আর্কাইভউপন্যাস

উপন্যাস : আকাশ যেদিন রক্তিম হয়ে উঠল : আহমাদ মোস্তফা কামাল

ভোরবেলায় রফিকের ঘুম ভাঙল এলোমেলো স্বপ্ন দেখে। পারম্পর্যহীন অনেক স্বপ্নদৃশ্য, একটার সঙ্গে যে আরেকটার মিল নেই তা স্বপ্নের ভেতরেই বুঝতে পারছিল সে, সব মিলেমিশে একটা অস্বস্তিকর মিশ্র অনুভূতি তৈরি হয়েছিল। ঘুম ভাঙার পরও সেই অনুভূতি রয়ে গেছে, মাথার ভেতরে সূক্ষ্ম যন্ত্রণা, ঘুম-লাগা-চোখে মৃদু জ¦লুনি। আহ! কী যন্ত্রণাকাতর ঘুম আমার, ভাবল সে, তারপর স্বপ্নদৃশ্যগুলো মনে করার চেষ্টা করল। না, মনে পড়ছে না। সবই এলোমেলো, জটপাকানো। কেবল একটি দৃশ্য হঠাৎ পরিষ্কার হয়ে উঠল। ভরা বর্ষার থই থই পানিতে ভাসছে একলা একটা ডিঙ্গি নৌকা, ছইবিহীন, নৌকার দুই পাশি দু হাতে ধরে ভীতমুখে বসে আছেন মা। বৃষ্টি হচ্ছে মুষলধারে, নৌকার খোল ভরে উঠছে পানিতে, ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে নৌকাটা। মায়ের মুখমণ্ডলে এখন ভয়ের বদলে আতঙ্ক, ক্রমাগত ঠোঁট নাড়ছেন, সম্ভবত দোয়া-দরুদ পড়ছেন, কিন্তু তাতে লাভ হচ্ছে না। নৌকাটা পুরোপুরি তলিয়ে যাওয়ার ঠিক আগে মা চিৎকার করে তার নাম ধরে ডেকে উঠলেন―বাবলু, আমাকে বাঁচা বাজান…

ভীষণ অবাক হলো রফিক। বাবলু তার ডাক নাম, বহুকাল পর নামটা শুনলো, তাও স্বপ্নে। কিন্তু বিস্ময়ের কারণ সেটি নয়, কারণ হলো―ঠিক এই স্বপ্নটিই সে দেখেছিল বহু বছর আগে, দেখে দারুণ বিচলিত হয়ে রওনা হয়েছিল গ্রামের বাড়ির পথে। তারপর অনেক ঘটনার পর মুখোমুখি হয়েছিল এক ব্যাখ্যাতীত-ভীতিকর অভিজ্ঞতার। সেই স্মৃতি সে ভুলে যেতে চেয়েছে প্রাণপণে, অনেকটা ভুলতে পেরেছেও, এখন কালেভদ্রে মনে পড়ে, সবসময় নয়। কিন্তু এতদিন পর অবিকল সেই স্বপ্ন আবার ফিরে এল কেন ? এক স্বপ্ন তো মানুষ বার বার দেখে না, দেখলেও খানিকটা বদলে যায়―এক নদীতে যেমন দু বার স্নান করা যায় না, এক স্বপ্নও দুবার দেখা যায় না। কিন্তু সে দেখল তো! কেন ? এবারও কি কোনও ভীতিকর অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছে তার জন্য ? নাকি আদৌ স্বপ্নটা দেখেনি সে, এলোমেলো স্বপ্নদৃশ্যগুলো মনে করার চেষ্টা করছিল বলে সেই পুরোনোটাই মনে পড়েছে ? না, পুরোনোটা নয়। নতুন করেই দেখেছে আবার। এবার আর আগের মতো বিচলিত হওয়া যাবে না, অস্থির হওয়া চলবে না, শান্ত থাকতে হবে… নিজেকে বোঝাতে লাগল সে। কিন্তু এত সহজ নয় শান্ত হওয়া। সেবারের ঘটনা অনেক দূর পর্যন্ত গড়িয়েছিল, বলা যায়, তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এবারও কি তেমনই কিছু ঘটতে চলেছে ? কীই-বা ঘটার আছে আর ? পড়ন্ত বেলায় পৌঁছে গেছে জীবন। বয়স পঞ্চাশ পার হওয়ার পর নতুন কিছু ঘটার থাকে না, সবই পুরোনো ঘটনার চর্বিতচর্বণ। নাকি তার একমাত্র ছেলে ইভানের জীবনে ঘটবে ? তারই ইঙ্গিত কি দিয়ে গেল ওই স্বপ্নে দেখা নারী, যাকে কেবল স্বপ্নেই মা হিসেবে দ্যাখে সে, বাস্তবে কখনওই দেখেনি! ছেলের কথা মনে হতেই ফের অস্থিরতাটা ফিরে এল। 

শীতকালের মধুমাখা ভোর। পাশেই রেবেকা নিঃসাড় ঘুমিয়ে আছে। ভোরের গাঢ় ঘুম। রফিক উঠে রুম থেকে বেরুলো। পাশেই ইভানের রুম। সেখানে এই ভোরবেলায়ও আলো জ¦লছে। রফিক উঁকি দিয়ে দেখল, লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে ইভান, তার আদরের খোকা। লেপের ওপর একটা খোলা বই। সম্ভবত পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গেছে, বাতি নেভানোর কথা মনে পড়েনি। ছেলেটা প্রায় সারা রাত জেগে থাকে। পড়ে, লেখে, গান শোনে, সিনেমা দেখে। এত কম ঘুমিয়ে কীভাবে যে পারে! অনেক বলেও ওর অভ্যাসটা বদলানো যায়নি। ওর রুমের বাতি নিভিয়ে জানালার পর্দা টেনে দিয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল রফিক। ঘন কুয়াশা পড়েছে। ঢাকায় এখন এত কুয়াশা আর দেখা যায় না। ইট-সিমেন্ট-কংক্রিটের তৈরি বৃক্ষহীন এক নির্দয় নগরী, বায়ুদূষণে দিশেহারা নগরী, কুয়াশা জমবেই বা কীভাবে ? কিন্তু কয়েক দিন ধরে বেশ সাড়ম্বরে পড়ছে কুয়াশা। দেখতে ভালো লাগে। তার মনে পড়ল, অনেক বছর আগে স্বপ্নটা যেদিন সে দেখেছিল, তখন ছিল বর্ষাকাল। অথচ আকাশে মেঘ ছিল না একটুও, ছিল সোনাঝরা রোদ। সেদিনও নিজের প্রায়-ভুলে-যাওয়া ডাকনাম শুনে তার ঘুম ভেঙেছিল। সেবারও বহুকাল পর সে ওই নাম শুনেছিল, তাও স্বপ্নে।

সেই সময় সে এসে দাঁড়িয়েছিল জীবনের এক সন্ধিক্ষণে। পড়াশোনা শেষ, অনেক কিছুর ব্যাপারে গুরুতর কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চাকরি করবে কি না, করলে কী ধরনের চাকরি, না করলে চলবে কীভাবে, প্রীতিলতার সঙ্গে সম্পর্কটা কোনদিকে যাবে, নাকি এখানেই থমকে দাঁড়াবে, বাড়ির সঙ্গে সম্পর্কই বা কেমন হবে, এই রকম বহু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার তখনই সময়। কিন্তু কিছুতেই কোনও বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারছিল না রফিক। ও হ্যাঁ, রেবেকাকে সে আদর করে প্রীতিলতা বলে ডাকত। বিপ্লবী চরিত্রের ছিল কি না! সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারটা কঠিন হয়ে উঠেছিল এইজন্য যে, সে ততদিনে কেবল একটা ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে―যাই করুক না কেন, রাজনীতির সঙ্গে সে যুক্ত থাকবে। ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি নয়, মানুষের মুক্তির জন্য রাজনীতি। পথটা কঠিন, রুক্ষ, অমসৃণ। লক্ষ্যে পৌঁছনো দূরের ব্যাপার, ভারসাম্য বজায় রেখে ওপথে হেঁটে যাওয়াও কষ্টসাধ্য। এই ধরনের রাজনীতি করতে হলে অনেক কিছু ছেড়ে আসতে হয়। সংসার, ক্যারিয়ার, প্রথাগত জীবন, সব। সে কি পারবে ? নিজের কাছেই এ প্রশ্নের উত্তর ছিল না। প্রীতিলতা মানে রেবেকার তরফ থেকে অবশ্য কোনও বাধা ছিল না। বিয়ে বা সংসারের ব্যাপারে তার হ্যাঁ এবং না দুটো অবস্থানই স্বাভাবিক ছিল। রফিকের কাছে ছেড়ে দিয়েছিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার। আর রফিক হ্যাঁ এবং না-এর মাঝখানে পেণ্ডুলামের মতো দুলছিল। বিয়ে এবং সংসার করতে হলে একটা সুনির্দিষ্ট পেশা থাকতে হবে, উপার্জন করতে হবে, কিন্তু এমন কী পেশা আছে যা তাকে যথেষ্ট সময় এবং স্বাধীনতা দেবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য ? ভেবে কূল পাচ্ছিল না সে। এরকই এক দোদুল্যমান সময়ে স্বপ্নটা দেখেছিল, মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল এক অদ্ভুত সত্যের সামনে।

ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে, ভোরের শুভ্রতা দেখতে দেখতে, উত্তুরে হাওয়ায় বার বার কেঁপে উঠতে উঠতে কতক্ষণ পেরিয়ে গিয়েছিল, সে জানে না। হঠাৎ পিঠে হাতের স্পর্শ পেল রফিক। রেবেকা। এই স্পর্শ তার চেনা, না দেখেও বোঝা যায়। মৃদু কণ্ঠে বলল―এই শীতের মধ্যে খালি গায়ে দাঁড়িয়ে আছ যে!

খালি গা কই ? টি-শার্ট পরা তো!

টি-শার্টে এই শীত মানে ? শরীরটা ঠান্ডা হয়ে গেছে। কী হয়েছে তোমার ?

কিছু হয়নি। ঘুমটা ভেঙে গেল…

রাতেও ভালোভাবে ঘুমাওনি। এত ছটফট করেছ! দু:শ্চিন্তা করছো ?

তা তো একটু হচ্ছেই।

এখন গিয়ে একটু শোও, শরীরটা গরম হোক। আমি নাস্তা তৈরি করে তোমাকে ডাকব।

তুমি আজকে কলেজে যাবে না ?

না, কলেজ তো বন্ধ।

ও হ্যাঁ, তোমরা তো ছুটি পেয়ে গেছ। সুখের চাকরি।

 তোমারও তো আজকে ডে-অফ।

একদিনের ডে-অফ আর ছুটি কি এক হলো ? তাছাড়া, পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, কখন যে ডে-অফ বাতিল হয়ে যায়! সাংবাদিকতার চাকরি মানেই চব্বিশ ঘণ্টা অ্যালার্ট থাকা।

আচ্ছা, সেসব দেখা যাবে পরে। এখন গিয়ে একটু শোও। নাস্তা খেতে খেতে কথা বলব।

রফিক অবশ্য আর বিছানায় গেল না, একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে এসে বসল ডাইনিং টেবিলে। একাধিক পত্রিকা আসে বাসায়, সবই জানা খবর, তবু অভ্যাসমতো শিরোনামগুলোতে চোখ বুলিয়ে গেল। নাস্তা আসতে দেরি হলো না তেমন। রেবেকা রাতেই মোটামুটি গুছিয়ে রাখে, সকালে তিনজনেরই বাইরে বেরুবার তাড়া থাকে বলে নাস্তা বানাতে সময় নেয় না। আজকে অবশ্য তিনজনেরই ছুটি। ইভান ঘুমিয়ে না থাকলে বেশ জমিয়ে একটা আড্ডা দেওয়া যেত। তারা দুজনেই ইভানের সঙ্গে প্রচুর কথা বলে। রুশদেশের উপকথা থেকে ছেলের জন্য নামটি বেছে নিয়েছিল তারা, রূপকথার রাজপুত্রের মতোই মিষ্টি আর মায়াময় ছিল ও ছোটবেলায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চেহারায় পরিবর্তন এসেছে, স্বভাবেও। একটা কঠিন সংকল্প তার চোখেমুখে বাসা বেঁধেছে, পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার সংকল্প। কথাবার্তায় রাগ আর ক্রোধ ঝরে পড়ে। এই বয়সে ওরকম থাকেই। তারা ব্যাপারটাকে স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে।

কী মনে হয় তোমার ? কী হতে যাচ্ছে ?

কিসের কথা বলছ ?

ইলেকশন!

হয়ে যাবে।

বিরোধী দলগুলো তো প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে।

ভোট পড়বে না। তাতে কী ? দেখানো হবে যে ভোট হয়েছে।

তারপর ?

জানি না। তবে মন বলছে, ভালো কিছু হবে না। এরকম একটা ইলেকশন করে সরকার টিকে থাকতে পারবে না।

এর আগে পেরেছে তো!

এবারের বাস্তবতা আলাদা। আন্তর্জাতিক চাপকে ছোট করে দেখার উপায় নেই।

সরকারি দল এরকম একটা নির্বাচন করছে কেন বল তো ?

চিরকাল ক্ষমতায় থাকার উদগ্র বাসনা। বোঝোই তো।

হুম। কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। মনে হচ্ছে, কোনও বিপদ ঘনিয়ে আসছে।

অস্বস্তি সবারই হচ্ছে। পথেঘাটে মানুষের মুখে হাসি নেই। এ দেশে ভোট তো একটা উৎসবের মতো ব্যাপার, দু দিন পরেই নির্বাচন, অথচ কোথাও ভোটের আমেজ নেই।

এ প্রসঙ্গ থাক। বাজারে যাবে না ?

বাজারে ?

হ্যাঁ। তুমি না আজকে বাজার করতে চেয়েছ!

ও! ভুলেই গিয়েছিলাম। বাজারে যেতে ইচ্ছেও করে না। সবকিছুর দাম এত বেড়েছে! কুলিয়ে উঠতে পারি না।

দুজনের আয়েও এই অবস্থা। আমাদের টানাটানিটা আজও রয়েই গেল।

সৎ পথে থাকলে টানাটানি কমবে না।

সিনিয়র সাংবাদিক হয়েও তোমার কিছু হলো না। ওদিকে তোমার বন্ধুবান্ধবরা কত কিছু বাগিয়ে নিচ্ছে।

ঠাট্টার সুরে বলল রেবেকা।

নিজেকে বিকিয়ে দিয়ে কিছু চাই না যে!

বিকোতে হয় নাকি ?

হয় না ? নিশ্চয়ই হয়। ওদেরকে দেখো না, টক শোতে বসে সরকারের যে কোনও অপকর্মের পক্ষে সাফাই গাইছে। এমনি এমনিই ? সবই লেনদেনের খেলা।

তুমি যে ওরকম কিছু করো না, আমার তাতেই আনন্দ।

কিন্তু আমরা তো হেরে গেছি প্রীতি। সংখ্যায় কমতে কমতে এখন সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছি।

হারিনি হারিনি। শেষ পর্যন্ত আমরাই জিতবো, দেখে নিয়ো।

রেবেকার কথায় অবাক হলো না রফিক। ওর অনিঃশেষ আশাবাদ এখনও অনির্বাণ শিখার মতো জ¦লছে। এতগুলো বছর ধরে রেবেকা বিশ্বাস করে চলেছে, একদিন এ দেশের মানুষ জেগে উঠবে, নিজেদের অধিকার বুঝে নেবে, মনের মতো দেশ গড়ে তুলবে। রফিকের এত আশা নেই। বরং ভয়াবহ এক নৈরাশ্য তাকে গ্রাস করে ফেলেছে।

রফিক বাজারে গেল ঠিকই, কিন্তু ঠিক মনোযোগ দিতে পারল না। সে দেখেশুনে বাজার করে, দামাদামিও করে প্রচুর, কিন্তু আজকে একদমই ইচ্ছে করছে না। বহু বছর ধরে একই বাজারে যায় বলে দোকানিরাও চেনা। খুব একটা ঠকায় না। অথচ সে দেখে, অনেক লোক দরদামের ধার ধারে না। তারা কেবল পছন্দের জিনিসটা চায় এবং দোকানিরা প্রায় দ্বিগুণ দাম নেয় তাদের কাছ থেকে। তাতে তাদের কিছু যায়-আসে না। রফিক বোঝে, দোকানিরাও বলে, ঘুষের পয়সা, সেইজন্য টাকার মায়া নাই। একদিকে এই দৃশ্য অন্যদিকে ঠিকমতো বাজার করতে না পারা মানুষের মলিন মুখ। যাদের অবৈধ উপার্জন নেই তারা সবাই ব্যয় সংকোচন করছে। গত তিন-চার বছরে সব জিনিসের দামই দ্বিগুণ বেড়েছে, আয় তো সেই অনুপাতে বাড়েনি, সংকোচন না করেই বা উপায় কী ? দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এই মানুষগুলো চাহিদার অর্ধেক বা তার চেয়েও কম পূরণ করতে পারছে। কষ্ট বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে ক্ষোভ, বারুদের মতো জমা হচ্ছে সেসব, কবে যে বিস্ফোরণ হবে, বোঝা কঠিন।

বাজার থেকে ফিরে এককাপ চা নিয়ে ফের ব্যালকনিতে গিয়ে বসল রফিক। ভোরে দেখা সেই স্বপ্নটা আবার তাকে ভোগাচ্ছে। একই স্বপ্ন যদি ফের না দেখত, আগেরবার যদি ওরকম অভিজ্ঞতা না হতো, তাহলে এত ভাবতো না সে। এই স্বপ্ন কি কোনও দুর্যোগের পূর্বাভাস ? বাসায় ফিরেও সে নিঝুম হয়ে ভাবতে লাগল। মনে পড়ে গেল অনেক বছর আগের ঘটনাসমূহ।    

২.

বহু বছর আগে এক ভোরে স্বপ্নটা দেখে ঘুম থেকে জেগেও পরিষ্কার বুঝতে পারছিল, অর্থহীন একটা স্বপ্ন দেখেছে সে। তার মা নেই, কিংবা থাকলেও সে দেখেনি কোনওদিন, ওই মুখ যে মায়েরই মুখ এ-কথা ভাবার কোনও কারণও নেই। আর যদি হয়েও থাকে, তবু বাঁচার জন্য তাকে ডাকবেন না তিনি। শিশুকালে যে পুত্রকে রেখে তিনি চলে গিয়েছিলেন, তাকে ডাকার জন্য যে মনের জোর লাগে, তা তার নিশ্চয়ই নেই। রফিক তাই স্বপ্নটাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করল। এমনিতেই আজকাল ভালো ঘুম হয় না। অনেক রাত পর্যন্ত বিনা কারণেই জেগে থাকে, তারপর একসময় শুয়ে পড়লেও ঘুম আসতে চায় না, ঘুম এলে অল্পক্ষণের মধ্যে ভেঙে যায়, ফের ঘুম আসতে অনেক দেরি হয়। জীবনের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে বলেই বিবিধ দুর্ভাবনা আর অনিশ্চয়তার জন্য ঘুমের সমস্যা হচ্ছে। তারও পর ওরকম একটা স্বপ্ন। মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইলেও স্বপ্নদৃশ্যটা ভুলতেই পারছে না রফিক। কেন ওরকম একটা স্বপ্ন দেখলাম আমি ? ভাবল সে। অবশ্য কয়েক দিন ধরেই খুব অস্থিরতায় ভুগছিল সে, যদিও সুনির্দিষ্ট কোনও কারণ খুঁজে পাচ্ছিল না। কোনও কাজে মন বসছিল না, থেকে থেকে মনে হচ্ছিল, কে যেন তাকে ডাকছে―যদিও তাকে ডাকার মতো কেউ নেই কোথাও; আর একা থাকলেই মনে হচ্ছিল―কোথাও কিছু যেন ভেঙে পড়ছে। রীতিমতো ভেঙে পড়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছিল রফিক! নিজের এই অবস্থার কোনও ব্যাখ্যা তার কাছে ছিল না। স্বপ্নটা কি সেই মানসিক অস্থিরতারই অবচেতন প্রকাশ ?

 ভোরের মৃদু-মায়াময় আলো মুছে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, সূর্যরশ্মি ছড়িয়ে পড়ছে, বর্ষাকালে ঝলমলে রোদ দেখতে ভালো লাগে। আজকে বোধহয় সেরকমই এক ঝলমলে দিন। অবশ্য আগে থেকে কিছুই বলা যায় না, যে কোনও সময় হয়তো মেঘ জমতে শুরু করবে আকাশজুড়ে, হয়তো বৃষ্টি হবে মুষলধারে, তারপর ফের উঠবে রোদ। কিংবা দিনভর গুঁড়িগুঁড়ি ঝরতেই থাকবে, রোদের দেখা আর পাওয়াই যাবে না। তার মনে এখন মেঘের আনাগোনা। স্বপ্নদৃশ্যটা চোখে ভাসছে, কানে বাজছে আর্তচিৎকার, বাবলু আমাকে বাঁচা…।

হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিল সে, বাড়িতে যেতে হবে। যদিও মাসখানেক আগেই সে বাড়ি থেকে ঘুরে এসেছে, এত তাড়াতাড়ি ফের বাড়ি যাওয়ার কথা নয়। সত্যি বলতে কি, বহু বছর ধরেই সে নিয়মিত বাড়িতে যায় না, তবু হঠাৎ কী যে হলো, একদিন থাকার মতো কাপড়চোপড় ব্যাগে ভরে ফেলল সে। আতিক কিংবা ফারহানাকে বলে যাওয়া দরকার। কিন্তু ওরা এত ভোরে ওঠে না। আরেকটু অপেক্ষা করবে কি না ভাবতে ভাবতেই টুকটাক শব্দ পেল ওদের ঘর থেকে। তার মানে, কেউ একজন উঠে পড়েছে। হ্যাঁ, তাই। দরজা খুলে বাইরে বেরুলো ফারহানা। রাতের পোশাক ছাড়েনি, রফিককে দেখে তাই একটু বিব্রত হলো, কিন্তু সামলে নিল দ্রুতই। বলল―কী ব্যাপার রফিক ভাই, আজকে এত সকালেই উঠে পড়েছেন ?

ঘুম ভেঙে গেল।

কিন্তু কাপড়চোপড় পরে যাচ্ছেন কোথায় ?

বাড়িতে যাব ফারহানা।

বাড়িতে! বাড়িতে ?

ফারহানার অবাক হওয়ার যথার্থ কারণ আছে। রফিক যে সচরাচর বাড়িতে যায় না, সে তা জানে।

হ্যাঁ।

হঠাৎ ? কোনও সমস্যা ?

না ঠিক সমস্যা না। মনটা একটু…

আচ্ছা, ঠিক আছে। একটু অপেক্ষা করেন, আমি নাস্তা তৈরি করছি।

আরে না। নাস্তা লাগবে না। আমি পথ থেকে কিছু খেয়ে নেব।

কী যে বলেন! খালিমুখে বাসা থেকে বেরুবেন, তাই কি হয় ?

খালিমুখে বেরুলে কী হয় ?

তা আর আপনাকে বুঝতে হবে না। একটু অপেক্ষা করেন। আমার বেশি সময় লাগবে না।

আটকে গেল রফিক। নিশ্চয়ই ফারহানা ভাবছে, খালিমুখে বেরুলে ওর সংসারের অকল্যাণ হবে! এইসব উদ্ভট বিশ্বাসই তো বয়ে বেড়ায় এ দেশের মেয়েরা। যত্ত সব। বিরক্ত হলো বটে, কিন্তু ফারহানা যখন সাজিয়ে-গুছিয়ে নাস্তা বেড়ে টেবিলে ডাকল, তার মন ভালো হয়ে গেল। সত্যিই তো, এই ভোরবেলায় খিদে পেটে দূরের পথে রওনা হওয়া কোনও কাজের কথা নয়। পথে খেয়ে নিলেও খাওয়ার পর টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন পড়লে আরও বিপদ।

নাস্তা শেষ হতে না হতে ধোঁয়া-ওঠা গরম এক মগ চা এল, ঘুম ঘুম চোখে উঠে এল আতিকও। সকালবেলায় অল্প পরিমাণ চায়ে রফিকের পোষায় না, সেজন্য মগভরতি চা। এইসব ছোট ছোট যত্নআত্তি রফিককে মুগ্ধ ও কৃতজ্ঞ করে তোলে। বিয়ে কিংবা সংসারযাপন নিয়ে রফিকের যে ভীতি আছে, আতিক-ফারহানার সংসার দেখে তা যেন খানিকটা কাটতে শুরু করেছে। ওরা দারুণ সাহসী, পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই ওরা বিয়ে করে ফেলেছিল, কারণ ফারহানার বিয়ের জন্য জোর চেষ্টা করছিলেন ওর বাবা। ফারহানা বাবাকে বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে বিয়েই করে ফেলেছে, আতিকও দ্বিধা করেনি, ‘যা হবার হবে’ ভাব নিয়ে সংসার-সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়েছে। পড়াশোনা শেষ করার পর দুজনে মিলে এই ছোট্ট বাসাটা নিয়েছে। এখনও ভালো কোনও চাকরি পায়নি দুজনের কেউই, তবু টুকটাক করে চালিয়ে নিচ্ছে। আতিক এখনও টিউশনি চালিয়ে যাচ্ছে আর ফারহানা একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়াচ্ছে। রফিক কিছুতেই বাসা খুঁজে পাচ্ছিল না। ছোট বাসা, কম ভাড়া, তাও ব্যাচেলর, একটু নিরিবিলি―এত সব শর্ত পূরণ করে বাসা পাওয়া যায় নাকি ? অথচ হল ছেড়ে আসা জরুরি হয়ে উঠেছিল। তখনই একদিন আতিক বলল, তুই আমাদের বাসায় উঠতে পারিস। একটা রুম খালি আছে। রফিক যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। বাসা খোঁজার ঝক্কি নেই, গোছানোরও ঝক্কি নেই, জিনিসপত্র কেনার ঝক্কি নেই।  স্রেফ ওদের বাসায় উঠে পড়া। সাবলেট নয়, পেয়িং গেস্ট হিসেবে। কেবল একটা রুম ভাড়া নেওয়া নয়, খাওয়া-দাওয়া একসঙ্গে। তার মানে বাজার করা বা রান্না করারও ঝক্কি নেই। বিয়ের পর আতিক আর ফারহানা আসলে এক রুমের বাসাই খুঁজছিল, সাবলেট নয়, স্বতন্ত্র বাসা, যেন স্বাধীনভাবে থাকতে পারে। পায়নি সেরকম। বাধ্য হয়ে একটু বেশি ভাড়া দিয়ে দু রুমের বাসা নিতে হয়েছে, সঙ্গে আবার একটা ড্রয়িং কাম ডাইনিংও আছে, আছে দুটো বাথরুম আর দুই বেডের সঙ্গে দুটো ব্যালকনিও। এত বড় বাসা ওদের লাগে না। পরিবারের অমতে বিয়ে করার ‘অপরাধে’ আত্মীয়-স্বজনরা ওদেরকে ত্যাগ করেছে, ফলে আক্ষরিক অর্থেই টোনাটুনির সংসার। রফিক আসার ফলে ওদের বেশ সাশ্রয় হলো। ভাড়া আর খাওয়া-দাওয়ার খরচ মিলিয়ে প্রতি মাসে দশ হাজার টাকা দেয় রফিক। আতিকের চোখেমুখে তখন দারুণ এক স্বস্তির আলো খেলা করে। আফটার অল সংসারটা তো তাকে চালাতে হয়! রফিক আসার আগে এই টাকাটা পাওয়ার তো কোনও উপায় ছিল না। অতএব সুবিধা দু পক্ষেরই। রফিক ঝামেলাহীন জীবন যাপন করছে, অন্যদিকে আতিক-ফারহানার খানিকটা আর্থিক সাশ্রয় হচ্ছে।

সমস্যা হলো, রফিকের জন্য এই দশ হাজার টাকাও অনেক। তার আয়ের একমাত্র উৎস ওই টিউশনিই। অবশ্য বাড়ি থেকে চাচা নিয়মিত টাকা পাঠান। সে ঢাকায় আসার পর থেকে এক মাসের বিরতিও পড়েনি। তার বাবা নেই। এতগুলো বছর ধরে চাচার কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে, ব্যাপারটা তার আর ভালো লাগে না। কিন্তু আপাতত কিছু করারও নেই। সেজন্যই সে চাকরি করার কথা ভাবছে, যদিও তার ইচ্ছে ছিল একজন ফুল-টাইম রাজনৈতিক কর্মী হওয়ার।

ধোঁয়া-ওঠা গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে রফিক এই সব ভাবছিল। তখন আতিক বলল, কী রে তুই নাকি বাড়িতে যাচ্ছিস ?

হ্যাঁ।

হঠাৎ বাড়িতে কেন ? কোনও খবর পেয়েছিস ?

না, সেরকম কিছু না।

তাহলে ?

একটা স্বপ্ন দেখলাম। মনটা একটু…

কী স্বপ্ন ?

রফিক চুপ করে রইল। স্বপ্নের কথা বলতে চায় না সে, বুঝে নিল আতিক। তবে স্বপ্ন দেখে বিচলিত হয়ে বাড়িতে যাচ্ছে ও, এটা বেশ অবাক ব্যাপারই। রফিক কোনওকিছুই বিশ্বাস করে না। নিত্যদিনের জীবনযাপনে আমরা বুঝে না-বুঝে কত কিছু মেনে চলি, ও সেসব কিছুকেই কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেয়। পারিবারিক বন্ধনগুলোকেও মনে করে অপ্রয়োজনীয়, এমনকি ক্ষতিকর। সেজন্য বাড়িতেও যায় না। এমন এক চরিত্র সে অর্জন করেছে যে মনে হয়, সব সময়ই রেগে আছে। ভাবল আতিক। রফিকের এই সব একরোখা পাগলামি তার বন্ধুরা মেনে নিয়েছে। সবারই বিশ্বাস, বাস্তব জীবনের সঙ্গে ওর সংযোগ সামান্য, বাস করে এক অলীক স্বপ্নের জগতে, একাডেমিক ভাষায় ইউটোপিয় জগতে। বাস্তবের সঙ্গে যখন দেখা হবে, তখন সব ঠিক হয়ে যাবে। যাবেই, কারণ বাস্তবতার সঙ্গে আসলে মানুষের দেখা হয় না, হয় সংঘাত। সেই সংঘাতে অনেক কল্পনাই আকাশ থেকে মাটিতে নেমে আসে, অনেক স্বপ্নই ভেঙে খান খান হয়ে যায়। বন্ধুরা এসব জানে বলেই রফিককে নিজের মতো করে থাকতে দেয়।

আতিক আর স্বপ্নের কথা জিজ্ঞেস করল না। বলল―যা ঘুরে আয়। ফিরবি কবে ?

আগে যাই তো! ভালো লাগলে দু-চার দিন থাকব, নইলে কালকেই ফিরব।

আতিকের হয়তো গল্প করার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু সুবিধা হলো না। ওর তো কোনও তাড়া নেই। বেকার কি না! বিকেলের দিকে হেলেদুলে বেরুবে টিউশনির জন্য। রফিক খেয়াল করল এর মধ্যেই ফারহানা দ্রুত রেডি হয়ে নিল। নিজে নাস্তা করল, আতিকের জন্য নাস্তা বেড়ে ঢেকে রাখল টেবিলে, তারপর কাপড়-চোপড় পরে একেবারে ফিটফাট হয়ে গেল। ওর স্কুল শুরু সকাল আটটায়, পৌঁছতে হয় সাড়ে সাতটার মধ্যেই। একটা মেয়ে ঘরের কত কাজ করে এটা রফিক এ বাসায় আসার আগে খেয়াল করেনি। কিন্তু এখন না চাইলেও চোখে পড়ে। আতিক বাসায়ই থাকে বেশির ভাগ সময়, তবু প্রায় কিছুই করে না। অথচ ফারহানা স্কুলে যাচ্ছে, তার আগে নাস্তার ব্যবস্থা করছে, ফিরে এসে ফের রান্না করছে, ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে গুছিয়ে রাখছে, কাপড়চোপড় ধুচ্ছে, আরও কত কী! এই যে দুজনের কাজের পরিমাণে এত পার্থক্য তবু তাদের মধ্যে কোনও সমস্যা হচ্ছে না, এ নিয়ে মনোমালিন্য হচ্ছে না, দুজনেই খুব স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে নিয়েছে ব্যাপারটা। দম্পতির মধ্যে এই বোঝাপড়ার ব্যাপারটা কীভাবে ঘটে, রফিক বুঝতে পারে না। হওয়ার কথা তো ছিল উল্টোটা। গৃহশ্রমেরও সমবণ্টন  হওয়া উচিত, যেহেতু সংসারটা দুজনেরই, তা না হওয়ার ফলে দ্বন্দ্ব হওয়ার কথা। হয় না কেন ? রফিক সবসময় বাইরের বাস্তবতাগুলো দেখেছে, সমাজ পরিবর্তনের জন্য বইয়ের বুলি আউড়েছে, অথচ ঘরের মধ্যেও পরিবর্তন যে দরকার, দরকার মানসিকতার পরিবর্তন, এ কথা কখনও মনে হয়নি।

ফারহানাই আগে বেরিয়ে গেল। চা শেষ। রফিকও উঠে নিজের রুমে গেল। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আয়েশ করে সিগারেট টানলো একটা। সকালে মনে হচ্ছিল, এখনি বেরুতে না পারলে ক্ষতি হয়ে যাবে। ভরপেট নাস্তা করে, চা-সিগারেটের তৃপ্তিকর আপ্যাায়ন শেষে মনে হলো, এত তাড়াহুড়ার কিছু নেই। এমনকি না গেলেও চলে। বাড়িতে গেলে মনের অস্থিরতা কমবে এমন কোনও গ্যারান্টিও নেই। হয়তো, মনের অস্থিরতা বলতেও কিছু নেই, আসলে খিদে লেগেছিল। এখন পেট শান্ত, মনও শান্ত। কিন্তু… না, মন তো পুরোপুরি শান্ত হচ্ছে না। একটা অস্বস্তি, একটা খচখচানি রয়েই যাচ্ছে। চোখে ভাসছে সেই মুখ, কানে বাজছে সেই আর্তচিৎকার। ওটা কার মুখ ? মায়ের ? কেমন ছিল তার মা ? এখনও কি আছে নাকি মরে গেছে ? সে তো সেই কৈশোরেই জানতে পেরেছিল, তাকে যিনি লালন-পালন করেছেন, তিনি তার মা নন, চাচি। কিন্তু তার মা বেঁচে আছেন, অন্যত্র বিয়ে হয়েছে। জেনেও কেন মাকে কখনও দেখতে ইচ্ছে করেনি তার ? কেন জানতে ইচ্ছে করেনি, কোথায় আছে মা, কেমন আছে ? মা-ও কেন একবারও আসেনি ছেলেকে দেখতে ? কেমন মা সে ? অভিমানে বুক ভারী হয়ে উঠল তার। নাহ, এইসব ভাবালুতাকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। তারচেয়ে বেরুনো যাক। একবার যেহেতু যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেই, ঘুরে আসাই ভালো হবে।

৩.

রফিক সচরাচর বাড়িতে আসে না, কিংবা বছরে-দু বছরে একবার এলেও দু-একদিন পরই ফিরে যায়, এবং যাওয়ার সময় তার আচরণে এমন কিছু চোখে পড়ে না যা দেখে মনে হতে পারে―সে আবার কোনওদিন এদিকে পা বাড়াবে। মাঝে মাঝে সে এত দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে যে, সবাই প্রায় ভুলেই যায়―এ বাড়িতে রফিক নামের কোনও একজন ছিল কোনওদিন। তবু, এই কিছুদিন আগে প্রায় সপ্তাহখানেক বাড়িতে কাটিয়ে যাওয়ার পর, এত তাড়াতাড়ি হঠাৎ করে আবার তাকে আসতে দেখে, তার চাচা―উদাসপুর হাইস্কুলের হেড মৌলভি দীন মোহাম্মদ ভুঁইয়া―শুধু অবাকই হলেন না, এক গভীর দার্শনিক চিন্তায় ডুবে গেলেন। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন―প্রতিটি ঘটনার ভেতরেই কোনও না-কোনও ইশারা বা ইঙ্গিত লুকানো থাকে; গভীরমনস্ক মানুষ ছাড়া অন্যরা তা বুঝতে পারে না। বিশেষ করে অপ্রত্যাশিত ঘটনাগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ, আল্লাহ পাক এসবের মাধ্যমে বান্দাদের কাছে পরবর্তী ঘটনাসমূহের জন্য গভীর ইশারা পাঠান। রফিকের এই হঠাৎ বাড়ি আসার মধ্যেও সে-রকম কোনও ইঙ্গিত-ইশারা আছে এবং তিনি এর সঙ্গে পরির মার মৃত্যুর কোনও যোগসূত্র আছে বলে মনে করছেন―কিন্তু সেটা যে কী, তা বুঝে উঠতে পারছেন না। পরির মা এ বাড়িতে আশ্রিতা এক ভিখারী―একসময় প্রতিটি সম্ভ্রান্ত সচ্ছল পরিবারে এমন দু-চারজন আশ্রিত মানুষ থাকত―আজ সকালেই মারা গেছে। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরেই মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে এই মহিলা, আর কারও কথা নয়, কেবল রফিকের নামই উচ্চারণ করছিল। দীন মোহাম্মদ সাহেব একবার রফিককে খবর দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু ব্যাপারটাকে সে আদৌ পাত্তা দেবে না ভেবে আর দেওয়া হয়নি। রফিক বাড়িতে তো আসেই না, কোনওদিন একটু খোঁজও নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না―কে কেমন আছে! দীন মোহাম্মদ সাহেব মাঝেমধ্যে দায়িত্ব মনে করে চিঠি লেখেন, রফিকের কুশলাদি জানতে চান―সে তার উত্তরও দেয় না। নিয়মিত টাকাও পাঠান, সে প্রাপ্তি স্বীকারের জন্য পোস্টকার্ডে একটামাত্র বাক্য লেখে―টাকা পেয়েছি। কারও কথা জানতে চায় না, নিজে কেমন আছে তাও জানায় না। এখন আর এ নিয়ে কোনও অভিযোগ-অনুযোগ বা অভিমান প্রকাশ করে না বাড়ির কেউ, কিন্তু একবার সবাই তার আচরণে খুব কষ্ট পেয়েছিল। দীন মোহাম্মদ সাহেব তার বড় মেয়ের বিয়ের কথাবার্তা চলার সময় রফিককে আসার জন্য অনুরোধ করেছিলেন―যত দায়িত্বহীনই হোক, সে যে এ বাড়ির বড় ছেলে, সেটি সবারই মনে থাকে―কিন্তু রফিক আসেনি। পরে পাত্রের বিস্তারিত বিবরণ জানিয়ে চিঠি লিখে বোনের বিয়ের ব্যাপারে তার মতামত জানতে চাওয়া হলে সেই চিঠিরও উত্তর দেয়নি সে। বাধ্য হয়ে তার মতামত ছাড়াই বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করে আবার চিঠি পাঠিয়েও লাভ হয়নি, রফিক যথারীতি নিরুত্তর-নিরুদ্দেশ থেকেছে, আসার প্রয়োজনও বোধ করেনি। এমনকি বিয়ের পর প্রায় দুবছর পার হয়ে গেল, আজ পর্যন্ত সে জানতেও চায়নি―বোনটির কোথায় কার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে, কেমন আছে সে। এই ছেলেটিকে তিনি, তার বড় ভাই রইস আহম্মদ ভুঁইয়ার হঠাৎ মৃত্যু এবং ভাবির অন্যত্র বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর, কোলেপিঠে করে বড় করেছিলেন, এখন সেটা আর নিজেরই বিশ্বাস হয় না। মানুষ কীভাবে এমন অকৃতজ্ঞ হয় ? যা হোক, যে-ছেলে নিজের বোনের বিয়েতে আসার প্রয়োজন বোধ করে না, সে পরির মার অসুস্থতার খবর পেয়ে আসবে―সেটি ভাবা নিশ্চয়ই বাড়াবাড়ি, দীন মোহাম্মদ সাহেব তাই খবর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। অথচ কী আশ্চর্য, সকালে পরির মা মারা গেছে, আর দুপুরের মধ্যেই কি না ছেলেটা বাড়িতে এসে হাজির! আজকে সকাল থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে, এই ঝড়-বাদলের মধ্যে কেউ বাইরেই বেরুতে চায় না, আর সে কি না ঢাকা থেকে এসে পড়েছে! এর মানে কী ? তার এই আসার সঙ্গে যে পরির মা’র মৃত্যুর যোগসূত্র আছে―দীন মোহাম্মদ সাহেবের সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আছে ইশারা ও ইঙ্গিত। তিনি নিশ্চিত। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও ইঙ্গিতটা তিনি ধরতে পারছেন না।

রফিক পরির মার মৃত্যুসংবাদ পেয়েছে বাড়িতে পৌঁছানোর পরপরই। ঢাকা থেকে যখন রওনা হয়েছিল তখন ছিল ঝকঝকে রোদ, অর্ধেক পথ আসতে না আসতে শুরু হয়েছে মুষলধারে বৃষ্টি, থামাথামির নাম নেই। সে বৃষ্টিতে ভিজেই বাড়িতে পৌঁছেছে। এসেই জেনেছে, পরির মা সকালে মারা গেছে। তাহলে কি সে ভোরের স্বপ্নে পরির মাকেই দেখেছিল ? সে-ই কি অমন আকুল হয়ে ডাকছিল রফিককে ? মৃত্যুসংবাদ শুনে গম্ভীর হয়ে দীন মোহাম্মদ সাহেবকে শুধু জিজ্ঞেস করেছে―লাশ কোথায় রেখেছেন ?

বাংলা ঘরে।

বাংলা ঘর মানে ‘বাহির-বাড়ি’র ঘর কিংবা কাচারি ঘর। এই এলাকায় কেন ‘বাংলা ঘর’ বলা হয় সে জানে না। এ বাড়িটা অনেক বড়, তার আবার দুটো অংশ। বাইরের অংশে একটা ঘর, পারিবারিক কবরস্থান, মসজিদ ছাড়াও অনেকখানি খালি জায়গা। বাইরের ঘরে সাধারণত অনাত্মীয় অতিথিরা থাকেন, অথবা নানা প্রয়োজনে কেউ দেখা করতে এলে এই ঘরে বসেন, তাদেরকে  অন্দরমহলে নিয়ে যাওয়ার রীতি এ পরিবারে নেই। পারিবারিক কবরস্থানে ঘুমিয়ে আছেন রফিকের পূর্বপুরুষেরা, ভুঁইয়া বাড়ির লোকজন ছাড়া আর কারও জায়গা হয়নি সেখানে। মসজিদটা সঙ্গত কারণেই পারিবারিক কোনও ব্যপার নয়, তবু এই মসজিদে গ্রামের সব মানুষ আসে না, আসে কেবল খানদানিরাই, সাধারণ মানুষের জন্য আলাদা মসজিদ আছে পাশের গ্রামে, তারা সেখানেই যায়। অন্দরমহলও অনেকখানি জায়গা নিয়ে। সেখানে দুটো দালান। একটা বেশ পুরোনো―রফিকের দাদার আমলের―কিন্তু আজও বেশ মজবুত, একটা গাঁথুনিও আলগা হয়নি। বাড়িতে এলে রফিক এ ঘরেই থাকে, সবাই ওটাকে ‘রফিকের ঘর’ বলে। অন্য দালানটি নতুন―দীন মোহাম্মদ সাহেব বানিয়েছেন।

পরির মার লাশ বাইরের ঘরে রাখা হয়েছে শুনে রফিকের মুখে গম্ভীর একটা ছায়া পড়ল, গম্ভীর স্বরেই বলল―বাইরে কেন, ভেতরে এনে রাখেন।

ভেতরে এনে কী হবে ? দাফন করতে হবে না ?

সেটা তো বৃষ্টি থামার আগে করতে পারছেন না, ততক্ষণ ভেতরেই থাকুক।

দীন মোহাম্মদ সাহেব আর ঘাটাননি। লাশ এনে রফিকের ঘরের বারান্দায় রেখেছিলেন, বৃষ্টির ছাঁট আসে বলে ঘরের ভেতরে রাখতে হয়েছে।

রফিকের হাবভাব সুবিধার মনে হচ্ছে না তার কাছে। যদিও এমন কিছুই সে করেনি, তবু তার মনে হচ্ছে―কোথাও কোনও একটা সমস্যা হয়েছে। একটা সমস্যা, ইশারা বা ইঙ্গিতের চিন্তায় তিনি অস্থির হয়ে পড়লেন।

রফিক বসে বসে ভাবছিল, কেন সে স্বপ্নটা দেখল, কেনই-বা এত বিচলিত হলো, যে, কাপড়চোপড় ব্যাগে ভরে বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল! যুক্তিবাদী মানুষ রফিক, অন্তত নিজেকে সে সেরকমই মনে করে, নিষ্ঠুরভাবে সব আবেগ জীবন থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে বহুদিন ধরে―এই হঠাৎ আসা তাই নিজের কাছেই অস্বাভাবিক লাগছে তার। এসে জেনেছে, কয়েক দিন ধরেই পরির মা কেবল তাকেই দেখতে চাইছিল। তাকে খবর দেওয়া হয়নি কেন, এ প্রশ্ন সে নিশ্চয়ই করতে পারত। করেনি। বাড়ির যে কোনও বিষয় থেকেই সে দূরে থাকতে চায়, এ-কথা অনেক আগেই জানিয়ে দিয়েছে সবাইকে। তো, পরির মা মারা গেছে, বা কয়েক দিন ধরে সে রফিককে দেখতে চাইছিল―এর সঙ্গে তার গত কয়েক দিনের অস্থিরতা বা আজকে ভোরের স্বপ্ন দেখা বা হঠাৎ বাড়ি চলে আসার কোনও সম্পর্ক আছে কি না সেটা একটা প্রশ্ন বটে, তবে ওরকম কিছু মেনে নেওয়া তার জন্য কঠিন। এমন কোনও জৈবিক তরঙ্গের কথা তার জানা নেই যার মাধ্যমে দুজন মানুষ ভিন্ন জায়গা থেকে কোনও মাধ্যম ছাড়াই পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। তাছাড়া, সে স্বপ্ন দেখেছে মাকে, পরির মা তো তার মা নয়, নিছকই এক আশ্রিত মানুষ। সবচেয়ে ভালো হয়, স্বপ্নটাকে অবচেতন মনের উদ্ভট প্রকাশ হিসেবে উড়িয়ে দিতে পারলে। কিন্তু তা পারা যাচ্ছে না, কারণ বৃদ্ধা সত্যিই মারা গেছে এবং স্বপ্নে যে তাকে ডাকছিল তা আসলে ছোটবেলায় দেখা এই নারীরই মুখ। এবং এও সত্য যে, পরির মা তাকে বাবলু নামেই ডাকত, সম্বোধন করত ‘বাজান’ বলে। ছোটবেলার এইসব বিষয় স্বপ্নের ভেতরে বেঁকেচুরে ঢুকে পড়তে পারে বৈকি, পরির মা যদি মারা না যেত তাহলে স্বপ্নটাকে নিছকই সাধারণ ব্যাপার বলে ধরে নিতে সুবিধা হতো রফিকের। কিন্তু তার মৃত্যুই বিষয়টি ব্যাখ্যার ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছে। তবে কি মৃত্যুর আগে এই অসহায় বৃদ্ধ মানুষটি তার কাছে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল, সেজন্যই কি বারবার তাকে দেখতে চাইছিল ? না, প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলছে না। 

পরিস্থিতির আকস্মিকতায় নিজেকেই চিনতে পারছে না রফিক। পরির মার মৃত্যুতে কেনই বা সে এমন গভীর শোকে আক্রান্ত হয়েছে, তাও বুঝতে পারছে না। তার ভেতরে রীতিমতো ভাঙচুর চলছে। এমন হওয়ার কারণ কী ? পরির মা তো তার কেউ ছিল না। এ বাড়িতে আশ্রিত এক অন্ধ বুড়ো ভিখারি সে―ছোটবেলা থেকে তাকে দেখেছে; বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তার সঙ্গে একটা মায়ার সম্পর্কও তৈরি হয়েছিল রফিকের। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তার মৃত্যুতে সে একেবারে ভেঙে পড়বে। ব্যাপারটা সে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করছে। এমন কি হতে পারে যে, যেসব স্নেহবন্ধন সে ছিন্ন করেছে, যেসব আশ্রয় সে অস্বীকার করেছে―তার সবকিছু ওই একটি জায়গাতেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছিল ? তা যদি হয়ও, কেন সেটি হবে, তা-ও ভাবছে রফিক।

এই অপ্রত্যাশিত শোক-স্তব্ধতা আর অস্থিরতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য নিজের শৈশব আর কৈশোরকে একবার যাচাই করতে বসল রফিক। বাবাকে তার মনে পড়ে না। যুুবক বয়সেই তিনি মারা গেছেন, রফিকের বয়স তখন বছর দেড়েক এবং এর বছরখানেকের মাথায় তার মায়ের অন্যত্র বিয়ে হয়েছে। শৈশবেই মা-বাবাকে হারানোর এই ঘটনা কি তাকে এমন এক অদ্ভুত চরিত্রে পরিণত করেছে ? মনে হয় না। বাবার মৃত্যু তার মধ্যে কখনও তীব্র কষ্টের অনুভূতি তৈরি করেনি। আসলে বাবা থাকা এবং না-থাকার মধ্যে কোনও পার্থক্যই বুঝতে পারেনি কোনওদিন―যেহেতু সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল। কোনও কিছুর উপস্থিতি জীবনে গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেই তার অনুপস্থিতি তীব্রভাবে অনুভূত হয়। রফিক তো তার জীবনে বাবার উপস্থিতি টেরই পায়নি! মা’র ব্যাপারটাও ওরকমই। রফিককে এ বাড়িতে ফেলে রেখে তিনি যখন আবার বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলেন―তখন তার কেমন লেগেছিল তা বলতেই পারবে না। হয়তো দু-চারদিন কেঁদেছিল, শিশুরা মায়ের অনুপস্থিতিতে যেভাবে কাঁদে আর কি! তারপর মা না থাকার সঙ্গেই মানিয়ে নিয়েছিল নিজেকে; যেমন করে প্রতিটি শিশুই তার পবিত্র শৈশব পার হতে না-হতে ধীরে ধীরে জগতের কুৎসিত সব দৃশ্য ও মানুষদের মুখোমুখি হয় এবং মানিয়েও নেয় সবকিছুর সঙ্গে।

বড় হয়ে যখন মার কথা জানতে পারে রফিক, তখন তীব্র অভিমান তৈরি হয়েছিল। আমাকে রেখে এমন একটা কাজ মা করতে পারল!―এই কষ্ট দীর্ঘদিন বয়ে বেড়িয়েছে সে। কিন্তু একটা সময় তার অসহায়ত্বের বিষয়টিও বুঝে নিয়েছে রফিক। মা নাকি খুব সুন্দরী ছিলেন, অল্প বয়সেই বিধবা হওয়াটা তার জন্য বিপদ-বিপত্তি ও অসহায়ত্ব ডেকে এনেছিল। এই সমাজে সব স্তরেই যেমন বিধবারা নিগৃহীত হয়, রূপসী হলে তো কথাই নেই―তাকেও নিশ্চয়ই সেসবের মুখোমুখি হতে হয়েছিল! রফিক জেনেছে, মাকে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে প্রায় জোর করেই আবার বিয়ে দিয়েছিলেন তার বাবা, কারণ মেয়ের অকাল বৈধব্য তাকে স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি। তাছাড়া ওই সময় শ্বশুবাড়িটাও মার বসবাসের জন্য নিশ্চয়ই উপযুক্ত ছিল না―রফিকের দাদা-দাদি ছিলেন না, স্বামী মারা গেছে, থাকার মধ্যে এক দেবর, তার কাছে থাকাই বা কেমন দেখায়! রফিকের চাচা-চাচি অবশ্য, প্রচলিত অর্থে, খুব ভালো মানুষ। মা-বাবার অনুপস্থিতিতে তারাই রফিককে বুকে তুলে নিয়েছিলেন, স্নেহ-আদর-শাসন-মমতা-ভালোবাসা দিয়ে বড় করে তুলেছেন, বহুদিন পর্যন্ত তাদেরকেই মা-বাবা বলে জেনেছে রফিক, ডেকেছেও। বড় হওয়ার পর চাচাই সত্যটা জানান তাকে, চাচির তাতে তীব্র আপত্তি ছিল। রফিক যখন তাকে চাচি বলে ডাকতে শুরু করে, তখন তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেন তিনি, বলতেন―‘আমিই তোর মা, উনি তোকে মিথ্যে বলেছেন! তুই আমাকে চাচি ডাকবি না, খবরদার।’ এরপর থেকে রফিক তাকে মা-ই ডেকেছে সবসময়, মা বলতে সে চাচিকেই বোঝে এখনও। যা হোক, মা-বাবার অনুপস্থিতি তার গভীর অবচেতনে কোনও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে কি না সে জানে না, তবে সচেতনভাবে করেনি। এবং তাদের অনুপস্থিতিতে সে কখনও স্নেহ-মমতার অভাবে ভোগেনি। এ নিয়ে চাচা-চাচির কাছে তার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তবু যে তাদের সঙ্গে তার দূরত্ব সেটি ইচ্ছেকৃতভাবে তৈরি।

৪.

পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন করার প্রয়াস হিসেবেই রফিক সচেতনভাবে দূরত্ব তৈরি করেছিল। ঘটনাটা ছিল এরকম : ছোটবেলা থেকে সে চাচার কাছে তাদের পরিবারের মহিমান্বিত কাহিনি শুনে এসেছে। তোমার দাদা ছিল এই, তার বাবা ছিল ওই ইত্যাদি ইত্যাদি। যেন তারা কত মহান, কত বিশাল, যেন তারা না এলে এই পৃথিবীর কতই না ক্ষতি হয়ে যেত! এবং অদ্ভুত ব্যাপার হলো―এ অঞ্চলে ‘ভুঁইয়া বাড়ি’ সত্যিই একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। সেটি বিশেষভাবে বোঝা যেত নির্বাচনের সময়। যে কোনও নির্বাচন―ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে সংসদ নির্বাচন―ভুঁইয়া বাড়ির সমর্থন অন্তত ৪/৫ টি গ্রামের মানুষকে প্রভাবিত করত! এখন অবশ্য অবস্থা ধীরে ধীরে পাল্টাচ্ছে―গ্রামে কৃষকদের ছেলেমেয়েরা শিক্ষিত হচ্ছে, স্থানীয় স্কুল-কলেজে ছাত্রদল-ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবির ইত্যাদি নানাবিধ ছাত্রসংগঠনের সক্রিয় কার্যকলাপ দেখা যাচ্ছে; আগে এমনটি ছিল না―তারা এখন অনেক কিছু বোঝে, নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতে পারে; সেটি শুধু রাজনৈতিক ব্যাপারে নয়, যে কোনও ব্যাপারেই। ভুঁইয়া বাড়ির মহিমা তাই দিন দিন ম্লান হতে চলেছে। অবশ্য এই মহিমা এতদিন ধরে ছিল কেন, সেটিই কোনওদিন ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারেনি রফিক। চাচা তাকে যতই পারিবারিক গৌরবগাঁথা শোনান না কেন―সে বোঝে, এর ভেতরটা ফাঁপা, গৌরব করার মতো আসলে তেমন কিছু নেই। তার পূর্বপুরুষেরা কিছু জমিজমার মালিক ছিলেন, পরিমাণে সেটি যথেষ্টই, অল্পবিস্তর শিক্ষাদীক্ষাও ছিল। এই দিয়ে কোনও মহান ভূমিকা রাখা যায় না, কিন্তু কলার বাগানে একটা খেজুর গাছকে যেমন যথেষ্ট লম্বা দেখায়, তার পূর্বপুরুষেরাও ছিলেন তেমন―এই অজপাড়াগাঁয়ে তাদেরকে লম্বাই দেখাত―যদিও অতটা দীর্ঘ তারা নন, ছিলেন না কখনও, এরকমই মনে করে রফিক। সন্দেহ নেই, তেমন শিক্ষাদীক্ষা না থাকলেও তাদের বুদ্ধি ছিল যথেষ্ট, নইলে একটি বিস্তৃত অঞ্চলের মানুষের মনোজগতে এরকম প্রভাব তৈরি করা এবং তা অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব হতো না। এই প্রভাব ছিল এমনই যে, ভুঁইয়া বাড়ির ছেলেদের সব অপরাধও তাদের প্রশ্নহীন আনুগত্যে ম্লান হয়ে যেত। তো, চাচার অব্যাহত গৌরব-কীর্তনে এবং লোকজনের এসব ভক্তি-শ্রদ্ধা দেখে রফিকের মধ্যেও অনেক দিন পর্যন্ত ‘বংশগৌরব’ বিদ্যমান ছিল। সেটি প্রথম চিড় খায় স্কুল পাস করে শহরের কলেজে ভর্তি হওয়ার পর। স্কুলের পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করায় এটা ছিল চাচার কাছ থেকে তার জন্য একটা পুরস্কার, তিনি নিজে এসে রফিককে ঢাকার নামজাদা কলেজে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ তার নিজের ছেলেমেয়েরা কেউ গ্রামের কলেজে, কেউ বা বড়জোর মফস্বলের কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। তিনি বোঝেননি, এই পুরস্কার তার জন্যই আত্মঘাতী হবে। যা হোক, কলেজে ভর্তি হয়ে রফিক রীতিমতো হতভম্ব হয়ে গেল। সারা দেশ থেকে সেরা ছেলেরা এসে এই কলেজে ভর্তি হয়―এদের অন্তত অর্ধেক শহুরে এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারের। তাদের সঙ্গে বসে সে ক্লাস করে বটে, কিন্তু নিজেকে একটা গেঁয়ো ভূত ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না, নিজের গ্রাম্যতা আর অজ্ঞতা নিয়ে কুণ্ঠিত হয়ে থাকে সবসময়। তার এতদিনের লালিত বংশগৌরব ধুলোয় লুটিয়ে যাওয়ার জোগাড় হলো। যে বংশে পরিচয় দেওয়ার মতো একটি নামও নেই, তার আবার বংশগৌরব! মনে হলো―কী আশ্চর্য বিভ্রমের ভেতর দিয়েই না বড় হয়ে উঠেছে সে! কিন্তু এই অভিজ্ঞতার জন্যই যে সে বাড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন হলো তা নয়। হলো অন্য কারণে, সেটা বলতে গেলে একটু বিস্তৃতভাবেই বলতে হবে।

কলেজে পড়ার সময় সে থাকত হোস্টেলে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থাকত হলে। তখনও হোস্টেল বা হলগুলো একদলীয় সংঠনের দখলে চলে যায়নি। বিরোধ সত্ত্বেও নানা দল-মতের ছেলেরা থাকতে পারত, থাকত নির্দলীয় নিরীহ ছেলেরাও। মেয়েদের হোস্টেলে বা হলগুলোতেও দল-মত নির্বিশেষে সবাই থাকতে পারত। তো, সে ছিল নির্দলীয়-নিরীহ গোছের গেঁয়ো ছেলে। আর এই ধরনের ছেলেমেয়েদের ব্রেন ওয়াশ করার জন্য, অর্থাৎ একজন তরুণকে আমূল পাল্টে দেওয়ার জন্য তিন ধরনের সংগঠন খুব সক্রিয় থাকত কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর দুটো রাজনৈতিক, অন্যটি অরাজনৈতিক। রাজনৈতিক সংগঠন দুটো আবার পরস্পরবিরোধী―একটি বামপন্থী, অন্যটি ডানপন্থি মৌলবাদী। অরাজনৈতিক সংগঠনটি ধর্মীয়―তাবলিগ জামাত। অবশ্য মধ্যপন্থি ধারার কিছু সংগঠনও ছিল, তার মধ্যে দুটো ছিল প্রধান। তারা ব্রেন ওয়াশ করত না, তবে জোর করে মিছিলে নিয়ে যেত। রফিককেও বাধ্য হয়ে তাদের মিছিলে যেতে হয়েছে, না গেলে হোস্টেল থেকে বের করে দেওয়া হবে বলে ভয় দেখানো হয়েছিল কি না! কিন্তু ওই পর্যন্তই, ওদের কর্মকান্ড, কথাবার্তা, নীতি-আদর্শ কোনওকিছুই তাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। 

হোস্টেলে ওঠার মাস তিনেকের মাথায় রফিক প্রথম মুখোমুখি হলো তাবলিগ জামাতের। এক শুক্রবার বিকেলে তার রুমের দরজায় নক করল তারা, বোঝাতে শুরু করল ইসলামের মহিমা, ধর্ম-কর্মের প্রয়োজনীয়তা, বিশেষ করে তাবলিগের ফজিলত এবং এর আবশ্যিকতা। তিন চিল্লায় বেহেশত প্রাপ্তির নিশ্চয়তাও দিল তারা; কিন্তু লাভ হলো না কোনও। দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও তারা যে রফিককে দলে ভেড়াতে পারেনি, তার কারণ দুটো। প্রথমত, চাচার কারণেই ধর্মবিষয়ক অনেক বই পড়তে হয়েছিল তাকে, এবং শুনেছেও প্রচুর তার কাছ থেকেই। অনেক রকম সীমাবদ্ধতা ও স্ববিরোধিতা সত্ত্বেও সে তার চাচার কিছু গুণের কথা স্বীকার করে। এর মধ্যে একটি হলো―ধর্মকে তিনি কেবল আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দার্শনিকভাবে বিচার করার চেষ্টা করতেন। এই গুণটি বেশ দুর্লভ। তো, চাচা কোনওদিন তাকে নামাজ-রোজা ইত্যাদির জন্য চাপাচাপি করেননি, যদিও তিনি নিজে বেশ ধার্মিক এবং ধর্মের সব বিধান নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। তিনি বলতেন―‘তুমি যদি আল্লাহর মহিমা বুঝতে পারো তাহলে একদিন কৃতজ্ঞতাবশতই তার আদেশগুলো পালন করতে শুরু করবে।’ তাবলিগওয়ালারা যেমন আল্লাহর ভীতিকর রূপটি উপস্থাপন করে তাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করত, চাচা কখনও সেটা করেননি। তিনি প্রকৃতির সুন্দর সব দৃশ্য দেখাতেন, বলতেন―‘যিনি এতসব সুন্দরের স্রষ্টা তিনি কি নিষ্ঠুর হতে পারেন ?’ বলতেন―‘বেহেশতের লোভে বা দোজখের ভয়ে নয়, ধর্মকর্ম করা উচিত তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য।’ চাচার এসব কথাবার্তার প্রভাব তার মধ্যে রয়ে গিয়েছিল বলেই তাবলিগ তাকে আকর্ষণ করেনি। দ্বিতীয় কারণটিও প্রথমটিরই সম্প্রসারণ। সে বুঝতেই পারেনি―কলেজপড়ুয়া একজন তরুণকে সবসময় আল্লাহর ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকতে হবে কেন ? তার অপরাধটা কী যে আল্লাহ তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য একেবারে উদ্যত হয়ে থাকবেন ? আর যদি ভুলত্রুটি কিছু হয়েও থাকে তবু যিনি অনাদি, অসীম, অপার দয়ালু, পরম করুণাময়, তাঁর কি সেসব ছোটখাটো তুচ্ছ বিষয়ে নজর দেওয়া মানায় ?  তাছাড়া, তাবলিগওয়ালাদের এই গাট্টিবোচকা মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্যটি রফিকের কাছে দৃষ্টিকটু লাগত, মনে হতো―এরা ইসলামের ‘খেদমত’ করার বদলে সৌন্দর্য নষ্ট করছে!

তাবলিগের পর এল ডানপন্থি ছাত্র সংগঠনটি। তারাও ইসলামের কথাই বলল, কিন্তু ভিন্নভাবে। বলল, শুধু ঘরে বসে আল্লাহ আল্লাহ করলে হবে না; ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। মরলে শহীদ, জিতলে গাজি। মুখে ইসলামের কথা বললেও এদের কাজকর্ম ছিল ভীতিকর। বিশেষ করে মারামারির সময় এরা যে ধরনের নৃশংসতার পরিচয় দিত, তা অকল্পনীয়। এরা এত সংগঠিত ছিল যে দেশের যে কোনও এক প্রান্তে তাদের সঙ্গে অন্য কোনও সংগঠনের মারামারি লাগলেই তারা সেটাকে একযোগে সারা দেশে ছড়িয়ে দিত। প্রতিপক্ষের ওপর হামলার জন্য এরা নিত্যনতুন কৌশল আবিষ্কার করত আর সারা দেশ থেকে বিভিন্ন দলের কর্মীদের হাত বা পায়ের রগ কাটার খবর আসতে থাকত পত্রিকায়। রফিক তাদের সঙ্গে এসব নিয়ে কোনও আলাপই তোলেনি। সেই সাহসই তার ছিল না, বলাই বাহুল্য। বরং কতগুলো মৌলিক বিষয়ে তার যেসব প্রশ্ন ছিল সে সেগুলোই তুললো। কিন্তু প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক জবাব দিতে পারল না তারা। সত্যিকারের ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে সেটা যে আধুনিক যুগের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে না, দ্রুত অগ্রসরমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে না―রফিকের সে রকমই মনে হতো। এ প্রসঙ্গ ধরেই তাদেরকে সে জিজ্ঞেস করল―তাদের কল্পিত ইসলামি রাষ্ট্রে শিল্পসাহিত্য-খেলাধুলা-ব্যাংক-বিমা ইত্যাদি বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে ? সেই রাষ্ট্রে নারীদের অবস্থানই বা কী হবে ? তারা বলল―ইসলাম তো নারীদের মুক্তি দিয়েছে, অতএব যতটুকু ইসলামসম্মত, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীদের ততটুকু অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। নিশ্চিত করবে নিরাপত্তাও। তাদেরকে পর্দায় ঢেকে দেওয়া হবে কি না, জিজ্ঞেস করলে তারা বলল―নিশ্চয়ই। পর্দা তো ফরজ। আজকে যে সন্ত্রাস, মূল্যবোধের অবক্ষয়, ড্রাগ অ্যাডিকশন, সামাজিক অস্থিরতা আর নারী নির্যাতনের ফলে সারা দেশে নাভিশ্বাস উঠেছে―তার মূল কারণ নাকি নারীদের বেপর্দা হওয়া। ইত্যাদি। তাদের এসব কথা শুনেই রফিকের বোঝা হয়ে গেল। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী, তাদেরকে এভাবে ঘরে ঢুকিয়ে দিলে তো পুরো দেশই অচল হয়ে পড়বে। তাছাড়া, মেয়েরা হলো নিসর্গের মতো, তাদের দিকে তাকালেই বোঝা যায়―খোদা কী দারুণ সৌন্দর্যপ্রিয়! সুন্দরী মেয়েদের দেখার জন্য সে প্রতিদিন বন্ধুদের সঙ্গে কলেজ হোস্টেল থেকে নিউমার্কেটে যায়, তাদেরকে পর্দায় ঢেকে দেওয়া হবে ভাবতেই সে শিউরে উঠল।

এরই মধ্যে প্রধান দুটো ছাত্রসংগঠনের মিটিং-মিছিলেও বাধ্য হয়ে যোগ দিয়েছে কয়েকবার। বলাই বাহুল্য, ভয়ে। তারা এসে আদেশ করে, অনুরোধ নয়, না গেলে ভয়ভীতি দেখায়―ওরা পারেই এতটুকু; একজন তরুণকে কনভিন্স করার মতো কোনও আদর্শ নেই বলে ভীতিসঞ্চারই তাদের একমাত্র অস্ত্র। কিন্তু তাকে মুগ্ধ করে ফেলল বামপন্থি ছাত্রসংগঠনের কর্মীরা। বন্ধুর মতো আড্ডা দিতে দিতে তারা রফিককে শোনাল শ্রেণিহীন-শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন, ফসলের সুষম বণ্টন আর যৌথ খামারের পরিকল্পনা, প্রগতি ও বিপ্লবের সম্ভাবনার কথা। নারী-পুরুষ সম্পর্ক, মানুষে-মানুষে সম্পর্ক, সমাজ-দেশ-জাতির প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ―এ-সবকিছু নিয়েই কথা চললো দিনের পর দিন। এমন একটি সমাজের স্বপ্নও যে দেখা যায়, তা রফিকের জানাই ছিল না। সে এত বেশি ঘোরগ্রস্ত হয়ে পড়ল যে  বিপ্লব, কমরেড, সমাজতন্ত্র―এই শব্দগুলো তার ধ্যান-জ্ঞান হয়ে উঠল। তার পরিবর্তন আসা শুরু করল তখন থেকেই। বন্ধুরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল―কীভাবে শোষণ করা হচ্ছে, কীভাবে নিপীড়িত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। নিজের তথাকথিত ঐতিহ্যবাহী পরিবারটিকে মনে হলো গণবিরোধী। মনে হলো, যে শ্রেণিতে সে বাস করে তাকে শত্রুশ্রেণি বলে বিবেচনা করা উচিত।

এই দীক্ষা আর ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো রফিক। তখনও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা পুরোপুরি তৈরি হয়নি তার। উৎসব-অনুষ্ঠানে তো যেতই, তাছাড়া কারণে-অকারণে বাড়িতে যাওয়া হতো তার। গেলে ভাইবোনদের সঙ্গে নিজেদের বংশ নিয়ে প্রচুর ঠাট্টা-ইয়ার্কি-উপহাসও করত। বলত, ‘আমরা হচ্ছি ভুয়া বংশ, আমার দাদার নাম জহুর হোসেন ভুঁইয়া নয়―জহুর হোসেন ভুয়া।’ আর এসব কথা বলত চাচাকে শুনিয়ে শুনিয়েই, যেন তিনি বুঝতে পারেন―তাকে দেওয়া বংশমর্যাদা সংক্রান্ত এতকালের শিক্ষা বিফলে গেছে। এই সম্পর্কটুকুও বিলীন হলো ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়। বাড়ির জন্য এরকম টান নাকি এক ধরনের পেটিবুর্জোয়া অ্যাটিটিউড, ত্যাগ করতে না পারলে শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লড়াকু ভূমিকা রাখা সম্ভব নয়! তখন সে বিপ্লবের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে, মনে হতো―বিপ্লব বুঝি দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে, ডাকলেই চলে আসবে; কিন্তু বিপ্লব আর আসত না―দরজা ঠেলে আসত কমরেডরা। সরকার ও প্রধান বিরোধী দলীয় ছাত্রসংগঠন আর প্রতিক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর কার্যকলাপ-অত্যাচার-নির্যাতন নিয়ে আলাপ আলোচনা হতো, ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের’ উপায় খুঁজে বের করা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলত দিনের পর দিন। পরস্পরের সমালোচনাও চলত প্রচুর। কার কোন আচরণটি বুর্জোয়া, কোনটি পেটিবুর্জোয়া, কোনটি প্রতিক্রিয়াশীল― এইসব। মনে আছে―একবার তাদের এক বন্ধু কমরেড মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে, তাদের সামনেই, যে খবরটা নিয়ে এসেছিল তার ওপর রাগে ফেটে পড়েছিল―মা অসুস্থ তো আমি কী করব ? আমি কি ডাক্তার ?

রফিক লজ্জায় ম্রিয়মাণ হয়ে গিয়েছিল―মায়ের অসুস্থতাকে এইভাবে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া হয়, আর সে কি না চাচা-চাচি-ভাই-বোন নিয়ে এত আবেগপ্রবণ! সেদিনই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল―এসব ‘পুতুপুতু আবেগ’ আর ‘পেটিবুর্জোয়া অ্যাটিটিউড ’ ছাড়তে হবে। এরপর প্রায় বছরখানেক সে বাড়িতে যায়নি। এমনকি বোনের বিয়ের সময়ও নয়। ব্যাপারটা নিশ্চিতভাবেই তার জন্য খুব কষ্টকর ছিল। চাচির জন্য মন কাঁদতো, চাচার জন্য খারাপ লাগত, ভাই-বোনের জন্য বুকটা হাহাকার করে উঠত। যা হোক, বছরখানেক পর বাড়িতে গেলে সবার অভিমানমাখা দৃষ্টি চোখে পড়েছিল, কিন্তু পাত্তা দেয়নি সে। হয়তো তাদেরকে পাত্তা না দেওয়ার জন্যই রফিক কথা বলতে শুরু করে পরির মার সঙ্গে। আর হঠাৎ করেই তার সামনে এক অদ্ভুত জগৎ উন্মোচিত হয়। ছোটবেলা থেকেই এই মহিলাকে দেখে আসছে সে―কিন্তু কোনওদিন ভালো করে কথা বলে দেখেনি, যদিও তার জন্য বুড়ির অদ্ভুত একটা স্নেহ ছিল, রফিককে সে ডাকত ‘বাজান’ বলে। তার শৈশব এবং কৈশোরের কিছু অংশ কেটেছে এই বৃদ্ধ ভিখারির কার্যকলাপ বিস্ময়ের চোখে দেখে। অন্ধ ছিল সে, তবু নিজের সব কাজ নিজেই করত। ভিক্ষা করতে বেরুতো গ্রামে, সেখান থেকে বাজারে যেত, ফিরে এসে নিজেই রান্না করত, তারপর তরকারির একটু অংশ রফিকের জন্য নিয়ে আসত। বাড়ির অনেক বাচ্চার মধ্যে কী করে সে-ই তার বিশেষ স্নেহের পাত্র হয়েছিল, সেই রহস্য আজও রফিকের কাছে পরিষ্কার নয়। তো, এই মহিলাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য সে মনে মনে মৃত বাবার প্রশংসা করত। ঠিকানাবিহীন-অন্ধ- বুড়ো-স্মৃতিভ্রষ্ট এই মহিলা নইলে যেত কোথায় ? কিন্তু বাবা বোঝেননি―তিনি তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে একটি জ্বলন্ত প্রশ্ন রেখে যাচ্ছেন। কেন ওই অসহায় সর্বস্ব-হারানো অন্ধ বৃদ্ধাকে এই বাড়ির আশ্রিতা হয়েও ভিক্ষা করে, নিজে বাজার করে এবং রান্না করে খেতে হয়―প্রশ্নটি তার সেই ছোটবেলাতেই জন্ম নিয়েছিল, যার উত্তর আজও পায়নি। তাদের তো কোনও অভাব ছিল না, বাড়িতে প্রতি বেলাতেই হিসাবের বাইরে দু-চারজন লোক বেশি খেতো; চাচা সীমিত সামর্থ্যরে মধ্যে গ্রামের দরিদ্র লোকজনকে সাহায্য করতেন; এমন একটি সচ্ছল পরিবারে একজন মানুষ কোনও বাড়তি ব্যাপারও নয়―তাছাড়া এ পরিবারের মানুষগুলোও খুব বেশি নিষ্ঠুর নয়, বরং বেশ সহানুভূতিসম্পন্ন। তাহলে ?

এসব নিয়ে অবশ্য পরির মার নিজের কোনও অভিযোগ ছিল না, কিংবা অভিযোগ আছে কি না সে বিষয়ে কেউ কখনও জানতেও চায়নি। তো, এতদিন পর তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে রফিক আবিষ্কার করল―সে এক স্মৃতিভ্রষ্ট মানুষ। কোত্থেকে এসেছে সে, কোথায় বাড়ি, সেখানে কেউ আছে কি না, কিংবা ছিল কি না, কিছুই মনে নেই তার। কেবল মনে আছে তার মেয়ের কথা, যে মেয়েটিকে পরিরা তাদের দেশে নিয়ে গিয়েছিল! অনেক অনুরোধ-মিনতি-সাধ্য-সাধনার পর তাকে ফেরত দেওয়া হলেও পরিরা এর প্রতিশোধ নেয় পরির মাকে অন্ধ করে দিয়ে। মেয়েকে পরিরা নিয়ে গিয়েছিল বলে তার নাম হয় পরির মা। এসব শুনতে শুনতে রফিকের সামনে যেন এক জাদুবাস্তবতার জগৎ উপস্থিত হয়। পরির মা এখন পর্যন্ত গভীরভাবে বিশ্বাস করে―যে মেয়েটিকে ওরা ফিরিয়ে দিয়ে গিয়েছিল সে প্রকৃতপক্ষে তার মেয়ে নয়, পরিদের মেয়ে তার মেয়ের রূপ ধরে এসেছিল, আর তার মেয়ে রয়ে গেছে পরিদেরই দেশে! সবার চোখকে ফাঁকি দিতে পারলেও মায়ের চোখকে যে দেওয়া যায় না, সেটা জেনেই তারা তাকে অন্ধ করে দিয়ে গেছে। পরির মার এই বিশ্বাসে কোনও খাদ ছিল না, আর তার জগৎ জুড়ে ওই মেয়েটি ছাড়া আর কেউ ছিলও না। তাকে কখনও তার স্বামী বা অন্য কোনও সন্তান বা সংসার বা বাড়িঘর অথবা মা-বাবা-ভাইবোন সম্বন্ধে কিছু বলতে শোনা যায়নি। কিছুই মনে করতে  পারত না সে। এমনকি যে মেয়েকে নিয়ে এত এত গল্প, পরে তার কী হলো, কোথায় গেল, তা-ও মনে ছিল না তার। জিজ্ঞেস করলে সে তার অন্ধ চোখ মেলে সুদূরে তাকিয়ে থেকে অনেকক্ষণ পর কেবল বলতে পারত―‘ওই যে বান আইলো!’ এটুকুই। ছোটবেলা থেকেই অবশ্য রফিক শুনে এসেছে যে, তার জন্মের আগেই বাবা তাকে নিয়ে এসেছিলেন উপকূলবর্তী কোনও এলাকা থেকে। খুব বড় এক ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসের পর কী একটা কাজে যেন বাবা সেখানে গিয়েছিলেন, এবং কুড়িয়ে পেয়েছিলেন পরির মাকে। যাহোক, কথা বলতে বলতেই তার জন্য গভীর মমতা তৈরি হয় রফিকের ভেতরে। আর তার সঙ্গে কথা বলার জন্য, তাকে দেখার জন্য সে আবার বাড়িতে আসতে শুরু করে। 

 সেই পরির মা মারা গেছে। অজানা কারণে রফিক শোকে প্রায় মূহ্যমান হয়ে পড়েছে। গত কয়েক বছরে তার সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্কই কি এর কারণ ? এই কষ্ট লাগা কি কোনও পেটিবুর্জোয়া ফিলিং ? কমরেডরা থাকলে বলতে পারত। আমি বোধহয় বামপন্থা ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি, এখনও নানা ব্যাপারে কমরেডদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আমাকে বিনা-বাক্যব্যয়েই মেনে নিতে হয়―আপনমনে ভাবল রফিক। যা হোক, বাড়িতে আসার পর থেকে সে পরির মার লাশ ছেড়ে এক মুহূর্ত কোথাও যায়নি। এখন বিকেল। বৃষ্টি থেমেছে। দাফনের ব্যবস্থা হচ্ছে―কিন্তু ব্যাপারটা এত সহজে শেষ হবে বলে মনে হচ্ছে না।

৫.

সকাল থেকে প্রবল বৃষ্টি, কিছুতেই কবর খোঁড়া যাচ্ছে না। দীন মোহাম্মদ সাহেব বৃষ্টি থামার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। বাড়িতে একটা লাশ থাকলে স্বস্তিতে কিছু করা যায় না―হোক না সে অনাত্মীয়, আশ্রিত, ভিক্ষুক। সেই অস্বস্তি প্রায় আশঙ্কায় পরিণত হয়েছে রফিকের উপস্থিতিতে। এই আশঙ্কার কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই, কিন্তু পৃথিবীর সব কিছু যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না বলেই বিশ্বাস করেন তিনি―আল্লাহ পাক অনেক রহস্যময় ঘটনার জন্ম দেন, দিয়েছেন, দেবেন―যেগুলো মানুষের লব্ধ জ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। সেই প্রমাণ তিনি আবারও পেলেন। বিকেলের দিকে যখন বৃষ্টি ধরে এল, গোরখোদকরা চলে গেল কবর খুঁড়তে, তিনি লোকজনকে খবর পাঠালেন জানাজায় শরিক হতে, আর তখনই রফিক এল, জিজ্ঞেস করল―‘কবর কোথায় দেবেন বলে ঠিক করেছেন ?’ তিনি, যা স্বাভাবিক, তাই করেছেন―এ গ্রামে কোনও গোরস্থান নেই, পাশের গ্রামের গোরস্থানেই কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন; কিন্তু কথাটা রফিককে জানাতেই সে বেঁকে বসল, বলল―‘না, এই বাড়িতেই পরির মার  কবর হবে।’ শুনে তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। তাদের পারিবারিক কবরস্থানে পরির মার মতো একজন নাম-পরিচয়হীন ভিখারির কবর হতে পারে―এ কথা রফিক ভাবল কীভাবে ? ঝামেলা একটা হবে সে আশঙ্কা তিনি আগেই করেছিলেন, কিন্তু সেটি ঠিক এই মাত্রার তা কল্পনাও করেননি। দীন মোহাম্মদ ভুঁইয়া ঠান্ডা মাথায় রফিককে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, বলেছেন―এ হচ্ছে তাদের বংশমর্যাদার প্রশ্ন। প্রবল প্রতাপশালী জহুর হোসেন ভুঁইয়ার পাশে একজন বেওয়ারিশ ভিখারিকে কি রাখা চলে ? কিন্তু এসব কথা রফিক কানেই নিচ্ছে না। গোঁ ধরে বসে আছে। দীন মোহাম্মদ হাল ছেড়ে দিয়ে তার স্ত্রীকে পাঠিয়েছেন রফিককে বোঝাতে, কিন্তু তিনিও বিফল হয়েছেন। খবর পেয়ে আত্মীয়-স্বজন, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, উদাসপুর হাইস্কুলের হেডমাস্টারসহ অন্য শিক্ষকরাও ইতিমধ্যে চলে এসেছেন। রফিক আর কারও কথা না শুনুক, শিক্ষকদের কথা শুনবে বলে তার বিশ্বাস ছিল, কিন্তু কারও কথাতেই সে তার অবস্থান থেকে এক চুলও নড়েনি। দীন মোহাম্মদ বুঝতে পারছেন না, রফিক ব্যাপারটা নিয়ে এমন গোঁ ধরে আছে কেন ? সন্ধ্যা পার হয়ে রাত নেমেছে, এখন পর্যন্ত লাশের কোনও গতি করা গেল না, এর কোনও মানে হয়! বাড়ি ভরতি লোকজন, তারা আর কতক্ষণ বসে থাকবে ? দীন মোহাম্মদ তাই গণ্যমান্য লোকজনকে নিয়ে মিটিং-এ বসলেন, ডেকে পাঠালেন রফিককে―সে যা বলার সবার সামনেই বলুক।

রফিক এল, কিন্তু বসল না, দীন মোহাম্মদ সাহেবকে আলাদা করে ডেকে বলল―আপনি তো বাড়িতে বাজার বসিয়ে দিয়েছেন। এত লোককে খবর দিয়েছেন কেন ? ব্যাপারটাকে অযথা এত জটিলই বা করে তুলছেন কেন ?

রফিক যে এমন বেয়াদব হয়ে উঠেছে তা তার জানাই ছিল না। এ কোন ধরনের ভাষা ? কিন্তু তিনি মাথা গরম করলেন না, বললেন―জটিল আমি করছি, না তুমি ?

আমি করছি না তো! আমি তো খুবই সহজ একটা কথা বলেছি। পরির মা প্রায় বিশ বছর এ বাড়িতে ছিল, তার কবর এ বাড়িতে হলে অসুবিধা কী ?

অসুবিধা হলো, তাতে আমাদের বংশমর্যাদা…

রাখেন আপনার বংশমর্যাদা! বংশ ধুয়ে পানি খাবেন ? যা বলছি, তাই করেন…

দীন মোহাম্মদ এবার আর সহ্য করতে পারলেন না। বেয়াদবির একটা সীমা থাকা উচিত। রাগে কাঁপতে কাঁপতে তিনি বললেন―তোমার কাছে বংশের কোনও গুরুত্ব না থাকতে পারে, আমার কাছে আছে। ওই মহিলার কবর এ বাড়িতে হবে না।

হতেই হবে।

না, হবে না। দরকার হলে ওই লাশ আমি পানিতে ভাসিয়ে দেব।

পারবেন না। আমি এখানে থাকতে আপনি সেটা করতে পারবেন না।―

তুমি দেখতে চাও, আমি পারি কি না ?

যা পারবেন না, তা নিয়ে অযথা চেঁচামেচি করবেন না। যা বলছি শোনেন। এই বাড়ির ওপর আমার পূর্ণ অধিকার আছে। আইনত এই বাড়ির অর্ধেক এবং দাদার সমস্ত সম্পত্তির অর্ধেক অংশীদারিত্ব আমার। এসব নিয়ে আমি কোনওদিন কথা বলিনি, বলতেও চাই না, কোনওদিন এসব দাবিও করতে আসব না। কিন্তু অধিকার যেহেতু আছে, তাই বলছি―উনার কবর এ বাড়িতেই হবে।

দীন মোহাম্মদ প্রচণ্ড ধাক্কা খেলেন। রফিক যে এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করতে পারে, তিনি তা কল্পনাই করেননি। চিৎকার করে বললেন―তুমি কি সম্পত্তি ভাগাভাগি করতে চাও ? এখনই করতে চাও ? লাশ দাফন করার আগেই ? তাহলে শুনে রাখো, ছোটবেলা থেকে তোমাকে লালনপালন করেছি, পড়াশোনা করিয়েছি, এখন পর্যন্ত প্রতি মাসে হাতখরচ দিয়ে যাচ্ছি― এ সবকিছুর হিসাব হতে হবে।

রফিকও ভাবতে পারেনি, চাচা তাকে এরকম খোঁটা দেবেন। সম্বিৎ হারালো সেও, উঁচু গলায় বলল―হিসাব করতে চাইলে করেন। খরচ যা করেছেন তা তো আমারই প্রাপ্য। হিসাব তো আমিও চাইতে পারি।

ঠিক আছে, তাহলে আজকেই সব মীমাংসা হয়ে যাক। এক্ষুণি। আমি সবার সামনেই ভাগ-বাটোয়ারা করে ফেলতে চাই যেন তুমি পরে কোনও ঝামেলা করতে না পারো।

তা আপনি যা-ই করেন, পরির মার কবর এ বাড়িতেই হবে এটাই আমার শেষ কথা। আমি আমার অধিকার ছাড়ব না। এই কবরস্থানে কেবল আপনার বাপ-মা, দাদা-দাদি ঘুমিয়ে আছেন, তা কিন্তু নয়, তারা আমারও পূর্বপুরুষ। এমনকি আমার বাবাও এখানেই আছেন। তাদের পাশে আমি পরির মাকে রাখবই। এ আমার অধিকার।

দীন মোহাম্মদ স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এই রফিককে তিনি চেনেন না। এত জেদি, এত রাগী, এত একরোখা, এত বেয়াদব সে হলো কবে ? কীভাবেই বা হলো ? এত আদর-যত্নে বড় করার ফল কি তাহলে এই ? সম্পত্তির ভাগ সে চাইতেই পারে, তাই বলে এভাবে ? ঘরে একটা লাশ রেখে ? এরকম কদর্য ভাষায় ? কীভাবে সম্ভব ? সত্যি বটে, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই বাড়ি এবং জমিজমার মালিক তারা দু ভাই এবং যেহেতু তার বড় ভাইয়ের একমাত্র উত্তরাধিকার রফিক, তাই এসব সম্পত্তির অর্ধেক ওরই প্রাপ্য; এবং চিরদিন এগুলো নিজের দখলে রাখার কোনও ইচ্ছেও তার নেই। তিনি ভেবেছিলেন―রফিককে বিয়েশাদি করিয়ে তাকে তার অংশটুকু বুঝিয়ে দেবেন। সে তার শরিকানার বিষয়টি বোঝে, কিন্তু জানে না, তার বাবার মৃত্যুর পর আইনত তিনিই রফিকের অভিভাবক এবং সাবালক হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত রফিকের ভরণপোষণ এবং সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের দায়দায়িত্বও  তাঁরই। তিনি সেটিই করেছেন। তাঁর ভাইয়ের মৃত্যুর পর থেকে সম্পত্তি থেকে অর্জিত আয়ের সম্পূর্ণ হিসাব রেখেছেন; রফিকের প্রাপ্য অংশ আলাদা করে ব্যাংকে জমিয়েছেন; রফিকের ভরণপোষণ, পড়াশোনা, প্রতি মাসের হাতখরচ ইত্যাদি তিনি নিজের আয় থেকে দিয়েছেন দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে, এতিমের হক তো তিনি মেরে খানইনি, উল্টো নিজের ছেলেমেয়েদের চেয়ে অধিক মনোযোগ দিয়েছেন রফিককে বড় মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। রফিক এসবের কিছুই জানে না। তিনি জানানোর প্রয়োজন বোধ করেননি। হ্যাঁ, আরও আগেই, প্রশ্নটি ওঠার আগেই, সম্পত্তি বিলিবণ্টনের ব্যবস্থা তার করা উচিত ছিল―সেটা না করার পেছনে তাঁর কোনও অসৎ উদ্দেশ্যও ছিল না। তিনি ভেবেছিলেন―ওর বয়স কম, এগুলো দেখেশুনে রাখতে পারবে না। তা ছাড়া, ওর নামে ব্যাংকে যে টাকা জমছে তা জানলে বাজে খরচের নেশায় পড়ে যাবে বলে তাঁর শঙ্কা ছিল। রফিক এ-ও জানে না, এ সবকিছুর অর্ধেক মালিকানা তার হলেও বাড়ির কিছু অংশ―মসজিদ, কবরস্থান ইত্যাদি―এজমালি সম্পত্তি, অর্থাৎ ওগুলোর কোনও ভাগ হয় না, বাড়ির সব শরিকের সমান অধিকার তাতে। ওটার ওপর কোনও জোরজুলুম চলে না, এক শরিকের আপত্তিতে অন্য কোনও শরিক জোর করে সেখানে কিছু করতে পারে না। রফিক যেহেতু প্রশ্নটা তুলেছেই, এসব বিষয় অবশ্যই তাকে মেনে চলতে হবে; এবং আজই এ সবকিছুর একটা বিহিত-ব্যবস্থা করে ফেলবেন তিনি। এখন বাড়িতে আত্মীয়স্বজন আছে, এলাকার গণ্যমান্য লোকজন আছে―তাদের উপস্থিতিতেই এর একটা সুরাহা করবেন।

রাগ সামলাতে পারছেন না দীন মোহাম্মদ, কষ্টও পাচ্ছেন খুব―এই ছেলেটিকে তিনি নিজের সন্তানের চেয়ে অধিক স্নেহে বড় করেছেন, কোথাও কোনও ত্রুটি রাখেননি, কোনও আকাক্সক্ষা অপূর্ণ রাখেননি। সম্পত্তি নিয়ে যদি তার প্রশ্ন থেকেই থাকে, সেটা এভাবে বলার কোনও দরকার ছিল না। বেয়াদবের মতো ‘বংশ ধুয়ে পানি খাবেন’, ‘বাড়িতে বাজার বসিয়ে দিয়েছেন’ ইত্যাদি আপত্তিকর বাক্য ব্যবহার করারও দরকার ছিল না। দুঃখ-কষ্ট-অভিমানে তাঁর বুক ভেঙে যাচ্ছে। এমনিতে শান্ত মানুষ তিনি, সহজে রাগেন না, কিন্তু রেগে গেলে আর নিয়ন্ত্রণ থাকে না নিজের ওপর। বাড়িতে একটা লাশ পড়ে আছে, তার সৎকারের ব্যবস্থা করাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ, তিনি তা ভুলেই গেলেন। আত্মীয়দের কাছে গিয়ে বললেন―‘রফিক সম্পত্তি ভাগাভাগির কথা বলছে। আপনারা সবাই আছেন, এখনই বসে সেটেল করে দিয়ে যান। বাড়ির কোন অংশ সে চায়, কোন কোন জমি চায়, সে-ই বুঝে নিক।’ শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেলেন। রফিকের কি মাথা খারাপ হয়ে গেল ? এরকম একটা সময়ে সম্পত্তি নিয়ে কথাবার্তা না বললেই কি চলত না ? একটা লাশ বাড়িতে রেখে, চাচাকে প্রায় জিম্মি করে এসব মীমাংসা করতে হবে ? তারা সবাই একযোগে গেলেন রফিকের কাছে; কিন্তু সবার সঙ্গে কথা বলতে রাজি নয় সে, শুধু হেডমাস্টার সাহেবকে ডেকে নিল।

ঝামেলা ভালোই লেগেছে বলে মনে হচ্ছে―হেডস্যারের কথা শুনে রফিকের তাই মনে হলো। চাচাকে সে সম্পত্তি ভাগ করার কথা বলেনি, কিন্তু তিনি ব্যাপারটা সেভাবেই নিয়েছেন। স্যারও কথা শুরু করলেন ওই প্রসঙ্গ নিয়েই―সম্পত্তি ভাগাভাগির কথা এখন না বললে হতো না রফিক ? তুমি মেধাবী, বুদ্ধিমান, শিক্ষিত ছেলে। এভাবে ওই প্রসঙ্গ উত্থাপন করা তোমার উচিত হয়নি।

আমি তো সেটা বলিনি।

বলোনি! দীন মোহাম্মদ সাহেব বললেন যে!

না স্যার, আমি এসব বলিনি।

তাহলে কী বলেছ ?

চাচা তো আমার কোনও কথাই শুনছেন না, তাই বলেছি এ বাড়িতে আমার অধিকার আছে, পরির মার কবর এ বাড়িতেই হবে।

কিন্তু তুমি ব্যাপারটা নিয়ে এত জেদ করছো কেন বলো তো ? কবর এক জায়গায় হলেই হয়।

তা যদি হয়ই, তাহলে এই বাড়িতে হলে অসুবিধা কী ?

এটা তোমাদের পারিবারিক মর্যাদার প্রশ্ন। কবরস্থানটা পারিবারিক―এখানে অন্য কারও কবর কখনও হয়নি। তোমার পূর্বপুরুষেরা এই অঞ্চলের সম্মানিত মানুষ ছিলেন, তাঁদের বংশধর হিসেবে তোমার চাচা যদি তাঁদের সম্মান রক্ষা করতে চান, তাহলে তাঁকে দোষ দেওয়া যায় না।

পরির মাকে এখানে কবর দিলে তাঁদের সম্মান ক্ষুণ্ন হবে ? এই পরিবারের আভিজাত্য ভেঙে পড়বে ?

তোমার চাচা তাই-ই মনে করেন।

যে সম্মান আর আভিজাত্য এত ঠুনকো, তা ভেঙে পড়াই উচিত।

সেটা তোমার দৃষ্টিভঙ্গি, তাঁর নয়! তুমি তাঁর জায়গায় দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করো।

আমি তো বুঝতে পারছি, কিন্তু তিনি কেন আমার ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন না ?

আমরা কেউ-ই তা পারছি না। তাঁর যুক্তিটা আমরা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারছি, কিন্তু তুমি কী কারণে এতটা জেদ করছো বুঝতে পারছি না। আমাকে বুঝিয়ে বলো তো!

ব্যাপারটা আমার কাছে আদর্শিক। আপনিই তো আমাদেরকে বলতেন স্যার, আদর্শের প্রশ্নে কোনওদিন মাথা নত কর না।

এখনও তা বলি। কিন্তু তুমি কোন আদর্শ থেকে কথাটা বলছো, সেটা বলবে তো!

স্যার, এই শ্রেণিবিভক্ত সমাজকে আমি স্বীকার করি না। আমি শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্ন দেখি, সেই সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করি, এবং বিশ্বাস করি―কাজটা শুরু করা উচিত নিজের পরিবার থেকেই। দেখুন স্যার, আমাদের পরিবারের মধ্যে এই শ্রেণিবিভাজন কত তীব্র, মৃত্যুর পরও আমার পূর্বপুরুষের পাশে পরির মাকে কবর দিলে তাঁদের আভিজাত্য ক্ষুণ্ন হয়! আদর্শিকভাবেই এই দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র বিরোধিতা করি আমি। আর তা ছাড়া, আরেকটা কথাও আমি ভাবছি। বেঁচে থাকতে পরির মার কোনও স্থায়ী ঠিকানা ছিল না। কোত্থেকে এসেছে, কে সে তা সে নিজেই জানত না। মৃত্যুর পরও কি সে কোনও স্থায়ী ঠিকানা পাবে না ? গ্রামের গোরস্থানে কবর দিলে তিন/চার বছরের মধ্যে সেখানে আরেকটা নতুন কবর হবে। এখানে হলে তা হবে না। অন্তত মৃত্যুর পর তার একটা স্থায়ী ঠিকানা হোক!

বাবা রফিক, আমার পুরো জীবন আমি ব্যয় করেছি একটিমাত্র স্বপ্ন দেখে―আমার ছাত্ররা আদর্শিক মানুষ হবে। এখন বুড়ো হয়েছি, ছাত্রদের মুখে আদর্শের কথা শুনলে নিজের জীবনকে সার্থক বলে মনে হয়। তুমি একজন ভিখারির জন্য এভাবে ভাবছো দেখে আমার গভীর আনন্দ হচ্ছে। কিন্তু যে শ্রেণিবিভাজনের কথা তুমি বললে ওতে তো আমাদের কোনও হাত নেই! শ্রেণি আল্লাহরই তৈরি।

না স্যার। শ্রেণি তৈরি করেছে মানুষ, আল্লাহর এতে কোনও ভূমিকা নেই।

তুমি কি আল্লাহকে বিশ্বাস করো ?

সেটা কি খুব জরুরি ব্যাপার ?

না, তা নয়। কিন্তু বিশ্বাস করলে তোমাকে এটাও বিশ্বাস করতে হবে যে, শ্রেণি ব্যাপারটা তাঁরই তৈরি, মানুষের নয়।

কীভাবে ?

একটা শিশু জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গেই তো তার শ্রেণি নির্ধারিত হয়ে যায়। সে যদি দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয় তাহলে সে-ও দরিদ্র, ধনী পরিবারে জন্মালে সে ধনী। কিন্তু জন্মের ব্যাপারে তো কারও হাত নেই, কাউকে তো আর জন্মের আগে জিজ্ঞেস করা হয় না যে সে কোথায় জন্ম নিতে চায়, করলে কোনও মানুষ দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিতে চাইত বলে মনে হয় না। এমনও নয় যে, একটা শিশু জন্মের আগেই কোনও পাপ বা পুণ্য করে আসে এবং পাপের শাস্তি বা পুণ্যের পুরস্কার হিসেবে শিশুটিকে দারিদ্র বা প্রাচুর্যের মধ্যে জন্ম দেন তিনি। কে কোথায় জন্ম নেবে সে সিদ্ধান্ত নেন স্বয়ং আল্লাহতায়ালা। তুমিই বলো, একজন মানুষকে জিজ্ঞেস না করেই একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিতে জন্ম দেওয়ার ঘটনাটিই কি প্রমাণ করে না যে তিনি মানুষকে শ্রেণিবিভক্ত হিসেবেই দেখতে চান ?

আপনি এখনকার সিস্টেম দেখে কথাগুলো বলছেন, স্যার। কিন্তু তার আগে কি এই প্রশ্ন আসে না যে, এই শ্রেণি ব্যাপারটা এল কোত্থেকে ? ইতিহাসের প্রাথমিক পর্বে মানব সমাজে কোনও শ্রেণিবিভাজন ছিল না। মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণিদেরও তো সমাজ আছে, সংঘবদ্ধতা আছে, কিন্তু শ্রেণিবিভাজন নেই। মানুষও একটা প্রাণীই। পার্থক্য হলো অন্য প্রাণিরা প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে মেনে নিয়েছে, মানুষ তা মানেনি। সে তার মতো করে সভ্যতা নির্মাণ করতে চেয়েছে।

সেটা কি খুব ভুল হয়েছে ?

অবশ্যই ভুল হয়েছে। আল্লাহ তো সবাইকে সমান সুযোগ দিয়েছেন। বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ মানুষের জন্যও যা, একটা বাঘ বা হরিণ, প্রজাপতি বা ফড়িং , পিঁপড়া বা মাকড়সার জন্যও তা-ই। কমবেশি নেই। মানুষ চাইলেও বাতাস থেকে বেশি পরিমাণ অক্সিজেন নিতে পারবে না। কিন্তু তারা প্রাকৃতিক সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পদে রূপান্তরিত করার জন্য যুদ্ধ করে চলেছে হাজার হাজার বছর ধরে আর এর নাম দিয়েছে সভ্যতা!

রফিকের কণ্ঠ থেকে ব্যঙ্গ ঝরে পড়ল। হেডমাস্টার সাহেব কোনও কথা বলতে পারলেন না, গভীর ভাবনায় নিমগ্ন হলেন। তাঁর এই ছাত্রটি এই ধরনের চিন্তা করতে শিখলো কীভাবে ? একেবারে নতুন ধরনের চিন্তা। ওর যুক্তিগুলো এত সুসংহত যে এর বিরুদ্ধে কিছু দাঁড় করাতেও মন চায় না।

তাঁকে চুপ করে থাকতে দেখে রফিকই আবার বলল―আদিম সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা ছিল না, এটা মানব-ইতিহাসের অনেক পরের ব্যাপার। আর এই ধারণা থেকেই শ্রেণির জন্ম। আপনিই বলুন স্যার, আদিতে যে শ্রেণি ছিল না সেটা কি এই প্রমাণ করে না যে আল্লাহ শ্রেণি চান না, মানুষই এসবের জন্ম দিয়েছে ? ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি আল্লাহর সৃষ্টি নয়, আল্লাহ সব ধর্মের, সব বর্ণের, সব জাতির, এমনকি সব জীবজন্তু, পশুপাখি এবং কীটপতঙ্গেরও। আপনি কি তা মনে করেন না স্যার ?

হ্যাঁ, নিশ্চয়ই মনে করি। তিনি রাব্বুল আল আমিন। সমগ্র সৃষ্টিজগতের রব, স্রষ্টা, পালনকর্তা। শুধু মানুষের নন।

তাহলে বলুন, তিনি কি দুজন শিশুর মধ্যে একজনকে শাস্তি আরেকজনকে পুরস্কার দিতে পারেন, ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণিতে তাদেরকে জন্ম দিয়ে ? দুজনেই তো নিষ্পাপ।

আমি জানি না বাবা। তিনি কী পারেন আর কী পারেন না তা বলার ক্ষমতা আমার নেই।

ঠিক আছে স্যার, তা না হয় নাই বললেন। কিন্তু শ্রেণি যে মানুষেরই তৈরি তা তো মানবেন ? 

 তোমার যুক্তি মানলে তো তা মানতেই হয়। কিন্তু তাই যদি হবে, তিনি তাহলে এই শ্রেণি টিকিয়ে রেখেছেন কেন ? যা তাঁর পছন্দের নয়, যা তাঁর ইচ্ছের বিরুদ্ধে, ইচ্ছে করলেই তো তিনি তা ধ্বংস করে দিতে পারেন। দেন না কেন ? 

দেন না, কারণ, তিনি চান কাজটা মানুষই করুক। মানুষকে তিনি স্বাধীনতা দিয়েছেন যা ইচ্ছে তাই করার; এমনকি তাঁর ইচ্ছের বিরুদ্ধে কাজ করার স্বাধীনতাও আছে মানুষের, আর সেটা আছে বলেই মানুষের পাপ-পুণ্যের বিচার হবে, নইলে তো সব দায়দায়িত্ব আল্লাহর কাঁধেই চাপিয়ে দেয়া যেত। মানুষ যে শ্রেণি সৃষ্টি করল―এ তাঁর ইচ্ছেবিরুদ্ধ, এ পাপ মানুষের, মানুষেরই কর্তব্য এ থেকে মানুষকে মুক্তি দিয়ে তাঁর ইচ্ছেকে সম্মান জানানো।

এই বিতর্ক প্রাচীন, অন্তহীন। আমরা কোনও সমাধানে পৌঁছতে পারব বলে মনে হয় না, বাবা। তবে আমি তোমার মতামতকে শ্রদ্ধা করি। আর পরির মার ব্যাপারে তোমার অবস্থানকেও সমর্থন করি। কিন্তু বুঝতেই পারছ, নানা কারণে প্রকাশ্যে সেটা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তোমার চাচা আমার দীর্ঘদিনের সহকর্মী, এখন এই বুড়ো বয়সে আমি তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তাঁর সেন্টিমেন্টে আঘাত করতে চাই না।

ঠিক আছে স্যার। আপনি প্রকাশ্যে আমার পক্ষে না থাকলেও অন্তত বিরুদ্ধে যাবেন না, নীরব থাকবেন। আর চাচাকে শুধু এটুকু বলবেন, আমি সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে কোনও কথা তুলিনি। বাকিটুকু আমার একার লড়াই।

স্যার চলে গেলে রফিক স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ল। বোঝাই যাচ্ছে, যুক্তিতর্কে স্যার পরাস্ত হয়েছেন। তার আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল। উদাসপুর হাই স্কুলের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী হেডমাস্টার শামসুদ্দীন আহম্মদ এম.এ, এম.এড কে পরাস্ত করা সহজ কথা নয়। ৪০ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন তিনি, এ দেশের বহু প্রভাবশালী লোকই তাঁর ছাত্র, কিন্তু তারাও স্যারের সামনে এসে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতেই অভ্যস্ত―এমনই ব্যক্তিত্ব তাঁর। কমরেডদের কথা মনে পড়ল রফিকের। তারাই এই কৌশল শিখিয়েছিলেন যে, একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিকে ধর্মহীনতার কথা বলতে নেই। একজন আস্তিককে পরাস্ত করতে হয় আস্তিকতা দিয়েই, নাস্তিকতা দিয়ে নয়, ইত্যাদি।

স্যার চলে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ কেটে গেছে, এদিকে কেউ আর আসেনি। ব্যাপারটার কোনও সুরাহা হলো না। ঠিক আছে, আমিও আমার জায়গা থেকে নড়ছি না, জয়ী আমাকে হতেই হবে, চাচা কদিন এভাবে লাশ ফেলে রাখতে পারেন আমি তা দেখে নিতে চাই―জেদি ভঙ্গিতে ভাবল রফিক।

৬.

বাড়ি এখন চুপচাপ। অধিকাংশ লোকই চলে গেছে। একটা জমজমাট নাটক―চাচা-ভাতিজার দ্বন্দ্ব―যারা দেখতে এসেছিল, সম্ভবত শেষ পর্যন্ত সেটি দেখার ধৈর্য তারা ধরে রাখতে পারেনি। যারা রয়ে গেছে তারাও ঝিম মেরে বসে আছে―চুপচাপ, নিঃশব্দ।

দীন মোহাম্মদ ভুঁইয়ার সবকিছুই আজ এলোমেলো হয়ে গেছে। ঘুম, খাওয়া দূরে থাক, এশার নামাজটা পর্যন্ত পড়া হয়নি। রফিকের জন্য এখন তাঁর খারাপ লাগছে, মনে হচ্ছে ওর সঙ্গে এতটা খারাপ ব্যবহার না করলেও চলত। হেডমাস্টার সাহেবের কাছে সব শুনে মনটা নরম হয়ে গেছে তাঁর। কেন যে ভুল বুঝে এতগুলো লোকের সামনে সম্পত্তি ভাগের প্রসঙ্গ তুলে রফিককে অপমান করলেন তিনি, সেজন্য নিজের ওপরই ক্ষুণ্ন হয়ে আছেন। ছেলেটা পরির মার জন্য একটা স্থায়ী ঠিকানার কথা ভাবছে―কথাটা জানার পর তিনি অসম্ভব অবাক হয়েছেন। মনে হচ্ছে, এই রফিককেও তিনি চেনেন না। যে তার আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে ভালো করে কথা পর্যন্ত বলে না, সে পরির মার জন্য এমন মমতা পোষণ করতে পারে, তা তিনি বুঝবেন কীভাবে ? আগে মনে হতো ছেলেটা বিগড়ে গেছে, এখন মনে হচ্ছে― তাঁর ধারণা ভুল, একজন সামান্য ভিখারির জন্য যে পারিবারিক মর্যাদা পর্যন্ত বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকে, সে বিগড়ে যেতে পারে না। কে জানে পরির মার মধ্যে সে কী পেয়েছে! কে জানে এই অপরিচিত ভিখারিটিই আল্লাহ পাকের কাছে তাঁর পূর্বপুরুষদের চেয়ে অধিক প্রিয় কি না, আর আল্লাহ সেটি তাদেরই এক বংশধরের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিচ্ছেন কি না! হয়তো তাকে এখানে কবর দেওয়া হলে তার উছিলাতেই এই কবরস্থানের অন্য বাসিন্দারা মাফ পেয়ে যাবেন। দীন মোহাম্মদ সাহেবের অভিমান হচ্ছে―যেসব কথা রফিক তার স্যারকে বলেছে, সেটা তাকে বলল না কেন ? এখন, এই অবস্থায়ও, সে যদি এসে বলে তাহলে তিনি আর আপত্তি করবেন না। নইলে নিজে থেকে ওকে কিছু বলা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। সমস্যাটির সমাধান কীভাবে হবে তিনি ভেবে পাচ্ছেন না। এভাবে লাশ ফেলে রাখাও খুবই অন্যায় হচ্ছে, কিন্তু কী করা যায় ? আল্লাহর হাতে সব ছেড়ে দিয়ে বসে থাকা ছাড়া অন্য কোনও উপায় তো দেখা যাচ্ছে না।

লাশ আগলে বসে আছে রফিক। অনেকক্ষণ ধরে এ ঘরে কেউ আসছে না। খিদে জানান দিচ্ছে, তৃষ্ণাও। সেই সকালে খেয়ে বেরিয়েছে, বাড়িতে এসে পরিস্থিতির চাপে কিছু খাওয়া হয়নি আর। খিদে আর ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে। কিছু খেয়ে ঘুমোতে ইচ্ছে করছে। আর কেউ না হোক, মা তো আসতে পারে―সে ভাবছিল। আমাকে না খাইয়ে রেখে তিনি ঘুমান কীভাবে ? কী মায়াময় পবিত্র ওই মুখ! মা না হয়েও মায়ের স্নেহেই তাকে বরাবর আশ্রয় দিয়েছেন তিনি। মনে হলো, কতদিন সে ওই মুখের দিকে ভালো করে তাকিয়েও দেখেনি। অন্যায়, এ খুবই অন্যায়। চাচার জন্যও কষ্ট হচ্ছে এখন। ভাবছে, এতটা কঠোর হওয়ার কি কোনও দরকার ছিল ? এমনভাবে আঘাত করারও কি কোনও প্রয়োজন ছিল ? একজন মানুষ সারা জীবন ধরে একটা মূল্যবোধ আঁকড়ে ধরে আছে। এত সহজে কি তা থেকে তাকে বিচ্যুত করা সম্ভব ? তার তো উচিত ছিল, এভাবে বিচ্ছিন্ন না থেকে দিনের পর দিন চাচা-চাচির সঙ্গে কথা বলা, ভাইবোনদের সঙ্গে আলাপ করা। কথা না বলে কি পরিবর্তন আনা সম্ভব ? এভাবে বিপ্লব হয় না। বিপ্লবের কথা মনে হতেই কমরেডদের কথা মনে পড়ল তার―এই মুহূর্তের ভাবনাগুলোকে নিশ্চয়ই পেটিবুর্জোয়া ইমোশন বলে চিহ্নিত করতেন তারা। এত সব তুচ্ছ ইমোশন নিয়ে নাকি বিপ্লব হয় না। বৃহত্তর জনজীবনের কথা ভেবে ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র সম্পর্কগুলোকে বিসর্জন দেয়াই বিপ্লবী হওয়ার পূর্বশর্ত।

আমি তাহলে পেটিবুর্জোয়াই রয়ে গেলাম!―সে ভাবছিল―বিপ্লবী হওয়ার জন্য আমার এত দিনের সাধনা তাহলে এবার ধুলোয় লুটাতে বসেছে! নইলে সবার জন্য আমার এমন মন খারাপ লাগবে কেন ?

ঝিম ধরে বসে ছিল রফিক। কিছুই ভাবছিল না, ভাবার মতো অবস্থাও ছিল না। খিদে-তৃষ্ণা-ঘুম সব যেন একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তার ওপর―কিন্তু সামনে একটা লাশ রেখে ঘুমানো কী অসম্ভব ব্যাপার সেটা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানে। অনেকক্ষণ একা বসে থাকতে থাকতে অভিমানে বুক ভরে উঠছিল তার―আর তখনই চাচি এসেছিল। বলেছিল―‘ঝগড়াঝাঁটি যা করার উনার সঙ্গে করবি, আমার সঙ্গে কী ? সারাদিন না খেয়ে থাকলি, হাত-মুখ ধুয়ে খেতে আয়।’ সে প্রথমে জেদ করছিল, কিন্তু চাচি এসে হাত ধরতে নরম হয়ে গেছে। মনটা নরম হয়েই ছিল, ওই স্নেহস্পর্শে সে আরও ভেঙে পড়েছে। তারপর ভাত খেতে খেতে চাচির অবিরল বকাঝকা শুনতে শুনতে―তার না আসা নিয়ে, না কথা বলা নিয়ে, যোগাযোগহীনতা নিয়ে, বিচ্ছিন্নতা নিয়ে―তার মনে হচ্ছিল, এতদিনে সে আবার বাড়ি ফিরে এসেছে। যেন এমন করে ফেরা সে ভুলেই গিয়েছিল। এসব কথা মনে হওয়ার সময় কমরেডরা উঁকিঝুকি দিতে থাকলে সে তাদেরকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে। মায়ের চেয়ে কমরেডরা বড় নয়, এমন একটি অবিপ্লবী―প্রতিবিপ্লবীও বলা যায়―ভাবনায় সে আক্রান্ত হয়। তারপর চাচির আদর-স্নেহে-যত্নে আর অবিরল কান্নায় আবেগাক্রান্ত হয়ে সে তার নিজের ঘরে ফিরে আসে। এ ঘরে পরির মার লাশ, এটা ফেলে সে ঘুমায় কীভাবে ? পারিবারিক আভিজাত্যবোধ ভেঙে দেওয়ার যে জেদ থেকে সে গোঁ ধরে বসেছিল, এখন সেটি উবে গিয়ে এই অন্ধ-ভিখারির প্রতি এক অসংজ্ঞায়িত মমত্ববোধই প্রধান হয়ে উঠেছে। মানুষের জীবনও এমন হয়!―সে ভাবছিল। জীবনের অনেক বছর যাকে কাটিয়ে দিতে হয় স্মৃতিহীন হয়ে, অনাত্মীয়-অচেনা পরিবেশে, অনাদর ও অবহেলায়, তাকে কি মানবজীবন বলা যায় ?

 ছোটবেলার একটি দৃশ্যের কথা মনে পড়ল রফিকের। তখন বর্ষাকাল। গ্রামের, যাকে বলে, থই থই বর্ষা। এ-বাড়ি থেকে ও-বাড়িতে যেতে নৌকা লাগে। তেমনই একটি সময়ে একদিন বিকেলে হাটে যাওয়া হচ্ছে। বাড়ি থেকে হাট অনেকটা দূরে। এ-বাড়ি ও-বাড়ি থেকে চার/পাঁচজন একই নৌকায় করে একসঙ্গে যাচ্ছিল তারা। পরির  মা-ও যাচ্ছে তার অতি ক্ষুদ্র সংসারের জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে। কেন তাকেই যেতে হচ্ছে, এতগুলো লোকের কেউ কেন ওই সামান্য সদাইটুকু এনে দিতে পারছে না, তখন অবশ্য এই প্রশ্ন মনে জাগেনি, এখন জাগে। তো, নৌকা হাটে ভিড়লে পরির মাকে তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে বলা হলো, নইলে তাকে রেখেই চলে যাওয়া হবে! তারা সবাই নেমে পড়ল নৌকা থেকে। চাচা কিছু জিনিসপত্র কিনে তাকে পাঠালেন নৌকায় গিয়ে বসতে, বাকিটা তিনি কিনে ফিরবেন। রফিক এসে দেখল, তার আগেই পরির মা এসে নৌকায় বসে আছে―অর্থাৎ যথাসম্ভব দ্রুত নিজের কেনাকাটা সেরে ফেলেছে সে। অসংখ্য নৌকা এসে ঘাটে ভিড়ছে, ঘাট ছেড়ে চলে যাচ্ছে, ফলে পানিতে আলোড়ন আর তাতে ছোট্ট নৌকাটা বিরামহীন দুলছে। অন্ধ ও বৃদ্ধ ওই মহিলা শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারছে না, খুব ভীত মুখে, দু হাতে শক্ত করে নৌকার পাশি ধরে রেখেছে―যেন ওটাই তার জীবনের একমাত্র অবলম্বন। মনে পড়ছে, নৌকায় পা রাখতেই পরির মা বলেছিল, ‘বাজান আইলা ?’ অন্ধ হয়েও সে, এমনকি রফিকের পায়ের শব্দ কীভাবে চিনে ফেলল―সেটা এখনও এক বিস্ময় হয়েই আছে।―‘হ্যাঁ। তুমি এত আগেই এসে বসে আছো কেন পরির মা ?’ এরকম একজন বৃদ্ধাকে চাচি/খালা বা দাদি ডাকাটাই শোভন হতো কিন্তু কেউ তাকে তা শেখায়নি; ভারসাম্য রক্ষা করতে করতে তার মুখে এক ধরনের বিমূঢ় বিমূর্ত অভিব্যক্তি ফুটে উঠল―‘যদি আমারে থুইয়া চইলা যায়’!

এতদিন পর হয়তো পুরো বিষয়টির একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারে রফিক। সব হারিয়ে যে বৃদ্ধা শেষ পর্যন্ত এ বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল, তার অসহায়ত্বের বোধ কত তীব্র ছিল, ঘটনাটি তার ইঙ্গিত দেয়। মানুষের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস সে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছিল। ঘোর বর্ষায় তাকে বহু দূরবর্তী হাটে ফেলে তার আশ্রয়দাতারা চলে আসবে না―এই আস্থা তার ছিল না। জীবন তার কাছে কী দুর্বহ ছিল―ভেবে বিষণ্ন বোধ করে রফিক। সব হারিয়ে তবু নিজের জীবনকে তার টেনে বেড়াতে হতো, ভিক্ষে করতে হতো; এক টাকার তেল, দুটাকার মাছ-তরকারি, কি চার আনার লবণ কিনতে ওই বর্ষায়ও তাকে হাটে-বাজারে যেতে হতো―কেউ ছিল না তাকে সাহায্য করার মতো এবং ভয় পেতো যে, তাকে ফেলেই সবাই চলে আসবে, আর তাকে হাটে বসেই কাঁদতে হবে! জীবন! হাহ!

দৃশ্যটি মনে পড়তেই বিদ্যুচ্চমকের মতো তার মনে হলো, স্বপ্নে তাহলে সে এই দৃশ্যটিই একটু ভিন্নভাবে দেখেছে! কী আশ্চর্য! কোনও স্মৃতিই তাহলে পুরোপুরি হারিয়ে যায় না, কোনও না কোনওভাবে ফিরে ফিরে আসে!

ভাবতে ভাবতে কখন যে ঝিমুনি এসেছিল, হয়তো ঘুমিয়েই পড়েছিল, সে বলতেও পারবে না। হঠাৎ তার ঘুম ভাঙে মৃদু একটি শব্দে। নিঝুম রাত নেমেছে―গ্রামে যেমন নামে; বাইরে আবার বৃষ্টি, আর কোনও শব্দ নেই কোথাও। তবে কি বৃষ্টির শব্দেই ঘুম ভেঙেছে আমার ? ভাবল সে―না বোধ হয়, অন্যরকম কোনও একটা শব্দ পেয়েছি। কিসের শব্দ ? শব্দ হওয়াটা কোনও অস্বাভাবিক ব্যাপার নয় অবশ্য, গ্রামের রাতগুলো এমনিতেই নিসর্গের নানারকম শব্দে মুখর হয়ে থাকে। কিন্তু তাতে তো ঘুম ভাঙার কথা নয়!  হঠাৎ তার মনে পড়ল―পরির মা মারা গেছে, আর সে বসে বসে লাশ পাহারা দিচ্ছে। লাশের দিকে চোখ গেল তার। মনে হলো ওখানে কিছু একটা পরিবর্তন এসেছে! সেটা কী ? সে খুব ভালো করে লক্ষ করল। হ্যাঁ, সত্যি একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার ঘটেছে―মনে হচ্ছে লাশের মুখটা অন্যদিকে ঘুরে গেছে। আগে ডান দিকে মুখ ফেরানো ছিল, এখন ঊর্ধ্বমুখী। নিশ্চিত হওয়ার জন্য সে লাশের মুখের ওপর থেকে সন্তর্পণে কাপড় সরিয়ে দেখল, যা ভেবেছিল তাই। শুধু তাই নয়, লাশের চোখও খোলা, আগে বন্ধ ছিল; চোখের পাতাও কি একটু কাঁপলো ? সে কি ভুল দেখছে ? নাকি স্বপ্ন ? না, এর কোনওটিই নয়। তার স্পষ্ট মনে আছে, লাশের চোখ বন্ধ ছিল, মুখ ফেরানো ছিল ডানদিকে। তাহলে ? এরকম পরিবর্তন হলো কীভাবে ? পরির মা কি তাহলে বেঁচে আছে ? সে ফিসফিসিয়ে, প্রায় শোনা যায় না, এমনভাবে একবার ডাকল―এবং, অদ্ভুত ব্যাপার, প্রতিউত্তরে ঘড়ঘড়ে একটা শব্দও এল লাশের গলা থেকে। এর মানে কী ? তার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল ? কেন এমন ভয় লাগছে ? যুক্তিহীন, অসংজ্ঞায়িত একটা ভয়। সে নিঃশব্দে দূরে সরে দাঁড়াল। কিন্তু এ কী দেখছে সে ? লাশটি হাত বাড়িয়ে তাকে ধরতে চাইছে যেন। সে আরেকটু সরে দাঁড়াল, হাতটি আরও লম্বা হলো; সে আরও সরে দাঁড়াল, লাশটিও তার হাত আরেকটু লম্বা করল। কোনও মানুষের হাত এত লম্বা হতে পারে না। এ কী ভৌতিক কাণ্ড ঘটছে! ভয়ে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। সে গিয়ে দরজার কাছে, লাশের পায়ের দিকে দাঁড়াল, এবং এবার দেখল তার পা লম্বা হচ্ছে, যেন লাশটি তার পা দিয়ে রফিককে ছুঁতে চাইছে। সে এবার দরজার বাইরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল, কিন্তু অচিরেই পা-টিও পৌঁছে গেল সেখানে। সে কি ডাকবে কাউকে ? ও ঘরে আলো জ্বলছে, কিন্তু কেউ জেগে আছে কি না বোঝা যাচ্ছে না, ডাকার জন্য ঠোঁট খুলে সে টের পেল―গলা দিয়ে কোনও শব্দও বেরোচ্ছে না। রফিক একবার উঁকি মেরে ঘরের ভেতরে তাকালো, দেখল―লাশের হাত এবার ঊর্ধ্বমুখী, বড় হতে হতে সেটি প্রায় ছাদ ছুঁয়ে ফেলেছে। সে আর দাঁড়ানোর সাহস পায় না, দৌড়ে উঠোনে নামে। তার সঙ্গে সঙ্গে পা-টিও আসছে বলে মনে হলে সে একবার পেছন ফিরে তাকায়, হ্যাঁ সত্যি তাই ঘটেছে। তার বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়, কোনও চিন্তাভাবনা ছাড়াই সে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে থাকে, দৌড়াতেই থাকে। অনেক দূর এসে নিজেকে একটু নিরাপদ মনে হলে সে পেছন ফিরে তাকায়। দ্যাখে―লাশের হাত তাদের প্রাচীন দালানের ছাদ ফুঁড়ে বেরিয়েছে, যেন আকাশ স্পর্শ করার জন্য তার এই অভিনব যাত্রা, আর পা এগিয়ে চলেছে কবরস্থানের দিকে। এত দূর থেকেও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে রফিক, তাদের দালান ভেঙে পড়ছে। তার দাদা বানিয়েছিলেন, সেই কবে, এত মজবুত করে যে, এতদিনেও একটা গাঁথুনিও আলগা হয়নি, আজ কি না সেটাই একটা লাশের হাতের কাছে পরাজিত হলো! সে আর দাঁড়ানোর কথা ভাবতেও পারে না―আবার দৌড় দেয়, লাশটিও তার পেছনে পেছনে আসছে বলে মনে হলে তার দৌড়ের গতি বেড়ে যায়। রফিক ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে থাকে, দৌড়াতেই থাকে―যেন অন্তহীন এই দৌড়।

৭.

সেদিন আর বাড়ি ফেরেনি রফিক। হাঁটতে হাঁটতে পাঁচ কিলোমিটার দূরের বাসস্ট্যান্ডে চলে এসেছিল। তখনও বেলা ওঠেনি, প্রথম বাসও ছাড়ার সময় হয়নি। ফজরের নামাজ পড়ে মুসুল্লিরা বেরুচ্ছে মসজিদ থেকে, বাসস্ট্যান্ডের দু-একটা দোকান খুলতে শুরু করেছে, ছোট্ট রেস্টুরেন্টটাও খুলে গেছে, সেখানে চলছে চুলা ধরানোর আয়োজন। ওখানে অবশ্য কেউ রেস্টুরেন্ট বলে না, বলে হোটেল। অনেকে হোটেলও বলে না, বলে মোল্লার দোকান। মালিকের নাম মনসুর মোল্লা, ভোর থেকে রাত পর্যন্ত এই দোকান খোলা থাকে। কম দামের সাধারণ খাবার পাওয়া যায়, সাধারণত স্বল্প আয়ের মানুষরাই তার ক্রেতা। রফিক গিয়ে সেখানে বসল। প্রথম বাস ছাড়ার আগ পর্যন্ত অন্তত কোথাও বসতে হবে তো! সমস্যা হলো, এটা তার নিজের এলাকা, সবাই তাকে চেনে, মনসুর মোল্লাও চেনে, এই ভোরবেলায় তাকে এখানে বসে থাকতে দেখলে প্রশ্ন তো উঠবেই। পরির মার দাফন নিয়ে চাচার সঙ্গে দ্বন্দ্বের কথা নিশ্চয়ই এতক্ষণে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে! প্রশ্ন ওঠার সেটাই প্রধান কারণ। কেবল প্রশ্নই উঠবে না, এই সব কথা ডালপালা মেলে এ-কান থেকে ও-কান করে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু কী আর করা যাবে, অপেক্ষা করা ছাড়া তো উপায় নেই। মনসুর মোল্লা অবশ্য তাড়াতাড়ি করে তার চা-নাস্তার ব্যবস্থা করেছিল, পরোটা আর ডিম ভেজে খেতে দিয়েছিল, দিয়েছিল পরপর দু কাপ কড়া দুধ চা, তবে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। এই এলাকার মানুষের ভক্তিপ্রবণতা অসাধারণ। ভুঁইয়া বাড়ির ছেলেকে আগ বাড়িয়ে কিছু জিজ্ঞেস করার কথা তারা ভাবতেই পারে না। অথচ গতকালের ঘটনা সবাই জানে, চাচা-ভাতিজার দ্বন্দ্বে পরির মার দাফন হয়নি তাও অজানা নেই কারও। সেই বাড়ির বড় ছেলে সকালবেলা বাসস্ট্যান্ডে এসে বসে আছে কেন তা তো কৌতূহলের বিষয় হতেই পারে। রফিক অবশ্য স্বস্তিবোধ করছিল। কিছু জিজ্ঞেস করলে সে কী-ই বা বলতে পারত ?

প্রথম বাসেই ঢাকায় ফিরে এসেছিল সে। এর পরের দিন-দশেক প্রচণ্ড জ¦রের ঘোরে কী এক আচ্ছন্নতায় কেটে গিয়েছিল তার, স্পষ্টভাবে কিছুই মনে নেই। নিশ্চয়ই আতিক আর ফারহানাকে মহাবিপদে ফেলে দিয়েছিল সে, নববিবাহিত দম্পতির তো অসুস্থ রোগী সামলানোর অভিজ্ঞতা থাকে না, তবু ওদের সেবা-যত্নেই সে সুস্থ হয়ে উঠেছিল। জ¦র যখন একটু কমতো, তখন মনে হতো, মায়ের কাছে যাব। মা মানে চাচি, যাকে সে ছোটবেলা থেকে মা বলেই জেনে এসেছে, ডেকে এসেছে। চাচাকেও সে বাবা বলেই জানতো এবং ডাকত। তাকে যদি না জানানো হতো যে তাঁরা তার বাবা-মা নন, তাহলে তার পক্ষে বুঝে ওঠা সম্ভবই ছিল না। রফিক ভেবেই পায় না, কেন চাচা তাকে জানানোর কথা ভেবেছিলেন, তাও সেই ছোটবেলায়, যখন তার ভেতর থেকে কৈশোরের সারল্য এবং লাবণ্য মুছে যেতে শুরু করেনি। তিনি কেন ভাবেননি, যা জেনে সে বড় হচ্ছে, তার বাইরের কোনও কঠিন সত্য শুনে তার বড় রকমের ব্রেকডাউন হতে পারে ? কী এত তাড়া ছিল তার ? মনে পড়ে, জানানোর আগে কয়েক দিন ধরে চাচার সঙ্গে চাচির একটা চাপা বাদানুবাদ চলছিল। বিষয়বস্তু সম্বন্ধে কিছু না জানার ফলে রফিক সবকিছু বুঝতে পারত না, কিন্তু চাচির নিচু কণ্ঠও তীব্র হয়ে উঠত কখনও কখনও যখন তিনি বলতেন, ‘আমি চাই না, ও কিছু জানুক।’

চাচা হয়তো বলতেন, ‘কিন্তু সত্য তো চেপে রাখা যায় না, একদিন না-একদিন জানবেই।’

চাচি বলতেন, ‘বড় হয়ে জানলে জানুক, এই বয়সে ওর জানার দরকার নাই।’

কিন্তু চাচা কোনও যুক্তি শোনেননি। একদিন রফিককে কাছে ডেকে কাছে বসিয়ে খুব আদর করে বলেছিলেন, ‘বাবা তোমাকে কিছু কথা বলব, তুমি মন খারাপ করো না।’ তারপর জানিয়েছিলেন সেই সত্য যা জানার জন্য প্রস্তুত ছিল না রফিক। শুনে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল সে, কী বলবে কী করবে বুঝতে পারছিল না, অনেকক্ষণ চুপ করে অপলক তাকিয়ে ছিল চাচার দিকে, একসময় আড়াল থেকে চাচি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলেন, আর সে হঠাৎ চিৎকার করে উঠেছিল―‘মা, সামনে এসো। বলো, এসব কি সত্যি ?’

তিনি আড়াল থেকে বেরিয়ে সামনে এসেছিলেন, রফিককে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন : ‘না, সত্যি না। উনি যা বলছেন তা বিশ্বাস করিস না বাবা। আমিই তোর মা।’

 তিনি কাঁদছিলেন, সে দেখেছিল, চাচার চোখও ভরে উঠেছে জলে। তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও রফিক ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছিল, চাচা মিথ্যা বলেননি, তিনি আসলে মিথ্যা বলার মানুষই নন, মিথ্যা বলে তার লাভও নেই। রফিকের কৈশোরকাল বিষণ্নতায় ভরে উঠেছিল। একা একা নদীর পাড়ে গিয়ে বসে থাকত। কারও সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগত না। ভাইবোনদের সঙ্গে না, খেলার সাথীদের সঙ্গে না, স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গেও নয়। না-দেখা মায়ের প্রতি গভীর অভিমানে ভরে থাকত বুক। মৃত্যু তবু মানা যায়, ও বিষয়ে কারও হাত নেই বলে, কিন্তু শিশুপুত্রকে রেখে মা কীভাবে অন্যের সংসারে যায়, এই প্রশ্ন তাকে দগ্ধ করত। তার জীবনে যেন বিপর্যয় নেমে এসেছিল, মহাবিপর্যয়, ছোট্ট মানুষ সে, সামলে উঠতে পারছিল না কিছুতেই। কোথাও কিছু ছিল না সান্ত্বনা পাওয়ার মতো। হয়তো সেজন্যই সে বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে দিয়েছিল। পাঠ্যবই নয়, গল্পের বই। একটু-আধটু পড়ার অভ্যাস আগে থেকেই ছিল, সেটিই হয়ে উঠল নেশার মতো। শহর থেকে অনেক দূরের ওই গ্রামে পছন্দমতো বই পাওয়া সহজ ছিল না। স্কুলের লাইব্রেরিই ছিল ভরসা, বইয়ের এক সমৃদ্ধ সংগ্রহ ছিল সেখানে, কিন্তু প্রায় সবসময়ই বন্ধ থাকত। স্কুলের বাচ্চাদের বই পড়ার প্রতি কোনও আগ্রহ ছিল না, খোলা রেখেই বা কী হবে ? হয়তো সে শিক্ষক-পরিবারের ছেলে বলে বিশেষ সুবিধা পেতো। লাইব্রেরির দায়িত্বে থাকা শিক্ষককে বললে তিনি তালা খুলে দিতেন, রফিক পছন্দমতো বই বাড়িতে নিয়ে আসত। পড়া শেষ হলে সেটা ফেরত দিয়ে আরেকটা আনত। বইয়ের পাতায় কাল্পনিক মানুষদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার গল্প পড়ে সে আকুল হয়ে কাঁদতো, কাঁদতে ভালো লাগত তার।

 সেই বিপর্যয় সে কীভাবে কাটিয়ে উঠেছিল মনে নেই। বইয়ের একটা বড় ভূমিকা তো ছিলই, কিন্তু তার চেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন মা। একবার তাকে চাচি বলে ডেকে বিশাল ধমক খেয়েছিল সে, বলেছিলেন, খবরদার আমাকে চাচি বলে ডাকবি না। আমিই তোর মা। তারপর থেকে আর চাচি বলে ডাকেনি সে, মা-ই ডেকেছে, তবে দীন মোহাম্মদ সাহেবকে আর বাবা বলে ডাকেনি। অবশ্য চাচা বলে ডাকতেও সময় লেগেছে প্রচুর। হঠাৎ করে তো আর সম্বোধন পাল্টানো যায় না। কথাও বলত কম। বললেও ভাববাচ্যেই কথা হতো।

ধীরে ধীরে সে বাস্তবতা মেনে নিয়েছিল। যদিও এই অভিজ্ঞতা এক ধাক্কায় তার বয়স বাড়িয়ে দিয়েছিল অনেকখানি, সমবয়সীদের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত হয়ে উঠেছিল। বড় হয়ে যখন সে সেই সময়ের কথা ভাবত, তখন মনে হতো, বয়স কেবল জন্মসাল দিয়ে মাপা যায় না, মাপতে হয় অভিজ্ঞতা দিয়ে। একসময় সে ফিরে এসেছিল স্বাভাবিক জীবনে। ভাইবোনদের সঙ্গে দুষ্টুমি-খুনসুটি করত, যদিও জানা হয়ে গেছে ওরা তার আপন ভাইবোন নয়, তবু অসুবিধা হতো না। ধীরে ধীরে সে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়, কেবল গর্ভে ধারণ করলেই মা হওয়া যায় না, মা হওয়ার জন্য মাতৃহৃদয় থাকতে হয়, যেমনটি আছে তার চাচির। তেমনই কেবল জন্ম দিলেই পিতা হওয়া যায় না, জন্মদাতাকে জনক বলা যায় বটে, যেমন গর্ভধারিণীকে বলা যায় জননী, কিন্তু যিনি লালন-পালন করেন তিনি হয়ে ওঠেন পিতা। যেমনটি হয়েছেন তার চাচা। এমনকি ‘আপন’ ভাইবোন একটা ধারণা মাত্র, একই বাবার ঔরসে এবং একই মায়ের গর্ভে জন্মালেই যে কেউ ‘আপন’ হয়ে যাবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। আপন হতে পারে কাজিনরাও, এমনকি রক্তসম্পর্কহীন অন্য কেউও। এই সব সম্পর্ক নিয়ে সে নতুন করে ভাবতে শিখেছিল। তো, ভাইবোনদের সঙ্গে তো বটেই,  বন্ধুদের সঙ্গেও চুটিয়ে আড্ডা দিত। কিন্তু তা সত্ত্বেও মাঝে মাঝে সবার মধ্যে সে একা হয়ে যেত। এই একা হওয়ার স্বভাব তাকে ভাবুক মানুষে পরিণত করে তুলেছিল।

জ¦রের ঘোরে তার কাছে সেইসব দিন ফিরে এসেছিল। কেবলই মনে হতো, আমি মার কাছে যাব, মার কাছে গেলে আমার আর কোনও অসুখ থাকবে না, দুঃখ থাকবে না। মুখেও এসব বলেছিল কি না সে জানে না, আতিক হয়তো খবর দিয়েছিল বাড়িতে, মাকে নিয়ে চাচা এসেছিলেন সত্যি সত্যি আর সে মায়ের কোলে মাথা রেখে অঝোরে কেঁদেছিল।

একটু সুস্থ হয়ে ওঠার পর মা বললেন, না বলে চলে এসেছিস কেন ? বাড়িতে চল।

 সে বিমূঢ় বোধ করেছিল। বাড়িতে যাবে ? কোন মুখে যাবে ? অত বড় একটা ঘটনা ঘটিয়েছে, সারা গ্রামের মানুষের সামনে চাচাকে অপমান করেছে, দাদার সম্পত্তিতে তার ভাগ আছে বলে জোর গলায় তর্ক করেছে, সে যাবে কীভাবে ? পরির মা’র কবর কোথায় হয়েছে, জিজ্ঞেস করারও সাহস হচ্ছিল না তার। কিন্তু মা তার মনের এত সংকোচ আর অপরাধবোধের খবর জানবেন কীভাবে ? তিনি নিয়ে যাবেনই। অতঃপর সে অপত্য স্নেহে কাছে পরাস্ত হয় এবং চাচার কাছে মাফ চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বহুকাল পর সে দীন মোহাম্মদকে বাবা বলে ডাকে এবং পায়ে হাত রেখে ক্ষমা চাইলে তিনি রফিককে তুলে বুকে জড়িয়ে নেন। বলেন, বাড়ি চলো বাবা। আমি কিছু মনে রাখিনি। বাড়ি চলো, সব বলব।

সে বাড়িতে গিয়েছিল, মা-বাবার বাধ্য পুত্র হয়ে, বহুকাল পর। তার জন্য সেখানে বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। কবরস্থানে দাদির পাশেই হয়েছে পরির মার কবর। এই জায়গাটি চাচা নিজের জন্য ঠিক করে রেখেছিলেন, সেটিই তিনি ছেড়ে দিয়েছেন পরির মার জন্য, যদিও কবরস্থানে এখনও অনেক জায়গা খালি পড়ে আছে। সে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। সপ্তাখানেক বাড়িতে ছিল সে, বোনের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে জামাইসহ তাকে নিয়ে এসেছিল, অনেক দিন পর ভাইবোন সবাই মিলে আনন্দমুখর সময় কাটিয়েছিল। সে ফিরে এসেছিল ভিন্ন মানুষ হয়ে।

বাড়িতে যাওয়ার পর সে আবিষ্কার করেছিল, তাদের পুরোনো ভবনের ছাদে ফাটল ধরেছে। কীভাবে এমন হলো ? তবে কি সত্যিই পরির মার হাত ছাদ ফুঁড়ে আকাশের দিকে রওনা দিয়েছিল ? সেদিন সে যা দেখেছিল, তা কি তবে দৃষ্টিভ্রম ছিল না ? আরে ধুর, তা কী করে হয় ? দীন মোহাম্মদ সাহেবকে সে জিজ্ঞেস করেছিল, কী করে এমন হলো! তিনি জানিয়েছিলেন, পরির মা’র কবর দেওয়ার পর টানা তিন দিন মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে। বিল্ডিংটার বয়স বহু বছর, হয়তো টানা বৃষ্টির তোড়ে… বলতে বলতে তিনি থেমে গিয়েছিলেন, কিছুক্ষণ পর ফের বলেছিলেন, ঠিক জানি না কেমন করে হলো। বৃষ্টিতে ফাটল ধরার কথা না। রফিক আর কথা বাড়ায়নি। তার বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিপ্রবণ মনও বিচলিত হয়ে উঠেছিল। কোনও অলৌকিক রহস্যের কথা ভাবতে মন চাইছিল না।  

অনেক বছর পর টানা দশ দিন পারিবারিক আবহে বাড়িতে কাটিয়ে মনের ভেতর থেকে অনেক দ্বিধা-সংশয়-প্রশ্ন দূর করে ফেলেছিল রফিক। মনে হয়েছিল, মানুষকে কোথাও না-কোথাও ফিরতে হয়। আর ফেরার জন্য সবচেয়ে আনন্দময় জায়গা হলো পরিবার, বিশেষ করে যে পরিবারে দ্বন্দ্ব-সংঘাত-হিংসা-বিদ্বেষের চেয়ে স্নেহ-প্রীতি-মায়া-ভালোবাসা অধিকতর শক্তিশালী। নিজের পরিবারের সবার মধ্যেই এই গুণাবলি আছে, আছে প্রীতিময় বন্ধন। এদেরকে ত্যাগ করার মানেই হয় না। তার মনে হয়েছিল, সে বিপ্লবের ভুল অর্থ জেনেছে, বিপ্লব মানে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়, বরং নতুন ধরনের পরিবার গড়ে তোলা।

ঢাকায় ফিরে এসে রেবেকার সঙ্গে দেখা করে সব কথা বিস্তারিত খুলে বলেছিল রফিক। নিজের অনুভূতি এবং উপলব্ধি শেয়ার করেছিল, জানিয়েছিল নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্তের কথাও। সে আর প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে থাকতে চায় না, তবে এমন কোনও চাকরি করতে চায় যেন পরোক্ষভাবে হলেও রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকা যায়। বলেছিল, এই সিদ্ধান্তে রেবেকার যদি আপত্তি না থাকে এবং রেবেকা যদি রাজি থাকে, তাহলে সে তাকে বিয়ে করতে চায়, তবে কিছুদিন সময় দিতে হবে। রেবেকা আপত্তি করেনি, বরং খুশিই হয়েছিল। সম্ভবত সেও সেরকমই কিছু ভাবছিল। বছর দুয়েকের মধ্যে দুজনেই চাকরিতে থিতু হয়েছিল, রফিক সাংবাদিকতায় আর রেবেকা শিক্ষকতায়। তারপর দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে করে সংসার পেতেছিল।

এই পুরো সময়টাতে আতিক আর ফারহানা তাদের পাশে ছিল। এমনকি বিয়ের পরও কয়েক বছর তারা একই বাসায় ছিল। এর মধ্যে আতিক পায় সরকারি চাকরি, ফারহানা পায় ব্যাংকের চাকরি। ঢাকার বাইরে পোস্টিং হয় আতিকের, ফারহানাও ধরাধরি করে একই জায়গায় পোস্টিং নেয়। দূরে গেলেও তাদের বন্ধুত্ব অটুটই থাকে। ঢাকায় এলে ওরা রফিক-রেবেকার বাসাতেই উঠত। তাদের অন্য বন্ধুরাও নানা কাজে যুক্ত হয়ে নিজ নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিপ্লবের স্বপ্ন যারা দেখত তারাও এখন যে কোনও মানুষের মতোই সংসারী। অবশ্য দু-তিনজন যোগ দিয়েছে সরকারের দালালিতে। বিপ্লবী হয়েও একটা লুটেরা বুর্জোয়া স্বৈরাচারী সরকারকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিতে এতটুকু দ্বিধা হয়নি তাদের। এসব দেখে রেবেকা এবং রফিকের মনে হয়, সক্রিয় রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল। অবশ্য পরোক্ষ সমর্থনটা এখনও রয়ে গেছে। বামপন্থিদের মধ্যে এত বিভাজন, ছোটখাটো বিষয়ে এত দ্বন্দ্ব, তবু মনে হয়―সবাই মিলে বসে যদি ন্যূনতম একটা ঐক্য তৈরি করত, তাহলে তাদের মতো মানুষদের সমর্থন করার একটা প্ল্যাটফর্ম থাকত।

রফিক-রেবেকা দুজনেই যথাযথভাবে পারিবারিক সব দায়িত্ব পালন করেছে। চাচা বেশিদিন বাঁচেননি। মৃত্যুর আগে বাড়ি এবং জমিজমা ভাগবাটোয়ারার জন্য রফিক এবং তার ভাইবোনদের সঙ্গে বসেছিলেন তিনি। নিয়মানুযায়ী দাদার সম্পত্তির অর্ধেক পাওয়ার কথা রফিকের, বাকি অর্ধেক চাচার তিন ছেলেমেয়ের। তাও মেয়ে পাবে কম, সেটাই আইন। রফিক সেটা মানেনি। বলেছে, আমি অর্ধেক নেব না। সব জমি সমানভাবে চারজনের মধ্যে বণ্টন হবে, অর্থাৎ বোনও ভাইদের সমান ভাগ পাবে, তবে বোনের অংশ বুঝিয়ে দিয়ে বাকিটুকু থাকবে মায়ের নামে। ভাইদের অংশের বণ্টন কার্যকর হবে মা চলে যাওয়ার পর। চাচা রাজি ছিলেন না। তিনি তাঁর ধর্মীয় নৈতিকতার ব্যাপারে ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। রফিকের অংশ থেকে নিজের ছেলেমেয়েদের ভাগ দেওয়াকে তাঁর মনে হচ্ছিল এতিমের হক নষ্ট করার মতো অপরাধ। রফিক তখন অর্ধেক নিতে রাজি হয়, এবং বলে, এই অর্ধেক নিয়ে তো আমি যা ইচ্ছে তাই করতে পারি, তাই না ? হ্যাঁ, করতে পারে―চাচা জানিয়েছিলেন। তাহলে আমি আমার অংশ থেকে ভাইবোনদের দিতে চাই। চাচা তখন আর না করার কোনও উপায় খুঁজে পাননি। সে শুনেছিল, বণ্টননামা শেষ করে নিজের ঘরে গিয়ে তিনি স্ত্রীকে বলেছিলেন―আমার এই একটা ছেলেই মানুষের মতো মানুষ হয়েছে। বড় মানুষ না হলে কেউ এত উদার হতে পারে না।

রফিকও স্বস্তি পেয়েছিল। ফসলের সুষম বণ্টনে সে বিশ্বাস রেখেছিল একসময়। সেটা আর হয়ে ওঠেনি। কিন্তু উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তির যে সমবণ্টন করা গেল, সেটি নিশ্চয়ই আনন্দের। তাছাড়া, তাকে বড় করে তোলার জন্য চাচা-চাচির যে নিরন্তর সংগ্রাম, তার ঋণও কিছুটা শোধ হয়েছিল হয়তো। তার তিন ভাইবোন সবসময়ই তাকে পিতার মতো সম্মান করে, তখনও করত, এখনও করে। পারিবারিক কোনও সিদ্ধান্তই রফিকের পরামর্শ ছাড়া হয় না। কে বলবে, ওরা তার চাচাতো ভাইবোন ? এ তো আপনের চেয়েও বেশি।

  রফিক-রেবেকা ঢাকায়, আরেক ভাইও ঢাকাতেই সংসার পেতেছে, মেজটা থাকে গ্রামে, স্কুলে মাস্টারি করছে সে। বোনটাও ভালো আছে। মোটামুটি সুখী পরিবার বলা যায়। তাদের একমাত্র ছেলে ইভান এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে এবং বিস্ময়করভাবে তাকে পেয়েছে বামপন্থার রোগে। সবসময় রেগে থাকে, সবকিছু ভেঙে ফেলতে চায়। কিন্তু কীভাবে ভাঙবে বুঝতে না পেরে আক্রোশে ফোঁসে।

৮.

ব্যালকনিতে বসে বসে এইসব ভাবছিল রফিক। সময় কতক্ষণ পেরিয়ে গেছে খেয়াল করেনি। একসময় রেবেকা আসে, বলে―আজকে কী রান্না করব ?

রান্না ? করো কিছু একটা। আনমনে বলে রফিক।

রফিক যেদিন বাজার করে সেদিন রেবেকা ওর পছন্দের খাবারটিই রান্না করে সবসময়। সেজন্য জিজ্ঞেস করে নেয়, কী রান্না করবে। ফ্রিজে তোলার আগে সবজি কিংবা মাছের যে স্বাদ সেটা নাকি পরে আর পাওয়া যায় না, কিন্তু রফিক বাজারে যায় দু সপ্তাহ পরপর, ফ্রিজে না রেখেও তো উপায় নেই। সেজন্য ওই একদিন একটু বিশেষ কিছু রান্না হয়। রফিক নিজেই বলে, কিন্তু আজ বলেনি, এমনকি জিজ্ঞেস করেও উত্তর পাওয়া গেল না। সকাল থেকেই কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে আছে সে, রেবেকা খেয়াল করছে।

তোমার রান্না এখনও শেষ হয়নি ? রফিক ফের বলল।

না। বাজার গোছালাম মাত্র।

ও! একটু বসো না!

রেবেকা দোটানায় পড়ে গেল। রান্না বসানো দরকার। এখন গল্প করার জন্য বসা ঠিক হবে না। আবার মনে হচ্ছে, রফিক কিছু বলতে চায়। একটু ভেবে সামনের চেয়ারে বসল রেবেকা, জিজ্ঞেস করল―কী হয়েছে তোমার ?

রফিক শূন্য চোখে তাকিয়ে রইল। যেন প্রশ্নটা বুঝতে পারেনি। একটু চিন্তা হলো রেবেকার, কী হলো ওর হঠাৎ করে ? উত্তরের জন্য বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে যখন দেখল রফিক কিছুই বলছে না, চোখ মেলে রেখেছে দূরে কোথাও, রেবেকা গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখল, বলল : তোমার মন খারাপ কেন ? কী হয়েছে ?

না, ঠিক মন খারাপ না…

তাহলে ?

স্বপ্নটা আবার দেখলাম।

কোন স্বপ্নটা ?

ওই যে, তোমাকে বলেছিলাম না ?

সঙ্গত কারণেই রেবেকার মনে পড়ল না। বলল, কোনটার কথা বলছো ?

ওই যে, মা ডাকছে বাবলু বাবলু আমাকে বাঁচা…

স্বপ্নবিবরণ মনে না পড়লেও এরকম একটা স্বপ্নের কথা, তারপর পরির মার মৃত্যুর কথা বলছিল রফিক, মনে পড়ল রেবেকার। কিন্তু সে তো বহু বছর আগের কথা, তাদের বিয়েরও আগের। এতদিন পর সেই স্বপ্ন আবার ? মানে কী ? স্বপ্নটা ঠিক কী ছিল তা মনে নেই রেবেকার, থাকার কথাও নয়, সে তো আর দেখেনি, নিজের দেখা স্বপ্নের কথাই মনে থাকে না, আর অন্যের স্বপ্ন শুনে মনে রাখা! তবু রেবেকা বলল, মাকে দেখেছ ?

জানি না। কিন্তু মা বলেই মনে হচ্ছিল। আর ডাকছিল বাবলু বলে। অবিকল সেই স্বপ্ন।

যা দেখেছ ভালো দেখেছ। এ নিয়ে ভেবো না। ওঠো। গোসল করে নাও। আমি রান্নাটা করে ফেলি।

ইভান কোথায় ?

ঘুমাচ্ছে।

এত বেলা পর্যন্ত ঘুমায় কেন ?

রাত জাগে, ইউনিভার্সিটিও বন্ধ, ঘুমাক না।

রফিকের মনে হচ্ছিল , কারও সঙ্গে কথা বলতে পারলে ভালো লাগত। রেবেকা ব্যস্ত, ছেলেটা জেগে থাকলে ওর সঙ্গে গল্প করা যেত। কিংবা স্রেফ কেউ আশেপাশে থাকলেও চলত। কী আর করা! একা একাই বসে রইল বেশ কিছুক্ষণ, তারপর গোসলে গেল। দীর্ঘ সময় ধরে শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে রইল। শীতের দিনে কুসুম কুসুম গরম পানিতে শাওয়ার নিতে বেশ লাগে। প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করে দিয়েছে। নেই নেই করেও তাদের বাসায় গিজার আছে, এসি আছে, ওয়াশিং মেশিন আছে, ফ্রিজ-টেলিভিশন তো আছেই। একদিনে হয়নি অবশ্য, রেবেকা বেশ গোছনো স্বভাবের মেয়ে, একটু একটু করে অনেক বছর ধরে সংসার গুছিয়ে নিয়েছে। অথচ একসময় মনে হতো, এই মেয়ে কোনওদিন সংসার করতে পারবে না। মনে হতো, বিপ্লব করার জন্যই ওর জন্ম হয়েছে। সাহসী ছিল, ছিল রাগীও। কোনও অন্যায় সইতে পারত না, ওর তীব্র প্রতিবাদের মুখে গুটিয়ে যেত প্রবল প্রতাপশালী লোকজনও। সেই রেবেকা এখন কী যে শান্ত, ধীর-স্থির, ভাবলেও অবাক লাগে। রফিক পারতপক্ষে পুরোনো দিনের সেসব কথা তোলে না। বিপ্লবের স্বপ্ন মরে যাওয়ার দুঃখ যে কী গভীর তা সে জানে। রেবেকারও কি সেই দুঃখ নেই ? নিশ্চয়ই আছে। রেবেকাও নিশ্চয়ই জানে, কিছুই বদলাবে না আর। এ দেশ অন্ধকারে তলিয়ে যেতে যেতে একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। রফিকের সঙ্গে তার পার্থক্য কেবল এটুকুই যে, রফিক আর কিছুই আশা করে না, কিন্তু রেবেকার ভেতরে কোনও অদ্ভুত কারণে এক অনির্বাণ আশাবাদের শিখা জ¦লে আছে।

পরপর দু দিন খুব অস্বস্তিকর সময় কাটালো রফিক। স্বপ্নের রেশটা রয়েই গিয়েছিল, মনে হচ্ছিল কিছু একটা ঘটবে, অদ্ভুত কিছু। কিন্তু সেরকম কিছু ঘটলো না বা ঘটার লক্ষণ দেখা গেল না। রফিক তখন নিজেই নিজেকে শাসন করল, বাড়াবাড়ি দুশ্চিন্তা করার কোনও কারণই ঘটেনি, সে কথাও নিজেকে বোঝালো। তা ছাড়া, সময়টাও বেশ সংকটপূর্ণ, এখন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার মানে হয় না।    

দু দিন পরের কথা। আজকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সকালেই বেরিয়ে গেল রফিক, অফিসে যাবে বলে। একটা রিকশা নিয়ে ঘণ্টাখানেক নানা রাস্তায় ঘুরে পরিস্থিতি বুঝতে চেষ্টা করল। একদম সুনসান নীরব রাস্তাঘাট। যেন কারফিউ চলছে শহরে। বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বয়কটের আহ্বান জানিয়েছে, প্রতিহত করার ঘোষণাও দিয়েছে। মানুষ যে সত্যি সত্যি সেই ডাকে সাড়া দেবে, রফিক কল্পনাও করেনি। অবশ্য এখনই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। সারা দিন পড়ে আছে, হয়তো বেলা বাড়লে ভোটাররা কেন্দ্রে আসবে। সে বেশকিছু কেন্দ্রের আশপাশেও ঘুরে এল। না কোনও লোকই দেখা যাচ্ছে না। অবশ্য ভোটাররা আসবেই বা কেন ? প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন। সব প্রার্থীই সরকারি দলের। কারও দলীয় প্রতীক আছে, কারও ভিন্ন প্রতীক। কিন্তু দল একটাই। এমনকি সরকারদলীয় জোটের ছোট দলগুলোও সরকারি দলের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে নিয়েছে। এরকম উদ্ভট নির্বাচনের কথা পৃথিবীর কোথাও কেউ শোনেওনি, দেখা দূরের কথা। অনন্তকাল ক্ষমতায় থাকার জন্য এত ছলচাতুরিও করতে দেখেনি কেউ কোনওদিন।

হতাশ এবং বিরক্ত হয়ে অফিসে ঢুকল সে। সারা দিন সারা দেশ থেকেই খবর আসতে লাগল। কোথাও ভোটারদের দেখা যায়নি। খবরগুলো বিশ্লেষণ করে বোঝা গেল, বড়জোর ৫ থেকে ৬ শতাংশ ভোট পড়তে পারে। নির্বাচন কমিশন থেকে অবশ্য ভিন্ন ঘোষণা আসতে লাগল। দুপুর বারোটা নাগাদ বলা হলো, সকাল থেকে ১৮ শতাংশ ভোট পড়েছে, বিকেল তিনটায় বলা হলো ২৭ শতাংশ, এক ঘণ্টা পর বলা হলো ৪০ শতাংশ, সন্ধ্যায় জানানো হলো ৪২ শতাংশ ভোট পড়েছে। ডাহা মিথ্যা কথা, সবাই বুঝলো। চল্লিশ শতাংশ মানে প্রায় পাঁচ কোটি ভোট। এত ভোটার কেন্দ্রে এলে চেষ্টা করেও কারও পক্ষে গোপন করা সম্ভব নয়। অথচ সারা দেশের ভোটকেন্দ্রগুলো ছিল খালি। নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তারা অলস সময় কাটাচ্ছেন, এরকম অনেক ছবি এবং ভিডিও দেখা গেছে মিডিয়ায়।

রাতে যখন বাসায় ফিরল রফিক, ততক্ষণে ফল ঘোষণা হয়ে গেছে। বানানো ফলাফল, বোঝাই যাচ্ছে। চমক এটুকুই যে, ৬২ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে জয়ী দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। অবশ্য তারা সবাই আওয়ামী লীগেরই, মার্কাটা শুধু নৌকার বদলে অন্য কিছু ছিল। সারা দিন অফিসে অস্বস্তিকর পরিবেশ ছিল। যে খবরগুলো পাওয়া যাচ্ছিল, তা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু সেসব খবরের খুব সামান্যই প্রকাশ করা যাবে। পত্রিকার সম্পাদক বা মালিকপক্ষ সরকারের রোষানলে পড়তে চায় না। এই সরকার যে চিরস্থায়ী হয়ে গেছে, পাঁচ বছর পরপর কোনও একটা অকল্পনীয় দুর্বুদ্ধি বের করে নির্বাচন নামের একটা নাটক সাজাবে, ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত হবে, তা সবাই বুঝতে পারছিল। তাহলে সরকারের বিরুদ্ধে থেকে কী লাভ ? সহকর্মীদের অধিকাংশই বিরক্ত এবং হতাশ, আবার সরকারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন খুব আনন্দিত। তারা নিয়মিত গণভবনে যায়, ‘প্রশ্ন নয় প্রশংসা করতে এসেছি’ নামক সংবাদ সম্মেলনে। তারা দিনভর অন্যদের টিটকারি দিয়েছে―ঠেকাতে তো পারলেন না, নির্বাচন তো হয়েই গেল! ইত্যাদি। এদের সঙ্গে আর কথাই বলতে ইচ্ছে করে না রফিকের। এত বিবেক-বুদ্ধিহীন মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হয় ভেবে গ্লানিও হয়।

বাসায় ফিরেও সেই বিরক্তি, গ্লানি, ক্রোধের অনুভূতি থেকে বেরুতে পারছিল না সে। রাতে খাওয়ার টেবিলে ইভানও এসে বসল। ইদানীং ও অনেক রাত পর্যন্ত বাইরে থাকে, ও ফেরার আগেই রফিক-রেবেকা খেয়ে নেয়, এত রাত পর্যন্ত ছেলের জন্য অপেক্ষা করা সম্ভব হয় না। ফিরেও নিজের রুমে ঢোকে, বিশেষ কথাবার্তা বলে না, নিজের মতো খায়, তারপর সারা রাত জেগে থাকে। কেমন যেন একা হয়ে গেছে ছেলেটা। গম্ভীর, বিষণ্ন, রাগী। নানা বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করে, প্রচুর চিন্তা করে, তারপর কোনও একদিন মা আর বাবার সঙ্গে নিজের চিন্তাগুলো শেয়ার করে। আজকে নাকি ও বাইরেই যায়নি। একসঙ্গে খেতে বসল ঠিকই, কিন্তু তিনজনই চুপচাপ। খাওয়া শেষ হওয়ার পর ইভান হঠাৎই জিজ্ঞেস করল―বাবা, এভাবেই চলবে সব কিছু ? এর কি শেষ নাই ?

শেষ তো আছেই, সবকিছুরই শেষ আছে, কিন্তু কবে যে সেটা হবে বোঝা যাচ্ছে না।

আজকে কি সত্যিই চল্লিশ পার্সেন্ট ভোট পড়েছে ?

আরে না। পাঁচ-ছয় পার্সেন্ট পড়েছে হয়তো।

এরকম ডাহা মিথ্যা কথা সিইসি বললেন কীভাবে ?

স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীই অনর্গল মিথ্যা বলেন, তার সাঙ্গপাঙ্গরা বলবে না কেন ?

কিন্তু আওয়ামী লীগের সমর্থক তো কম না। তারা ভোট দিতে গেলে অন্তত পঁচিশ-ত্রিশ পার্সেন্ট ভোট পড়তই। তার মানে ভোট তারাও দেয়নি। এটা হলো কেন ?

প্রতিদ্বন্দ্বিতা নাই, ভোট দিলে যে ফল হবে, না দিলেও তাই। খামোখা কষ্ট করে ভোট দিতে যাবে কেন ?

নিজেদের সম্মান রক্ষা করার জন্য হলেও তো যেতে পারত।

এখানে একটা সমস্যা হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী তো নিজের দলের নেতাদেরই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে বলেছেন। মানে একজন মার্কা হিসেবে নৌকা পাবে, বাকিরা অন্য মার্কা পেলেও তারা সব আওয়ামী লীগেরই লোক। যে-ই জিতুক, সরকারের ঝুঁকি নাই।

তাতে কী হলো ? তাদের সমর্থকরা ভোট কেন দেবে না ?

ধরো, আমাদের এলাকায় পাঁচজন ভোটে দাঁড়িয়েছে। সবাই আওয়ামী লীগের। তাদের কর্মীরাও একই দলের কিন্তু পাঁচ ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। কিন্তু সমর্থকরা কী করবে ? কাকে ভোট দেবে ? একজনকে দিলে অন্যজনের বিরাগভাজন হতে হবে। সেই ঝুঁকি তারা নেবে কেন ?

তা অবশ্য ঠিক। তাহলে ব্যাপারটা মিটমাট হলো কীভাবে ? সবাই তো জিততে চেয়েছে, কিন্তু ঘোষণা করা হয়েছে একজনের নাম।

ওটা স্ক্রিপটেড। আগে থেকেই ঠিক করা ছিল, কাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে।

অন্যরা মেনে নিল ?

না নিয়ে উপায় কী ? নেত্রীকে তো তারা ঈশ্বর মনে করে। তবে একটা ব্যাপার কি জানো, দুটো শত্রুতা কখনও মেটে না, আমৃত্যু থেকে যায়। একটা হলো জমির শত্রুতা, আরেকটা ভোটের শত্রুতা। ভিন্ন দলের প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে হারলে যতটা না সম্মানে লাগে, নিজ দলের আরেকজনের কাছে হেরে গেলে তার চেয়ে বেশি ইগোতে লাগে। ওই যে পাঁচজনের কথা বললাম, একই দলের হলেও তারা আর কোনওদিন একসঙ্গে কাজ করতে পারবে না। দলের কোনও সংকটে আর একও হতে পারবে না।

তার মানে দলের ভেতরেই বিভক্তি তৈরি হলো।

হ্যাঁ। শুধু তাই নয়। নির্বাচন মানেই কথার যুদ্ধ। প্রতিপক্ষকে কথা দিয়ে ঘায়েল করতে হয় আর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হয়। তো এরা একে অপরের বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিষোদ্গার করেছে। জনগণ দেখেছে, এরা সবাই খারাপ। মেসেজটা এভাবে পৌঁছেছে আওয়ামী লীগ মানেই খারাপ।

তো এরকম যে হবে, তাদের মহান নেত্রী কি তা বোঝেননি ?

না বোঝার কারণই নাই। সব তো তারই ডিজাইন।

জেনেশুনে নিজের দলের এত বড় ক্ষতি করার কারণ কী ?

পরিষ্কার কারণটা জানি না। আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকতে চান, তা তো বোঝাই যায়। কিন্তু এটাই একমাত্র কারণ নয়, সম্ভবত গূঢ় কোনও কারণ আছে।

সেটা কী ?

পরিষ্কার বুঝতে পারছি না। তবে আমার ধারণা, তিনি চান, তাঁর মৃত্যুর পর দলটিও যেন বিলুপ্ত হয়ে যায়।

রেবেকা এতক্ষণ ধরে বাপ-ছেলের কথা শুনছিল। এবার ভীষণ বিস্মিত কণ্ঠে বলল, কী বলছো ? তোমার এরকম মনে হওয়ার কারণ কী ?

দেখো, তাঁর বয়স হয়েছে। প্রাকৃতিক নিয়মেই তিনি মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছেন। অথচ দলের ভেতরে তিনি কোনও বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি হতে দেননি। না নিজের পরিবার থেকে, না দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে থেকে। তাঁর অনুপস্থিতিতে দলের হাল ধরবে কে ?

হয়তো এর মধ্যেই কাউকে দাঁড় করিয়ে ফেলবেন।

উঁহু করবেন না। উনি নিজেকে ছাড়া কিছু বোঝেন না। ভয়াবহ সেল্ফ সেন্টার্ড মানুষ। কাউকে বিশ্বাসও করেন না। নেতা-কর্মীদের তো নয়ই, এমনকি নিজের পরিবারের কাউকেও নয়। তাছাড়া এবার যেভাবে পরিকল্পিতভাবে দলের তৃণমূল পর্যন্ত বিভক্তি ছড়িয়ে দিলেন, তিনি মারা গেলে দল টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।

তুমি যে কী বলো না! তিনি নিজেই নিজের দলকে ধ্বংস করতে চাইছেন, এও কি সম্ভব ?

সম্ভব, উনার পক্ষে সম্ভব।

ধুর! এগুলো তোমার রাগের কথা।

আমি তো তাদের সমর্থক না যে রাগ-অভিমান থাকবে, বা দল নিয়ে দু:শ্চিন্তা থাকবে। বললামই তো, উনি ভয়ানক আত্মকেন্দ্রিক মানুষ। কথা বলার সময় কীভাবে আমি আমি করতে থাকেন দেখো না ? তাঁর লক্ষ্যই হলো, আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকা এবং মৃত্যুর পর তাঁর পাশে যেন আর কারও নাম উচ্চারিত না হয় সেটা নিশ্চিত করা।  

একটা সাপ, এতদিন সবাইকে ছোবল মেরেছে, এবার নিজেই নিজের লেজ খাওয়া শুরু করেছে। তাই না বাবা ?―ইভান মন্তব্য করল।

হ্যাঁ তাই। আমার অন্তত তাই মনে হয়।

৯.

কোনও রকম ঝক্কিঝামেলা ছাড়াই সরকার গঠন করে ফেলল আওয়ামী লীগ। সরকারি দলের নেতাকর্মী-সমর্থকদের মধ্যে বন্য উল্লাস। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য পশ্চিমা বিশ্বের প্রচণ্ড চাপ উপেক্ষা করে এত সহজে ফের মসনদে বসা যাবে, তারা ভাবতেও পারেনি। নেত্রীর ক্ষুরধার বুদ্ধির প্রশংসায় পঞ্চমুখ আওয়ামী লেখক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী-টক শোজীবীরা। পাঁচ বছরের আগে ফের কোনও নাটক মঞ্চায়নের প্রয়োজন হবে না, এ নিয়ে স্বস্তিও। অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন শ্মশানের নীরবতা এবং অস্বস্তি। সবাই হতভম্ব এবং হতাশ। কারও কোনও কর্মসূচি নাই, সম্ভবত রাজনীতিও শেষ হয়ে গেছে। প্রধান বিরোধী দল রুটিনমাফিক বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তাতে কারও মনে আশার সঞ্চার হচ্ছে না, জাতির কাঁধে চেপে বসা স্বৈরশাসন যে আরও দীর্ঘস্থায়ী হলো তা বুঝে নিতে কারও অসুবিধাও হচ্ছে না। 

সাধারণ মানুষের জীবন রাজনীতি দিয়েই নিয়ন্ত্রিত হয়, কিন্তু তাদের ওসব নিয়ে পড়ে থাকলে চলে না। ফিরে যেতে হয় জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহে। গতানুগতিক জীবন। চাকরিবাকরি, হা-হুতাশ, দীর্ঘশ্বাস, বেঁচে থাকার অদম্য চেষ্টা। জিনিসপত্রের দাম হুহু করে বেড়েই চলেছে, সামনে রোজা আসছে, বাড়বে আরও, নাভিশ্বাস উঠছে মানুষের। ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ, হতাশায় জর্জরিত মানুষগুলো ক্ষোভ ঝাড়ার কোনও জায়গা পাচ্ছে না। সব জমা হচ্ছে গোপন কোনও জায়গায়, হয়ে উঠছে আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরণোন্মুখ। সার্বিক অবস্থা বিচার করে রফিকের এই সব মনে হয়। রেবেকার সঙ্গে আলাপ করতে গেলে বোঝা যায়, তারও একই অনুভূতি। ইভানের রাগ আরও বেড়েছে। ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের মাস্তানি সীমা ছাড়িয়েছে, কাউকে কথাই বলতে দিচ্ছে না। কিছুদিন আগেই এক বামপন্থি সংগঠনের সভাপতির মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে সরকারের সমালোচনা করার ‘অপরাধে’।

এই দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে বেরোবার জন্য রফিকরা জানুয়ারির শেষে ছুটি নিয়ে সপ্তাহখানেক বাড়িতে কাটিয়ে এল। প্রতি বছর ডিসেম্বরে একবার করে বাড়িতে যায় তারা। এবার নির্বাচনের জন্য ছুটি পায়নি রফিক, তাই জানুয়ারির শেষে যেতে হলো। ভাইবোন আর তাদের ছেলেমেয়েরাও এসেছে, একসঙ্গে দারুণ আনন্দমুখর সময় কাটালো সবাই। শীতের সুস্বাদু সবজি, নদীর তাজা মাছ, খেজুরের রস, নানারকম পিঠার আয়োজন―যেন এক উৎসব। গ্রামে শীতও পড়েছে জাঁকিয়ে। রাতের বেলা সবাই মিলে আড্ডা দেয়। ভাইবোনদের ছেলেমেয়েদের ধারণা, তাদের চাচা/মামা যেহেতু বড় সাংবাদিক, তিনি সবই জানেন। অবশ্য ওদেরই বা দোষ কী ? ওদের মা-বাবাদেরও একই ধারণা। নানা কিছু নিয়ে কত যে প্রশ্ন ওদের! একটা প্রশ্ন একেবারে কমন―দেশ কি এভাবেই চলবে ? কোনও পরিবর্তনই কি আসবে না ? রফিক মোটেই আশাবাদী ধরনের মানুষ নয়, তবু বলতে হয়। সবার মুরুব্বি হিসেবে কথাগুলো শোনায় বাণীর মতো―পরিবর্তন আসবেই। এটা অবশ্যসম্ভাবী। জগতের ইতিহাস পরিবর্তনের ইতিহাস। এমনকি প্রকৃতিও পরিবর্তনশীল। কিন্তু তুমি যখন এবং যেভাবে এবং যে ধরনের পরিবর্তন চাইছো, তেমনটিই হবে সেটি ভাবার কোনও কারণ নেই। কখন কীভাবে কী ধরনের পরিবর্তন আসে বা আসবে সেই সূত্র আমার জানা নেই। যদি কখনও দিশাহারা মনে হয় নিজেকে, তাহলে আশাবাদীদের কথা শুনবে এবং বিশ্বাস করবে। আশাবাদ তোমাকে প্রেরণা জোগাবে এবং সেই প্রেরণায় তুমি কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতেও পারো। তবে এও মনে রাখবে, আশাবাদীরা তোমাদের যেসব কথা শোনাবে সেখানে কোনও নেতিবাচক কথা থাকবে না। তারা জেনেশুনেই তোমাকে বিভ্রান্ত করবে। তাদের কথা শুনে তোমার মনে হবে, পরিবর্তনটা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, দরজা খুললেই ঢুকে পড়বে। বাস্তবতা কিন্তু সেরকম নয়। অতএব আশাভঙ্গের সম্ভাবনাটুকুও মনে রাখবে। যদি আশা পূরণ না হয় তাহলে অন্তত তোমার যেন ব্রেকডাউন না ঘটে। সমাজ-রাষ্ট্র-পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার গুরুভার নিজের দুর্বল কাঁধে তুলে নেবে না। ওটা সবার কাজ নয়। তোমার মেন্টর তোমাকে যে উদাহরণগুলো দেবেন সেগুলো ব্যতিক্রম। খেয়াল করলে দেখবে, সেই উদাহরণযোগ্য মানুষগুলো সবাই আশ্চর্যরকম প্রতিভাবান। তাঁদের প্রতিভাকে ব্যাখ্যা করা যায় না বলেই আমরা তাঁদেরকে বলি ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভা। নিজের কাজটি নিষ্ঠার সঙ্গে মন দিয়ে করে যাও, পৃথিবী না বদলালেও নিজের কাজের প্রভাব তুমি দেখে যেতে পারবে। মাঝেমধ্যে নিজেকে সময় দেবে। বেড়াতে যাবে, নিসর্গের বিবিধ ঐশ্বর্য মনোযোগ দিয়ে দেখবে, গান শুনবে, বই পড়বে, সিনেমা-নাটক দেখবে, ফুটবল বা ক্রিকেট খেলা দেখবে, অর্থাৎ যা তোমাকে আনন্দ দেয়, বিনোদন দেয় তাই করবে। পরিবারের সদস্যদের সময় দেবে, তাদের প্রতি তোমার যে দায়িত্ব আছে তা পালন করবে। পরিবারের দায়িত্ব না নিতে পারলে জগতের দায়িত্ব তুমি নেবে কীভাবে ? নিজেকে ভালোবাসবে, ভালোবাসবে পরিবার-পরিজনকে, বন্ধুদেরকে, এমনকি শত্রুদেরকেও। তোমার অশান্ত মন তখন শান্ত হয়ে উঠবে এবং বড় কাজ করার অন্তর্গত শক্তি ও প্রেরণা পাবে।

এসব কথা যখন সে বলেছিল তখনও জানতো না, পরিবর্তন খুব কাছেই এবং তাড়াতাড়িই তা আসছে। একটা চাপা অস্বস্তি টের পাচ্ছিল সে, ক্ষমতাসীনদের আস্ফালন ছাড়া বাকি দেশ যেন থম মেরে ছিল। তারপর হঠাৎ করেই যেন কিছু একটা ঘটতে শুরু করল। ঘটনার শুরু একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রাক্তন পুলিশপ্রধান বেনজির আহমেদের অকল্পনীয় দুর্নীতি এবং অজস্র অপকর্ম নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের মধ্য দিয়ে। এই পুলিশপ্রধান ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী, একসময় র‌্যাবপ্রধানও ছিলেন, প্রধানমন্ত্রী এবং তার পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন, বাড়িও গোপালগঞ্জে। তার অপকর্ম সম্বন্ধে সাংবাদিকদের জানা ছিল কিন্তু প্রকাশের সাহস কারও ছিল না। হঠাৎ করে পত্রিকাটির এই রিপোর্ট দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করল। সরকারের জন্যও তা হয়ে উঠল বিব্রতকর। প্রসঙ্গটি পুরোনো হতে না-হতে এনবিআরের মতিউর রহমানের বিপুল দুর্নীতির খবর চাউর হলো তার ছেলের বেশি দামে ছাগল কেনা নিয়ে। তার নাম হলো ছাগলকাণ্ডের মতিউর। এটাও পুরোনো হলো না। তার আগেই সাবেক প্রধান বনরক্ষক মোশারফ হোসেনের পরিচয় প্রকাশ পেল বনখেকো হিসেবে। মিলল দুর্নীতির হিসাবও। এরপরই পিএসসির ড্রাইভার আবেদের প্রশ্ন ফাঁস করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার খবর। সরকার এবং তাদের দল এবং তাদের সুবিধাভোগীরা, প্রধানমন্ত্রী এবং তার পরিবারের সদস্যরা, এবং তার আত্মীয়স্বজনরা, তার অনুগত আমলা-পুলিশ-আর্মি এমনকি পিওনরাও যে দুর্নীতির মহাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে, এ কথা জানা ছিল সবারই, কিন্তু এত বিস্তারিতভাবে দেশের পত্রিকায় আসেনি এর আগে। অবশ্য বিদেশি সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এবং নেত্রনিউজ একাধিক প্রতিবেদন করেছে কিন্তু সরকার তা মিথ্যা অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দিয়েছে। এবার একটার রেশ ফুরাতে না-ফুরাতে আরেকটা এসে হাজির হচ্ছে, সামাল দেওয়া সম্ভব হচেছ না সরকারের পক্ষে।

আর তখনই সরকার সেই পুরোনো খেলা খেলল―এক প্রসঙ্গ দিয়ে অন্য প্রসঙ্গ চাপা দেওয়ার খেলা। ছ বছর আগে ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন অনেক দূর পর্যন্ত টেনে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী জেদের বশে কোটা বাতিলই করে দিয়েছিলেন। তার তিন বছর পর হাইকোর্টে কোটা পুনর্বহালের জন্য রিট করেছিল সরকারেরই অনুগত একদল লোক। হাইকোর্ট ওটা নিয়ে আর নাড়াচাড়া করেনি। হঠাৎ করে রিটের তিন বছর পর অর্থাৎ আগের কোটা সংস্কার আন্দোলনের ছ বছর পর ফের কোটা পুনর্বহালের নির্দেশ দেয় আদালত। সরকার ঠিকই আন্দাজ করেছিল। ছাত্ররা কোটা পুনর্বহালের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ফের কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু করে। সরকার যে এটাই চাইছিল তা বোঝা যায় আন্দোলনে সরকারি ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের সমর্থন দেখে। শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে, সরকারের তরফ থেকে কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না, বরং বেনজির-মতিউর-মোশারফ প্রসঙ্গ রয়েই যায়। আর তখনই সক্রিয় হয়ে ওঠে সরকারের ঘনিষ্ঠ দুই সাংবাদিক। সংবাদ সম্মেলনে এই আন্দোলনকে মুক্তিযোদ্ধা বনাম রাজাকার বাইনারিতে ফেলে উদ্দেশ্যপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। বাচাল প্রধানমন্ত্রী যেন এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি সমস্ত শিক্ষার্থীদেরই রাজাকারের নাতিপুতি বলে গালি দেন। এটাই তার এবং তাদের ব্রহ্মাস্ত্র, তাদের বিরুদ্ধে কেউ সামান্য সমালোচনা করলেও তাকে রাজাকার বলে গালি দিয়ে থামিয়ে দেওয়া হয়। তিনি ভেবেছিলেন, শিক্ষার্থীরা না থামলেও তাদেরকে যারা নৈতিক সমর্থন দিচ্ছেন তারা এই গালি খেয়ে থেমে যাবেন এবং শিক্ষার্থীরা তাতে দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু এবার তার সব হিসাব উল্টে গেল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে মধ্যরাতে গর্জে উঠল মিছিল―‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার/ কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার’। স্লোগানে মুখরিত হলো ক্যাম্পাস, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া অপবাদ ফিরিয়ে দেওয়া হলো তাকেই স্বৈরাচার উপাধি দিয়ে।

এর পরের ঘটনাগুলো ঘটতে লাগল দ্রুতগতিতে। সরকার তাদের রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক শক্তির সর্বগ্রাসী প্রয়োগ ঘটাল, রক্তপ্লাবনে ভেসে গেল দেশ। শিক্ষার্থীদের সমর্থনে জনতা নেমে এল পথে, বানের জলের মতো। এত রক্তপাত দেখে রফিক নিশ্চিত হয়ে গেল, নৌকা এবার ডুববে। রক্তস্রোতের মধ্যেই ডুবে মরবে নৌকার মাঝিমাল্লা সবাই।

 কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে ইভানের তেমন আগ্রহ ছিল না। সরকারের এই সর্বগ্রাসী হামলার পর সে আর  নিষ্ক্রিয় থাকতে চাইল না। একদিন রাতে এসে বলল, আমি কাল থেকে বাসায় ফিরব না। তোমরা আমাকে না করো না প্লিজ।

নিষেধ করার কোনও নৈতিক শক্তি ছিল না রফিক বা রেবেকার। এত অন্যায়, এত রক্তপাত, এত হত্যাযজ্ঞ দেখেও যে তরুণ প্রতিবাদ না করে থাকতে পারে, সে তো মানুষই নয়। রেবেকা বলল, যাও বাবা। না করব না। কিন্তু বাসায় ফিরে এসো। দীর্ঘ সংগ্রামের জন্য শরীর-স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে হয়। খেতে হয়, ঘুমাতে হয়। যখন ইচ্ছে যেয়ো, কিন্তু এসে খেয়ে যেয়ো, একটু ঘুমিয়ে নিয়ো।

আচ্ছা মা, তাই হবে। বাবা, তুমি কিছু বলবে ?

হ্যাঁ, বলব। তুমি অবশ্যই যাবে। কিন্তু পুলিশ কিংবা সরকারি সন্ত্রাসীদের সামনে বুক পেতে দাঁড়াবে না। গুলি খেয়ে মরার মধ্যে বীরত্ব আছে, কিন্তু মনে রাখবে জীবন অমূল্য। তোমরা লড়াই করছো, সেই লড়াইয়ের ফলাফল দেখার জন্য হলেও তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে।

কিন্তু বাবা, ওরা তো টার্গেট করে গুলি করছে। নিজেকে বাঁচাব কীভাবে ?

 কৌশলী হবে। আন্দোলন-সংগ্রাম-বিপ্লব-যুদ্ধে কৌশলই আসল ব্যাপার। ঐক্যবদ্ধ মানুষের শক্তির চেয়ে বড় কোনও শক্তি নেই। যে কোনও মূল্যে ঐক্যবদ্ধ থেকো। ছোটখাটো মত বিরাধ যেন ঐক্যে ফাটল ধরাতে না পারে সেই চেষ্টা করবে।

থ্যাংক ইউ বাবা। মনে থাকবে তোমাদের কথা।

ইভান বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে দু দিন আগে, এখনও ফেরেনি। কারফিউ চলছে শহরে, চলছে ইন্টারনেট শাটডাউন। ইভানের ফোনও বন্ধ। টেলিভিশনগুলো আন্দোলনের খবর সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট করছে। পত্রিকায় কিছু কিছু খবর আসছে বটে, কিন্তু যতটা ছাপা হচ্ছে, তারচেয়ে অনেক বেশি ঘটনা ঘটছে। ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে সব খবর সময়মতো না পৌঁছলেও রফিকের পত্রিকার প্রতিনিধিরা নানা জায়গা থেকে ফোনে খবর পাঠাচ্ছে, কখনও অফিসে এসে লিখছে, ফের বেরিয়ে যাচ্ছে। খবর যা পাওয়া যাচ্ছে, অবস্থা ভয়াবহ। তার হিসাবে অন্তত হাজারখানেক মানুষ মারা গেছে গত কয়েক দিনে। আহত কয়েক হাজার। এর মধ্যে ইভানের কোনও খবর পাওয়া যাচ্ছে না। রফিক সব হাসপাতাল এবং থানায় খোঁজ নিয়েছে। পায়নি। দুশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারছে না রফিক-রেবেকা কেউই।

তৃতীয় দিন বিকেলে অচেনা একটা নাম্বার থেকে রেবেকার ফোনে মেসেজ এল : মা, আমি ইভান। আমার ফোন হারিয়ে গেছে। আমি বেঁচে আছি, সুস্থ আছি, তোমরা চিন্তা করো না। আর হ্যাঁ, এই নাম্বারে ফোন করো না।

রেবেকা এসে রফিককে মেসেজটা দেখাল। রফিক দাঁড়িয়েছিল ব্যালকনিতে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আকাশের রংটা দেখছে অবাক বিস্ময়ে। এরকম রক্তরঞ্জিত রং বহুদিন দেখেনি সে। ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে। সন্ধ্যায় আকাশে এরকম রং দেখা গেলে মা বলতেন, কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসেন (রা.) এবং তাঁর পরিবার-পরিজন এবং সঙ্গীসাথীদের যে রক্ত ঝরেছিল, সেই কথা মনে করিয়ে দিতে আকাশ মাঝেমধ্যে ওরকম রঙে নিজেকে সাজায়। বলার সময় তাঁর কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হতো, চোখ অশ্রুসিক্ত হতো। মহররম মাসে এই শোক আর অশ্রু আরও গভীর হয়ে উঠত। আলোর রং বদলানোর বৈজ্ঞানিক কারণ জানা ছিল না বলে তাঁদের এই বয়ানকে সত্য বলে ভাবত সে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা জানার পরও মনে হয়েছে, তাঁরা হয়তো ভুল জানতেন, কিন্তু নবীবংশের জন্য তাঁদের মমতা, ভালোবাসা, শোক আর শ্রদ্ধায় কোনও ঘাটতি ছিল না। সন্ধ্যায় আকাশের এই রূপ দেখে হঠাৎ তার মনে হলো, এখন সেই মহররম মাস চলছে। আর সারা দেশে ঝরছে রক্ত। পুলিশ-বিজিবি-র‌্যাব আর সরকারের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা নিরস্ত্র-নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালিয়ে রক্ত ঝরাচ্ছে। এমনকি নারী শিক্ষার্থীরাও হামলা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। মারা যাচ্ছে শিশুরাও। ঠিক যেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ফিরে এসে ফের হামলা করেছে। হাজার কথার ভিড়ে আমরা যেন আমাদের সন্তানদের রক্তাক্ত হওয়ার কথা ভুলে না যাই, সেজন্যই কি আকাশ এমন রঙে সাজল আজ ?

শহীদের রক্তে ভেজা আকাশের এই রংই বলে দিচ্ছে, ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম শাসকের বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে।

রফিক টের পেল, রেবেকা তার কাঁধে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

কাঁদছ কেন ?―রফিক কোমল স্বরে বলল―ইভান তো লিখেছে, ও বেঁচে আছে, সুস্থ আছে…

কিন্তু যারা মারা যাচ্ছে! অকাতরে মরছে! ওরাও তো আমাদেরই সন্তান। ওদের কি এভাবে মরার কথা ছিল ?― বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলে রেবেকা। আর রফিক ভাবে, সব সন্তানকে নিজের সন্তান হিসেবে ভাবতে না পারলে তুমি আর কেমন মা ? নিজের ছেলের নিরাপদে থাকার খবর পেয়েও তুমি কাঁদছ, কারণ যারা মারা যাচ্ছে, তারাও তোমার কাছে সন্তানের মর্যাদায় অভিষিক্ত, সেজন্যই তুমি মা, তুমিই বাংলাদেশ। এখানেই তোমার জয়, এখানেই এক কোটি প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও শ্রেষ্ঠ তুমি…

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button