আর্কাইভউপন্যাস

উপন্যাস : বেনাপোল এক্সপ্রেস : সাব্বির জাদিদ

ট্রে ন চলতে শুরু করার অনেকক্ষণ পরও মা-বাবার শুকনা মুখটা চোখে লেগে রইল তরুর। এর আগেও সে অনেকবার ট্রেন ভ্রমণ করেছে। কখনও মামার বাড়ি গেছে, কখনও খালার বাড়ি। স্টেশনের কোলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে যার একাধিক আত্মীয় বাড়ি, দুদিন পরপর তাকে ট্রেনে উঠতেই হয়। কিন্তু এবারের মতো একাকী বিষণ্ন ট্রেনভ্রমণ কখনও আসেনি তরুর জীবনে। মাইলস্টোন কলেজে চান্স পাওয়ার পর অবশ্য উৎফুল্লই হয়ে উঠেছিল ও। মা-বাবা থেকে শুরু করে আত্মীয়-স্বজন, সকলে ওর এই জীবনটাই কামনা করে আসছিল―তরুর যে মেধা, ও ভালো কোনও কলেজে চান্স পাক। সবার সামনে তাদের মুখ উজ্জ্বল করুক। এলাকার বদরুন্নেসা কিংবা হদিরুন্নেসা, যেসব কলেজের ক্লাসরুমের বেঞ্চের ঠ্যাং ভাঙ্গা থাকে, শিক্ষকেরা নিজেরাই ক্লাস কামাই দিতে ওস্তাদ, এই সব কলেজ তরুর জন্য না। মাইলস্টোনে চান্সের সংবাদটা চাউর হলে মসজিদে মিলাদ দিয়েছেন বাবা। মিলাদের জিলাপির একটা অংশ পাড়ায় বিলি করেছেন মা। যে সাফল্যের জন্য বাড়িতে আনন্দের এমন ফল্গুধারা, আজ সেই সাফল্যের দিকে এগিয়ে যেতে গেলে তরুর অবাধ্য চোখে জল আসে বারবার। কয়েক বছরের জন্য বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার প্রশ্নে বিষণ্নতা ওকে গ্রাস করে পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের মতো। শরীরের অঙ্গের মতো প্রিয় হয়ে ওঠা সবুজ জন্মগ্রাম ছেড়ে ও কীভাবে থাকবে গাছপাতাহীন নিষ্ঠুর ঢাকায়! এমন যদি হতো, মাইলস্টোনে সে পড়বে, কিন্তু থাকবে বাড়িতে, কত ভালো হতো!

আজ প্লাটফর্মে বাবা-মাকে ফেলে বেনাপোল এক্সপ্রেসের বাঁশি বেজে উঠলে ওর বুকের মাঝে বেজে উঠেছিল বিপন্নতার হুইসেল। ওর কেন জানি মনে হচ্ছিল, এরপর আর কোন দিন ওর স্থায়ীভাবে বাড়িতে ফেরা হবে না। মায়ের হাতের রান্না কিংবা পুকুরে মাছ ধরার সময় বাবার পাশে কৌতূহল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হবে না। শীতের সকালে উঠানের কোনায় নক্ষত্রের মতো ফুটে থাকা সজনে ফুল দেখা হবে না। আর এইসব ভেবে ওর বুকের ভেতরটা শূন্য শূন্য লাগছিল আর চোখের কোনা ভিজে উঠছিল অব্যক্ত ব্যথায়। তখন নিজেকে প্রবোধ দিচ্ছিল তরু―আগামী সপ্তায়ই সে ছুটি নিয়ে বাড়ি আসবে এবং প্রতি সপ্তায়ই সে একবার করে বাড়ি আসবে। এই সিদ্ধান্ত কতটা বাস্তবায়নযোগ্য―ভেবে দেখার মানসিক স্থিতি ছিল না তরুর। তবে সিদ্ধান্তটা নিয়ে ওর বুকের ভার খানিকটা হালকা হয়েছিল।

ট্রেন যত দূরে সরছিল, ভিড়ের মাঝে মা-বাবার মুখ তত ছোট হচ্ছিল। এক সময় যখন তাদের বিষণ্ন মুখ ভোরের দুটি বিবর্ণ তারার মতো দিগন্তে ডুবে গেল, তরুর চোখ থেকে টুপ করে ঝরে পড়ল এক ফোঁটা অশ্রু। ট্রেনভর্তি মানুষ, তার মাঝে ষোল বছরের একটি মেয়ে কাঁদছে, ব্যাপারটা যতটা না বেদনার তার চেয়ে বেশি কৌতূহলের। সবাই নিশ্চয়ই ড্যাবড্যাব চোখে দেখছে তরুকে। তরু দ্রুত চোখ মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। তার পাশের সিটটা তখনও খালি। তরু শূন্য সিটটার দিকে একবার তাকিয়ে মনে মনে কোনও এক নারী সহযাত্রী কামনা করল, যেন বেনাপোল থেকে ঢাকার এই দীর্ঘ জার্নিটা তার নির্ভার ও স্বস্তিকর হয়। যাত্রীরা তখনও সবাই আসন গ্রহণ করেনি। কেউ কেউ বাংকারে লাগেজ ওঠানোয় ব্যস্ত। কেউ কেউ তখনও সিট খুঁজে চলেছে। এক শিশু মায়ের কোলে চিৎকার করে কাঁদছে। মায়ের মুখে রাগ এবং চূড়ান্ত বিরক্তি। যে কোনও মুহূর্তে চড় খেতে পারে সন্তান। এর মাঝে এক বাদামওয়ালা ‘এই বাদাম এই বাদাম’ বলে চিল্লাচ্ছে। তরু ভেবেছিল, মাত্রই শুরু হয়েছে জার্নি, ট্রেনের সবার যাত্রা মাত্রই ছেড়ে আসা বেনাপোল স্টেশন থেকে শুরু হয়েছে, এই এখনই কারও বাদামের তেষ্টা পাওয়ার কথা না; তাই বাদামওয়ালা যাত্রীদের অভিবাদনের বদলে ধমক খাবে, বিরক্তি থেকে উৎপাদিত এরকমই এক আকাক্সক্ষা নিয়ে বাদামওয়ালার দিকে তাকিয়ে রইল তরু, তখন দেখল, তাকে অবাক করে দিয়ে এক বৃদ্ধ দম্পতি মহাউৎসাহে বাদাম কিনে কোচড় ভরতি করে ফেলেছে। ক্লিষ্ট হাসি হেসে তরু জানালায় তাকাল। মাঠের ভেতর দিয়ে ছুটছে ট্রেন। জলাশয়ের ধারে একটি মৃত গাছের ডালে এক ধ্যানে বসে থাকতে দেখল একটি উজ্জ্বল মাছরাঙ্গাকে। গ্রামের সবুজ মনোরম ছবিগুলো এত দ্রুত পেছনে সরে যাচ্ছে যে, কোনওটাতেই নিবিড়ভাবে চোখ রাখা যাচ্ছে না।

‘বাদাম লাগবি বাদাম’―চমকে উঠে তরু পেছনে তাকাল। বাদামওয়ালা কিশোরটি তার ঘাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটির চোখে চোখ পড়তেই বলল, আপু, বাদাম লাগবি ? মচমচে বাদাম। তার পেছনে কান্নারত সেই সন্তানের মা। তখনও সিট খুঁজে ফিরছে। তরুর পাশের সিট নাম্বারের দিকে তাকাতেই চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল মায়ের। এই ছ্যামড়া, সর তো। ইডা আমার সিট। সর সর। কোলের ধারে সিট থাকতি খুঁজতি খুঁজতি হয়রান হচ্চি। সর সর। বাদামওয়ালা কিশোরকে হটিয়ে মহিলা তরুর পাশে বসার আয়োজন শুরু করে দিলো। এক কোলে তার সন্তান অপর কোলে বিশাল বোচকা। শঙ্কিত হয়ে উঠল তরু। একটু আগে সে নারী সহযাত্রী কামনা করেছিল। কিন্তু ট্যাঁ ট্যাঁ করে কান্নারত কোনও সন্তানের মাকে সে কামনা করেনি, যার সঙ্গে আবার ব্যাগের বদলে কাপড়ের বিশাল বোচকা। শঙ্কিত হয়ে উঠল তরু। এই মহিলার গন্তব্য যদি হয় ঢাকা, তবে তরুর জীবন হয়ে উঠবে স্রেফ ঝালাপালা।

দুই হাত বন্দি অবস্থায় আসন গ্রহণ কষ্টসাধ্য হওয়ায় অনভিজ্ঞ হাতে তরু বাচ্চাটাকে ধরল। মহিলা পায়ের কাছে বোচকা রেখে সিটে বসতে বসতে হাসিমুখে বলল, মেলা ধন্যবাদ। কোনে যাবা ?

ঢাকা। আপনি ? ঘরোয়া পরিবেশে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করলেও বাইরের পরিবেশে তরু সব সময় প্রমিত বলার চেষ্টা করে।

বেশি দূরি না। ঝেকরগাচা। বাপের বাড়ি। তা তুমি কি একা একাই ঢাকা যাচ্চ ?

হ্যাঁ, একাই। কমলাপুর স্টেশন থেকে ছোটকাকু রিসিভ করবে।

খুব ভালো, এই যুগি মিয়া মানুষির এই সাহসডা দরকার। মিনসের জাত দেখুক, আমরাও পারি। আমরা ওগোর মুখাপেক্ষী না। তুমার জন্যি মেলা দুয়া থাইকল।

কথার শুরুতেই জীবনের গভীর জটিলতা নিয়ে আলাপ, চমকাল তরু। এই মহিলার কি কোনও বঞ্চনা আছে ? যার উৎস তার স্বামী কিংবা অন্য কোনও পুরুষ ? নয়তো আলাপের শুরুতেই ওই প্রসঙ্গ তুলবে কেন! শুরুতে বিরক্ত হলেও মহিলার প্রতি এক ধরনের স্বজাতসৃষ্ট প্রসন্নতা ও দরদ অনুভব করল তরু। এই প্রসঙ্গে তরুর মনে পড়ল, রাজধানী থেকে অনেক দূরে, দেশের সীমান্তবর্তী একটি গ্রাম ছেড়ে ওর ঢাকায় পড়তে যাওয়ার কারণ কি শুধুই ক্যারিয়ার, নাকি নিরাপত্তাহীনতাও একটা বড় কারণ ? বাবা-মা সব সময়ই চেয়েছে, পড়ালেখায় তাদের তরু এলাকার মাঝে দৃষ্টান্ত স্থাপন করুক। ভর্তি হোক স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি সে গ্রাম ছাড়ুক, এতটা আশাও বোধহয় করেনি তারা। কিন্তু বছরখানেক আগের সেই ঘটনার পর বাবা-মা কেন, তরুও চেয়েছে গ্রাম ছাড়তে। যে গ্রামকে ও এত ভালোবেসেছে, সেই গ্রাম যদি ওর ভালোবাসার মর্যাদা না দেয়, তবে কেন সে গ্রামে থাকবে!

দুই

চোর চোর! কয়েকজন ক্ষিপ্ত মানুষ হ্যাংলা-পাতলা এক কিশোরকে চোর চোর বলে ধাওয়া করলে নীরব প্ল্যাটফর্মের মৌনতা ভেঙ্গে যায়। রেললাইনের ওপর মৃতের মতো শুয়ে আছে কুয়াশার ঘায়ে জর্জরিত মুমুর্ষূ রোদ। একাকী এক গাভী রেলের ধারের সবুজ ঘাসে মুখ ডুবিয়ে ঘাস খাচ্ছে আরাধনার ঢঙে। তার পিঠে বসে মরা রোদ পোহাচ্ছে এক লেজ ঝোলা ফিঙে। ৫ জানুয়ারির দুপুর, অথচ চারপাশে তাকালে মনে হচ্ছে মাত্রই জাগতে শুরু করেছে প্রকৃতি। খানিক আগেই মাফলারটা ভালো করে গলায় পেঁচিয়ে কংক্রিটের আসনে বসেছিলেন হাসনাত। কংক্রিটের শীতলতা নিতম্ব ভেদ করে সারা দেহে ছড়িয়ে পড়লে দেহের কম্পন থামিয়ে তিনি পায়ের কাছে টেনে নিয়েছিলেন ট্রাভেল ব্যাগ। এক পুরুষ চড়ুই প্লাটফর্মের ওপর হেঁটে হেঁটে খড়কুটো কুড়িয়ে দাম্পত্য-দায়িত্ব পালন করছিল। হাসনাত চড়ুইটিকে দেখছিলেন আর অপেক্ষা করছিলেন ট্রেনের। ট্রেন আসতে এখনও অনেক দেরি। খুঁতখুঁতে স্বভাবের হাসনাত তবু আগেই এসে বসে আছেন। যদি পথের কারণে স্টেশনে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়ে যায়! যদি সময়ের আগেই চলে আসে ট্রেন! এই দেশে কোনও কিছুই অসম্ভব না। তাছাড়া করার মতো হাতে কোনও কাজও ছিল না হাসনাতের। ফলে স্টেশনে এসে বসে থাকা তার জন্য মোটেও বিরক্তির কিংবা ক্লান্তির নয়। তাছাড়া যতক্ষণ বাইরে থাকা যায়, ততক্ষণ বিচিত্র মানুষ ও জীবন দেখা যায়। আবার সেটা যদি হয় স্টেশনের মতো বিবিধ মানুষের আনাগোনামুখর জায়গা, তবে তো কথাই নাই। আজ অবশ্য আগেভাগে স্টেশনে এসে খানিকটা হোঁচটই খেয়েছিলেন তিনি। এত কম মানুষের স্টেশন বহুদিন দেখেননি তিনি। নির্বাচনের কড়াইয়ে ভাসছে দেশ। কড়াইয়ের নিচে জোগানো হচ্ছে লাকড়ি। তাতে কড়াইয়ের তরকারি ফুটছে টগবগ করে। এই যখন অবস্থা দেশের, তখন মানুষ হয়তো দূরের পথে জার্নি করতে ভয় পাচ্ছে। না জানি কখন আবার হরতাল-ধর্মঘটের ডাক পড়ে যায়। এখন অবশ্য হরতাল-ধর্মঘটের চিরায়ত সেই রূপ বা বৈশিষ্ট্য বদলে গেছে। বিরোধীদল হরতাল দিলে রাস্তায় যানবাহন নামে দ্বিগুণ। বিপরীতে বিরোধী দল সমাবেশ ডাকলে সমাবেশ ঠেকাতে হরতাল পালন করে সরকার। বাস তো বাস, লঞ্চ-ট্রেন পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। যেন বিরোধী পার্টি এক জায়গায় জমায়েত হতে না পারে। হাসনাতের তাই বিরোধী দলের হরতালে ভয় নাই। তার যত ভয় সরকারি হরতালে।

টিকিট আগেই করা ছিল। শীত তাড়াতে সিগারেট ধরান হাসনাত। ট্রেনে ওঠার পর সিগারেট খেতে পারবেন না। যশোর থেকে ঢাকা সাত ঘণ্টার জার্নি। এত দীর্ঘ সময় ভাতপানি না খেয়ে থাকা যায়, সিগারেট নয়। হাসনাত একবার ভাবেন, ট্রেন আসার আগ পর্যন্ত চেইন স্মোকিং করবেন। দীর্ঘ সময় সিগারেট ঠোঁটে না তোলার আগাম কাফফারা। সেই লক্ষ্যেই প্রথম সিগারেটে ধোঁয়া ছাড়তে থাকেন তিনি। ততক্ষণে তার সামনে নেচে উঠেছে সেই চড়ুইটি। প্লাটফর্মে ছড়িয়ে থাকা খড়কুটো ঠোঁটে নিয়ে উড়ে উড়ে যাচ্ছে শেডের নিচে তৈরি হতে থাকা বাসায়। বাসায় নিশ্চয়ই নারী চড়ুই ডিম পাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর পুরুষ চড়ুই ডিম পাড়ার উপযোগী বাসা তৈরিতে খড়কুটার জোগান দিচ্ছে। চড়ুইটার কর্মমুখরতা মুগ্ধ করে হাসনাতকে। তখন তার মাথায় উদিত হয় নতুন ভাবনা। জীবন চলার পথে তিনি যেদিকে তাকান সেখানেই দেখতে পান প্রকৃতির বিরামহীন সৃজন-প্রক্রিয়া। সৃষ্টিই প্রকৃতির একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান। এক টুকরা ঘাস, অনুকূল পরিবেশে ফেলে দিলে সে বেঁচে যায়। শুধু নিজেই বাঁচে না, শেকড় থেকে ছড়িয়ে দেয় নতুন প্রাণের জয়ধ্বনি। কিংবা স্টেশনের এই একজোড়া চড়ুই, প্রজনন তথা সৃষ্টির বাইরে আর কোনও ভাবনা নাই ওদের। ব্যতিক্রম শুধু মানুষ। মানুষের প্রকৃত আনন্দ ধ্বংসে। মানুষের হাতে ধ্বংস হচ্ছে বন, ধ্বংস হচ্ছে প্রকৃতি। শুধুই কি প্রকৃতি, মানুষের হাতে মানুষও কি ধ্বংস হচ্ছে না ? হাসনাতের মেরুদণ্ডের হাড়ে এই যে ব্যথা টনটন করে, সেটাও কি ওই ধ্বংসের চিহ্ন নয় ?

শিরদাঁড়া সোজা করে বসতে গিয়ে হাসনাত কঁকিয়ে ওঠেন। পিঠের ব্যথাটা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেহে। আসন বদল করে বসতে যাবেন, তখনই ওই চোর-কাণ্ড। একাধিক ছুটন্ত মানুষ চোর চোর বলে ধাওয়া করছে এক কিশোরকে। চমকে ওঠেন হাসনাত। ভয়ার্ত চড়ুই ঠোঁটের খড় ফেলে উড়ে গিয়ে বসে ল্যাম্প পোস্টে। ভোজনরসিক গাভীটি এক নজর মাথা তুলে আবার মুখ ডোবায় ঘাসে। লেজ ঝোলা ফিঙেটি উড়তে উড়তে হারিয়ে যায় শেডের আড়ালে। ধাওয়াকারীদের পদাঘাতে মুহূর্তের মধ্যে ধুলায় ভরে ওঠে জায়গাটা। এক মুহূর্তে হাসনাতের চোখের ফ্রেমে ফুটে ওঠে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুটো ছবি। ধাওয়া খাওয়া কিশোরের মুখে প্রাণ হারানোর বিপন্নতা আর ধাওয়াকারী লোকদের মুখে প্রাণ হরণের হিংস্রতা। হাসনাতের মনে হয়, এই বিপন্নতা ও হিংস্রতা, দুটোই যেন বাংলাদেশের প্রতিবিম্ব। কিশোরের জন্য শঙ্কিত হয়ে ওঠেন হাসনাত। লোকগুলোর চোখে-মুখে যে ক্রোধ তিনি দেখছেন, ধরা পড়লে নির্ঘাৎ গণপিটুনি খাবে ছেলেটি। প্রাণও হারাতে পারে। তিনি জানেন না, এই কিশোর সত্যিই কোনও চোর কি না। চোর হলেও গণপিটুনি অমানবিক এবং অন্যায়। এ দেশের মানুষের হৃদয় ও চরিত্র বিয়াল্লিশ বছরের নিবিড় পর্যবেক্ষণেও বুঝতে উঠতে পারলেন না হাসনাত। একবার মনে হয়, এ মাটির শিরায় শিরায় বহমান সততা ও সরলতার রক্ত। পরক্ষণে মনে হয়, হিংস্রতা ও শঠতার বাইরে এ মাটির কোনও অর্জন নাই। অনেক মানুষ সম্পর্কে তিনি জানেন, যারা পথের মাঝে টাকা কুড়িয়ে পেলে পকেটের পয়সা খরচ করে মালিকের কাছে পৌঁছে দেয়। আবার এমন অনেক মানুষ সম্পর্কেও জানেন, যারা অন্যের পকেট কাটতে সিদ্ধহস্ত। এ দেশের মানুষ চেনার প্রশ্নে সম্পূর্ণ দ্বান্দ্বিক দুটি চরিত্র হাসনাতকে বহুকাল আগে থেকেই নাকানি-চুবানি খাইছে আসছে।

অভিযুক্ত চোর এবং ধাওয়াকারীরা প্লাটফর্ম ছাড়িয়ে অনেক দূর চলে গেছে। এখন আর তাদের ক্ষিপ্ত মুখ দেখা যাচ্ছে না। তারপরও হাসনাত খুব করে চাচ্ছেন, ছেলেটা যেন ধরা না পড়ে। এই দেশে ব্যাংক লুট হচ্ছে, লক্ষ কোটি টাকা পাচার হচ্ছে, মুদ্রাস্ফীতি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে, সিন্ডিকেটের কারণে দ্রব্যমূল্য বহু আগেই মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে। অথচ যারা এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত, তাদের সাজা হচ্ছে না, বরং ভি চিহ্ন বুকে ঝুলিয়ে নায়কের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে আর এদের অপকর্মের বলির শিকার হয়ে অভাবের তাড়নায় কেউ চুরি করলে তার শাস্তি হচ্ছে। তাও যেনতেন শাস্তি না, গণপিটুনি। হাসনাত আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। গলা বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করেন ছেলেটার পরিণতি। না, ওরা ধরতে পারেনি ছেলেটাকে। ব্যর্থ হয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে আসছে ধাওয়াকারীরা। হাসনাত স্বস্তি বোধ করেন। নির্ভর চিত্তে বসে পড়েন আসনে। চড়ুই পাখিটা আবার ফিরে এসেছে। আবার সে খড়কুটা ঠোঁটে তুলছে। চড়ুইটাকে কাজে ফিরতে দেখে মন ভালো হয়ে গেল হাসনাতের। যে প্রকৃতি সুযোগ পেলেই মাথা তুলে দাঁড়ায়, ছড়িয়ে দেয় নতুন প্রাণের বীজ, সেই প্রকৃতিকে নাশ করার সাধ্য মানুষের নাই।   

আপনার পাশে একটু বসি ? বহু যুগের ওপার থেকে গড়িয়ে আসা এক অলৌকিক কণ্ঠ বেজে ওঠে হাসনাতের কানের পাশে। হাসনাত এতটাই চমকান, বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ার উপক্রম হয় তার। চোখ তুলে দেখেন, লম্বা গোঁফদাড়িতে আচ্ছন্ন সৌম্যকান্তির এক বৃদ্ধ বিনীত ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে হাসনাতের দিকে। বৃদ্ধের দরাজ কণ্ঠ হজম করতে খানিকটা সময় লাগে হাসনাতের। কতক্ষণ তিনি থতমত চোখে তাকিয়েই থাকেন বৃদ্ধের দিকে। অপ্রস্তুত ভাব কাটলে সম্মোহনযুক্ত কণ্ঠে বলেন, জি, বসুন, নিশ্চয়ই। এটা তো বসারই জায়গা।

বৃদ্ধ জোব্বার প্রান্ত গুটিয়ে হাসনাতের পাশে বসলে আতরের গন্ধে জায়গাটা সৌরভময় হয়ে ওঠে। আতরের গন্ধের সঙ্গে সিগারেটের গন্ধ মিশে গেলে হাসনাতের মনের মাঝে ধাক্কার মতো লাগে। তিনি সিগারেটটা দূরে ছুড়ে ফেলে বৃদ্ধের দিকে তাকান―কোথায় যাবেন ?

অগন্তব্যে।

মানে ? টিকিট করেছেন কোন জায়গার ?

করিনি। আমাদের টিকিট লাগে না।

আপনাদের বলতে ?

আমার মতো আরও যারা আছে।

আমি কি আপনার এবং আপনার মতো আরও যারা আছে তাদের মতো না ?

না।

পার্থক্য কোথায় ?

সেটা সময়ই বলে দেবে।

লোকটার কথা ও আচরণে যুগপৎ বিস্ময় ও বিরক্তির উদয় হয় হাসনাতের। পরস্পরবিরোধী দুই অনুভূতির মাঝে বিভ্রান্ত বোধ করেন তিনি। লোকটার সঙ্গে আলাপ এগিয়ে নেবেন নাকি এখানেই ক্ষান্ত দেবেন বুঝতে পারেন না। হাসনাতের পূর্বাভিজ্ঞতা বলে, এই ধরনের মানুষের সঙ্গে আলাপের পরিণতি শেষমেষ সুখকর হয় না। রহস্যের আড়ালে এরা হয় আপাদমস্তক ভণ্ড।

আপনার মেরুদণ্ডের ব্যথাটা কি আগের মতোই আছে ?

মেরুদণ্ডের ব্যথা! হাসনাতের মুখ হা হয়ে যায় বিস্ময়ে। তিনি যে নিপীড়নের এক তীব্র ব্যথা সারা পিঠে বহন করে চলেছেন, এই লোক কীভাবে বুঝল! ভেতরে ভেতরে শঙ্কিত হয়ে ওঠেন হাসনাত। এই লোক কি সরকারের কোনও চর! তিনি যে উন্নত চিকিৎসা নিতে ঢাকা যাচ্ছেন, ওরা কি জেনে গেছে! পরক্ষণে শান্ত হন তিনি। তার ওপর সংঘটিত নিপীড়ন গোপন কোনও ঘটনা নয়। স্থানীয় পত্রপত্রিকায় এসেছে, ইউটিউবাররা কন্টেন্ট বানিয়ে ভিউ খেয়েছে, চায়ের দোকানে দোকানে চলেছে আলাপ। ধান শুকানো উঠোনের মতো ছড়ানো হলেও খুব বেশি বড় শহর নয় যশোর। এখানে সরকারি গুন্ডাবাহিনী একজন প্রতিপক্ষকে মারপিট করলে তার ঢেউ অবধারিতভাবেই শহরের কূলে কূলে আছড়ে পড়ে। এই বৃদ্ধের পক্ষে তাই সংবাদটা জোগাড় করে তাকে চমকে দেওয়া অসম্ভব নয়। প্রশ্ন হলো, এত লোক রেখে বৃদ্ধ কেন তাকেই চমকে দিতে চায়! নাকি সে কোনও ধান্দাবাজ! হাসনাত ট্রাভেল ব্যাগ কাছে টেনে একটু সরে বসেন। অজানা গা ছমছমে এক ভয় তার রক্তকণিকায় শিহরণ তোলে। বৃদ্ধ আকাশের দিকে তাকিয়ে দূরাগত কণ্ঠে বলে, ঢাকায় যাচ্ছেন ভালো কথা; কিন্তু যাকে আমরা গন্তব্য ভাবি, সব সময় সেটা গন্তব্য নাও হতে পারে। আমরা বাঁচার জন্য ছুটি অথচ আমাদের শেষ ঠিকানা মৃত্যু। কথাগুলো হাসনাতের চারপাশে ছড়িয়ে দিয়ে উঠে পড়ে রহস্যময় বৃদ্ধ। লাঠিতে ঠকঠক শব্দ তুলে হাঁটতে থাকে প্লাটফর্মের উল্টাপাশে। তার গন্তব্য কোথায়, বোঝা যায় না। এক সময় চোখের আড়াল হয়ে যায় বৃদ্ধ, কিন্তু তার ছড়িয়ে দেওয়া আতরের সুবাস ও কথার সম্মোহন থেকে অনেকক্ষণ বের হতে পারেন না হাসনাত।

তিন

এক শরতের বিকেলে কবিরপুর পশুহাট থেকে বাবা একটি ছাগলছানা কিনে আনলে তরুর দিনগুলো অন্যরকম হয়ে যায়। তরুর তখন মেট্রিকের টেস্ট পরীক্ষার ডেট পড়ে গেছে। পড়ার টেবিল ছাড়া কিছু বোঝে না। এ সময় উঠান থেকে ভ্যাঁ ভ্যাঁ ডাক ভেসে আসলে তরু কিছুক্ষণের জন্য থমকায়, বিরক্ত হয়, তারপর আবার পড়ায় মন দেয়। রাতে মা যখন ওর মুখে তুলে তুলে ভাত খাওয়ায়, তরু জিজ্ঞেস করে, ছাগলের ডাক শুনলাম যে মা!

তোর আব্বা কিনে আনচে। বাচ্চা ছাগল।

ছাগল দিয়ে কী হবি! ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে আমার পড়ার ডিস্টাব করচে। সামনে আমার এক্সাম, এইডা ছাগল কিনার টাইম, মা ?

তোর জন্যিই তো কিনা হয়েচে।

আমার জন্যি মানে!

মান্নতের ছাগল।

মান্নত!

মেট্রিক পরীক্ষায় তোর রেজাল্ট ভালো হলি ছাগলডা জবাই করে পাড়ায় বিলি করা হবি। গোপন মান্নাত। কারুর কাছ কবিনে কিন্তু। শেষে তোর রেজাল্ট যদি খারাপ হয়ে যায়!

তুমার মাতা তো আগেই খারাপ হয়েচে। ইবার আব্বার মাথাডাও গেল। পরীক্ষার খোঁজ নি ছাগল কিনা সারা। আমার রেজাল্ট যদি খারাপ হয়, ওই ছাগলের জন্যিই হবি।

অলক্ষুণে কতা কসনে তো। ধর, ইডাই শেষ গাল।

এই সংসারে বড্ড আদরে-যত্নে বেড়ে উঠছে তরু। বকুলপুরে আর একটা মেয়েকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না, পরীক্ষার দিনগুলোতে যাদের মা মেয়েকে মুখে তুলে তুলে খাওয়ায়। পাড়ার মহিলাদের এ নিয়ে অবশ্য টিটকিরির শেষ নাই। কন্যার প্রতি পিতা-মাতার বাড়তি যত্ন তাদের পড়শিদের কাছে মনে হয় ঢং। দুনিয়ায় যেন আর কারও মেয়ে পড়ালেখা করে না। মার অবশ্য এসব টিটকিরিতে মাথাব্যথা নাই। তার বরং ভালোই লাগে ব্যাপারগুলো। নিজেকে মনে হয় উজ্জ্বল ব্যতিক্রম মা। এ নিয়ে মৃদু গর্বও আছে ভেতরে ভেতরে। মেয়ের খাবারমাখা এঁটো মুখ মুছে দিয়ে মা যখন বেরিয়ে যায়, তরু নবউদ্যমে মন দেয় পড়ায়। কিন্তু ছাগলের বারংবার ভ্যাঁ ভ্যাঁ ডাক ভঙ্গ করে তার মনোযোগ। কী কৌতূহলে একবার বারান্দায় গিয়ে ছাগলটা দেখে আসে তরু। উঠোনের পেয়ারা গাছের সঙ্গে বাঁধা ছানাটা। সাইজ দেখেই হাসিই পায়। এইটুকুন পুঁচকে ছাগলকে দিয়ে তার বাপ পাড়া খাওয়াবে! তরু যখন এইসব ভাবে, তখন পাশের ঘর থেকে বাবার কণ্ঠ ভেসে আসে। মিয়ার টেস্ট পরীক্ষা মাত্র শুরু হচ্চে। এরপর ফাইনাল। তারপর রেজাল্ট। কমছে কম ছয় মাসের মামলা। তুমি দেখো তরুর মা, এর মধ্যেই ছাগলডা গায়েগতরে কীরাম করে বড় হয়ে যায়! ছোড ছাগল ছোড ছাগল কয়ে যে সারাক্ষণ মাতা খাচ্চ, তখুনডা বুঝবা কী কত্তি আমি ছোড ছাগল কিনিচি।

অবাক হয় তরু। বাবা কি ওর মনের কথা পড়ে ফেলেছে! নয়তো বাবা এইসব বলে কেন! উঠানে বাঁধা ছাগলটা দেখে ও আবার ফিরে আসে পড়ার টেবিলে। ও ভেবেছিল, ওই রাতই ছাগল ডাকার শেষ রাত। সকাল হতেই সে শান্ত ছাগল হয়ে উঠবে। কিন্তু তরুর ধারণা সত্য হয় না। পরপর তিন দিন সে অবিরাম ডেকে তরুর পড়াশোনার বারোটা বাজিয়ে দেয়। শেষে এমন হয়, মিছিল করা যুবকের ভাঙ্গা গলার মতো ডাকতে ডাকতে গলা ভেঙ্গে যায় ছাগলের। তখন কেমন মায়া জন্মায় তরুর। মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করে, ছাগলডা এত ডাকে ক্যান, মা ?

মা বলে, মায়া।

মায়া মানে ?

পুরনো বাড়ি ছাড়ে আসার মায়া। মাকে ছাড়ে আসার মায়া। যখন তোর বিয়ে হবি, আমাদের ছাড়ে চিরকালের জন্যি শ্বশুরবাড়ি চলে যাবি, তখন বুঝবি।

মায়ের কথায় কেমন থতমত খায় তরু। একটা ছাগলছানার কান্নার ভেতর যে মানুষের জীবনের গভীর এক সত্য ঢুকে যাবে, বুঝতে পারেনি সে। মন খারাপ করা গলায় সে জিজ্ঞেস করে, তুমারও কি অমন মন খারাপ হয়েছিল ?

তা আবার হয় না! মায়ের গলা চিরে গোপন গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। তারপর দীর্ঘশ্বাসটা গোপন করে টানা গলায় বলে, এডাই যে মাইয়ে মানুষের নিয়তি!

মা চলে গেলে বারান্দার ওপর থেকে উঠানে বাঁধা ছাগলছানাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে তরু। বাচ্চাটাকে কেমন এক মানবশিশু মনে হয়, যাকে জোরপূর্বক মা থেকে বিচ্ছিন্ন করে সম্পূর্ণ অচেনা এক দ্বীপে আটকে রাখা হয়েছে। অথচ এখনও ওর মায়ের কোলের ভেতর শুয়ে থাকার বয়স। এখনও ওর মায়ের আদর খাওয়ার বয়স। অথচ এই বয়সেই এক মহৎ কর্ম সাধনের জন্য এই বাড়ির লোকেরা তাকে বন্দি করে রেখেছে। সিঁড়ি থেকে স্যান্ডেল পরে তরু পায়ে পায়ে ছাগলছানার দিকে এগিয়ে যায়। খুঁটির সঙ্গে বাবা কাঁঠালের পাতা ডালসুদ্ধ বেঁধে রেখেছেন। তরু একটা একটা করে পাতা ছিঁড়ে ছাগলটার মুখে ধরে। কিন্তু ছাগল অজানা অভিমানে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। তরু খেয়াল করে, ছাগলের ডাগর ডাগর চোখ দুটোয় টলমল করছে ব্যথার জল। অথচ অশ্রুবিসর্জনের মতো নিরাপদ কোল কিংবা স্বজন তার পাশে নাই।

সেই দিন থেকে তরু আর ছাগলছানার ওপর বিরক্ত হয় না। অবশ্য ততদিনে নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়েও নিয়েছে ছাগলটি। এখন আর ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে বাড়ি মাথায় করে না। এর মাঝে বাবা একদিন রশি ধরে বাইরে থেকে হাঁটিয়েও এনেছে ছাগলটিকে। তরু পড়তে পড়তে জানলা দিয়ে দেখেছে চমৎকার সেই দৃশ্য। ছবিটি তরুর বুকের ভার অনেকটাই নামিয়ে দিয়েছে। একটা লম্বা শ্বাস ফেলে সে মনে মনে বলেছে, যাক, আজ হতে ও একজন বন্ধু পেল। কিন্তু তরু জানে না, বন্ধু হিসেবে বাবা নয়, তরুকেই পছন্দ ছাগলটির। তার প্রমাণ পাওয়া গেল এক সপ্তাহ পর। সেদিনই প্রথম রশি খুলে ছেড়ে দেয়া হলো ছাগলটিকে। মা-বাবা দুজনই ভয়ে ভয়ে ছিলেন। ছাড়া পেয়ে না জানি কোথায় ছুট দেয়। তখন আবার খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হতে হবে। কিন্তু না, ছাগলটি রশিমুক্ত হওয়ার পরও কোথাও ছুটে যায় না। সে বরং কৌতূহলী চোখে চারপাশে তাকায় আর এক পা দু পা করে বারান্দার সিঁড়ি ভাঙ্গে। তারপর তরুর দরজা সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বাইরে যে এত সব কাণ্ড ঘটে চলেছে, জানে না তরু। হঠাৎ কী ভেবে ও পড়ার ফাঁকে দরজায় তাকায়। ছাগলের নিশ্চুপ ছায়া দেখে ক্ষণিকের জন্য ভয় পেয়ে যায়। তারপর পূর্ণ চোখ মেলতেই বুঝতে পারে, ছাগলছানাটি দরজার মুখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে ওকে। একটি মেয়ে রাত দিন ঘরের ভেতর বসে বসে শব্দ করে পড়ে, এমন দৃশ্য যেন জীবনে সে দেখেনি। তরু পড়া থামিয়ে ফিক করে হেসে ফেলে। আদুরি ভঙ্গিতে ঘাড় নেড়ে বলে, কী রে দুষ্টু, কখুন আলি! আমারে পলা পলা দেখছিস বুঝি! তরু কোলে নেওয়ার ভঙ্গিতে দু হাত সামনে বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু কী ভেবে ছানাটি সরে যায় দরজা থেকে। হয়তো সে তরুর ভাষা বুঝতে পারে না। কিংবা খাতির জমানোর জন্য আরও কটা দিন অপেক্ষা করে।

পরদিনও আগের ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটে। সকালে খাইয়ে-দাইয়ে ছাগলটি ছেড়ে দিলে সে চারপাশে তাকিয়ে আস্তে ধীরে বারান্দার সিঁড়ি ভাঙ্গে। তারপর তরুর দরজার সামনে দাঁড়ায়। এ দিন আর সে শুধু দাঁড়িয়েই থাকে না, আলতো পায়ে ঘরের ভেতর ঢুকে যায়। কখন যে তরুর চেয়ারের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, টের পায় না তরু। যখন টের পায়, ভয়ে চিৎকার করে ওঠে। মা ছুটে আসে রান্নাঘর থেকে―কী রে, কী হলো!

ততক্ষণে তরু গড়াগড়ি খাচ্ছে হেসে। মাকে বলে, তোমার ছাগল আমাক পছন্দ করে ফ্যালেচে। দ্যাখ, কীরাম করে আমার পাশে খাড়া আছে।

তোর চিহারার ভিতর একটা মায়া মায়া ভাব আছে। সেই জন্যিই তোর কাছে আসছে। অবুলারা সব বুঝতি পারে।

কীরাম মায়া, মা ? তরুর একবার মনে হয়, কথাটা জিজ্ঞেস করে মাকে; কিন্তু জিজ্ঞেস করতেও গিয়েও আর জিজ্ঞেস করে না সে। তবে বুঝতে পারে, মা তার মিথ্যা বলেনি। সত্যিই, তার চেহারার মধ্যে একটা মায়া মায়া ভাব আছে। এই কথাটা শুধু মা বলেনি, আরও একজন বলেছে। পিয়াস স্যার। পিয়াস স্যার মানে নাইনে থাকতে তরু যার কাছে কয়েক মাস প্রাইভেট পড়েছিল। খুব ভালো ছাত্র। ছেলে হিসেবেও নাকি ভালো। বাবার মুখে পিয়াসের অনেক প্রশংসা শুনেছে তরু। শুনেছে আর অবাক হয়েছে। বাবা সহজে কারও প্রতি মুগ্ধ হয় না। প্রশংসাও করে না সহজে। সেই মানুষটা যখন কারও প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়, বুঝতে হবে আসলেই সে মুগ্ধ করার মতো ছেলে। হাইস্কুলে পড়ানোর সুবাদে বাবা অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী পেয়েছেন। তাদের মধ্যে নাকি অনন্য এই পিয়াস। বাবা প্রায়ই বলে, ওকে আমি নিজির হাতে গড়িছি। ও অনেক দূর যাবি, তোরা দেখে নিস।

বাবার পছন্দের সেই ছাত্র পিয়াস যশোর সরকারি এমএম কলেজে অনার্স করছে। সেবার গরমের লম্বা ছুটিতে বাড়ি এলে বাবার নির্দেশ অথবা অনুরোধে তরুর অঙ্ক বোঝানোর দায়িত্ব ওঠে পিয়াসের ঘাড়ে। সেবারই পড়ানোর ফাঁকে একদিন পিয়াস বলেছিল, তোমার চিহারার ভিতর একটা মায়া আছে। জীবনে অনেক মেয়ে দেখেছি। কিন্তু এই মায়াটা কারও চিহারায় পাইনি।

নাইন পড়ুয়া তরু স্যারের এই ভানহীন প্রশংসায় লজ্জায় রাঙ্গা হয়ে উঠেছিল। দুই দাঁতের নিচে কলম ফেলে গ্রীবা বাঁকিয়ে বলেছিল, কী যে কন, স্যার!

পিয়াস বলেছিল, আমাকে স্যার বলবে না, তরু। স্যার শুনলেই মনে হয় টেকো মাথার চশমা পরা এক রাগী মুরুব্বি। আমাকে ভাইয়া বলবে।  

আজ পিয়াস ভাইয়ার দেওয়া সেই বিশ্লেষণটা মায়ের মুখে ফিরে এলে তরু ক্ষণিকের জন্য থমকায়। ভাবে, সত্যিই কি তার চেহারায় মায়া আছে ? ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ায় তরু। নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। আল্লাহ সুন্দর একটা মুখ দিয়েছে তার। কিন্তু সেই মুখে মায়া আছে কি না, বুঝতে পারে না। আয়না দেখে ঘুরতেই আবার সেই ছাগল। অদ্ভুত চাহনিতে তাকিয়ে আছে তরুর দিকে। তরু ছাগলের মুখের সামনে বসে। গলাটা পেঁচিয়ে ধরে বলে, যা, আজগেত্তে তোর নাম মায়া। নাম পছন্দ হয়েচে ?

নতুন নাম পেয়ে ছাগলছানা হয়তো খুশি হয়। তাই তো এক লাফে বারান্দা আর দুই লাফে বারান্দা থেকে উঠানে নেমে যায় সে। উঠানে নেমেও বন্ধ হয় না তার নাচানাচি। সারা উঠান সে দাপাদাপি করে বেড়ায়। তরুর মনে তখন উদয় হয় নতুন ভাবনার―পিয়াস ভাইয়া যদি এর মধ্যে বাড়ি আসে আর জানতে পারে ছাগলটার নাম মায়া, সে কি ধরতে পারবে এই নামের উৎস! উনি এবার বাড়িতে এলে নির্ঘাৎ বিরাট এক কাণ্ড হবে। তরু মনে মনে পিয়াস ভাইয়ার ছুটির জন্য অপেক্ষা করে। তরুর গোপন প্রতীক্ষার অবসান হয় তখন, যখন ধুমধাম করে শুরু হয় ওর টেস্ট পরীক্ষা। ততদিনে মায়ার সঙ্গে ওর সখ্য আরও বেড়েছে। তরু যখন স্কুলে যায়, ছাগলটা কিছুদূর ওর পেছন পেছন হাঁটে। আবার যখন ওর ফেরার সময় হয়, ছাগলটা দাঁড়িয়ে থাকে বাড়ির সামনের আমবাগানে। রাস্তার মাথায় তরুর ছবি ফুটে উঠতেই চঞ্চলতা শুরু হয় ছাগলছানাটার। ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে ডাকতে ডাকতে ছুটে যায় পাশে। ছাগলের এই মানবীয় আচরণ দারুণ আনন্দ দেয় তরুকে। এককেকবার মনে হয়, মায়া যদি চকলেট অথবা চিপস অথবা অন্য কিছু খেত! ও ফেরার পথে মায়ার জন্য সেইসব মজার খাবার কিনে আনতে পারত। কিন্তু ছাগলটার প্রিয় খাবার যে কাঁঠালপাতা। তাই তো কোল ঘেঁষতেই বাগানের একমাত্র কাঁঠাল গাছ থেকে পাতা পেড়ে ছাগলের মুখে ধরে তরু। ছাগলটা অমৃতের মতো সেই কাঁঠালপাতা মজা করে খায়। 

একদিন তরু মাকে বলে, তুমার মান্নত বাদ।

বাদ মানে ? মা আকাশ থেকে পড়ে।

মায়াকে জবোই করা যাবে না।

ক্যান! ওর তো কিনাই হয়চে জবোই করার জন্যি।

তুমার মনে কি ইট্টুও দয়ামায়া নি ? দ্যাকো না ও কীরাম করে আমার পাশে পাশে ঘোরে। আর ওরে জবোই করে গোশত খাব আমি! তা হবিনে। পাল্লি আব্বারে কও আরেকটা ছাগল কিনতি। সিডা জবোই করো। কিন্তু মায়া না। মায়া এই বাড়ি থাকবি। যতদিন আল্লাহ ওর হায়াত দেছে, ততদিন থাকবি। ও হুজুরির ছুরির নিচে মরবিনে, ও মরবি বুড়ো হয়ে।

এ তুই কী কচ্ছিস! কত টাকার জিনিস তুই বুঝতি পারছিস ?

আমার বুঝে কাম নি। ভালোবাসা টাকা দিয়ে মাপার জিনিস! আমি যা কইছি তাই হবি। এবার সরো। আমার পড়তি দেও।

সেদিন অঙ্ক পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে অদ্ভুত এক দৃশ্য রচিত হয় তরুর সামনে। নিত্যদিনের মতো সেদিনও স্কুল পথে দাঁড়িয়ে ছিল মায়া। তবে আজ শুধু মায়াই দাঁড়িয়ে নাই। মায়ার সঙ্গে আছে এক মালা। যেটা ঝুলছে ওর গলায়। আবার মালার সঙ্গে একটি চিরকুট। তাতে কিছু লেখা। রহস্যের গন্ধ পায় তরু। বেড়ে যায় কৌতূহল। মায়ার গলায় মালা এল কোত্থেকে! দ্রুত পায়ে সে এগিয়ে যায় মায়ার কাছে। মালার সঙ্গে ঝুলতে থাকা চিরকুটটা হাতে নিয়ে দেখে, তাতে চমৎকার হস্তাক্ষরে লেখা একটি বাক্য : তরু, তোমাকে আমি পছন্দ করি।

সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠে তরুর। এমন অদ্ভুত চিঠি কে পাঠাতে পারে ওকে ? বোঝাই যাচ্ছে কোনও ফালতু কিংবা কাঁচা হাতের কাজ এটা নয়। হলে ভাষাটা ভিন্ন হতো। লিখত, তরু, আমি তোমাকে ভালোবাসি। এই ছেলে ভালোবাসি না বলে পছন্দ করি লিখেছে। তার মানে অপশন হাতে রেখেছে। শুরুতেই চূড়ান্ত কথাটা বলেনি সে। চালাক ছেলে। ধীরে ধীরে এগোতে চায়। আবার হাতের লেখাও দারুণ! দেখলেই বইয়ের প্রচ্ছদের টাইপোগ্রাফির কথা মনে হয়। তরু বুঝতে পারে না কে তাকে এমন চিরকুট লিখতে পারে। একটু ভাবতে ছাত্রনেতা জয়নালের ছবিটা সামনে আসে। অনেক দিন ধরেই সে তরুর পেছনে ঘুরছে। তরুর স্কুলের আসা-যাওয়ার পথে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কখনও তার ঠোঁটে থাকে সিগারেট। এসএসসির পর নেতাগিরি করতে গিয়ে আর পড়ালেখা করেনি। এলাকার যুব নেতাদের পেছন পেছন ঘোরে। তাদের হয়ে মাস্তানি করে। সে-ই কি ছাগলের গলায় চিরকুট ঝুলিয়েছে ? কিন্তু এটা তো চমকে দেওয়ার মতো এক অভিনব কাজ। মাস্তানদের মাথায় এমন অভিনব কাজের মগজ থাকে না। জীবনে এরা শুধু পারে একটা কাজই―গুন্ডামি। লিপি বলেছে, মেয়েদের টিজ করার উস্তাদ জয়নাল। আবার নেশা ভাঙও করে। হাসি পায় তরুর। যে হাত গাঁজা সাজায়, সেই হাতে এমন সুন্দর লেখা আসা অসম্ভব। আরও কয়েকটি ছেলে সম্ভাবনার তালিকা দীর্ঘ করে। কিন্তু অদ্ভুত ও সৃজনশীল পদ্ধতিতে পছন্দের কথা জানাবে, তেমন কারও ছবি সামনে আসে না। ফলে বুকের ভেতর গোপন কৌতূহল চেপে রেখে মায়াকে নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢোকে তরু। পরদিন ইংরেজি পরীক্ষা। পড়তে হবে অনেক। পড়েও তরু। তবু দিনভর চিরকুটের ভাবনা তাকে নিস্তার দেয় না।

সেদিন সন্ধ্যায় পিয়াস আসে তরুদের বাড়িতে। উদ্দেশ্য স্যারের সঙ্গে দেখা করা আর স্যারের কন্যার পড়াশোনার খোঁজ-খবর নেওয়া। আজই সে কয়েক দিনের ছুটি পেয়ে যশোর থেকে বাড়িতে এসেছে। পিয়াসকে দেখে তরুর মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। ভেতরের চঞ্চলতা যেন বাইরে বেরিয়ে না পড়ে তাই পিয়াস ভাইয়ার সামনে যায় না তরু। শেষে বাবা ওকে ডাকে, এই তরু, তোর পিয়াস ভাইয়া আয়েচে। দেকা করে যা। আর পরীক্ষার কিছু টিপস নিয়ে নে।  

খানিক পরে চায়ের কাপ হাতে বসার ঘরে আসে তরু। দুজনের সামনে দুটো কাপ রেখে পিয়াসের উদ্দেশে বলে, কবে আইলেন ভাইয়া ?

তরুর সহজ জিজ্ঞাসা অথচ তারই উত্তর দিতে গিয়ে কথা পেঁচিয়ে যায় পিয়াসের। ব্যাপারটা বাবা খেয়াল না করলেও সর্বদা চোখ-কান খোলা তরু ঠিকই ধরতে পারে। তার মনে হয়, পিয়াস ভাইয়া আসার সংবাদে তরুর মনে যে চড়ুই পাখির চঞ্চলতা, তার একটা অংশ গড়িয়ে পড়েছে পিয়াসের ডানায়। একটু পর দোয়া চেয়ে পড়তে বসব বলে নিজের ঘরে ফিরে আসে তরু। কিন্তু বুকের ভেতর চড়ুইয়ের নিরন্তর ওড়াউড়ি থামে না সহজে।

পরদিন ইংরেজি পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে জয়নাল পিছু নেয় তরুর। তিন রাস্তার মোড়ে অশ্বত্থ গাছের নিচে সে তরুর পথরোধ করে দাঁড়ায়। পুরনো কথাটাই নতুন করে পাড়ে―তুমি মিয়াডা খুব ফাইন। তোমারে ভালোবাসি। যতদিন উত্তর না দেচ্চ ততদিন তুমার পিছন পিছন ঘোরব।

আগের দিনগুলোতে জয়নালের এই ছ্যাবলামি এড়িয়ে গেলেও আজ জবাব দিতে ইচ্ছা করে তরুর। সর্বাঙ্গে তাচ্ছিল্য হেনে সে বলে, আমার সঙ্গে এট্টা ছাগল ঘোরে দেকেচেন ? আপনে আমার ওই ছাগলের চায়েও অধম। আপনেরে ভালোবাসব কোন দুখখি! কথাটা বলেই তরু পা বাড়াতে যায়। তখন জয়নাল ওর একটা হাত চেপে ধরে। সঙ্গে সঙ্গে ফুঁসে ওঠে তরু। অগ্রপশ্চাৎ না ভেবেই সে জয়নালের গালে ঠাস করে থাপ্পড় কষে দেয়। হতভম্ব হয়ে যায় জয়নাল। যাকে দেখে এলাকার সব পোলাপান ডরায়, জুনিয়র ছেলেরা নতমস্তকে সালাম ব্যতীত যার সামনে পথ চলে না, ফেসবুকে ঢুকলেই এমপির শালার সঙ্গে দেখা যায় যার যুগল ছবি, সেই জয়নালকে চড় মেরেছে টেন পড়ুয়া এক ছুকড়ি! কী কলিযুগ এল! হতভম্ব জয়নাল এক ঝলকে চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে আনে। না, তার দুজন চেলা ছাড়া অন্য কেউ দেখেনি ঘটনা। দেখলে মহাসর্বনাশ হয়ে যেত। জয়নাল যখন সুস্থির হয়, তখন তার ভেতর থেকে ক্রোধ ফুঁসে ওঠার ফুরসত পায়। ততক্ষণে তরু দুই পা এগিয়ে গেছে বাড়ির দিকে। জয়নাল ছুটে যায় তরুর সামনে। ওর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, আমারে ছাগলের সঙ্গে তুলনা কল্লি, আমার গালে থাপ্পড় মাল্লি, ইর শ্যাষ আমি দেখে ছাড়বনে। তরুর গালে প্রতি-থাপ্পড় মারতে গিয়েও শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নেয় জয়নাল। তরু আর একটা কথাও বলে না। ফোঁপাতে ফোঁপাতে ছুটে আসে বাড়িতে। মায়ের গলা ধরে ভেঙ্গে পড়ে কান্নায়।

চার

ভালো থাকতি চালি জীবনে বিয়ে কইরো না―তরুকে জীবন সম্পর্কিত দার্শনিক এই প্রশ্নের মুখে ছেড়ে দিয়ে ঝিকরগাছা স্টেশনে হুড়মুড় করে নেমে পড়ে পার্শ্ববর্তী মহিলা। হতভম্ব তরু জানালায় মুখ বাড়িয়ে দেখে, এক কোলে বোচকা আর অপর কোলে সন্তান নিয়ে প্লাটফর্মের বাইরের দিকে হেঁটে যাচ্ছে সে। তাকে কেউ নিতে আসেনি। কেউ তার জন্য অপেক্ষায় নাই। অবাক হয়ে যায় তরু। একা এক মহিলা, যার সঙ্গে আবার সন্তান ও বোচকা, তাকে কেউ রিসিভ করতে আসবে না! মহিলার এই বিয়ে বিদ্বেষের কারণ কি তবে এই―সে স্বামীর যত্ন থেকে বঞ্চিত ? কিংবা স্বামী কর্তৃক নিপীড়িত ? এই পৃথিবীতে নারী মানেই কি তবে বঞ্চিত ? জয়নালের সেই নির্মম প্রতিশোধের কথা কীভাবে ভুলবে তরু, যে প্রতিশোধের বলি হয়েছিল তার প্রিয় ছাগলছানাটি। সেদিন মায়ের গলা ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেও কান্নার কারণ বলেনি তরু। না বললেও এক বাঙালি মা ঠিকই বুঝতে পারেন তরুর মতো উঠতি বয়সী মেয়েদের সঙ্গে কী ঘটে, কী ঘটতে পারে, এই বাংলায়। আর তাই তো ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত মেয়ের সঙ্গ ছাড়েননি মা। পরশুদিন আবার পরীক্ষা। মাঝখানের শুক্রবারটা ছুটি। তরু চোখ মুছে শক্ত হয়ে নবউদ্যমে পড়তে বসেছিল। আর মা বান্ধবীর মতো বসে থেকেছিল পাশের চেয়ারে। ফজলু মাস্টারের এ বাড়িটায় সব সময় আনন্দের হাট বসে থাকে। অথচ সেই রাতটা ছিল কথা না বলা রাত। তারাদের মতো চুপচাপ জেগে থাকা রাত। দূরের গোরস্থান থেকে ভেসে আসছিল কোক পাখির ডাক। পাখিটির ডাক যতবার কানে পড়ছিল, গা ছমছম করছিল তরুর। এক সময় পাখিটি ক্লান্ত হয়ে ডাক থামালে ঘুমাতে গিয়েছিল সবাই। পরদিন সকালের সূর্য উঠেছিল নির্মমতার বার্তা নিয়ে। ফজরের নামাজ পড়ে ফেরার পথে মুসল্লিরা আবিষ্কার করেছিল এক বীভৎস দৃশ্য। তরুদের আম গাছের ডালে ঝুলছে মায়ার ফাঁস লাগানো মৃতদেহ। কোটরাগত চোখ। আধহাত বেরিয়ে আসা জিভ। ভোরের মৃদু বাতাসে বাবুইয়ের বাসার মতো দোলা ছোট্ট শরীর। খবর শুনে বাইরে ছুটে এসেছিল তরু। এক নজর দেখেই অজ্ঞান। মা আহাজারি করছিল। স্তব্ধ বাবা দ্বিতীয় আমগাছ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ঠায়। কতক্ষণ পর জ্ঞান ফিরেছিল মনে নাই তরুর। তবে বাড়ি যে লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠেছে, ঠিক বুঝতে পারছিল ও। আরও বুঝতে পারছিল, মায়ার সঙ্গে এই নির্মমতা কে ঘটিয়েছে। তরু খুব করে চাচ্ছিল, আল্লাহ যেন তাকে এক ঐশ্বরিক ক্ষমতা দেয়, যে ক্ষমতার বলে সে জয়নালের দুই হাত লুলা করে দেবে। ততক্ষণে ডাল থেকে নামানো হয়েছে মায়াকে। তরু মায়ার পাশে বসে কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে বলেছিল, আমি এর বিচার চাই। আব্বা, তুমি এর বিচার করো। আমি জানি, কিডা মায়াকে খুন করেচে।

কিডা ? মেয়ের মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করেছিল বাবা। জয়নালের নাম শোনামাত্র থতমত খেয়েছিল নিরীহ এই স্কুল মাস্টার। ফিসফিস করে বলেছিল, এর বিচার করার সাধ্য আমার নি রে মা। ওরা ভালো লোক না। ওদের সাতে টিক্কা দিয়া আমারে সাজে না। এর বিচার আমি আল্লাহর কাছ দিলাম।

জুমার নামাজের আগে ঘরের পেছনে বাঁশঝাড়ের নিচে কবর দেওয়া হয়েছিল মায়াকে, যেভাবে অশ্রু ভেজা চোখে চিরবিদায় জানানো হয় প্রিয় মানুষকে। সেদিন থেকে তরুর হৃদয়েও কি একটু একটু করে ঘনীভূত হয়নি পুরুষ-বিদ্বেষ, বোচকাওয়ালা ওই নারীর মতো ? এক পুরুষ জোরপূর্বক কেন এক নারীকে দখল করতে চাইবে! আর দখলে ব্যর্থ হয়ে কেন তার শোধ তুল নিরীহ অবলা প্রাণির ওপর! মায়ার মৃত্যু এলোমেলো করে দিয়েছিল তরুর জীবন। দুদিন ওর চোখ থেকে অশ্রু মোছেনি। ভাত নামেনি গলার নিচে। মন বসেনি পড়ায়। এই শোক যে ও কোন দিন সামলে উঠতে পারবে, ভাবতে পারেনি। টেস্টের বাকি পরীক্ষাগুলো খারাপ হয়েছে। মা-বাবা সান্ত্বনা দিয়েছে, সামনে আরও অনেক মায়ার দেখা পাবি। সেগুলো আগলে রাখিস। যে মায়া চলে গেছে তার জন্য তুই কেন পথ হারাবি!

না, পথ হারায়নি তরু। পড়াশোনাই যেহেতু ওর সারা জীবনের সাধনা, তাই অল্পদিনেই ও কাটিয়ে ওঠে মায়ার মায়া। ডুবে যায় ওর আপন জগতে। যে জগতে পড়াশোনার বাইরে কিছু নাই। আর দৃঢ় করে নেয় পূর্বের প্রতিজ্ঞা, যেভাবেই হোক ওকে বড় হতে হবে। জয়নালদের ধরাছোঁয়ার সম্পূর্ণ বাইরে থাকার মতো বড়। এমন বড়, যেখানে জয়নালদের কল্পনাও পৌঁছায় না। আর এর জন্য ওকে গ্রাম ছাড়তে হবে। বাবার কাছ শুনে শুনে বড় হওয়া সেই নীতিবাক্যটা আবারও সামনে এসে দাঁড়ায়―বড় হতি হলি গিরাম ছাড়তি হয়। তোকও ছাড়তি হবি গিরাম। একেনে পড়ে থাকলি হাইস্কুলের মাস্টারের বেশি কিছু হতি পারবিনে।

তরুর আজ গ্রাম ছাড়ার দিন। তরুর আজ প্রাথমিক বিজয়ের দিন। ওকে বহনকারী বেনাপোল এক্সপ্রেস যত ঢাকার দিকে এগোচ্ছে, তত পেছনে পড়ে থাকছে জয়নালরা আর বিজয় তত সন্নিকটবর্তী হচ্ছে। তাই বাবা-মা ও গ্রাম ছেড়ে আসার এই মন খারাপের দিনেও প্রচ্ছন্ন এক আনন্দ লেপ্টে থাকে তরুর হৃদয়পটে। ঝিকরগাছা স্টেশনের যাত্রী নিয়ে ট্রেন যখন দুলতে শুরু করে, তখন তরুর সামনে উদিত হয় এক নতুন বিস্ময়। পিয়াস ভাইয়া। নীল রংয়ের সুন্দর একটা পাঞ্জাবি পরেছে। পরনে জিন্সের প্যান্ট। সদ্য ছাঁটা ঘাসের মতো খোঁচা খোঁচা দাড়ি মুখজুড়ে। পিঠে ব্যাগ। সারা অঙ্গে চঞ্চলতা; কিন্তু মুখের অপ্রতিভ ভাবটা লুকাতে পারছে না। তরুকে কথা বলার সুযোগ না দিয়েই সে বোচকাওয়ালা নারীর রেখে যাওয়া সিটে এসে বসে। হতভম্ব হয়ে যায় তরু। ওর মুখ ফস্কে বেরিয়ে আসে কথা―পিয়াস ভাইয়া!

চেনা কণ্ঠে ততোধিক অবাক হয় পিয়াস―তরু তুমি!

তারপর অল্পক্ষণের নীরবতা। নীরবতা ভেঙ্গে কথা বলে পিয়াসই―তুমি কি ঢাকা যাচ্ছ ?

জি। আপনি ?

আমিও। কী আশ্চর্য, তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল!

আগামী সপ্তাহ থেকে আমার ক্লাস। কিন্তু আপনার কী কাজ ঢাকায় ?

মামা আসছে সিঙ্গাপুর থেকে। মামাকে রিসিভ করতে যাচ্ছি।

ও। মামার প্রসঙ্গে একটু কি মনক্ষুণ্ন হয় তরু ? শুরুতে ভেবেছিল, পিয়াস বোধহয় ওকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য ট্রেনে উঠেছে। সঙ্গ না হলেও অন্তত চমকে দেওয়ার জন্য তো অবশ্যই। কিন্তু মামার আসার খবরে কিছুটা হতোদ্যম হয়ে পড়ে তরু। পিয়াস যদি শুধু ওকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য ট্রেনে উঠত, তরু বেশি খুশি হতো। তারপরও দীর্ঘ ট্রেন জার্নিতে চেনাজানা মানুষটা পাশে থাকবে ভেবে স্বস্তিবোধ করে ও। ব্যস্ততার কারণে মা-বাবা কেউ আসতে পারেনি। সঙ্গে বিরাট লাগেজ। এই সময় সঙ্গে পরিচিত মানুষ থাকলে সাহস বাড়ে। যদিও ছোট কাকুকে বলে দেওয়া আছে, তিনি রিসিভ করতে কমলাপুর থাকবেন।

সময় বইতে থাকে। না পিয়াস না তরু, কেউ কোনও কথা বলে না। দুজনেই হয়তো ভেতরে ভেতরে কথা সাজায়। কিন্তু সাজানো কথা প্রকাশের ভাষা পায় না। তরুর মনে একেকবার উঁকি মারে প্রশ্ন―মামাকেই যদি আনতে যাবে পিয়াস ভাইয়া, ঝিকরগাছা স্টেশন থেকে কেন উঠবে সে! যশোর, যেখানে সে পড়ে, কিংবা বেনাপোল, যেখানে তার বাড়ি, সেখান থেকে ট্রেনে কেন উঠল না! প্রশ্নটা যখন মনের ভেতর নাড়াচাড়া করে তরু, ওর মনের ভেতরের সবটা যেন দেখতে পায় পিয়াস, নয়তো প্রসঙ্গ ছাড়া কেন বলবে : ঝিকরগাছা আমার মামাবাড়ি। মামাবাড়ি একটু কাজ ছিল। তাই ওখান থেকেই টিকিট করেছি। কিন্তু এভাবে তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে ভাবতেই পারিনি। যা হোক, তুমি মাইলস্টোনে চান্স পেয়েছ, এতে আমি খুব খুশি হয়েছি। তোমাকে নিয়ে গর্ব হচ্ছে।

প্রশংসা পেয়ে গোলাপি হয়ে ওঠে তরু। চঞ্চলতা লুকাতে মুখ বাড়িয়ে দেয় জানালায়। জানুয়ারির বেপরোয়া ঠান্ডা বাতাসে ওড়ে ওর খোলা চুল। মাঝে মাঝে তার ঝাপটা এসে লাগে পিয়াসের মুখে। প্রকৃতি এমন একটি ট্রেন জার্নি মিলিয়ে দেবে, স্বপ্নেও ভাবেনি পিয়াস। তরু দেখে, রেললাইনের ধারে একটি অশ্বত্থ গাছের ছায়ায় এক জোড়া ছাগলছানা নিয়ে দুটি ভাইবোন খেলছে। ছবিটি এক মুহূর্ত ভেসে উঠেই পেছনে হারিয়ে যায়। কানের পাশে চুল গুঁজে দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বলে, খুব বাতাস। যেদিন ওরা আমার ছাগলটাকে মারল, সেই দিনটাও ছিল এমন বাতাসি দিন।

তোমাদের ছাগলের ঘটনায় খুব আহত হয়েছিলাম। স্যারের কাছে শুনেছি, কারা এটা করেছে। ক্ষমতা থাকলে আমি এর শোধ নিতাম।

কেন, আপনি শোধ নেবেন কেন ?

অবলা একটা প্রাণির সঙ্গে এই নিষ্ঠুরতা যারা করেছে, তারা কেন ছাড় পাবে!

ছাগলটা আমাকে খুব ভালোবাসত। আমিও বাসতাম ওকে। একদিন কী হয়েছে জানেন, ছাগলটা কোত্থেকে গলায় অদ্ভুত এক মালা নিয়ে হাজির। মালার সঙ্গে চিরকুট।

চিরকুট! আশ্চর্য তো! কী লেখা ছিল চিরকুটে ?

থাক, ওটা আর শুনে কাম নাই।

জানার খুব কৌতূহল হচ্ছে।

লেখা ছিল, তরু, আমি তোমাকে খুব পছন্দ করি।

মোবাইল আসার আগে ছেলেরা তাদের পছন্দের মেয়ের কাছে পরিচিত পোলাপানের মাধ্যমে চিরকুট পাঠাত। এই পোলাপানকে মজা করে বলা হতো পিয়ন। তোমার কোনও প্রেমিক ছাগলটাকে পিয়ন হিসেবে ব্যবহার করেছে। হাহা।

আপনি হাসছেন। চিরকুটটা পেয়ে খুব মেজাজ খারাপ হয়েছিল।

কেন ?

কে না কে লিখেছে!    

যেই লিখুক, সে হয়তো মনে মনে তোমাকে খুব পছন্দ করে।

ছাতা করে। এতই যখন পছন্দ, সামনে এসে বলুক না! ছাগলের গলায় কেন বলবে!

তরু!

বলেন, ভাইয়া।

চিরকুটটা আমি লিখেছিলাম।

আপনি, ভাইয়া, আপনি! তরু চোখে পলক ফেলতেও ভুলে গেল।

পাঁচ

মাত্র এক ঘণ্টার অপেক্ষা অথচ হাসনাতের মনে হচ্ছে তিনি অনন্তকাল ধরে অপেক্ষা করছেন। খড় কুড়ানো সেই চড়ুই পাখিটিও ত্যক্ত অথবা ক্লান্ত হয়ে কোথায় যেন চলে গেছে। অথচ দেখা নাই বেনাপোল এক্সপ্রেসের। আগামীকাল ধানমন্ডির এক ডাক্তারের অ্যাপয়েনমেন্ট নেওয়া আছে। বন্ধু শহিদুল সব ব্যবস্থা করে রেখেছে। শহিদুলের বাসা জিগাতলা। কমলাপুর নেমে একটা সিএনজি নিয়ে হাসনাত জিগাতলা যাবেন। থাকবেন বন্ধুর বাসায়। রাত কয়টা বাজবে কে জানে। বসে থাকতে থাকতে পিঠের ব্যথা চাগিয়ে উঠলে হাসনাত একটু হেঁটে আসেন। যশোরের বিখ্যাত অর্থোপেডিক ডাক্তার মোবারক বলেছেন, পিঠের এই ব্যথাটা হাসনাতকে ভোগাবে। বয়ে বেড়াতে হবে জীবনভর। ভালো চিকিৎসা নিলে এবং নিয়ম মেনে চললে ব্যথা কমবে, কিন্তু পুরোপুরি নিরাময় হবে না। হাসনাতের তবু সৌভাগ্য, তিনি প্রাণে মরেননি। বেঁচে আছেন। তার ওই পরিস্থিতিতে পড়ে অনেকে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারেনি। হাসনাত দেখেছেন, গত দশ বছরে সবকিছু কীভাবে চোখের পলকে বদলে গেছে। অসাধুরা তো বটেই, সাধুরাও লুটেরা হওয়ার দৌড়ে প্রতিযোগিতা করেছে। হাসনাতের মতো ব্যতিক্রমী দু’চারজন যারা আছেন, যারা মেরুদণ্ড সোজা করে বাঁচতে চেয়েছেন, তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আর দশজনের মতো তিনিও যদি মাথা বেচে দিতেন ক্ষমতার পায়ের কাছে, আজ তাকে পিঠের ব্যথা নিয়ে ঢাকা যেতে হতো না।

ছাত্রজীবন থেকেই হাসনাত ছিলেন ব্যতিক্রম। বাম রাজনীতি করা ছেলেদের সঙ্গে মিশতেন। যশোর এমএম কলেজের উজ্জ্বল সেই দিনগুলো মনে পড়ে হাসনাতের। কবিতা, লিটলম্যাগ, গ্রাফিতি আর মানুষের অধিকার আদায়ের মিছিল-মিটিং ছিল পড়াশোনার চেয়েও বেশি উত্তেজক এবং আকর্ষণীয়। নিয়মতান্ত্রিক নটা পাঁচটার চাকরির স্বপ্ন কোনওদিনই দেখেননি তিনি। ফলে অন্যরা যখন নিশ্চিত ক্যারিয়ার গড়তে বিসিএসের বইয়ে মুখ গুঁজে পড়ে থাকত সকাল-সন্ধ্যা, হাসনাত তখন শহরের এ-মাথা ও-মাথা চষে বেড়াতেন বন্য হাতির মতো। বন্ধুরা তার এই বাউণ্ডুলে স্বভাব দেখে বিস্মিত হতো। তোরে মাঝে মাঝে জিন মনে হয়। এই এখন দড়াটানা ব্রিজে তো একটু পরই স্টেডিয়াম মাঠে। শহরের ধারেই ঘোপে হাসনাতের পৈতৃক বাড়ি। ছোটবেলা থেকেই দেখছেন, বাবার রড-সিমেন্টের ব্যবসা। ছাত্রজীবনে তাই কর্মজীবন নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয়নি। মনে হয়েছে, তার জন্য কাজের একটা ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েই আছে। সত্যি তাই, কোনও মতে পড়াশোনাটা শেষ করে হাসনাত টুকটাক বাবার ব্যবসা বুঝতে শুরু করেন। তাও প্রায় ষোল-সতেরো বছর আগের ঘটনা। বাবা তখন শক্তসমর্থ ছিলেন। কাজের মূল ধাক্কা বাবাই সামলাতেন। হাসনাত হাওয়া খেয়ে বেড়াতেন আর মন চাইলে দোকানে ঢুঁ মারতেন। এখন বয়স হয়েছে বাবার। বয়স হয়েছে হাসনাতেরও। বন্ধুরা সব কোথায় কোথায় ছিটকে গেছে। আলাদা আলাদা ঘাটে ভিড়েছে সবার জীবনের তরী। মাঝে মাঝে মনে হয়, সবাইকে নিয়ে যদি একটা দিন কোথাও বসা যেত! বর্তমান নিয়ে কোনও কথা নয়, শুধু স্মৃতিচারণ চলবে। তাদের স্মৃতিগুলো এত বর্ণিল, এত বর্ণাঢ্য, এত উজ্জ্বল; রাত ফুরিয়ে যাবে, স্মৃতিচারণ ফুরাবে না। অথচ বছর চলে যায় কারও কারও সঙ্গে ফোনে কথা পর্যন্ত হয় না। ঢাকায় গিয়ে যে শহীদুলের বাসায় তিনি উঠবেন, সেই শহীদুলের সঙ্গেও দেড় বছর পর দেখা হবে। অথচ শহীদুলের একটা নিরুপদ্রব প্রেমের জন্য তিনি কী না করেছেন! মাঝে মাঝে কারও সঙ্গে যে দেখা হয় না এমন না। পুরনো বন্ধুদের সামনে পেলেই হাসনাত পুরনো দিন নিয়ে প্রগলভ হয়ে পড়েন। কিন্তু বন্ধুরা স্থির থাকতে চায় বর্তমানকে নিয়েই। কে কোথায় আছে, বাচ্চাকাচ্চা কয়টা, কত টাকা রোজগার, কার গাড়িবাড়ি হলো, বসের পারিবারিক কেচ্ছা―এই সব। হাসনাত বন্ধুদের এই সব বৈষয়িকতার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেন না। ফলে দিনে দিনে বন্ধুদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আকর্ষণটাও ফিকে হয়ে আসছে। হাসনাতের পূর্ণ মনোযোগ তাই এখন ব্যবসার প্রতিই। অন্যের অধীনস্থতা ধাতে নাই বলে চাকরির চেষ্টা করেননি। ব্যবসাকে চিরকালই স্বাধীন পেশা হিসেবে জেনেছেন। অথচ ব্যবসায় ঢুকে বুঝেছেন, এখানেও আছে পরাধীনতার ছোবল। ঈদে, পার্বণে, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন দিবসে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের পাণ্ডারা আসে চাঁদা চাইতে। এ নাকি তাদের অধিকার। গেল মাসে এমনই একদল ছেলে এসেছিল হাসনাতের দোকানে। হাসনাতের পর যদি মায়ের আরও দুটো ছেলে হতো, সর্বশেষ ছেলের বয়স যা হতো, এই ছোকরাগুলোর বয়স তাই। সামনে ইলেকশন। তাদের কিছু মালপানি দরকার। ইলেকশন উপলক্ষে খরচাপাতি আছে না!

হাসনাত তখন দোকান বন্ধ করে বাসায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় এই উৎপাত। ক্রোধ সামলে তিনি অবাক হওয়ার ভান করে বললেন, খরচ তো হবেই। কিন্তু তার জন্য তো আপনাদের পার্টি আছে। পার্টি টাকা দেয় না ?

বড় ভাই, আপনে কি পার্টির বাইরির লোক ? ছোট ভাইদের ভালো থাকার ব্যাপারে আপনেরও কিছু দায়িত্ব আছে।

দ্যাখ ছোট ভাইয়েরা, আমি নিতান্ত ছা পোষা এক ব্যবসায়ী। আয়-রোজগার কম। কোনও সাতেপাঁচে নাই। অন্য কোথাও দেখলে তোমাদের সময়ও বেঁচে যায়, আমার সময়ও।

ইলেকশনডারে আপনে নিজির মনে করতেছেন না ক্যান! ইডা তো সবার জাতীয় উৎসব। খুশি খুশি মনে কিছু দিয়ে দেন। অনেক জাগায় যাতি হবি। সুমায় নষ্ট করেন না প্লিজ।

ছেলেগুলো ঘুরেফিরে বারবার যখন ইলেকশনের কথা তুলছেই, ওদের সঙ্গে ইলেকশন বিষয়ে একটু কথা বলতে ইচ্ছে করল হাসনাতের। তিনি বললেন, যে ইলেকশনে বিরোধীদল নাই, ইলেকশনের আগেই সিলেকশন হয়ে কারা ক্ষমতায় যাচ্ছে, সেই ইলেকশনকে এখনও তোমরা জাতীয় উৎসব বলো ?

পেছন থেকে একটা ছেলে, যাকে একটু ভদ্র মনে হয়, বলে, ভাইয়া, ইবার কিন্তু বিরোধীদল আছে। সবখানেই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। আপনি সচেতন মানুষ। সব খবরই তো রাখেন।

প্রতিদ্বন্দ্বিতা ? আমির সঙ্গে ডামির নির্বাচনে আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় নাকি! সবই তো সরকার দলীয় লোক।

হাসনাতের কপাল ভালো যে এতক্ষণ ওরা সহনশীল আচরণ করেছে। কিন্তু হাসনাতের মুখে যখন তাদের স্বপ্নের নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, এরপর আর শান্ত থাকা যায় না। থাকার নিয়মও নাই। পেছন থেকে একজন ফট করে সামনে চলে আসে। নেতাকে বলে, ভাই, আমরা কার ধারে আইছি! এই লোক যে জামাত-শিবিরের লোক, এখনও বুঝতি পারতেছেন না ক্যান! ডান্ডা মারে ঠান্ডা করাই এর ওষুধ।

প্রতিবাদ করেন হাসনাত―জামাত-শিবির বলার আগে আমাকে নিয়ে ভালো করে স্টাডি করে আসো। তোমাদের এই ট্যাগিংয়ের রাজনীতি ভবিষ্যতে তোমাদের জন্যই বুমেরাং হবে।  

পেছন থেকে অল্পবয়সী আরেকটা ছেলে চিল্লিয়ে ওঠে―জামাত-শিবিরই যদি না হবি তাইলে আমাদের নির্বাচন নিয়ে তোর এত চুলকানি ক্যান!

হতভম্ব হয়ে যান হাসনাত। এত বড় হয়েছেন অথচ এমন আচরণের মুখামুখি কোনদিন হননি তিনি। তাও আবার দুর্ব্যবহারটা নেতার কাছ থেকে নয়, এসেছে এক চামচার কাছ থেকে। এ যেন বাঁশের চেয়ে কঞ্চি মোটা অবস্থা। ক্রোধ লুকিয়ে রাখতে পারেন না হাসনাত। এক পা এগিয়ে তেড়ে ওঠেন তিনি। চড় শাসিয়ে বলেন, এই ছেলে এই, তুই তোকারি করছ কেন! বের হও আমার দোকান থেকে।

আমাকে মারবি ? এত বড় সায়োস! আয়, মার। ছেলেটা ছুটে এসে গাল পেতে দেয়। হাসনাতও কী বোকা, পাতা গালে চড় বসানার ঝোঁক সামলাতে পারেন না। এই একটা চড়ই যথেষ্ট সবাইকে ক্ষিপ্ত করে তুলবার জন্য। তারা ক্ষিপ্ত হয়েও ওঠে, বন্য পশুর মতো। ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা হাসনাতের ওপর। এলোপাতাড়ি কিলথাপ্পড়ে তারা হাসনাতের সুঠাম দেহকে সাটপাট শুইয়ে দেয় মাটিতে। ব্যথা, বেদনা, অপমানে এতটাই বিমূঢ় হন হাসনাত, দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে যান সকল আঘাত। তার মুখ থেকে বের হয় না যন্ত্রণাবাহিত সামান্য আর্তনাদও। প্রতিরোধ এলে মারতে আরাম। সাপ ততক্ষণ মার খায়, যতক্ষণ সে লেজ বাঁকায়। কিন্তু জীবন থেকে হতাশ হয়ে সাপ যখন মিশে যায় মাটির সঙ্গে, আঘাতকারীদের উৎসাহ ফুরিয়ে যায়। হাসনাতের ব্যাপারেও সেটাই ঘটে। ওরা ভেবেছিল হাসনাত প্রতিরোধ করবেন। তাতে মারতে সুবিধা হবে। কিন্তু মানুষটা দম ফুরানো সাপের মতো এমনভাবে লুটিয়ে থাকে দোকানের মেঝেয়, ছেলেগুলোর উৎসাহ মরে যায়। তবে যাওয়ার আগে সেই ছেলেটি, যার সঙ্গে শেষ তর্ক হয়েছিল, হকিস্টিকের নিষ্ঠুর স্মৃতি রেখে যায় হাসনাতের পিঠে। সেই আঘাত নিয়েই আজ ঢাকা যাবেন হাসনাত।

৫ জানুয়ারির দুপুর। বঙ্গাব্দের হিসাবে পৌষের ২১ তারিখ। এমন সময় কনকনে ঠান্ডা থাকার কথা। কিন্তু হাসনাত তেমন ঠান্ডা অনুভব করছেন না। আসলেই কি শীত কমে গেছে নাকি তার শীতানুভূতি কমেছে বুঝতে পারেন না তিনি। একদিন পরই আমির সঙ্গে ডামির নির্বাচন। এমন সময় ইচ্ছা করেই হাসনাত ডাক্তারের অ্যাপয়েনমেন্ট নিয়েছেন। নির্বাচনের দিন বন্ধুর বাসায় থাকবেন। চোখের সামনে নির্বাচন নামের তামাশা তিনি হজম করতে পারবেন না। তাই তো এলাকা ছেড়ে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত। চড়ুইটা আবার ফিরে এসেছে। এবার একা নয়, তার জোড়াও এসেছে। দুজন লাফিয়ে লাফিয়ে খাদ্যকণা খুঁটছে। ওদের সুখী জীবন দেখে হাসনাতের হৃদয়টা নৌকার মতো দুলে উঠল। ওদের মতো সুখের ছোট্ট ঘর বাঁধার আকাক্সক্ষা ছিল হাসনাতের। হয়নি। ঘর বাঁধার জন্য চড়ুইদের সঙ্গী পছন্দ করতে হয় না। জন্মের সময়ই প্রকৃতির কোল থেকে ওরা একে অন্যের সঙ্গী নিয়ে আসে। ব্যতিক্রম মানুষ। ঘুরে ঘুরে মনের মতো সঙ্গী খুঁঁজতে হয় মানুষের। সব সময় তাদের খুঁজে পাওয়াও যায় না। পেলেও আবার ঘর বাঁধা যায় না। মানবসৃষ্ট কত প্রতিকূলতা দুজনের সামনে এসে দাঁড়ায়! হাসনাতের চোখে ভাসে লায়লির মুখ। আহ লায়লি! খুঁজলে এই প্লাটফর্মের ধুলোর ভেতরও পাওয়া যাবে লায়লি আর হাসনাতের যুগল পায়ের ছাপ। সেই লায়লি আজ অন্যের সংসারে আর হাসনাত মেরুদণ্ডের জখম নিয়ে একাকী রেলস্টেশনে বসে থাকে ট্রেনের অপেক্ষায়। অপেক্ষাই কি তবে মানবজীবনের নিয়তি!

হাসনাত সতেরো বছর আগে হারিয়ে ফেলা লায়লির মুখটা ভাবতে থাকেন আর তখন ধুলো উড়িয়ে ট্রেন প্রবেশ করে প্লাটফর্মে। 

ছয়

শুনুন! হন্তদন্ত হয়ে আব্দুল হাই কলাভবনের তিনতলার সিঁড়ি ভাঙছিল হাসনাত। জাফর স্যারের ক্লাস শুরু হওয়ার খুব বেশি দেরি নাই। কিংবা হতে পারে স্যার ক্লাসে ঢুকে গেছেন। হাসনাত অন্য স্যারদের ক্লাস মিস করলেও জাফর স্যারের ক্লাসের নিয়মিত ছাত্র। স্যার এমন চমৎকার পড়ান, মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুধু শুনতে ইচ্ছে করে। তাই, প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার প্রতি চূড়ান্ত উদাসীন হাসনাতেরও এই হন্তদন্ত হয়ে সিঁড়ি ভাঙ্গা। স্যার আবার নিয়মের ব্যাপারে খুব কড়া। স্যার ক্লাসে ঢুকে যাওয়ার পর অন্য কারও ক্লাসে ঢোকা নিষেধ। চাই সে স্যারের যত প্রিয় শিক্ষার্থীই হোক। ক্লাস চলাকালে অন্য কারও প্রবেশ―এতে নাকি স্যারের মনোযোগে বিঘ্ন ঘটে। শুধু স্যারেরই বা বলি কেন, হাসনাত খেয়াল করে দেখেছে, স্যারের ক্লাস চলাকালে বাইরে থেকে কেউ এলে খোদ শিক্ষার্থীরাও বিরক্ত হয়। স্যারের আজকের টপিকটাও দারুণ। হাসনাত তাই আজকের ক্লাসটা মিস দিতে চায় না কোনওভাবেই। আরও আগেই সে কলেজে চলে আসতে পারত। কিন্তু বাড়ি থেকেই বাগড়া বাঁধিয়েছে খোদ মা। হাসনাত যখন রেডি হচ্ছে, মা বললেন ফার্মেসিতে যেতে। তার প্রেসারের ওষুধ শেষ হয়ে গেছে। আব্বাকে বলা যায়, কিন্তু আব্বার দোকান আছে। বড় একটা পার্টির আসার কথা সকাল সকাল। তাদেরকে বসিয়ে রাখতে পারবেন না আব্বা। অগত্যা কলেজে বেরোনোর আগ মুহূর্তে ফার্মেসিতে যেতে হয়েছিল হাসনাতকে। আর এই ঘটনাই তাকে জাফর স্যারের ক্লাস থেকে ছিটকে ফেলার শঙ্কা তৈরি করেছে। হাসনাত খেয়াল করে দেখেছে, যেদিনের সকালটায় ঝামেলা ঢুকে যায়, সেই দিনে পদে পদে ঝামেলা ওত পেতে থাকে। নয়তো দড়াটানা ব্রিজ পার হয়ে তার সাইকেলের চেন কেন পড়ে যাবে! অথচ গত দেড় বছরে সে কোনওদিন তার প্রিয় হিরো সাইকেলটার চেন পড়তে দেখেনি। সেটাও না হয় মানা গেল, কিন্তু এখন, যখন সাইকেলটাকে খোঁয়াড়ে বন্দি করে রেখে হন্তদন্ত হয়ে সে ক্লাসে যাওয়ার সিঁড়ি ভাঙছে, তখন পেছন থেকে কিন্নর কণ্ঠে ‘শুনুন’ বলে কে ডাকে ? হাসনাত ছুটতে ছুটতেই পেছন ফেরে। এক তরুণী মুখে হাসি ঝুলিয়ে তাকিয়ে আছে। মেয়েটাকে আগে কোথাও সে দেখেছে বলে মনে পড়ল না। তবে এটুকু সে নিশ্চিত, মেয়েটা তার ডিপার্টমেন্টের নয়। নিজ ডিপার্টমেন্টের সব মেয়েকেই সে মোটামুটি চেনে। 

আমাকে ডাকছেন ?

এখানে আর কেউ তো নেই। আপনের জন্যি একটা জিনিস আনছি।

জিনিস ? ভ্রƒ কুঁচকে গেল হাসনাতের।

একটা চিঠি।

চিঠি! এই অবেলায়, ক্যাম্পাসের সিঁড়িতে এক অচেনা তরুণী তার জন্য চিঠি সাজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভাবতেই মনটা অন্য রকম হয়ে গেল হাসনাতের। এক মুহূর্তের জন্য সে কি বিস্মৃত হলো জাফর স্যারের কথা! বেশ আগ্রহী কণ্ঠে বলল, চিঠি! আমার জন্য ? কার চিঠি ?

পড়ার পর বুঝতি পারবেন। তরুণী এগিয়ে এসে একটা কাগজ বাড়িয়ে ধরল। কৌতূহলী হাসনাত চিঠিটা ধরতেই সিঁড়ি থেকে ছিটকে নেমে গেল তরুণী। এর খানিক পরই দোতলা থেকে ভেসে এল কয়েকটি মেয়ের সম্মিলিত হাসির শব্দ। কতক্ষণ বোকার মতো দাঁড়িয়ে থেকে যখন ঘোর ভাঙল হাসনাতের, তার ক্লাসের কথা মনে পড়ল। এই মুহূর্তে তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে দুটো জিনিস―ক্লাস এবং চিঠি। হাসনাত কার ডাকে আগে সাড়া দেবে! সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে উঠতে সে স্থির করল, ক্লাস হারালে ক্লাস পাওয়া যাবে না, কিন্তু চিঠিটা তো তোলাই থাকবে পকেটে। অতএব, ক্লাসের দিকেই এগোনো যাক। আবার ক্লাসে ঢুকেও গোপনে চিঠির ওপর চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাবে। এইসব ভেবে সে ক্লাসের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। জাফর স্যার ক্লাসে ঢুকে পড়েছেন। দুয়ার বন্ধ। চলছে রুদ্ধদ্বার ক্লাস। হাসনাত ‘হুইশ’ বলে ঠোঁটে একটা শব্দ তুলল। তারপর কতক্ষণ ক্লাস রুমের সামনের করিডোরে পায়চারি করে অগত্যা নিচে নেমে এল। মাঠের এক কোনায় দাঁড়িয়ে ভাঁজ খুলল চিঠির। চিঠি না বলে চিরকুট বললেই জিনিসটার প্রতি সুবিচার করা হয়। মেয়েলি হাতের গোটা গোটা অক্ষরের তিন লাইনের ছোট্ট লেখা। গতকালের অনুষ্ঠানে আপনার কবিতা আবৃত্তি ভালো লেগেছে। ভবিষ্যতেও আপনার আবৃত্তি শুনতে চাই। ইতি, রহস্যময়ী।     

চিরকুট পাঠান্তে ঘোর রহস্য ফুটে ওঠে হাসনাতের মুখাবয়বে। ক্যাম্পাসের রহস্যময়ীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার মতোই সুপুরুষ হাসনাত। পড়াশোনায় ভালো। দেখতে-শুনতে ভালো। রাজনীতিসচেতন। আবার ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সামনের দিকে থাকে। এমন ছেলের কাছে রহস্যময়ীদের চিরকুট আসা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু কী এক অদ্ভুত কারণে মফস্সলের এই প্রাচীন কলেজের রহস্যময়ীরা আজ পর্যন্ত হাসনাতের প্রতি কৃপা করেনি। আজই প্রথম। হাসনাতের শিরায় শিরায় রোমাঞ্চের মৃদু তরঙ্গ বয়ে যায়। মেয়েটার মুখ মনে করতে যায় সে, যে মেয়েটির হাত থেকে চিরকুটটি তার হতে এসে পৌঁছেছে। কিন্তু কী অদ্ভুত, তাড়াহুড়োয় মেয়েটির মুখ মনে রাখা হয়নি। চিরকুটটা বুকের সঙ্গে ঘষতে ঘষতে হাসনাত তাদের কলাভবনের বিল্ডিংটার দিকে তাকাল। দোতলায়, রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনুষদের সামনে কয়েকটি মেয়ের জটলা। ওদের মধ্যেই কি আছে সেই মেয়ে! হাসনাত একটি গাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মাথায় তখন যুগপৎ দুটো জিনিস খেলছে―ক্লাস এবং রহস্যময়ীর রহস্য।

পরদিন দুপুরে কলাভবনের মাঠের কোনায় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারছিল হাসনাত। তখন আবার উপস্থিত গতকালের মেয়েটা। আজ তার হাতে কোনও চিরকুট নাই, আছে একটি আইসক্রিম। আইসক্রিমটি হাসনাতের দিকে বাড়িয়ে ধরে হাসতে হাসতে বলল, এটা আপনের। আপনের জন্যিই আমরা লাইলির কাছ থেকে আইসক্রিম বাগাতি পারিছি। আরে ধরেন না, গইলে যাবি তো!

কী বলেন এসব, কিছুই তো বুঝি না, লাইলি-আইসক্রিম, কী এসব ? হাসনাত যখন বিভ্রান্ত হয়ে এসব বলছে, ততক্ষণে ওর ডান হাতের দুই আঙ্গুলের চিপায় ঢুকে পড়েছে আইসক্রিমের ডাঁটি। বন্ধুরা ততক্ষণে চিৎকার জুড়ে দিয়েছে, কী খবর দোস্ত, তলে তলে কবেততে জল খাওয়া হচ্চে কওদিনি!

সোহাগ বলে, আরে জল না জল না। আইসকিরিম। ডুবে ডুবে দোস্ত আমার আইসকিরিম খাচ্চে। এই বলে সে ছোঁ মেরে আইসক্রিমটা নিয়ে নেয় হাসনাতের হাত থেকে। এরপর দূরে ছিটকে গিয়ে গপাগপ সাবাড় করে ওই ঠান্ডা খাদ্যবস্তু।

ছয় মাস পর, যখন লাইলির জীবনের সঙ্গে জুড়ে গেছে হাসনাতের জীবন, তখন এক বিকেল বেলা পুকুর পাড়ে বসে এই ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে করতে হেসে গড়িয়ে পড়ে লাইলি। হাসনাত বলে, এতদিন শুনে এসেছি এই ধরনের খেলা ছেলেরা খেলে। মেয়েদেরও এসবের চর্চা আছে জানতাম না।

হ্যাঁ, সেদিন, সেই মেয়েটির মাঝ সিঁড়িতে এসে হাসনাতের হাতে চিরকুট ধরিয়ে দেওয়া লাইলিদের একটা খেলা ছিল। তার আগের দিন বান্ধবীদের অনেকেই হাসনাতের আবৃত্তি শুনে ফিদা হয়েছিল। ক্যাম্পাসে ওদের পড়াশোনার বয়স বেশি না। ভর্তি হওয়ার পর এই প্রথম কোনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলো। আর এই প্রথম তারা হাসনাতের আবৃত্তি শুনল। নিবিড়ভাবে তাদের চেনারও সুযোগ হলো হাসনাতকে। বিশেষ করে লাইলি, আবৃত্তির সময় সেই যে তার চোখ ঝলমলিয়ে উঠল মুগ্ধতায়, তার ছটা আর নিষ্প্রভ হলো না। বান্ধবীরা ক্ষ্যাপাতে লাগল। তুই নির্ঘাত ওই ছেলের প্রেমে পড়েছিস। ধুর বলে লাইলি বারবার ওদের থেকে সরে যাচ্ছিল। কিন্তু রিতা, সুমি দমবার পাত্র নয়। ওরা বারবার লাইলির সামনে গিয়ে পড়ছিল আর বলছিল, এমুন সুদর্শন ছেলের প্রেমে পড়লে, কিছু খাওয়াও দোস্ত।

লাইলির মজাই লাগছিল। কিন্তু বারবার খাওয়ানোর কথা বললে ও ত্যক্ত হয়ে বলল, খাওয়াতে পারি এক শর্তে, যদি হাসনাত ভাইকে একটা চিরকুট দিতে পারিস।

হাসনাত কিডা ? রিতা সুমি দুজনের চোখই গোল গোল হয়ে উঠল।

হাসনাত ভাইকে চিনিসনে আবার জ¦ালাতি আসছিস। লাইলি মুখ ঝামটা দিয়েছিল কৃত্রিম।

ও বুঝছি বুঝছি। ওই আবৃত্তি করা ছেলেটাই হাসনাত। ঠিক আছে, কী চিরকুট দিতি হবি ক। লাইলির চ্যালেঞ্জ লুফে নিল সুমি।

লাইলি খাতার পৃষ্ঠা ছিঁড়ে তৎক্ষণাৎ লিখে ফেলল চিরকুট : গতকালের অনুষ্ঠানে আপনার কবিতা আবৃত্তি ভালো লেগেছে। ভবিষ্যতেও আপনার আবৃত্তি শুনতে চাই। ইতি, রহস্যময়ী।

পুকুরপাড়ে বসে সেদিনের স্মৃতিচারণ করতে করতে লাইলি বলল, সুমিটা খুব হারামি। ও যে সত্যি সত্যি আপনাকে চিরকুট দিতে ছুটে যাবে, ভাবতেও পারিনি।

হাসনাত হাসতে হাসতে বলল, এবার সুমিকে আমি আইসক্রিম খাওয়াব।

কেন কেন ? সে নতুন কোনও চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে নাকি ?

চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেনি। পুরস্কার পাওনা হয়েছে তার।

কীসের পুরস্কার ?

আমার সঙ্গে তোমাকে মিলিয়ে দেওয়ার পুরস্কার।

পুকুরের উলটো পাশে এক জোড়া ডাহুক ডাকছিল। লাইলি ডাহুক দম্পতির দিকে তাকিয়ে আনমনে বলল, আমাকে এক জোড়া ডাহুক দেবেন ?

হাসনাত আপ্লুত কণ্ঠে বলল, আমি তোমাকে ডাহুকের চেয়েও বড় পুরস্কার দেব।

কী সেটা ?

আমার হৃদয়।  

সাত

ট্রেনে উঠে নিজের সিট খুঁজতে খুঁজতে বগির ঠিক মাঝখানে যেতে হলো হাসনাতকে। শোভন চেয়ার কোচের এই বগিগুলোর সিট পজিশন অন্য রকম। বগির প্রথম দরজা থেকে সিট শুরু হয়েছে যাত্রামুখী। আবার বগির দ্বিতীয় দরজা থেকে সিটের যা পজিশন, তা যাত্রার উল্টোমুখী। বগির ঠিক মাঝখানে গিয়ে মুখোমুখি হয়েছে দুদিক থেকে শুরু হওয়া সারিগুলো। হাসনাতের সিট পড়েছে একটা সারির শেষ সীমানায়, যেখান থেকে সামনে তাকালে বিপরীত দিকের যাত্রীর মুখের ওপর দৃষ্টি হোঁচট খায়। জায়গাটা নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর। এই সিটগুলোর প্রতিটি যাত্রীর প্রতিটি মুভমেন্ট উলটা পাশের যাত্রীর দৃষ্টিতে বন্দি। হাসনাত খানিকটা বিরক্তি নিয়েই বাংকারে তুললেন লাগেজ। সিটে বসে সামনে তাকাতেই থতমত খেলেন। তার উলটো পাশের সহযাত্রী এক কিশোরী। আনমনা চোখে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। হাসনাতের থতমত খাওয়ার কারণ, কিশোরীর মুখের কোথায় যেন একটুখানি লাইলি লেগে আছে। ট্রেন ছাড়লে মৃদু বাতাসে যখন কিশোরীর চুল উড়তে লাগল নাকে-মুখে, হাসনাতের স্মৃতিতে আবার ফিরে এল পুকুর পাড়। এমএম কলেজের পুকুর পাড়, এক জোড়া ডাহুকের প্রেমময় সংসারে যে পুকুর প্রত্যুজ্জ্বল।

হাসনাত লাইলিকে ডাহুকের চেয়েও বড় পুরস্কার তার হৃদয়টা দিয়েছিল। কিন্তু লাইলিকে সে বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনি। ক্যাম্পাসে তার আর লাইলির ছয় মাস বয়সী সম্পর্ক নিয়ে যে কাণ্ড ঘটেছিল, তা ভাবলে এখনও শরীর হিম হয়ে আসে হাসনাতের। প্রথম প্রথম তো সাদা বকের মতোই উড়ছিল দুজন। ক্যাম্পাস চত্বরে পরিচিত পরিমণ্ডলে খানিকটা সংযত থাকলেও ক্যাম্পাসের বাইরে তাদের ওড়াউড়ির আকাশ ছিল অসীম। কখনও ধর্মতলা, কখনও পালবাড়ি মোড়, কখনও বা দড়াটানা মোড়ের বইয়ের দোকান, আবার কখনও বিনোদিয়া পার্ক―সবখানে ওরা ভালোবাসার ছাপ রেখে যাচ্ছিল। শহরবাসী ওদের উচ্ছল ছুটে চলা দেখত, কেউ কেউ অভিনন্দিত করত, কেউ ঘেন্নায় মুখ ঘোরাত, কেউবা ঈর্ষায় ভ্রƒ কোঁচকাত। আজ থেকে ষোল-সতের বছর আগের সংযত সময়ে সম্পর্কে যে সংযম রাখা নিয়ম ছিল, সেই নিয়ম ভেঙ্গে পড়েছিল ওদের বেপরোয়া ডানার ঘায়ে। ফলে যা হবার তা-ই হয়েছিল। খুব অল্পদিনেই সবার মাঝে জানাজানি হয়ে গিয়েছিল ঘটনা। রশিদ স্যার, যিনি লাইলিকে বিশেষ স্নেহ করতেন, তিনি একদিন গোপনে ডেকে লাইলিকে উপদেশ দিয়েছিলেন : দিনশেষে এসবে কোনও লাভ নাই। সাময়িকের আবেগ ও উত্তেজনা। পড়াশোনার ক্ষতি হবে। আর একটা সময় দেখবে, যাকে তুমি প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসো, সে তোমাকে ছেড়ে চলে গেছে। মাঝখানে বিরাট এক ক্ষতি করে গেছে তোমার। স্যারের সামনে শুধু কেঁপেছিল লাইলি। স্যারের কথাগুলোকে মনে হয়েছিল সত্যিই। তবে শেষের কথাটার সঙ্গে সে একমত হতে পারেনি। আর যাই হোক, ক্ষতি করে ভেগে যাওয়ার মতো ছেলে হাসনাত না। লাইলির যেমন শুভাকাক্সক্ষী রশিদ স্যার আছেন, অমন এক স্যার আছেন হাসনাতেরও। আফজাল স্যার। তিনিও রশিদ স্যারের মতোই হাসনাতকে বোঝালেন। এসবে লাভের লাভ কিচ্ছু হয় না। যা হয় তা হলো পড়াশোনার ক্ষতি। ভালো রেজাল্ট করো। বড় চাকরি করো। অমন মেয়ে কত আসবে জীবনে। তাছাড়া… অন্য স্যাররাও তোমাদের ওপর বিরক্ত। এভাবে কেউ ক্যাম্পাসের মধ্যে ঢলাঢলি করে! ধর্ম শালীনতা বলেও তো একটা কথা আছে, নাকি!

হাসনাত প্রতিবাদ করতে চেয়েছিল। ঢলাঢলি মানে! জুনিয়র একটা মেয়ের সঙ্গে কথা বলা কি ঢলাঢলি ? এখন পর্যন্ত মেয়েটার হাতও ধরেনি হাসনাত। আর এই স্পর্শহীন সম্পর্কের নাম হয়ে গেল ঢলাঢলি। আজব!

হাসনাতের মনের কথাটা যেন পড়ে ফেলেছিলেন আফজাল স্যার। দেখ, পুকুর পাড়ে তোমরা যা করছ, এমএম কলেজের ইতিহাসে এই প্রথম। কলেজে আসো পড়াশোনার জন্য। পুকুর পাড়ে কী তোমাদের! তোমার জন্য আমাকে পর্যন্ত অন্য টিচারদের কাছে কথা শুনতে হয়।

স্যারের রুম থেকে হনহন করে বেরিয়ে এসেছিল হাসনাত। দুদিন ছিল গম্ভীর হয়ে। এর মাঝে একবারের জন্যও দেখা কিংবা কথা হয়নি লাইলির সঙ্গে। আর লাইলিটাও বা কেমন, সেও নিজ থেকে যোগাযোগ করেনি। করবেই বা কীভাবে, তার ওপরও যে তখন রশিদ স্যারের উপদেশ ক্রিয়া করে চলেছে। দুজনের দেখা হলো এক সপ্তাহ পর, ক্যাম্পাসের বাইরে ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পাশে। লাইলি একটি টিউশনি করে ফিরছিল। লাইলিকে এখানে রিকশায় দেখে হাসনাত তো অবাক। সে কোনও কিছুর তোয়াক্কা না করে লাফ দিয়ে উঠেছিল লাইলির রিকশায়। লাইলি কিছুটা বিব্রত হয়েছিল―কী করো এসব! এভাবে গুন্ডার মতো কেউ মেয়েদের রিকশায় ওঠে! ছেলেমানুষ মানেই কি গুন্ডা!

হাসনাত হাসল―ঠিকই ধরেছ। পুরুষমানুষ জন্মসূত্রেই গুন্ডা। তা আসছ কোত্থেকে ?

জুঁইয়ের বাসায় গেছিলাম।

জুঁইটা আবার কে ? নতুন বান্ধবী ?

না, আমার ছাত্রী। ক্লাস নাইন। ওকে আমি পড়াই।

হাসনাত খুব অবাক হলো―তুমি একটা মেয়েকে পড়াও অথচ আমি জানি না।

ইচ্ছা করেই জানাইনি।

কেন ?

লজ্জায়।

টিউশনিতে লজ্জা কীসের ?

ও তুমি বুঝবা না।

বোঝায়ে বলো।

যারা গরিব, যাদের বাবার রড-সিমেন্টের ব্যবসা নাই, যাদের বাড়ি থেকে পর্যাপ্ত মানি অর্ডার আসে না, তারা টিউশনি করে খরচ জোগায়।

হুর! এটা কোনও কথা! অনেক পোলাপান টাকা-পয়সার বাড়তি ফুটানির জন্যও টিউশনি করে। যাই হোক, টিউশনির ব্যাপারটা তুমি আমার কাছে শেয়ার করোনি। আজ এখানে দেখা না হলে বলতেও না। আমি কি তোমার এতই পর ?

এটা এমন আহামরি বিষয় না যে, তোমায় শেয়ার না করায় পর হয়ে যাওয়ার প্রশ্ন আসবে।

আচ্ছা বাদ দাও। কিন্তু কয়দিন তোমার দেখা নাই কেন!

তোমারও তো দেখা নাই।

একটু ব্যস্ত ছিলাম।

আমিও ব্যস্ত ছিলাম।

তোমার কী হয়েছে, লাইলি ? কোনও কারণে ডিস্টার্ব আছ ?

ভাবছি, বাড়ি থেকে আমাকে কী জন্য এখানে পাঠিয়েছে আর আমি কী করছি!

কী করছ মানে! পড়াশোনার জন্য পাঠিয়েছে পড়াশোনা করছ।

বলো পড়াশোনা করছি না। পড়াশোনাটা ছাড়া বাড়ি সব করছি। আমি যদি কেবল পড়াশোনা করা মেয়ে হতাম তবে এই মাঝ রাস্তায় পথচারীদের তোয়াক্কা না করে বখাটেদের মতো করে আমার রিকশায় উঠে পড়তে না।

লাইলির কথাবার্তা আজ শুরু থেকেই অন্য রকম লাগছিল। যেন সে এড়িয়ে যেতে চায় হাসনাতকে। অথবা এই সম্পর্ক নিয়ে সে অসুখী। হাসনাত যেন তাকে জোর করে সম্পর্কটায় আটকে রেখেছে। মনের মাঝে এইসব প্রশ্ন খচখচ করছিল শুরু থেকেই। এখন যখন লাইলি বখাটে শব্দটা উচ্চারণ করল, রেগে গেল হাসনাত। কী! আমি বখাটে! আমাকে বখাটেদের সঙ্গে তুলনা করলে! এই মামা, দাঁড়ান দাঁড়ান। হাসনাত লাফ দিয়ে রিকশা থেকে নামল। ফোঁস ফোঁস করতে করতে বলল, আমাকে বখাটে বলা, না! আমি বখাটে! আর কোনওদিন তোমার সঙ্গে কথা বলব না।

লাইলি অবাক গলায় বলল, আজব! আমি কখন তোমাকে বখাটে বললাম! তুমি সব সময় দুই লাইন বেশি বোঝো।

হাসনাতের মাথায় তখন কী যে হয়েছে, সে আরও রেগে গেল। হ্যাঁ, আমি দুই লাইন বেশি বুঝি। আর তুমি যত সাধু। হাসনাত হাত থেকে ধুলো ঝাড়ার মতো করে হৃদয় থেকে লাইলিকে ঝেড়ে ফেলার প্রতিজ্ঞা করল। প্রতিজ্ঞার কথা সে চিবিয়ে চিবিয়ে লাইলিকে শুনিয়েও দিলো। কিন্তু সেই প্রতিজ্ঞা সে দুদিনও ধরে রাখতে পারল না। সেদিন রাতেই সে লাইলিকে ফোনের ওপর ফোন করে অতিষ্ঠ করে তুলল। কিন্তু ফোন রিসিভ হলো না। অথচ বাজারে নতুন আসা নকিয়া ১১০০ মডেলের ফোনটা হাসনাতই কিনে দিয়েছিল লাইলিকে। ফোনের টাকাটা জোগাড় করতে হাসনাতকে অবলম্বন করতে হয়েছিল অসৎ পথ। নিজের মোবাইল সে বাবার কাছ থেকেই বৈধ পথে কিনেছিল। কিন্তু লাইলির ফোনের জন্য কয়েক দিন বিরতি দিয়ে দিয়ে সে দোকানে বসেছিল আর ক্যাশ থেকে টাকা তুলেছিল। ব্যাপারটায় মনের ভেতর খচখচ করলেও প্রেমিকার জন্য এইটুকু করাই যায় ভেবে আত্মসান্ত্বনা নিয়েছিল হাসনাত। যে ফোনের জন্য চোরের খাতায় নাম লেখাল হাসনাত, সেই ফোন আজ রিসিভ না হলে ওর মেজাজ কয়েক রকম হয়ে গেল। পরদিন সকালেও ফোন রিসিভ না হলে মেজাজ খারাপ পরিণত হলো দুশ্চিন্তায়। মনে মনে সান্ত্বনা দিলÑআর যাই হোক, রিকশা থেকে নেমে ওইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখানো তার উচিত হয়নি। পরদিন বিকেলে সে লাইলির টিউশনির পথে বিধ্বস্ত প্রেমিকের মতো নড়বড়ে কাঁধে দাড়িয়ে রইল। হাসনাতের বিপন্ন, বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত মুখ দেখে এত হাসি পেল লাইলির, সেই হাসি সে গোপন রাখতে পারল না। সে কেবলই ঠোঁট টিপে হাসতে লাগল। হাসনাতের পাশে গিয়ে সে রিকশা থেকে নামল আর মুখ কৃত্রিম গম্ভীর করে বলল, একা একা কী করো এখানে ?

তা জেনে তোমার কী ? হাসনাত ঝংকার দিয়ে উঠল।

চলো একটা রেস্টুরেন্টে বসি। খিদে লাগছে। লাইলি হাসনাতের হাত ধরল।

কেঁপে উঠল হাসনাত। শিহরিত হলো। হবেই বা না কেন! এটাই যে প্রথম স্পর্শ! হাসনাতের সকল মান-অভিমান-ক্রোধ আগুনের আঁচলাগা মোমের মতো গলে গলে পড়তে লাগল। বাধ্য ছেলের মতো সে লাইলির পিছু পিছু একটা সিঙ্গাড়ার দোকানে বসল। এ-ই তাদের রেস্টুরেন্ট।

আমার সব সময় অস্থির লাগে। মনে হয়, আব্বা-মার সঙ্গে প্রতারণা করছি। তারা আমাকে পড়ানোর জন্য পাঠিয়েছেন আর আমি পড়াশোনা বাদ দিয়ে তোমার সঙ্গে ঘুরছি।

পড়াশোনা বাদ দিয়ে ঘুরছ কে বলল! পড়াশোনা সঙ্গে রেখে ঘুরছ।

আমার পড়ায় মন বসে না। সারাক্ষণ তুমি মনে ভেতর বসে থাকো।

তারপরও তো ফোন রিসিভ করো না।

সেটা আমার অভিমান। এসব তুমি বুঝবা না।

তোমার অভিমান আমি বুঝি। কিন্তু এই কয়দিন যে আমার নির্ঘুম রাত কাটল, সেটা তুমি বুঝবা না। সিঙ্গাড়ার সঙ্গে কাঁচা মরিচে একটা কামড় বসাল হাসনাত।

সেটা বুঝি বলেই আজ রিকশা থেকে নেমে পড়লাম।

সিঙ্গাড়ার দোকানে দুজনের কথার তরী নানা ঘাটে ঘুরতে লাগল। এমন সময় সেখানে উপস্থিত হলো ষণ্ডামার্কা এক লোক, হাসনাত যাকে আগে কখনও দেখেনি। কিন্তু লাইলির চেনা। লাইলির মুখ হা হয়ে গেল। হাতের সিঙ্গাড়া টুপ করে পড়ে গেল প্লেটে। বলল, আপনে এখানে কী করেন ?

এই প্রশ্নডা তো আমার। তুমি এখেনে কী করো ?

সিঙ্গাড়া খেতে এসেছি। সঙ্গে কলেজের বন্ধু।

ইরাম বন্ধু তুমার কয় ডজন আছে কওদিনি ?

ফালুত কথা বলবেন না, রাজু ভাই। আপনি আমাকে আর কারও সঙ্গে দেখেছেন ?

তালি আমি যে এট্ট কতা চার মাস ধরে কয়ে যাচ্ছি, তার কুনু উত্তর দেচ্চ না ক্যান!

উত্তর তো দিছিই। আমার এখন পড়াশোনার সময়, প্রেম করার সময় না।

তালি এখুনডা কী কচ্চ ? সিঙ্গাড়ার টেবিলে একটা ঘুষি মেরে বলে উঠল রাজু।  

লাইলি চুপ করে থাকল। এত কিছু ঘটে যাচ্ছে চোখের সামনে, এরপর আর চুপ থাকতে পারে না হাসনাত। উচিতও না। সে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে বলল, আপনি কিন্তু ভদ্রতার সীমা ছাড়ায়ে যাচ্ছেন। আমি আমার প্রেমিকার সঙ্গে দোকানে বসি আর মঙ্গল গ্রহে যাই, সিঙ্গাড়া খাই আর ফালুদা খাই, তাতে আপনার কী, হাহ!

হাসনাতের অগ্নিমূর্তি দেখে আঁতকে ওঠে লাইলি, ফিসফিস করে বলে, চুপ করো। এই লোক ভয়ংকর।

আরে রাখো তোমার ভয়ংকর! আমার কী ছিঁড়বে সে! একটা ফালতু লোক। ম্যানার বোঝে না। দেখছে দুটো ছেলেমেয়ে কথা বলছে, তার মাঝে এসে মাস্তানি মারায়! লাইলির বাধা হাসনাতের ক্রোধের পালকে আরও ফাঁপিয়ে তোলে।  

অবাক বিষয় হলো, এই মুহূর্তে হাসনাত যতটা ক্রুদ্ধ রাজু ততটাই শীতল। সে সাপের শীতল চাহনি দিয়ে লাইলির দিকে তাকায়। হিসহিস করে বলে, পেরেমিকা! বাহ! বাহ! আপনে নাকি এই শহরে আইচেন পড়ালেখার জন্নি। এখুন তো দেখি পেরেমও করেন। ভালো ভালো। কথা শেষ করে খুব বাজে একটা ভঙ্গি করে রাজু। তারপর খুব ধীর পায়ে বেরিয়ে যায় সিঙ্গাড়ার দোকান ছেড়ে। এবার উৎকণ্ঠিত চেহারায় এগিয়ে আসে দোকানকার, ভাই, উনি ডেঞ্জারাস লোক। চোরাকারবারি করে বর্ডারে। সঙ্গে সব সময় অস্ত্র থাকে। তার সঙ্গে আপনের অমুন আচরণ ঠিক হয়নি।

লাইলির পর লোকটার বিষয়ে দোকানদারের এই সাক্ষ্য এবার সত্যি সত্যি চিন্তিত করে হাসনাতকে। এই শহরে হাসনাতের খুঁটির জোর নাই বললেই চলে। কলেজে যে কয়জন কাছের বন্ধু ছিল, লাইলিকে অধিক সময় দিতে গিয়ে তাদেরকেও হারিয়েছে। ফলে, এই লোক যদি সত্যি সত্যি ভয়ংকর হয়, সে যদি সত্যি সত্যি হাসনাতকে ক্ষতি করতে চায়, তবে হাসনাতের কোনও প্রতিরোধ ব্যবস্থা নাই। চিন্তিত মুখে সে বেরিয়ে আসে সিঙ্গাড়ার দোকান ছেড়ে। লাইলিকে বলে, এই লোক কবে থেকে তোমাকে জ¦ালাচ্ছে ?

তাও মাস দুয়েক।

কী বলে সে ?

আমাকে ভালোবাসে। আমাকে বিয়ে করতে চায়।

বিয়ে! মামাবাড়ির আব্দার। বিড়বিড় করে হাসনাত। তারপর একটা রিকশা নিয়ে লাইলিকে হোস্টেলে পৌঁছে দিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরে যায়। এর মাঝে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দুজনের মাঝে আর একটা কথাও হয় না।

আট

হঠাৎ হট্টগোল। কয়েকজন রুদ্রমূর্তি ধারণকারী তরুণ বাবার বয়সী এক ভদ্রলোককে ধমকাচ্ছে। ভদ্রলোকও শুরুতে খুব উত্তেজিত ছিলেন। টকাস টকাস করে তাদের কথার প্রতিবাদ করছিলেন। কিন্তু ছেলেগুলো যখন মুখের কথাতেই ক্ষান্ত হলো না, বরং তাদের মুখের ক্ষিপ্ততা নেমে এল হাতের মুষ্ঠিতে, তখন তিনি চুপসে গেলেন। গোপনে একবার বাম হাত দিয়ে চোখের কোনা মুছলেন। অপমানাশ্রু ? হট্টগোলে তরু-পিয়াস দুজনই চমকে উঠেছে। তরু যতটা না চমকেছে, তারচেয়ে বেশি পেয়েছে ভয়। মারামারি, হট্টগোল, রক্তপাতে তার ভীষণ ভয়। সেই যে একবার জয়নালরা মায়াকে ঝুলিয়ে রেখেছিল গাছে, বিনা অপরাধে, সেই থেকে তরুর মানসিক দুর্বলতা আরও বেড়েছে। কোথাও একটু শব্দ হলেই ভাবে, এই বুঝি কারও পিঠের হাড্ডি ভাঙল। পিয়াস হঠাৎ উঠতে গেলে তরু তার হাত চেপে ধরে―যাবেন না। কোত্থেকে কী হয়ে যায়!

আরে দেখেই আসি না! পিয়াস হাত ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ায়।

তরুর মুখামুখি সিটের ভদ্রলোক, যিনি যশোর থেকে উঠেছেন, তিনিও উঠলেন পিয়াসের দেখাদেখি।

সন্ত্রস্ত তরু একটু ভেবে বলল, আঙ্কেল, আপনি যাবেন না। আপনাকে অসুস্থ লাগছে। পিঠে কি ব্যথা পেয়েছেন ?

ভদ্রলোক বললেন, হ্যাঁ মা, পিঠের ব্যথার চিকিৎসা নিতেই ঢাকা যাচ্ছি। তোমাকে ভালো লেগেছে। আগে দেখে আসি কী হলো। তারপর কথা বলব।

হট্টগোলের উৎস তিন সারি পেছনে। পিয়াস এবং পিঠে ব্যথা ভদ্রলোকের মতো আরও অনেকেই সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। তারা বোঝার চেষ্টা করছে ঘটনা। একটু পর পিয়াস ফিরে এসে যা বর্ণনা করল, তা অনুচ্ছেদ আকারে সাজালে এমন হয় : তিন সারি পেছনের ওই হালকা চাপ দাড়িওয়ালা প্রৌঢ় কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন। যেহেতু দু দিন পরেই নির্বাচন, তাই প্রৌঢ়ের কথার ভেতর অনিবার্যভাবে চলে আসে নির্বাচন প্রসঙ্গ। কথায় কথায় তিনি বলেন, এইসব ডামি নির্বাচনে তার কোনও আগ্রহ নাই। ইলেকশনের আগে সিলেকশন হয়ে থাকলে সেই ভোটাভুটিতে কারই বা আগ্রহ থাকে। দেশটাকে একেবারে ফোকলা বানিয়ে ছাড়ল এরা।

প্রৌঢ়ের কথা কান পেতে শুনছিল পাশের সিটের তিন তরুণ। ভেতরে ভেতরে তারা ফুঁসছিল। এত সাধনার নির্বাচন অথচ তাকে বলে কি না ডামি ইলেকশন! তাও আবার পাবলিক প্লেসে। বিশেষত প্রৌঢ় যখন বলেন, আওয়ামী লীগের তিনটি ভুয়া নির্বাচন ইতিহাসের কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে, তখন আর ক্রোধ সামলে রাখতে পারে না তারা। তারা চড়াও হয় প্রৌঢ়ের ওপর। আঙ্কেল, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনার অধীনে এবারের নির্বাচন হতি যাচ্ছে স্মরণকালের সিরা নির্বাচন। আর সেই নির্বাচন নিয়েই আপনের এত এলার্জি। আপনে নিশ্চয়ই জামাত-শিবিরের লোক।

জবাবে ফুঁসে ওঠেন প্রৌঢ়ও। দ্রুত ফোন কেটে বলেন, এই ট্যাগিংয়ের রাজনীতিই একদিন ডোবাবে তোমাদের। কেন, সরকারি দল না করা মানেই কি জামাত-শিবির ? এর বাইরে আর কিছু চিন্তা করতে পারো না ? তোমাদের পৃথিবী এত ছোট কেন! সরকারের কাছে মাথা বেচে দিইনি বলেই এখনও সত্যকে সত্য আর মিথ্যাকে মিথ্যা বলতে পারি। চোখ থেকে দলের চশমাটা খোলো, তোমরাও সত্যটা দেখতে পাবা। দেশের মানুষ ভালো নাই। বহুকাল তারা ভোট দিতে পারে না। জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এই সরকার বেশিদিন টিকতে পারবে না।

ওই চাচা ওই, মুক সামলা কতা কন। বহুত সহ্য করচি। আর না কিন্তু। এই যে বেনাপোল এক্সপ্রেসে চড়ে আইজ ঢাকা যাতি পারতিছেন, ইডা কার অবদান ? জননেত্রীর অবদান। তার দিয়া ট্রেনে চড়ে তার বিরুদ্ধে বিষোদগার। শালার বাঙালি নেমকহারামের জাত।

এটা কারও বাপের টাকার ট্রেন না। এটা জনগণের টাকার ট্রেন।

আবার মুখি মুখি কতা। আপনে তো বহুত ঘাড়ত্যাড়া আছেন! ওই ঘাড় সুজা না কল্লি আপনে ঠিক হবেন না। দ্বিতীয় তরুণ প্রৌঢ়ের পাঞ্জাবির কলার ধরে হ্যাঁচকা টান মারে। টান খেয়ে গলায় যতটা না ফাঁস খান প্রৌঢ়, তারচেয়ে অধিক হন অপমান। ছেলের বয়সী ছোকরাগুলোর আকস্মিক অপমানে তিনি বাকরহিত হয়ে যান। এ সময় ট্রেনের এই কামরায় আবির্ভূত হয় সৌম্যকান্তির সেই বৃদ্ধ, যশোর স্টেশনে হাসনাতকে যে হতভম্ভ করেছিল। সে হক মওলা বলে একটা চিৎকার-ধ্বনি ছড়িয়ে দেয় কামরা জুড়ে। তখন সবার মনোযোগ সরে আসে বৃদ্ধের দিকে। বৃদ্ধ হাতের তসবিহটা আকাশপানে তুলে বিড়বিড় করে বলে, আল্লাহ মানুষের সামনে জুলুমের অনেক উদাহরণ দিয়েছেন। ফেরাউন, নমরুদ, হামান, কারুন সবই জুলুমের উদাহরণ। আজ যে তরুণেরা মুরব্বিদের কলার চেপে ধরছে, এটাও জুলুম। মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়াও জুুলুম। কিন্তু ক্ষমতার মোহে কেউ বুঝতে পারে না দিনে দিনে কীভাবে মানুষ ফেরাউন হয়ে ওঠে।

ট্রেনের ভেতর যেন বজ্র্রপাত হয়। সত্য কথাটা এতটা পরিষ্কার করে এর আগে কেউ বলেছে কি না ভাবতে থাকে সবাই। হাসনাতের বিস্ময় তখন দ্বিগুণ, কারণ, এই বৃদ্ধই তাকে দর্শন দিয়েছিল যশোর স্টেশনের প্লাটফর্মে। লোকটা কে ? বুজুর্গ খিজিরের মতো কেউ ? যাকে সবখানেই পাওয়া যায়। হাসনাত বৃদ্ধকে খুঁজতে থাকেন। কিন্তু বৃদ্ধ ততক্ষণে অদৃশ্য। রয়ে গেছে শুধু আতরের সুবাস। বৃদ্ধের কথার মাঝে এমন প্রভাবক ক্ষমতা ছিল, হট্টগোল থেমে যায়। মারমুখী উচ্ছৃঙ্খল ছেলেগুলো শান্ত হয়ে বসে পড়ে সিটে। অপমানিত প্রৌঢ় জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকেন বাইরে। পারলে দেহটাও বাইরে গলিয়ে দিয়ে তিনি এই অপমান থেকে পরিত্রাণ পেতে চাইতেন।

পিয়াস ফিরে এসে তরুকে জানায়, সামনে ইলেকশন, ইলেকশনের আগে সবখানেই এমন হয়। ও কিছু না।

কিছু না মানে! আমি তো শুনতে পাচ্ছিলাম সব। সরকারের সমালোচনা করায় একজন ভদ্র মানুষকে অপমান করা হলো। তাও কারা করল, যারা তার সন্তানের বয়সী।

ওনারও দোষ আছে। উনি কেন শুধু শুধু সমালোচনা করতে গেলেন।

বা রে, সমালোচনা করা যাবে না ? এতই যখন সমালোচনার ভয়, একটা ভালো নির্বাচন দিয়ে দেখিয়ে দিলেই তো পারে।

আবার তুমি শুরু করলে। এবার কিন্তু আমরাও বিপদে পড়ব।

কিন্তু এভাবে আর কতদিন ? আর কতদিন আপস করে বেঁচে থাকব! আর কতদিন মনের ক্ষোভ বুকের মাঝে চাপা দিয়ে রাখব!

চুপ করো তরু। ওরা শুনতে পেলে আবার কী হয় না হয়।

হ্যাঁ, চুপই তো করব। চুপ করে থাকাটাই তো আমাদের নিয়তি। তরুর কথা জড়িয়ে যায়। আঠারোর নির্বাচনে বাবার সেই অপমান সামনে এসে দাঁড়ায়। ঈদের নামাজে যাওয়ার মতো সেজেগুজে বাবা সেবার ভোট দিতে গিয়েছিলেন। সঙ্গে নিয়েছিলেন মাকেও। কিন্তু ভোট দিতে পারেননি। সরকারি দলের পান্ডারা ঘিরে রেখেছিল কেন্দ্র। বলেছিল, আরে মাস্টার সাব, আজকাল কি কষ্ট করে ভোট দিতি আসা লাগা নাকি!

বাবা বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। কেন, ঘরে বসে অনলাইনে ভোট দেয়ার সিস্টেম আছে নাকি ?

তা না মাস্টার মশাই। আপনের ভোট আমরাই দিয়ে দিছি।

তোমরা দিয়ে দেছ মানে ? আমি কোন মার্কায় ভোট দেব তোমরা জানলে কীরাম করে ?

চাচাজান, এখুন তো মার্কা এট্টাই―নৌকা। তাই আপনের আর চাচির ভোট আমরাই দিয়ে দিছি। বাড়িত চলে যান। এখেনে থেকে আর সুমায় নষ্ট করবেন না।

বাড়ি এসে বাবা খুব কেঁদেছিলেন। ভোট মানে শুধুই তো একটা সিল মারা না। এ জাতির কাছে ভোট একটা উৎসবের নাম। সেই উৎসবটাও ওরা খতম করে দিল। নিম্নমধ্যবিত্ত নাগরিক হিসেবে এ দেশে আমাদের একটাই শক্তি ছিল, ভোটাধিকারের শক্তি। আমাদের সেই শক্তিটাও লয় হয়ে গেল। এই দেশে আমাদের আর কোনও ক্ষমতাই রইল না। 

বাবার শিশুদের মতো ফোঁপানোর সেই দৃশ্য এখনও তরুর চোখে আসে। কিন্তু এই দেশে কান্নাটাও এত কঠিন, চাইলে যেখানে সেখানে কান্না করা যায় না। বিশেষত যখন ট্রেনে একগাদা মানুষ এবং তার মুখের সামনে মুখোমুখি হয়ে বসে আছে আরও কয়েকজন যাত্রী, তখন কান্না করাটা বিব্রতকর ঘটনাই বটে।

পিয়াস তরুর কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে আস্তে বলে, আরও বড় হয়ে এসব নিয়ে ভেব। এখন তোমার কাজ পড়াশোনা।

তরু চোখ-মুখ শক্ত করে সোজা হয়ে বসে। উলটো পাশ থেকে হাসনাত জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কি ভাইবোন, সরি, তুমি করেই বললাম।

হাসনাতের কথায় ওরা এক মুহূর্তের জন্য পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। তারপর পিয়াস বলে, জি। ভাইবোন। চাচাতো। ও তরু। আমি পিয়াস। তরুকে ঢাকা রাখতে যাচ্ছি। ওর মাইলস্টোনে চান্স হয়েছে।

বাহ! এটা তো খুবই ভালো খবর। বাড়ি তো নিশ্চয়ই যশোরের এদিকেই ?

বেনাপোল। আপনার বাড়ি ?

আমার নাম হাসনাত। যশোর বাড়ি। চিকিৎসার জন্য ঢাকা যাচ্ছি।

কী হয়েছে আপনার ? নরম গলায় জিজ্ঞেস করে তরু। ও হ্যাঁ, ওই পিঠের ব্যথাটা ?

ঠিক ধরেছ ব্রিলিয়ান্ট গার্ল।

ব্যথাটা পেলেন কীভাবে ? যুগপৎ কৌতূহল দুজনের কণ্ঠে।

আজকাল ব্যথা পাওয়ার উপলক্ষ লাগে না। তুমি শিরদাঁড়া সোজা করে চলো, ব্যথা দেয়ার লোকের অভাব হবে না। এই যে একটু আগে দেখলে না ওই ভদ্রলোক, তিনিও ব্যথা পেয়েছেন। তবে তার কপাল ভালো, ব্যথাটা শুধু হৃদয়েই পেয়েছেন, আমার মতো শরীরে নয়। মাঝে মাঝে মনে হয়, প্রাণে বেঁচে আছি, এই তো মিরাকল। যা হোক, যাত্রাপথে তোমাদের সঙ্গে পেয়ে ভালো লাগছে। তোমাদের মতো এই উড়ন্ত দিন আমরাও পার করে এসেছি। তারুণ্য হারিয়ে ফেলার ক্ষতি কোনও কিছু দিয়েই পোষানো যায় না। তবে আমার কাছে মনে হয়, তোমরা শুধু চাচাতো ভাইবোনই নও, আরও কিছু।

এ আপনার ভুল ধারণা আঙ্কেল। আমি এক সময় পিয়াস ভাইয়ার কাছে পড়তাম।

একটু আগে যে বৃদ্ধ এসে নীতিকথা আওড়ে গেল, উনি আমাকে খুব বিস্মিত করেছেন।

আমাদেরও বিস্মিত করেছেন। একসঙ্গে বলল পিয়াস-তরু।

তোমাদের বিস্ময় আর আমার বিস্ময় ভিন্ন। উনি যশোর স্টেশনে আমার সামনে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কিন্তু তাকে এই ট্রেনে উঠতে দেখিনি। এবং তার সবকিছুই রহস্যময়।

তাই! ওরা অবাক হয়ে চুপ করে থাকে। আতরের গন্ধটা আবার নাকে এসে লাগে। সেই গন্ধের প্রভাবেই কি না কে জানে, পার্থিব এই ট্রেন জার্নি অপার্থিব স্নিগ্ধতায় ভরে ওঠে। যেন আঁচল ধরে মায়ের সঙ্গে সঙ্গে একটু একটু করে কোথাও এগিয়ে যাওয়া।

ট্রেন ততক্ষণে মোবারকগঞ্জ পেরিয়ে কোটচাঁদপুরের দিকে ছুটছে। দুপুরকে হটিয়ে নিসর্গ দখলে নিতে অজানা লোক থেকে ছুটে আসছে বিকেল। নাকি বিকেলকে আলিঙ্গন করতে ছুটে যাচ্ছে ট্রেন ? পিয়াসের সহযোগিতা নিয়ে জানালার কাচ নামিয়ে দেয় তরু। কাচের ওপারের পৃথিবী আগের মতোই দ্যুতিময়। তবে শীতটা এখন নাই।

নয়

তরুর মিষ্টি মুখটা দেখে পূর্ণতা না পাওয়া সংসারটার কথা বারবার মনে পড়ে হাসনাতের। সঠিক সময়ে বিয়ে করলে তরুর মতো অমন একটি মেয়ে আজ তার ঘরেও থাকতে পারত। গুন্ডা রাজু, সিঙ্গাড়ার দোকানের সেই গুন্ডা রাজুর হাতে সেদিন যদি তছনছ না হতো তাদের মিষ্টি সম্পর্কটা, তাদের জীবন হয়তো আজ স্বর্গডানায় উড়ে বেড়াত। আজ হয়তো তাদের মেয়েটাও মুকুটে উচ্চশিক্ষার পালক লাগাতে ছুটে যেত মফসসল ছেড়ে রাজধানীতে। কিন্তু গুন্ডা রাজু তাদের সকল স্বপ্ন, আকাক্সক্ষাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। সিঙ্গাড়ার দোকানের সেই ঘটনার দু দিন পর লাইলি আবার গিয়েছিল টিউশনে, স্টেডিয়াম পাড়ায়। ফেরার পথে আচমকা এক বিপন্ন কিশোর, যার মুখজুড়ে বিপর্যয়ের ঝড়, লাইলির সামনে আছাড় খেয়ে পড়ে বলেছিল, আপা আপা, আমার মা মরে যাচ্ছে। হাসপাতালে নিতি হবি। আমি ছাড়া মার কেউ নি। আপনে চলেন আমারে বাড়ি। আমার মাক বাঁচান। এট্টা অ্যাম্বুলেন্স…

ছেলেটির আছাড়াবিছাড়ি কান্না হতভম্ব করেছিল লাইলিকে। এক মুহূর্তের জন্য সে বাজপড়া তালগাছ হয়ে গিয়েছিল। তারপর আগপাছ না ভেবে সে ছুটে গিয়েছিল ছেলেটির পিছু। যে নিরালম্ব কিশোরের মা মরতে বসে, তার সকাতর অনুরোধে সাড়া না দিয়ে কীভাবে নিজের পথ দেখতে পারে লাইলি! পারেনি সে। তাই সে ছেলেটার পিছু পিছু হন্তদন্ত হয়ে এমন এক চুপচাপ বাড়ির দিকে এগোয়, যার আশপাশে আর কোনও ঘরদোর নাই। কিন্তু এটা যে ছিল এক ফাঁদ, বুঝতে পারে না লাইলি। যখন বোঝে, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ছেলেটা ওকে যে ঘরে নিয়ে যায়, মুমূর্ষু মা তো দূরের কথা, সেখানে কোনও নারীই নাই। আছে বরং রাজু। সিঙ্গাড়ার দোকানের সেই গুন্ডা রাজু। ছেলেটি রাজুর হাতে লাইলিকে সোপর্দ করে ছিটকে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। আর লাইলি, এমএম কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়া লাইলি, স্টেডিয়াম পাড়ায় টিউশন করতে আসা লাইলি, দাঁতালো বাঘের সামনে হয়ে পড়ে এক নিরীহ হরিণ শাবক। লাইলি ভয়ার্ত হরিণ শাবকের মতোই থরথর করে কাঁপে। কাঁপতে কাঁপতে তার চোখ চলে যায় জানালায়। দেখে, জানালার ফ্রেমে দাঁত কেলিয়ে হাসছে একটু আগে বিপর্যয়ের অভিনয় করা সেই কিশোর। সেই বিপন্ন সময়ে নিজের ওপর যে ধরনের কেয়ামত নেমে আসার শঙ্কা করেছিল লাইলি, সেই শঙ্কা না নামলেও ভিন্ন এক শঙ্কার আবির্ভাব ঘটে স্টেডিয়াম পাড়ার নির্জন টিনশেডের বাড়িটিতে। ফোনে হাসনাতের সঙ্গে অভিনয় করতে হয় লাইলিকে। লাইলি স্বাভাবিক গলায়, না স্বাভাবিক না, কিঞ্চিৎ কামুকী গলায় হাসনাতকে জানায়, নির্জন খালার বাড়ি সে একান্তে দেখা করতে চায় হাসনাতের সঙ্গে। নিতে চায় হাসনাতের শরীরের স্পর্শ। এ তার বহুদিনের কামনা। লাইলির প্রস্তাবে হাসনাতের কি একটু খটকা লাগে ? লাগলেও সুতীব্র এক নিষিদ্ধ আকর্ষণের লঘু হয়ে যায় সেই খটকা। সে বরং ছুটতে ছুটতে হাজির হয় উদ্দিষ্ট বাড়িতে। যেখানে সে প্রাণভরে মুখ ডোবাতে পারবে লাইলির নিটোল বক্ষে। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও তার মাথায় আসে না, এ এক ফাঁদ হতে পারে। হাসনাত যখন কামনাতাড়িত নিষিদ্ধ স্বরে লাইলিকে ডাকতে ডাকতে ঘরে ঢোকে, ঠিক তখনই বাইরে থেকে বন্ধ হয়ে যায় দরজা, সশব্দে। নির্জন এক অচেনা ঘরে হতবুদ্ধ দুই তরুণ-তরুণী বুঝতে পারে না পরিণতি। ধীরে ধীরে লোক জমায়েত হয়। নাকি রাজুর চিত্রনাট্য সফল করতে অজানা জায়গা থেকে উদিত হয় তাদের মুখ! কয়েকজন চিৎকার করে বলতে থাকে―মহল্লার ইজ্জত বলে এট্টা কতা আচে। এইসপ খানকিদের জ¦ালায় পরিবার নিয়ে বাস করাই দায়। তাদের চিৎকার শেষ হয় না, তার আগেই আসে স্থানীয় পত্রিকার দুজন সাংবাদিক। তারা পটাপট হাসনাত-লাইলির ছবি তুলে ফেলে। সবাই ছিঃ ছিঃ করতে থাকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওদের অভিসার নিয়ে খবর বেরোয় লোকাল দৈনিকে। রাজু হো হো করে হাসতে হাসতে বলে, দাগ লাগা দিলাম। আমারে অবজ্ঞা করার দাগ।

এই দাগ নিয়ে লাইলি আর পড়তে পারে না এমএম কলেজে। তার গরিব বাবা পড়াশোনা শিকেয় তুলে মেয়েকে বাড়ি নিয়ে যান এবং বিয়ে দিয়ে দেন দূরের এক চাকরিজীবী ভদ্র ছেলের সঙ্গে। হাসনাত পড়াশোনা বর্জন না করলেও প্রেমিকার বিসর্জনে বন্ধ হয় তার ক্লাস। তার ক্লাস-আড্ডামুখর জীবন হয়ে পড়ে স্থবির। জারি থাকে শুধু পরীক্ষা।

বাাড়িতে আপনার কে কে আছে ? তরুর জিজ্ঞাসায় ভাবনার সুতো কেটে যায় হাসনাতের। তিনি থতমত খেয়ে বলেন, আব্বা-মা।

আর আন্টি ? মানে আপনার ওয়াইফ, সন্তান ?

নাই।

নাই বলতে বিয়ে করেননি, নাকি…

বিয়ে করিনি। 

কেন, কোনও মেয়ে কি আপনাকে ছ্যাঁকা দিয়েছে ? প্রশ্নটা করে শিশুদের মতো খিলখিল করে হেসে ওঠে তরু।

ছ্যাঁকা! শব্দটা নিয়ে কতক্ষণ মনের ভেতর খেলতে থাকেন হাসনাত। আসলেই কি লাইলি তাকে ছ্যাঁকা দিয়েছে ? পরিবারের চাপে বাধ্য বাঙালি কন্যার মতো লাইলি বিয়ের পিড়িতে বসে গেলে বন্ধুরা খোঁচা দিতে ছাড়েনি―মিয়া মানুষ এমুনই। সুযোগ পালিই ফুড়ুৎ। লাইলি তোরে নিয়ে শুধু খেলেছে। এখুন ভালো বর পাওয়ামাত্র ঝুলে পড়েচে তার গলায়।

বন্ধুদের সঙ্গে একমত হতে পারেননি হাসনাত। তার শুধু মনে হয়েছে, লাইলি পরিস্থিতির শিকার। তার হৃদয়ে হাসনাতের আসন আগের মতোই আছে। নয়তো বিয়ের আগের রাতে ফোন করে হাউমাউ করে কেন সে কাঁদবে! বহু বছর পর লাইলির সেই কান্নাবিজড়িত ফোঁপানি স্পষ্ট শুনতে পান হাসনাত। আর তখন ঘুঘু ডেকে ওঠা দুপুরের মতো বিষণ্ন হয়ে ওঠে তার মন। চোখের আর্দ্রতা ঢাকতে তিনি দৃষ্টি সরান জানালায়। তখন খেয়াল করেন, ঝুপ করে মিষ্টি এক বিকেল নেমে এসেছে চরাচরে। সেই বিকেলের আদর খেতে খেতে তেপান্তর পেরিয়ে বেনাপোল এক্সপ্রেস প্রবেশ করছে পোড়াদহ স্টেশনে। ব্রেকে ক্যাচক্যাচ শব্দ তুলে ট্রেন যখন স্টেশনের শেডের নিচে থামে, জানুয়ারির বিকেলের শীত ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। বাইরে থেকে ভেসে আসে যাত্রীদের হট্টগোল, যারা ওঠা কিংবা নামায় পাশের জনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত। এদিকটাতে তরুর এবারই প্রথম আসা। সে বাইরের মানুষ দেখতে জানালার কাচ তুলে দেয়। প্লাটফর্ম জুড়ে জনারণ্য। পঙ্গু এক ফকিরকে প্লাটফর্মে শুয়ে ভিক্ষা করতে দেখে। পঙ্গুর পাশে বসে আছে এক শিশু। শিশুটি একটি কয়েন দিয়ে টিনের থালায় শব্দ করে চলে। কয়েক মিনিট অতিবাহিত হওয়ার পরও ট্রেন না ছাড়লে পিয়াস ভাবে, এটা যেহেতু জংশন, এখানে হয়তো ট্রেন আরও মিনিট পাঁচেক দাঁড়াবে। এইসব ভেবে সে চা খাওয়ার জন্য সে ট্রেন থেকে নামে।

তরু উৎকণ্ঠামিশ্রিত গলায় বারবার বলে, ট্রেন যেন মিস না হয়। দ্রুত খেয়ে চলে আসবেন।

হাসনাত বলেন, এভাবে না যাওয়াই ভালো। কিন্তু পিয়াসের নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস টনটনে। আচমকা ট্রেন ছেড়ে দিলেও যে কোনও মূল্যে সে ট্রেন ধরতে পারবে। সে ট্রেন থেকে নেমে চায়ের দোকান খোঁজে। কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর সে পাশের প্লাটফর্মে পেয়েও যায় একটি টি স্টল। কিন্তু সে যখন চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়ায়, ততক্ষণে নড়ে উঠেছে বেনাপোল এক্সপ্রেস। পোড়াদহ জংশনে ট্রেনের বিরতিবিষয়ক যে ধারণা নিজের মতো করে গড়ে নিয়েছিল পিয়াস, তা ভুল ছিল। ফলে চা তৈরি, পরিবেশন এবং কাপে ঠোঁট ছোঁয়ানোর ফাঁকে ট্রেনের যাত্রাবিরতির সময় ফুরিয়ে যায়। ব্যাপারটা যখন বুঝতে পারে পিয়াস, তার মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। কোনওমতে পাঁচ টাকার বিল দশ টাকা ধরিয়ে দিয়ে সে দৌড় শুরু করে ঊর্ধ্বশ্বাসে। কিন্তু ট্রেন ততক্ষণে নাগালের বাইরে যায় যায় করছে। ট্রেন নড়ছে অথচ তখনও পিয়াসের দেখা নাই বিষয়টা ভাবনায় ফেলে দেয় তরুকে। সে জানালা দিয়ে মাথা বের করে আতিপাতি খোঁজে পিয়াসকে। যখন দেখে পিয়াস রুদ্ধশ্বাসে ছুটছে, তরু হাত দিয়ে ইশারা করে―জলদি আসেন। জলদি আসেন।

কিন্তু যান্ত্রিক ইঞ্জিনের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারে না পিয়াসের মানবইঞ্জিন। ফলে ট্রেনটা পিয়াসকে রেখে বেরিয়েই যায় প্লাটফর্ম ছেড়ে। উৎকণ্ঠিত, ভয়ার্ত তরু তখনও হাত-মাথা বের করে ডেকে চলেছে পিয়াসকে। হাসনাত আফসোস করেন―কেন যে ছেলেটা অসময়ে চা খেতে গেল! তরু, তুমি দুশ্চিন্তা করো না, আমি তোমাকে ঢাকায় নামতে সাহায্য করব। আর তুমি তো বললেই, তোমার ছোট কাকু থাকবেন কমলাপুরে। অতএব দুশ্চিন্তা করো না। পিয়াস পুরুষমানুষ। সে যে কোনওভাবে গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে। হাসনাত সান্ত্বনা ও ভরসা দিতে থাকেন এই ষোড়শীকে। কিন্তু প্রকৃতি ততক্ষণে আরও একটি দুর্ঘটনার আয়োজন সম্পন্ন করে ফেলেছে, যা ঘটার এক সেকেন্ড আগেও মানুষ ধরতে পারে না। ট্রেন প্লাটফর্ম ছেড়ে তখন আরও খানিকটা দূর এগিয়ে গেছে। তরুর হাত-মুখ তখনও জানালার বাইরে। সে উৎকণ্ঠিত মুখে ক্রমেই বিন্দু হয়ে ওঠা পিয়াসকে দেখছে। দুর্ঘটনার জন্য এই সময়টাকেই বেছে নেয় প্রকৃতি। হাত নেড়ে যখন পিয়াসকে শেষ বিদায় জানাচ্ছে তরু, ঠিক তখন এক হিরোখোর থাবা মেরে তরুর হাত থেকে মোবাইলটা কেড়ে নেয়। আঁতকে ওঠে তরু। এতক্ষণ সে পিয়াস পিয়াস করছিল। এবার পিয়াসের জায়গা দখল করে মোবাইল। সে মোবাইল মোবাইল বলে চিৎকার করে জুড়ে দেয়। কিন্তু ট্রেন তখন পাগলা ঘোড়া। তাকে থামায় সাধ্য কার! ভয়ে আতঙ্কে তরু কান্নায় ভেঙে পড়ে। তরুর হাত থেকে ফস্কে গেছে দুটি নির্ভরতা। মোবাইল এবং পিয়াস। সেই পিয়াস, যে পিয়াস তাকে পছন্দ করে কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারে না। যে পিয়াস ছাগলের গলায় পছন্দের কথা জানিয়ে চিরকুট লেখে। পিয়াসের জন্য তরুর দুশ্চিন্তা বাড়তেই থাকলে আবার আবির্ভূত হয় সৌম্যকান্তির সেই বৃদ্ধ। আতরের ঘ্রাণ ছড়িয়ে হক মওলা হাক ছেড়ে সে বলে, আসল বিপদ থাকে আমাদের সামনে আর আমরা ক্ষণিকের বিপদ নিয়ে দুশ্চিন্তা করি। আমরা চারপাশে যা দেখি তা বিপদ নয়, তা মূল বিপদের উপসর্গ।

তরু, হাসনাত একসঙ্গে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে বৃদ্ধের দিকে।

দশ

ট্রেন রাজবাড়ী স্টেশন ছেড়ে এসেছে বেশ আগে। মোবাইল এবং পিয়াসকে হারানোর ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে তরু। হাসনাত ছাত্রজীবনে পড়া একটা পুরনো উপন্যাস খুলে রেখেছেন চোখের সামনে। কিন্তু মন নাই পড়ায়। বৃদ্ধের পুনঃপুনঃ আবির্ভাব তাকে ভাবিয়ে তুলছে। দেশের ভাগ্যাকাশে কি বড় কোনও বিপদের ঘনঘটা দেখা যাচ্ছে ? যশোর থেকে রাজবাড়ী পর্যন্ত প্রতিটি স্টেশন জানালা দিয়ে যতটুকু পারা যায় হাসনাত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছেন। দুদিন পর নির্বাচন অথচ তার কোনও অভিঘাত নাই কোথাও। কয়েক জায়গায় বরং নেতিবাচক দৃশ্য দেখেছেন। কাউকে ধাওয়া করা হচ্ছে, কাউকে ধরে পেটানো হচ্ছে, কারও দোকানে ভাঙচুর চালানো হচ্ছে। হাসনাত বোঝেন, কেন এসব হয়, কারা এসব করে; কিন্তু মুখ খোলা যাবে না। এই তো কয়েক স্টেশন আগে এই ট্রেনের মধ্যে এক প্রৌঢ়কে মারতে উদ্যত হয়েছিল তিন তরুণ, নির্বাচনের নামে তামাশার সমালোচনা করার অপরাধে। এটা সারা দেশের চিত্র। এই তরুণরা ছড়িয়ে আছে সারা দেশেই। এবং সবখানেই তারা তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। একবার বাইরে আর একবার তরুর মুখের দিকে চেয়ে গভীর হতাশায় ডুবে যান হাসনাত। তরুর ওই বিষণ্ন মুখটাই যেন বাংলাদেশ। বিপর্যয়ের ক্লান্তিতে যা ঝিমিয়ে পড়েছে। এই দেশ নিয়ে আসলে স্বপ্ন দেখার কিছু নাই। সব স্বপ্ন ধূসর হয়ে গেছে। ভোটাধিকার, মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক মর্যাদা, কথা বলার স্বাধীনতা সবকিছুই লুণ্ঠিত হয়েছে। এইসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েন হাসনাতও। ঘুম ভাঙ্গে তীব্র হট্টগোলে, আহাজারি আর আর্তনাদের শব্দে। হাসনাত চোখ রগড়ে লাফিয়ে ওঠেন। তরু তখনও ঘুমে। হাসনাত বাইরে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন ট্রেনের অবস্থান। কিন্তু চারপাশে শুধু ধোঁয়া। আগুন আগুন চিৎকার। সবাই যে যার মতো বেরোনোর চেষ্টা করছে। কিন্তু ধাক্কাধাক্কিতে কেউই বের হতে পারছে না। গোলকধাঁধার মতো এক জায়গাতেই ঘুরপাক খাচ্ছে সবাই। হাসনাত ধাক্কা দিয়ে তরুকে ডেকে তোলেন―তরু, ট্রেনে আগুন লেগেছে।

আগুন আগুন! শিঙার দ্বিতীয় ফুৎকারে কবর থেকে যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠবে মানবসম্প্রদায়, সেভাবে ঘুম থেকে লাফিয়ে ওঠে তরু। ততক্ষণে আগুনের উন্মত্ততা বেড়েছে আরও। যাত্রীরা দরজার দিকে ছুটছে, কিন্তু আগুনের সূত্রপাত দুই দরজার মুখেই। সেখান থেকে ধীরে ধীরে ভেতরে আসছে। লোকেরা জানালা দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করে, কেউ কেউ পারে অধিকাংশই পারে না। শীতের কারণে অধিকাংশ জানালাই বন্ধ ছিল আর মানবদেহের তুলনায় ক্ষুদ্র ওই জানালায় শরীর গলাতে গিয়ে সবাই জট পাকিয়ে বসে থাকে। আগুন যখন ছুঁয়ে দেওয়ার দূরত্বে চলে আসে, হাসনাত তরুকে নিয়ে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে জানালার কাছে যান। জানালার নামানো কাচ সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও উপরে তুলতে পারেন না। কাচের এপাশ থেকে শুধু দেখেন, সেই বৃদ্ধ নির্ভার বদনে লাঠি ঠুকে ঠুকে অজানা লোকের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

তরু মা মা বলে কাঁদে। মা ও মা। মা গো। আমি মরে যাচ্চি মা! পুরো কামরাজুড়ে তখন সত্যিকারের রোজ কেয়ামত।

বিপন্নতার এই চূড়ান্ত ক্ষণেও একটি মেয়ের মা মা আর্তনাদে হাসনাত ক্ষয়িত হন। তিনি হন্তদন্ত হয়ে চিৎকার করে বলেন, তোমার মায়ের নাম্বারটা বলো, আমি নাম্বার তুলছি। মার সঙ্গে শেষ কথা বলো। আমরা হয়তো আর বের হতে পারব না। শেষের দিকে হাসনাতের কণ্ঠ একেবারে ভেঙ্গে পড়ে।

সুরা ফাতেহার মতো মুখস্ত থাকা নাম্বারটাও দাউ দাউ আগুনের দিকে তাকিয়ে ভুল হয়ে যায় তরুর। কয়েকবারের চেষ্টায় সে নাম্বারটা যখন বলে, হাসনাত নাম্বার ডায়াল করেন। বহু যুগের ওপার হতে হাসনাতের মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে লাইলির নাম। প্রায় বিশ বছর আগে সেভ করা নাম্বারটা আজও আছে অক্ষত হয়ে। মৃত্যুর আলিঙ্গনে দাঁড়িয়েও হাসনাত বিবশ হয়ে যান। লাউডস্পিকার অন করে তিনি মোবাইলটা তুলে দেন তরুর হাতে। ওপাশে লাইলি কাঁদে এপাশে তরু কাঁদে। আর লাইলির মেয়েটাকে লাইলির কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য হাসনাত একটু ফাঁকফোঁকর খুঁজতে থাকেন। কিন্তু আগুন লাগা এই বদ্ধ কামরায় মুক্তির কোনও পথ খুঁজে পাওয়া যায় না।

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button