আর্কাইভপ্রচ্ছদ রচনা

ভালোবাসার সাম্পানে কালের কণ্ঠস্বর : নূর কামরুন নাহার

প্রচ্ছদ রচনা : বাংলা ভাষার ঐতিহ্যবাহী সাহিত্যপত্র

সাতচল্লিশে ঘটে দেশভাগের মতো একটা বড় ঘটনা। শুধু ধর্মের দোহাইয়ে দেশভাগ হলেও এ উপমহাদেশের সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, ভূখণ্ড, জীবনাচারণসহ সর্বক্ষেত্রেই পড়ে এর সর্বগ্রাসী প্রভাব। দেশভাগের দগদগে ঘা, রাতারাতি বদলে যাওয়া পরিচয়, পরিচয় সংকট, নৈতিক সংকট, নষ্ট চিন্তার মানুষ ও রাজনীতি, জাতীয়তাবাদের প্রকট উন্মেষ, সব মিলিয়ে ষাটের দশক এক প্রবল ঢেউ। এ ঢেউ প্রবলভাবে আছড়ে পড়ে সাহিত্যজগতেও। বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাসে তাই ষাটের দশক এত জীবন্ত ও আলোচিত। সময়টার চিত্রও পাওয়া যায় নানাজনের স্মৃতিচারণে। হায়াৎ সাইফ সময়টাকে বর্ণনা করেছেন এভাবে―

‘আমি সেই সময়ের কথা বলছি, যখন আমরা সদ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। ষাটের দশকের শুরু। আমাদের বৌদ্ধিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে আজকে যা-কিছু দৃশ্যমান তার বীজবপনের সময়, আমাদের জাতিসত্তার বিকাশ ও বিবর্তনের সময়, আমাদের আত্মপরিচয়ের অবয়ব-ধারণের থরথর কম্পমান সময়। একটি রুদ্ধকণ্ঠ সমাজের বিবরে পচনের পঙ্কে পা রেখেও আমরা উদ্বেল হয়ে উঠতে পারতাম অনেক পরিচর্যায় লালিত এক অনাগত উচ্চকিত ভবিষ্যতের আকাক্সক্ষায়।

‘সেই সময় ছিল দারুণভাবে উত্তাল, তরঙ্গবিক্ষুব্ধ কিন্তু তলদেশে স্থিতধী, একটি ধ্রুবের দিকে স্থিরনিবদ্ধ। সংঘাত ছিল স্বার্থবুদ্ধির সঙ্গে আদর্শের, সংঘাত ছিল রাষ্ট্রচিন্তায় ও সমাজবিবর্তনে, কিন্তু মূলধারার আবহমান বাংলার যে মর্মরূপ তার পরিচর্যায় আমরা প্রায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিয়োজিত ছিলাম মূলত আত্মরক্ষার খাতিরে।’

কথাশিল্পী রিজিয়া রহমান তার আত্মজীবনীমূলক প্রাচীন নগরীর যাত্রা গ্রন্থে সময়টা বর্ণনা করেন―

‘সময়টা ছিল পালা বদলের।… পুরনো আর নতুনের টানাপোড়েনে সবাই বিভ্রান্ত, নতুন জন্ম নেওয়া নতুন রাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে ওঠার অনুশীলনে ব্যস্ত, এলোমেলো, অস্থির।’

এ রকম একটা সময় যখন সমাজ বিবর্তন, রাষ্ট্রচিন্তন আর আত্মসংঘাতে মন প্রবল আলোড়িত, আবার নতুন এক ভূখণ্ডের স্বপ্নও শিরায় শিরায় জারিত, যখন নিজস্ব জাতীয়তা আর অস্তিত্বের খোঁজে চলছে তোলপাড় তখন এই জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা ও আন্দোলনের মধ্যেই ঢাকাকে কেন্দ্র করে আন্দোলিত হচ্ছে এক সাহিত্য-আন্দোলন। যাকে চিহ্নিত করা হয়েছে ষাটের দশকের ‘আধুনিক সাহিত্য আন্দোলন’ হিসেবে। তখন ঢাকাকেন্দ্রিক একটা সাহিত্য আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠার বেশ কিছু রাজনৈতিক আর সাংস্কৃতিক কারণও পুরোপুরি বিদ্যমান, যদিও ঢাকা তখনও এক অবহেলিত নগর। বিভিন্ন লেখকের বর্ণনায় যেমনটা পাওয়া যায়―

 ‘সেই ঢাকা ছিল রাজনৈতিক টানাপোড়েনে সদ্য হাতবদল হওয়া, বিষণ্ন ধূসর এক নগরী, যার শরীরের সাবেকি অলঙ্কারের ঔজ্জ্বল্য বিবর্ণ হলেও, সেগুলো সবই ছিনতাই হয়ে যায়নি।’  (প্রাচীন নগরীর যাত্রা, রিজিয়া রহমান)

‘তখনকার দিনে ঢাকা ছিল একটি ঘুমন্ত প্রাদেশিক শহর। ধানমন্ডি কেবল নির্মিত হচ্ছে, গুলশান-বারিধারার ওই অঞ্চলটি প্রায় জঙ্গলাকীর্ণ। মুড়ির টিনমার্কা টাউন-সার্ভিস বাসগুলো যাতায়াত করে সদরঘাট থেকে নবাবপুর হয়ে গুলিস্তান-রমনা পর্যন্ত। চার আনায় রিকশা পাওয়া যায়। র‌্যাঙ্কিং স্ট্রিট অভিজাত বসতি। নিউমার্কেট একদিকে। একটু সরে এসে এদিকে শাহবাগ হোটেল, যা আজকের দিনের পোস্ট গ্রেজুয়েট মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট। তার ওপাশে রেডিওর স্টুডিও, যা এখনো বর্তমান। তখন ওখান থেকেই সম্প্রচার হতো।’

‘সমস্ত রমনা অঞ্চল উত্তরে শাহবাগ প্রান্ত থেকে দক্ষিণে নাজিমুদ্দীন রোড পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তখন সারা এলাকাটি বড় বড় কড়ই গাছের স্নিগ্ধ ছায়ার সম্প্রীতিতে নিবিড় হাতছানি দিয়ে আমাদেরকে ডাকত।’ (হায়াৎ সাইফ)

‘নাজিমুদ্দিন রোডের শেষ মাথায় গিয়ে রেললাইন পার হলেই শুরু হয়ে যায় সবুজের রাজত্ব। কার্জন হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন, ঢাকা হাইকোর্ট, বর্ধমানের মহারাজার শৌখিন কাঠের বাড়ি―‘বর্ধমান হাউস’ (বর্তমানে বাংলা একাডেমি) এসব ছিল অসংখ্য দীর্ঘদেহী গাছে ঘেরা, চারপাশের সীমাহীন সবুজেই যেন ডুবে ছিল এইসব অন্য অবয়বের দালানগুলো। ছিল রমনার বিশাল প্রান্তরে রূপালি হারের ছড়ার মতো রোদে ঝিকমিকিয়ে ওঠা খালগুলো।’ (প্রাচীন নগরীতে যাত্রা, রিজিয়া রহমান)

সময় আর শহরের এইসব চিত্রে বোঝা যায় ষাটের দশকের ঢাকা ছিল শান্ত স্নিগ্ধ, তবে পালাবদল আর রাজনৈতিক অস্থিরতার ভেতর দিয়ে জেগে উঠতে শুরু করেছে। এই জেগে ওঠা ছিল সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, মানুষের জীবনাচারণসহ সকল সূক্ষ¥ জায়গাগুলোতে, নিঃসন্দেহে সাহিত্য-শিল্প এবং সাহিত্য আন্দোলনের ক্ষেত্রেও। এর বড় একটা অনুঘটক ছিল দেশভাগ। এটা অনস্বীকার্য যে, আধুনিক বাংলাসাহিত্যের উন্মেষ, বিকাশ ও প্রতিষ্ঠা কলকাতাতেই ঘটেছে। বাংলা সাহিত্যের আন্দোলনগুলোও তাই অনেকটাই কলকাতা কেন্দ্রিক। সাতচল্লিশের পর ওপার থেকে ঢাকায় আগমন ঘটে  বেশ কিছু কবি-সাহিত্যিকের। সদ্য ভাগ হওয়া পাকিস্তানে ঢাকার নতুন পরিচয় হয় পূর্ব-পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী। শিল্প-সাহিত্যের ব্যাপক প্রসার এবং ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী হিসেবে নানা বর্ধন ঘটলেও কোলকাতা ঢাকার চেয়ে অনেক নবীন শহর। ঢাকার একটা ঐতিহাসিক গুরুত্বও তাই বিদ্যমান। তাছাড়া সে সময় পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে জাতি এবং ভাষাগত পার্থক্য পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয়তাবাদের যে চেরাগ জে¦লে দিয়েছিল তা সৃজনশীলতার জগতে ব্যাপক আন্দোলন তুলছিল। মানুষের বঞ্চনা আর হতাশা, আশা আর স্বপ্ন, বোধ আর বোধহীনতার প্রতিবিম্ব ধারণ করেছিল শিল্প-সাহিত্য। তাই একটা সাহিত্য আন্দোলন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল। ভেতরের ক্ষোভ ক্রমেই সৃষ্টির লাভা হয়ে বের হয়ে আসছিল। আর সাহিত্য পত্রিকার মাধ্যমেই প্রশমন হচ্ছিলো মনের জ¦ালার আর আন্দোলনও ক্রমেই দানা বেঁধে উঠছিল―

‘এই সময়ে অর্থাৎ ষাটের দশকের প্রথম পর্যায়েই এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটল। স্বাক্ষর প্রকাশিত হলো ১৯৬৩ সালে। স্বাক্ষর তৎকালীন অনড় প্রাতিষ্ঠানিকতাকে বড় রকমের ঝাঁকুনি দিয়েছিল। স্বাক্ষরের চতুর্থ ও সর্বশেষ সংখ্যা বেরিয়েছিল ১৯৬৭ সালে, আর এই চারটি সংখ্যাতেই এই পত্রিকাটি আমাদের কবিতার ক্ষেত্রে একটি নতুন পথ-চলার সূচনা করেছিল। সেই পথটিকে পাকা করে গড়া হলো পরবর্তী এগারো বছর ধরে আবদল্লাহ আবু সায়ীদের সম্পাদনায় কণ্ঠস্বর দিয়ে। কণ্ঠস্বর প্রথম বেরিয়েছিল ১৯৬৫ সালে, যখন আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দি পেরিয়ে যাচ্ছি।’  (হায়াৎ সাইফ)

স্বাক্ষর পত্রিকার বাহ্যিক জৌলুসও তেমন ছিল না কিন্তু নতুন সৃষ্টির সোপানে পা রাখার ইঙ্গিতে পূর্ণ ছিল। যেমনটা ভালোবাসার সা¤পান গ্রন্থে লিখেছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।

‘স্বাক্ষর-এর চেহারা ছিল একেবারেই সাদামাটা। পত্রিকাকে মোহনীয় ও রূপসী করে তোলার জন্যে যে-প্রচ্ছদ নিয়ে সবার এত দুশ্চিন্তা, সেই প্রচ্ছদের বালাইটুকু পর্যন্ত নেই এতে। মলাট বলতে নিতান্তই একটা সাদা কাগজ, ওপরে পত্রিকার নাম পর্যন্ত নেই, তার জায়গায় লম্বা চৌকো একটা পরিসরে কবিদের নামগুলো একের পর এক টাইপ করে সাজানো। যেন পত্রিকার নাম-টাম কিছু নয়, কবিরাই এতে মুখ্য।

‘এই সাদামাটা চেহারাটা কোনও বিষয় ছিল না। এটা ছিল তরুণদের সৃষ্টির স্বাক্ষর। তারা এখানে স্বাক্ষর রেখেছিল নতুন কিছু সৃষ্টির। যা ক্রমেই একটি নতুন ধারা তৈরির মেনিফেস্টো। কিন্তু স্বাক্ষর আনতে চেয়েছিল নতুন কিছু।

‘স্বাক্ষর-এর পুঁজি বলতে প্রায় কিছুই ছিল না। না-সম্পন্ন লেখকের, না-সচ্ছলতার। তবু স্বাক্ষর-এর যে-পরিচয় বেঁচে থাকবে তা হলো স্বাক্ষর নতুন কিছু এনেছিল।’

‘স্বাক্ষর-এর চরিত্রের সবচেয়ে বড় যা পুঁজি ছিল, তা হচ্ছে এর দুঃসাহস। পত্রিকার প্রচ্ছদ থেকে আরম্ভ করে প্রতিটি শব্দের নির্ভীক তীক্ষè উচ্চারণে এই সাহসিকতা উৎকীর্ণ। লুকোবার, গোপন করবার, পালাবার কোনও উদ্যোগ নেই কোথাও―ভয়ে, সম্ভ্রমবোধে বা ‘পবিত্রে’র চোখ-রাঙানিতে কোনও শব্দ, উপমা বা প্রতিমা বর্জিত হয়নি।’

স্বাক্ষর যেমন নতুন কিছুর বেঁচে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করে, যেমন তার পুঁজি ছিল নতুনত্ব, তেমনি তরুণদেরও পুঁজি ছিল নতুনত্ব। নতুন সৃষ্টির উন্মাদনায় তারা ছিল উন্মত্ত, অস্থির। তাদের লক্ষ্য ছিল ভেঙেচুরে নতুন তৈরি, নতুন স্বর। সৃষ্টি অথবা অনাসৃষ্টির উল্লাসে হাসা এই তারুণ্য তাদের বোধ, উন্মাদনা, যুগ যন্ত্রণা, উচ্চকিত হয়ে ওঠা চিৎকারের উদ্গিরণ ঘটাতেই থাকে আর ধ্বংস, ক্ষয়, ক্ষোভ থেকে বের হয়ে আসতে থাকে একের পর এক সৃষ্টি―‘স্বাক্ষর-এর দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশিত হতে না-হতেই জ্বলে উঠল দলের দ্বিতীয় বর্তিকা: সাম্প্রতিক। সম্পাদক শাহজাহান হাফিজ।’ (ভালোবাসার সা¤পান, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ)

‘সাম্প্রতিক বেরোতে না-বেরোতেই ফারুক আলমগীরের সম্পাদনায় জ্বলে উঠল আর-এক প্রদীপ : প্রতিধ্বনি। অন্যদের মতোই আটপৌরে চেহারা, নিরাভরণ, তবু ভেতরে বয়ে বেড়াচ্ছে জ্বলিত ইস্পাত। স্বাক্ষর আর সাম্প্রতিক-এর লেখকরাই উপস্থিত এখানে, কিন্তু তবু কী যেন এক নতুন উদ্দীপনার হাওয়া এর সমস্ত অবয়বে।’ (ভালোবাসার সা¤পান, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ )

তরুণরা যেন বুক চিরে হৃদয় দেখানোর খেলায় মেতে উঠেছিল। তাদের হৃৎপিণ্ডের রক্তাক্ত ক্ষত আর জ¦ালার ভেতর নেশা ধরেছিল, যাকে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছেন দুটো ‘ন’-এর নেশা পেয়ে বসেছিল তাদের নতুনত্বের আর নষ্টের। ঠিক যেন তাই, নষ্ট আর নতুনত্ব। কিন্তু নতুনত্ব মানা যায়। কালের ধর্মই নতুনের আবাহন। প্রত্যেক কালই আশা রাখে কিছু নতুনত্বের। কিন্তু নষ্ট কেন ? নষ্টের চেষ্টার এই আকুতি কেন ? এই একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আবারও যেতে হয় সেই কালের শেকলের কাছে। কাল কখনও সুন্দরের অনুগামী, কখনও অবক্ষয়ী, কখনও সৃষ্টিমত্ত, কখনও ধ্বংসবিলাসী। ষাটের দশকের শুরুতেই শুরু হয়েছিল সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়। মূলত পঞ্চাশের শেষ এবং ষাটের প্রথমেই চেপে বসা সামরিক শাসন, শোষণ, দলিত অধিকার, আকাক্সক্ষার মৃত্যু, বঞ্চনা আর বিতৃষ্ণার মধ্য দিয়ে অবক্ষয় এসেছিল আগ্রাসীরূপে। সাতচল্লিশের দেশভাগের পর যে আশা জেগে উঠেছিল, সে আশায় দীপ জে¦লেছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এবং যুক্তফ্রন্টের বিজয়, পঞ্চাশের দশকের লেখকেরা―শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আল মাহমুদ প্রমুখ লেখার পুষ্টি নিয়েছিলেন যেই আশাবাদ থেকে, তা দীর্ঘায়ু লাভ করতে পারেনি। সামরিক শাসন তাকে পঙ্গু করে দিয়েছিল জ¦লে উঠার মুহূর্তেই―

‘১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি এবং বাক্-স্বাধীনতা হরণ ও সব ধরনের রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ দ্বারা। পঞ্চাশের দশকে বাঙালির জাগরণের কাণ্ডারি ছিলেন মূলত ছাত্র-তরুণেরা, ভাষা-আন্দোলনে যাঁরা ছিলেন পরিচালক ও রূপকার। এই আন্দোলন থেকে উঠে আসে এক ঝাঁক নাম যাঁরা বয়সে একান্ত যুবা, তবে তাঁদের হাতেই সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক-সাঙ্গীতিক ও শিল্পধারায় রূপায়িত হয়েছিল ভাষা-আন্দোলন। হাসান হাফিজুর রহমান, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, আলতাফ মাহমুদ, মুর্তজা বশীর, আহমদ রফিক, গাজীউল হক, জহির রায়হান, শেখ লুতফর রহমান এমনি আরও অনেক নাম উল্লেখ করা যায়। তাঁরা পঞ্চাশের দশকের পূর্ববাংলার জাগরণের রূপকার, তবে তাঁদের বিচ্ছিন্ন ও বিকলাঙ্গ করে দিল ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন যার মূল লক্ষ্যই ছিল পূর্ববাংলার জাতীয় আন্দোলন দমন।’ (মফিজুল হকের স্মারক বক্তৃতা)

 দেখা যায় সৃষ্টির যে একটা স্ফূলিঙ্গ জ¦লে উঠেছিল পঞ্চাশের দশকে, দেশপ্রেম, স্বজাত্যবোধে যেমন উদ্দীপিত হয়ে উঠেছিল সৃজনশীলতা আর সৃষ্টি তার মুখ থুবড়ে পড়েছিল অবদমন আর অবরুদ্ধতায়।

শিল্পসত্তার হরণ, অবদমন, অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য আর নৈরাশ্যের মধ্য দিয়ে অবক্ষয় জাতির মননে গাঢ় হয়ে উঠেছিল।

‘ষাটের দশকে আমাদের সমাজে অবক্ষয় এসেছিল দুটি পর্যায়ে। প্রথম ঢেউটি এসেছিল শ্বাস-চেপে-ধরা সামরিক নিগ্রহকে কেন্দ্র করে। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২-এর মধ্যে ঘটেছিল এর মূল ঘটনাটি…

‘এর পরেরটা এসেছিল এর ঠিক পরপরই বাষট্টি তেষট্টির দিকে। এটা এসেছিল স্বৈরশাসনের উপজাত হিসেবে।’ (ভালোবাসার সা¤পান, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ)

এই অবক্ষয় লেখক শিল্পী আর তরুণদেরও দ্বিধাবিভক্ত করে দিয়েছিল দুটো দলে। একদল শুদ্ধ সুন্দরের বিশ্বাসী। আর একদল অবক্ষয়বাদী, অন্ধকারকে বের করে নিয়ে আসতে চায়। জীবনের পচা, ক্ষয় আর ঘুণে ধরা সমাজ আর নষ্টবোধ দেখাতে চায় কলমের রক্তাক্ত অক্ষরে। কেউ কেউ থাকতে চায় সুন্দর শোভনের নান্দনিক স্পন্দনে, আর কেউ কেউ জীবনের বিবমিষা আর অন্ধকারের নন্দনে।

ভালোবাসার সাম্পানে যাদের পরিচয় পাওয়া যায় এভাবে―

“এক দলে রয়েছে, অন্যদলের ভাষায় ‘পবিত্রতাবাদীরা’― গতানুগতিক সাহিত্যের প্রচলিত আদর্শ ও মূল্যবোধগুলোকে আঁকড়ে-থাকা রাবীন্দ্রিক চেতনার একালীয় উত্তরসূরিরা, সত্য শিব সুন্দরের ফেলে-আসা ঘেয়ো আদর্শগুলোকে যারা নতুন যুগের তারুণ্যস্নানে পুনরুজ্জীবিত করতে চায়।”

অন্যদল পবিত্রতায় বিশ্বাস করে না। তারা ব্রাত্য, উচ্ছন্নে যাওয়া। তারা বিশ্বাস করে জীবনে―উষ্ণ, গনগনে, অনাস্বাদিত জীবনে―এর অসহ্য সুখ আর অকথ্য-যন্ত্রণার দীপ্র জ্বলন্ত মশালে। তারা জানে, বহ্নিমান আর যন্ত্রণাদগ্ধ এই জীবন গতিশীল নদীর মতোই পবিত্র। এর ভেতর আমুণ্ডু আত্মাহুতি দিয়ে ডুবুরির আদলে তুলে আনতে হবে জীবনের তাবৎ অর্থ আর অর্জন। নতুন যুগচেতনার দেশলাইয়ে নিজের শরীরে আগুন লাগিয়ে সেই দুঃসহ যন্ত্রণার ভেতর থেকে উপহার দিতে হবে জীবনের নতুন উপমা।

‘এই দলটির যা ছিল সবচেয়ে বড় পুঁজি, তা হলো নির্জলা সততা ও দুঃসাহস। অকপট এবং নগ্নভাবে নিষিদ্ধের জন্মান্ধ চিৎকারকে তুলে ধরেছিল তারা, কারও অনুমোদন বা পছন্দ-অপছন্দের পরোয়া না করেই। নিরাপদ সততাই ছিল তাদের নির্মোহ দেহচ্ছদ। উষ্ণ রক্তমাংসময় অকৃত্রিম হৃদয় ছিল এ-ব্যাপারে তাদের একমাত্র পুঁজি।’

এখানে একটু পেছনে ফেরা দরকার। এই যে দ্বিতীয় দল যাদের পুুঁজি নির্জলা সততা আর দুঃসাহস  যারা প্রকাশ করেছে স্বাক্ষর, যারা কালের খাতায় রাখতে চায় নিজেদের স্বাক্ষর এই দলটির ভিন্ন রেখা নির্ধারিত হয়েছিল স্বাক্ষর প্রকাশেরও আগে। যার ঐতিহাসিক  প্রেক্ষাপট ভালোবাসার সাম্পানে উঠে এসেছে এভাবে―

‘১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বরের একটি দিন। ১৫০ জগন্নাথ হলে সভা বসল সময়মতো। যোগদানকারীর সংখ্যা বেশি নয়, কিন্তু সবাই উদ্দীপ্ত, উৎসুক। যেন বিরাট কিছু ঘটতে যাচ্ছে সামনে তাকে এগিয়ে নিতে কাঁধ বাড়িয়ে দিয়েছে সবাই।’ 

এই দলটি প্রকাশে উন্মুখ। তারা তাদের বোধ আর বিশ্বাসকে তুলে ধরতে চায়। শব্দের শানিত তরবারিতে ভাঙ্গতে চায় মুখোশধারী সমাজকে। এই তরুণরা কালের ধ্বনি আর কালের বিবর প্রকাশের জন্য মরিয়া। তারা তুলে ধরতে চায় তাদের কণ্ঠস্বর। সময়ের উত্তাল স্রোত, সময়ের সমাজবাস্তবতা প্রকাশের চরম উত্তেজনায় অস্থির কয়েকজন তরুণের মিলিত প্রাণ ঘোষণা করে―

‘নিজেদের মুখপত্রে নিজেদের কথা জোর গলায় বলতে হবে। সেজন্য চাই আলাদা পত্রিকা। আলাদা মুখপত্র। আলাদাভাবে আমরা আত্মপ্রকাশ করতে পারলেই আমাদের আলাদা কণ্ঠস্বরকে তুলে ধরতে পারব।’ (ভালোবাসার সা¤পান, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ)

নিজেদের মুখপত্র, নিজেদের পত্রিকা প্রকাশের এমন জোরালো তরঙ্গ বয়ে গেলেও পত্রিকা প্রকাশ করার কঠিন বাস্তবতা রুখে দিতে চায় স্বপ্নের মুখপত্র কণ্ঠস্বরের প্রকাশ। কিন্তু তারুণ্য বাধা মানবে কেন। তাই পূণাঙ্গ পত্রিকা প্রকাশ সম্ভব না হলেও দলটি প্রকাশ করে বক্তব্য, একফর্মার একটা কাগজ। কাগজও বলা যায় না, একে বলা যায় ইশতেহার, নতুন দলের আগমনবার্তা। এই বক্তব্য পত্রিকায় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের লেখাতেই  উঠে আসে দলটির মূল বক্তব্য― 

‘দলটা তাদেরই-সেই সব অসন্তুষ্ট, অগতানুগতিক রাগী তরুণদের-অন্তঃসত্ত্বা রক্তে যাদের নতুন সৃষ্টির আগ্রহ উদ্্গ্রীব। এখানকার সাহিত্যের ও সমাজের ভানসর্বস্ব অযোগ্য মোড়লদের প্রতি তাদের ঘৃণা, ক্ষোভ ও আক্রোশ-যার ফলশ্রুতি হিসেবে সেই ঘেয়ো, অথর্ব, নির্জীবদের বয়স্ক প্রভাব থেকে মুক্তিতে তারা কৃতশপথ-তারা একত্রিত, সমবেত, আয়োজিত। উদ্দেশ্য তাদের নতুন কিছু, মহৎ কিছু, বিস্ময়কর কিছু-প্রয়োজনে উপেক্ষিত বা হাস্যকর কিছু-অসামাজিক অশ্লীল গর্হিত কিছু, কিন্তু কিছু নতুন, কিছু অভাবনীয়। কালের বুকের ওপর নতুন স্বাক্ষরের বেগবান চিন্তায় তারা অস্বস্ত যে স্বাক্ষর স্পষ্ট ও স্থায়ী-সাময়িক ও স্বল্পায়ু হলেও সজীব ও স্বাস্থ্যবান।’

 বক্তব্য-তেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিলো দলটির উদ্দেশ্য আর বক্তব্য।  বক্তব্যের প্রকাশ তাদের আর উদ্দীপিত করে তুলেছিল।  আরও আঁটঘাঁট বেঁধে নামে তারা, না কিছু একটা বের করতেই হবে। আড্ডা জমে উঠে ঠাটারিবাজারের হোটেল নাইল ভ্যালিতে। সেই একই স্বপ্ন  সাহিত্য পত্রিকার প্রকাশ, যেখানে ফুটে উঠবে তারুণ্যের সৃষ্টির কোলাহল। এ রকম এক অস্থিরতা থেকেই জন্ম হয় স্বাক্ষর, সাম্প্রতিক, প্রতিধ্বনি এবং কণ্ঠস্বরের মতো সাহিত্য পত্রিকাগুলো এবং দানা বেঁধে উঠে আন্দোলন।

দুটো দলেরই উদ্দেশ্য সৃজনশীলতা আর সাহিত্য। দুটো দলই তরুণ তবে তাদের প্রকাশ ও আদর্শ ভিন্ন। তাদের বলার বিষয় ও কায়দা ভিন্ন। প্রথম তরুণ দলটি স্বস্তিময় সুন্দর ছন্দোময় জীবন অন্বেষী আর দ্বিতীয় দল চায় ভেতরের অগ্নির বহিঃপ্রকাশ, সময়ের জ¦ালা আর সময়ের নখরে ক্ষতবিক্ষত হতে। প্রথম দলের দাবি তারা পঞ্চাশের মুখপাত্র কিন্তু দ্বিতীয়ের দৃষ্টিতে প্রথম দল বহন করছে খানিকটা, তিরিশের উত্তরাধিকার আবার রবীন্দ্রবলয়েরও কিছুটা। কিন্তু এই দ্বিতীয় দল চায় আরও নতুন কিছু, আরও নতুন প্রকাশ, নতুন বাচন আর জীবনের উষ্ণতা ও আগুনে পুড়ে আরও বেশি জীবন ও কালের কাছাকাছি পৌঁছানো।

জীবন, কাল এবং সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজন এমন এক মুখপত্র যা তারা এতদিন ধারণ করে এসেছে তাদের স্বপ্নে যেখানে জীবনের ক্লেদ, গ্লানি, বির্পযয়, বিবমিশা উঠে আসবে নগ্নভাবে। এই খোলামেলা আড়ালহীন প্রকাশের লক্ষ্যেই সৃষ্টি হয় সৃষ্টির নতুন ইতিহাস। তারপর ইতিহাসের শরীর খুঁড়ে দেখা যায়―

“১৯৬৫ সালের মে-জুন মাসের একটি বিকেল। বেলা পড়তে শুরু করতেই সেকালের ঢাকার ‘তরুণতম’ লেখকদের প্রায় সকলেই এক দুই করে এসে ভিড় করতে শুরু করল পাবলিক লাইব্রেরির সামনের ছোট্ট মাঠটুকুতে।”

‘প্রথম দলের সবাই প্রায় আমার সমবয়সী, দু-তিন বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে আসা তরুণ। দ্বিতীয় দলে রয়েছে অতি-তরুণেরা, আমার চেয়েও দু-তিন বছরের ছোট এরা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখনও সবাই। দু-দলের বিচ্ছেদ এতটাই বেড়ে গেছে যে এরই মধ্যে ঠিক হয়ে গেছে কোনওভাবেই আর একসঙ্গে থাকা চলবে না―দু-দলের লেখকদের দৃষ্টিভঙ্গি, বোধ, বিশ্বাস যেহেতু ভিন্ন, তাই তাদের আত্মপ্রকাশের মুখপত্রও হবে আলাদা। নিজ নিজ আলাদা জীবনভাবনা তুলে ধরবে তারা নিজ নিজ মুখপত্রের ভেতর দিয়ে। ঠিক হয়ে গেছে প্রথম দলের পক্ষ থেকে বেরোবে কালবেলা, সম্পাদনা করবে জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত। দ্বিতীয় দলের পক্ষ থেকে বেরোবে কণ্ঠস্বর সম্পাদক হবো আমি।’ (ভালোবাসার সা¤পান, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ)

এমন একটা ভেতরগত সিদ্ধান্ত আর দৃঢ়তার পরও সে সম্মেলনে দুটো পত্রিকার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয় না। সিদ্ধান্ত হয় পত্রিকা দুটো না, একটি হবে, নাম কালবেলা আর সম্পাদক হবে জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত আর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। সেই একটা সিদ্ধান্তে কেমন প্রশান্তিও নামে দুই শিবিরে। কিন্তু সেও ক্ষণিক। শিরায় শিরায় নতুন সৃষ্টি, নতুন স্বরের যে উন্মাদনা তা আবারও ছিটকে নিয়ে যায় কণ্ঠস্বর প্রকাশের দিকে। কিছু দৃঢ় হাত একত্রিত হয়ে শপথের মতো বলে, কণ্ঠস্বর বের হবে। আলাদাই থাকবে দুই ঘরানা।

‘কণ্ঠস্বরকে প্রথমে ভাবা হয়েছিল কবিতা পত্রিকার নাম হিসেবে। কিন্তু স্বাক্ষর নামটা কবিতা-পত্রিকার নাম হিসেবে অনেকের পছন্দ হয়ে যাওয়ায় ঠিক করা হয় সবরকম লেখা নিয়ে যে পত্রিকাটি বেরোবে তার নাম হবে কণ্ঠস্বর।’ (ভালোবাসার সা¤পান, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ)

কণ্ঠস্বর বের করার কথা ঠিক হলো, সম্পাদক ঠিক হলো, তার পরের ধাপ প্রকাশক। পাওয়া গেল মানানসই একজনকে, খালেদা হাবীব, ইবরাহীম খাঁর মেয়ে পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি (বর্তমানে উপমন্ত্রীর মর্যাদা)। তিনিই হলেন প্রকাশক। সাতদিনেই হয়ে গেল ডিক্লারেশন। শুরু হলো কণ্ঠস্বরের যাত্রা । কিন্তু কারা হলেন কণ্ঠস্বরের লেখক ?

‘প্রথম ষাটের এই তরুণ লেখকদের অধিকাংশই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র। যেন একই স্বপ্নের অভিন্ন হাতছানিতে জড়ো হয়ে গেল তারা ওই বিভাগে। আবদুল মান্নান সৈয়দ, রফিক আজাদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আসাদ চৌধুরী থেকে আরমান চৌধুরী, শহীদুর রহমান, ফারুক আলমগীর, ইমরুল চৌধুরী, ইউসুফ পাশা, প্রশান্ত ঘোষাল, আমিনুল ইসলাম বেদু, মফিজুল আলম―যারা পরবর্তীতে এখানকার সাহিত্যে ক্রমান্বয়ে খ্যাতিমান বা ধীরে ধীরে বিস্মৃত হয়েছে।’

“দেখতে দেখতে দেশের নানান এলাকা থেকে এগিয়ে এল আরও অনেকে। ১৯৬০ থেকে ৬৫-এর মধ্যে একটা পুরো দল দুদ্দাড় আওয়াজে এসে জড়ো হয়ে গেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। সিলেট থেকে ভাঙা-সিলেটি উচ্চারণে ‘খো খো’ করতে করতে হাজির হলো আফজাল চৌধুরী। এল পুরোনো ঢাকার নতুন কবি ইমরুল চৌধুরী, এক হাতে তার একালের কবিতার ইশতাহার, অন্য হাতে শিশুসাহিত্যের উৎসাহ। ভূতের সঙ্গে ষাট সেকেন্ড, ইমু মিয়ার দেশভ্রমণ এসব বেরিয়ে গেছে ওর তখন। সুদূর বরিশালের উলানিয়া জমিদারবাড়ি থেকে এসে হাজির হলো আশিক-ই-ওয়াহিদ মোহাম্মদ আসাদুল ইসলাম চৌধুরী, এসে হয়ে গেল আসাদ চৌধুরী। এল নামে আর চেহারায় পূর্বপুরুষের ইরানি ঐতিহ্য নিয়ে আলী আগা জাকারিয়া সিরাজী, এসে হলো জ্যাক সিরাজী। এল সুস্মিত কবিতা নিয়ে স্নিগ্ধ চেহারার ফারুক আলমগীর। এল উত্তাল তারুণ্যে প্রোজ্জ্বল মোহাম্মদ রফিক, রণপায় চড়ে পুরোনো ঢাকা থেকে এল রণপা চৌধুরী (রণজিৎ কুমার পাল চৌধুরী), ঝিনাইদহ থেকে এল গল্পকার শহীদুর রহমান, যৌনতার ‘কয়েক হাজার অশ্বশক্তি’ নিয়ে এসে জুটল ইউসুফ পাশা, এল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোহাম্মদ জামাল খান, এল জামাত আলী―এসে শামিল হয়ে গেল তরুণদের সেই উদ্দাম জামায়াতে। এল সুনির্মল গাঙ্গুলী, ইয়াসিন আমিন, আবদুর রশিদ-এর মতো জানা-অজানা তরুণের দল। বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গন মুখর হয়ে উঠল উষ্ণ উৎসুক সেই অপরিচিত তারুণ্যের পদপাতে।”

‘বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গন তখন যেন সেই সময়কার সারাদেশের সাহিত্যমাতাল তরুণদের এক সাংস্কৃতিক পবিত্র স্থান, যেখানে এলে যোগ দেওয়া যাবে তারুণ্যের উথলে ওঠা মহাজমায়েতে।’ (ভালোবাসার সা¤পান, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ)

কণ্ঠস্বর হলো তরুণদের মুখপত্র, তরুণরাই কণ্ঠস্বরের লেখক। তরুণের এ দীর্ঘ মিছিলে উপচানো লেখার সম্ভার। তাই প্রকাশক, সম্পাদক ঠিক হবার পর লেখার কোনও ঘাটতি হলো না। কণ্ঠস্বরের প্রথম সংখ্যায় ছিল দুটো গল্প, চারটা কবিতা, তিনটা অনুবাদ কবিতা, একটা ছোট আকারের নিবন্ধ আর একটা মূল প্রবন্ধ। ডাবল ক্রাউন ডিমাই সাইজের পত্রিকার পৃষ্ঠা চল্লিশ। ছাপা হলো ইষ্ট বেঙ্গল বিউটি প্রেসে। সেই প্রেসও ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী। ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নেয়া সে প্রেসের বর্ণনা পাওয়া যায়  আবদুল মান্নান সৈয়দের স্মৃতিচারণে―

‘দোতালায় কম্পোজ সেকশন। সরু, দিনের বেলায় অন্ধকার, ভাঙ্গা পতনোন্মুখ এক সিঁড়ি দিয়ে দোতালায় উঠতে হয়। তখন কি জানতাম আমার চিরকালের সাহিত্য যাত্রা এমনি এক সিঁড়ি দিয়ে।’

প্রচ্ছদ হলো ওপর থেকে নিচে একটি একটি অক্ষর সাজিয়ে ২৪ পয়েন্টের লাল রংয়ের পাইকা টাইপে কণ্ঠস্বর লিখে। দাম রাখা হোল পঞ্চাশ পয়সা। ছাপা হলো সাড়ে বারোশো কপি। প্রথম সংখ্যা বেরোবার পরপরই পাঠকমহলে তুমুল সাড়া পড়ে গেল।

তবে যে-ব্যাপারটা পাঠকমহলকে সবচেয়ে বেশি তপ্ত আর সরগরম করে তুলল তা পত্রিকার তৃতীয় কভার পৃষ্ঠায় লাল হরফে লেখা এর ঘোষণাপত্রটি :

‘যারা সাহিত্যের সনিষ্ঠ প্রেমিক, যারা

শিল্পে উন্মোচিত, সৎ, অকপট, রক্তাক্ত,

শব্দতাড়িত, যন্ত্রণাকাতর; যারা

উন্মাদ, অপচয়ী, বিকারগ্রস্ত,

অসন্তুষ্ট, বিবরবাসী;

যারা তরুণ, প্রতিভাবান, অপ্রতিষ্ঠিত, শ্রদ্ধাশীল, অনুপ্রাণিত;

যারা পঙ্গু, অহংকারী,

যৌনতাস্পৃষ্ট

কণ্ঠস্বর

তাদেরই পত্রিকা।

প্রবীণ মোড়ল, নবীন অধাপক,

পেশাদার লেখক, মূর্খ সাংবাদিক, ‘পবিত্র’

সাহিত্যিক, এবং

গৃহপালিত সমালোচক এই পত্রিকায়

অনাহূত।’

(ভালোবাসার সা¤পান, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ)

এই একটা ঘোষণাই পত্রিকার চরিত্র উন্মোচন করে দিল। কণ্ঠস্বর কাদের পত্রিকা, কী তাদের স্বর। এ ঘোষণাই জানান দিল একদল তরুণ রাবীন্দ্রিক ও রবীন্দ্র-উত্তর শুদ্ধতায় আর সত্যসুন্দরের প্রকাশের একনিষ্ঠতাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এই ঘোষণা তখন ফিরছে সাহিত্য অঙ্গনের সবার মুখে মুখে, আনছে একটা চমক আর চাবুকের বাড়ি মারছে প্রথাগত বোধ আর ভাবনায়। তখন মাঠে আছে সমকালের মতো প্রখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা। চল্লিশ এবং পঞ্চাশের শক্তিমান ও জনপ্রিয় লেখকরা ভিড় করে আছেন সমকালের পাতায়। কিন্তু কণ্ঠস্বরের প্রথম সংখ্যাতেই ছিল নান্দনিকতা আর অন্য এক শুচিতা। যেমন তার অবয়ব, তেমনি তার ছাপা আর শিল্পের প্রতিশ্রুতির প্রতি আপসহীনতা। পঞ্চাশের সাহিত্যের সঙ্গে কণ্ঠস্বরের মূল পার্থক্যটা ছিল আদর্শগত। পঞ্চাশের ধারার সাহিত্যের মূল বিষয় ছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, দেশভাগ, দেশভাগোত্তর বাস্তবতা, মা-মাটির সংলগ্নতা, জাতিসত্তা, নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি অঙ্গীকার আর মমত্ববোধ। ফলে পঞ্চাশের সাহিত্যে ছিল স্বপ্নের বুনন, সেখানে স্বপ্নভঙ্গও ছিল তবে সে বেদনার প্রকাশও ছিল কোমলস্বরের। কণ্ঠস্বরের জন্মই হয়েছিল এক বন্ধ্যা ও স্বপ্নহীন সময়ে, সামরিক শাসনের যাঁতাকলে। কণ্ঠস্বরের লেখকদের ভেতরে ছিলো যা কিছু সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, ছিলো প্রথা ভাঙ্গার উন্মত্ততা। কণ্ঠস্বরের লেখকদের মধ্যে তাই ছিল পাশ্চাত্য সাহিত্যের অবক্ষয়। তাদের বেদনা, ক্ষত ও বঞ্চনার প্রকাশ ছিল  উচ্চগ্রামের। কণ্ঠস্বর তাই চমকে দিয়েছিল  ক্লেদাক্ত, রক্তাক্ত আর নগ্ন প্রকাশে। 

“কণ্ঠস্বর-এর প্রথম সংখ্যার ঘোষণা সাধারণ পাঠকের রক্তে চাঞ্চল্য জাগালেও যা তাদের ব্যাপারে সত্যি সত্যি আগ্রহী করে তুলেছিল তা হলো এর লেখাগুলোর শক্তি ও নতুনত্ব। বিষয় বা জীবনানুভূতি থেকে শুরু করে শব্দে, ভাষায়, প্রকরণে, সবখানেই ছিল এর নবীনতা। প্রথম সংখ্যায় লেখা খুব-একটা বেশি ছিল না। আগেই বলেছি মূল প্রবন্ধ―দুর্বলতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলাম আমি। গল্প ছিল দুটো একটা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের নিঃশ্বাসে যে প্রবাদ, অন্যটা আবদুল মান্নান সৈয়দের অতিওয়ারিশ মাল। কবিতার সংখ্যা একটু বেশি, চারটি রফিক আজাদের ‘মৃত্যু: ২’, শহীদুর রহমানের ‘দুটি কবিতা’, ইমরুল চৌধুরীর ‘সৌরময় নাস্তিকতা’, হাংরি জেনারেশনের মলয় রায়চৌধুরীর দুটি কবিতা (ও আমার বাংলা মাগো ও শ্মশানে নিয়ত ফুল)। এছাড়া ছিল ইভ বন ফোয়ার তিনটি অনুবাদ কবিতা।” (ভালোবাসার সা¤পান, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ)

এরকম একটি দলকে ঊনবিংশ শতাব্দীর পাশ্চাত্য সাহিত্যের কলাকৈবল্যবাদীদের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। যারা বলেছিল শিল্পের সঙ্গে সমাজের উপযোগিতার সম্পর্ক নেই, শিল্প শুধু শিল্পের জন্যই। অৎঃ ভড়ৎ ধৎঃ’ং ংধশব-এ বিশ্বাসী লেখক যেমন ফ্লবেয়ার, বোদলেয়ার প্রমুখরা অবক্ষয়ের ভেতর থেকে তুলে এনেছিলেন শিল্প। এদের তিরিশের দশকের কল্লোলযুগের লেখকদের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, যারা রবীন্দ্রবলয় থেকে বেরিয়ে এসে সাম্যবাদী, নৈরাশ্যবাদী ও সুররিয়ালিস্ট ধারার সাহিত্য রচনায় উদ্যোগী হন এবং যারা পাশ্চাত্যের কলাকৈবল্যবাদীদের দ্বারাও প্রভাবিত। তিরিশের দশকের ছিল দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সামাজিক অস্থিরতা, শ্রেণিবৈষম্য, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা-হাঙ্গামার এক অস্থির সময়। দীনেশরঞ্জন আর গোকুলচন্দ্রের খানিকটা খেয়ালী সিদ্ধান্তেই ফসল মাসিক কল্লোল-এর আত্মপ্রকাশ। ১৯২৩ থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে প্রকাশিত এ পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই আর্বতিত হয়েছে কল্লোলের লেখক আর বাংলা সাহিত্যে ‘কল্লোল’ যুগ । আর এ যুগের গুরুত্বপূর্ণ ফসল বাংলা সাহিত্যের পঞ্চপাণ্ডব  কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে। কাজী নজরুল ইসলাম, প্রেমেন্দ্র মিত্র, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, সঞ্জয় ভট্টাচর্য, অবনীনাথ রায়সহ এবং কল্লোলের নারীলেখকদের  ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে এ আন্দোলনে। অথবা এদের হয়তো তুলনা চলে ষাটের দশকের হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের সঙ্গে। হাংরি আন্দোলনের শব্দটি ইংরেজি ঐঁহমৎু থেকেই নেওয়া হয়েছে, যার মানে ক্ষুধার্ত। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৫ বছর বেগবান ছিল হাংরি আন্দোলন। যার পুরোধা ছিলেন কবি সমীর রায়চৌধুরী ও তাঁর ছোট ভাই মলয় রায়চৌধুরী। ইশতেহারে মলয় রায়চৌধুরী লেখেন ‘শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা কবিতা সৃষ্টির প্রথম শর্ত। …এখন কবিতা রচিত হয় অরগ্যাজমের মতো স্বতঃস্ফূর্তিতে।’ এ ইশতেহারে লিড দিয়েছিলেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, আর প্রকাশক ও সম্পাদক ছিলেন দেবী রায়। ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৫ বছর বেগবান ছিল হাংরি আন্দোলন। পুরোপুরি কণ্ঠস্বরের কিছু মিল খুঁজে নিলেও কণ্ঠস্বর এক ভিন্ন আন্দোলন। কণ্ঠস্বরকে এসব আন্দোলনের সঙ্গে এসব আন্দোলনের সঙ্গে মিলানো যায় না। কণ্ঠস্বর-এর প্রাণপুরুষ এবং সম্পাদক  এ বিষয়ে স্পষ্ট  বলেন―

‘তারা এই অবক্ষয়কে সমকালীন আমেরিকান বা পশ্চিমবঙ্গীয় সাহিত্যের অবক্ষয়ী ধারার অনুকরণসর্বস্ব উত্তরপুরুষ বলে রায় দিয়েছিলেন। তারা এই সমাজের পতনের ইতিহাস সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন না। অনুভব করেননি যে আমাদের এই অবক্ষয়ের মূল প্রোথিত ছিল আমাদেরই সমাজের ক্লেদাক্ত বাস্তবতার ভেতরে এবং এই তরুণেরা ছিল আমাদের সেই জাতীয় অবক্ষয়েরই ক্লেদজ কুসুম।’ (ভালোবাসার সা¤পান, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ)

এই ক্লেদজ কুসুমেরাই ছিল স্বাক্ষর, সাম্প্রতিক আর কণ্ঠস্বরের প্রাণভোমরা। কণ্ঠস্বর তার নিজ ভূমির কাছ থেকেই রসদ নিয়েছিল। বাইরের এসব আন্দোলনও এবং তাদের মেনিফেস্টোর সঙ্গেও কণ্ঠস্বরের পার্থক্য ছিল। যেমন কল্লোল যুগে রবীন্দ্র বলয় থেকে বের হয়ে স্বতন্ত্র্য একটা স্বর প্রতিষ্ঠিত করা এবং কলাকৈবল্যবাদকেই অনেক ক্ষেত্রে আদর্শ মেনে নিলেও কল্লোল যুগের লেখকদের মূল বিষয় ছিল আধুনিকতা, ওখানে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার বিষয় মুখ্য ছিল না, যা ছিল হাংরি জেনারেশন আন্দোলনে।

হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁরা সাহিত্যকে পণ্য হিসেবে চিহ্নিত করতে অস্বীকার করেছিলেন। তাঁরা এক পৃষ্ঠার লিফলেট প্রকাশ ও বিনামূল্যে বিতরণ করত। লিফলেট বেরও করা হতো বিভিন্ন জায়গা থেকে। হাংরি আন্দোলনের একটা রাজনৈতিক চেহারাও ছিল। তারা নানা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে মুখোশ পাঠাত। কণ্ঠস্বর তা নয়। তাছাড়া কণ্ঠস্বরে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার বিষয়টা থাকলেও প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার চেয়ে এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল উপস্থাপনে নতুনত্ব, নতুন স্বর, তারুণ্যের পূজা। 

‘কণ্ঠস্বর আন্দোলন ছিল একটি শিল্প-আন্দোলনের নাম। দল, মত, বিশ্বাস বা আদর্শের জাতপাতের তোয়াক্কা তার ছিল না। লেখার বিষয় বা বক্তব্য নিয়ে কোনও মাথাব্যথা ছিল না। তাদের চাহিদা ছিল একটাই―ন্যূনতম শিল্পশক্তির পরিচয় দিতেই হবে লেখায়, তাহলেই লেখা প্রকাশিত হবে। হ্যাঁ, সেই সঙ্গে ছিল আরেকটা শর্ত: তরুণ হতেই হবে তোমাকে। হতে হবে জেদি, তেজি, টাটকা, তাজা তরুণ; একরোখা, রাগী, অসন্তুষ্ট। হ্যাঁ, রাগী। কেননা রাগ না-থাকলে প্রতিষ্ঠিতদের অচলায়তন ভেঙে নতুন পৃথিবী সৃষ্টির শক্তি কোথা থেকে আসবে তোমার রক্তে ? কী করে চারপাশের ভণ্ডামির ডেরাকে উৎখাত করবে। ’ (ভালোবাসার সাম্পান, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ)

কণ্ঠস্বর ছিল তারুণ্যের পত্রিকা। যা-কিছু নতুন, যা-কিছু ব্যতিক্রমী বা প্রতিভান্বিত, তারই কেবল সেখানে ছিল উদার আমন্ত্রণ। স্বকীয়তা এবং প্রতিভাই ছিল তার মূল আরাধ্য।

কণ্ঠস্বর আন্দোলনের আরও একটি বিষয় হলো এটি ছিল ঢাকাকেন্দ্রিক। ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্য আন্দোলন এর আগে সংঘটিত হয়নি এমন নয়। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায় শিখা গোষ্ঠীর কথা। শিখার মুখবাণী ছিল : ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’

১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হলে বাংলা ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সভাপতিত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুসলিম সাহিত্য সমাজ। কাজী আবদুল ওদুদকে বলা হতো এ প্রতিষ্ঠানের মস্তক, আবুল হুসেনকে হস্ত আর কাজী মোতাহার হোসেনকে হৃদয়। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন বলতে তারা কী বুঝতেন সে সম্পর্কে ড. কাজী মোতাহার হোসেন দ্বিতীয় বর্ষের কার্যবিবরণীতে বলেছিলেন―

‘আমরা চক্ষু বুঝিয়া পরের কথা শুনিতে চাই না বা শুনিয়াই মানিয়া লইতে চাই না; আমরা চাই চোখ মেলিয়া দেখিতে, সত্যকে জীবনে প্রকৃতভাবে অনুভব করিতে। আমরা কল্পনা ও ভক্তির মোহ আবরণে সত্যকে ঢাকিয়া রাখিতে চাই না। আমরা চাই জ্ঞানশিক্ষা দ্বারা অসার সংস্কারকে ভস্মীভূত করিতে এবং সনাতন সত্যকে কুহেলিকা মুক্ত করিয়া ভাস্বর ও দীপ্তিমান করিতে। এক কথায় আমরা বুদ্ধিকে মুক্ত রাখিয়া প্রশান্ত জ্ঞানদৃষ্টি দ্বারা বস্তুজগত ও ভাবজগতের ব্যাপারাদি প্রত্যক্ষ করিতে ও করাইতে চাই।’

বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের আর এক অন্যতম সংগঠক মোতাহের হোসেন চৌধুরী জীবনবিরোধী নৈতিকতাকেও বর্জন করেছিলেন যুক্তিনিষ্ঠতায়।

‘বিবাহিত নর-নারীর প্রেমহীন স্থ’ূল যৌনসম্ভোগে সমাজের আপত্তি নেই, কিন্তু অবিবাহিত প্রেমিক-প্রেমিকা যদি একটু হাতে হাত রাখে অথবা ঠোঁটে ঠোঁট ঠেকায় তবেই যত আপত্তি। প্রীতিকে বড় করে না দেখে নীতিকে বড় করে দেখায় এই স্থূল পরিণতি।’

এই শিখাগোষ্ঠীর সঙ্গেও কণ্ঠস্বর আন্দোলনের মৌলিক কিছু পার্থক্য আছে। শিখাগোষ্ঠীর মূল উদ্দেশ্য ছিল মুক্তবুদ্ধির চর্চা। সেটি তারুণ্যের উদ্ভাস নয়। শিখাগোষ্ঠীর মধ্যে উদারতা এবং তাঁদের দৃষ্টি সাম্প্রদায়িকতামুক্ত হলেও অনগ্রসর মুসলমানদের বুদ্ধির জাগরণের জন্য এটি কাজ করেছিল। এখানে ছিল শুভ বোধবুদ্ধির উদয় ও চর্চার চেষ্টা। শিখা গোষ্ঠী কোনও অবক্ষয়বাদী ছিলেন না বরং সাহিত্য ও জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে বোধে জাগরণ আনতে চেয়েছিলেন আর কণ্ঠস্বর ছিল অবক্ষয়ী চিন্তা ও যন্ত্রণার দগ্ধ প্রকাশ। এটি তুলে আনতে চেয়েছিল সমাজের অন্ধকার, ক্লেদ আর হতাশার মূর্তি। এটি প্রতিষ্ঠিত লেখকসমাজের বিপরীতে ছিল তারুণ্যের হুঙ্কার।

হাংরি আন্দোলন যেমন লিফলেট বা হ্যান্ডবিল প্রকাশ করত কণ্ঠস্বর তা নয়, কণ্ঠস্বর অনেক সুবিন্যস্ত এবং সুসম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিনেরর সঙ্গেই বরং এর সাজুয্য অনেক বেশি। কণ্ঠস্বরের আর এক পরিচয় সাহিত্য আন্দোলন হলেও মূলত এ পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোক্তারা একটা ভালো মানের সাহিত্য পত্রিকা বা লিটলম্যাগই প্রকাশ করতে চেয়েছেন। তাই এ পত্রিকার একটা বিষয়, উদ্দেশ্য এবং বক্তব্য ছিল।  শিবনারায়ণ রায় লিটল ম্যাগাজিনের উদ্ভব সম্পর্কে বলেছেন, ‘গতানুগতিক নয়, জনপ্রিয় নয়, সাফল্যাকাক্সক্ষী নয়, পৃষ্ঠপোষণলোলুপ নয়, একেবারে নিজস্ব, মৌলিক কিছু কথা অভিনবরূপে প্রকাশ করবার তীব্র অভীপ্সা থেকেই লিটল ম্যাগাজিনের উদ্ভব।’ (শিবনারায়ণ রায়, লিটল ম্যাগাজিন: অভিযাত্রা সাহিত্যপত্র)

কণ্ঠস্বরও তাই গতানুগতিক নয় বরং গতানুগতিকতাকে ভাঙার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একেবারে নিজস্ব এবং অভিনবত্বও এর প্রধান লক্ষ্য।

লিটল ম্যাগাজিনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কী হবে সে বিষয়ে বুদ্ধদেব বসু বলেছেন গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়। এ ব্যাপারে দেশ পত্রিকার ১৯৫৩ সালের মে মাসের সংখ্যায় ‘সাহিত্যপত্র’ প্রবন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি লেখেন―

‘এক রকমের পত্রিকা আছে যা আমরা রেলগাড়িতে সময় কাটাবার জন্য কিনি, আর গন্তব্য স্টেশনে নামার সময় ইচ্ছে করে গাড়িতে ফেলে যাই―যদি না কোনও সতর্ক সহযাত্রী সেটি আবার আমাদের হাতে তুলে দিয়ে বাধিত এবং বিব্রত করেন। আর এক রকমের পত্রিকা আছে যা স্টেশনে পাওয়া যায় না, ফুটপাতে কিনতে হলেও বিস্তর ঘুরতে হয়, কিন্তু যা একবার হাতে এলে আমরা চোখ বুলিয়ে সরিয়ে রাখি না, চেয়ে চেয়ে আস্তে আস্তে পড়ি, আর পড়া হয়ে গেলে গরম কাপড়ের ভাঁজের মধ্যে ন্যাপথলিন-গন্ধী তোরঙ্গে তুলে রাখি―জল, পোকা, আর অপহারকের আক্রমণ থেকে বাঁচবার জন্য। যেসব পত্রিকা এই দ্বিতীয় শ্রেণির অন্তর্গত হতে চায়―কৃতিত্ব যেটুকুই হোক, অন্ততপক্ষে নজরটা যাদের উঁচুর দিকে, তাদের জন্য নতুন একটা নাম বেরিয়েছে মার্কিন দেশে; চলতি কালের ইংরেজি বুলিতে এদের বলা হয়ে থাকে লিটল ম্যাগাজিন।’

তাই কণ্ঠস্বর-কে সাহিত্য পত্রিকা, সাহিত্য আন্দোলন যে অভিধাই দেওয়া হোক না কেন এর মধ্যে রয়েছে লিটলম্যাগের বৈশিষ্ট্য। কণ্ঠস্বর ধারাবাহিকভাবে সমৃদ্ধির দিকে গেছে। প্রথম সংখ্যার পর দ্বিতীয় সংখ্যার প্রচ্ছদ হয়েছিল কাইয়ুম চৌধুরীর আঁকা লোগোতে। এবং অবক্ষয়কে ধারণ করে এটি শুরু হলেও  বহুমাত্রিকতায় আর জীবনমুখী হয়ে উঠছিল তৃতীয় সংখ্যা থেকেই কণ্ঠস্বর তার আত্মপরিচয় ব্যক্ত করেছিল এভাবে―

‘যাঁরা জীবনকে অনুভব করতে চান

শততলে, শতপথে, বিঘ্নিত রাস্তায়;

আঙ্গিকের জটিলাক্ষরে, চিন্তার বিচিত্র

সরণিতে; কটু স্বাদে ও

লোনা আঘ্রাণে; সততায়, শ্রদ্ধায়, বিস্ময়ে

অভিভূতিতে ও পাপে;

মহত্ত্বে ও রিরংসায়; উৎকণ্ঠায় ও

আলিঙ্গনে,’

নিজস্বতার মধ্য দিয়ে নিজ মাটিতে দাঁড়ানোর একটা প্রাণান্ত চেষ্টা কণ্ঠস্বরের ছিল। কণ্ঠস্বরে লিখেছিলেন ষাটের দশকের (পরে যারা প্রখ্যাত হয়েছেন) প্রায় সকল লেখক। সত্তর দশকের লেখকেরাও এখানে স্থান নিয়েছিলেন। কণ্ঠস্বরের সঙ্গে জড়িয়েছিলেন কবি নির্মলেন্দু গুণ, লিখেছেন আসাদ চৌধুরী, শহীদ কাদরী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক বাংলা সাহিত্যের এমনি উজ্জ্বল সব লেখক।

১৯৬৫ সালে বের হওয়া পত্রিকাটি ৬৭তেই পৌঁছে গিয়েছিল যৌবনে। ঢাকাকে ছাড়িয়ে সারা দেশব্যাপী যেমন সাড়া ফেলেছিল তেমনি প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও ছুটে এসেছিল লেখকেরা, স্থান করে নিয়েছিল কণ্ঠস্বর পাতায়।―

সাতষট্টি সাল জুড়ে একঝাঁক ঝকঝকে নতুন কবি, ভরা বর্ষার ইলিশ-ঝাঁকের মতোই, প্রায় একসঙ্গে এসে হাজির হয়ে গেল আমাদের সেই খরস্রোতের উদ্ভুতি ধারায়। (ভালোবাসার সাম্পান, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ)

১৯৬৭ সাল ছিল আমাদের ফুলে-ফলে ভরে ওঠার মঞ্জরিত ঋতু। এই বছরের বারো মাসের মধ্যে কণ্ঠস্বর-এর দশটি সংখ্যাই-যে কেবল বেরিয়েছিল তা নয়, ষাটের মূল লেখকদের অধিকাংশই জড়ো হয়ে গিয়েছিল কণ্ঠস্বর-এর চত্বরে, আঙিনা মৌ মৌ করতে শুরু করেছিল। কেবল লেখক আসেনি, নতুন অনেক কর্মীতেও প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠেছিল এর আসর। নির্মলেন্দু গুণ আর সাযযাদ কাদিরের কথা আগেই বলেছি। এছাড়াও এসেছিলেন তোফাজ্জল হোসেন সরকার, আগস্ট ’৬৭ সংখ্যার কর্মাধ্যক্ষ হিসেবে। (ভালোবাসার সাম্পান, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ)

ভরা যৌবনের এ পত্রিকা শিল্প-সাহিত্যের নতুনত্ব আর অভিনবত্বের মৌ মৌ গন্ধ ছড়ালেও এর প্রকাশের নেপথ্যের কাহিনি নানা সংগ্রামে করুণ। যেমন ছিল আর্থিক সংকট তেমনি প্রেস ও প্রকাশের নানা ঝামেলা, প্রতি সংখ্যার প্রকাশেই ছিল সংশয় আর উদ্বেগ। সম্পাদককে হতে হতো গলধঘর্ম। চোখে থাকতো না ঘুম, উ™£ান্তের মতো ছুটোছুটি করতে হতো শুধু সান্ত্বনা আর আনন্দ ছিল নতুন সৃষ্টির। কন্ঠস্বর প্রকাশের নানা বিড়ম্বনার বিষয়টি এসেছে ভালোবাসার সাম্পানে।

‘প্রেস-মালিকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আমরা এরই মধ্যে তিনটি প্রেস পাল্টে তখন এসে উঠেছি সেগুনবাগানের ললনা প্রেসে। ললনা প্রেস ললনাদের প্রেস নয়, এর আসল নাম ইস্টার্ন প্রিন্টিং পাবলিশিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লি.। ওখান থেকে ললনা নামের একটা মহিলা পত্রিকা বেরোচ্ছে বলে মুখে-মুখে ওই প্রেসের তখন ওই নাম। পত্রিকাটি তখন এর আধুনিকতা এবং নতুনত্বের জন্যে সেকালের তরুণীমহলে সাড়া জাগিয়েছে।’   (ভালোবাসার সা¤পান, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ)

‘আজ পেছনদিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে কী আশ্চর্য মিল ছিল ললনা আর কণ্ঠস্বর-এর মধ্যে। এর একটা একালের উঠতি মেয়েদের হাল-ফ্যাশানের পত্রিকা, একটা তরুণ-লেখকদের নতুন যুগান্তরের মুখপত্র-একই রকম নতুন, ব্যতিক্রমী আর স্বাধীনচিত্ততার অবাধ উচ্ছ্বাসে পাখা-ঝাপটানো। এ মিল কি যুগচেতনার? বহুশতাব্দী-স্থায়ী সামন্তবাদী সমাজের ভেতর পুঁজিবাদের প্রথম পদপাতে শিউরে-ওঠা মুক্তমনের অনাবিল আনন্দ-স্বনন?’  (ভালোবাসার সা¤পান, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ)

কন্ঠস্বরকে দুটো পর্বে ভাগ করা যায়। স্বাধীনতাপূর্ব ও স্বাধীনতাউত্তর কণ্ঠস্বর। আবদুল মান্নান সৈয়দের স্মৃতিচারণেও এমনটিই বলেছেন তিনি। তার স্মতিচারণে উঠে এসেছে এর লেখকদের অনেকের নাম―কণ্ঠস্বরের এক যুগের জীবনে স্পষ্টত ছিল দুটি পর্ব। ১৯৬৫-৭০ : প্রথম পর্ব; দ্বিতীয় পর্ব : ১৯৭২-৭৬। ১৯৭১ সালে স্বাভাবিকভাবেই কণ্ঠস্বর বন্ধ ছিল।

মধ্য-ষাটে প্রকাশিত হয়ে সে যেমন ষাটের নতুনোজ্জ্বল কণ্ঠস্বরগুলো গ্রহণ করেছে, তেমনি সত্তরের স্বতন্ত্র লেখকদেরও। এই এক যুগের প্রায় সব প্রতিভাশীল ও প্রতিশ্রুতিবান লেখক কোনও না কোনও সময় উথিত হয়েছেন কণ্ঠস্বর থেকে। কণ্ঠস্বর প্রথম প্রকাশের মুহূর্ত থেকে সব সময়ই দরজা খুলে রেখেছে সম্ভাবনাময় তরুণদের জন্যে। (কণ্ঠস্বরে লেখেনি, এমন শক্তিশালী তরুণ যে নেই, সে কথা বলছি না।) আমার এই উক্তির প্রমাণ মিলবে কণ্ঠস্বরের (আদে পর্যায়ের) শেষ সংখার লেখক-তালিকার মধ্যে : সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম, আবদুল মান্নান সৈয়দ, শিহাব সরকার, আবিদ আজাদ, সানাউল হক খান, দাউদ হায়দার, খোন্দকার আশরাফ হোসেন, শাহাদাৎ বুলবুল, আলতাফ হোসেন, অরূপ তালুকদার, সিকদার আমিনুল হক, মোহাম্মদ রফিক, আসাদ চৌধুরী, মহাদেব সাহা, জাহিদুল হক, মাকিদ হায়দার, সুরাইয়া খানম, ইকবাল হাসান, হাসান ফিরোজ, জাহিদ হায়দার, মুহম্মদ নূরুল হুদা, মহফিল হক, শামসুল ইসলাম, কানন খান তুহিন, মাহমুদ হক, গোলাম কাদের গোলাপ, ইউসুফ শরীফ, ফজলুল হক, আহসান হামিদ, জগন্ময় মজুমদার, মাহবুব হাসান, কামাল চৌধুরী, নাজিম শাহরিয়ার, সোহরাব হাসান, আবুবকর সিদ্দিক, রাজীব আহসান চৌধুরী, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, রহমান মাসুদ, তপংকর চক্রবর্তী, ইকবাল আজিজ, আবু জাফর, ময়ূখ চৌধুরী, অ্যা. ফ. ম. সিরাজউদ্দৌলা চৌধুরী, তাপস মজুমদার, মাহবুবুল বারী খান (মাহবুব বারী), মাশুক চৌধুরী, হাসান হাফিজ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, জিনাত আরা রফিক, নির্মলেন্দু গুণ, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ও আবদুল হাফিজ। সহযাত্রিক তরুণ কবি মরহুম আবুল হাসানকে উৎসৃষ্ট এই শেষ সংখ্যায় কণ্ঠস্বর-গোষ্ঠীর (সকলে নয় অবশ্য) একটি একত্রিত ফটোগ্রাফ মুদ্রিত হয়েছে। কণ্ঠস্বরে প্রকাশিত এটিই একমাত্র ফটোগ্রাফ এবং আমাদের একমাত্র যৌথ প্রতিকৃতি।’

কণ্ঠস্বর যে ধীরে ধীরে একটা পরিণত পত্রিকায় উত্তীর্ণ হচ্ছিল দ্রোহ, অবক্ষয়ের মধ্য দিয়েই জীবনধর্মী এবং জীবনঅন্বেষী হয়ে উঠেছিল এবং একটা নতুন অঙ্গীকার নিয়ে  তার দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়েছিল সেটি ১৯৭২ অর্থাৎ স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে প্রকাশিত কণ্ঠস্বর-এর প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয় এর মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে―

তবু মনে হচ্ছে কণ্ঠস্বরের এই পরিবর্তন কেবলমাত্র কলেবরগত স্ফীতি বা ত্রৈমাসিক রূপান্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বর্তমান সংখ্যা থেকে কণ্ঠস্বরের এতকালের চরিত্রেরও কিছু লক্ষ্যযোগ্য পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। এক কথায় বলতে গেলে, এই সংখ্যার সঙ্গে কণ্ঠস্বর তার অগ্রযাত্রার প্রথম পর্যায় ছেড়ে দ্বিতীয় পর্যায়ে পা দিচ্ছে। খুব স্পষ্টভাবে অনুভবগম্য না হলেও আমরা নিকটতরেরা অনুভব করছি আমাদের সাহিত্য গত দশকের বিক্ষিপ্ত, অস্থির ও লক্ষ্যহীন মানসিকতার পর্যায়ে ছেড়ে―অন্ধকার বন্দনার ক্লেদাক্ত পাপ ও পচন থেকে এবং আকাশ-ব্যাপী নৈরাজ্য, বিভ্রান্তি ও অর্থহীনতার আবর্ত থেকে মুক্তি নিয়ে সুস্থ সংহত এক অম্লান জীবনাগ্রহে জেগে উঠছে।

 এই চারিত্রিক পরিবর্তন এই জীবননান্দে জেগে ওঠাটা যে একটা সাফল্য একটা ইতিবাচকতা সেটিও সম্পাদক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদর আমাদের জানান তার ভালোবাসার সাম্পান গ্রন্থে।

‘আমাদের প্রথম তারুণ্যকে জ্বালিয়ে তুলেছিল অবক্ষয়; এ আমাদের অনুভূতিকে তীব্রভাবে উদ্দীপিত করেছিল, কিন্তু (প্রথম যৌবনের প্রচণ্ডতায় ও অপরিণতির কারণে) একে আমরা ভালভাবে আত্মস্থ করতে পারিনি। তাই অবক্ষয় নিয়ে আমরা হৈ-চৈ করলেও এ ধারণায় আমাদের চোখে পড়ার মতো সাফল্য কম। কিন্তু জাগরণকে আমরা দেখেছিলাম কিছুদিন পরে, সামান্য একটু পরিণত বয়সে।’

১৯৬৫ টিতে বের হওয়া পত্রিকাটি যখন ১৯৭৫ সালে এসে পৌঁছালো তখন চলে গেছে ১০ বছর। লিটল ম্যাগাজিনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি স্বল্প আয়ু নিয়ে জন্মায়। সে তুলনায় এক দশক টিকে থাকার পর এ সম্পাদকের অভিব্যক্তি ছিল এমন―

‘কন্ঠস্বর দশম বর্ষে পদার্পণ করল। আমাদের প্রাথমিক প্রস্তুতির তুলনায় বড় বেশি দীর্ঘ এই সময়―বড় বেশি রকম অপ্রত্যাশিত ও অস্বস্তিকর। সত্যি কথা বলতে কি, কণ্ঠস্বর-এর এতটা দীর্ঘায়ুর জন্যে আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। তবু কণ্ঠস্বর এখনও বেঁচে আছে। একটা নতুন সাহিত্যযুগের আত্যন্তিক প্রয়োজন, একত্রিত একটি নবীন লেখকদলের সমবেত দরকার এই পত্রিকাটিকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে।’ (ভালোবাসার সা¤পান, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ)

কণ্ঠস্বর বেঁচেছিল মোট এগারো বছর। এর মধ্যে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়কার দু-বছর বাদ দিলে এর জীবনকাল ন-বছরের মতো।

এই দশম বর্ষে পর্দাপনকে স্বাগত জানিয়েছিলেন উদোক্তারা―

কণ্ঠস্বর-এর প্রথম সংখ্যা ১৯৬৫-তে বেরোলেও এর আসল যাত্রা শুরু হয়েছিল ছেষট্টি থেকে। সেই হিসেবে ১৯৭৫-কে দশম বর্ষ পদার্পণের বছর ধরে এপ্রিল মাসে মোটামুটি জাঁকালো ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো। এবার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলা বাংলা একাডেমির মিলনায়তনে। সভাপতি হলেন সমকালের সম্পাদক সিকানদার আবু জাফর।’

সেই অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকায় কণ্ঠস্বরের এই দশ বছরের যাত্রা এবং প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তিকে তুলে ধরেছিলেন সম্পাদক স্বয়ং ভালোবাসার সম্পানে না, কণ্ঠস্বর কোনও ঈপ্সিত ‘স্ট্যান্ডার্ড ম্যাগাজিন’ নয়; কণ্ঠস্বর আজও ‘লিটল ম্যাগাজিন’-এর রচনা এবং প্রকাশনাঘটিত সমস্ত পরিশীলন সত্ত্বেও। কণ্ঠস্বর মূলত লেখক-সৃষ্টির পত্রিকা। এ কারণেই কণ্ঠস্বর ‘স্থৈর্য এবং সংযমে’র নয়, কণ্ঠস্বর নতুনত্ব এবং প্রতিভার; গৃহপালিত প্রতিষ্ঠানিকতার নয়, প্রতিষ্ঠাহীন অনিকেতের; তারুণ্যের এবং ভুলের, শক্তির এবং অপচয়ের, সুশৃঙ্খল স্বেচ্ছাচার ও দুঃসাহসী মৌলিকতার― অগতানুগতিকতার, আপসহীনতার, ব্যতিক্রমের। বিশ্বাস করি কণ্ঠস্বর এখনও তার এই চরিত্র হারায়নি। নান্দনিক পরিশীলনের পাশাপাশি প্রতিভার উজ্জ্বল স্বেচ্ছাচারকে, কণ্ঠস্বর, আজ অব্দি, একইভাবে অন্বেষণ করে।…

‘শেষ করার আগে আবার মনে হচ্ছে কণ্ঠস্বর এত দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে, প্রথম প্রকাশের সময় ঘূর্ণাক্ষরেও মনে আসেনি। আজ মনে হচ্ছে যদি এ ভুল না ঘটত, যদি জানতে পারতাম সেদিন এ দীর্ঘ দশটা বছওে ঝঞ্ঝা উতরে বেঁচে থাকবে আমাদের এই ভালোবাসার সাম্পান, তবে হয়তো আরও একটু সর্তক হতাম সচেতন পরিকল্পনায়, সনিষ্ঠ শ্রমে আরও একটু ফলবান করে তুলতে চেষ্ঠা করতাম আমাদের প্রয়াসের, আনন্দের এই ফসলটিকে।’

এটা বোধহয় সকল সৃষ্টির ক্ষেত্রেই ঘটে। ছাইয়ের ভেতর কতটা আগুন লুকিয়ে আছে তা জানা, বোঝা বা অনুমান করা সম্ভব হয় না। আরো একটা বিষয়ও বোধহয় সার্বজনীন যদি জানা যেত কতটা জ¦লে উঠবে আগুন তাহলে হয়তো প্রস্ততি আরও নিখুঁত করা যেত, হয়তো আরও পরিকল্পিত হত পথচলা। কণ্ঠস্বরের সম্পাদকের এ অনুভূতি এবং অতৃপ্তি আর আরও ভালো করার আকুতি। সকল সৃষ্টিশীল মানুষের সঙ্গেই মেলে। তবে এটা নিশিচতভাবেই বলা যায় সময়টা এমন ছিল না যে, খুব পরিকল্পিতভাবে কিছু হবে। প্রকাশের উন্মত্ততা, দৃঢ়তাতেই কণ্ঠস্বরের প্রকাশ সম্ভব হয়েছিল। তবে যদি খুব সাধারণভাবে বিবেচনা করা হয় প্রায় সৃষ্টিই কিন্তু এমনি একটা উন্মাদনা থেকেই হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলোও অনেক পরিকল্পিত থাকে না। এবং এটা আগাম জানার কোনও সুযোগই থাকে না কোনওটা কালের স্বাক্ষর হয়ে দাঁড়াবে। কণ্ঠস্বরের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। কণ্ঠস্বর একটা সময়ের দাবিতে বের হয়েছিল কিন্তু তার পুরো পথের রেখা তার জানা ছিল না। নানাভাবে নানা বন্ধুর পথ দিয়ে কণ্ঠস্বর চলেছে আর ধরে রেখেছে সময়ের স্বরকে। কণ্ঠস্বরের এই অপরিকল্পিত পথচলার কথা আবদুল মান্নান সৈয়দের স্মৃতিচারণেও দেখা যায়―

‘কণ্ঠস্বরের অনেক কিছুই ঠিক ছিল না, অর্থাৎ পূর্বরচিত বা পূর্বপরিকল্পিত ছিল না। সে ছিল তার সম্পাদকের মতোই সতত অস্থির, যৌবনের আবেগে অবিরল হিল্লোলিত। যেমন, তার কাগজের আয়তন। এগারোটি সংখ্যা সব মিলিয়ে বেরিয়েছিল ক্রাউন ১/৪ সাইজে। … ..

বড় সাইজেও একসময় পরিত্যক্ত হয়―কণ্ঠস্বর চলতি ডিমাই আকারে বেরোতে থাকে। সবচেয়ে মুশকিল হয় সংখ্যাগুলির পূর্বাপর নির্ধারণে-তিরিশটি সংখ্যা- কোনওটার পর কোনওটা বেরিয়েছে তা আনুপূর্বিক সাজানো স্বয়ং সম্পাদকের পক্ষেও বোধহয় সম্ভব হবে না।’

দশম বর্ষের ঐ অনুষ্ঠানের পরেই আবার কণ্ঠস্বরের বিদায়ের ঘন্টা বেজে উঠেছিল। সম্পাদকের মনে হচ্ছিলো―

‘কণ্ঠস্বর তো স্ট্রার্ন্ডাড পত্রিকা বা গড়পড়তা কোনো সাধারণ পত্রিকা নয় যে একে আজীবন ঘাড়ে বয়ে বেড়াতে হবে। এতো লিটল ম্যাগাজিন! এতো ক্ষণিকের জোনাকি। একটা সাহিত্যের ধারাকে নতুন বাঁকে পৌছে দিয়ে বা একটি নতুন লেখকদলকে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েই তো এর দায়িত্ব শেষ।’

‘অনেক ভেবেচিন্তে চারুকলা ইনস্টিটিউটের বকুলতলায় আমরা কণ্ঠস্বর-এর বিদায়-অনুষ্ঠানের আয়োজন করলাম। গাছপালায় ছাওয়া এই ভবনটির অনবদ্য স্থাপত্যসৌকর্য আজও আমার মনটাকে প্রথমদিনের মতোই স্নিগ্ধ করে। এমনি একটি ছায়াবহুল মুগ্ধ আঙিনা আমাদের এতদিনের ভালোবাসাকে বিদায়ের জন্যে সবচেয়ে মানানসই হবে ভেবে এই আঙিনাটিকেই বেছে নিলাম।’

‘১৯৭৬ সালের প্রথম সংখ্যা বের করার কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল। বিশাল ওই সংখ্যাটি ছিল কবিতা-সংখ্যা। ওই সংখ্যায় সত্তর দশকের প্রায় সব কবির সমাবেশ ঘটেছিল। ওই সংখ্যাই কণ্ঠস্বর- এর শেষ সংখ্যা।…’

‘আমার মনে হয় ওই সময়ে কণ্ঠস্বর বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভালোই হয়েছিল। সবকিছুকে তার পরিপূর্ণ মুহূর্তেই বিদায় নেওয়া ভালো। যৌবনের মৃত্যুই সুন্দর। কবিতা-সংখ্যাটি বের হলে তা নিয়ে হইচই পড়ল। সবাই সংখ্যাটির উচ্ছ্ববসিত প্রশংসা করলেন, কিন্তু ও-ই শেষ। এরপরে কণ্ঠস্বর আর কোনও কোলাহল তোলেনি।’

কণ্ঠস্বর টিকে ছিল এগারো বছর কিন্তু বাংলাদেশের সাহিত্য তথা বাংলা সাহিত্যে এর অবদান অবিস্মরণীয়। ষাটের দশকের সাহিত্যচর্চায় অবিসংবাদিত কণ্ঠস্বর হচ্ছে কণ্ঠস্বর। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ-এর সম্পাদনায় কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল তারুণ্যের ও সাহিত্যের পীঠস্থান। কণ্ঠস্বরে বলা যায় সবচেয়ে বেশি লিখেছিলেন আবদুল মান্নান সৈয়দ তার দৃষ্টিতেও উঠে এসেছে এ পত্রিকার প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তি।

সব মিলিয়ে কণ্ঠস্বর-এর সাফল্য বৈফল্যগুলি একদিন পরিষ্কার হবে। কিন্তু সে আলোচনা করার যোগ্য অধিকারী নই আমি। হয়তো তার কারণ, আলোচকের প্রয়োজনীয় দূরত্ব (কণ্ঠস্বরের ব্যাপারে) নেই আমার অর্জনে। আমার মনে আছে, একবার আর্ট কলেজের এক অনুষ্ঠানে কণ্ঠস্বরের মৃত্যু ঘোষণা করার পরেই একসঙ্গে তাঁর বাড়িতে ফিরে সম্পাদকের সনির্বন্ধ ও প্রায় কাতর অনুরোধ-আমাকে কণ্ঠস্বর সম্পাদনার ভার নেওয়ার জন্যে। আমার মনে আছে, কণ্ঠস্বর বিষয়ে আমার নিজস্ব আবেগী মুহূর্তগুলি।

আবেগ শমিত রেখে অন্তত একথা বোধহয় বলতে পারি যে, পঞ্চাশের দশকে সমকাল; যে ভূমিকা পালন করছে, ষাটের দশকে তাই-ই উদযাপন করেছে কণ্ঠস্বর। আবার সমকাল যেমন পরবর্তী দশককে অন্তত অংশত ধারণ করেছিল, কণ্ঠস্বরও তেমনি সত্তর দশকে আহ্বান করে নিয়েছিল। তাহলেও কণ্ঠস্বরের কেন্দ্রীয় চরিত্র ষাটের দশকেরই বলে আমি মনে করি এবং একটি দশকের কেন্দ্রীয় চারিত্র যে অঙ্গীকার করেছে, সে নিশ্চয়ই আমাদের শ্রদ্ধেয়। আর যিনি এই চারিত্র সংগঠন করেছেন তিনি কণ্ঠস্বর সম্পাদক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদক হিসেবে আমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।

কণ্ঠস্বর ছিল একটা যুগ সন্ধিক্ষণের  পত্রিকা। সাহিত্যের নতুন স্বর সৃষ্টির প্রত্যাশী এক আন্দোলন। কণ্ঠস্বর উচ্চকিত করেছিল সময়ের সন্তানদের। কণ্ঠস্বর একটা বিশেষ সময়কে ধরতে চেয়েছিল কিন্তু এর প্রভাব এবং এর ফলাফল এতোই সুদূরপ্রসারিী ছিল যে এটি বাংলাসাহিত্যে একটা ভিন্ন স্বর সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। আলোচনা সমালোচনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, সফলতা-বিফলতা, নানা যোগ-বিেেয়াগের পরও এটাই সত্য যে সম্পাদক যাই বলুন কণ্ঠস্বর ক্ষণিকের জোনাকি নয় বরং কালের জ¦লে ওঠা আগুন। আসাদ চৌধুরী তার এক কবিতায় তুলে ধরেছেন স্বপ্নের সে আগুনকে। যে আগুন রবি ঠাকুরের ভাষায় ‘ছড়িয়ে গেল সবখানে’―

দুচোখে চশমা নয়, ঝিলমিল স্বপ্ন

মলমের মতো মেখে দিলেন সায়ীদ ভাই

আমাদের দুই চোখে

আমাদের সবেধন নীলমণি

আমাদেরি কেউ কেউ খ্যাতি ও অখ্যাতির

সাগর পেরিয়ে গেছে,

কেউ কেউ ফিনফিনে স্মৃতি বিস্মৃতির

সুরভির ভাঁজ খুলে চলে

হৃদয় গহন দ্বারে

নিজেদের সেই কণ্ঠস্বর

হৃৎপিণ্ডে আল্লারাখার আঙুলের কারুকাজ।

কৃতজ্ঞতা কোথায় যে রাখি!

―আসাদ চৌধুরী (অংশবিশেষ)

এ কবিতাই বলে দেয় কণ্ঠস্বর কতটা ছাপ রেখে গেছে হৃদয়ে হৃদয়ে ও কালে। আর এ কবিতা যেন সে আন্দোলনের এক উজ্জ্বল চিত্র। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত কণ্ঠস্বর শুধু একটি পত্রিকা নয়, ষাটের কণ্ঠস্বর, বাংলা সাহিত্যের কণ্ঠস্বর, এক সাহিত্য আন্দোলনের ইতিহাস, সময়ের দলিল।

সমকাল-এর মতো কণ্ঠস্বর এক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যপত্রিকা হিসেবে টিকে থাকবে বাংলাদেশের সাহিত্য ইতিহাসে―

ভালোবাসার সম্পানে এই কণ্ঠস্বর পরিভ্রমণ করছে ষাটের দশক থেকে আজ পর্যন্ত এবং আশা করা যায় এ সাহিত্য ভ্রমণ বিস্তৃত হবে আরও বহুদূর, বহুকাল।

তথ্যসূত্র

১.            ভালোবাসার সাম্পান, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

২.           ষাটের দশকের সেই সময়, হায়াৎ সাইফ কালি ও কলমের দ্বিতীয় বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা (এপ্রিল ২০০৫/ বৈশাখ ১৪১২)

৩.           আবুল হাসনাত এবং ষাটের দশকের সাংস্কৃতিক জাগরণ, মফিদুল হক

                [বেঙ্গল শিল্পালয়ে ২০২২ সালের ২৯শে জুলাই ‘আবুল হাসনাত স্মারক বক্তৃতা’য় পঠিত।]

৪.           সাম্প্রতিক-স্বাক্ষর-কণ্ঠস্বরঃ প্রসঙ্গ কথা, গ্রন্থনায় আমিনুল ইসলাম বেদু

 লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button