আর্কাইভবিশেষ সংখ্যাবিশ্বসাহিত্য

অগ্নিবৃষ্টি : মূল :  বানু মোশতাক

বিশ্বসাহিত্য : অনূদিত গল্প

বাংলা অনুবাদ : মোশাররফ হোসেন

[বানু মুশতাক ভারতের কর্নাটক রাজ্যের একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক, আইনজীবী ও সামাজিক কর্মী। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি নারীর অভিজ্ঞতা, সমাজ ও ধর্মীয় কাঠামোর দ্বন্দ্ব এবং মানবিক সম্পর্কের সূক্ষ¥ টানাপোড়েনকে গভীর সংবেদনশীলতায় তুলে ধরেছেন। তাঁর ছোটগল্প সংকলন Heart Lamp-এর জন্য তিনি ২০২৫ সালে International Booker Prize অর্জন করেন―যা কোনও কার্নাড়া লেখকের জন্য প্রথম। তাঁর লেখায় বাস্তবতা ও কাব্যিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন দেখা যায়, যা আধুনিক ভারতীয় সাহিত্যে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।]

মসজিদ থেকে ফজরের আজানের ধ্বনি ভেসে আসতেই মুতাওয়াল্লি উসমান সাহেব বিছানায় উঠে বসলেন। তার পাশে স্ত্রী আরিফা নেই। ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখতে পেলেন―আরিফা এবং তাদের তিন বছরের ছেলে আনসার কার্পেটের উপর ঘুমিয়ে আছে। ছোট্ট আনসারের শ্বাসের ধরন অস্বাভাবিক। কপালের ওপরের ভেজা কাপড়, পাশে ছড়িয়ে থাকা দুধের বাটি, কাপ, চামচ, পানির জগ আর গরম পানির ফ্লাস্ক দেখে বুঝলেন কী হয়েছে। আরিফা নিশ্চয়ই সারা রাত জেগে ছিল, আর এখন ক্লান্তিতে ঘুমে ঢলে পড়েছে… অপরাধবোধে উসমানের বুক কেমন কেঁপে উঠল!

কিন্তু হঠাৎ মনে পড়ল তার সবচেয়ে ছোট বোন জামিলা আর তার স্বামী পাশের ঘরে ঘুমাচ্ছে। তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে ভাবলেন আরিফার ওপর একটা কম্বল দেবেন কি না, কিন্তু তারপর জামিলার স্বামীর কথা ভেবে ভ্রƒ আর শরীর দুই-ই কুঁচকে গেল, আর তিনি রূঢ়ভাবে আরিফাকে ধাক্কা দিলেন। ক্লান্ত ঘুম থেকে সে তৎক্ষণাৎ জেগে উঠল না দেখে উসমান সাহেবের রাগ আরও বেড়ে গেল।

এক ফকিরের গাওয়া পুরোনো একটা গান হঠাৎ তার মনে ভেসে উঠল―

‘হাঁড়িটা কোথায় রাখব বল,

মনে হাঁড়ি, ঘরে হাঁড়ি,

শরীরেও হাঁড়ি গরম হয়ে ওঠে।’

শূকরের মাংস যেমন হারাম, রাগও তেমন হারাম। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা বিশ্বাস করে শূকর দেখলেও তারা অপবিত্র হয়ে যায়। গানটার উপমা ছিল এই―রাগ যখন মনে, ঘরে, শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেই রাগই যেন শূকরের মতো অপবিত্র।

উসমান সাহেব নিজেও এককালে এই গান বহু গেয়েছেন। কিন্তু সেই সকালে অযৌক্তিক রাগের মুখে গানটা মিলিয়ে গেল। অধৈর্য হয়ে তিনি ছটফট করতে লাগলেন আর হঠাৎ যেন কিছু মনে পড়তেই রূঢ়ভাবে আরিফার পায়ে লাথি মারলেন। চমকে উঠে আরিফা সোজা হয়ে বসল।

ভেতরে গিয়ে ঘুমাতে পারো না ? কর্কশ গলায় জিজ্ঞেস করে উত্তরের অপেক্ষা না করেই তিনি বেরিয়ে গেলেন।

বাড়ি থেকে মসজিদ এক ফারলং (২২০ গজ বা ১ মাইলের ৮ ভাগের ১ ভাগ) দূরে। ভোরের কুয়াশা চিরে লম্বা পদক্ষেপে তিনি হাঁটছিলেন। দেহ চলছিল মসজিদের দিকে, কিন্তু মন বারবার ফিরে যাচ্ছিল বাড়ির ভেতর; গত রাতের দিকে।

তার সবচেয়ে প্রিয় ছোট বোন, যে বোনকে তিনি আদর-স্নেহে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়িয়েছেন, যে বোনকে পাঁচ বছর আগে বিয়েতে আঠারোটা রেশমি শাড়ি, সোনার গহনা, তার স্বামীর জন্য মোটরবাইক দিয়েছিলেন, সেই বোন এসে পারিবারিক সম্পত্তিতে ভাগ চাইছে! তার সম্মানে রান্না করা বিরিয়ানি আর সেমাই পায়েসের স্বাদও কাল রাতে তিক্ত লাগছিল।

উসমান সাহেবের বুক আবার জ্বলে উঠল―যেন ভেতরের রাগের আগুনে শরীর পুড়ে যাচ্ছে!

তার ওপর সে তর্কও শুরু করছিল―আন্না (কার্নাড়া ভাষায় ‘বড় ভাই’ বোঝাতে ব্যবহৃত সম্মানসূচক শব্দ), এই অংশটুকু আমার হক―আল্লাহ ও নবীর শরিয়তের বিধানেই এটা আমার অধিকার। তুমি যে সম্পত্তি পরিশ্রম করে নিজে অর্জন করেছো, আমি তো তার ভাগ চাইনি!

কী অর্জন করেছে সে ? তার নিজের কীই বা আছে ? সে তো কেবল বাবার রেখে যাওয়া সম্পদের দেখাশোনা করছে!

আমাদের বাবার সম্পত্তির এক-ষষ্ঠাংশ আমার।

ওহো! হিসেব করে এসেছে সব। উসমান সাহেবের মনে হয়েছিল―‘নাও তোমার সেই এক-ষষ্ঠাংশ,’ বলে গালে একটা চড় বসিয়ে দেন।

কিন্তু তিনি নিজেকে সামলে নিলেন, চেষ্টা করলেন শরীর দখল করা সেই ‘শূকরটাকে (রাগকে) থামাতে, যে পাগলের মতো ভেতরে লাফাচ্ছে। পাশেই ছয় ফুট লম্বা জামিলার স্বামী বসে ছিল, ঠিক যেন এক দেহরক্ষী।

জামিলা আবার বলল―তুমি মহল্লার এত ঝামেলা মেটাও, তুমি চাইলে আমায় ডেকে বলতে পারতে, ‘এই নাও তোমার অংশ।’ আমার কথা বাদ দাও, সাকিনা আক্কাকে (‘বড় বোন’ বোঝাতে ব্যবহৃত সম্মানসূচক শব্দ) দেখো―তার না আছে স্বামী, না উপার্জনক্ষম সন্তান। দুটো মেয়ের বিয়ে সে কীভাবে দেবে ?

মুতাওয়াল্লি সাহেব চুপচাপ মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলেন। অবিশ্বাস্য! শান্ত জামিলা আজ এত কিছু বলে যাচ্ছে! আর সে নীরব। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল―আমের বাগান, নারকেল-বন, তুলোর ক্ষেত, রেশমের পোকা লালন করার ঘর, আর শহরের ঝলমলে বাড়িগুলো। এই সবের কোনটা সে তার চার বোনকে ভাগ করে দেবে ?

একঘেয়ে ব্যাঙের মতো জামিলা তখনও কথা চালিয়ে যাচ্ছিল―আন্না, তুমি আমায় ভালো ঘরে বিয়ে দিয়েছো, তা আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু একটু ভেবে দেখো―বাবা মারা গেছেন দশ বছর হলো। যদি তখনই তুমি আমাকে আমার ভাগ দিতে, এতদিনে আমি আমার বিয়েতে তোমার যা খরচ হয়েছে তার দশ গুণ টাকা রোজগার করতে পারতাম। এখন আমি সেই সব টাকা চাইছি না। কিন্তু…

এই ‘কিন্তু’ শব্দটাই উসমান সাহেবের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিল। আরিফা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে উদ্বিগ্নভাবে এসব শুনছিল। তার মনে হলো জামিলার কথা, তার কণ্ঠস্বর আর তার যুক্তি―সবই দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু তার দাবি তো ন্যায্য, তাই না ? এটা কে অস্বীকার করতে পারে ? কফি বাগান আর যে বাড়ি থেকে মুতাওয়াল্লি সাহেব প্রতি মাসে চার হাজার টাকা ভাড়া পান―এই দুটো তো তার নিজের বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া সম্পত্তি। আরিফা তার ভাগ পেয়েছিল না চেয়েই। তার বাবা-মা তাকে আর মুতাওয়াল্লি সাহেবকে তাদের বাড়িতে ডেকে নিয়ে, ভালো করে খাওয়া-দাওয়া করিয়ে, নতুন জামা-কাপড় উপহার দিয়ে, তার নামে হস্তান্তর করা সম্পত্তির দলিল তুলে দিয়েছিল। আর জামিলাকে এখন এই অধিকারের জন্য লড়তে হচ্ছে।

মুতাওয়াল্লি সাহেব একটিও কথা বললেন না। গোঙানির মতো একটা শব্দ করে উঠে দাঁড়ালেন আর এক অচেনা দৃষ্টিতে জামিলার দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন শূন্যতার মধ্যে কিছু খুঁজছেন। বড় ভাইকে এভাবে দেখে সে একটু ভয় পেল। কিন্তু পরক্ষণেই স্বামীর দিকে এক পলক তাকিয়ে একটু সাহসও পেল। বুকে জোর এনে, মুখস্থ করা কথার মতো দ্রুত বলল―তুমি যদি শরিয়ত অনুযায়ী আমার প্রাপ্যটা না দাও, তাহলে আমি আদালতের মাধ্যমে তা নিতে বাধ্য হব।

বাকরুদ্ধ হয়ে মুতাওয়াল্লি সাহেব তাড়াতাড়ি তার শোবার ঘরে চলে গেলেন; তার রাগান্বিত পদক্ষেপে ভয় পেয়ে আরিফা দ্রুত পাশে সরে গিয়ে পথ ছেড়ে দিল।

তিনি মূর্তির মতো বিছানায় বসে রইলেন, টুপি খোলারও কষ্ট করলেন না। কপালে ঘামের মুক্তা জমে উঠলে আরিফা চুপচাপ পাখা চালু করে দিল।

ঘটনার এসব খুঁটিনাটি তার মনের ভেতর দিয়ে বয়ে গেল। শীতকাল বলে মসজিদের পেছনের অজুখানায় গরম পানি ফুটানো হচ্ছিল। অভ্যাসবশত তিনি অজু করলেন, নামাজও পড়লেন। দেহ পরিষ্কার হলো, কিন্তু মন জ্বলছিল আগুনে।

একদিকে জামিলার ধৃষ্টতা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল, অন্যদিকে সম্পত্তি ভাগ করার যন্ত্রণা। তার আসল চিন্তা এখন কীভাবে বোনকে শাস্তি দিয়ে সব সম্পত্তি নিজের হাতে রাখা যায়।

মসজিদটা ছিল বিশাল, চারপাশে খোলা আঙিনা। ফজরের নামাজে আঙুলে গোনা যায় এমন অল্প লোক আসে―তাদের মধ্যে তার ঘনিষ্ঠ কেউ নেই। বাধ্য হয়েই তিনি ঘরের দিকে ফিরতে শুরু করলেন।

কিন্তু তার মন এখনই ঘরে ফিরতে চাইছিল না। ধীরে ধীরে পা ফেলে তিনি যখন শহরের চত্বরে এসে পৌঁছালেন, মদিনা হোটেলের দরজা ততক্ষণে খুলে গেছে। ভেতরে ঢুকে এক কাপ চা খেলেন, কিন্তু মনের বোঝা নামল না। উদাস মনে হোটেল থেকে বেরিয়ে চত্বরের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন, যেখানে ট্রাফিক পুলিশ দাঁড়ায়। কিন্তু তিনি বাঁশি বাজালেন না, গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণও করলেন না। চারদিকে তাকালেন, যেন কোন দিকে যাবেন ঠিক করতে পারছেন না―তার চেহারা ছিল বড় অসহায়।

তখনই একটা অসম্ভব ঘটনা ঘটল।

ধপ! একটা শব্দ হলো। কিছু বুঝে উঠার আগেই রাস্তার ওপরের বিদ্যুতের তার থেকে একটা কাক পড়ে গেল―যেভাবে গাছ থেকে শুকনো পাতা ঝরে পড়ে। মুতাওয়াল্লি সাহেব কয়েক গজ দূর থেকে এটা দেখে চলে যেতে উদ্যত হলেন, কিন্তু হঠাৎ আরেকটা কাক কোথা থেকে উড়ে এসে ডাকতে শুরু করল, কা কা। শব্দটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। যেন জাদুর মতো কাকেরা জমা হতে লাগল। তার মনে হলো কিছু কাকের ডাকে ছিল বিলাপ। কিছু ডাক শোনাচ্ছিল ক্রুদ্ধ, হিংস্র। কিছু শোনাচ্ছিল অলস―যেন বাধ্য হয়ে ডাকছে। কিছু ডাক শোনাচ্ছিল গভীর অভিশাপের দীর্ঘশ্বাসের মতো, কিছু মুক্তির উল্লাসের তূর্যধ্বনির মতো, আবার কিছু আনন্দ-আহ্বানের মতো। নানা রকম অনুভূতি তার ভেতরে জাগতে শুরু করলে তিনি সেখান থেকে সরে যেতে চাইলেন। কাকেরা তার মাথার চারপাশে ঘুরতে লাগল―যেন আক্রমণ করবে। দিশেহারা হয়ে এক পা এগিয়ে গেলেন। চোখের কোণে সেই নিথর কাকটা। আরে! এই দুর্ভেদ্য কালোর ভেতরে কি এত রংধনু লুকিয়ে ছিল!

অন্যমনস্ক হয়ে বাড়ি ফিরে বেডরুমে ঢুকতে ঢুকতে মুতাওয়াল্লি সাহেবের ঘুম পাচ্ছিল। আরিফা তখন ঘরকন্নার কাজে ব্যস্ত―অসুস্থ সন্তানের দেখভাল করতে হচ্ছে, অন্য ছেলেমেয়েদের জন্য নাশতা, দুপুরের খাবার, স্কুলের ব্যাগ, জুতা-মোজা তৈরি রাখতে হচ্ছে; জামিলা আর তার স্বামীর জন্য বিশেষ খাবার পাকাতে হচ্ছে। সে চাইছিল না বাড়ির মেয়ে অভিমান করে, অসন্তুষ্ট হয়ে বাপের বাড়ি ছেড়ে যাক। তার মায়ের বলা একটা কথা মনে পড়ল: ‘হকদার তরসে তো আঙ্গার কা নুহ বরসে’… যার হক আছে, সে যদি নারাজ হয়, তবে আগুনের বৃষ্টি নামে।

আগের রাতে সে মুতাওয়াল্লি সাহেবকে নরম ফিসফিসে কণ্ঠে বলেছিল―শোনো, ঘরের মেয়েকে কষ্ট দিও না। কোরআন শরিফে তো সাফ সাফ লেখা আছে যে বাবার সম্পত্তিতে মেয়ে সন্তানের হক আছে, তাই না ? তোমার চার বোনকে ডাক, যা দেওয়ার দরকার তা দিয়ে হাত ঝেড়ে ফেলো। আল্লাহ পাক আমাদের যা থাকবে তাতেই বরকত দেবেন।

আরিফা সচরাচর তাকে উপদেশ দিত না। কিন্তু ভেতরে ভয় থাকলেও এই কথাটা সে বলেই ফেলেছিল। মুতাওয়াল্লি সাহেব শত শত ফয়সালা করে এসেছেন; এমন কী কথা নতুন করে তাকে বলার আছে যা তিনি আগে থেকেই জানেন না ? বোরখাপরা, তুচ্ছ এক নারীর কথা কেন তিনি সহ্য করবেন ?

চুপ করো আর নিজের কাজ করো, বলে ধমক দিয়ে তিনি শুয়ে পড়ে নাক ডেকে ঘুমাতে লাগলেন।

আরিফা রুটি বেলছিল, মনটা ভীষণ অস্থির। ইয়া পরওয়ারদিগার, ওকে একটু সুবুদ্ধি দাও, মনে মনে প্রার্থনা করল। একটু আগেই সে আনসারের কপালে ভেজা কাপড় দিয়ে এসেছে। যান্ত্রিকভাবে ময়দা বেলতে বেলতে আর তাওয়ায় রুটি উলটে-পালটে দিতে দিতেই তার মনে হলো আনসার কষ্ট পাচ্ছে―তাড়াতাড়ি সে হলঘরে ছুটে গেল যেখানে ছেলেটাকে শুইয়ে রেখেছিল।

তখনই সেই মহিলাকে আরিফা দেখতে পেল। বোরখা পরা, নেকাব দিয়ে মুখ ঢাকা হলেও তাকে মুহূর্তেই চিনে ফেলল। একসময় যে বোরখা কালো ছিল, এখন তা পুরোনো হয়ে ফ্যাকাসে বাদামি হয়ে গেছে, বোরখার ছেঁড়া জায়গা দিয়ে একটা ময়লা শাড়ি উঁকি মারছে। ফাটা গোড়ালি, বিবর্ণ চামড়া, সেফটি পিন দিয়ে জোড়া দেওয়া হাওয়াই চপ্পল―এক নজরেই আরিফা মহিলার দশা বুঝে ফেলল এবং তার জন্য লজ্জা অনুভব করল। মহিলাটা ভেতরে ঢুকল না, বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল―যেখানে মুতাওয়াল্লি সাহেবের সাথে দেখা করতে আসা আরও অনেক পুরুষ দাঁড়িয়ে ছিল। কোনায় দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাকে দেখে আরিফার গলায় একটা দলা আটকে এল। বসার ঘর আর বারান্দার মাঝখানের পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে সে ফিসফিস করে বলল―যেন শুধু ওই মহিলার কানেই পৌঁছায়। সাকিনা আক্কা, ওখানে কেন দাঁড়িয়ে আছেন ? মিনতি করছি, ভেতরে আসুন।

নেকাবের আড়াল থেকে আরিফা মহিলার মুখের ভাব দেখতে পেল না―সে শুনেছে কি না বোঝার উপায় নেই। কিন্তু তার পাশে দাঁড়ানো যুবকটা প্রায় নিষ্ঠুর স্বরে জবাব দিল। ঠিক আছে মামি, আপনি গিয়ে আপনার কাজ করুন। মামা এলে আমরা কথা বলে চলে যাব।

সাকিনা ছিল তার বড় ননদ, প্রচণ্ড আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এক নারী। বিধবা হওয়ার পর তিন সন্তান মানুষ করার জন্য, সংসার চালানোর জন্য সে সেলাই-এর কাজ শুরু করেছিল। ভাইয়ের বাড়ি থেকে এক ফোঁটা পানিও নেওয়ার বাসনা তার ছিল না। মাঝেমধ্যে ঈদ-পরবে এসে বড় ভাইয়ের দোয়া নিয়ে যেত। আজকে সে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে অন্যদের সাথে―যেন পরের মানুষ। আরিফার মনে হলো, জামিলার মতো সেও কি সম্পত্তির ভাগ চাইতে এসেছে ? কিন্তু তাড়াতাড়ি সেই ভাবনা মন থেকে সরিয়ে দিয়ে আবার সাকিনাকে ডাকল ভেতরে আসতে। স্বামী বেরিয়ে আসার আগে কোনওভাবে সাকিনাকে অন্তত ঘরে এনে বসানোর তার এই চেষ্টা বৃথা গেল।

শরীর ভারী লাগছিল, কিন্তু মুতাওয়াল্লি সাহেবের ঘুম ভালো হয়েছে। আরিফাকে দেখে অবাক হলেন―আগে কখনও সে এমনটা করেনি, বারান্দার লোকজনের দিকে উঁকি মেরে দেখছে, বাইরের কাউকে ইশারা করছে। মুতাওয়াল্লি সাহেব নিজেও বুঝতে পারলেন না যে তার গলার স্বর তীক্ষè হয়ে উঠল―‘আরিফাআআআ ?’

হতভম্ব হয়ে আরিফা পর্দা ফেলে দিল আর বিড়বিড় করল, যেন নিজেকেই বলছে―সাকিনা আক্কা ওখানে পুরুষদের সাথে দাঁড়িয়ে আছে, যেন বাইরের মানুষ। তাই ভেতরে আসতে বলছিলাম।

‘কী ?’ মুতাওয়াল্লি সাহেব বাইরে এসে যখন সাকিনা আর তার ছেলেকে দেখলেন, তার মুখে রক্ত ছুটে এল।

সাকিনা দুই হাত জোড় করল আর এক অদ্ভুত সুরে তার আবেদন পেশ করল: ভাইসাব, আমার মতো এক অসহায় বিধবাকে সাহায্য করুন। আল্লাহ পাক আপনাকে আর আপনার পরিবারকে সুখ-শান্তি দেবেন। আমার ছেলে বিএ ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছে। একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে তত্ত্বাবধায়ক পদে চাকরির জন্য তার একটা ইন্টারভিউ আছে। শুনলাম আপনি ওই কলেজ কমিটির সদস্য। আমার ছেলের নাম সৈয়দ আবরার। দয়া করে ওকে এই চাকরিটা পাইয়ে দিন। আবেদনপত্র এই যে, দেখুন। আমার ছেলে যদি এই চাকরিটা পায়, আমার মতো দুর্ভাগিনীর ঘরে জন্মেও সে আমাদের পরিবারের খুঁটি হয়ে দাঁড়াবে। সবাই বলে আপনি একটা কথা বললেই ওর চাকরি হয়ে যাবে। আপনি তো গরিব মানুষের সুখ-দুঃখের সাথী। আমার প্রতি রহম করুন। মুতাওয়াল্লি সাহেব কোনও কথা বলার আগেই সে চাকরির আবেদনপত্র তার হাতে ধরিয়ে দিল, পায়ে পড়ল আর তাড়াতাড়ি চলে গেল।

মুতাওয়াল্লি সাহেবের মনের ভেতরে কাকেরা চিৎকার করতে লাগল। মুখ আরও লাল হয়ে উঠল। ঠান্ডা আবহাওয়াতেও কপালে ঘামের মুক্তো জমে উঠল। মোটা গদিওয়ালা একটা চেয়ারে ধপাস করে তিনি বসে পড়লেন। পর্দার আড়ালে আরিফার চোখে তখন অশ্রুধারা বইছে।

দরজার কাছেই এক যুবতী দাঁড়িয়ে ছিল, বুকের সাথে শক্ত করে একটি শিশুকে জড়িয়ে রেখেছে। মাথার ঘোমটা ঠিক করে সে একটু সরে গিয়ে বলল, আন্না, এই শিশুর বাবার একটা গরুর গাড়ি ছিল। পনেরো দিন আগে তার একটা অপারেশন হয়েছে। অপারেশন করাতে গিয়ে গাড়ি আর গরু দুটোই বিক্রি করে দিয়েছি। এখন নাকি জরুরি আরেকটা অপারেশন করা লাগবে! ডাক্তার সাহেব তাই বলছেন। আমার কাছে এখন আর কিছু নেই। আপনি… আপনি… তার কথা আটকে গেল, চোখ ঝাপসা হয়ে এল। হেঁচকি তুলে সে কাঁদতে লাগল।

মুতাওয়াল্লি সাহেব তাকে হাসপাতালের নাম, ডাক্তারের নাম আর অন্যান্য খুঁটিনাটি জিজ্ঞেস করে বললেন, তার স্বামীর অপারেশনের ব্যবস্থা তিনি করে দেবেন। মনের গভীর থেকে দোয়া করতে করতে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে যুবতী চলে গেল।

এক স্কুলছাত্র তার সামনে খাতা বাড়িয়ে দিল। হায়ার প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা তার গোল গোল হাতের লেখায় মুতাওয়াল্লি সাহেবকে দয়া করে বিকেল তিনটায় স্কুল উন্নয়ন কমিটির বৈঠকে আসতে অনুরোধ করেছেন। তিনি খাতায় সই করে ছেলেটাকে পাঠিয়ে দিয়ে পুরুষদের দিকে ঘুরে তাদের সমস্যা শোনার জন্য যাচ্ছিলেন―ঠিক তখনই ঝড়ের মতো ঢুকে পড়ল দাউদ।

দাউদ ছিল তার ডান হাত। নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের মতোই সে তার কাছে অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। তাদের চিন্তা একই পথে চলে―এটাই ছিল তাদের বন্ধুত্বের প্রমাণ। মুতাওয়াল্লি সাহেবের মুখের উঠানামা, ভ্রƒর নড়াচড়ার দ্রাঘিমাংশ-অক্ষাংশ, গোঁফের কম্পন, নাকের রেখা আর মুখের কোণের দাগ থেকে তার মেজাজ বুঝে নেওয়ায় সে ছিল পারদর্শী। সে অনুযায়ী সে তার কথাবার্তা, আচরণ, কোমরের বাঁক বদলে নিত। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ছিল চালাক, নির্লজ্জ আর আত্মমর্যাদাহীন। তো তারপর…

সে ফজরের নামাজে হাজির হয়নি। জানোয়ারটা এখন এসেছে ? কোথায় ছিল এতক্ষণ, কে জানে… দাঁত কিড়মিড় করলেও মুতাওয়াল্লি শান্ত থাকার ভান করে জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় গিয়েছিলে দাউদ ? তোমাকে তো কোথাও দেখলাম না!

দাউদ তার প্রশ্ন আর ভঙ্গি দুইই বুঝল। মনে মনে হাসলেও মুখে বলল, আসসালামু আলাইকুম, মুতাওয়াল্লি সাহেব, আর মিথ্যা ভদ্রতা দেখিয়ে বসে পড়ল।

মুতাওয়াল্লি সাহেব শুধু মসজিদ কমিটির সভাপতিই ছিলেন না, রাজনীতিতেও জড়িত ছিলেন। তার মনে এই ভ্রম ছিল যে তিনি যে প্রার্থীকে সমর্থন করবেন, সব মুসলমানকে তার পক্ষে ভোট দেওয়াতে পারবেন। অনেক উচ্চাভিলাষী প্রার্থী তাকে বিশ্বাস করত আর প্রায়ই দেখা করতে আসত। এই কারণেই সকালবেলা তার বাড়িতে অনেকে জড়ো হয়। এমনকি সাকিনাও তার সাহায্য চেয়েছে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে, বড় ভাই হিসেবে নয়। সে পরের মানুষের মতো আচরণ করেছে আর তাকে কষ্টও দিয়েছে। মুতাওয়াল্লি সাহেব বারান্দার লোকজনের দিকে তাকালেন।

এখনও অনেকে তার সাথে কথা বলার অপেক্ষায় বসে আছে। কিন্তু দাউদের সাথে তার জরুরি কাজ আছে। বেঞ্চিতে বসা অস্থির মানুষগুলোর দিকে তিনি আবার তাকালেন আর উঠে দাঁড়ানোর জন্য নড়ে উঠলেন। এসময় বৃদ্ধ সাবজান হোঁচট খেয়ে সামনে এগিয়ে এল, সাদা হয়ে যাওয়া ভ্রƒ আর ছানি পড়া ঝাপসা চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে। সাহেব, সাহেব… আমার ছোট মেয়ের বিয়ে আগামী সপ্তাহে। আমার কাছে কোনও টাকা নেই। আপনাকে একটু দয়া করতেই হবে। ওর বিয়ে হয়ে গেলে আমি শান্তিতে চোখ বুজতে পারব। বাবা! আপনি আমার বাবার মতো… আমার মতো এক বুড়োর প্রতি রহম করতেই হবে, বলতে বলতেই মুতাওয়াল্লি সাহেবের পায়ে পড়তে যাচ্ছিল।

আহা! এত ছেলেমেয়ে হয়েছে তোমার। শেষ মেয়ে, বলছো ? ষাট বছর বয়সে পেয়েছিলে নাকি ? শেষমেশ লাইনে এসেছ তো। মুতাওয়াল্লির মনের এক কোণে এক শয়তান কিক্কিরি করে হেসে উঠল। তিনি একটা বড় খোলা জমির ছবি মনে এঁকে ফেললেন, মাঝখানে একটা ভাঙাচোরা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। যতবার ওই জমির পাশ দিয়ে যান, ততবার সেখানে একটা শপিং কমপ্লেক্স বানানোর স্বপ্ন দেখেন।

কোনও দয়া না দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন―আমার কাছে এখন কী চাও সাবজান চিক্কাপ্পা ? (কার্নাড়া ভাষায় বাবার ছোট ভাইকে ডাকার জন্য ব্যবহৃত একটি সম্মানসূচক শব্দ)

কিছু বেশি না… থতমত খেয়ে সাবজান এক মুহূর্ত থামল; তারপর বলতে লাগল―আল্লাহ পাকের রহমত আপনার ওপর বর্ষিত হোক… আমি… আমি… এই বিয়ের জন্য অন্তত চল্লিশ হাজার টাকা লাগবে।

মুতাওয়াল্লি সাহেব অবাক হবার ভান করলেন।

চল্লিশ হাজার টাকা… কোথায় পাব এত টাকা ? বলেই তিনি যেন গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন। দাউদ আস্তে করে কাশল।

আন্না… একটা ব্যাপার… ভাবলাম আপনাকে জানাই… যদি একটু সময় থাকে… না, যখন ভাবি, দুনিয়াটা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে… আইন, নৈতিকতা, ধর্ম এসবের কিছু বাকি আছে নাকি ?

হুম। কী হয়েছে, দাউদ ?

আপনি এই ব্যাপারটা জানেন না ? সত্যি ?

কারও কাছ থেকে কোনও উত্তর না পেয়ে দাউদ বলতে শুরু করল, ইসলাম ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আন্না… মুসলমানদের আর কোনও ইজ্জত নেই…

তার ভূমিকা ছিল দীর্ঘ।

সোজাসাপটা বলবে কী হয়েছে ? বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন মুতাওয়াল্লি সাহেব।

আন্না, আপনি তো উমরকে চিনেন, ঘোড়ার নাল বানায় যে ? তার দ্বিতীয় মেয়ের বিয়ে হয়েছিল নেলামাঙ্গলার কারও সাথে, তাই না, কিন্তু ছেলেটা আগেই আরেকটা মেয়েকে বিয়ে করেছিল, মনে আছে ? যাই হোক, প্রথম স্ত্রীর বড় ভাই―

কে সে ? ক্রমশ বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন মুতাওয়াল্লি সাহেব। সম্পর্কের জট খোলার ধৈর্য তার ছিল না।

তার নাম নিসার, একজন রংমিস্ত্রি। মসজিদ রং করবে বলে দুইশ টাকা নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল, মনে আছে, গত রমজানে ?

আহ, হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে।

এবার সব মনে পড়ে গেল মুতাওয়াল্লি সাহেবের। মনে পড়ল রংমিস্ত্রিকে গাছের সাথে বেঁধে মসজিদের টাকা খাওয়ার জন্য মারধর করার কথা।

সে পুকুরে পড়ে মরে গেছে, দেড় মাস আগে লাশ পাওয়া গিয়েছিল। পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে।

হুম। তারপর কী হলো ?

কী আবার হবে। সব তছনছ হয়ে গেছে। পুলিশ নিসারের লাশ নিয়ে হিন্দু কবরস্থানে কবর দিয়ে দিয়েছে।

দাউদ ধীরে ধীরে খবরটা জানাল, আর সেটা ছিল গুলি খাওয়ার মতো। এটা কি সত্যি হতে পারে ? এমন কথা কেউ কখনও শুনেছে ? এক মুহূর্তের জন্য মুতাওয়াল্লি সাহেবের মনে হলো তার হৃদয় থেমে গেছে। কপালে ভাঁজ পড়ল, ঘাম ছুটে এল। সবাই ভুলে গেল কী কাজে এখানে এসেছিল, এমনকি সাবজানও। মনের গভীরে কুরে কুরে খেলেও সে তার মেয়ের বিয়ের কথা আর উল্লেখ করল না। খবরটা সবাইকে কাঁপিয়ে দিয়েছে।

ভাবা যায়! একজন মুসলমানের লাশ―কাফন ছাড়া, গোসল ছাড়া, এমনকি জানাজার নামাজ ছাড়া, কবরস্থানে না দিয়ে শ্মশানে অনাড়ম্বরভাবে পুঁতে দেওয়া হলো! মুতাওয়াল্লি সাহেবের মনে একটা কথা এল। কিন্তু দাউদ, নিসারের খতনা হয়নি নাকি ?

এই প্রশ্নের উত্তর দাউদের কাছে ছিল না।

ছিঃ ছিঃ… না হয়ে ছিল নাকি ? কিন্তু পুলিশ এসব ভাববে কেন ? লাশ পুঁতে দিয়ে হাত ঝেড়ে ফেলতে চেয়েছিল, ব্যস।

তারা কীভাবে জানল এটা নিসারের লাশ ?

নিখোঁজ হওয়ার বেশ কিছুদিন পর তার বউ পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে গিয়েছিল। পুলিশ তাকে অচেনা লাশের গায়ের কাপড় দেখালে সে চিনে ফেলল। তারপর লাশের ছবি দেখাল। ফুলে গিয়েছিল, কিন্তু নিসারই ছিল। আর পুলিশ ইচ্ছে করেই এটা করেছে। এই মসজিদে এসে যদি বলত আমাদের একজনের লাশ পাওয়া গেছে, আমরা মুহূর্তেই লাশ নিয়ে এসে সঠিকভাবে কবর দিতাম, এটা কি তারা জানে না!

পরক্ষণেই দাউদ একটু সন্দেহের সুরে বলল: আমি যতদূর জানি, ওই গোলমাল পাকানো শঙ্করই পুলিশকে বলে লাশটা হিন্দু শ্মশানে পুঁতে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে।

সেখানে উপস্থিত সবাই মর্মাহত হলো। ছি! কী ভয়ঙ্কর সময় এসেছে। এখানে কারও মৃত্যু হলে হাজারে হাজারে কাঁধ লাশ কবরস্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। আর এই বেচারা একটা কাফন আর ভালো কবরও পেল না।

বছরে দুইবার―রমজান আর বকরি ঈদের নামাজ ছাড়া নিসার কখনও মসজিদে পা দেয়নি। বাড়ি রং করার টাকা অগ্রিম নিয়ে তারপর উধাও হয়ে শত শত মানুষকে ঠকিয়েছে। টাকা দিয়ে মদ খেয়ে টলতে টলতে ঘুরে বেড়াত। এমনকি একবার মসজিদ রং করবে বলে জামাতের টাকাও খেয়ে ফেলেছিল। কিন্তু এখন, যাদের সে ঠকিয়েছিল তাদের কাছেই যেন তাকে সঠিকভাবে কবর দেওয়াটা সবচেয়ে পবিত্র কর্তব্য হয়ে উঠেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, নিসারের লাশের জন্য সঠিক দাফনের ব্যবস্থা করাটা মুতাওয়াল্লির কাছে অনেক সমস্যার সমাধান বলে মনে হলো। তিনি যন্ত্রণায় কাতর হওয়ার ভান করলেন, বিলাপ করলেন। ‘কী করা যাবে ? মানুষকে তার করা পাপের ফল ভোগ করতেই হয়।’ দাউদসহ সেখানে জড়ো হওয়া সব মানুষ ঘটে যাওয়া দুঃখজনক ঘটনাটার কথা ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল।

তওবা, তওবা! সাবজান নিজের গালে চপেটাঘাত করল। মৃত্যু তো সবার জন্য অবধারিত। কিন্তু এমন ভয়ঙ্কর মৃত্যু কারও হওয়া উচিত নয়। নবীজির প্রশংসা নেই, সালাম নেই। কাল আমাদের লাশও কেউ পুঁতে দেবে, যেখানে খুশি, যেমন খুশি।

দাউদ এই সুযোগ হাতছাড়া করল না―মুতাওয়াল্লি সাহেব, আপনি আছেন বলেই আর আমাদের পথ দেখান বলেই আমরা এখনও মানুষ হয়ে আছি―শাহ বানুর মামলায় তারা কোরআন শরিফ নিয়ে আদালতে গিয়েছিল, আর সেটাকেই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বড় করে বারবার আমাদের অপমান করতে লাগল। আর এখন মুসলমানদের লাশ নিয়ে হিন্দু শ্মশানে পুঁতে দিচ্ছে ? এর চেয়ে বড় অন্যায় আর কী হতে পারে ?

দাউদ এটাকে একটা গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখতে শুরু করল। সবাই অস্থির হয়ে পড়ল, এমনকি মুতাওয়াল্লি সাহেবও। তিনি দাড়ি মোচড়ালেন, মাঝেমধ্যে নাকে আঙুল ঢোকালেন, আর গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে বসে রইলেন। হঠাৎ সজাগ হয়ে চারপাশের মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে মুখ কুঁচকে ফেললেন―যেন অসম্ভব দুঃখ পেয়েছেন! চোখ সরু করে খুলে কেশে গলা পরিষ্কার করে নিলেন।

বিষয়টা এত জটিল ছিল যে এমনকি আরিফাও ছেলেমেয়েদের স্কুলের জন্য তৈরি করার বদলে পর্দার আড়ালে এসে দাঁড়াল। একটু দেরিতে ঘুম থেকে উঠে জামিলা আরিফার সাথে ফিসফিস করে কথা বলে কী হয়েছে জেনে নিল আর ভাবির সাথে পর্দার পেছনে যোগ দিল। তাদের নারীহৃদয় দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছিল।

ইয়া আল্লাহ! যেই হোক না কেন, বেচারার আত্মা শান্তি পাক। একজন মুসলমান লাশের যা পাওয়া উচিত সেই সব রীতি তাকে দেওয়া হোক আর কবরস্থানে সে তিন গজ জমি পাক।

জামিলার স্বামীও খবরটা জানতে পেরে বাইরে অন্যদের সাথে এসে দাঁড়াল। সবাই উদ্বিগ্ন, উত্তেজিত। ইসলাম রক্ষার জন্য পবিত্র যুদ্ধ করার উৎসাহ বেড়ে উঠল। অবশেষে মুতাওয়াল্লি সাহেব কথা বলা শুরু করলেন।

এখন আমাদের সব শক্তি দিয়ে চেষ্টা করতে হবে নিসারের দেহাবশেষ ওখান থেকে তুলে এনে এখানে কবর দিতে। যে কোনও বাধা, যে কোনও সমস্যার মোকাবিলা করতে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে, বুঝলে ? দাউদ, আমাদের যুব কমিটিকে খবর দাও। তারা এলে একসাথে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারের সাথে দেখা করতে যাব। আজই কাজ শুরু করতে হবে! বলেই তাড়াতাড়ি যোগ করলেন: তাদের বলো অন্য কিছু নিয়ে চিন্তা না করতে। এই মুহূর্তে জামাতে টাকা নেই, যা খরচ হবে তা আমি নিজে দেব বলে দাও।

তিনি জানতেন এই কাজের ফলে যে জনপ্রিয়তা আর সমর্থন তিনি পাবেন তার তুলনায় যা খরচ হবে তা কিছুই না। মুতাওয়াল্লি হিসেবে এরকম কথা বলা তার মর্যাদার সাথেও মানানসই। টাকা আবার কোথায় যাবে ? তার অভিজ্ঞতা বলে, এই ধরনের কাজে টাকা দিতে মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে। তিনি এটাকে যুব কমিটিকে কাছে টেনে আনার এক বিরাট সুযোগ হিসেবেও দেখলেন―যারা আগে তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করে দূরে সরে গিয়েছিল।

সব তার প্রত্যাশা অনুযায়ী ঘটল। তিনি ভাবনা থেকে বেরোনোর আগেই জামিলার স্বামী পকেট থেকে আড়াইশ টাকা বের করে তার সামনের টেবিলে রেখে দিল। মন থেকে বলল―ভাইয়া, এটা যদি আপনি কাজে লাগান, তাহলে আমিও নেকির সওয়াব পাব। আল্লাহ পাক আপনার মতো মানুষদের আরও শক্তি, সুস্বাস্থ্য আর অর্থ দান করুন। তার মনে হলো এত বড় কাজ সামনে থাকতে বউকে দিয়ে সম্পত্তির ভাগ চাওয়াটা ঠিক নয়।

পর্দার আড়াল থেকে স্বামীর ভাবভঙ্গি লক্ষ করে জামিলা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সে বড় ভাইয়ের কাছে সম্পত্তির ভাগ চেয়েছিল শুধু স্বামীর চাপে, নিজের ইচ্ছেয় নয়। সে খুশি হলো যে বিষয়টা আপাতত চাপা পড়ে গেল।

আরিফা তার স্বামীকে নিয়ে খুব গর্ব অনুভব করল। ভাবল, না খেয়ে তাকে এই হিমালয়সম কাজে যেতে হবে, তাই ছুটে গিয়ে ফুলের মতো হালকা পরোটা বানাতে লাগল। মুতাওয়াল্লি সাহেব বোন আর তার স্বামীর পরিবর্তিত আচরণ দেখে মনে মনে হাসলেন, যদিও তা প্রকাশ করলেন না―বরং গম্ভীরভাবে ঘরের ভেতরে ঢুকলেন, যেন গভীর চিন্তায় মগ্ন।

বেশ কয়েকজন যুবককে সাথে নিয়ে তিনি প্রথমে জেলা প্রশাসকের সাথে দেখা করলেন। জেলা প্রশাসক ছিলেন একজন বাঙালি ব্রাহ্মণ যুবক; জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট। জেলার ভেতরের সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের জটিল জট আর মাঝেমধ্যে যে আবেগের বিস্ফোরণ ঘটে তার সাথে তিনি পরিচিত ছিলেন। মুতাওয়াল্লির দেওয়া চিঠি পড়েই পরিস্থিতি বুঝতে পেরে ভেতরে ভেতরে হাসলেও গম্ভীর, মর্যাদাপূর্ণ মুখ নিয়ে বসে রইলেন। মুতাওয়াল্লি সাহেবের উদ্দীপ্ত কথা শুনে ঘুরিয়ে উর্দুতে প্রশ্ন করলেন―এ আর নতুন কী, মুতাওয়াল্লি সাহেব ? আপনার এলাকায় নতুন নলকূপ বা স্কুল ভবন মেরামত বা এরকম অন্য কোনও কাজের জন্য তো কখনও আমার কাছে আসেননি।

মুতাওয়াল্লি তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিলেন। এসবের একটা তালিকা বানিয়ে পরের বার আবার আসব স্বামীজি;  এখন যদি একটা আদেশ দিয়ে দেন, এটুকুই যথেষ্ট।

তবুও মুতাওয়াল্লি সাহেব, মাটি তো সব জায়গায় একই, তাই না ? মাটিতে কী তফাত ? খুব স্বাভাবিকভাবে তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

মুতাওয়াল্লির কাছে তার জন্য বেশ কিছু অপ্রাসঙ্গিক উত্তর ছিল, কিন্তু সেগুলো শোনার আগেই জেলা প্রশাসক তার সহকারীকে একটা আদেশ জারি করতে বললেন।

পনেরো দিন কেটে গেল। মুতাওয়াল্লি সাহেব ক্লান্ত হলেন না, যদিও এক অফিসার থেকে আরেক অফিসার, এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে যেতে হলো। এমনকি সাথে যারা আসত তাদের জন্য মাঝেমধ্যে কফি আর নাশতা কিনতেও তিনি দ্বিধা করলেন না।

কুখ্যাত শঙ্করের পক্ষ থেকে তেমন বাধা আসছে না দেখে তিনি একটু হতাশ হলেন, তবে পুলিশ আর কর্মকর্তারা যথেষ্ট দেরি করাল।

মুতাওয়াল্লি সাহেব সারা দিন বিভিন্ন অফিসে ঘুরতেন তারপর গভীর রাত পর্যন্ত আলোচনা চালাতেন―হয় মসজিদের উঠোনে বা মদিনা হোটেলের বড় হলরুমে বা তার বাড়ির বারান্দায়। তিনি কত পরিশ্রম করছেন তা সবাইকে বর্ণনা করে শোনাতেন। পরিকল্পনা করতেন কীভাবে আর কোথায় কোন অফিসারের ক্ষমতা খর্ব করতে হবে। বিভিন্ন দিক থেকে ইসলামের প্রতি নানা বিপদের কথা বর্ণনা করতেন আর যুবকদের উপদেশ দিতেন কীভাবে এই সমস্যাগুলো কার্যকরভাবে সমাধান করা যায়। বুঝতেই পারলেন না কত দ্রুত এভাবে পনেরো দিন কেটে গেল। পুরো জামাত নিসারের লাশ আর মুতাওয়াল্লি সাহেবের প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছু নিয়ে আলোচনা করছিল না। বেশ কয়েকজন মহিলা পুরো নেকাব পরে নামাজ পড়ে মন থেকে দোয়া করলেন যেন নিসারের লাশের সৌভাগ্য হয় মুসলিম কবরস্থানে কবর পাওয়ার, আর তার আত্মা চিরশান্তি পায়।

এই মহৎ কাজের জন্য অনেক টাকা সংগ্রহ হলো। অবশেষে নিসারের লাশ তোলা হলো। মুতাওয়াল্লি আর তার অনুসারীরা পচে যাওয়া লাশটাকে তাদের সাথে আনা নতুন, মাড় দেওয়া কাফনে জড়ালেন। লাশ এতটাই পচে গিয়েছিল যে গোসল দেওয়া সম্ভব নয়, তাই গোলাপ জল ছিটিয়ে দেওয়া হলো। দুর্গন্ধে বমি আসার মতো অবস্থা হলেও কেউ মুখে তা প্রকাশ করল না। পুলিশরা রুমাল দিয়ে নাক ঢাকল। শেষমেশ মুতাওয়াল্লি আর তার সঙ্গীরা কাঁধে করে নিসারের জানাজার শোভাযাত্রা শুরু করল। পচা মাংসের গন্ধ ঢাকতে তারা প্রচুর আতর ঢেলে দিয়েছিল আর কাফনকে জুঁই ফুলের মালার চাদরে ঢেকে দিয়েছিল। জুঁই ফুলের একটা কুঁড়িও ফোটেনি। ‘হর ফুল কে কিসমত মেঁ কাহাঁ নাজ―এ-আরুস, চন্দ ফুল তো খিলতে হ্যায় মাজারোঁ কে লিয়ে’: সব ফুলের ভাগ্যে কনের সাজ নেই; কিছু ফুল শুধু মাজারের জন্য ফোটে।

লাশ নিয়ে বেশ দূরে যেতে হবে, তবু অনেক মানুষ জড়ো হয়েছিল। খাটিয়া কারও কাঁধে এক-দুই মিনিটের বেশি থাকল না, হাতে হাতে বদলাতে থাকল। শোভাযাত্রাটি শহরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলল, সামনের মোড় ঘুরলেই কবরস্থান। হয়তো আর দশ কদম যাওয়ার বাকি আছে, ঠিক তখনই একজন মানুষ হোঁচট খেয়ে এগিয়ে এল। এক অদ্ভুত, নোংরা ভঙ্গিতে গলার জোরে অশ্লীল গালিগালাজ করতে লাগল যেন পুরো পরিস্থিতির গাম্ভীর্য আর দুঃখকে সে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিতে চায়। মানুষটাকে দেখার সাথে সাথে মুতাওয়াল্লি সাহেব, যিনি খাটিয়ার সামনের দিকে কাঁধ দিয়েছিলেন, হতভম্ব হয়ে গেলেন। তার মুখ মৃতের মতো ফ্যাকাসে হয়ে গেল। শোভাযাত্রার আরও অনেকে একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাল। কেউ এক পা-ও এগোল না, সবার গলা শুকিয়ে গেল। মানুষটা আরও কিছু গালিগালাজ করে একটা ছোট গলি দিয়ে টলতে টলতে উধাও হয়ে গেল।

মুতাওয়াল্লি সাহেব সবার আগে নিজেকে সামলে নিয়ে সতর্ক চোখে পুলিশদের দিকে তাকালেন। কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে সেজন্য শোভাযাত্রার সাথে কিছু পুলিশ ছিল। শোভাযাত্রা থেমে যেতে দেখে একজন পুলিশ এগিয়ে গিয়ে মাতালটাকে লাঠি দিয়ে ভয় দেখাচ্ছিল। মুতাওয়াল্লি সাহেব ধীরে একটা পা ফেললেন, জামাত তাকে অনুসরণ করল। মুতাওয়াল্লি সাহেবের পা কাঁপতে শুরু করল। কেউ এসে খাটিয়ার সামনের দিকে তার জায়গা বদলে নিল। মুতাওয়াল্লি সাহেব রুমাল বের করে মুখ থেকে গড়িয়ে পড়া ঘাম মুছলেন। দাউদের দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকালেন, সে মাথা নিচু করে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। অনেকে চোখে চোখে কথা বলছিল কিন্তু মুখে কেউ কিছু বলল না; বরং সবাই লম্বা লম্বা পা ফেলে কবরস্থানে পৌঁছে গেল।

পুলিশ বাইরে দাঁড়িয়ে রইল আর লাশটা যথাযথভাবে মুসলিম কবরস্থানে কবর দেওয়া হলো। মুতাওয়াল্লি সাহেবের মাথার শিরা ফেটে যাওয়ার উপক্রম; কার লাশ তারা কবর দিল ?

কোনও সন্দেহ নেই যে মাতালটা ছিল রংমিস্ত্রি নিসার। দাউদ আর রংমিস্ত্রির বউয়ের প্রতি তিনি এতটাই রাগান্বিত হলেন যে তাদের কুপিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলতে ইচ্ছা করল। কিন্তু তার একটা সান্ত্বনা ছিল: যদিও জামাতের অনেকে নিসারকে চিনে ফেলেছিল, তাদের একজনও পুলিশকে জানায়নি। সবাই তার ইজ্জত রক্ষা করেছে। কিন্তু ক্ষণিকের স্বস্তি তখনই মিলিয়ে গেল। হাজারে হাজারে কাক ‘কা কা’ চিৎকার করে তার মগজ ঠুকরে খেতে শুরু করল। এটা কি হিন্দু লাশ ? এটা কি মুসলমান লাশ ? লাশটা এতটাই পচে গিয়েছিল যে চেনা যায় না। এখানে পচবে, নাকি ওখানে পচবে ?

মানুষেরা তাড়াতাড়ি কবর ভরাট করছিল। কবর দেবার কাজ পুরোপুরি শেষ হবার অপেক্ষা না করেই তিনি বাড়ির দিকে ছুটলেন। তিনি একা ছিলেন―কিন্তু কাকেরা ছিল, তার মাথার ভেতরে আঘাত করছে আর তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে।

অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে তিনি বাড়ির বসার ঘরে গিয়ে বসলেন। কয়েক মিনিট পরেও যখন আরিফাকে দেখলেন না, উদ্বিগ্ন হয়ে ডাকলেন, আরিফাআআআ! এক গ্লাস পানি নিয়ে এসো।

মেয়েকে বেরিয়ে আসতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, আজ স্কুলে যাওনি কেন ?

আম্মা তো বাড়িতে নেই, না ? তাই থেকে গেলাম।

বাড়িতে নেই ? কোথায় গেছে ?

মেয়েটা চোখের পাতা তুলল―কাঁদতে কাঁদতে লাল হয়ে যাওয়া চোখ―জবাব দিল―আনসার তো খুব অসুস্থ, তাই না আব্বা ? আম্মা তার সাথে হাসপাতালে আছে।

হুহ ? কী বললে ? কে অসুস্থ ? কবে থেকে ? কী অসুখ ?

একের পর এক প্রশ্ন আসতে থাকায় মেয়েটার চোখ থেকে ভারী অশ্রু ঝরতে লাগল।

আনসারের তো গত পনেরো-বিশ দিন ধরে খুব জ্বর ছিল, তাই না ? ডাক্তার বলছিল মাথার কোনও অসুখ। মেনিনজাইটিস নামে কোনও রোগ নাকি। সে অবিরাম কাঁদতে শুরু করল।

মুতাওয়াল্লি সাহেবের হাত থেকে পানির গ্লাস পিছলে পড়ে গেল।

ধীরে ধীরে তার কানে কিছু শব্দ প্রবেশ করতে লাগল―আন্না, সম্পত্তিতে আমার ভাগ; আন্না, এই গরিব বিধবাকে সাহায্য করুন; বাবা, আমার মেয়ের বিয়ের জন্য ধার দিন; হকদার তরসে তো আঙ্গার কা নুহ বরসে… অগ্নিবৃষ্টি… কাক, কালো, ধূসর… তাদের ভেতরের রংধনু…

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button