ্রে পোড়ে বৃষ্টিতে ভেজে

ঝড়ের কষাঘাত সয়ে দাঁড়াতে চায় পুনর্বার

পায়ের তলায় খুঁজে ফেরে এঁটেল মাটির সৌরভ।

স্বজনের মুখে ফোটাতে চায় হাসি

মেঘবালক-বালিকার জন্য সংগ্রহ করে নতুন বসন

আয়োজন করে অপেক্ষাকৃত উত্তম খাবারের

রোজার শেষে আনন্দে দ্যাখে শাওয়ালের চাঁদ!

……………………………….

সালিম সাবরিন

শ্যামাঙ্গিনী

(শওকত আলীর প্রদোষে প্রাকৃতজনের নায়িকাকে)

শিল্পের সুষমাময়ী মৃন্ময়ী সে কায়া,

শ্যামাঙ্গের তুলিকায় মূর্ত প্রেম-ছায়া।

প্রাকৃত নারীর রূপে সুন্দরের বাস,

মূর্তিতে জাগিয়ে তোলে আর্যদের ত্রাস।

ধর্মের দোহাই পেড়ে ঘাতক সমাজ,

পুড়িয়ে মারিতে চাহে সুন্দরের কাজ।

পাপাচারী অপবাদে দহে নারীদেহ,

হৃদয়ে জাগেনি কারও বিন্দুমাত্র স্নেহ।

তপ্ত সেই লৌহদণ্ড বিঁধে যায় যোনি,

শিল্পীর স্বপ্ন ভাঙ্গে তীব্র আর্ত ধ্বনি।

মৌলবাদ কেড়ে নেয় সৃষ্টির উল্লাস,

নিম্নবর্গে নেমে আসে মৃত্যুর নিঃশ্বাস।

রক্তে লেখা ইতিহাস আজও কাঁদে একা

ক্ষতচিহ্ন বয়ে চলে শিল্পে যায় দেখা।

…………………..

মতিন রায়হান

হেমন্তের ধূপগন্ধা ভোর থেকে উত্থিত

হেমন্তের ধূপগন্ধা ভোরে পাঠ করি শ্লোক, দৃঢ়লয়ে…

আপনিও পাঠ নিন বিহঙ্গসকালÑকোমল রোদ্দুরে…

আমাদের পাঠ থেকে জন্ম নিক হাজার নদীর ঢেউ

ইলিশের লাফ থেকে খুঁজে নিই অতীত দিনের ঋদ্ধ

সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি। কিন্তু আজ আমাদের বুকে উঠে লম্ফঝম্ফ

করে বিনাশের টাট্টু ঘোড়া! দেখি ফেট্টি বাঁধা সহিসের

পীড়াদায়ী নর্তনকুর্দন! জীবনটা যেন আজ নদীর কঙ্কাল!

যতই পালটাতে চাই মনের খোলনলচে, পারি না তো!

সত্যবাবু ইশারায় যতই ডাকুন : আয়, বস, বল তবে

সমূহ যাতনাকথা; পারি না তো বলে দিতে সব ইতিবৃত্ত!

সমূহ বিনাশ বারবার হাত তুলে ডাকে, নিরন্তর জোগায়

অলীক প্রণোদনা! মেলে ধরে দৃশ্যগ্রাহ্য শুভ্র স্তনশোভা

পিপাসার্ত ঠোঁট আর উন্মাতাল ঊরুসন্ধি! তাই থাকি ভয়ে!

হেমন্তের ধূপগন্ধা ভোরে পাঠ করি শ্লোক, দৃঢ়লয়ে…

………………………..

শামসুল বারী উৎপল

ত্রিভুজ, সময় ও জীবন

আঁধার-পীড়িত ভাবনার চিলেকোঠায়

মরে যায় শুভ্র কৈতর

দীর্ঘ তটরেখা হাতছানি দেয় নীলাম্বরীর নীল

সবুজ ঘিরেছে আগুনে, উত্তপ্ত মরুভূমি

নপুংশক আঁধারে জ্বলে

ভ্রান্তির যোগাসনে বসা উদ্ভট পৃথিবী

ঠক ঠক কড়া নাড়ে ত্রিভুজ, জীবন ও সময়,

পিথাগোরাসের উপপাদ্য জানান দেয়

ত্রিভুজ, জীবন এবং সময়ের তিনটি বাহু 

সমার্থক নয় পরস্পরের।

গতকাল আসোনি আজকেও নয়

কাল কি ঠিক ঠিক আসবে তুমি!

…………………………………….

মাহফুজ আল-হোসেন

উৎসবের শব্দগুলো

মাতৃসুলভ শব্দগুলো উৎসবের উদ্বেগ আর লাজুক উদবেড়ালকে পোষ মানায় বাৎসল্যে,

যেন বানের জলের মতো তেড়েফুঁড়ে আসা দুঃখের প্রবাহে সাময়িক বাঁধ―

আর স্মৃতিভ্রষ্ট ক্যালেন্ডারের বুকে লাল বৃত্ত এঁকে দিয়ে

নির্বোধ পিপীলিকার ক্লান্তিকে ছুটি দেয় একদিনের জন্য।

অথচ চক্রক্রমিক আনন্দ আর দুঃখ

কখনই সহোদর ছিল না, বরং একই মুঠোফোনের বিজ্ঞাপনে দুই সংস্করণ―

একটায় লেপ্টে থাকে রেভলন হাসি, অন্যটায় দুষ্পাঠ্য শর্তাবলি।

ইথারে ভেসে থাকা অসবর্ণ শব্দগুলো জোড়া বাঁধলেই অশুচি হয় না,

বরং শব্দের মৈথুনে উৎসবের পুনর্জন্ম হয় নতুন অভিধানে;

অপ্রস্তুত প্রকৃতি―নদী-মহাসড়ক-রেইলট্র্যাক

আর রোমিও হাওয়াই চপ্পলের আওয়াজও মিলিয়ে যায় বহুবর্ণিল বিলবোর্ড আর সাউন্ড সিস্টেমে।

শব্দগুলোও জানে―এই আনন্দ মুহূর্তিক,

আর দুঃখ এক চলমান ভাষিক প্রকল্প―

সে কারণেই প্রতিশব্দগুলো

নৈরাশ্যের চিরন্তন নদীতে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে নেমে আসে বারংবার―স্ফূর্তির বার্তাবহরূপে।

গাত্রোত্থান করে সৌগন্ধ শব্দগুলো আজ জরিদার পাঞ্জাবি পরুক―বর্ণান্ধ বর্তমানের চোখ ঝলসে দিতে;

কারণ উৎসবের পরদিন হয়তো ওরা ঠাঁই করে নিতে পারে অচেনা দৈনিকের হারানো বিজ্ঞপ্তিতে।

………………………..

ভাগ্যধন বড়ুয়া

শূন্যযাত্রা

পথের আরম্ভ কিংবা শেষ আমরাই চিহ্নিত করি

বস্তুত শূন্যতা

প্রশ্নের উত্তর নেই, মিলেও না…

মুখ দেখাদেখি, ঝাপসা হয়ে যাওয়া স্পষ্ট ছবি

বিস্মৃত কথারা ফেরত এলে মৌন মুখ, শূন্যদৃষ্টি…

ভিন্ন গল্প নিয়ে আসে, জমা স্মৃতি কোষবন্দি;

বলতে পারে না কিংবা বলে কী হবে?

মনে জমাটবদ্ধ বয়ান…

গতিতে পতিত হলে কে ধরে রাখে সময় ?

………………………………..

শাহেদ কায়েস

কবিতাযুগল

পায়ের নিচে সূর্যরেখা

পৃথিবী আজ হেসে উঠেছে নবীন সূর্যের আলোয়

দাঁড়িয়ে আছি উন্মুক্ত বুকে সূর্যাস্তের মুখোমুখি

ছায়ার অবশিষ্ট নিয়ে ঘরে ফিরি, হাতে ফুল

স্মৃতির প্রাচীরে আঁকি যত সোনালি ভুলের গুল্মলতা

আমি দিবালোক প্রহরী, অন্ধকারে আস্থা নেই মোটে

যা ছিল গোপন, তুলে দিই নীরব আত্মপ্রকাশের হাটে 

আঘাত নয়, আত্মপ্রবঞ্চনার স্পর্শে নত হয় নিশ্বাসও

যা কিছু আবরণ ছিল―উড়িয়ে দিই ধূলিরূপ সমর্পণে

ভোর ফোটে, নদীতে মুখ ধুয়ে নেয় পুরোনো ছায়া

প্রাচীন গাছটি পাখির স্পর্শেও কাঁপে না আর, শুধু ঝরে

তোমার বার্তা―সেসব বাতাসেই গলে যায় মৌন রোদে

রোদে শুকিয়ে নিই সমস্ত অপেক্ষার ভিজে পাণ্ডুলিপি

স্তব্ধতার কাঁথায় মুড়ে রাখি কথাহীন প্রেমের মূর্ছনা

যা ছিল চিহ্ন, মুছে যায় দিন শেষের সূর্যরেখার মতো

বাতাসে তবু ঝুলে থাকে এক অজানা ঋতুর কণ্ঠস্বর। 

শূন্যতার প্রান্তে

সমস্ত বৃক্ষের শিকড়ে খুঁজেছি―কিছুই নেই, শুষ্ক নিঃসঙ্গতা

পাতা ঝরে পড়ে, তবু একটিও নাম উচ্চারিত হয় না বাতাসে

মেঘ জমে না আর, আকাশ যেন সাদা পাথরের দেয়াল

প্রার্থনা হয় নিঃসাড়, বৃষ্টি আসে না, শুধু উড়ে যায় মেঘ

নদীর জল রয়ে গেছে নিশ্চল

কোনও ঢেউ নেই―প্রতিশ্রুতি কোনও সমুদ্রযাত্রা নেই

রাত্রি নামে ঠিকঠাক, কিন্তু তার ফাঁপা বুক

কেউ নেই, ব্যঞ্জনা নেই কোনও―শুধু ছায়ার কারসাজি

আলো ফুরিয়েছে আগেই, অন্ধকারও নামেনি

শুধু এক ধূসর সময় দাঁড়িয়ে―নড়ে না ঘড়ির কাঁটা

শব্দের ইঙ্গিত ঝরে পড়ছে, বাক্য ফিরিয়ে নিয়েছে নিজেকে

ইশারা তো দূরে থাক―চোখে দীপ্তি নেই আর

ছিল না কোনও দাবানল, ছিল না কোনও ক্ষোভের বীজ

সব কিছুই নিস্তরঙ্গ জল, যাকে নাড়িয়ে যায় না হাওয়া

জেগে থাকা মানেই ক্লান্তি, ঘুম মানেই বিশৃঙ্খলা

তুমি কেউ নও, তুমি কিছুই না―নেই অন্তিম, নেই শুরু

…………………………………….

টোকন ঠাকুর

থাকা না-থাকা

ছিল―শব্দটিই বলে দিচ্ছে, নেই। নেই নেই শব্দের মধ্যেই

ছিল উঁকি মারে। কী ছিল ? কী নেই ?

হেমন্ত ছিল মানে হেমন্ত নেই আর। শীত ছিল মানে শীত

নেই আর। ট্রেন চলে গেছে মানেই ট্রেন এসেছিল।

বৃষ্টি ছিল। বৃষ্টি নেই। কুয়াশা ছিল। কুয়াশা নেই।

একদিন তুমিও ছিলে, নেই হয়ে গেছো।

কিছুই কি থাকে না ? কবিতা ?

…………………………………..

সৈকত হাবিব

একগুচ্ছ কণাকবিতা

প্রজাপতিটা

পাখা নেড়েই চলেছে

অথচ সে মৃত

মৃতেরা হয়তো

প্রেম বোঝে না

তবু তুমি কি

ভালোবাসবে না ?

আয়না তখনই জীবিত

যখন তুমি

তার ভেতরে থাকো

মানুষ যুগপৎ

তার নিজের

প্রভু ও দাস

কে তুমি

অসীম শূন্যতার ভেতর

একটি খুব ছোট্ট বিন্দু

কত তুচ্ছ তুমি

যখন ব্যাকটেরিয়ারাও

তোমার যমদূত

হাওয়া কি ঈশ্বর

সে তোমার প্রাণবিন্দু

অথচ অদৃশ্য

নাম জীবনানন্দ

অথচ বেদনার

কী তীব্র সিন্ধু

মানুষ ব্রহ্মাণ্ডের

তুচ্ছ ধূলি

তবু জানে তার ভাষা

১০

শিকারি কি জানে না

হরিণেরও

একটা হৃদয় ছিল?

…………………….

ওবায়েদ আকাশ

ফাল্গুনের চোখ

একজন ইলিশমাছ দাঁড়িয়ে স্যালুট করছেন

ভোরের হাওয়া

এই নদীবিধৌত চাওয়া তোমার মর্মে

ভাবতে বসে দেখি―

একের পর এক জঙ্গল কেটে, ভিটেবাড়ি কেটে

একে একে প্রস্তাব করছি নদীদের নাম:

কেউ দুঃখ, কেউ দীর্ঘশ্বাস কিংবা কেউ প্রগাঢ় নিঃসঙ্গতা

নদীতে যেসব নৌকা ভাসতে শুরু করেছে

কারও গায়ে হলুদ মৌমাছিদের ভাষা

কেউ আবার সামুদ্রিক প্রবাল বোঝাই রোমান্টিকতা নিয়ে ঘুরছে

আজকাল এসব দেখে যে আমার চলে না

তা আমি কী করে বোঝাই মরাপাতাদের!

আমি কৃষকের কাছে যাই, গাছের কাছে যাই

তারা কেউ মেহগনি পাতার ঝরে পড়ার নাম রেখেছে কান্না

কেউ মাঝনদীতে চাষাবাদের নামে খনন করছে হৃৎপিণ্ড

এবার তোমাদের এটুকুই বোঝাতে পেরেছি, ফাল্গুনের চোখ

…………………………………………

বিনয় কর্মকার

লিলিথ

লিলিথের অধিকার মেনে নেয় না ঈশ্বর!

বিকল্প দরপত্রে তৈরি হয়েছিল ইভ।

একদিন এখানে পাখি পোষা হতো,

প্রাচীন অট্টালিকার গায়ে-গায়ে এখনও জড়িয়ে আছে ভাঙা খাঁচা।

স্থির সুরাপাত্র কেঁপে-কেঁপে ওঠে! কামাতুর পুরুষের ঠোঁট খোঁজে চুমুক উছিলা―

রাতের উৎসব শেষ হলে, প্যান্ডেলের পাশে পড়ে থাকে, হ্যাজাক আলোয় পোড়া পতঙ্গ পাখনা, ম্যান্টলের সাদা ছাই―

ঘুঙুরের খসে পড়া ঘণ্টি থেকে খুঁজে নিয়েছি বাইজির ইতিবৃত্ত―

………………………………..

রেবা হাবিব

না পাওয়ার বেদনা

তোমাকে না পাওয়ার বেদনায়, বিতৃষ্ণায়

আঁখি মুদ্রিত হয়নি!

সময়ের রুদ্ধশ্বাসে হারিয়ে যায়নি দুনিয়ার মায়া! 

অভিমানী মন আত্মাহুতি দেয়নি পাহাড়ি শিশিরে!

বোকা শিশির! কথা দিয়ে মন দিয়ে, স্পর্শে বসেনি অচেনা কোনও যুবকের ঠোঁটে!

এভাবেই কি কেটে যাবে নির্বাসনে, জীবনের ভেলা?

মানুষ অতি সহজে ভুলে যায় অনেক কিছু!

যেভাবে বৃষ্টি ভুলে যায় মাটির প্রত্যাশা!

বারেবারে, তপ্ত রোদের গল্প শুনি বৃষ্টির ছন্দে!

ফ্যাকাশে মুখে শুনেছি বিশালাকার সমুদ্রের মাঝে কারও আত্মহননের গল্প!

যদি কেউ শর্তহীন ভালোবাসে

নিজেকে তখন বৃক্ষের কচিপাতা মনে হয়!

তাই তো, সব ব্যথার গল্প শোনাতে নেই।

কিছু জমানো ব্যথা জলজ পাখির

গান হয়ে মিশে যায় উত্তাল সমুদ্রে!!

……………………………….

সাকিরা পারভীন

বিস্সুদবার

ঝপঝপ করে বিষ্টি পড়ছে

একটা বারান্দা জামা, কাপড় খুলে ফেলেছে

আজ বিস্সুদবার মাথাভরতি কাচ

ঘরভরতি ঘুম বিছানাভরতি নুন নিমফুল নহলী উৎসব ডায়োনিসিয়া

আজ বিস্সুদবার বুকভরতি ভস্মীকৃত নেপলস…তোমার শিঞ্জন

আর নদীটাকে তহসিল অফিসে রেখে

দাগ খতিয়ানের পরিমাপ এক্স টু দি পাওয়ার ওয়াই

শা-ই শা-ই শা-ই…ধ্বনির কুচকাওয়াজ আজ বিস্সুদবার

গা ভরতি শুক্কুর শনির প্রতাপ জুমার আজান পোলাও কোর্মার ঘ্রাণ

কচুশাকের দীঘল ভেজা নরম ত্বক

তুলে আনার প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে বাছতে বসা কুচো চিংড়ির সাথে

সংলাপ বিনিময় অন্তর্বতীকালিন অভিশাপ আহ বিস্ময়কর বিস্সুদবার

তিনটি ধূম্রশলাকার মুণ্ডুপাত করা গেছে চারটি রাজতন্ত্র

পাঁচটি পরিবারতান্ত্রিক থিয়েটার সাতাশটি ধর্মশালা আহা বেহিসাবি বিস্সুদবার

আজ বাঁশি নেই ঘরে তাও কয়েকবার বৃষ্টির তাপমাত্রা মাপা গেছে

ধুধু… একশ চার নাকি পাঁচ ডিগ্রি জ¦রের মেসমারাইজড

আজ বিস্সুদবার তোমার বুঁদ হয়ে থাকা অহংকারের ভেতর

ঢেলে দেয়া গেল দরবৃদ্ধির সূচক

তাকেও তুমি বাসতে শুরু করেছ ভালো ভাবোনি কোনওদিন যাকে

ছন্নছাড়া গোলাপের বাগানে খুব সাধারণ কোনও গোলাপই না হয় হতো

তাতে কি বদলে যেত আবহাওয়া চিনি ভরতি চা খেয়ে

রোজই যে ডায়েট প্রকল্প করো তাতে তো তার কথাই মনে পড়ে

তোমার পৃথুলা ডাক্তার যার চেম্বারে বসেছে বৈশ্বিক সেমিনার

তুমি খুব অপারগ সভাপতি হয়ে

কোনওমতে বলে দিতে পারো কবিতা আর চিত্রকলার ফারাক

সে তো ফারাক্কা প্রকল্পের আওতায় পড়ে না

বিস্সুদবার এলে এত কিছু এক্সিকিউট করতে হয়

তার থেকে পিকাসোর ধারাবাহিক বউয়ের আর শ্রমণ-রোদনের গল্পগুলো পড়ে না নিলে

সিরামিক পটারির কিউবিক ফর্ম জানা না হলে পপার্টের পিতার খবর না নিলে

বিস্সুদবার রাত বড় বেপরোয়া ভাবে তোমাকে তোষামোদ করতেই থাকবে

যেন তুমি কেবল এর গহ্বরে ডুবে থাকতে প রো

আজ বিস্সুদবার… আদতে শুক্কুরের দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসেছে

তা-ও তিন ঘণ্টা হতে ন মিনিট বাকি

চল সাকি

প্রিয়তম সাকিরা তোমার ঠোঁটের ভেতর

একনাগাড়ে শিবরঞ্জনি সুরে দুমড়ে মুচড়ে বসে থাকি।

……………………….

মুশাররাত

নিষিদ্ধ

আপনি ঠিক আমারই মতো

তারপরও মনে কথা আছে যত

বলা যায় না।

আপনি ঠিক আমারই মতো

আমার মতোই রং নীল-সাদা প্রিয়

তারপরও চার চোখে সওয়া যায় না।

আপনি ঠিক আমারই মতো

সবুজের কাছে ঠাঁই নেওয়া ক্ষত

তবুও মাটিতে মাটিতে হাত ছোঁয়া যায় না।

আপনি ঠিক আমারই মতো

মানুষের ভিড়ে একা, অদৃশ্য, অশ্রুত

অশ্রুটা করতলে মোছা যায় না।

আপনি ঠিক আমারই মতো

বয়ে নিয়ে বেড়ানো এক বুক মায়া―

আলোকিত কোনও হাতও

নিতে আসে না।

পরস্পরকে আমরা তবু চাইতে পারি না।

পরম্পরায় আমাদের কেউ মনে রাখে না।

……………………………….

আহমেদ শিপলু

নাটাই। ঘুড়ি। অদৃশ্য সুতোর ভরসা

যতটা সিরিয়াস হলে কাটা ঘুড়ির পেছনে ছোটা যায়, ততটাই জীবন। বিশ্বাস। গোত্তা খাওয়া ঘুড়ির মতো। উড়ছে। মাঝ আকাশ বরাবর দৃষ্টির আড়ালপূর্ব মুহূর্তের মতো। সুতো কাটা ঘুড়ির কোনও মালিক থাকে না। মালিকেরা নাটাই গোটাতে গোটাতে হিসাব করে সুতোর। এদিকে শহরজুড়ে টুকরো হচ্ছে আকাশ।

মানুষের কাছে গেলে লাটিমের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। আসলে ঘ্রাণজুড়ে শৈশবের মাঠ। বয়স বাড়ে আর সঙ্গীরা চলে যেতে থাকে। এখানে বিজয়ের গন্ধ পাওয়ার কথা। অথচ গন্ধজুড়ে নিঃসঙ্গতার বিলাপ!

সব সময় বিজয়ী হতে নেই। বিজয়ী হলে দাড়ি, কমা এসে অপেক্ষা করে। পরাজিতের সামনে চিরকাল ধু ধু প্রান্তর। সকল পথই তখন অপেক্ষা করে। মানুষেরা পথের মাঝখানে হাঁপায়। হাঁপাতে হাঁপাতে হারিয়ে ফেলে জীবন। দেয়াল এবং ঘরকে আলাদা করতে গিয়ে একদিন দাঁড়ালাম ছাদের কিনারে। পায়ের তলে ঘর আর দেয়াল। ছাদের ওপর ঝুঁকে পড়া ফলবান বৃক্ষের ডালপালা। পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেওয়া চাঁদ। জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া ছাদ, কার্নিশ, সিঁড়ি। ঘর আর দেয়ালের কথা হচ্ছিল যদিও।

যতটা সিরিয়াস হলে এই সব আলাপ অর্থহীন মনে হতে পারে, ততটা অগুরুত্বপূর্ণ নয় এইসব অর্থহীনতা।

………………………….

রকিবুল হাসান

কেউই থাকে না

কেউই থাকে না―শুধুই শ্যামের বাঁশরী কেঁদে কেঁদে থেকে যায়

নদীও তো একদিন যৌবনের গান নিভে চলে যায়,

নিজের বুকেই নিজেকে হারায় স্বপ্নের মৌতায় খরায় পুড়িয়ে

ঢেউয়ের উন্মত্ত মাতাল পিপাসারা তখন কঙ্কাল হয়।

চোখের মায়ারা মরীচিকা ভুলের রোদ্দুর হয়ে যায়

বুকের কম্পন নতুন জমিনে ঊর্বরতার উৎসব হয়,

নতুন জীবনে সবুজের কবিতার পঙ্ক্তি হয়

অকস্মাৎ বর্ষায় মরা নদীও যৌবন পায়―ভেসে যায় পুরনো জীবন।

সবই তো চলে যায়―সবই হারায়―কিছুই যায় না―হারায় না কিছুই

নতুন রূপেতে ফেরে শুধু পলিমাটিতে নতুন জীবনের সুর,

এইসব বুকে নিয়েই তো ভালোবেসে যায় নিরুদ্দেশ সন্ধ্যাদোয়েল

বুকের কম্পনে বদলায় জীবনের গল্প―মেলে না তো হিসেবের চার কোণ।

বেণি দুলানো পথেরা―ঝিঁঝি পোকার মায়াবী মুঠো মুঠো আলো

কোথায় হারিয়ে গেলো―চেনা পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ

কতো রামধনু কতবার যে প্রেমের রঙে জন্মালো-মরলো!

কোথায় কীভাবে ভেসে গেলো পবিত্র মমতাভরা বাড়ির উঠোন।

তুমিও তো একদিন চলে যাবে―মল্লিকাদির মতো

অথবা রহস্যময় বনলতা কিংবা লাবণ্য হিসেবি রূপাগ্নি জয়নাব

বুকের গহিনে অদৃশ্য অজস্র বিষধর নীলবিষ দংশন,

কেউই থাকে না―চলে যায়―শুধুই শ্যামের বাঁশরী কেঁদে কেঁদে থেকে যায়।

…………………………

সেঁজুতি বড়ুয়া

নেশাতুর সময়ে

আমাদের চা-বিকেল

উনোনের কেটলিতে ফোটে

ধূসর সিনেমা আর গল্পের

ফাঁদপাতা ঘ্রাণে

মুচমুচে স্মৃতিগুলো যেন

চুপিসারে গ্রামোফোনে বাজে;

ধুলো জমা পুরোনো এ শহরে

সময় কি বুনো ফুলে ওড়ে ?

কালজয়ী সুরের রোদ্দুরে

চলে নেশাতুর গজল মহড়া

বিষাদের স্মৃতি কেটে গেলে

পাঠ করি, পরস্পরকে আবারও

সন্ধেটা প্যারাবন যেন

দপ করে নেভে আর জ্বলে

আর কত অগভীর শীতে

উদ্যানে বসন্ত তাড়াবো?

দিনশেষে আমরাও ‘শুকসারি’

কাঁপা হাতে আকাশ দোলাই

দূরে রেখে হাহাকার স্মৃতি,

অভিমানী ঠোঁট খুঁজে পাই!

……………………………..

মুক্তিপিয়াসী

বসন্ত নকশিকাঁথা

বসন্ত বাতাসে উড়ে কত্থক বোল,

স্বরলিপিতে অলৌকিক গন্ধ ঢালে কস্তুরী;

কালের কোরাসে হয়ে যায় নীলকণ্ঠ!

নীল আকাশে দেখা দেয় কলঙ্কিত চন্দ্র হয়ে,

জোছনাস্নানে কোটর ভরে রেখে দিই ইন্দু প্রভা।

তারপর ফিরে যেতে যেতে অনন্তর কোণে জেগে ওঠা সহজিয়া গান

অবুঝের মতো কেবলই পিছু ডাকে।

পদ্মপাতায় শিশির বিন্দু রেখে কতবার ডুবেছি স্বপ্নপাথারে; কল্পকাব্যে কতবার মনে মনে আফ্রোদিতি হয়ে উঠেছি!

নিগূঢ উন্মীলন ঝামুর ঝুমুর পসরা সাজায়; রেখে যায় সকালের ড্যাফোডিল!

শিশির শুকিয়ে বয়ে যায় অগ্নি মেঘ।

ততক্ষণে ‘জুপিটার সিম্ফনি’ রচনায় মত্ত মোজার্ট; মত্ত জীবন কনসার্টও!

স্নায়বিক কালি কলমে লেখা এই নকশি কাঁথা; সুচের ফোঁড়ে ফোঁড়ে চিত্রিত

বিষ ও অমৃত ক্রমান্বয়ে শাণিত হয়

নীল জ্বরে!

……………………….

স্নিগ্ধা বাউল

কুয়াশার হুইসেল

রুই মাছের মতন ফুটে থাকা চালতা ফুলের উঠানটায় শহরে মিছিল করে মৃত গ্লাডিওলাস। কানকোর লাল রক্তটা জমাট করতে চায় বেইলি রোডের মহিলা সমিতি। এলেবেলে সাজিয়ে দিলে যে নদীটা বুকের ভিতরটা টানটান করে রাখে তাই আমাদের পাটিপাতা বিছানা। দম আটকে গেলেও বাতাসের পায়চারি করার যে রিদম তা একটা সমুদ্র সমান গর্জনের হুইসেল। পেছনে ডাকছে মা কলতলায় জমানো জলে মুছে দিতে সকালের নিপাট দুঃখ! প্রতারিত হতে থাকলেও সেখানে মরিচা জমেনি বীরভূমের লালমাটি হয়ে। অথচ পাখিরা ভুল সময়ে ডাকেনি কোনওদিন বসন্ত কিংবা পরিহাসে!

শহরে কুয়াশা নেমে আসে স্মৃতির বিভ্রমতার শৈশব হয়ে। পাড়াতো আত্মীয়মুখ ঝাপসা হয়ে এলে চাদরে ভাসে অসুখ।

…………………….

নিলয় রফিক

প্রকৃতির ঘরে

কে যেন আসবে শুনে সমুদ্র প্রস্তুত

ঝরাপাতা উড়ে যাচ্ছে বৃক্ষের সবুজ

হেমন্তের নোনা রোদ উষ্ণতা আরাম

সুড়ঙ্গপথে নজর কারুকাজে সাজ

দেখতে-দেখতে সন্ধ্যা রথের মিছিল

ফুলের গন্ধে আবার নয়নাভিরাম

শব্দের বীজতলায় সুরের জিকির

প্রমত্ত যুগলডানা মণি-চোখে প্রেম

নদের জলের ঢেউ মোহনা পাগল

আনন্দচিত্ত পাড়ায় প্রকৃতির ঘরে

উড়াল দেব শহরে সুন্দর মুহূর্তে

প্রাচীন মরুর কূপে জলের সাঁতারে

…………………….

পিয়াস মজিদ

মৃতদের মেসেঞ্জারে

মৃতদের মেসেঞ্জারে চোখ পেতে রাখি।

আমাকে শেষ কী লিখেছিলেন―

প্রবুদ্ধসুন্দর কর

অনু হোসেন

আপন মাহমুদ

পিনাকী ঠাকুর

শারমিন রাহমান

সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়

দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু

রাজীব আশরাফ

আকাশলীনা

রাহুল পুরকায়স্থ

কিংবা

মুরাদ নীল ?

এদের অনেকের শেষ মেসেজের উত্তর দেওয়া হয়নি,

দেব দেব করে এখনও দিই না।

আমার মেসেজ সিন করে

তারা যদি আবার ঘুমিয়ে পড়ে!

অনেক প্রশ্ন মনে নিয়ে মরে গেলেও

মানুষ একটা উত্তরের অপেক্ষায় জেগে থাকে তো।

……………………..

অলভী সরকার

করুণ কাঁঠালিচাঁপা 

বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছো

তুমি!

কোনও শিকারীর সামর্থ্য নেই

এসে

তোমাকে বিদ্ধ করবে তীব্র

গুলি,

অথবা তোমার অবয়বে দেবে

ঢিল।

প্রথমেই ওরা থমকে দাঁড়াবে

আহা!

ভয়ে-বিস্ময়ে, কামনা এবং

প্রেমে;

তুমি উড়ে গেলে করুণ কাঁঠালি

চাঁপা,

ফিরে চলে যায় চুমুর গন্ধ

নিয়ে।

আর কিছুক্ষণ শিকারির মুখো-

মুখি,

আর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাক হে

ছেলে;

চোলাইগন্ধী শরীরের কাছে

এসে

পাখির মতন ঝাপটানো ডানা

মেলে।  

…………………………..

সনেট মাহমুদ

আন্তঃনাক্ষত্রিক ভালোবাসা

একদিন হুট করে ডেকে আমায় বলেছিলে এর চেয়ে তুমি আমায় ভুলে যাও; আমাদের পথ দুটো আলাদা হোক, জগতের মঙ্গল হোক, সেই থেকে তোমাকে ভুলতে চেয়ে পণ্ডশ্রম করে চলেছি, ফল লাভে ব্যর্থ হয়ে শেষ তরিকা হিসেবে হাঁটা শুরু করেছিলাম তাও

সেই কোন অনাদি কাল হতে তা আজ মনে পড়ে না, সেই থেকে হেঁটেই চলেছি

প্রথমে পেরুলাম চেনা পথঘাট, বিশালাকায় রেইন ফরেস্ট, বাদা বন,

গিরি-পর্বত-সাগর-মরু প্রান্তর সব পেরিয়ে যখন বিস্তৃত এক সমতল ভূমিতে চিত হয়ে শুয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ভাবছি এবার হয়তো তোমা হতে মুক্তি মিলল

তখনই ঘটল অঘটন

নীলাভ মিটমিট তারা আর্কটেরাস

তার নীল আলো আমার চোখে ফেলল

সেই আলো, আহা কী মর্মভেদী সেই আলো

চোখে পড়তেই

মনে পড়ে গেল আবার তোমার প্রতীক্ষাকাতর নীল চোখ দুটি

অপসৃয়মান সরীসৃপের শব্দে

মনে পড়ল তোমার মৃদু পায়ে শুকনো পাতার উপর হেঁটে চলা

আর বনের হিসহিস শব্দ

অবিরত বলতেই থাকল তোমার কথা

আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না

বেদনার তীব্র আঘাতে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে নিমিষেই এক রাশ ধুলায় পরিণত হলাম, রয়ে গেল শুধু পাওয়া আর না পাওয়ার হাহাকার অনুভূতি

ধুলায় মিলিয়েও শেষ রক্ষে হলো না, দমকা বাতাস এসে নিমিষে উড়িয়ে নিয়ে ফেলল তোমার রোজকার যাত্রাপথে

ভুলতে না পারার অপরাধে তোমার আগত পায়ের শব্দ

জোর করে শোনান হলো প্রায় এক যুগ

যখনই মনে হতো এবার বোধ হয় অবসান হতে চলল এ কয়েদকাল

তখনই পাক খাওয়া সময়ের ঘূর্ণি বাতাস এসে নিয়ে যেত বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন ক্ষণে সময়ের বিভিন্ন ধারায় বিকশিত হতে থাকা তোমারই উঠানে

শুনতে হতো তোমার কাচভাঙা হাসির শব্দ, চলচঞ্চল পায়ে দ্রুত চলে যাওয়া কিংবা দীর্ঘ নীরবতা

অস্তিত্বহীন অস্তিত্ব দিয়ে স্পর্শ করার বাসনার অক্ষমতার বেদনায় কতবার যে নীল হয়েছি তা আর নাই বললাম

তারপর অবশেষে আশীর্বাদ হয়ে এল এক মহাপ্লাবন

সেই জলের প্রচণ্ডতায় সব কিছুই ভেসে গেল, আমিও ভেসে চললুম জলের নীল ফেনায় উড়ে উড়ে ভেসে ভেসে

সিন্ধু-নর্মদা-সরস্বতী-ইরাবতী আরও কত নাম না জানা প্রাচীন নদীতে ভেসে ভেসে, কত প্রাণ কত প্রকৃতি কত বিচিত্র প্রকাশের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে, প্রেম এ উন্মাদ মজনুকে পারস্যে একা রেখে, রাইকিশোরীর সখীদের সাথে এক বেলা সাঁতার কেটে অবশেষে এসে পৌঁছালাম কালের স্রোতে জীবনানন্দের চির বিষণ্ন সেই দেশে শালিক নয় একেবারে বোহেমিয়ান শিল্পীর বেশে

এসেই

তোমার সাথে তেরাস্তার মোড়ে দেখা হয়ে গেল একদিন

স্বভাবসুলভ বিরক্তি প্রকাশ পেল তোমার চেহারায়

যেন ঠিক গতকালকেই আমাদের দেখা হয়েছিল

আমি বললাম এস চা খাওয়া যাক

ভদ্রতার খাতিরে মনে হয় না বলতে পারলে না

অবশেষে আবার আমরা মুখোমুখি ধুমায়িত চায়ের কাপ হাতে, মাঝখানে কুড়ি নয় প্রবাহিত হয়ে গিয়েছে প্রায় অনন্ত মহাকাল; কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছে এই তো সেদিনই আমরা হেঁটে বেড়িয়েছিলাম এমনই কোনও প্রান্তরে। তোমার হাত স্পর্শ করতেই তুমি নীরবতা ভাঙলে।

বললে তুমি চলে যাবার পরপরই কিছু একটা ঘটে গেল আমার, সময় স্থান সব সংকুচিত হয়ে যেন এক বিন্দুতে মিলে গেল। শুরু হলো আমার প্রতীক্ষার কাল। প্রতিটা শব্দে মনে হতো যেন এসেছ, ধ্বনিত পাখির সুরে, উচ্চারিত সকল নামে মনে হতো যেন তুমিই ডেকে ফিরছ। বন্ধু তুমি তো অনন্ত মহাকালব্যাপী ঘুরে ফিরেছ, কিন্তু আমি ছিলাম প্রতীক্ষায়-এক বিন্দুতে একভাবে তোমারই প্রতীক্ষায়।

কতবার ধ্বংস হয়ে গিয়ে আবার আমি ফিরে এসেছি, শুধু তুমি আমায় কামনা করেছো বলে।

যদি পাতা বুনে বানাতাম ঘর যমুনার তীরে, কিংবা বেদে পল্লিতে সংসার পাততাম দুজনে মিলে, তবে কি মুক্তি মিলত ? সংসারে কি মুক্তি মেলে, কিংবা সাময়িক প্রাপ্তিতে, রাই যদি কালাকে পেত তবে কি তার মুক্তি মিলত ?

আমি হেসে বললাম, আন্তঃনাক্ষত্রিক পরিভ্রমণে আমি একটা জিনিস জেনেছি; ভালোবাসার শিকলে পা জড়ালে মুক্তির সহজ কোনও রাস্তা নেই। কারও মুক্তি মেলে সামান্যে, আর কারও অপেক্ষা করতে হয় তোমার আমার মতো অনন্ত মহাকাল।

…………………

সৌম্য সালেক

কিছুই জানি না

দেখো, বের করো, আমি কোন দিকে বাড়িয়েছি হাত

কার স্নিগ্ধ আননে, কার বক্ষ-বিভাজে

কার গুচ্ছ-অলকায় ?

দেখো, বের করো, আমি কার কাছে পেতেছি দু হাত

কোন সন্ধানে, কোন সুখের আশায়

কোন অন্বেষে আঁখি-লাল অশ্রুধারায় ?

এসো, আমাকে উদ্ধার করো

কোন উগ্র-নেশায় এই ছন্নবেশ

কোন রুগ্ণ-বাসনায় ধূলি মেখেছি কপালে!

সবকিছু তুমি খুলে দেখতে চাও

সবকিছু তুমি জানতে চাও

আর সবকিছু বুঝতে ব্যর্থ হয়ে

বারবার কেবল অভিযোগ তোলো

বারবার হৃত-রহস্যের কথা বলো

রেগে পণ করে বলো: শঠ্, সব তুমি জানো!

‘কি জানি কীসের লাগি’-প্রাণ প্রতিপর হায় হায় হুতাশনে জ্বলে

আসলে তো আমি তার কিছুই জানি না! 

………………………

নাদিম মাহমুদ

মা জানতো ভবিষ্যৎ বিক্রি হয়ে গেছে

মানুষ ক্ষমতাকে আকরগ্রন্থের মতোই ভালোবাসে,

ভুলে যায়! রাজনীতি চুলের জটিল বিন্যাস।

শিরোনামহীন নিষ্ঠুরতা মহিমান্বিত মানুষের কাণ্ডকীর্তি আর জানে কিছু বেঁচে থাকার ছলনা। আলোচনার বিষয়বস্তু এড়াতে রক্তের দাগ, সময় রাজা পিতৃপুরুষের কথা ভুলে করে লবণের চাষ।

আমি অতি সচ্ছল সুশীল বুদ্ধিজীবীকে তোষামোদ করতে দেখি পেশাদার ভিক্ষুকের মতো। আমাদের ঐতিহ্যবাহী থালাবাসন আসবাবপত্র মনে করিয়ে দেয় পৃথিবীর এই পরিবর্তন সময়ের আনুষ্ঠানিকতা।

স্মৃতি হৃদয়ের পাটাতন খুলে নেয় নিষ্ঠুর শোষণে।

ঠুনকো বিশ্বাসে কেটে যায় মানবজনম।

বিশ্বাস আমাদের ঠকিয়েছে জীবনভর, থাকতে চেয়েছি মায়ের কোলে; তবুও নারীর ঘনিষ্ঠ হতে গিয়ে নষ্ট করি পবিত্র সম্পর্ক, মা-ই প্রথম নারী সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে ভালোবাসতে পারে, বিচলিত হয়েও স্নেহ করে, কালো মেঘ দেখে আঁচল দিয়ে আকাশ ঢাকে।

অফুরন্ত মেঘের কোলে অপরাজিত বিদেহী আত্মা যিশুর পিতা অগণিত মানুষের মুখে লুকিয়ে ছিল। ঈশ্বর আমাদের একটি আপেল দাও! জ্ঞান দাওনি, আপেল নিয়েই যুদ্ধ করি।

মৃত্যুর গাফিলতি কিংবা প্রত্যাশার শেষ চুম্বনে

সখি চোখের জলে কিনে নিও মৃত্যুই আমাদের রেহাই দিবে, মা জানতো ভবিষ্যৎ বিক্রি হয়ে গেছে।

………………….

সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button