এক মুঠো খেজুর : মূল : তায়েব সালিহ

বিশ্বসাহিত্য : অনূদিত গল্প
আরবি থেকে ইংরেজি অনুবাদ : ডেনিস জনসন ডেবিস
ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ : নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর
তখন আমি খুবই ছোট ছিলাম। ঠিক কত ছিল বয়স, মনে করতে পারি না। তবে মনে পড়ে—লোকে আমাকে দাদুর সাথে দেখলে মাথায় হাত বুলিয়ে, গাল টিপে আদর করে দিত—অথচ এমনটা তারা কখনও আমার দাদুর সঙ্গে করত না। আশ্চর্যের বিষয় ছিল, কখনও আমি আব্বুর সাথে বাইরে যেতাম না। ভোরবেলায় মসজিদে কোরআন শিখতে যাওয়ার সময়টা বাদে সচরাচর দাদু আমাকে সবখানেই সাথে করে নিয়ে যেতেন।
মসজিদ, গ্রামের পাশের নদী আর মাঠ—এই তিনটা জিনিস আমাদের শৈশব জীবনের নিদর্শন। মনে পড়ে, আমার বয়সী বেশির ভাগ শিশুই কোরআন পাঠ করতে শেখার জন্য মসজিদে যেতে চাইত না, কিন্তু আমি মসজিদে যেতে খুব ভালোবাসতাম। এর কারণ, আমি খুব দ্রুত মুখস্থ করতে পারতাম, কোনও মেহমান এলে ক্বারি হুজুর আমাকে দাঁড়িয়ে সুরা ‘আর-রহমান’ তেলাওয়াত করতে বলতেন। তেলাওয়াত শুনে মেহমানগণ আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, গালে চিমটি কাটতেন—দাদুর সাথে থাকলেও আমাকে লোকে যেমনটা করত।
হ্যাঁ, আমি মসজিদ ভালোবাসতাম, আর আমি নদীও ভালোবাসতাম। সকালে কোরআন শেখার পালা শেষ হলে আমি কাঠের স্লেটটা মসজিদে রেখে জিনের গতিতে দৌড়ে মায়ের কাছে আসতাম। গোগ্রাসে নাশতা গিলে নদীতে ঝাঁপ দিতে ছুটে যেতাম। সাঁতার কেটে কেটে ক্লান্ত হয়ে গেলে পর নদীর তীরে বসে বসে স্রোতধারার দিকে তাকিয়ে থাকতাম, নদীটা পূর্বদিকে বেঁকে গিয়ে কাঁটাওয়ালা অ্যাকাশিয়া গাছের ঘন ঝোপের আড়ালে চলে গেছে। ওখানে বসে আমি লাগামহীন কল্পনার জগতে ডুবে যেতে ভালোবাসতাম আর ভাবতামঅ্যাকাশিয়া ঝোপের আড়ালে দৈত্যাকার উপজাতি রয়েছেআমার দাদুর মতোই যারা দীর্ঘ, রোগা, সাদা দাড়িওয়ালা আর তীক্ষ্ম নাকবিশিষ্ট। কোনও প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে সব সময় দাদু তার তর্জনী নাকের ডগায় ঘষতেন। তার দাড়ি ছিল নরম, ঘন আর তুলোর মতো সফেদজীবনে আমি অত নিখুঁত সাদা বা এমন সুন্দর কিছু কখনও দেখিনি।
আমার দাদু খুব দীর্ঘদেহী ছিলেন; এলাকার এমন কাউকে কখনও দেখিনি তার সঙ্গে কথা বলার সময় ওপরের দিকে তাকাতে হয়নি। কোনও ঘরে ঢোকার সময় তাকে এতটাই নুয়ে ঢুকতে হতো যে, আমার মনে হতো অ্যাকাশিয়ার ঝোঁপের পেছনে মোড় নিতে গিয়ে যেমন বেঁকে গেছে দাদুর দেহটাও তেমনি বেঁকে যেত। তাকে খুব ভালোবাসতাম আমি এবং ভাবতাম, বড় হলে আমি তার মতোই লম্বা ও হালকা-পাতলা হব, লম্বা পা ফেলে ফেলে হাঁটব।
আমি বিশ্বাস করতাম, আমিই তার সবচাইতে প্রিয় নাতি। অবাক হওয়ার কিছু নেইআমার চাচাতো ভাইয়েরা খুবই বোকা, আর আমি ছিলামলোকেরা বলতবুদ্ধিমান শিশু। বুঝতে পারতাম দাদু কখন চাইতেন আমি হাসব আর কখন চুপ থাকব। তার নামাজের ওয়াক্তগুলো মনে রাখতাম, তিনি কিছু বলার আগেই তার জায়নামাজ এনে দিতাম, অজু করার জন্য বদনায় পানি ভরে দিতাম। যখন তিনি কাজে ব্যস্ত থাকতেন না, তখন আমার কোরআন তেলাওয়াত উপভোগ করতেন, আমি তার মুখ দেখে বুঝতাম তিনি আবেগাপ্লুত।
একদিন আমি দাদুকে আমাদের প্রতিবেশী মাসুদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। বললাম, ‘আমার ধারণা, আপনি মাসুদকে পছন্দ করেন না ?’
দাদু আঙুলে নাকের ডগা ঘষে বললেন, ‘সে একটা আলসে, আর আমি অলস মানুষ পছন্দ করি না।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘অলস মানুষ মানে কী ?’
দাদু কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে রাখলেন। তারপর মুখ তুলে বিস্তীর্ণ মাঠের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি কি দেখতে পাচ্ছ ? মরুভূমির শেষ প্রান্ত থেকে নীল নদের তীর অবধি মাঠ প্রসারিতএক শো একর হবে। দেখছ, ঐ অগুনতি খেজুর গাছ সব ? আর ঐ গাছগুলোস্যান্ট, অ্যাকাশিয়া, সায়াল ? এগুলোর সবই মাসুদের ভাগ্যে ছিল, উত্তরাধিকারসূত্রে সে পিতার কাছ থেকে পেয়েছিল।’
দাদুর কথা বলার মাঝখানে নীরবতা নেমে এল, সেই ফুরসতে আমি আমার চোখ দূরে সরিয়ে সেই বিশাল সম্পত্তির দিকে তাকালাম। আর মনে মনে বললাম, ‘এই খেজুর গাছগুলো, বৃক্ষরাজি বা কালো ফাটলধরা জমিন, এসব কারতাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। এসব কেবলই আমার স্বপ্ন দেখবার এবং আমার খেলার মাঠ।’
দাদু আবার কথায় ফিরলেন: ‘হ্যাঁ প্রিয় নাতি আমার, চল্লিশ বছর আগে এগুলো সবই মাসুদের ছিলএর দুই-তৃতীয়াংশ এখন আমার।’
কথা শুনে আমি অবাক হলাম। আমি ভাবতাম, সৃষ্টির শুরু থেকেই এসব জমির মালিক দাদু। তিনি বললেন, ‘এই গ্রামে প্রথম পা রাখার সময় আমার এক একর জমিও ছিল না। তখন এসব সম্পদের মালিক ছিল মাসুদ। এখন আমার ভাগ্য বদলেছে, না চাইতেই আল্লাহ আমাকে দিয়েছে; তার কাছে চাওয়ার আগেই বাকি জমিনও আমি কিনতে পারব আশা করি।’
কেন জানি না, দাদুর কথায় আমি ভয় পেয়ে গেলামআর মাসুদের জন্য করুণা বোধ হলো। মনে মনে কামনা করলাম, দাদু যা বলেছেন তেমনটা যেন না হয়। মাসুদের গান, তার চমৎকার কণ্ঠ আর তার প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা জলপ্রবাহের মতো হাসির কথা মনে পড়ল। আমার দাদুকে কখনও হাসতে দেখতাম না।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, মাসুদ তার জমি বিক্রি করেছে কেন ?
দাদু বললেন, ‘নারী’। তিনি শব্দটা যেভাবে উচ্চারণ করলেন, তাতে মনে হলো ‘নারীরা’ যেন ভয়ংকর কিছু। ‘ভাই আমার, শোনো তোমাকে বলি, ‘মাসুদ অনেকগুলো শাদি করেছে। প্রত্যেক বার বিয়ের সময় সে এক-দুই একর জমি আমার কাছে বিক্রি করেছে।’ আমি মনে মনে দ্রুত হিসাব করে দেখলাম, মাসুদ এ পর্যন্ত নব্বইজন নারীকে বিয়ে করেছে! তার তিনজন স্ত্রী, মলিন চেহারা, খোঁড়া গাধা, জীর্ণ জিন, ছেঁড়া হাতাওয়ালা জোব্বা আমার চোখে ভেসে উঠল। এসব ভাবনা যখন আমার মাথা থেকে প্রায় ঝেড়ে ফেলেছিলাম, তখন মাসুদকে আমাদের দিকেই আসতে দেখলাম। দাদু আর আমি চোখাচোখি করলাম।
মাসুদ বলল, ‘আজ খেজুরের বাদা নামাব, আপনি থাকবেন না ?’
আমার মনে হলো, দাদু জমিতে যাবেন এটা সে চাইছে না। কিন্তু দাদু দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন, আর তার চোখে মুহূর্তের জন্য ঝিলিক দেখতে পেলাম। তিনি আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে মাসুদের খেজুর তুলে আনা দেখতে চললেন।
কেউ একজন দাদুর বসার জন্য গরুর চামড়ামোড়ানো একটা টুল বাড়িয়ে দিল, আর আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। ওখানে প্রচুর লোকসমাগম হয়েছিল। আমি সবাইকে চিনতাম, তবু কোনও কারণে বারবার মাসুদের দিকে আমার চোখ চলে যাচ্ছিল: ভিড় থেকে আলাদা হয়ে সে দূরে দাঁড়িয়ে আছে যেন এ খেজুর আর জমিতে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো নিয়ে ওর মাথা ঘামানোর দরকার নেই। তবু মাঝে মাঝে বড়সড় খেজুরের বাদা উপর থেকে ঝুপ করে পড়লে সে দিকে তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হচ্ছিল। গাছের মাথায় বসে যে ছেলেটা ধারালো কাস্তে দিয়ে একটা একটা বাদা কাটছিল, ওর দিকে তাকিয়ে একবার চেঁচিয়ে বলতে শুনলাম, ‘সাবধান, গাছের হৃৎপিণ্ড কেটে ফেলিস না যেন।’
কিন্তু মাসুদের কথায় কেউ কর্ণপাত করেনি। খেজুরগাছের চূড়ায় বসা ছেলেটা আগের মতোই তড়িঘড়ি এবং সোৎসাহে কাস্তে চালাচ্ছিল, আর একেকটা খেজুরের বাদা ঝুপঝাপ করে পড়ছিল যেন বেহেস্তের নেয়ামত নিচে নেমে আসছিল। মাসুদের উচ্চারিত শব্দগুচ্ছ নিয়ে আমি ভাবছিলাম‘খেজুর গাছের হৃৎপিণ্ড’। আমি কল্পনা করছিলাম, খেজুরগাছও অনুভূতিসম্পন্ন কোনও সত্তা, যার বুকে একটি হৃৎপিণ্ড স্পন্দিত হয়, ধুকধুক করে। আমার আরও মনে পড়ল, একদিন মাসুদ আমাকে একটা খেজুরগাছের ডাল নিয়ে খেলতে দেখে বলেছিল, ‘বাজান, খেজুরগাছও মানুষের মতোই সুখ-দুঃখ বোঝে আর কষ্ট পায়।’ আমি অকারণেই তার কথায় লজ্জা পেয়েছিলাম।
ভাবনা থেকে যখন সামনের জমির দিকে তাকালাম, চোখে পড়ল, আমার বয়সী শিশুরা পিঁপড়ার বাহিনীর মতো খেজুরগাছের চারপাশে ভিড় জমিয়ে খেজুর কুড়াচ্ছে আবার বেশির ভাগ কুড়ানো খেজুরই মুখে পুরে দিচ্ছে। গাছ থেকে নামানো খেজুর জড়ো করে বড় বড় ঢিবি করে রাখা হচ্ছে। আর লোকজন সেগুলো দাড়িপাল্লায় ওজন করে বস্তায় ভরছে। আমি গুনে দেখলামমোট ত্রিশ বস্তা খেজুর।
ধীরে ধীরে ভিড়ও কমে গেল। রয়ে গেল কেবল ব্যাপারি হুসাইন, আমাদের জমির পূর্ব পার্শ্বের জমির মালিক মুসা, আরও দুজন লোক, যাদের আমি আগে কখনও দেখিনি।
আমি একটি মৃদু শিসের মতো শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখলাম, আমার দাদু ঘুমোচ্ছেন। আর খেয়াল করলাম, মাসুদ তার নির্লিপ্ত ভঙ্গিটা বদলায়নি; একটা খেজুরের ডাঁটা মুখে পুরে দাঁতের নিচে চিবোচ্ছে, যেন বেশি আহার করে ফেলায় তার মুখে খাবার রয়ে গেছে কিন্তু সে কী করবে বুঝতে পারছে না।
সহসা আমার দাদু জেগে উঠলেন, লাফিয়ে দাঁড়ালেন এবং এগিয়ে গেলেন খেজুরের বস্তাগুলোর কাছে। তার পেছন পেছন গেলেন হুসাইন, মুসা এবং সেই অপরিচিত দুজন লোক। আমি মাসুদের দিকে তাকালাম, সে অত্যন্ত ধীরে আমাদের দিকে এগোচ্ছে, যেন এমন কেউ, যে পিছু হটতে চায়, অথচ তার পা জোর করে তাকে সামনে নিয়ে যাচ্ছে।
তারা বস্তাগুলোর চারপাশে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে পরীক্ষা করতে লাগল, কেউ কেউ দু-একটা খেজুর মুখেও তুলল। দাদু আমার হাতে একমুঠো খেজুর দিলেন, আমি সেগুলো চিবোতে লাগলাম। দেখলাম, মাসুদ দুই হাত ভরে খেজুর নিয়ে নাকের কাছে তুলে সুবাস নিল, তারপর আবার রেখে দিল।
তারা বস্তাগুলো ভাগ করল। হুসাইন দশটি; দুই অপরিচিত লোক নিল পাঁচ বস্তা করে। পূর্ব পাশের ক্ষেতের মালিক মুসা পাঁচটি আর আমার দাদু নিল পাঁচটি। কিছু বুঝতে না পেরে আমি মাসুদের দিকে তাকালাম। খেয়াল করলাম, তার দুটো চোখ দুটো পথ হারানো ইঁদুরের মতো ডানে-বামে ছুটে বেড়াচ্ছে।
আমার দাদু মাসুদকে বললেন, ‘তুমি এখনও আমার কাছে পঞ্চাশ পাউন্ড ঋণী আছো’।
‘এ বিষয়ে পরে কথা বলব।’
হুসাইন তার সহকারীদের ডাকল, তারা গাধা নিয়ে এল। অপরিচিত লোক দুজন উট নিয়ে এল। বস্তাগুলো গাধা আর উটের পিঠে তোলা হলো। একটি গাধা এমন জোরে চেঁচিয়ে উঠল যে, উটগুলো মুখে ফেনা তুলে বিরক্তি প্রকাশ করতে লাগল। আমি নিজেকে মাসুদের আরও কাছে যাওয়া থেকে নিবৃত করতে পারলাম না। অনুভব করলাম, আমার হাত নিজের অজান্তে তার পোশাক ছুঁতে চাইছে। আমি শুনলাম, তার কণ্ঠ থেকে এমন শব্দ বেরিয়ে আসছে যা আমার কানে শোনাচ্ছিল জবাই হওয়া ভেড়ার আর্তনাদের মতো। আমি বুঝতে পারছিলাম না, কেন আমার বুকে অসহনীয় যন্ত্রণা অনুভব হচ্ছিল।
আমি সেখান থেকে সরে যেতে দৌড়াতে শুরু করলাম। দাদুর ডাক শুনে মুহূর্তকাল থমকে দাঁড়ালাম, তারপর আবার দৌড়াতে থাকলাম। দৌড়াতে দৌড়াতে আমার মনে এল, আমি দাদুকে খুব ঘৃণা করি। গতি আরও বাড়িয়ে দিলাম এবং দৌড়াতে দৌড়াতে মনে হচ্ছিল, আমার ভেতর কোনও গোপন বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছি, এর থেকে আমি মুক্তি চাই।
আমি নদীর তীরে গিয়ে থামলামনদীটা বেঁকে অ্যাকাশিয়া গাছের ঝোপের আড়ালে হারিয়ে গেছে। তারপর, জানি না কী কারণে, মুখের ভেতর গলা পর্যন্ত আঙুল ঢুকিয়ে উদরস্থ খেজুরগুলো আমি উগরে দিলাম।
সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ



