একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাশিল্পী : শহীদুল জহির : কথাশিল্পী শহীদুল জহির : উত্থান জাদুবাস্তবতাময় : স্বপন নাথ

তাঁর পারিবারিক নাম মো. শহীদুল হক। এ নামেই প্রথম গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ : পারাপার (গল্প/ ১৯৮৫), জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা (উপন্যাস/ ১৩৯৪), সে রাতে পূর্ণিমা ছিল (উপন্যাস/ ১৯৯৫), ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প (গল্প/১৯৯৯), ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প (গল্প/২০০৪), মুখের দিকে দেখি (উপন্যাস/২০০৬)। আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু (উপন্যাস/২০০৯), শহীদুল জহির নির্বাচিত গল্প (২০০৬), শহীদুল জহির নির্বাচিত উপন্যাস (২০০৭)। শহীদুল জহির গল্পসমগ্র (২০১৯), শহীদুল জহির উপন্যাসসমগ্র (২০১৯) সাম্প্রতিক প্রকাশনাগুলোতে অগ্রন্থিত, অপ্রকাশিত, অনুবাদিত কয়েকটি রচনা সংযোজিত হয়েছে। তিনি আজীবন নির্জন ও নিঃসঙ্গ ছিলেন।
সাহিত্যচর্চায় অবদানের জন্য আলাওল পুরস্কার, আজকের কাগজ সাহিত্য পুরস্কার, প্রথম আলো বর্ষসেরা বই সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেন। ২০২৫ সালে একুশে পদক (মরণোত্তর)-এ তাঁকে সম্মানিত করা হয়েছে।]
শহীদুল জহির তাঁর জীবদ্দশায় লেখক হিসেবে জনপ্রিয় অর্থে পাঠকপ্রিয় ছিলেন না। একইভাবে তাঁর জনশ্রুতি ছিল না। বলা যায় অবহেলা, উদাসীনতায় আড়াল ছিলেন অনেক দিন। তিনি নিজেও জনপ্রিয় হতেও চেষ্টা করেননি। তাঁর পরবর্তী ও বন্ধু লেখকদের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণে শোনা যায়, লেখালেখির শুরুর দিকে কেউ জানত না যে, শহীদুল জহির অসাধারণ মেধাবী এক লেখক। কেউ তাঁর লেখার দিকে খেয়ালও করেননি। অন্যদের আক্রান্ত করলেও, যেমন মুহম্মদ সবুর বলেছেন, ‘পরশ্রীকাতরতা, পরনিন্দা, প্রতিহিংসার বিষয় তাঁর লেখায় উঠে এলেও ব্যক্তিজীবনে তা স্পর্শ করেনি। তবে তাঁর লেখার মধ্যে যে জাদুবাস্তবতা; তা তার জীবনকে স্পর্শ করেছে। সতীর্থদের অনেকেই জেনেছেন তিরোধানের পর যে, তাদের সহপাঠী বা সহকর্মী শহীদুল হক একজন যে একই―এমন ধন্ধেও পড়েছেন সতীর্থদের অনেকেই। …তাই জাদুবাস্তবতার মতোই ম্যাজিক লণ্ঠন হয়ে জ্বলে উঠলেন মৃত্যুর পর সবার কাছে। এই সতীর্থের কাছেও নব মূল্যায়নে প্রতিভাত। আজ তিরোধানের পর তার সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে―এও এক জাদুবাস্তবতা’। [আকাশ ২০০৮ : ২৩]
এতদিন পড়ে আসা কথাসাহিত্যের ভাষা, ছক ও রীতি ভেঙ্গে নতুন কিছু দেখা যায় তাঁর সাহিত্যে। হয়তো এমন হতে পারে, যারা তখন লেখক হিসেবে সেলিব্রেটি, তারা ভেবেছেন, শহীদুল জহিরের লেখালেখি নিয়ে উৎসাহ দেখানো ঠিক হবে না। কারণ সকলেই বিস্মিত হয়েছেন তাঁর লেখার রীতি ও ভাষা দেখে। উপস্থাপনের মৌলিকত্ব তাঁকে প্রথা থেকে বিচ্যুত করেছে। স্বভাবতই সমকালীন উৎসব থেকে তিনি দূরে থেকেছেন। নিজের উদ্যোগেই তা করেছেন। মূলত আমরা যারা পাঠক হিসেবে তৈরি হচ্ছি, প্রথম দিকে বুঝে উঠতে পারিনি তাঁর লেখা। স্মরণে রাখছি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আখতারুজ্জমান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হকের লেখা। সে সূত্রে ভেবেছি শহীদুল জহির আলাদাভাবে কিছু করেছেন। এর বাইরে যেমন পড়েছি, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, তারাশঙ্কর বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়; অথবা বাংলা সিনেমাযোগী ফাল্গুনী, নীহাররঞ্জন রায়ের লেখা। একইভাবে আমরা লক্ষ করি পশ্চিমা অত্যাধুনিক উপন্যাসে সমাজরূপ ও ব্যক্তির টানোপোড়েন, বাংলা উপন্যাসে সে রকম নেই। আমরা বলতেই পারি রুশ ভাষার রচনা, যেমন, তলস্তয়, দস্তয়ভস্কি, গোর্কি বা ইউরোপের কাফকা, কাম্যু প্রমুখের লেখার প্রচুর উদাহরণ। একই সঙ্গে পশ্চিম বাংলার প্রতিষ্ঠিত লেখকদের রচনাগুলো আমাদের অভিজ্ঞতা, পছন্দ, রুচি তৈরি করে দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকান সাহিত্য। বিশেষত আফ্রিকা ও লাতিন সাহিত্য আমাদের লেখকসমাজে সজোরে ধাক্কা দেয়। এর প্রভাব আমরা নেতিবাচক মনে করিনি। এ কারণে যে, বিদেশি সাহিত্যের প্রভাবে বাংলা ভাষায় চমৎকার সাহিত্য রচিত হয়েছে, হচ্ছে। এছাড়া বিশ্বসাহিত্যের কত তত্ত্ব ও ইজম আমাদের এখনও তাড়িত করছে। এসব প্রভাব, দাপট কখনও বিতর্কের জন্ম দিলেও আমরা অস্বীকার করিনি।

মূলত লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার উদাহরণ দিলেও আমরা ধাক্কা দিতে পারিনি। তবে এর মধ্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসসহ অনেকেই চেষ্টা করেছেন। যে তালিকায় শহীদুল জহিরের নাম অনায়াসে যুক্ত হয়ে যায়। প্রথম যখন পড়েছি শহীদুল জহিরের লেখা, তখন মনে হয়েছিল, তাঁর লেখার মধ্যে কোনও প্রেমের আবেগ নেই কেন ? সমাজের অসঙ্গতি তুলতুলে ভাষায় চিত্রিত নেই কেন ? পাঠক কাঁদে না কেন ? এসব প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে থাকে। প্রশ্নসমূহের মধ্যেই ডুবে আছে উত্তর। যেক্ষেত্রে তাঁর পূর্ববর্তী লেখার বিষয়, রীতি, ভাষায় ব্যবধান তৈরি করেছেন শহীদুল জহির। অনেকেই বলেছেন, আমরাও মনে করি, তাঁর লেখার ধরন, বৈশিষ্ট্য, কৌশল সমকালে অনেকেই বুঝে উঠতে পারেননি। কাল ব্যবধানে পাঠাভ্যাস পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে, মৃত্যুর পর যেন আবার পুনর্জন্ম হলো শহীদুল জহিরের। এক অবিশ্বাস্য শক্তি ও সম্মানে তিনি ফিরে এলেন পাঠক, সুধীসমাজের কাছে। বিস্ময় থাকলেও সত্য; তাঁর উত্থানের ঘটনাপ্রবাহ অনেকটাই জাদুবাস্তবতা রীতির মতো।
শহীদুল জহিরের কথাসাহিত্যে কী দেখি। কোনও একটি তুচ্ছ, ছোট্ট ঘটনা সিরিয়াস ভঙ্গিতে তিনি জুড়ে দিয়েছেন। তা হলে একটি নিশ্চিত কথা বলা যায় যে, অনেক স্তর, বহুবাচনিক সীমানা রয়েছে তাঁর কথাসাহিত্যে। তাঁর রচনায় বিষয়বৈচিত্র্য আছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা মূল প্রসঙ্গ ধরে এর আবর্তনও লক্ষ করি। তিনি অতি চমৎকারিত্বে নির্মাণ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, মূল্যবোধ থেকে ক্রম-অপস্রিয়মাণ সমাজের মনোভঙ্গি। যারা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে জাতির অর্জনকে নির্বিচারে ধ্বংস করে। এই ধ্বংস ও ভুলে যাওয়া বা ভোলানো সংস্কৃতির বিপক্ষে তাঁর প্রতিস্পর্ধী বয়ান পাঠককে মুগ্ধ করে। এসব বিষয়ের অনুষঙ্গে বিবৃত করেছেন কৃষক, সাধারণ, সর্বহারা শ্রেণির জীবন; শ্রেণিগত শোষণের পরিণাম। এছাড়া খুব সচেতনতায় বর্ণনা করেছেন একাত্তর ও একাত্তর পরবর্তী ধর্মজ রাজনীতির হিংসা, দ্বিধা এবং নিপীড়ন; বিভিন্ন শ্রেণি, গোষ্ঠীর অন্তর্দ্বন্দ্ব, অযাচিত সংঘাত।
এসব নির্মাণে কি তা হলে তিনি কার্ল মার্কস, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, মিখাইল বাখতিনসহ বিভিন্ন লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি সামনে রেখে রচনায় নেমেছিলেন। তা নয়। তাঁর কথাসাহিত্যে মার্কসিজম, ম্যাজিক রিয়ালিজম, সুররিয়ালিজম, পোস্টকলোনিয়ালিজম, বাস্তুতন্ত্রবাদ (ইকোক্রিটিসিজম)সহ বিভিন্ন ইজমের আনাগানো এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিবিধ বাচনের প্রভাব ও ইঙ্গিত রয়েছে। এসব থাকা মানে এ নয় যে, ল্যাবরেটরিতে নিরীক্ষা করে পাতে তোলা হবে তাঁর সাহিত্য। এত সব বিবেচনা করার মতো সুযোগ এখানে নাই। তাঁর প্রতিটি উপন্যাসে তিনি ক্রমশ বদলে গিয়েছেন। ফলে একই মডেলে বিচার, বিবেচনা করা মুশকিল। একটা স্থির দৃষ্টিকোণ থেকে সিদ্ধান্ত দেওয়া সমালোচকের কাজ নয়। যা হয়েছে বা হচ্ছে শত বছর ধরে। সমালোচনা সাহিত্যে, সাহিত্য গবেষণায়ও প্রচলিত পদ্ধতি (পদ্ধতি বলাও ঝামেলা) ব্যবহারে সাহিত্য বিচার ও মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে। একাডেমিক পরিসরেও এসব পুনরাবর্তন লক্ষ করি।
শহীদুল জহির একটি বিন্দু, বক্তব্য স্পর্শ ও প্রকাশ করতে গিয়ে তাঁর প্রতিবেদনে অসংখ্য স্তর নির্মাণ করেছেন। পাঠক কি আগে থেকে প্রস্তুত থাকেন এসব আবিষ্কারের জন্য ? তা নয়। পাঠ করতে করতে পাঠককে কী এক ঝামেলায় পড়তে হয়। লেখক ইচ্ছে করেই এমন জটিলতায় ফেলেন কি না; তাকে তা বাধ্য হয়ে ভাবতে হয় কখনও। এসব কি নতুন কোনও বিষয় ? না। আমরা এ কালের কথা বাদই দিলাম। প্রাচীন ও মধ্যযুগে বাংলা কিংবা পশ্চিমা সাহিত্যে এরূপ আঙ্গিক ও শৈলী লক্ষ করেই থাকি। সহজভাবেই বলি, মধ্যযুগে কি শাসন, শোষণের বিপক্ষে কিছু বলার সুযোগ ছিল ? ছিল না। এসব বলতে গিয়ে কত কল্পকাহিনির প্রচার এবং দেবতাদের মহিমা প্রচারে আশ্রয় নিতে হয়েছে। রাজা বাদশার প্রশংসা করতে হয়েছে। ফলে সাহিত্যে অনিবার্যভাবে ম্যাজিকের আশ্রয় নিতে হয়েছে। সেখানে কাহিনি লিখতে হয়েছে মিথ-পুরাণের অনুষঙ্গে। ফলে পাঠাভ্যাসে বিশ্বসাহিত্যের ইশারা যে কোনও মগজে স্থান করে নিতে পারে। আমরা জানি, শুধু লেখক নয়, যে কোনও সাধারণ মানুষের মনে-মগজ-চিন্তায় অনিবার্যভাবে স্থান করে নেয় এ বিশ্বের রূপ-রস-গন্ধ। ব্যক্তির মনোজগতে এভাবেই বহুস্বরিত সাংস্কৃতিক ভূমি তৈরি হতে পারে। শহীদুল জহিরের তা-ই হয়েছে। স্মরণীয় সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর বসবাস ছিল বিশ্বসাহিত্যের কুণ্ডলীর মধ্যে। যে কারণে তাঁর মধ্যে বৈশ্বিক আবহ খেলা করেছে; ওঠে এসেছে বিনিময়ের তথ্য, তত্ত্ব ও রীতি।
আরেকটি বিষয় প্রশ্ন হিসেবে উত্থাপন করতে পারি। আমরা প্রায়ই বলি অমুক লেখক একেবারে আলাদা, মৌলিক। ধরুন শহীদুল জহির একেবারে মৌলিক। এ বক্তব্য কি সঠিক ? মোটেও না। শর্ত মেনে নিয়ে বলতে হয়, মৌলিকত্ব কোথায় রয়েছে। কারণ এর আগেও এসব লেখা হয়েছে। যৌনতা, খুন, আত্মহত্যা, কষ্ট, দহন, হাসি, কান্না, কিংবা ঘাতে-অভিঘাতে বিশাল ট্রমাটিক অস্থিরতা, এগুলো নিয়ে বিশ্বের ধ্রুপদী সাহিত্য আগেও লেখা হয়েছে। কালের ব্যবধানে নানা গড়ন তৈরি হয়েছে মাত্র। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের উদাহরণ টেনে অনেকেই বলতে চান যে, শহীদুল জহির ম্যাজিক রিয়ালিজমের বোঝাপড়া খুব ভালোভাবে করেছেন। মার্কেজের স্বীকারোক্তি নিশ্চয়ই মনে আছে আমাদের। যে গল্পগুলো তিনি জোড়াতালি দিয়েছেন, সেসব তাঁর দাদি ও অন্যদের কাছে শুনেছেন শৈশবে। তা হলে বোঝাই যায়, শোনা গল্পগুলো স্মৃতির অসংখ্য স্তর পার হয়ে এসে আছড়ে পড়ে কখনও মার্কেজ, কখনও শহীদুল জহিরের ওপর। আমাদের প্রশ্ন―মার্কেজের আগে জাদুবাস্তবতার প্রয়োগ বা এ বিষয়ক চর্চা ছিল না ? ছিল, কিন্তু শুধু কেন লাতিন আমেরিকার কথাই বলতে হবে। বিশ্বের নানা জায়গায় এ বিষয়ে চর্চা হয়েছে। কিন্তু হুজুগ ও ঔপনিবেশিক ক্রিয়ার ফল মানতে হয়। ফলে গল্পগুলো কত শতাব্দীর ধাপ অতিক্রম করেছে; যেভাবে তৈরি হয় মগজের কোষগুলো। আবার শহীদুল জহির লাতিনকেই অুনসরণ করেছেন; এটি অনুযোগ আকারে নয়, বলতে হবে তাঁর বিদ্যাচর্চার পরিসর হিসেবে। তাঁর প্রতিবেদন পাঠে মনে হয়, তিনি সাহিত্য অবলম্বিত কিছু কথা প্রকাশ করতে চেয়েছেন। ঠিক সাহিত্য রচনা করতে চাননি। সাহিত্যকে মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন মাত্র। বস্তুত সাহিত্য ও জীবনদর্শনের মধ্যে মেটাফিজিক্যাল বোধ তৈরি করেছেন। যে কারণে তিনি পাঠকসমাজকে নিরীক্ষার এক ল্যাবে ফেলে দিয়েছেন, জটিল দ্বন্দ্বের মধ্যে। ওই জটিল তরঙ্গে সাঁতার দিতে দিতে আমাদের মগজ ধোলাই হয়ে যায়। ভাবতে থাকি সাহিত্যকর্ম লেখা নয়, অসামান্য এক নির্মাণ।
আমরা সকলেই কিছু না কিছু ভূগোল, ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব ইত্যাদি পাঠ করি, একাডেমিক সৌজন্যে। কিন্তু এসব বিদ্যার অতলে ডুব দিতে শিখিনি। আরেকটি কথা এখানে পাদটীকা হিসেবে স্মরণ রাখি। লেখা ও বক্তব্যে অনেক সাহিত্য সমালোচকরা কিছু শব্দ ও প্রত্যয়ের কথা মুখস্ত বলেন, যারা এগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা বা প্রয়োগ দেখাতে পারেন না। পাঠক হিসেবে আমাদের ধারণা ও বিশ্বাস, শহীদুল জহির বিশেষত ইতিহাস, ভাষা, প্রত্নবিদ্যা সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন ধারণা রাখতেন। এর বাইরে তাঁর ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে কতক ভৌগোলিক নাম জড়িত, যেমন, নারিন্দা, মৈশুন্দি, ভূতের গলি, রায়গঞ্জ ইত্যাদি। যেগুলোকে তিনি প্রত্নপ্রতিমা রূপে গ্রহণ করেছেন।
তিনি মূলত ব্যক্তি ও জনসমাজের চেতন-অবচেতনের ঢেউ, মনোভঙ্গি টেনে হিঁচড়ে বের করে তরেতরে সাজিয়েছেন কি না, যা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক শৃঙ্খলাকেন্দ্রিক কারাগারে অবদমিত রয়েছে চিরায়তভাবে। এক্ষেত্রে মিশেল ফুকোর কথা স্মরণে রাখি। কখনও কেউ এভাবে ভাবেন যে, সামাজিক স্থিতাবস্থা বজায় রাখা এ সমাজ ও রাষ্ট্রের লক্ষ্য। পুঁজিবাদী ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক শৃঙ্খল যে আইন ও শাস্তির কথা প্রচার ও জারি রাখে, তা কি মানুষের মুক্তির পক্ষে সহায়ক ? মূলত যারা রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থাকে এবং অ্যাপারেটাস- সমূহের সহায়তায় এ সমাজ সুশৃঙ্খল রাখতে চায় তারা মূলত তাদের নির্ধারিত কামনা-বাসনা, এবং একটি কাঠামোকেন্দ্রিক শোষণই চলমান রাখে। এই ক্ষমতা-কাঠামোর শৃঙ্খলা ভেঙ্গে ফেলে ব্যক্তির মেরুদণ্ড। ব্যক্তি পরাজয়ে সামাজিক অসঙ্গতির প্রতিষ্ঠা দেয়। এসব সমস্যা তিনি সাহিত্যে প্রতীক ও রূপকপুঞ্জে দেখাতে চেয়েছেন। প্রতিবেদনগুলো পাঠ করতে করতে মনে হয়, প্রকাশিত সংকটের উপকরণ সংখ্যাবিচারে অসীম। একই সঙ্গে কিছু বিমূর্ত সংকট মূর্ত করাও তাঁর নিজস্ব এক সাহিত্যপ্রকল্প।
শৈল্যব্যবচ্ছেদের কাজ তিনি করেছেন ভাষার উপকরণে। অভিজ্ঞতা, ব্যাপকত্ব, গভীর জ্ঞান, উপলব্ধি, বোধ না থাকলে এ নির্মাণ সম্ভব নয়। তাঁর প্রতিটি উপন্যাস এবং গল্প আলাদা না করেও যদি বলি, তা হলে গ্রাম, বস্তি, ঝুপড়ি, লেন, অ্যাপার্টমেন্ট-কলোনি, কৃষি, সামাজের নানা স্তরের মানুষের জীবনাচরণে আর্থিক বা সামাজিক লেনদেনে বিনিময়গত পার্থক্য আছে। কিন্তু আচারিক প্রকাশে খুব ব্যবধান নেই। এসব স্থানে বাসরত মানুষের মনোদৈহিক কামনা-বাসনা একই। এসব থেকে উদ্ভূত টানাপোড়েন একই রেখায় চলমান। আমরা যারা খোলসের অসুখ দেখি, রাষ্ট্র ও সমাজস্থিত মানুষের মৌল সংকট এবং মনস্তাত্ত্বিক অসুস্থতা খেয়ালই করি না। শহীদুল জহিরের ফোকাস ছিল ওই না দেখা বিষয়ের প্রতি। যেমন, কুমড়া গাছ উৎপাটিত হওয়ার দুঃখে মগজে আগুন ধরা তোরাব শেখ এবং আবদুস সাত্তার, মোদাব্বের, ফৈজুদ্দিনসহ আরও অনেক মূলত একই ঘরের বাসিন্দা। পাঠকরা অনেকে বলে থাকেন, বলেছেনও, শহীদুল জহির কথাসাহিত্যে জাদুবাস্তবতার কৌশল ব্যবহার করেছেন। একই সঙ্গে তিনি এ দেশের লোকবিদ্যারও প্রয়োগ দেখিয়েছেন। তাঁর উপভাষা ও আঞ্চলিক ভাষা প্রয়োগে আমরা পাঠের প্রতি আরও বেশি মনোযোগী হই। রাষ্ট্র ও সমাজের নানামুখী পীড়নগত চাপ (ংঃৎবংং) সামাজিক মানুষের ওপর আছড়ে পড়ে। ফলে বিভিন্নমুখী ঘাতে বিভ্রান্ত ও টানাপোড়েনে অস্থির এ জনগোষ্ঠীর মনোভঙ্গি তুলে ধরেছেন। এসব বিভ্রান্তি সাধারণত রাজনীতি, কূটাভাসের কৌশলে চাপা পড়ে যায়। আমরা যা দেখি না, এক্ষেত্রে তাঁর দেখা ব্যতিক্রম, ভাষিক উপস্থাপনেও প্রথাবিরোধী শহীদুল জহির।
স্মরণীয়, শিক্ষার্থী জীবনে তিনি বামপন্থার রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। সাহিত্যে তিনি মার্কসীয় নন্দনে গল্প লিখেছেন কি না এ বিতর্ক রয়েছে। সরাসরি বিপ্লবী অবয়ব দেখালেই কি মার্কসীয় সাহিত্য বলতে হবে ? এখানে তত্ত্বগত বিভ্রান্তি রয়েছে। মূলত আর্থ-সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত ও উৎপাদন সম্পর্ক যেখানে রয়েছে, সেখানে এমনিতেই জীবন এবং ইকোলজি মার্কসীয় তত্ত্বের অধীন হয়ে যায়। তিনি নিজেও বলেছেন, এক সময় মার্কসবাদে আচ্ছন্ন ছিলেন। বস্তুত তিনি লোকমিথ, লোকজ্ঞানের উপকরণ মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যবহার করেছেন মাত্র।
তিনি চিরনিঃসঙ্গ ছিলেন। এই নৈঃসঙ্গ হয়তো তাঁর ভালোলাগার একটি অংশ এবং তাকে শিল্পিত করেছেন সাহিত্যে। তিনি সাহিত্যে সাধারণ, সামাজিক, সামষ্টিক মানুষের কথাই বলেছেন। এ সামষ্টিক শব্দ ও উচ্চারণের মাঝে তিনি লক্ষ করেছেন কীভাবে মানুষ ক্রমে একা হতে থাকে। কীভাবে সামাজিক চালচিত্র একটি মানুষকে বিচ্ছিন্নতার কর্কটরোগ আক্রান্ত করে। শুধু তাই নয় এ সামাজিক ধাঁধা ব্যক্তি ও সামষ্টিকতার ওপর আধিপত্য তৈরি করে। এর বিপক্ষে যে নিষাপ্রভ লড়াই, এই নিচু স্বরকে শহীদুল জহির রূপায়ণ করেছেন। যেমন, আপাত বিচ্ছিন্ন মানুষ দেখি ‘চতুর্থ মাত্রা’ গল্পে। এ গল্পের নির্মাণও ভিন্ন। বিশেষত ভবিষ্যৎ ক্রিয়াপদের প্রয়োগে। ভূতের গলির আবদুল করিমকে খোঁজ করতে গিয়ে তার অস্তিত্ব ওঠে আসে। সংলাপের বাইরে তৃতীয় বন্ধনীতে তাঁর বিবরণ দিয়েছেন। যেমন একটি অংশ এখানে দেখা যেতে পারে। ‘[আমরা তখন আবদুল করিমকে তার ঘরের ভেতর দেখতে পাব, সে তার খাটের তলায় পুরনো খবরের কাগজের ভেতর থেকে গুটিকয় নিয়ে আসবে। আমরা শিশি-বোতল-কাগজওয়ালা হকারের চেহারাটা দেখতে পাব না, যদিও তার চেহারাটা এই সময় দেখতে পাওয়া আমাদের জন্য খুব জরুরি বলে মনে হবে; আমরা তার কথা শুনতে পাব।]’ [জহির ২০১৯ : ১৪৯]
মূলত আবদুল করিম বিচ্ছিন্ন নিঃসঙ্গ একজন। তার কাছে যাতায়াত করা কাজের বুয়া, কটকটিওয়ালা কেউই তার সঙ্গী হয়ে উঠতে পারে না। তবু প্রতিদিন একঘেয়েমিতে এ জীবন আবদ্ধ। ফলত এ জীবন সৃজনশীল না হলে যা হয়―পুনরাবৃত্তময়। প্রথায়, বৃত্তাবদ্ধ জীবন বন্দি থাকে বিচ্ছিন্নতার স্বাদ গ্রহণে। যা চলেছে তা চলতে থাকবে বলেই লেখক এ প্রকরণে পর্যবেক্ষণ করেছেন। ‘আমরা তখন তাকে আবার ঘরের ভেতরে চেয়ারে বসা অবস্থায় দেখব, তারপর সে উঠে গিয়ে বিছানায় গড়াবে, কাত হবে, চিত হবে।… লোকটি তার পামশুর খটখট শব্দ করে আবদুল করিমের বেঞ্চের কাছে এগিয়ে আসবে, তারপর ঝুঁকে পড়ে ফুলটা তুলে নেবে।… তারপর ফুলটা নাকের কাছে ধরে রেখেই রাস্তা দিয়ে গুটিগুটি পায়ে হেঁটে মহল্লার ভেতরে চলে যাবে’। [জহির ২০১৯ : ১৭২]
শোনা যায়, তিনি অসামান্য জাদুবাস্তবতার নান্দনিকতা দেখিয়েছেন তাঁর সাহিত্যে। আমরা বলি এর বাইরে ভাষার ঘোর, বিক্ষিপ্ত বিবরণ পাঠককে বিভ্রান্ত করে বৈকি। তাঁর ম্যাজিকের সাফল্য ও ব্যর্থতা এখানেই। তিনি যে ইতিহাসের উপকরণ ব্যবহার করছেন, এর প্রতি তিনি আবার উদাসীনও বটে। কারণ তিনি ইতিহাসকে অনুষঙ্গে নিয়েছেন। কিন্তু উপন্যাসের ইতিহাস প্রকৃত ইতিহাস থেকে অনেক দূরবর্তী। তা অবশ্য অস্বীকৃত নয় যে, রাজনৈতিক বাস্তবতার ঘোর ও নির্মমতার কাছে জীবন, সমাজ, প্রাত্যহিক রুটিরুজির দু:শ্চিন্তা, অবসাদ, স্ত্রী, পুত্র-কন্যা-সংসার আটকে থাকে। মেরুদণ্ড ভেঙ্গে বোঝা বহন করতে হয় বা ভাঙতে হয় নিজের অস্তিত্ব। এ জন্ম, বেড়ে ওঠা, আর জীবনের ঘানি টেনে নেওয়ার জাদুবাস্তবতা অভিজ্ঞতার প্রতিবেদন নির্মাণে তিনি অসামান্য এটা বলা বাহুল্য নয়। তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন, ‘এখন কাঁদো নদী কাঁদো বা চাঁদের অমাবস্যা পড়ে আমার মনে হয়েছে তার লেখায় ম্যাজিক রিয়ালিজমের ব্যবহার আছে। এবং আমার মনে হয়, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লেটিন আমেরিকার সাহিত্য পড়া ছিল, হয়তো মার্কেজের বইও পড়া থাকতে পারে’। [আকাশ ২০০৮ : ১৯১]
উপন্যাসের পাঠকৃতি নির্মাণে অনেক বিষয়, ঘটনা, উপকরণের মালা গেঁথে নিয়েছেন। যৌক্তিকভাবে পুনরাবর্তিত হয়েছে দেশের মুক্তিযুদ্ধ ও এর মাধ্যমে অর্জিত সংস্কৃতি। একই সঙ্গে তা কত সংহতভাবে উপস্থাপন করা যায় এর উদাহরণ শহীদুল জহির। এ জন্য তিনি তৈরি করেছেন প্রতীক ও রূপকপুঞ্জ। রূপকের আবরণ ও আভরণে গড়ে তুলেছেন আখ্যানের স্বর। এ জন্যই শহীদুল জহির কথাসাহিত্যে অনন্য, স্বতন্ত্র। বলার অপেক্ষা না যে, সামাজিক বাস্তবতার রূপায়ণ ও নান্দনিক বিবেচনায় জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা ব্যতিক্রম ও অসামান্য উপন্যাস। তিনি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ের বাস্তবতা অবলোকন করেছেন নিবিড়তায়। ফলত মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন এবং স্বাধীন দেশে সামাজিক মনস্তত্ত্বের ব্যবধান তাঁকে পীড়িত করেছে। তিনি এ অস্বাভাবিক পরিবর্তন মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেননি। আখ্যানে জটিল গ্রন্থির ইঙ্গিত প্রদানে তিনি আবদুল মজিদের স্যান্ডেল ছেঁড়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। স্বাধীনতা ও মূল্যবোধ ভুলে দলীয় বিবেচনা, স্বার্থপরতা মুখ্য হলে মানুষ বিচ্ছিন্ন হতে পারে সৃজনের স্বপ্ন থেকে। স্বাধীনতাপূর্ব এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যারা বিরোধিতা করেছে, যেমন, বদু মওলানাসহ অনেকে; তারাই আবার কুটিল ষড়যন্ত্রে ফিরে আসে মাঠে। এর মধ্যে আবদুল মজিদের মতো সুবিধাবাদী চরিত্র লক্ষণীয়। মুক্তিযুদ্ধ- উত্তরকালে আত্মপরিচিতির সংকট বিশাল দ্বন্দ্বে ফেলে দেয়। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধ ও সংস্কৃতিবিরোধী এবং এ দেশের লোকবাংলার চারিত্র্য অস্বীকারের প্রক্রিয়া প্রবল হতে থাকে। বলা যায় সকল অর্জনই প্রশ্নবিদ্ধ ও অপসৃত হয়। পুঁজিবাদের অসহনীয় অত্যাচারে তা হওয়ারই কথা।
তাঁর বিবরণে শ্যামাপ্রসাদ লেন-মহল্লা বাংলাদেশেরই প্রতীক হয়ে ওঠে। উপন্যাসের কাহিনি নির্মাণে কেন্দ্রস্থল রেখেছেন পুরোনো ঢাকার লক্ষ্মীবাজার-শ্যামপ্রসাদ লেন। আমরা সেখানে কত স্বপ্ন, আশা আকাক্সক্ষার অপমৃত্যু হতে দেখি। “বদু মওলানারা এখন তাদেরকে ‘ভাইসব’ বলে ডাকে… সে বিষণ্নভাবে হেসে আবদুল মজিদের কাঁধের ওপর প্রাচীন বৃক্ষ শাখার মতো তার শিরা-ওঠা হাত রাখে। সে তাকে বাসায় নিয়ে যায় বহুদিন পর এবং তার সঙ্গে এত কথা বলে যে, আবদুল মজিদ তার প্রায় কিছুই বুঝতে পারে না, শুধু মাত্র একটি কথা ছাড়া তা হচ্ছে এই যে, রাজনীতিতে চিরদিনের বন্ধু অথবা চিরদিনের শত্রু বলে কিছু তো নেই, কাজেই অতীত ভুলে যাওয়া ছাড়া আর কিই বা করার থাকে মানুষের।” এ ভুলে যাবার সংস্কৃতি গ্রাস করেছে সকলকে। সোজা বা সাদাসিধে স্কেলের মতো কোনও বাস্তবতা কখনওই হয় না। কখনও সরলতায় সমাজ চলে না। এ উপন্যাসের স্থানিক পরিচয় নারিন্দা হলেও বাংলাদেশ প্রতিবিম্বিত হয়ে আছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যে উত্থানের পরিচয় এ দেশের মানুষের ছিল, তা ক্রম-ক্ষয়িষ্ণু হতে দেখি ১৯৭২ সালের পর-পরই। আরও প্রসারিত হয় ১৯৭৫ সালের পর। একাত্তর সালে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ আবার ফিরে আসে ভিন্ন ভঙ্গিতে। বস্তুত বিক্ষুব্ধ সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি অতীত-বর্তমান- ভবিষ্যৎকে সংযুক্ত করে ফেলেন। যা মানুষের চৈতন্যে বারবার পালাবদল ও যাতায়াত করে। একাত্তর সালের ভয়াবহ গণহত্যা কেউ ভোলে আবার কেউ ভোলে না। কারণ রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক উঁচুনিচু ভেঙ্গে সমান্তরাল করে দেয়। ফলে বদু-র মতো ঘাতকরা দেশপ্রেমিকের কাতারে চলে আসে; মহল্লাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। কিন্তু প্রতিরোধের কোনও কণ্ঠ থাকে না। এর ফাঁকে একাত্তরের ভয়াবহ হত্যা, নির্যাতনের বিবরণ লেখক আবার স্মরণ করিয়ে দেন। যে নির্মম হত্যার বিবরণ মহল্লার অবহেলিতরাই স্মরণ করে। ‘সেই অন্ধকারের ভেতর জবাইয়ের ঔজ্জ্বল্য দেখে বুঝতে পারে, …ইসমাইল হাজামসহ আবদুল গণি তিনটে তালিকার একুশজনকে শনাক্ত করতে পারে এবং জানায় যে, এদের সকলেই মৃত। তার কাছ থেকে শোকাহত এবং ক্রুদ্ধ লোকেরা জানতে পারে যে, এদের প্রত্যেককে জবাই করে দেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং মস্তকহীন ধড় রাতের বেলায় রিকশা ভ্যানে করে নিয়ে গিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দেয়া হয় এবং ছিন্ন মুণ্ডু নিয়ে গিয়ে খ্রিষ্টানদের কবরস্থানে পুঁতে রাখে’। [২০১৯ : ৩২]
এ চরম বাস্তবতাও মানুষ যে ভুলে যায় ওই পরিবর্তিত রাজনীতির কারণেই। ফলে মোমেনাসহ আরও অসংখ্য নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার বিষয়টি নিছক শোনা ছাড়া আর কোনও প্রতিক্রিয়া তৈরি করে না।
এই হত্যাকারীরাই সমাজে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত, ক্ষমতাবান। আবার অপরাধীদের শুধু অপরাধী পরিচয় হলে সমস্যা নেই। তবে তাদের একাধারে অনেক পরিচয়। এসব সম্মান, মর্যাদা, অর্জন ও দ্বিধাহীন সামাজিক অনুমোদনের ফলে সহজেই স্বীকৃতিযোগ্য। সামাজিক সম্মতি উৎপাদনে তাদের কোনও সমস্যা হয় না। এ ডামাডোলে শহীদুল জহির এখানে দুটো অভিযোগের কথা বলেন : একটি যুদ্ধাপরাধ, অন্যটি রাজনীতিতে অন্ধত্বের প্রয়োগ ও নিষ্ঠুরতা। যুদ্ধাপরাধ বা ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতিকে আলাদা করা যায়নি। অবশ্য আলাদা করার বোধও অনুপস্থিত। পাঠক হিসেবে আমাদের ধারণা আর কোনও লেখক এরকম না-ভাবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ মগজে তো খেলা করে নেতির প্রতি ভালোবাসা। অবশ্য এ দুই অপরাধের সংস্কৃতি সংহত ও যৌথভাবে আক্রমণাত্মক হয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তীকালেও একই চেহারায় এ সমাজে ক্রিয়াশীল। একাত্তর স্মরণে রেখেও মূল্যবোধ অস্বীকার, অন্যদিকে অপরাধকে আশীর্বাদ হিসেবে সংশ্লেষিত করা ও প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে।
লক্ষণীয়, একজন কথাশিল্পী বা ইতিহাসলেখক যুদ্ধ ও সংশ্লিষ্টতার বিবরণ লিখতে পারেন। এমনকি সামাজিক ইতিহাসের বিবিধ সমস্যাও। কিন্তু জনসমাজের মনোজগতের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া খুব কমই আসে। আবার মনোজাগতিক রহস্যে তলে-অতলে কত অজানা বাচনই থেকে যায়। এই অপূর্ণতা পূরণ করেছেন শহীদুল জহির। একাত্তরবিরোধী চরিত্র বদু ও তার সহযোগীরা আবার সদম্ভে ফিরে আসে মহল্লায়। আবদুল মজিদের পরিবার ও মুক্তিযোদ্ধারা তাদের কাছেই নির্যাতিত হয়। আবদুল মজিদ তার মেয়ে মোমেনাকে বাঁচাতে পারেনি। এরপর একাত্তরের পরও নয় মাসের ইতিহাসে ভোলেনি বলে জানিয়ে দেয় বদু। যেখানে আতঙ্কের শুরু। এমন একটি জনযুদ্ধের ভয়াবহ ট্র্যাজেডির মধ্যেও এদেশের মানুষ বাটোয়ারা, আপোসরফা করে নিল। গণমানুষের রক্তদান ভুলে যাবার ভান করে চাপা দিল স্ববিরোধিতায়। খুনিদের উত্থানের সঙ্গে মিশে যাওয়াকে অনেক ক্ষেত্রে গৌরব মনে করে কেউ কেউ। পুরো ক্ষমতাকাঠামো চলে গেল একাত্তরের পরাজিত অথচ নিপীড়কগোষ্ঠীর কাছে। যেক্ষেত্রে জীবন ও রাজনীতির চরম বাস্তবতার দিকে শহীদুল জহির আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
পর্যবেক্ষক হিসেবে আমাদের মনে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ঘটনা পরম্পরা এবং সঙ্গে দর্শনগত ও মনোকাঠামো সম্পর্কে শহীদুল জহির কিছু বলার চেষ্টা করেছেন এ উপন্যাসে। সাধারণ মানুষের (পক্ষ-বিপক্ষ) অবচেতনে স্তরসঞ্চিত দৃষ্টিকোণের ইঙ্গিত করেছেন তিনি। যা যৌথ নির্জ্ঞানে সঞ্চিত হয়েছে দিনে দিনে; আর আমরা খোলস দিয়ে ঢেকে রাখতে আত্মঘাতী, জাদুর মতো গল্প বুনে চলছি। মোমেনা হত্যার জন্য এখনও মজিদ পরিবার ঘৃণা করে বদু-কে। ফলে দু:শ্চিন্তা ভর করে তাদের মনে। অবশেষে মহল্লা ছেড়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেয় মজিদ। মোমেনার কথা মনে আছে বলেই সে বদু-র কথা মনে রাখে। ‘আবদুল মজিদ ঠিক করে যে, মহল্লার সব লোকের কী হবে তা নিয়ে চিন্তা করে তার লাভ হবে না, সে প্রথমে নিজেকে বাঁচাতে চায় এবং সঙ্গে সমষ্টিগত প্রচেষ্টার অবর্তমানে সে তা করতে পারে; এখনই মহল্লা ত্যাগ করে। তার এই চিন্তা এবং সিদ্ধান্তের পরিণতিতে ছিয়াশি সনের সাতই জানুয়ারির দৈনিক ইত্তেফাকে আবদুল মজিদদের বাড়ি বিক্রির একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। …কেন আবদুল মজিদ মহল্লা ছেড়ে চলে যায়, অথবা এমনও হতে পারে যে, আবদুল মজিদের এই সংকটের বিষয়টি মহল্লায় এবং দেশে হয়তো কেউই আর বুঝতে পারে নাই’। [জহির ২০১৯ : ৫৬]
এই চলমানতা ও ইতিহাসের বাস্তবতা থেকে আমরা জানি, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে কথিত গণবাহিনী, গোপন কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর বিভিন্ন গ্রুপ কখনও বিপক্ষ আবার কখনও নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। এ বিষয়গুলোর বিবরণ লিখতে অন্য লেখকদের মতো তিনিও নানা অনুষঙ্গ আশ্রয়ী হয়েছেন। সেভাবে তাঁকে ভাষা ও উপকরণ নির্বাচন করতে হয়েছে। উপভাষা, আঞ্চলিক ভাষা প্রয়োগে নিশ্চিত ক্রিয়া করেছে তাঁর নিঃসঙ্গপীড়িত জীবনের হাহাকার ও নস্টালজিয়া। যেমন সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাস। স্মরণীয় তাঁর পৈতৃক এলাকা সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ আর ঢাকাস্থ জন্মস্থানের যোগসূত্র। তাঁর প্রত্ন-চেতনা ও ভাষায় রায়গঞ্জ কত জীবন্ত, তা বোঝা যায় সাহিত্যে। সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাস আমাদের দৃষ্টিতে বাংলা ভাষায় লেখা ব্যতিক্রম একটি রচনা। আখ্যানে একটির পর একটি ঘটনা, বলা যায় ঘটনাপুঞ্জের সমাবেশ ঘটেছে। ঝরনার মতো ছলছল করা ভাষা ও বিবরণ। চরিত্রগুলো আলাদা হলেও আবার মূল স্রোতে মিশে গেছে। একটি থেকে আরেকটিতে মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হতে থাকে, কিন্তু বিচ্ছিন্নতা বা অবসাদের কোনও সুযোগ থাকে না। বিশেষত ভাষার গাঁথুনি অসামান্য সে কারণেই।
অন্যার্থে এ উপন্যাস দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দলিল। লোকবাংলার সংস্কৃতিকে মুছে দিতে নানা তর্ক আছে। অস্বীকারের গর্জনে সামাজিক বন্ধন ও ঐক্য ধ্বংস হলে পরস্পরের মধ্যে হিংসাত্মক প্রবণতা শক্তিশালী হতে থাকে। এছাড়া এ উপন্যাসেও তিনি তুলে ধরেছেন মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার মূল্যবোধ। যদিও সার্বিক ক্ষয়িষ্ণুতার বিবরণ দেওয়াই তাঁর লক্ষ্য। যেমন, ‘একাত্তর সনের মুক্তিযুদ্ধের পর তারা গ্রামে এমন শব্দ এবং বন্দুকের গুলির ফটফট আওয়াজ আর শোনে নাই, কতক্ষণ ধরে তারা মানুষের চিৎকার শুনতে পেয়েছিল মফিজউদ্দিন মিয়ার গলার নিচ থেকে হৃৎপিণ্ড পর্যন্ত গুলির ক্ষত ছিল, লাশের সারিতে তার আট ছেলের প্রত্যেকে ছিল, ছিল ছেলেদের স্ত্রী এবং সন্তানেরা; মহির সরকারের উঠোনে বসে থাকা কৃষকেরা লাশের হিসাব করতে গিয়ে বিপর্যস্ত বোধ করে, …কিছুক্ষণ আগে মহির সরকারের বাড়ির উঠানে যে চাঁদটির কথা বলা হয়েছিল, তার সেই অসাধারণ চাঁদটির কথা পুনরায় মনে পড়ে… এ রহম চান আমি জিন্দেগিতে দেহি নাই, মনে হইছিল যানি রক্তের ভিতর চুবান খায়া উইঠছিল চানটা,…’। [জহির ২০১৯: ৬৪-৬৫]
সকলেরই জানা একটা সময় এ দেশের বিভিন্ন জনপদে খুন-ডাকাতি-জখম করা ছিল রুটিন কাজ। বস্তুত একটি পরিবারের নির্মম হত্যাকণ্ডের সূত্র ধরে কাহিনি বিকশিত হয়েছে। এসব সিরিজ কাজ কীভাবে একটির পর একটি ঘটতে থাকে এবং এগুলোর ওপর অন্য ঘটনাসমূহের প্রলেপ তৈরি হয়; এমনই এক উপন্যাস সে রাতে পূর্ণিমা ছিল। সুহাসিনী গ্রামের সত্য হলো মানুষ হারানো বা খুন হয়ে যাওয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে কোনও সিরিয়াস আলোচনা বা অনুভূতি স্থায়ী হয় না। কারণ শুধু রূপকথার মতো গল্প তৈরি হতে থাকে। আমরা সাধারণত বলি যে, এ ঘটনার তো কোনও বিচার হলো না, কিছুই হলো না। কারণ একটি ঘটনার পর অন্য ঘটনায় আগের বিষয় চাপা যেতে থাকে। প্রাত্যহিক এ জীবনে বাস্তবতা কত নিষ্ঠুর।
একই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত সচেতন থাকেন তাঁর নিজস্ব ভূগোল নিসর্গ নিয়ে। এক সময় রাজনীতিতে চরমপন্থাপর্ব বলে আলোচ্য এক বিষয় ছিল। সকল ঘটনার বিবরণে চন্দ্রাহত নানা গল্পে সাজানো হয়েছে এ উপন্যাসে। প্রতিটি গল্পই কেবলই বিহ্বলতা তৈরি করে। শহীদুল জহির এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘কোন ব্যক্তির ক্যারিশমাকে ঘিরা এ ধরনের বিহ্বলতা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়। এই উপন্যাসে তাই হইছে। …আমার এই উপন্যাসের গ্রামের মানুষের বিহ্বলতা মূল চরিত্রের সঙ্গে একটা লাভ-হেইট সম্পর্কের জন্ম দিয়েছে, ব্যাপারটা এমন প্রকাশিত না হইলেও লাভ-হেইট আছে, কিন্তু মূলত তারা বিহ্বল, ফলে তারা নিস্পৃহও তাই মেরে ফেললে তারা তেমন কষ্ট কচলায়া এর মধ্যে বাস করে। আমি এখানে চান্দের আলোর একটা লৌকিক ভাঁওতাবাজির অবতারণা তার ভিতরে এই লাভ-হেইট-এর ব্যাপারটাকে ঢুকায়া দিতে চাইছি। চান্দের আলোয় বিহ্বল হয়া পড়া আমাদের সমাজের একটা প্রিয় ভাঁওতাবাজির কথা, চন্দ্রাহত বলে একটা শব্দ আছে আমাদের, সম্ভবত ইংরেজি গড়ড়হংঃৎঁপশ থেকে ধার করা।… অস্পষ্টতা অনেক সময় সাহিত্যের জন্য আরামদায়ক এবং প্রয়োজনীয় অনেক কিছু পাঠকের বিবেচনার উপরে ছেড়ে দেওয়া সাহিত্যের জন্য মঙ্গলকর,…’ [আকাশ ২০০৮: ১৮৯]
এ উপন্যাসের গল্প বলার কাঠামোই ভিন্ন। বাংলাভাষায় লেখা এমন রচনা আর আছে কি না আমাদের জানা নেই। পরাবাস্তবতার চমৎকার উদাহরণ দিতে গেলে এ উপন্যাসের কথা বলতেই হবে। প্রতিটি ঘটনা বা ইঙ্গিতের অবতারণা পাঠ করতে গিয়ে, আমরা কোনও রূপকথা, বাস্তব কাহিনি বা স্মৃতিচারিত কোনও ঘটনার সঙ্গে পরিচিত হই। প্রতিটি কিসসাই বিচ্ছিন্ন, তবে আবার সবই যেন যুক্ত হয়ে যাচ্ছে মূল প্রবাহের সঙ্গে। লক্ষ করি ভেজাল, বিভ্রান্তির ফাঁকে বাণিজ্যিক পুঁজি সম্প্রসারিত হয় গ্রামে। এর মধ্যে প্রেম, হিংসা, যৌনতা, কামনা-বাসনার বিবরণ চমৎকৃত করে। মূলত গ্রামের লোকজন গল্পের খোঁজ পায় মিয়া বাড়ির আগুনে পুড়ে যাওয়া ও পুরোটা নিশ্চিহ্ন হওয়ার সুবাদে। ধ্বংস থেকে লাশ ও জিনিসপত্র উদ্ধারে বিচিত্র ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ভেতর তারা প্রবেশ করে। আগেই বলা হয়েছে শহীদুল জহির সাহিত্যে বহুবাচনিক ঢাকনা উন্মোচন করেছেন। বস্তুত তাঁর নির্মাণকলার প্রয়োজনে তা করতে হয়েছে। এসব গল্প, কিসসা, ইতিহাসের ঘটনা বিবিধ বিষয়ের ইঙ্গিত ও ইশারায় উপস্থাপিত। বিধ্বস্ত বাড়ি থেকে অনেক কিছুই উদ্ধার করা হয়। ‘আধপোড়া লাল মলাটের বই বের করে এবং তাদের ভেতর যারা পড়তে পারে, তারা কয়েকটি মলাটের বইয়ের অক্ষত নাম পড়ে, পাঁচটি প্রবন্ধ, মাও সে তুঙ; সামরিক বিষয়ে ছয়টি প্রবন্ধ, মাও সে তুং; রাষ্ট্র ও বিপ্লব, ভি. ই. লেনিন’। [জহির ২০১৯ : ৯০]
যা মফিজুদ্দিনের কনিষ্ঠ ছেলে রফিকুল ইসলামের সঞ্চয়ে ছিল। পুরো বাড়ি পুড়ে যাবার দিন বুকে স্বপ্ন নিয়ে রফিকুল ইসলামও মারা যায়।
এর প্রতিক্রিয়ায় সমাজ বিভ্রান্তির শাসনাধীনে চলে যায়। সুহাসিনী গ্রাম সন্ত্রাসের করায়ত্তে দণ্ডিত হয়। সন্ত্রাসীরা বংশ পরম্পরায় শাসন করতে ইচ্ছুক। এসব কিসের ইঙ্গিত দেয় পাঠককে ? লেখক সুকৌশলে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও উপনিবেশের পরিণাম ইত্যাদি বয়ান করেছেন। আরেকটি বিষয় আমাদের খেয়াল করতে হয়, এখানে পূর্ণিমা, চাঁদ সম্পর্কিত কিসসা যোজনে লেখকের সচেতন প্রয়াস ছিল স্পষ্ট। অর্থাৎ তাঁর লক্ষ্য ছিল, টোটাল একটা বিভ্রান্ত, ভেজালের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আইডেনটিটিকে শনাক্ত করা। একটি পর্বে মফিজুদ্দিন সুহাসিনী গ্রামে তালগাছ বপন করে, তখন থেকে তালগাছ বাগানের পরিচয়ে সকলেই চিনতে পারে সুহাসিনী গ্রাম। মিয়াবাড়ির চন্দ্রভানকে বিয়ের পর মফিজুদ্দিনের নতুন পরিচিতি হয়―ম্যাসাব। এরপর মফিজুদ্দিন অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে ক্ষমতা, সিদ্ধান্তগ্রহণ ও নির্বাচন প্রক্রিয়ায়। গ্রামবাসী ও তার বিশ্বাস―সে বেঁচে থাকবে ১০০ বছর। নয়নতারা হাট স্থাপনের অসামান্য সেই গল্প ‘যমুনার বুকের এই নারীটির কথা জীবনের প্রায় প্রতিটি বাঁকেই মফিজুদ্দিনের মনে পড়ে’। কেন মনে পড়ে নয়নতারা নামের নারীটির কথা ? যে মেয়েটি নৌকার ছইয়ের ভেতর যৌনক্রিয়া শুরুর আগে কামসূত্র পাঠ ও সূত্র চর্চার কথা জানায়। আরও বলে সঙ্গমের চৌষট্টি কলা তার জানা। তাই কলার চর্চা দেখাতে চায় হালাকু, জোবেদ, মফিজুদ্দিনের সঙ্গে। এর পর তাদের সঙ্গে আটান্নতম বার সঙ্গম ক্রিয়া সম্পন্ন হয়। সঙ্গমক্রিয়ার ফলে মৃত্যু ঘটে হালাকু, জোবেদ ও নয়নতারার। মফিজুদ্দিন আপাত রক্ষা পায়। সে বুঝতে পারে, ‘একটি পতিতা মেয়ের দয়ায় তার এই বেঁচে থাকা; এই একটি বিষয় সে তার পরবর্তী জীবনে কখনও বিস্মৃত হয় নাই। সেদিন মফিজুদ্দিন পদ্মা নদীর উপর এই গণিকা নারীর শেষকৃত্যের আয়োজন করে, সেদিন উন্মুক্ত আকাশের নিচে পদ্মার বিস্তৃত বুকের উপর মরে শক্ত হয়ে যাওয়া এক দরিদ্র গণিকার চরণ মফিজুদ্দিনের চোখের পানিতে ভিজে যায়’। [জহির ২০১৯ : ১২৩]
এখানে গণিকা (নয়নতারা), দুলালি, আলেকজান, চন্দ্রভান উপস্থাপিত ঘটনা ও বিষয়কে মহত্ত্ব দিয়েছে। যদিও মাঝে মধ্যে কুঞ্চিত হয়েছে। এসব চরিত্র লেখক ইচ্ছে করে নির্মাণ করেছেন কি না; অবশ্য বাস্তবেও রয়েছে এমন ঐন্দ্রজালিক স্পর্শ। আমরা লক্ষ করি অবক্ষয়, দ্বন্দ্ব, বিক্ষুব্ধতার ফলে সফল হয় না মোল্লা নাসির ও দুলালির প্রেমাকাক্সক্ষা; এবং মুক্তিযোদ্ধা আবু বকর সিদ্দিক মাস্টারের স্বপ্ন। অবশিষ্ট থাকে মৃত্যু, হতাশার প্রত্ন-অভিজ্ঞতা। ‘সুহাসিনীর কৃষকেরা তখন দুটো লম্বা বাঁশের উপর একটা তালাই ফেলে খাটিয়া বানায় এবং কলাপাতা কেটে এনে তার উপর পাতে, তারপর তারা কবরের খুঁড়ে তোলা আলগা মাটি সরিয়ে দুলালির অস্থি ও করোটি সংগ্রহ করে কলাপাতার উপর রাখে।… সেদিন মোল্লা নাসির উদ্দিনের কবরের পাশে দুলালির শেষ অস্থির কবর রচনা করার পর গ্রামের লোকেরা যখন শেষ বিকেলের আলোয় ভিটার উপর থেকে নেমে আসে, তারা বিস্ময়ের সঙ্গে দেখে যে, মিয়াবাড়ির ভিটার পাশ দিয়ে পুব আকাশে এক বিরাট পূর্ণিমার চাঁদ সুহাসিনীর বাড়িঘর, পথ এবং ফসলের মাঠের দিকে তাকিয়ে জেগে উঠেছে ’। [জহির ২০১৯ : ১৮৯]
মুখের দিকে দেখি উপন্যাসে মৌখিক ভাষার প্রয়োগ পাঠককে আকৃষ্ট করে। যে ভাষার গড়ন দিয়ে সমাজের প্রতিনিধি চেনা যায়। লক্ষণীয় চরিত্র নয়, একটি জনপদ হয়ে ওঠে কেন্দ্রীয় চরিত্র। ঢাকার একটি অঞ্চলে বানরের আবাস গড়ে ওঠে। সেখানে বানররা দলগতভাবে বাস করে। কিছু মানুষের সঙ্গে বানরদের আত্মীয়তা তৈরি হয়। চান মিঞা, খৈমন, খরকোস-এর সঙ্গে আরও কয়েকটি চরিত্রের উপস্থিতি দেখি। একটি সাধারণ প্রশ্নের উত্তর থেকে এ উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য আমরা পেতে পারি। ‘মুখ’ বলতে তিনি কী ইঙ্গিত করেছেন। যেক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধে নির্মিত হওয়া মানুষের স্বপ্ন, আশা, আকাক্সক্ষা এবং এসব ভাঙ্গনের বিবরণ আমরা পাঠ করি। ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থ, পুরোনো রাজনীতির খেলা, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির মতলব ইত্যাদি কারণে যে মুখ বিকৃত হয়েছে, সেই মুখ আমরা দেখি। এমন অনেক আখ্যানের সমাহারে গড়ে উঠেছে উপন্যাসের আখ্যান। এখানে জমি, বাড়ি দখলের অপচেষ্টা, ব্যক্তি আইডেনটিটির সংকট রয়েছে। বস্তুত এই আইডেনটিটির সংকট পাঠক বা সাধারণ মানুষ বিবেচনায় না নিলেও শহীদুল জহির এ সমস্যাকে সিরিয়াসলি দেখেছেন। আমরা বলব, যা নিয়ে এ দেশের মৌল সংকট তৈরি হয়েছে এবং ‘ভাসুরের নাম নিতে নেই’ বলে দৃষ্টিগত বিভ্রান্তি আছে। সেখানে তিনি যা অন্যত্র বলতে পারতেন না, তা উপন্যাসে বলে দিয়েছেন। আমরা মনে করি এখানেই শহীদুল জহিরের কৃতিত্ব। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস ও প্রতিষ্ঠায় শুধু যুদ্ধের কথা বলা হয়। এর বাইরে মানুষের নানামাত্রিক রক্তক্ষরণ আমরা ভুলে যাই। ‘চান মিঞার জন্ম একাত্তর সনে,… সেই জন্য তার নাম হয়তো হতে পারত বিজয় মিঞা―যা হোক, একাত্তুর সনে খুবই কষ্ট ও বিপদের মধ্যে খৈমন সন্তান এবং স্বাধীনতার জন্য প্রতীক্ষায় থাকে। পাকিস্তানি মিলিটারি যখন বাঙালি মারা শুর করে, তখন খৈমনের পেট বোঁচকার মতো গোল হয়া ওঠে, তার পায়ের পাতা ফুলে যায় এবং সে একটা গাভিন বিপর্যস্ত মহিলা বিলাইয়ের মতো তাদের ঘরের ভিতরে ছায়ার মতো হাঁটে-তখন রাজাকার কমান্ডার আসে, অথবা রাজাকাররা হয়তো আসে তার আগে।… চান মিঞা তো পোঁটলার পোলা এবং লেদু তর্ক করতে চাইলে সে বলে, কী কচ তুই, অয় তো পোঁটলার ভিতর থন বাইরইছে, মায়ের প্যাট হয় নাইকা!’ [জহির ২০১৯: ২৪৩-২৪৭]
১৬ ডিসেম্বর চান মিঞার কান্নার শব্দ শুনে ভূতের গলির মানুষ। তার জন্ম নিয়ে রাজাকার কামান্ডার গণি বাজে কথা বলেছে, তাকে খৈমন কথার উত্তর দিতে খোঁজ করে চানের জন্মের পর। কিন্তু পায় না। ‘খৈমনের জীবনে চান মিঞা এবং স্বাধীনতা আসে, কিন্তু তারা আবদুল জলিল, রশিদুল এবং ময়না মিঞাকে হারায়’। একদল লোক বিনা বাধায় মামুন মিঞা ও খ্রিস্টান সোসাইটির জায়গা জমি দখল করে নেয়। এতে সহযোগী ছিল বান্দরবাহিনী। এই বান্দরবাহিনী খৈমনের জীবনে প্রভাব সৃষ্টি করে। আবার চানমিঞাকে দুধ খাওয়ায় এক বান্দরনি। অর্থাৎ বানরসমাজেই চান মিঞার বড় হয়ে ওঠা আমরা প্রত্যক্ষ করি। বাহ্যিকভাবে হয়তো আমরা অনেক ঘটনাই দেখি, ঘটনার ভেতরে সংখ্যালঘু এক সম্প্রদায়ের টানাপোড়েন লক্ষ্য করি। আরও রয়েছে প্রেমের জন্য হাহাকার। এ উপন্যাসেও আছে অনেক তলের সমাবেশ। যা ক্রমশ জটিল থেকে জটিল হতে থাকে। যেমন সাধারণ বিবরণের মধ্যে ঠাট্টার বিষয়কে কেমন সিরিয়াস করে তুলেন লেখক; চান মিঞার পরোক্ষ মনোবাসনায়। খ্রিস্টানকন্যা জুলির বিয়ের তারিখ ঠিক হলে এবং চানমিঞার লেখাপড়া বিষয়ে কথপোকথনে চানমিঞার মনোভঙ্গি ও বাসনা প্রকাশিত হয়; একই সঙ্গে উদ্ভাসিত হয় সামাজিক মনস্তত্ত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গি। ‘সে তাকে একটা ড্রেস বানায় দিতে চায়, হয়তো তার বিয়া উপলক্ষেই দেবে, এবং এজন্য জুলির কোমরের মাপ তার দরকার, তোমার কোমরের মাপটা আমাকে দিবা, সে বলে, এবং জুলি কাগজের ঠোঙায় তার একটা পেন্টি দিয়া দেয়; চান মিঞা র্যাব এবং খরকোশের চোখে ধুলা দিয়া এইসব করে, সে জুলির ফুলতোলা নাইলনের পেন্টি নিয়া যায়া জিঞ্জিরার এক কামারকে দেয়, কামার চানমিঞার নির্দেশ এবং পেন্টির মাপ অনুযায়ী স্টিলের পাত দিয়া একটা কবজাঅলা চেস্টিটি বেল্ট বানায়―দেহ বর্জ্য ত্যাগের জন্য নিচের দিকে ব্যবস্থা রাখে’। [জহির ২০১৯ : ৩২২]
আবু ইব্রাহিমের মৃত্যু উপন্যাসের শুরুতে একটি কাব্যাংশ লেখক উল্লেখ করেছেন, ‘মানুষের মৃত্যু অবশ্যই হয়, …পালকের চেয়েও হাল্কা’। এ কথা বলেছেন এ জন্য যে, একজন নিঃসঙ্গ আবু ইব্রাহীমের মৃত্যুর পাঠ দিয়ে বয়ান শুরু হয়। ‘সিরাজগঞ্জ শহরের কালীবাড়ি রোডে, মমতাদের বাড়ির প্রাঙ্গণে, পেয়ারা গাছতলায় শববাহকেরা যখন আবু ইব্রাহীমের লাশসহ খাটিয়া কাঁধে তুলে নেয়… সেদিন গভীর রাতে ঢাকার বেইলি রোডের সরকারি কলোনিতে আবু ইব্রাহীম মমতাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে ব্যালকনিতে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলেছিল সারস পাখির ঝাঁক উইড়া যাইতাছে, শোনো’। [জহির ২০১৯: ৩২৯]
এ মৃত্যু সত্যি পালকের চেয়ে হালকা। কারণ সে পারিবারিক জীবনে সুখী ছিল না। একজন সাধারণ কর্মচারী হিসেবে আবু ইব্রাহীম সৎ জীবন যাপন করতে চেয়েছে। যে কারণে আয় বাড়াতে ভিন্ন পথের আশ্রয় নেয়নি, নিতে পারেনি। তার সহকর্মী বন্ধুরা নানা পথে আয় বাড়িয়ে ঢাকা শহরে ফ্ল্যাট বা নিজস্ব বাড়ির মালিক হয়ে যায়। পারিবারিক জীবনে কারও আবদার পূরণ করতে পারে না সে। সংসার, প্রেম সবকিছুতে ব্যর্থ হলেও সততার পরীক্ষায় সে জয়ী হয়। নিজের জীবনের কাহিনি ডায়রিতে লিখে সন্তুষ্টি পাওয়া ছাড়া তার আর কোনও আশ্রয় ছিল না। এক সময় তার স্ত্রী সন্তানসহ না বলে চলে যায়। অর্থাভাবে বন্ধু সিদ্দিকের জোরাজুরিতে আগ্রহী হলেও ফ্ল্যাটের জন্য রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা হয় না। অনৈতিকভাবে খালেদ জামাল কিছু টাকা দিলেও সে নিজের কাছে রাখতে পারে না। এসব টানাপোড়েনের মধ্যে সেই টাকা নিয়ে বিপদে পড়ে। একদিন অফিস যাবার পথে সঙ্গে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছিনতাইকারীদের একজন তার হৃৎপিণ্ডের ভেতর চাকু ডুবিয়ে দেয়। এভাবে পালকের চেয়ে তুচ্ছ এক মরণ আবু ইব্রাহীমকে গ্রাস করে। এ মৃত্যুর নীরবতা যেভাবে বর্ণনা করেন শহীদুল জহির : ‘তখন দূরের দালানকোঠার ভেতর দিয়ে পূর্ণিমার চাঁদ উঠে কড়ুইগাছের পাতার ফাঁকে গ্যাস বেলুনের মতো লটকে থাকে এবং জ্যোৎস্নার ফ্যাকাশে আলোয় একটি প্যাঁচা উড়ে এসে মাদারগাছের ডালে বসে এদিক-ওদিক তাকায়। তারপর পেঁচাটি হঠাৎ উড়ে গিয়ে যখন ঘাসের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন একটি ছুঁচো তীক্ষè আর্তচিৎকার করতে করতে আগাছার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ছুটে যায়, পেঁচা এঁকেবেঁকে অনুসরণ করে, বারে বারে ছোঁ মেরে নেমে আসে’। [জহির ২০১৯ : ৩৮২]
এ ছাড়াও মেহেরনি, চন্দনবনে, উড়াল উপন্যাসেও তিনি একই সূত্রে নিরীক্ষা করেছেন বিভিন্নভাবে।
২.
শহীদুল জহিরের গল্প, প্রচল গল্প থেকে অবশ্যই আলাদা। ব্যক্তি, সামষ্টিক, সমগ্রতার বয়ানই তাঁর উপস্থাপনার লক্ষ্য। এর মধ্যে মানুষের দ্বন্দ্ব-বিক্ষুব্ধতার অবয়ব অবশ্যই রয়েছে। জীবনের গভীরে গেলে তা অনিবার্য হয়ে ওঠে। যে বিষয়ে পাঠক হয়তো খেয়াল করেছেন, প্রতিবেদনের নির্মাণ কৌশল উপন্যাস ও গল্পে ব্যবধান তৈরি করেছে, তা কিন্তু নয়। শৈলী, ভাষা ও বিষয় নির্বাচনে ক্রমশ উচ্চকিত হওয়ার নিরীক্ষা উজ্জ্বল। গল্পেও আঞ্চলিক ভাষার স্থানিক বৈশিষ্ট্য অবিকল থাকা, অর্থাৎ আঞ্চলিক, ব্যক্তিক উপভাষা প্রয়োগে মুনশিয়ানা রয়েছে না বলে, যথার্থ বলব। আবদুল মান্নান সৈয়দের মন্তব্য এক্ষেত্রে বিবেচনাযোগ্য। “আদি গল্প রচনার কাল ১৯৭৪ এবং অন্তিম গল্প রচনার কাল ২০০৩। এই ত্রিশ বছরে ব্যাপ্ত ১৮টি গল্পের পর তিনি কত পরিণত হয়েছেন সেটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। ১৯৭৪ সালে রচিত ‘ভালোবাসা’ এবং ২০০৩ সালে প্রণীত ডলু নদীর হাওয়ার মধ্যে অনেক ব্যবধান। আবার তার তাবৎ গল্প থেকে শহীদুল জহিরের একটি চরিত্রই উদ্ভাসিত হয়, সমাজের অন্ত্যেবাসী মানুষের জীবন-যাপনের চিত্রণই তার লক্ষ্য। বহির্জীবনই অনেকখানি, তারই মধ্য দিয়ে অন্তর্লোকে যাত্রা। এ বহির্জীবনের পটভূমি বাংলাদেশ, গল্প শুধু ঢাকা শহর নয়―ঢাকার বাইরেরও কোনো কোনো স্থান নির্বাচন করে নিয়েছেন এবং গভীর সত্যতা ও নিবিষ্টতার সাথে তার রূপায়ণ ঘটিয়েছেন।” [সৈয়দ ২০১১ : ২৭০-২৭১]
তা হলে কোন শ্রেণির মানুষের গল্প বলেছেন শহীদুল। মার্কসীয় শ্রেণিতত্ত্বে সচেতন ছিলেন তিনি। একই সঙ্গে ছিলেন অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির লেখক। এর প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর শিক্ষাজীবন পর্বে। কমবেশি সকল গল্পেই এর স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। কখনও তিনি সরাসরি শ্রেণি অধিকারের কথা বলেছেন। শোষণ, উৎপাদনসম্পর্কের হেতু ও বিচ্ছিন্নতাজাত মানুষের ক্রূরতা এবং হিংসা আমরা লক্ষ করি তাঁর গল্পে। প্রথম দিকের গল্পগুলোতেই তা প্রতিভাত। তোরাব শেখ, পারাপার, মাটি ও মানুষের রং ইত্যাদি গল্পে। সামান্য তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে বস্তিবাসীর মধ্যে যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, এমন একটি চিত্র লক্ষ করি তোরাব শেখ গল্পে। তোরাব অভিমানে বাইরে চলে যায় আর আসে না। এ ফিরে না আসা বিবিধ বার্তা তৈরি করে।
আমরা গল্পগুলোকে ঠিক আলাদা বর্গে ভাগ করতে পারি না, আবার একও করতে পারি না। অর্থাৎ তাঁর লক্ষ্য থেকে তিনি কখনও বিচ্যুত হননি। সব গল্পেই সংকট, সংশয়, দ্বন্দ্ব, সংঘাতের রূপায়ণ দেখি। তবে সতর্ক থাকতে হয় তাঁর গল্প নির্মাণ ও সংকটসমূহ উপলব্ধির প্রশ্নে। সুহাসিনী, মৈশুন্দি, রায়সাবাজার, লক্ষ্মীবাজার, তালতলা, ভূতের গলি ইত্যাদি আমাদের পরিচিত এবং চেনাজানা সংকট তিনি অন্যভাবে বলেন। আমরা কয়েকটি গল্প থেকে তাঁর বাকি গল্পগুলোর বার্তাকে শনাক্ত করতে পারি। ইকোলজি-সংবেদন ও পরাবস্তবতার নিরীক্ষায় ‘আগারগাঁও কলোনিতে নয়নতারা ফুল কেন নেই’ গল্পটি উপস্থাপিত। পরাবাস্তবতার প্রয়োগ বা ছায়া আরও অনেক গল্পেই রয়েছে। এ গল্পের বার্তাটি তালতলাস্থ কলোনির ভূকম্পনের মতো পাঠকমনেও কম্পন তৈরি করে। তালতলা কলোনির আবদুস সাত্তারের বাসায় নয়নতারা ফুলগাছ বেঁচে থাকে না। প্রশ্ন হলো―কেন বাঁচে না। এ নয়নতারা গাছে ফুল ফোটানোর প্রচেষ্টায় অবশেষে সাত্তারের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। বাসার বারান্দায় নয়নতারার সঙ্গে অন্যান্য ফুল ও পাতাবাহারের গাছ লাগানো হয়েছিল। কিন্তু নয়নতারা গাছের কোনও উন্নতি হয় না। প্রজাপতিরা আসে আবার দোলা দিয়ে ফিরে যায়। এর মধ্যে আবদুস সাত্তার ও শিরীন বানুর দাম্পত্য প্রসঙ্গ ও ১৯৭০ সালের স্মৃতি বিবৃত হয়। হঠাৎ একদিন ভূমিকম্প হলে বারান্দার গাছগুলো ছিটকে পড়ে এদিক সেদিক। একইসঙ্গে নয়নতারা গাছও। ভূমিকম্পনের কারণে আবদুস সাত্তার মাটিতে পড়ে গেলে মাথা থেঁতলে আহত, এরপর মারা যায়। তার মৃত্যুর পর আবার তুলে আনা হয় গাছগুলো। নয়নতারা গাছগুলো ক্রম শুকিয়ে যায় ও পাতা ঝরতে থাকে। আবার কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শে বারবার গাছ লাগানো হলেও বাঁচে না। অবশেষে কৃষি কর্মকর্তা নয়নতারা চাষের বিপক্ষে মত দেন। সে নোট লেখে ‘নয়নতারা (ঠরহপধ জড়ংবধ) গাছগুলো আরামেই ছিল; কিন্তু ভূমিকম্পের ফলে একটি পরিবর্তন ঘটে যায়। দুটো টবের গাছ মৃত ব্যক্তিটির মগজের নির্যাসের সংস্পর্শে আসে। ভূমিকম্পের পর অন্য গাছগুলোকে যখন তোলা হয়, তখন তারা ভালোই থাকে; কিন্তু মৃত ব্যক্তি যে দুটো ঝোপকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল তাদের উপরে ওঠানো মাত্র তারা মরতে শুরু করে এবং অন্য গাছগুলোও আক্রান্ত হয়’। [জহির ২০১৯ : ৬০]
গল্পের উপান্তে বলা হয় ‘গাছগুলো স্রেফ আত্মহত্যা করে’। টবাশ্রিত অন্য সকল গাছের কোনও ক্ষতি হয় না, কুলক্ষণও স্পর্শ করে না। তবে কেন নয়নতারার ক্ষেত্রে তা ঘটে। এমন ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটতে থাকে। আত্মহত্যার ক্রিয়া একটি গাছ থেকে অন্য গাছে ছড়িয়ে যায়। এখানে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে প্রজাপতি। এসব ঘটনা বাস্তবে আদৌ কী সম্ভব। তবে প্রতিস্থাপন করে অবশ্যই এ জাতীয় সংশয়ের ধারাপাত জানা সম্ভব।
আবার কাকপাখি ঠোঁটে ধরে উড়িয়ে নিয়ে যায় মানবসন্তান, কেউ জানে না। হয়তো মুক্তির পথ খোঁজ করি আমরা সারাক্ষণ। পীড়িত বঞ্চিত আর ক্রম নিয়তি-নির্ধারিত নির্যাতনের শিকার কাঠুরে ও দাঁড়কাক গল্পের আকালু ও টেপির যেমন মুক্তির আর কোনও পথ খোলা ছিল না। টেপির অতিকথন বন্ধ করতে আকালু কবজ-তাবিজের আশ্রয় নেয়। এরপরও সে গাছ, পাখি আর প্রাণির সঙ্গে কথা বলে। পৃথিবীতে মানুষের কাছে আশ্রয় না হলে প্রকৃতির অন্য অনুষঙ্গেই জীবনের মুক্তি খোঁজা স্বাভাবিক। তারা বহুবার স্বপ্নে বিভোর হয়, কিন্তু প্রতিবারই লুণ্ঠন আর বিপদের সম্মুখীন হয়। সামান্য, ক্ষুদ্র আয় উপার্জন হলে এসব চলে যায়। আকালুর ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। মহল্লার লোকসমাজ লাঠি, বল্লম, লোহার রডসহ আক্রমণ করে। তারপর একদিন প্রচারিত হতে থাকে ‘ওই কাকেরা বাঁশের আড়া ছেড়ে উড়ে যাওয়ার সময় আকালু ও টেপিকে ঠোঁটে করে নিয়ে যায়। কিন্তু একই সঙ্গে রাস্তায় অপরিষ্কৃত আবর্জনার স্তূপ জমে যেতে থাকে এবং শহরের আকাশ পাখিহীন একঘেয়ে হয়ে ওঠে। এভাবে বহুদিন কেটে যায়, তারপর আশেপাশের মফস্সলের এই কাকেরা নতুন প্রজন্মের কাকের জন্ম দিয়ে শহরের আকাশ পুনরায় ভরে তোলে’। [জহির ২০১৯ : ৭৯]
এ গল্পের শুরু হয়েছে কাকশূন্য ঢাকা শহরের স্মৃতিচারণে। হিংস্রতার কারণেই এ-শহর হয়ে যায় পাখিশূন্য; প্রকৃতি সংশ্লিষ্ট মানুষের বসবাসের অযোগ্যতাকে নির্দেশ করেছেন লেখক। অথচ কাকপাখি মানুষের কাছে কুৎসিত হলেও কিন্তু পরিবেশবান্ধব। তিনি বোঝাতে চান মানুষের সঙ্গ মানুষের জন্যই যন্ত্রণাদায়ক, মৃত্যুতুল্য। এর বিপরীতে প্রকৃতি, পশুপাখিদের সংশ্রবে জীবন্ত হয়ে ওঠে মানুষ।
ডুমুরখেকো মানুষ গল্পে আবর্তিত হয় তাঁর পছন্দের শৈলী। গল্প শুরুর একটি বাক্য―‘তার মুখে একটি রহস্যময় হাসি ঝুলে ছিল’। তারপর একটার পর একটা রহস্যের ভাঁজ তৈরি করেন লেখক। মানুষ জীবনের দীর্ঘ পরিভ্রমণ শেষে আবার শূন্যতারই সারাংশ ধারণ করে। অস্তিত্বের উৎস থেকে এখন পর্যন্ত ইতিহাসের কী শিক্ষা, তা সব জেনেও স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের জাল বুনে গভীর অতলে। গল্প পাঠ শেষে মনে হয়, আমরা সকলেই যে যার মতো ডুমুরখেকো অস্তিত্ব; ডুমুরখেকো জাদুকর। এমনই কিসসার গল্প নিয়ে ঘুরছি আমরা সকলেই, একটাই লক্ষ্য―জীবনকে যাপন করা। আমরা অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের খোঁজ, স্থানিক, কালিক, দূরান্তের জাদুকরের ইঙ্গিত বা সঙ দেখে অস্থিরতার অসুখে আক্রান্ত হই। ডুমুরখেকোদের মতো আত্মসমর্পণ করি। ডুমুরের পেছনে নয়, আসলে মানুষ স্বীয় লালসা, বাসনার পেছনে ছুটতে থাকে। এটা মনুষ্যজীবনের এক অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা। শহীদুল জহিরের জাদুকর মোহাব্বত কী বলতে চেয়েছে, তার ডুমুর আর হাড়ের ইশারায় তার পোঁটলার ভেতর কী রয়েছে; একবার বলে ‘প্রীতিলতা’ আবার বলে ‘হাড্ডি’― আবার সে নিজেই জনসমাবেশকে অস্তিত্বহীন করে জিজ্ঞাসায়, ‘আপনেরাও হাড্ডি ?’ সকলেই এক সময় ডুমুরের খোঁজে অস্থির হয়। এ অস্থিরতার সুযোগে শহরের বিভিন্ন স্থানে ডুগডুগি বাজিয়ে ডুমুর বিক্রি ও ডুমুরের মাহাত্ম্য প্রচার করে। ফলে সকলেই ডুমুরগাছ কিনতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। তবে মোহাব্বত ডুমুরগাছ বিক্রি করতে সম্মত হয় না। পাঁচজন ডুমুরখেকো জাদুকরের প্রাসাদসম বাড়িতে সমবেত হয়। তারপরও জাদুকর সম্মত হয় না, বলে ডুমুরগাছ বিক্রি করা হয় না। উল্টো মোহাব্বত ধমক দেয় ও ফিরে যেতে বলে। সম্মত না হলে, ‘আধো-অন্ধকার রহস্যময় পরিবেশে পাঁচ জন অপরিণামদর্শী ডুমুরখেকোর চেতনায় ওলট-পালট ঘটে যায়’। তারা একত্রে জাদুকর মোহাব্বতকে আক্রমণ করে বসে। ইমারত ভাঙ্গার শব্দ হলে তারা সম্বিৎ ফিরে পায়। তখন তারা ইমরাত, অট্টালিকা, সিংহদরজা কিছুই দেখে না। কিন্তু তারা নিজেদের আবিষ্কার করে কাঠচেরাইয়ের কারখানায়। সকলের শরীরে রক্তের দাগ। হাতের অস্ত্রগুলো ফেলে দেয়। ঘোর কেটে গেলে ‘এই পাঁচজন ডুমুরখেকো… লক্ষ্মীবাজারে, পদ্মনিধি লেনের গলিতে, নারিন্দা অথবা দয়াগঞ্জে, কলতাবাজার অথবা রোকনপুরে, অথবা কাগজিটোলায়, অথবা শাহ সাহেব লেনে, অথবা বনগ্রামে তাদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়।… এইসব মহল্লার লোকেরা ডুমুরভক্ষণকারী এইসব লোকের কথা বলে, তারা তাদের ডুমুর খাওয়ার আনন্দ এবং বেদনার কথা বলে, এবং তাদের অপরিণামদর্শিতার পরিণতির কথা বলে’। [জহির ২০১৯ : ৮৯]
‘কাঁটা’ গল্প স্মরণ করিয়ে দেয় সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর একটি তুলসীগাছের কাহিনি গল্পকে। যে গল্পের সমস্যা ওই তুলসীগাছের শক্তি। বিষয়টি প্রতীকী অর্থেই উত্থাপন করেছেন লেখক। যে বিষয়ের দিকে তিনি ইঙ্গিত করেছেন যে সংকটের শুরু হলো কখন। তিনি স্পষ্ট না বললেও বোঝা যায় এর উৎস আরও অতীত, গভীরে। আমরা প্রথমেই বলে রেখেছি, কীভাবে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলের ছায়ায় ঘোরতর সংকটের উৎপত্তি ঘটে। যা থেকে তৈরি হয় মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সংকট। লেখকের থিমও অসাধারণ। লেখক ইঙ্গিত ও স্মরণ করিয়ে দেন―সুবোধচন্দ্ররা বার বার কুয়োতে নিপতিত হয়। মানে তাদেরকে কুয়োর মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়। এ ছুড়ে ফেলার চর্চা ছিল অতীতে, বর্তমানেও আছে এবং ভবিষ্যতে থাকবে। ‘কাঁটা’ গল্প শুরু হওয়ার ভাষা লক্ষ করি, ‘ভূতের গলির লোকদের জীবন দীর্ঘদিন যাবৎ একটি সংকটের ভেতর দিয়ে পার হয় বলে জানা যায়; বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আশির দশকে দ্বিতীয় শাসনের কাল শুরু হয়,…’। [জহির ২০১৯: ১০৫]
শুধু কি ভূতের গলিতে, নাকি দেশব্যাপী সংকট ? তাঁর বর্ণনাই বলে দেয় সংকট ব্যাপক ও গভীরতর। একটি পর্যায়ে ওঠে আসে গলিতে আশ্রিত ভাড়াটিয়া সুবোধ ও স্বপ্নার বিসর্জনের প্রসঙ্গ। যুক্ত হয় পরানের পতন। তাদের পতন অনিবার্য করে তুলে রাজনৈতিক শাসনের দুর্বলতা, সামরিক শাসনের অপকর্ম, রাজনীতিতে হত্যাজনিত ঘটনার আবর্তন ইত্যাদি। সমস্যার পর সমস্যা; আবার সুবোধ-স্বপ্না কীভাবে হারিয়ে যায়। এ দেশের জনমানুষের জীবনে কালরাত্রি নেমে আসে একাত্তর সালের পঁচিশে মার্চ। শুরু হয় গণহত্যা। পাকিস্তান সেনারা অতর্কিতে আক্রমণ ও ঢাকা শহর রক্তাক্ত করে। এ সময়ই পালাতে চায় অনেকে। তবে তাড়া খেয়ে আবার ফিরে আসে সুবোধ-স্বপ্না। প্রাণে বাঁচার জন্য সুবোধ কলেমা শেখে, স্বপ্না সিঁদুরের টিপ দেওয়া বন্ধ রাখে, শাঁখা পরায় বিরত থাকে। মহল্লার লোকজন, পাকিস্তান সেনাদের সহচর রাজাকার বাহিনী তাদের খোঁজ রাখে উৎসুক হয়ে, কেউ শত্রু ভেবে। তবে অধিকাংশ লোকজন তাদের বাঁচতে চেয়েছে। মহল্লার লোকজনের সন্দেহ-সংশয়ে দোলাচলের কারণে অবশেষে তাদের আর শেষ রক্ষা হয়নি। ‘পাকিস্তানি মিলিটারি যখন আবুবকর মওলানার সঙ্গে আজিজ ব্যাপারীর বাড়িতে আসে তখন তারা আজিজ ব্যাপারীর বাড়ির ভেতরের এই বড় ঘরটিতে একদল লোককে মিলাদ পড়তে দেখে।… হিন্দুরা মিলাদ পড়ে নিহি, কিন্তু আবুবকর মওলানা যখন জানতে চায় তুলসীগাছ কে পূজা করে…, দুজন সেপাই এগিয়ে লাইনের প্রথম ব্যক্তিকে বলে লুঙ্গি উঠাও… সেদিন লাইনে দাঁড়ানো লোকেরা একে-একে লুঙ্গি উঠিয়ে দেখায়, সম্ভবত সুবোধচন্দ্রের সঙ্গে যে দাঁড়িয়েছিল সে তাকে ঝাপটে ধরে কুয়োর পাড়ের উপর দিয়ে ঠেলে ভেতের ফেলে দেয়।… সেদিন আজিজ ব্যাপারীর কুয়োতলায় তিনজন গুলি খেয়ে মরে এবং কুয়োর ভেতর পড়ে মরে সুবোধচন্দ্র। ভূতের গলির লোকেরা এই কথাটা ভুলতে পারে না যে, একাত্তর সনে সুবোধচন্দ্রকে তারাই কুয়োর ভেতর ফেলে দেয়’। [জহির ২০১৯ : ১১৯]
পুরো ঘটনা মহল্লাবাসীর কাছে আপাত স্বপ্নের মতো মনে হলেও তারা বারবার স্মরণ করে। কারণ এমন ঘটনার সঙ্গে তাদের জানাশোনা রয়েছে। ফলে তারা ভুলতে পারে না কখনও। আরও সমস্যার জন্ম দেয় স্বপ্নার বপন করা তুলসীগাছ। ‘তাদের মনে হয় যে, সুবোধ ও স্বপ্নার বিষয়টি হয়তো সত্য নয়, স্বপ্ন; কিন্তু তখন তাদের আবদুল আজিজ ব্যাপারীর বাড়ির প্রাঙ্গণে লাগানো তুলসীগাছটির কথা মনে পড়ে, তারা আজিজ ব্যাপারীর বাড়িতে যায় এবং দেয়ালের কিনারায় মৃদু বাতাসের ভেতর তুলসীগাছটিকে দেখে; এবং তখন তাদের কুয়োটির কথা মনে পড়ে।’ [জহির ২০১৯: ১২৪]
আরেকটি গল্প কোথায় পাব তারে গড়ে উঠেছে এ মৈশুন্দি, ভূতের গলিকে কেন্দ্র করে। এখানেরও ব্যক্তি হলো আবদুল আজিজ ব্যাপারী। কিন্তু নাম একই হলেও গল্পের পটভূমি ভিন্ন। নিঃসঙ্গ আবদুল করিম চাইলেই সঙ্গহীন থাকতে পারে না। নিজে নয় প্রতিবেশীরা তাকে খেয়াল রাখে বেশি। এ জীবন যাপন আমাদের সকলেরই। গল্প ও ঘটনাহীন করিম এ যাপন থেকে বের হতে পারে না। আবদুল করিম মৈমনসিংহ যেতে বলে আর যেতে পারে না, বিভ্রান্তি তাকে গ্রাস করে রাখে। অবেশেষে কেউই কোনও লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না। মাঝখানে বিভ্রান্তি ও অভ্যস্ততার আবর্তে জীবন আটকে থাকে। লেখক বলেছেন ‘মহল্লায় আবদুল আজিজ ব্যাপারী ডালপুরি খাওয়ার অভ্যাস বাদ দিতে পারে না, …যখন আবদুল করিমকে দেখে তাকে পুরি খেয়ে যাওয়ার কথা বলে, আহো ডাইলপুরি খায়া যাও, তখন আবদুল করিম তার বৈঠকখানায় বসে ডাল অথবা আলুপুরি খায়, এবং বলে হালায় আলু দিয়া ডাইলপুরি বানায়’। [জহির ২০১৯: ১৮৭]
এ বিসর্জিত জীবনযাপনের প্রবাদতুল্য ইঁদুর-বিলাই খেলার ইশারা সকলেই জানে। আমাদের সামষ্টিক নির্জ্ঞান অবচেতনে স্থায়ী হয়ে আছে ইঁদুর-বিলাই প্রসঙ্গ। বহমান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। স্মৃতিকাতর জীবনে অনেকেই ইঁদুর-বিলাই খেলায় ইঁদুর বা বিলাই চরিত্রের অভিনয় করে থাকবেন। খেলার ছকটিও অজানা নয়। তবু শহীদুল জহির অসামান্য গাণিতিক অথচ গীতল ভাষায় বয়ান করেছেন খেলার গল্প। ইন্দুর-বিলাই গল্পে কত চেনাজানা বিষয়কে রূপকের মাধ্যমে শৈল্পিক করে তুলেছেন শহীদুল জহির। এর আগে খেলার নিয়মকানুন বিধৃত করেছেন। আমাদের নিয়ে গিয়েছেন বাল্যকৈশোরে চোর-পুলিশ, শত্রু-মিত্র খেলার মতো নস্টালজিয়ার গহ্বরে।
এ দেশের জনমানুষের জীবনে একাত্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। ওই সময়ের স্থানীয় রাজাকার কমান্ডার ও বাহিনীর সঙ্গে এলাকাবাসীর বোঝাপড়ার খেলা শুরু। তবে খেলার পদ্ধতি অজানা থেকে যায়। এক সময় রাজাকারদের আমন্ত্রণে ভূতের গলিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আসে এবং তাদের কর্মকাণ্ড শুরু করে। তখন এ গলির লোকজন পালাতে শুরু করে। গলি, মহল্লায় কোনও লোক আর দেখা যায় না। এতে পাকিস্তান সেনারা খুব বিরক্ত হয়। এ খেলাসূচক গল্পের মাধ্যমে একটি দীর্ঘ সময় এবং ওই সময়ের নির্মম বাস্তবতাকে উত্থাপন করেছেন লেখক। ইঁদুর হওয়ার কথা না, তারা একসময় ইঁদুর হয়েছে; বিলাই হওয়ার কথা নয়, তারাই বিলাই হয়েছে। লেখক জানাচ্ছেন, ‘লেফটেন্যান্ট শরিফ পুনরায় বিরক্ত হয় এবং গফুর মওলানার পরামর্শে তারা পুনরায় পাঁচ-দশটা বাড়ি পোড়ায়। কিন্তু লেফটেন্যান্ট শরিফের বিরক্তি কমে না; সে যখন বলে, রাজাকার লোগ কেয়া কারতা, ইয়ে শালে চুহা লোগকো ভাগনেছে কিউ রোকতা; …পুরো একাত্তর জুড়ে মহল্লার কালো ভাঙ্গা বাড়িঘরের ভেতর ভূতের গলির লোকেরা ইন্দুরের মতো বাস করে,… এবং ভূতের গলির লোকেরা বলে যে, তারা ইন্দুর-বিলাইয়ের কথা ভুলে যায়; অথবা তারা হয়তো আসলে ভোলে না’। [জহির ২০১৯: ২২৭]
এ গল্পে খেলার ছলে শ্লেষাত্মক বক্তব্যও রয়েছে। বস্তুত এ গল্পে ইশারায় চাবুক মেরেছেন অসঙ্গত এ-সমাজের গায়ে। শুধুই ব্যক্তির স্বার্থপর উন্নতির খেলায় আমরা পরাজয়কে পরম গৌরবে মেনে নিচ্ছি। এ গল্পকাঠামো যেমন গল্পের প্রথাকে ভেঙ্গেছে, তেমনি সমাজ উপলব্ধির বয়ানও ব্যতিক্রম।
স্বাধীনতাউত্তরকালে এ দেশের রাজনীতি, সমাজে ইঁদুর-বিলাই খেলা কখনও থামেনি। রাজনীতি, নির্বাচন, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কাজেও এই খেলা চলমান থাকে। শুধু ব্যক্তি, পরিপ্রেক্ষিত ও পরিবেশ বদলানো দেখি। কিন্তু খেলার চরিত্র বিভিন্ন আঙ্গিকে ফিরে আসে। বিভিন্ন অনুষঙ্গে এই খেলার অবয়ব তিনি বর্ণনা করেছেন। সেরকম একটি পর্যায়ের একটি অংশ লক্ষণীয়। ‘তখন মহল্লায় এবং দেশে ইলেকশন আসে, আমরা ইন্দুর-বিলাই, রান্দা-বাড়ার পাশাপাশি নতুন একটা খেলা পাই, খেইলের নাম, ভোট দিবেন কিসে;… ভোট দিবেন কিসে ? রকেট মার্কা বাক্সে।/ তোমার ভাই, আমার ভাই। মিলন ভাই, মিলন ভাই।/ …কালাম ভাই যেখানে, আমরা আছি সেখানে।/ মিলন ভাই যেখানে, আমরা আছি সেখানে।’ [জহির ২০১৯: ২৩৯]
মূলত মুক্তিযুদ্ধে দেশ মুক্ত, স্বাধীন হলেও এ দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আসেনি। বরং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী একটা সাংস্কৃতিক আবহ বিকশিত হয়। এছাড়া একটি স্বাধীন দেশে সাধারণ মানুষ সততার সঙ্গে দেশগড়ার সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার কথা। কিন্তু নেতৃত্বের দুর্বলতা, সামাজিক বিপ্লবের অঙ্গীকার না থাকার ফলে এ খেলা কখনও শেষ হয় না। ‘বুইড়া হয়ে গেলে বা মরে গেলে অথবা খেলতে খেলতে ক্লান্ত বা বিরক্ত হয়ে গেলে কিংবা জীবনে হঠাৎ দরবেশি ভাব দেখা দিলে কেবল বিলাইরা ইচ্ছা করে খেলা ছেড়ে যেতে পারে, ইন্দুররা পারে না; বিলাই খেলতে চাইলে ইন্দুরকে খেলতে হবে’। [জহির ২০১৯: ২৪৩]
ডলু নদীর হাওয়া গল্পে আবার ভিন্নরকম খেলার উপস্থাপনা লক্ষ করি। ‘তিনটা প্রবেশপথের বিষয়ে দুই স্তর বিশিষ্ট শিকার-শিকারি খেলার একটা বিশ্লেষণ দাঁড় করায়’। এখানে খেলার একটি ছকও লক্ষণীয়। সকলেই জানেন, সকল পরিবেশে পুরুষ নারীর ওপর আধিপত্য বিস্তার করে। এখানে এ আধিপত্য বিস্তারের প্রতিশোধে সমর্তবানু বা এলাচিং তৈমুর আলিকে মারতে চায় জহর দিয়ে। এ লক্ষ্যে সে প্রতিদিন দুধের সঙ্গে বিষের গ্লাসও পান করতে দেয়। কিন্তু আরও ঘটনার কারণে বাস্তবায়িত হতে দেরি হয়। প্রতিশোধের এই খেলা চলমান থাকে চল্লিশ বছর। তৈমুর এক পর্বে এলাচিংকে বিয়ে করে; কিন্তু গৃহপ্রবেশ উপলক্ষে তার পা ভাঙ্গে, আহত হয়। কিন্তু তৈমুর কীভাবে বিপদে নিপতিত হলো এবং তাদের পরিচয় দিতে লেখক বলেছেন, ‘আক্ষরিক অর্থে সমর্তবানুর ফান্দের গর্তে পড়ে যাওয়ারও আগে, যখন ডলু নদীর কিনারায় তার সঙ্গে দেখা হয় তৈমুর আলি তখনই জাদুর জালে আটকা পড়ে, কারণ সমর্ত হচ্ছে আরাকানের অঙমেচিংয়ের মেয়ে এবং আরও একটা মগ নাম আছে, এলাচিং। এই মেয়ের খপ্পরে পড়ে যায় তৈমুর আলি; সমর্ত বা এলাচিং সবকিছু পরিকল্পনা করে ঘটায়; এবং গোলেনুর বলে মাইয়া ফোয়া ইবা গম নঅয়’। [জহির ২০১৯ : ২৭১]
এর মাঝে উপস্থিত হয় এলাচিং এর প্রেমিক সুরত জামাল। তাকে কাছে থেকে সরানোর জন্য আলিকদম পাঠিয়ে দেওয়া হয়। লক্ষণীয় তৈমুর প্রথম থেকেই একটি জাল বা ফাঁদে পড়ে যায়। সারা জীবন এ জাল সে অতিক্রম করতে পারেনি। এলাচিং-এর প্রতিশোধ ও হত্যাপ্রকল্প জারি থাকে তার মৃত্যু পর্যন্ত। লেখক বলেছেন, শালিখ দেখার ঘটনাই নিয়ে যায় বিপদের দিকে; এবং এই বিপদের কারণ বাড়তে থাকে। ‘এক শালিখ দেখার পর এইসব শুরু হয়,… গরিবের মেয়ে হওয়ায় সাহেবরা ডাকার কারণে সমর্ত কিছু জিজ্ঞেস না করেই এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়ায়, বলে অঁনে আঁরে ডাইক্কন কিয়া ?’ [জহির ২০১৯: ২৭১]

অবশেষে দুটো গ্লাস থেকে তরল পান করে তৈমুর মারা যায়। ডাক্তারও সনদ লিখে দেয় যে, তৈমুর আলি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এ কাহিনির ভেতর হিরার আংটি নিয়ে আরেকটি গল্প রয়েছে। তবে এ থেকে উদ্ভূত সমস্যার কোনও সমাধান হয় না।
অনেক নিরীক্ষা ও শৈলীর মধ্যে অবশ্যই উল্লেখ করতে হয় আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস গল্প। এ গল্পটি কমলকুমার মজুমদারের অনুসরণে নিরীক্ষা কি না, তা আমাদের জানা নেই। তবে কমলকুমারের রচনা তিনি পড়ে থাকবেন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। আরও অনেক শৈলী-বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে যতিচিহ্নের নিরীক্ষাও রয়েছে। তিনি এ গল্পে কোথাও দাড়ি ব্যবহার করেননি। শুধু কমা আর সেমিকোলন চিহ্ন প্রয়োগেই গল্প সম্পাদন করেছেন। ভাষার প্রকরণে লেখকের নিয়ন্ত্রণ এ গল্পে প্রমাণিত হয়। তবে এভাবে লেখার পেছনে আর কোনও উদ্দেশ্য ছিল ? তিনি শুরুতে বলে দিয়েছেন ‘আমাদের মহল্লা, দক্ষিণ মৈশুন্দির শিল্পায়নের ইতিহাস আমাদের মনে পড়ে;’ এ শিল্পায়ন প্রক্রিয়ার কথা বলতে গেলে অনেক গল্প এখানে সমবেত হতে থাকে। মৈশুন্দি মহল্লার লোকজন নেহাত তরমুজ সম্পর্কে সচেতন হয়। এই তরমুজ ফলের সঙ্গে শিল্পায়নের কী সম্পর্ক থাকতে পারে ? গল্পের উপান্তের বক্তব্য ধরে আমরা রহস্য উদ্ধারে উপনীত হতে পারি। যেমন, ‘মৃত্যুশয্যাতেও হাজি আবদুর রশিদের চিন্তা করতে পারার ক্ষমতা পরিষ্কার ছিল,… তখন তিনি সংকটের গভীরতা উপলব্ধি করতে পারেন এবং বড় ছেলে রইসউদ্দিনকে বলেন, একটা তরমুজের ফ্যাক্টরি বসাও,… আমরা জানিতে পারি যে, তরমুজ কাটা, বাছাই, পরিষ্কার করা, জীবাণুমুক্ত অবস্থায় কৌটাজাত করার ব্যবস্থা হবে ফ্যাক্টরিতে এবং এখানে আমাদের মহল্লার ১৫-২০ জন কাজ পাবে; তখন পুনরায় ইট বালির ভেতর লাফালাফি করে এবং আমরা মৃত হাজি আবদুর রশিদের কথা ভুলতে পারি না’, [জহির ২০১৯ : ২৯০ ]
এর আলোকে হাজি ফুড প্রডাক্ট কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে বিস্কুট, লজেন্সের প্রতিষ্ঠাও ঘটে। এমন উপসংহারের কারণেই আমরা সাদা, লাল তরমুজের নানারকম কাহিনি শুনতে থাকি। বস্তুত তরমুজ অনুষঙ্গে লেখক ভিন্ন ভাবনা উসকে দেন পাঠকের মাথায়। এটা তো সর্বত্রই, বিশ্বের বাণিজ্য পুঁজির দাপটের ধাক্কা লাগে অনুৎপাদনশীল মৈশুন্দির ভুবনে। আধুনিক শিল্পায়ন পরিবেশ, মন মগজ রুচি সবকিছু পালটে ফেলে। ‘তরমুজের বিচি খেয়ে ফেলার পর পেটে যে ব্যথা হয়, সেই ব্যথার ভেতর হাজি আবদুর রশিদের অন্তর্দৃষ্টি উন্মোচিত হয় এবং তিনি মহল্লায় লেদ মেশিনের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা বুঝতে পারেন’―এ দাপট ও প্রতাপের কারণেই সাদা ফল, লাল রঙজাত ইঞ্জেকশনের প্রাদুর্ভাবে লাল হয়ে যায়। মহল্লার তরুণরা তরমুজের পালিশ করা চামড়াতে রেজর ঘষে শেইভ করা শেখে। এর দামও অপ্রত্যাশিত হারে ওঠানামা করে। এক সময় বাজার থেকে তরমুজ নিখোঁজ হয়। বাড়তে থাকে মটর পার্টসের দাম। কেউ কেউ পাগলামি স্বভাবে আক্রান্ত হতে থাকে। পরস্পর পাগল বলে গালি দেয়। কেউ বলে তরমুজখোর। এ গল্পটি ঠিক কোনও গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ করা যায় না। শিল্পায়নের ইতিবৃত্ত বলা লেখকের শুধু উদ্দেশ্য ছিল না। তাঁর ভাবনা আরও গভীরে প্রবেশ করেছে। যেখানে ভাবতে হয়―একটি এলাকায় শিল্প গড়ে ওঠার সঙ্গে টোটাল পরিবেশ বদলে যাওয়ার ইতিহাস। যেক্ষেত্রে মানুষের জীবযাপনের পদ্ধতি অনেক গুরুত্ববহ। যা শহীদুল জহির সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন।
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে সহজেই বোঝা যায়, তাঁকে শনাক্ত করতে হয় ভাষা-শৈলী থেকে। উপন্যাস, গল্প এমনকি অনুবাদকর্মের নামকরণেও বোঝা যায় এটা শহীদুল জহিরের লেখা। প্রথমে কেউ মনে করতেই পারেন এসব গদ্যের শিরোনাম কি না। বস্তুত তিনি নিরীক্ষা করতে গিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছেন ভাষা বলার কৌশল, প্রথাগত রীতি। অনেকেই লিখেন, খুব অল্প সময়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। শহীদুল জহিরের বিরতিময় নির্মাণ তাঁকে স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে। বিশ্বসাহিত্য পাঠ ও চর্চায় তিনি নির্মাণ করেছেন ভিন্ন গদ্যশৈলী। ফলে জনপ্রিয়তার চন্দ্রাহত মায়াময় জগৎ ছেড়ে দূরে থেকেছেন। আবার জয়ের মুকুট মাথায় ফিরে এসেছেন; বস্তুত তাঁর এই উত্থান জাদুবাস্তবতাময়।
তথ্যসূত্র
আকাশ, ওবায়েদ [সম্পাদক], (২০০৮)। শালুক বর্ষ ৯, সংখ্যা ১০ । ঢাকা
জহির, শহীদুল [সংগ্রহ ও সম্পাদনা: মোহাম্মদ আবদুর রশীদ], (২০১৯)। শহীদুল জহির উপন্যাসসমগ্র। ঢাকা : পাঠক সমাবেশ
জহির, শহীদুল [সংগ্রহ ও সম্পাদনা: মোহাম্মদ আবদুর রশীদ], (২০১৯)। শহীদুল জহির গল্পসমগ্র। ঢাকা : পাঠক সমাবেশ
সৈয়দ, আবদুল মান্নান, (২০১১)। শহীদুল জহির : নিরুচ্চারী কথক; রবীন্দ্রনাথ থেকে শহীদুল জহির। ঢাকা : লেখালেখি
লেখক : প্রাবন্ধিক



