
কোনও শিক্ষার্থী যদি আপনার কাছে একটি শব্দের অর্থ জানতে চায় তবে তার সহজ ও সঠিক উত্তর―অভিধান দেখে নাও। উত্তর আপনার জানা থাকলেও সরলভাবে না-দিলে প্রশ্নকারী উপকৃত হয়―সে শব্দটির বহুধা অর্থ, ব্যুৎপত্তি ও বাক্যের প্রায়োগিক কৌশল জানতে পারে। অভিধান শব্দার্থ জানার উৎস ঠিকই কিন্তু শব্দের অর্থ অধীর, চঞ্চল এবং সর্বদা পরিবর্তনশীল। বাক্যে প্রয়োগেই তার যথার্থতা প্রকাশ পায়। আবার একান্ত জানা শব্দের অর্থও তাৎক্ষণিক আমাদের মনে আসে না। জানি, মনে আছে কিন্তু মুখে আসছে না। সর্বসাধারণের নিত্য ব্যবহৃত অনেক শব্দের অর্থ বুঝলেও তা অনেক সময় প্রকাশ করা যায় না। শব্দের ভাবটি জানা কিন্তু ভাষায় প্রকাশে অক্ষম―এমনটিও হয়। যেমন ‘বিপদ-আপদ’ শব্দজোড়টি আমরা হামেশা উচ্চারণ করি। এ-দুটির অর্থ কি এক? কাছাকাছি অর্থের কিন্তু ভাবের দিক থেকে সমার্থক নয়। প্রথমটি আমরা সহজে বোঝাতে পারলেও দ্বিতীয়টি বোঝানো কঠিন। পদ বুঝি, বিপদ বুঝি, শ্বাপদও বুঝি কিন্তু আপদ! আপদ থেকে যেমন সহজে মুক্তি মেলে না, তেমনই আপদের অর্থজট থেকেও করোটি সহজে রেহাই পায় না। সেজন্যই হাতের কাছে অভিধান থাকা প্রয়োজন।
কাকে বলে অভিধান? ‘অভিধান’ শব্দটির অর্থ কী? এই তৎসম শব্দটির গঠনই বা কেমন? এসব প্রশ্নের জবাবের জন্য আমাদের নমস্য অভিধানকারদের শরণ নিতে হবে। অভিধান শব্দের অভিধান-নির্ভর অর্থ : ‘শব্দার্থ প্রতিপাদক গ্রন্থ’ বা শব্দকোষ। সহজ কথায়, যুগ যুগ ধরে কোনও ভাষায় ব্যবহৃত শব্দগুলোর অর্থ ও উৎপত্তি জানার বই হলো অভিধান। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের মতে, অভিধান শব্দটির গঠনরূপ : অভি (সম্যক) + ধা (ধারণ করা) + অন = অভিধান। যার দ্বারা অর্থ সরাসরি ধরা পড়ে বা প্রকাশ পায়। অভিধান শব্দটির সঙ্গে ‘অভিধা’ শব্দটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। অভিধা মানে শব্দশক্তি। শব্দেরও এক ধরনের শক্তি আছে―প্রকাশের শক্তি, বর্ণনার শক্তি। যে-শক্তি দিয়ে শব্দের অর্থ সম্পর্কে জানা যায় তা-ই শব্দশক্তি। প্রাচীন সংস্কৃত ভাষার পণ্ডিতেরা বলেছেন, শব্দের শক্তি তিন রকম : অভিধা, লক্ষণা ও ব্যঞ্জনা। শব্দের প্রথম ও প্রধান অর্থকে বলা হয় অভিধা। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, শব্দের যে শক্তিতে উচ্চারণমাত্র তার প্রধান বা মূল অর্থ (মুখ্যার্থ বা বাচ্যার্থ) বোঝা যায় তাকে ‘অভিধা’ বলে। অভিধানে একটি শব্দের বহুমুখী ভাবের নানা অর্থ থাকে। তাই নরেন বিশ্বাস অভিধানের মানে লিখেছেন : ‘যে গ্রন্থে শব্দের সম্যক বা পরিপূর্ণ অর্থ ধরা পড়ে বা যা দিয়ে অর্থের উত্তম বা পূর্ণ প্রকাশ ঘটে।’ (রফিকুল ইসলাম সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ৩৮ বর্ষ, ৩য় সংখ্যা, জুন ১৯৯৬)।
‘অভিধান’ শব্দটি কানে এলেই একটি ওজনদার বইয়ের চিত্রকল্প চোখে ভেসে ওঠে। অভিধান কেবল আকার-আকৃতিতে বা স্বাস্থ্যে-কলেবরে ভারী নয়―প্রকৃতিতে ওজনদার, বিষয়বস্তুর বৈশিষ্ট্যেও গুরুত্বপূর্ণ। ‘অভিধান’ শব্দটির মধ্যে কৌলীন্য এবং আভিজাত্য আছে। বইয়ের জগতে তাই অভিধান ভিন্ন মর্যাদায় অভিষিক্ত। একালে জ্ঞানের জগৎ বিপুল-বিশাল, সীমাহীন, আদিগন্ত বিস্তৃত। বৈচিত্র্যময় জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগৎ ক্রমশ দ্রুত বিকাশমান। এই জ্ঞান-বিজ্ঞানের সংখ্যাতীত শব্দভাণ্ডারের ভেতরেও দেহের অন্তঃস্রোতা রক্তপ্রবাহের মতো লুকিয়ে থাকে অজ্ঞাতপূর্ব জ্ঞানের আরেক জগৎ। ভাষার শব্দের ভেতরে সুপ্রচল অর্থের সীমানা ছাড়িয়ে সুপ্ত হয়ে আছে আরও কত অর্থ তার সন্ধান দেয় অভিধান। কেবল শব্দের বহুবিধ অর্থের সন্ধানের জন্যই অভিধান নয়, কালক্রমে এসব শব্দের অর্থান্তর, উৎস, ব্যুৎপত্তি, জাতপাত, মূলের খবর, প্রয়োগ বৈচিত্র্য ও উদাহরণসহ প্রয়োগবিধিও অভিধান আমাদের জানিয়ে দেয়। পূর্ণাঙ্গ আধুনিক একটি অভিধান আমাদের একটি শব্দের বাচ্যার্থ, ব্যঙ্গার্থ ও ব্যঞ্জনার সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দেয়।
এসব কথা তো সাধারণ শব্দাভিধান প্রসঙ্গে। বাংলা ভাষার অভিধানের ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়―দুশো-সোয়া দুশো বছর মাত্র। বলা যায়, বাংলা গদ্যবিকাশের ইতিহাসের সমান্তরালে বিকশিত হয়েছে অভিধান রচনা ও সংকলনের ধারা। তবে বাংলা ভাষায় অভিধান রচনার আছে কালানুক্রমিক ইতিহাস। প্রাচীন কাল থেকে সংস্কৃত ভাষায় অনেক কোষগ্রন্থ সংকলিত ও রচিত হয়েছে কিন্তু আঠারো শতকের আগে বাংলা ভাষায় অভিধান বা কোষগ্রন্থ রচনার নিদর্শন পাওয়া যায় না। অধ্যাপক নরেন বিশ্বাস তাই বাংলা অভিধানচর্চার ইতিহাসকে তিনটি পর্বে ভাগ করেছেন :
(ক) প্রথম পর্ব (দ্বিভাষিক অভিধান, অষ্টাদশ শতাব্দ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দের মধ্য ভাগ অর্থাৎ ১৭৪৩ থেকে ১৮৫৪);
(খ) মধ্য পর্ব―বাংলা অভিধান (১৮১৭ থেকে ১৯০০); এবং
(গ) আধুনিক পর্ব (১৯০১ থেকে ১৯৯০)।
অভিধানকার অধ্যাপক নরেন বিশ্বাসের এই কাল-বিভাজনের আধুনিক পর্বে বাংলা ভাষায় অসংখ্য বিষয়-বৈচিত্র্যময় অভিধান রচিত ও সংকলিত হয়েছে। বিস্তৃত টীকা-ভাষ্যে বাংলা ভাষায় বৃহদায়তন শব্দাভিধান রচয়িতা হিসেবে দুজন নমস্য পণ্ডিত জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস ও হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। দুই খণ্ডে বিভক্ত তাঁদের বাঙ্গালা ভাষার অভিধান ও বঙ্গীয় শব্দকোষ বাংলা অভিধানের ইতিহাসে মাইলস্টোন। শতবর্ষ ধরে এই অভিধান দুটি বাংলার ছাত্র-শিক্ষক, কবি-লেখক, সাংবাদিক-সাহিত্যিক ও ভাষাচর্চাকারীদের সহায়ক হিসেবে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করছে। এ দেশে বাংলা ভাষাচর্চার প্রধান জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। এই প্রতিষ্ঠান ভাষা ও সংস্কৃতিসহ জ্ঞানবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় কাজ করছে। ‘অভিধান ও বিশ্বকোষ উপবিভাগ’ নামে একটি ভিন্ন শাখা বাংলা একাডেমিতে আছে। সেখান থেকে বিভিন্ন বিজ্ঞানবিষয়ক অভিধান, দর্শন অভিধান, ইতিহাস অভিধান, প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা ভাষার অভিধান, বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান, ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, আধুনিক বাংলা অভিধান, উচ্চারণ অভিধান, লেখক অভিধান, চরিতাভিধান, বিদেশি শব্দের অভিধান, তিন খণ্ডে বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধানসহ আরও বিভিন্ন বিষয়ে ছোট-বড় অনেক অভিধান ও কোষগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে বাংলা ভাষার প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ, বাগধারা, প্রবাদ-প্রবচন, সমার্থক শব্দ, সমোচ্চারিত শব্দ নিয়ে অভিধান প্রকাশিত হয়েছে। নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত হয়েছে নজরুল রচনাপঞ্জি ও নজরুল শব্দপঞ্জি, নজরুল সাহিত্যে প্রবাদ-প্রবচন ইত্যাদি কোষগ্রন্থ। এমন কী, আশ্চর্যের বিষয়, এ দেশে প্রকাশিত হয়েছে গালি অভিধানও। তাই বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধোত্তর কালে বাংলাদেশের বৌদ্ধিকমহল প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিচিত্রবিধ অভিধান রচনা, সংকলন ও প্রকাশনায় বেশ অগ্রগতি অর্জন করেছে।
এত সব কথা মনে এল কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত জ্যোতির্ময় সেনের সম্পাদনায় পৌরাণিক শব্দসন্ধান শীর্ষক অভিধানটি দেখে। বাংলাদেশে অভিধান সংকলন ও সম্পাদনা যতই বিকশিত হোক, ভারতীয় পৌরাণিক বিষয় নিয়ে অভিধান সংকলন ও সম্পাদনায় অদ্যাবধি কেউ এগিয়ে এসেছেন বলে আমার জানা নেই। ভারতীয় পুরাণ, উপনিষদ, মহাকাব্য আমাদেরই ঐতিহ্যের অংশ। এই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারিত্ব আমরা কোনওভাবেই অস্বীকার করতে পারি না। কারণ ইতিহাস-ঐতিহ্য অস্বীকার বা অপনোদন করে কোনও জাতি অগ্রগতি লাভ করতে পারে না। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের দিকে দৃকপাত করলে আমরা লক্ষ করি, প্রাচীন ও মধ্যযুগের অধিকাংশ সাহিত্য ভারতীয় দর্শন ও পুরাণ-নির্ভর। বিগত বিশ শতকের সাহিত্যও অনেকাংশে তা-ই। রবীন্দ্রসাহিত্য এবং নজরুল-জীবনানন্দ-বিষ্ণু দে, শামসুর রাহমান প্রমুখ কবির অনেক কবিতা পৌরাণিক শব্দবন্ধ ও অন্তর্গত ভাবসম্পদে ভরপুর। সেসব কবিতার মাধুর্য অনুধাবন করতে গেলে ভারতীয় পুরাণ ও দর্শন আত্মস্থ থাকা প্রয়োজন। নইলে তাদের সাহিত্যের অন্তর্গত রসগ্রহণ সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে পৌরাণিক শব্দের অভিধান হাতের কাছে থাকা অত্যন্ত জরুরি। সেই প্রয়োজনীয় কাজটি পৌরাণিক শব্দসন্ধান-এর মাধ্যমে সম্পাদন করেছেন জ্যোতির্ময় সেন। এক্ষেত্রে তিনি এ দেশে পৌরাণিক অভিধানচর্চার ইতিহাসে পথপ্রদর্শক হিসেবে পরিগণিত ও প্রশংসার্হ হবেন বলে মনে করি।
জ্যোতির্ময় সেন প্রায় তিন যুগ ধরে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। মূলত ছড়াকার ও শিশুসাহিত্যিক হিসেবে তাঁর উত্থান ও পরিচিতি। ইতিমধ্যে শিশুকিশোর-উপযোগী বেশ কিছু সুখপাঠ্য বই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর। ছড়ার পাশাপাশি তিনি কবিতা, গান, গল্প ও প্রবন্ধ লিখছেন। বেতার-টেলিভিশনের গীতিকার হিসেবেও তিনি প্রতিষ্ঠিত। সংস্কৃত সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে শিক্ষকতা-জীবনে জ্যোতির্ময় তাঁর অধীত বিদ্যার চর্চায় নিরলস আছেন। বৈদিক সাহিত্য, পুরাণ-উপনিষদসহ সংস্কৃত সাহিত্যের জগতে তিনি প্রতিনিয়ত পরিব্রাজক। সেই সূত্রে তিনি ‘ক্ষেপা খুঁজে ফেরে পরশপাথর’-এর মতো খুঁজে ফিরছেন পৌরাণিক শব্দ ও চরিত্র। সংস্কৃত সাহিত্যের বিপুল সমুদ্র-ভাণ্ডার থেকে তিনি ডুবুরির মতো সেসব মণিমাণিক্য, হিরেজহরত খুঁজে এনে হাজির করেছেন পাঠকদের চোখের সামনে। এরই সাক্ষ্য তাঁর পৌরাণিক শব্দসন্ধান।
নিঃসন্দেহে পৌরাণিক সকল শব্দই সংস্কৃত বা তৎসম। এ-সকল শব্দ কোনওটিই একক অর্থের অনুগত নয়―এদের ব্যঙ্গার্থ ও ব্যঞ্জনা বহুমাত্রিক, বহুবর্ণিল। এসব অসংখ্য শব্দের ভেতরে লুক্কায়িত আছে অনেক অর্থ ও অর্থান্তর। কেবল তা-ই নয়; আছে নানা গল্পকথা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, তত্ত্বকথা, রস ও রহস্য। আছে সেকালের সমাজ, সভ্যতা, রাজনীতি, কূটনীতি, দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও যুদ্ধবিগ্রহের কথা। আছে সেকালের সামাজিক মনস্তত্ত্ব, সাংস্কৃতিক দর্শন, জটিল সৃষ্টিতত্ত্ব এবং কল্পনা ও বাস্তবের মিশেলে অবিস্মরণীয় জীবনতৃষ্ণা। পৌরাণিক অনেক শব্দ আবার আলো-আঁধারিময়―কিছু বোঝা যায়, কিছু যায় না। তা আফ্রিকার গভীর অরণ্য বা অসীম অন্তরীক্ষের মতোই রহস্যময়। তাই সেই শব্দারণ্যে প্রবেশের অধিকার সবাই অর্জন করতে পারে না―সেই শব্দ-সমুদ্রে অবগাহনের শক্তি-সাহসও সকলের নেই। এ দেশের বিদ্বজ্জনের সেই অনালোকিত জগতের অচিন পথে পদক্ষেপের বাসনাও কারও মধ্যে লক্ষিতব্য নয়। সেই ‘দুর্গমগিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার’ পথে নিঃসঙ্গ জ্যোতির্ময় সেন পা বাড়িয়েছেন দৃঢ় পদক্ষেপে। তাই তিনি ভূমিকাংশে লিখেছেন :
‘শব্দ সন্ধান করার শখ আমার বহুদিন থেকে। পৌরাণিক শব্দের প্রতিও রয়েছে দুর্বার আকর্ষণ। এই শখ আর আকর্ষণ থেকেই আমি নিরলস পথ হাঁটি। শব্দের সন্ধান করি। শব্দেরা যেন অধরা মায়ামৃগ। সোনার হরিণ। সহজে ধরা দিতে চায় না।’…
‘প্রায় এক যুগ ধরে পৌরাণিক শব্দ সন্ধান করে সংগ্রহ করতে পেরেছি কিছু শব্দ। সংখ্যা গণনার বিচারে হতে পারে তিন হাজারের কাছাকাছি।
শুরুতেই বলে নেওয়া ভালো, বৈদিক বা পৌরাণিক গ্রন্থের পাতায় পাতায় আছে রাশি রাশি শব্দ। তার মধ্য থেকে যেসব শব্দের উৎসমূল আছে, উৎপত্তির গল্প-রহস্য আছে, নামকরণের কারণ আছে, মূলত আমি সেসব শব্দই সন্ধান করি। সন্ধান পেলে আকর গ্রন্থ থেকে চয়ন করে জমিয়ে রাখি আমার উঞ্ছবৃত্তির থলিতে। আর এই শব্দগুলোর সৃষ্টিরহস্য পাঠকবন্ধুদের জানাতে চাই।’
অভিধানকারের এই বক্তব্য থেকে তাঁর উদ্দেশ্য বোঝা যায়। সীমাহীন ধৈর্য, অক্লান্ত মানসিক শ্রম ও প্রবল নিষ্ঠা না-থাকলে চতুর্বেদ, অষ্টাদশ পুরাণ ও সংস্কৃত সাহিত্য অধ্যয়ন এবং অধীত বিদ্যার সারাৎসার সংকলন সম্ভব নয়। গবেষকের মনন ও ভালোবাসাময় মন নিয়ে জ্যোতির্ময় সেন পৌরাণিক শব্দের রস-রহস্য সংগ্রহ করেছেন তাঁর মৌচাকে। এর ফলে সংকলিত হয়েছে পৌরাণিক শব্দসন্ধান। এই অভিধানের অনুষঙ্গে ইতঃপূর্বে তাঁর প্রকাশিত হয়েছে পৌরাণিক শব্দের উৎস অভিধান (ঐতিহ্য, ২০২০), অভিশপ্ত পৌরাণিক চরিত্র (কথাপ্রকাশ, ২০২৩), এবং ইতিমধ্যে পৌরাণিক নদী অভিধান (কথাপ্রকাশ, ২০২৬)। এই চারটি কোষগ্রন্থ ও অভিধানের মাধ্যমে জ্যোতির্ময় সেন পৌরাণিক চরিত্র, শব্দ ও প্রকৃতিকে যেমন জ্যোতিষ্মান এবং জনবোধ্য করেছেন তেমনই নিজেও অধিকতর জ্যোতির্ময় হয়েছেন।
জ্যোতির্ময় সেন পৌরাণিক শব্দসম্ভার নিয়ে যে কাজ করেছেন তা এ দেশে অদৃষ্টপূর্ব। তবে পশ্চিমবঙ্গে পৌরাণিক বিষয়-আশয় নিয়ে লেখক-গবেষকবৃন্দ বিচিত্রবিধ কাজ করেছেন এবং করছেন। সেসব গ্রন্থ থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের কথা তিনি সবিনয়ে স্বীকারও করেছেন। জ্যোতির্ময়ের তথ্যানুসন্ধানের পরিধি এবং পুরাণবিষয়ক পাঠবৃত্ত বেশ বড়। বইটির শেষে পঁচাশিটি আকরগ্রন্থের তালিকা তিনি দিয়েছেন। তা থেকে অনুমিত হয় তাঁর পাঠ-ব্যাপকতা এবং অনুসন্ধান-প্রচেষ্টা। ভূমিকাতেও তিনি স্বীকার করেছেন :
‘পৌরাণিক শব্দসন্ধান বইটি সংকলনে বেদ, পুরাণ, স্মৃতিশাস্ত্র, রামায়ণ, মহাভারত প্রভৃতি আকরগ্রন্থের পাশাপাশি সুবলচন্দ্র মিত্র সংকলিত সরল বাঙ্গালা অভিধান, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত বঙ্গীয় শব্দকোষ (প্রথম-দ্বিতীয় খণ্ড), নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী সম্পাদিত পুরাণকোষ (প্রথম-চতুর্থ খণ্ড), সুধীরচন্দ্র সরকার সংকলিত পৌরাণিক অভিধান, পণ্ডিত হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য রচিত হিন্দুদের দেবদেবী―উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ (প্রথম-তৃতীয় খণ্ড) প্রভৃতি গ্রন্থ মুখ্য সহায়ক গ্রন্থ হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে।’
জ্যোতির্ময় সেনের ‘মুখ্য সহায়ক গ্রন্থ’-এর সূত্রে বলা যায়, পৌরাণিক বিষয়-আশয় প্রাচীন কালের হলেও পুরাণ-নির্ভর কোষগ্রন্থ এবং অভিধান নিতান্তই আধুনিক কালের সৃষ্টি। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধান ও হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ-এ ইতস্তত-বিক্ষিপ্তভাবে পৌরাণিক শব্দের অর্থ ও টীকাভাষ্য থাকলেও তা যৎসামান্য এবং তথ্যের দিক থেকে অকিঞ্চিৎকর। এ-অভাব পূরণের লক্ষ্যে সুধীরচন্দ্র সরকার (১৮৯২-১৯৬৮) একক প্রচেষ্টায় রচনা করেন পৌরাণিক অভিধান (১৯৫৮)। এটিই বাংলায় প্রথম পুরাণবিষয়ক অভিধান। এরপর গত শতকের ষাটের দশকের শেষে প্রকাশিত হয় অমলকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৌরাণিকা। বিগত শতকে পুরাণবিষয়ক অভিধানচর্চার আর তেমন কোনও উল্লেখযোগ্য নিদর্শন নেই। বিশ শতকের শেষ দশকে কলকাতার গুরুদাস কলেজের সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী (১৯৫০) মহাগ্রন্থ পুরাণকোষ রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ভারততত্ত্ববিদ এবং ভারতীয় মহাকাব্য ও পুরাণের অন্যতম বিশেষজ্ঞ গবেষক। বিশালতা, বিস্তৃতি ও গভীরতায় সত্যিকার অর্থেই তাঁর পুরাণকোষ মহা অভিধানগ্রন্থ। পাঁচ খণ্ডে বিস্তৃত এই অভিধানের পৃষ্ঠাসংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। মহাভারত, রামায়ণ ও মুখ্য পুরাণের এমন কোনও শব্দ ও চরিত্র নেই যা এখানে বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে বর্ণিত হয়নি। পুরাণকোষ প্রশান্ত মহাসাগরের মতো বিশাল এবং আটলান্টিকের মতো গভীর। এর প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে এবং শেষ পঞ্চম খণ্ড ২০২৪-এ।
উল্লিখিত সকল অভিধানের লেখক-প্রকাশকই ভারতীয়। সেই ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকারিত্ব আমাদের হলেও এ দেশে এমন চর্চার নজির নেই। বরং তা অঙ্গীকৃতের বদলে উটপাখির মতো মুখ গুঁজে অস্বীকার করবার প্রবণতাই বেশি। তবে বৃত্তাবদ্ধ সুযোগ ও সীমিত সাধ্যের মধ্যে জ্যোতির্ময় সেন সেই চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। পুরাণকোষ-এর তুলনায় ক্ষুদ্রার্থে হলেও বাংলাদেশে তাঁর পুরাণবিষয়ক অভিধান-চতুষ্টয়, বিশেষত পৌরাণিক শব্দসন্ধান মাইলফলকতুল্য। পুরাণচর্চার ঐতিহ্যবাহী ধারাটি তিনি ক্ষীণতোয়া স্রোতের মতো হলেও বাংলাদেশে জিইয়ে রাখতে পেরেছেন। তবে জানতে ইচ্ছে করে, তিনি কি তাঁর উত্তরসাধক রেখে যেতে পারবেন?
অভিধান বা কোষগ্রন্থের ক্ষেত্রে সংগ্রাহক ও সম্পাদকের ভূমিকা বেশি। আর তা যদি হয় সংস্কৃত ভাষার শব্দ ও চরিত্র নিয়ে, তবে সম্পাদকের দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রতিটি ভুক্তির টীকাভাষ্য রচনার ক্ষেত্রে দুর্বোধ্য ও কালের মাত্রায় অচলিত শব্দ এড়িয়ে সর্ববোধ্য জলচল শব্দের প্রয়োগের প্রতি গুরুত্ব দিতে হয়। এক্ষেত্রে অনেক ভুক্তিতে লক্ষ করা যায়, জ্যোতির্ময় সেন মাঝেমধ্যে তৎসম শব্দ ব্যবহার করেছেন―যা একটু সচেতন থাকলে এড়ানো যেত। যেমন, ‘অষ্টোত্তর সহস্র’র বদলে এক হাজার আট, ‘রেতঃস্খলন’ হতে পারত বীর্যপাত, ‘অস্বীকৃত-ভর্তৃকা’র পরিবর্তে অস্বীকৃত হবু স্ত্রী, ‘স্বর্বেশ্যা’ না-লিখে স্বর্গের নর্তকী ইত্যাদি। সম্পাদক এ-বিষয়ে অসচেতন ছিলেন, তা বলা ঠিক হবে না। সহজ-সরলতার দিকে তাঁর দৃষ্টি থাকা সত্ত্বেও চোখ ফাঁকি দিয়েছে অনেক দুর্বোধ্য শব্দ। আশা করি আগামী সংস্করণে শব্দের ভুক্তিবৃদ্ধির পাশাপাশি সাধারণ পাঠকবোধ্য শব্দ প্রয়োগের প্রতি নিষ্ঠাবান হবেন। আধুনিক অভিধানের নিয়ম অনুসারে বইটি বর্ণানুক্রমিকভাবে সাজানো হয়েছে। কিন্তু লক্ষ করা যায়, কোনও-কোনও বর্ণের ভুক্তি দৃষ্টিকটুভাবে মাত্র দুয়েকটি শব্দের মধ্যে সীমিত। এমন কিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আলোচ্য অভিধানটি এ দেশের শব্দকোষ-মণ্ডলে নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে। পৌরাণিক শব্দসন্ধান শিক্ষার্থী-শিক্ষক, সাংবাদিক-লেখক, বুদ্ধিজীবী-গবেষক এবং ধীমান পাঠকদের পাঠকক্ষে, হাতের নাগালে, এমন কি পড়ার টেবিলে রাখার মতো সহায়ক গ্রন্থ। বইটির বহুল প্রচার কামনা করি।
লেখক : প্রাবন্ধিক



