একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি : হেলাল হাফিজ : হেলাল হাফিজ : সচকিত উচ্চারণের কবি : আহমেদ মাওলা

সময়ের দুর্বার স্রোত হেলাল হাফিজকে (১৯৪৮-২০২৪) যেন টান মেরে নামিয়ে এনেছিল কবিতার মাঠে। ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনের উত্তপ্ত মাঠই হেলাল হাফিজকে দুরন্ত সাহস জুগিয়েছিল। তখন তাঁর বয়স ছিল ২০ বছর, দু চোখ জুড়ে তারুণ্যের টগবগে স্বপ্ন। আইয়ুব খানের সামরিক বন্দুকের দীর্ঘ ছায়ার নিচে দমবন্ধ জীবন। রুদ্ররোষে ফুঁসে উঠেছিল পুরো ঢাকা শহর। ছাত্রদের ১১ দফা, শেখ মুজিবের ৬ দফার আন্দোলনে মিছিলে-সেøাগানে উত্তপ্ত আগুন, দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার রাস্তায়। দ্রুত বদলে যেতে থাকে ছাত্র-জনতার মুখের ভাষা, দেহের ব্যাকরণ। সমাজ ও রাজনীতি সমান্তরাল, জনমানসের অনুচ্চারিত কণ্ঠস্বর যেন অক্ষরে বিম্বিত হলো হেলাল হাফিজের হাতে ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতায়। কবিতাটি লেখার পটভূমি বর্ণনা করতে গিয়ে হেলাল হাফিজ বলেছেন―“যে আমি কোনোদিন মিছিলে যাইনি, চিরদিন অপছন্দ করি রক্তক্ষয়, হত্যা, যুদ্ধ; সেই আমাকেও এই আন্দোলন আলোড়িত করেছিল। মানুষের ওপর পীড়ন, মিছিল, সেøাগান আমাকেও দ্রোহী করে তোলে। সেই সময়ের সিংহভাগ মানুষের আকাক্সক্ষার বহিঃপ্রকাশই ছিল এ কবিতা। ঊনসত্তরের উত্তাল সময় আমাকে দিয়ে ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ লিখিয়ে নিয়েছে।” (মোহাম্মদ, ২০২২ : ১০৭) কোনও সমাজের অন্তর্নিহিত মৌল সমাজিক সম্পর্ক বা নীতি থেকে উত্থিত কোনও সমস্যাকে কেন্দ্র করে জনসাধারণের সংঘবদ্ধ প্রতিবাদই হলো আন্দোলন। আন্দোলনে প্রতিপক্ষ থাকে রাষ্ট্র। প্রত্যেকটি আন্দোলনের একটি রাজনৈতিক চরিত্র এবং শ্রেণিস্বার্থ থাকে। রাষ্ট্রসম্পর্কিত আলোচনায় দেখা যায়, সমাজের প্রভাবশালী শ্রেণি বাকি ব্যাপক জনসাধারণকে করায়ত্ত করার যন্ত্র হিসেবে রাষ্ট্রকে গড়ে তোলে। ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনের সামাজিক শক্তির উৎস কী, তা খুঁজলে দেখা যায়, তৎকালীন পূর্ববাংলার কৃষিকাঠামোর মধ্যে গড়ে ওঠা আইয়ুব সরকারের সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র এককভাবে জনসাধারণের ওপর একচেটিয়া কর্তৃত্ব চালিয়ে গেছে। যা ইংরেজ ঔপনিবেশিক রেকর্ডকেও অতিক্রম করছে। (লেনিন ১৯৯৭: ১৭) ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের চরিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, তৎকালীন পূর্ববাংলার শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত শ্রেণি নিজেদের ওপর নিপীড়ন, জেল-জুলুম-অত্যাচার ও প্রবঞ্চনাকে সামনে রেখেই সংগঠিত হয়েছিল। ফলে আইয়ুব খানের মতো শক্ত সামরিক শক্তিও পদত্যাগ বা ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়। সেই নিপীড়িত শ্রেণি থেকে উঠে আসা প্রতিনিধি হিসেবে হেলাল হাফিজ বারুদগন্ধি শব্দগুচ্ছ নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। সময়তাড়িত তাজা-তারুণের কণ্ঠস্বরে বেজে উঠেছিল লক্ষ-কোটি মানুষের জনভাষ্য :
‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
মিছিলের সব হাত, কণ্ঠ, পা এক নয়।
…
শাশ্বত শান্তির যারা তারাও যুদ্ধে আসে
অবশ্য আসতে হয় মাঝে মধ্যে
অস্তিত্বের প্রগাঢ় আহ্বানে
কেউ আবার যুদ্ধবাজ হয়ে যায় মোহরের প্রিয় প্রলোভনে।
…
উৎকৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায়।’
রাজনৈতিক বিশ্বাস নিয়ে উচ্চাঙ্গের শিল্পসফল কবিতা রচনার অনেক উদাহরণ আছে কিন্তু ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’তে সুনির্দিষ্ট কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শের বিশ্বাস নেই। কবিতাটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ‘শ্রেষ্ঠ সময়’। একটা জাতির জীবনে কখনও কখনও বাঁকবদলের ঐতিহাসিক মুহূর্ত আসে, তখন গৃহকাজে ডুবে থাকা ব্যক্তিক মানুষকেও পথই ডেকে নিয়ে যায়। সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে একটি সরল রেখায় দাঁড় করিয়ে দেয়। ১৯৬৯ সাল বাঙালি জীবনে তেমনই একটি উত্তাল তরঙ্গময় সময় হয়ে এসেছিল। সেই আলোড়িত সময়ের অন্তরাত্মার উত্তাপকে ‘শ্রেষ্ঠ সময়’ হিসেবে ধারণ করেছে এই কবিতা। কারণ, সময়টা এমনই যে ‘শাশ্বত শান্তির যারা তারাও যুদ্ধে আসে আসতে হয়। যৌক্তিকতা হচ্ছে ‘অস্তিত্বের প্রগাঢ় আহ্বান’ এসেছিল সেই সময়। অস্তিত্বের মূলে টান পড়লে কেউ কি আর ঘরে বসে থাকতে পারে ? তীব্র বেগে ধেয়ে আসা সমুদ্রের ঝড় আর গণ-আন্দোলনের মধ্যে কোনও পার্থক্য নাই। প্রাথমিক খসড়ায় কবিতাটি বেশ দীর্ঘ ছিল। উত্তরকালে হেলাল হাফিজ স্বীকার করেছেন―আমি শরিফের ক্যান্টিনে যেয়ে ছফা ভাই (আহমদ ছফা) আর কবি হুমাযুন কবিরকে কবিতাটা দেখালাম। কবিতা পড়ে তারা আমাকে বুকে টেনে নিলেন। …ছফা ভাই বললেন, কবিতাটা এত বড় রাখা যাবে না। কিছু জায়গায় ঝুলে গেছে। আমরা কিছুই বলব না, তুমি তোমার মতো করে এডিট কর। আরও পনেরো-বিশ দিন সময় নিয়ে ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ বর্তমান রূপে আনলাম। … ১৯৬৯ সালে কবিতা লেখার পর ক্যম্পাসে রাতারাতি আমি তারকা। বিখ্যাত করে দিল, মানে বিখ্যাত বানিয়ে দিল। আহমদ ছফা ও কবি হুমায়ুন কবির কবিতার প্রথম দুই লাইন এক রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে দেওয়ালে চিকা মেরে দিল। তারা দুজন তখন আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্সের লোক। কবিতাটি এতটা জনপ্রিয় ছিল, টিএসসির দিকে গেলে মেয়েরা একজন অন্যজনকে বলত, ওই দেখ, এখন যৌবন যার যায়, বলাবলি করত’। (মোহাম্মদ ২০২২ : ১০৮-১১০) জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ, কবিতাটির উৎসমূলে রয়েছে গণভিত্তি অর্থাৎ ‘অস্তিত্বের প্রগাঢ় আহ্বান’। ঐ সময়ের জন-আকাক্সক্ষার ভাষ্য এই কবিতায় প্রতিবিম্বিত হয়েছিল। তাতে দ্রোহ আর বিপ্লবের কণ্ঠভাষ্য যেমন ছিল, তেমনি যৌবনশক্তির তেজোদীপ্ত উদ্বোধন ঘটেছিল চমৎকারভাবে। কাজী নজরুল ইসলামের পর সম্ভবত হেলাল হাফিজের কবিতায় এই যৌব-শক্তির দ্বিতীয়বার ব্যবহার লক্ষ করা যায়। স্বাক্ষরিত তারিখ থেকে জানা যায়, ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ লেখা হয় ১/২/১৯৬৯, তারপর ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লেখেন ‘দুঃসময়ে আমার যৌবন’ কবিতা―‘মানবজন্মের নামে কলঙ্ক হবে/এরকম দুঃসময়ে আমি যদি মিছিলে না যাই উত্তর পুরুষে ভীরু কাপুরুষের উপমা হবো/আমার যৌবন দিয়ে এমন দুর্দিনে আজ/ শুধু যদি নারীকে সাজাই।’ ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৭৯ সময়পর্বে আর কোনও কিছু পাচ্ছি না। ১৯৮০ সালের দিকে তিনি আবার কবিতায় ফেরেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ যে জলে আগুন জ¦লে প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে। তিনি ক্রমাগত আত্মজৈবনিক হয়ে ওঠেন এবং তাঁর কবিতায় প্রেম-বিরহ-বিষাদ, রাজনৈতিক হতাশা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা প্রধান হয়ে উঠে।

জনপ্রিয় বা অমর হওয়ার জন্য অজস্র লেখা যে জরুরি নয়, এটা সম্ভবত হেলাল হাফিজের জীবন দেখে বোঝা যায়। খুব কম কবিতা লিখেও যে কবিতার আলোচনায় থাকা যায়, হেলাল হাফিজ সেই উদাহরণ রেখে গেছেন। কাব্যজীবনের শুরুতে এই আকস্মিক, অপ্রত্যাশিত জনপ্রিয়তা তাঁর উত্তরকালীন জীবনকে অনেকাংশে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে আমার ধারণা। ঐ স্বরের কবিতা লেখা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে, ফলে যতদিন গেছে, তিনি স্বল্পপ্রসূ হয়ে ওঠেন।
ভাব এবং রূপগত দিক থেকে বিবেচনা করলে তাঁর কবিতাকে নিম্নোক্তভাবে পাঠ করা যায়―
১. দ্রোহ-বিপ্লব-রাজনৈতিক কবিতা
২. প্রেম-বিরহ-বিষাদ-যন্ত্রণার কবিতা
৩. হতাশা-ক্লান্তি-দুঃখ-বেদনার কবিতা
যে রাজনীতির চিন্তা থেকে ঊনসত্তরে কবিতায় তাঁর অভিষেক ঘটেছে, তা ছিল ঘূর্ণিঝড়ের মতো গতিময় আবেগ, তারুণ্যখচিত সংরাগে উচ্চকিত। তাতে সমষ্টিচেতনার একটা দায় আছে, যেমন―‘কবিতা কেঁদে ওঠে মানুষের যে কোনো অ-সুখে/ নষ্ট সময় এলে উঠানে দাঁড়িয়ে বলে―/ পথিক এ পথে নয়/ ভালোবাসা এই পথে গেছে।’ সেটা স্বধীনতা-উত্তর সময়ে রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে ভেঙ্গে যায়। জনজীবনে হতাশা, নৈরাশ্য, অরাজকতা, বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তাঁর কবিতায় কখনও প্রত্যক্ষ, কখনও পরোক্ষভাবে ছায়া ফেলেছে। রাজনৈতিক চেতনা তাঁর পিছু ছাড়েনি। যদিও তা নির্দিষ্ট কোনও দলভুক্ত মতাদর্শ দ্বারা চিহ্নিত করা যায় না। তবে নিপীড়িত জনগণের পক্ষে তাঁর অবস্থান, এটা স্পষ্ট বোঝা যায়।
স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল নৈরাজ্যকর, চারিদিকে হতাশা। মুক্তিযোদ্ধারা স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় উৎকণ্ঠিত। দেশ পুনর্গঠনের দায়িত্ব যাদের কাছে, তারাই সবচেয়ে বেশি জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। রণাঙ্গন ফেরত মুক্তিযোদ্ধদের বিভিন্ন বাহিনীতে নিয়োগ বা কাজে লাগানো, যুদ্ধে ইজ্জত হারানো মা-বোনদের পুনর্বাসন, বিভিন্ন দেশ থেকে পাওয়া সাহায্য প্রকৃত বাস্তুহারা, অসহায় মানুষদের মধ্যে সঠিভাবে বণ্টন করা, খাদ্য উৎপাদনে কৃষিকে অগ্রাধিকার দেওয়া, শিল্প ও বাণিজ্য বাড়িয়ে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করার জন্য কর্মপরিকল্পনা কিছুই করা হয়নি। এসব দিকে মনোযোগ না দিয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রেখে যাওয়া শূন্য চেয়ার/পদে বসার নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ফলে দেশের একদিকে ক্ষুধা-দারিদ্র্য, অন্যদিকে গরিবের ত্রাণ, রিলিফের খাদ্যসমগ্রী তসরুপ, লুটপাট, কালোবাজারি, মজুতদারি করে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির মাধ্যমে মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়ে অর্থ-সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে এক শ্রেণির মানুষ। সমাজিক বৈষম্যের কারণে প্রতিবিপ্লব পরিস্থিতি তৈরি হয়। জাসদ, গণবাহিনী, মুজিব বাহিনী, রক্ষী বাহিনী এসবের আগমন ঘটে। বামরাজনীতিতে রুশ ও চীন পন্থিদের বিভাজন, চুয়াত্তরের মন্বন্তর, পঁচাত্তরে সেনাবাহিনীর ক্যু, হত্যা, নৃশংসতা, একাধিক সামরিক জেনারেলের ক্ষমতা দখল ইত্যাদি ঘটনা হেলাল হাফিজের মানসে গভীর ছায়াপাত করেছে। ফলে হেলাল হাফিজের রাজনৈতিক কবিতায় প্রধান হয়ে ওঠে হতাশার সুর। ‘অস্ত্র সমর্পণ’ কবিতায় তিনি লিখেছেন :
‘মারণাস্ত্র মনে রেখো ভালোবাসা তোমার আমার
নয় মাস বন্ধু বলে জেনেছি তোমাকে, কেবল তোমাকে।
…
অথচ তোমাকে আজ সেই আমি কারাগারে
সমর্পণ করে, ফিরে যাচ্ছি ঘরে
মানুষকে ভালোবাসা, ভালোবাসি বলে।
যদি কোনোদিন আসে আবার দুর্দিন
যেদিন ফুরাবে প্রেম অথবা হবে না প্রেম মানুষে মানুষে
ভেঙে সেই কালো কারাগার
আবার প্রণয় হবে মারণাস্ত্র তোমার আমার।’
এই কবিতার অর্থব্যঞ্জনার মধ্যেই যে জলে আগুন জ¦লে কাব্যগ্রন্থের শিরোনামের প্রতীকী তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যায়।
আশি থেকে পঁচাশির মধ্যে রচিত কবিতার মধ্যে প্রধানত রাজনৈতিক চেতনার প্রকাশ বেশি দেখা যায়। সেই রাজনীতিও অপ্রাপ্তিজনিত বেদনার। যে প্রত্যাশিত দেশ বা সমাজ ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় কাক্সিক্ষত ছিল, স্বাধীনতার পর তার সিকি পরিমাণও না পাওয়ার বেদনা তাঁকে বিষাদের অন্ধকারে নিমজ্জিত করেছে। ‘নিখুঁত ট্র্যাজেডি’ কবিতায় তিনি লিখেছেন :
‘অথচ পাল্টে গেল কতো কিছু―রাজনীতি
সিংহাসন, সড়কের নাম, কবিতার কারুকাজ
কিশোরী হেলেন।
কেবল মানুষ কিছু এখনো মিছিলে, যেন পথে-পায়ে
নিবিড় বন্ধনে ফুরাবে জীবন।’
অর্থাৎ স্বাধীনতার পর কতকিছুই না পাল্টে গেছে কিন্তু সমাজের চেহারার কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। সমাজ শোষক আর শোষিত এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত। সিংহাসন, সড়কের নাম পাল্টেছে কেবল শাসকের শ্রেণিচরিত্রের কোনও বদল ঘটেনি। এই আক্ষেপ, হতাশাই হেলাল হাফিজের উত্তরকালের কবিতায় তুমুলভাবে বেজেছে। আক্ষেপটা খুবই যৌক্তিক :
‘কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে
আমি আর লিখবো না বেদনা অঙ্কুরিত কষ্টের কবিতা
…
কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে
ভূমিহীন মনুমিয়া গাইবে তৃপ্তির গান জ্যৈষ্ঠে বোশেখে’
না, মনুমিয়াদের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। দেশ স্বাধীন হলেও মনুমিয়াদের ভাগ্যের কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। হেলাল হাফিজের বুকে কেবল কষ্টের পাথর জমেছে। তাঁকে লিখতে হয়েছে ক্রমাগত ‘কষ্টের কবিতা’। রাজনৈতিক বিশ্বাসের এই ভাঙচুর, বটবৃক্ষের মতো হতাশা, হেলাল হাফিজকে অবলম্বহীন, নিরাশ্রয়ী, নিঃসঙ্গ, বৈরাগ্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। মধ্যযুগের দেবনির্ভরতা থেকে বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে আস্থা শেষ পর্যন্ত মানুষকে স্বস্তি দিতে পারেনি। জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম এসবও মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়।
প্রেম-বিরহ-বিষাদ-যন্ত্রণার কবিতা
হেলাল হাফিজের প্রেমের কবিতায় আবেগের তীব্রতা এতটাই প্রবল যে, সেই প্রেমাগ্নিতে কেবল কবি নিজেকে পোড়াণ না, প্রেমিকাকেও দগ্ধ করেন সমানভাবে। প্রেমাস্পদের প্রতি তাঁর নিবেদন আ-কণ্ঠব্যাপী। হৃৎপিণ্ডের গভীরতা ছাড়া এই ভালোবাসা মাপার আর কোনও বাটখারা নেই। কিন্তু সেই প্রেমও যেন একপাক্ষিক। প্রেমিকার প্রতি অনুরাগের উষ্ণতা ছড়িছে শব্দের বাক্প্রতিমায় :
‘তোমাকে শুধু তোমাকে চাই, পাবো ?
পাই বা না পাই এক জীবনে তোমার কাছে যাবো।
…
অপূর্ণতায় নষ্টে কষ্টে গেলো
এতোটা কাল, আজকে যদি মাতাল জোয়ার এলো
এসো দুজন প্লাবিত হই প্রেমে
নিরাভরণ সখ্য হবে যুগল-স্নানে নেমে।’
প্রেমিকাকে কাছে পাওয়া না পাওয়ার মধ্যে যে অপ্রাপ্তিজনিত হতাশাই তাঁকে ‘নষ্ট কষ্টের’ দিকে নিয়ে গেল, সেখান থেকে তাঁর আর ফেরা হলো না। নৈঃসঙ্গ্যই চিরসঙ্গী হয়ে থাকল। উত্তরকাল শূন্যতাগহ্বরে নিমজ্জিত করেছে ব্যক্তি-কবি হেলাল হাফিজকে। আধুনিকতার শেষ পরিণতি শূন্যতাবাধ, সেটাকেই উত্তরাধুনিকতা প্রশ্ন করেছে, জিজ্ঞাসার সামনে এনে জানতে চেয়েছে, প্রযুক্তিনির্ভরতা তোমাকে কতটা শুশ্রƒষা, আশ্রয় বা শান্তি দিয়েছে ? হেলাল হাফিজ একাধিক বিশ্বযুদ্ধ সভ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে হেলাল হাফিজ লেখেন দুই পঙ্ক্তির একটি কবিতা :
‘নিউট্রন বোমা বোঝ
মানুষ বোঝ না!’
আধুনিক পৃথিবী হয়ে ওঠে মারণাস্ত্রময়, ত্রাস ও উৎকণ্ঠার। যুদ্ধ রক্তলোলুপ অসভ্য বর্বরতা, সম্পদ ও রাজ্য দখলের ইতিহাসই পরিণতি লাভ করল। হেলাল হাফিজের কবি-মানসে এই বিমানবিকতা প্রবলভাবে আভিঘাত হানে। ফলে রাজনৈতিক বিশ্বাসকে দীর্ঘদিন লালন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। প্রেম আর যুদ্ধ তাঁর কবিতায় অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। ব্যক্তিগত জীবনে অবিবাহিত থাকার সিদ্ধান্ত এবং বোহেমিয়ান, উন্মূল জীবন-যাপন করতে থাকেন তীব্র-তুমুল যৌবনকে উপেক্ষা করে। রোমান্টিক প্রেমের যে স্তর প্রণয়-প্রেম-পরিণয়, সেটা কেবল অনুভবে অচরিতার্থ থেকে যায়। বাস্তবের আধার ও আধেয় শূন্য পড়ে থাকে। একাকী যাপন করা জীবন সত্যি ভয়াবহ দুঃসাহসের। হেলাল হাফিজ সেই দুঃসাহসের জীবনকেই বেছে নিলেন স্বেচ্ছায় :
হলো না, হলো না
দিবস হলো না, রজনীও না
সংসার হলো না, সন্ন্যাস হলো না, কার যেন
এসবও হলো না, ওসব আরও না
এই কিছু না হওয়ার বেদনাই তাঁর ব্যক্তিক জীবনকে বিধ্বস্ত করেছে। করুণ, বিষাদ-বেদনার দিকে নিয়ে গেছে। লিখলেন―বেদনাকে বলেছি কেঁদো না―কষ্টের ফেরিওয়ালা হয়ে উঠলেন। সেটা তাঁর আত্মমর্মরিত জীবনেরই অংশ―‘কষ্ট নেবে কষ্ট/ হরেক রকম কষ্ট আছে/ কষ্ট নেবে কষ্ট/লাল কষ্ট নীল কষ্ট কাঁচা হলুদ রঙের কষ্ট/ পাথর চাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্ট/আলোর মাঝে কালোর কষ্ট/ মাল্টি কালার কষ্ট আছে/কষ্ট নেবে কষ্ট…আমার মতো ক’জন আর/ সব হয়েছে নষ্ট/আর কে দেবে আমার মতো হৃষ্টপুষ্ট কষ্ট।’ ব্যক্তিগত জীবনে হেলাল হাফিজ কতটা কষ্ট বয়ে বেড়িয়েছেন ? তাঁর সমস্ত জীবনই বলতে গেলে কষ্টের জীবন ছিল। কষ্টের ফেরিওয়ালা হয়ে ঘুরেছেন এই শহরের রাস্তায়-রে¯েঁÍারায়। দুর্ভাগা দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্র কেউ তাঁর দায়িত্ব নেয়নি। যদিও তিনি পুরো জীবন ব্যয় করেছেন দেশের সামষ্টিক মানুষের মুক্তি ও কল্যাণ চিন্তায়। কিন্ত তাঁকে কেউ ভাবেনি। আশ্রয়ের হাত বাড়িয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি। এই জন্যই তিনি লিখতে পেরেছিলেন এমন কবিতা পঙ্ক্তি :
‘আমাকে দুঃখের শ্লোক কে শোনাবে ?
কে দেখাবে আমাকে দুঃখের চিহ্ন কী এমন,
দুঃখ তো আমার সেই জন্ম থেকে জীবনের
একমাত্র মৌলিক কাহিনি।’
বেদনাকে বলেছি কেঁদো না এই পঙ্ক্তিই হেলাল হাফিজের শাশ্বত নিয়তি হয়ে থাকল। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে অমীমাংসিত প্রশ্ন রেখে গেল কবি ও কবিতা প্রত্যাশিত সমাজ নিমার্ণের ব্যর্থতার দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র এবং রাজনীতির কাঁধেই বর্তায়। শাসকগোষ্ঠীর চরম ব্যর্থতার দায় আর লুকানো থাকে না। যদিও শাসকশ্রেণি ক্ষমতায় থাকাকালীন নিজেদের সাফল্য এবং উন্নয়নের গল্প দিয়ে কার্পেটের নিচে ঢেকে রাখে সব ব্যর্থতা। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে শাসকশ্রেণি আজো ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে বের হতে পারেনি। আধা সামন্ত, আধা ঔপনিবেশিক মনোভাব, বুর্জোয়া নীতির কারণে স্বাধীনতার সুফল জনসাধারণের কাছে পৌঁছায়নি। বেহাত হয়েছে বিপ্লব, এটাই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের করুণ ইতিহাস।
ঋণ স্বীকার :
মোহাম্মদ আলী (২০২২) হেলাল হাফিজের কবিতা ফুল ও ফুলকি, দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা
লেনিন আজাদ (১৯৯৭) ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান: রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতি, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা
লেখক : প্রাবন্ধিক, অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ,
ডিন, কলা ও মানবিক অনুষদ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়



