জাহানারা : মূল : নিয়াজ জামান

বিশ্বসাহিত্য : অনূদিত গল্প
বাংলা অনুবাদ : নূর কামরুন নাহার
[নিয়াজ জামানের জন্ম ১৯৪১ সালে। লেখক, অনুবাদক ও গবেষক। দীর্ঘকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এ ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে অধ্যাপনা করেছেন। পাঠদান করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ লোকঐতিহ্য নকশিকাঁথা এবং জামদানি নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং রচনা করেছেন দ্য আর্ট অফ কাঁথা এমব্রয়ডারি। তাঁর দ্য ড্যান্স অ্যান্ড আদার স্টোরিজ গল্পটি এশিয়া উইক শর্ট স্টোরি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছিল। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে দিদিমার নেকলেস অ্যান্ড আদার স্টোরিজ, দ্য ক্রুকড নিম টি, দ্য কনফেশনাল আর্ট অব টেনেসি উইলিয়ামস। তাঁর এ ডিভাইডেড লেগেসি: দ্য পার্টিশন ইন সিলেক্টেড নভেলস অব ইন্ডিয়া পাকিস্তান অ্যান্ড বাংলাদেশ গ্রন্থটি জাতীয় আর্কাইভস পুরস্কার লাভ করে। সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৩ সালে অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। অনুবাদক হিসেবে ২০১৭ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। ব্যতিক্রমধর্মী সংগঠন ‘গাঁথা’র প্রতিষ্ঠাতা। সংগঠনটি বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের নারী লেখকদের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বাংলাদেশের নারী লেখকদের লেখা ও গ্রন্থ ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন এবং এ বিষয়ক ব্যাপক কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর ইংরেজি The Woman Who Rose গল্পের বাংলা অনুবাদ এটি]তার নাম জাহানারা। মোগল সম্রাট শাহজাহানের কন্যার নামে নামকরণ হলেও সে কোনও রাজকন্যা নয়। পত্রিকা অফিসের সাধারণ এক কর্মী। পুরুষ-অধ্যুষিত অফিসে পাঁচ নারীর একজন। আর তাই সে পুরুষ সহকর্মীদের কাছ থেকে যতটা সম্ভব দূরত্ব রেখে চলে।
প্রেম-ভালোবাসার বিষয়ে অফিস সাধারণত নাক গলায় না, যতক্ষণ না তা গভীর হয়ে ওঠে বা গুরুতর কিছু ঘটে। গুরুতর বিষয়গুলো হচ্ছে গভীর সম্পর্কগুলো বিয়েতে গড়ায় এবং প্রায়শই তা হয় দ্বিতীয় বিয়ে এবং সেটি এমন দুজনের মধ্যে ঘটে যাদের একজন আগে থেকেই বিবাহিত। তারপর অফিসে খুবই বাজে দৃশ্যের অবতারণা ঘটে, প্রথম স্ত্রী এসে হয়তো চিৎকার, বিলাপ, অথবা আর্তনাদ করে কাকুতি জানায়। তবে হালকা প্রণয়ে কোনও আপত্তি নেই, বরং এরকম সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া কর্মীরা কম ছুটি নেয় এবং অফিসে বেশি সময় দেয়।
কিন্তু জাহানারার এসব সম্পর্ক বা প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই। তার পৃথিবী অন্যরকম। অসুস্থ বাবা, ক্লান্ত নাকাল মা, স্কুলপড়ুয়া তিন ছোট ভাইবোন নিয়ে তার পরিবার। তারা নারায়ণগঞ্জে থাকে। বাবার ক্ষুদ্র পেনশন ও তার বেতনের ওপর নির্ভর করেই তাদের সংসার আর টিকে থাকার লড়াই।
জাহানারা স্বপ্ন দেখে কোনও একদিন তার বিয়ে হবে, কিন্তু তার রূপ বা বিত্ত কোনওটাই এমন নয় যে তা সম্ভাব্য বরদের আকৃষ্ট করতে পারে। এইচএসসি শেষ করার পর সে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নেয়। নতুন একটি পত্রিকার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে চাকরির জন্য আবেদন করে।
কর্তৃপক্ষের দাবি তারা লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করতে আগ্রহী। বাস্তবে তা কতটা ঘটে তা পরিমাপ করা দুরূহ। অবশ্য বিশ জন পুরুষের মধ্যে পাঁচ নারীর অবস্থান দাবিকে খানিকটা সত্য করে তোলে এবং এই সহাবস্থান অফিসের পরিবেশে কিছুটা বৈচিত্র্যও এনে দেয়।
জাহানারা সেই চল্লিশজন নারীর একজন, যারা চাকরির জন্য আবেদন করেছিল। অন্যদিকে, পুরুষ প্রার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় দুই শতাধিক। পূর্ণকালীন স্থায়ী কর্মচারীদের পাশাপাশি এখানে রিপোর্টাররাও রয়েছে, যারা সবসময় আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকে। জাহানারার মূল কাজ হচ্ছে জমে থাকা অথবা ই-মেইলে আসা সংবাদগুলো প্রকাশের উপযোগী করে ফরম্যাট অনুযায়ী তৈরি করা।
অফিস সময় সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা। অফিস শেষে টেম্পোতে মতিঝিল, মতিঝিল থেকে বাসে নারায়ণগঞ্জে বাসায় যেতে যেতে প্রায় দশটা বেজে যায়। পরিবারের সবাই রাত করেই খাবার খায়। শুধু অসুস্থ বাবা আগেই খেয়ে নেন, জাহানারা যখন বাড়ি ফেরে, তখন তিনি ঘুমিয়ে পড়েন।
ঢাকায় কর্মজীবী নারীদের জন্য হোস্টেল আছে। জাহানারার ধারণা হয়তো সেখানে একদিন সে একটা সিট পেয়ে যাবে। কিন্তু আপাতত তাকে অপেক্ষাতেই থাকতে হচ্ছে। ছুটি সপ্তাহে একদিন। ওই একদিনই কাপড় ইস্ত্রি করে গুছিয়ে রাখা, ছোট ভাইবোনদের পড়াশোনার খোঁজ নেওয়া আর প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সারতে হয়। কখনও কখনও ছুটির দিনে জাহানারা ছোটখাটো কিছু বিলাসিতার জন্যও সামান্য খরচ করে। আর এটাই হচ্ছে পুরো পরিবারের জন্য সামান্য আনন্দ-খোরাক।
বাকি দিনগুলোয় ছোট ভাই স্বপন, স্কুল থেকে ফেরার পথে বাজার থেকে যা আনতে পারে, সেটা দিয়েই চলতে হয়। কখনও সখনও ফেরিওয়ালার আনা মাছ, শাক-সবজি থেকেও প্রয়োজনীয় কেনাকাটা চলে। সুস্থ থাকতে বাবাই বাজার করতেন। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে তিনি আর তেমন কিছু করতে পারেন না।
ঢাকায় হোস্টেলের সিট পাবার চেষ্টার কথা শুনে মা বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। ছেলের চেয়ে কয়েক বছরের বড় এ মেয়েই তার ভরসা আর সান্ত্বনার আশ্রয়স্থল। সে যদি ঢাকায় চলে যায়, তাহলে চলবে কীভাবে ? জাহানারা মাকে বোঝায়, প্রতি সপ্তাহে ছুটির দিন বাসাতেই থাকবে, আগের দিন সে রাতেই চলে আসবে, পরদিন সকালে অফিসে যাবে। তাছাড়া প্রতিদিনের যাতায়াতের ফলে এখনও তো পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো হয় না, বরং চার ঘণ্টার জার্নির ধকলে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু এটাও সত্যি, হোস্টেলে কবে সিট পাবে তার কোনও নিশ্চয়তা নেই, খুব শীঘ্র পাবে এমন কোনও আশাও নেই।
মা গোপনে প্রার্থনা করেন হোস্টেলে ওঠার আগেই মেয়ের বিয়ে হয়ে যাক। কিন্তু বিয়ের পর স্বামী যদি চাকরি করতে না দেয় ? অনেক পুরুষই তো তা দেয় না―যদিও জাহানারার মায়ের সময়ের তুলনায় সময় এখন অনেক বদলে গেছে। আবার জামাই যদি ঢাকায় থাকে, তাহলে তো মেয়েকে সপ্তাহে এক দিনও দেখতে পাবেন না!
অফিসের আশপাশে যারা থাকে, তারা সাধারণত বাসা থেকে এনে বা অফিস ক্যাফেটেরিয়ায় কম দামে খাবার কিনে খায়। বড় কর্মকর্তারা অবশ্য কখনওই ক্যাফেটেরিয়ায় খান না। সেখানে খাবারের ব্যবস্থা শুধু জাহানারা ও তার মতো ছোটখাটো কর্মচারীদের জন্য। তবে ক্যাফেটেরিয়ার এ ভর্তুকি দেওয়া খাবারও জাহানারার জন্য বেশ ব্যয়বহুল। তাই বাসা থেকে আনা চাপাতি, ভাজি ও রাস্তার মোড়ের ছোট দোকান থেকে কেনা একটা কলা খেয়েই তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়।
একঘেয়ে কাজ, কিন্তু ধীরে ধীরে এতেই সে আনন্দ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করে। সকালে অন্যদের আগে খবর পড়ে ফেলা, পাঠানো প্রতিবেদনের কন্টেন্ট শেষ মুহূর্তে সংশোধন করা, হতাশ রিপোর্টারদের সঙ্গে কথা বলা, মাঝে মাঝে ইন্টারনেট কাজ না করলে পেন-ড্রাইভে লেখা নিয়ে আসা, গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের সঙ্গে দেখা হওয়া, এসব কিছুতে সে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি পায়। জাহানারা মাঝে মাঝেই ভাবে লেখক আর রিপোর্টারদের নাম পত্রিকায় ছাপা হয়। কিন্তু কয়জন পাঠক জানেন যে আমরাও আছি, পত্রিকা প্রকাশের পেছনে আমরাও কাজ করি।
সদ্য অবসরপ্রাপ্ত এক অধ্যাপক কলামিস্ট স্বামীর সঙ্গে জীবনযাপন নিয়ে পত্রিকায় রম্য কলাম লিখছেন। তিনিই একদিন লেখার হার্ড কপি এবং সফট কপির পেন-ড্রাইভ নিয়ে আসেন। কিন্তু সমস্যা হলো, পেন-ড্রাইভটি কিছুতেই খুলছে না। ভদ্রমহিলা অস্থির হয়ে পড়েন :
‘তাহলে কি আবার পুরোটা টাইপ করতে হবে ?’
‘আপনি ই-মেইলে পাঠিয়ে দিতে পারেন।’
সমস্যাটা তো সেখানেই। বাসায় ইন্টারনেট কাজ করছে না, আর সেজন্যই পেন ড্রাইভ নিয়ে এসেছি।’
তাদের কথোপকথন শুনে অফিসের সিনিয়র কম্পোজিটার মাহদি এগিয়ে আসে।
মাহদি নার্ভাস হয়ে পড়া লেখককে আশ্বস্ত করে। লেখাটি স্ক্যান করে হার্ড কপির সঙ্গে মিলিয়ে দেখে নেবে।
‘এটা কি এখনই করতে পারবেন ?’ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চাইলেন অধ্যাপক।
‘হ্যাঁ’।
মাহদি কপিটা নিয়ে স্ক্যানারে রাখে, হালকা গুঞ্জন তুলে মেশিনটা কাজ করে যায়। কয়েক মুহূর্তেই স্ক্যান শেষ হয়। মাহদি স্ক্রিনে লেখাটা দেখিয়ে বলে, ‘সব ঠিক আছে, আপনি চাইলে আমি একটা প্রিন্ট আউট করে দেব, যাতে হার্ড কপির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারেন। ভবিষ্যতে এমন সমস্যা হলে, আপনি আমাকে বলবেন।’
তারপর জাহানারার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘উনিও এটা করতে পারেন।’
মূল্যবান লেখাটা ঠিকঠাক রয়েছে দেখে তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন, ব্যাগ থেকে একটা নোট বের করে বলেন, ‘আপনারা একটু চা-সিঙ্গারা খান, আমি ততক্ষণে দেখে নিই সব ঠিক আছে কি না।’
হেসে আপত্তি জানালেও মাহদি শেষ পর্যন্ত অফিসবয়কে ডাকে। অফিসবয়ের কাজের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ক্যাফেটেরিয়া থেকে চা-সিঙ্গারা নিয়ে আসা।
জাহানারা অতিথিকেও সিঙ্গারা খাওয়ার অনুরোধ জানায়, কিন্তু তিনি ততক্ষণে লেখা মেলানোর কাজ শেষ করে চলে যাচ্ছেন।
সেদিনই প্রথমবারের মতো জাহানারা মাহদিকে মনোযোগ দিয়ে দেখে। মাহাদির শ্যামবর্ণ, ঢেউখেলানো চুল, গভীর বাদামি চোখ, সবকিছুই তার চোখে পড়ে। তবে সবচেয়ে যেটা তাকে বেশি আকৃষ্ট করে তা হলো মাহদির শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী আচরণ। কী সাবলীলভাবে নার্ভাস হয়ে যাওয়া মহিলার সমস্যার সমাধান করে দিল! জাহানারাও নিজে খানিকটা হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিল, হয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেও এমন আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে।
এরপর মাঝে মাঝেই, সকাল ১১টার দিকে, মাহদি দুই কাপ চা আর তিনটা সিঙ্গারা অর্ডার করে। একটা জাহানারার জন্য, দুটো নিজের জন্য। সে জাহানারাকেও দুটো সিঙ্গারা অফার করে কিন্তু জাহানারা হেসে বলে, ‘এগুলো এত বড় যে একটা খেলেই হয়!’
মাহদি গল্প করে, জানায়―আগে রাতের শিফটে কাজ করত। এক সপ্তাহ আগে তার শিফট বদল হয়েছে। এখন তার কাজের সময় সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা। কয়েক দিন পর, এক সন্ধ্যায়, জাহানারা যখন অফিস থেকে বের হচ্ছে, মাহদি পাশে এসে দাঁড়ায়।
‘আপনি কোথায় থাকেন ? যদি কাছাকাছি হয়, তাহলে আপনাকে নামিয়ে দিতে পারি।’
জাহানারা মাথা নাড়ে, ‘আমি মতিঝিলে যাবার টেম্পো ধরব। সেখান থেকে নারায়ণগঞ্জের বাস নেব।’
মাহদি সেকেন্ড-হ্যান্ড হোন্ডাটা দেখিয়ে বলে, ‘আপনাকে মতিঝিলে নামিয়ে দিতে পারি।’
‘কিন্তু তাতে তো আপনার অনেক ঘুরে যেতে হবে। তাছাড়া আমি তো জানিই না, আপনি কোথায় থাকেন,’ দ্বিধান্বিত স্বরে জাহানারা বলে।
মাহদি সহজভাবে বলে, ‘এটা কোনও বিষয়ই না, হোন্ডা দিয়ে আপনাকে নামিয়ে দিতে খুব বেশি সময় লাগবে না।’
একটা স্বস্তিদায়ক যাত্রার চিন্তা। তাকে টেম্পোর জন্য অপেক্ষা করতে হবে না, ঠাসাঠাসি করে বসতে হবে না, এমন কোনও পুরুষযাত্রীর পাশে বসতে হবে না যারা সুযোগ পেলেই গায়ের সঙ্গে শরীর ঘষতে চায়। প্রস্তাবটা এতটাই লোভনীয় যে, শেষ পর্যন্ত সে রাজি হয়ে যায়। যদিও মনে একটা সংশয় থেকে যায়, লোকজন কী বলবে! তারপর সে চারদিকে তাকিয়ে দেখে, সবাই নিজের কাজে এতটাই ব্যস্ত যে, তার দিকে খেয়াল করার সময় কারও নেই।
সেদিন থেকেই শুরু হয় মাহদির সঙ্গে প্রতিদিনের যাত্রা। প্রথম দিনই মাহদি বলল, ‘হোন্ডার পেছনে বসলে ভারসাম্য রাখতে কাঁধে হাত রাখতে হবে, না হলে পড়ে যেতে পারেন।’
এক মুহূর্ত থমকায় জাহানারা। সে এখনও পর্যন্ত কোনও অপরিচিত পুরুষকে স্পর্শ করেনি। তার হৃৎস্পন্দন দ্রুততর হয়। তার মনে হয় হৃৎপিণ্ডের ধুকপুক এত জোরে হচ্ছে যে, মাহদি নিশ্চয়ই শুনতে পাচ্ছে!
অফিসে এ খবর ছড়িয়ে পড়তে দেরি হয় না। সহকর্মীদের চোখে-চোখে এক ধরনের ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি খেলে যায়। শুধুই বন্ধুত্বের ব্যাপার হলে এতটা নিয়মিতভাবে মাহদির সঙ্গে যাতায়াত কি সম্ভব ?
শুরুতে ব্যাপারটা থাকে নিছক সহকর্মীর সহানুভূতি। তারপর একদিন, তারা যখন মতিঝিলের পথে, হঠাৎই ঝুম বৃষ্টি তাদের ভিজিয়ে দেয়।
জাহানারা চিন্তায় পড়ে যায় ভিজে কাপড়ে সে কীভাবে নারায়ণগঞ্জ ফিরবে ?
মাহদি বলে, ‘আমার বাসা মগবাজারের তিনতলার ছাদঘরে। তুমি চাইলে চুল শুকিয়ে নিতে পারো। তোমার নাইলনের শাড়িটাও শুকিয়ে যাবে দ্রুত। তারপর তোমাকে বাসস্ট্যান্ডে নামিয়ে দেব। দেরি হয়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু…’
বৃষ্টি থামে রাত দশটার দিকে। ততক্ষণে মাহদি রান্না করে ফেলেছে এক হাঁড়ি খিচুড়ি।
জাহানারা ভেজা কাপড় খুলে একটা দড়িতে মেলে দেয়, যাতে ফ্যানের বাতাসে শুকিয়ে যায়। তারপর খিচুড়ি খেতে বসে। একটা নকশি কাঁথা মুড়ি দিয়ে সে বসে, ভেজা শরীরটা তখনও ঠাণ্ডায় কাঁপছে।
এরপর যা ঘটার তাই ঘটে।
জাহানারা পরিবারের কথা ভেবে চিন্তায় ভেঙে পড়ে।
‘তুমি বাসায় ফোন করে বলো অতিরিক্ত বৃষ্টির জন্য আসতে পারবে না।’
‘ওরা জানতে চাইবে, আমি কোথায় আছি।’
‘বলবে এক সহকর্মীর বাসায়। ওরা তো জানতে চাইবে না সে নারী না পুরুষ।’
‘তোমার বাড়িওয়ালাকে কী বলবে ? একটা অপরিচিত মেয়ের সঙ্গে রাত কাটিয়েছ, এটা কীভাবে বোঝাবে ?’
‘বলব, তুমি আমার বোন।’
সকালে জাহানারা ও মাহদি অফিসের পথে আলাদা হয়ে যায়।
মা ফোনে খুব বেশি প্রশ্ন করেননি, তবে যখন বাসায় যাবে নিশ্চয়ই হাজারো প্রশ্ন করবেন। তার সহকর্মীর নাম কী ? সে কি বিবাহিত ? যদি বিবাহিত হয়, তাহলে কি তার সন্তান আছে নাকি ?
জাহানারাকে পুরোপুরি একটি নতুন চরিত্রের গল্প বানিয়ে নিতে হয়। তার দুই সহকর্মীর নাম মিলিয়ে সে তৈরি করে একটা নতুন নাম―শিরিন আখতার। শিরিন অবিবাহিত, ঢাকার মগবাজারের একটা মহিলা হোস্টেলে থাকে। এই কল্পিত চরিত্রের সমস্ত কিছু সে মুখস্থ করে নেয়, যেন কোনও প্রশ্নের মুখোমুখি হলে উত্তর দিতে দেরি না হয়।
সারাদিন মনে শুধু রাতের ঘটনাই ঘুরপাক খেতে থাকে। তার দ্বিধা, ভয়, অস্বস্তি সবকিছুই মাহদির মৃদু কথা ও প্রশ্রয়ে একরকম বিলীন হয়ে গেছে। তবু মনে হয়, কিছু একটা যেন অপূর্ণ রয়ে গেছে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, সে কিছু পেতে চলেছে, যা এতদিন অধরা ছিল, কিন্তু ঠিক তখনই মাহদি নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল। সে মুহূর্তে তার ভেতরে এক ধরনের শূন্যতাও জন্ম নিয়েছিল।
রাতে ঘুম আসেনি জাহানারার। কিন্তু মাহদি পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছিল একদম নিশ্চিন্তভাবে।
পরদিন, অফিসে সে চুপচাপ থাকে। দুপুরের খাবার আনেনি বলে অফিসবয়কে ডেকে চাপাটি ও ভাজি আনতে বলে।
মাহদি সারা দিন তার ডেস্কের আশেপাশেও আসে না। হয়তো সেও বুঝেছিল, কাছে গেলে জাহানারা চোখ-মুখে কিছু প্রকাশ করে ফেলতে পারে।
মাহদি কি আজও তাকে মতিঝিলে নামিয়ে দিয়ে আসার কথা বলবে ? সকালে বিদায় নেওয়ার সময়ও তাদের কোনও কথোপকথন হয়নি। জাহানারা একটু আগেই বের হবার সিদ্ধান্ত নেয়, যেন নিজের মতো করে টেম্পো ধরতে পারে।
কিন্তু, যখন ব্যাগ গুছিয়ে অফিস থেকে বের হচ্ছে, দেখে মাহদি দাঁড়িয়ে আছে।
‘তুমি তৈরি ?’
জাহানারা মাথা নাড়ে।
বাসের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যন্ত মাহদি পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।
‘তোমার প্রতিদিন এত কষ্ট করে যাতায়াত করতে হবে না, এর একটা সহজ সমাধান আছে।’
জাহানারা এক মুহূর্তের জন্য ভাবে, মাহদি কি তাকে বিয়ের কথা বলতে চাইছে ?
কিন্তু সেই শব্দটি উচ্চারিত হয় না।
‘তুমি তোমার সহকর্মীর সঙ্গে থেকে যেতে পার। ছুটির দিনে বাড়ি যাবে।’
এক ধরনের হতাশা অনুভব করে জাহানারা। কিন্তু মাহদি তার কথার পরের বাক্যে চলে যাওয়ায় সে কিছু বলার সুযোগ পায় না।
হেলমেটের ফিতা দ্রুত বাঁধতে বাঁধতে শুধু বলল, ‘ভাবো এ বিষয়ে।’
বাসের জানালার বাইরে তাকিয়ে, সারা পথ জাহানারা শুধু এ কথাই ভাবে। মাকে কীভাবে বলবে যে, শিরিন আখতার প্রস্তাব দিয়েছে তারা দুজনে মিলে একটা ছোট বাসা ভাড়া নিতে পারে ?
কয়েক বছর আগেও এমনটা ভাবা কঠিন ছিল, কিন্তু এখন অনেক কর্মজীবী নারী পরিবার থেকে দূরে নিজস্ব বাসায় থাকে। বাড়িওয়ালারাও এখন আর তেমন আপত্তি করে না।
এর আগেও পরিবারে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, কিন্তু তখন সবাই বিষয়টা সহজভাবে নেয়নি। এবার তারা কী ভাববে ?
কিন্তু মাহদি তার বাড়িওয়ালাকে কী বলেছে ? সে কি এখনও জাহানারাকে নিজের বোন হিসেবেই পরিচয় দিচ্ছে, নাকি ধীরে ধীরে অন্য কিছু ভাবছে ? প্রশ্নের উত্তর আগেভাগেই তৈরি করে রাখে সে, কিন্তু বাড়ি ফেরার পর কেউই তাকে কোনও প্রশ্ন করে না।
মা শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ার অভিযোগ করেন―অসুস্থ বাবার জন্য খাবারের ফলের দাম হাতের নাগালের বাইরে, মুরগি কেনা আর সম্ভব হচ্ছে না। ভাই একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য টাকা চায়। বোনেরা নতুন জামার বায়না ধরে। এই সব চাওয়ার মাঝে নিজের কথা বলার কোনও সুযোগই পায় না জাহানারা। রাতে বিছানায় শুয়ে তার মনে হয়, পরিবারের এসব সমস্যা তার নিশ্বাস বন্ধ করে দিচ্ছে। শুধু অফিসেই তার সামান্য মুক্তি। তার হৃৎপিণ্ডের গতি আবার বাড়ে, কিন্তু সেটি কি অফিসের কাজের স্বাধীনতা, নাকি মাহদির তাকানো ?
পরদিন, মাহদি জানতে চায় পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় থাকার ব্যাপারে কথা হয়েছে কি না। জাহানারা মাথা নাড়ে। সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করে মাহদির আচরণ যেন পালটে যাচ্ছে। সে নানা অজুহাতে জাহানারার টেবিলের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে। কাজে সাহায্য করার ফাঁকে সে তার কাঁধ বা গলায় হাত ছুঁইয়ে দেয়। মাহদির অফিসের সময় পালটে গিয়েছে, তাই সে আর প্রতিদিন তাকে মতিঝিল পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে না। তবে মাঝে মাঝেই কোনও একটা অজুহাতে ‘আমি একটু পরে আসছি’ বলে অফিস থেকে বের হয়ে জাহানারাকে মতিঝিলে নামিয়ে দিয়ে আসে।
এক সন্ধ্যায় মাহদি বলে, ‘এভাবে আর চলা যায় না। আমি তোমাকে সত্যিই চাই। শুধু অফিসে দেখা হওয়া আর মাঝেমধ্যে মতিঝিল পর্যন্ত নামিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট নয়।’ জাহানারা চমকে যায়। সত্যি বলতে, সেও আশা করেছিল এমন কিছু শুনবে, কিন্তু যখন মাহদি সরাসরি কিছু বলে না, তখন তার হতাশ লাগে।
তবে মায়ের প্রতিক্রিয়া তাকে বিস্মিত করে। অপ্রত্যাশিতভাবে মা ব্যাপারটা খুব সহজভাবেই মেনে নেন।
এতদিন জাহানারা ভেবেছিল মা নিশ্চয়ই অনেক আপত্তি করবে, কিন্তু মা শুধু বললেন, ‘তাহলে তুই কি প্রতি সপ্তাহে আসবি ?’
সকালে জাহানারা কয়েকটা শাড়ি, ব্লাউজ, পেটিকোট আর প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস ব্যাগে ভরে আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই অফিসের উদ্দেশে রওনা দেয়। অফিসে অনেক নারী সহকর্মীই বড় বড় ব্যাগ নিয়ে আসে, তবে পুরুষ সহকর্মীরা সাধারণত খালি হাতে আসে। তাই, জাহানারার একটু ভারী ব্যাগ নিয়ে কেউ তেমন কোনও মন্তব্য করে না।
মাহদির অফিসের সময়সূচি এখন আলাদা। সে যখন জাহানারার ডেস্কের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, জাহানারা বলে, ‘আজ আমি দুপুরের খাবার আনিনি। ক্যাফেটেরিয়া থেকে ভাজি আর চাপাটি আনতে কাউকে বলতে হবে, না হয় গিয়ে খেতে হবে। তুমি আমার সঙ্গে খাবে ? আমরা একটু আগেই যাব ?’
ক্যাফেটেরিয়ায় সারাদিনই নাশতা ও দুপুরের খাবার পাওয়া যায়। তবে দুপুরের খাবার খেতে বেশির ভাগ লোকই ২টার দিকে আসে। ১টার সময় যখন তারা ঢোকে, তখন জায়গাটা প্রায় ফাঁকাই পায়।
জাহানারা ধীর স্বরে বলল, ‘আমি মাকে বলেছি, আমি এক সহকর্মীর সঙ্গে বাসা ভাড়া নিচ্ছি।’
ওরা দুজন একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়, সেই পুরোনো বাসাটায় নয়, বরং ওয়্যারলেস গেটের এক নতুন অ্যাপার্টমেন্টে। তবে অফিসে যাওয়ার সময় আলাদা হয়ে যায়। মাহদির শিফট বদলে যাওয়ার কারণে, কখনও তারা একসঙ্গে বাসায় ফিরত, কখনও আলাদা।
জাহানারার মাঝে মাঝে চিন্তা হয়, এই সিদ্ধান্ত কি একদিন বিপজ্জনক হয়ে উঠবে ? কিন্তু মাহদি তাকে আশ্বস্ত করে, ‘আমি সাবধান থাকি। অফিসে কেউ কিছু জানে না।’
তারা একটা ছোট্ট মেয়েকে রাখে ঘরের কাজের জন্য। সে মেঝে ঝাড়ু দেয়, বাসন মাজে, কাপড় কেচে দড়িতে শুকায়, মশলা বাটে আর সবজি কেটে রাখে। জাহানারা সকালে একটু বেশি করে ভাজি রান্না করে যাতে দুপুরের খাবার হিসেবে সেটাই নিতে পারে। মাহদি আগের মতোই ক্যাফেটেরিয়ায় খায়।
জাহানারা বেশ আনন্দেই থাকে, কিন্তু মনের গভীরে একটা অদ্ভুত শূন্যতাও অনুভব করে।
কেন মাহদি কখনওই বিয়ের প্রসঙ্গ তোলে না ?
প্রতিটি সপ্তাহান্তে সে বাসায় যায়। যাবার সময় তার ব্যাগে থাকে পুরো সপ্তাহের বাজার আর ফেরার পথে সে নিয়ে আসে ভিন্ন কিছু পোশাক।
চার মাস পর মাহদি বলে, ‘আমাকে বাড়ি যেতে হবে। আব্বার শরীর ভালো না।’
জাহানারা কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে বলে, ‘কদিন থাকবে ?’
‘আশা করি অল্প কয়েক দিনের ব্যাপার’।
জাহানারা মাথা ঝাঁকায়, ‘ঠিক আছে, সমস্যা হবে না।’
দুপুরে যখন জাহানারা অফিসে তখনই মাহদি রওনা হয়। তাদের দুজনের কাছেই বাসার চাবি থাকে, তাই একা ফিরতে জাহানারার কোনও সমস্যা হয় না। মাহদি পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও ফিরে আসে না। প্রতি সপ্তাহান্তে জাহানারা বাড়ি ফিরে সেদিনও সেভাবেই ফেরে আসে। মায়ের কাজে সাহায্য করে। কাপড় ধোয়, রান্না করে, খানিকটা সেলাইও করে। কিন্তু তার সমস্ত মন আর মনোযোগ পড়ে থাকে মাহদির প্রতি। সে কি এতই ব্যস্ত যে একবারও ফোনও করতে পারে না ? নাকি তার বাবার অবস্থা এতটাই খারাপ যে কথা বলার সময়ই পাচ্ছে না ?
পরদিন, অফিসে ঢুকে সে আশায় থাকে হয়তো আজ মাহদি ফিরে এসেছে। ডেস্কে বসে দুপুরের খাবার খেতে খেতে সে যখন ভাজি আর চাপাটি মুখে দিচ্ছে তখনই শুনতে পায় মনির বলছে―
‘মাহদি ছুটি নিয়েছিল অসুস্থ বাবাকে দেখতে। এখন সে আরেক সপ্তাহের ছুটি বাড়িয়েছে, কারণ সে বিয়ে করেছে।’
জাহানারা থমকে যায়।
‘কার কথা বলছেন ?’
অফিসবয় পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, হাতে চায়ের কাপ। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলে, ‘আপা, আপনে জানেন না ? মাহদি ভাই বিয়ে করছে!’
না, অসম্ভব! মাহদি কখনও এমন করতে পারে না। এক মুহূর্তে তার সব কিছু ওলট-পালট হয়ে যায়। ব্যাগের ভেতরে থাকা চারটি পিঠার কথা মনে পড়ে, মা ভালোবেসে বানিয়ে দিয়েছে শিরিন আখতারের জন্য। পুরো দিনটা যেন এক ঘোরের মধ্যে কেটে যায়। যন্ত্রের মতো কাজ করে যায়। সে কোনও কিছুই ভাবতে চায় না, কোনও কিছুই অনুভব করতে চায় না। কিন্তু যখনই চোখ তুলে তাকায় তখনই মনে হয় সবাই যেন করুণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তারা কি কিছু আঁচ করতে পেরেছে ? হয়তো কেউ জানে না পুরোটা, কিন্তু সবাই নিশ্চয়ই কিছু একটা অনুমান করছে।
ডেস্ক গুছিয়ে ছোট ব্যাগটা হাতে নিয়ে সে অফিস থেকে বের হয়। মন বলে, সহকর্মীরা নিশ্চয়ই ভুল বলছে। মাহদি তো বলেছিল, সে তাকে ভালোবাসে!
কিন্তু তখনই একটা তীক্ষè অনুভূতি তার বুক চিরে দিয়ে যায়, সে কখনওই বিয়ের কথা বলেনি।
একবারও না।
সিঁড়ির পথটা অন্ধকার। যদিও বাড়িওয়ালা লোহার জাল দিয়ে বাতিটা ঘিরে রাখে তবু কেউ আবারও বাতিটা খুলে নিয়ে গেছে, জাহানারা একটু কষ্ট করেই চাবি বের করে তালা খোলে, ভেতরে ঢুকে আলো জ্বালে, ঘরটা অদ্ভুতভাবে ফাঁকা। মাহদি গ্রামে যাওয়ার সময় তার টয়লেট সামগ্রী, কিছু জামাকাপড় আর স্যান্ডেল নিয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু এখন ?
আলনাতে একটাও মাহদির জামা নেই তার! তার গোছানো শাড়িগুলোর পাশে, যেখানে মাহদির কাপড় থাকত, সেখানে এখন শুধু শূন্যতা। বড় লাগেজটাও নেই। টেবিলে একটা ময়লা চায়ের কাপ পড়ে আছে। মাহদি নিশ্চয়ই এসেছিল, চা বানিয়ে খেয়েছে, কিন্তু ধুয়ে রাখার প্রয়োজন বোধ করেনি। চুলার ওপর ছোট্ট কালো হয়ে যাওয়া কেতলিটা পড়ে আছে, ভেতরে বাসি চায়ের পাতা। রান্নাঘরের ভালো মেলামাইনের কাপ-প্লেট, কারি বাটি, ভাতের বাটি, সবই গায়েব।
শুধু কিছু ছোটখাটো জিনিস রয়ে গেছে, যা জাহানারা কিনেছিল।
বিছানায় বসে পড়ে সে। সেই সূক্ষ্ম কাজ করা কাঁথাটা, যেটা একদিন বৃষ্টিতে ভিজে গায়ে জড়িয়ে নিয়েছিল, সেটাও নেই। শুধু তার কেনা চাদরটা পড়ে আছে, সঙ্গে মিলিয়ে কেনা বালিশের কভার। তীব্র কষ্টে তার চোখের সব জল শুকিয়ে গেছে। তাকে কি কাঁদতে হবে ? নাকি সে একরকম বোবা যন্ত্রণার ভেতর স্থবির হয়ে গেছে ?
সে বিশ্বাস করেছিল মাহদিকে, কিন্তু মাহদি ছিল আর দশজন পুরুষের মতোই। সে জাহানারার সঙ্গে রাত কাটিয়েছে, কিন্তু বিয়ে করেছে ‘ভদ্র মেয়ে’কে। জাহানারা ‘ভদ্র মেয়ে’ ছিল না। সে ছিল এক ‘পতিতা’, এক ‘পতিত নারী’। পুরুষেরা কখনও পতিত হয় না, তারা যা-ই করুক না কেন। জাহানারা শুধু তার মান-সম্মানই নয়, নিজের পরিবারকেও মিথ্যা বলে এই সম্পর্কে জড়িয়েছে।
এখন তার চোখে ভেসে ওঠে বাবার অসহায় মুখ, মায়ের নিরীহ বিশ্বাসী চেহারা। সে ব্যাগ থেকে সেই কৌটা বের করে, যেখানে মা যত্ন করে শিরিন আখতারের জন্য বানানো পিঠাগুলো দিয়েছে। সে ক্ষুধার্ত। সে ধীরে ধীরে একটা পিঠা বের করে। মুখ শুকিয়ে আসছে, তবু এক কামড় খায়।
আস্তে আস্তে চিবোয়। তারপর ব্যাগ থেকে নিজের আনা কাপড়গুলো বের করে, যন্ত্রের মতো আলনাতে গুছিয়ে রাখে। সারাদিনে শুধু দুপুরের ভাজি-চাপাটি আর একটা পিঠা খেয়েছে সে। যদিও তার মনে হচ্ছে বিছানায় গুটিয়ে পড়ে থাকা আর মরণ ছাড়া তার আর কিছু করার নেই, তবু জাহানারা ওঠে। একটা ছোট হাঁড়িতে খিচুড়ি বসায়। মাহদি চলে যাওয়ার পরও কয়েকটা হাঁড়ি আর কিছু চাল-ডাল পড়ে আছে। পেয়াজ, শুকনো মরিচ, সরিষার তেল সবই আছে ছোট্ট রান্নাঘরে।
রান্না করতে করতে এক মুহূর্তের জন্য মন চলে যায় সেই বৃষ্টিভেজা রাতে, যেদিন মাহদি নিজেই খিচুড়ি রান্না করেছিল। সেদিন গায়ে একটা কাঁথা মুড়ি দিয়ে সে খিচুড়ি খেয়েছিল। সেটাই ছিল তার ‘বিবাহের রাত’, যদিও সেখানে ফুলে সাজানো খাট ছিল না, ছিল না কোনও চঞ্চল বন্ধু বা বোনের লুকোচুরি, ছিল না দোরগোড়ায় আঁকা আলপনা। এখন কি সে এই বাসায় থাকবে ? থাকা সম্ভব ? মাহদি কি বাড়িওয়ালাকে বলেছে যে সে চলে যাচ্ছে ? নাকি বলেছে, ‘আমরা’ চলে যাচ্ছি ?
জাহানারা যথারীতি পরদিন সকালে কী পরবে, সেটা বের করে গুছিয়ে রাখে। তারপর খেতে বসে। গরম খিচুড়ি মুখে দেয়। এই খিচুড়ির স্বাদ সেই রাতের খিচুড়ির মতো নয়, তবু সে খায়। কারণ, তাকে শক্ত হতে হবে। বেঁচে থাকতে হবে। বেঁচে থাকাটাই প্রতিশোধ। বেঁচে থাকাটাই শক্তি। সে বাকি খিচুড়িটা রেখে দেয় সকালের জন্য।
সকাল ছয়টায় পরিচারিকা দরজায় কড়া নাড়ে, যেমন সে প্রতিদিন নাড়ে। জাহানারা দরজা খুলে বলে, ‘আজ কোনও কাজ নেই তোমার। মাসের শেষে তোমার টাকা দিয়ে দেব।’
তারপর হঠাৎ মনে পড়ল, মাসের শেষ দিনটা পড়েছে শুক্রবারে। তাই বলে, ‘একদিন আগেই রাতে এসো, তখন সব পরিশোধ করে দেব।’
সিঁড়ির নিচে বাড়িওয়ালার সঙ্গে দেখা হয়।
তিনি কিছুটা সহানুভূতির সুরে বললেন, ‘তোমার শ্বশুরের শরীর খারাপ শুনেছি। তাই তোমার স্বামী গ্রামে গেছে। তোমরা মাসের শেষে বাসা ছেড়ে দিতে পারো। তুমি একা থাকতে পারবে তো ?’
মাহদি অন্তত ভান ধরে রেখেছে, কিন্তু এটাও সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা এই ফ্ল্যাটে থাকছে না। জাহানারা ভাবল আর এখন মাত্র দশ দিন সময়। দশ দিনের মধ্যে এ বাসা ছেড়ে তাকে ফিরে যেতে হবে নারায়ণগঞ্জে, আবার সেই ক্লান্তিকর আসা-যাওয়া। শিরিন বানু বা আখতার জাহান-এর সঙ্গে মিলে কোথাও একটা ছোট বাসা ভাড়া নিয়ে ঢাকায় থাকতে পারলে জীবনটা অনেক সহজ হতো।
কিন্তু এই বাসায় একা থাকা সম্ভব নয়। এমনকি শিরিন বা আখতার কেউ রাজি হলেও, তাদের অন্য কোথাও বাসা নিতে হবে। তাহলে বাড়িওয়ালা বুঝে ফেলবে, সে আর মাহদি আসলে স্বামী-স্ত্রী ছিল না। জাহানারা মাহদিকে আবার ফোন করে। না, ফোন যাচ্ছে না। পুরো সপ্তাহটা যেন ধোঁয়াশায় মতো যায়। তার অফিস যেতে ইচ্ছে করে না, কিন্তু কাজ করতে হবে। তার টাকা দরকার। তার পরিবারের টাকা দরকার।
আগে দুজনের জন্য রান্না করত, এখন শুধু নিজের জন্য। রাতে যা রান্না করে, সেটাই সকালে খায়। দুপুরে অফিসে চাপাটি-ভাজি, না হয় মোড়ের দোকান থেকে দুটা কলা আর এক পিস পাউরুটি খেয়ে নেয়। মাস শেষ হলেই তাকে বাসা খালি করে দিতে হবে। সে গোছাতে শুরু করে।
শিরিন আর আখতারের সঙ্গে সে আলোচনা করে একসঙ্গে বাসা নেওয়ার বিষয়ে। শিরিন জানায়, সে তিনজন মেয়ের সঙ্গে মিলে একটা বাসায় থাকে। আখতার গাজীপুর থেকে আসে। সে জানায় সে চেষ্টা করবে। কিন্তু, প্রথমে তাকে মা-বাবার অনুমতি নিতে হবে।
মাহদির বিয়ে করার সংবাদ জানার এক সপ্তাহ পর, জাহানারা সেই চেনা গলার আওয়াজ শুনতে পায়।
অফিসের ওপাশ থেকে ভেসে আসছে মাহদির কণ্ঠস্বর।
তার হৃৎস্পন্দন থমকে যায়। কাঁধের ওপর দিয়ে সে তাকায়।
হ্যাঁ, মাহদি!
সেই একই চেনা হাসি, কিন্তু তার মুখের আত্মতুষ্টিতে তাকে কুৎসিৎ দেখাচ্ছে। মাহদি একজন অতিথির সঙ্গে গল্প করছে। জাহানারার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই তার হাসিটা মিলিয়ে যায়। মুখে এক মুহূর্তের জন্য অপরাধবোধের ছাপ ফুটে উঠে। কিন্তু, সে কিছু বলে না। তার দিকে আর একবারও না তাকিয়ে সে চেয়ার ঘুরিয়ে বসে। ঠিক তখনই, জাহানারার চোখে পড়ে―তার আঙুলের ডগায় লাল মেহেদির দাগ!
জাহানারা ভাবে অফিসবয়কে কলা আর এক পিস পাউরুটির জন্য পাঠাবে, ঠিক তখনই মাহদি তার পাশে এসে দাঁড়ায়―
‘চলো, ক্যাফেটেরিয়ায় লাঞ্চ করি।’
প্রথমে মাথা নাড়তে গিয়েও শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে যায় জাহানারা।
এখনও দুপুর হয়নি। ক্যাফেটেরিয়ার কর্মী জানায়, খাবার প্রস্তুত হতে আরও দশ মিনিট লাগবে। সুযোগ বুঝে, নরম কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে জাহানারা বলল, ‘তুমি ফোন ধরোনি কেন ?’
মাহদি একটু ইতস্তত করে, তারপর বলে, ‘আমি দুঃখিত। কিন্তু আমি আর কী করতে পারতাম ? আব্বা খুব অসুস্থ ছিলেন, আর মা চাচ্ছিলেন বাবার কিছু একটা হয়ে যাবার আগে আমার বিয়ের এনগেজমেন্ট হয়ে যাক। কিন্তু মেয়ের পরিবার এনগেজমেন্ট করাতে রাজি না। তারা সরাসরি আকদ করাতে চায়।’
‘তুমি শুক্রবার বাসায় আসলে, তুমি জানো যে তখন আমি বাসায় থাকব না।’ ওয়েটার ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের ট্রে নিয়ে আসে। জাহানারা চুপ হয়ে যায়।
ওয়েটার চলে গেলে মাহদি বলে, ‘কিন্তু তোমার প্রতি ভালোলাগা বদলায়নি, আমরা এখনও আগের মতো দেখা করতে পারি।’
জাহানারা হালকা হাসল। তিক্ত, বিষাক্ত হাসি।
‘ছিঁচকে চোরের মতো তোমার কাপড়গুলো আলনা থেকে লুকিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরও ?’
সন্ধ্যায় মাহদি আবার তাকে বাসায় নামিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করে। জাহানারা কিছু না বলে মাথা নাড়ে। তারপর টেম্পোতে উঠে বসে। মোটরবাইক চালিয়ে মাহদি পাশ দিয়ে চলে যায়।
জাহানারা তাকিয়ে থাকে, সে এখন কোথায় থাকে ? পুরুষদের জন্য জীবন কত সহজ! তারা যে কোনও জায়গায় থাকার জায়গা খুঁজে নিতে পারে।
যেখানে নেমে প্রতিদিন সে হেঁটে যায় সেই রাস্তার মোড়ের ফার্মেসিটা তার নজরে পড়ে। এখানে মাঝে মাঝে সে এসেছে কখনও অ্যাসপিরিন কিনতে, কখনও উইসপার প্যাড নিতে। আজ কিছুই দরকার নেই। সে কাউন্টারের কাছে গিয়ে কিছু ট্যাবলেট চাইল। সেলসম্যান তাকিয়ে বলল, ‘আমরা পাঁচটার বেশি দিতে পারি না।’ জাহানারা নির্বিকারভাবে ট্যাবলেট নেয়। তার কোনও সমস্যা নেই। আরও কয়েকটা ফার্মেসি থেকে কিনে নেবে।
পরদিন অফিসে মাহদি বার বার তার ডেস্কের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে। অজান্তেই হাত ছুঁয়ে যায় তার চুল, তার পাশে উষ্ণ নিশ্বাস, মাহদির কণ্ঠ ঠিক আগের মতোই মোলায়েম, উষ্ণ আর স্বস্তিদায়ক। কিন্তু তার ভালোবাসা মরে গেছে।
সেই সন্ধ্যায়ও মাহদি তাকে বাসায় নামিয়ে দিতে চায়। জাহানারা এবারও মাথা নাড়ে।
পরদিন, মাহদি আবারও তাকে লাঞ্চে আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু এবার, জাহানারা খেয়াল করে অফিসের সহকর্মীরা তাকিয়ে আছে। তারা সবাই জানে, মাহদি এখন বিবাহিত। তাদের চোখের ভাষা পরিষ্কার। তারা এই ঘনিষ্ঠতা পছন্দ করছে না। কারণ, সবারই ধারণা নারী-পুরুষের সম্পর্ক কখনওই শুধু বন্ধুত্ব হতে পারে না। জাহানারা সহকর্মীদের দৃষ্টি উপেক্ষা করে। সে কী করবে তারা তা বলে দিতে পারে না।
সে মাথা ঝাঁকায় এবং উঠে দাঁড়ায়। আজ বৃহস্পতিবার।
ক্যাফেটেরিয়ায় আজ স্পেশাল তেহারির দিন।
মাহদি দুজনের জন্য দুই প্লেট তেহারি অর্ডার করে।
খাবার সার্ভের জন্য তারা অপেক্ষা করে। জাহানারা শান্ত স্বরে বলে, ‘কাল মাসের ত্রিশ তারিখ। আমার ফ্ল্যাটে থাকার শেষ দিন। আজ সন্ধ্যায় তুমি আমাকে বাসায় নামিয়ে দিতে পারবে ?’
অফিস শেষে মাহদি অপেক্ষা করে বাইরের রাস্তায়। জাহানারা মোটরসাইকেলে উঠে, হাত রাখে তার কাঁধে।
এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হয়―যদি সত্যিই আমাদের বিয়ে হতো, তাহলে আমি নির্ভয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতাম।
জাহানারা ব্যাগ থেকে চাবি খুঁজে বের করার আগেই মাহদি চাবি বের করে। সে লাইট জ্বালায়। আলোতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ঘরের ভেতরের শূন্যতা। মাহদি তাকিয়ে থাকে।
জাহানারা বলে, ‘আগামীকাল চলে যাব। এত ভাড়ায় আমি এখানে থাকতে পারব না।’
‘তুমি কী করবে ? কোথায় যাবে ?’
‘নারায়ণগঞ্জ ফিরে যাব।’
তারপর এক মুহূর্ত থেমে, জিজ্ঞেস করে, ‘যাওয়ার আগে তুমি এক কাপ চা খাবে ?’
‘আমি ভেবেছিলাম…’
‘তুমি ভেবেছিলে… ?’
‘আমরা একসঙ্গে রাতের খাবার খাব, আগের মতো ?’ ‘কিন্তু আমরা তো বাজার করিনি। আমার কাছে সামান্য একটু চাল-ডাল আছে।’
‘আমি খেতে আসিনি।’ মাহদি বলল।
জাহানারা অফিসের শাড়ি বদলে নরম সুতির শাড়ি পরে। তারপর চা বানায়।
মাহদি চায়ে চুমুক দেয়, তারপর বলে, ‘তুমি খাবে না ?’
‘তুমি চা খাও, আমি ততক্ষণে খিচুড়ি বসিয়ে দিই।’
পেঁয়াজ কেটে, চাল-ডাল ধুয়ে চুলায় খিচুড়ি বসায়।
তারপর আলতো স্বরে বলে, ‘খিচুড়ি রান্না হতে হতে তুমি একটু শুয়ে বিশ্রাম নিতে পারো।’
খিচুড়ি রান্না শেষ হবার আগেই মাহদি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
জাহানারা নিঃশব্দে একা বসে খিচুড়ি খায়। প্রতিদিনের মতোই খিচুড়ির পাতিল নেটের ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখে। যাতে সকালে খাওয়ার উপযোগী থাকে। তারপর মাহদিকে জীবনের প্রথম এবং শেষ চিঠিটি লিখতে শুরু করে।
মাহদি,
আমি তোমাকে মেরে ফেলতে পারতাম, চেয়েওছিলাম। কিন্তু তারপর ভাবি, যদি সেটা করি, তাহলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ আমাকে নিয়ে যাবে। আমার জীবন অনেক মূল্যবান, আমি নিজেকে শেষ করতে পারি না। যখন ঘুমের ওষুধ কিনেছিলাম, তখন ভেবেছিলাম, লজ্জায় মরে যাব। কিন্তু আমি মরিনি। মরিনি যে কারণে, ঠিক সেই একই কারণে, তোমাকেও খুন করিনি।
একজন নারী যদি এমন কিছু করে, তাহলে সে ‘পতিতা’, ‘পতিত নারী’। কিন্তু একজন পুরুষ যদি এমন কিছু করে, তাহলে সে ‘পতিত’ হয় না কেন ?
যদি তোমার বিন্দুমাত্র বিবেক থাকে, তাহলে আমার সামনে তোমার মেহেদি রাঙা আঙুল তুলবে না। আমার কানের কাছে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে বউয়ের গল্প বলবে না। আমার ডেস্কে এসে ইচ্ছাকৃতভাবে আমার হাত, আমার গাল, আমার চুল স্পর্শ করবে না, লাঞ্চের জন্য ডাকবে না, কিংবা বাসায় পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব দেবে না।
আজ সকালে আমি আমার পদত্যাগপত্র দিয়ে দিয়েছি। সামনের মাসে এ অফিস ছেড়ে দেব। তোমার জীবন থেকেও অদৃশ্য হয়ে যাব। আমি তোমাকে একটা ঘুমের বড়ি দিয়েছি। চাইলে আরও দিতে পারতাম। তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা নিয়ে তুমি খুব আত্মবিশ্বাসী ছিলে।
না, মাহদি। আমার ওপর তোমার আর কোনও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নেই। তুমি যদি আমাদের সম্পর্ক নিয়ে বন্ধু অথবা আমাদের সহকর্মীদের সঙ্গে ঠাট্টা করো, তাতেও আমার কিছু যায় আসে না। আমি ওগুলোকে গোনায় ধরি না। যদি তুমি আমাকে বিদ্রƒপও করো তবু মনে রেখো―আমি সাধারণ মেয়ে নই। একজন সাধারণ মেয়ে নিজেকে অথবা তার বিশ্বাসঘাতক প্রেমিককে মেরে ফেলত।
সবসময় মনে রেখো আমি মরিনি, তোমাকেও মারিনি। এটাই আমার শক্তি। কাল সকালবেলা যখন তুমি ঘুম থেকে উঠবে, আমি থাকব না। তুমি আমাকে আর দেখতে পাবে না। বাড়িওয়ালাকে কী বলবে, সেটা তোমার ব্যাপার। তোমার স্ত্রীকে কী বলবে, সেটাও তোমার ব্যাপার। ঘুমের ওষুধের পাতাটা এখানেই রেখে যাচ্ছি। আমি তোমাকে যা করতে পারতাম, তার প্রমাণ।
সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ



