আর্কাইভবিশ্বসাহিত্যসাক্ষাৎকার

ওলগা তোকারজুক : যে পন্থায় একজন ঔপন্যাসিক তাঁর উপন্যাস শুরু করেন তা ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানের মতো

বিশ্বসাহিত্য : সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : মার্তা ফিগলেরোভিচ

বাংলা অনুবাদ : এলহাম হোসেন

[ওলগা তোকারজুক অনেকের তুলনায় অপেক্ষাকৃত তরুণ বয়সে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১৮ সালের নোবেল-সাহিত্য পুরস্কার তিনি লাভ করেন ২০১৯ সালে। জীবনের গণ্ডি পাড়ি দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অতি বিস্তৃত আবেগে অনুরণিত কল্পনার বয়ান নির্মাণের জন্য তিনি এই পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর কষ্টসহিষ্ণু গবেষণালব্ধ উপন্যাসগুলো পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক প্রভাব-বিস্তৃত ইতিহাস, প্রথম শতাব্দীর ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় ভাবধারা, ইহুদিদের মধ্যে প্রচলিত অতীন্দ্রিয়বাদ, অতি প্রাচীন বাইবেলের বাণী, জোতিষবিদ্যা, প্রাক-খ্র্রিষ্টান পৌত্তলিকতা ইত্যাদি বিষয় ঐতিহ্যের মাটি খুঁড়ে বের করে আনে। পোলিশ সংস্কৃতির সঙ্গে ইহুদি সংস্কৃতির আন্তঃগ্রন্থিকতা এবং লৈঙ্গিকতাকে তরল ও সামাজিক নির্মাণ হিসেবে উপস্থাপনার জন্য তিনি তাঁর রক্ষণশীল দেশ পোল্যান্ডে বিতর্কিত। ২০১৯ সালে পোল্যান্ডের সংস্কৃতিমন্ত্রীকে যখন তোকারজুকের সাহিত্যকর্ম নিয়ে জিজ্ঞেস করা হলো,

তখন তিনি উত্তরে বললেন, তাঁর কোনও উপন্যাসই তিনি পড়েননি।

তোকারজুকের জন্ম পশ্চিম পোল্যান্ডের সুলেচোতে। যখন তাঁর বয়স নয়, তখন তাঁর পরিবার দক্ষিণাঞ্চলের সিলেসিয়ায় চলে যায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই জায়গা তার মালিকানা বারবার পরিবর্তন করেছে। এটি ইউরোপের স্বাস্থ্যনিবাসে পরিণত হয়েছে। টমাস মানের The Magic Mountain-এর দাভোশ এখানে অবস্থিত। তাঁর বাবা ছিলেন ইউক্রেন থেকে আসা উদ্বাস্তু। গত শতাব্দীর মাঝামাঝিতে যে নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দাঙ্গা হয়, তা থেকে কোনওরকমে তিনি পালিয়ে যান। তাঁর মা পোল্যান্ডের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের কৃষক পরিবারের মেয়ে। পুরোপুরি লেখকবৃত্তি গ্রহণের পূর্বে তুকারজুক সাইকোথেরাপিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। একটা ছোট্ট প্রকাশনা ও বইয়ের দোকানও চালিয়েছেন। ১৯৯৩ সালে প্রথম Podroz ludzi ksiegi (বইওয়ালাদের অভিযাত্রা) উপন্যাস রচনার মধ্য দিয়ে সাহিত্যজগতে তাঁর পদচারণা শুরু হয়। এটি প্রথম দিকের আধুনিক স্পেন ও ফ্রান্সের পটভূমিকায় রচিত রূপকধর্মী উপন্যাস। তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস E. E. (১৯৯৫) কার্ল ইয়ুংয়ের তত্ত্ব এবং মনোসমীক্ষণের বিষয় নিয়ে রচিত। এরপর রচনা করেন Primeval and other Times (১৯৯৮)। এটির ইংরেজি অনুবাদ হয় ২০১০ সালে। এটি জাতীয় বেস্টসেলার হয়ে ওঠে। House of Day এবং House of Night (১৯৩৮, ২০০২) দুটি বহুস্বরিক গীতিকবিতা, সিলেসিয়ার নিম্নাঞ্চলের কিংবদন্তি ইতিহাস নিয়ে রচিত, ইউরোপ জুড়ে সমালোচকদের স্বীকৃতি লাভ করে।

ইংরেজি ভাষাভাষী বিশ্ব বেশ দেরিতে তাঁর অনুবাদক ও প্রথম ইংরেজি ভাষার প্রকাশক গ্রান্টা বুকস, নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি প্রেস, টুইস্টেট স্পুন প্রেস এবং তাঁর বর্তমান ব্রিটিশ প্রকাশক ফিটজকারালডো এডিশনস-এর মাধ্যমে তোকারজুকের ব্যাপারে জানতে পারে। ২০১৭ সালে জেনিফার ক্রফটের অনুবাদ Flights  (২০০৭) ২০১৮ সালে ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার লাভ করে। এন্টোনিয়া লয়েড-জোনস কর্তৃক অনূদিত Plow over the Bones of the Dead (২০০০, ২০১৮) এর পরের বছর একই পুরস্কারের জন্য সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত হয়। তোকারজুকের সবচেয়ে বড় কাজ হলো নয়শ’র বেশি পৃষ্ঠার The Books of Jacob (২০১৪)। এটি অষ্টাদশ শতাব্দীর ইহুদি অতীন্দ্রিয়বাদী জেকব ফ্রাঙ্কের গল্প বিধৃত করেছে। তিনি নিজেকে মসিহ ঘোষণা করেন এবং বিস্ময়করভাবে দীর্ঘস্থায়ী ধর্মীয় প্রার্থনা প্রথার প্রতিষ্ঠা করেন। ক্রফটের করা ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় ২০২১ সালে। তাঁর বহু ছোটগল্প এবং উপন্যাস Empuzjon এবং The Magic Mountain-এর পুনর্লিখন এখনও অনূদিত হয়নি।] [ মার্তা ফিগলেরোভিচের জবানিতে : যেখানে তোকারজুক তিন দশক ধরে বাস করছেন, সেই সিলেসিয়ার নিম্নাঞ্চলের ছোট্ট গ্রাম ক্রাজানোতে পৌঁছতে আঞ্চলিক রাজধানী থেকে ওয়ান-কার ট্রেনে চেপে বসলাম। রাজধানী রোক্লো, যেটি জার্মান ভাষায় ব্রেসলো নামে পরিচিত, সেখান থেকে পরবর্তী গ্রাম নওয়া রুদায় গেলাম। সেখানে তোকারজুক এবং তাঁর স্বামী গ্রেগর্জ তাঁদের পোষা কুকুর টিমিকে সঙ্গে নিয়ে আমাকে সাদরে গ্রহণ করলেন। তারপর ভাঙাচোরা পাহাড়ি রাস্তা ধরে আমরা গাড়ি চালিয়ে গেলাম তাঁর বাড়িতে। যখন পৌঁছলাম, দেখলাম, গুহার মতো দেখতে বাড়ির রান্নাঘরের জানালা দিয়ে গাছগুলো আমার দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। তোকারজুক আর ওর বোন তাতিয়ানা  এখানে থাকেন। প্রতি বসন্তে আশপাশের গাছগুলোর গুঁড়িতে খোদাই করে সজীব নীল রংয়ের চোখ আঁকেন। লাইব্রেরিতে, যার বিপরীত দিকে একটা লোহার লাঙল ঝোলানো আছে, সেখানে দেখলাম তোকারজুকের ছবি আঁকা রয়েছে। চুলের পরিবর্তে মাথাভর্তি সাপ নিয়ে মেডুসার মতো তিনি আয়নায় নিজের চেহারা দেখছেন। বাস্তব জীবনে তোকারজুক মাথায় নীল রং করা পুঁতির মালা পরেন। স্থানীয় সংস্কার অনুযায়ী এমন চুলের সাজ যা কলটুন নামে পরিচিত (পোলিশ ভাষায় এ ধরনের চুলের বেণিকে Plica Polonica বলা হয় মধ্যযুগ থেকেই)। সেটি এর ধারণকারীকে রোগ-বালাই এবং অভিশাপ থেকে মুক্ত রাখে।

আমাদের মধ্যে আলাপচারিতা চলল চারদিন ধরে। প্রচুর চা-কফি খেলাম। বিভিন্ন ভেষজ দিয়ে ঘরে তৈরি ব্রান্ডিও। আপেলের স্ট্যু খেলাম। তাইওয়ানের হরর মুভি দেখলাম। একদিন অপরাহ্ণে একটি ছোট্ট গির্জা দেখতে গেলাম। এটি অবশ্য রাস্তার পাশেই। উইলগিফোর্টিসের উদ্দেশে তৈরি। তিনি ছিলেন শ্মশ্রুবিশিষ্ট নারী, লোকজ, স্থানীয় সন্তু। ওঁকে নিয়ে কিংবদন্তি আছে। তোকারজুক তাঁর House of Day, House of Night-এ এই কিংবদন্তির সাহিত্যরূপ দিয়েছেন। গির্জার সদস্যরা উইলগিফোর্টিসের বিরক্তিকর শ্মশ্রুকে বালি দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। তবে বিকেল পাঁচটার সময় দীর্ঘ ছায়া এসে পড়ে তাঁর কাঠের তৈরি চোয়ালের নিচের অংশে।]

মার্তা ফিগলেরোভিচ : এত দূরের একটি জায়গায় থাকতে আপনার কি কখনও একা একা লাগে ?

ওলগা তুকারজুক : অনেক দূরে। ১৯৯৩ সালে আমরা শহরে কয়েক বছর থাকার পর যখন এখানে এলাম তখন তো ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। আমরা হিপ্পিদের কাছ থেকে বাড়িটা কিনেছিলাম। ওরা এই বিরানভূমিতে বসবাস করা ত্যাগ করেছে। বাড়ি যখন কিনি তখন এটি পুরোপুরি ভাঙাচোরা। রাস্তায় ময়লা-আবর্জনায় ঠাসা। নিয়মিতই বরফ পড়ত। আশেপাশে তখন কোনও প্রতিবেশী ছিল না। চারপাশে শুধু বিরানভূমি। এমন পরিবেশ মানববসতিকে চ্যালেঞ্জ ছঁড়ে দেয়। তবে আমার কাছে এর সবকিছুই ছিল একটি উপহারের মতো। এখানে বসেই আমি শেষ করলাম Primeval and other Times. যেন মনে হচ্ছিল, আমি দেয়ালগুলোর ভেতর থেকে ফিসফিস শব্দ শুনছি। এটি শুনতে শুনতে আমি লিখে ফেলি House of Day, House of Night.

আমিসহ আরও অনেকেই মনে করত যে, আমরা একটা অজানা সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের ওপর বসবাস করছি। আমার সব সময়ই মনে হতো যে, আমি বাড়ির ভেতর জলের গুনগুন শব্দ শুনছি। ভূগর্ভস্থ ঘরটি সংস্কার করতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত কেউ আমার কথা বিশ্বাস করল না। আমরা খুঁড়ে খুঁড়ে এর ভিত্তি বের করলাম। তখন দেখলাম, ঠিক এর নিচ দিয়ে একটা ঝরনা বয়ে যাচ্ছে। এভাবে জার্মানরা পর্বতের ঢালে বাসা তৈরি করত। এরা জলপ্রবাহের বিপরীতে দাঁড়াত না। বাড়ির মধ্য দিয়ে জলকে বয়ে যেতে দিত। যুদ্ধ চরমে পৌঁছার পর থেকে কিছু লোককে ভাগ্য তাড়া করে এখানে নিয়ে এসেছিল। এক পর্যায়ে আমি উইলিয়াম ব্লেকের তিনজন অনুবাদকের প্রতিবেশী ছিলাম। এ ঘটনা আমাকে Drive Your Plow over the Bones of the Dead লিখতে উৎসাহ দিয়েছে। এই জায়গাটি তাদের আকৃষ্ট করেছিল। এটি অতীন্দ্র্রিয়বাদী, যারা মেইস্টার একহার্ট এবং জেকব বোহমির ভক্ত―তাদেরকেও আকৃষ্ট করেছিল।

প্রশ্ন : আপনি কি এই অঞ্চলটা ইতিমধ্যে চিনে ফেলেছেন ? আপনি কোথায় বেড়ে উঠেছেন ?

উত্তর : কাছেই একটা জায়গায়, সিলেসিয়ার নিম্নাঞ্চলে একটা আলাদা অংশে আমার শৈশব কেটেছে। আমার বাবা-মার সাক্ষাৎ হয়েছিল সুলেকোর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে। সেটি একটি মফসসল শহর। জিওলোনা গোরার কাছে। ওখানেই পরে আমার জন্ম হয়। বাবা-মা একটা অসাধারণ প্রকল্পে অংশ নিতে ওখানে যান পঞ্চাশের দশকে। সময়টি যুদ্ধ-পূর্ববর্তী কাল। তাঁরা ওখানে গিয়েছিলেন গণমানুষের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে বা সাধারণ মানুষের হাইস্কুলে। ইংরেজিতে ঐ প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনটাই বলা হতো। ষোল থেকে বিশ বছর বয়সী তরুণদের গতানুগতিক বিষয় থেকে শুরু করে দক্ষতা তৈরির জন্য উপযোগী যেমন―কৃষিকাজ, গাড়িচালনা―সব বিষয়ই পড়ানো হতো। আমার মা পড়াতেন সাহিত্য, নাট্যসাহিত্য এবং লোকসাহিত্য। বাবা লাইব্রেরিয়ানের চাকরি করতেন। একটা প্রসিদ্ধ লোকজ দলকে তিনি নেতৃত্ব দিতেন। ওটা ছিল একটা আবাসিক স্কুল। ওখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা পাশাপাশি থাকতেন। শিক্ষকদের প্রফেসর বলা হতো না। বলা হতো আঙ্কেল বা আন্টি। আমার বয়স যখন নয় আর আমার বোন তাতিয়ানার বয়স যখন তিন বছর, তখন আমরা পোল্যান্ডের ছোট্ট শহর ওপোলে চলে যাই। ওটি চেচনিয়ার সীমান্তের খুব কাছে। ওখানে মা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলে পোলিশ ভাষা পড়াতেন, আর বাবা স্কুলের লাইব্রেরি চালাতেন। পাশাপাশি গাইডেন্স কাউন্সিলর হিসেবে কাজ করতেন।

প্রশ্ন : গণমানুষের বিশ্ববিদ্যালয়ে বেড়ে ওঠা বলতে আপনি কী বোঝাতে চান ?

উত্তর : ওখানে সবসময় কিছু না কিছু চলতেই থাকত। কেউ আমাদের ওখানে আসছে, থাকছে, চলে যাচ্ছে রাতের ক্লাসে। স্কুলটা চলত একটা পুরাতন হান্টিং হাউজে। এর মালিক ছিলেন অভিজাত রাজিউইল পরিবার। ওখানে একটা বড় ডাইনিং রুম ছিল। সঙ্গে রান্নাঘর। শিক্ষার্থীদের জন্য ডর্মেটরি আর শিক্ষকদের জন্য তিন-চারটা অ্যাপার্টমেন্ট। শিক্ষকরা জোড়ায় জোড়ায় আসতেন―স্বামী-স্ত্রী। তবে ওদের বাচ্চাকাচ্চা ছিল না বললেই চলে। প্রায়ই আমার বাবা-মার ক্লাসে ঢুকে যেতাম। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে নাচতাম, গান গাইতাম। ভাবতাম, সব স্কুল ওরকমই। পরে বুঝতে পারলাম―এটা কেমন বিশেষ একটি ব্যাপার ছিল। জন্মের পর এমন পরিবেশে বেড়ে উঠতে পেরে আমি নিজেকে কতই না সৌভাগ্যবান মনে করি।

 সে-সময় আরেকটা ছোট্ট মেয়ে নিজেকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছিল। ও একজন ইতিহাসের শিক্ষকের মেয়ে। ও আর আমি একসঙ্গে খেলতাম। পুরো বাড়ি আমরা চষে বেড়াতাম। প্রায়ই অবাক হতাম এই ভেবে যে, এই প্রাসাদে আগে কারা থাকত এবং যুদ্ধের সময় এই বাড়িটা ধ্বংস বা লুট হয়নি কেন। এখানে বিশাল একটা বলরুম ছিল। একপাশে বিরাট এক ফায়ারপ্লেস। এই ফায়ারপ্লেসের পাইপে আমরা শব্দ করলে অদ্ভুত এক ধরনের প্রতিধ্বনি হতো। মনে হতো, এই চুল্লি হলো অন্য আরেকটি জগতে প্রবেশ করার দরজা। চারপাশে অনেক পুরাতন বইপুস্তক ছিল। ওখানে অনেক চিত্রকর্মও ছিল। যখন বেড়ে উঠছিলাম তখন পল ক্লি ছিলেন আমার প্রিয় চিত্রকর। তাঁর চিত্রকর্ম―‘দৈত্য, ধীর লয়ের গানের তালে তালে নাচ’-এর জন্য আমার তাঁকে ভালো লাগত। এই চিত্রকর্মটি দেয়ালে ঝোলানো ছিল। চিত্রকর্মটি যেন কাঁচা হাতে আঁকা রেখাচিত্র। একটি বালিকা আমার দিকে তাকিয়ে থাকত। ছবির নিচের দিকে মেয়েটি দাঁড়িয়ে হাত নাড়তো। যেন ও একটা বাদক-বাদিকার দলকে নির্দেশনা দিচ্ছে। ওর নির্দেশ অনুযায়ী দৈত্যটি উড়ে বেড়াচ্ছে। এই ছবিটির নিচে দাঁড়িয়ে কল্পনা করতাম, আমিই সেই ছবির মেয়ে।

আমার বাবা-মা সকাল থেকে রাত অবধি কাজ করতেন। আট ঘণ্টার অনেক বেশি। আমি ওদের মনোযোগের কেন্দ্রে ছিলাম না বললেই চলে। আয়াদের কাছে আমাদের রেখে ওরা চলে যেতেন। মাঝে মাঝে আমাকে আর তাতিয়নাকে একা রেখেই চলে যেতেন। আমার একবার নিউমোনিয়া হয়। একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখি বাবা-মা বাড়িতে নেই। চেষ্টা করলাম বাইরে গিয়ে খুঁজতে। তাতিয়ানা তার মা-বাবার চাইতে তার বড় বোনের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ―এই ব্যাপারটি দেখে বাবা-মা খুশি হতেন। শহরের বাইরে গেলে আমাদেরকে ওদের পুরাতন বন্ধু যাকে আমি কুবিকা নানি বলে ডাকতাম, সে এবং তাঁর স্বামীর কাছে রেখে যেতেন। কুবিকা নানির স্বামী স্কুলের স্টুয়ার্ড হিসেবে কাজ করতেন। যুদ্ধের সময় কুবিকা নানি জেনারেল বার্লিং সেনাসদস্য হিসেবে কাঁধে বন্দুক আর পায়ে বুট পরে সাইবেরিয়া থেকে বার্লিন পর্যন্ত হেঁটে গেছেন। এর জন্য আমি তাঁর ভক্ত হয়ে গেছি।

বাবা-মা ও আমার সাহিত্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ওরা আমাকে বইয়ের কথা বলতেন। অবশ্য যে বইগুলো গুরুত্বপূর্ণ―সেগুলোর কথা। অভিজ্ঞতা থেকে আমি একটি তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছি। চৌদ্দ বছর বয়সের পূর্বে যারা বেশি বই পড়ে না, তারা পরবর্তী জীবনে ব্রেনের যে অংশটা বিভিন্ন কল্পচিত্র ও অভিজ্ঞতা প্রক্রিয়াজাত করে, সেই অংশের পুরোপুরি উন্নতি ঘটাতে পারে না। আপনি যদি আপনার কলেজজীবনে সিরিয়াস পাঠক হতে পারেন, তবে পরবর্তী জীবনে আপনি ব্যাখ্যা করতে পারবেন বিশ্লেষণাত্মকভাবে। এটা আমি মাঝে মাঝে সাহিত্য সমালোচকদের মধ্যে পাই। এরা খুবই বুদ্ধিমান। তারপরেও তাদের মধ্যে কী যেন কী নেই।

একটা সিগারেট ধরাতে চাই। আপনার কোনও আপত্তি আছে ?

প্রশ্ন : একদম না। আপনি কি ভালো ছাত্রী ছিলেন ?

উত্তর : চতুর্থ গ্রেড পর্যন্ত আমি একেবারে সবার উপরেই ছিলাম। পরের গ্রেডে এসে গুন আর ভাগের অঙ্ক ঢুকে পড়ল। জীবনে এই প্রথম ধাক্কা খেলাম। অঙ্কে আমি ভালো নই। অন্যান্য বাচ্চারা আমার চাইতে ভালো। এই অভিজ্ঞতা আমার জন্য খানিকটা ট্রমার মতো। যেহেতু আমি সর্ববিষয়ে বুদ্ধিমান থাকতে থাকতে অভ্যস্ত, তাই নিজেকে বুঝিয়ে শুনিয়ে মানিয়ে নিলাম যে, আমি বিজ্ঞানের যোগ্য নই। এখন মনে হয়, আমার মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা রয়েছে।

একজন প্রাইমারি স্কুল শিক্ষকের কথা মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, আমি নাকি খ্যাপাটে। একটা অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আমি কি এখন নিজেই নিজের যত্ন নিতে পারি ?’ এরপর একটা স্যান্ডউইচ আর সোডার বোতলে দুধ নিয়ে খেতে বসে পড়লাম। তখন অবশ্য অন্যান্য বাচ্চারা কাজে ব্যস্ত।

প্রশ্ন : তরুণ বয়সে আপনি কী পড়তেন ?

উত্তর : ছোটবেলায় আমি আর তাতিয়ানা গ্রিক ও রোমান ভাষায় পৌরাণিক কাহিনি, যা জ্যান প্যারান্ডোভস্কি পোলিশ ভাষায় পুনঃকথন করেছেন, সেই চিরায়ত লেখা আবিষ্কার করি। আমাদের অবশ্যই ঐ বইয়ের দুই-তিন কপি পড়তে হয়েছিল। জল ও গাছের দেবতাদের আবিষ্কার করে আমি হতবাক হয়ে যাই। প্রকৃতির মধ্যে স্বর্গীয় উপস্থিতি উপলব্ধি করি। গ্রিক মিথ আমাকে এঁদের নাম জানতে ও সম্মান করতে শিখিয়েছে। বাতাস আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়। এটি যেদিকে খুশি, যে নামে খুশি এবং যেখানে খুশি বয়ে যেতে পারে। আমার মার পোলিশ ভাষার অনেক প্রসিদ্ধ লেখা মুখস্থ ছিল। তিনি আমাকে স্তেফান, জোরোমস্কি এবং জারোস্ল ইয়াজেউইকজ এর লেখা পড়তে বলতেন। তবে পোলিশ সাহিত্যে খুব একটা আগ্রহী ছিলাম না। এটা ছিল তাঁর পছন্দের এলাকা। এ কথা বলতে আমি অবশ্য বিব্রত বোধ করছি। আমার বাবা আবার ছিলেন উচ্চাভিলাষী লেখক। তিনি মাসিক সাহিত্য পত্রিকা Literature na swiecie-এর নিয়মিত সাবস্ক্রাইবার ছিলেন। সেই সুবাদেই গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে।

প্রতিটি গ্রীষ্ম আমরা আমাদের নানা-নানির বাড়িতে কাটাতাম। স্টেট লাইব্রেরির কাছেই একটা গেস্ট হাউজ চালাতেন ওরা। ওখান থেকেই আমি রাক্ষুসে পাঠক হয়ে উঠি। তরুণ বয়সে টি. এস. এলিয়টের কবিতার বেশির ভাগ পঙ্ক্তি আমি মুখস্থ করে ফেলি, ইংরেজি ও পোলিশ উভয় ভাষায়। লাইব্রেরি থেকে একটা দোভাষী বই চুরি করেছিলাম। ওটাই একমাত্র আমার চুরি করা বই। ফকনারের Absalom, Absalom! সেই সময় আমাকে পেয়ে বসে। আর কোনও বই আমার কাছে এর চাইতে এতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। আজও মনে হয় বইটি আমার পুরোপুরি হজম হয় না। তবে The Sound and the Fury পড়ার সময় আমি Stream of Consciousness বয়ানের সন্ধান পাই। ১৯৭৫ সালে আমার Beyond the Pleasure Principle-এর পোলিশ ভাষার প্রথম অনুবাদ ছাপা হয়। পনেরো বছর বয়সে আমি বইটি পড়েছিলাম। অর্থের লুক্কায়িত ব্যবস্থা যা আমাদের সঙ্গে আমাদের বাস্তবতার সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করে, সে-ব্যাপারে ফ্রয়েডীয় ধারণা আমাকে ব্যাপকভাবে মুগ্ধ করেছিল। আমার স্কুলের অ্যাসাইনমেন্টে Absalous পড়তে আমি ফ্রয়েডের পদ্ধতি প্রয়োগ করেছি।

প্রশ্ন : আপনি কি খুব অল্প বয়সে লেখা শুরু করেছেন ?

উত্তর : যখন আমার বয়স বারো বছর, তখন আমি আমার প্রথম উপন্যাস লেখা শুরু করি। সেটি অবশ্য ছিল ডাকিনীদের নিয়ে। ওরা ঘরে থাকত না। মা আর তার মেয়ে। প্রত্যেকের বিশেষ বিশেষ মন্ত্র ছিল। ওদের বিশেষ ক্ষমতা ছিল। তবে আমি কখনও ভাবিনি যে, কোনওদিন লেখক হব। নৃত্যশিল্পী হতে চেয়েছিলাম অথবা নিউক্লিয়ার ফিজিক্স পড়তে চেয়েছিলাম। মহাশূন্য যাত্রা, ঔষধশাস্ত্র নিয়েও পড়তে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরে যখন জানলাম যে, পরবর্তী বিষয় কোনও বস্তুই নয় তখন হতাশ হলাম। তরুণ বয়সে কিশোরদের ম্যাগাজিন Na Przelaj (off-Read)-এ ছোট ছোট কিছু লেখা প্রকাশিত হয়। ওগুলো আনাড়ি ধাঁচের, অসংলগ্ন অদ্ভুত বিষয়-আশয় নিয়ে লেখা গল্প। জোসে দোনোসো এবং হুলিও কোর্তেজারকে অনুকরণ করার চেষ্টা করেছিলাম সে-সময়। দীর্ঘতম রচনা Piesn O Psim Oowstanin (Canticles of the Conquering Canines) একটা বিকল্প বাস্তবতার বর্ণনা হাজির করেছে। কুকুর এখানে বিশ্বের দখল নিয়ে নিয়েছে। আর একটা গল্প ছিল পোলিশ আচার-প্রথা সংক্রান্ত যেখানে স্থানীয়রা রুই মাছ কিনে বাথটাবে দিনের পর দিন জিইয়ে রাখে। তারপর ক্রিসমাস ডের প্রাক্কালে এরা মাছটাকে মেরে ফেলে। দেয়ালের ওপারেই দেখবেন আমাদের লোকজন ঠিক এই কাজটিই করে থাকে। আমার বাবা ছিলেন আমার লেখার উদার সমর্থক। তিনি আমার গল্প টাইপও করে দিতেন। আমি বলতাম, আর বাবা লিখতেন। আমি যা লিখেছি তা আবার আরেকজনকে পড়ে পড়ে শোনানো আমার জন্য বিব্রতকর। তবে বাবা একেবারে সিরিয়াসলি টাইপ করে যেতেন।

হাইস্কুলে পড়ার সময় আমরা কয়েকজন বন্ধুবান্ধব মিলে একটা সভা করতাম। এর নাম দিয়েছিলাম Uposathas. এটি একটি সংস্কৃত শব্দ। সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের প্রতিফলন ঘটিয়ে এটি করা হয়। সে-সময় বৌদ্ধদের যে ধর্মগ্রন্থ আমি পড়তাম সেটি সঙ্গে করে নিয়ে আসতাম। আমাদের দলের কোনও একজনের ব্রিটিশ সঙ্গীতের ব্যাপারে জানাশোনা ছিল। আমরা সবাই লেড জেপেলিন এবং ডিপ পার্পলের রেকর্ড শুনতাম। আমার প্রথম ছেলেবন্ধুর কাছ থেকে আমি অনেক শুনেছি। সে-ই আমাকে ব্রুনো স্কালজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। সে ওয়ারশতে দর্শনশাস্ত্র পড়তে গিয়েছিল। ওর পেছন পেছন আমি সেখানে মনোবিজ্ঞান পড়তে চলে যাই।

প্রশ্ন : ওয়ারশর স্কুল আপনার কেমন লাগত ?

উত্তর : আমার মনে হয়, মনোবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করার মানে হলো মনোসমীক্ষণের চাইতে আরও বেশি কিছু শেখা। তবে পোলিশ প্রজাতন্ত্রে কেউ মনোসমীক্ষণ পড়ায়নি। যখন ওখানে পৌঁছলাম তখন বুঝলাম, যদিও অনেক দেরিতে, যে আমি একটি আচরণ রীতির বিভাগে গভীরভাবে ঢুকে গেছি। ইঁদুর এবং প্রতিবর্ত ক্রিয়ার উপর অনেকগুলো বক্তৃতা আমি শুনেছিলাম। ওয়ারশ নিজেই আমাকে ট্রমাক্রান্ত করে ফেলে। জামেনহফ স্ট্রিটের ডর্মেটরিতে উঠলাম। রাজধানীর দোকানপাট, থিয়েটার এবং রেস্তোরাঁগুলো একেবারে প্রচণ্ড রকমের চমৎকার। যখন আমার ছেলেবন্ধুর সঙ্গে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল, তখন নিজেকে খুবই একা লাগছিল। ১৯৮১-এর শেষের দিকে পোল্যান্ড রাজনৈতিক সংকটে নিপতিত হয়। তখন পৃথিবীটাকে হতাশাগ্রস্ত মনে হলো। আমার চারপাশের মানুষদের প্লাস্টিকের ব্যাগ নিয়ে ছোটাছুটি করতে দেখলাম। এ দৃশ্য দেখে কান্না পেল। অনেক দিন বিষাদগ্রস্ত থাকলাম। প্রত্যেকে বেশ পার্টি-টার্টি করল। হতাশায়।

শ্রেণিবৈষম্য আমার বিচ্ছিন্নতাবোধকে আরও বাড়িয়ে দিল। আমি ছোট্ট একটা শহুরে বালিকা; কমিউনিস্ট শাসিত পোল্যান্ডে মনোবিজ্ঞান একটি অভিজাত পাঠের বিষয়। আমার এক সহপাঠী ছুটি কাটাতে গেল ফ্রান্সে। আরেকজন গেল গ্লাসগোতে তার ফুপির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষে আমেরিকায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একদল হিউম্যানিস্টিক মনোবিজ্ঞানী কর্তৃক পরিচালিত একটি আউটপ্যাশেন্ট ক্লিনিকে স্বেচ্ছাসেবক থেরাপিস্ট হিসেবে কাজ করতে শুরু করলাম। ওদের সঙ্গে আমি আমার প্রথম সমীক্ষণ শুরু করলাম। এটা এক ধরনের দলবদ্ধ থেরাপি। আমাকে অল্প কয়েকজন রোগীর সঙ্গে কাজ করার জন্য বলা হলো। তবে কাজটি ছিল কঠিন। আজকের দিনে কেউ কোনও ছাত্রকে এমন সাংঘাতিক মনোবৈকল্যের রোগী নিয়ে কাজ করতে দেখবে না।

প্রশ্ন : কে কে আপনার রোগী ছিলেন ? আপনি কি তাদের নিয়ে কখনও কিছু লিখেছেন ?

উত্তর : এদের একজন ছিলেন এক বেকার লোক। তাঁকে প্রতিবেশীরা জান্সেপার্টি জানট-জনি দ্য পার্টিজ্যান বলে ডাকতেন। তার বয়স চল্লিশের মতো হবে। বেশ ট্রমাক্রান্ত ছিলেন। সৈনিকের পোশাক পরে এমনভাবে হাঁটতেন যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যোদ্ধা। এক হাতে থাকত ছুরি আরেক হাতে পিস্তল। অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ছিলেন। একদিন যখন আমি তাঁকে তাঁর এপার্টমেন্টে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম, তখন একটা কৌশল অবলম্বন করতে চেষ্টা করলাম। সেটি অবশ্য আমার প্রশিক্ষণ কোর্সে শিখেছিলাম। বিভ্রমের মধ্যে প্রবেশ করে আবার এই বিভ্রমেরই বাইরে নিয়ে যাওয়া আর কি। উনি আমাকে বলছিলেন যে, কেউ একজন তার পানিতে বিষ মিশিয়ে দিয়েছে। লোকজন তাকে গাছের আড়াল থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছে এবং আক্রমণ করার জন্য রাস্তায় ট্যাংক অবস্থান নিয়েছে। ‘চলুন, পানিটা দেখি,’ আমি বললাম, ‘ঠিক আছে। পানি সত্যিই ঘোলা ছিল। কারণ অতি সম্প্রতি পাইপ পরিষ্কার করা হয়েছে। কিছু মেরামতের কাজের জন্য পানি একটু ঘোলা বটে তবে ওয়ারশতে এটিই সর্বোৎকৃষ্ট পানি। কাজেই, ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’ আরও বললাম, ‘দেখুন, বাইরে কেউ নেই। সবকিছু ঠিকঠাক আছে।’ সেদিন আমরা উভয়েই জানালা দিয়ে বাইরে রাস্তার আলো এবং যে বরফ দেখেছিলাম, তার কথা আমার আজও মনে পড়ে। উনি অপেক্ষাকৃত ভালো বোধ করার পর আমি ডর্মেটরিতে ফিরে গেলাম। তারপর গেলাম এক পার্টিতে। সকালবেলা জানলাম, সামরিক আইন জারি করা হয়েছে। রাস্তায় ট্যাঙ্ক মোতায়েন করা হচ্ছে। আমার ছোটগল্প ‘চে গুয়েভারা’তে আমি এই আখ্যানটুকু হাজির করেছি। এর জন্য জ্যাস-এর কাছে ঋণী। সে সময় আমি মূলত কবিতা লিখছিলাম। ব্যস্ত ছিলাম, তাই মনে হলো উপন্যাসের চাইতে কবিতা দ্রুত লেখা যায়। ‘Oddzial psychogeriatryczny’ কবিতাটি Mandragora ম্যাগাজিনে ছাপা হয়। ওগুলোর খোঁজ-খবর করলে জানতে পারবেন। ওগুলো খুব একটা ভালো হয়নি।

আমার ক্যারিয়ারের পরবর্তী পর্যায়ে আমি এক যুবকের চিকিৎসা করেছিলাম। ওর ছিল জটিল পারিবারিক ইতিহাস। ও আমাকে সবিস্তারে সব বলেছিল। বছর দুয়েক পর ওর ভাই আমার রোগী হিসেবে এল। সে-ও আমার অফিসে এসে একই ঘটনার বর্ণনা করল। এদের বর্ণনার মধ্যে তেমন কোনও পার্থক্য নেই। একজন বলল, ওর মা একটা ঠান্ডা মাথার কুত্তা। আমার এ ধরনের ভাষা ব্যবহারের জন্য মাফ করবেন। ওদের বাবা ওদের মানসিকভাবে সাহায্য করে। আরেকজন বলে, ওদের বাবার বাজে ব্যবহার থেকে ওদের মা ওদের বাঁচায়। এতে আমি পেশাগত জটিলতার সম্মুখীন হলাম। আমি কি ওদের একেবারে শক্তপোক্ত ট্রমার গভীরে ডুব দেব। ধরুন, ওদের এক খারাপ চাচা এই বৈষম্যগুলো আলোচনা করবে এবং ওদের মানসিক ভারসাম্যহীনতার চিকিৎসা করবে ? এ ধরনের অভিজ্ঞতার কারণে একটি ধারণা আমার মধ্যে বদ্ধমূল হয় যে, মনোসমীক্ষণ একটি বিজ্ঞান।

প্রশ্ন : আপনি কতদিন সাইকোথেরাপিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন ?

উত্তর : হ্যাঁ, তা প্রায় পাঁচ বছর। থেরাপিউটিক ট্রেনিং নেওয়ার সময় আমার প্রথম স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। সে সময় আমি একটা ওয়ার্কশপ করছিলাম। সে তখন সাবালক ছাত্র। সেটা ছিল প্রথম দর্শনেই প্রেম। ওয়ালব্রিখে ও উত্তরাধিকার সূত্রে একটা অ্যাপার্টমেন্ট পেয়েছিল। ওটা খনি অধ্যুষিত এলাকা। আমরা ওখানে গেলাম। সেখানে আমার চারপাশে বউ পেটানো স্বামী, ধূমপান ও বিয়ারে আসক্ত পুরুষ আর ঘিঞ্জি, নোংরা সব ঘরদোর দেখে বিস্মিত হলাম। মনে মনে বললাম, এ আবার কোথায় এসে পড়লাম রে বাবা। ওখানে সেন্ট্রাল হেলথ ক্লিনিকে মাদকাসক্তদের নিয়ে কাজ নিলাম। আমি আর আমার স্বামী অঅ এর স্থানীয় একটা ভার্শন চালু করলাম যাতে ওরা মাদকাসক্তি থেকে বের হয়ে আসতে পারে। আমার ছেলের জন্মের পর স্ট্রলারে করে ওকে নিয়েই মিটিং-এ যেতাম। আমি অবশ্য স্বতন্ত্র ধরনের থেরাপি দিতাম। এটা বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল পদ্ধতির সংমিশ্রণ।

খুব দ্রুত আগ্রহ হারিয়ে ফেললাম। আটকে গেছি বলে মনে হলো। চিকিৎসা করতে করতে মাঝে মাঝে মনে হতো, রোগীর চাইতে থেরাপি তো আমারই বেশি প্রয়োজন। বুঝতে পারলাম, আমি মানুষের জন্য কী করতে চাই, আর আমার নিজের কী দরকার―এই দুয়ের মধ্যে আটকে গেছি। ছোটবেলায় শিখেছি যে, সবারই মানুষকে সাহায্য করা উচিত। অথচ এখন আমি এর বিরুদ্ধাচরণ করছি। আমার কাছে একটা বই ছিল। তখনও সেটা পড়লে একটা প্রেতাত্মাকে, যে একটা বনে থাকে, তাকে শিশুর মতো ভয় পেতাম। সেই প্রেতাত্মা নির্জন বাড়িতে হানা দেয়। লেখে, ঘুর ঘুর করে। পিঁপড়া, ফড়িং এবং এ রকম আরও অনেক কিছু দরজায় কড়া নাড়ে। তার কাছে সাহায্য চায়। প্রেতাত্মা বিরক্ত হয়। বলে, ‘আমাকে একা থাকতে দাও।’ চিৎকার করে বলে, ‘আমার কাজ আছে।’ তারপর রাগ প্রশমিত হলে ফড়িংকে সাহায্য করে। একটা সেতুবন্ধ তৈরি করে। এখন সে সব প্রাণীর সঙ্গে থাকে। আজ আমি নিজের অন্তর্মুখিনতা ও অন্যকে সাহায্য করার বাধ্যবাধকতার মাঝখানে পড়ে জর্জরিত। আমার বার্থচার্টে এই টেনশনের প্রতিফলন আপনি দেখতে পাবেন।

প্রশ্ন : আপনার রাশি কী ?

উত্তর : আমি কুম্ভরাশির জাতক। ওখান থেকে আমার অতিমাত্রায় সামাজিক হওয়ার ভাবনা আসে বা আমার চরিত্রের উৎসুক দিকটা আসে। তবে আমার বার্থচার্টে বৃশ্চিক রাশিতে নেপচুন আছে। সেটা আবার এগুলোর পুরো উলটো।

যাই হোক, এরপর আমি আর আমার স্বামী আরও বেশি বেশি সৃজনশীল কাজের দিকে ঝুঁকলাম। তরুণ শিক্ষকদের সহায়তা দেওয়ার জন্য একটা দল গঠন করলাম। শিক্ষকেরাও মুগ্ধ হয়ে গেলেন। ইতিমধ্যে একটা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান শুরু করলাম। নাম ইউনাস। ১৯৯১ সালে। ক্লাসে যা ঘটে সেগুলো নিয়ে ঐ দলে ওয়ার্কশপ করলাম। ক্লাসে যেসব দ্বন্দ্ব বাঁধে সেগুলো নিয়েও কাজ করলাম। ওয়ালব্রিখের অনেক শিক্ষক ঐ ওয়ার্কশপগুলোর জন্য আমাদের আজও মনে রেখেছেন।

বছর দুয়েক আগে আমি ইয়ুংয়ের লেখা আবিষ্কার করেছিলাম। তাঁর কাছ থেকে সমন্বিত বিজ্ঞান এর ধারণা নিয়েছি। একটা ধারণাও পেয়েছি যে, আমরা একটা জীবজগতের বাসিন্দা। মানুষের চেতন মন বোঝার জন্য আমাদের চারপাশের গাছপালা, পশুপাখি এবং এমনকি মাশরুমকেও বোঝা জরুরি। উচ্ছ্বাসে আমি ইয়ুংয়ের বিশ্লেষণ বা সমীক্ষণ প্রক্রিয়ার পোলিশ ভাষার একটা ডিকশনারি প্রকাশ করার প্রয়োজন বোধ করেছিলাম। ওয়ালব্রিখে এবং সব স্থানেই। সে-সময় ইয়ুং পোল্যান্ডে পরিচিত ছিলেন না। এমনকি কয়েক বছর পরেও আমি যখন আমার বইয়ে ইয়ুংকে উদ্ধৃত করি তখন পাঠক তাঁকে চিনতে পারেননি। কেউ কেউ আমার কাছে জানতে চেয়েছেন ইয়ুং কোনও হস্তরেখা বিশারদ কি-না যিনি জোতিষশাস্ত্র নিয়ে লেখালেখি করেন। সে-সময় গ্রুপ থেরাপির উপর অনেকগুলো ম্যানুয়াল প্রকাশ করেছিলাম। কমিউনিকেশন ট্রেনিং-এর উপরও। পরবর্তী সময়ে আমরা একটা বইয়ের দোকান খুললাম। ঔপন্যাসিক হয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত এসব প্রকল্প আমাকে সাহায্য করেছে জীবিকা উপার্জনে। Primeval and Other Times লেখার সময় যে কাজগুলো লেখকসুলভ নয় সেগুলো ছেড়ে দিই। বইটা পকেটে নিয়ে ভাবলাম, এখন আমার জীবিকা অর্জনের সুযোগ আছে।

প্রশ্ন : মাতৃত্ব কীভাবে আপনার কাজকর্মকে প্রভাবিত করেছে ?

উত্তর : তরুণ বয়সে বাচ্চা নেওয়ার সুবিধা আছে। মাতৃত্বকে অসাধারণ কিছু মনে হয় না। একটা ছোট্ট মানুষ আপনার জীবনে এল আর আপনি তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করলেন। আপনার তখন প্রচুর শক্তি। আপনি তাই শেষ রাতেও পার্টি করতে পারেন। তারপর সকালে ঘুম থেকে উঠে একসঙ্গে খেলতে এবং পর্বতে হাওয়া সেবন করতে যেতে পারেন। এসবই স্বাভাবিক। আমার মার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেছি। তাই জবিননকো কে মানুষ করে তুলতে আমি পুরো পরিবারের সাহায্য পেয়েছি। আমি আর আমার স্বামী একসঙ্গে কাজে গেছি, ভ্রমণে বেরিয়েছি। মনে হয় না, বাচ্চা থাকলে কাজের ক্ষতি হয় বা জীবিকা উপার্জনের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। মা হওয়ার চাইতে Beyond the Pleasure Principal পড়াকে অস্তিত্বের দিক থেকে আমার কাছে অধিকতর বেশি পরিবর্তন সাধনকারী কাজ বলে মনে হয়।

প্রশ্ন : আপনি কি আশি এবং নব্বইয়ের দশকে রাজনীতি করেছেন ?

উত্তর : প্রত্যেকেই কি করেনি ? হাইস্কুলে পড়াকালে আমাকে নৈরাজ্যবাদী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। তারপর মাওবাদী। আমার মনে হয়, সংহতি আন্দোলন যথেষ্ট মৌলিক। আমি আগাগোড়াই বিপ্লব চেয়েছিলাম। যেহেতু সংহতির ব্যাপারে অধিকতর ভালো জানতাম, তাই ওদের ধার্মিকতা আমাকে তখনও ভাবাতো। সবকিছু ছিল পোপসংশ্লিষ্ট, ক্যাথলিক চার্চ ও প্রার্থনাসংক্রান্ত। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস নিয়ে আমি ধর্মঘটে যোগ দিয়েছিলাম। তবে আমি তো আর সংগঠক ছিলাম না। ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীরের পতন হলে আমার মনে হলো, বিশ্বে পরিবর্তন আসছে। তবে মাদকাসক্তদের সঙ্গে কাজ করার দরুন এমন সব দুঃখ-দুর্ভোগের সঙ্গে আমার পরিচয় হলো যে, সেখানে দাঁড়িয়ে আমি আর আশাবাদী হতে পারলাম না। যে তারতম্যটা লক্ষ করলাম তা হলো―বার্লিন প্রাচীরের পতনের পূর্বে আমি শুধু লোহার ভেদরেখাটা অর্থাৎ পূর্ব জার্মানি পর্যন্ত যেতে পারতাম, আর এর পতনের পর অর্থ উপার্জনের জন্য আমি আমেরিকায় যেতে সক্ষম হলাম।

প্রশ্ন : লন্ডনে কি আপনার অবস্থার পরিবর্তন হলো ?

উত্তর : সাইকোথেরাপিস্ট হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করার পর কয়েক বছর লেখালেখি বাদ দিয়েছিলাম। কিন্তু লন্ডনে আবার লেখালেখি শুরু করলাম। চ্যারিং ক্রস রোডে সিলভার মুন বলে একটি মৌলিক নারীবাদী বইয়ের দোকানে যেতাম। কিছুই কিনতাম না। সব কিছুর দাম ছিল অনেক চড়া। তবে ওখানে বসে Women Who Run with the Welves-এর মতো বই এবং ইয়ুংয়ের ভাবধারার লেখক, যেমন ম্যারি-লুইস ভন ফ্রানৎস-এর বই পড়তাম। নিজেকে তখন আবিষ্কার করেছি বিদ্বেষ ও উদ্দীপনার মাঝখানের ভেদরেখায়, নারী ও পুরুষের মধ্যকার বিভাজনকারী রেখার উপর, নারী ও পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির বিভাজন রেখায়। এরপর জেন্ডারের ব্যাপারে একটি তত্ত্ব নিয়ে ফিরে এলাম পোল্যান্ডে।

এমনকি যখন ছোট্ট বালিকা ছিলাম তখনও দেখেছি, লাইব্রেরিটাকে পুরুষ মানুষ কর্র্তৃক পুরুষ মানুষদের জন্যই ডিজাইন করা হতো। যে বইগুলো পড়তাম সেখানে দেখতাম, নারী চরিত্রগুলোর কাজই পুরুষ চরিত্রগুলোকে সাপোর্ট করা। তবে হ্যাঁ, গ্রিন গ্যাবলস এবং এমা বোভারির অ্যান ছিল অন্য রকম। এমন কোনও নারী চরিত্র ছিল না যে কোনওকিছুকে দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে পারে বা বিশ্বটাকে বদলে দিতে পারে বা কেউ বিস্ময়কর কিছু বেছে নিতে পারে। আমি যে ধরনের বই পড়তে চাইতাম তা খুঁজে বের করাই ছিল কঠিন। মনে হতো, লাইব্রেরিতে ঢুকতে হলে আমার নারীবাদী ভাবনা ত্যাগ করতে হবে। ওটাই আমার লাইব্রেরির প্রবেশমূল্য। পুরুষবাদী চিন্তাকাঠামো বুঝতে পারাটাই আমার লন্ডনে থাকার উপকারিতা। তখন থেকেই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবছি। কয়েক বছর পর লিখলাম আমার প্রথম উপন্যাস House of Day, House of Night. এখানে জেন্ডারসংক্রান্ত অস্পষ্ট ধারণাবিশিষ্ট চরিত্রগুলোকে আমি নিয়ে এলাম। Empuzjon আমার সাম্প্রতিক উপন্যাস। এখানে টমাস মানের The Magic Mountain উপন্যাসের পুনঃপাঠ হাজির করেছি। পুরুষতান্ত্রিকতার প্রত্যুত্তরে যুক্তিবাদী একটি রচনা। he Magic Mountain-এর মতো বড় বড় লেখার মধ্যে আলতোভাবে প্রবেশ করলেই দেখবেন সেখানে নারীবিদ্বেষী ধারণা কেমনভাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে।

লন্ডনে আধা-অবৈধভাবে একটি টিভির এন্টেনা তৈরির কারখানায় কাজ করতাম। যারা আমার সঙ্গে কাজ করতেন তারা এসেছিলেন সেন্ট্রাল আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং আর্জেন্টিনা থেকে। কাজের সময় আমরা সবাই একসঙ্গে বসে গল্পগুজব করতাম। সপ্তাহান্তে মেইডের কাজও করতাম। যে হোটেলগুলো চিনতাম সেখানে গিয়ে বলতাম, ‘আমি কাজ করতে চাই।’ রিসেপশনিস্ট ভয় দেখাতেন, বলতেন, ‘এ পথে নয়, তোমাকে পেছনের দরজা দিয়ে আসতে হবে।’ কিন্তু ওরা আমাকে নিয়ে গিয়ে রুম পরিষ্কার করার কাজে লাগিয়ে দিতেন। এ অভিজ্ঞতা আমাকে আমার প্রথম যথার্থ ছোটগল্প ‘Numery’ (Number) লিখতে উদ্বুদ্ধ করে। যে বিছানা ছেড়ে লোকজন উঠে চলে যায় তার পরতে পরতে জীবনটাকে উলটে-পালটে আমি দেখেছি। পোল্যান্ডে ফিরে আরও বেশি গুরুত্ব সহকারে কাজ করতে শুরু করলাম Podroz ludzi Ksiegi (Journey of the People of the Book) নিয়ে।

প্রশ্ন : প্রথম উপন্যাসটি কি সহজেই প্রকাশ করতে পেরেছিলেন ? প্রকাশক খুঁজে পেলেন কীভাবে ?

উত্তর : ফিরে তাকালে দেখি, ওটি সেই বই নয় যা একজন লেখক লিখেছিলেন, বরং ওটি সেই বই যা একজন পাঠক লিখেছিলেন। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর ফ্রান্স ও স্পেন নিয়ে লেখা সত্যিই বেশ সাহসী ব্যাপার ছিল, বিশেষ করে, যখন আমি নিজে কখনও স্পেন বা ফ্রান্সে যাইইনি। এই জায়গাগুলো সম্বন্ধে যা লিখেছি তার সবই এসেছে আমার পড়া বইগুলো থেকে। বিশেষ করে Zycic Codzienne সিরিজের বইগুলো থেকে যেগুলো লেখা হয়েছে সারা বিশ্বের দৈনন্দিন জীবন-যাপনের অভিজ্ঞতা নিয়ে। এই বইগুলো আমার কিশোর বয়স থেকেই পছন্দ করতাম। একটা বড় নোটবুকে আমি Ludzi Ksiegi গ্রন্থটি রচনা করেছিলাম। ধীরে ধীরে টাইপ মেশিনে টাইপ করি। চারটি মাত্র কার্বন কপি করেছিলাম। সবার নিচের কপিটা এতই ঝাপসা হতো যে সেটি প্রায় পড়া যেত না। যে কারণে আমি তিনজন সম্পাদকের কাছে তিনটা কপি পাঠাই। প্রথম দুজন বাদ দিয়ে দেন। একজন আমাকে পাণ্ডুলিপিটি ফেরত দেবেন না, বললেন। আরেকজন বললেন, তার ফেলে  দেওয়া পাণ্ডুলিপিগুলোর মধ্য থেকে আমারটা খুঁজে নিতে হবে। কিন্তু জারেক মারকিউইজ যিনি ছোট্ট একটা অখ্যাত প্রকাশনা চালান, তিনি আমাকে হ্যাঁ বললেন। আমাকে কাগজের দাম দিতে হয়েছিল। তবে বইটি সম্মানজনক পোলিশ পুরস্কার পেয়েছিল। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে একটা জুতার বাক্সে ভরে আমার দ্বিতীয় উপন্যাস E. E. এর পাণ্ডুলিপি নিয়ে এসেছিলাম। ইয়ুংয়ের পিএইচডি অভিসন্দর্ভের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এই উপন্যাস লিখেছিলাম। বিভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে আমি দেখেছি। প্রতিটি পরিপ্রেক্ষিত ইয়ুং-নির্দেশিত চার ধরনের ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এদের মধ্যে কখনওই সমঝোতা হয় না।

প্রশ্ন : আপনি কি আপনার প্রথম ড্রাফটটা সবসময় হাতে লেখেন ?

উত্তর : Flights লিখেছিলাম একটা বাঁকবদলের কথা মাথায় রেখে। তখন প্রথমে উচ্ছিষ্ট কাগজে লিখতাম। পরে তা টাইপ করতাম। আজকাল যখন কোনও ধারণা মাথায় উঁকি দেয়, তখন আমার ল্যাপটপে বসা পর্যন্ত অপেক্ষা করি। এমএস ওয়ার্ডে লিখি। ছোট ছোট ফাইলে। পরে সেগুলো বড় একটা ফাইলে নিই। এটাকে আমি ‘কপার্স’ বলি। এখানে নেওয়া হলে আমি আর এতে হাত দিই না। ড্রাফট তৈরির সময় অনেক ফাইল খুলে রাখি। প্রয়োজনে সেগুলো থেকে আমি কপি করি, পেস্ট করি। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর যে উপন্যাসটা নিয়ে কাজ করছিলাম, তা লেখা থামিয়ে দিই। এটি যুদ্ধপরবর্তী সিলেসিয়ার গল্প অবলম্বনে লেখা। ফিরে এসে দেখি একই নামে কয়েকটা কম্পিউটারে আমি ড্রাফট সেভ করে রেখেছি। আমার তিনটি কম্পিউটার আছে। তাই প্রায়ই পুনরাবৃত্তি হয়ে যায়। আবার একই দৃশ্যের দুই তিনটা ভার্শনও লিখে ফেলি। Empuzjon-এর পাণ্ডুলিপি লেখার সময়ও আমার একই ঘটনা ঘটেছিল। আমার চরিত্র ক্যাফেতে একটা খাবারের অর্ডার দেয়। এরপর আমি বেমালুম ভুলে যাই। কয়েক অনুচ্ছেদ পর আবার এই দৃশ্য লিখি। উপন্যাসের বয়ান নির্মাণে যে কল্পনা আমি কাজে লাগাই, তা বেশ গভীর। কিন্তু স্মৃতির সঙ্গে এটি মিশে কখনও কখনও ঝাপসা হয়ে যায়। মনে হয়, অপেক্ষা করুন, এ কথাটা কি আগে বলেছি, নাকি এ কথা বলার কথা আগে ভেবেছি ?

ছাত্রাবস্থায় শিক্ষার মনস্তত্ত্ব বিষয়ে আমার পরীক্ষা দিতে হয়েছিল। সেটি অবশ্য এক বিখ্যাত অধ্যাপকের কাছে মৌখিক পরীক্ষা। তিনি ছিলেন আমাদের টেক্সট বইয়ের লেখক। খুব ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। পাসও করেছিলাম। কিন্তু যখন তিনি আমাকে গ্রেড দিচ্ছিলেন তখন বললেন, ‘তোমার স্মরণ রাখা ও শেখার একটা অদ্ভুত পন্থা আছে। এমনটা আমি কখনও দেখিনি। তোমার ছোটখাটো অনেক বিষয় মনে পড়ে, তুমি সেগুলো বিস্তারিত বলতেও পারো কিন্তু তুমি সমস্যার কেন্দ্রটাই হারিয়ে ফেলো।’ তিনি ঠিকই বলেছিলেন। যে ট্যাপ ড্যান্সিং নাবিককে আমি অনেক আগে দেখেছি আড় চোখে তার কথাও আমি নির্ভুলভাবে বর্ণনা করতে পারি। অথচ পরিবারের সদস্যদের আমাকে মনে করিয়ে দিতে হতো যে, আমি কোনও আলাপচারিতার মধ্যে আছি। ভয় হচ্ছিল, এটি আমাকে খারাপ লেখক বানিয়ে দেয় কি-না। কিন্তু এরপর আমি নবোকভের Speak Memory গ্রন্থটি পড়ে ফেলি। ওখানে তিনি এ ধরনের স্মরণশক্তির ব্যাপারে অভিযোগ করেছেন। বইটি পড়ে বেশ শক্তি পেলাম। ভাবলাম, তিনি যদি অস্বাভাবিক স্মরণশক্তির এমন চমৎকার ব্যবহার করতে পারেন, তবে আমি পারব না কেন ?

প্রশ্ন : আপনি কীভাবে আপনার অস্বাভাবিক স্মরণশক্তি ব্যবহার করতে শিখলেন ?

উত্তর : চিন্তাভাবনা কীভাবে তার শরীর গঠন করে, তা Fights লেখার সময় বুঝতে পারি। ভেবেছিলাম ঐ উপন্যাস হবে অনেক কিছুর সমষ্টি, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক কিছুর একত্রীকরণ। ছড়ানো-ছিটানো যে বাস্তবতাগুলোর মধ্যে আমরা বসবাস করি সেগুলোকে আমি একটা নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে অঙ্কন করতে চেয়েছিলাম। এর জন্য দরকার ছিল একটা রেখা যা ধরে পাঠক এগিয়ে যাবে। বুঝতে পারলাম, গল্পকথকের জন্য দরকার উত্তম পুরুষ। সম্পূর্ণ দৃশ্যপট একসঙ্গে তুলে ধরে এমন বর্ণনা-কৌশলের চাইতে উত্তম পুরুষ গল্পকথকের মুখ দিয়ে গল্প বলা সহজ। কিন্তু ভাঙা ভাঙা আখ্যান পাঠককে ধন্দে ফেলে দেবে। এক্ষেত্রে আপনি আপনার নিজের সত্তাকেই উৎসাহ উৎসারণকারী শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। যখন আমি সম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপিটি আমার প্রকাশক উইডানিকটু লিটারেকির কাছে পাঠালাম, তখন ওরা আমাকে ই-মেইল পাঠাল। বলল, সম্ভবত আমি ভুল ফাইল এটাচ করেছি। ওরা জিজ্ঞেস করল, এই অসম্পূর্ণ, ভাঙা ভাঙা জিনিসটা কী ? ভুল বুঝবেন না, আমি কিন্তু ঐ প্রকাশনাকে পছন্দ করি। কিন্তু আমার সম্পাদক গতানুগতিক গদ্যে অভ্যস্ত ছিলেন।

প্রশ্ন : আপনি কি কাউকে আপনার ড্রাফট দেখান ?

উত্তর : নিয়মানুযায়ী কখনওই না। গুরুত্বপূর্ণ এডিটিং পর্যন্ত অপেক্ষা করি। যদি মনে হয় যে, এর উপর আর সৃজনশীল কিছু আমাকে করতে হবে না, তখন প্রথম যে ব্যক্তি এটি পড়েন, তিনি হলেন আমার স্বামী গ্রেগর্জ।

প্রশ্ন : কীভাবে বোঝেন যে, আপনার লেখা প্রস্তুত হয়ে গেছে ?

উত্তর : আমার সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। উৎসাহ শেষ হয়ে আসে। এক্ষেত্রে লেখাকে আমার কাছে ক্ষুধা মনে হয় বা আকাক্সক্ষা মনে হয়। আপনি আরেক কামড় খেতে পারবেন বা আপনি আরেক অধ্যায় লিখতে পারবেন, এ রকম কখনও অনুভব করবেন না। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশিক্ষণকালীন ভাষা ব্যবহার করে বলতে পারি―এই প্রক্রিয়াটিকে শারীরবৃত্তীয় বা শরীর-মন উভয়টাই মিলিয়ে এমন এক প্রক্রিয়া মনে হয়, যেমন ধরুন―তা পুনর্জনন প্রক্রিয়া বা প্রাকৃতিক কর্ম সাধন ইত্যাদি। যেইমাত্র আপনি জন্ম দিলেন, সঙ্গে সঙ্গে এর ব্যথাটা ভুলে গেলেন―ঠিক এমনই। যেইমাত্র উপন্যাসটি লেখা শেষ হলো, সেইমাত্র আপনি এটা লিখতে গিয়ে যে কষ্ট করেছেন, তা ভুলে গেলেন। তবে এটা শরীরের ওপর একটা চাপ। সর্বোপরি, মনোযোগের জন্য প্রয়োজন হয় প্রচুর পরিশ্রম।

The Books of Jacob লেখা শেষ করে আমি অসুস্থ বোধ করেছিলাম। গতানুগতিক চাইনিজ মেডিসিন প্র্যাকটিস করেন এমন একজন ডাক্তার দেখিয়েছিলাম। পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে তিনি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কী কাজ করছেন ? এটা ধীরে ধীরে আপনার জীবনীশক্তিকে খেয়ে ফেলছে যা আপনি আর কোনও কিছু দিয়েই পুনঃস্থাপন করতে পারবেন না!’ আমার ভয় হলো যে, আমি আমার জীবনের হয়তো  একটা অংশ নষ্ট করে ফেলেছি যা আর কখনও ঠিক হবে না।

প্রশ্ন : সচরাচর আপনার লেখার দিনটি কেমন হয় ? এর কি কোনও আনুষ্ঠানিকতা আছে ?

উত্তর : যারা রুটিন করে লেখেন তাদেরকে আমার হিংসে হয়, বিশেষ করে যিনি সকালে ঘুম থেকে উঠে তিন ঘণ্টা লেখেন, তারপর হাঁটতে বের হন। আমি এসব পারি না। মাঝে মাঝে বাড়ির আশেপাশে টুকিটাকি কাজকর্ম করি। ছন্দ ফিরে পাওয়া মাত্রই কাজে লেগে পড়ি এবং লেগে থাকি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। চাঙ্গা থাকার জন্য এক কাপ চা খাই, সলিটেয়ার খেলি। ব্যাপারটি মস্তিষ্কে চিরুনি চালানোর মতো।

প্রশ্ন : কোথায় লেখেন ?

উত্তর : বাড়িতে, চিলেকোঠায় বসে লেখি। আমার শান্ত, প্রশান্তিময় পরিবেশ দরকার। তবে জায়গার চাইতে আমার ল্যাপটপের সঙ্গে যোগাযোগটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেখানেই আমার ল্যাপটপ রাখি সেখানেই আমি লিখতে বসে যাই। কোনও হোটেলে যদি তিনদিনের বেশি থাকি, তবে সেখানেই কাগজ-কলম নিয়ে লিখতে বসে যাই। ট্রানজিটের সময় একদম মন বসাতে পারি না।

প্রশ্ন : আপনি কি মনোসংযোগের জন্য অফলাইনে থাকেন ?

উত্তর : হায় ঈশ্বর, নাহ। আমি সবসময়ই ইন্টারনেট ঘাটাঘাটি করি। কখনও ঐতিহাসিক ঘটনা, কখনও কোনওকিছুর প্রকৃত নাম, সমার্থক শব্দ ইত্যাদি দেখতে থাকি। এটি আমার কল্পনার জগৎকে মজবুত করে। The Books of Jacob লেখার সময় উইকিপিডিয়া থেকে সাহায্য নিই জানার জন্য যে, অষ্টাদশ শতাব্দীতে যে ধূমকেতু ইউরোপের উপর দিয়ে উড়ে গিয়েছিল তা পোল্যান্ডের পূর্বাঞ্চল থেকে দৃশ্যমান ছিল কি-না। আবার সেই ধূমকেতুটা দেখতে কেমন ছিল―তা জানার জন্য আমি গুগল স্ট্রিট ভিউ ব্যবহার করি। যে জায়গায় কখনওই যাইনি, যেমন―চেচনিয়ার শহর ব্রুনো, সেই জায়গাগুলোর বর্ণনা করতে এটি আমাকে সাহায্য করে।

প্রশ্ন : আপনি কি সব গবেষণা অনলাইনে করেন ?

উত্তর : নাহ। লাইব্রেরি এবং আর্কাইভেরও দরকার। মাঝে মাঝে ভ্রমণও করি। যে কল্পকাহিনির ভিত্তি সুদৃঢ় নয়, তা আমি পছন্দ করি না। যেমন ধরুন―এ রকম বাক্য আমি পছন্দ করি না―‘সে বাইরে গেল। বসল। চা পান করল। তারপর জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। বাইরে গাড়ি চলে যাচ্ছে।’ আমি বরং জানতে চাই, সে কী চা খাচ্ছিল, কোন জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিল; কী ধরনের গাড়ি রাস্তা দিয়ে চলে যেতে দেখল, রাস্তায় আর কী কী ছিল; চেয়ারটাতে বসে তার কেমন লাগছিল; ঘরটাই বা কেমন; বাইরে দিনের উজ্জ্বলতা কেমন ছিল। হতে পারে, আমি পাঠকের মতো বিশেষ কল্পনাপ্রবণ নই। তবে আমার মনে হয়, লেখকের দায়িত্ব সে-কাজ করা।

 মোটামুটিভাবে সোজাসাপ্টা বই, যেমন Anna in a Grobowcach Swiata (Anna in the Tombs of the World)-এর কথাই ধরুন। এখানে আমি সুমেরু অঞ্চলের মিথের পুনঃকথন হাজির করেছি। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সম্বন্ধে যতটুকু পেরেছি হাজির করেছি। সুমেরু অঞ্চলের বাসিন্দারা কী পান করতেন ? পণ্ডিতেরা বলেন, তারা নাকি শুধু বিয়ার পান করতেন। কিন্তু সেই বিয়ার তৈরিতে তারা কী ধরনের বার্লি ব্যবহার করতেন ? নিশ্চয় যে ইস্টার্ন ইউরোপীয় বার্লির কথা আমি জানি, তা নয়। আমি সিরিয়ায় গিয়ে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের চারপাশে হাঁটতে থাকি। সেখান থেকে বুনো বার্লির ডগা সংগ্রহ করি। এই বার্লি ওখানে এবং ওর আশেপাশে জন্মাত। মাঝে মাঝে আমার উপন্যাসের একটা বাক্য লিখতে আমাকে কষ্টকর গবেষণা করতে হতো। পাঠক এই ব্যাপারটি জানলো না-কি জানলো না―তা নিয়ে মাথা ঘামাই না। বরং আমার নিজের খাতিরেই এবং আমি যা লিখছি, তা ঠিকঠাক জানার জন্য একাজ করি।

প্রায়ই আর্কাইভে কাজ করতে করতে অনেক কিছু সামনে চলে আসে। The Books of Jacob-এর মূল চরিত্রের সঙ্গে আমার হঠাৎই সাক্ষাৎ হয়ে যায়। একটা পুরাতন বইয়ের দোকানে তার শিষ্যের লেখা একটা পুস্তিকা পেয়ে যাই। যে সময় এই বই ছাপা হয় সে সময় পোলিশ উইকিপিডিয়াতে জেকোব ফ্রাঙ্কের কোনও অস্তিত্ব ছিল না। যখন আমি আরও গভীরে অনুসন্ধান চালালাম তখন আমার পুরো পাঠের বিষয় পেয়ে গেলাম। যেন পুরো একটা গবেষণাপত্র পেয়ে গেলাম। ইহুদি অতীন্দ্রিয়বাদ, লোককাহিনি, অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্ব-ইউরোপের দৈনন্দিন জীবন, অষ্টাদশ শতাব্দীর ইতিহাস, বিশেষ করে আলোকায়ন এবং পোল্যান্ডে এর প্রভাব এবং সেই সময়ের সাহিত্য সম্বন্ধে জানতে চেয়েছিলাম। জেকোব ফ্রাঙ্কের ষাটটি ঘাত-সংঘাতময় বছরের জীবনে কে কে ছিলেন এবং তাঁদের সঙ্গে কী কী ছিল, তা জানতে চেয়েছিলাম। উদাহরণ স্বরূপ, আপনি কি জানেন যে, ফ্রাঙ্কের কিছু অনুসারীকে ফরাসি বিপ্লবের সময় গিলোটিনে হত্যা করা হয় ? আমার আফসোস যে, আজকের দিনে এই বইয়ের শেষে কোনও গ্রন্থতালিকা নির্দেশ করা হয়নি। ইতিহাসবিদগণ বলেছেন, আমার খুব একটা ভুলত্রুটি হয়নি। সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছে এর পোলিশ ভাষার সংস্করণের টাইপ সেটিং-এ। কিছু উদ্ধৃতিতে হিব্রু ভাষার শব্দের কিছু কিছু বর্ণ কম্পোজিটর ছেড়ে দিয়েছেন। এটা ধরতে পারিনি।

আপনি একবার যদি গবেষণার সেই গভীরে প্রবেশ করেন তাহলে আপনি এমন অনেক কিছুর সন্ধান পেয়ে যাবেন যার ব্যাপারে আগে মনোযোগ দেননি। তখন মনে হবে, পৃথিবী আপনাকে সাহায্য করছে। যে ব্যক্তি আনাড়ি তিনি ফ্রাঙ্কের পূর্বপুরুষদের খোঁজে ইস্তোনিয়ায় যেতে পারেন। কেউ হয়তো আনাড়িভাবে যেতে যেতে কাউন্টেস কাতারজিনার কথা বলতে পারেন। পোল্যান্ডের ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হতে পারে। এ ঘটনা কি সম্ভব ? আমার মনে হয়, সাহিত্যের মনস্তাত্ত্বিকগণ এই ব্যাপারটি খতিয়ে দেখবেন।

প্রশ্ন : আপনি কি মনোসমীক্ষণের ঢংয়ে লেখার কথা ভেবেছেন ?

উত্তর : ভেবেছি। সৃজনশীল লেখার মনস্তত্ত্ব আমাকে মুগ্ধ করে। ভিন্ন ভিন্ন স্বর, ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। পাঠকের যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয়, যে পন্থায় একজন ঔপন্যাসিক তাঁর উপন্যাস শুরু করেন তা ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞান কীভাবে শুরু হয়, তার মতো। এটি এমন এক প্রক্রিয়া যেখানে পাঠক প্রবেশ করে এমনভাবে যেন রোগী তার সাইকোথেরাপিস্টের সঙ্গে কোথাও প্রবেশ করছেন। আপনাকে একটা পারস্পরিক বিশ্বাসের জায়গা তৈরি করতে হবে যার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে এবং নানা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ, পরিবর্তন করা যাবে। এই সবকিছু একটি নির্দিষ্ট মুক্তির দিকে নিয়ে যায়। এটি অবশ্য পরিশোধন প্রক্রিয়া বা ক্যাথারসিসের মতো। অর্থাৎ সাইকোথেরাপির শুরুতে রোগী যেমন ছিলেন, এর শেষে আর তিনি তেমন থাকেন না। পাঠকও তাই। এ কাজটিই লেখক করে থাকেন। এভাবেই উপন্যাস তার পাঠককে প্রভাবিত করে। একটি বিশ্বাসযোগ্য বোঝাপড়া স্থাপনের মধ্য দিয়ে পাঠককে উৎসাহিত করা হয় গ্রন্থটি পড়ে যেতে, যাতে নানা কিছুর দ্বারা বিব্রত হলেও তারা শেষ পর্যন্ত পড়েন এবং শেষে এসে বদলে যান। আমার বিশ্বাস, প্রতিটি ভালো উপন্যাস পাঠককে তার নিজের মতো করে বদলে দেয়।

প্রশ্ন : আপনি কি কখনও একসঙ্গে একের অধিক সংখ্যক উপন্যাস নিয়ে কাজ করেন ?

উত্তর : আমি The Books of Jacob এবং Drive Your Plow over the Bones of the Dead পাশাপাশি রেখে লিখেছিলাম। যারা উপন্যাস দুটো পড়েছেন তাঁদের কাছে বিষয়টি অদ্ভুত লাগতে পারে। দুইটি বইয়েরই চুক্তি ছিল। আমি জানতাম, The Books of Jacob আমাকে আটকে দেবে। সে-সময় পোল্যান্ডে সবাই ক্রাইম ফিকশন পড়ত। আমি তাড়াতাড়ি কিছু একটা লিখতে চাইলাম।

পাশাপাশি দুটি টেবিল পাতি। একটা ভরিয়ে ফেলি ঐতিহাসিক ম্যাপ এবং জটিল আখ্যানের খসড়ায়। এই দলিল- দস্তাবেজকে মই বলি। এতে একগাদা শব্দবন্ধের তালিকা তৈরি করি। একটা চেইনের মতো বয়ান নির্মাণ করি। এর কোনও কোনওটা অর্থের মডিউল। এগুলোকে নড়ানো-চড়ানো বা পুনঃসজ্জিত করা যেত না। তবে নম্বর উল্লেখ করা উপবিভাগগুলোতে খসড়া লেখা চলত। বুলেট পয়েন্ট দিয়ে চিহ্নিত করতাম। নিচে সংখ্যা বসিয়ে বসিয়ে। The Books of Jacobকে সুশৃঙ্খলভাবে তৈরি করা খুব কঠিন কাজ। আমার অন্য টেবিলে লেখার কাজ চলছিল Drive Your Plow over the Bones of the Dead-এর। এর আখ্যান বেশ পরিষ্কার ও অধিকতর সুগঠিত।

সে-সময় নেদারল্যান্ডে গিয়েছিলাম ফেলোশিপ নিয়ে। তখনই আমার বর্তমান স্বামীর সঙ্গে দেখা হয়। আমার দরখাস্তে অঙ্গীকার করি যে, আমি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উপন্যাস নিয়ে কাজ করব। তবে Drive Your Plow over the Bones of the Dead লেখার দুরারাধ্য আকর্ষণ ছাড়তে পারলাম না। একবার শুরু করলে এর বয়ানের মধ্যে ডুবে যাই। নিজেকে জোরালোভাবে আবিষ্কার করি দুসজেকোর মধ্যে। যে নতুন অধ্যায় লিখতে যাচ্ছিলাম সেখানে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা নিয়ে অধৈর্য হয়ে পড়েছিলাম। এরকম অনুমান করে শুরু করলাম যে, বনের সব প্রাণি নিজেরাই শিকারিদের খুনিতে রূপান্তরিত হবে। মাঝখানে গিয়ে আমার মনোভঙ্গি পালটে ফেললাম। দুসজেকো নিজেই খুনি হয়ে যাবে। শুনেছিলাম, আগাথা ক্রিস্টি নাকি তাঁর একটা ক্রাইম উপন্যাসে এমনটাই করেছিলেন। যদিও আমার মনে নেই যে, এ তথ্য আমি কোথায় পেয়েছিলাম। শেষ অধ্যায়টা লেখা শেষ করে বেলকনিতে গিয়ে একের পর এক কয়েকটা সিগারেট ধরালাম। দুসজেকোর জন্য এতই দুঃখ হচ্ছিল যে, আমি কেঁদে ফেললাম। ওর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

প্রশ্ন : Drive Your Plow over the Bones of the Dead উপন্যাসটি বেশ মজার। এমনকি খুন করার অস্ত্রগুলোও মজার।

উত্তর : আমারও তাই মনে হয়। তবে আমার বৌদ্ধ বন্ধু-বান্ধবরা রাগ করেছেন। ওরা ভেবেছেন, এই উপন্যাসে মানুষকে হত্যা করার আহ্বান রয়েছে।

প্রশ্ন : আপনি কীভাবে আপনার বইগুলোর কাঠামো তৈরি করেন, সে ব্যাপারে আরও বলুন।

উত্তর : আরও জটিল রচনা কাঠামো তৈরি করার জন্য প্রয়োজন প্রচুর বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম এবং কঠিন পথ বেছে নিতে হয়। The Books of Jacob-এর ঐ দৃশ্যটার কথা ভাবুন যেখানে জেকব ফ্রাঙ্ক সীমান্ত পার হচ্ছে এবং তাকে পাসপোর্ট দেখাতে হবে। কোন দিক থেকে নাম-পুরুষের একজন বর্ণনাকারী এই দৃশ্য দেখবে ? তারা কি শুধু পাসপোর্টই দেখবে ? ওরা কি জানে যে, ফ্রাঙ্কের আশেপাশের লোকজন কী ভাবছে ? এই প্রশ্নগুলোর নামপুরুষ গল্পকথক বা চতুর্থ পুরুষ গল্পকথক অনবরত উদ্বেগ তৈরি করে, বিশেষ করে যদি অনেকগুলো প্রধান চরিত্র থেকে থাকে। অবশেষে, একটা মই দিয়ে এই সবগুলো কণ্ঠ ধরে ফেলা যথেষ্ট নয়। এ জন্য আমি প্যাকিং পেপার কিনেছিলাম এবং তাতে পাশাপাশি ভিন্ন ভিন্ন গল্পপ্রবাহ এঁকে নিয়েছিলাম। আরও কিছু যোগ করার জন্য এর সঙ্গে আঠা দিয়ে আরও কিছু পেপার লাগিয়ে নিয়েছিলাম।

উপন্যাসটি লেখার সময় ঐ শব্দটা পেয়েছিলাম। বইটি শুরু করেছিলাম একটি ঐতিহাসিক প্রবন্ধ হিসেবে। পরে বুঝলাম, এভাবে পাঠক  ফ্রাঙ্কের ইতিহাস সরাসরি ও নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন না। তখন ঠিক করলাম, আমি একটি উপন্যাস লিখব একজন আঁটসাঁট নাম-পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। সে এমন এক গল্পকথক হবে যে সবকিছু দেখে, শুনে গল্প বলবে এবং আখ্যানটাকে এগিয়ে নেবে। তবে সে কাজ করতে আমাকে একটি বিষয়ী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হয়েছিল এবং গল্পের বহু পার্শ্ব গুরুত্বের সঙ্গে চিন্তা করতে হয়েছিল। তাই আমি বাস্ক শহরের পণ্ডিত ব্যক্তি নাহমানকে উত্তম পুরুষ গল্প কথক হিসেবে বেছে নিলাম। নাহমান ছিলেন ফ্রাঙ্কের সবচেয়ে অনুরক্ত শিষ্য। নাহমানকে তাঁর নিজের ভাষা, বাগবিধি, মেজাজ-মর্জি ও স্বভাবসুলভ কাজকর্মের কাছে ছেড়ে দিলাম। তাঁকে কিছুটা ফ্রাঙ্কের প্রেমেও পড়তে দিলাম। এবার ভাবলাম, সমস্যার সমাধান করে ফেলেছি। আমি অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির মাঝ বরাবর অবস্থান করতে পারি। এটি একই সঙ্গে অধিকতর নৈর্ব্যক্তিক এবং ব্যক্তিক। কিন্তু আমার চরিত্রগুলো সংখ্যায় আরও আরও বাড়তে থাকল তাদের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে। নামপুরুষ গল্পকথক এদের ধারণ করার মতো যথেষ্ট নয়। আমার আরও শক্তিশালী উপষঙ্গের প্রয়োজন হলো যেটি শুধু ফ্রাঙ্কের গল্পটাই দেখবে না, বরং আমি কীভাবে লিখছি তার পুরো প্রক্রিয়াটাই লক্ষ করবে। শুধু ওপর থেকে নয় বরং ভেতরে থেকে পুরো ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করবে। ভূতুড়ে মহিলা ইয়েনতির চরিত্রের মধ্য দিয়ে ভিন্ন একটি পরিপ্রেক্ষিত হাজির করেছি। এই ইয়েনতি পুরো উপন্যাসের কাহিনির উপর প্রভাব বিস্তার করেছে। কখনও জুম করে ছোট ছোট ব্যক্তিগত বিষয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছি। আবার কখনও দূর থেকে ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে চারপাশের পুরো দৃশ্য একবারে দেখেছি। শেষ পর্যন্ত সে সবকিছুকে কাছে আনে। কখনও কখনও তার দৃষ্টিভঙ্গির ছাচে বাইবেলের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। বুক অব জেনেসিস-এর মতে, ঈশ্বর বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির পর ‘দেখলেন এবং বললেন, সবকিছু ভালোই হয়েছে।’ কিন্তু কে এটি দেখতে পেয়েছিল এবং ঈশ্বরের অভ্যন্তরীণ ভাবনা-চিন্তা বুঝতে পেরেছিল ? আমার মনে হয়, এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতার বর্ডার লাইন। এটি অতীন্দ্রিয় ব্যাপারও বটে।

প্রশ্ন : আমি আপনার বাথরুমের একটি পোস্টারে gnosis শব্দটি দেখেছি। আপনি কীভাবে অতীন্দ্রিয়বাদের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠলেন ?

উত্তর : আমার প্রজন্মের অনেক পোলিশকে আমি পছন্দ করি। ইহুদিদের সংস্কৃতি আমাকে মুগ্ধ করেছিল। তাই এটা ইহুদিদের অতীন্দ্রিয়বাদী শিক্ষাপদ্ধতি কাবালাহ থেকে আসতে পারে। অতীন্দ্রিয়বাদী যে ধারণা আমি নিয়েছি তা এসেছে Pardes দর্শন থেকে। এই দর্শনে বলা হয়েছে যে, বাস্তবতার চারটি স্তর রয়েছে। এর এক-একটি স্তরে এক এক উপায়ে প্রবেশ করা যায়। এগুলো হলো Peshat, Yemez, derash এবং Sod. এগুলোর অর্থ হলো যথাক্রমে আক্ষরিক, রূপক, দৃষ্টান্ত এবং অতীন্দ্রিয় উন্মোচন। আমার কাছে The Matrix  ছিল খুব চ্যালেঞ্জিং একটা ব্যাপার। আবার একই সঙ্গে বাস্তবতা সম্বন্ধে আকর্ষণীয় ধারণা। আমরা কী দেখছি এবং কী ভাবছি তা জানা-বোঝার জন্য সবসময় সজাগ থাকতে হয়।

যখন বেড়ে উঠছিলাম তখন যে ধর্ম আমাকে বেষ্টন করেছিল, তার বিরোধিতা করতে গিয়েও আমি অতীন্দ্রিয়বাদের প্রতি আকৃষ্ট হই। কিছু কিছু সূত্র মতে, এটি খ্রিষ্টধর্মের চাইতেও প্রাচীন। তবে পরবর্তী পর্যায়ে এই দুয়ের মধ্যে প্যাঁচ লেগে গেছে। এখন এটিকে খ্রিষ্টধর্মের অন্ধকার দিক হিসেবে গণ্য করা হয়। এর বিপরীতে রয়েছে পৃথিবী। বর্তমানে মনে হয়, পৃথিবী খ্রিষ্টধর্ম থেকে অতীন্দ্রিয়বাদের দিকে সরে যাচ্ছে। ঞযব গধঃৎরী সিনেমা দেখে আমি কেমন আহত ও উত্তেজিত হয়েছিলাম, তা আমার মনে পড়ে। সিনেমাটি প্রশ্ন করেছে―বাস্তব কী, আর ভুয়া কী ? বাস্তব পৃথিবী কি আদৌ রয়েছে ? এতে প্রবেশ করার জন্য তোমার কোন চাবিটি দরকার ? ওগুলো খোঁজার জন্য তোমাকে কি অতীন্দ্রিয়বাদী হতে হবে ? আমার ছেলেকে বলেছি, ‘এটিই সত্যিকারের অতীন্দ্রিয়বাদ।’

প্রশ্ন : আপনিই আপনার উপন্যাস বেছে নেন, নাকি আপনার উপন্যাসই আপনাকে বেছে নেয় ?

উত্তর : আসলে উপন্যাসগুলো শুরু হয় কিছু ধারণা দিয়ে যেগুলো আমি চাইলেই ঝেড়ে ফেলে দিতে পারি না। গল্পের শুরুটার জন্ম দেয় এই ধারণাই। এটি আমাকে সূক্ষ্ম বিষয়বস্তু ও উপ-আখ্যানের যোগান দেয়। আমাকে পড়তে উৎসাহ দেয়। ধীরে ধীরে চরিত্রের আবির্ভাব ঘটে। পুরোপুরি নয়, তবে আমি আস্তে আস্তে চরিত্রগুলোর অবয়ব বুঝি, ওরা কারা এবং ওরা কী চায়, তা উপলব্ধি করি। ওদের সঙ্গে নিজেকে মিলাই। এরপর ওরা কথা বলতে শুরু করে। প্রথমে বলতে পারি না যে, ওরা আসলে কী নিয়ে কথা বলছে। তবে ওদের কথা শুনতে থাকি।

আমার মনে হয়, আমরা নিজেরা অনেক গল্পের কুঁড়ি বয়ে চলেছি। শৈশবে একদিন দেখেছিলাম, আমার মা একটি মুরগি রান্না করার জন্য প্রস্তুত করছেন। আমার জায়গায় নিজেকে রেখে ভাবুন, বিষয়টা কেমন বিরক্তিকর। কিন্তু কেউ তো আপনার হয়ে মুরগিটা রান্নার আগে সাফ করবে না। আপনি জবাই করা মাথা ছাড়া একটি মুরগি কিনেছেন দোকান থেকে। মা যখন মুরগির পেটটা চিরে ফেললেন, দেখলাম, ওটা একটা বাচ্চা মুরগি। দেখলাম, এর পেটের ভেতর ডিমের কুঁড়ি গজাচ্ছে। আমরা তো শুধু ডিমটাই দেখি। কিন্তু এর পূর্ণতা পেতে একে অনেকগুলো মধ্যবর্তী পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। প্রথমে ছোট থাকে। তারপর এর মধ্যে কুসুম তৈরি হয়। একটা পাতলা স্বচ্ছ পর্দার দ্বারা বেষ্টিত হয়। ভাবুন, একটা ছোট্ট কুঁড়ি এর ভেতরে বেড়ে ওঠে। তারপর ধীরে ধীরে এর চারপাশের খোলশটা শক্ত ও অস্বচ্ছ হয়ে ওঠে। এই ডিমগুলো একের পর এক সাজানো হয়। এগুলো অবশ্য নিজেদের উৎসই নির্দেশ করে। এই ডিম রেডিমেড কিছু নয়। এটি একটি সৃষ্টি প্রক্রিয়ার ফল। এভাবে কি আমরা আমাদের ব্যক্তিত্ব তৈরি করি না ? এছাড়া যা আমরা সৃষ্টি করি, তার বাইরেও আমাদের অভ্যন্তরে ক্রমশ আমরা কি কিছু বহন করি না ? আমরা যখন লিখি তখন কি এই ভ্রƒণগুলোকেই আমরা প্রসব করি ?

প্রশ্ন : আপনি কি নিজেকে ধার্মিক হিসেবে উপস্থাপন করতে চান ?

উত্তর : আমি বলব, কিছু কিছু ক্ষেত্রে, যা অবশ্য নিয়ম-কানুন মানে না, সেখানে আমি ধার্মিক। ধর্মীয় ব্যবস্থা নিয়ে আমি প্রচুর চিন্তা-ভাবনা করি। ক্যাথলিক পরিবারে বেড়ে ওঠার জন্য আমি প্রায়ই ভাবি দেবতার বেদিতে যে প্রাণিগুলো বিসর্জন দেওয়া হতো সেগুলোর ব্যাপারে খ্রিষ্টধর্ম কি অপরাধ বোধ করে ? যিশু তো প্রাণির পরিবর্তে নিজের জীবনটাই বিসর্জন দিয়েছেন। তাঁর অনুসারীদের নিজের রক্ত-মাংস খাইয়েছেন। আনুষ্ঠানিকতার পরিপ্রেক্ষিতে দেখলে বলা যায়, কোরবানিকৃত পশুর রক্ত ও নাড়িভুঁড়ি গির্জার মেঝে মাখিয়ে ফেলত। একদিক থেকে মানব সভ্যতা এই রক্তাক্ত আনুষ্ঠানিকতাগুলো এখনও ত্যাগ করেনি। আমরা এখনও অন্ন-বস্ত্রের জন্য বন্য প্রাণি হত্যা করি। বিনোদনের জন্যও। সম্ভবত ওটাই ছিল আমাদের প্রকৃত পাপ। নিষিদ্ধ আপেল খাওয়া নয়, বরং প্রাণি হত্যা করা। সম্ভবত এ কারণেও মানুষ নিজেকে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবে। আমরা আমাদের পাপের বোঝা অনুভব করতে পারি।

সম্প্রতি আমি জাঁ ভ্যান ইক-এর গেস্ট-এর বিখ্যাত বেদিমূল পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। ওখানে একটা চিত্রকর্ম এ রকম যে, একটা পাটাতনে একটা শাবককে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। গোটা দুনিয়া থেকে লোকজন এসেছে এটিকে শ্রদ্ধা জানাতে। এই শিল্পকর্মের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, এইসব যোগী, সন্ন্যাসী যিশুকে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসেনি, সেই যিশুকে যে যিশুকে মেষ শাবকের রূপকল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়। আমরা আসলে নিজেরা প্রকৃতিকে প্রতারিত করছি।

ধরুন, যখনই আমি কোনও ইঁদুর বা বিড়াল দেখি এবং এর চোখের দিকে তাকাই, তখনই এর চোখ দু’টোর পেছনে পুরো বিশ্বটাকে দেখি, অনুভব করি। এই প্রাণিকে খাটো করে দেখা মানে হলো এই জগতের অস্তিত্ব অস্বীকার করা। চোখ দুটোর ভেতরে একটা জগৎ আছে যার সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানি না। গতকাল সকালে আপনি আসার পূর্বে আমাদের উপত্যকায় একটি হরিণের পাল বেরিয়েছিল। ওরা চেক প্রজাতন্ত্রের দিকে যাচ্ছিল। একটা হরিণের পেছনে পেছনে ত্রিশটা হরিণী যাচ্ছিল। এই সপ্তাহের প্রথম দিকে আমার এক প্রতিবেশীর কুকুর একটা হরিণীকে মেরে ফেলেছে, আমার বাড়ির দরজার বাইরে। আমি অবাক হলাম এই ভেবে যে, এই গল্পগুলোই তো আমি লিখতে চাই। শেষকৃত্যের গল্প।

এবার আমাকে উঠতে হবে। কয়েক ঘণ্টা বসে থাকলে আমার মেরুদণ্ডে ব্যথা করে। এটা অবশ্য আমার পেশার জন্যই হয়েছে। আরেক গ্লাস ড্রিংকস চলবে ?

প্রশ্ন : হ্যাঁ, প্লিজ। The Books of Jacob পোল্যান্ডের জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে রাজনৈতিক উষ্মা উসকে দিয়েছিল। বর্তমান সরকারকেও। আপনি কি জানতেন যে, উপন্যাসটি এতটা বিতর্ক সৃষ্টি করবে ?

উত্তর : উপন্যাসটা আদতে রাজনৈতিক। বিদেশিদের চোখে এটিকে রাজনৈতিক মনে হবে না। কিন্তু পোলিশ প্রেক্ষাপটে এটি সুস্পষ্টভাবেই তর্ক উসকে দেওয়ার মতো কথা বলে। পূর্ব-ইউরোপের ইহুদি সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা থেকেই আমি এটি লিখেছিলাম। এটি লিখেছিলাম ওদের পক্ষ থেকে মতদ্বৈধের প্রকাশ হিসেবে যারা গণহত্যা ও এর পরবর্তী ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে পোল্যান্ডে ইহুদিদের উপস্থিতি সংকীর্ণ করে এনেছিল। জেকোব ফ্রাঙ্কের গল্প জানতে পেরে তাঁর সূত্রের খোঁজে লাইব্রেরি ও আর্কাইভে ঢুঁ মেরেছি। কাউন্টেস কোসাকোয়া চিঠি লিখে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন আমার উপন্যাস পড়ে। পোল্যান্ডের শহর রোহাতিন-এর বাজারের মধ্যে দাঁড়িয়ে তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘এখানে কি এমন কেউ আছেন যিনি পোলিশ ভাষায় কথা বলেন ?’ দেখা গেল, কেউ বলেন না, ডানপন্থি জাতীয়তাবাদীরা আমাদের ইতিহাসের এই দিকটা মুছে ফেলে দিতে চেয়েছিল―এর বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক চরিত্র।

প্রশ্ন : কিন্তু আপনি কি পোলিশ ভাষার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা বোধ করেন না ? আপনার কি মনে হয়, অনুবাদের মধ্য দিয়ে আপনার বইগুলো কিছু একটা হারাচ্ছে ?

উত্তর : এ কথা সত্য যে, অন্যদের চাইতে আমার শৈলী অন্য ভাষায় অনুবাদ করা অধিকতর সহজ। ফরাসি ভাষা কঠিন। এর সুশৃঙ্খল বুদ্ধিবৃত্তি এবং উদ্ভট শব্দবন্ধের মধ্যে টানাপোড়েন আছে। পোলিশ ভাষা এ সমস্যা এড়িয়ে যেতে পারে। এ কথাও সত্য যে, পোল্যান্ডের অনেক লোক পোলিশ ভাষাকে লালন করেন তাঁদের জাতীয়তাবাদী চরিত্রের চিহ্নায়ক হিসেবে। এটি অবশ্য ইউরোপের রোমান্টিসিজমের দীর্ঘ উত্তরাধিকার। জাতির ধারণা উদ্দীপক চিহ্নও বটে। পোলিশরা এটি তীব্রভাবে অনুভব করে, কারণ অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত আমরা স্বাধীন দেশ ছিলাম না। পোলিশ আধুনিকতাবাদীরা সতর্কতার সঙ্গে আমাদের ভাষাকে আধুনিকায়িত করেছেন। এ কাজ এরা এমনভাবে করেছেন যেন সৌন্দর্য আর বিশুদ্ধতাই ছিল এর শেষ কথা। আমি এসব পাত্তা দিই না। আমি বরং ভাষাকে এর বাইরে যে জিনিসগুলো আছে সেগুলো বের করে আনার হাতিয়ার হিসেবে দেখি। আমার বেশ আনন্দ হয় যখন আমার পাঠক আমাকে বলেন, ‘ওলগা, যখন আপনার গদ্য পড়ি তখন সঙ্গে সঙ্গে আপনার বর্ণনার বিষয়বস্তু আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে।’ মানুষের চেতনাকে রূপ দিতে কল্পচিত্রের গুরুত্বের বিষয়টি আমি ইয়ুংয়ের কাছ থেকে জেনেছি। সেই থেকে আমি নিজে এ কাজ করার চেষ্টা করি। যখন Primeval and Other Times প্রকাশ হলো তখন কিছু সমালোচক বললেন, এর ভাষা বেশ সরল, প্রায় বাইবেলের ভাষার মতো। সম্পাদনা করার সময় খুব যত্নের সঙ্গে সব জটিল বাক্য, পরোক্ষ বাক্য, নামবাচক শব্দ, ক্রিয়া-বিশেষণ বাদ দিয়ে দিই। এগুলো আমি অপছন্দ করি। একটা স্বচ্ছ বুনন চেয়েছিলাম যেটা প্রাইমেভাল শহরের রক্ষাকারী দেবদূতদের দেখতে বাধাগ্রস্ত করবে না।

প্রশ্ন : আপনার কি মনে হয় পোল্যান্ডের চাইতে এর বাইরের বিশ্বেই আপনার বই বেশি গৃহীত হয় ?

উত্তর : একেবারে ঠিক বলেছেন। এখানে কখনওই আমার সমালোচক-ভাগ্য ভালো নয়। E. E. তে কেউ ইয়ুংয়ের এল্যুশন বুঝতেই পারেনি। এক সমালোচক তো একে ‘রজঃস্রাব সংক্রান্ত উপন্যাস’ বলে আখ্যায়িত করেছেন, কারণ এর প্রধান চরিত্র সবে বয়ঃসন্ধি পার করছে। এর কিছুদিন পরে পোল্যান্ডের পুরুষতান্ত্রিক সমালোচনা নতুন প্রজন্মের সব নারী লেখকদের গায়ে এই তকমা সেঁটে দিয়েছে। Primeval and Other Times উপন্যাসে আমি মিথোলোজি, নৃতত্ত্ব ও ইতিহাস একসঙ্গে গেঁথে দিয়েছি। একটি পত্রিকায় একে ‘মুখ থেকে লালা ঝরা হাবাগোবার গল্প’, বা একেবারে সাদামাটাভাবে বলতে গেলে একে ‘রুগ্ণ গল্প’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ঐ যে পুরাতন একটা কথা মনে পড়ে গেল―‘নিজের দেশে কেউ কখনও দৈবজ্ঞ হয় না।’

প্রশ্ন : আপনি কি দৈবজ্ঞ বা স্বপ্নদ্রষ্টাদের প্রতি আগ্রহ বোধ করেন ?

উত্তর : নব্বইয়ের দশকে আমি যখন ব্লেইক আবিষ্কার করলাম, তখন মনে হলো, আমি শুধু একজন দৈবজ্ঞকেই আবিষ্কার করলাম না, বরং একজন সম্পূর্ণ শিল্পীকে আবিষ্কার করলাম। তিনি লিখেছেন, এঁকেছেন, দার্শনিক রং দিয়েছেন এবং ফ্ল্যামেরিয়ন কাঠের খোদাইকৃত শিল্পের মতো যেন স্বর্গ থেকে মাথা বের করে দিয়েছেন।

আরেকজন লেখক যিনি আমার Primeval and Other Times এবং অন্যান্য বইয়ের পেছনে উৎসাহ জুগিয়েছেন তিনি হলেন অষ্টাদশ শতকের পোলিশ যাজক বেনেডিক্ট মিলোস্কি। তিনি Nowe Ateny (New Athens) গ্রন্থের লেখক। এটি পোলিশ ভাষার প্রথম দিকের বিশ্বকোষ। তিনি থাকতেন ইউরোপের উপকণ্ঠে, যেখানে আলোকায়নের হাওয়া লাগেনি বললেই চলে। অভিনব যা কিছু দেখেছেন তাই তিনি গ্রহণ করেছেন এবং অনেক চেষ্টা করে শ্রেণিবিন্যস্ত করেছেন। তিনি চেচ দার্শনিক কোমেনিয়াসের অনুসারী ছিলেন। তাঁর বিশ্বকোষীয় ধারণা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সর্বজনীন জ্ঞান অর্জনের মধ্য দিয়ে মানবতা মুক্তি লাভ করবে। Nowe Atene- তে বাস্তব কল্পনার সঙ্গে প্যাঁচ লাগে। এতে ড্রাগন, জাদুবিদ্যা এবং প্রচুর পরিমাণে উপকরণ রয়েছে যেগুলো ল্যাটিন ভাষা থেকে ধার করা হয়েছে। যখন আপনি একে দিদেরোর বিশ্বকোষের সঙ্গে তুলনা করবেন, যেটি সেই সময়ে বের হয়েছিল, তখন দেখবেন, একটা বিশাল সভ্যতা সম্বন্ধীয় ফারাক এদেরকে আলাদা করে ফেলে। আমার মনে হয় না যে, মিলোস্কি কখনও শুনেছিলেন যে, এগুলো বর্ণের ক্রমানুযায়ী সাজাতে হয়। আজকের দিনে পোলিশ সাহিত্যের ইতিহাসবিদরা পেছন ফিরে তাকিয়ে তাঁকে বোকা মনে করে, গর্দভ মনে করে। মনে করে, তিনি এমনই বোকা যে তিনি বায়ুকলের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন। তবু তাঁর জ্ঞানপিপাসা এবং আধাসত্য বিশ্ববীক্ষা আমাকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেয়।

Empuzjon-এর জন্য একইভাবে আমি এমেরেতিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম। তিনি একজন নারী এবং তাঁকেও আমার কাছে দৈবজ্ঞ মনে হয়। মান-এর উপন্যাসে অল্প সময়ের জন্য তাঁকে দেখা যায়। The Magic Mountain কমপক্ষে ছয়বার পড়েছি। প্রতিবারই একে একেবারে নতুন মনে হয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থবার একে একেবারে মজার মনে হয়েছে। প্রথম দিকের পাঠের কথা মনে হলে বিচলিত বোধ করি। নাফতা ও শেতে ম্রিনির স্ব স্ব-ধারণার ডায়াগ্রাম তৈরি করেছিল। পরবর্তী পুনঃপাঠের সময় আমি এমেরেন্তিয়াকে আবিষ্কার করি। মনে হলো, এই চরিত্র আবার কোত্থেকে এল ? একে নিয়ে গবেষণা করলাম। শেষ পর্যন্ত দেখলাম, এমরেন্তিয়া অবিশ্বাস্যরূপে একটি অসাধারণ নাম। বাইবেলের অপ্রাসঙ্গিক অংশে তাকে যিশুর দাদির দাদি হিসেবে দেখা যায়। জার্মানির বাভারিয়াতে সন্ত এমেরেন্তিয়ার কিংবদন্তি চালু আছে। ধর্মীয় প্রতিমূর্তিগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখতে পারেন। ওরা তাঁকে এমনভাবে অঙ্কন করেছেন যে, তিনি হাত বাড়িয়ে রক্ষা করার ভঙ্গিতে পোশাক মেলে ধরে সন্তু অ্যান, কুমারী ম্যারি এবং যিশুকে আগলে রেখেছেন। দেখতে কুৎসিৎ, বয়স্ক ও জ্ঞানী একজন মহিলা যিনি প্রথাবহির্ভূত নারীকেন্দ্রিক পবিত্র একটি পরিবারকে আগলে রেখেছেন। আমি নিশ্চিত যে, তিনি একজন নিপীড়িত পৌত্তলিক দেবী। হারিয়ে যাওয়া মাতৃতান্ত্রিক বিশ্বের অবশিষ্টাংশ। আধুনিক বিশ্বের শিকড় থেকে ঠিকরে বেরিয়ে এসেছেন। মান-এর মতো একজন নারীবিদ্বেষী ও সমকামী ব্যক্তি কি ভেবেচিন্তে তাকে তাঁর বয়ানে হাজির করেছেন ? নাকি তিনি অনিচ্ছাকৃতভাবে পিতৃতান্ত্রিকতার সমন্বিত অচেতনকে তাঁর মধ্য দিয়ে উচ্চারিত হতে দিয়েছেন ?

প্রশ্ন : মানুষ কি মাঝে মাঝে আপনার মধ্য দিয়ে আপনার উপন্যাসে কথা বলে ?

উত্তর : আপনাকে তাহলে একটা গল্প বলি। এই বাড়িতে ওঠার কিছুদিন পর আমরা জানতে পারলাম যে, এক জার্মান দম্পতি এই বাড়িটি তৈরি করেছিলেন। মি. এবং মিসেস ফ্রাঞ্জ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই বাড়ি ছেড়ে ওরা পালিয়ে গেছেন। একটু ঘুরুন―দেখুন, চুল্লির উপরের দেয়ালে একটি ছবি আছে। এই ফটো কীভাবে আমার হলো ? যখন আমি House of Day, House of Night লিখছিলাম, যা আসলে এই বাড়ির প্রতি আমার শ্রদ্ধাজ্ঞাপক এবং এই জায়গার প্রতিও, তখন মার্তা নামক একজন বৃদ্ধ মহিলার চরিত্র সৃষ্টি করলাম যিনি একটা অ্যামব্রয়ডারি করা কার্ডিগান পরে চারপাশে ঘুরে বেড়াতেন। তিনি আমার উপন্যাসের প্রধান গল্পকথক। এই উপত্যকার প্রতিনিধিত্বকারী আত্মা। এই চরিত্রই উপন্যাসের আখ্যানের সুতা ধরে টানে। কয়েক বছর পর জার্মানিতে একটি বইমেলায় ফ্রাঞ্জের নাতিপুতিরা আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি হয়। পরিবারের সবার ছবি নিয়ে ওরা আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। যখন একটা ছবি দেখলাম অর্থাৎ তাদের দাদির ছবি যিনি একজন বয়স্ক মহিলা, সোয়েটার পরা, ঠিক তার মতো যার কথা আমি বর্ণনা করেছি, তখন আমার পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। ওদের জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে ? ওরা উত্তর দিল, ‘মার্তা’। সেই থেকে আমার মনে হয়, এরা এখনও এখানে, এই বাড়িতেই আছেন।

প্রশ্ন : আপনাকে ধন্যবাদ।

উত্তর : আপনাকেও ধন্যবাদ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button