সময়ের বিশ্বস্ত চিত্রকর : আবিদ আনোয়ার : শেখর ইমতিয়াজ

প্রচ্ছদ রচনা : চিত্রকল্পের কবি আবিদ আনোয়ার
সময় এবং সংরাগের বিশ্বস্ত চিত্রকর কবি আবিদ আনোয়ার। বিষয় ও গঠনশৈলি―কাব্যশিল্পের এই উভয়বিধ কারুমিতির সম্পূরণ নিয়ে আবিদ আনোয়ারের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রতিবিম্বের মমি প্রকাশ পেয়েছে আমাদের কাব্য-ইতিহাসের আরেকটি সফল সংযোজনচিহ্ন হিসেবে।
কবিতা আবেগের ফেনিল সংলাপ নয়, ব্যক্তিগত উল্লাসের এল-চিৎকার নয়, কবিতার কাছে দাবি থাকে আরও কিছু বেশি অনুধ্যান, আরও অধিক তীব্রতা যেখানে উপস্থাপিত হবে প্রাজ্ঞ-চেতনার গাণিতিক এবং পিনদ্ধ উদ্ভাস। আবিদ আনোয়ার তা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছেন। বিষযবস্তুর দেশজ সততার সঙ্গে ছন্দ, উপমা, চিত্রকল্প প্রভৃতির সম্মিলনে নির্মিত হয়েছে এ-গ্রন্থের প্রতিটি কবিতা।
অভিজ্ঞতা, অনুভূতি এবং অনুশীলনের বৈচিত্র্য আবিদ আনোয়ারকে সাম্প্রতিক বাংলা কাব্যধারায় স্বতন্ত্র পরিচয়ে চিহ্নিত করবে―এটা আমরা প্রতিবিম্বের মমি কাব্যগ্রন্থ পাঠে নিশ্চিত হতে পারি। আত্মদ্রোহ এবং আত্মঘৃণার স্মারকলিপি হিসেবে পাচ্ছি মোট চুয়াল্লিশটি কবিতা, যেসব কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে মানবিক ইতিনেতির দ্বন্দ্ব ও সমাধানের জীবনায়নাভাস।
গ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘কবলিত মানচিত্রে’তে আমরা কবির বোধ এবং বিশ্বাসের পরিচয় পাই। কাল, ভূগোল এবং মানবিক মূল্যবোধ যেখানে নষ্টামির করতলবফন্দ, সেখানেও কবি বিস্তৃত বিশ্বাসের অঙ্গীকার উচ্চারণ করেন―
‘আমারও মগজে বসে
কদাকার চঞ্চু ঠোকে শতকের চিল
তবু কোনো অন্তর্গত বাঁচার আবেগে
আমি ঠিকই সেরে উঠি
দুর্ঘটনাকবলিত পেশীর নিয়মে
… …
স্বপ্নখেকো সময়ের বীভৎস থাবার পাশে
অবাক জ¦ালিয়ে রাখি ব্যক্তিগত চাঁদের পূর্ণিমা।’
(কবলিত মানচিত্রে)
তবে, জীবনের প্রতি ইতিময় বিশ্বাস কিংবা বোধের অসুস্থতার চেয়ে জীবনের অসহায়ত্ব, আকাক্সক্ষার বিনাশ এবং অস্তিত্বের আর্তনাদ কবির কাছে প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। ‘উত্তর-পুরুষ’, ‘কবি’, ‘ভ্রমণ-বৃত্তান্ত’, ‘নন্দনতত্ত্ব’, ‘ডারউইনীয় রক্তের ভেতরে’, ‘মেটাডর’, ‘ঐশ্বরিক’, ‘রমিজের বন্ধ্যা কুকুরী’, ‘গ্রাস’, বেঁচেবর্তে আছি’―এসব কবিতা পাঠের পর পাঠককে জীবন সম্পর্কে একটা ভয়ঙ্কর বিষণ্ন বোধের দ্বারা আক্রান্ত হতে হয়। জীবনের এমনিতর নির্মমতা পাঠককে রীতিমতো আন্দোলিত করে তোলে; জীবনের অপূর্ণতাগুলো পাঠকের চেতনাকে আঘাত করে। কবি আবিদ আনোয়ারের সার্থকতা এখানেই। কালান্তক সময়কবলিত মানচিত্রে বিপুল জনগোষ্ঠীর আর্তনাদ কবির কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে―
‘আমাদের সুপ্রাচীন আবিলাবর্তে
সংহতির কানামাছি খেলে-খেলে এভাবে সবাই
মোটামুটি বেঁচেবর্তে আছি…’
(বেঁচেবর্তে আছি)
কবির যাপিত জীবনের অর্থহীনতা নিয়ে কবি উপহাস করেছেন ‘কবি’ নামক কবিতায়। গ্রামবাংলার লোকবিশ্বাসের পারম্পর্য, জীবনের অপচয়, প্রজ্ঞার অসারত্ব নিয়ে একটি অসাধারণ কবিতা নির্মাণ করেছেন কবি আবিদ আনোয়ার। একজন কবির জীবনের সামগ্রিক আয়োজনকে তিনি বিদ্রƒপ করেছেন এভাবে―
‘এদিকে দরগার চেয়ে আরো বেশি রহস্যখচিত পরীর কাঁকালে
ছেলে তার ঘোরে-ফেরে; ঘুমে নয়, স্বপ্নে নয়, নেহাত সকালে
দেখে সূর্য ভেঙে খানখান―কেঁপে ওঠে গোপন সন্ত্রাসে;
কখনো নিজেরই কবরের পাশে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে হাসে!’
(কবি)
অস্থির জীবনের এই এল-পদপাতের উচ্চারণই তো আজকের কবিতার আটপৌরে বিষয়বস্তু। আবিদ আনোয়ারও সে-সবকেই তাঁর কবিতার শরীরে ধারণ করেছেন। কিন্তু কীভাবে কেমন করে নির্মাণ করেছেন তিনি তাঁর কবিতার শরীর ? এই প্রশ্নের জবাবের মধ্যেই আবিদ আনোয়ারের স্বাতন্ত্র্য, সার্থকতা এবং দক্ষতা নিহিত রয়েছে। পরাবাস্তববোধ থেকে নির্মিত যে-কয়টি কবিতা এ-গ্রন্থে রয়েছে সে-কয়টির মধ্যেই কবির শক্তি যথার্থভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ‘নন্দনতত্ত্ব’, ‘ডারউইনীয় রক্তের ভেতরে’, ‘অ্যাক্যুরিয়াম’, ‘বোঝাপড়া’, ‘হাত’, এমনি আরও কিছু কবিতা রয়েছে যা বাংলা কবিতার ইতিহাসে উল্লেখযোগ্যতার দাবি রাখে।
আবিদ আনোয়ারের কবিতার গঠনশৈলি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে শুধু এটুক বলা যায়: কাব্যশিল্পের অলঙ্কারের প্রতি তাঁর আছে আধুনিক কলাপ্রকৌশলগত পরিমিতিবোধ। গ্রন্থের প্রতিটি কবিতা থেকেই উদাহরণ দেওয়া যায় যার সংখ্যা হবে প্রচুর। উপমা, রূপক, বিশেষ করে চিত্রকল্প নির্মাণে আবিদ আনোয়ারের দক্ষতা সত্যিই উল্লেখযোগ্য। তাঁর কবিতা লৌকিক-অলৌকিক পটজমিনের সেলুলয়েডে গৃহীত চিত্রাবলির মুখোমুখি করে পাঠককে। এদিক থেকে আমরা আবিদ আনোয়ারকে চিত্রকল্পের রূপকার ব’লে আখ্যায়িত করতে পারি।
আজাদ সাহিত্য মজলিস, ১৭ মে ১৯৮৫



