আর্কাইভউপন্যাস

উপন্যাস : গোলচেহারার আয়না : সাদিয়া সুলতানা

বাবা নিরুদ্দেশ হওয়ার চল্লিশ দিন পর তার ঝোলা থেকে আয়নাটা আবিষ্কার করেছে গোলচেহারা। এই আয়নায় মানুষের ভেতর দেখা যায়, বাহির দেখা যায় না। আয়নার সামনে দাঁড়ালেই তরাসে কাঁপে বুক। গোলচেহারা বিষয়টা জানার পরেও প্রতিদিন কম্পিত বুকে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। তারপর যা দেখে তা সহ্য করা ওর জন্য বেশ কঠিন হয়ে যায়।

আয়নায় নিজের চেহারা দেখতে পায় না গোলচেহারা। দেখে কচুরিপানার বেগুনি মুকুটে সেজে ওঠা একটা পানাভরা পুকুর। সবুজের সৌন্দর্য চোখ ভরে দেখার আগেই সাপের দিঘল সোনালি বেণি চোখে পড়ে। ঐ জলসাপ খুব দুরন্ত, ফণা না জাগিয়েও কামড় দেয়। আয়নায় পর্দা ফেলে গোলচেহারা তাই হুড়পাড় করে ঘরের বাইরে বের হয়। বাইরে বেরিয়ে উঠানে লেপটে থাকা শূন্যতা দেখে চমকে ওঠে। একটু আগে এখানেই ছিল সবাই। কোথায় গেল ?

ওর মনে হয়, জাদুকর মোহন ফিরে এসেছে। তেলেসমাতি দেখিয়ে গোলচেহারাকে সবার কাছ থেকে আলাদা করে ফেলেছে। মাথা ঘুরিয়ে চৌদিকে দেখে গোলচেহারা। নাহ, আশেপাশে চেনা গণ্ডি, চেনা পথ। শুধু চেনা মানুষগুলো কাছে ধারে নাই। সহসা ওর মনে পড়ে যায়, গতকাল সন্ধ্যা থেকে সুরাইয়াকে পাওয়া যাচ্ছে না।

গোলচেহারার জাদুকর বাবা এমন করে আস্ত একটা মানুষকে উধাও করে ফেলতে পারত। জাদু দেখতে আসা মানুষেরা যখন বিস্ময়ে হৈ হৈ করে উঠত তখনই বাকশের মুখ ঠেলে গুম হয়ে যাওয়া মানুষটি বেরিয়ে আসত। একদিন হঠাৎ করে গোলচেহারার বাবাও গুম হয়ে গেল, ফেলে রেখে গেল তার জাদুর ঝোলা আর আয়না।

আচমকা শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে গোলচেহারার। তাজা সকালটা ক্রমশ রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। ও ভয় পায়। ভয়ে কুঁকড়ে উঠে জাদুর ঝোলা, আয়না, ঘরদোর… সব পেছনে ফেলে ছুটতে থাকে। আকাশের অনড় মেঘদলও ছুটতে শুরু করে। তালু পোড়ানো রোদ জ্বালায়, পোড়ায়। পশ্চিম থেকে ধেয়ে আসা লু হাওয়ার চাবুক শপাং শপাং ঘায়ে বিদ্ধ হয় দেহে। এই সময়ে খরাও হচ্ছে জবর। জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষির হাল-হকিকতও তাই খারাপ। আমন বুনতে কম কষ্ট করেনি কৃষক। মাটিকে যত্নআত্তি করে বীজতলা প্রস্তুত করার পর বীজ ছিটিয়েছে। চারা জাগলে সারিবদ্ধভাবে নির্দিষ্ট দূরত্ব, সংখ্যা আর গভীরতায় চারা লাগিয়েছে। এখন দরকার পানি। চারদিকে পানির জন্যই হাহাকার। বৃষ্টির দেখা নাই। কিন্তু বৃষ্টি তো নামার কথা। কে কথা দেবে আর! ধরাছোঁয়ার বাইরে ঐ উপরে যিনি বসে থাকেন তার ইশারা ছাড়া তো কিছুই ঘটে না দুনিয়ায়, তবু বৃষ্টির আশায় দুদিন আগে হিন্দুপাড়ায় ব্যাঙের বিয়ে দিয়েছে সাতকুড়ির গ্রামের মানুষেরা। বরপক্ষ আর কনেপক্ষ ছিল উলেশ্বরী আর রত্না রানি নামের দুই সই।

গোলচেহারা ওর সই সুরাইয়ার সঙ্গে ব্যাঙের বিয়ে দেখতে গিয়েছিল। গিয়ে দেখে সেই হুলুস্থুল চলছে। ছায়ামণ্ডপ, পুষ্পমাল্য, গায়ে হলুদ, ধান দূর্বা, সাত পাক, সিঁদুর দান, মন্ত্রপাঠ, শঙ্খের বাজ, খানাপিনা, নাচগান সবই ছিল। বৃদ্ধারা পর্যন্ত সুরে সুরে দুলে দুলে গান গাইছিল, ‘ওরে ও ব্যাঙা-বেঙি… দে না দে না পানি আনি…।’ বিয়েতে উলেশ্বরী আর রত্না রানি, দুই সইয়ের তেমন কোনও খরচ হয়নি, পাড়ার সবাই চাঁদা তুলেছে। সুরাইয়া আর গোলচেহারা বর-কনেকে দেখে বিশ টাকা করে দিয়েছে। সিঁদুর আর রঙিন পোশাক পরা ব্যাঙ দুটিকে দেখে দুজনে হেসেছে খুব। বিয়ের পর ব্যাঙ দম্পতিকে কালী মন্দিরের পেছনের পুকুরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। গতকাল সুরাইয়া আর গোলচেহারা ব্যাঙা আর বেঙিকে দেখতে গিয়েছিল, ওদের দেখা পায়নি। সুরাইয়া বলেছিল, আজ আবার পুকুরপাড়ে যাবে।

গোলচেহারা দৌড়ায়। ওর দেহ ভারী, মুখ গোলগাল। মুটিয়ে যাওয়া দেহে গরম হাওয়া চাবুকের ঘা মারছে, এই আঘাত সহ্য করা আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও ক্রমে কাবু হতে থাকে গোলচেহারা। ওকে স্বস্তি দিতে গন্তব্য উঁকি দেয়। 

মাকে পেয়ে যায় ও চার বাড়ি পরেই। সুরাইয়ার দাদি পেস্তা বেগমের চিৎকার সদর দরজার কাছ থেকেই শোনা যাচ্ছে, ‘আমাগো সাতকুড়িতে মিলিটারি আইছে রে… ওরে তোরা কে কোথায় আছোস রে…আমার সোনার পাখিরে মাইরা ফেলল রে…’

থমকে যায় গোলচেহারা, কী হয়েছে তা আন্দাজ করতে না পেরে বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে থাকা উৎসুক মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। দ্রুতই সব ঘটনা জানা যায়।

সকালে চাষিরা ধরাধরি করে সুরাইয়াকে ক্ষেত থেকে তুলে এনেছে। আবু জাফরের ক্ষেতে পড়ে ছিল সুরাইয়া। মরেনি। মেয়েটার কোমর থেকে শুরু করে ঊরু, হাঁটু, পায়ের পাতা পর্যন্ত অবশের মতো হয়ে গেছে। কালো কালো ডাঁই ধরেছে পায়ের নগ্ন পাতায়। ওর পায়ের কাছে কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে আছে চারপেয়ে টোপলা। সে সুরাইয়ার ন্যাওটা। নিজের পাত থেকে রোজই টোপলাকে খাবার তুলে দেয় সুরাইয়া। থেকে থেকে টোপলা সুরাইয়ার শরীরের গন্ধ শুঁকছে। গোলচেহারা তাকিয়ে দেখে সুরাইয়ার পায়ের পাতার আলতার রেখা গাঢ় হয়ে উঠেছে। গতকাল বিকেলে গোলচেহারা আর সুরাইয়া, দুই সই একসঙ্গে আলতা পরেছিল। আলতা পরার সুবিধা আছে, আয়নার সামনে দাঁড়াতে হয় না। ঝুমুর ঝুমুর মল পরে উঠানজুড়ে হাঁটলে নিজের রূপ নিজেই দেখা যায়। দুই সই গতকাল এভাবেই হাঁটছিল আর কারণে-অকারণে হাসছিল। হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যার দিকে ‘তুই দাঁড়া, আমি আসতেছি’ বলে সুরাইয়া কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল, গোলচেহারা ওকে আর খুঁজে পায়নি। কেঁদে কেঁদে সেই কাহিনিই বিতং করছে পেস্তা বেগম।

‘ওরে আমার নাতিন রে…কালকাও কত হাসিখুশি করতেছিল আমার বইন রে… কোথায় গেলি রে…।’

সত্তোরোর্ধ পেস্তা বেগমের শরীর ভঙ্গুর, একা একা আজকাল বাড়ির বাইরে যেতে পারেন না। এখন কান্নার ধকল নিতে পারছেন না তিনি, মাটিতে আছড়ে পড়েছেন। তার কান্না সংক্রমিত হচ্ছে নারী দর্শনার্থীদের ভেতরে। গোলচেহারা কাঁদে না, পিলপিল পায়ে মায়ের কাছে এসে দাঁড়ায়।

গোলচেহারার বিধ্বস্ত চেহারা দেখে ওর মা গুলবদন খেঁকিয়ে ওঠে।

‘তুইও বাইর হইছিস ? দুই বইনের মারা খাওনের শখ হইছে, না ?’

গুলবদনের পাশে গোলচেহারার বোন গোলনাহার দাঁড়ানো। চাপাস্বরে দুই বোনকে পুনঃপুন তিরস্কার করে গুলবদন। উঠানভরা মানুষ না থাকলে মেয়েদের চুলের মুঠি ধরে এখনই ছেঁচড়ে বাড়ি নিত সে। দুই বোন মায়ের কথায় সায় দেয় না। পূর্ণদৃষ্টিতে সুরাইয়াকে দেখে। ওদের পাশে দাঁড়িয়ে আতহার জামালও সুরাইয়াকে দেখে আর উৎসুক জনতাকে শুনিয়ে বলে, ‘এইজন্যই মাইয়াগো ঘরের ভিতরে থাকা দরকার, পর্দা পুশিদা করা দরকার। সুরাইয়ার বাপ আবু জাফররে কতদিন কইছি, মাইয়া বালেগ হইছে, বোরকা ধরাও। বিয়া দাও। কে শোনে কার কথা!’

আতহার জামালের পাশে তার বোরকা পরা বিবি রোমেলাও দাঁড়িয়ে আছে। কালো আলখেল্লার আড়ালে থাকা বিবিকে আতহার জামাল ইশারায় বাড়ির ভেতরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে নিজের কথার পুনরাবৃত্তি করে। উপস্থিত মানুষের একাংশ কলরব তুলে তার সঙ্গে সহমত পোষণ করে। সেই সঙ্গে ঘাড় উঁচু করে বেপর্দা সুরাইয়াকে একনজর দেখারও চেষ্টা করতে থাকে। 

সুরাইয়াকে যখন পাওয়া যায় তখন ওর দেহ ছিল উদোম। সুরাইয়ার বাবা আবু জাফর আজ সকালে মাঠে পানি সেচ দিতে যায়নি। মেয়েকে এ পাড়ায় ও পাড়ায় খুঁজে বেরিয়েছে। গতকাল সন্ধ্যা থেকেই মেয়ের সন্ধান করছে সে। ছুটে ছুটে এ বাড়িতে ও বাড়িতে গেছে। কোথাও মেয়েকে পায়নি।

সবুজ ক্ষেতে সুরাইয়ার চিত হয়ে থাকা দেহটা প্রথম দেখেছিল নবুচাঁদ। প্রথমে সুরাইয়ার নিম্নাঙ্গের আধশুকনো রক্তের চলটা চোখে পড়েনি নবুচাঁদের। ওর পুরুষ চোখ নিরাভরণ নারীর বুকে উপুড় হওয়া বাটির মতো গোল গোল স্তনে আটকে ছিল। বাম স্তনের কালচে বৃন্তটা না থাকায় ঘাবড়ে গিয়েছিল নবুচাঁদ, অমন লোভনীয় অবাধ্য স্তনজোড়ায় হাত দিতে গিয়েও দেয়নি। বিষয়টা চেপে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ানো নবুচাঁদ গোলচেহারার কাছে এগিয়ে গিয়ে চুপিসারে বলে, ‘তোর সইয়ের গায়ে দেওয়া গামছাটা নিয়া আয়। আমার গামছা। গেল হাটের থেইকা কিনছি। এককেরে নতুন।’

গোলচেহারা নবুচাঁদের রক্ত জমাট বাঁধা মুখে তাকায়। নবুচাঁদ ওর প্রেমিক। জনসম্মুখে প্রেমিকের দিকে বেশিক্ষণ দৃষ্টি রাখা যায় না। গোলচেহারার চোখ তাই উঠানময় ঘোরে। কে যেন পেছন থেকে প্রশ্নবিদ্ধ স্বরে গুনগুন করে, ‘কামটা নবুই করছে মনে কয়! নইলে এত মানুষ থাকতে নবুই ক্যান সুরাইয়ারে আগে দেখবো।’

চমকে তাকায় গোলচেহারা। দেখে এই বাড়ির ধলা মুরগিটা ছানাসমেত উঠানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ধলা কদিন আগে দশটা ছানা দিয়েছিল। মড়ক লেগেছে। শেষ ছানাটা এখন ধলার পায়ে পায়ে ঘুরছে। বিকেল পর্যন্ত টিকবে কি না সন্দেহ। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয় না কেন মানুষের, তা নিয়ে দুই সই একদিন খুব হাসাহাসি করেছিল। পরে ধলার ছানাদের মৃত্যুসংবাদ আদান-প্রদান করতে করতে দুজনে কেঁদেছিলও খুব।

সুরাইয়া কাঁদতেও পারে। ওর কান্না দেখলে গোলচেহারার মনে হয় এর চেয়ে নির্মল এর চেয়ে সুন্দর কিছু দুনিয়াতে নেই। দুদিন আগে ক্রন্দসী সুরাইয়াকে ও টেনে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়েছিল। দেখেছিল, যেমন চেহারা সুরাইয়ার তেমন ওর ভেতরটাও। একদম দুধসাদা স্রোত বয় সুরাইয়ার ভেতরে। নিজেকে আয়নায় দেখে সলজ্জ হেসেছিল সুরাইয়া। তখন শত শত সাদা ফুল ভেসে উঠেছিল আয়নায়। বিহ্বল গোলচেহারাকে ও কথা দিয়েছিল, প্রাণের সইয়ের আয়নার গোমর কখনও ফাঁস করবে না।

ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হাঁসফাঁস লাগে গোলচেহারার। ঘামে ঘাড়-গলা চটচট করে। নবুচাঁদ গোলচেহারাকে ইশারা করে। অমন ইশারা গোলচেহারার ঘর্মাক্ত শরীরে মেঘের নাগাল পাওয়া ঠান্ডা হাওয়ার পরশ বুলায়, ঢোলকলমির জেল্লা ভরা সবুজে ডুবে যাওয়ার মুহূর্তটুকুর কথা মনে করিয়ে দেয়।

ডুবতে ডুবতে থৈহীন প্রান্তরে ডুবে যায় গোলচেহারা আর ডুবন্ত দেহের এখানে সেখানে হাত দিতে দিতে ওর প্রেমিক ওকে আমূল চেপে ধরে। দিশাহীন মেঘের মতো গলে যেতে যেতে গোলচেহারা জানতে চায়, ‘কবে বিয়া করবা ?’ ব্যস্ত মানুষটির কাছ থেকে ইতিবাচক কোনও জবাব না পেয়েও ওর শ্বাস নিবিড় হয়ে আসে।

আচমকা শত প্রশ্ন নিয়ে উঠানের শত মানুষ মুখর হয়ে ওঠে। এসব প্রশ্নের উত্তর জানা নাই বলে গোলচেহারা বোঝার চেষ্টা সুরাইয়া কোথায় গিয়েছিল, কার কাছে গিয়েছিল। সন্দেহ বা ক্ষোভ কিছু একটা ফেনিয়ে ওঠে গোলচেহারার বুকের ভেতরে। হাতে বাঁধা তাবিজটা চেপে ধরে ও। বদনজ¦র থেকে রক্ষা করতে সুরাইয়ার হাতেও একটা তাবিজ বেঁধেছিল ওর মা। গোলচেহারা ভালো করে তাকিয়ে দেখে সইয়ের তাবিজটা অক্ষত আছে এখনও।

গোলনাহার এগিয়ে এসে বোনের শরীর ঘেঁষে দাঁড়ায়।

‘কোন শুওরের বাচ্চা যে কামডা করল! মনটা চায়…’

পিঠে ঝুলে পড়া চুলের গোছা সপাটে বাড়ি দিয়ে খোঁপা বাঁধতে বাঁধতে অন্তঃসত্ত্বা গোলনাহার বোনের দিকে তাকায়। গোলচেহারা কুঁকড়ে গেছে। কিছুই বলছে না, কাঁদছেও না। গোলনাহার বিস্মিতই হয়। ঐ মূহূর্তে গুলবদন এগিয়ে এসে মেয়েদের হাত ধরে টান দেয়।

‘তামশা দেখতে আইছে সব। মাইয়ার ইজ্জত গেছে আর হেরা ম্যালা বসাইছে। চল চল, বাড়িত যাই। রঙ্গ দেখার কাম নাই।’

রঙিন দুনিয়ার আকাশ কুমিরের হা মেলে আছে। অসহনীয় রোদ ঢলে পড়ছে। রোদ থেকে পালাতে এবার আর ছোটে না গোলচেহারা। মা, বোনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধীর পায়ে হাঁটে।

২.

পেস্তা বেগমের ছেলে আবু জাফরের বাড়ি সাতকুড়ি গ্রামের একেবারে প্রাণভোমরার ভেতরে। সাতকুড়ি গ্রামের প্রাণভোমরা গর্ভেশ্বরী নদী। নদী এখন আর নদী নাই, নদীর নামটি আছে। সাতকুড়ি গ্রামেও প্রাণ নাই। সে আরেক কিসসা।

ঢলোঢলো ঢেউয়ের আনাগোনা না থাকলেও আপাতত চাঞ্চল্য এসেছে সাতকুড়িতে। শুধু অচঞ্চল, নিথর পড়ে আছে পেস্তা বেগমের নাতনি সুরাইয়া। মাঝে একটা রাত পেরিয়ে গেছে। মেয়েকে ধরে বসিয়ে গোসল করিয়েছে উলফত আরা। শরীরের ক্ষত লীন করতে না পারলেও রক্ত, মাটি ধুয়ে মেয়েকে পরিচ্ছন্ন করেছে মা। পেস্তা বেগমের নির্দেশে একবার কবিরাজ বাড়ি গিয়ে জ্বালাপোড়ার ওষুধ এনেছে সুরাইয়ার বাবা আবু জাফর। সুরাইয়ার ব্যথার উপশম হয়নি, গোঙ্গানি বন্ধ হয়েছে। রক্তক্ষরণের কারণে শরীর সাদা আর নিস্তেজ হয়ে গেছে। ব্যথার প্রতিক্রিয়া দেখানোর শক্তিও নেই শরীরে। এই মুহূর্তে মেয়ের মাথার কাছে বসে আছে মা উলফত আরা। মুখে রা নেই তার। খানিক আগেও বাষ্পাচ্ছন্ন স্বরে মেয়ের নাম ধরে ডাকছিলেন তিনি। এখন ক্লান্ত হয়ে গেছেন। পেস্তা বেগমও ক্লান্ত। বয়স হিসাব করলে তার শরীর-মন কোনও ধকল নেওয়ারই উপযুক্ত না। ছেলে-ছেলে বউয়ের ঘর থেকে বেরিয়ে ধীর পায়ে তিনি উঠানে এসে দাঁড়িয়েছেন।

উঠানের পশ্চিম পাশের সজনে গাছটা ফুলে ফুলে সেজে উঠেছে। পেস্তা বেগমের সাধ ঐ সজনে গাছের নিচে পাতা ফুলের বিছানায় একদিন হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমাবেন। এই ফাল্গুন চৈত্র মাসে সজনে গাছে ফুল আসে। ফুলের যন্ত্রণায় গাছে কোনও পাতা থাকে না। চওড়া কাণ্ডের উর্ধ্বমুখী শাখায় শাখায় অজস্র ফুল ফোটে। ঘি রঙা ফুলগুলো যখন ঝরতে শুরু করে তখন শুধু তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছা করে। সন্ধ্যা লাগলে মাঝেমধ্যে গাছের সামনে দাঁড়ান পেস্তা বেগম। তখন তার শরীরের জ¦ালা-পোড়া, বিষ-বেদনা সব উধাও হয়ে যায়। ব্যথা উপশমের শান্তিতে পেস্তা বেগমের তখন কেবলই গাছের নিচে সাজানো বিছানায় ঘুমিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।

বরাবরই ঘুম নেই পেস্তা বেগমের চোখে। সত্তর বছরের মধ্যে তেপ্পান্ন বছরই তিনি প্রায় নির্ঘুম কাটিয়েছেন। সাতকুড়ি গ্রামের আর সকলে যখন ঘুমে কাতর হয়ে থাকে পেস্তা বেগম তখন বিভা রানির সঙ্গে কথা বলতে বলতে বিছানায় এপাশ ওপাশ করেন।

কত কী যে বলে বিভা রানি। অনর্গল বলে। কবে কোথায় নিজের কানের দুল জোড়া হারিয়েছিল, কবে সন্ধ্যা বাতি দিতে দেরি করেছিল বলে শাশুড়ির গালমন্দ শুনেছিল, তেঁতুলের টক আচার খেতে গিয়ে কবে জিহ্বা ছড়ে গিয়েছিল, কবে পিঠার সাঁজ বানাতে গিয়ে হাত পুড়িয়েছিল, কোন-বারের দংর্গাপূজায় নতুন শাড়ি কিনতে শহরে গিয়েছিল―নতুন ঢঙে রোজই পুরনো সব গল্প বলে চলে বিভা রানি। গল্প জমে উঠলে পা দুখানি ছড়িয়ে বসে সবচেয়ে মোক্ষম গল্পটা সে বলতে শুরু করে আর ছটফটায়। ছটফট ছটফট করতে করতে বিভা রানি গল্পটা আর শেষ করতে পারে না। খোপে বন্দি থাকা মোরগটা ডেকে উঠলে পেস্তা বেগমের ঘর ছেড়ে যাওয়ার সময় হয় বিভা রানির। যেমন ধীর পায়ে সে ঘরে ঢুকেছে তেমন ধীর পায়ে সে ঘর ছেড়ে বেরিয়েও যায়। আর পেস্তা বেগম তখন এক বুক টনটনে ব্যথা নিয়ে একাকী বসে থাকে।

পেস্তা বেগমের স্বামী মিয়াজান ব্যাপারি আক্রান্ত হওয়ার এক দুই দিনের মধ্যেই স্ত্রীর ঘুম না আসার অসুখটা আবিষ্কার করেছিল। মানুষটা এত যত্ন নিত তার। কী রেখে কী করবে বুঝতে পারত না। এমনকি পেস্তা বেগমকে সঙ্গ দিতে মুখে পানি দিয়ে এসে বিছানায় বসে থাকত মানুষটা। বেশিক্ষণ অবশ্য বসে থাকতে পারত না, ঘুমে এলিয়ে পড়ত বিছানায়।

মিয়াজান ব্যাপারি মারা গেছেন অনেক অনেক বছর হলো। দিন-তারিখের হিসাব নাই পেস্তা বেগমের। শুধু মনে আছে, ঐ বছর সজনে গাছ ঝাঁপিয়ে ফুল এসেছিল। ঐ সজনে গাছটা মিয়াজান ব্যাপারির নিজের হাতে লাগানো গাছ। এই গাছের ডালপালা থেকে সাতকুড়ি গ্রামের শত শত সজনে গাছের জন্ম। সজনে খেতে ভালো লাগে না পেস্তা বেগমের, চিবাতে চিবাতে গাল ধরে আসে। মিয়াজান ব্যাপারি অবিশ্যি সজনে খুব পছন্দ করত। ডাল, সর্ষে বাটা, ছোট মাছ, সবজির সঙ্গে সজনে ডাঁটা যোগ করে কত রকমের রান্নাই না করতেন পেস্তা বেগম। মানুষটা বড় আনন্দ নিয়ে খেত। পেস্তা বেগমের শাশুড়ি আম্মা কর্ফুল মাইও সজনে তরকারি খেতে ভালোবাসতেন। জায়ে জায়ে, ননদে দেবরে বসে হাত লাগিয়ে কত কাজ, কত কোটাবাছা করেছেন এই সংসারে! কোথায় যে চলে গেল আপন মানুষগুলো।

চোখ ঝাপসা হয়ে আসে পেস্তা বেগমের। বছর তিন আগে সদর হাসপাতালে নিয়ে বিনা পয়সায় তার চোখের ছানি কাটিয়ে এনেছিল ছেলে আবু জাফর। পেস্তা বেগম চোখের পাতা বন্ধ করেন, খোলেন বার কয়েক। মনে হচ্ছে, আবার ছানি পড়েছে চোখে, তিন হাত দূরে থাকা সজনে গাছটাকেও তিনি এখন আর দেখতে পাচ্ছেন না।

বুকের ভেতরে হু হু করে ওঠে। এভাবে একদিন সব নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কত কিছুই তো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। স্বামীর কবরের চিহ্ন শুধু আছে, শাশুড়ি কর্ফুল মাইয়ের কবরের চিহ্ন নেই। কত আপনজনেরই তো কবরের চিহ্ন নেই। শুধু কি বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়িই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে ? দেবর, ননদ, জা, ভাসুর, চাচা, জ্যাঠা কতজনই তো মরে গেছে। যুদ্ধের কালে মরেছে সবচেয়ে বেশি। কর্ফুল মাইয়ের মতো এদের কারও কবরের চিহ্ন নাই। এমনভাবে এরা দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে যেন এদের কোনও অস্তিত্বই কোনওকালে ছিল না।

হঠাৎ পেস্তা বেগমের মাথায় একটা গুরুতর ভাবনা আসে। ছেলেকে বললে কি এই সজনে গাছের নিচে তার কবরটা করবে ? না কি ভিটার পরে কোনও কবর রাখতে চাইবে না ছেলে ? ভয় পাবে ?

বিভা রানি দুদিন আগেও পেস্তা বেগমকে বলেছে, ওর ভয় করছে। কবরের কথা, মরা পোড়ার কথা শুনলেই বিভা রানি ভয় পায়। ঐ ভয় যতক্ষণ পর্যন্ত সে পেস্তা বেগমের ভেতরে সঞ্চারিত করতে না পারে ততক্ষণ সে শান্তি পায় না।

পেস্তা বেগমের মনের ভেতরে অশান্তির আগুন দাউ দাউ করে জ¦লে ওঠে। শেষ শান্তিটুকুও কেড়ে নিল…। তার সুরাইয়া, তার ফুল, তার কলিজার টুকরা এখন কবরের দিকে পা বাড়িয়ে আছে। আহ… খোদার লানত নামুক ওদের উপরে, ওরা সব ধ্বংস হোক, কুষ্ঠ রোগে মরুক! শাপ-শাপান্ত করতে করতে পেস্তা বেগম আঁচলের খুঁট দিয়ে দুই চোখ মোছেন।

উলফত আরার কান্নার প্রলম্বিত সুর কানে বিঁধছে। আফরুজা, হুমায়রা, জুয়াইরাহও কি মায়ের সঙ্গে যোগ দিয়েছে ? এমন প্রবল হচ্ছে কেন কান্নার প্রবাহ ? সুরাইয়ার কিছু হলো নাকি ? এখন তখন যে সুরাইয়ার কিছু হবে তা অবশ্য পেস্তা বেগম জানেন। গতকালও যখন সুরাইয়াকে ঘরে আনা হয় তখনও পেস্তা বেগমের এমনটা মনে হয়নি। একটু আগে নাতনির মুখটা দেখেই তিনি বুঝেছেন, শিয়রে মৃত্যুর পয়গাম এসে হাজির হয়েছে।

আউলা একটা হাওয়া এসে পেস্তা বেগমকে ধাক্কা দেয়। পড়ে যেতে যেতে হাওয়া খাবলেই তিনি ভারসাম্য রাখেন। আহারে… সুরাইয়াকেও কবরে শোয়াতে হবে! ঐ ফুলটাও মাটিতে মিশে যাবে! আহ, তার সুরাইয়া! তার সোনার চান! তার চোখের তারা!

চার বোনের মধ্যে সুরাইয়াই তার ন্যাওটা। সময়ে অসময়ে সে দাদির পিছু নিত, কথায় কথায় তার গলা জড়িয়ে ধরে গালে টুকুস করে চুমু খেত, ‘ও দাদি তোর শরীল এত নরম ক্যান ? তোর গাল এত তুলতুলা ক্যান ?’ চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলত, ‘ও দাদি তোর মাথায় এ চুল, না পাটের গোছা ?’ গোসলের সময় পিঠ উদলা হলে জড়িয়ে ধরে জানতে চাইত, ‘ও দাদি… কেমনে পিঠে দাগ হইল ?’

পেস্তা বেগম হাহাকার করে ওঠেন। অদৃশ্য শত্রুকে অভিশাপ দিতে দিতে মাতম করেন, ‘সাতকুড়িত আবার মিলিটারি আইছে, গুষ্ঠি নাশ হয় নাই…’

অব্যাখ্যাত বেদনায় শরীর ভার হয়ে আসে পেস্তা বেগমের। তাল সামলাতে না পেরে তিনি কাটা-গাছের মতো মাটিতে আছড়ে পড়েন।

৩.

দুনিয়ায় কত মানুষই তো জাদু দেখায় কিন্তু যে একবার মোহন জাদুকরের জাদু দেখেছে সে স্বীকার করতে বাধ্য হবে, হ্যাঁ একেই বলে জাদু।

সাতকুড়ি গ্রামের ধলাই মাঠের ফি বছরের চৈত্র সংক্রান্তির মেলার একসময়ের আকর্ষণ ছিল চড়কপূজার বিপজ্জনক সব কসরত। মায়ের কাছ থেকে শুনেছে গোলচেহারা, আগুনের খেলা থেকে শুরু করে ত্রিশ চল্লিশ ফুট উঁচু চড়ক গাছ থেকে পিঠে বঁড়শি গেঁথে দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়া, জিভে বা শরীরের কোনও জায়গায় লোহার শিক গাঁথা বা ভাঙ্গা কাচের টুকরার ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার মতো ভয়ংকর সব খেলা দেখানো হতো এই মেলায়। সেসব বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে মোহন জাদুকরের জাদুই ছিল মেলার মূল আকর্ষণ। এমনও দিন ছিল মেলার সময় জাদুকর মোহনের জন্যই ধাপে ধাপে বাড়াতে হতো। সাত দিনের মেলা আট, দশ দিনে গড়াত। এ গ্রাম সে গ্রাম ভেঙ্গে মানুষ মোহন জাদুকরের জাদু দেখতে আসত।

শুধু মাটির পিনিসকে পাখি, পাখিকে রুমাল, রুমালকে রঙিন ফিতাতে বদলে দিতেই সিদ্ধহস্ত ছিল না মোহন জাদুকর, জাদু দেখানোর ফাঁকে ফাঁকে সে বাংলা সিনেমার কালজয়ী সব গানও গাইত। ‘আছেন আমার মোক্তার/আছেন আমার ব্যারিস্টার/শেষ বিচারের হাইকোর্টেতে তিনিই আমায় করবেন পার/আমি পাপী তিনি জামিনদার…হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস/দম ফুরাইলে ঠুস…’ গানে বিভোর হতে হতে উৎসুক মানুষেরা দেখত একটা মাটির পিনিস আচমকা একটা জ্যান্ত পাখি হয়ে গেছে। অলৌকিক দৃশ্য দেখার ঘোর কাটতে না কাটতেই ঝুলওয়ালা রঙচঙে আলখেল্লা পরিহিত জাদুকর মোহন গেয়ে উঠত, ‘কি জাদু করিলা, পিরিতি শিখাইলা/থাকিতে পারি না ঘরেতে, প্রাণ সজনী/থাকিতে পারি না ঘরেতে।’ সবাই জাদু ভুলে যখন জাদুকরের কণ্ঠস্বরের প্রশংসা করত তখন জাদুকর মোহন ডান হাতের মধ্যমায় পরিহিত কালো পাথরের আঙটিটা বাম হাতের তিন আঙুল দিয়ে ঘুরাতে ঘুরাতে হাসত। হাসতে হাসতে ভিড়ের মধ্যে মেয়েকে দেখতে পেলে তার হাসি আরও প্রসারিত হতো। বাবার মনোযোগ পেয়ে দর্শক সারিতে দাঁড়ানো গোলচেহারা তালি দিতে দিতে হাত ব্যথা করে ফেলত। আর মনে মনে গোপন বাসনা পুষে রাখত, একদিন বাবার মতো ও ধলাই মাঠের এই মেলায় জাদু দেখাবে। কিন্তু কোথা থেকে কী যে হয়ে গেল, বাবার সব জাদু গোলচেহারার আয়ত্তে আসার আগেই জাদুকর মোহন কি না লাপাত্তা হয়ে গেল! কোথাও খোঁজ নেই তার!

মোহন জাদুকর নিরুদ্দেশ হওয়ার পর এই গ্রামের অনেকেই কানাঘুষা করেছে, পিরিতে মজে উড়ালপঙ্খী হয়ে ঘর ছেড়েছে জাদুকর মোহন। মোহনের বিবি গুলবদনকেও তারা আকারে-ইঙ্গিতে নানা কটু কথা বলেছে। গোলচেহারা, গোলনাহারও কম শোনেনি। এই তো সেদিনও বাড়িতে এসে হানিফের বিবি মুন্নুজান বলে গেছে, তার স্বামী জেলা শহরে মাল আনতে গিয়ে রেলস্টেশনে জাদুকর মোহনের মতো একজনকে দেখেছে, সঙ্গে নাকি শাড়ি পরা একজন মেয়েও ছিল। 

সাতকুড়ির যে যা-ই মন্দ কথা রটিয়ে বেড়াক তবু তারা স্বীকার করতে বাধ্য হয়, জাদু দেখাত বটে মোহন জাদুকর! এই বছরও চৈত্রসংক্রান্তির মেলা বসেছে ধলাই মাঠের পাড়ে। সাতকুড়ি গ্রামের পাশের গ্রাম হালাইজানা থেকে জোকারের মতো চকরাবকরা পোশাক পরা এক জাদুকর এসেছিল জাদু দেখাতে, জমেনি। উলটো ভিড়-বাট্টার মাঝে অনেক লোকের পকেট কাটা গেছে। সাতকুড়ি গ্রামের মানুষের সন্দেহ, জাদুকরের তিন ফুটি সঙ্গীটা ভিড়ের মধ্যে চুপচাপ কাজ সেরেছে। গোলচেহারাও গিয়েছিল মজা দেখতে। পানিশূন্য গ্লাসটা কী করে পানি ভর্তি করেছে জোকারটা এক পলক দেখেই ও চালাকিটা ধরে ফেলেছে।

বুক হালকা করে শ্বাস ফেলে গোলচেহারা। মাঝেমধ্যে ওর বাবাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। মা ওর নিরুদ্দেশ যাত্রার শোক সামলাতে পারবে কি না সে কথা ভেবে ভেবে আর ঘরের বাইরে পা দেওয়া হয় না গোলচেহারার।

বাইরে অন্ধকারে ঘাপটি মেরে থাকা ভয় সহসা ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। গোলচেহারার দেহ নিস্তেজ হয়ে আসে। ওর সই সুরাইয়া না জানি কত কষ্ট সহ্য করে বিছানায় পড়ে আছে। আব্বা কাছে থাকলে গোলচেহারা আবদার করত, ‘আব্বা, জাদু দিয়া গায়েব হওয়া শয়তানটারে বাইর কইরা আনেন তো।’ গোলচেহারা জানে ওর আব্বা ঠিকই সুরাইয়ার ধর্ষককে ধরে আনতে পারত। বাবাই তো প্রথম নেংড়া শাজানকে হাতেনাতে ধরেছিল। গোলচেহারার আব্বার হাতে ধরা পড়ার পর শয়তানটার সেই কী মিনতি!

বছর তিন আগের ঘটনা। সেদিন সুরাইয়াদের বাড়ির গোসলখানার বেড়ার ফাঁক দিয়ে মোবাইল ক্যামেরা তাক করে ভিডিও করছিল শাজান। সুরাইয়ার মা উলফত আরা সবে শরীরে পানি ছুঁইয়েছে। নেংড়া শাজানও তক্কে তক্কে ছিল। কিন্তু পড়বি তো পড় একেবারে মোহন জাদুকরের হাতে! পাশের রাস্তা দিয়েই যাচ্ছিল সে। মোহন জাদুকর কী আর ওকে ছাড়ে! উত্তেজিত গ্রামবাসীর হাতে অপরাধীকে ধরিয়ে দিয়ে সে নিশ্চিন্ত মনে জাদু দেখাতে বেরিয়ে পড়েছিল। ওদিকে গণপিটুনিতে শাজানের এক পা গেল ভেঙ্গে, দিনের পর দিন সে পা নিয়ে ভুগল। শেষ পর্যন্ত ওর নামের আগে নেংড়া তকমা বসে গেল। এর পর থেকেই তো সাতকুড়ি গ্রামে যত অনাসৃষ্টির শুরু হলো।

গোলচেহারার বুক চেপে কান্না আসে। আব্বা হারিয়ে যাওয়ার দিনের কথা মনে পড়ে। ঐদিন সকালে হালাইজানা গ্রামে জাদু দেখাতে যাবে বলে ঝুলওয়ালা আলখেল্লা পরে জাদুর ঝোলা গুছিয়েছিল জাদুকর মোহন। প্রত্যেকবার আব্বার সাজ-সরঞ্জামের ঝোলা গোলচেহারাই গোছাতো। রাতে দ্রুত ঘুমিয়ে গিয়েছিল বলে সেবার গোলচেহারা ঝোলায় হাত লাগানোর সুযোগ পায়নি। ওর আব্বাই দেখে দেখে একেকটা জিনিস ঝোলায় ভরেছিল। সকালে ঘুম ভেঙে উঠে চোখ রগড়াতে রগড়াতে আব্বাকে ঝোলা গোছাতে দেখে অভিমান হয়েছিল গোলচেহারার। আব্বার দিকে পিঠ দিয়ে ঘুমের ভান করে শুয়েছিল ও। আব্বা ঘর থেকে বের হওয়ার আগে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, ‘আম্মা যাই…।’

পাঁজরের হাড় মড়মড় করে ওঠে গোলচেহারার। ভান করতে করতে ও সেদিন সকালে সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভেঙ্গে দেখে আব্বার ঝোলা আছে, আব্বা নেই! মা জানিয়েছিল, কে যেন ডেকে নিয়ে গিয়েছিল ওর আব্বাকে। পাকঘরে ব্যস্ত থাকায় গুলবদন মানুষটাকে দেখতে পায়নি।

আহারে… কেন সেদিন পেছন ফিরে ও একবার আব্বাকে দেখেনি! একবার কেন আব্বা আব্বা করে ডেকে আব্বার গলা জড়িয়ে ধরে কথা বলেনি! কেন বলেনি, ‘আব্বা যাইও না, ও আব্বা যাইও না!’ এখন কত শত সহস্রবার যে আব্বা আব্বা বলে ডাকে, কাঁদে―কেউ তো সেই ডাক কানে তোলে না।

গোলচেহারা কান্না সামলানোর কোনও চেষ্টা করে না, ‘আব্বা…আব্বা’ আওয়াজ তুলে আমূল ঢলে পড়ে। দূর আকাশে চাঁদটাও হঠাৎ গলে পড়তে শুরু করে। চাঁদ-গলা আলো গাছ-গাছালির শাখায় শাখায় আছড়ে পড়ে অলৌকিক এক দৃশ্যের তৈরি করে। মৃদুমন্দ হাওয়া বইতে শুরু করে। শুকনা পাতায় পাতায় টোকা লেগে আচমকা অদ্ভুত এক আবহসঙ্গীত বাজতে শুরু করে। মনে হতে থাকে, সুরাইয়ার আত্মা মুক্তি পায়নি, গোলচেহারার দেহে ভর করে অন্ধকারের ভেতরে গুমরে কেঁদে চলছে।

কিন্তু এ কথা কেন মনে হবে ? সুরাইয়া তো মরেনি! গোলচেহারার সই তো বেঁচে আছে!

ত্বরিত বেগে লাফিয়ে ওঠে গোলচেহারা। সুরাইয়াদের বাড়ি থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে কি ? ওর দাদি পেস্তা বেগম কি কাঁদছে ? ও বুড়ি তো সময়ে-অসময়ে কাঁদে। এখনও কি কাঁদছে ? না, সুরাইয়ার মা উলফত আরা কাঁদছে ? নাকি কষ্ট সহ্য করতে না পেরে সুরাইয়াই অমন বীভৎস সুরে কাঁদছে ?

বোঝা যায় না। কান্নার সুর চৌদিক ভাসিয়ে নেয়, অন্ধকার ভূতুড়ে হয়ে ওঠে। কোনও এক গাছের খোড়ল থেকে পেঁচা ডেকে ওঠে। আত্মার কান্নাও আরও জোরালো হয়। গোলচেহারার মর্মে গিয়ে বেঁধে কান্নার তির।

‘ও মা সুরাইয়া আইছে…’ কেঁদে ওঠে গোলচেহারা। ‘কী হইছে ? কী হইছে ?’ প্রশ্নের সঙ্গে আলো আঁধারি ফুঁড়ে মায়ের চেনা অবয়ব বেরিয়ে আসতে দেখে গোলচেহারা ধাতস্থ হয়, তারপর ভেজা ভেজা স্বরে বলে, ‘কিছু না, আব্বার কথা মনে হয় আম্মা।’

গুলবদনেরও স্বামীর কথা মনে পড়ে। মনকে মস্ত এক পাথর দিয়ে বেঁধে সে মেয়েদের নিয়ে দিন পার করে। আকুলিবিকুলি দুঃখগুলোও আগলে রাখে, কারও কাছে খোলাসা করে না। হিতে বিপরীত হয়, থেকে থেকে এরা গুলবদনকে ত্যক্ত করে, ফলত সে সারাক্ষণই তেতে থাকে।

গোলচেহারা অন্যমনস্ক মাকে পুনরায় ডাকে, ‘আম্মা…।’ ঐ ডাকে মধুমাখা। মেয়ের ডাক শুনে গুলবদনের বুকের ভেতরে চিলিক দিয়ে ওঠে, এগিয়ে গিয়ে সে দু হাতে মেয়েকে বুকে টেনে নেয়। মায়ের নরম বুকে মুখ লুকায় গোলচেহারা, ওর পুরো শরীর কান্নার জোয়ারে কেঁপে ওঠে।

৪.

দুই গাল ভাত মুখে দিয়ে সুরাইয়াদের বাড়ি লক্ষ করে ছুটছে গোলচেহারা। ওর সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলেও জোর পায়ে হাঁটার চেষ্টা করছে গোলনাহার। রুক্ষ পথ ধরে ছুটতে ছুটতে কত কী যে দেখা যাচ্ছে, কত কী যে মনে পড়ছে। ধুলার সঙ্গে গলাগলি করে স্মৃতিরা মাটিতে লুটাচ্ছে।

নবুচাঁদের সঙ্গে দেখা করবে বলে গোলচেহারা সুরাইয়াকে নিয়ে কতবার ঘর ছেড়ে বের হয়েছে। সেই মিথ্যা এখন ওর দেহে সাপের বিষ ঢালছে। সুরাইয়া মিথ্যা বলতে চাইত না। গোলচেহারা বলত, ভালো মিথ্যা বলায় দোষ নেই। সুরাইয়া বলত, মিথ্যার ভালো-মন্দ নেই। মিথ্যা মিথ্যাই।

গোলচেহারা কি আর তা জানে না ? মিথ্যা মিথ্যার দুনিয়া নির্মাণ করে। সত্যকে হত্যা করে। আর সত্যকে হত্যা করা পাপ। নবুচাঁদের জন্য কত পাপ যে করেছে গোলচেহারা। তখন মিথ্যাকে পাপ বলে মনে হয়নি, মিথ্যা বরং সত্যিকে রঙিন আর উপভোগ্য করে তুলেছে। ঐ মিথ্যার বেষ্টনীতে গোলচেহারা অপাপবিদ্ধ সুরাইয়াকেও শামিল করেছে। শরীরে ওঠা বিষজ্বর নামাতে যখন তখন ছল করে প্রেমিকের কাছে ছুটেছে গোলচেহারা। মাকে বলেছে, ‘সইয়ের কাছে যাই।’ সইকে বলেছে, ‘মার লগে দেখা হইলে কইবি, তোর লগেই আছিলাম।’ সে কি নিজের সঙ্গেও ছিল গোলচেহারা!

ক্ষেতের সবুজ গর্ভে ডুবতে ডুবতে নিজের অস্তিত্ব বিস্মৃত হয়েছিল। সাতকুড়ি গ্রামের একমাত্র নদী গর্ভেশ্বরীর মৃত্যুর পর পলিজমা মাটিতে ভারা ভারা ধান হয়। সুগন্ধি ধানের ক্ষেতের আলে বসে চাঁদমুখো নাঙের হাতের পরশে গোলচেহারা দেহের জ্বর নামিয়েছে কত! সত্য-মিথ্যার ফারাক খোঁজেনি কখনও।

নবুচাঁদকে ভালোবেসেছে গোলচেহারা―এই কথা সত্যি। এই জ্বলজ্বলে সত্যির তাড়নায় বাড়িতে অনর্গল মিথ্যা বলে বেরিয়েছে। আর সেই মানুষটিই কি না ওর মিথ্যার বেসাতি চুরচুর করে ভেঙ্গে দিয়ে সত্যিকে টেনে বের করেছে। তবে গোলচেহারার জীবনের চরম সত্যিটা দেখিয়েছে, জাদুকর মোহনের ঐ আয়না।

মন চাইলেই আর আগের মতো আয়না দেখে না গোলচেহারা। বাবার আয়নার দিকেও অলক্ষ্যে চোখ মেলে তাকায় না। যদিও বিশ্বাস করে, আয়নার সামনে নিজেকে আর নবুচাঁদকে দাঁড় করালেই নিগূঢ় সত্যির সন্ধান পেয়ে যাবে। তবু সমাধানের পিছু ছোটে না। রাতে জানালার কপাটে টোকা দিয়েছিল নবুচাঁদ। গোলচেহারা সাড়া দেয়নি। সাড়া না পেয়ে নবুচাঁদ বিনীত কণ্ঠে প্রশ্ন করেছে, ‘কী হইছে তোর ? আমার লগে এমন করোছ ক্যান ?’ 

কী হয়েছে তার সন্ধান পায়নি গোলচেহারা। শুধু কী এক শঙ্কায় দেওয়ালে ঝোলানো আয়নাটা বাবার জাদুর আয়না না জেনেও তা থেকে মুখ ফিরিয়ে শুয়েছিল।

অর্ধমৃত সুরাইয়াও শুয়ে আছে। ওর পায়ের কাছে কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে টোপলা। টোপলার দুই চোখের নিচে কালচে দাগ। ওর দোদুল পেটটা পড়ে আছে। সুরাইয়া ছাড়া এই বাড়ির কেউই টোপলাকে খেতে দেয় না।

গোলচেহারা সইয়ের কাছে ছুটে যায়। জ্বরতপ্ত কপালে হাত রাখে। প্রিয়জনের স্পর্শ পেয়েও তাকায় না সুরাইয়া। অস্ফুট স্বরে কী বলে। ওর ঠোঁটের কাছে কান পাতে গোলচেহারা। হঠাৎ সুরাইয়ার ঠোঁটের কম্পন থেমে যায়। উলফত আরা কান্না শুরু করে। পেস্তা বেগমও সুর করে কাঁদেন। এই কান্নার ভাঁজ আজরাইলের আগমনের সংবাদ খোলাসা করে। ছুটে গিয়ে স্বামীর পায়ে পড়ে উলফত আরা।

‘আপনি আমার সুরাইয়ারে হাসপাতালে নিয়া যান। আল্লাহর দোহাই লাগে।’

আবু জাফর পা ছাড়ানোর চেষ্টা না করে বিবির পেট বরাবর লাথি মারে। উলফত আরা মেঝেতে ছিটকে পড়ে। আবু জাফর থামে না। উঠে বিবির চুলের মুঠি ধরে। শ্রবণ-অযোগ্য শত গালি দিয়েও শান্ত হয় না সে, বিবিকে জানিয়ে দেয় এই মেয়েকে ঘরে রাখবে না। পেস্তা বেগম ছুটে গিয়ে ছেলের হাত ধরেন।

‘আব্বা এমন করে না আব্বা, আমাগো মাইয়াটা, আমাগো সোনার পুত্তলিটা। আমাগো সুরাইয়া বাঁচব না রে। ওরে তুই ডাক্তারের কাছে নিয়া যা আব্বা।’

হাত ঝাড়া দিয়ে মাকে দূরে ঠেলে দেয় আবু জাফর।

‘মরাই উচিত ওর।’

‘আসতাগফিরুল্লাহ! কী কস আব্বা ?’

অবস্থা বেগতিক দেখে টোপলা ভীরু স্বরে ডাকে, ম্যাও, ম্যাও। গোলচেহারা আর গোলনাহার সুরাইয়ার ঘরের বাইরে পা রাখে। ওদের দেখে রোমেলা দৌড়ে এসে ফিসফিস করে বলে, ‘বাঁচার আশা নাই। আবু জাফর পুলিশরেও খবর দেয় নাই। দিলেই তো সর্বনাশ। সব ফাঁস হইয়া যাইব। নিজের মাইয়ারই তো স্বভাব ভালো না। বনে-বাদাড়ে ঘোরে। প্রেম-পিরিতি করে।’ রোমেলার সহজ দেহভঙ্গিমা দেখে বোঝা যায়, আশেপাশে তার স্বামী আতহার জামাল নেই।

প্রতিবেশিনীর ফিসফিসানি গলিত লাভার মতো আবু জাফরের কানে ঢোকে। সে কুঁদে উঠে রোমেলাকে তাড়া করতে যায়, খিড়কি লক্ষ করে দৌড় দেয় রোমেলা।

বিষণ্ন দুপুরটা আবু জাফরের বাড়ির উঠানে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। হাহাকার করে ওঠে সে, মেয়েকে নিয়ে কোথায় যায়, কী করে দিশা পায় না কোনও। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পরিত্রাণ মেলে। পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়ায় আবু জাফরের বাড়ির চৌহদ্দিতে। লোকাল থানায় খবর পৌঁছে দিয়েছে কোনও সুহৃদ। এখন আবু জাফরের আর কোনও কাজ নেই। যা করার পুলিশই করবে। সুরাইয়াকে মেডিকেলে নেওয়া হবে।

উঠানের পেয়ারা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে অন্তর্দাহে একাকার হতে থাকে গোলচেহারা। দাহ চলছে বাইরেও। ইসতেস্কার নামাজ, ব্যাঙের বিয়ে কোনও কিছুতেই ওপরওয়ালা সন্তুষ্ট হননি। একফোঁটা বৃষ্টি নামা দূরে থাক, এক তাল মেঘও জমেনি আকাশে। খরখরে উঠানটা তিরস্কারের ভঙ্গিতে বুক চিতিয়ে আছে। আশেপাশের গাছপালা, ঘাসলতা নেতিয়ে আছে। পথঘাট জ্বলন্ত তাওয়ার মতো ভাপ ছড়াচ্ছে। ঐ পথে কী করে নামবে গোলচেহারা ? নামলেই তো পুড়ে যাবে। এখনও কি পুড়ছে না ?

গোলচেহারা তাপদাহ থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়। ছুটতে চায়। গোলনাহার বোনের হাত ধরে টানে। কিন্তু ওর পা সরে না। সুরাইয়ার মুখটা মনে পড়ে বুকের ভেতরটা জ¦লেপুড়ে যায়। কে করল ওর সইয়ের এই অবস্থা ? কে ? নাকি সইয়ের এই অবস্থার জন্য কোনও না কোনওভাবে ও নিজেই দায়ী ? ওর আর নবুচাঁদের সম্পর্কটা আড়াল করতেই তো এই অবস্থাতেও কলংকের ভাগীদার হচ্ছে সুরাইয়া।

এর মধ্যে পুলিশ উঠানে ভ্যান এনে দাঁড় করিয়েছে। এই ভ্যানের মালিক এই গ্রামেরই কানু। সে পুলিশ দেখেই ভ্যান ফেলে ধলাই মাঠের দিকে দৌড় দিয়েছিল। একজন কনস্টেবল বাঁশি ফুঁ দিতে দিতে অনেক দূর পর্যন্ত কানুকে তাড়া করে ভ্যান নিয়ে সুরাইয়াদের বাড়িতে ফেরত এসেছে।

চারদিকে এখন উৎসুক মানুষের ভিড়। সুরাইয়াকে ঘর থেকে বের করা হবে, সবার ভেতরে চাপা উত্তেজনা কাজ করছে। সবার উত্তেজনায় পানি ঢেলে আবু জাফর একাই আপাদমস্তক চাদরে প্যাঁচানো মেয়েকে কোলে করে ভ্যানে তুলেছে। ভ্যান চালানোর মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আগত পুলিশদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত জ্যেষ্ঠ সদস্যটি খানিকক্ষণ হম্বিতম্বি করে ভিড় থেকে নিত্য নামের একজনকে টেনে বের করেছে। পেটা শরীরের নিত্য মুদি দোকানদার। দোকান ফেলে থানায় যাওয়া সম্ভব না জানাতেই, পুলিশের গালি শুনেছে, ‘দোকান ফেইলা মজা দেখতে আসছ চান্দু আর ভিকটিম নিয়ে থানায় যাইতে পারবা না ? এজাহারে নাম ঢুকায় দিবোনে, থানায় দৌড়াইতে দৌড়াইতে গুদুমগাদুম শরীরটা একেবারে পাতলা হইয়া যাইব।’ নিত্যকে নাস্তানাবুদ হতে দেখে ভিড় করে দাঁড়ানো মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটে।

গোলচেহারা, গোলনাহার দুই বোনের মুখে হাসির চিহ্ন নাই। সুরাইয়ার প্রস্থানদৃশ্য দেখতে দেখতে দুই বোনেরই চোখের কুটুরি জ¦লছে। পুলিশ সুরাইয়াকে নিয়ে চোখের আড়ালে চলে গেছে। উলফত আরা মেয়ের সঙ্গে যেতে পারেনি। উথাল-পাথাল চিৎকার করে সে অজ্ঞান হয়ে গেছে। অপরাধীদের অভিশাপ দিতে দিতে পেস্তা বেগমও অজ্ঞানপ্রায় হয়ে গেছেন। রোমেলা আর প্রতিবেশী হানিফের বিবি মুন্নুজান দুজনের মাথায় পানি ঢালছে। হুলুস্থুল কারবার দেখে আর স্থির থাকতে পারে না দুই বোন। দৌড়ে পালায়।

৫.

বাড়ি ফিরে শরীরের ঘাম শুকালে দুই বোন যে যার মতো ঘরের কাজে মগ্ন হয়। বেলা বাড়ে। সূর্যের তাপ বাড়ে, ঠ্যাটামিও বাড়ে। গরমের বাড়াবাড়িতে শরীরের কাপড় রাখা যায় না। গোলনাহার পাতলা একটা সেমিজ পরে জগভর্তি পানি নিয়ে উঠানে বসে হাঁপায়। গোলচেহারা বাবার ঝোলাটা নিয়ে বিছানার ওপরে বসে। জাদু দেখানোর জিনিসগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে। পিতলের একটা কাঠি আছে এর মধ্যে, এটার ডগায় পাখির রঙিন পালক লাগানো। পালক রঙিন না আসলে, জাদুকর মোহন কবুতরের সাদা পালকে লাল, নীল রঙ করে সুতা দিয়ে কাঠির সঙ্গে বেঁধেছে। এই কাঠিটা আর কিছুই না, মানুষের চোখে বিভ্রম তৈরির একটা উপাদান। জাদু দেখানোর ফাঁকে কাঠিটা হাতে নিয়ে ঘোরালে দর্শকদের দৃষ্টি বিক্ষিপ্ত হয়। এতে জাদুর এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে পৌঁছানো সহজ হয়।

গোলচেহারার আব্বা কত কী জানত! ওকে কত আদর করত!

ছোটবেলায় একবার ওর খুব জ¦র হয়েছিল। টানা সাত দিনের জ¦রে পাখির মতো হয়ে গিয়েছিল শরীরটা। ঐ সময়ে শহরে বড় এক মঞ্চে জাদু দেখানোর জন্য অগ্রিম টাকা নিয়েছিল মোহন জাদুকর। পরে ঐ টাকা ফেরত দিয়ে মেয়ের সেবাযত্ন করেছে। টানা দশ দিন ঘরের বাইরে বের হয়নি। ওদের দুইবোনের অসুখ-বিসুখ হলে ওদের আব্বাই সেবা করত, কপালে জলপট্টি দিত, মুখে খাবার তুলে দিতে দিতে গান গাইতো, ‘ওরে আমার সোনা ময়না পাখি… আদরে আদরে কই তোরে রাখি…’

চোখ পোড়ে। এখনও সূর্যের তাপ কড়া। শরীরে হাওয়া লাগলেই ফোসকা পড়ে যাচ্ছে। গোলচেহারার মা এই দোজখের তাপের ভেতরে পাকঘরের পাশে খড়ি জড়ো করছে। এই ঘর থেকেও দেখা যাচ্ছে ওর মায়ের মুখে লেপটে থাকা বেদনার ব্যঞ্জনা। চিরকাল এভাবেই ঘর সামলেছে মা। ওর আব্বা ঘরে থাকা না থাকায় মায়ের কায়িক শ্রমের কোনও কমবেশি হয়নি। মাকে তবু মোহন জাদুকরের ওপর ক্ষুব্ধ হতে দেখেনি। যেন গুলবদন জানত, মানুষটার জাদুতেই তাকে মুগ্ধ থাকতে হবে।

এখন জাদুর বিভ্রম কেটে গেছে, মায়ের সামনে দাঁড়ালেই মা এখন কারণে-অকারণে ক্ষেপে ওঠে, হয়ে ওঠে তাতানো পৃথিবী।

আচ্ছা গোলচেহারা কি জাদু দিয়ে মাকে আবার সুখী করতে পারে না ?

মনটা হঠাৎ ফুরফুরে হয়ে যায় গোলচেহারার। চোখ না বুজেও কল্পনায় স্পষ্ট দেখতে পায় একটা দৃশ্য, ধলাই মাঠের মেলায় জাদু দেখাচ্ছে ও। মন্ত্র আওড়াতে আওড়াতে মাটির পিনিসকে উড়ালপঙ্খী বানাচ্ছে, ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে জাদুকর মোহন আর গুলবদন মুখে বিশ্বজয়ের হাসি ফুটিয়ে মেয়ের কসরত দেখছে।

কল্পনায় বেশিক্ষণ বুঁদ হয়ে থাকতে পারে না গোলচেহারা। সুরাইয়ার মৃত্যুর খবর আসে। খবরটা জানিয়ে মেয়েদেরকে ভড়কে দিয়ে উঠানে আছাড়িপাছাড়ি কাঁদে গুলবদন। আর হুমকি দেয় যখন-তখন বাড়ি থেকে বের হলে দুই মেয়ের ঠ্যাং লুলা করে দেবে। মায়ের হুমকি-ধামকিতে এক বিন্দুও বিচলিত না হওয়া গোলনাহার পাকঘরে ঢুকে ভাতের থালা হাতে বসে।

গোলচেহারা কী করবে বুঝতে না পেরে ধীর পায়ে ঘরে ঢুকে খাটে রাখা আয়নাটা দেওয়ালে ঝুলিয়ে দেয়। আয়নার দিকে তাকায় না গোলচেহারা, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।

সুরাইয়া এই আয়নার রহস্য জেনে সেদিন শিশুর মতো উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিল। বলেছিল, একদিন এই আয়নার সামনে নেংড়া শাজানকে দাঁড় করাতে হবে। তাহলে ওর সব কুকীর্তি ফাঁস হয়ে যাবে। আর অন্য পা-টাও হারাবে নেংড়া শাজান।

কী করে শাজানকে বাগে আনবে গোলচেহারা ? কী করে সইয়ের ইচ্ছাপূরণ করবে ? ভাবতে ভাবতে সহসা মাথা উঁচু করে গোলচেহারা। তারপর থমকে যায়।

ঐ আয়নার মাঝে যে এত রহস্য লুকিয়ে আছে ওর আব্বা তা কখনও বলেনি। হয়তো বলতে চেয়েছিল, সুযোগ পায়নি। নিরুদ্দেশ হওয়ার আগে কিঞ্চিৎ অস্থির হয়ে উঠেছিল মানুষটা। বাবার ন্যাওটা গোলচেহারা বাবার ছটফটানি টের পেয়েও নিজের বালখিল্যতায় তা উপেক্ষা করেছে।

ভিন গ্রামে জাদু দেখিয়ে বাবা যখন বাড়ি ফিরে আসত তখন ওর আনন্দের সীমা থাকত না। বাবা বাড়িতে থাকা মানেই বাবার কাছ থেকে নানা রকম হাতসাফাই আর ভেলকি রপ্ত করার সুযোগ মিলত। মেয়ের কাছে সহজে জাদুর রহস্য ভাঙত না মোহন। মেয়ে নিজেই একেকটা খেলার নেপথ্যের কারসাজি ধরে ফেলত। কী করে তুলতুলে রুমাল বেড়াল হয়, পেয়ালার পানি বরফ হয়, চুলভর্তি মাথা ন্যাড়া হয়, মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ পাল্টে যায়, ফুল হয়ে যায় বেলুন… মাথা খাটিয়ে সব বের করে ফেলত গোলচেহারা। শুধু ঐ আয়নার রহস্যই বের করতে পারছে না।

এতটুকু বুঝেছে, ঐ আয়না সব জানায়, সব দেখায়। আয়নায় যা দেখে গোলচেহারা তা ওর সহ্য হয় না। নিজের পোশাকহীন নগ্নতা সহ্য করা গেলেও মুখে, চোখে ঝুলতে থাকা রক্তাক্ত ঝালরের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। আয়নার ওপরে তাই চটজলদি কালো রঙের একটা পর্দা টানিয়ে দেয় গোলচেহারা।

ঘরে গোলনাহার ঢুকেছে। ভাত খেয়ে খেয়ে ওর গাল, চোখ-মুখ ভরাট হয়ে এসেছে। শরীরও হয়ে উঠেছে ভারী। বোনের মøান মুখ দেখে গোলনাহারের সতেজ মুখ মøান হয়ে আসে।

‘সুরাইয়ারে দেখতে যাবি ?’

এই একটা প্রশ্ন শুনেই পাল্টে যায় গোলচেহারার অভিব্যক্তি, মুখের জমাট রেখা সরল হয়, দুচোখ উষ্ণ পানিতে ভরে ওঠে। গোলনাহার বোনকে দেখে, দেখে বোনের মুখ-চোখে বেদনার চিহ্ন।

বাবার আয়না ছাড়া এখন আর অন্য আয়না ঘরে রাখে না গোলচেহারা। আয়নায় নিজের মুখও দেখে না। আয়না থাকলে দেখতে পেত ওর গোলগাল চেহারায় ভাঙন ধরেছে, ফোলা ফোলা গাল চুপসে গেছে। ফরসা গালে আর সন্তাপ ভরা চোখের নিচে অনিদ্রার ছাপ পড়েছে। ঠোঁটদুটো ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। এক-দুবার জ্বরও এসেছিল বুঝি, ঠোঁটের কোণ ফেটেছে।

‘কী রে যাবি না ?’

এবার বুঝি বা কান্নার সময় হয় গোলচেহারার। সই নেই, সেই বেদনা মর্মে গিয়ে বাজে। বেদনায় মুহ্যমান গোলচেহারা বিছানার চাদর আঁকড়ে ধরে শব্দহীন কাঁদে। গোলনাহার বোনকে কী করে সান্ত্বনা দেবে, শব্দ হাতড়ায়।

‘ক্যামনে ওরে মাইরা ফেলল! কোন শুওরের বাচ্চা যে কামটা করল, যদি জানতে পারতাম!’

চমকে ওঠে গোলচেহারা। জানা কি অসম্ভব ? ঐ আয়না কি জানাতে পারে না ? প্রশ্নটা তোলপাড় তোলে ভেতরে। মায়ের বেঁধে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা ভুলে, বোনকে পেছনে রেখে গোলচেহারা এক ছুটে ঘরের বাইরে বেরিয়ে যায়।

৬.

ঘুমাতে পারেন না পেস্তা বেগম। বিভা রানির জ¦ালায় ঘুমাবেন কী করে। যখন তখন ঘরে আসে বিভা রানি। দিন মানে না, রাত মানে না। মাথার কাছে বসে বিনবিন করে গল্প করে, থেমে থেমে হাসে, কাঁদে। হাসির চেয়ে কান্নাতেই বেশি মাতে সে। এত বছর হয়ে গেল তবু বিভা রানির কান্না ফুরাল না।

পেস্তা বেগমের ভাঙা চোয়াল আরও ভিতরে ঢুকে যেতে চায়। অসময়ে কেন বিভা রানির কথা মনে পড়ছে। এই নাম মনে এলেই তো মুখপুড়ি টের পেয়ে যায়, পায়ে পায়ে তার সামনে এসে উপস্থিত হয়। ভয়ার্ত চোখে একবার চারদিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেন পেস্তা বেগম। না এখনও আজকের দুর্দশার খোঁজ পায়নি সে। রাতে তিনি বিছানায় গেলে অবশ্য সে ঠিকই এসে হাজির হবে। গত রাতে তিনি নিজের বিছানায় যাননি। উলফত আরা আর তিন নাতনির সঙ্গে এক ঘরে থেকেছেন। তাকে অবাক করে চোখ দু-একবার ঘুমে ভার হয়ে এসেছে কিন্তু বিভা রানি আসার পাঁয়তারা করেনি।

আজ বিভা রানি ঠিকই এসে উপস্থিত হয়। অনেক দিন পর এমন দিনের আলোতে তার দেখা মেলে। পেস্তা বেগমের সামনে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই বিভা রানি কাঁদতে শুরু করে আর দমকে দমকে আনন্দ আর কষ্টের বিতং করে।

‘ও দিদি, কষ্টের কাল শ্যাষ হয় না ক্যান ? সবাই যে কইলো ওরা চইলা গেলে আমাগো কষ্ট শ্যাষ হইব।’

ওরা কারা তা জানেন পেস্তা বেগম, আর জানেন বলেই ফের বিরক্ত হন। শত্রুর গল্প করতে গেলেও অত কান্না আসে ? অবশ্য কান্না বন্ধ হয়ে বিভা রানির মুখমণ্ডল বিভায় পূর্ণ হতে বেশি সময় লাগে না।

‘ও দিদি, তোমার সুরাইয়ার মতো আমার গোপালের শরীল ভত্তিও খালি মায়া আর মায়া। তুমি না কও, মায়া না থাকলে ভালা মানুষ হওয়া যায় না ?’

পেস্তা বেগম কিছু বলেন না। বিভা রানি একাই বলে। তার ছেলে নাড়ু গোপাল চন্দ্র প্রথম যেদিন হাঁটতে শিখল সেদিনের গল্প চলছে এখন। তিপ্পান্ন বছর ধরে এইসব গল্প শুনছে পেস্তা বেগম, গল্পের প্রতিটা মোচড় দাঁড়িকমা সমেত মুখস্থ হয়ে গেছে তার। কিছু গল্প তো পেস্তা বেগমের নিজের জীবনের। তবু দুর্মুখ শত্রুর মতো মুখ চলছে বিভা রানির।

‘বুঝলা দিদি আমার তো তহন দিশা নাই। আমার গোপাল রে বিছরাইতাছি কিন্তু কোথাও পাইতেছি না। এই দুয়ারে দৌড়াই, ঐ দুয়ারে দৌড়াই। ওর বাবা তো একবার রাইগা গিয়া কইল, নাড়ু গোপাল রে ছাড়াই বর্ডারের দিকে মেলা করব। আমি তার পায়ে পইড়া গড়াইয়া কানলাম।’

কান্নার দৃশ্যটা পেস্তা বেগমের সামনেই মঞ্চস্থ করে বিভা রানি। তারপর একটু স্থির হয়ে বসে বলে, ‘তারপর কী হইল জানো দিদি ?’

তারপর কী হলো পেস্তা বেগম জানেন। তারপর নাড়ু গোপালের খোঁজে তার মা সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পার হলো। কিন্তু ঐ নদীর কাছে, ঐ সমুদ্দুরের কাছে তো বিভা রানির নাড়ু গোপাল নাই, সে আছে আগুনের দেবতা অগ্নির কাছে। কিন্তু কোনও যজ্ঞের আয়োজন তো করা হয়নি তবু কেন নাড়ু গোপাল আহুতির জন্য প্রস্তুত ? বিভা রানি সেই কথা বলে আরেক দফা কাঁদে।

‘আহারে… আমার গোপাল… ঘরে আয় বাবা।’

কদিন ধরে এই বাড়িতে শুধু কান্নারই শব্দ। পেস্তা বেগমের মাথার এ কোণ ও কোণ দপদপ করে। এমন না যে তিনি এইসব গল্প জানেন না। জানেন বলেই গল্পের কচকচানিতে তার শরীর মনে বিবমিষা জাগে। এই ভাব দূর করতে সুপারি ছাড়া এক খিলি পান মুখে দেন পেস্তা বেগম। তার বেশির ভাগ দাঁতই নড়বড়ে, সুপারির বদলে কোন দাঁতটাকে যে মাড়িতে পিষে ফেলেন তার কোনও ইয়ত্তা নেই। অসমান মাড়িতে পান ফেলে বিকৃত মুখে পান চিবান পেস্তা বেগম। যেন পান তো চিবান না, বিষ করোলা চিবান।

শ্রোতাকে নিশ্চুপ দেখেও বিভা রানির গল্পে ভাটা পড়ে না।

‘ও দিদি, আমার গোপাল কই গেল ? দেখছ ?’

পেস্তা বেগমের একবার ইচ্ছে হয় বলে, ‘দেখছি দেখছি, দেশদ্রোহীদের হাতে পড়ছে তোর গোপাল’। পরক্ষণেই নিজেকে সামলান তিনি। এই কথা বললে আর রক্ষা নেই, পুরো ভিটাবাড়ি মাথায় তুলবে বিভা রানি। নিশ্চুপ পেস্তা বেগম মুখই খোলেন না। মুখে ভরা পানের রস নিয়ে বসে থাকেন। তখনই তার চোখ যায় সজনে গাছে। খরায় সর্বনাশ হয়ে গেছে, গুটি ঝরে ঝরে সজনে ডাটা একেবারে পাতলা হয়ে এসেছে। এইবার আম, জাম, লিচু, জামরুল সব গাছেই ফলন কম। আগের বছর উপুড় করে দিয়েছিলেন তিনি, এবার রাশ টেনেছেন।

এবার সৃষ্টিকর্তাকে পেয়ে বসেন পেস্তা বেগম। বিভা রানির মুখ বন্ধ করে দিয়ে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, ‘সব দিকেই মারবা তুমি! পেটে মারবা মারো, আমার সুরাইয়া কী করছিল ? অমন ফুলের মতোন মাইয়াটারে তুমি দেশদ্রোহীদের হাতে দিলা কেন গো আল্লাহ।’

মোক্ষম শব্দটা কানে ঢুকতেই বিভা রানি মাটিতে গড়িয়ে কাঁদতে শুরু করেন, ‘ঐ দেশদ্রোহীরা আমার গোপাল রে নিছে, ও দিদি গো আমার গোপাল রে পাই না দিদি, আমার গোপাল রে নিছে দিদি… ও দিদি…’

কান্না শুনে নিজেকে আর সামলে রাখতে পারেন না পেস্তা বেগম। বিভা রানির দিকে এগিয়ে ওর নরম শরীরটাকে আলিঙ্গন করে নিজেও ডুকরে কেঁদে ওঠেন।

৭.

রাক্ষুসে বাতাসের হলকায় বোঝা যায়, নবুচাঁদের আজকের দিনটা ভালো কাটবে না। অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে মন্দ হালতেই আছে নবুচাঁদ। আর যেদিন থেকে গোলচেহারার সন্দেহের দৃষ্টি ওকে বিদ্ধ করতে শুরু করেছে সেদিন থেকে ও আরও খারাপ আছে।

খরা আরও বেড়েছে। শেষ বিকেলের সূর্যও যেন এক হাত ওপরে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে তাপ বিলাচ্ছে। এক গ্লাস ঠান্ডা পানি, না এক জগ ঠান্ডা শরবত খেতে পারলে শরীর-মন জুড়াত। ঘর ছেড়ে বাইরে এসে কলপাড়ের কাছাকাছি থাকা শরবতি লেবুগাছ থেকে একটা লেবু পাড়ে নবুচাঁদ। গাছটা ওর মায়ের হাতে লাগানো। মানুষটা চলে গিয়েও গাছগাছালির সবুজ রয়ে গেছে। মা থাকলে মা-ই শরবত বানিয়ে দিত। মায়ের হাতের শরবত মিঠা। মায়ের কথা মিঠা, মায়ের ছোঁয়া মিঠা। মা ওর শরীরে কোনও আঁচ লাগতে দিত না। কিছু হলেই উড়ে উড়ে চলে আসত। নবুচাঁদের বাবা হৈ হৈ করত, ‘পোলারে আঁচলের তলায় থুইয়া লাভ হইব না। আরও অকম্মা হইব তোমার পোলা, বিপদে আপদে মাথা তুইলা দাঁড়াইতে শিখব না।’ বাবার ঐ সাবধানবাণীতে ভয় জুড়ে থাকত, তাই নবুচাঁদের মা আরও ব্যতিব্যস্ত হয়ে ছেলের মাথার ওপরে আঁচল ছড়িয়ে রাখত।

বাবার ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি করে অকর্মাই হয়েছে নবুচাঁদ। নবুচাঁদের হাতে কাজ-কাম নেই। গত বছরও চাষের জমি ছিল। নিজে চাষ না করলেও আধি দিয়ে ফসলের ভাগ পেত। এখন আর আবাদি জমি নেই। বাপের রেখে যাওয়া জমি বেচে খেয়েছে।

আতহার জামালের সঙ্গে সাবরেজিস্ট্রি অফিসে বসে একেবারে টিপসই স্বাক্ষর দিয়ে পাকা দলিল করে এসেছে। আতহার জামালই সব ঠিক করে রেখেছিল। নবুচাঁদ আতহার জামালকে স্পষ্ট বলেছে, দাগ, খতিয়ান, মৌজা, চৌহদ্দি ওসব নবুচাঁদের বোঝার কাজ বাঁধেনি, দলিলগ্রহীতাই সব বুঝে নিক। ওর শুধু মাথা গোঁজার ভিটেটুকু থাকলেই হলো। আতহার জামালও বেইমানি করেনি। ছোটবেলা থেকে সে নবুচাঁদকে সাতকুড়ির মাটি, কাদায় গড়িয়ে বড় হতে দেখেছে। ভিটাটুকু বাদ দিয়ে ওর চাষের জমিটুকুই দলিলে তুলে নিয়েছে, নবুচাঁদকে টাকার পাই পাই হিসাব বুঝিয়ে দিয়ে আতহার জামাল আশ্বস্ত করেছে।

টাকা আর কী, হাতের ময়লা। হাতের তালু উপুড় করলেই ঝরঝর করে ঝরে যায়। নবুচাঁদের টাকাও ঝরে গেছে।

জমিজমা কেন বিক্রি করেছে নবুচাঁদ, গোলচেহারা অনেক চাপ দিলেও ও বলেনি। আসলে টাকা হাতে না থাকলে শরীরে ওম পায় না নবুচাঁদ। ইয়ার-দোস্তরা ডাকলে দু-চার পয়সা পকেট থেকে বের করতে না পারলে মানসম্মান ধূলিসাৎ হয়, ঐ মান ধরে রাখতেই জমি বেচার টাকায় ক মাস ফুটানি করেছে―এসব কথা বললে মুখ ভার করবে গোলচেহারা। এখন নবুচাঁদেরও মুখ ভার। কতদিন মোটা চালের ভাত খাওয়া যায়, পাইজাম চালের কেজিও এখন বায়ান্ন টাকা। তার ওপর শুধু ভাত তো আর খাওয়া যায় না। ভাত খেয়েও হয় না। ঠাঁট বজিয়ে রাখতে বাবুগিরি করা চাই। চাই নতুন পোশাক, জুতা, তেল-সাবানও।

বঁটি দিয়ে লেবু কাটতে গিয়ে ডান হাতের তর্জনীর অনেকটা কেটে ফেলেছে নবুচাঁদ। আঙুল কাটার পর শরীরের খরদাহ শরবত ছাড়াই জুড়িয়ে আসছে। শরবত খাওয়ার আর আগ্রহ পায় না ও। ঠান্ডা ভাত-তরকারি পাতে তুলে একেবারে রাতের খাওয়া সেরে নেয়। আজ আর ঘর থেকে বের হবে না। দোস্তরা কেউ ডাকতে এলেও বাইরে যাবে না। অবশ্য পুলিশ থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর থেকে ইয়ার-দোস্তদের কেউই ওর খোঁজ করেনি, হয়তো বুঝে গেছে নবুচাঁদের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে হবে। 

মাঝে ওর ঘর জমজমাট হয়ে উঠেছিল। চোলাই খাওয়ার জন্য নবুচাঁদের বাড়িটা বেছে নিয়েছিল নেংড়া শাজান। বিজন ভিটাবাড়ি, সাতকুড়ির মধ্যে এর চেয়ে সুবিধাজনক জায়গা আর হয় না। নেংড়া শাজান অবশ্য একা আসত না। দলে-বলে আসত। এক বোতল এক দমে সাবাড় করে বলত, নেশা হয় না। নারীশরীর ছাড়া নেশা জমে না। নবুচাঁদ ভয়ে ভয়ে এক দু গ্লাস খেত। অভ্যাস হওয়ার আগেই আসরটা ভেঙ্গে গেল। পুলিশি দাবড়ানি খেল নেংড়া শাজান।

অনেক দিন পর আজ একটা বোতল জোগাড় করেছে নবুচাঁদ। বেশি কসরত করতে হয় না এখন চোলাই জোগাড় করতে। আদিবাসী পাড়া থেকে অঢেল সাপ্লাই আসে। এই গ্রামের ইজাজুলও চোলাইয়ের ঠেক দিয়েছে। শুধু কি চোলাই, দু-একটা বিদেশি মাল হানিফের মুদি দোকানেই পাওয়া যায়। একটু বেশি টাকা লাগে এই যা। নবুচাঁদের পকেট হালকা, চোলাইই সই। সন্ধ্যার পর হানিফের দোকানে দাঁড়িয়ে একটু ইশারা করলেই হয়। গতকালই এনেছিল বোতলটা। খেতে মন টানেনি। আজ খাবে। নেংড়া শাজানের মতো এক দমে পুরো এক বোতল শেষ করবে।

বোতল হাতে নিয়ে উদাস নবুচাঁদ জানালার বাইরে দৃষ্টি গলিয়ে চাঁদ দেখার চেষ্টা করে। সামনে বেকায়দা দাঁড়িয়ে থাকা বুড়ো আমগাছটার জন্য নজর বাধাগ্রস্ত হয়। শরীরে শৈথিল্য আসে। কালই আতহার জামালকে বলে গাছটার একটা গতি করতে হবে। যতই ফুসলানোর চেষ্টা করুক আতহার জামাল, দশ হাজারের কমে ঐ গাছ ও ছাড়বে না। স্বাধীনতার বছরে লাগানো গাছ। অনেক মোটা বেড় গাছের। এই ভিটার ওপরে কত লাশ পড়ল। এই গাছটার তবু কিছু হলো না।

নবুচাঁদের জন্ম স্বাধীনতার অনেক পরে। এই গল্প ওর বাবার কাছ থেকে শোনা। নবুচাঁদের দাদা সোনাই চাঁদের নিজের হাতে লাগানো গাছ। যুদ্ধের সময় সাতকুড়ি গ্রামের সবাই যখন শরণার্থী হয়ে ভারতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিল তখন নবুচাঁদের অপরিণামদর্শী দাদা যুদ্ধে যাওয়া ছেলে রেহেল চাঁদের ফিরে আশার অপেক্ষায় এই ভিটাবাড়ি আঁকড়ে ধরেছিল। সেই সময়েরই কোনও দুর্বল মুহূর্তে বাড়ির সীমানায় আমগাছটা নিজের হাতে লাগিয়েছিল সে। যুদ্ধ থেকে ফিরেছিল রেহেল চাঁদ। ফিরে বাপ-মা, চাচা-চাচি, ভাইবোন কারও সন্ধান পায়নি। এমনকি এই ভিটার ওপরে পৈতৃক চিহ্ন হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়ি-ঘরের টিনের চাল, খুঁটি কিছুরই সন্ধান পায়নি। পুকুরঘেঁষা জায়গায় মোটা মোটা কাণ্ডের মেহগনি, সেগুনের মতো কাষ্ঠল গাছগুলো পর্যন্ত হাওয়া হয়ে গিয়েছিল। শুধু টিংটিংয়ে পাতি আমগাছটাই কী করে যেন টিকে ছিল। বাড়ির উপরে ঘটে যাওয়া হত্যাযজ্ঞ আর লুটপাটের সাক্ষী হয়ে থাকা সেই গাছই কালে কালে প্রকাণ্ড হয়েছে।

সহসা নবুচাঁদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। এই গাছ কাটা কী ঠিক হবে ? সোনাই চাঁদের অভিশাপ লাগবে না তো ? এমনিতেই সুরাইয়ার মৃত্যুর শাপ বয়ে বেড়াচ্ছে ও। এরপর কিছু হলে কী করে সামলাবে নবুচাঁদ ? ভাবনার দৌরাত্ম্যে নবুচাঁদের শিরায় শিরায় প্রবাহিত রক্তে ঝাঁকি লাগতে শুরু করে। বাড়ির অদূরে দাঁড়ানো শ্যাওড়া গাছের ঘন শাখা-প্রশাখা ভেদ করে হু হু করে ডেকে ওঠে অচেনা এক পাখি।

চোলাইয়ের বোতল কাত হয়ে আছে বিছানায়। শূন্য দৃষ্টিতে বোতলটার দিকে একবার তাকায় নবুচাঁদ, ঐ পানীয় আকর্ষণ করছে না আর। কান্না পাচ্ছে। মনে হচ্ছে কান্না ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট নাই ওর জীবনে। কিন্তু কার কাছে গিয়ে কাঁদবে ?

এই মুহূর্তে গোলচেহারা ওকে টানছে। নিজের ওপরে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে না নবুচাঁদ। এই টান যে কোন অনর্থ বয়ে আনবে তা জানে না নবুচাঁদ। তবু ও হুড়মুড়িয়ে ঐ বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হয়।

আচমকা মেঘ ডাকে। ভয়ে শিরদাঁড়া টান টান হয়ে যায় নবুচাঁদের। পানিকে ভয় পায় নবুচাঁদ। ভয় পায় বৃষ্টিকেও। এখন কি বৃষ্টি নামবে ? আকাশের ভাব বুঝতে না পেরে পিছিয়ে যায় নবুচাঁদ।

৮.

শরীরে যেন হাড় মড়মড় রোগ হয়েছে এমনভাবে গোলচেহারা বিছানায় দুমরায়, মুচরায়। পুরো শরীরটা ভেঙ্গে টুকরা টুকরা করতে মন চায় ওর। একবার ডানপাশ ফিরে শোয়, একবার বামপাশ ফিরে শোয়। বুক, পাঁজর, শিরদাঁড়া, হাত, পায়ের মাংসের ভাঁজের ভেতরে থাকা হাড়গোড় মড়মড় করে। সহ্য করতে না পেরে উঠে বসে গোলচেহারা। মাকে ডাকতে চায়। সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে ভুগে পুনরায় ও বিছানায় শুয়ে পড়ে। উথাল-পাথাল ভাবনা কমে না, উল্টো মাথার খুলির ভেতরে পাক খায় অলুক্ষণে সব কথা।

সারা রাত ঘুমায়নি গোলচেহারা। সুরাইয়া ঘুমিয়েছে, চিরদিনের মতো ঘুমিয়েছে, আর কখনও ওর ঘুম ভাঙবে না। গোলচেহারা বারবার ঘুম ভেঙে উঠেছে। জানালায় আছড়ে পড়া আলোর প্রখরতা দেখে বিছানায় আর শুয়ে থাকতে পারে না ও, উঠে পাকঘরে মায়ের সামনে এসে দাঁড়ায়। গুলবদন মোলায়েম স্বরে মেয়েকে ডাকে, ‘আয়, ভাত খা। নাহার রে ডাক।’ গোলনাহারকে ডাকতে হয় না, ভাতের ঘ্রাণ শুঁকে ও বোনের পিছু পিছু পাকঘরে পা রাখে।

গোলনাহারের শরীর ভারী হয়ে এসেছে। ক্ষুধাও বেড়েছে। এই ফাল্গুনে সাড়ে পাঁচ মাসে পড়েছে। কিন্তু গর্ভের স্ফীতি দেখে মনে হয়, শেষের দিকে। গেল সপ্তাহে মায়ের সঙ্গে সদরে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে এসেছে। গোলনাহারের মা বলে, খাটো শরীরের মানুষের পেটে জায়গা কম থাকে। ওর পেট তাই ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। ভাত কম খেলে ভালো। মিনমিনে স্বরে ডাক্তারকে সেই কথা বলতেই কড়া গলায় ডাক্তার বলেছিল, মায়ের পেটের জায়গার চিন্তা সৃষ্টিকর্তার, মানুষের না। সেই কথা শুনে এসে এখন তিন বেলা তৃপ্তিমতো ভাত খায় গোলনাহার। মেয়েকেও গুলবদন আর কিছু বলে না। শুধু মাঝে মধ্যে মনে করিয়ে দেয় ভাতের জোগাড়যন্ত কী করে হয়।

‘আতহারের বাড়ি ধান ভানানির কাম আছে। একলা পারি না। গোলচেহারা, তুই লগে লইস আইজ।’

মায়ের নরম স্বরে গোলচেহারা মাথা নাড়ে। গোলনাহার মুখ ভ’রে ভাত নিয়ে হাসে। গুলবদন ভ্রƒ কোঁচকায়।

‘হাসোস ক্যান। ভাত গলায় ঠেকব।’

‘হাসি ওঠে। অত ধান দিয়া আতহার কী করে ? কত্তগুলা গোলা ওর! ধান চাপা পইড়া মরব একদিন।’

‘ঐ ধান কি অয় একলা খায় ? বেচে।’

মায়ের উত্তর মনঃপুত হয় না গোলনাহারের, হাসিও বন্ধ হয় না। যেন ও ধানের গোলা উল্টে আতহার জামালের দেহ চাপা পড়ার দৃশ্যটা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে।

সকালের খাওয়াপর্ব শেষ করে বাসনকোসন ধুয়ে মায়ের সঙ্গে খানিকক্ষণ কোটাবাছার কাজ করে দুই বোন। পিঠ লেগে আসছে বলে গোলনাহার উঠে দাঁড়ায়। টান টান রোদের উত্তাপে বিপর্যস্ত গুলবদন ছড়ার বিলে গা ধুতে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়, গোলনাহারও হাঁসফাঁস করতে করতে মায়ের পিছু নেয়।

ঘরে ঢুকে গোলচেহারা চমকে যায়। সবাইকে আড়াল করে নবুচাঁদ কখন যেন ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। আগে কখনও এভাবে নবুচাঁদ ঘরে ঢোকেনি। গোলচেহারার বিস্ময় ভাব কাটতে সময় নেয় না। রাগী স্বরে জানতে চায়, ‘ঘরে ঢুকছো ক্যান ? সবাই বাড়িত আছে।’

‘নাই কেউ বাড়িত, আমি জানি। আর তুই তো জানোস আমার বিপদ। বিপদের দিনে তুই ছাড়া কে আছে আমার।’

বিপদের দৈর্ঘ্য-প্রস্থের বিবরণ দিতে থাকে নবুচাঁদ।

ময়নাতদন্তের পর আবু জাফর সুরাইয়ার লাশ ফেরত পেয়েছে। মেয়ের দাফনও সম্পন্ন করেছে। শোনা গেছে পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নেংড়া শাজান আর নবুচাঁদের নাম বলেছে আবু জাফর। হানিফের দোকানে চা খেতে গিয়ে এর- ওর মুখে ঘটনা শুনে নবুচাঁদের কলিজার পানি শুকিয়ে গেছে। ও এক দৌড় দিয়ে রাস্তায় নেমেছে। তারপর আরেক দৌড় দিয়ে গোলচেহারার বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়িয়েছে। নবুচাঁদ ভাবতেও পারেনি সুরাইয়ার জন্য ওকে এত দুর্ভোগ পোহাতে হবে। নেংড়া শাজান আর কানু গা ঢাকা দিয়েছে। বিপদের আশঙ্কায় নবুচাঁদেরও ঘরে থাকার উপায় নেই। তাই ও গোলচেহারার কাছে এসেছে।

নবুচাঁদকে দেখে ভয় পেয়ে গেছে গোলচেহারা। মা দেখলে কী উপায় হবে ভেবে কণ্ঠনালি শুকিয়ে যাচ্ছে। কথা ভুলে ড্যাবডেবিয়ে প্রেমিকের দিকে তাকিয়ে থাকে ও। বোঝে ঐ চোখে-মুখে আগের মতো আর চাঁদপনা আলো নেই। আলোহীন ভাসা ভাসা চোখ দুটিতে অনিদ্রার ছাপ। সরু কপালের ওপরে এক গোছা চুল লেপটে আছে। ঘামে ভেজা চুল দেখে বোঝা যাচ্ছে পথ পাড়ি দিতে দৌড়েছে সে। না কামানো দাড়ি-গোঁফের ওপরেও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। টের পায় গোলচেহারা ঘামে ভেজা মানুষটার জন্য আগের মতো মায়া উতলে উঠছে না। বরং ভ্রƒ কুঁচকে যাচ্ছে।

প্রথম যেদিন গোলচেহারাকে ছুঁয়েছিল নবুচাঁদ সেদিন ভয়ে কাঁপছিল গোলচেহারা। উঠানে গমভাঙ্গা খুঁটতে থাকা ঝুঁটিওয়ালা বাদামি সাদা কবুতরটাকে একটা কুচকুচে কালো কাক এসে ঠোকরাচ্ছিল, তবু ছুটে যেতে পারছিল না। নিজেকে ছাড়াতে চাচ্ছিল, আবার চাচ্ছিল টিনের দেওয়ালে ঠেকে থাকা পিঠ আরও বাধা পাক, নবুচাঁদের শক্তপোক্ত দেহের ভারে চাপা পড়ে যাক ওর দেহ। একটা সময়ে অধৈর্য নবুচাঁদের ঠোঁটজোড়া ওর ঘাড়ে, গলায় ওঠানামা করতে শুরু করেছিল। ঘন ঘন শ্বাস ফেলছিল গোলচেহারা, নবুচাঁদের শ্বাস হয়ে উঠছিল উষ্ণ আর ভারী। এরপর নবুচাঁদের হাতজোড়া সক্রিয় হয়ে ওপরের দিকে উঠে আসতেই হুঁশ ফিরেছিল গোলচেহারার, মাথা নিচু করে ঝুপ করে বসে পড়ে নিজেকে আলাদা করে ফেলেছিল ও।

আজ কেন দৃশ্যটা মনে পড়ছে, মনে পড়লেই বা কী! কাবু হওয়ার মতো বয়স তো পার হয়ে এসেছে গোলচেহারা, সেই বোধ মগজে টোকা দিতেই জিভের আড় ভেঙে ও বলে, ‘তোমার বিপদ তো আমার কী ?’ 

‘কী কছ ?’

দুর্ভাবনাগ্রস্ত নবুচাঁদ ছুটে এসে প্রেমিকার হাত চেপে ধরে। গোলচেহারা নিজেকে ছাড়িয়ে দূরে সরে দাঁড়ায়। বাকরুদ্ধ নবুচাঁদ এবার ঘাড় ইশারা করে ওকে কাছে ডাকে।

এই ইশারা গোলচেহারার প্রিয়, তবু ও অনড় দাঁড়িয়ে থাকে। ওর মনে পড়ে যায়, সুরাইয়ার মৃত্যুর আগের দিনও দেখা হয়েছিল দুজনের, ঘাই মেরে মেরে গোলচেহারার বিবশ দেহে লেপ্টে যেতে চাওয়া নবুচাঁদের পকেট থেকে চৌকো একটা প্যাকেট পড়ে গিয়েছিল। প্যাকেটের গায়ে উদোম নর-নারীর ছবি দেখে নবুচাঁদকে ধাক্কা মেরে এক ছুটে বাড়ি ফিরে গিয়েছিল গোলচেহারা। ঘরে দোর দিয়ে দম নিয়েছিল। এরপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের রতিজনিত অতৃপ্ত চেহারার নগ্নতা দেখে ও তড়িঘড়ি কাপড়চাপা দিয়েছিল আয়নায়।

দৃশ্যটা মনে হতেই ফের গোলচেহারার দেহ-মনে অস্বস্তি জাগে। স্বস্তি পেতে এদিকে-সেদিকে তাকায়। দেখে নবুচাঁদ ইশারা করছে। এবার আর ইশারার অর্থ খোঁজে না গোলচেহারা। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবে। কী ভাবে ও কে জানে। হয়তো ভাবে প্রেমিককে আয়নার সামনে দাঁড় না করানো পর্যন্ত যাবে না কোথাও, তার কাছে কোনও প্রশ্নের উত্তর জানতেও চাইবে না।

ছুটে এসে প্রেমিকাকে পেছন দিয়ে জড়িয়ে ধরে নবুচাঁদ। ফোঁসফোঁস করে শ্বাসের টান তুলে যেই মুহূর্তে ও গোলচেহারার সুডৌল স্তনজোড়া চেপে ধরতে যাবে ঠিক সেই মুহূর্তে গোলচেহারা চিৎকার করে ওঠে, ‘ছাড়ো… আমারে ছাড়ো। আমি কিন্তু…।’

ওকে ছাড়ে না নবুচাঁদ। আরও শক্ত করে চেপে ধরে গোঙ্গাতে থাকে, ‘পুলিশ নাকি আমারে খুঁজতেছে। বিশ্বাস কর আমি কিছু করি নাই। আমি শুধু সুরাইয়ারে পইড়া  থাকতে দেখছি।’ ঐ দেখার মধ্যেও যে পাপ ছিল তা বলে না নবুচাঁদ। না বললেও গোলচেহারা এবার স্মিত হেসে বিশ্বাস শব্দের মাহাত্ম্য খোঁজে। কী করবে গোলচেহারা তা জানার আগেই ওকে ছেড়ে দিয়ে নবুচাঁদ খানিকটা দূরে সরে দাঁড়ায়।

‘তুই এমন করতাছোস ক্যান আমার লগে। আমি কী করছি ?’

‘কী করছো সেটা আমি তোমারে ভাইঙ্গা বলমু ?’

গোলচেহারার মুখ-চোখে স্পষ্ট ভেসে থাকা বিরক্তি পরিমাপ করে বিব্রত নবুচাঁদ ফ্যাঁসফ্যাঁসে স্বরে বলে, ‘আমি কিছু করি নাই। শুধু আমার গামছাটা দিয়া সুরাইয়ার…’ নবুচাঁদের কথা থামিয়ে দিয়ে গোলচেহারা এবার জোর গলায় বলে ওঠে, ‘ওইসব শুইনা লাভ নাই। আমি সব জানি। কোনও সাফাই গাইয়া লাভ নাই। আমি সব জানি। আমার আয়নাও সব জানে।’

কী জানে ঐ আয়না তা নিয়ে কোনও কৌতূহল জাগে না নবুচাঁদের ভেতরে। ওকে অবাক করে ভয় জাগে মনে। আয়নার সামনে দাঁড়াতে চায় না নবুচাঁদ। তবু সাহস করে বলে, ‘কী জানে ?’

‘কী জানে!’

‘হ্যাঁ, বল কী জানে ? দেখা তোর আয়নার খেল।’ এবার ভয় বা কৌতূহল নেই কণ্ঠে। বিদ্রƒপে ফেটে পড়ে নবুচাঁদ।

এই আহ্বানের অপেক্ষাতেই ছিল কি না গোলচেহারা কে জানে। দুই পা এগিয়ে গিয়ে ও ঘরের দক্ষিণপাশের জানালার ডান দিকের দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখা আয়নার সামনে দাঁড়ায়। আয়নার ওপরে রাখা পর্দাটা একটানে সরিয়ে গোলচেহারা আয়নার ওপরে হা করে বাষ্প ছাড়ে, তারপর একটা পরিষ্কার ন্যাকড়া দিয়ে আয়নাটা মোছে। আয়নাটা পুরোপুরি পরিষ্কার না হতেই গোলচেহারাকে ডিঙিয়ে স্বেচ্ছায় আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায় নবুচাঁদ। তারপর আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে বজ্রাহত মানুষের মতো থির হয়ে যায়। যখন সম্বিত ফেরে তখনই বুঝে যায়, জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা করে ফেলেছে। ভুল শুধরানোর জন্য সময় পায় না নবুচাঁদ, চেষ্টাও করে না। গোলচেহারার ঘর থেকে বেরিয়ে রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াতে দৌড়াতে ও নিজের ভিটার ওপরে এসে দাঁড়ায়।

৯.

একটা স্থিরচিত্রের মতো জীবন মাঝেমধ্যে স্থির হয়ে থাকে, কোনও গতি থাকে না। হঠাৎ অস্থির হয়ে ওঠে গতিহীন চিত্রটা, তারপর এত দ্রুত পাল্টাতে থাকে দৃশ্যপট যে মানুষ তাল মেলাতে পারে না। আর এই তাল মেলানোর জন্য পেস্তা বেগম তো একজন অক্ষম মানুষ। না, এখনও চলাফেরার মতো শক্তি আছে তার, শুধু চোখ দুটোই হঠাৎ হঠাৎ বিগড়ে যায় আর বিভা রানির দেখা পেলে মনও অস্থির হয়ে ওঠে।

পেস্তা বেগম স্বীকার করেন, বিভা রানি কষ্ট করেছে। একটা পুরো জীবন জ¦ালিয়ে-পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে এই সাতকুড়ির জন্য। সাতকুড়ির জন্যই তো, এই সাতকুড়িই তো ওদের দেশ, ওদের দুনিয়া। তো যুদ্ধের বছর কে না কষ্ট করেছে, পেস্তা বেগমও কি কম কষ্ট করেছেন ? কিন্তু ওসব তর্কে কে যাবে বিভা রানির সঙ্গে ? অবুঝ আর নির্বোধ এক নারী, নিজের দুঃখ ছাড়া কিছুই বোঝে না। বিভা রানির ভয়ে তাই ভোর থেকে নিজের ঘর ছেড়ে চালির একপাশে বসে আছেন পেস্তা বেগম। তার চিবুক বুকের সঙ্গে লেগে আছে। আফরুজা, হুমায়রা আর জুয়াইরাহর সঙ্গে হাত লাগিয়ে এখন তিনি পাট শাক বাছতে বাছতে ছেলে বউ আর ছেলের বাদানুবাদ শুনছেন। তিন বোনের অবশ্য বাপ-মায়ের দিকে কোনও মনোযোগ নেই। তারা মাঝেমধ্যে চোখে-মুখে একে-অন্যের সঙ্গে ইশারায় কথা বলছে আর হাসিতে ভেঙ্গে পড়ছে। মেয়েদের হাসির শব্দ কানে গেলেই খেঁকিয়ে উঠছে উলফত আরা।

‘শরীরে রঙ লাগছে না ? বড়টার মতো ঠাপানি খাইয়া মরলে শান্তি হইব! কত কইছি, যখন তখন বাইরে যাইস না মা, অত হাসিস না, রঙ করিস না অত।’

পেস্তা বেগম অসহিষ্ণু হয়ে ওঠেন, বিভা রানির ওপরে ঘনিয়ে ওঠা রাগ ঝাড়েন উলফত আরার ওপরে।

‘বয়সের রঙ লাগলে কী দোষ ? যেই শুওরের বাচ্চা আকাম করছে ওর দোষ।’

‘হ, আপনার আসকারা পাইয়া সব মাথায় উঠছে। নিজের ছেলের অবস্থা দেখছেন ?’

আবু জাফর তেড়ে আসে, ‘কী দেখবে রে মাগি ?’

মুহূর্তের মধ্যে আগুন দিগি¦দিক ছুটতে শুরু করে।

‘মুখ খারাপ করবেন না, মুখ আমরাও খারাপ করতে জানি।’

‘কর দেখি, একেবারে চোপাটা ভাইঙ্গা দিমু না!’

‘দ্যান তো দেখি দ্যান, দেখি কে কার চোপা ভাঙে।’ বলতে বলতে নিজের গাল স্বামীর দিকে এগিয়ে দেয় উলফত আরা। আবু জাফর সংকুচিত হয়ে যায়।

সুরাইয়ার মৃত্যুর পর এই সংসারে কাজিয়া-ফ্যাসাদ লেগেই আছে। আগে স্বামীর সঙ্গে এত মুখ করত না উলফত আরা। আর এখন কথায় কথায় প্রমত্ত জলরাশির মতো ফুলে ওঠে। আবু জাফরও তাই। হবেই বা না কেন। ধানের শীষের বৃদ্ধি হচ্ছে না। সবুজ গোছা অচিরেই চিটা ধানে পরিণত হবে। আসমানের ভাব দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সামনে পেটে পাথর বাঁধতে হবে। এর ভেতরে মেয়ের মামলা চালাতে কোর্টে দৌড়াতে হয়। সরকারি উকিলে কাজ হয় না বলে মেম্বার মোজাফ্ফর আর আতহার জামাল মিলে এই গ্রামেরই লতিফ উকিলকে ঠিক করে দিয়েছিল। লতিফ উকিল সদরে থাকে, বেশিদিন হয়নি সে উকিল হয়েছে। বড় উকিল না হলে কি আর মামলায় ভালো ফল পাওয়া যায় ? ও কথা আবু জাফরও বোঝে, সরকারি উকিল, কম পয়সার উকিল গা করে না, শুনানির সময় ঝিমিয়ে থাকে। মামলার ভবিষ্যৎ তাই ভালো না। এখন অবশ্য মামলা বা মেয়ের জন্য শোক করে না আবু জাফর, ধানের জন্য শোক করে, বৃষ্টির জন্য হাহাকার করে। এই হাহাকার ক্রমে ওকে খিটখিটে করে তুলছে। সবই বোঝেন পেস্তা বেগম। কিন্তু মেয়ের শোকে উন্মাদিনী উলফত আরা কিছুই বুঝতে চান না। স্বামীর সঙ্গে খেঁকিয়ে ওঠে, ‘নেংড়া শাজানের সঙ্গে কী কথা আপনার ? ভাবছেন কিছু দেহি না আমি, কিছু বুঝি না ?’

নাম নিতে না নিতেই উঠানে নেংড়া শাজান এসে দাঁড়ায়।

‘গ্রামে কিছু ঘটলেই আমার নাম উঠে ক্যান কাকা ? কী পাপ করছি আমি ? একটা পা লুলা, সেইটাই কি আমার পাপ ?’

শুধু ঐ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নেংড়া পা নিয়ে বাড়ি পর্যন্ত এসেছে শাজান তা বিশ্বাস করতে চায় না আবু জাফর কিংবা উলফত আরা। তাই দুজনই ফ্যালফ্যালিয়ে নেংড়া শাজানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

হাঁটুর নিচ থেকে বাঁকা হয়ে থাকা বাম পা-টা ডান হাত দিয়ে কায়দা করে ধরে উঠানে দাঁড়িয়ে থাকে শাজান। জামিনে আছে সে, ঐ পা নিয়ে ঢাকায় গিয়ে হাইকোর্ট করে জামিন নিয়েছে। এখন ফয়সালা করতে আবু জাফরের বাড়িতে চলে এসেছে। ওর পেছনে দাঁড়িয়ে আছে ভ্যানওয়ালা কানু। কানুকেও আসামি করেছে পুলিশ। দীর্ঘদিন হাজত খেটে কানুও জামিন পেয়েছে। কানুর পেটানো শরীর শিথিল হয়ে এসেছে। শোনা যায়, নেশাপানি ধরেছে কানু, কাজে মন নেই, দুবেলা বউ পিটানোতে মন দিয়েছে। কানুর বউও কম যায় না, মার খেলে মার ফেরতও দেয়। বিপর্যস্ত কানুর এখন নেংড়া শাজানের পিছু ঘোরা ছাড়া পথ নেই।

নেংড়া শাজান আর কিছু বলছে না, ওর হয়ে কানুই আবু জাফরকে ইশারা করে, ‘ও কাকা বাইরে বাইর হও দিকি। শাজান ভাইয়ের জরুরি কথা আছে।’

মুখ না তুললেও পেস্তা বেগম বুঝে গেছেন কে এসেছে, এবার তিনি চিৎকার করে ওঠেন, ‘কে আইলো রে… মিলিটারি আইলো ? কীসের কথা দেশদ্রোহীদের লগে…’ দাদির চিৎকার শুনে তিন বোন হাসি থামিয়ে হুড়মুড়িয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। থতমত খেয়ে নেংড়া শাজান পা টেনে দুই কদম পিছিয়ে যায়। আবু জাফর ধীর পায়ে হেঁটে ওর সামনে দাঁড়িয়ে বলে, ‘বাড়িত আসছোস ক্যান ?’

এত প্রশ্ন প্রশ্ন খেলা ভালো লাগে না নেংড়া শাজানের, সে চাপা স্বরে বলে, ‘বাইরে আইবেন কাকা ? না আমি চইলা যামু ?’

এতক্ষণে ওর দৃষ্টির উগ্রতা লক্ষ করে আবু জাফর। পোষ মানা বিড়ালের মতো নেংড়া শাজানের পিছু পিছু সে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যায়। উলফত আরাও স্বামীর পিছু পিছু ছোটে।

১০.

আয়না যেই দৃশ্য দেখাচ্ছে তা সহ্য করা গোলনেহারের পক্ষে সম্ভব হয় না। ও চিৎকার করে গোলচেহারাকে ডাকে। গোলচেহারা পাকঘরে ভাত খেতে বসেছিল। সুরাইয়ার মৃত্যুর পর খাওয়ার রুচি উধাও হয়ে গেছে, তবু মায়ের ডাকচিৎকার শুনে ও যখন দুই মুঠো ভাত নিয়ে সবে গোলসা মাছের ট্যালট্যালা ঝোলের সঙ্গে মাখিয়েছে, মুখেও তোলেনি, ঠিক তখনই বোনের চিৎকার কানে এসেছে। হতচকিত গোলচেহারা ভাতের থালা মাটিতে রেখে ছুটেছে। ঘরে ঢুকে অবশ্য গোলনাহারের হাল দেখে গোলচেহারার উৎকণ্ঠাভরা চেহারায় ক্রোধ ছড়িয়ে পড়েছে।

গোলনাহার মায়ের মতোই ঠোঁটকাটা, স্বভাবেও অস্থির ধরনের। গোলচেহারা ওর ঠিক উল্টো। দুই বোনে ঠিকঠাক বনে না। তবু বোনের ঘরে অবাধ যাতায়াতের সুযোগে আজ আয়নাটা গোলনাহারের চোখে পড়ে গেছে। সেদিন নবুচাঁদ ওভাবে চলে যাওয়ার পর ফের আয়নাটা ঝোলায় ঢুকিয়ে রেখেছিল গোলচেহারা। সকালে ঝোলা থেকে বের করে একবার মুছেছে। বেখেয়ালে আয়নাটা চৌকির ওপরে রেখে ভাত খেতে গেছে গোলচেহারা। আর এদিকে আয়নাটা দেখামাত্র নিজের সৌন্দর্য পরখ করতে চেয়েছে গোলনাহার। আয়নার আশ্চর্য ক্ষমতার কথা অজানাই ছিল ওর। বেঢপ শরীরের কারণে আজকাল আয়নার সামনে দাঁড়ানোর ইচ্ছেই হতো না। একটু আগে নিজেকে দেখতে গিয়ে ঘটনাটা টের পেয়ে গেছে গোলনাহার। সেই সঙ্গে নিজের মুখ-চোখের বদলে পেটের ভেতরের ঘুমন্ত শিশুর জলে ডোবা দেহটা আয়নায় স্পষ্ট হয়ে উঠতে দেখে আতংকের বদলে আনন্দে বিহ্বল হয়ে পড়েছে।

‘আমার আয়নায় হাত দিছোস ক্যান তুই ?’

স্বভাববিরুদ্ধ স্বরে চিৎকার করে ওঠে গোলচেহারা।

আহ্লাদি স্বরে গোলনাহার বলে ওঠে, ‘এইটা জাদুর আয়না গোলু, কী জাদু যে দেখাইতাছে!’

গোলনাহার বোনের মুখের অভিব্যক্তি পরিমাপ করার মতো অবস্থায় নেই। খুশিতে ও আত্মহারা হয়ে আছে। আশ্চর্য আয়না ওকে ওর গর্ভের শিশুকে দেখাচ্ছে। ওরই পেটে পবিত্র জলে চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে আছে ঐ শিশু। শিশুটির চুল ভেজা ভেজা, আঠালো। চোখ, নাক, ঠোঁট, গাল, কপাল সব মাখনের মতো মসৃণ, কোমল। চাইলেই বুঝি ওকে কোলে তুলে নেওয়া যাবে। কিন্তু গোলনাহার নিজেকে সংবরণ করে, হাত বাড়ায় না। মা তো, বুঝে গেছে যেন হাত ছোঁয়ালেই শিশুটি কেঁদে উঠবে। কাঁদাবে না ও, মা হয়ে গোলনাহার কিছুতেই মানিককে কাঁদাবে না।

গোলচেহারার শরীরে হঠাৎ শক্তি ফিরে আসে। ও ছুটে গিয়ে আয়নার ওপরের পর্দা টেনে দেয়।

পরের দিন গোলনাহারকে দেখে বাড়ির সবাই অবাকই হয়। সবাই বলতে এই বাড়িতে তো গোলনাহার বাদে মানুষই দুজন, গুলবদন আর গোলচেহারা। গুলবদন আড়চোখে তাকিয়ে দেখে গর্ভের সন্তানের ভালোমন্দ নিয়ে মেয়ে হঠাৎ করেই যেন বিচলিত হয়ে উঠেছে। মেয়ের হড়বড়ানি ভাবও কমে এসেছে। ধীরে হাঁটছে ও, ধীরে বসছে, হাওয়াই বরং গোলনাহারের ভারী শরীরকে টেক্কা দিতে চাইছে।

স্বামীর ভাত খেতে পারেনি গোলনাহার। স্বামী নামের পুরুষের কারণে সব পুরুষকেই ভয় পেত ও। আবার ঐ পুরুষের কারণেই ওর গর্ভসঞ্চার হয়েছে। কিন্তু সেই পুরুষ কী ওর স্বামী না অন্য কেউ, সেই গোমর ফাঁস করেনি গোলনাহার। বিয়ের আগে বোনের সঙ্গে আত্মায় আত্মায় মিল ছিল ওর। কিন্তু নাইওর আসার দিনগুলোতে বোনের কাছে নিজেকে ভাঙ্গেনি গোলনাহার। জানায়নি স্বামী সঙ্গমে কোনওদিনও সুখ পায়নি। একটা দানবের নিচে অনুভূতিহীন শুয়ে থাকা ছাড়া রতিক্রিয়ায় কোনও ভূমিকাই ছিল না ওর। একতরফা স্পর্শের আগ্রাসনে কোনও উন্মত্ততাও জাগতো না শরীরে। ওদিকে ব্যথা পেয়ে আহ করে উঠলে স্বামী নামের পুরুষটা সঙ্গিনীর সুখলাভের বহিঃপ্রকাশ ভেবে আরও আগ্রাসী হয়ে উঠত। তাই দাঁতে দাঁত চেপে শব্দহীন গোলনাহার বিছানায় পড়ে থাকত। বেশিদিন চাপা দিয়ে রাখতে পারেনি ব্যথার শব্দ, অভ্যস্তও হতে পারেনি ভালোবাসাহীন দাম্পত্যে। এজন্য খুব বেশি কসরত করতে হয়নি ওকে। একদিন বিহানবেলা দাঁতে মাজন দিতে দিতে বমির বেগ উঠলে যখন কলপাড়ে ছুটেছিল তখনই ওর শাশুড়ির অভিজ্ঞ চোখ বুঝে গিয়েছিল, গোলনাহার পোয়াতি। কিন্তু এই সন্তান কার ? তা না জানলেও নিজের অক্ষমতার কথা জানত বলে ঐদিনই ওর স্বামী ওর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল।  

লোকে বলে ওর আটকুঁড়া স্বামী বছর বছর বউ তাড়ায়। গোলনাহারের পেটে বাচ্চা আসার খবর শুনে ‘বারোভাতারি মাগী’ বলে চুলের মুঠি ধরে ওকেও তাড়িয়েছে। নিজের সংসার ছেড়ে মেয়ে ঘাড়ে এসে পড়ায় গুলবদন এতদিন বিরক্তই ছিল। আজ মেয়ের ভাব দেখে খুশি হয়ে ওঠে সে, এতদিনে মেয়ের সুমতি হয়েছে, সন্তানের আকাক্সক্ষা মেয়েকে বুঝদার করেছে।

গুলবদনের স্বস্তি বেশিক্ষণ থাকে না। দুপুরের দিকে দুই বোনকে চুলোচুলি, ধস্তাধস্তি করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। ওদের কাজিয়া-ফ্যাসাদের সারমর্ম জানতে মিনিট দশ সময় লাগে গুলবদনের। গোলচেহারাকে না জিজ্ঞাসা করে আজও গোলনাহার ওর আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। গতকালের ঘটনার আকস্মিকতায় গোলনাহার জানতেও পারেনি ওর গর্ভের সন্তানটি মেয়ে না ছেলে। রাতে বোনের কাছে আবদারটুকু জানাতেই খেঁকিয়ে উঠেছিল গোলচেহারা। আজ তাই নিজেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পর্দায় হাত রেখেছিল গোলনাহার কিন্তু আয়নার পর্দা সরানোর আগেই গোলচেহারা বোনকে দেখে ফেলেছে এরপর ছুটে গিয়ে ওর গালে চড় মেরেছে। এরপর গোলনাহারও তেড়ে গেছে বোনের দিকে। গোলচেহারা কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না।

ছোট মেয়ের ক্রুদ্ধ চেহারা দেখে গুলবদনও বোকা বনে গেছে। আগুন জ¦লছে গোলচেহারার চোখে। আঙুল তুলে ও এখনও বোনকে শাসাচ্ছে।

‘খবরদার তুই আমার আয়নায় হাত দিবি না।’

‘ক্যান হাত দিমু না। ঐটা আমার আব্বার জিনিস, তোর না। আমি একশবার হাত দিমু, একশোবার হাত দিমু।’

ঘটনাপ্রবাহের ভেতরে হঠাৎ স্বামীর কথা এসে পড়ায় বিচলিত গুলবদন উঠানের ওপরে বসে পড়ে। তারপর রাজ্যের শোক-দুঃখের কথা মনে করতে করতে হাত-পা ছড়িয়ে বিলাপ করতে থাকে।

গোলনাহারকে গালিগালাজ করতে ছাড়ে না গুলবদন।

‘কী একটা দুরমুশা জন্ম দিছি। যেই দিক দিয়া যায়, ভাইঙা চুইড়া সব শ্যাষ করে।’

গোলনাহারের হাসির ব্যারাম। বোনের সঙ্গে ঝগড়া পর্ব শেষ করে সে আঙুলে লেগে থাকা বড়ইয়ের আচার চেটে চেটে খায় আর মায়ের দিকে তাকিয়ে শব্দহীন হাসে। ঐ হাসি দেখে রাগে গুলবদনের শরীর কাঁপে। বিষতিতা নিঙরানো জিহ্বা, ঠোঁট সমানে চলে তার।

‘হাস, হাস বেশি কইরা হাস। কান্দন যহন শুরু হইবো তহন কোনও কূলকিনারা পাবি না। কাইন্দা কাইন্দা নিজে ডুববি, আমারেও ডুবাইবি।’

গোলনাহার ভারী শরীর বাঁকা করে দাঁড়িয়ে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হাসে।

‘আমি তো ডুইবা আছি গো মা…।’

১১.

দেখতে দেখতে গোলচেহারার আয়নার কথা গ্রামের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এর নেপথ্যে গোলনাহারের ভূমিকা আছে জেনেও গোলচেহারা চুপ করে থাকে। গোলনাহার যে নিজের ঢাউস পেটের মতো কোনও কথাই গোপন রাখতে পারে না তা ওর চেয়ে ভালো আর কে জানে। সে নিজের কথা পেটের ভেতরে গচ্ছিত রাখলেও আশৈশব ‘আল্লাহর কিরা… তোরেই বলতেছি আর কাউরে বলিস না কিন্তু’ বলে বোনকে শাসিয়ে একে তাকে অন্যের গোপন কথাসকল বলে বেড়ায়। এই দফাও এর ব্যতিক্রম হয়নি। যেদিন প্রথম গোলনাহার আয়নায় নিজেকে দেখেছে সেদিন সন্ধ্যার মধ্যে খবরটা এ-কান সে-কান হয়ে দশ বাড়ি গিয়ে পৌঁছেছে।

দু-তিন দিনের মাথায় টেপি-ঝেপির মা, মরিয়ম, মুন্নুজান, রোমেলাসহ গ্রামের দু-চারজন পুরুষও এসে দাঁড়ায় এই বাড়ির দুয়ারে। কিন্তু উদ্ধত গোলচেহারার একই কথা, কাউকে আলাদা করে নয়, আয়নার জাদু সে জনসম্মুখেই দেখাবে।

খবরটা ছড়িয়ে গেলে জাদুকর মোহন গুম হওয়ার ঠিক ছয় মাস পর সাতকুড়ি গ্রামের মানুষগুলো আবার নড়েচড়ে বসে। পাড়াগাঁ অমন ঝিমিয়ে পড়লে দশ গ্রামের মধ্যে সাতকুড়ির উঁচু ভাবটি যেন আর থাকে না। ভাগ্যের ফেরে হারানো সেই গৌরব ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব পড়ে জাদুকর মোহনের মেয়ে গোলচেহারার ওপর।

গোলচেহারার আয়নাকে উদ্দেশ্য করে যে ঘটনা ঘটার আভাস পাওয়া যায় তা সকলের নিস্তরঙ্গ জীবনে রীতিমতো চমক বয়ে আনে। উত্তেজনার প্রাবল্যে তারা সুরাইয়ার মৃত্যুকে ঘিরে ঘনীভূত হয়ে ওঠা শোককে পর্যন্ত ভুলে যেতে থাকে।

গোলচেহারাও কম যায় না। বাহারি লেইস লাগানো পেটিকোট, বুকের ভাঁজ অব্দি নামানো গলা আর কুঁচিওয়ালা হাতার ব্লাউজের সঙ্গে কায়দা করে শাড়ি পরে ও ছুমন্তরের যন্ত্রপাতি দিয়ে ঝোলা গোছায়। পিতলের কাঠিতে বাঁধা পালকে নতুন করে রঙ লাগায়। তারপর শাড়ির ফুলেল জমিনে মাংসবহুল নিতম্ব মুড়িয়ে দেহে অসরল ঢেউ তুলে ধলাই মাঠে জাদু দেখানোর প্রস্তুতি নেয়।

মোহন জাদুকরের মেয়ে ভানুমতির খেল দেখাবে খবরটা সাতকুড়ি গ্রামের কোনায় কোনায় রটে যাওয়ার পর গ্রামবাসীদের চেহারা উত্তেজনায় চকচক করে উঠলেও নবুচাঁদকে বিমর্ষ চেহারায় ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। এর নেপথ্যে কোনও গল্প আছে কি না তার খোঁজ নিতে হলে কদিন আগের সেই দুপুরের দিকে ফিরে যেতে হবে, যেদিন নবুচাঁদ প্রথম গোলচেহারার আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল কিন্তু সে কী দেখেছে তা কেউ জানতে পারেনি।

এই মুহূর্তে সাতকুড়ি গ্রামের ধলাই মাঠে জাদু দেখাতে এসেছে গোলচেহারা। নবুচাঁদকে আশেপাশে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। আয়না না প্রেমিকা―কার মুখোমুখি হতে চায় না সে সেই প্রশ্নের উত্তর ভালো করেই জানে গোলচেহারা। তাই ভিড়ের মধ্যে নবুচাঁদকে না খুঁজে মুখে হাসির পাতলা পর্দা ঝুলিয়ে রেখে ও দুহাতে কায়দা করে তালি বাজায়, ‘হৈ হৈ হৈ হৈ… শুরু হবে ভানুমতির খেল নয়, গোলচেহারার খেল… হৈ হৈ… দ্যাখো দ্যাখো গোলচেহারার আয়নার খেল।’

কে এগিয়ে আসবে প্রথমে, কে দাঁড়াবে আয়নার সামনে তা নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়। গোলচেহারাই একজনকে সুযোগ করে দেয়, হাত বাড়িয়ে ডাকে, ‘ও ভাই, আপনি আসেন…।’ ডাক পেয়ে নেংড়া শাজান খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। হাতে থাকা পিতলের কাঠি নাড়িয়ে অনুচ্চস্বরে মন্ত্রপাঠ করতে করতে গোলচেহারা ধীরে ধীরে আয়নার ঝালর সরিয়ে দেয়। এরপর সত্যি সত্যি শুরু হয়ে যায় গোলচেহারার আয়নার খেল।

মুখের বহিরাবরণ ভেদ করে ক্রমশ স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হতে থাকে নেংড়া শাজানের অন্তর্গত চেহারা। পালাবে কী না, ধরা পড়ে যাবে কী না―সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পৌঁছাতেই যা হওয়ার তা হয়ে যায়। আয়নায় স্বচ্ছ প্রতিচ্ছবি হয়ে নেংড়া শাজানের চৌকো মুখের প্রকৃত ছিরিছাঁদ ফুটে উঠতে থাকে। ওর নিচু চোখের দৃষ্টিও বাদ যায় না। দৃষ্টির নেপথ্যে লুকানো আঁঠালো তরল আয়নায় ভেসে ওঠা চোখের গহ্বরে থকথক করে। তড়িতাহত নেংড়া শাজান ঝুলন্ত পা নিয়ে সরে যাওয়ার আগেই ঐ তরল পিচকারির মতো ছুটে এসে লাগে শরীরে। নেংড়া শাজানের শরীরে আসলে কিছুই লাগে না, শুধু ঘিনঘিনে একটা অনুভব ওর ত্বকে শিউরানি তোলে। পাশাপাশি দাঁড়ানো গোলচেহারা দেখে, আয়নার ভেতরের শরীরটি নড়ছে, সূক্ষ্মভাবে কাঁপতে কাঁপতে পাল্টে যাচ্ছে তার সামগ্রিক অবয়ব।

আয়নায় ভেসে ওঠা পুরুষের মুখটি সুচাল হয়ে ধীরে ধীরে শিশ্নের আদল নিচ্ছে। স্বচ্ছ কাচে প্রতিফলিত সেই অঙ্গের রূপ বড় বিকট দেখাচ্ছে। এ পাশে নেংড়া শাজানের শিটকা লাগা মুখটি টিনের পাতের মতো দুলছে।

আচমকা আয়নায় প্রতিফলিত সব ছবি ধুয়েমুছে পরিষ্কার হয়ে যায়। বিস্মিত নেংড়া শাজান দেখে আয়নার ভেতরে সুরাইয়ার শুভ্র মুখটি ক্রমে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠছে। কিছু যেন বলতে চাইছে সুরাইয়া। কী বলতে চাইছে ও, তা আর কেউ না বুঝলেও নেংড়া শাজান বুঝে যায়। ঠাটা পড়া মানুষের মতো দাঁড়িয়ে থাকা নেংড়া শাজান তাই আচমকা সচল হয়ে বুকভর্তি করে বাতাস নিতে নিতে ছোটে। পা নিয়ে সহজে মাঠ পার হতে পারে না সে, তবু লেংচাতে লেংচাতে ভিড় থেকে ক্রমে আলাদা হয়ে পড়ে।

হৈ হৈ করতে থাকা মানুষ এবার একযোগে আয়নার সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কী দেখছে মানুষ ? মিনিট খানেকের মধ্যেই এই প্রশ্নের বিপরীতে অতিরঞ্জিত সব উত্তর আসতে থাকে। সেই সঙ্গে গোলচেহারার আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখার উদগ্র বাসনা দ্রুত মিইয়ে আসতে থাকে। কৌতূহল আর আমোদে ঠাসা ভিড়ে হুল্লোড় শুরু হয়, যে যেভাবে পারে পিছু ছোটে। কিন্তু ভিড়ের চাপে কেউই বেশিদূর এগোতে পারে না।

হঠাৎ ভিড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে নবুচাঁদ মাথা জাগায়। নবুচাঁদের ডান হাতে আধভাঙা ইট দেখে গোলচেহারার বুঝতে বাকি থাকে না, ঐ অস্ত্রের নিশানা কী। কায়দা করে সরে এসে গোলচেহারা আয়নাটা নবুচাঁদের দিকে তাক করে। চমকে ওঠে নবুচাঁদ, ওর নিশানা লক্ষ্যচ্যুত হয়। তাকিয়ে দেখে নাক-চোখ-ঠোঁটের বদলে একটা বিসদৃশ শিশ্ন ঝুলছে আয়নায় প্রতিফলিত মুখে। এই অঙ্গটি যে ওর চিনতে ভুল হয়নি নবুচাঁদের। ঐ তো তলপেটের ঠিক মাঝ বরাবর ত্রিভুজাকৃতির জন্মদাগটা আরও চকচকে হয়ে ভাসছে। এবার দৌড়াতেও ভুলে যায় নবুচাঁদ। ওকে বেকায়দায় পড়তে দেখে গোলচেহারার চেহারা চকচকে হয়ে ওঠে। জিন্দা মাছের মতো লাফিয়ে উঠে ও আয়নার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়ায়।

রাতে গুলবদনের ঘরের চালে ঢিল পড়ে। একটা দুটা ঢিল না, শয়ে শয়ে। চাপ নিতে না পেরে ঘরের নাজুক চাল আরও নাজুক হয়ে পড়ে। গুলবদনের বাড়িতে ঘর বলতে একটা। একটা ঘরকেই চাটাই দিয়ে দুই ভাগ করা হয়েছে। গুলবদনের ইচ্ছে ছিল মেয়েদের বিয়ে দিলে ওদের কেউ স্বামী সন্তানসহ বেড়াতে এলে একটা ঘরে থাকবে। সেই ইচ্ছে তো পূরণ হয়নিই বরং গোলনাহার পাকাপাকিভাবে এই ঘরে উঠে এসেছে। প্রথম প্রথম দুই বোন একসঙ্গেই ঘুমাত। রাত জেগে সুখ-দুঃখের গল্প করত। ধীরে ধীরে দুজনের মধ্যে বাগবিতণ্ডা বেড়েছে। এখন গুলবদনের সঙ্গে এক চৌকিতেই ঘুমায় গোলনাহার আর গোলচেহারা পাশের ঘরে থাকে।

এই মুহূর্তে তিন মা-মেয়ে একে অপরকে আলিঙ্গন করে চৌকির ওপর উঠে বসে আছে। গোলচেহারা একবার ঘরের দরজা খুলে বাইরে যেতে চেয়েছে, গুলবদন দেয়নি। সম্ভাব্য বিপদের আন্দাজ করে মেয়ের হাত চেপে ধরেছে সে। ঢিল পড়া বন্ধ হয়নি। সহসা মনে হয় ঢিল না, থানইট পড়তে শুরু করেছে। গোলচেহারা চেঁচিয়ে ওঠে, ‘কোন শুওরের বাচ্চা রে! তোদের ওপর আল্লাহর লানত পড়ুক।’

আবার ঢিল পড়ে। গুলবদন মেয়ের মুখ চেপে ধরে। মায়ের হাত সরিয়ে গোলচেহারা চেঁচিয়ে ওঠার প্রাণান্ত চেষ্টা করে, ওর দুই চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চায়। গোলনাহার মাকে ছেড়ে খাটের মাথায় পিঠ ঠেকিয়ে বসে দাঁতে ঠোঁট চেপে কান্না ঠেকায়। গর্ভের শিশুটি বিপদ টের পেয়েছে, হাত-পা ছুড়ে সে মাতৃগর্ভ থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সত্যিই কি প্রসবের সময় হয়ে এল ? আতংকিত গোলনাহার দুহাতে পেট চেপে ধরে।

১২.

সারা দিন ঘর থেকে বের হয়নি নবুচাঁদ। আমগাছটার নিচে পাটি বিছিয়ে শুয়ে থেকেছে। বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব নিয়ে একটা আলগা বাতাস বইছে চারদিকে। চারদিক জুড়িয়ে এলেও সাতকুড়ির হাওয়া পুনরায় গরম হয়ে উঠেছে। সে খবর এখনও নবুচাঁদের কানে পৌঁছায়নি, সে বিরান ভিটায় হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে।

নবুচাঁদের নিজের বলতে কেউ নেই। কোনও আত্মীয়-স্বজন নেই, ভাইবোন নেই। নেই বলতে, একটা সময়ে ছিল। নবুচাঁদের বাবা রেহেল চাঁদের ঔরসে ভুতনি বিবি একে একে দুই মেয়ে আর দুই ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়েছিল। নবুচাঁদের বড় দুই বোন অনেক অনেক বছর আগে ট্রলার ডুবিতে মারা গেছে। ওদের গাঙ গর্ভেশ্বরী তখন ছিল উজানি গাঙ। কালবৈশাখির সময় এই গাঙ আরও ক্ষেপে উঠত। বড় বোন লায়লা দুই বাচ্চাসহ ছোট বোন আমেলাকে নিয়ে ট্রলারে করে নিজের শ্বশুরবাড়িতে যাচ্ছিল। যাত্রাপথে ঝড় উঠে ট্রলার ডুবলে ট্রলারের যাত্রী সব মারা গিয়েছিল। নবুচাঁদের পিঠাপিঠি আরেক ভাই ছিল হাবাগোবা, নাম হাবুচাঁদ। হাবুচাঁদও পানিতে ডুবে মরেছিল। ভুতনি বিবির ধারালো নজর ফাঁকি দিয়ে বাড়িসংলগ্ন পুকুরে পড়ে গিয়েছিল হাবুচাঁদ। সেই থেকে অনেক বছর পাগল থেকে ভুতনি বিবিও মরেছে। না, সে পানির মরা না। একদিন ভোরে বিছানা থেকে আর উঠে দাঁড়ায়নি ভুতনি বিবি।

ভুতনি বিবি যতদিন সুস্থ অবস্থায় জীবিত ছিল ততদিন নবুচাঁদকে আগলে রেখেছে। পাশের গ্রাম হালাইজানার বড় পিরের মাজারে গিয়ে দুই ছেলের প্রাণরক্ষার আশায় সে মানত করে এসেছে একাধিকবার। এরপর হাবুচাঁদ পানিতে পড়ার পর নবুচাঁদকে দেখেশুনে রাখার ক্ষমতা হারিয়েছিল ভুতনি বিবি।

মায়ের মতো ছোটবেলা থেকে নবুচাঁদকে ওর বাবা রেহেল চাঁদও আগলে রেখেছে। ছেলেকে সে কখনও পানির কাছে যেতে দেয়নি। মুক্তিযোদ্ধা রেহেল চাঁদ অস্ত্র হাতে পাকিস্তানি মিলিটারিদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যেতে ভয় না পেলেও পানিকে ভয় পেত। তার ধারণা হয়েছিল এই বাড়ির সন্তানসন্ততিদের মৃত্যুর সঙ্গে পানির যোগ আছে। এজন্য শেষকালের সন্তান নবুচাঁদকে সাঁতার পর্যন্ত শেখায়নি রেহেল চাঁদ।

নবুচাঁদ সাঁতার জানে না তা নিয়ে ইয়ার-দোস্তরা হাসাহাসি করলেও এ কথা সত্যি যে বাবা-মায়ের নিষেধ, বারণ শুনতে শুনতে নবুচাঁদও পানিকে ভয় পায়। বৃষ্টি-বাদলা দেখলেও ওর শরীর ছমছম করে। এর সুযোগ নিয়ে বন্ধুরা মাঝেমধ্যে ওকে টেনে পানিতে নামানোর চেষ্টা করে। নবুচাঁদের কান্নাকাটি আর চিৎকারে ওরা পরাস্ত হয়। মনে পড়ে ওর, গত কুরবানি ঈদের এক সপ্তাহ আগে হাট থেকে ফেরার সময় ওর বাল্যবন্ধু হাফিজ ওকে টেনে-হিঁচড়ে পুকুরে নামিয়েছিল। এরপর হাফিজকেই অজ্ঞান নবুচাঁদকে বাড়ি বয়ে আনতে হয়েছিল। নবুচাঁদের গায়ে জ্বর এসেছিল ঐ দিন রাতে। হাফিজ এখনও ঐ ঘটনা নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করে। নবুচাঁদ উপরে উপরে হেসে ব্যাপারটা উড়িয়ে দেয়, বন্ধুকে বলে না, পানির ভয় ওর কাটেনি। কিন্তু পানি ছাড়া উপায় কি ? উপায় নিজেই বের করে নেয় নবুচাঁদ, রোজ টিউবয়েল চেপে আধ বালতি পানি দিয়ে দ্রুত বেগে গোসল সারে। আর বৃষ্টি দেখলে দৌড়ে পালায়।

আজ দূর আসমানে মেঘের নিশানা দেখা যাচ্ছে। জবুথবু মেঘ না, অনেকক্ষণ ধরে মেঘের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। ঐ আর্তনাদ শুনে ভয় ভয় লাগে নবুচাঁদের।

আজকাল রাতে ঘুমাতে পারে না। বাড়িটা অশরীরীদের আখড়া হয়েছে। নবুচাঁদ চোখ বন্ধ করলেই এরা কাঁদতে শুরু করে। ক্রন্দনরত মানুষগুলোর কণ্ঠ, আহাজারি চেনা চেনা লাগে ওর। কখনও মনে হয় মা কাঁদছে, কখনও মনে হয় সুরাইয়া অভিশাপ দিচ্ছে। কখনও বা মনে হয় ওর বোন লায়লা, আমেলা ক্ষীণ স্বরে ডাকছে, ‘ভাই…বাঁচা…ও ভাই বাঁচা…দম আটকায় যায় ভাই, ও ভাই বাঁচা…’

নবুচাঁদ নিজেই বাঁচে কি না, ঐ পানি তো ওকে ডুবানোর জন্য তক্কে তক্কে থাকে। পানির ভয়ে হুড়মুড় করে উঠে ঘরে গিয়ে দরজা দেয় নবুচাঁদ। সহসা ওর মনে পড়ে যায়, পরিবারের সবাই আগে চলে যাওয়ায় কাঁদার জন্য নবুচাঁদ রয়েছে, ওর মৃত্যু হলে ওর জন্য কাঁদার কেউ নেই। শীতল এক অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে শরীরে। একটা সিগারেট ধরাতে চায় নবুচাঁদ। হাত কাঁপে, লাইটারের আগুন স্থায়ী হয় না। আগুনহীন সিগারেট ঠোঁট থেকে সরিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে নবুচাঁদ। ওর মৃত্যুর পর কেউ কাঁদবে না, কেউ কাঁদবে না। মরতে চায় না নবুচাঁদ। মরতে চায় না।

ভয় আরও ভয়কে ডেকে আনে। গোলচেহারার আয়নার কথা মনে পড়ে যায়। সুরাইয়ার মৃত্যুর পর দুজনের প্রেমটা ঢিলেঢালা হয়ে যাওয়ায় সেদিন গোলচেহারার বাড়িতে গিয়েছিল নবুচাঁদ। গোলচেহারার সম্মোহনে ও নিজের মুখটি আয়নায় দেখে ফেলেছিল। দেখে খেই হারিয়ে ফেলেছিল। কী দেখেছে নবুচাঁদ তা জানার জন্য গোলচেহারা পরের দিন ওকে চেপে ধরেছিল, উত্তর না দিয়ে ওর সামনে থেকে সেদিনও হুড়পাড় করে দৌড় দিয়েছিল নবুচাঁদ। এরপর সেদিন ধলাই মাঠে যা ঘটল, নবুচাঁদ আর গোলচেহারার মুখোমুখি হয়নি। দ্রুতই সেই সুযোগ এসে যায়।

‘নবু…বাড়িতে আছোস ?’

‘হ ভাই ?’

‘বাইরে আয়, খবর আছে।’

‘কী খবর ?’

‘আরে আয় তো।’

আতহার জামালের আহ্বান শুনে শোয়া থেকে উঠে বসে নবুচাঁদ। কী হয়েছে জানতে চাওয়ার আগেই উদ্বিগ্ন আতহার জামাল জানায়, ফের লাশ মিলেছে সাতকুড়িতে। শুনে শরীর শক্ত হয়ে আসে নবুচাঁদের। ক্ষীণ স্বরে প্রশ্ন করে,  ‘কার লাশ ?’

‘এহনও বুঝতাছি না। তুই চল।’

লাশ দেখতে যাবে কী না যাবে―অস্বস্তি ঘিরে ধরে নবুচাঁদকে। আতহার জামাল তাড়া দেয়, ‘গেলে আয়, আমি গেলাম…।’

আতহার জামাল উঠান পার হতে না হতেই বৃষ্টি নামে। বৃষ্টির পানি শরীরে লাগতেই ভয়ে কুঁকড়ে ওঠে নবুচাঁদ। এক দৌড়ে ঘরে ঢুকে দরজায় খিল লাগায়। পানি ওর জন্য মৃত্যুদূত, ঘর থেকে এক পা-ও বাইরে রাখবে না এমন বৃষ্টির দিনে।

১৩.

বহুকাক্সিক্ষত বৃষ্টি নেমেছে, খরা নাশ হয়েছে―বৃষ্টিকে ঘিরে সাতকুড়ির মানুষের আনন্দ, উত্তেজনা তবু প্রশমিত হয়ে আসে ক্রমশ। সবাই জানে পুলিশি ঝামেলা শুরু হবে আবার, বৃষ্টির সঙ্গে সম্ভাবনার বদলে তাই আতঙ্ক নেমে আসে। আতঙ্ক আর শংকা বুকে নিয়ে তবু দলে দলে মানুষ লাশ দেখতে ছোটে।

কার লাশ গুঞ্জন চলে বহুক্ষণ। গোলচেহারা অকুস্থলে ছুটে এলে গুঞ্জনের আপাতত একটা সমাধান হয়। সবার মনে পড়ে যায়, বহু দিন ধরে মোহন জাদুকর নিখোঁজ। এতদিন ধরে যারা মোহন জাদুকরের অন্তর্ধান নিয়ে নানা কিচ্ছা কাহিনি ফেঁদেছে তারাই আবার নতুন করে নতুন সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, ‘আমি আগেই কইছিলাম, আমাগো মোহন জাদুকর এমন না। আর যাই করুক, বিবি বাচ্চা ছাইড়া যাওয়ার মানুষ না সে।’

একজন আফসোস করে ওঠে, ‘আহারে, বড় ভালা ছিল মানুষটা, জাদু দেখানো ছাড়া দুনিয়ার আর কিছুই বুঝত না।’

আরেকজন চকিতে প্রশ্ন করে, ‘কে মারল মানুষটারে ?’

ফিসফিসানি বাড়ে। কে মেরেছে সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারলেও কে মরেছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারায় এদেরকে সন্তুষ্ট হতে দেখা যায়।

অতি পরিচিত ঝুলওয়ালা রঙচঙে আলখাল্লাটা না থাকলে হয়তো লাশটা শনাক্ত করা যেত না। লাশ তো আর লাশ নেই। হাড়, হাড্ডি, চুল, বিবর্ণ কাপড়-চোপড় আছে। সেসব দেখে পলকে লাশ শনাক্ত করা যায় না। মাটি, লাশের হাড়-হাড্ডি হাতড়ে জাদুকর মোহনের আঙুলের কালো পাথরের আঙটিটা বের করে এ লাশ আব্বারই―বিষয়টা সবাইকে জানিয়ে পাথর চোখে লাশের দিকে তাকিয়ে থাকে গোলচেহারা। মাটির স্তূপ থেকে গোলচেহারাকে জাদুমন্তরে কালো পাথরের আঙটি বের করে আনতে দেখে আরেক দফা শিউরে ওঠে সাতকুড়ির মানুষেরা। অনেকেই কয়েক পা পিছিয়ে যায়, নিচু স্বরে নিজেদের মধ্যে কথা বলে।

‘অ্যাই মাইয়া বাপের মতোই পাক্কা জাদুকর!’

‘হয় হয়, কী কাণ্ড দ্যাখছোস!’

‘শোনোছ নাই ওর আয়নার কথা ?’

‘শুনছি শুনছি, কত ভেলকি যে দেখাইব!’

ঝিরঝিরে বৃষ্টির ভেতরে কৌতূহলী জনতা দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখে ভয় আছে। খুব বেশি কাছে ভিড়ছে না তারা। দুর্গন্ধ নেই, তবু অনেকে মুখে কাপড় চাপা দিয়েছে। ঘোমটা টানা নারীরা আঁচল টেনেছে ভালো করে। এদের মধ্যে মা আছে কিনা ঠাহর করতে পারে না গোলচেহারা।

ওর পাশে দাঁড়ানো একটা নারীকণ্ঠ জানতে চায়, ‘লাশটা বাইর হইল ক্যামন কইরা ?’ উত্তেজিত নিত্য পুরো ঘটনাটা পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করে।

নিত্যদিনের মতো গরু চড়াতে এসে খুঁটি গাড়তে গিয়ে আজ একটু গভীরেই চলে গিয়েছিল নিত্য। শক্ত কিছুতে গিয়ে খুঁটিটা বারবার বাঁধা পাচ্ছিল বলে জিদ উঠে গিয়েছিল ওর, হাত দা দিয়ে সমানে মাটি খুঁড়েছে। তখনই বের হয়েছে লাশটা। যদিও লাশটা কার সেই বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেনি নিত্য। ভয় পেয়ে মানুষজন ডাকতে ছুটেছে।

গোলচেহারা নিশ্চিত এ ওর আব্বার লাশ। যদিও ওর খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে, জাদুকর মোহন মারা যায়নি, এই লাশও তার না, সে ইচ্ছে করে গায়েব হয়ে আছে। একদিন ঠিকই জাদুমন্তর বলে ফিরে আসবে। গোলচেহারাকে সঙ্গে নিয়ে ধলাই মাঠে ফের সে জাদু দেখাবে। ফের গান গাইবে, ‘এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নাই…।’

গোলচেহারা কাদামাটিতে বসে আছে। বিষপিঁপড়া ওর হাতের তালু ছেঁকে ধরেছে। হাত নাড়ায় না গোলচেহারা, ভাবলেশহীন বসে থাকে।

পুলিশ এসেছে, হুশশশ… হুশশশ শব্দে দুর্বল শরীরের একটা কনস্টেবল বাঁশিতে ফুঁ দিচ্ছে আর আরেকজন চিৎকার করছে, ‘দূরে সরেন। দূরে সরেন। লাশের গায়ে কেউ হাত দিবেন না।’

গোলচেহারা হাত সরিয়ে নেয়। পিঁপড়ার দল আচমকা গায়েব হয়ে যায়। বাতাসের বেগ বাড়ে। গোলচেহারা উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। ঠিক তখনই জোরে বৃষ্টি নামে। দেখতে দেখতে চারদিক লণ্ডভণ্ড করে ভয়াল বাতাস ওড়ে। এতক্ষণ বাতাস কোথায় যে ঘাপটি মেরে ছিল কে জানে। এখন বৃষ্টির সঙ্গে ঘূর্ণি নাচন নাচছে। বৃষ্টির দাপটে বেশিক্ষণ নাচতে পারে না বাতাস, চুপসে গিয়ে বিলাপ করে।

বৃষ্টির দাপট উৎসুক জনতাকে তাড়িয়েছে। এখন আশেপাশে কেউ নেই। পুলিশের গাড়িটা পর্যন্ত দৃষ্টিসীমা থেকে উধাও হয়ে গেছে। বুড়া জামগাছের নিচে দুর্বল শরীরের কনস্টেবলটা একটা বাঁকাতেড়া ছাতা মাথায় ধরে দাঁড়িয়ে আছে। লাভ হচ্ছে না কোনও, সে বৃষ্টি থেকে বাঁচতে পারছে না। জামগাছটার নিচের দিকটায় ডাল-পালা নেই বললেই চলে, খড়ি হয়ে আগেই পুড়েছে ওরা। গাছের মাথাটাও সেদিন বজ্রপাতে পুড়ে গেছে।

গোলচেহারা লাশের দিকে তাকায়। পানি কাদায় গর্তটা ভরাট হয়ে আসছে। ঢেকে যাচ্ছে হাড়গোড়, ছিন্ন কাপড়চোপড়। আবার জেগে উঠছে।

গোলচেহারার আব্বাকে কি কেউ জীবন্ত কবর দিয়েছিল ? মনের ভেতরে প্রশ্নটা আসতেই বজ্রের শিখার মতো চমকে ওঠে গোলচেহারা। নিজেকে সামলাতে চায় ও, পারে না। এতক্ষণ পর চোখের পাথর ভেঙে বৃষ্টি নামে। বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে কাঁদে, ‘আব্বা গো, আব্বা গো…ঐ আব্বা…।’

১৪.

একটা গতানুগতিক চেহারা নিয়ে এই বাড়িতে সকালটা জেগে উঠলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দিনটা আর রোজকার মতো রইল না। সুরাইয়ার মায়ের কান্নার সুর বাড়ির ফুটোফাটা বেড়া দিয়ে দিগি¦দিক ছড়িয়ে পড়ল।

একটু আগে গোয়ালঘরের সামনে বড় গরুটার দুধ নিচ্ছিল উলফত আরা। দুই আঙুলে সরিষার তেল মেখে কায়দা করে ওলান টানছিল। এই কাজটা ভালোবাসার সঙ্গে করে উলফত আরা। দুধ নেওয়া শেষ হলে গরুটাকে আলিঙ্গন করে আদর করে। আজ আদর করতে করতে সুরাইয়ার শোক ঘনীভূত হয়ে উঠছিল। তখনই আবু জাফর বিবিকে খবরটা দিয়েছে।

আজ এই বাড়ির শোকের কারণ ভিন্ন কিনা তা জানতে প্রতিবেশীরা কেউ বাড়ির ভেতরে মাথা গলানোর আগে স্ত্রীর মুখ চেপে ধরে আবু জাফর, ‘একদম চিল্লাফাল্লা করবি না, মাইনষের কানে কথাডা গেলে কী হইব বোঝোস মাগি!’

কিছুই আর বুঝতে চায় না উলফত আরা, উউউউ শব্দে কাঁদে। কান্না শুনে টোপলা শোয়া থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চোখ পিটপিট করে ক্রন্দসীকে দেখে। এমনিতেই সুরাইয়ার মৃত্যুর পর টোপলার খানাখাদ্যে টানাটানি চলছে। এই বাড়ির কেউ ওকে ডেকে কাঁটাটা পর্যন্ত খেতে সাধছে না, আগানে-বাগানে ঘুরে সুবিধাও হচ্ছে না তেমন। হবে কী করে, মানুষের অন্তরে কি আর রহম আছে ? থাকলে কি আর উলফত আরার এত বড় সর্বনাশ করতে পারে ?

ঘরের মানুষেরই তো কোনও হেলদোল নেই। নিজের মেয়ের হত্যার বিচারের রাস্তা বন্ধ করার কথা বিবিকে জানিয়ে পাকঘরের খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে আছে সে। আর কাঁদতে কাঁদতে উলফত আরার শ্বাসরোধ হয়ে আসছে। যার জন্য এই কান্না তার ভেতরে কোনও ভ্রƒক্ষেপ দেখা যায় না, এ কথা বুঝে আরও বেদম হচ্ছে কান্না।

ঘটনা গুরুতরই বটে। নেংড়া শাজানের কাছ থেকে এক তোড়া টাকা নিয়েছে আবু জাফর। টাকার বিনিময়ে আদালতে দাঁড়িয়ে হলফনামা পড়ে সাক্ষ্য দিয়ে এসেছে, সুরাইয়া আজীবন অসুখ-বিসুখে ভুগেছে, যখন-তখন খিঁচুনি উঠত মেয়ের, অসুখে ভোগা মেয়ের চিকিৎসা করতে রক্ত পানি করেছে সে, মেয়েকে বাঁচাতে পারেনি, আসামিরা খালাস পেলে তার কোনও আপত্তি নেই… ইত্যাদি ইত্যাদি। আবু জাফরের বক্তব্য সমর্থন করে সাতকুড়ির আরও ছয়-সাতজন আদালতে হলফনামা পাঠ করে সাক্ষ্য দিয়ে এসেছে। নবুচাঁদও সাক্ষ্য দিয়ে বলেছে, খিঁচুনি উঠে সুরাইয়ার শরীর বাঁকাচোরা হয়ে ধান ক্ষেতে পড়েছিল। ও দৌড়ে গিয়ে সবাইকে খবর দিয়েছে। আজ আদালত থেকে হাসিমুখে বাড়িতে ফিরেছে নেংড়া শাজান আর ওর চ্যালা কানু। আর নোটের তোড়া থেকে দুটো বড় নোট তুলে নিয়ে আবু জাফর কোর্টকাচারি থেকে ফেরার পথে রাজ্যের সদাইপাতি কিনে এনেছে।

মেয়েদের ডাক দিয়ে ব্যাগ থেকে জিনিসগুলো বের করতে বলে আবু জাফর। স্বামীর কথা শোনামাত্র উলফত আরার শোক ক্রুদ্ধতার আগুনে চাপা পড়ে যায়। ফুঁসে উঠে ও স্বামীর আনা সদাইপাতির দিকে ধেয়ে যায়। ওসব পাপের টাকায় কেনা, অভিশাপের টাকায় কেনা, সুরাইয়ার সম্ভ্রমের বিনিময়ে কেনা―বলে পা দিয়ে ডাল, তেল, নুন, আটার প্যাকেটগুলো মাটিতে খচে উলফত আরা।

এবার আবু জাফরও আগ্রাসী হয়ে ওঠে, উলফত আরাকে টান মেরে মাটিতে ফেলে সে সজোরে লাথি মেরে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায়। মাটিতে গড়াতে গড়াতে বিলাপ করতে থাকে উলফত আরা। দিনভর বিলাপ করে চলে ও, ঘর-সংসারের কোনও কাজ ধরে না। ছেলে বউয়ের বিলাপ থেকে ঘটনার সারসংক্ষেপ ছেঁকে তুলতে তুলতে পেস্তা বেগম বেদিশ হয়ে যান। চোখে ফের ধাঁধা লাগে, সামনে থাকা কিছুই দেখতে পান না তিনি। আসন্ন সন্ধ্যার ওম অনুভব করতে করতে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। আজ আর পানি আসে না তার চোখে। সুরাইয়ার মৃত্যু সব পানি শুষে নিয়েছে।

পেস্তা বেগম পান আনতে ঘরের ভেতরে ঢোকেন। বিভা রানি এসেছে। এই জ¦ালা আর তার ভালো লাগে না। সন্ধ্যা নামলেই মনে হয় তিনি একটা হাত-পাওয়ালা জীবন্ত গহ্বরের ভেতরে এসে দাঁড়িয়েছেন। কখনও বা মনে হয় ঘর না, কবর এটা, কবরের ভেতরে তাকে চাপা দিয়ে তার একমাত্র সন্তান আবু জাফর দৌড় লাগিয়েছে। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ… কলমা পড়তে পড়তে তিনি তার প্রস্থানদৃশ্য রচনা করছেন। আর তার সহলেখক হিসেবে আছে ক্রন্দসী বিভা রানি, যে রাত ফুরিয়ে গেলেও পেস্তা বেগমের পিছু ছাড়ছে না। এখন সে পেস্তা বেগমকে চমকে দিয়ে গোলচেহারার আয়নার গল্প শুরু করেছে।

‘ও দিদি আয়নার গপ শুনছো ? ওই আয়না নাকি জাদুর আয়না। ওইহানে কি দেহা যায় গো দিদি ? আমার নাড়ু গোপালরে দেহা যাইব ?’

‘আমি কী জানি!’

‘ও দিদি, কও না।’

‘দুরো, আমি জানি না। তুই যা, গোলচেহারার কাছে। নিজে গিয়া দেইহা আয়। আমার আয়না দেহার বয়স নাই, খায়েশও নাই।’

এ কথা সত্য যে, পেস্তা বেগমের বয়স নাই, কিন্তু খায়েশ নাই, এই কথা মিথ্যা। এক মিথ্যা হাজার বার বললে সত্যির মতো শোনায়। তাই পান মুখের ভেতরে নাড়তে চাড়তে গুনে গুনে পাঁচ-ছয়বার পেস্তা বেগম বলে, ‘তুই যা গোলচেহারার কাছে, আমার অত খায়েশ নাই।’

পেস্তা বেগমকে অবাক করে গোলচেহারাই তার কাছে আসে। তোবড়ানো গালে পান চিবাতে চিবাতে তিনি নিজেকে স্থির করেন। বাবার লাশ পাওয়ার পর থেকে গোলচেহারার চেহারার দিকে তাকানো যায় না। দেখে মনে হয় রাতভর ঘুমায় না। থানাতেও দৌড়ায়। পুলিশ দুর দুর করে তবু ঠ্যাটার মতো গিয়ে বসে থাকে রোজ। মামলার তদন্ত চলছে। লাশ কার, পরীক্ষা করতে লাশের অংশ নাকি ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। গোলচেহারা যতই বলে ঐ লাশ মোহন জাদুকরের, লাশের আঙুলে জড়ানো আঙটি ওর বাপের, নেংড়া শাজানই ওর বাপের খুনি, পুলিশ আমলে নেয় না। তবে নেংড়া শাজান আবার পালিয়েছে। ওর বাড়িতেও গিয়েছিল পুলিশ। এই বাড়িতেও এসেছিল। গ্রামের প্রায় সব বাড়ির মানুষকেই এটা-সেটা নানা কথা জিজ্ঞাসা করছে। পুলিশ দেখলে পেস্তা বেগমের কলিজায় মোচড় দিয়ে ওঠে। বিভা রানিও একই কথা বলে। তা ও গেল কই ? এতক্ষণ গোলচেহারার আয়না আয়না করছিল, আর এখন ওকে দেখে পালিয়েছে!

‘কী রে কেমন আছোস তুই ? সই মরার পর তো এই বাড়িতে আসোছই না।’

আফরুজা, জুয়াইরাহ, হুমায়রা তিন বোন ছুটে আসে।

‘ও বু, তোমার আয়নাটা দেহুম। আমাগো কেমন দেহা যাইব ঐ আয়নায় ?’

তিন বোনের কলকলানিতে গোলচেহারার মুখে হাসি ফোটে।

‘তোগোরে পরির লাহান দেহা যাইব।’

‘না বু সত্যি, সেই দিন আব্বায় মাঠে যাইতে দেয় নাই। আমি আয়নায় মুখ দেহুম। ও বু চলো তোমাগো বাড়ি চলো।’

‘আইজ রাইত কইরা না। তোগো দেহাইতে আমিই আয়না নিয়া আসুম।’

‘না বু, আইজই দেহুম।’

আফরুজার আহ্লাদী মুখটির দিকে তাকিয়ে গোলচেহারার সইয়ের কথা মনে পড়ে। মনে হয় সইই ওর কাছে আবদার করছে। ওদিকে মেয়ের সইকে দেখে উলফত আরার কান্না বেগবান হয়।

‘ও গোলু হুনছোস, তোর চাচা আমার মাইয়ার রক্ত বেচা টাকা আনছে রে ঘরে। ওরে আমার সোনার ময়না কই গেল রে…।’

গোলচেহারার শরীরে কাঁপন ওঠে। পেস্তা বেগমের কাছে একটা আবদার নিয়ে এসেছিল ও, এখন আর সে কথা বলার সাহস পায় না। আফরুজা, হুমায়রা, জুয়াইরাহ খানিক আগের উচ্ছ্বাস ভুলে বিমর্ষ চেহারায় তাকিয়ে থাকে। উলফত আরার গলার স্বর চড়া হয়। পেস্তা বেগম ধমকে ওঠেন, ‘সুরাইয়ার মা, থামো!’

থামে না উলফত আরা। সুরাইয়া…সুরাইয়া…নামটা ঘূর্ণির আবর্তে চৌদিকে ছড়িয়ে যেতে থাকে।

১৫.

আবু জাফর ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। বিবির মৃত্যুতে শোকের চেয়ে আতঙ্ক আর ভয় ক্রমশ প্রগাঢ় হয়ে উঠছে। উলফত আরা মারা গেছে। ওর জান কবজকারী ও নিজে।

এই মুহূর্তে উলফত আরা চিত অবস্থায় উত্তর শিয়রে শায়িত আছে। ওর চুল খোলা, চোখজোড়া বন্ধ, মুখও বন্ধ। গায়ের ফর্সা রঙ খানিক বিবর্ণ। চোখের কোটর কালো। দুই হাত শরীরের দু পাশে, পা দুটো লম্বালম্বি আছে। পরনে কচি কলাপাতা শাড়ি এবং লাল পেটিকোট। লাল পেটিকোটের অনেকটা শাড়ির নিচ থেকে বেরিয়ে আছে। গলায় হলুদ ও কালো রঙের সুতায় স্টিলের খোলে তিনটি ছোট-বড় তাবিজ ঝুলানো।

তাবিজ নেওয়ার বাতিক ছিল উলফত আরার। ওর তিন মেয়ের গলাতে, খোঁপাতেও নানা আকৃতির তাবিজ দেখা যায়। সুরাইয়ার গলাতেও তাবিজ ঝুলতো। নজর না লাগার তাবিজ। আবু জাফরের ডান হাতের বাজুতেও কালো কায়তনে বালা-মুসিবত দূরীকরণের তাবিজ বাঁধা আছে। তবু বালা-মুসিবত এই বাড়ির পিছু ছাড়ে না। উলফত আরার মৃত্যুর পর মুসিবত ধৈর্যের শেষ দাগ অতিক্রম করেছে।

মৃতার দিক থেকে চোখ ফিরালে দেখা যায়, ঘরের মেঝেতে একটা শিশি পড়ে আছে যার গায়ে মোটা কালো হরফে কীটনাশক আর বন্ধনীর ভেতরে লাল হরফে ‘কার্বামেটস বিষ’ লেখা। এই বিষ আবু জাফরই এনেছিল। জমিতে ব্যবহার করা হয়নি বলে ঘরের তালার ওপরে রাখা ছিল। উলফত আরা নিজের কাজে লাগাবে কে জানত। অবশ্য আজ বিকালেও ঝগড়া হয়েছিল দুজনের। আবু জাফর হাট থেকে বিবির জন্য একটা নতুন শাড়ি এনেছিল। শাড়ি দেখামাত্র দিশেহারা হয়ে উঠেছিল উলফত আরা। গলার রগ ফুলিয়ে চিৎকার করে উঠেছিল, ‘আমার মাইয়ার ইজ্জত বেচার টাকা দিয়া শাড়ি কিনছেন ? ঐ শাড়িতে আমি মুতি… আপনার ঐ শাড়িতে আমি মুতি।’ এরপর শাড়ি হাতে নিয়ে পাকঘরে ঢুকে বঁটি দিয়ে ফালাফালা করেছিল উলফত আরা।

ঘটনাটা এত দ্রত ঘটে গিয়েছিল যে হতচকিত আবু জাফর বিবিকে আটকাতে পারেনি। উলফত আরা শাড়ির কাটা টুকরোগুলো স্বামীকে লক্ষ করে ছুড়ে মারতেই আগুন জ¦লে উঠেছিল আবু জাফরের মাথায়। বিবিকে মারতে গোয়াল ঘর থেকে একটা লাঠি এনে তেড়ে গিয়েছিল। পাগলিনী উলফত আরা দমেনি, স্বামীর দিকে তর্জনী তুলে বলেছে, ‘ঐ পাপের টাকায় যদি এক মুঠ চালও আনেন ঘরে, খোদার কসম আমি আপনার সংসারে লাথথি মাইরা চইলা যামু।’

কসম খাওয়ায় ঐ মুহূর্তে নিভে গিয়েছিল আবু জাফর। হাতের লাঠিটা ফেলে দিয়েছিল। টের পাচ্ছিল ওর লুঙ্গির কোচড়ে গোঁজা টাকা কয়টা খোঁচাচ্ছে। দীর্ঘদিন বাদে আবু জাফর বিবির রাগের প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা রাগ দেখায়নি। উলফত আরাও গুম হয়ে গিয়েছিল। যন্ত্রের মতো এ কাজ সে কাজ করছিল। গোয়ালঘরে ঢুকে অনেকক্ষণ ধরে দুধেল গরুটাকে আদরও করেছে। তারপর সন্ধ্যা পার হলে বাড়ির সবাইকে খেতে দিয়েছে। নিজে খায়নি। এরপর যে যার মতো বিছানায় চলে গেছে।

বিছানায় শরীর লাগামাত্রই ঘুমিয়ে যায় আবু জাফর। সারা দিন খাটনির পর এই ঘুমটুকুই একমাত্র সুখ। মাঝরাতে ঘুম গভীর হয়ে এসে অন্ধকার যখন চারদিক গ্রাস করে নিচ্ছিল তখনই বিছানা ছেড়েছিল উলফত আরা। কাজটা হয়তো সে তখনই করেছে। বিবির পাশে শুয়ে থেকেও আবু জাফর কিছু টের পায়নি। আফরুজা, হুমায়রা, জুয়াইরাহ তখন গভীর ঘুমে ছিল। পেস্তা বেগম নিজের ঘরে বিভা রানির সঙ্গে বাগবিতন্ডা করছিলেন, কিছুই টের পাননি।

মৃতা উলফত আরাকে প্রথমে আবু জাফরই দেখেছে। দেখে কতক্ষণ পর্বতের মতো অনড় দাঁড়িয়ে ছিল। চিৎকার করতে পারেনি। ধাতস্থ হলে মাটিতে বসে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করেছিল। বাবার কান্নার শব্দ শুনে পাশের ঘর থেকে প্রথমে মেজো মেয়ে আফরুজা ছুটে এসেছে।

সুরাইয়া আর আফরুজা পিঠাপিঠি দুই বোনকে জমজের মতো দেখাত। মায়ের মাথার কাছে আফরুজাকে বসে থাকতে দেখে মুহূর্তের জন্য আঁতকে ওঠে আবু জাফর, তার মনে হয় এ আফরুজা না, সুরাইয়া।

এই লাশ যে সুরাইয়ার না তা ভুলে ‘আমার সুরাইয়া…’ ‘আমার সুরাইয়া…’ বিলাপ করতে শুরু করে আবু জাফর। আফরুজা মাকে দু হাতে আঁকড়ে ধরে গোঙ্গায়। হুমায়রা আর জুয়াইরাহ মাটিতে বসে কাঁদে। পেস্তা বেগম শুধু প্রতিক্রিয়াহীন বসে থাকেন।

টোপলা পা টেনে টেনে হেঁটে শিশিটার কাছে যায়। মুখ দেয় না। বিপদের ঘ্রাণ পেয়ে ম্যাও ম্যাও করে ওঠে। গোয়ালঘরে থাকা দুধেল গরুটাও বোঝে, এই বাড়িতে বিপদ এসেছে। উঁচু স্বরে ডেকে উঠে খুঁটিতে বাঁধা দড়িটা টেনে সে সামনে এগোতে চায়।

ঘর ছেড়ে বের হয়ে গোয়ালঘরে একবার উঁকি দিয়ে অবলা প্রাণিগুলোকে এক নজর দেখে নিয়ে পেস্তা বেগম নিজের ঘরে ঢোকেন। উলফত আরার লাশটা ঢাকার জন্য একটা কাপড় দরকার। ট্রাংকে রাখা কাপড়-চোপড়ের ভেতর থেকে একটা পুরানো চাদর বের করেন তিনি। চাদর নিয়ে আবু জাফরের ঘরে ঢুকতেই সে সজোরে কেঁদে ওঠে, ‘ও মা… অয় আমারে এত বড় শাস্তি দিল… ও মা।’

ছেলের কাছে গিয়ে দাঁড়ান পেস্তা বেগম কিন্তু ছেলের মুখের দিকে দৃষ্টি দেন না। তার চোখ উলফত আরার মৃতদেহে আটকে থাকে। এই হলো মৃত্যু, তার সঙ্গে মৃত্যুর দেখা নেই। তিনি মরেন না, সবার মরণ দেখেন। সংসারের সুখ-দুঃখের সাথী ছেলে বউয়ের মৃতদেহটা চাদর দিয়ে ঢেকে পেস্তা বেগম তার শিয়রের কাছে বসেন। তার চোখ নিঙড়ে এক ফোঁটা পানিও বের হয় না। ক্রন্দনরত ছেলে, নাতনিদের সামনে শুষ্ক চোখে বসে থেকে তার লজ্জা লজ্জা করে।

এ কী শাস্তি হলো! অসহায় পেস্তা বেগমের হাঁসফাঁস লাগে। জীবনে প্রথমবারের মতো বিভা রানির সান্নিধ্য আজ তার বড় দরকারি বলে মনে হয়।

১৬.

অনেক দিন পর গোলচেহারাকে মনোযোগ দিয়ে দেখে নবুচাঁদ। গোলগাল চেহারার মেয়েটা এখন পূর্ণাঙ্গ নারী। চেহারার ছাঁচ নিখুঁত না হলেও ওর দেহের গড়ন আকর্ষণীয়। ত্বক উজ্জ্বল, মুখ আর হাতের উন্মুক্ত অংশ শুধু রোদে পোড়া। লম্বায় ওরা দুজন প্রায় সমান সমান। সেই হিসাবে বলা যায় এ দেশের পুরুষদের গড় উচ্চতার তুলনায় নবুচাঁদ খাটো।

নবুচাঁদ সাগ্রহে তাকায় গোলচেহারার দিকে। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে গোলচেহারার থুতনিতে, ঐ ঘামটুকু কাঁপিয়ে দেয় নবুচাঁদকে। ছুঁয়ে দিয়ে প্রেমিকার ঘামটুকু মুছে দিতে না পারলে কিসের প্রেমিক ? নিজের ব্যর্থতার মাত্রা পরিমাপ করে নিভে যায় নবুচাঁদ। গোলচেহারা কী বোঝে কে জানে, ডান হাতের তালু দিয়ে ঘামটুকু সপাটে মুছে তির্যক দৃষ্টিতে তাকায়।

ওরা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। মাটিতে এখন পানি, কাদা নেই। পায়ের নিচে ভ্যাদলা ঘাস আর সবুজ ধান আছে চৌদিকে। অভ্যস্ত চোখ সবুজে মুগ্ধ হয় না, দোদুল্যমান শীর্ষে নজর বুলিয়ে আবার পূর্বস্থানে ফিরে আসে। গোলচেহারা অনড়, অটল দাঁড়িয়ে থাকে।

গোলচেহারার মুখোমুখি দাঁড়ালে আজকাল বিব্রত হয় নবুচাঁদ। চট করে তাই একবার ওর পায়ের দিকে তাকায়। নবুচাঁদ দেখেছে আজকালকার মেয়েরা উঁচু জুতা পরে খুব। কেমকেমি বাজারে জুতার দোকানে বাহারি রকম জুতা দেখেছে ও। এক বিঘত উঁচু জুতাও আছে। সেই জুতার গোড়ালি কলমের মতো সরু। জুতোজোড়া দেখে সেদিনই সিদ্ধান্ত নিয়েছে নবুচাঁদ গোলচেহারাকে কখনও উঁচু ঐ জুতা কিনে দেবে না।

এখনও গোলচেহারাকে নিয়ে খোয়াব দেখছে নবুচাঁদ! নিজের বালখিল্যতায় এবার ওর হাসি পায়। গোলচেহারা হাসে না। আগে নবুচাঁদের ছায়া কিংবা শরীরের অংশবিশেষ দেখলেও গোলচেহারার শরীরের ভাঁজে ভাঁজে ঢেউ উঠত। ঢেউ ভাসিয়ে নিতে চাইত, ডুবিয়ে নিতে চাইত। ডুবতে উন্মুখ গোলচেহারা ভীরু পায়ে এগিয়ে নিজেকে সমর্পণ করতে করতে ভেঙে ভেঙে পড়ত। সব আকর্ষণ আজ অন্তর্হিত হয়ে গেছে। শরীর-মনের কোথাও আজ সাড়া জাগছে না। বরং বিরক্তিতে ভ্রƒ কুঁচকে উঠছে। বিরক্তিভাব গোপন না করেই চাপা স্বরে বলে গোলচেহারা, ‘ক্যান ডাকছো ?’

কত দূরে সরে গেছে ঐ নারী, তবু তাকে বুকের ভেতরে নিতে নবুচাঁদের মন চায়। ওড়নাটা গলা থেকে পেছনের দিকে খানিকটা ঝুলিয়ে দিতেই গোলচেহারার দেহের ভাঁজ দৃশ্যমান হয়। কাপড়ের আড়াল সরে গেলে কী দেখতে পাবে―ঝটকায় ভাবনাটা মাথায় আসতেই নবুচাঁদের হৃদপিণ্ডটা খাবি খায়, ধমনীর অভ্যন্তরের রক্তপ্রবাহও দ্রততর হতে শুরু করে। এসব ভাবনা কদিন আগেও মাথায় এলে ও গোলচেহারাকে কায়দা করে প্রলুব্ধ করত। এখন গোলচেহারা কিছুতেই নরম হবে না।

নবুচাঁদ ছটফটিয়ে ওঠে। একটা ফটু দিয়ে যদি ঐ নারীর তামাম গোস্যা পানি হয়ে যেত! যাবে নাকি একবার কাছে ? একবার দৌড়ে গিয়ে জাপটে ধরবে নাকি ? হিতে বিপরীত হয় যদি ? যদি ফুঁসে উঠে ঐ নারী কামড়ে দেয় কালকেউটের মতো ? নাহ, নবুচাঁদ জানে, নারীকে বিশ্বাস করতে নেই। নেংড়া শাজানের কথা এটা। বিয়ের দিনই নেংড়া শাজানের বউ আফলাতুন স্বামীর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। তিন মাস যেতে না যেতেই বিয়ের গহনাপত্র, নতুন শাড়ি-কাপড় নিয়ে নেংড়া শাজানের দুই পাওয়ালা দোস্ত ইসমাইলের সঙ্গে পালিয়েছে। পালানোর আগে শাজানের নামে বদনামও রটিয়েছে। নেংড়া শাজানের নাকি বিকৃতির শেষ নেই।

কাকে সামনে রেখে কার কথা ভাবছে নবুচাঁদ!

তলানিতে পড়ে থাকা ভালোবাসাটুকু হাতড়ে নিজের কাছে টানতে চায় নবুচাঁদ, ব্যগ্র স্বরে বলে, ‘তুই আমারে ভুল বুঝতাছোস। আমি কিছু করি নাই।’

নবুচাঁদের আবেগজড়িত কণ্ঠ শুনে নরম হয় না গোলচেহারা। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে জানতে চায়, ‘নেংড়া শাজানের লগে তোমার কী কাম ?’

‘কী কী…’ জিহ্বা আঠালো হয়ে কথা মুখের ভেতরেই আটকে থাকে নবুচাঁদের। খানিকক্ষণ তোতলায় ও। হলুদ ওড়নাটা টেনে পেট-বুকের ওপরে ছড়িয়ে দেয় গোলচেহারা। নবুচাঁদের দৃষ্টি এখন আর কিছু খোঁজার ফুরসত পায় না।

‘সেদিন ধলাই মাঠে দুইজন একলগে ছিলা না ?’

গোলচেহারার চোখে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ দেখা যায়। ঘাবড়ে যায় নবুচাঁদ। নিজেকে সামলাতে মুখ ফিরিয়ে শুকনা গাঙ দেখে। ওরা গর্ভেশ্বরীর বুকে জমা পলিমাটিতে দাঁড়িয়ে আছে। উর্বর মাটির কোনও কোনাই খালি নেই। ধান ছাড়াও লতারি-পাতারি শাক আর জঙ্গলে ভরে গেছে উদলা গাঙের বুক। সকালের বৃষ্টির পর চারদিকের সবুজ ধুয়েমুছে একেবারে চকচকে হয়ে গেছে।

গোলচেহারা সবুজে ভোলে না, প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করে। নবুচাঁদ প্রশ্নের উত্তর দেয় না। ওর অতৃপ্ত চোখ দুটি গোলচেহারার দেহ পর্যবেক্ষণ করে। প্রেমিকের আগ্রাসী দৃষ্টিতে আজ আর শরীরে থরো থরো কাঁপন ধরে না। উত্তর চাই তার। তাই প্রশ্নটা দিয়ে ফের নবুচাঁদকে বিদ্ধ করে ও।

গোলচেহারার ঝাঁঝ মেশানো স্বরে অসহায় বোধ করে নবুচাঁদ, জবাব হাতড়ে বেড়ায়।

‘আমি দেখছি শাজান তোমার পিছনেই আছিল। তুমি ওর লগে শলা কইরা ঢিল দিয়া আমার আব্বার আয়না ভাঙতে চাইছিলা ? একবার সাহস কইরা আয়নার সামনে খাড়াও দেখি দুইজন। দেখি সুরাইয়া আর আমার আব্বারে কে মারছে তা বাইর হয় কি না।’

‘কী কছ!’

‘যা কই ঠিকই কই। তোমাগো মতো পুরুষমানুষ রে চেনা আছে। ঐ আয়নাই চিনাইছে আমারে।’

নবুচাঁদের শিড়দাঁড়ায় ত্বরিত গতিতে একটা শীতল স্রোত বয়ে যায়। তবু শেষবারের মতো ঘুরে দাঁড়াতে চায় ও।

‘বেশি বুঝিস না। তোর ঐ আয়নার ভিতরে জিন আছে। বদ জিন। উল্টাপাল্টা জিনিস দেখায়।’

নবুচাঁদের কণ্ঠে খানিক আগের কোণঠাসা ভাব আর নেই। এখন ও অনেকটা ধাতস্থ হয়েছে। এই বেপরোয়া নারী যেন ঘা মেরে ওর পৌরুষত্ব জাগিয়েছে। এখন কুণ্ঠিত থাকার প্রশ্নই নেই।

ক্রোধের বাড়াবাড়িতে নবুচাঁদ গোলচেহারার দিকে ধেয়ে যায়। গোলচেহারা পিছিয়ে যায় না। উল্টো দুই কদম এগিয়ে আসে। ওর নাকের ছিদ্র প্রসারিত হয়, চোখজোড়া দিয়ে আগুন ঠিকরায়। দেখে থমকে যায় নবুচাঁদ। এমন তো ছিল না গোলচেহারা। এক তাল কাদামাটির মতো ছিল, ইচ্ছে মতো দলে-মথে যাকে পছন্দমাফিক ছাঁচে বসানো যেত।

‘তুই বেশি বাড়িস না।’

‘বাড়লে কী করবি। সুরাইয়ার মতো অবস্থা করবি ? কইরাই দ্যাখ!’

এবার গোলচেহারা তুমির সীমা অতিক্রম করে তুইয়ে নেমেছে। নবুচাঁদও নিজের উচ্চতা থেকে তড়াক করে নেমে গেছে। অসহিষ্ণুতা ছাপিয়ে ঘিনঘিনে স্বরে ও গোলচেহারাকে শাসায়।

‘কী করমু ? সময় হইলেই দেখবি।’

দ্রত সরে যায় নবুচাঁদ। গোলচেহারা ধীর স্থির দাঁড়িয়ে থাকে।

১৭.

রাতভর ঘুমাতে পারেনি নবুচাঁদ। শুয়ে বসে ভেবেছে, কাজটা কি ও সত্যিই করেছে ? বারবার শুনতে শুনতে, গোলচেহারার সন্দেহের দৃষ্টি দেখতে দেখতে ওর কেন মনে হচ্ছে, ও-ই সেদিন সুরাইয়াকে… এই পর্যন্ত ভেবে প্রতিবার আঁতকে উঠেছে নবুচাঁদ। ও যদি কাজটা না-ই করে তবে কেন গোলচেহারার আয়না ওর চেহারা বিকৃত করে দেখাল ? ওর ভেতরে কি এত কাম, এত বাসনা লুকানো যা জগৎসংসারের মানুষের সামনে প্রদর্শনযোগ্য না ?

ঐ আয়নাই এখন শত্রু ওর। ঐ আয়নার কারণেই প্রেমটা হাতছাড়া হয়ে গেছে। নবুচাঁদ দু হাতে মাথাটা চেপে ধরে। ইচ্ছে করে, বাড়ি দিয়ে মাথাটা দু ভাগ করে ফেলে। কী করে ও গোলচেহারাকে বিশ্বাস করাবে ও জীবিত সুরাইয়ার দেহে হাত দেয়নি। নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে শুধু একবার মৃত সুরাইয়াকে স্পর্শ করেছিল। আর নেংড়া শাজানের চাপে কোর্টে দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিয়েছে, সুরাইয়ার খিঁচুনি রোগ ছিল। সাক্ষী দেওয়ার পর বিরিয়ানি খাওয়াতে চেয়েছিল নেংড়া শাজান, টাকাও সেধেছিল। নবুচাঁদ বিরিয়ানি খায়নি, টাকাও নেয়নি।

এই তো ওর অপরাধ, এই অপরাধ কি গোলচেহারার কাছে ক্ষমার যোগ্য হবে ? ভেবে ভেবে মুষড়ে পড়ে নবুচাঁদ।

ঝিমধরা অনুভূতি ছাপিয়ে হঠাৎ রাগ হয় নবুচাঁদের, ইচ্ছে করে ঐ বাড়িতে গিয়ে গোলচেহারার চুলের মুঠি চেপে বিছানার ওপর ফেলে দেয়, তারপর ইচ্ছেমতো… কী করবে ভাবতে ভাবতে ওর শরীরে ঝাঁকি লাগে। ত্বরিত গতিতে শরীরের নিম্নাংশে হাত রেখে টের পায়, তাপহীন অঙ্গটা ওকে ভেঙচে এক দিকে এলিয়ে আছে। দমে যায় নবুচাঁদ। হবেই তো এমন, নিজেকে অভিশপ্ত তো করেছে ও নিজেই।

কিন্তু আর যাই করেছে কখনও জোর করে কিছু তো করতে চায়নি গোলচেহারার সঙ্গে। ও তো আর নেংড়া শাজান না, এ বাড়ি ও বাড়িতে উঁকিঝুঁকি মেরে মেয়েদের দেখবে, সুযোগ পেলে ধান ক্ষেতে, ঝোপের আড়ালে একে তাকে চেপে ধরবে। নাহ… এসবের কিছুই ও করতে পারবে না। তাহলে কী করবে ? নেংড়া শাজানকে মেরে ফেলবে ? না ধরিয়ে দেবে ? যেভাবে গোলচেহারার বাবা মোহন জাদুকর ওকে ধরিয়ে দিয়েছিল ?

প্রশ্নে প্রশ্নে মাথার মধ্যে জট পাকিয়ে যায় আবার। রাগ শিথিল হয়ে আসে। কান্না কান্না পায়। কেউ নেই ওর যার কাছে গিয়ে কাঁদে, ‘ও মা…ও মা…’ করে বালিশে মুখ চেপে খানিকক্ষণ গোঙ্গায় নবুচাঁদ। ওর বাবা বলত, মা-ই ওকে নষ্ট করেছে, পানিতে পড়ে ছেলের মৃত্যু হবে সেই শঙ্কায় ছেলেকে বুকে করে রেখেছে। বাবাও কি ওকে বুকে করে রাখেনি ? এই দফা বাবার মুখটাও মনে পড়ে যায়, ‘আব্বা ও আব্বা…’ ডাকতে ডাকতে নবুচাঁদের মুখ আঁঠালো তরলে ভরে উঠতে থাকে।

কেঁদেও সুখ নেই। মাথায় হাত বুলিয়ে কেউ বলারও নেই, ‘আর কত কাঁদবি ? আর কাঁদিস না বাপ ?’ বিছানা ছেড়ে খানিকক্ষণ ঘরের এদিক-সেদিকে হাঁটে নবুচাঁদ। ঠিক করে, দেশান্তরী হবে। সাতকুড়ি ছেড়ে যেদিক চোখ যায় চলে যাবে, নেংড়া শাজানের মতো।

মোহন জাদুকরের লাশ পাওয়ার পর আবার গা ঢাকা দিয়েছে নেংড়া শাজান। ওর সব সময়ের সঙ্গী কানুকেও কোথাও দেখা যাচ্ছে না। এবার হাসি পায় নবুচাঁদের, নেংড়া পা নিয়েও জীবনটা দৌড়ে কাটছে নেংড়া শাজানের। আকাম-কুকাম করেই তো এক পা গেছে শাজানের। আগে পা ভালোই ছিল। আবু জাফরের বাড়ির গোসলখানার দৃশ্য ভিডিও করতে গিয়ে মোহন জাদুকরের হাতে ধরা খেয়ে সাতকুড়ির মানুষের বেদম মার খেয়েছিল সে। বাম পা-টা ভেঙ্গেছিল তখন, ঢাকায় পঙ্গু হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাও করিয়েছে, ঠিক হয়নি। এরপর থেকে শাজানের সঙ্গে মেশা কমিয়েছে নবুচাঁদ।

এই অবস্থার সঙ্গে অর্থ-কড়িরও নিবিড় সম্পর্ক আছে। পকেটের টাকা নিঃশেষ হয়ে গেলে বন্ধু সঙ্গ কমতে থাকে। এমনিতে খরচের শতেক রাস্তা ওর। এর ভেতরে আবার থানা পুলিশ করে পয়সা ঢালতে হয়েছে। পুলিশ তো এক গ্রাম মানুষের সামনেই ধরে নিয়ে গিয়েছিল সেদিন। মেম্বার মোজাফ্ফর থাকায় রক্ষা। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বলে রেটটা একটু কম ধরেছে পুলিশ। আসামির বদলে সাক্ষীর ক্রমিকে নাম লিখেছে। সেদিন সুরাইয়াকে যেখানে যেই অবস্থায় দেখেছে নবুচাঁদ, সব পুলিশকে বলেছে, শুধু একটা বিষয় চেপে গেছে। এই বিষয়টা নিজের অভ্যন্তরেও চেপে রাখতে চাইছে ও, চেপে রাখতে চাইছে বলেই তা আরও প্রকট হয়ে উঠছে।

নবুচাঁদের বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে, অন্ধকারের পর্দায় সিনেমার মতো দৃশ্যটা ভেসে উঠছে।

সুরাইয়ার নগ্ন স্তনজোড়া ওর দিকেই তাক করে রেখেছে কেউ। নবুচাঁদ চোখ বন্ধ করে। কিন্তু চোখ বন্ধ করলেও অন্ধকার পিছু ছাড়ে না। রাক্ষুসে অন্ধকারের অভ্যন্তরে নামে-বেনামে কত শত ভয় ঝুলে থাকে। বিজন ঘরে থাকা নবুচাঁদের সঙ্গে ঐ ভয় রগড় করে। একটা আপন মানুষও নেই নবুচাঁদের যার সঙ্গে ও নিজের ভয়, আতঙ্ক, বেদনার বোঝা বাটোয়ারা করে নেবে। এখন আর এই ঘরদোর ভালো লাগে না ওর। সঙ্গী ছাড়া কি ঘরদোর ঘরদোর বলে মনে হয় ?

নবুচাঁদ বুঝে গেছে কপালে আর সঙ্গী-সাথী লেখা নেই। ওর পাঁজরের হাড় দিয়ে বানানো মানুষটাকেও এতদিনে চিনতে পারেনি। তাই তাকে সঙ্গীও করা হয়নি। কপালের লিখন হাজার ঘষামাজা করেও মুছে ফেলতে পারবে না নবুচাঁদ। এর ভেতরে দুয়ারের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা বেত্তমিজ আমগাছটা বেকায়দারকম ভয় দেখায়, দিনভর বৃষ্টি পেয়ে এমনভাবে শাখা-প্রশাখা ছড়িয়েছে গাছটা যে ও বিভ্রমে পড়ে যায়, ‘ঐটা গাছ না দেও ?’

ফুসফুসের ভেতরে ধোঁয়া ঢোকালে বিভ্রম কাটে খানিক। গাছটাকে গাছই মনে হয়, অন্ধকারকে মনে হয় আধোয়া পৃথিবী। এই বিপুলা পৃথিবীতে কে আছে ওর আপনার ? কেউ নেই, কেউ নেই।

এই তো এই সময়ে সাতকুড়ির পুরুষেরা বিবি-বাচ্চার শরীরের ঘ্রাণ নিতে নিতে যেখানে ঘুমাচ্ছে সেখানে নবুচাঁদ কিনা পলকহীন তাকিয়ে অন্ধকারের স্বেচ্ছাচারিতা দেখছে। তিতা একটা ঢেকুর উঠে মুখগহ্বর নোনতা পানিতে ভরে যায়। সন্ধ্যায় মিষ্টি কুমড়া ভর্তা আর দুটো বাটা মাছ ভাজা দিয়ে এক পেট ভাত খেয়েছিল। কিছুই হজম হয়নি। পেট ফুলে আছে। থেকে থেকে বিদঘুটে ঢেকুর উঠছে। কণ্ঠনালিও শুকিয়ে আসছে। পানি খাওয়ার জন্য বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছে না। 

ওঠে না নবুচাঁদ। দিনের পর দিন ঘর ছেড়ে বেরও হয় না। দিনভর ওকে খুঁজতেও আসে না কেউ। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। তারপর রাত নামে, দীর্ঘ আর বিভীষিকাময়। একা ঘরে বিছানায় শুয়ে বসে নবুচাঁদ তড়পায়।

১৮.

অন্ধকার অচিন পাখির মতো ওড়ে… ওড়ে, ছলাৎ ছলাৎ কালো ঢেউ ওঠে। নির্ঘুম পেস্তা বেগম ঢেউ গোনেন, এক, দুই, তিন…

‘ও দিদি লও আয়নাটা দেখি।’

আয়নার সংবাদ জানে বিভা রানি। যেই রাতে গোলচেহারা এসে পেস্তা বেগমের হাতে আয়নাটা তুলে দিয়েছে সেই রাতেই ওর কাছে সংবাদ পৌঁছে গেছে, এরপর থেকেই বিভা রানি তার মাথা খেয়ে ফেলছে। হাজারটা ধমক দিয়েও তিনি বিভা রানিকে কোণঠাসা করতে পারছেন না।

সাতকুড়ির অবস্থা ভালো না। অচিরেই একটা বিস্ফোরণ ঘটবে, সব খবরই পেস্তা বেগমের কানে আসে। গুলবদনের বাড়ির চালে ঢিল পড়া বন্ধ হয়নি। কারা যেন রাতের আঁধারে মুখে গামছা বেঁধে এসে হুমকি দিয়ে গেছে, ঐ আয়না নিয়ে যেন গোলচেহারা ঘরের বাইরে বের না হয়, হলে ওর অবস্থাও সুরাইয়ার মতো হবে।

সেসব কথা আরেকবার বিভা রানিকে মনে করিয়ে দেন পেস্তা বেগম। তবু উত্তেজনায় বিভা রানির সিঁদুর থ্যাবড়ানো মুখ জ্বলজ্বল করে। পেস্তা বেগমের ভেতরে কোনও হেলদোল দেখা যায় না। ভিতরে তরঙ্গ নাচে ঠিকই, তিনি বিভা রানির কাছে ধরা দেন না।

‘আমার গোপাল রে যদি দেহায়, তারেও যদি দেহি!’

এবার লাল হয়ে ওঠে বিভা রানির মুখ। বাইরে থমকে থাকা অন্ধকার ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। পেস্তা বেগম উঠে দাঁড়ান। গোলচেহারা তার কাছে আয়নাটা গচ্ছিত রাখার পর থেকে একবারও তিনি সেটায় হাতে নেননি। ঐ আয়না তার কাছে আমানত স্বরূপ, আমানতের খেয়ানত করেননি পেস্তা বেগম। আজ বিভা রানির উস্কানিতে তিনি না উঠে পারেন না। খাটের নিচে রাখা ট্রাংকটা টান দিয়ে বের করে আয়নাটা হাতে নেন।

বিভা রানি করতালি দিয়ে ওঠে। কাঁপা কাঁপা হাতে ঘরের আলো জ¦ালান পেস্তা বেগম। বিছানার ওপরে রাখা আয়নাটা তিনি হাতে তোলার আগেই বিভা রানি ছোঁ মেরে আয়নাটা হাতে নেয়।

কী দেখায় আয়না ?

আয়নার মধ্যে পলকে ভেসে ওঠে বিভা রানির যন্ত্রণাকাতর মুখ। অন্তরের সব ক্ষত বাইরের চেহারায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিভা রানির রক্তাক্ত হৃৎপিণ্ডটাও দেখা যায়। বেদনাভরা মুখের প্রতিচ্ছবিতে বেশিক্ষণ চোখ রাখতে পারে না বিভা রানি। ওর অন্তরাত্মায় হাহাকার ওঠে। হায়রে সেই সে কত বছর আগে এই দেহ ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়েছিল মিলিটারি আর দেশদ্রোহীরা, সব চিহ্ন থেকে গেছে। আর সামলাতে পারে না বিভা রানি, আয়নাটা বুকে নিয়ে ধপ করে মাটিতে বসে পড়ে।

‘ও দিদি…কষ্ট গো দিদি…।’

‘কী হইছে ? কী হইছে তোর ?’

বিচলিত হয়ে ওঠেন পেস্তা বেগম। বিভা রানি উত্তর দেয় না। খুনখুন, খুনখুন করে কাঁদে। কান্নার প্রলম্বিত সুর রাতকে আরও ভয়াল করে তোলে।

‘আয়না দেইখ না দিদি, সইজ্জ করতে পারবা না।’

কোনও কালেই পেস্তা বেগম বিভা রানির কথা শোনেননি। এবারও শোনার প্রশ্ন আসে না। তিনি এগিয়ে যান। আয়নাটা দু হাতে ধরে নিজেকে দেখতে চান। ওখানে তিনি কই ? দেখেন সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন আধপোড়া নারী। দগদগে ক্ষতে যার পিঠ ফুলে উঠেছে। ঐ ক্ষত এত তাজা এত টসটসে যে আর তাকিয়ে থাকতে পারেন না পেস্তা বেগম। আর্তনাদ করে ওঠেন।

জাগতিক নিষ্পেষণে শরীরের জ্বালাপোড়া চাপা পড়ে গিয়েছিল পেস্তা বেগমের। বেঁচে গিয়েছিলেন তিনি। এখন গোলচেহারার আয়নাই তাকে পুনরায় আগুনের দিকে ঠেলে দিতে চাইছে। আগুনের এক নাম মৃত্যু। কিন্তু পেস্তা বেগম তো মৃত্যুঞ্জয়ী, আগুনের অদম্য শিখাও তাকে মারতে পারেনি, শরীরে চিহ্ন রেখে গেছে শুধু।

কবের কথা ? সেই অনেক অনেক বছর আগে। ঐ বছর সাতকুড়িতে বৃষ্টি হয়েছিল খুব। বৃষ্টি থামলে কদিন সাতকুড়ি কবরস্থানের মতো নিথর পড়েছিল। এই উঠানে, এই উঠানেই পেস্তা বেগমের শাশুড়ি কর্ফুল মাইয়ের লাশটা পড়েছিল, আরও লাশ ছিল এখানে, ওখানে, ঐ দূরে। কার কার লাশ মনে আছে, চেহারা মনে নেই। চোখ বন্ধ করলে এখন আর কাউকে দেখতে পান না পেস্তা বেগম, ব্যথার বিলোড়নে শুধু ভেঙেচুরে যান। ঐ আয়না কি তাদের অবয়ব দেখাতে পারবে ?

বিভা রানি ছুটে এসে পেস্তা বেগমকে আঁকড়ে ধরে।

‘ও দিদি, তুমি কি দেখলা ?’

এ যেন শৈশবের সেই খেলা, আমি যা দেখি তুমি তা দেখ কি ? আমি দেখি এক গাঙ রক্ত, তুমি ?

পেস্তা বেগমের শরীর নিথর হয়ে গেছে। ধমনীর রক্তপ্রবাহ অচঞ্চল হয়ে উঠেছে। আয়নার হুজ্জতি ভালো লাগছে না তার। বিভা রানিকে দূরে ঠেলে দিয়ে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, ‘কিছু দেহি নাই, আমি কিছু দেহি নাই।’

বিভা রানিও চিৎকার করে ওঠে, ‘মিছা কথা কও ক্যান দিদি!’

পেস্তা বেগম জোরে জোরে মাথা নাড়েন, ‘সত্যি… সত্যি… কিছু দেহি নাই।’

আচমকা প্রেতায়িত শিখা ঘিরে ধরে পেস্তা বেগমকে। তিনি বের হওয়ার পথ পান না। লাল কমলা স্ফুলিঙ্গ লাফিয়ে উঠে তাকে পোড়াতে চায়। তিনিও লাফ দিয়ে সরে যেতে চান। আর তখনই গোলচেহারার আয়নাটা হাত ফসকে মাটিতে পড়ে যেতে যেতে হাওয়ার অদ্ভুত এক কম্পনে বাঁধা পেয়ে বিছানার ওপরে আছড়ে পড়ে।

১৯.

সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হয়নি এখনও। সূর্য মুঠো মুঠো কমলারঙ ছড়িয়ে অস্ত যাওয়ার পাঁয়তারা করছে। হাওয়াশূন্য প্রকৃতিকে শুষ্ক, রুক্ষ দেখাচ্ছে। নির্জনতা ছিন্ন করে সহসা একটা পুরুষকণ্ঠ চিৎকার করে ওঠে। কণ্ঠটা আতহার জামালের। নবুচাঁদের বাড়ির ভেতর থেকে ছুটে আসছে সে। তার মুখ দিয়ে কলেমা বের হচ্ছে, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।’ দেখে মনে হচ্ছে সে খুব ভয় পেয়েছে। রাস্তায় গোলচেহারাকে দেখে খানিকটা দম নেয়ে আতহার জামাল। চিৎকার করে ওঠে, ‘খবরদার নবুর বাড়ির দিকে যাইস না… আমি থানায় যাইতাছি, পুলিশ ডাকা লাগব।’

সম্পর্কের হিসাবের খাতা বন্ধ করতে ঐ দিকেই যাচ্ছিল গোলচেহারা। আতহার জামালের নিষেধাজ্ঞা ওকে আরও উসকে দেয়। গোলচেহারা থামে না দেখে আতাহার জামাল চেঁচিয়ে ওঠে, ‘ঐদিকে যাইস না, যাইস না কইলাম… নবু আর নাই, নবু আর নাই…।’

এবার মাতালের মতো ছোটে গোলচেহারা। নবুচাঁদের ভিটায় এসে থামে। বিজন বাড়িতে দাঁড়ানো আমগাছটা বরাবরের মতো ওকে অভ্যর্থনা জানায়। গোলচেহারার মুখমণ্ডল থেকে রক্ত সরে যায়, গাছের দিকে চোখ আটকে থাকে। কী দেখছে! গোলচেহারার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার জোগাড় হয়। কোথা থেকে টোপলা ছুটে এসে ওর পায়ের কাছে দাঁড়ায়। সুরাইয়াদের বাড়ি থেকে প্রায় বিতাড়িত হয়ে এই বাড়ির পাকঘরে আশ্রয় নিয়েছে সে। নবুচাঁদের ফেলে রাখা ঝুটা ভাত পেট ভরে খেয়ে আলস্যভরে ঘুমাচ্ছিল। এদিকে এত কাণ্ড হয়ে গেছে টেরই পায়নি। ঘাড় উঁচু করে সবুজ চোখজোড়া মেলে টোপলাও তাই আমগাছের দিকে তাকায়। তারপর ম্যাও ম্যাও আওয়াজ তুলে গোলচেহারার পায়ের কাছে কুণ্ডুলি পাকিয়ে শুয়ে পড়ে।

পাংশুটে চেহারায় গোলচেহারা সশব্দে কলেমা পড়ার চেষ্টা করে, ওর শুকনো আলজিভ, কণ্ঠনালি ভেদ করে শব্দ বের হয় না। হতবুদ্ধি হয়ে পড়া গোলচেহারা দেখে নিয়তি পাল্টে দিতে নিজের মৃত্যুদৃশ্য নিজেই রচনা করেছে নবুচাঁদ। পানিতে মরতে হয়নি নবুচাঁদকে, নবুচাঁদ ওর দাদা সোনাই চাঁদের লাগানো আম গাছের প্রকাণ্ড একটা ডালে ঝুলে পড়েছে।

আধঘণ্টার মধ্যে পুলিশ চলে আসে। নবুচাঁদের লাশ নামিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে হানিফ, মোজাফ্ফর মেম্বারসহ আরও জনা ছয়েকের সই-স্বাক্ষর নেয়। বিপদের মাত্রাতিরিক্ত সম্ভাবনা আন্দাজ করে আতহার জামাল স্বাক্ষর করতে অনীহা প্রকাশ করলেও পুলিশের ধমক খেয়ে সে কাগজে স্বাক্ষর করে।

লাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের অভাব নেই। অভাব শুধু চোখের পানি ফেলার মানুষের। উৎসুক জনতার মধ্যে এমন কাউকে দেখা যায় না যে নবুচাঁদের প্রস্থানে কাঁদবে, যদিও কিছু মানুষ হায় আফসোস করতে করতে মৃত্যুর নেপথ্যের কারণ হিসেবে ভিন্ন এক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। ঐসব ইঙ্গিত বোঝার চেষ্টা না করেই নবুচাঁদের লাশটা ভ্যানে তুলে পুলিশের গাড়িটা গর্ভেশ্বরীর খাঁ খাঁ করা বুক মাড়িয়ে গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে যায়।

নবুচাঁদের মৃত্যুর পর নতুন বিপত্তি দেখা দেয়। এই বিপত্তি মূলত গোলচেহারার। বিপদ-আপদের আসলে শেষ নেই গোলচেহারার জীবনে। যেই আয়না বিপত্তারিণী হতে পারত সেটাই ক্রমশ জীবন হরণকারী হয়ে ওঠে।

ঘরের চালে ঢিল পড়ে। গোলনাহারের মতো ডাকাবুকো মেয়েও কোণঠাসা হয়ে ঘরে বসে থাকে। আগের মতো বাড়িঘরের কাজে গুলবদনকে কেউ তেমন ডাকতে আসে না। স্বামীর লাশ পাওয়ার পর গুলবদনের তেজও কেমন থিতিয়ে এসেছে। মেয়েদের কথায় কথায় শাসন করে না। সকাল সকাল দু-এক বাড়ি ধর্না দিয়ে যা কাজ পায় তা সেরে নিয়ে নিজের বাড়িতে এসে ঘাপটি মেরে থাকে। তার ওপর আবার আতহার জামালের বিবি আজ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, কাল থেকে ওর কাজে আসার দরকার নেই। আতহার জামাল পছন্দ করে না।

সাতকুড়ি গ্রামের মানুষেরা মানবেই বা কেন। অপঘাতে মৃত্যু হলে পুলিশই তো নড়েচড়ে বসে। আত্মহত্যা না হত্যা তা নিয়ে তদন্ত করে করে জান বের করে ফেলে সবার। উলফত আরার মৃত্যুর পরেও কদিন ধকল গেছে। যদিও উলফত আরার মৃত্যুর পর মরাবাড়িতে আর দশটা বাড়ির মতো বিলাপ হয়নি, কোরআন শরিফ পাঠ করেনি কেউ, আগরবাতিও সুবাস ছড়ায়নি। মরাবাড়িতে দফায় দফায় সান্ত্বনা দিতেও যায়নি কেউ। সাতকুড়ির মানুষের মধ্যে চাপা আতঙ্ক বিরাজ করেছে, এই বুঝি পুলিশ কাউকে ধরতে আসে। কিন্তু যেই গতিতে সুরাইয়া আর ওর মা উলফত আরার লাশ নিয়ে ফেরত দিয়েছিল পুলিশ সেই গতি আর পরে থাকেনি। এক দুবার এসে হানিফ, হাফিজ, পলু সরেন, আতহার জামাল, মেম্বার মোজাফ্ফরসহ আবু জাফরের সই-স্বাক্ষর নিয়ে গেছে।

আর নবুচাঁদের পক্ষ হয়ে মামলা করার কেউ নেই বলে এই যাত্রা রক্ষা পাওয়া গেছে। তাই বলে তো আর হয়রানির শেষ হয়নি। আজ সকালেও আতহার জামালের জবানবন্দি নিতে এসেছিল পুলিশ, সে-ই তো নবুচাঁদের লাশটা প্রথম দেখেছে। বিরক্ত আতহার জামাল দলে-বলে তাই মোজাফ্ফর মেম্বারের কাছে গেছে, জানিয়েছে, একটা সমাধান না করলে সাতকুড়িতে বসবাস করাই মুশকিল হয়ে যাবে। এমনিতেই প্রকৃতির নিষ্ঠুরতায় চাষ-বাসের অবস্থা সঙ্গীন তার ওপর আবার একের পর এক অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

আজও বৃষ্টি নেমেছে। তুমুল বৃষ্টি, যেন বান ডেকে আনবে, সাতকুড়িকে ডুবাবে, ভাসাবে। কিন্তু সাতকুড়িতে যেই গজব নেমেছে তা ভাসিয়ে নেবে কি ? তার কোনও লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। বরং বৃষ্টি গোলচেহারার বাপের লাশের মতো সাতকুড়ির ভূতল থেকে সব বিপদ আপদ টেনে বের করে আনছে। ফসল কাটার সময় নামা এই বৃষ্টি অপয়া, অলক্ষুণে। ধানকাটা সারা না হতেই দুনিয়া অন্ধকার করে ঢল নামছে।

এই গ্রামে গোলচেহারার আয়নাই কুবাতাস এনেছে―এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সাতকুড়ির মানুষের আর দেরি হয় না।

২০.

পেস্তা বেগম ঘরের ভেতরে বন্দি হয়ে আছেন। কেউ তাকে বন্দি করেনি, তিনি নিজেই নিজেকে চার দেয়ালের মধ্যে আটকে রেখেছেন। বিভা রানির প্যাঁচাল এড়িয়ে যাওয়ার তাই কোনও উপায় মিলছে না।

‘ও দিদি, রেহেল চাঁদের ছেলেটা ফাঁস নিল। আমাগো সোনাতনও তো ফাঁস নিছিল। সোনাতনের স্বামী যুদ্ধে গেছিল। সোনাতনরে তাই ওরা বেবস্ত্র করল। যা মনে চাই তা করল। সহ্য করতে না পাইরা সোনাতন ফাঁস নিল।’

কথা বলেন না পেস্তা বেগম। বলেন না, ‘তুই থাম।’ সোনাতনের মুখটা চোখের সামনে ভাসে। সেই দিনটাও স্পষ্ট দেখতে পান তিনি।

সাতকুড়িতে পা রেখেই বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল ওরা। বাড়িঘরের সঙ্গে মানুষও পুড়েছে। পলায়নপর মানুষের পদশব্দে চাপা পড়েছে মানুষের আর্তনাদ। পেস্তা বেগমের জা সোনাতনের ছেলে সাত বছরের মিলন আর বিভা রানির ছেলে গোপাল খেলছিল, হঠাৎ হৈ-হাঙ্গামায় ভয় পেয়ে দুজনে ছুটে এসে পেস্তা বেগমদের বাড়ির খড়ের গাদায় লুকিয়েছিল। কী এক পাউডার ছিটিয়েছিল মিলিটারিটা, আগুন জ¦লে উঠেছিল দাউ দাউ। ছেলে দুটো পুড়ে মরেছে। ছেলেকে বাঁচাতে গোয়াল ঘরে লুকিয়ে থাকা সোনাতন ছুটে এসেছিল। দূরে বাঁশঝাড়ের আড়ালে যেতে যেতে পেস্তা বেগম দেখেছে, ওরা সোনাতনকে ধরে নিয়ে জঙ্গলের ভেতরে ঢুকেছিল। অনেকক্ষণ পর যখন মিলিটারিরা চলে গিয়েছিল, সোনাতন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসেছিল, নগ্ন সোনাতনের ঊরু থেকে রক্ত ঝরছিল।

‘ও দিদি, রেহেল চাঁদের ছেলেটা যে মইরা গেল, ওর ভাইটাও তো মরছে। বইনও মরছে। সব পানির মরা। নবু পানিতে মরল না দিদি ? ওর কপালের লিখন খণ্ডাইল কেডা ? অয় যে পানিতে মরল না ? ও দিদি, মনে আছে তোমার, যুদ্ধের বছর কেমুন বিষ্টি পড়ছিল ?’

পেস্তা বেগমের মন কোথায় পাক খায়, তিনি জানেন না। বিভা রানি শ্রোতাকে নিরুত্তর দেখেও অনর্গল বলে চলে, ‘ঐ ফির পানি হইছিল খুব, গর্ভেশ্বরীও ফুইলা উঠছিল। কিন্তুক কোনও লাভ হইল না। ওরা ঠিকই সাতকুড়িত ঢুকল। পয়লা পরথম মুক্তিরা বড় বিরিজটা ভাইঙা দিলে আমাগোর মানুষগুলারে আর ছুঁইতে পারত না ওরা। ও ভগবান… আর কয়টা দিন পানি দিলা না কেন তুমি… ও ভগবান…’

‘তুই থাম তো…এত পুরান কথা তোলোস ক্যান ? তোর স্বভাব বড় খারাপ।’

পেস্তা বেগমের ধমক খেয়ে লজ্জা পায় কি না বিভা রানি কে জানে, ঘাড় নিচু করে বলে, ‘আহারে অমন জুয়ান পোলা ফাঁস নিল, অয় যুদ্ধে গেল না! মিলিটারি মারল না! দেশদ্রোহী মারল না! বেকুব পোলা। ও দিদি, আমার গোপাল ডাঙর হইলে যুদ্ধে পাঠামু।’

 পেস্তা বেগমের মন চায় তিনি বিভা রানিকে জন্মের মতো একটা ধমক দেন, বলেন, ‘এহন কি দ্যাশে যুদ্ধ লাগছে যে যুদ্ধে যাইব ?’ তার মাথার শিরা দপদপ করে। এক বিপদের ওপরে আরেক বিপদ। নবুচাঁদের সঙ্গে গোলচেহারার আশনাইয়ের কথা কম-বেশি সবাই জানে। কোন দুঃখে নবু ফাঁস নিল তার কার্যকারণ মিলাতে সাতকুড়ির মানুষের কোনও সমস্যা হবে না। এর সঙ্গে এখন আবার যোগ হয়েছে গোলচেহারার আয়নার তেলেসমাতি।

‘মেয়েটারে বাঁচতে দিবে না ওরা। সুরাইয়ার লাহান হাল না করে…’

কঁকিয়ে ওঠেন পেস্তা বেগম। বিভা রানি খুশি হয়ে ওঠে, ‘আগেই কইছি দিদি দ্যাশে যুদ্ধ চলে, যুদ্ধ শ্যাষ হয় নাই। ঐ যে দেশদ্রোহীর দল মাইয়াগো টাইনা নিয়া যায়। তোমারেও তো দেশদ্রোহীরা টাইনা নিয়া গেছিল। মনে আছে ?’

কড় কড় কড়াৎ শব্দে বাজ পড়ে। চমকে উঠে পেস্তা বেগম কথা হারিয়ে ফেলেন। তার শরীর কাঁপছে। বুকে চাপা দেওয়া ব্যথা-বেদনা এক খাবলা দিয়ে যেন টেনে বের করে এনেছে বিভা রানি। আবার বাজ পড়ে। এবার আর চমকান না পেস্তা বেগম, রেগে ওঠেন। দূর দূর করে তিনি বিভা রানিকে তাড়াতে চান, ‘তুই যা… তুই যা। এক্ষনি আমার ঘর ছাইড়া বাইর হ।’

দুপুরের পর থেকে ঘরদোর নিস্তব্ধ হয়ে আছে। উলফত আরা মারা যাওয়ার পর থেকেই বাড়িঘরের এই অবস্থা। তিন বোনের সাড়াশব্দও পাওয়া যায় না সহজে। মাঝেমধ্যে টোপলাই এই ঘর ঐ ঘর হুড়পাড় করে। আজ বৃষ্টির দিন চারদিক আরও ঝিম ধরে আছে। থেকে থেকে মেঘ গুড় গুড় করছে শুধু। হঠাৎ হঠাৎ বেমক্কা শব্দে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বৃষ্টির ছাঁট বাড়ছে, কমছে।

এর ভেতরে পেস্তা বেগমের হুমকিধামকি কেউ শুনছে না। যার জন্য বলা সে এক পাও নড়েনি। আকাশে আলো কাঁপছে। বিদ্যুতের তরঙ্গ এদিক থেকে ওদিক যাচ্ছে। মনে হচ্ছে চকমকি পাথর ঠুকছে কেউ, আগুন ধরে যাবে আকাশের গায়। অমন আগুন সাতকুড়িতে আগেও দেখা গেছে। যেই আগুনে লোপাট হয়েছিল পেস্তা বেগম আর মিয়াজান ব্যাপারির ভরা সংসার।

এই গ্রামেরই দেশদ্রোহী আজমের সঙ্গে সাতজন পাকিস্তানি সেনা ঢুকেছিল এই বাড়িতে। প্রথমেই বড় ঘরটায় আগুন দিয়েছিল। বৃদ্ধা কর্ফুল মাই চিৎকার করে উঠেছিল বলে তার বুক বরাবর গুলি করেছিল একজন সেনা। মিয়াজান ব্যাপারি তখন ঘরে ছিল না। বাঁশঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা পেস্তা বেগমকে টানাটানি করে ঘরে তুলতে তুলতে সেনারা বিশ্রি ঢঙে হাসছিল। সেনাদের হাতে পায়ে ধরে অনেক কেঁদেছিলেন তিনি। বাবাগো, ভাইগো বলে আছড়ে পড়েছিলেন মাটিতে। কিছুতেই কেউ বশ মানেনি। কতক্ষণ ওরা পেস্তা বেগমকে নিষ্পেষণ করেছিল মনে নেই তার। যাওয়ার আগে সেনারা তাকে আগুনের মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল। সেই আগুনে ঘরদোরের মতো তার পিঠটাও পুড়ে ছারখার হয়ে গিয়েছিল।

পেস্তা বেগম কঁকিয়ে ওঠেন, তার পিঠে এখনও আগুনে পোড়া দাগ আছে। আগুনের ভয় যায় নাই তাই। অন্ধকারের মতো আগুনের ভয়ও তাকে হাপুসহুপুস গিলে খায়। ভয় ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনায় খুশি খুশি দেখা যায় বিভা রানিকে। ওর চকচকে চোখে মুখে দৃষ্টি দিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ান পেস্তা বেগম, নড়বড়ে পায়ে ছুটে গিয়ে বিভা রানিকে টেনে ঘরের বাইরে বের করার চেষ্টা করেন।

‘যা বাইর হ, বাইর হ।’

‘ন…না…!’ নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বিভা রানি কঁকিয়ে ওঠে।

‘না, তুই যাবি… এহনই যাবি… আর আইবি না… আর আইবি না। তুই মইরা গেছোস… তুই মইরা গেছোস… তুই মরা…’

বিভা রানি কী করে যাবেন! ঘরের দরজা আটকে টানটান হয়ে শুয়ে আছে টোপলা। ঘন ঘন হাই তুলছে। আজ শরীর ভারী, খাওয়া বেশি হয়ে গেছে। দুপুরে ট্যাংরা মাছ রান্না করেছে আফরুজা। মা মারা যাওয়ার পর রান্নার ভার ওর ওপরে পড়েছে, এখনও তেল ঝালের আন্দাজ হয়নি। খেতে স্বাদ হয়নি তরকারি, এর ওপরে আবার ট্যাংরা মাছ দু চোখে দেখতে পারে না হুমায়রা আর জুয়াইরাহ। দুই বোনই আজ ফেলা ফেলা করে ভাত খেয়েছে। শেষ পাতের মাছমাখা ভাতের পুরোটাই জুটেছে টোপলার কপালে। পেটপুরে খেয়ে সেই তখন থেকে আয়েশ করে শুয়ে আছে টোপলা। হাই তুলছে আবার। একবার ম্যাও করে ডাকছে না, লাফিয়ে উঠে জায়গা থেকে সরছেও না, যেন ঘর থেকে কে বের হলো না হলো তাতে ওর কিছু আসে যায় না।

২১.

ধলাই মাঠে জাদু দেখানোর দিন যেই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছিল গোলচেহারা আজও সেই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু ওর সামনে আয়নাটা নেই। তবে আদুল ডান পা সামনে বাড়িয়ে আছে ও, যেন একটিবার ইঙ্গিত পেলেই ছুটে গিয়ে আয়নাটা নিয়ে আসবে।

সালিশে উপস্থিত কেউই আর ঐ সাহস দেখায় না। নেতৃস্থানীয় একজন শুধু তর্জনী তুলে সতর্ক করে, ‘আইজ কোনও ভেলকি দেখানোর কাম নাই। সাতকুড়ি গ্রামে থাকতে হইলে ঐসব ভেলকিবাজি বন্ধ করা লাগব। নইলে… মা, মাইয়া তিনটারে এক কাপড়ে গ্রাম ছাড়তে হইব। কী কন মেম্বার সাব ?’

কথা শেষ না করে চেহারার গাম্ভীর্য ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে মানুষটি। তার পাশে বসে থাকা আতহার জামাল উসখুস করে। তার চোখে-মুখে ভয়ের রেখা দেখা যায়। কাউকে বুঝতে না দিয়ে মিনমিনে স্বরে আতহার জামাল বলে, ‘ঠিক কথা, মোহনের পরিবারের কারণে সাতকুড়িতে আজ শান্তি নাই। একটা ফয়সালা করার দরকার। মেম্বার সাব বলুক কী করা যায়।’

মেম্বার মোজাফ্ফর চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে। উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করার কঠিন দায়িত্ব তার ওপরে পড়েছে। চেয়ারম্যান সাহেব ওমরাহ হজ পালন করতে আরব দেশে গেছেন। এইসব বিচার-সালিশে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র তারই আছে। অবশ্য কোর্টকাচারির দিগদারিতে আজকাল চেয়ারম্যান সাহেবও সালিশ ডাকতে ভয় পান। এখতিয়ারের বাইরে কিছু করলেই আদালত থেকে তলব চলে আসে। তার ওপরে আছে সাংবাদিকদের অত্যাচার। কিছু একটা পেলেই পত্রিকার পাতায় তুলে দিয়ে দেশজুড়ে হৈচৈ ফেলে দেয়। তাই এখন সব বিষয়ে বিচার-সালিশ ডাকা কমিয়ে দিয়েছেন তারা। কিন্তু গত রাতে গ্রামবাসী গিয়ে মোজাফ্ফরকে চেপে ধরেছে, একটা কিছু না করলেই না।

‘সবার আগে বন্ধ করতে হইব ঐসব জাদুটোনার কাজ।’

ভিড়ের মধ্য থেকে কথাটা কে বলে তার মুখটি ভালো করে দেখতে পায় না গোলচেহারা। ও মাথা উঁচু করে, উত্তেজিত মানুষগুলোর মুখ পরখ করে।

এতক্ষণ তার কাছাকাছি নিথর পাথরের মতো বসেছিল গুলবদন, এবার সে উঠে দাঁড়িয়ে কোমরের দুপাশে দুহাত গেঁথে বলে, ‘যা করবেন করেন, গতর খাইটা খাই আমরা, কামাইরুজির সময় এইসব দিগদারি ভালা লাগে না।’

নেতৃস্থানীয় লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে ফের আঙুল তোলে, ‘একদম চক্ষু নামায় কথা বলবি বেয়াদব মাইয়া মানুষ! কোনও গৃহস্থ বাড়ি তোরে আর কাজে নিব না। তখন গতর বেইচা খাইস।’

‘খারাপ কথা বলবেন না, তুই তোকারিও করবেন না, করলে বেয়াদবি করা ছাড়া আর কোনও উপায় থাকব না।’

মায়ের ঋজু ভঙ্গি দেখে গোলচেহারার পেশি টান টান হয়ে যায়। সকলে দেখে উদ্ধত নারীটির খোঁপা শিথিল হয়ে তার ঘাড়ের কাছে নামে। দু হাত উঁচু করে এল খোঁপা মজবুত করে গোলচেহারা। কোমরে গেঁথে রাখা শাড়ি খানিক উঠে আসে। বেপর্দা নারীর দেহের সংকোচন প্রসারণ দেখে উপস্থিত পুরুষদের দেহ-মনে চেনা অস্বস্তি জাগে। এদের অবস্থা দেখে খোঁপা লুটিয়ে হাসে গোলচেহারা।

‘আয়নাখান আনি ? সগলে নিজের চেহারাখান একবার দ্যাখেন ?’

ঝাঁকের মধ্য থেকে আঙুল তুলে কেউ কেউ শাসায়, ফের এই আয়না নিয়ে জাদু দেখাতে এলে মোহন জাদুকরের মতো তার মেয়েও শেষ হয়ে যাবে। বাবার নাম শুনে ক্ষণিকের জন্য স্থির হয়ে যায় গোলচেহারা। ওর পেছনে দাঁড়ানো গোলনাহার অস্থির স্বরে বলে, ‘এখনই যা, আয়নাখান আন, দ্যাখ কেমন মজা হয়!’

মজা দেখতে সালিশি পরিষদের সামনে মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে থাকে অথর্ব মানুষের দল। এরা ঝিমধরা মাছের ঝাঁক, নিজেরাই সারি বেঁধে টুনি জালে মাথা ঢুকিয়ে দেয়। সুযোগ পেয়ে বড় মাছেরা গোলনাহারের অসভ্যতার বিচারকাজও সেরে নিতে উদ্যোগী হয়। তারা জানে, স্বামী পরিত্যক্তা গোলনাহার জাদুকর বোনের চেয়েও দুশ্চরিত্রা। তার পেটের সন্তানের পিতা শনাক্ত হয়নি সে কথা চাউর হলেও এতদিন কেউ টুঁশব্দটি করেনি। এখন সময় এসেছে।

আসন্ন বিপদ বুঝেও গোলনাহার মুখে আঁচল চেপে হাসে। ওদিকে সালিশে গোলচেহারার আয়নার ভাগ্যও নির্ধারিত হয়। স্থির হয় চেয়ারম্যান সাহেব দেশে ফিরলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। আপাতত জাদু দেখাতে পারবে না গোলচেহারা, ঐ আয়নাও ঘরে রাখতে পারবে না। মেম্বারের কাছে জমা দিতে হবে। জাদুটোনার জিনিস ঘরে রাখা শেরেকি গুনাহ, এ হলো আল্লাহর উপরে দিগদারি করা। কারণ একমাত্র তিনিই জানেন বান্দার ভেতর-বাহির। আয়নার মতো জাগতিক তুচ্ছ পর্দায় ভেসে ওঠা দৃশ্য আসলে গোলচেহারার করা কুফরি কালামের প্রভাব। তার বাপও কম টাউটারি করে নাই। মেলায় মেলায় হাত সাফাই দেখিয়ে বেড়িয়েছে। যদিও সে মরে গিয়ে সাতকুড়ি গ্রামকে জাদুর মতো বেশরিয়তি কাজের দায়ভার থেকে মুক্তি দিয়েছে। এবার তার মেয়ের পালা।

এদিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগেই গুলবদন স্ফূর্তির স্বরে ঘোষণা দেয়, ‘গোলু তোর আয়নাখান নিয়া আয়, সগলের চরিত্তিরখান একটু দেহি। দেহি শয়তান কার ভিতরে কী পুইরা রাখছে।’

মায়ের নির্দেশে গোলচেহারা সামনে পা বাড়ায়। তাই দেখে সভায় যেন বা মৌমাছির ঝাঁক হামলা দেয়, মাগরিবের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে বলতে বলতে ভিড় পাতলা হতে শুরু করে। ভিড়বাট্টায় যেই মানুষটি এতক্ষণ কারও দৃষ্টিগোচর হয়নি এবার তাকে দেখা যায়। নেংড়া শাজানকে দেখে গোলচেহারার ভেতরে কোনও হেলদোল হয় না। সালিসের অমীমাংসিত সব সিদ্ধান্তের কথা ভেবে ও নেংড়া শাজানকে উপেক্ষা করে হাসে।

ওদিকে সেদিন যেই ইটটা বড় মাঠে মারতে পারেনি নবুচাঁদ, আজ নেংড়া শাজান সুযোগ পেয়ে তা আর হাতছাড়া করে না। উড়ুক্কু ইট ফের লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। নিজেকে বাঁচাতে গোলচেহারা মাটিতে বসে পড়তেই সেটি ঝটকায় গিয়ে গোলনেহারের ঢাউস পেটে আছড়ে পড়ে। গোলনেহারের ভারী দেহটা তাল সামলাতে না পেরে বেঁকেচুরে মাটিতে লুটায়। ঘটনার আকস্মিকতায় গুলবদন আর গোলচেহারা কোনও প্রতিক্রিয়া দেখাতেও ভুলে যায়। ইন্দ্রিয়সমূহের ক্ষমতা লোপ পেয়েছে যেন এমনভাবে দুজনে একই জায়গায় একই ভঙ্গিতে বসে থাকে। ঊর্ধ্ব আকাশে মৃতদেহের খোঁজে শকুন ওড়ে। উড়তে উড়তে ওরা নিচে নেমে আসে, ভাব বুঝে আবার উপরে উঠে যায়। শকুনের চক্করের সঙ্গে দূর আকাশে কিছু সান্ধ্যপাখিও ডানা ঝাপটায়।

সন্ধ্যা ডিঙিয়ে দ্রুতগতিতে রাত নামে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অপরিচ্ছন্ন বিছানায় সেই রাতে গোলনাহারের মৃত সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। ঘরে ফিরে শোকে কিংবা শ্রান্তিতে গোলচেহারার চোখ ভেঙে ঘুম নামে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ও স্বপ্ন দেখে, রাতের অন্ধকার ফুঁড়ে দৃশ্যমান হওয়া এক আলোকরেখা বরাবর মোহন জাদুকর দাঁড়িয়ে দু হাতে আশ্চর্য সেই আয়না ধরে রেখে অবিশ্রান্ত হাসছে।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button