অনূদিত পঙ্ক্তিমালা : বাংলা অনুবাদ : শশিভূষণ

বিশ্বসাহিত্য : অনূদিত কবিতা
ভদ্রে! করিও না শোক;
ওরা এমনই―চির প্রতারক।
একস্থানে নহে স্থির পুরুষের মন;
একখানা পা যখন জলের গভীরে―
অন্যখানি রাখে তারা তীরেতে তখন।
[Sigh no more, ladies,…/ William Shakespeare]যদি চুম্বন-খেলাতেই সমাপ্ত হতো
বাসরের যত আয়োজন―
কোনও নারী তবে আর পুরুষের সাথে
করতো না শয্যাগ্রহণ।
[Were kisses all the joys…/ William Shakespeare]সন্দেহ হোক―নক্ষত্র সকল
অগ্নিগোলক; সূর্যটা নহে স্থির।
সন্দেহ করো, সত্যও সত্যি না―
সে মিথ্যার মুখোশ।
তবুও আমাকে করো না অবিশ্বাস।
[Doubt thou the stars…/William Shakespeare]হতাম যদি নিদ্রা চোখের―
প্রশান্তি তার বুকে;
রাত না-জানি কাটতো কত
নিবিড় প্রণয়-সুখে!
[Sleep dwell upon thine eyes…/ William Shakespeare]যদি নেমে আসে প্রশান্তি অপার
প্রতিটি ঝড়ের শেষে;
আসুক প্রলয়―জাগিয়া উঠুক
মৃত্যু বঁধুবেশে।
[If after every tempest…/ William Shakespeare]ধৈর্যের কঠিন মাটিতে যখনি
পুঁতেছি দুঃখের বীজ―
সেখানে তখনি ফলেছে সুখের সুবর্ণ ফসল।
[When I planted my pain…/ Kahlil Gibran]যদি ভালোবাস, দাও তাকে ছেড়ে;
যদি ফিরে আসে, তোমারই আছে।
যদি নাহি আসে―ছিল না কখনও।
[If you love something…/ Proverb]আঃ কী যে মধুর চাঁদমুখখানি
সকল অঙ্গসুধা;
সকলেই তাকে সকলের ভেবে
মিটায় সকল ক্ষুধা।
[Oh, so sweet―…/ Robert Browning]কী কহিব সখী দুঃখের কথা
তোমার সকাশে;
ভরা ভাদরের বাদল এ-দিনে
বঁধু নাই পাশে।
[এ সখী হামারি দুখের…/ বিদ্যাপতি]প্রিয়ার কপোলতলে একবিন্দু তিল―
হেলায় বিলায়ে দিলে বিনিময়ে তার
বুখারা-সমরখন্দ সমগ্র নিখিল।
[আর্গ আঁতুর্কে শিরাজী…/ হাফিজ]জনম জনম ও-রূপ দেখিনু
তবু না আঁখির মিটিলো তিয়াস;
যুগ যুগ ধরে হৃদয়ে রাখিনু
তবু-না পুরিলো অন্তর-আশ।
[জনম অবধি হাম…/ কবি বল্লভ]কী এমন ক্ষতি দেহের মৃত্যু হলে―
বেশি কিছু তার চেয়ে ?
জীবদ্দশায় যা যাচ্ছে মরে
আমাদের মাঝে।
[Death is not the greatest…/Norman Cousins]
…………………………………………………………

তোমার সাথে খেলবো খেলা
তোমার সাথে খেলবো খেলা―যে খেলা আজ
চেরির ডালে খেলছে বসে বসন্ত।
পাগলপারা দুইটি ডানায় খেলছে দুলে
বনের পাখি দুরন্ত।
মাতাল হাওয়া খেলছে যেমন
উড়িয়ে তার খোলা-বেণীর চুলগুলি;
হোক না কুসুম সন্ধিবিহীন―
গোপন বুকের বসন তো!
[Pablo Neruda-i I want to do with you-র আলোকে]………………………..
এলিস
অই ছেঁড়ি, কী হইছে তোর―কুনো
ভয়-টয় পাইছস্? ডরাইছস্ নি ?
কেমুন-কেমুন ভাব…
আইজ রাইতখানও যা-ঠান্ডা!
শরীল-টরীল… কী হইছে কইবি তো ?
‘কিছু হয় নাই―আমি ঠিক আছি;
আমারে লিখতে দাও চিডিখান।
তুমি-না বললা, আইজ রাইতটা যা…’
ঠান্ডা; আর কুয়াশায় ঢাকা।
তয়, তোর পাও দুইখান য্যান
ফড়িঙের লাহান বাতাসে নাচে―
মাটিতে পড়ে না;
চৌখের মইদ্দেও কী-জানি…
তোরে ভূতে-টুতে…!
এলিস! পোলাডা ক্যাডা―
যে কইছে তোরে ভালোবাসে ?
‘আ-আম্ ম্মু’ বলেই পলকে মেয়েটি পালায়।
[A Frosty Night / Robert Ranke Graves]হৃদয়ে রক্তক্ষরণ
একটা সময়ে যুদ্ধ থেমে যাবে
নেতারা সহাস্যে হাতে হাত মেলাবেন পরস্পরে;
এবং তখনও ঐ-বৃদ্ধা অপেক্ষা করবেন
তার মৃত সন্তানের জন্য।
আর ঐ-বধূটি প্রহর গুনবে
প্রিয়তম স্বামীর পথের দিকে চেয়ে।
এবং তখনও ঐ-শিশুগুলি
একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকবে বাক্যহারা
তাদের সাহসী পিতাদের ফিরে আসার আশায়।
জানি না এভাবে দেশটাকে কারা বেচে দিলো;
তবে, সেজন্য কাদের মূল্য দিতে হয়েছে―তা জানি।
[My Heart Bleeds / Mahmoud Darwish]………………………….
দো-বুঁদ
No time to grieve for roses, when the forests are burning―Slowacki
দাবানলে পুড়ছিল বনভূমি
তবুও তাদের গ্রীবা
গোলাপ স্তবকের মতন
বেষ্টিত ছিল বাহুবন্ধনে
চারদিকে ছুটছিল লোকজন
সে বলল―তার স্ত্রীর ছিল
এমনই ঘন কেশ
যার গভীরে যে-কেউ
অনায়াসে পারতো লুকাতে
এক চাদরের তলে চুপি চুপি
তারা করছিল খুনসুটি―
প্রেমের প্রলাপ
তারপর অবস্থা সঙ্গিন হলে
তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল চোখের ভিতর
আর নিজেদের বেঁধে নিলো শক্ত আলিঙ্গনে
এত শক্ত যে
চোখের পিছির কাছে পৌঁছে গেলেও
কিছুতেই তারা বুঝতে পারেনি সে অগ্নিতাপ
তারা ছিল শেষ পর্যন্ত সাহসী
ছিল বিশ্বস্ত পরস্পরে
মুখের কানায় থেমে থাকা
দু ফোঁটা অশ্রুর অনুরূপ
[Two Drops / Zbigniew Herbert]…..
অপেক্ষা
ধৈর্যের কঠিন মাটিতে পুঁতেছি কষ্টগুলি
অপেক্ষার আঁচলে বেঁধেছি বেদনার ভার
আশার সুবর্ণ লতায় গেঁথেছি ফসলের গান
দূর মরীচিকা ইশারায় ডাকে : আয়…
ফুরাবে এ পথ; সামনেই পোতাশ্রয়।
দুঃখের দুর্বহ বোঝা বয়ে নিতে
বিধাতা দেয়নি যাকে অধিকার―
হতভাগ্য সেইজন।
[[Kahlil Gibran-Gi When I planted my pain…অবলম্বনে]………………….
অগ্নি ও তুষার
কেউ কেউ বলে :
এ জগৎ শেষ হবে অগ্নিতে;
কেউ বলে―না, তুষারে।
আমার সমর্থন ঐ-দলে;
কারণ অভিজ্ঞতা বলে
বাসনা আগুনেই তা শেষ হতে পারে।
তবু যদি দু-বার মরণ তার হতো―
ঘৃণা-বিদ্বেষ ভরা বরফপাহাড়
একাই যথেষ্ট, প্রবল―হতো তার ধ্বংসের একমাত্র কারণ।
[Fire and Ice / Robert Frost]………………..
বনভূমিপাশে এক তুষার-সন্ধ্যায়
এই বনভূমি যার, মনে হয় তাকে
চিনি। যদিও-বা জানি থাকে অই গাঁয়ে―
আমাকে সে দেখবে না দাঁড়াতে এখানে।
ক্ষণিক থেমেছি পথে দেখবার ছলে
কেমনে ঢেকেছে বন তুষার-চাদরে।
প্রিয় ঘোড়াটি ভাবছে : অদ্ভুত ব্যাপার!
কাছাকাছি নেই কোনও গৃহস্থখামার।
বরফের হ্রদ আর বনভূমিপাশে
অকারণ থেমে যেতে কার মন চায়
ঘন কালো মসিমাখা এমন সন্ধ্যায়!
গলার ঘণ্টিটা নেড়ে প্রশ্ন করে সে-ও :
‘কোনো ভুলত্রুটি, কিংবা গলদ কোথাও ?’
আর একমাত্র শব্দ অস্পষ্ট দূরের
অবাধ বাতাস আনে সুমন্দ দোলায়;
নরম তুষার তাতে আঁচল বুলায়।
নিবিড় অরণ্যভূমি―অপূর্ব মধুর!
তবু নেই কোনো অবসর দাঁড়াবার।
আঁধার নামবার আগে দূরে বহুদূর―
দীর্ঘ পথ যেতে হবে, প্রতিজ্ঞা আমার;
দীর্ঘ পথ যেতে হবে―প্রতিজ্ঞা আমার।
[Stopping by Woods on a Snowy Evening /Robert Frost]
……………………..
কী যে বাজে একটা রাত
এলিস, মামণি―কী হয়েছে তোর ?
এত আনমনা, বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে তোকে
মনে হয় ভয়-টয় পেয়েছিস।
হতে পারে, রাতটা ভীষণ ঠান্ডা, তাই…
‘না মা, আমি ঠিক আছি;
এরচেয়ে ভালো ছিলাম না কখনও;
বিরক্ত করো না, লিখতে দাও চিঠিটা।’
লক্ষ্মী মেয়ে, কোনও কারণে কি তুই―
‘বলেছি তো, আমি ঠিক আছি;
তাছাড়া, তুমিই-না বললে, রাতটা খুব…’
ঠান্ডা; আর কুয়াশায় ঢাকা;
নিষ্প্রভ চাঁদটা হাই তুলছিল ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে।
তবুও জুনের ঝোপঝাড়ের ভেতর থেকে
মনে হলো পাখিরা করছে কলরব।
নরম ও পুরু বরফ পড়ছে ঝরে
আকাশের তারারা করছে নাচানাচি;
মে-উৎসবের সমস্ত মেষও এতটা উল্লাসে নাচে না কখনও।
এলিস, তোমার পাগুলিও তেমনি নাচছে
বাতাসের উপর লাফিয়ে লাফিয়ে; সেখানে
তারাদের মাঝে তোমাকে দেখাচ্ছে
কোনও দেবদূত কিংবা পরির মতন।
চোখদুটি তোমার তুষারাবৃত তারার আলোক;
তোমার হৃদয় উত্তপ্ত, শীতল―
সত্যি বলো তো, কে বলেছে তোমাকে ‘ভালোবাসি’ ?
‘মা, আ-আসি’―বলেই পলকে পালালো মেয়েটি।
(Robert Ranke Graves-এর A Frosty Night কবিতা অবলম্বনে)
সচিত্রকরণ : রজত



