আর্কাইভগল্প

শরীফার জাদুবাস্তবতা : আবিদ আনোয়ার

আবার পড়ি : তাঁর গল্প

শরীফার কাছে আজকাল প্রশ্নবোধক চিহ্নকে মনে হয় সাপের মতো! উত্তরের অপেক্ষায় ক্যামন যেন ফণা তুলে রাখে! কে এই চিহ্ন বানিয়েছিল শরীফা জানে না। পৃথিবীর সব ভাষাতেই আছে! সাপের সাথে এর আকারগত সাদৃশ্যের চেয়েও স্বভাবগত সাদৃশ্য বেশি! এ-কথা শরীফা হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছে গত কয়েক মাসে! সাপের স্বভাব ছোবল মারা। প্রশ্নও ছোবল মারে, ঠোকরায়! ছোবলে-ঠোকরে জর্জরিত করে ফেলে চৈতন্যকে। সঠিক উত্তর পেলে বিষ কমে আসে। নেতিয়ে পড়ে ফণা এবং চলে যায় অন্য কোথাও! কোনও কোনওটি আবারও ফিরে আসে ভিন্ন কোনও উত্তরের অপেক্ষায়!

আজকাল বই পড়তে গেলে কোনও প্রশ্নবোধক চিহ্ন দেখলেই শরীফা থেমে যায়। চোখ নিবদ্ধ হয় সেই চিহ্নের ওপর। বইয়ের পাতা থেকে হিলহিল-করে লিকলিকে সাপের মতো সেই চিহ্ন ঢুকে পড়ে তার চোখে! চোখ-দিয়ে ঢুকে যায় মাথার ভেতর! ক মাস থেকে এইসব সর্পচিহ্ন হানা দিচ্ছে তার মনে। মানুষের মন কি মাথায়-না-বুকে থাকে শরীফা বুঝতে পারে না। তার শুধু মনে হয় প্রশ্নবোধক চিহ্ন নামের এক বিশাল সর্পবাহিনী তাকে তাড়িয়ে ফিরছে অহরহ! ঢুকে যাচ্ছে বুকে-মাথায় সবখানে। আজকাল এমনও হয়: এগুলোকে শরীফা ধরতেও চায়! জানালা দিয়ে হুরহুর করে মশার মতো ঢোকে! একসঙ্গে হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি! কখনও-কখনও সবগুলো মিলে এক হয়ে যায়। কিন্তু স্বভাব বদলায় না! সাপের আদলেই দলবদ্ধ হয়! এরা সবাই মিলে বিশাল এক ফণা তৈরি করে, আর তা তুলে দংশন করতে থাকে তার চার-চৈতন্যকে!

তিন মাস থেকে শরীফা যাচ্ছে শহরের কামেল পীর হজরত সাইফুল্লাহ মাহমুদ ফারায়েজীর দরবারে। উদ্দেশ্য হুজুরের দোয়ায় সন্তান লাভ। লোকমুখে শুনেছে, পত্রিকায় দেখেছে, হুজুরের অলৌকিক ক্ষমতার কথা। শুনেছে ডাক্তার-বৈদ্য- ঝাড়-ফুঁক সব ব্যর্থ হয়েছে কিন্তু পীর বাবার দরবার থেকে কেউ খালি-পেটে ফিরে আসেনি! সন্তানহীনতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েছে কত নারী। জীবন বেজে উঠেছে নতুন সুরে! মাতৃত্বের গৌরবে! সেই গৌরব রাষ্ট্র করার জন্য অনেকেই সাক্ষাৎকার ছাপাচ্ছে পত্র-পত্রিকায়।

পীর সাহেবের মূল মুরিদান শহরের গণ্যমান্য ধনাঢ্য ব্যক্তিগণ। দেশের রাজনৈতিক নেতাদের প্রায় সবাই তার মুরিদ। এমনকি একজন প্রেসিডেন্টও ছিলেন তাঁর দারুণ ভক্ত। ঘন ঘন যাতায়াত করতেন হুজুরের দরবারে। দিনরাত মুরিদের ভিড়ে গমগম করছে তাঁর পবিত্র দরবার শরিফ। ভেতরে আছে বিশ্রামের ব্যবস্থা। গরিব শ্রেণির লোকেরা তাঁর মুরিদ-হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। সমাজের মাথাই যেখানে ‘ঠাঁই পায় না’ স্থানাভাবের কারণে সেখানে সাধারণের প্রবেশ উন্মুক্ত-হওয়া সমীচীন নয়! অবশ্য সন্তানপ্রত্যাশী বন্ধ্যা নারীদের সেবাদান কর্মসূচি সবার জন্যই উন্মুক্ত। অনেকে বলেন, হুজুর এসবের প্রশ্রয় দিতে চান না। হুজুরের দোয়ার সর্বজনীন ব্যবহার নিশ্চিত করতে তাঁর সাগরেদগণ এই পার্শ্ব-প্রকল্প চালিয়ে যাচ্ছে!

শরীফা প্রথম দিন গিয়েছিল স্বামীর সঙ্গে। শাশুড়িও সঙ্গে ছিল। হুজুরের বিধান: স্বামী-স্ত্রীকে একসঙ্গে চাই, অন্তত প্রথম দিন। একজন বাঙালি নারী সন্তান নেবে অথচ স্বামীর সম্মতি নাই তা হতে পারে না! অন্য কারও না-হোক, অন্তত স্বামীর সম্মতি না-পেলে হুজুর দোয়া দিবেন না। প্রথম দিনের পর আর স্বামীর প্রয়োজন নাই। একা আসাই ভালো! দোয়া-দরুদ সারতে সময় লাগে বেশ! আসলে প্রথম দিনের পর অনেক স্বামী নিজেই আর আসেন না। লজ্জা বলে কথা! লোকে বাঁজা-রমণীর মুখ দেখুক ক্ষতি নাই! কিন্তু আঁটকুড়ে পুরুষের মুখ না-দেখানোই ভালো!   

হুজুরের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের কথা শরীফা ভুলবে না কোনওদিন। তাঁর কথা শুনে শরীর কাঁপছিল থরথর করে! জিভ শুকিয়ে কাঠ-হয়ে গিয়েছিল। ডাক্তারের চেম্বারের বাইরে যেমন ওয়েটিং রুম থাকে হুজুরের দরবারেও একই ব্যবস্থা। শ-রী-ফা বে-গ-ম…প্রায় ক্কারির মতো সুরেলা উচ্চারণে কে একজন তার নাম-ধরে ডেকে উঠল! মন্ত্রমুগ্ধের মতো হুজুরের কক্ষে দুরু দুরু পায়ে প্রবেশ করল শরীফা। হুজুর আপাদমস্তক তাকে দেখে নিলেন। শরীফা নিচু-মুখে মেঝেয়-পাতা দামী কার্পেটের কারুকাজ দেখছিল।

হুজুর জিজ্ঞেস করলেন: ‘বিয়ে হয়েছে কয় বছর ?’

প্রায় চারবছর, হুজুর।

পেটে বাচ্চা এসে নষ্ট হয়েছে কখনও ?

না, হুজুর।

ডাক্তারি পরীক্ষা হয়েছে ?

হয়েছে, ডাক্তার বলেছে কোনও অসুবিধা নাই, তবু হচ্ছে না।

কার অসুবিধা নাই, তোমার নিজের না স্বামীর ?

দু জনেরই।

তাহলে হয় না কেন ?

শরীফা অবাক হয়! হুজুর এসব কী বলছেন! শরীফা বলতে গেলে শিক্ষিত মেয়ে। বিজ্ঞানের ছাত্রী ছিল। আবশ্যিক বিষয় ছিল বায়োলজি। তাদের বায়োলজি কাজ করছে না বলেই তো এখানে আসা। হুজুরের কথাবার্তা শুনেই শরীফা বুঝেছিল তিনি উচ্চশিক্ষিত। শরীফার স্বামী আলী আসগরকে ডাকা হলো। হুজুর বললেন: ‘আপনারা পালক সন্তান নিলেই পারেন।’

আলী আসগর বললেন: ‘পালক সন্তান কি আর নিজের সন্তানের মতো, হুজুর!’

দুজনকেই অবাক করে দিয়ে হুজুর বললেন: ‘আমার দরবার থেকে সন্তান নিলে আপনার নিজের মনে করবেন কী করে ? আপনার স্ত্রী গর্ভে ধারণ করবে বলেই কী আপনার হয়ে যাবে ?’ আলী আসগর আর শরীফা হুজুরের কথার কোনও অর্থ খুঁজে পেল না। লজ্জা পেয়ে চুপ-করে রইল। হুজুর আলী আসগরকে বললেন: ‘আপনি যান, আপনার স্ত্রীকে আমার আরও কিছু গোপন কথা জিজ্ঞেস করার আছে। আপনার সামনে হয়তো সব কথা বলবে না।’

আলী আসগর নিঃশব্দে হুজুরের কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

তাকিয়া ঠিক-করে হুজুর নড়েচড়ে আরাম-করে বসলেন। শরীফাকে জিজ্ঞেস করলেন: ‘তোমার পড়াশোনা কতদূর ?’

ইন্টারমিডিয়েট বিজ্ঞান বিভাগ।

তোমার স্বামীর পড়াশোনা ?

বিএসসি।

সন্তান না-হলে অসুবিধা কী ?

যার সন্তান নাই কেবল সে-ই জানে, হুজুর! জীবনকে ব্যর্থ মনে হয়। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা, বিশেষ করে আমার শাশুড়ি আমার স্বামীকে আবার বিয়ে-করতে বলে!

বিয়ে করুক!

আমি মানতে পারি না, হুজুর! আমার স্বামীর সঙ্গে অন্য কেউ ঘর করবে ভাবতে পারি না!

আমার দোয়ার ওপর তোমার নিজের, তোমার স্বামীর ও শাশুড়ির বিশ্বাস কতটা ?

অনেক হজুর।

ওদের বিশ্বাসের কথা তুমি জানলে কী করে ?

ওরাই তো আমাকে এখানে নিয়ে আসল। বিশ্বাস না-থাকলে আনবে কেন ?

দোয়া-ই-জাহের.. .. ..

কী বললেন, হুজুর ?

হুজুর কিছু কথা বলছেন। শরীফা শুনে যাচ্ছে। তাকে উদ্দেশ্য করে নাকি আপনমনেই বলে চলেছেন ঠিক বোঝা যাচ্ছে না! মাঝেমাঝে চোখ বন্ধ-করে তিনি উপরের দিকে তাকাচ্ছেন আর বলে চলেছেন: “আল্লাহ সর্বশক্তিমান। পুরুষ তার শক্তির নিশানা। তিনি তাঁর প্রতিটি বান্দাকে প্রথম দুনিয়াতে পাঠান পুরুষের ঔরসে। স্ত্রী-জাতিকে তার সন্তান নিতে হয় পুরুষের ঔরস থেকে। একমাত্র ঈসা নবীকে তিনি জন্ম দিয়েছিলেন পুরুষের ঔরস ছাড়াই! পুরুষের স্পর্শ ছাড়া দুনিয়াতে আর কোনও স্ত্রীলোক গর্ভবতী হয় নাই!  আমি দোয়া করব আল্লাহ যেন তোমার সন্তানকে তোমার স্বামীর ঔরসে পাঠান। কিন্তু যদি এমন হয় তোমার স্বামীর কোনও অসুবিধার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না, তবে তুমি কি অন্য কারও ঔরস থেকে সন্তান নেওয়ার জন্য রাজি আছো ?”

শরীফার সারা শরীর কেঁপে উঠল! চোখের সামনে নড়ে উঠল পাগড়ি-পরা হুজুরের সৌম্যমূর্তি! নড়ে উঠল হুজুরের খাসমহল! প্রচণ্ড শব্দে বাইরে কোথাও ফেটে গেছে কারও গাড়ির টায়ার। ভুসভুস শব্দ-করে বাতাস বেরোবার শব্দ আসছে। সেই শব্দের সঙ্গেই শরীফার মুখ থেকেও অস্পষ্ট স্বরে বেরোলো: ‘কথাটা বুঝলাম না, হুজুর!’

হুজুর বললেন: ‘না-বোঝার কিছু নাই! তুমি ভালোই বুঝেছ। কথা পরিষ্কার! আমার দরবারে মানুষের অভাব নাই! সবাই শহরের গণ্যমান্য লোক! ভালো ঔরস, তো ভালো সন্তান! আজ চলে যাও। ভেবেচিন্তে মন-চাইলে আবার আইস! আমার সঙ্গে আর দেখা করার দরকার নাই। ৪ নম্বর রুমে মৌলানা ফৈজুল্লাহ আছেন। তোমাকে সব বুঝিয়ে দিবেন। এটি ‘দোয়া-ই-জাহের’-এর পদ্ধতি। এতে অসুবিধা থাকলে ‘দোয়া-ই-বাতেন’ আছে! তোমার নিরাশ-হওয়ার কিছু নাই!

শরীফার ইচ্ছে জাগে হুজুরকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেয় ‘দোয়া-ই-বাতেন’ কীরকম! কিন্তু সে-মুহূর্তে তার জিভ লেগে-ছিল তালুতে! সারা মুখে এক বিন্দুও পানি নাই! শরীরের সমস্ত শক্তি ব্যয়-করে চেঁচিয়ে উঠলেও তার মুখ থেকে কোনও শব্দ বেরুবে না, শরীফা বুঝতে পারে।       

হুজুরের কক্ষে ঢোকার সময় শরীফা আদবের সঙ্গে তাঁকে সালাম দিয়েছিল। বের-হবার সময় সালাম দিতে ভুলে গেল। মনে হলো শরীরের কোনও ওজন নাই। কে যেন তার দুই পা আগলে-ধরে তাকে হাঁটিয়ে-নিয়ে চলেছে! দরজার এপাশে আসতেই গোল টুপি-পরা একজন এগিয়ে এসে বলল: “আমার নাম মৌলানা ফৈজুল্লাহ। আপনার জন্য কোন দোয়া! ‘জাহের’ না ‘বাতেন’ ? হুজুর কি আপনাকে আমার সঙ্গে কথা বলতে বলেছেন ? এই ফরমে দস্তখত দিতে হবে আপনাকে ও আপনার স্বামীকে। আপনার স্বামী দস্তখত দিয়ে দিয়েছেন। আপনার দস্তখত দরকার।” শরীফা তার কথার কোনও উত্তর না-দিয়ে হঠাৎ বলে উঠল: পানি!

সেখানেই সোফায়-বসে শরীফার স্বামী আলী আসগর আর তার শাশুড়ি অপেক্ষায় ছিল। পানি-খেয়ে শরীফা ইশারায় তাদের বেরিয়ে আসতে বলল তার সঙ্গে। মৌলানা ফৈজুল্লাহ আপন-মনে বলে উঠলেন: দোয়া-ই-বাতেন!

শরীফা যখন হুজুরের কক্ষে তখন তার স্বামী ও শাশুড়ি মৌলানা ফৈজুল্লাহর কাছ থেকে জেনে নিয়েছে হুজুরের দোয়া গ্রহণের সব নিয়ম-কানুন। তবে ‘জাহের’ ও ‘বাতেন’-এর প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে। তিনি বলেছেন: “যেহেতু ঢাকা শহরেই বাড়ি সপ্তাহে তিনদিন আসলে ভালো হয় মাসিকের দিনগুলো বাদ দিয়ে। মাসিকের সময় শরীর থাকে অপবিত্র। তাই, হুজুরের দরবারে প্রবেশ নিষেধ। যত বেশি আসা যাবে দোয়াও কাজ করবে তত বেশি। কারও-কারও তিন মাসেই কাজ হয়ে যায়। কারও-কারও বছর পার হয়ে যায়। যারা কম-কম আসে তাদের জন্যই বেশি সময় লাগে।” এসব জানা হয়ে গেছে বলেই আলী আসগর ও তার মা ফেরার পথে কোনও প্রশ্ন করেনি শরীফাকে।

শরীফার মনোরাজ্যে এখন ঝড় বইছে! এক-এক সময় ভাবে: সে তার স্বামীকে বলে দিবে সবকিছু! আসগর আলী তাকে ভালোবাসে পাগলের মতো। সন্তান নাই বলে তার তেমন দুঃখ নাই। দুঃখ কেবল তার নিজের, আর দুঃখে কাতর হয়ে আছে তার শাশুড়ি। বুড়ি বিয়ান দিয়েছে ছয়-ছয়টা। আলী আসগর পাঁচ নম্বর। ভাইবোন সবাই বিবাহিত এবং উচ্চ ফলনশীল। অনুর্বর কেবল আলী আসগর ও শরীফার সংসার। শরীফার দুঃখ দেখে আলী আসগর তাকে অনেক দিন বলেছে: “জানো শরীফা, তুমি মা হওনি বলেই আজও এত রূপ-যৌবন টিকে আছে তোমার। তোমার অনেক বান্ধবীকে দেখো! মা-হয়ে কেমন বুড়িয়ে গেছে অল্পবয়সেই। তুমি বুঝবে না পুরুষ-মানুষের কাছে স্ত্রীর রূপ-যৌবন কতটা মূল্যবান। আমার কোনও দুঃখ নাই, শরীফা! সন্তান হয় হোক, না-হলে নাই!” শরীফা জানে বুড়ি শাশুড়িও তাকে ভালোবাসে তার রূপের কারণেই।

শেষমেশ শরীফা ভাবে: হুজুরের কথা স্বামীকে বলে লাভ কী ? দোর্দণ্ড প্রতাপশালী এই হুজুরের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত-হয়ে কে জানে তার স্বামী কী কাণ্ড করে বসে! শত-শত আলী আসগর ও শরীফা বেগমকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে হুজুরের মুরিদবাহিনী। সবচেয়ে বড় কথা শরীফা যা বুঝেছে তা-ই কি সত্য! এমনও হতে পারে হুজুর তার বিশ্বাস পরীক্ষা করার জন্য হেঁয়ালিপূর্ণ এসব কথা বলেছেন! দোয়া-ই-বাতেন কীরকম তা জানার আগে শরীফার উচিত নয় কারও কাছে কিছু প্রকাশ করা! শরীফাকে জানতেই হবে দোয়া-ই-বাতেন কোন পদ্ধতিতে কাজ করে!

বার বার প্রশ্নবিদ্ধ হলেও হুজুরের দরবার এক দুর্বার আকর্ষণে টানছে শরীফাকে। দোয়া-ই-বাতেন কি তাহলে কাজ করতে শুরু করেছে শরীফার সত্তায়! 

শরীফাকে অপেক্ষা করতে হলো না। শাশুড়িই তাকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলল। শরীফা ঠিক করল আসগরের এক ছুটির দিনে তাকে সঙ্গে-করে আবারও যাবে হুজুরের দরবারে। কিন্তু আলী আসগর শেষমেশ যায়নি। মাকে ডেকে বলল: ‘মা, তুমি শরীফাকে নিয়ে যাও!’

২.

শরীফাকে মনে রেখেছেন হুজুর। শরীফাকে একবার যে দেখেছে তার পক্ষে তাকে ভোলা খুব কঠিন! বললেন: “আবারও এলে তাহলে! আমি জানতাম তুমি আসবে। এখানে একবার যে পা-রাখে তাকে আসতেই হয়। এবার নিশ্চয়ই ভেবেচিন্তে এসেছ। বল জাহের-না-বাতেন! কোনপথে যাব, কোন দোয়া দিব ? তোমার সঙ্গে তোমার স্বামী এসেছেন ?”

শরীফা বলল: “জি না, শাশুড়ি এসেছেন।”

হুজুর একটু কড়া-মেজাজে বললেন: “তোমাকে আমি অনেক সময় দিয়েছি। এত সময় সবাইকে দিই না! ঝটপট সিদ্ধান্ত নিতে হবে তোমাকে।”

একঝাঁক প্রশ্নবোধক চিহ্ন আবারও একসঙ্গে ঢুকে-গেল শরীফার মাথায়! মাথা ও বুক টনটন করছে। প্রথম সাক্ষাতে শরীফার যতটা জড়তা ছিল তা এবার আর নাই। কিন্তু এক-মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ভেবে আবারও জড়তা এসে ভর করেছে! ইচ্ছে হলো জেনে নিতে দোয়া-ই বাতেন কীরকম পদ্ধতি! কিন্তু হুজুরের কী ঠেকা পড়েছে তাকে এত কিছু বুঝিয়ে-দেওয়ার! হজুর তো ভিজিট-নেওয়া ডাক্তার না! এসব কাজে হুজুর কোনও ভিজিট নেন না। টাকার তাঁর প্রয়োজনই নাই। তাঁর এস্টেট চালাচ্ছেন শহরের গণ্যমান্য ধনাঢ্য সব মুরিদ। মনের মকসুদ পুরা-করার জন্য যারা এখানে আসেন! ‘বাতেন’ পদ্ধতি কী তা জানার প্রয়োজন নাই! শরীফা ভাবে জাহেরের মতো না-হলেই হলো! এখান থেকে আর ফিরে-যাবারও উপায় নাই। স্বামী-শাশুড়ি দু জনেরই দৃঢ় বিশ্বাস হুজুরের দোয়া ব্যর্থ হবে না। শরীফা ফট-করে তার সিদ্ধান্ত জানাল: “দোয়া-ই-বাতেন, হুজুর!”

হুজুর বললেন: “আবারও ভেবে দেখো। এই পদ্ধতিতে আমার ফুঁক-দেওয়া শরবত খেতে হয়। লোকে বলে পড়া-শরবত। এই শরবত-খেয়ে একা-ঘরে পড়ে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। স্বপ্নের-ঘোরে বিরক্ত করবে জিনেরা। জিনের চেয়ে মানুষ ভালো! আবারও ভেবে দেখো!”

শরীফা কোনও কথা না-বলে শুধু না-সূচক মাথা নাড়ল। হুজুর বুঝলেন ‘বাতেন’ ছাড়া উপায় নাই। বললেন: “মৌলানা ফৈজুল্লাহর কাছে যে ফরম আছে তাতে দস্তখত দিয়ে চলে যাও! আগামী শনিবার সন্ধ্যায় আসবে যদি শরীর থাকে পবিত্র। তোমার প্রথম ‘ইত্তিছালের’ ব্যবস্থা-করে রাখব। না-আসতে পারলে অবশ্যই আগেভাগে জানিয়ে দিতে হবে। সেদিনের জন্য তোমার ইত্তিছাল বাতিল করা হবে। অন্য একজনের ইত্তিছালের ব্যবস্থা করব।”

৩.

শনিবার সন্ধ্যায় শাশুড়িকে নিয়ে শরীফা উপস্থিত হলো হুজুরের দরবারে। হুজুরের সঙ্গে তার সরাসরি সাক্ষাতের আর দরকার হবে না। কয়েক মাস কেবল দোয়া-ই-বাতেন-এর ইত্তিছাল চলবে। শাশুড়ির বিশ্রামের ব্যবস্থা হলো একটি কক্ষে। মৃদু মোমবাতি ও আগরবাতি-জ্বালানো অন্য একটি সুন্দর কক্ষ! শরীফাকে সেখানে নিয়ে গেলেন মৌলানা ফৈজুল্লাহ। কক্ষের প্রায় মাঝখানে-পাতা একটি বক্স-খাটে ধবধবে সাদা বিছানায় বসিয়ে দিলেন শরীফাকে। জিনেরা খুব শৌখিন প্রাণি! পরিষ্কার-পরিছন্ন পরিবেশ ছাড়া তাদের রোচে না। মোমবাতি ও আগরবাতি বস্তির ঘরকেও পবিত্রতা দেয়! হজরত সাইফুল্লাহ মাহমুদ ফারায়েজীর দরবার শরিফের এই শরিফ কক্ষটিকে তো বটেই! শরীফাকে পড়া-শরবত খাইয়ে দিলেন মৌলানা ফৈজুল্লাহ। খেতে হলো একটু-একটু-করে। পচা-পাতার গন্ধঅলা এই শরবত খেতে শরীফার সময় লাগল প্রায় পাঁচ মিনিট। শরীফাকে একলা-রেখে চলে গেলেন মৌলানা ফৈজুল্লাহ। মানসিক উত্তেজনায় শরীফা প্রায় নেশাগ্রস্তের মতো হয়ে গিয়েছিল এই শরবত-খাওয়ার আগেই। পড়া-শরবত খাওয়ার পর শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কাজ করে চলেছে দোয়া-ই-বাতেন! মনে হলো বক্স-খাট তাকে বিশাল এক দোলনার মতো দোলাচ্ছে। জাপান থেকে আমেরিকা! তাল সামলাতে না-পেরে শরীফা গা-এলিয়ে দিল খাটে। কিন্তু তাতেও দোলা কমছে না একটুও!

শরীফা দেখল দরজা-খুলে তার কক্ষে প্রবেশ করেছে এক মধ্যবয়সী জিন। ঢুকেই দরজা লাগিয়ে দিল। প্রথমেই হাত রাখল শরীফার মাথায়। আদরের ভঙ্গিতে গাল-টিপে দিল কিছুক্ষণ! তারপর জিনের দুই হাত দ্রুত চষে চলেছে শরীফার শরীরের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। ব্লাউজ খুলল আলী আসগরের মতো! শাড়ির ভেতরে হাত-ঢুকিয়ে শরীফার শরীরে হারিয়ে-যাওয়া কী যেন খুঁজে চলেছে ব্যতিব্যস্ত জিন। আদর করছে শরীফাকে! শরীফার মনে পড়ল: শহরের নানা হাসপাতালের গাইনি বিভাগে গোপন রুমে পুরুষ-ডাক্তারগুলো প্রায় এভাবেই তাকে পরীক্ষা করেছে গত কয়েক বছর! ব্লাউজ খুলে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেছে স্তনের বোঁটা কতটা লালচে-গোলাপি! যে-মেয়ের স্তনের বোঁটা লালচে-গোলাপী সে হয় নিঃসন্তান। টিপে দেখলেই যেন আসল রং ফুটে ওঠে ভালো! এক্স-রে দেখেও বোঝা যায়নি জরায়ুর অবস্থা! অনেক ডাক্তার তো যৌনাঙ্গে আঙুল-ঢুকিয়ে নেড়ে-দেখেছে জরায়ুর মুখ। তবে, জিনের পরীক্ষা একটু অন্যরকম। হাত চালাচ্ছে অনেকটা আলী আসগরের মতো! একটু পরেই জিন কামার্ত এক পুরুষের মতো হামলে পড়ল তার ওপর। চেঁচিয়ে উঠবে সে শক্তি নাই তার শরীরে। উদ্ধারের আশায় জিনকেই জড়িয়ে ধরল গভীর আগ্রহে। চোখ বন্ধ-করে রাখল। দেখতে পেল জিনের পাঁজায় চিৎ-শরীরে সওয়ার-হয়ে শরীফা পৌঁছে গেছে পৃথিবীর বাইরে মহাকাশের এক রাজ্যে। সেখানে কিলবিল করছে লক্ষ কোটি মানবশিশুর ভ্রƒণ! বায়োলজি-পড়া শরীফার কাছে এই প্রথমবারের মতো মনে হলো শিশুদের ভ্রƒণ নিজেও প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো!

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ                               

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button