আর্কাইভবিশেষ রচনা

বিশেষ রচনা : নজরুল : শতবর্ষে নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ : শাহীনুর রেজা

এ সময় থেকে ২৫ বছর আগে নজরুল জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে গোটা বাংলাদেশে যেভাবে নজরুলের জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন হয়, তা দেখে একজন নজরুল অনুরাগী হিসেবে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলাম। এরপর ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ৯০ বছর পূর্তি, ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শতবর্ষ, অগ্নি-বীণার শতবর্ষ, ধূমকেতুর শতবর্ষ পালন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালিত হয়েছে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শতবর্ষ নিয়ে আয়োজন ছিল চোখে পড়ার মতো। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থের শতবর্ষের আয়োজন ।

পৌষ ১৩৩২ বঙ্গাব্দ, ২৩ ডিসেম্বর, ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে সাম্যবাদী প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। প্রকাশক মৌলভী শামসুদ্দীন হুসেন, বেঙ্গল পাবলিশিং হোম, ৫ নূর মহম্মদ লেন, কলিকাতা। ১৫ নং নয়ান চাঁদ (দত্ত) স্ট্রিট, কলিকাতা, মেটকাফ প্রেসে শ্রী মণিভূষণ মুখার্জী কর্তৃক মুদ্রিত। পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৭, মূল্য দুই আনা ।

এর আগে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্ত ‘লেবর স্বরাজ পার্টি’র মুখপত্ররূপে প্রকাশিত সাপ্তাহিক লাঙল পত্রিকার প্রথম খণ্ড বিশেষ সংখ্যায় ‘সাম্যবাদী’ প্রকাশিত হয়। ১৬ পৃষ্ঠার লাঙল-এ ৫ম থেকে ১০ম পৃষ্ঠা পর্যন্ত ‘সাম্যবাদী’র ১১টি গুচ্ছকবিতা―‘সাম্যবাদী’, ‘ঈশ্বর’, ‘মানুষ’, ‘পাপ’, ‘চোর-ডাকাত’, ‘বারাঙ্গনা’, ‘মিথ্যাবাদী’, ‘নারী’, ‘রাজা-প্রজা’, ‘সাম্য’ ও ‘কুলি-মজুর’ ছাপা হয়। বাংলা সাহিত্যের কোনও কবির কোনও কবিতা কোনও পত্রিকায় এত গুরুত্বের সাথে আগে কখনও ছাপা হয়েছে কি না সন্দেহ।

আমরা গুচ্ছ কবিতা বললেও নজরুলের রাজনৈতিক বন্ধু মুজফ্ফর আহ্মদ ‘সাম্যবাদী’কে নানা উপশিরোনামে বিভক্ত একটি বিরাট কবিতা বলে দাবি ক’রে লিখেছেন―লাঙলর প্রথম সংখ্যায় নজরুলের বিখ্যাত কবিতা ‘সাম্যবাদী’ প্রকাশিত হয়েছিল। নানা উপশিরোনামে বিভক্ত এটি একটি বিরাট কবিতা। ‘ঈশ্বর’, ‘মানুষ’, ‘পাপ’, ‘বারাঙ্গনা’, ‘নারী’ ও ‘কুলি-মজুর’ এই কবিতার উপশিরোনাম (সব্-হেডিং) মাত্র। অনেকে ভুল ক’রে এই সব্-হেডিংগুলোকে আলাদা আলাদা কবিতা মনে করেন।

লাঙল দ্বিতীয় সংখ্যার ১১ পৃষ্ঠায় খড়কুটোতে পত্রিকার সার্কুলেশন সংক্রান্ত একটা খবরে পাওয়া যায়―গতবার আমরা ৫ হাজার লাঙল ছেপেছিলাম―কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সমস্ত কাগজ ফুরিয়ে যাওয়াতে কলিকাতায় অনেকে কাগজ পাননি এবং মফস্সলে একেবারেই কাগজ পাঠানো হয়নি। ঐ সংখ্যার প্রধান সম্পদ কাজী নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ গ্রাহকগণের আগ্রহাতিশয্যে পুস্তিকা আকারে বের করা হলো, দাম রাখা হয়েছে মাত্র দু’আনা।

কার্তিক, ১৩২৯ বঙ্গাব্দ অক্টোবর, ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে প্রথম কাব্যগ্রন্থ অগ্নি-বীণায় বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশের পর নজরুল জনমানসে ‘বিদ্রোহী-কবি’ হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন, ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে ‘সাম্যবাদী’ প্রকাশের পর তিনি ‘সাম্যের কবি’ হিসেবে পরিচিত হন।

১১টি গুচ্ছকবিতার প্রথম ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় কী আছে ? তা জানার জন্য আমরা লাইন বাই লাইন কবিতাটি ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করছি :

গাহি সাম্যের গান

যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান

যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান।

কবি নিজেই সাম্যের গান, সমতার গান গাইছেন। যে গানে সকল বাধা-ব্যবধান এক হয়ে গেছে। কবি সেই সমতার গান গাইছেন; যেখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, ক্রিশ্চান একখানে মিশে গেছে।

গাহি সাম্যের গান―

কে তুমি? পার্সী? জৈন? ইহুদী? সাঁওতাল, ভীল, গারো?

কনফুসিয়াস্? চার্বাক-চেলা? বলে যাও, বল আরো।

বন্ধু, যা-খুশি হও,

কবি নিজেই সাম্যের গান গাইছেন। কবি প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন, তুমি কে ?―পার্সী ? জৈন ? ইহুদী ? সাঁওতাল ? ভীল বা গারো ? নাকি তুমি কনফুসিয়াস্ ? নাকি চার্বাকপন্থী নাস্তিক ? বলে যাও, আরও কিছু থাকলে তা-ও বলতে পারো, যা খুশি হও বলতে পারো :

পেটে-পিঠে, কাঁধে-মগজে যা খুশি পুঁথি ও কেতাব বও

কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক―

জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থ-সাহেব পড়ে যাও যত শখ,

কিন্তু কেন এ পণ্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল?

দোকানে কেন এ দরকষাকষি? পথে ফোটে তাজা ফুল।

কবি বলছেন, পেটে পিঠে কাঁধে মগজে তুমি যা-খুশি পুঁথি ও কেতাব বহন কর অথবা সব ধর্ম, যেমন―কোরান পুরান বেদ বাইবেল ত্রিপিটক যত শখ হয় পড়ে যাও। কিন্তু এসব কিছু মিথ্যা পণ্ডশ্রম। এসব পড়া মানে মগজে শূল হানা। পথের ধারে, বাগানে তাজা ফোটা ফুল থাকতে দোকানে গিয়ে বাসী ফুলের জন্য দর কষাকষি করা মিথ্যা বোকামি ছাড়া আর কিছু না :

তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,

সকল শাস্ত্র খুঁজে পাবে সখা, খুলে দেখ নিজ প্রাণ!

তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার,

তোমার হৃদয় বিশ্ব-দেউল সকল দেবতার,

কেন খুঁজে ফের দেবতা-ঠাকুর মৃত-পুঁথি-কঙ্কালে?

হাসিছেন তিনি অমৃত হিয়ার নিভৃত অন্তরালে।

কারণ, মানুষের মধ্যেই আছে সকল ধর্মগ্রন্থ, সর্বকালের সকল জ্ঞানভাণ্ডার। তুমি খুলে দেখো তোমার প্রাণের মধ্যেই আছে সকল শাস্ত্রের সারকথা। তোমার মধ্যেই আছে সব ধর্ম, সকল যুগের অবতার। শুধু তাই নয়, তোমার হৃদয়-মন্দিরই সকল দেবতার পবিত্র বাসভূমি। তাহলে মৃত ধর্মগ্রন্থের কঙ্কালের মধ্যে কেন দেবতাকে খুঁজে ফেরো। এটা মূর্খামি ছাড়া আর কিছুই না। দেবতাকে ধর্মগ্রন্থে খুঁজতে গেলে স্বয়ং দেবতাই মানুষের হৃদয়ের অন্তরাল থেকে মুচকি হাসেন।

বন্ধু, বলিনি ঝুট,

এইখানে এসে লুটাইয়া পড়ে সকল রাজমুকুট।

এই হৃদয়ই সে নীলাচল, কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন,

বুদ্ধÑগয়া এ, জেরুজালেম এ, মদিনা, কাবা-ভবন,

মস্জিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয়,

এইখানে বসে ঈসা মুসা পেল সত্যের পরিচয়।

কবি বলছেন, বন্ধু আমি মিথ্যা বলিনি, এইখানে এই হৃদয়ের কাছে এসেই সকল রাজমুকুট লুটিয়ে পড়ে। এই হৃদয়ই পরম তীর্থ নীলাচল, ঈশ্বরের লীলাভূমি কাশি, মথুরা, বৃন্দাবন। এই হৃদয়ই গৌতম বুদ্ধের বুদ্ধ গয়া। এই হৃদয়ই জেরুজালেম, মদিনা, কাবা শরিফ। এই হৃদয়ই মস্জিদ, মন্দির, গির্জা। আর এখানে এই হৃদয়ের আঙ্গিনায় বসেই ঈসা-মুসা সত্যের সন্ধান পেয়েছেন।

এই রণ-ভূমে বাঁশির কিশোর গাহিলেন মহা-গীতা,

এই মাঠে হ’ল মেষের রাখাল নবীরা খোদার মিতা।

এই হৃদয়ের রণভূমিতেই বংশীধারী শ্রীকৃষ্ণ মহা-গীতার মন্ত্রবাণী উচ্চারণ করেছিলেন। এই হৃদয় প্রান্তরেই মেষের রাখাল নবী করিম (স.) আল্লাহ তাআলার বন্ধুত্ব লাভ করেছিলেন।

এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা মাঝে বসিয়া শাক্যমুনি

 ত্যজিল রাজ্য মানবের মহা-বেদনার ডাক শুনি।

শাক্যবংশে যার জন্ম সেই শাক্যমুনি অর্থাৎ বুদ্ধদেব এই হৃদয়ের ধ্যান গুহাতে বসেই মানুষের বেদনা-মুক্তির জন্য রাজ্য ত্যাগ করেছিলেন :

এই কন্দরে আরব-দুলাল শুনিতেন আহ্বান,

এইখানে বসি’ গাহিলেন তিনি কোরানের সাম-গান।

এই হৃদয়-কন্দরে বসেই আরব দুলাল অর্থাৎ নবী করিম (স.) আল্লাহর ডাক শুনেছেন এবং এখানে বসেই তিনি মহাগ্রন্থ কোরানের সাম-গান গেয়েছেন :

মিথ্যা শুনিনি ভাই,

এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির কাবা নাই।

 কবি দৃঢ়ভাবে বলেছেন, তিনি মিথ্যা শোনেননি, সত্যই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনও মন্দির বা কাবা কোথাও নেই।

সাম্যবাদী নজরুল ইসলামের সপ্তম কাব্যগ্রন্থ। প্রথম অগ্নি-বীণা-এর পরে দোলন-চাঁপা, বিশের বাঁশি, ভাঙার গান, চিত্তনামা এবং ছায়ানট-এর পরে সাম্যবাদী। ‘সাম্যবাদী’র বিষয়-বক্তব্যের স্পিরিট যে তাঁর পূর্বের গ্রন্থের থেকে ধীর-স্থির―তা নজরুল অনুধাবন করেছিলেন। এটা বোঝা যায় ‘সাম্যবাদী’ পুস্তুকাকারে প্রকাশিত হবার দু মাস পরে ১ মার্চ ২০২৬ তারিখে নজরুল ইসলাম কৃষ্ণনগর থেকে জনৈক আন্ওয়ার হোসেনকে লিখিত একটি পত্রে :

‘আমার লেখার পূর্বে তেজ ইত্যাদির কথা,―আপনি কি আমার বর্তমান লেখাগুলো পড়েছেন ? আমি জানি না―লেখা প্রাণহীন হচ্ছে কিনা! হলেও আমি দুঃখিত নই। আমি যার হাতের বাঁশি, সে যদি আমায় না বাজায় তাতে আমার অভিযোগ করবার কিছুই নেই। কিন্তু আমি মনে করি―সত্য আমায় তেমন করেই বাজাচ্ছে, তার হাতের বাঁশি করে। আমার লেখার উদ্দামতা হয়তো কমে আসছে।―তার কারণ আমার সুরের পরিবর্তন হয়েছে। আপনি কি আমার ‘সাম্যবাদী’ পড়েছেন ? তাহলে বুঝবেন সব কথা।’

বাংলা ভাষা-ভাষী পাঠককুল ১৯২৫ সালে নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ কবিতা পাঠ করে যেমন একটি সাম্য-মৈত্রী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, শতবর্ষ পরে ২০২৫ সালেও তা পূরণ হয়নি। তাই আমরা আগামী শতক ২১২৫ সাল পর্যন্ত টার্গেট করে এ কবিতা পাঠ করে যাব। পাঠ করে যাব―যতদিন না আমাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়, সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button