
শেষ রাতে কথা হচ্ছিল।
আমি একটা বিড়ালের বাচ্চা নিয়ে এসেছিলাম রাস্তা থেকে তোমার মনে আছে বাবা ?
ঘুমভাঙা চোখে বিছানায় উঠে বসতে বসতে বিমান বলল, না কবে ?
মনে করে দেখো, মনে থাকবে।
পিতা-পুত্র কথা হচ্ছে। শীত আর নেই। শহরে না হলেও, শহর থেকে দূরে ফাল্গুন মাস। পলাশ ফুটেছে বাঁকুড়া, পুরুলিয়ায়। শেষ রাতে ঘুম ভেঙেছে বিমানের। তাকে ডাকছিল অরণি। অরণি বলল, বাবা আমার কিছু কথা আছে।
আলো জ্বাল।
না থাক, এসব কথা আলোয় হয় না বাবা।
আলো জ্বলল না। কিন্তু নাইট ল্যাম্পের মৃদু আলো তো আছেই। বিমান তার বিছানায় উঠে বসল। সে একাই শোয়। আসলে তাড়াতাড়ি ঘুমোয় তাড়াতাড়ি ওঠে। তাই তার শয্যা আলাদা। ভোরে উঠে সে প্রস্তুত হয়। প্রাতঃভ্রমণে যায়। ঘণ্টাখানেক হেঁটে বাড়ি ফিরে একটু বসে, চা খেয়ে বাজারে যায়। বাজার থেকে ফিরে ল্যাপটপ খোলে। অনেকগুলি খবরের কাগজ দ্যাখে। এমনিভাবে সকাল আরম্ভ হয়।
উঠে বিমান তার মোবাইলে দেখল শেষ রাত। চারটে বাজে। অরণি প্রায়ই রাত জাগে। আজও হয়তো জেগেছে। অরণি বলল, বাবা আমার আচমকা বিড়ালটার কথা মনে পড়ে গেল।
বল, মনে করতে পারি কি না দেখি।
একটা বাচ্চা বিড়াল, ধবধবে শাদা রং, রাস্তার মাঝখানে চলে গিয়েছিল, আমার স্কুলবাসের সামনে, আমি তাকে রাস্তা থেকে ঘরে নিয়ে এসেছিলাম।
চুপ করে থাকে বিমান। আবছা মনে পড়ছে। সে কতদিন আগের কথা। তখন মনে হয় ক্লাস ফাইভে পড়ে। নাকি আরও নিচে ? সে জিজ্ঞেস করল, কোন ক্লাসে তুই তখন ?
ফোর হব, আমার দিকে তাকিয়ে বিড়ালটা কাঁদছিল। মনে হয়েছিল, রাস্তায় গাড়ি চাপা পড়বে। কদিন আগেই একটা কুকুর, ভুলুয়া বলতাম আমি তাকে, আমাদের ফ্ল্যাটবাড়ির সামনে শুয়ে থাকত, বিস্কুট দিত পায়েলদি, আমিও দিয়েছি একবার, পুরো প্যাকেট দিয়ে এসেছিলাম, ভুলুয়া লরি চাপা পড়েছিল, তুমি জানতে ?
না, কী করে জানব ?
আমি বাড়ি ফিরে কাঁদছিলাম, তুমি জানতে না ?
আমি তখন অফিসেই ছিলাম।
বাড়ি ফিরলে আমি তোমাকে বলিনি ?
বলেছিলি হয়তো।
তোমাকে থানায় যেতে বলেছিলাম, পুলিশ লরিটাকে ধরুক, শাস্তি দিক।
কুকুর-বিড়াল মরলে কেউ থানায় যায় না।
আমি তখন দশ বছর, আমি জানি অ্যাক্সিডেন্ট হলে পুলিশ আসে, বাবা আমি কি তখন জানতাম যাবতীয় আইন সব মানুষের জন্য, পশু-পক্ষীর জন্য নয়, একবার একটা ভিখারি চাপা পড়ল, ফুটপাথে গাড়ি উঠে পড়েছিল, কিছুই হলো না, আমি তখন ক্লাস এইট, বুঝতে শিখেছি।
তো কী হলো, সেখানে আমার কী করার ছিল ?
কিছু না বাবা, আবার কিছুও, তুমি আমাকে বুঝিয়ে বলোনি কিছুই, কুকুরটার মৃত্যু নিয়ে তোমার কোনও তাপ-উত্তাপ ছিল না, ভিখারির মৃত্যু নিয়েও না, সব শুনে সব জেনেও টিভি দেখতে বসলে, আমি অন্য ঘরে একা বসেছিলাম, ভাবছিলাম ভুলুয়া দুপুরে মরেছে, বিকেলেও পড়ে আছে।
পরদিন সকালে কর্পোরেশন তুলে নিয়ে গিয়েছিল মনে হয়, কিন্তু আমার এসব মনে নেই, অনেক কিছুই ভুলে যাচ্ছি।
বাবা, এরপর সেই বিড়াল বাচ্চাটাকে দেখে মনে হয়েছিল, গাড়ি চাপা পড়ে মরে যাবে।
বিমান চুপ করে থাকে। অরণিও চুপ। জানালা খুলে দিল বিমান। হিমেল বাতাস ঢুকল ভিতরে। আলো ফোটেনি, কিন্তু অন্ধকার পাতলা হয়ে গেছে। রাত আবার ছোট হতে আরম্ভ হয়েছে। বিমান বলল, তুই জীবজন্তু ভালোবাসতিস, ছোটবেলায় এমন হয়।
অরণি বলল, তুমি জীবজন্তু ভালোবাসো না ?
হাসল বিমান, বলল, বুঝতে পারি না, কিন্তু রাস্তার কুকুর নিয়ে আমার রিজারভেশন আছে, আমি পছন্দ করি না, জন্মায়, এটো-কাঁটা খেয়ে বাঁচে, লোকের সামনে লেজ নাড়ে শুধু খাওয়ার জন্য।
অরণি বলল, বন্য কুকুর শিকার করে বাঁচে, তারাই তো ক্রমে ক্রমে লেনি ডগ হয়েছে।
বিমান বুঝতে পারছিল না অরণি তার ঘুম ভাঙিয়ে কী বলতে এসেছে। কুকুর-বিড়াল নিয়ে আলোচনা করার প্রকৃষ্ট সময় কি এটা!
অরণি বলল, নেকড়ে থেকেই কুকুর, তুমি আমাকে কল অফ দ্য ওয়াইল্ড বই এনে দিয়েছিলে, জ্যাক লন্ডনের উপন্যাস।
হ্যাঁ, অনেক বইই এনে দিয়েছিলাম, বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় হয় যাতে।
কুকুরে স্লেজ টানত, গভীর রাতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে কুকুরগুলো কাঁদত, তাদের স্বাধীন নেকড়ে জীবন থেকে পালিত কুকুরজীবনের লাঞ্ছনার জন্য।
হ্যাঁ, উপন্যাসের ঐ অংশ খুব টাচি। বিমান বলল।
বাবা, ভুলুয়া রাস্তায় গাড়ি চাপা পড়ে মরল, তাই বিড়ালের বাচ্চাটাকে আমি বাড়ি নিয়ে এলাম, নাহলে ও গাড়ি চাপা পড়ত, ক্ষুধার্ত ছিল, আমি পালব বলে নিয়ে এসেছিলাম।
বিড়ালের লোমে ডিপথেরিয়া হয়।
যত্ন করে রাখলে কিছুই হয় না, তুমি রাত্তিরে এসে দেখলে, রাগ করলে খুব, বললে, বিড়াল রাখা যাবে না।
কেন যাবে না ?
তুমি জবাব না দিয়ে বললে, যেখান থেকে নিয়ে এসেছিলাম, সেখানে রেখে দিয়ে আসতে।
বিমান বলল, মনে পড়ছে না।
সব ভুলে গেছো বাবা ?
মনে রাখার মতো ঘটনা নয়।
তুমি রাস্তায় রেখে দিয়ে আসতে বলেছিলে, বিড়ালের বাচ্চাটাকে দেখে খুব রেগে গিয়েছিলে, তোমাকে দেখে সে খাটের নিচে চলে গিয়েছিল ভয় পেয়ে, তোমাকে দেখেই সে ভয় পেতে আরম্ভ করেছিল, তা জানো ?
মাথা নাড়ল বিমান। মনে নেই। তার আবছা মনে পড়ছে। অরণির কত রকম খেয়াল ছিল। খুব ছোটবেলায় সাতদিন অন্তর গাড়ি কিনে আনতে হতো। তারপর একটু বড় হলে ফুটবল। ক্রিকেট বাদ দিয়ে পুরীর সমুদ্রতট থেকে নিয়ে এল কত ঝিনুক, মারবেল। সব সাজিয়ে রাখল বইয়ের আলমারির একটা তাকে। একদিন কী গাছ নিয়ে এল, তার জন্য টব আনতে হলো। গাছটা বাঁচেনি। রাস্তায় শিকড় উপড়ে পড়েছিল। গাছের তো প্রাণ আছে। গাছটা মরে গেলে কদিন খুব মন খারাপ হয়েছিল অরণির। তারপর বিড়াল এসেছিল। না, বিড়ালের আগে পাখি এসেছিল। এক জোড়া লাভ বার্ড। পাখি অবশ্য এনেছিল বিমান নিজে। সেই পাখি খাঁচা থেকে উড়িয়ে দিয়েছিল অরণি। খাঁচার দরজা খুলে খাবার দিচ্ছিল। কিন্তু বিড়াল!
অরণি বলল, বাবা তুমি কদিন খুব রাগ করছিলে, কুকুর-বিড়াল পছন্দ করো না, তোমার পায়ের শব্দ ও চিনত, তুমি এলেই খাটের নিচে কিংবা ডিভানের নিচে, কুঁকড়ে মুকড়ে বসে থাকত, যত সময় তুমি বাড়ি থাকবে, বেরুতই না, তুমি টের পেতে নিশ্চয়ই, আমি ভাবলাম, তুমি অনুমতি দিয়েছ।
বিমান শুনছিল। এরপর একদিন সাহস পেয়ে বিড়ালের বাচ্চাটা বেরিয়ে এল। ধবধবে শাদা, শুধু পিঠের কাছে কালো ডোরা। তার মুখখানিও খুব মনে আছে অরণির। বিমান ভাবে অরণি বিড়ালের মুখ মনে রেখেছে! তার তো কালো বিড়াল আর শাদা বিড়াল, এইটুকু পার্থক্য জানা আছে। তার বেশি জানে না। বিড়াল সে রঙে চেনে। অরণি বলল, সে বেরিয়ে এল, আমি দুধের বাটি দিলাম, তুমি ঘরে ঢুকছ, তুমি এত রেগে গেলে; লাথি মেরে দুধের বাটি উল্টে দিলে, বাচ্চাটার গায়েও পা লাগল। সে ভয়ে খাটের নিচে ঢুকে গেল। মুখের দুধ মেঝেতে গড়িয়ে গেল। বিমান বলল, আমি এমন করেছিলাম, মনে নেই তো।
ভুলে গেছো ইচ্ছে করে, কাজটা ঠিক ছিল না, আমি কাঁদতে লাগলাম, তুমি বললে বিড়ালটাকে বাইরে ফেলে দিয়ে আসতে। কাকে বললে, না মাসিকে, মাসির কথা মনে আছে তো ?
মাসি লতিকা মণ্ডল। মাসি তাদের বাড়িতে থাকত। বাড়ির লোকের মতোই প্রায়। ঘর-গেরস্তির কাজে সাহায্য করত। মাসির বাড়ি বেড়াচাঁপা। অকালে বিধবা না বর তাকে ত্যাগ দিয়ে মরেছিল, তা জানত না বিমান। অরণির মা রীতা বলে, মাসির স্বামী তাকে ছেড়ে দিয়ে আর একটা বিয়ে করেছিল, তখন মাসির দুটি মেয়ে, অহনা আর লহনা। অহনা বিয়ে করে সুন্দরবনের সাতজেলিয়া থাকে, আর লহনা থাকে বেড়াচাঁপা। সেও স্বামী পরিত্যক্তা। যাই হোক, তখন ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার গুছিয়ে নিয়েছে। মাসি তাকে নিয়মিত সাহায্য করত। সেই মাসি বেড়াচাঁপা গিয়ে আচমকা মারা গেল। বসে বসে ঢলে পড়ল। কতদিনের কথা এসব। মাসির মৃত্যু সংবাদ পেয়ে খুব কেঁদেছিল অরণি। মাসির বয়স হয়েছিল। বিমানের মনে হতো, তার ছেলে বড় হয়ে গেছে, বুড়ি শুধু ঘুমোয়, কাজ আর করে কই, বেড়াচাঁপা গিয়ে থাকতে পারে পাকাপাকি। কাজ ফুরোলে খাওয়াপরা দিয়ে রাখবে কেন ? মাসি চলেই গেল সেবার মেয়ের কাছে। এখন এই মুহূর্তে বিমানের মনে হলো, সে যা চেয়েছিল সেই সমস্যার সমাধান হয়ে গিয়েছিল এইভাবে। সে একটু কুঁকড়ে গেল। অরণি সেই কথা তুলবে না তো ? বাবা তুমি চেয়েছিলে, মাসি তাই আর এল না। এলই না। তুমি কি চেয়েছিলে বুড়ির আর কাজ নেই, মরে গেলেই বা ক্ষতি কিসে ? বিমানের বুক ভার হয়ে উঠল।
বিমান দেখল, জানালার বাইরে কিছুটা আলো দেখা যাচ্ছে, কিন্তু সকাল হয়নি। সে জানালা টেনে দিল কী মনে করে। কথাগুলো যেন বাইরে না যায়। বাইরে গিয়েই বা কী হবে, কে শুনবে, নিদ্রায় সব বধির হয়ে আছে। গাছ-পালা, পাখিরা, কুকুরগুলো। বাস চলাচল শুরু হয়নি এখনও। আগে এই সময়ে ট্রাম ছাড়ত। ফার্স্ট ট্রাম ব্রিজ কাঁপিয়ে ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে ধর্মতলার দিকে চলে যেত। ট্রাম বন্ধ হয়ে গেছে বছর চার। সে ফার্স্ট ট্রাম ধরে ধর্মতলার দিকে যাত্রা করে কলেজ স্ট্রিট নেমে হাওড়ার বাস ধরত। তখন সে দুর্গাপুর চাকরি করতে যেত। তখন অরণি জন্মায়নি। ওর দিদি অরুণিমা হয়েছে। সে এখন সিডনি থাকে।
অরণি বলল, মাসিকে বলতে মাসি আমাকে বোঝাল, আমি যে বিড়ালটাকে নিয়ে এসেছি, ওর মা হয়তো খুঁজে বেড়াচ্ছে।
আমি বললাম, ওর মা নেই।
তা হয় নাকি, সবার মা থাকে।
মা ওকে ফেলে গেল কেন ?
মাসি বলল, ফেলে যাবে কেন, হয়তো মা খাবার আনতে গিয়েছিল, সেই সময় তুমি তুলে এনেছ।
আমি চুপ করে থাকলাম। মাসি তখন আমাকে বলল, ছেলেধরা যেমন ধরে নিয়ে যায়, তুমি তেমনি করেছো, ওর মায়ের কাছে ওকে দিয়ে আসতে হবে।
বিমান শুনছিল। তার একটু শীত শীত করছিল। সে গরম চাদর টেনে গায়ে জড়িয়ে নিল। অরণি তার কথা বা প্রতিক্রিয়ার জন্য তার দিকে তাকিয়ে আছে। বিমান বলল, এসব আমি জানব কীভাবে ?
বাবা, তুমি তো বলে গিয়েছিলে বিড়ালটাকে রাস্তায় রেখে আসতে যাতে ও চাপা পড়ে মরে যায়।
বিমান বলল, এ কথা বলছিস কেন, বাচ্চাদের বিড়াল-কুকুর ঘাঁটার একটা প্রবণতা থাকে, তুই তাইই করছিলি, কিন্তু এসব করলে নানা অসুখ হয়, তাই।
না বাবা, তাহলে লোকে বিড়াল পোষে কেন ?
সে অনেক রকম ব্যবস্থা নিতে হয়, আমাদের ছোট ফ্ল্যাট, জায়গা কম, বুঝবি না।
মাসি বলল বিড়ালটাকে এমন জায়গায় দিয়ে আসতে হবে যাতে ওর মা খুঁজে পায়, কোন জায়গা বলো সোনা। আমি বললাম, ওকে খুঁজে খুঁজে ওর মা আমাদের ফ্ল্যাটেই চলে আসবে, দেখো। মাসি মাথা নেড়ে বলেছিল, আমরা থাকি দোতলায়, আমাদের বাড়ি চিনবে কী করে, আসবেই বা কী করে, জানালা দিয়ে আসতে পারবে না, দরজা তো বন্ধই থাকে।
বিমান বলল, কী করলি তারপর ?
তুমি রাত্তিরে এসে খোঁজ নিলে, বিড়াল বিদায় করেছি কি না।
তখন দিয়ে এসেছিস ওর মায়ের কাছে ?
মাকে পাব কোথায় বাবা, আমি বললাম দিয়ে এসেছি, বিড়ালটা তখন ডিভানের নিচে, একটুও আওয়াজ নেই, একবার বোধহয় মিঁউ করেই থেমে গিয়েছিল, তুমি শুনতে পাওনি ভাগ্যি, সে তারপর চুপ, তুমি ঘুমালে আমি তাকে বের করে আনলাম খাটের নিচ থেকে, কত রাত তখন, সকলে ঘুমিয়ে, আমি ঘুমাইনি, ঘুমের ভান করে জেগেছিলাম, তাকে দুধ দিলাম, কোলে নিয়ে বসে থাকলাম, বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছি, সেও তখন ডিভানের নিচে গিয়ে হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছিল, ভোরে মাসি দ্যাখে আমি মেঝেতে ঘুমিয়ে, আমাকে ডেকে বিছানায় নিয়ে গেল। পরদিন মাসির সঙ্গে আমি তাকে নিয়ে বেরুলাম। কোথায় তার মা ? রাখি কোথায়, শেষে মাসিই বুদ্ধি দিল, পরেশনাথ মন্দিরে রেখে আসতে, ওদের ধর্মে পশু-পাখিকে খাওয়ায়, বিড়ালবাচ্চা ভালো থাকবে।
তাই করলি, পরেশনাথে রেখে এলি ?
অরণি বলল, হ্যাঁ, পেছনের গেট দিয়ে ঢুকেছিলাম আমি আর মাসি, দারোয়ান গেট খুলে দিল, মাসি বিড়ালকে আঁচলের আড়ালে নিয়ে ঢুকে গেল, আমিও গেলাম পিছু পিছু। মাসি মন্দিরের বাগানে তাকে রেখে আমার হাত ধরল, চলো, তাকাবে না আর, একদম তাকাবে না, আমি যত পিছনে ফিরি, দেখি সে কই, মাসি আমাকে টানতে টানতে বের করে নিয়ে এল, আমি শুনতে পাচ্ছিলাম সে ডাকছে, মাসি কত নিষ্ঠুর ছিল বাবা, আমাকে বাড়ি এনে হাত ছাড়ল।
বিমান বলল, মাসি ভালো জায়গাতেই রেখে এসেছিল, নিষ্ঠুর কেন হবে ?
তুমি বলেছো তাই তোমাকে খুশি করতে বিড়ালটাকে ফেলে এল, মাসি কেন নিষ্ঠুর হবে, সত্যি তো।
বিড়াল ঠিক তার মায়ের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল, বাগানটা ভালো, নিরাপদ। বিমান বলল।
না, সেদিন রাতেই মেঘ করে খুব বৃষ্টি এল, ঝমঝম করে বৃষ্টি এল, বাগানে রাতে কেউ নেই, ও একা, এত বৃষ্টি, ও যে মরে যাবে, আমি কাঁদতে লাগলাম, ভিজে গিয়ে জ্বর আসবে ওর, কোথায় রেখে এলে মাসি, মাসি বলল, ওর মা এসে নিয়ে গেছে ওকে, ঠিক নিয়ে গেছে। আমি ভাবলাম তাই হবে হয়তো। বাবা তুমি যে কেন তাকে রাখতে দাওনি, কী হতো, আমরা আছি আর একটা বিড়াল থাকত, কত লোকের বাড়িতে অতিরিক্ত একটা লোক থাকে, আমাদের ছিল বলতে মাসি, দিদিও বলতে লাগল, রেখে দিলেই হতো, কিন্তু তুমিই সব, মা কিছু বলতে পারল না, দিদিও না, শুধু আমি বলতে লাগলাম, বৃষ্টিতে সে বাঁচবে না, তারপর কী হলো জানো ?
বিমান তাকিয়ে থাকল। ছেলে সবটা কি বানিয়ে বলছে, মনে হয় না। এমন কিছু ঘটেছিল যা সে ভুলে গেছে। শুনে যত গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে, আসলে ততটা ছিল না। কুকুর-বিড়াল সে পছন্দ করে না। একদমই না। কেন তা জানে না। অনেকের তো অনেক রকম অভ্যেস হয়। কুকুর-বিড়াল পছন্দ করে না মানে সে যে নিষ্ঠুর প্রকৃতির মানুষ তা নয়। অনেক মানুষই তার কাছে উপকৃত হয়েছে। সাধ্যমতো সাহায্য করেছে কাউকে কাউকে। কিন্তু বিড়াল নিয়ে অরণির অভিযোগ তাকে শুনতে হচ্ছে। সে বলল, এমন অনেক হয়, আগে বস্তায় ভরে বিড়াল অন্য জায়গায় চালান করত, জানিস।
অরণি কথায় গুরুত্ব দিল না, বলল, পরের দিন না তার পরের দিন, আমি মাসির হাত ধরে দোকান থেকে আসছি, দেখতে পেয়েছি বাবা দেখতে পেয়েছি, সে পরেশনাথ মন্দিরের অন্য গেট দিয়ে বেরিয়েছে, কত বড় মন্দির, কতটা পথ পেছনের গেট আর সামনের গেটের ভেতর, বিড়ালটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিল, অতটা পথ হেঁটে আসছিল, মা কই, একা একা, সম্পূর্ণ একা। একা একা ফুটপাথ দিয়ে হাঁটছিল, পেছনের গেট থেকে মন্দিরের লোক তাকে বের করে দিয়েছিল, হয়তো মেরেও ছিল, নতুবা খুঁড়িয়ে হাঁটবে কেন, পেছনের বাম পা জখম হয়েছিল। মিঁউ মিঁউ করে কাঁদছিল। লোকে তাকে দেখছিল না। আমি দেখতে পেয়ে মাসির হাত ছাড়িয়ে ছুটে গেছি, মাসিও ছুটেছে, হাঁপাচ্ছিল আমাকে ধরে, বলল, সোনা ছুঁয়ো না, দেখছ না কী নোংরা, গায়ে কাদা লেগে আছে। সে আমার দিকে তাকিয়ে আকুল স্বরে ডাকছিল।
আমি বললাম, মাসি নিয়ে যাই, ওর মাকে ও পায়নি।
মাসি খুব মাথা নাড়ল, বলল, একদম না, তখন মাসি বলল, এইটা সেই বিড়াল নয়।
না সেই বিড়াল।
মাসি বলল, একদম না, দেখছো না, এর লেজ পুরো শাদা, সেই বিড়ালের লেজের মুখ কালো ছিল।
না ছিল না, এমনিই ছিল। আমি বললাম।
মাসি বলল, তোমার বাবা রাগ করবে সোনা।
ও ওর মা খুঁজে পায়নি মাসি, পাবে না, রাস্তায় থাকলে ভুলুয়ার মতো মরে যাবে, ওকে কেউ না কেউ মেরে ফেলবে।
বাজে কথা বলো না তো, চলো বাড়ি চলো। মাসি আমার হাত ছাড়ল না। আমাকে টানতে টানতে বাড়ি নিয়ে এল। আমি কাঁদছি। মাসি বলছে সে বিড়াল নয়, সে বিড়াল অন্য। বুঝতে পারছিলাম মাসি সত্য বলছে না, বানিয়ে বলছে।
বিমান দেখল অরণির দু চোখ জলে ভরে গেছে। সকাল হয়নি এখনও। বিমান কথা খুঁজে পাচ্ছিল না। তখন অরণি বলল, এরপর মাসি গেল নিজের মেয়ের কাছে, ফিরেও এল, আমি বললাম, মেয়ে হারিয়ে যায়নি তো। মাসি বুঝতেই পারল না কথাটা। আসলে মাসি তার প্রভুকে সন্তুষ্ট রাখতে বিড়ালটাকে বিসর্জন দিল। প্রভু তুমি বাবা। তোমার মায়া ছিল না, আমি মায়ের কাছে থাকি, তার মা হারিয়ে গেছে, খুঁজতে খুঁজতে সে রাস্তায় গাড়ি চাপা পড়েই মরেছিল। মাসি বলত সে পেয়ে গেছে তার মাকে, না হলে দেখতে পেতাম। কিন্তু মাসি দেখতে পেত না, আমি পেতাম, বিড়ালটা অনেক রাত্তিরে, সবাই ঘুমালে আমাদের বাড়ির সামনে এসে কাঁদত। আমাকে ডাকত। এই কথা একদিন মাসিকে বলতে, কেঁদে ফেলল, তুমি এ কী বলো সোনা, সে বড় হয়ে গেছে, এখন তার মায়ের দরকার নেই, তুমি বড় হচ্ছ, সেও বড় হচ্ছে।
বিমান বলল, যাক, এসব মনে করে কী হবে ?
মাসির খুব বাসনা ছিল নাতির বিয়ে দেখবে, হয়নি।
হুঁ। বিমান মাথা নাড়ল।
বিয়ের তিন দিন আগে চলে গেল, বিয়ে ভেস্তে গেল।
চুপ করে থাকল বিমান।
তোমার পা ভাঙল, মনে আছে ?
কী বলতে চায় অরণি ? সে কি তার অনুমানের পথে হাঁটছে ? লতিকা মাসির মৃত্যু হলো কেন ? মরতে তো চায়নি সে।
আমি কিছুই করে উঠতে পারছি না, যা করতে যাচ্ছি আটকে যাচ্ছে, এবার বিড়ালটার কথা লিখব, কনফেশন, দেখি কী হয়, মনে আছে, সেই যে তোমার চেনা, শুভদীপ, সে কীভাবে মিষ্টি মুখে আমাদের ঠকিয়ে দিল, আমি ভাবছি প্রতারককে চিনতে পারিনি, সব পাসওয়ার্ড তার হাতে তুলে দিলাম।
গম্ভীর হয়ে গেল বিমান। কিন্তু সে হয়। কত লোক প্রতারকের হাতে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছে। সাইবার ক্রাইম। ব্যাঙ্ক একাউন্ট সাফ করে দিচ্ছে। তার সঙ্গে এসব মিলবে কী করে ? কত লোক তীর্থ করতে গিয়ে আপনজন হারিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরল। এমন হয়।
বাবা আমি ছোট ছিলাম, আমি তাকে রাখতে পারিনি, কিন্তু এখনও রাতে সে যেন ডাকে, আমাদের ফ্ল্যাটের দরজা অবধি উঠে আসে সিঁড়ি দিয়ে, খোঁড়া বিড়াল, মন্দিরের লোকের মায়া নেই, মেরে বের করে দিয়েছিল, উফ আমি বিড়ালটার জন্য কিছু করব, কী করব ভেবে পাচ্ছি না, সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখব, আমার সেই বিড়ালটি কেমনভাবে হারিয়ে গেল এই শহরে।
সে এত বছর বেঁচে নেই, বিড়ালের আয়ু বড় জোর পনের-ষোলো বছর। বিমান নিচু গলায় বলল।
অরণি উঠে গেল। ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। দরজায় রীতা দাঁড়িয়ে। বলল, ভুলে গেছো, সবই সত্য।
আলো ফুটছে এতক্ষণে। অন্ধকার কেটে গেছে। বিমান জানালার দিকে তাকাতে পারছে না। সেই প্রাণিটি। একটি বিড়াল। জানালায় এসে বসেছে। তাকিয়ে আছে তার দিকে। দরজায় কে যেন কচি নখে আঁচড়াচ্ছে। সে। আবার এল অরণি। দরজায়। বলল, কোনও গাড়ি হয়তো তাকে পিষে দিয়ে গেছিল। রাস্তায় পড়ে পড়ে পচেছিল। কাক খুঁটে খেয়েছিল তাকে… বুঝলে বাবা, আমি যে কেন প্রতারণা, কেন অমানবিকতার শিকার হচ্ছি বারবার, কেন যে পৃথিবীটা আচমকা বদলে গেল, বুঝলে, যা মনে হয় স্বাভাবিক, তাই একদিন অস্বাভাবিক হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এখন…।
দরজায় আঁচড়াচ্ছে কে। ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে বিমান। দু হাতে মুখ ঢাকল।
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



