আর্কাইভবিশেষ রচনা

বিশেষ রচনা : নজরুল : শতবর্ষ পেরিয়ে : ‘বিদ্রোহী’র দর্শন এবং ‘মিথ’-এর ব্যবহার : প্রথমা রায়মণ্ডল

১.

‘বিদ্রোহী’ : শতবর্ষ পেরিয়ে

কাজী নজরুল ইসলামের আলোড়ন সৃষ্টিকারী ‘বিদ্রোহী’ কবিতার জন্মশতবর্ষ পেরিয়ে গেছে ডিসেম্বর ২০২১-এর অন্তিম লগ্নে। কবিতাটির জন্ম হয়েছিল প্রচণ্ড এক শীতের রাতে, কলকাতার ৩/৪সি, তালতলা লেনের ভাড়াবাড়িতে, ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে। এ তথ্য জানিয়েছেন মুজফ্ফর আহমদ, তাঁর কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা শীর্ষক গ্রন্থে। পেন্সিলে লেখা এই অবিস্মরণীয় কবিতাটির প্রথম শ্রোতাও ছিলেন তিনিই। তালতলার এই বাসায় কবি নজরুল ইসলাম মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন ১৯২১-এর জুলাই-আগস্ট থেকে। তার ঠিক মাস চারেক পরে, যেন আকস্মিকভাবেই জন্ম নিল এই মহাকবিতাটি।

কবিতাটি প্রথম মুদ্রিত হয় সাপ্তাহিক বিজলী পত্রিকার পৌষ সংখ্যায় ১৩২৮ বঙ্গাব্দে। তবে ১৩২৮ বঙ্গাব্দের কার্তিক সংখ্যায়, মোসলেম ভারত পত্রিকায় কবিতাটি ছাপা হওয়ার কথা থাকলেও তা সময়মতো মুদ্রিত হতে না পারার কারণে কবিতাটিকে প্রথম আলোর মুখ মোসলেম ভারতই যে দেখিয়েছে, এ কথা প্রামাণ্য ইতিহাস নির্ভরতায় বলা যাবে না। এরপর কবিতাটি প্রবাসীতে মুদ্রিত হয় ১৩২৮ বঙ্গাব্দের মাঘ মাসে; এবং সাধনা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৩২৯-এর বৈশাখে। ‘বিদ্রোহী’র বিপুল জনপ্রিয়তা এবং অবিশ্বাস্য রকম পাঠক-চাহিদা বৃদ্ধির কারণে, কবিতাটি পর পর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকীতে মুদ্রিত এবং পুনর্মুদ্রিত হতে থাকে। অধ্যাপক অরুণকুমার বসু, তাঁর নজরুল জীবনী শীর্ষক গ্রন্থে, ‘বিদ্রোহী’ কবিতার জনপ্রিয়তার কথা প্রকাশ করেছেন এভাবে :

‘এই অসাধারণ জনপ্রিয়তা সাম্প্রতিক বা পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে, যে কোন কবিতার ক্ষেত্রেই দুর্লভ ঘটনা। একাধিক পত্রিকায় একটি মাত্র কবিতার এতবার পুনর্মুদ্রিত হওয়ার অভিজ্ঞতাও কোনও কবিতার ভাগ্যে ঘটেনি। একটি কবিতা একজন কবিকে তাঁর সমগ্র কাব্য-জীবনের দিগনির্ণয় দিয়ে গেল, এমন উদাহরণও বিরল।’

বলা প্রয়োজন যে, এই বিপুল জনপ্রিয়তা এবং অবিশ্বাস্য রকম পাঠক-চাহিদার তাগিদ থেকেই কবি নজরুল সম্পাদিত অর্ধ-সাপ্তাহিক ধূমকেতু পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় কবিতাটি পুনরায় মুদ্রিত হয় (২২ শ্রাবণ, ১৩২৯ বঙ্গাব্দ/ ১১ আগস্ট, ১৯২২)। এই সংখ্যার নবম পৃষ্ঠায় ‘সানাইয়ের পোঁ’ পর্যায়ে ‘বিদ্রোহী’ স্থান পায়। কবিতার পাদটীকায় জানিয়ে দেওয়া হয় যে, ‘পাঠকদের সহজলভ্য ক্রয়ের সুবিধার জন্য’, ধূমকেতুর প্রথম সংখ্যায় তা পুনরায় মুদ্রিত হয়েছে।

১৯২২ সালের অক্টোবর মাসে প্রকাশিত হয় কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ অগ্নিবীণা (কার্তিক, ১৩২৯ বঙ্গাব্দ), আর তাতেই অন্তর্ভুক্ত হয় কবির অমর কবিতা: ‘বিদ্রোহী’।

২.

‘মিথ’ এবং’ বিদ্রোহী’

‘মিথ’ বা পুরাণ মূলত পৌরাণিক লোককাহিনির একটি ধারা।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান এবং ইসলামি ঐতিহ্য মিশ্রিত ‘মিথ’গুলোর পেছনে ছড়িয়ে রয়েছে নানাবিধ আখ্যান। এইসব মিথ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত হয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে সমাজের অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সম্পর্ক। তবে বেশির ভাগ মিথই ধর্মীয় বিশ্বাস এবং দেব-দেবী সম্পর্কিত গল্পের আধার-জাত। প্রতীকাশ্রিত এই সব মিথ ব্যবহার করে কবিরা সমাজের মূল্যবোধ, বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক ধারণা, দ্রোহ, প্রতিবাদ ইত্যাদিকে কবিতায় ব্যঞ্জনাময় রূপে সুসজ্জিত করেন। এই সব মিথের সঙ্গে অনেক সময় জড়িয়ে থাকে অতিপ্রাকৃত ঘটনাবলি ও চরিত্রসমূহ, দেবতা কিংবা দানব নির্ভর কল্প-কাহিনি। উনিশ শতকের কবিতায়ও ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলেছিল প্রতীকাশ্রয়ী মিথ-পুরাণের প্রসঙ্গ।

কাজী নজরুল ইসলামও এ-কবিতায় মিথাশ্রিত চরিত্র, কাহিনি, উপ-কাহিনিকে জড়িয়ে নিয়ে, নবতর ভাবনায় ও বিন্যাসে সমকালের চিন্তা-চেতনার অনুষঙ্গে একে ব্যবহার করেছেন।

দেশ ও সমাজ-মানস যখন পরাধীনতার শৃঙ্খলে বন্ধ্যা; প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর যাপিত জীবনে যখন নেমেছে অমানিশার গাঢ় অন্ধকার; যখন রাষ্ট্রীয় জীবনে ব্রিটিশ শাসনের নাগপাশ গিলোটিনের মতো শোনাচ্ছে মৃত্যুর পরোয়ানা, তখন মুক্তিকামী মানুষের প্রতিবাদী সত্তার প্রতীক হিসেবে, কবিতায় গুরুদায়িত্ব পালন করেছে এইসব মিথ। নজরুল ইসলামও তাঁর এই মহার্ঘ্য কবিতা ‘বিদ্রোহী’তেও সদর্থক হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করেছেন মিথকে। বিশেষত তাঁর অগ্নিবীণা কাব্যের এই বিখ্যাত কবিতাটিতে, তিনি তৎকালীন শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে মিথকে ব্যবহার করেছেন বলিষ্ঠ প্রতিবাদ, দ্রোহ এবং বিদ্রোহের ইমেজ হিসেবে। ‘বিদ্রোহী’তে ব্যবহৃত মিথগুলো তাই কখনও রূপক, কখনও প্রতীক কিংবা ইমেজ হয়ে রূপকাশ্রয়ী যুদ্ধের দামামা শুনিয়েছে।

সমকালে নজরুল ইসলাম ছিলেন তারুণ্যের এক বিচ্ছুরিত আলোকোজ্জ্বল বহ্নিশিখা; সেই আলোর বিচ্ছুরণ, ‘বিদ্রোহী’র মাধ্যমে তরুণ সমাজে আলোকশিখা ছড়িয়ে দিয়েছে, শুনিয়েছে জাগরণের নির্ঘোষ বাণী। মিথ তখন এই কবিতায় হয়ে উঠেছে, ‘অ সড়ফব ড়ভ ঈড়মহরঃরড়হ, ধ ংুংঃবস ড়ভ ঃযড়ঁমযঃ, ধ ধিু ড়ভ ষরভব.’

নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় মিথ জাগরণের প্রতীক, শৃঙ্খল মোচনের ও পৌরুষের রূপক এবং কল্যাণ ও শুভ চেতনার প্রতীকাশ্রয়ী গড়ঃরভ-এ রূপ নিয়েছে। ধ্বংসও কবির কাছে হয়ে উঠেছে নতুনভাবে সমাজ গড়ার চেতনাশ্রিত জাগরণের এক অভয় বাণী। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তিনি মিথগুলিকে একই পঙ্ক্তিতে পাশাপাশি ব্যবহার করেছেন ধ্বংস ও সৃষ্টির চিত্রকল্প রূপে। কবি এখানে সমাজের মুক্তিযুদ্ধে, নিজেই একজন অন্যতম নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধি; জাগরণের চেতনাশ্রিত এক অমোঘ শক্তির প্রতিমূর্তি।

কাজী নজরুল ইসলাম কীভাবে তাঁর ‘বিদ্রোহী’র অন্তর্সত্তাকে বাক্সময় করে ফুটিয়ে তুলেছেন; কীভাবে দেশীয় তথা ভারতীয় ও ইউরোপীয় এবং আরবীয় ও পারস্যের মিথকে বিদ্রোহের মূল দর্শন প্রকাশে ব্যবহার করেছেন এবং পর্যায়ক্রমে তার বিস্তার ঘটিয়েছেন, তার মূল সুর এবার বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখানো যাক।

৩.

‘বিদ্রোহী’র দর্শন এবং মিথের ব্যবহার

কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মূল দর্শন বিশ্বের সর্বহারা মানুষের মুক্তির অভীপ্সা এবং তার জন্য কবির নিরন্তর দ্রোহ ও প্রতিবাদ। কবিতাটির দুটি পর্যায়। প্রথম পর্যায়ে তিনি বিশ্বের তাবৎ সর্বহারা মানুষের সমস্যার কথা বলেছেন এবং তাদের মুক্তির জন্য নিজেকে শক্তিশালী ‘বিদ্রোহী বীর’রূপে তৈরি করেছেন। আর দ্বিতীয় পর্যায়ে ‘উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল’ না থামা পর্যন্ত তাঁর নিরন্তর বিদ্রোহ চালিয়ে যাওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। কবিতাটির বহিরাঙ্গিক ভাববস্তুকে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর ওহঃৎড়ফঁপরহম ঘধুৎঁষ ওংষধস গ্রন্থে [১৯৭৪, মুক্তধারা] অনন্য মহিমায় প্রকাশ করেছেন :

‘ঠরফৎড়যর ধহহড়ঁহপবং ঞযব চড়বঃ’ং ফবঃবৎসরহধঃরড়হ ঃড় ভরমযঃ ধমধরহংঃ ধষষ বারষং রহ ঃযব ড়িৎষফ, চধৎঃরপঁষধৎষু ঃযব ড়ঢ়ঢ়বৎবংংড়ৎ’ং ৎিড়হম. ঐব পড়সঢ়ধৎবফ যরসংবষভ ঃড় ঃযব ারড়ষবহঃ ড়নলবপঃং রহ হধঃঁৎব, সরমযঃু ধিৎৎরড়ৎং রহ ষবমবহফং ধহফ যরংঃড়ৎু ধহফ ফবধফষু বিধঢ়ড়হং ড়ভ সড়ফবৎহ ধিৎভধৎব.’

এবং,

‘ঘধুৎঁষ ওংষধস’ং ঠরফৎড়যর ংঢ়ৎরহমং ধ ংঁৎঢ়ৎরংব ড়হ ঁং রিঃয ঃযব ভরহধষ ংঃধঃবসবহঃ ঃযধঃ যব ড়িঁষফ নব ংরষবহঃ ড়হষু ধভঃবৎ ধষষ ঃুৎধহহু ধহফ ড়ঢ়ঢ়ৎবংংরড়হ যধফ নববহ বৎধফরপধঃবফ ভৎড়স ঃযব ড়িৎষফ.’

কবিতাটির মধ্য দিয়ে কবির সাম্যবাদী চিন্তা এবং আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রত্যয় বাক্সময় হয়ে উঠেছে। ঠিক একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অধ্যাপক আহমদ শরীফ ‘বিদ্রোহী’ কবিতার অন্তর-প্রবাহিত গতিবেগকে প্রকাশ করেছেন এভাবে :

‘এ কবিতা অফুরন্ত অপ্রতিরোধ্য প্রাণের প্রবল আবেগতাড়িত দিশেহারা এক চঞ্চল তরুণের প্রাণশক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্র খুঁজে বেড়ানোর চিত্র। এত শক্তি নিয়ে কী হবে, কী করবে স্থির করা সম্ভব হচ্ছে না, তাঁর পক্ষে। তাই কখনও সৃষ্টির, কখনও লালনের আবার কখনও দুর্বল মুহূর্তে ভালোবাসার আবেগে অস্থির। ধ্বংসের প্রথম দিকে আত্ম-পরিচিতি ঘোষণায় এ শক্তি নিষ্ঠুর! কঠোর ধ্বংসমুখী এবং শক্তির স্বরূপ সন্ধানে আগ্রহী, মধ্যে স্বরূপ উপলব্ধির উল্লাসে শক্তির বৈচিত্র্য নিরূপণে প্রয়াসী; এবং শেষে শক্তির প্রয়োগে অত্যাচারী দমনের, উৎপীড়িতের ক্রন্দন নিবারণের সাফল্যে শান্ত হওয়ার সংকল্প ব্যক্ত করেছেন।’ [নজরুল সমীক্ষা: অন্য নিরিখে; পৃ. ১১৭]।

কবিতার ভাববস্তু, বিষয়, অন্তর্সুর এবং গতিবেগ, বিশেষত ‘বিদ্রোহী’ কবিতার অন্তর্বৃত্ত ও বহির্বৃত্তের প্রকাশে কবি মিথ বা পুরাণকে অবলম্বন করেছেন। এত পুরাণ-চরিত্র এবং বিচিত্রমুখী পুরাণাশ্রিত শব্দের সমাহার, তাঁর আর কোনও কবিতায় পরিলক্ষিত হয় না। বিষয়ানুগ শিল্পচাতুর্য, ভাবের গভীরতা, অন্তর্সুরের প্রতীকী উপমাশ্রিত অলংকারময় চিত্রকল্প বা ইমেজ নির্মাণ, অনুপ্রাসের ঝংকারে বাণীবদ্ধ প্রতিবাদ এবং তাকে গতিময় করার জন্য তিনি মিথকে ব্যবহার করে আবেগ ও কাব্যিক ব্যঞ্জনা বা ঢ়ড়বঃরপ ফরপঃরড়হ-কে সুতীব্র করেছেন। কবির, এই কবিতায় ব্যবহৃত মিথ-পুরাণ, ইতিহাস-চেতনা এবং ঐতিহ্যকে পাঁচটি পর্যায়ে বিন্যস্ত করা যায় :

১. ভারতীয় মিথ : পুরাণের ব্যবহার [পুরাণের বিভিন্ন দেব-দেবী চরিত্র, পুরাণাশ্রিত নানা অনুষঙ্গ শব্দ];

২. বাংলার লৌকিক এবং দৈশিক মিথ তথা লোক-পুরাণের ব্যবহার;

৩. ইউরোপীয় মিথ, বিশেষত গ্রিক-পুরাণের ব্যবহার;

৪. ইসলামি মিথ এবং ঐতিহ্যের ব্যবহার; এবং

৫. পারস্য ও মধ্যপ্রাচ্যের মিথিক উৎসের শাব্দিক এবং ব্যক্তিচরিত্রের উপস্থিতি।

এই কবিতায় নজরুল ইসলাম মূলত একটি অবরুদ্ধ সময়ের শোষিত-বঞ্চিত-নিষ্পেষিত তরুণসমাজ এবং পৌরুষের প্রতীক রূপে মিথকে ব্যবহার করেছেন। পৌরাণিক যাবতীয় মিথ-চরিত্র এবং কাহিনির প্রতিবাদী সত্তা এখানে কবির হাতিয়ার। ধ্বংস এবং সৃষ্টি, এ কবিতায় অনুষঙ্গবাহী মিথে প্রতিবাদী ইমেজের রূপ নিয়েছে। কখনও বা মিথের তথা পুরাণের ব্যবহারের ফলে কবিতার অন্তর্সত্তা শিল্পরসোত্তীর্ণ হয়ে উঠেছে চমৎকারভাবে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটিতে মিথের ব্যবহারের প্রক্রিয়া ও উদ্দিষ্ট বা অন্বিষ্ট, এভাবে বিন্যস্ত করা যেতে পারে :

ক. কবি এই কবিতায় প্রাচীন মিথ বা পুরাণ এবং ঐতিহ্যকে, বিশেষত মিথের প্রতিবাদী চরিত্র এবং সংশ্লিষ্ট কাহিনিকে আধুনিক পরিপ্রেক্ষিতে, আত্মমগ্নতায় ব্যবহার করেছেন। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা বুদ্ধদেব বসুর মতো পুনর্নির্মাণ করেননি।

খ. হিন্দু-মুসলিম মিথ এবং পুরাণসংক্রান্ত শব্দের ব্যবহারের মাধ্যমে কবি একটি সম্প্রীতির বাতাবরণ তৈরি করেছেন।

গ. ভারতীয়, পারস্য, মধ্যপ্রাচ্যের ও গ্রীক পুরাণের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে কবির আন্তর্জাতিকতাবাদে আস্থার পরিচয় মেলে।

ঘ. হিন্দু-মুসলিম এবং গ্রিক মিথ উল্লেখের মাধ্যমে কবির পরধর্মসহিষ্ণুতার পরিচয় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

ঙ. হিন্দু দেব-দেবী এবং ইসলাম-ধর্ম সম্পৃক্ত শব্দের পাশাপাশি ব্যবহার এবং মিথাশ্রিত উপমা ও রূপক, কবির ধর্মনিরপেক্ষতাকেই আভাসিত করেছে।

চ. কবিতায় পর্যাপ্ত উপমা-রূপক-অনুপ্রাস চিত্রকল্প ব্যবহার করে, কবি একে [‘বিদ্রোহী’কে] ধ্রুপদী এবং আধুনিক চেতনায় সমন্বিত করতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে পুরাণ বা মিথের মিশেলে কবিতাটি রসোত্তীর্ণ শিল্পমর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছে।

ছ. কবিতায় মিথের ব্যবহারের ফলে অতীত-সত্যের সঙ্গে বর্তমান-সত্যের সাঙ্গীকরণ তথা একাত্মতা সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে। ফলে পাঠক হৃদয়ে, কবিতার সঙ্গেই সমকালীন ঘটনাবলির প্রতিক্রিয়া উপলব্ধিও সহজতর হয়েছে।

জ. ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি বিভিন্ন ধরনের মিথের ব্যবহার করেছেন কাব্যিক তাৎপর্য ও ব্যঞ্জনা সৃজনের জন্যেও।

ধ্রুবকুমার মুখোপাধ্যায় তাঁর নজরুল ইসলাম: কবিমানস ও কবিতা শীর্ষক গ্রন্থে, ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় মিথের বা পুরাণের ব্যবহারের অভীষ্ট সম্পর্কে বলেছেন : ‘যে প্রতিবাদী মানসিকতা থেকে বিদ্রোহী কবিতার জন্ম, সেই মানসিকতাই কবিতাকে পুরাণের প্রতিবাদী চরিত্র-বৈশিষ্ট্যকে বেছে নিতে সাহায্য করেছে।’ [পৃ. ১৩৮]।

‘বিদ্রোহী’ কবিতার মিথ বা পুরাণ ব্যবহারের যৌক্তিকতা বিচারের সময় এই বিবেচনার সত্যাসত্য নিরূপণ করার চেষ্টা করা হবে।

বিশ্লেষণের পূর্বে, কবিতায় ব্যবহৃত মিথ বা পুরাণ-চরিত্র এবং পুরাণাশ্রিত শব্দসমূহের একটি তালিকা প্রস্তুত করা যেতে পারে :

১. হিন্দু-মিথ

১. ১. দেবতা : রুদ্র ভগবান, নটরাজ, ভীম, ধূর্জটি, জমদগ্নি, ব্যোমকেশ, পিনাক পাণি, প্রণব, দুর্বাশা, ভৃগু, বলরাম, পরশুরাম, বিষ্ণু, বিশ্ববিধাতৃ, বিশ্বামিত্র, শ্যাম, জগদীশ্বর, ধর্মরাজ, পুরুষোত্তম, কৃষ্ণকণ্ঠ, অগ্নি, প্রভঞ্জন, শনি, ঈশান, বাসুকি, সূর্য ইত্যাদি।

১. ২. দেবী : ইন্দ্রাণী, চণ্ডী, রণদা, ছিন্নমস্তা।

১. ৩. পুরাণাশ্রিত শব্দ : হোম-শিখা, সাগ্নিক, পুরোহিত, শ্মশান, মন্থন-বিষ, গঙ্গোত্রী, সন্ন্যাস, গৈরিক, যজ্ঞ, বজ্র, ওঙ্কার, ডমরু, ত্রিশূল, দ্বাদশ রবি, সপ্তনরক, ভূলোক দ্যুলোক গোলোক, উচ্চৈঃশ্রবা, দেব-শিশু, মৃন্ময়, চিন্ময়, খড়া, মহাশঙ্খ, স্বর্গ-মর্ত্য, পাতাল, কৃষ্ণ : হোকণ্ঠ, বৈজয়ন্তী ইত্যাদি।

২. ইসলামিক : খোদা, আরশ, ইস্রাফিল, জিব্রাইল, হাবিয়া দোজখ, তাজী, র্বো রাক্।

৩. গ্রিক : অর্ফিয়াস।

৪. লোকপুরাণ : ‘এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী’।

৫. মধ্যপ্রাচ্যীয় ঐতিহাসিক [ঐতিহ্য] : বেদুঈন, চেঙ্গিস।

বিশ্লেষণ

কবিতার শুরুতেই কবি হিন্দু-মুসলিম পুরাণের পাশাপাশি ব্যবহার দেখিয়েছেন :

১. ‘ভূলোক দ্যুলোক গোলোক ভেদিয়া’ [পঙ্ক্তি: ৭]।

এখানে ‘গোলোক’ হিন্দু পুরাণাশ্রিত শব্দ। ‘গোলোকে’র অর্থ বৈকুণ্ঠ বা বিষ্ণুলোক, অর্থাৎ স্বর্গের নারায়ণের বাসস্থান।

২. ‘খোদার আসন আরশ ছেদিয়া’ [পঙ্ক্তি: ৮]।

এখানে খোদা অর্থাৎ আল্লাহ। ‘খোদার আরশ’ অর্থাৎ সর্বব্যাপী খোদার আসন বা উচ্চতম স্বর্গীয় অবস্থান। শব্দটি আরবি ‘আরশ’ থেকে এসেছে।

৩. ‘মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর।’ [পঙ্ক্তি: ১০]

‘বেদ’-এ অগ্নিকে রুদ্র বলা হয়েছে। ভারতীয় দর্শনে ‘রুদ্র’ শব্দটি কখনও সূর্য, কখনও বা শিবের সঙ্গে প্রতিতুলিত। এখানে শিবের ত্রি-নেত্রের একটি। কপালে, যা জয়টীকারূপে জ্বলে বিজয়ীর মতো।

৪. ‘মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ’ [পঙ্ক্তি: ১৪]

ভারতীয় দর্শনে মহাদেব বা শিব নটরাজ নামে পরিচিত। তিনি ‘শিবতাণ্ডব’ নামের নৃত্যকলার উদ্ভাবক। নটরাজের এক পায়ে ধ্বংস, অন্য পায়ে সৃষ্টি। এখানে কবি নটরাজকে ‘মহাপ্রলয়ের’ অর্থাৎ ধ্বংসের প্রতিরূপ হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

৫. ‘আমি ভীম ভাসমান মাইন’। [পঙ্ক্তি: ২০]

ভীম মহাভারতের চরিত্র। পঞ্চপাণ্ডব ভাইদের মধ্যে দ্বিতীয়। কুন্তী ঋষি দুর্বাসার কাছ থেকে বর পেয়ে বায়ুদেবকে আহ্বানের মাধ্যমে ভীমের জন্ম দেন। বিশাল দেহ ও প্রবল শক্তির জন্য ভীম বিখ্যাত। ধ্বংসাত্মক ‘মাইন’-এর সঙ্গে ভীমের বিশাল শরীরের প্রতিতুলনা করেছেন কবি। তিনিও যেন ভীমের মতোই শক্তিশালী ও বিশালদেহী।

৬. ‘আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর’ [পঙ্ক্তি: ২২]

ভারতীয় পুরাণ অনুযায়ী ‘ধূর্জটি’ বলতে আকাশে জটাবিশিষ্ট দেবতাকে বোঝানো হয়েছে। ‘ধূর্জটি’ এখানে মহাদেব বা শিবের ভিন্ন নাম। কবি এখানে ‘ধূর্জটি’ বলতে মহাদেব বা শিব, অর্থাৎ তাঁর ধূম্রবর্ণ জটার কথা বুঝিয়েছেন।

৭. ‘আমি হোম-শিখা, আমি সাগ্নিক জমদগ্নি’ [পঙ্ক্তি: ৪৪]

দেবতার উদ্দেশ্যে মন্ত্রোচ্চারণ করে অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দেওয়াকে বলে ‘হোম’। তার শিখা হচ্ছে হোমশিখা। কবি এই শিখার মতো প্রজ্জলিত।

‘জমদগ্নি’ একজন বৈদিক ঋষি। চতুর্বেদ সম্বন্ধেই তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। তাঁর পিতা ঋচীক। মা কান্যকুব্জ রাজদুহিতা সত্যবতী। জমদগ্নি পরশুরামের পিতা। তিনি সাগ্নিক, মানে তিনি সর্বক্ষণ জাজ্বল্যমান। তিনি কামধেনুর জন্য রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। এখানে কবি নিজেকে ‘জমদগ্নি’ বলেছেন এই কারণে যে, তিনিও যেন সর্বহারার মঙ্গলার্থে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন।

৮. আমি যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি’। [পঙ্ক্তি: ৪৫]

হিন্দু শাস্ত্রানুযায়ী ‘যজ্ঞ’ একটি পবিত্র অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতাদের আহুতি দিয়ে আশীর্বাদ কামনা করা হয়। আসলে বেদ-এর মতে, অগ্নি হচ্ছে দেবতাদের মুখ। এইজন্য বিশ্বাস করা হয় যে, যজ্ঞে প্রজ্বলিত অগ্নিতে আহুতি দিলে প্রত্যক্ষভাবে দেবতাদের পাওয়া যায়। কবি তাই এখানে নিজেকে ‘যজ্ঞ’ বলতে চাইছেন এই কারণে যে, দেবতারা স্বয়ং তাঁর সঙ্গে আছেন।

‘পুরোহিত’ হতে হলে তাঁকে অনেক গুণের অধিকারী হতে হয়। বিশেষত, সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁকে ধর্মানুরাগী, প্রগতিশীল ও জনসাধারণের প্রতি মমত্বশীল থাকতে হয়। এছাড়াও আচরণগত দিক থেকে তাঁকে ধৈর্যশীল, সৎ, ন্যায়পরায়ণ, কথায় ও কাজে অভিন্ন, অর্থাৎ এককথায় তাঁকে শিষ্টাচারসম্পন্ন ও আদর্শবাদী ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হয়। কবি এখানে নিজেকে পুরোহিত বলেছেন। কারণ তিনি পুরোহিতের মতোই সর্বহারার কল্যাণে তাদের মুক্তির জন্য মুখ্য ভূমিকা পালন করবেন; এবং পুজোর সময় পুরোহিত যেমন সকলের অগ্রভাগে থাকেন, তিনিও তেমনি গণমুক্তির স্বার্থে অগ্রভাগেই আছেন। পুরোহিত তিনি, মুক্তিকামী মানুষকে মুক্তির মন্ত্র শোনাবেন।

কবি নিজেকে ‘অগ্নি’ বলেছেন। পুরাণে তথা ভারতে অগ্রগণ্য তিন দেবতার মধ্যে ‘অগ্নি’ একজন। ‘অগ্নি’কে ছাড়া কোনও যজ্ঞই হতে পারে না। তাই অগ্নি, পুরোহিত। অগ্নি নিজের রথে করে দেবতাদের যজ্ঞস্থলে নিয়ে যান। দেবকুলে যত দেবতা আছেন, অগ্নি তাঁদের প্রধান। মানবমুক্তির যে কর্মযজ্ঞে কবি নেমেছেন, সেখানে তিনিই অগ্রগামী, তিনিই প্রধান। তিনিই মন্ত্র উচ্চারণ করেন মুক্তির। সর্বাগ্রে।

৯. ‘আমি ইন্দ্রাণী-সুত হাতে-চাঁদ ভালে সূর্য’ [পঙ্ক্তি: ৪৮]

ইন্দ্রাণী, দেবরাজ ইন্দ্রের স্ত্রী। তাঁর সুত বা পুত্রের নাম জয়ন্ত। রামায়ণে, ইনি প্রবল পরাক্রমে রাক্ষসসেনাদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। কবিও লড়াকু। তিনি বিদ্রোহী। বিরোধীশক্তির বিরুদ্ধে তিনিও লড়ছেন তাই তিনি ‘ইন্দ্রাণী-সুত’।

১০. ‘আমি কৃষ্ণকণ্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া-ব্যথা বারিধির’! [পঙ্ক্তি: ৫০]

একদা সমুদ্র-মন্থনের ফলে, সমুদ্রগর্ভ থেকে বিষ উঠে আসে। সেই বিষের জ্বালায় পৃথিবী প্রায় ধ্বংস হওয়ার উপক্রম। ব্রহ্মার অনুরোধে শিব বা মহাদেব সেই বিষ শুষে নেন নিজের কণ্ঠে। বিষের জ্বালায় তাঁর কণ্ঠ বা গলা নীল হয়ে যায়। তাই তাঁকে বলা হয় ‘নীলকণ্ঠ’ বা ‘কৃষ্ণকণ্ঠ’। কবি এখানেও ব্যথার বারিধির বিষ কণ্ঠে ধারণ করে নীলকণ্ঠ হয়ে আছেন। তিনি মানবকল্যাণে, বিশ্বের সর্বহারা মানুষের মুক্তির জন্য, সমাজের গরল নিজে পান করেছেন।

১১. ‘আমি ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর’ [পঙ্ক্তি: ৫১]

‘ব্যোম’ অর্থাৎ আকাশ। ‘ব্যোমকেশ’ অর্থাৎ আকাশলোক পর্যন্ত ছড়ানো যার কেশ বা জটাজাল। ব্যোমকেশ, আসলে মহাদেব বা শিবের আরেক নাম। ভগীরথের চেষ্টায়, গঙ্গা যখন স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নেমে আসেন, শিব তখন গঙ্গার [জলের] তীব্র গতিবেগ-ধারাকে নিজের জটায় ধারণ করেছিলেন। ঐ সময় তাঁর জটাজাল আকাশলোকে ছড়িয়ে পড়ে। এখানেও কবি, ‘বন্ধন-হারা গঙ্গোত্রীর’ ধারাকে ধরে রাখেন।

১২. আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস’ [পঙ্ক্তি: ৫৬]

চেঙ্গিস খান ছিলেন মঙ্গোলিয়ার সম্রাট। তিনি দুর্ধর্ষ এক সমরনায়ক। যুবক চেঙ্গিসের স্ত্রীকে অন্য এক গোত্র-প্রধান অপহরণ করে নিয়ে যান। কাজেই তিনি নিজের গোত্রের মানুষদের পুনর্গঠিত করে অপহরণকারী গোত্রকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে নিজের স্ত্রীকে উদ্ধার করেন। এরপর তিনি অন্যান্য মঙ্গোলীয় গোত্রকে সংঘবদ্ধ করে ‘অর্ধেক পৃথিবী’ জয় করেন। কবিও চেঙ্গিস খানের মতো নিজেকে একজন সাহসী যোদ্ধা মনে করেন, যিনি সকলকে সংঘবদ্ধ ও একত্রীভূত করে একদিন বিশ্বজয় করবেন। এটাই কবির সংকল্প।

বেদুঈনরা আরবের এক যাযাবর গোষ্ঠীর মানুষ। কবিও অনেকটাই তেমনি যেন বন্ধনমুক্ত, যার কোনও পিছুটান নেই। মানুষের দুঃখ-দুর্দশা প্রতিহত করবার জন্যই যেন যাযাবরের মতো ছুটে বেড়াবেন বিশ্বময়।

১৩. ‘আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার’ [পঙ্ক্তি: ৫৮]

বজ্র, ইন্দ্রের অস্ত্র। বজ্র ধ্বংস করে। কবিও শোষকশ্রেণিকে ধ্বংস করতে চান। তাই তিনি ‘বজ্র’। শিবের আরেক নাম ঈশান। তিনি বিষাণ-বাদক। কবিও তাণ্ডব চান। যুদ্ধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। বেদ-এর সনাতন বীজমন্ত্র হচ্ছে ‘ওঙ্কার’। অউম-ওম্ [ব্রহ্মা বিষ্ণু-মহেশ্বর]। একে সকল মন্ত্রের এবং উপনিষদের স্বরূপ মনে করা হয়। কবির কণ্ঠেও ঐ মন্ত্রোচ্চারণ মঙ্গলধ্বনি।

১৪. ‘আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা-হুঙ্কার’ [পঙ্ক্তি: ৫৯]

ইসলাম ধর্মমতে যেদিন কেয়ামত বা মহাপ্রলয় শুরু হবে, তার পূর্বে ‘ইস্রাফিল’ নামের ফেরেস্তা ‘শিঙ্গার ’ধ্বনি করবেন। কবিও এখানে মহাহুঙ্কারে শোষণের বিরুদ্ধে, বিশ্বের সর্বহারা মানুষের মুক্তির সংগ্রামে ইস্রাফিলের মতো শিঙ্গা বাজাবেন।

১৫. আমি পিনাক-পাণির ডমরু, ত্রিশূল, ধর্মরাজের দণ্ড’ [পঙ্ক্তি: ৬০]

পিনাক-পাণি শিবের আরেক নাম [পিনাক হাতে যার]। পিনাক নামের ধনুক তিনি যুদ্ধে ব্যবহার করতেন। যখন যুদ্ধ থাকতো না, তখন তা হয়ে উঠতো বাদ্যযন্ত্র। কবি ঠিক এভাবেই শিবের ডমরু এবং ত্রিশূল হতে চান। ডমরু বাজিয়ে জনগণকে সমবেত করা যায়। শিবের অস্ত্র ত্রিশূলও সংগ্রামক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। কবি ‘ধর্মরাজের দণ্ড’ একথা সোচ্চারে প্রচার করেছেন। মূলত যমের অন্য নাম ধর্মরাজ। তিনি নরকের অধীশ্বর দেবতা; এবং দেবতাদের মধ্যে তিনিই একমাত্র সার্বিক পুণ্যবান ব্যক্তিত্ব। তাঁর ‘দণ্ড’ দিয়ে তিনি জীবের প্রাণ সংহার করেন। কবিও এইরূপ ‘দণ্ড’ হতে চান। যা দিয়ে শোষক শ্রেণিকে ধ্বংস করা যাবে।

১৬. ‘আমি চক্র মহাশঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ প্রচণ্ড’ [পঙ্ক্তি: ৬১]

‘প্রণব’ মানে ওঙ্কার। এর উচ্চারণ করে স্তব করা হয়। কবি প্রচণ্ড ধ্বনিময় ওঙ্কার হতে চান। অনেকটা স্লোগানের মতো।

১৭. ‘আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাসা-বিশ্বামিত্র-শিষ্য [পঙ্ক্তি: ৬২]

কবি দুর্বাসা ঋষিকে ক্ষ্যাপা বলেছেন। তিনি নিজেও তেমনি। দুর্বাসা মুনি এমনি ক্ষ্যাপা যে তিনি তাঁর স্ত্রীকে কথা দিয়েছিলেন যে, তাঁর শত ত্রুটি তিনি ক্ষমা করে দেবেন। এবং ১০১তম বারে তিনি শাপ দিয়ে সব ভস্ম করে দিয়েছিলেন। তাঁর শাপে দেবরাজ ইন্দ্র শ্রীভ্রষ্ট হন; শকুন্তলা দুষ্মন্ত কর্তৃক পরিত্যক্ত হন। পান থেকে চুন খসলে আর রেহাই নেই অভিশাপ দিয়ে অস্থির করে তুলবেন। কবিও শোষকদের ঐভাবেই অভিশাপ দিয়ে অস্থিরতায় বেঁধে ফেলতে চান।

বিশ্বামিত্র ছিলেন ব্রহ্মর্ষি। তিনি ক্ষত্রিয়ের সন্তান হয়েও তপস্যা করে ব্রাহ্মণ হয়েছিলেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ তাঁর অধ্যবসায়। বিশ্বামিত্রের জীবনের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, বশিষ্ঠ মুনির সঙ্গে তাঁর বিরোধ। কবি নিজেকে ‘বিশ্বামিত্র-শিষ্য’ বলে প্রতিপন্ন করতে চান।

১৮. ‘আমি মহা-প্রলয়ের দ্বাদশ রবির রাহু গ্রাস’! [পঙ্ক্তি: ৬৫]

কশ্যপের ঔরসে ও অদিতির গর্ভে দ্বাদশ আদিত্যের জন্ম। কুর্মপুরাণ মতে, বারোমাসে বারো আদিত্য বা রবি। মতান্তরে বলা হয় যে, সূর্যপত্নী সংজ্ঞা, সূর্যের তাপ সহ্য করতে না পারলে, তাঁর পিতা বিশ্বকর্মা সূর্যকে দ্বাদশ খণ্ডে বিভক্ত করেন। কবি নিজেকে এই দ্বাদশ রবির মহাপ্রলয় মনে করেন। এই রবি বা সূর্যের সঙ্গে রাহুর চিরশত্রুতা। কবি সেই ‘রাহু-গ্রাস’ হতে চান। রাহু একজন দানব। তিনি দেবতা সেজে কৃষ্ণের দেওয়া সুধা পান করতে গিয়ে চন্দ্র ও সূর্যের কারণে ধরা পড়ে যান। ক্রুদ্ধ হয়ে বিষ্ণু তাঁর সুদর্শনচক্র দিয়ে রাহুর মাথা কেটে ফেললেও, স্বর্গসুধা পান করার কারণে ইতোমধ্যে তাঁর অমরত্ব পাওয়া হয়ে গেছে। সেই থেকেই ‘মাথা’র নাম রাহু, আর ‘দেহের’ নাম কেতু। রাহু, পুরোনো শত্রুতা থেকে, সুযোগ পেলেই চন্দ্র ও সূর্যকে গিলে ফেলে ‘গ্রহণ’ ঘটায় [সূর্যগ্রহণ চন্দ্রগ্রহণ]। কবিও এইভাবে অশুভ শক্তিকে গিলে ফেলতে চান; তা সে চন্দ্র এবং সূর্যের মতো প্রতাপশালী হলেও।

১৯. ‘আমি বিশ্ব-তোরণে বৈজয়ন্তী, মানব বিজয় কেতন’ [পঙ্ক্তি: ৯০]

‘বৈজয়ন্তী’ মূলত স্বর্গের রাজধানীর নাম; হিন্দু পুরাণে এভাবেই তা পরিচিত। এখানে অবশ্য ‘বৈজয়ন্তী’কে পতাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কবি মনে করেন, মানুষ একদিন জিতবেই। তাই তিনি নিজেই ‘বিশ্বতোরণের বিজয় পতাকা’।

২০. ‘তাজি বোররাক্ আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার…।’ [পঙ্ক্তি: ৯৩]

আরবে ও পারস্যে ‘তাজী’ শব্দের অর্থ অশ্ব। ফারসী ‘তাজী’ শব্দ থেকে এর উৎপত্তি। ‘তাজী’ মানে বেগবান তেজীয়ান ঘোড়া। ‘বোররাক্’ শব্দের অর্থ ‘পক্ষবিশিষ্ট স্বর্গীয় অশ্ব’। ইসলামি শাস্ত্র অনুযায়ী বেহেস্তের পক্ষীরাজ ঘোড়া―যার মুখ নারীর মতো আর শরীরের বাকি অংশ ঘোড়ার মতো আকৃতিবিশিষ্ট।

হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী ‘উচ্চৈঃশ্রবা’র অর্থ সাদা রঙের ঘোড়া। এটি দেবরাজ ইন্দ্রের বাহন, অশ্বকুল শ্রেষ্ঠ। কবি বিদ্রোহী, তাঁর শক্তি অফুরন্ত। তাঁর সঙ্গে বাহনরূপে আছে মুসলিম ও হিন্দু পুরাণের দুই পবিত্র তেজী ও বলবান ঘোড়া। সমরক্ষেত্রে তাই তিনি টগবগে ও প্রাণচঞ্চল। একই পঙ্ক্তির মধ্যে মুসলিম ও হিন্দু পুরাণের মিলিত ব্যবহারের মধ্য দিয়ে কবির সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

২১. ‘ধরি বাসুকির ফণা জাপটি’ [পঙ্ক্তি: ৯৯]

‘বাসুকি’র বাবা মহর্ষি কশ্যপ, মা কাহ্ন। সর্পরাজ বাসুকি, অনন্তনাগ নামেও পরিচিত। হিন্দু-পুরাণের কাহিনি অনুসারে, সমুদ্র-মন্থন কালে নাগরাজ বাসুকি মন্থনের তীব্র পীড়াদায়ক রজ্জুরূপে ব্যবহৃত হয়েছিলেন। মন্থনকালে অমৃতের সঙ্গে বেরিয়ে আসে বাসুকির কণ্ঠনিসৃত যে তীব্র হলাহল; অমৃত বণ্টন কালে, মহাদেব তা কণ্ঠে ধারণ করে পরিচিত হলেন ‘নীলকণ্ঠ’ নামে।

বাসুকির বসবাস পাতালে। তিনি পাতালে বসেই পৃথিবীকে স্থিরভাবে ধারণ করে আছেন। এটা পুরাণ বা মিথভিত্তিক কাহিনি।

কবি সেই বাসুকির ফণা জাপটে ধরেছেন। তিনি অকুতোভয়। সাপের ছোবল বা বিষে তাঁর কোনও ভয় নেই।

২২. ‘ধরি স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি’ [পঙ্ক্তি: ১০০]

ইসলামি শাস্ত্র অনুসারে ‘জিব্রাইল’ ঈশ্বর প্রেরিত দূত। এই জিব্রাইলের কাছ থেকেই হযরত মুহম্মদ ধর্মবাণী শ্রবণ করতেন। কবি এই দেবদূতের আগুনের পাখা সাপটে ধরে থাকেন। এখানে তাঁর নির্ভরতা অন্তহীন।

২৩. ‘আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী’; [পঙ্ক্তি: ১০৩]

‘অর্ফিয়াস’ গ্রিক-রূপকথার এক বিখ্যাত বীর এবং কবি। ‘অর্ফিয়াস’ বা অর্ফিউসের বাঁশির সুরে জীবজগৎ এবং প্রকৃতি মুগ্ধ হতো। সর্পদংশনে তাঁর স্ত্রী ইউরিডাইসের মৃত্যু হলে তিনি পাতালে চলে যান এবং বাঁশি বাজিয়ে যমরাজকে মুগ্ধ করেন। কবি এরপরে নিজেকে ‘শ্যামের হাতের বাঁশরী’ বলেছেন, তাঁর বাঁশির তানে গোটা বিশ্ব মোহিত। কবি এখানে অর্ফিয়াসকে হ্যামিলিয়নের বাঁশিওয়ালার পুনরুজ্জীবনের সঙ্গে প্রতিতুল্য ভাবেন। হিন্দুপুরাণে কৃষ্ণ বা শ্যামের বাঁশরীও রাধাকে মুগ্ধ করেছে। এখানেও সুরের মাদকতার কথা বলেছেন কবি।

২৪. ‘ভয়ে সপ্ত নরক, হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া’ [পঙ্ক্তি: ১০৯]

আস্তিক মানুষের শাস্ত্রীয় বিশ্বাস, মৃত্যুর পরে পাপের পরিমাণ অনুযায়ী মানুষকে নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। ভাগবত পুরাণে বর্ণিত আছে, পৃথিবীর দক্ষিণ ভূমির নিচে এবং জলের উপরে স্বয়ং যম, মৃতলোকদের এনে, কর্মানুসারে দোষ-গুণের বিচার করেন। পাপের ওজন বিচার করে কাউকে স্বর্গে, কাউকে নরকভোগে পাঠানো হয়। মোট নরক সংখ্যা ২৮; তার মধ্যে ৭টি নরক ভয়ংকর। ইসলামি শাস্ত্র অনুযায়ী, ‘হাবিয়া দোজখ’ও সপ্তম এবং ভয়াবহ নরক। কবি এখানে নিজেকে যমের চেয়েও ভয়ংকর মনে করেন। নরকের ভীষণতম আগুনও, কবির ভয়ে নিভে যায়। অপরিমেয় তাঁর শক্তি।

২৫. ‘আমি ছিনিয়া আনিব বিষ্ণু-বক্ষ হইতে যুগলকন্যা!’ [পঙ্ক্তি: ১১৩]

ভারতীয় মিথ অনুযায়ী ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বর―শ্রেষ্ঠ এই তিন দেবতার মধ্যে বিষ্ণুই শ্রেষ্ঠতম। তিনি গোলোকাধিপতি নারায়ণ। তিনি সর্বমানবের কল্যাণের জন্য যুগে যুগে অবতাররূপে মর্ত্যে জন্ম নেন। সেই অপার ক্ষমতাশালী বিষ্ণুর বক্ষ থেকে কবি যুগলকন্যাকে অর্থাৎ বিষ্ণুর দুই পত্নী লক্ষ্মী বা কমলা এবং সরস্বতী বা বীণাপাণিকে ছিনিয়ে নেবেন।

২৬. ‘আমি অন্যায়, আমি উল্কা, আমি শনি’ [পঙ্ক্তি: ১১৪]:

কবি এখানে নিজেকে ধ্বংসের প্রতীকরূপে চিহ্নিত করেছেন। তিনি উল্কার মতো দুর্দম। নিজেকে তিনি ‘শনি’ বলেছেন। পুরাণ মতে, শনির পিতা হলেন সূর্য এবং মাতার নাম ছায়া। ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী, শনি নবগ্রহের অন্যতম গ্রহ, তাঁর পত্নী চিত্ররথ-দুহিতা। তাঁর অভিশাপ প্রাপ্তির কারণে, শনি যার প্রতি দৃষ্টি দেবেন, সে-ই ধ্বংস হয়ে যাবে। কবি এখানে শনি হয়ে দৃষ্টি দেবেন। জনবিরোধী শোষকেরা শনির দৃষ্টিপাতে ধ্বংস হয়ে যাবে।

২৭. ‘আমি ছিন্নমস্তা চণ্ডী, আমি রণদা সর্বনাশী’ [পঙ্ক্তি: ১১৬]

হিন্দু পুরাণ বা মিথ অনুযায়ী, দশ মহাবিদ্যার অন্যতমা ইনিই প্রচণ্ড চণ্ডিকা নামে খ্যাত। ইনি প্রসন্ন হলে উপাসকগণের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়। ইনি বাম হস্তে নিজের ছিন্ন মস্তক ধারণ করে লোলজিহ্বা দ্বারা স্বীয় কণ্ঠনিসৃত রক্তধারা পান করেন। তিনি মুণ্ডমালা বিভূষিতা; তাঁর বাম ও দক্ষিণ হস্তে নরকপাল ও কর্তরী; গলায় নাগযজ্ঞোপবীত।

কবি এখানে নিজেকে চণ্ডীর মতো রক্তলোলুপ ‘সর্বনাশী’ বলেছেন। তিনি চান মানুষের মুক্তি ও কল্যাণ। তাই তাঁর এই সর্বশেষ অস্ত্র। অসুর বধের সময় দুর্গার এই ভীষণ রূপ লক্ষিত হয়েছিল।

২৮. ‘আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!’ [পঙ্ক্তি: ১১৭]

আরবি শব্দ ‘জাহান্নাম’―অর্থ দোজখ বা নরক। নরকাগ্নিতে প্রচণ্ড জ্বালায় ঝলসে যায় শরীর। কিন্তু কবি ঐ আগুনকে ভয় পান না। তিনি তাই জাহান্নামের আগুনে বসেও ফুলের মতো প্রফুল্লচিত্তে হাসবেন। এখানে, মানবকল্যাণে কবির কষ্ট সহ্য করার শক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

২৯. ‘জগদীশ্বর-ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য’ [পঙ্ক্তি: ১২২]

জগতের রক্ষক ও পালক দেবতা হচ্ছেন ‘জগদীশ্বর-ঈশ্বর’। হিন্দু পুরাণ মতে, তিনি অসংখ্য জগৎ সৃষ্টি করেছেন। ‘পুরুষোত্তম’ অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ পুরুষ, ঈশ্বরেরও ঈশ্বর, বিষ্ণু, নারায়ণ। কবি এখানে নিজেকে পুরুষশ্রেষ্ঠ, ‘জগদীশ্বর-ঈশ্বর’ রূপে নিজেকে প্রকাশ করেন।

৩০. ‘আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার’ [পঙ্ক্তি: ১৩১]

‘নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার’ [পঙ্ক্তি: ১৩২]

পুরাণে বর্ণিত বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরাম, জমদগ্নি ও রেণুকার পঞ্চম পুত্র। ভৃগু বংশজাত বলে তিনি ভার্গব নামেও পরিচিত। কুঠার ছিল তাঁর প্রধান অস্ত্র। ক্ষত্রিয়দের হাতে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে, পৃথিবী থেকে ক্ষত্রিয়দের নিশ্চিহ্ন [নিঃক্ষত্রিয়] করে দেওয়ার সংকল্প গ্রহণ করেন এবং পরপর একুশবার পৃথিবীকে নিঃক্ষত্রিয় করে তবে শান্ত হন।

তেমনি, এখানেও কবি ক্ষত্রিয়-রাজত্বের অবসান ঘটিয়ে, সর্বহারার রাজত্ব কায়েম করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চান। তাই তিনি চান ‘পরশুরামের কঠোর কুঠার’ হয়ে ধ্বংসের মাধ্যমে অসম-সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে।

৩১. ‘আমি হল বলরাম-স্কন্ধে’ [পঙ্ক্তি: ১৩৩]

‘আমি উপাড়ি’ ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব-সৃষ্টির মহানন্দে। [পঙ্ক্তি: ১৩৪]

হিন্দু পুরাণ বা মিথ অনুযায়ী বলরাম বিষ্ণুর সপ্তম অবতার। তিনি কৃষ্ণের বৈমাত্রেয় জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। বাসুদেবের ঔরসে ও রোহিণীর গর্ভে তাঁর জন্ম। তাঁর প্রধান অস্ত্র ‘হল’ বা লাঙ্গল। এই ‘হল’ সবসময় তাঁর কাঁধে থাকে বলে তাঁকে ‘হলধর’ বা ‘হলধারীও বলা হয়। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় তিনি নিরপেক্ষ থাকলেও কংস-হত্যায় তিনি কৃষ্ণকে সাহায্য করেছিলেন।

কবি বলরামের ‘হল’ বা লাঙ্গল হয়ে, বিশ্বের অবহেলিতদের স্বার্থে, সব উপড়ে ফেলে, নতুন সমাজ কাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে ‘মহানন্দে’ থাকার বাসনা প্রকাশ করেছেন।

৩২. ‘আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন’ [পঙ্ক্তি: ১৪১]

ভার্গব বংশের প্রতিষ্ঠাতা মহর্ষি ভৃগু প্রাচীন প্রজাপতি ও সপ্তর্ষিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তিনি ধনুর্বিদ্যার প্রবর্তক।

যজ্ঞাগ্নিজাত ভৃগু, ব্রহ্মার মানসপুত্র বলে বিষ্ণুপুরাণে উল্লেখ আছে। ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর এঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম কে, তা মীমাংসার দায়িত্ব দেয়া হয় ভৃগুকে। ভৃগু স্বর্গে গিয়ে ব্রহ্মা কিংবা মহেশ্বরকে কোনও সম্মান প্রদর্শন না করায় তাঁরা ভৃগুর প্রতি ক্রুদ্ধ হন। এরপর গোলোকে গিয়ে নিদ্রিত বিষ্ণুবক্ষে পদাঘাত করার পরেও বিষ্ণু ব্যথিত না হয়ে, বরং ভৃগুর পায়ে ব্যথা লেগেছে ভেবে তাঁর পদসেবা করেন। বিষ্ণুর বিনীত আচরণে ভৃগু সন্তুষ্ট হন এবং তাঁকেই সর্বশ্রেষ্ঠ ও পূজ্য দেবতারূপে বরণ করেন। সেই থেকে ‘ভৃগু-পদচিহ্ন’ বিষ্ণুবক্ষে চিহ্নিত হয়ে আছে।

পৃথিবীতে যারা নিজেকে বড় বলে মনে করে, কবি ভৃগুর মতোই তাঁদের প্রতি আঘাত করে, ভারসাম্য রক্ষা করতে চান।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় মিথ বা পুরাণের ব্যবহার পর্যালোচনাসূত্রে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা হলো, পুরাণের যেসব চরিত্রে ও কাহিনিতে তিনি প্রতিবাদ লক্ষ্য করেছেন, তাঁদেরকেই তিনি নিজের মধ্যে সঞ্চারিত ও পুনরুজ্জীবিত করে নিজেকে এক মহাশক্তিধর রূপে প্রকাশ করতে চেয়েছেন ‘বিদ্রোহী-বীর’ নামের পরিচয়-আধারে।

কোনও এককালে, স্থানীয় ভূমিপুত্র তথা অসুরদের বাস্তুচ্যুত ও হত্যা করার জন্য স্বর্গের দেবতারা যেমন দেবী দুর্গার দশহস্তে যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছিলেন―‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি কাজী নজরুল ইসলামও তেমনি নিজেকে তৈরি করেছেন পুরাণ বা মিথ থেকে এবং ইতিহাস থেকে বীরত্বব্যঞ্জক উপমায় তিল তিল করে, প্রতিবাদীশক্তির সমাহারে নিজেকে সাজিয়ে। কেউ তাঁকে দাক্ষিণ্য দেয়নি। তিনি ‘একমেবদ্বিতীয়ম্’।

সর্বহারা মানুষের মুক্তির জন্য, নিজেকে বিশ্বের সেরা শক্তিতে রূপান্তর-মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করে তিনি একাই যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তিনি আশাবাদী; একদিন বিশ্বের জগদ্দল পাথর সরিয়ে, নতুন সমাজ তিনি গড়ে তুলবেন। তিনি শান্তি দেখতে চান, শান্ত হতে চান। তবে তিনি সেইদিনই শান্ত হবেন, ‘যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না’। অন্যথায় শোষকশ্রেণির বিরুদ্ধে তাঁর অনিবার্য-সংগ্রাম চলতেই থাকবে।

‘বিদ্রোহী’ কবিতায় মিথ বা পুরাণাশ্রিত চরিত্র এবং অনুষঙ্গ-শব্দকে তিনি শক্তি সঞ্চয়ের অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেছেন, ব্যবহার করেছেন। তাঁর, পৌরাণিক চরিত্র ও শব্দ প্রয়োগের সার্থকতা এখানেই।

৪.

প্রাসঙ্গিকতা

একশো বছর পেরিয়ে গিয়েও, ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটির প্রাসঙ্গিকতা এখনও সমানভাবে রয়েছে অটুট।

স্বাধীনতাকামী মানুষের মধ্যে, বিশেষত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেশাত্মবোধ জাগরণে, জনমত সৃজনে এবং জরাজীর্ণ গলিত সমাজদেহের শৃঙ্খলকে মুক্ত করার উদগ্র বাঞ্ছায়, এই কবিতাটিই একদিন সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। দ্রোহ ও প্রতিবাদ-প্রতিরোধের আহ্বান শোনা যায় এর প্রতিটি পঙ্ক্তিতে। কবিতায় ব্যবহৃত দেশীয়, হিন্দু ও ইসলামি ঐতিহ্য মিশ্রিত এবং ইউরোপীয় মিথসমূহের মধ্য দিয়ে কবির সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন ভাবনাই স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে; ব্রিটিশ শাসনের হাত থেকে দেশ ভৌগোলিকভাবে স্বাধীন হয়েছে ঔপনিবেশিক শোষণ ও বঞ্চনার নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়েছে দেশের মানুষ। তবে শোষণ শেষ হয়নি এখনও। বঞ্চনা রয়েছে এখনও অব্যাহত। এখনও গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের নিরন্ন মানুষের বঞ্চিত জীবনের হাহাকার কমেনি এতটুকুও।

কবি শ্রেণিহীন সমাজের, বিশেষত সাম্যবাদী সমাজের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, আজও সেই লক্ষ্যাভিমুখী আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যায়নি। তাই প্রতিবাদ-প্রতিরোধের আন্দোলনে এই কবিতা এখনও রক্তের গভীরে এবং মগ্ন চৈতন্যের সত্তায় আগুন ধরায়। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার অন্তদর্শনে যেমন রয়েছে মানবমুক্তির তথা সমাজমুক্তির কথা; তেমনি মিথাশ্রিত প্রতীকী সমবেত শক্তি এখনও স্বপ্ন দেখায় তরুণ সমাজকে; এখনও আন্দোলনে-জাগরণে উদ্বুদ্ধ করে, চেতনায় আলোড়ন তোলে, ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়া’য় প্রাণে এ-কবিতা।

তাই ‘বিদ্রোহী’ কবিতা আজও, বঞ্চিত মানুষের কাছে শোষণমুক্তির এক অপরিহার্য হাতিয়ার; জাগরণের এক প্রতীকী মহার্ঘ্য ধারাভাষ্য।

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button