আর্কাইভপ্রচ্ছদ রচনা

সম্পাদক বীরবল ও লেখক বিশ্বকবি প্রমথনাথ ও রবীন্দ্রনাথ : ড. সুরঞ্জন মিদ্দে

প্রচ্ছদ রচনা : বাংলা ভাষার ঐতিহ্যবাহী সাহিত্যপত্র

সবুজপত্র : বিশ শতকের আধুনিক নবপত্র

বাংলা সাহিত্যের নব্যতন্ত্রী। নতুন রূপ ও রীতির অগ্রপথিক। রূপে, প্রখর বুদ্ধিদীপ্তিতে ও মননশীলতায় তিনি ছিলেন অনন্য যাত্রী। রুচিতে ও সাহিত্যের নব্যধারার প্রবর্তক প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬)। তাঁর জন্মভূমি পূর্ববঙ্গের যশোর, মানসিক ভাষা গঠন হয়েছিল কৃষ্ণনগরে আর সাধনতীর্থ কলকাতায়। তিনি নিজেই বলেছেন―আমি জন্মেছিলুম পদ্মারপারের বাঙ্গাল, কিন্তু আমার মুখে ভাষা দিয়েছে কৃষ্ণনগর। কৃষ্ণনগর প্রমথ চৌধুরীকে দিয়েছে ভাষা ও রূপজানের মোহনমন্ত্র। কীর্তিমান হয়েও তিনি কৃষ্ণনগরকে ভুলতে পারেননি। বারবারই তিনি ‘কৃৃষ্ণনাগরিক’ বলে আত্মপরিচয় দিয়েছেন। শুধু কৃষ্ণনগর নয়, সেই সঙ্গে ঠাকুর পরিবারের বিদগ্ধ পরিবেশ তাঁর মন ও রুচিকে সৃষ্টি করেছিল।

নব্যযুগের অগ্রপথিক প্রমথ চৌধুরী বিএ-তে প্রথম এবং এমএ-তেও প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। পিতা ছিলেন হিন্দু কলেজের ছাত্র। ইংরেজি সাহিত্যের বিপুল সম্ভারে গড়ে উঠেছিল তাঁদের পারিবারিক গ্রন্থাগার। তাঁর বই কেনা ও বই পড়ার স্বভাব পারিবারিক ঐতিহ্য থেকে গড়ে উঠেছিল। সঙ্গীত, সাহিত্য ও চিত্রকলা―সংস্কৃতির এই তিন ধারার সম্মিলনে তাঁর যৌবনের মনোজীবন সমৃদ্ধ হয়েছিল। চিন্তার মৌলিকতা ও রচনারীতির নতুনত্ব তাঁর ছাত্রজীবন থেকেই প্রকাশ ঘটেছিল। তিনি চিন্তার চর্চা করেছেন আজীবন।

প্রমথ চৌধুরী ‘বীরবল’ ছদ্মনাম গ্রহণ করেছিলেন। মোগল সম্রাট আকবরের সভার অন্যতম সভাসদ সুরসিক বীরবলের ওপর তাঁর আকর্ষণ শৈশব থেকেই। বীরবল সভাসদ ছিলেন ও রসিকতার মাধ্যমে সত্যকথা বলতেন। বীরবলের এই বৈশিষ্ট্যের জন্য প্রমথ চৌধুরী বীরবল ছদ্মনাম গ্রহণ করেন। আসলে প্রমথ চৌধুরী ছিলেন রসরুচির সম্রাট। তিনি বই পড়েছেন বহু, কিন্তু লিখেছেন খুবই কম। জুলিয়াস সিজারের মতো পরিণত বয়সে কলম ধরেছেন। সিদ্ধিলাভ করেছেন দ্রুত। পরিণত মন  এবং অভিজ্ঞতার ভান্ডার নিয়ে, বাংলা সাহিত্যে প্রকাশিত হয়েছেন―ধূমকেতু হিসেবে না, ধ্রুবতারা হিসেবে স্থায়ী আসন পেয়েছেন। প্রমথ চৌধুরী ও সবুজপত্র (১৯১৪) আজ প্রায় সমার্থবোধক হয়ে উঠেছে। সবুজপত্র নাম ও পত্রিকার মলাটের সবুজ রং ছিল- চিরযৌবনের প্রতীক। সবুজ তারুণ্যের বর্ণ, প্রাণধর্মের বর্ণপত্র―‘ও প্রাণায় স্বাহা’ বাণীটি ছিল সবুজপত্রের মূলমন্ত্র। সবুজপত্র পত্রিকা যুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর যুগের বিদ্রোহী সন্তান। নব্যতন্ত্রী সাহিত্যিকদের প্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠেছিল সবুজপত্র। বাংলা গদ্যের অভিনব রচনারীতি ছাড়াও কালের দিক থেকে বিশ শতকের সাময়িকপত্রের ইতিবৃত্তে ঐতিহাসিক মূল্য আছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে ‘নোবেল’ পুরস্কার পেয়ে গেছেন। বন্ধুত্ব ও আত্মীয়তা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছিলেন। সবুজপত্র সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মতামত অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য―

‘আমি যখন সাময়িকভাবে চালনায় ক্লান্ত এবং বীতরাগ, তখন প্রমথর আহ্বানমাত্রে সবুজপত্র বাহকতায় আমি তাঁর পার্শ্বে এসে দাঁড়িয়েছিলুম। প্রমথনাথ এই পত্রকে যে একটি বিশিষ্টতা দিয়েছিলেন তাতে আমার তখনকার রচনাগুলি সাহিত্য-সাধনায় একটি নতুনপথে প্রবেশ করতে পেরেছিল।’

বাংলা সাময়িক পত্রিকার ইতিহাসে সবুজপত্র বৈশিষ্ট্য এবং স্বাতন্ত্র্যে উল্লেখযোগ্য মাত্রা দিয়েছে। যেমন―

প্রথমত―পত্রিকার প্রচলিত রীতি পরিহার করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত―বিজ্ঞাপন, ছবি, ‘ফিচারা’ নয়নরঞ্জন কিছু থাকবে না।

তৃতীয়ত―কোনও ব্যবসায়িক বুদ্ধি ছিল না।

চতুর্থত―আভিজাত্য ও কৌলিন্য, রসভোগ্য রুচি ফুটে উঠেছে।

পঞ্চমত―আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নব্যতন্ত্রী সাহিত্যের গতিপথ।

ষষ্ঠত―বক্তব্য ও বলার অভিনব স্টাইল, সবুজপত্রের প্রাণ।

সপ্তমত―সবচেয়ে বড় কাজ ভাষা আন্দোলন। কথ্যভাষায় সাহিত্যচর্চা।

প্রকৃতপক্ষে সবুজপত্রই বিশ শতকের সর্বপ্রথম পত্রিকা। শুধু সর্বপ্রথম নয়, আধুনিকতার অগ্রপথিক। আধুনিক চিন্তাধারার, আধুনিক জিজ্ঞাসার বাহন হিসেবে সবুজপত্রের ঐতিহাসিক মূল্য, স্মরণীয়। বিশ শতকের আধুনিক ভাবনাকে সর্বপ্রথম স্পষ্টকণ্ঠে উচ্চারণ করেছে। সবুজপত্র নতুনের অভিযাত্রী। শুধু সবুজপত্রের সম্পাদক নন, রবীন্দ্রনাথ থেকে সবুজপত্রের তরুণতম লেখক পর্যন্ত সকলেরই কলমে নতুন ফসল ফলেছিল। শব্দ সৃষ্টির নতুন ফসলের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ভঙ্গি ও আঙ্গিকের বৈচিত্র―সর্বস্তরে পুরোনো ভাবনা বর্জন করে নতুন পথে সাহিত্য সৃজন করা সবুজপত্রের ধ্যানসাধনা। প্রচলিত পথের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সবুজপত্র বাংলা সাহিত্যে বিচিত্র পথে বৈচিত্র্য এনেছে। সবুজপত্রের পথ মুক্ত, মন মুক্ত, ‘তোমার লেখনী তোমার নিজের আজ্ঞাবহ’। সবুজপত্র এগিয়ে গেছে, বিতর্কসঙ্কুল পরিবেশের মধ্যে। বহু প্রচলিত পথ ছেড়ে পরীক্ষামূলক নতুন পথেই অভিযাত্রা করেছে। দেশ-কালের সেই ঐতিহাসিক সন্ধিলগ্নে সবুজপত্র নানা রচনায় আত্মপ্রকাশ করেছে। সবুজপত্রের তরুণ লেখক অতুলচন্দ্র গুপ্তের ভাষায় বলা যায়―‘প্রগতিসাহিত্য’ বা ‘সমাজচেতন সাহিত্য’।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বাঙালির মননে পরিবর্তনের নতুন প্রকাশের বেদনায় উৎকণ্ঠিত ছিল। পাশ্চাত্য ভাবনার শুধু ভাবগত প্রভাবই নয়, পাশ্চাত্যের বিচিত্র রূপ ও রীতির অনুসরণ, সবুজপত্রের লেখকদের মধ্যে স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে―বঙ্কিমচন্দ্রের বঙ্গদর্শন। বঙ্গদর্শন (১৮৭২) পত্রিকার মাধ্যমে বঙ্কিমচন্দ্র স্বয়ং ইউরোপীয় চিন্তাধারা, বাংলা সাহিত্যে সঞ্চারিত করতে সচেষ্ট ছিলেন। দেশ-বিদেশের জ্ঞান-বিজ্ঞান বাঙালির মনোজীবনকে সরস করে তুলেছিল। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে―দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে সবুজপত্র এবং বঙ্গদর্শন পত্রিকার পার্থক্য প্রত্যক্ষভাবে প্রকাশিত হয়েছে―বঙ্গদর্শন পত্রিকার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল প্রধানত দুটি―প্রথমত, ‘বাঙালী যে ইংরাজের অনুকরণ করে ইহাই বাঙালীর ভরসা। দ্বিতীয়ত, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ভাব-সাধনার একটি সমন্বয় সাধনালয়।’ আর সবুজপত্রের (১৯১৪) সূচনায় সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী লিখেছেন―ভাবের বীজ যে দেশ থেকেই আনো না কেন, দেশের মাটিতে তার চাষ করতে হবে। … আমাদের পূর্ব কবি হচ্ছে কালিদাস, কাশীদাস নয়। দ্বিতীয়ত বাংলা সাহিত্যের নবসাহিত্য রাজধর্ম ত্যাগ ক’রে গণধর্ম অবলম্বন করেছে। বাংলা সাহিত্যের অচলায়তন ভাঙার ব্রত পালন করেছিল সবুজপত্র। সবুজপত্রের মাথার ওপর ছিল―চিরযৌবনের কবি রবীন্দ্রনাথের দক্ষিণপাণি। আধুনিক মনন ও আধুনিক আত্মজিজ্ঞাসা নিয়ে সবুজপত্র তার আধুনিক বীক্ষণ শুরু করেছিল।

সবুজপত্রের জীবনসীমা খুব দীর্ঘ নয়। কিন্তু ইতিহাসের একটি বিশেষ কাললগ্নে সবুজপত্র চিরসবুজ হয়ে আছে―যেন ‘সবুজ, বাংলার দেশজোড়া রঙ নয়, বারোমেসে রঙ’। সেই সবুজ সতেজ পত্র বিশ শতকের প্রারম্ভে যার যাত্রা, শুরুতেই প্রমথ চৌধুরী তার পার্থ, স্বয়ং বিশ্বকবি তার পার্থসারথী। সবুজপত্র পত্রিকায় গড়ে উঠেছিল একদল তরুণ লেখকগোষ্ঠী। পুস্তক সমালোচনার একটি যথার্থ মানদণ্ড গড়ে উঠেছিল সবুজপত্রের অকৃত্রিম হৃদয় সাম্রাজ্যে। অতুলচন্দ্র গুপ্ত, কিরণশঙ্কর রায়, সতীশচন্দ্র ঘটক, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বিশ্বপতি চৌধুরী, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়সহ উল্লেখযোগ্য আরও তরুণ লেখক সবুজপত্রের ভুবনে আজও সবুজ হয়ে আছেন। সবুজপত্র স্বল্পস্থায়ী হলেও যুগান্তকারী অবদান রেখেছে। সবুজপত্রের লেখকদের বাংলা গদ্যরীতির ছাপ পরবর্তী লেখকদের ওপরে পড়েছে। বিশ শতকের ঐতিহাসিক মহাসন্ধিক্ষণে সবুজপত্রের জন্ম না হলে, বাংলা গদ্যের আদর্শের পথ অনেকটা পিছিয়ে যেতো। প্রমথ চৌধুরীর সবুজপত্র জ্ঞানমার্গ ও বৃদ্ধিমার্গের দীপ্ত হোমানল জ্বালিয়ে বাংলা সাহিত্যকে অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছিল। বাক-বৈদগ্ধ মজলিসী মন, অভিজাত মানসিকতা, বুদ্ধিদীপ্ত মনন, উচ্চাঙ্গের হাস্যরস পরিবেশন করে, সবুজপত্র বাংলা সাহিত্যকে ভিন্ন মাত্রা দান করেছিল। শুধু সাহিত্য নয়, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, দর্শন, তুলনামূলক সাহিত্য দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছিল সবুজপত্র। এমনকি সবুজপত্র বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথকেও প্রভাবিত করেছিল। বাংলা গদ্যের বৈচিত্র্যহীনতা আর শিথিলতাকে গতিদান করে সবুজপত্র বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে উজ্জীবিত করেছিল।

বিচিত্র প্রমথ : বীরবলী রসিক

বিষয়ের নানামুখী বৈচিত্র্যে এবং প্রকাশরীতির অভিনবত্বে, তিনি বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন। প্রবন্ধ রচনাতে তিনি কথকের রীতিকেই ব্যবহার করেছেন, তাই ‘রায়তের কথা’র মতো নীরস বিষয়ও সরস ও সুখপাঠ্য হয়ে উঠেছে। সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরীর প্রবন্ধাবলী বিচিত্র বিষয়কে কেন্দ্র করে চিত্রিত হয়েছে। প্রবন্ধ সাহিত্যের সীমানা সবচেয়ে বিস্তৃত এবং অভিনব পথে প্রবাহিত করেছেন। বাংলা সাহিত্যে প্রমথ চৌধুরী সাহিত্য সমালোচক হিসেবে সর্বপ্রথম সামনে আসেন। তাঁর প্রবন্ধ আজীবন ক্ল্যাসিক্যাল বাঁধুনির পক্ষপাতী। সেই সঙ্গে ভাবাবেগমুক্ত বিশ্লেষণ, শ্লেষাত্মক তির্যকদৃষ্টি, তাঁকে সবার থেকে আলাদা করে বোঝা যায়। তাঁর সাহিত্য সমালোচনামূলক প্রবন্ধের মধ্যে ‘ভারতচন্দ্র’ প্রবন্ধটি নানা কারণে উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘ ২০০ বছরের ব্যবধান অতিক্রম করে প্রমথ চৌধুরী, ভারতচন্দ্রের মধ্যে তাঁর মানসমিতা আবিষ্কার করেছেন। দেশ-বিদেশের সাহিত্য-তীর্থে তাঁর অবাধগতি হওয়া সত্ত্বেও, তিনি সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন ভারতচন্দ্রের কাব্য থেকেই। আসলে তিনি ভারতচন্দ্রকে সামনে রেখে, সুকৌশলে ও বিচিত্র ভঙ্গিতে আত্মবিশ্লেষণ করেছেন। ভারতচন্দ্র বিচারে তিনি সম্পূর্ণ নতুন পথ দেখিয়েছেন। তিনি লিখেছেন―

‘ভারতচন্দ্রের সাহিত্যের প্রধান রস কিন্তু আদিরস নয়, হাস্যরস। এ রস মধুর রস নয়, কারণ এ রসের জন্মস্থান হৃদয় নয় মস্তিষ্ক, জীবন নয়, মন।’

আধুনিক বাংলা গদ্যরীতির সমৃদ্ধির মূলে, রবীন্দ্রনাথের পরে যে নামটি আসে, তিনি প্রমথ চৌধুরী। চর্যা ও চর্চা দুদিক থেকে প্রমথ চৌধুরীর বীরবলী ভাষার বুনিয়াদ রচিত হয়েছে। প্রমথ চৌধুরীর ভাষশিক্ষার মূলে আছে―কৃষ্ণনগরের লোকভাষা। ভাষা সম্পর্কে আরও দুটি মূলকথা তাঁর স্বীকৃতি থেকে জানা যায়―প্রথমটি হলো বাকচাতুরি। ভাষা শুধু কাজের ভাষা নয়, লেখারও ভাষা। তিনি ভাষাচর্যা প্রসঙ্গে হাস্যরসের কথা উল্লেখ করেছেন। বাকচাতুর্যের সঙ্গে হাস্যরসের একটি আত্মিক সম্পর্ক আছে। একমাত্র হিউমার ছাড়া অন্য যে কোনও শ্রেণির হাস্যরসের মূল উপাদান বাগবৈদগ্ধ্য।

প্রমথ চৌধুরীর কথ্যভাষার সঙ্গে তৎসম শব্দপ্রধান সাধুভাষার একটি আত্মিক সংযোগ ছিল। এই কারণেই সে ভাষা চলিত ভাষা হলেও তার গাঢ়বন্ধতা ও স্থিতিস্থাপকতা ছিল। ভারতচন্দ্রের ‘যাবনী মিশাল’ কাব্যরীতি প্রমথ চৌধুরীর বিচিত্র বিষয়ের সঙ্গে বিচিত্র শব্দাশ্রিত গদ্যরীতির কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রমথ চৌধুরীর ভাষা ঠিক গীতিধর্মী নয়, তাঁর ভাষা ভাস্কর্যধর্মী। যা ভাবাবেগ মুক্ত, যা ঋজু-সংহত। আতিশয্যবর্জিত গদ্যরীতি ক্লাসিক্যাল মনের পরিচয়বাহী। প্রমথ চৌধুরীর বাংলা ভাষা চর্চা ও বাংলা গদ্যরীতি সম্পর্কে সবেচেয়ে বড় কথা হলো এর পারিপাট্য―ওস্তাদি শিল্প। আসলে ফরাসি গদ্যের অনুশীলন তাঁর রচনায় নিপুণ পারিপাট্য এনে দিয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র এবং প্রমথ চৌধুরী দুজন ভিন্ন পথের অভিযাত্রী। হাস্যরসিক বঙ্কিমচন্দ্র হৃদয় ও মস্তিষ্ক দু স্থানের সমানভাবে ব্যবহার করেছেন। চৌধুরীসাহেব সেই হাস্যরসের জীবনমার্গে পরিমার্জিত বুদ্ধির পথে প্রকাশিত হয়েছেন। তাই চৌধুরীসাহেবের হাস্যরসে পান, ফান, স্যাটায়ার, উইট, প্যারাডক্স―সবই আছে। শুধু আবেগের সমর্থন ছিল না বলেই, রোমান্টিকতাবিরোধী হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু হাস্যরসের নিরাসক্ত বস্তুনিষ্ঠা পূর্ণমাত্রায় সক্রিয় ছিল। চৌধুরীসাহেব সবাইকে হাসিয়েও নিজে ভেসে যাননি। তিনি ফরাসি সাহিত্যিকদের মতো ‘ক্রিটিক্যাল অবজারভার’। বাকচাতুর্য, ঘটনা সাজানোর কৌশল, যেন শব্দের খেলায় পারদর্শী।

দুজনেই কৃষ্ণনাগরিক। দ্বিজেন্দ্রলাল উচ্চকণ্ঠ ও উচ্ছ্বসিত। প্রমথ চৌধুরী সূক্ষ্ম সুকৌশলী। প্রমথ চৌধুরীর মধ্যে হাস্যরসের কোনওরকম উত্তেজনা ও উন্মাদনা নেই। তাঁর বক্তব্যে ট্রমার চেয়ে ‘কোল্ডলজিক’ বেশি। তাই দ্বিজেন্দ্রলালের আক্রমণ পন্থার তুলনায় চৌধুরীসাহেবের সুকৌশলী শ্লেষ-বিদ্রুপ অনেক বেশি উচ্চমার্গের। উত্তেজনার প্রাবল্যে যেখানে দ্বিজেন্দ্রলাল ব্যক্তিগত আক্রমণে নগ্ন, সেখানে প্রমথ চৌধুরী অভিজাত, সুমিত মর্মভেদী।

বীরবলের রচনারীতির ঔজ্জ্বল্য ও ঋজুতা সর্বত্র প্রকাশিত হয়েছে। ‘বঙ্গ সাহিত্যের নবযুগ’ মননপ্রধান রচনা। লঘুচালে শুরু করে দুরূহ চিন্তার চাতুর্যে সঞ্চারিত করেছেন। তাঁর মতে নবযুগের বঙ্গসাহিত্যের প্রথম লক্ষণ হলো―‘সাহিত্য রাজধর্ম ত্যাগ করে গণধর্ম অবলম্বন করেছে। গণধর্মের প্রধান দোষ, বৈশ্যধর্মের দিকে তার প্রধান আকর্ষণ।’ বীরবল সাহিত্যের গণধর্মকে স্বীকার করলেও বৈশ্যধর্মের প্রতি চিরকালই প্রতিবাদী ছিলেন। প্রমথ চৌধুরীর পরিমার্জিত রুচিজ্ঞান সবচেয়ে বেশি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর রসতত্ত্ব আলোচনায়। তিনি ব্যাপকতর অর্থে ‘জীবন-শিল্পী’ না হলেও তিনি কিন্তু রূপজ্ঞানের প্রথম শিল্পী। বাংলা সাহিত্যের গদ্যে বীরবলী ঢঙে দীপ্তি ও দাহ সমানভাবে সমৃদ্ধ করেছে। বুদ্ধির সঙ্গে শব্দের চাতুর্য এক অন্য মাত্রা দিয়েছে। বুদ্ধি ও শব্দের চাতুর্যের সঙ্গে শ্লেষ সংযুক্ত হয়ে বীরবলী গদ্যরীতি সৃষ্টি হয়েছে। বীরবলী সরস গদ্যের প্রধান উৎস হচ্ছে―উইট। কৃষ্ণনাগরিক প্রমথ চৌধুরী মার্জিতরুচি নাগরিক বৈদগ্ধ্যের উত্তরাধিকার লাভ করেছিলেন। যা কবি ভারতচন্দ্র রায়কে মনে করিয়ে দেয়―বিশেষ করে বীরবলের প্যারাডক্স। তাঁর প্যারাডক্স শুধু প্রবন্ধে নয়, ছোটগল্পেও প্রভূত পরিমাণে প্রকাশিত হয়েছে। শ্লেষ, যমক, বক্রোক্তি তাঁর গদ্যরীতির ঠাস-বুনোনের আলোর চকিতে ভরে আছে। তাঁর মন্তব্যগুলি সংক্ষিপ্ত ও দ্রুতসঞ্চারী মধ্যে এপিগ্রামের অজস্রতা বিদ্যমান। বীরবলী গদ্যের আরও একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ক্লাইম্যাক্স ও অ্যান্টিক্লাইম্যাক্স একই সঙ্গে প্রতিফলিত হয়েছে। আরোহণ ও অবরোহণের ক্ষিপ্রগতি বীরবলের গদ্য-রীতিতে এক অনন্য মাত্রা এনে দিয়েছে―যা বাংলা সাহিত্যে চিরস্মরণীয়।

রবীন্দ্রযুগে জন্মগ্রহণ করে, রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে এসেও তিনি স্বতন্ত্র ও অনন্য। সাহিত্যসৃষ্টির দৈব-নির্ভরতাকে তিনি স্বীকার করেননি। অনুশীলন ও সাহিত্যচর্চায় সাহিত্য সৃষ্টি হতে পারে―এই ছিল তাঁর ঐকান্তিক বিশ্বাস। তাঁর বিষয়বস্তু ছিল বৈচিত্র্যে ভরপুর এবং নতুন। তার ফলে বলার ভঙ্গিও নতুন ধরনের হয়েছে।

প্রমথ চৌধুরীর ধ্রুপদী চলিত ভাষা সম্পর্কে এক মিশ্র স্বাদ পাওয়া যায়। যেমন―তৎসম শব্দের মাঝে কথ্যভাষার ইডিয়ম ব্যবহার করে লঘুগুরু শ্লেষাত্মক স্টাইল প্রকাশ করেছেন। এই মিশ্র শাব্দিক অসামঞ্জস্য তাঁর তির্যক দৃষ্টিকেই ফুটিয়ে তোলায় সহায়তা করেছে। লঘুগুরু শব্দ প্রয়োগে লেখকের শ্লেষ ও বক্রোক্তির তীব্রতা বেড়েছে। সৃষ্টি হয়েছে শব্দগত অসামঞ্জস্যের হাস্যরস। কথ্যভাষার ক্রিয়াপদ, সর্বনাম ও ইডিয়ম নিয়েও ভাষা তরল ও চটুল হয়ে ওঠেনি। অভিজাত হয়েও সহজ রসভাষ্য হয়ে উঠেছে। খাঁটি মুখের বুলি না হলেও তৎসম শব্দের প্রবাহে চলিত ভাষার শক্তিকে প্রকাশ করেছে। বীরবল তথা প্রমথ চৌধুরী বাংলা সাহিত্যের এক ভিন্ন ধারার অগ্রপথিক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন।

ফরাসি প্রেমিক চৌধুরীসাহেব

ফরাসি সাহিত্যের প্রতি প্রমথ চৌধুরীর অপার প্রীতি ছিল। জীবনে ও মননে ফরাসি সাহিত্য তাঁর অবিচ্ছেদ্য প্রেম ছিল। বাংলা ভাষায় ‘ফরাসি সাহিত্যের বর্ণপরিচয়’ প্রবন্ধটি এক মূল্যবান ও সুখপাঠ্য রচনা। ফরাসি সাহিত্যকে তিনি ভালোবাসতেন তাই না, তিনি ফরাসি জাতির সুখের সুখী, ব্যথার ব্যথী হয়ে উঠেছিলেন। ফরাসি সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলিকে সহজ-সরল বাংলা ভাষায় আমাদের সামনে এনেছেন―

১) ফরাসিরা ভাবনামূলক রাজ্যে ইন্দ্রিয়জ্ঞানকে উপেক্ষা করেনি।

২) ফরাসি সাহিত্যে বিজ্ঞান ও শিল্পকলার একত্র সাক্ষাৎ পাওয়া যায়।

৩) ফরাসি জাতি হাসতে জানে, হাসাতে জানে। তীক্ষè হাসির মর্মভেদী শক্তির সন্ধান তাঁরা জানতেন, তাই তাঁরা কটুবাক্য প্রয়োগ করতে শেখেননি।     

৪) ফরাসি সাহিত্যে জড়তা নেই। যা কিছু বলেন বা লেখেন―তা স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করেন।

৫) সংযম ও স্বল্পতা ফরাসি সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য গুণ।

ফরাসি প্রতিভা অনেক বেশি বিশ্লেষণী শক্তির পরিচায়ক। ফরাসি সাহিত্যের মোলিয়েরের সঙ্গে শেক্সপীয়রের তুলনামূলক আলোচনায়―ফরাসিদের বিশেষত্বের কথা বলেছেন। ফরাসি কবিরা শুধু হাস্য, করুণ, বীর ও মধুর রসের চর্চা করেছেন। ইংরেজদের মতো ভয়ঙ্কর ও অদ্ভুতরসের রসিক নন। ফরাসি জাতির মধ্যে শেক্সপীয়র জন্মাননি, এমনকি জন্মাতেও পারেন না। ফরাসি সাহিত্যের এই বিশেষ মেজাজ হচ্ছে―ফরাসি সাহিত্য রিয়্যালিস্টিক আর ইংরেজি সাহিত্য রোমান্টিক। তিনি বিশ্বাস করতেন―ভারতচন্দ্র যদি ফ্রান্সে জন্মাতেন, তবে, ফরাসি সাহিত্যের মাস্টারপিস বলে গণ্য হতেন। যদিও চৌধুরীসাহেব মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেছেনে―বাঙালি মেজাজের সঙ্গে ফরাসি গদ্যের মেজাজের আকাশ-পাতালের ব্যবধান। ফরাসি সাহিত্য চর্চা করলে, বাঙালি মানসিকতার কিঞ্চিৎ পরিবর্তন হতে পারে। ভিক্টর হুগো থেকে বালজাক, জোলা, মোপাসাঁ প্রভৃতি বিশ্রুতকীর্তি সাহিত্যিকদের রচনা বাংলায় চর্চা হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

ঠাকুরবাড়ি ও বীরবল

প্রমথ চৌধুরী পাবনা জেলার হরিপুর গ্রামের জমিদারপুত্র। পিতা জমিদার দুর্গাদাস চৌধুরী ও মাতা মগ্নময়ী। দুর্গাদাস চৌধুরী ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন―প্রমথ চৌধুরীর জন্ম হয় পিতার কর্মস্থল যশোহর। পাঁচ বছর বয়সে, তাঁর পিতা বদলি হয়ে কৃষ্ণনগর আসেন। কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল থেকে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেন। প্রমথ চৌধুরী অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। বিএ দর্শন অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম ও এমএ ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হোন। বিশাল গ্রন্থাগার ছিল। কৈশোর থেকে প্রমথের সময় কেটেছে পাঠাগারে। সারা জীবন ধরে তিনি বই কিনেছেন আর বই পড়েছেন―বইয়ের গুরুত্ব নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন।

 বিদ্যানুরাগী প্রমথনাথের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রথম দেখা হয় ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে। দেখা হয় কৃষ্ণনগরে নিজেদের বাড়িতে, তখন প্রমথনাথের বয়স ১৮ বছর। রবীন্দ্রনাথের নাম ও লেখার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাছের বন্ধু আশুতোষ চৌধুরীর (১৮৬০-১৯২৪) সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন। পাত্র আশুতোষ চৌধুরী ও পাত্রী প্রতিভাসুন্দরী ছিলেন লরেটো কলেজের প্রথম ব্রাহ্ম ছাত্রী। প্রতিভাসুন্দরীর শুধু গান আর বাজনায় নয়, স্বরলিপির ক্ষেত্রেও অসামান্য কুশলতা ছিল, তার প্রমাণ―তাঁর রচিত রবীন্দ্রসঙ্গীতের স্বরলিপি। পাত্র আশুতোষ চৌধুরীর সঙ্গে একই জাহাজে দ্বিতীয়বার বিলেত যাত্রা করেন। আশুতোষ ও প্রতিভাসুন্দরীর বিবাহের প্রধান ঘটক ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।

শুধু দাদা আশুতোষ চৌধুরী নয়, ভাই প্রমথনাথও ঠাকুরবাড়ির জামাই হয়েছিলেন।

প্রমথনাথ চৌধুরী বিয়ে করেছিলেন  ঠাকুরবাড়ির কন্যা ইন্দিরা দেবীকে (১৮৭৩-১৯৬০)। ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের দাদা সত্যেন্দ্রনাথ ও জ্ঞানদানন্দিনীর কন্যা। প্রমথ চৌধুরীর সঙ্গে ইন্দিরা দেবীর বিবাহ হয় ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ ফেব্রুয়ারি। বিবাহের সময় প্রমথ চৌধুরীর বয়স ৩১ ও ইন্দিরা দেবীর বয়স ২৬। তাঁরা নিঃসন্তান ছিলেন।

 বৈবাহিক সূত্রে প্রমথ চৌধুরী ঠাকুরবাড়ি থেকে বিবাহের যৌতুক হিসেবে, সেই সময় দু লাখ টাকা পেয়েছিলেন। সেই টাকা থেকে তিনি কলকাতার ১ নম্বর ব্রাইট স্ট্রিটে একটি বাড়ি কেনেন। সেই বাড়ির নাম ছিল―‘কমলালয়’। পরে সেই বাড়ি বিক্রি করে, আরেকটি ছোট বাড়ি কেনেন মেফেয়ার রোডে। প্রত্যেক শুক্রবার প্রমথ চৌধুরীর ১ নম্বর ব্রাইট স্ট্রিটের বাড়ি ‘কমলালয়ে’ সবুজপত্রের  সবার আড্ডা হতো।

 প্রমথ চৌধুরী কর্মজীবনে ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। ঠাকুর জমিদারির ম্যানেজারের কাজ করেছেন কিছুদিন। সবুজপত্রের সম্পাদক ছিলেন প্রমথ চৌধুরী, আর প্রকাশক ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৭১-১৯৫১) জামাতা ও সাহিত্যিক মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় (১৮৮৮-১৯২৯) সাহিত্যিক মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় শুধু সবুজপত্রের প্রকাশক নন, প্রধান উদ্যোক্তা।

 সিমলা থেকে চলে এসে, কলকাতায় ছাপাখানা করেন মণিলাল। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ছাপাখানার নাম দেন ‘কান্তিক প্রেস’ (১৯০৮)―যার অর্থ লোহার যন্ত্র। এই কান্তিক প্রেসে ছাপা হতো সবুজপত্র।

 প্রমথ চৌধুরী ওরফে বীরবলের সাহিত্য সাধনা ও সবুজপত্র সম্পাদনায় ঠাকুরবাড়ির অবদান অপরিসীম। শুধু রবীন্দ্রনাথ নয়, ঠাকুরবাড়ির একাধিক ব্যক্তি, কি কন্যা, কি কর্মকর্তা―সবার সহযোগিতা ছাড়া―সবুজপত্র ও বীরবলের বেড়ে ওঠা সম্ভব ছিল না।

লেখক রবীন্দ্রনাথ : সবুজপত্র

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। আর সবুজপত্রের সূচনা হচ্ছে ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে। নোবেলপ্রাপক কবি রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিসম্ভারের গতিপ্রকৃতির পরিবর্তন ঘটছে―সবুজপত্র পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই। বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্তে এ এক বিস্ময়কর ঘটনা। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিরাজির মোড় পরিবর্তনের কিঞ্চিৎ দায়িত্ব সবুজপত্র পত্রিকার আছে। সবুজপত্র রবীন্দ্রসাহিত্যের ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ। ১৮৬১-১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পঞ্চাশোর্ধ্ব প্রৌঢ় কবি, তারুণ্যের বাণী নিয়ে সবুজপত্রের নতুন পথে শামিল হলেন।

রবীন্দ্রসাহিত্যের সবুজপত্র পর্ব বাস্তবিকই আলো-বাতাস খচিত এক তারুণ্যের ইতিহাস। রবীন্দ্রনাথের শুধু কাব্য নাটকেরই নয়, গদ্য সাহিত্যেরও এক নতুন যুগের সূচনা হলো। দীর্ঘকাল পরে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্প লিখলেন সবুজপত্রে। সবুজপত্রের গল্পগুলি শিলাইদহ পদ্মা-লালিত গল্প থেকে স্বতন্ত্র। অভিনব শুধু বক্তব্যে নয়, বাক্যরীতির নবীনতায়ও। সবুজপত্রের ক্লাইমেক্স-অ্যান্টি ক্লাইমেক্সের দ্রুতসঞ্চারী এক আধুনিক ছোটগল্প। বলাকা কাব্য আর ফাল্গুনী নাটকের মূল বক্তব্যেও রবীন্দ্রমানসের স্বরূপধর্মের পরিচয় পাওয়া যায়। বলাকা ও ফাল্গুনীতে নতুন আশাবাদের ছন্দ স্পন্দিত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস ঘরে বাইরে এবং চতুরঙ্গ, সবুজপত্রেই প্রকাশিত হয়েছে। চতুরঙ্গ থেকে ঘরে বাইরে পর্যন্ত উপন্যাসের ভাষা ক্রমশ অগ্রসর হয়েছে। সেই সঙ্গে এপিগ্রামের সূক্ষ্ম-চতুর প্রয়োগ, বাংলা সাহিত্যের মহাসন্ধিক্ষণে রবীন্দ্রসাহিত্য এক ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। ভারতী-সাধনা পর্বের ভাষাভুবনের সঙ্গে সবুজপত্রের ভাষাবিন্যাসের পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। রবীন্দ্রসাহিত্যের রূপ ও রীতির এই পরিবর্তনের মূলে সবুজপত্রের দান কম নয়।

সবুজপত্রের বিরোধী পত্রিকা মানসী ও নারায়ণই ছিল প্রধান। চৌধুরীসাহেবের বিরোধী পত্রিকাদলের আক্রমণে বিপন্ন বোধে―সবসময়েই অভয় দিয়েছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ। বিশ্বকবি সবুজপত্রের সম্পাদককে যেমন উৎসাহিত করেছেন, তেমনিই শ্রদ্ধাও করেছেন। বাংলা সাহিত্যের অচলায়তন ভাঙার দুঃসাহসিক ব্রতে সম্পাদকের চিরসাথী ছিল বিশ্বকবির হৃদয়-কলম।

সবুজপত্র ও বিশ্বকবি 

সবুজপত্রের প্রথম সংখ্যার প্রকাশ তারিখ তাৎপর্যপূর্ণ। ২৫ বৈশাখ ১৩২১/১৯১৪ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ৫৫তম জন্ম দিন―প্রকাশিত হলো ঐতিহাসিক সবুজপত্র―সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী। প্রধান উপদেষ্টা রবীন্দ্রনাথ―তখন সদ্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন―১৯১৩। রবীন্দ্রসাহিত্য শুধু বাঙালির নয়, ভারতবাসীর একটি স্থায়ী সম্পদ―এ বিশ্বাসে  অবিচল ছিলেন প্রমথ চৌধুরী। ২৫ বৈশাখের মাহেন্দ্রক্ষণে সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী ওরফে বীরবল, একটি যুগান্তকারী ঘটনার সূচনা করলেন। সূচনালগ্ন থেকেই সবুজপত্র রবীন্দ্রনির্ভর, রবীন্দ্র- অনুপ্রাণিত ও রবীন্দ্র প্রতিভাদীপ্ত, যেন সবুজের অভিযান। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন―

ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা

ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ,

আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।

পুচ্ছটি তোর উচ্চে তুলে নাচা।

আয় দুরন্ত, আয়রে আমার কাঁচা।

অন্ধকারে বন্ধ করা খাঁচায়

আয় জীবন্ত, আয় রে আমার কাঁচা।

লাগবে লড়াই মিথ্যা এবং সাঁচায়।

আয় প্রচণ্ড, আয়রে আমার কাঁচা।

ভুলগুলো সব আনরে বাছা-বাছা।

আয় প্রমত্ত, আয়রে আমার কাঁচা।

পথে চলার বিধি-বিধান যাচা।

আয় প্রমুক্ত, আয়রে আমার কাঁচা।

চিরযুবা তুই যে চিরজীবী―

জীর্ণজরা ঝরিয়ে দিয়ে

প্রাণ অফুরান ছড়িয়ে দেদার দিবি।

আপন গলার বকুল-মাল্যগাছা,

আয় রে অমর, আয় রে আমার কাঁচা।

কবিতাটি শান্তিনিকেতনে লেখা হয়েছে―১৫ বৈশাখ, ১৩২১ আর সবুজপত্রে ছাপা হয়েছে―২৫ বৈশাখ, ১৩২১।

 প্রমথ চৌধুরী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর―দুজন অসামান্য ব্যক্তিত্বের যৌথ প্রয়াসেই সবুজপত্রে ‘সৌরভ ও গৌরব’ সময়ের সীমা পার করে স্থায়ী আসন লাভ করেছে। সবুজপত্র প্রকাশের প্রথম দু বছর (১৩২১-১৩২৩) মাত্র দুজন লেখক পত্রিকা অনায়াসে চালিয়ে গেছেন―তাঁরা হলেন বীরবল ও বিশ্বকবি।

  সবুজপত্রের প্রধান লেখক রবীন্দ্রনাথ বিদেশযাত্রা করলে, ১৩২৫ সালেই পত্রিকা বন্ধ-করার উপক্রম হয়। আবার রবীন্দ্রনাথ দেশে ফিরে এলে সবুজপত্রের উদ্বেগ শেষ হয়। প্রমথ চৌধুরী প্রতিভাধর  সম্পাদক―তা অবশ্যই সত্য। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সবুজপত্রকে কেন্দ্র করে নতুন করে নিজেকে সৃজন করলেন। এটা যেমন চিরসত্য, আবার সবুজপত্রকে তিনি উৎসাহিত করেছেন―তিনি নিজেও উৎসাহিত হয়েছেন, অনুপ্রাণিত হয়েছেন―ক্ষেত্রবিশেষে প্রভাবিতও হয়েছেন।

সবুজপত্রের সময় মাত্র ১৪ বছর (১৩২১-১৩৩৪ বঙ্গাব্দ)। বাংলা সাময়িকপত্রের ইতিহাসে এটি একটি যুগান্তকারী সম্পাদনার প্রকাশ। বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘সাহিত্যপত্র’ প্রবন্ধে (প্রথম দেশ, ৯ মে, ১৯৫৩) সবুজপত্রকে বাংলা সাহিত্যে প্রথম লিটল ম্যাগাজিন হিসেবে চিহ্নিত ও স্মরণীয় করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্রের বঙ্গদর্শনের (১৮৭২) পর সবুজপত্র (১৯১৪)―বাংলা সাহিত্যে একটি মাইলস্টোন।

 প্রকৃত অর্থে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সবুজপত্র সম্পাদকের প্রেরণার মূল উৎস। প্রচলিত সাময়িক পত্রিকার ওপর যখন রবীন্দ্রনাথ বীতশ্রদ্ধ―তখন সবুজপত্রই তাঁকে নতুন উৎসাহে অনুপ্রাণিত করে। রবীন্দ্রনাথের আগ্রহকে সার্থক করার জন্যই সবুজপত্রের সৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই নতুন একটি পত্রিকার সৃষ্টি অনিবার্য। প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যজীবনের একটি নতুন অধ্যায় সূচিত  হয়েছিল। নতুন যুগের ভাবনাকে প্রতিফলিত করার জন্য নতুন একটি পত্রিকার প্রয়োজন ছিল। নোবেল প্রাপক (১৯১৩) রবীন্দ্রনাথ, সবুজপত্র (১৯১৪) থেকে ব্যতিক্রমী সৃষ্টির পথে এগিয়ে যাবেন। সবুজপত্র হচ্ছে সেই সোনার তরী যা দিয়ে ভেসে যাবেন ব্যতিক্রমী সাহিত্য সৃষ্টির মোহনায়।

 সবুজপত্রে পাঠানো কবিতাগুলি নির্বাচনের দায়িত্ব ছিল রবীন্দ্রনাথের। সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী সবুজপত্রে প্রকাশের জন্য প্রাপ্ত সমস্ত কবিতা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথকে পাঠিয়ে দিতেন। সবুজপত্রের কবিতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মতামত অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য―

―‘বাংলায় এ জাতের কবিতা আমি ত দেখিনি। এর কোন লাইনটি ব্যর্থ নয়, কোথাও ফাঁকি নেই―এ যে ইস্পাতের ছুরি… বাংলায় সরস্বতীর বীণায় এ যেন তুমি ইস্পাতের তার চড়িয়ে দিয়েছ।’

সবুজপত্র পত্রিকায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের বহু নতুন রচনা প্রকাশিত হয়েছে। সবুজপত্রে প্রকাশিত তাঁর গল্পগুলির এক বিশেষ মাত্রা আছে। ১৩১৫ থেকে ১৩২১ পর্যন্ত সবুজপত্রের সাতটি সংখ্যায়  রবীন্দ্রনাথের সাতটি গল্প প্রকাশিত হয়। গল্পগুলি হলো―

১) হালদার গোষ্ঠী (বৈশাখ )

২) হৈমন্তী (জ্যৈষ্ঠ)

৩) বোষ্টমী (আষাঢ়)

৪) স্ত্রীর পত্র (শ্রাবণ)

৫) ভাইফোঁটা  (ভাদ্র)

৬) শেষের রাত্রি (আশ্বিন)

৭) অপরিচিতা (কার্তিক)

 এই সাতটি গল্প নিয়ে ১৩২৩ বঙ্গাব্দে গল্পসপ্তক নামে সংকলন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এই সাতটি গল্প ছাড়া রবীন্দ্রনাথের আরও পাঁচটি গল্প প্রকাশিত হয়েছে। তপস্বিনী ( জ্যৈষ্ঠ ১৩২৪), পয়লা নম্বর (আষাঢ় ১৩২৪), পাত্র ও পাত্রী (পৌষ ১৩২৪), তোতা কাহিনি (মাঘ ১৩২৪), ও সিদ্ধি (ফাল্গুন ১৩২৪)―এই পাঁচটি মিলে মোট ১২টি গল্প সবুজপত্রে প্রকাশিত হয়েছে, যা রবীন্দ্র ছোটগল্পের ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ।

রবীন্দ্রনাথের দুটি বিখ্যাত কবিতা সবুজপত্রে প্রকাশিত হয়েছে―১) ‘সবুজের অভিযান’ (প্রথম সংখ্যা ২৫ বৈশাখ ১৩২১) ও শা-জাহান (অগ্রহায়ণ ১৩২১)। কবিতা দুটি ছাড়া তাঁর দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস  সবুজপত্রে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। উপন্যাস দুটির নাম―১) চতুরঙ্গ ও ২) ঘরে-বাইরে। আমরা জানি, রবীন্দ্রনাথ তথা বাংলা উপন্যাসের ভুবনে, এই দুই উপন্যাস অত্যন্ত অভিনব ও ব্যতিক্রমী। পরীক্ষাধর্মী বাংলা উপন্যাসচর্চায় নতুন পথের দিশা  হয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে একটি উল্লেখযোগ্য নাটক ফাল্গুনী। ‘বৈরাগ্য সাধনা’ নামে প্রকাশিত হয়। শুধু গল্প, উপন্যাস বা নাটক নয়, বেশ কয়েকটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রবন্ধ সবুজপত্রে প্রকাশিত। যেমন―

১) ‘আমার জগৎ’ (১৩২১)―সঞ্চয় (১৯৬১) গ্রন্থে সংকলিত।

২) ‘কৃপণতা’, ‘আবার’, ‘শরৎ’ (১৩২১-১৩২২)―পরিচয় (১৯২৬) গ্রন্থে সংকলিত।

৩) ‘বিবেচনা ও অবিবেচনা’, ‘লোকহিত ও লড়াইয়ের মূল’ (১৩২১)―কালান্তর (১৯৩৭) গ্রন্থে সংকলিত।

সবুজপত্র পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের প্রকাশিত রচনাগুলি পর্যালোচনা করলে বলা যায়―সাহিত্যের চারটি শাখাকে সমৃদ্ধ করেছিল। প্রকাশিত রচনাগুলো রবীন্দ্রসাহিত্যে, বিশেষ করে নোবেল প্রাপ্তির পর―রবীন্দ্র বাঁকবদলের পরিচয় পাওয়া যাবে। রবীন্দ্র সাহিত্যচর্চার পর্যালোচনায়―সবুজপত্রকে কোনও ভাবে বাদ দিয়ে, সম্পূর্ণ মূল্যায়ন সম্ভব নয়।

সবুজপত্র পত্রিকার সমসময়ে আরও একটি পত্রিকা নারায়ণ প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটির সম্পাদক রবীন্দ্র-বন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ (১৮৭০-১৯২৫)। নারায়ণের  প্রধান লেখক বিপিনচন্দ্র পাল (১৮৫৮-১৯৩২)। এদের কাজ ছিল―সবুজপত্র ও রবীন্দ্রনাথের রচনার নির্মম সমালোচনা করা। নারায়ণ (১৯১৪) পত্রিকার প্রধান কাজ ছিল প্রমথ চৌধুরীর ভাষা―চলিত ভাষা ও রবীন্দ্ররচনার ভাব ও বস্তুকে কঠোর আক্রমণ করা। বিপিনচন্দ্র পাল রবীন্দ্রনাথের রচনাকে ‘বস্তুতন্ত্রতাহীন’ বলে অভিহিত করতে চাইলেন। সবুজপত্র  ও নারায়ণ (১৯১৪) কে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রবিরোধী গোষ্ঠী তৈরি হলো। রবীন্দ্রনাথও প্রয়োগ করলেন―‘আধুনিকতম অস্ত্র-নির্মল বুদ্ধির, অনাবিল ও শাণিত ভাবনার বিচ্ছুরণ।’ নারায়ণ পত্রিকাগোষ্ঠী শত চেষ্টা করেও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি। সবুজপত্রের শক্তি ও বিশ্বকবির নবসৃষ্টির কাছে ম্লান হয়ে গেছে।

সবুজপত্রের বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব

বাংলা সাহিত্যের পালাবদলের ইতিবৃত্তে সবুজপত্র চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।―

প্রথমত―‘ভাষার শৈথিল্য ও নিরর্থ আড়ম্বর’ বাদ দিয়ে সাধু ভাষার পরিবর্তে চলিত ভাষাকে ‘মনের কথার বাহন’ করা।

দ্বিতীয়ত―অতীতের কথা বাদ দিয়ে বর্তমানের বেদনাকে মনে নিয়ে, নিজের শক্তির সাধনা করা।

তৃতীয়ত―পাশ্চাত্য সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে প্রত্যাখ্যান না করে, বাঙালির জীবন-মননে মেলবন্ধন ঘটানো।

চতুর্থত―বাংলা সাহিত্যে এক নতুন সাহিত্য আদর্শ গড়ে তোলা।

পঞ্চমত―বিশ্বকবির চিন্তা-চেতনা ও ভাষা ভাবনার সমর্থনসহ আধুনিক মননশীল আঙ্গিকের সৃষ্টি করা।

ষষ্ঠত―তরুণ লেখকগোষ্ঠীর সৃষ্টির মাধ্যমে বিশ্বসংস্কৃতি বোধে উন্নীত হওয়া। 

সপ্তমত―সবুজপত্রে ‘টীকা-টিপ্পনী’ নামক একটি নতুন বিভাগের সূত্রপাত হয়। যেখানে বিতর্কমূলক আলোচনার সুযোগ ছিল।

অষ্টমত―রবীন্দ্র ছোটগল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক ও প্রবন্ধ সর্বত্রই অভিনবত্ব―বাংলা সাহিত্যকে ব্যতিক্রমী পথে সৃজিত করে।

নবমতম―একদম নতুন ও সম্ভাবনাময় লেখক সামনে আসেন―ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, অতুলচন্দ্র গুপ্ত,  সতীশচন্দ্র ঘটক, কিরণশংকর রায়,  সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ।

দশমত―বিজ্ঞাপন সম্পূর্ণভাবে বর্জিত না হলেও, বিজ্ঞাপনের ব্যবহার ছিল সীমিত এবং সংযত রুচিশীল। সেই সঙ্গে ফিচার, চিত্র ও আলোকচিত্র ব্যবহৃত হয়েছে―সবুজপত্রে এসেছে বিচিত্র বৈচিত্র্য।

পরবর্তী পত্রিকাগুলির কাছে সবুজপত্রের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলি নতুন প্রেরণার সঞ্চার করেছিল।

বিচিত্রা (১৯২৭)―সম্পাদক উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়

পরিচয় (১৯৩১)―সম্পাদক সুধীন্দ্রনাথ দত্ত

পূর্বাশা (১৮৩২)―সম্পাদক সঞ্জয় ভট্টাচার্য

কবিতা (১৯৩৫)―সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু।

এই পত্রিকাগুলি সবুজপত্র পত্রিকা থেকে বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছে। কল্লোল (১৯২৩) নমস্কার, মুক্তি অন্য ধরনের হলেও আত্মশুদ্ধির প্রতি আস্থা, গতানুগতিকতার প্রতি অনাগ্রহ সবুজপত্রের প্রেরণাজাত। পরিচয় পত্রিকার উদ্যোক্তারা সবাই সবুজপত্রী ছিলেন। সবুজপত্রের গদ্যরীতির বিশিষ্টতা ও সীমাবদ্ধতাকে নিরপেক্ষ বিচার-বিশ্লেষণ করেছে কবিতা পত্রিকা।

 রথীন্দ্রনাথ রায়ের বাংলা সাহিত্যে প্রমথ চৌধুরী গবেষণাগ্রন্থে সবুজপত্রের প্রভাবের কথা বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। রথীন্দ্রনাথ রায় ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ প্রাবন্ধিক ও সমালোচক। অন্নদাশঙ্কর রায় (১৯০৪-২০০২), শিবরাম চক্রবর্তী (১৯০৩-১৯৮০) ও সৈয়দ মুজতবা আলী (১৯০৪-১৯৭৪) প্রমুখের রচনা ভঙ্গির বিশেষত্ব আলোচনায় সবুজপত্র তথা প্রমথ চৌধুরীর প্রভাবের কথা উল্লেখিত হয়। অন্নদাশঙ্করের সবুজপত্রপ্রীতি বহু আলোচিত। অন্নদাশঙ্করের গদ্য স্টাইল প্রমথ চৌধুরীর রচনা স্টাইলের অনেকটা প্রভাবিত―এ কথা বলা যায়।

সবুজপত্রের চিন্তার স্বাধীনতাই সমকালীন নবীন সাহিত্যিকদের প্রধানভাবে অনুপ্রাণিত করে। বিশিষ্ট সমালোচক লেখেন―‘কথ্যভাষা, খেয়ালী রচনা, স্বমার্জিত স্টাইল―প্রমথ চৌধুরীর সবুজপত্রের এইসব বিশিষ্ট দান ভাবীকালের বাংলা সাহিত্যে নিঃসন্দেহে প্রভাব বিস্তার করেছে। বীরবলী স্টাইল ও ভাষার বংশধর কমে এলেও উত্তরাধিকারী কমেনি।’ এমনকি রবীন্দ্রনাথ ও সবুজপত্রে প্রভাবিত হয়েছেন। বাংলা গদ্যের ভাষা ও রচনারীতিতে সবুজপত্রের পরিবর্তন বাংলাসাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।

শেষ কথা হয় না শেষ!

বাংলা সাহিত্যের বিবর্তনের ইতিবৃত্তে সবুজপত্রের দান অপরিসীম। সেই নতুন বৃত্তের পরিধিতে রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথনাথের পরে যে নামটি মনে পড়বে―তিনি রবীন্দ্রস্নেহধন্য ভাইঝি ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী।

বাংলা গদ্যের চলতি রূপকে চূড়ান্ত সীমায় নিয়ে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। প্রমথ চৌধুরীর সবুজপত্রের তারুণ্য সমুদ্রকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবার জন্য বিশ্বকবিকে প্রয়োজন ছিল। বিশ্বকবিও বারবার নিজেকে ভেঙেছেন, নিজের সৃষ্টিকে বারবার অতিক্রম করেছেন। রবীন্দ্রনাথের শেষ ত্রিশ বছরের গদ্যরীতির বিস্ময়কর অভিব্যক্তি আছে। ঘরে বাইরের গদ্য একদিন শেষের কবিতার বাণীবিলাসের ঐশ্বর্যে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের বাংলা গদ্যে ‘রম্যরচনা’ শব্দটি ফরাসি ‘বেল-লেত্যর’ শব্দটির আক্ষরিক অনুবাদ। বাংলা সাহিত্যের গল্পকাররা শরৎচন্দ্র অথবা রবীন্দ্রনাথের ধারা ধরেছেন। চেকোভের পথে কেউ কেউ চলার চেষ্টা করলেও মোপাসাঁর ধারা বাংলা সাহিত্যে তেমন আসেনি। প্রথম থেকেই প্রমথ চৌধুরী তাঁর গল্পরচনায় ফরাসি বস্তুনিষ্ঠ ধারাই অনুসরণ করেছেন। তাই বলা যায়, প্রবন্ধ ও রসরচনাই তাঁর সার্থক স্বক্ষেত্র। পরবর্তীকালের বাংলা সাহিত্য সেই উত্তর দিয়েছে।

একালে কোলাহল বেশি। ক্লাসিকচর্চা এ যুগে অচল বললেই হয়। সুস্থ, সংযত ও রুচিশীল জীবন ছিল তাঁর প্রার্থনায়। প্রমথ চৌধুরী কামলোক থেকে আমাদের মনকে রূপলোকে নিয়ে যেতে চেয়েছেন। লেখক হতে গেলে প্রস্তুতির প্রয়োজন, তিনি তাঁর জীবনাচরণের মধ্যে জানিয়ে গেছেন। সুলভ জনপ্রিয়তার মোহ তাঁর চিত্তচাঞ্চল্য ঘটায়নি। পাঠকের মনোরঞ্জন করতে গিয়ে তিনি আপস করেননি।

কথ্যভাষা, ‘খেয়ালী রচনা’, ‘সুমার্জিত স্টাইল’―প্রমথ চৌধুরীর এই সমস্ত বিশিষ্ট দান ভাবীকালের বাংলা সাহিত্যে নিঃসেন্দেহে প্রভাব বিস্তার করেছে। চিরাচরিত ঘুম-পাড়ানি গানের পরিবর্তে তিনি নতুনমন্ত্র শোনালেন। জীবনকে জাগাতে বিদ্রুপের কশাঘাত করেছেন। বিদূষক সেজে রসিকতার ছলে গভীর বোধে নিয়ে গিয়েছেন। তাই তার ঐশ্বর্যদীপ্ত মনোজীবনে প্রমথবাবু নিঃসঙ্গ, একক। ভাবীকাল সেই দীপ্ত শাসনের মধ্যেই অনুসন্ধান করবে অনন্ত সম্ভাবনাময় চিত্ত-মুক্তির বুনিয়াদ।

সহায়ক গ্রন্থের তালিকা 

১.            প্রবন্ধ সংগ্রহ, প্রমথ চৌধুরী, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ, ৭ আগস্ট, ১৯৫২, পুনর্মুদ্রণ, ডিসেম্বর ২০০৩।

                (প্রমথ চৌধুরীর অন্যান্য গ্রন্থ, বীরবলের খাতা, রায়তের কথা, হিন্দু সংগীত, প্রাচীন বঙ্গসাহিত্যে হিন্দু-মুসলমান, চার-ইয়ারি কথা, গল্প সংগ্রহ, সনেট পঞ্চাশৎ ও অন্যান্য কবিতা।

২.           রবীন্দ্র রচনাবলী (জন্মশতবার্ষিক সংস্করণ) শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, শ্রীসরস্বতী প্রেস, ২৫ বৈশাখ, ১৩৬৮।

৩.           বাংলা সাহিত্যে প্রমথ চৌধুরী, রবীন্দ্রনাথ রায়, জিজ্ঞাসা, ৩৩ কলেজ রো, কলকাতা-৯, দ্বিতীয় মুদ্রণ (জিজ্ঞাসা), অক্টোবর ১৯৬৯।

৪.           বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মডার্ণ বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড (কলকাতা-৭৩), প্রথম সংস্করণ, ১৯৯৮, পুনর্মুদ্রণ, ২০১২।

৫. বাংলা সাহিত্যের ইতিকথা, ভূদেব চৌধুরী, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা-৭৩, পরিবর্তিত প্রথম দে’জ সংস্করণ, সেপ্টেম্বর ১৯৮৪, পুনর্মুদ্রণ, আগস্ট ২০০৯।

৬.           রবিজীবনী (প্রথম থেকে নবম খণ্ড), প্রশান্ত কুমার পাল, আনন্দ পাবলিশার্স, প্রথম সংস্করণ, মে ২০০৩, পঞ্চম মুদ্রণ ফেব্রুয়ারি, ২০১২।

৭.           শান্তিনিকেতনের চিঠি, শুভময় ঘোষ, বিশ্বভারতী গ্রন্থবিভাগ, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ, কার্তিক ১৪০৪।

৮.           পরিচয় (আখ্যান ও আখ্যানতত্ত্ব: ১৪২৩), সম্পাদক, বিশ্ববন্ধু ভট্টাচার্য, সম্পাদনা দপ্তর, ৮৯, মহাত্মা গান্ধি রোড, কলকাতা-৭।

৯.           শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ, আহমদ শরীফ, সংকলন ও সম্পাদনা, রতনতনু ঘোষ, কথাপ্রকাশ, প্রথম প্রকাশ, ২০১১, ঢাকা, বাংলাদেশ।

১০.         বহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথ, সুরঞ্জন মিদ্দে, রূপসী বাংলা (২০এ রাধানাথ বোস লেন, কলকাতা-৬), প্রথম প্রকাশ, ২০১৬।

১১.         রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়স্বজন, সমীর সেনগুপ্ত, সাহিত্য সংসদ (৩২এ, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোড, কলকাতা-৭০০০০৯), দ্বিতীয় সংস্করণ: আগস্ট ২০১৫।

১২.         সবুজপত্র ও বাংলাসাহিত্য, অশোক কুমার সরকার, পুস্তক বিপণি (২৭ বেনিয়াটোলা লেন, কলকাতা-৯) , প্রথম প্রকাশ: জানুযারি ১৯৯৪।

১৩.        শতবর্ষে সবুজপত্র: সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী, সম্পাদনা (যুগ্ম), সুদীপ্ত চৌধুরী, সুশান্ত দোলই, কৈবল্যদায়িনী কলেজ,  মেদিনীপুর, প্রথম প্রকাশ, আগস্ট ২০১৭।

 লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button