
মানুষজন ছুটছে। তাদের ভেতর আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। যে যেদিকে পারছে দৌড়ে কোনও শেডের নিচে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আকাশে আবার সেই গোলাপি মেঘ দেখা দিয়েছে। দিন এবং রাতের সন্ধিক্ষণে যে সানসেট লাইন দেখা যায় অনেকটা সেরকম। তবে অত স্পষ্ট নয়। কিছুদিন হলো পৃথিবীজুড়ে এই মেঘের আবির্ভাব হয়েছে। এখনও বছর পার হয়নি। শুরুর দিকে কম ছিল। দিনে দিনে মেঘের আবির্ভাব বাড়ছে।
শুরুতে আবছা কুয়াশার মতো আকাশের এক অংশ ঢেকে ফেলে। সেই কুয়াশা জমাট বাঁধে। কুয়াশা থেকে তির্যকভাবে নেমে আসে পিংক রে। গোলাপি রশ্মি। ভয়ংকর সেই রশ্মি যে-মানুষের গায়ে লাগে সে অস্থির হয়ে পড়ে। তার মনে হয় পুরো শরীর জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে। ছটফট করতে থাকে। সেই অবস্থায় অন্যকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করে। যাকে আঁকড়ে ধরে তার গায়ে পিংক রে না লাগলেও তারও একই অবস্থা হয়। বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত এই পিংক রে-র রহস্য উন্মোচন করতে পারেননি।
খানিকক্ষণ আগের ঘটনা। শান্তা আর আয়ান তাদের দাদা এবাদত গায়েনকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে বাড়ির বাইরে নিয়ে এসেছে। বাড়ির বাইরে প্রশস্ত জায়গা। সেখানে লিচুগাছ আছে। একপাশে বাঁধা থাকে গরু। চারপাশে ছাগল, ভেড়া, হাঁস-মুরগি ঘুরে বেড়ায়। শীত গ্রীষ্ম―সবসময় এবাদত গায়েন এসে বসেন বাড়ির বাইরের এই আঙিনায়। এখন বর্ষাকাল। বহুদিন ধরে বৃষ্টি হয় না। তাই মানুষের জীবন থেকে বর্ষাকাল হারিয়ে গেছে। এখন আছে শুধু শীত আর গরম। যখন শীত পড়ে তখন প্রচণ্ড ঠান্ডায় গাছের বাকল ফেটে যায়। শীতে মানুষ মারা যেতে থাকে। গরমে মানুষজনের শরীরের ত্বক পুড়ে সেখানে ঘা দেখা দেয়। গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ, কুকুর, বিড়াল সকলের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। তারা প্রবল শীতে কষ্ট পায়, আবার ভয়াবহ গরমেও মারা যেতে থাকে।
এবাদত গায়েন বললেন, আজ তোমাদের ইশকুল কখন ?
এবাদত গায়েনকে বাড়ির বাইরে তার জায়গায় বসাতে বসাতে শান্তা বলল, গতকাল ইশকুল কখন হয়েছিল, দাদা ?
এবাদত গায়েন বললেন, কথা হচ্ছে আজকের, গতকালকের নয়।
শান্তা বলল, আমাদের ইশকুল প্রতিদিন একই সময়ে হয়।
আয়ান বলল, দাদা, তুমি সব ভুলে যাচ্ছ। আমাদের ইশকুল শুরু হয় সকাল নয়টায়। আর ছুটি হয় দুপুর দুটার সময়। এটা প্রতিদিনের রুটিন।
শান্তা বলল, প্রত্যেক দিন সকাল আটটার সময় তুমি এখানে এসে বসো। দুপুর বারোটায় আবার বাড়ির ভেতর চলে যাও। আমরা ইশকুলে যাওয়ার আগে মরিয়ম চাচি চলে আসেন। তারপর থেকে তুমি মরিয়ম মরিয়ম বলে চিৎকার করতে করতে চাচির জীবন ভাজা ভাজা করে দাও। তোমাকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য কি আর কিছু বলতে হবে ?
এবাদত গায়েন চুপ করে আছেন। আচমকা তার কেন জানি ঘুম পাচ্ছে। তাকিয়ে থাকতে পারছেন না। প্রবল ঘুমে চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে। তিনি ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন। রাত আটটার ভেতর ঘুমিয়ে পড়েন। সারাদিন ঘুমান না। এ তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস।
সকালে বাড়ির বাইরে যেখানে তাকে বাসিয়ে দেওয়া হয় সেখানে বসে বেশির ভাগ দিন আরাম পান না। কোনও না কোনও অসুবিধা বোধ করেন। আজ তিনি বসে অতিশয় আরাম বোধ করছেন।
ছয় বছর আগে আকস্মিক স্ট্রোক করে এবাদত গায়েনের দুই পা অবশ হয়ে গেছে। তিনি উঠে দাঁড়াতে পারেন না। মাঝারি এক খামারের মালিক তিনি। সেখানে নানা জাতের সবজি আর গরু, ছাগল, ভেড়া আছে।
একমাত্র সন্তান ফরহাদ গায়েন মারা গেছে আট মাস আসে। পৃথিবীর দিকে পিংক রে ছুটে আসার প্রথম দিকের ঘটনা। এবাদত গায়েন বসে ছিলেন বাড়ির বাইরে তার বসার জায়গায়।
ফরহাদ গাড়ি থেকে নেমেছে। তখন অমনি আবছা কুয়াশায় আকাশ ঢাকা পড়ে গেল। কুয়াশা দ্রুত জমাট বাঁধতে থাকল। ফরহাদ বাড়ির দরজা পর্যন্ত পৌঁছুতে পারেনি। জমাট বাঁধা কুয়াশা থেকে নেমে এল পিংক রে। সেই ভয়ংকর গোলাপি রশ্মি এসে লাগল ফরহাদের গায়ে। ফরহাদ অস্থির হয়ে পড়ল। মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে। ছটফট করছে। উঠে দাঁড়াতে পারছে না।
এবাদত গায়েন অসহায় বোধ করছেন। তিনি উঠতে পারছেন না। তার পায়ে বল নেই। অবশ পা নিয়ে অসহায়ভাবে এবাদত গায়েন চিৎকার করতে থাকলেন, বউমা, ও বউমা তাড়াতাড়ি এসো।
শ্বশুরের আতঙ্কিত ডাক শুনে ফরহাদের স্ত্রী কুসুম ছুটে এসেছে। এসে দেখে ফরহাদ মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে। আকাশ থেকে নেমে আসা ভয়ংকর পিংক রে দেখেছে কুসুম। সে তখন ঘরের ভেতর ছিল। বিজ্ঞান একাডেমি থেকে কড়াকড়িভাবে বলে দেওয়া হয়েছে আকাশে পিংক রে দেখা গেলে প্রত্যেকে আশপাশের কোনও ঘরে ঢুকে যাবে। খোলা জায়গায় কেউ থাকবে না। পিংক রে ঘরে ঢুকে মানুষকে আক্রমণ করে না। খোলা জায়গায় থাকা মানুষেরা আক্রান্ত হচ্ছে।
কুসুম ছুটে গিয়ে ফরহাদকে চেপে ধরল। তখুনি মনে হলো কুসুমের শরীরে বিদ্যুৎ প্রবাহ শুরু হয়ে গেছে। কুসুমও একই সঙ্গে যন্ত্রণায় মাটিতে গড়াগড়ি দিকে থাকল। তার শরীরও মনে হচ্ছে পুড়ে যাচ্ছে।
পিংক রে শরীরে লাগলে সবাই যে মারা যাচ্ছে তা নয়। কেউ কেউ মারা যাচ্ছে। ফরহাদ আর কুসুম মারা গেল।
ফরহাদের ছিল ইটের ভাটা। এলাকায় সে একা সব ইট সাপ্লাই দিত। ইটের ভাটা তৈরিতে ফরহাদের তেমন আগ্রহ ছিল না। এবাদত গায়েনও নিষেধ করেছিলেন। কুসুমের অতিরিক্ত আগ্রহে ফরহাদ ইটের ভাটা বানিয়ে ইট পোড়ানো শুরু করেছে। তারপর একসময় তার নেশা হয়ে গেল। সে ভাটা বড় করতে থাকল। এক ভাটা থেকে পাঁচটা ভাটা বানিয়ে ফেলল।
শান্তার বয়স ১৪ বছর। সে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। আয়ানের বয়স ১১ বছর। সে পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে। বাড়িতে এবাদত গায়েন, শান্তা আর আয়ান থাকে। তাদের একজন আত্মীয়, শান্তা-আয়ানের মরিয়ম চাচি নিয়মিত আসেন। তিনি এই বাড়ির সকলের যত্নের দায়িত্ব নিয়েছেন।
বর্তমান ঘটনা
এবাদত গায়েন রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছেন। বাড়ির সামনে চওড়া রাস্তা। তবে এটা জনসাধারণের জন্য চলাচলের উন্মুক্ত রাস্তা নয়। বলা যেতে পারে পারিবারিক রাস্তা। পরিচিত মানুষজন চলাচলের জন্য এই রাস্তা ব্যবহার করে।
খবিরউদ্দিন এগিয়ে আসছে। খবিরউদ্দিন চতুর ধরনের লোক। সে সবসময় কোনও না কোনও মতলব নিয়ে ঘোরাঘুরি করে। স্বার্থ ছাড়া খবিরউদ্দিন কোনওদিকে এক পা ফেলে না।
তাকে দেখে এবাদত গায়েন দুই চোখ সরু করে ফেললেন। খবিরউদ্দিন নিশ্চয়ই নতুন কোনও মতলব নিয়ে আসছে। সে স্থানীয় ইশকুলের দপ্তরি। এটা তার পোশাকি চাকরি। পেছনের পেশা দালালি। জমি কেনাবেচা, কাউকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার দালালি করে।
ফরহাদের সঙ্গে খবিরউদ্দিনের বিশেষ খাতির ছিল। খবিরউদ্দিন ইটের ভাটায় আগুন জ¦ালানোর জন্য গাছ সাপ্লাই দেয়। তার বিরুদ্ধে চুরি করে বন কেটে উজাড় করার অভিযোগ আছে। এখন ফরহাদের ইটের ভাটা বিক্রি করে দেওয়ার ফন্দি করছে। সেদিন এসে বলল, চাচা, নিজের মানুষ ছাড়া ইটভাটা চালানো মুশকিল। ভাই-ভাবি নাই, শান্তা-আয়ান ছোট। ভাটা বিক্রি করে দেন। খরিদ্দার দেখি। ভালো দাম পাওয়া গেলে দিয়ে দেবেন।
এবাদত গায়েন বললেন, তুমি তো আছ।
ফরহাদ মুখ থেকে জিহ্বা বের করে কামড় দিল। লজ্জা পাওয়ার ভাব করে বলল, ইশকুলের দপ্তরির ইটের ভাটার মালিক হওয়া মানায় না।
এবাদত গায়েন জানেন খবিরউদ্দিন কারও কাছে অতি কম মূল্যে ইটের ভাটা বিক্রির ব্যবস্থা করবে। যে ইটভাটা কিনবে খবিরউদ্দিন তার কাছ থেকে মোটা অংকের কমিশন নেবে। এবাদত গায়েন বললেন, তাহলে ইটের ভাটা নিয়ে তোমার চিন্তা করার দরকার নাই, খবির।
শান্তা আর আয়ান বাড়ির ভেতর চলে গেছে। তারা ইশকুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। খবিরউদ্দিনেরও ইশকুলে যাওয়ার সময় হয়েছে। সম্ভবত সে ইশকুলে যাওয়ার পথে এদিকে এসেছে।
কাছে এসে খবিরউদ্দিন বলল, শান্তা তো বিরাট দুষ্টু হয়েছে, চাচা। পড়াশোনা করে না। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে ব্রেকফাস্ট মানে কী ? ব্রেকফাস্ট মানে হচ্ছে সকালের নাস্তা। শান্তা বলেছে ইফতারি।
বিরক্ত হয়েছেন এবাদত গায়েন। তিনি কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন, তুমি কি ইশকুলের দপ্তরি থেকে প্রমোশন পেয়ে প্রধান শিক্ষক হয়েছ, খবির ? ক্লাসে ইংরেজি পড়াচ্ছ ?
এরকম ঘটনা ঘটলেই খবিরউদ্দিন মুখ থেকে জিহ্বা বের করে কামড় দেয়। সে মুখ থেকে লম্বা জিহ্বা বের করে কামড় দিল। বরাবরের মতো লজ্জা পাওয়ার ভাব নিয়ে বলল, ইংরেজি শেখার ইচ্ছে আছে। ক্লাসের বাইরে দাঁড়িয়ে ইংরেজি পড়া শুনি। পাখির বাসা ইংরেজি হচ্ছে নেস্ট। বার্ড’স নেস্ট। তবে বাঘের বাসা ইংরেজিতে টাইগার’স নেস্ট হবে না। সেটা হবে ডেন। টাইগার’স ডেন। মানে বাঘের গুহা।
এবাদত গায়েন বললেন, ইংরেজি তো দেখছি বেশ ভালো শিখেছ, খবির। শেয়ালের গর্ত ইংরেজি কী ?
শেয়ালের গর্ত ইংরেজি কী খবিরউদ্দিন জানে না। সে তাড়াতাড়ি বলল, ইশকুলের সময় হয়ে যাচ্ছে, চাচা। এগুলাম। শান্তার দিকে খেয়াল রাখবেন। তাকে কন্ট্রোল করতে না পারলে তার দেখাদেখি আয়ানও দুষ্টু হয়ে যাবে।
খবিরউদ্দিন চলে যাচ্ছে। তার মাথায় জটিল চিন্তা কাজ করছে। শেয়ালের গর্ত ইংরেজি কী! আজ গিয়ে আজিজ স্যারকে জিজ্ঞেস করতে হবে। আজিজ স্যার ইংরেজির টিচার। ইশকুলে ইংরেজি পড়ান। দ্যা কাউ ইজ আ ডমেস্টিক অ্যানিমেল। ইট হ্যাজ ফোর লেগ…।
শান্তা আর আয়ান বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছে। তারা ইশকুলে যাচ্ছে। ইশকুলে যাওয়ার আগে প্রতিদিন দাদার সঙ্গে দেখা করে যায়। তারা দাদার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।
খবিরউদ্দিন ফিরে আসছে। সে শেয়ালের গর্ত ইংরেজি বানিয়ে ফেলেছে। শেয়াল ইংরেজি ফক্স। আর গর্ত হচ্ছে হোল। শেয়ালের গর্ত হবে ফক্স হোল।
খবিরউদ্দিন এসে দাঁড়িয়েছে এবাদত গায়েনের কাছে। সেখানে শান্তা আর আয়ান দাঁড়িয়ে আছে। এবাদত গায়েন বললেন, শান্তা, বাঘের গুহা ইংরেজি কী ?
শান্তা বলল, টাইগার’স কেভ।
খবিরউদ্দিনের সব তালগোল পাকিয়ে যেতে থাকল। তাহলে টাইগার’স ডেন কী!
এবাদত গায়েন বললেন, আর শেয়ালের গর্ত ?
আয়ান বলল, ফক্স’স ডেন।
অমনি খবিরউদ্দিনের ব্রেইন শটসার্কিট হয়ে এলোমেলো হয়ে গেল। সে নতুন কিছু চিন্তা করতে পারছে না। বুঝতে পারছে না ব্রেইনে অতিরিক্ত চাপের জন্য আশপাশের আলো কমে আসছে কি না। চোখের সামনে ধোঁয়াটে ভাব।
শান্তা অস্থির গলায় বলল, দাদা, ঘরে চলো। পিংক রে!
খবিরউদ্দিন ঘাড় ঘুরিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। আকাশ গোলাপি মেঘে ছেয়ে গেছে। গোলাপি মেঘে কুয়াশার মতো ঢেকে ফেলেছে আকাশ। মানুষজনের ভেতর অস্থিরতা শুরু হয়েছে। তারা চিৎকার করে যে যেদিকে পারছে ছুটে যাচ্ছে। মানুষজনের ছোটাছুটি আর চিৎকারে বিভ্রান্ত হয়ে খবিরউদ্দিন বুঝতে পারছে না কী করবে।
এবাদত গায়েনকে বাড়ির ভেতর নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো না। তার আগেই জমাট বাঁধা কুয়াশা ভেদ করে আকাশ থেকে তির্যকভাবে নেমে এল পিংক রে।
শান্তা আর আয়ান দাদার মাথা বুকের ভেতর শক্তভাবে চেপে ধরেছে। নিজেদের মাথা ঠেকিয়ে রেখেছে দাদার মাথায়। যেন আকাশের দিকে না তাকালে তাদের কিছু হবে না। তারা দাদাকে পিংক রে থেকে বাঁচাতে পারবে।
খবিরউদ্দিন কোথাও যাওয়ার জায়গা পেল না। পিংক রে দেখে সে লাফ দিয়ে গরুর গায়ের ওপর পড়ল। লাফ দিতে গিয়ে তার ডান পা গর্তে পড়ে আটকে গেছে। তাতে খবিরউদ্দিনের পুরো শরীর গরুর আড়ালে চলে গেলেও হাঁটুর নিচ থেকে খানিক অংশ বাইরে থেকে গেল।
মানুষজনের ছোটাছুটি বন্ধ হয়ে গেছে। আর কারও কোনও চিৎকার শোনা যাচ্ছে না। সবকিছু স্বাভাবিক। শান্তা আর আয়ান মাথা তুলল। তাদের কিছু হয়নি। হাঁস-মুরগি, ছাগল-ভেড়া সব আগের মতোই আছে। গরু ডাকছে।
খবিরউদ্দিন পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখে তার ডান পায়ের হাঁটুর নিচ থেকে পুরো পা পুড়ে শক্ত হয়ে গেছে। পিংক রে তার পা পুড়িয়ে ঝামা বানিয়ে দিয়েছে। পায়ের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে বজ্রপাতের বিদ্যুতে তার পা পুড়ে গেছে। এতক্ষণ কিছু বোধ করেনি। আচমকা ডান পায়ে আগুনে পুড়ে যাওয়ার মতো জ¦ালা শুরু হলো। খবিরউদ্দিন যন্ত্রণায় আকাশ চিরে ফেলার মতো করে তীব্র চিৎকার করতে থাকল।
২.
থিয়া ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। জানালায় স্বচ্ছ কাচ। থিয়ার মনে হচ্ছে জানালা খোলা গেলে ভালো হতো। জানালা খোলা যাচ্ছে না। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কম্পার্টমেন্ট। জানালা-দরজা বন্ধ।
রেল লাইনের পাশ দিয়ে যতদূর চোখ যায় বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ। মাঠে কোনও ফসল নেই। কিছুদিন আগে মাঠভরতি ভুট্টা ছিল। ভুট্টা তুলে নিয়ে যাওয়ার পর মাঠ ধু ধু পড়ে আছে।
থিয়া যাচ্ছে বাসবদি। কয়েক দিন আগে শান্তা নামে ১৪ বছরের একজন মেয়ে সোস্যাল মিডিয়ায় সহযোগিতা চেয়ে পোস্ট দিয়েছে। সে জানিয়েছে সম্প্রতি পিংক রের আক্রমণে তার বাবা-মা মারা গেছেন। তারা দুই ভাইবোন। দাদা আছেন। প্যারালাইজড। দাদার বয়স ৭৬ বছর। কেউ যদি তাদের ফ্যামিলি হোম দেয় তাহলে দাদা সিনিয়র সিটিজেন হোমে চলে যাবেন।
নগর কর্তৃপক্ষের নিয়ম হচ্ছে ১৮ বছর বা তার কম বয়সের কোনও শিশু যদি বাবা-মাকে হারিয়ে ফেলে তাহলে তাদের প্রথম পছন্দ হচ্ছে ফ্যামিলি হোম। আত্মীয় বা আত্মীয় নয় এমন যার কাছে শিশু থাকতে চাইবে সে সেখানে থাকতে পারবে। বয়স্কদের জন্য প্রথম পছন্দ হচ্ছে নিজ পরিবারের সঙ্গে থাকা। তিনি চাইলে নগর সিনিয়র সিটিজেন হোমেও থাকতে পারবেন।
শান্তা নামের এই মেয়ের পোস্ট দেখে থিয়ার মনে হয়েছে হয় তাদের কাছের আত্মীয় কেউ নেই কিংবা তারা তাদের কাছে থাকতে চাইছে না। দুটাই হতে পারে। কারণ শান্তারা দুই ভাইবোন কোথাও গেলে তাদের দাদাও সিনিয়র সিটিজেন হোমে চলে যেতে চেয়েছেন।
নীল আকাশ। ঝকঝক করছে। সাদা মেঘ আছে। এই আকাশে হঠাৎ গোলাপি মেঘ দেখা যায়। জমাট গোলাপি মেঘ। যেন সন্ধ্যার আগে সূর্য ডুবছে। তাতে পুরো আকাশ গোলাপি হয়ে উঠেছে।
ঝকঝকে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে মন ভালো হয়ে যাওয়ার কথা। থিয়ার মন খারাপ হয়ে গেল। তার মনে হলো এই সাদা মেঘ সাদা থাকবে না। আচমকা গোলাপি হয়ে যাবে। তারপর সেখান থেকে পিংক রে ধেয়ে আসবে। সেই গোলাপি রশ্মিতে মারা যাবেন কিংবা পঙ্গু হবেন শত শত মানুষ।
থিয়ার মুখোমুখি বসার জায়গাটা ফাঁকা। একজন লোক এসে সেখানে বসার অনুমতি চাইছে। থিয়া তাকে অনুমতি দিয়েছে। লোকটির বয়স আনুমানিক চল্লিশ বছর। মেদহীন শরীর। দেখতে সুন্দর। উচ্চতা ছয় ফুট হবে বলে মনে হচ্ছে। যে স্যুট সে পরেছে তাতে তাকে বেশ মানিয়েছে। সিটে বসতে বসতে লোকটি বিনয়ের সঙ্গে বলল, আমি অ্যালেক্স। আপনি একা বসে বোরড হচ্ছেন কি না ভাবছিলাম। অনেকে একা থাকলে কিছু পড়েন। আপনাকে পড়তেও দেখছি না। বিষণ্ন চোখে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন।
থিয়া বুঝতে চাইছে অ্যালেক্স তার কাছে কেন এসেছে। থিয়ার বয়স ৩২ বছর। সে একজন নভোচারী। মহাকাশ গবেষণাগারে কাজ করে। তাকে অনেক বিধিনিষেধের ভেতর দিয়ে চলতে হয়। বাসবদি আসার আগে ক্রিসকে গিয়ে বলল, আমার তিন দিন ছুটি লাগবে।
ক্রিস তাদের মহাকাশ গবেষণাগারের তার সেকশনের চিফ। তার বয়স হয়েছে ৬৫ বছর। দেখলে মনে হয় এখনও তার বয়স ৫০ বছরে আটকে আছে। ক্রিস বললেন, ছুটির অ্যাপ্লিকেশন পেয়েছি। কেন ছুটি লাগবে তা লেখোনি।
থিয়া বলল, একজনের সঙ্গে দেখা করতে যাব। বাসবদি।
ক্রিস বাসবদির লোকেশন বের করে দেখে বললেন, সে তো অনেক দূর। পরিস্থিতি ভালো নয়। এই অবস্থায় তোমাকে অতটা দূরে যাওয়ার অনুমতি দিতে পারছি না।
থিয়া বলল, তাহলে কি আমাকে জব ছেড়ে দিয়ে যেতে হবে ?
ক্রিস জানে থিয়া সেটা পারে। তার জেদ অতিরিক্ত। যা বলে তাই করে। তাকে ছুটি দিয়েছে। তবে নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে। মানুষজন বিজ্ঞান একাডেমি আর মহাকাশ গবেষণাগারের ওপর প্রচণ্ড ক্ষেপে আছে। তারা বলছে পৃথিবীতে এত বড় বিপর্যয় নেমে এসেছে অথচ বিজ্ঞান একাডেমি আর মহাকাশ গবেষণাগার কিছুই করতে পারছে না। পিংক রে যখন আকাশ থেকে ছুটে আসছে তখন অবশ্যই এখানে মহাকাশ গবেষণাগারের দায়িত্ব আছে। মানুষজন খেপে যাওয়ার পর থেকে মহাকাশ গবেষণাগারে যারা কাজ করে তাদের সতর্কভাবে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
সামনে বসে থাকা অ্যালেক্সের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় থিয়া বলল, আকাশের দিকে তাকিয়ে মন বিষণ্ন হয়ে যাচ্ছে। এমন সুন্দর ঝলমলে আকাশ। আচমকা গোলাপি হয়ে যায়। আমরা কিছুই করতে পারছি না।
অ্যালেক্সকে বেশ উৎসাহিত মনে হলো। সে চোখ-মুখ উজ্জ্বল করে বলল, কে বলল আমরা কিছু করতে পারছি না! আমরা করে ফেলেছি। সেটা নিয়েই আপনার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি। দুই মিনিট সময় আমাকে দেবেন।
আগ্রহ বোধ করছে থিয়া। অ্যালেক্স কী বলতে চাইছে শোনার জন্য সামনে খানিকটুকু ঝুঁকে বসল। অ্যালেক্স বলল, মানুষ যখন ঘরের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে তখন পিংক রে তাকে কাবু করতে পারছে না। আমাদের কোম্পানি পোর্টেবল রুম তৈরি করে বাজারে নিয়ে এসেছে। ভাঁজ করে সেটা হ্যান্ডব্যাগের মতো হাতে রাখবেন কিংবা ব্যাকপ্যাকের মতো পিঠে ঝুলিয়ে নেবেন। আকাশে গোলাপি মেঘ দেখা যাওয়ামাত্র ব্যাগ খুলে ফেলবেন। সেখান থেকে বের হয়ে আসবে টিন্টেড গ্লাস দিয়ে বানানো সিলিন্ডার আকারের ঘর। সেই ঘরে আপনি একা ঢুকতে পারবেন। আবার দুজন হলে আলাদা রুম। ফ্যামিলি রুমও আছে।
বলে অ্যালেক্স সামনে সাপের ঝাঁপির মতো গোলাকার একটা ব্যাগ নিয়ে এল। ব্যাগের গায়ে লাগানো বোতামে চাপ দিয়ে ব্যাগ খুলতে খুলতে বলল, আপনাকে পুরো ব্যাপারটা ডেমোনেস্ট্রেট করে দেখাচ্ছি।
অ্যালেক্সের ঘটনা থিয়া বুঝতে পেরেছে। পিংক রে নিয়ে ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে। কয়েক দিন পর শোনা যাবে পিংক রে থেকে বাঁচতে ভ্যাকসিন আবিষ্কার করা হয়েছে।
থিয়া বলল, প্লিজ এটা খুলবেন না। দেখতে চাইছি না।
তাতে অ্যালেক্স উৎসাহ হারাল না। জোর দিয়ে বলল, পোর্টেবল রুম এখনও মার্কেটে আসেনি। কোম্পানির বিজ্ঞাপনের জন্য মাত্র কয়েক পিস এনেছি। তাছাড়া কোম্পানি থেকে নিলে এই রুমের যা দাম পড়বে এখানে আপনি পাচ্ছেন তার অর্ধেক দামে।
থিয়ার মাথা ব্যথা করছে। এসব শুনতে ভালো লাগছে না। ট্রেন যাচ্ছে বেশ জোরে। অথচ তার মনে হচ্ছে ট্রেন মাঠের মাঝখানে থেমে আছে। চলছে না। থিয়া বলল, আপনাকে ধন্যবাদ। প্লিজ আমি একা বসেছিলাম, আমাকে একা বসে থাকতে দিন।
অ্যালেক্স খানিক মন খারাপ করে বলল, বাড়ির মানুষজনের জন্য নিয়ে যেতে পারতেন। কম দামে পাচ্ছেন।
থিয়া কিছু বলল না। অ্যালেক্স ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে চলে গেল।
সকাল পেরিয়ে গেছে। জানালার বাইরে দুপুর যেন আগুন ঢেলে দিচ্ছে। ফাঁকা মাঠের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। পুরা মাঠ মনে হচ্ছে গরমে জ¦লে যাচ্ছে।
থিয়া যখন বাসবদি এসে পৌঁছেছে তখন বাজে দুপুর আড়াইটা। শান্তা আর আয়ান কিছুক্ষণ আগে ইশকুল থেকে ফিরেছে। এবাদত গায়েন দুপুরে গোসল সেরে শান্তাদের ইশকুল থেকে ফেরার প্রতীক্ষায় থাকেন। শান্তা আর আয়ান ইশকুল থেকে ফিরলে একসঙ্গে দুপুরের খাবার খান। আজ এখনও তাদের দুপুরের খাবার খাওয়া হয়নি।
থিয়াকে দেখে শান্তা আর আয়ান চিনতে পেরেছে। থিয়া তার ছবি পাঠিয়েছিল। তবে শিশু হওয়াতে এবং নিরাপত্তা বিধিমালার জন্য শান্তা তাদের ছবি পাঠায়নি।
এবাদত গায়েনও থিয়াকে দেখে চিনতে পেরেছেন। শান্তা তাকে ছবি দেখিয়েছে। এবাদত গায়েনের পরামর্শে শান্তা সোস্যাল মিডিয়াতে ফ্যামিলি হোমের সহযোগিতা চেয়ে লিখেছে। দাদা বললেন, আমার মনে হচ্ছে এটাই তোমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা। যারা তোমাদের দায়িত্ব নিতে চাইবে তাদের আসতে বলো। তোমরা তাদের ইন্টারভিউ নেবে। আমিও তাকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করব। লিগ্যাল ডকুমেন্টসগুলো সব ভালোমতো দেখে নেবে।
শান্তা আর আয়ানকে দেখে থিয়ার ভালো লাগল। বেশ ভালো। এবাদত গায়েন বললেন কথাবার্তা খাওয়ার পরে হবে।
খাবারের আয়োজন অতি সাধারণ। মরিয়ম চাচি খাবার আয়োজন করে দিয়ে গেছেন। সরু চালের ভাত, নদীর মাছ, বাড়ির মুরগি আর ভুট্টার ডাল। খেতে হয়েছে অসাধারণ। থিয়ার মনে হলো সে অনেক দিন পর এমন আরাম করে খাচ্ছে। খাওয়া ব্যাপারটা যে আনন্দের সেটাই থিয়া ভুলে গিয়েছিল। শান্তাদের নিয়ে যেতে এসে থিয়ার মনে হচ্ছে সে এখানেই থেকে যেতে পারে। ফিরে না গিয়ে এখানে থেকে যেতেই তার বেশি ভালো লাগবে।
এবাদত গায়েন বললেন, তাদের নিয়ে রওনা হবে কবে ?
থিয়া বলল, আজ। রাত এগারোটার সময় ফেরার ট্রেন আছে।
থিয়া আর তার পরিবারকে এবাদত গায়েনের ভালো লেগেছে। থিয়া আর তার মা একসঙ্গে থাকে। ভিডিও কলে মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। অনলাইনে দ্রুত ফর্মালিটিজ শেষ করা গেছে। এখন এবাদত গায়েন সিনিয়র সিটিজেন হোমে যাওয়ার জন্য অ্যাপ্লিকেশন করছেন।
শান্তা আর আয়ানকে নিয়ে থিয়া যখন ট্রেন থেকে তার শহরে নেমেছে তখন সকাল। রোদ ওঠেনি এখনও, তবে চারপাশ সকালের স্নিগ্ধ আলোতে ফরসা হয়ে আছে।
৩.
বিজ্ঞান একাডেমিতে কয়েকটি দেশের প্রধান নেতা এবং বিজ্ঞানীরা জরুরি মিটিংয়ে বসেছেন। তাদের ভেতর উৎকণ্ঠা। এখন পর্যন্ত কেউ পিংক রে বিষয়ে কোনও গ্রহণযোগ্য তথ্য বা কারণ উপস্থাপন করতে পারেননি।
তরুণ বিজ্ঞানী দিয়া বলল, এই রে শুধু মানুষকে আক্রান্ত করছে। গরু, ছাগল, ভেড়া বা অন্য কোনও প্রাণির ওপর এর কোনও প্রতিক্রিয়া নেই। আমরা সন্ধান করে জানতে পারি অন্য প্রাণিদেহের কোন এন্টিবডি তাদের এই রে থেকে বাঁচাচ্ছে। তাহলে আমরা অতি দ্রুত এই রে থেকে মানুষকে বাঁচাতে ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে পারব।
বিজ্ঞানী তানিয়া বললেন, এখন পর্যন্ত এই রে কোনও শিশুকে আক্রমণ করেনি। শিশুদের ওপর পিংক রে কীভাবে প্রভাব ফেলে সে বিষয়ে অবশ্য সুনির্দিষ্ট গবেষণার কোনও তথ্য এই মুহূর্তে আমাদের হাতে নেই।
প্ল্যানেটোলজির সেকশন চিফ হানায়জা বললেন, আমরা কি খানিকটা বিচ্ছিন্ন ও এলোমেলোভাবে তথ্য প্রকাশ করছি না ? আমাদের কি উচিত নয় ধারাবাহিকভাবে সমস্ত তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করা ?
প্রধান বিজ্ঞানী মলি এখন পর্যন্ত কোনও কথা বলেননি। তিনি গম্ভীর মুখে চুপচাপ বসে আছেন। আজকের মিটিং ডাকা হয়েছে বিশ্বনেতাদের বিশেষ অনুরোধে। বিশ্বনেতারা চাইছে পিংক রে সম্পর্কে দ্রুত কোনও সিদ্ধান্ত জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে। আর সেই তথ্য আনতে হবে বিজ্ঞান একাডেমি থেকে। কিন্তু দেওয়ার মতো নিশ্চিত কোনও তথ্য বিজ্ঞান একাডেমির কাছে নেই। বিজ্ঞান একাডেমিকে চাপ দিচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নেতারা।
মিটিংয়ে এক দেশের নেতা নাসুম্মা অসহিষ্ণু গলায় বললেন, পাবলিক কী জিনিস সে সম্পর্কে হয়তো আপনাদের ধারণা নেই। আপনারা থাকেন গবেষণাগারে। আমাদের থাকতে হয় পাবলিকের সঙ্গে। পৃথিবী যে পিংক রে দিয়ে আক্রান্ত হয়েছে তা সবাইকে সমানভাবে আক্রমণ করছে না। এই গোলাপি রশ্মিতে বেশির ভাগ আক্রান্ত হচ্ছে শিল্প মিল কলকারখানার মালিক। বিলিয়নিয়ার এক একজন। রাস্তায় বের হওয়ার পরই তাদের ওপর পিংক রে এসে হামলে পড়ছে। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে তারা মারা যাচ্ছে। গত আট মাসে কতজন ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট মারা গেছে সে খবর আপনাদের কাছে না থাকলে নিউজ পোর্টালে খোঁজ করুন।
নাসুম্মার কথাতে ভীষণ ঝাঁজ ছিল। তিনি রাগী রাগী গলায় কথা বলেছেন। তাতে বিজ্ঞানীদের ভেতর অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা নেতার কথা মেনে নিতে পারছেন না। মিটিংরুমে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। গুঞ্জন ধীরে ধীরে হইচই পর্যায়ে চলে যাচ্ছে।
প্রধান বিজ্ঞানী মলি এই প্রথম কথা বললেন। তিনি হাত তুলে বললেন, আপনারা শান্ত হোন। আমরা কোনও একটি যৌক্তিক পথের সন্ধান করছি। অশান্ত অবস্থা আমাদের সঠিক পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেবে।
বিজ্ঞানীরা শান্ত হয়ে এলেন। কিন্তু নেতারা শান্ত হলেন না। যখন সকলে কথা থামিয়ে চুপ হয়ে গেছেন, তখন আরেক দেশের নেতা বললেন, ঘটনা যে প্রাকৃতিক নয়, ঘটানো হচ্ছে তা বুঝতে আপনাদের মতো রকেট সায়েন্স জানতে হয় না। লেখাপড়া না জানা যে মানুষ রাস্তা ঝাড়ু দেয় সেও বুঝতে পারছে। বুঝতে পারছেন না আপনারা বিজ্ঞানীরা।
মিটিংরুমে আবার হইচই শুরু হয়ে গেছে। এবার কয়েকজন বিজ্ঞানী মিটিং ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা জানালেন। নেতার এ ধরনের কথার জন্য তাকে ক্ষমা চাইতে বললেন। নেতা ক্ষমা চাইছে না। মিটিংরুমে হইচই বাড়ছে। বিজ্ঞানীরা আসন ছেড়ে উঠে পড়েছেন। তারা পুরা ঘরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছেন।
প্রধান বিজ্ঞানী মলি বিভিন্ন দেশের নেতার দিকে তাকিয়ে বললেন, এভাবে কথা বললে আমার পক্ষে মিটিং চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিজ্ঞানীরা তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করছে। সমাধানের পথ খুঁজছে। বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামলাবেন বিশ্বনেতারা। রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামলানোর দায় বিজ্ঞানীর নয়। কোনও সিদ্ধান্ত ছাড়া আজকের সভা শেষ করতে হচ্ছে বলে আন্তরিকভাবে দুঃখিত।
নেতা তার আচরণের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। বিজ্ঞানীদের সম্পর্কে বলা তার বক্তব্য বাদ দিতে বললেন।
মিটিংরুম আবার শান্ত হয়ে এসেছে। বিজ্ঞানীরা নিজ নিজ জায়গায় বসে পড়লেন। অ্যাটমোসফেরিক বিজ্ঞানী জিয়ানা বললেন, আমরা খেয়াল করলে দেখতে পাব এখানে বিস্ময়কর ব্যাপার আছে। এই পিংক রে সৃষ্টির জন্য কুয়াশার মতো আবরণ তৈরি হচ্ছে বায়ুমণ্ডলের মেসোস্ফিয়ার স্তরে। সেটা স্ট্রাটোস্ফেয়ার আর ট্রপোস্ফিয়ার পার করে মানুষকে আঘাত করছে। কিন্তু এর উৎস আরও অনেক পেছনে। ৫০ থেকে ১০০ মিলিয়ন কিলোমিটার ওপাশে।
পৃথিবীর আরও একজন প্রধান নেতাকে আবার অধৈর্য হতে দেখা গেল। তিনি খসখসে গলায় বললেন, অংকের ক্লাস বাদ দেন, বিজ্ঞানী। এখন আমাদের করণীয় কী তাই বলুন। টাকাপয়সা নিয়ে ভাববেন না।
প্রধান বিজ্ঞানী মলি বললেন, আমরা যুগপৎ অভিযান চালাব। ভ্যাকসিন আবিষ্কার করব। আর সেই সঙ্গে নভোমণ্ডলে পিংক রে-র উৎস সন্ধানে নভোচারী পাঠাব।
নাসুম্মা বললেন, ভ্যাকসিন আবিষ্কারের কাজ দ্রুত করুন। আপনাদের জানানো হয়েছে টাকা নিয়ে ভাববেন না। যত টাকা লাগে আমরা দেব। তবে নভোযান পাঠানোর নামে সময়ক্ষেপণ করবেন না। নভোযান পাঠাতে টাকা লাগলেও বলবেন। টাকা দেব।
মলি বললেন, আমার প্রস্তাব হচ্ছে, অতি দ্রুততার জন্য মঙ্গলগ্রহ গবেষণায় যে নভোযান প্রস্তুত আছে সেটাকে ব্যবহার করা হবে। তবে সেই নভোযান নিয়ে যেহেতু সূর্যের দিকে যেতে হবে তাই নভোযানের তাপ শোষণ ক্ষমতা বাড়াতে হবে। যদি আমার প্রস্তাবে আপনারা রাজি থাকেন তাহলে একই সঙ্গে আমরা দুটা কাজ করব। নভোযান প্রস্তুত করা আর দুজন নভোচারীকে সূর্যের দিকে যাওয়ার জন্য বিশেষ অবস্থা মোকাবিলা করার মতো উপযুক্ত করে তোলা।
নাসুম্মা বললেন, আর ভ্যাকসিন।
মলি বললেন, সেটার কাজও চলবে।
নাসুম্মা বললেন, ভ্যাকসিনের কাজ আগে শুরু করুন। দ্রুত কাজ শেষ করুন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মার্কেটে ভ্যাকসিন নিয়ে আসুন।
তবে ভ্যাকসিন নিয়ে আর কোনও কথা হলো না। মহাকাশের অভিযানে যাওয়ার জন্য দুইজন নভোচারী কে হবে তা নির্ধারণ করতে বিজ্ঞান একাডেমি দুই দিন সময় চাইল। পৃথিবীর নেতারা দুই দিন সময় দিতে রাজি হলেন না। তারা বললেন, আমরা আজ এখানে আছি। প্রয়োজনে আপনারা সারাদিন কাজ করুন এবং আজকের মিটিং শেষ হওয়ার আগে ঘোষণা দিন সেই দুজন নভোচারী কারা যাদের নভোমণ্ডলে পাঠানো হবে।
আগের অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা দেখে বিজ্ঞান একাডেমি নভোচারী থিয়া আর ক্রিসানাকে অভিযানে পাঠানোর প্রস্তাব করেছে।
৪.
ট্রেন থেকে নেমে থিয়া দেখল তার কাছে নয়টা ম্যাসেজ এসেছে। ইচ্ছে করে সে ডিভাইস বন্ধ রেখেছিল। ট্রেনে শান্তা আর আয়ানকে সময় দিয়েছে। তাদের সঙ্গে গল্প করেছে। তাদের কথা শুনেছে। নিজের বাড়ির কথা বলেছে। ছোটবেলার কথা বলেছে। তাতে আয়ান আর শান্তা আরও বেশি থিয়ার ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞান একাডেমি থেকে পাঠানো ম্যাসেজ দেখে থিয়া রীতিমতো হকচকিয়ে গেল। তার চোখজোড়া বিস্ময়। সে পরপর তিনবার ম্যাসেজ পড়ল। পিংক রের উৎস সন্ধানে ক্রিসানার সঙ্গে মহাকাশে যাওয়ার জন্য বিজ্ঞান একাডেমি থেকে তার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। সে রাজি থাকলে আজকের মধ্যে বিজ্ঞান একাডেমিকে তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। আজকের মধ্যে তার কাছ থেকে কোনও সাড়া না পেলে বিজ্ঞান একাডেমি ধরে নেবে সে পিংক রের উৎস সন্ধানে মহাকাশে যেতে রাজি নয়।
থিয়া রাজি। এমন ঘটনা সবসময় ঘটে না। পৃথিবীর জন্য এত বড় কাজ করতে পারা তার জন্য সৌভাগ্য বলে সে মনে করছে। কবে যেতে হবে সেই বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। থিয়া ফিরতি বার্তায় তার সম্মতি জানিয়ে আজ অফিসে গিয়ে বিস্তারিত জানবে বলে সিদ্ধান্ত নিল। তবে মনে প্রবল খটকা লেগে থাকল। আয়ান আর শান্তাকে আজই নিয়ে এসেছে। মহাকাশে যাওয়ার প্রস্ততি আছে। সেজন্য তাকে বাড়ি থেকে ক্যাম্পে চলে যেতে হবে। ছেলেমেয়ে দুজন ব্যাপারটা কীভাবে নেবে বুঝতে পারছে না। তাছাড়া তাদের ইশকুলে ভর্তি করতে হবে। অবশ্য সেই ব্যাপারে মা উদ্যোগ নিতে পারবেন। থিয়া ভাবল বাড়িতে পৌঁছে শান্ত মনে ম্যাসেজের উত্তর লিখবে।
শান্তা আর আয়ানকে নিয়ে থিয়া রেল স্টেশন থেকে বের হয়ে এসেছে। সামনে খানিকটা হাঁটা পথ। তার ওপাশে গাড়ি রাখা আছে। নতুন জায়গায় এসে আয়ান আর শান্তা উত্তেজনা বোধ করছে। এরকম আধুনিক শহরে এই তাদের প্রথম আসা। এখানে সবকিছু যেন সাজানো গোছানো। দেখে মনে হচ্ছে রং পেন্সিল দিয়ে খাতায় ছবি আঁকানো হয়েছে।
থিয়াও উত্তেজনা বোধ করছে। তবে সেটা মহাকাশে যাওয়ার খবর পেয়ে। তারা চলে এসেছে জানিয়ে মায়ের কাছে ম্যাসেজ পাঠানো দরকার। বাড়ি ফিরছে। গাড়িতে গিয়ে মায়ের কাছে ভয়েস ম্যাসেজ পাঠিয়ে দেবে বলে ঠিক করল থিয়া।
সকাল হয়ে আসছে। এখুনি সূর্য উঁকি দিলেই রোদ দেখা যাবে। শীতল বাতাস ছেড়েছে। বাতাসের শীতলভাব আরাম দিচ্ছে। রাতের জার্নির ক্লান্তি চলে গেছে। নিজেকে বেশ হালকা আর ঝরঝরে লাগছে নিজের কাছে।
শান্তা আর আয়ানকে নিয়ে থিয়া রেল স্টেশনের বাইরে হাঁটা পথ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তারা গাড়ি রাখার জায়গার দিকে হাঁটছে। থিয়ার মুখ অমনি গম্ভীর হয়ে গেল। আচমকা বাতাসের তাপমাত্রা বদলে গেছে। এখন বাতাস আর শীতল নেই। বাতাসে গরম ভাব। থিয়া আকাশের দিকে তাকাল। আকাশজুড়ে গোলাপি মেঘ দেখা দিয়েছে। আবছা কুয়াশার মতো মেঘ আকাশ ঢেকে ফেলছে।
আকাশের দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে থিয়া। তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়েছে শান্তা আর আয়ান। তারাও আকাশের দিকে তাকিয়েছে। আকাশে গোলাপি মেঘ জমাট বাঁধছে।
বাবা আর মায়ের কথা মনে পড়েছে আয়ানের। গোলাপি মেঘ দেখে সে প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেছে। ডানে বাঁয়ে তাকাল। তার ভেতর অস্থিরতা দেখা গিয়েছে। আচমকা শান্তার হাত ছেড়ে দিয়ে আয়ান সামনে দৌড়াতে শুরু করল। কোথায় যাবে বলে দৌড়াচ্ছে আয়ান জানে না। শুধু জানে তাকে দৌড়াতে হবে।
গোলাপি মেঘ জমাট বেঁধে ওপর থেকে নিচে নেমে আসছে। এখুনি মেঘের ভেতর থেকে পৃথিবীতে তির্যকভাবে ধেয়ে আসবে পিংক রে। শান্তা ছুটছে আয়ানের পেছন পেছন।
ঘটনা এত দ্রুত ঘটেছে যে থিয়া হতভম্ব হয়ে গেছে। কী করবে বুঝতে পারছে না। যে কোনও সময় পিংক রে ছড়িয়ে পড়বে চারপাশে। তখন বাইরে থাকা সম্ভব হবে না। তাকে পিংক রের উৎস খুঁজতে মহাকাশে যেতে হবে। এখন বাইরে থাকা তার জন্য হবে বিরাট বোকামি।
থিয়া জোরে জোরে শান্তাকে ডাকছে। ডাক শুনে শান্তা পেছন ফিরে তাকাল না। সে সামনের দিকে ছুটে যাচ্ছে। সামনে চওড়া বন মতো। সারি সারি ঘন গাছ। দৌড়াতে দৌড়াতে সেই বনের ভেতর ঢুকে গেল আয়ান। তাকে আর দেখা যাচ্ছে না। শান্তাও বনের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে।
সামনের দিকে ছুটে গেল থিয়া। আকাশ থেকে গোলাপি মেঘ আরও নিচে নেমে এসেছে। এখুনি নেমে আসবে পিংক রে। এখনও নেমে আসেনি সেটা বিস্ময়কর। গোলাপি মেঘ দেখে থিয়া আর সামনে এগুতে পারেনি। দৌড়ে রেল স্টেশনে ফিরে এল।
আয়ান বন থেকে বের হয়ে দেখে রাস্তা। সে কোনওদিকে না তাকিয়ে রাস্তার পাশ ধরে ছুটতে থাকল। কোথায় যাচ্ছে জানে না। শুধু মনে পড়ছে এরকম গোলাপি রশ্মি এসে পড়েছিল তার বাবা আর মায়ের শরীরে।
হঠাৎ রাস্তার ধারে আয়ানকে থেমে পড়তে হলো। একটা বাস এসে দাঁড়িয়েছে পাশে। বাস ড্রাইভার আকাশে পিংক রে দেখে দ্রুত বাস চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখলেন একজন শিশু একা রাস্তার ধার দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে ভীষণ ভয় পেয়েছে।
বাস ড্রাইভার বাস থামিয়ে আয়ানকে তাড়াতাড়ি বাসে উঠে পড়তে বললেন। আয়ানের আর ভাবার মতো অবস্থা ছিল না। সে লাফ দিয়ে বাসে উঠে পড়ল। বাস ড্রাইভার বাসের দরজা বন্ধ করে দিয়ে বাস চালিয়ে দ্রুত সামনে যেতে থাকলেন।
শান্তা বন থেকে বের হয়ে দেখে সামনে রাস্তা। সেই রাস্তা একদম ফাঁকা। সেখানে কোনও মানুষ কিংবা গাড়ি কিচ্ছু নেই। যতদূর দেখা যায় রাস্তার দু পাশ শূন্য হয়ে আছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্তা দেখল গোলাপি মেঘ আরও নিচে নেমে এসেছে।
রেল স্টেশনে ফিরে থিয়া দেখল শেডের নিচে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখমুখ শুকনো। সেই মানুষের ভিড়ে অ্যালেক্স তার টিন্টেড গ্লাসের পোর্টেবল রুমের ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ বিষণ্ন। সে উদাসীন মুখে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। থিয়া তাকে চিনতে পেরেছে কি না বুঝা গেল না। তবে থিয়াকে দেখেই অ্যালেক্স তাকে চিনতে পেরেছে। থিয়ার মুখে গভীর আতঙ্ক আর চিন্তার ভাঁজ।
অসহায় চোখে থিয়া উদগ্রীব হয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। পিংক রে পৃথিবীতে আঘাত হেনেছে। বাইরে আতঙ্কিত মানুষজনের আর্তচিৎকার শোনা যাচ্ছে।
ধীর পায়ে রেল স্টেশনের শেডের দিকে শান্তা হেঁটে আসছে। তার ভেতর কোনও তাড়া নেই। তাকে বিধ্বস্ত ও অবসন্ন দেখাচ্ছে। সে ফিরছে একা। আয়ানকে হারিয়ে ফেলেছে।
আয়ান যে বাসে আসছিল সেই বাস দুর্ঘটনায় পড়ল। সামনে কোনও একটা গাড়ি রাস্তা দিয়ে দ্রুত ছুটে যাচ্ছিল। তখন আকাশে গোলাপি মেঘ দেখে ঘাবড়ে গেছে। অমনি গাড়িতে আচমকা ব্রেক করেছে। তাতে তার পেছনে থাকা গাড়ি গিয়ে সেই গাড়িকে ধাক্কা দিয়েছে। আকাশে গোলাপি মেঘ দেখে সবকয়টি গাড়ি ছুটছিল জোরে। তাতে একটা গাড়ি গিয়ে আরেকটা গাড়িতে এত জোরে ধাক্কা দিয়েছে যে কোনও গাড়ির দরজা খুলে ঝুলে পড়েছে। কোনও গাড়ির জানালার কাচ ভেঙ্গে গুঁড়া গুঁড়া হয়ে গেছে। অনেকগুলো গাড়ি রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ ব্রেক করেছে। তাতে রাস্তার গাড়িগুলো ঘুরে আড়াআড়ি হয়ে গেছে। রাস্তায় গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। গাড়ি থেকে নেমে মানুষজন যে যেদিকে পারছে ছুটছে।
রিদা ছেলেমেয়েদের নিয়ে উইক এন্ডে বৃষ্টি দেখতে যাচ্ছে। এ সময়ে দক্ষিণে প্রবল বৃষ্টি হয়। দেখলে মন ভালো হয়ে যায়। রাস্তায় মানুষের ছোটাছুটি দেখে রিদা গাড়ির স্টিয়ারিং হুইল চেপে ধরে আকাশের দিকে তাকাল। আতঙ্কে তার চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। তাকে ড্রাইভিংয়ের নিয়ম ব্রেক করতে হলো। সে আচমকা জোরে গাড়ি ব্রেক করে রাস্তার পাশে থামিয়েছে। গাড়ি না থামিয়ে উপায় ছিল না। রাস্তার মাঝখানে এলোমেলোভাবে গাড়ি দাঁড়িয়ে রাস্তা ব্লক হয়ে গেছে। রাস্তায় ঘটনা কী ঘটেছে বুঝা যাচ্ছে না। অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে নাকি মানুষজন গাড়ি রাস্তায় ফেলে রেখে দৌড়াচ্ছে তা জানার উপায় নেই।
ছেলেমেয়ে দুজন তখনও কিছু বোঝেনি। তারা গাড়ির পেছনের সিটে বসে ছিল। ঝাঁকি দিয়ে গাড়ি থেমে যেতেই দুজনই চিৎকার দিয়ে লাফিয়ে উঠেছে।
রিদা দ্রুত গাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছে। ছেলেমেয়ে দুজনকে গাড়ি থেকে বের করে নিয়ে পাশে কোনও বাড়ির সন্ধানে ছুটতে থাকল। ছেলেমেয়ে দুজন তখন ঘটনা বুঝতে পেরেছে। ভয়ে তাদের মুখও শুকিয়ে গেছে। তারা মায়ের সঙ্গে দৌড়াচ্ছে।
নগর কর্তৃপক্ষ থেকে রাস্তার পাশে ঘরের মতো বেশকিছু শেড বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেখানে ঘরবাড়ি নেই সেখানেই নগর কর্তৃপক্ষ অস্থায়ী ঘর বানিয়েছে। যাতে পিংক রে ধেয়ে এলে মানুষজন সেই ঘরে আশ্রয় নিতে পারে। এখানে রাস্তার পাশে সেরকম কোনও ঘর দেখা যাচ্ছে না। তাতে মনে হচ্ছে কাছেপিঠে বাড়িঘর থাকার সম্ভাবনা আছে।
পিংক রে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। সামনে ছোট্ট এক বাড়ি দেখা গেছে। দরজা খোলা। আকাশে গোলাপি মেঘ দেখা দিলে মানুষজন তাদের বাড়ির দরজা খুলে রাখে যেন বিপদে পড়া মানুষ আশ্রয় নিতে পারে। মাটিতে পিংক রে নেমে আসার পর বাড়ির দরজা বন্ধ করে দেয়। তবে অনেক জায়গায় অসুবিধা দেখা গেছে। পিংক রের আঘাতে আক্রান্ত হয়ে যারা কোনও বাড়িতে ঢুকেছে তখন তাদের শুশ্রƒষা করতে গিয়ে যে তাকে স্পর্শ করেছে সেও আক্রান্ত হয়ে গেছে। তাতে মানুষজনের ভেতর ভয় ঢুকে গেছে। অনেকে তাই আকাশ থেকে গোলাপি রশ্মি নেমে আসার আগেই বাড়ির দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে।
রিদা ছেলেমেয়ে নিয়ে সেই বাড়িতে ঢুকে পড়ল। আরও দুজন মানুষ ছুটে আসছে এই বাড়ির দিকে। তাদের পেছনে একজন শিশু। বাড়িওয়ালা দরজা খুলে রেখেছেন। সামনে দুজন দরজার কাছাকাছি চলে এসেছে। শিশু তাদের পেছনে। পিংক রে এসে শিশুর সামনে থাকা দুজনের পেছনের জনের শরীরে আছড়ে পড়ল। সে অমনি লাফ দিয়ে সামনের জনকে চেপে ধরেছে। তারা দুজন তখন আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষের মতো ছটফট করতে করতে সেখানে পড়ে মারা গেল।
তাদের দেখে শিশু আর সামনে এগুতে সাহস পায়নি। সে সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ল। ভয় আর আতঙ্কে তার দুই চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। স্থির চোখে সামনে পড়ে থাকা দু’জন মানুষের দিকে তাকিয়ে আছে। শিশুকে দেখাচ্ছে মূর্তির মতো।
বাড়ি থেকে দরজার স্বচ্ছ কাচের ভেতর দিয়ে বাইরের সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। রিদা দেখল যে শিশু বাড়ির আঙিনায় ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখের রং ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে সে আগুনে ঝলসে যাচ্ছে।
ভয়াবহ কষ্টকর সেই দৃশ্যের দিকে রিদা তাকিয়ে থাকতে পারল না। চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। ছেলেমেয়েদের দরজার কাছ থেকে সরিয়ে দিয়েছে। খানিক বাদে চোখ খুলে রিদা দেখল বাড়ির আঙিনায় সেই শিশু দাঁড়িয়ে নেই। সে ঘাসের ওপর শুয়ে আছে। বেঁচে আছে কি না বুঝা যাচ্ছে না।
পিংক রে সরে গেছে। গোলাপি মেঘ গুটিয়ে নিয়েছে। আকাশ আবার আগের মতো হয়ে গেছে। নীল আকাশে সাদা মেঘ উড়ে যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন আচমকা গোলাপি মেঘের ঝড় এসেছিল। বাতাসে মেঘ উড়ে গেছে। গোলাপি মেঘের ছিটেফোঁটাও এখন আর কোথাও নেই।
রিদা বাড়িওয়ালাকে ঘটনা জানিয়েছে। বাড়িওয়ালা ইমার্জেন্সিতে ফোন করেছেন। ইমার্জেন্সি থেকে অ্যাম্বুলেন্স এসে বাড়ির সামনে থেকে তিনজনকে নিয়ে গেছে। তাদের ভেতর একজন শিশু।
৫.
শান্তা বাসবদি ফিরে এসেছে। আয়ানকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। শান্তার ধারণা আয়ান বাড়িতে ফিরে আসবে। বাড়ির ঠিকানা ছাড়া অন্য কোনও ঠিকানা তার জানা নেই। নতুন শহর তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত।
বাড়িতে ফেরা শান্তার জন্য সহজ ছিল না। থিয়া বলেছিল আয়ানকে সে খুঁজে বের করবে। শান্তা তখন জেনে গেছে থিয়াকে মহাকাশে যেতে হবে। থিয়া তাকে বলেছে। শান্তা বলল, তুমি মহাকাশে যাও। পৃথিবীকে রক্ষা করা অনেক জরুরি। আয়ানকে আমি খুঁজে বের করতে পারব।
থিয়ার মা বললেন, তবে তুমি আমার কাছে থাকো। আমরা দু’জন একসঙ্গে খুঁজব।
শান্তা বলল, আমাকে যেতে দিন। আয়ানের খবর দাদার কাছে পৌঁছানোর আগে আমাকে বাসবদি যেতে হবে। আয়ান হারিয়ে গেছে শুনলে দাদা বাঁচবেন না। দাদা চলে গেলে আমার আর কেউ থাকবে না।
বিজ্ঞান একাডেমি থেকে ক্রিস এসেছেন শান্তার সঙ্গে দেখা করতে। তিনি আদর মেশানো গলায় বললেন, দেখো শান্তা, ঘটনা একটা ঘটেছে। কী ঘটেছে আমরা জানি না। থিয়া তোমাদের দুই ভাইবোনকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। আয়ানকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পুরো দায় থিয়ার। সিকিউরিটি কাউন্সিল এজন্য থিয়াকে আটকে দেবে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন আছে। থিয়া আটকে গেলে পৃথিবীর কী হবে ?
শান্তা শান্তভাবে বলল, থিয়াকে বলেছি আমাদের জন্য চিন্তা না করতে। সে যেন নিশ্চিন্ত মনে মহাকাশে যায়।
ক্রিস বললেন, তোমাকে ভরসা করে থিয়া নিশ্চিন্তে থাকবে। কিন্তু মিডিয়া তাদের চিন্তা থামিয়ে রাখবে না। তারা আয়ানের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার খবর প্রচার করতে থাকবে। থিয়াকে নানাভাবে হেনস্থা করবে।
শান্তা জানতে চাইল, আমি কীভাবে আপনাদের সহযোগিতা করতে পারি ?
ক্রিস বললেন, তুমি থিয়ার মায়ের কাছে থেকে যাও। আমরা সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে আয়ানকে শিগগিরই খুঁজে বের করে ফেলতে পারব।
শান্তা রাজি হলো কিন্তু তাতে কোনও লাভ হলো না। মিডিয়া আয়ানের নিখোঁজ হওয়া সংবাদ প্রকাশ করে দিয়েছে। একজন বাস ড্রাইভার জানিয়েছেন পৃথিবীর দিকে পিংক রে ধেয়ে আসার সময় তিনি রেল স্টেশনের কাছ থেকে একজন শিশুকে উদ্ধার করেন। রোড অ্যাক্সিডেন্টে তার গাড়ির দরজা ভেঙে যায়। মানুষের জটলার ভেতর সেই শিশু বাস থেকে নেমে চলে গেছে। তার বয়স ১১ বছর। নাম জানেন না। বাসের ক্যামেরায় ধারণ করা ছবিতে ঝাপসা একজন শিশুকে দেখা যাচ্ছে। তার চেহারা স্পষ্ট নয়।
অস্পষ্ট চেহারার ছবি দেখে শান্তা নিশ্চিত হয়ে গেছে হারিয়ে যাওয়া এই শিশু আয়ান। সিকিউরিটি ফোর্স রোড অ্যাক্সিডেন্টের আশপাশ খুঁজে আয়ানের কোনও সন্ধান পায়নি। শিশু মিসিং কেসে পুরা নগর তোলপাড় হয়ে গেছে। নাগরিকরা নগর কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা নিয়ে ক্ষোভ জানাচ্ছে।
শান্তা বলল, এই ছবি দেখে দাদাও আয়ানকে চিনবেন। তখন তিনি অস্থির হয়ে যাবেন। প্রয়োজন হলে আমি আবার আসব। কিন্তু এখন আমাকে বাড়ি যেতে হবে।
থিয়া রাজি হয়েছে। ক্রিস বিজ্ঞান একাডেমির পক্ষ থেকে এবাদত গায়েনের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে চিঠি পাঠিয়েছেন। তিনি লিখেছেন দুর্যোগ মুহূর্তে এ ছিল নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত এক ঘটনা। বিজ্ঞান একাডেমি সিকিউরিটি কাউন্সিলের সহায়তা নিয়ে আয়ানকে খুঁজছে। তারা আশা করছে অতি অল্প সময়ের ভেতর আয়ানকে খুঁজে পাওয়া যাবে। তিনি যেন এ ব্যাপারে থিয়াকে ভুল না বোঝেন এবং ক্ষমা করে দেন।
খবর শুনে এবাদত গায়েন যতটা মুষড়ে পড়বেন মনে হয়েছিল ততটা মুষড়ে পড়েননি। শান্তাকে বললেন, তুমি যখন ফিরে এসেছ, আয়ানও ফিরে আসবে।
বাড়ির বাইরের আঙিনার এবাদত গায়েন বসে আছেন। তার পাশে শান্তা মন খারাপ করে বসে আছে। রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। শান্তা তাকিয়ে আছে স্থির চোখে। তার মনে হচ্ছে আয়ান বুঝি যে কোনও সময় চলে আসতে পারে। রাস্তা দিয়ে খবিরউদ্দিন আসছে। তার দুই হাতে ক্রাচ। ডান পা হাঁটুর নিচ থেকে নেই। কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে।
খবিরউদ্দিনের মুখ হাসি হাসি। সে শান্তার দিকে তাকিয়ে বলল, শহর দেখতে কেমন ? অতি চমৎকার নাকি মধ্যম মানের ?
শান্তা কিছু বলল না। খবিরউদ্দিন বলল, তোমার ভাই কোথায় ? তার কাছে শহর কেমন লেগেছে শুনি। ছোটরা যা দেখে তাতেই খুশি হয়। ছোটদের খুশি দেখার মধ্যেও আনন্দ আছে।
শান্তা এবারও কিছু বলল না। এবাদত গায়েন বললেন, সিনিয়র সিটিজেন হোম থেকে কাগজপত্র ফেরত চেয়েছি। সেখানে আর যাব না। বাড়িতেই থাকব।
হাহাকারের মতো গলায় অদ্ভুত শব্দ করে খবিরউদ্দিন বলল, ইটভাটার খরিদ্দার দেখে ফেলেছি। ভালো দাম দেবে বলেছে। আপনি বাড়ি থেকে হোমে চলে যাচ্ছেন দেখে মনে হলো ইটভাটা বিক্রি করে দেবেন।
এবাদত গায়েন বললেন, ইটভাটা বিক্রি করব না। তবে ইট পোড়ানো ব্যবসাও করব না। সেখানে সবজি চাষ করব।
খবিরউদ্দিন আবারও গলার ভেতর হাহাকারের মতো আওয়াজ করে বলল, সেখানকার মাটি পুড়ে ঝামা হয়ে গেছে। সেখানে সবজির ফলন হবে না।
এবাদত গায়েন বললেন, পাঁচ বছর জমি ফেলে রাখব। চাষ দেব। আবাদ করব না। পাঁচ বছর পর সবজি আবাদ করব। তাহলে তো হবে!
খবিরউদ্দিন কিছু না বলে উঠে পড়ল। ক্রাচ দুটা হাতে নিয়েছে। চলে যাবে। এবাদত গায়েন বললেন, ভাটায় পোড়ানোর জন্য তোমাকে আর গাছ দিতে হবে না। গাছ দেওয়া বন্ধ।
ক্রাচে ভর দিয়ে খুট খুট শব্দ করতে করতে খবিরউদ্দিন চলে গেল।
রাত। লোকাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের হেড ইলোরা এসেছেন। তাকে অল্প কিছুদিন হলো এই এলাকায় পাঠানো হয়েছে। বাসবদি তার কর্ম এলাকার ভেতরে।
এবাদত গায়েন তার বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছেন। শান্তা বসে আছে তার পাশে। ইলোরাকে সামনে বসতে দেওয়া হয়েছে। ইলোরা জিজ্ঞেস করলেন, তুমি যাওয়ার সময় কখনও কি থিয়ার ভেতর অস্বাভাবিক কোনও আচরণ খেয়াল করেছ ?
শান্তা বলল, সে স্বাভাবিক আচরণ করেছে। তার ভেতর কোনও অস্বাভাবিক আচরণ দেখা যায়নি।
সে কি তোমাদের আড়ালে রেখে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে।
এরকম ঘটনা ঘটেনি।
তাকে কি তুমি শিশুপাচারকারী হিসেবে সন্দেহ করো ?
শান্তা বলল, না। সে তেমন মানুষ নয়।
ইলোরা মুখ হা করে হাই তুললেন। হাই তোলা শেষ হলে বললেন, কে যে কেমন মানুষ তা চট করে বোঝা খুব মুশকিল। তোমার বাবা-মা মারা গেছেন। তোমার দাদি বেঁচে নেই। তোমার কোনও চাচা ফুপু নেই। তোমার বাবা ছিলেন তোমার দাদার একমাত্র সন্তান। তোমরা দুই ভাইবোন। শহরে গেলে। রেল স্টেশন থেকে বের হয়ে আয়ান দৌড় শুরু করল। তুমি তার পেছন পেছন গেলে। দুই ভাইবোন বনের ভেতর ঢুকে গেলে। তারপর থেকে আয়ান নেই।
শান্তা বুঝতে পারছে সিকিউরিটি হেড ইলোরা সোজা ধাঁচের মানুষ নন। তিনি ঘটনা পেঁচিয়ে দড়ি পাকিয়ে ফেলছেন। শান্তা বলল, এক বাস ড্রাইভার বলেছেন তিনি সেখান থেকে একজন শিশুকে উদ্ধার করেছেন। যে ভয়ে আতঙ্কে রাস্তার পাশ দিয়ে দৌড়াচ্ছিল। তখন আকাশ থেকে পিংক রে ধেয়ে আসছিল।
ইলোরা বললেন, কিন্তু সেই শিশু যে আয়ান তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আমরা আয়ানের ছবি দেখেছি।
সিকিউরিটি কাউন্সিল সেটা এখনও কনফার্ম করেনি। দেখো―আয়ান দৌড়ে যাচ্ছে। তখন সেখানে একটা বাস চলে এল। তারপর তুমি গিয়ে আর কোনও বাস দেখতে পেলে না।
হ্যাঁ কোনও গাড়ি কিংবা মানুষ রাস্তায় ছিল না। রাস্তা ফাঁকা ছিল।
ঘটনাটা সাজানো গল্প হয়ে গেল।
এবাদত গায়েন পিঠ সোজা করে বসেছেন। শীতল গলায় বললেন, আপনি কী বলছেন অফিসার ?
ইলোরা বললেন, থিয়া দুই ভাইবোনকে শহরে নিয়ে গেল। একটা বাস ঠিক সময়মতো সেখানে চলে এল। তারপর আয়ান মিসিং। থিয়া চলে যাচ্ছে মহাকাশে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ পাওয়া গেল না। পুরা ব্যাপারটা কেমন গল্প হয়ে গেল না!
কঠিন গলায় শান্তা বলল, না, গল্প হয়ে গেল না। তখুনি আকাশ গোলাপি মেঘে ঢেকে গিয়ে পিংক রে ছুটে আসবে সেটা কেউ জানত না।
ইলোরা বললেন, তুমি আয়ানকে শহরে না খুঁজে বাসবদি চলে এলে কেন ?
এবাদত গায়েন রাগী গলায় বললেন, অফিসার, সীমা থেকে বেরিয়ে পড়বেন না। ভুলে যাবেন না যে আপনি একজন শিশুকে প্রশ্ন করছেন। তার মনের ওপর চাপ পড়ে এমন কোনও প্রশ্ন তাকে করতে পারেন না। আশা করি আপনার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমাকে কথা বলতে হবে না। আর কোনও শিশুর সঙ্গে আপনার এমন আচরণ এটাই শেষ।
ইলোরা কিছু বললেন না। তিনি উঠে পড়েছেন। পুরো ঘরে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে এলেন। ধীর গলায় বললেন, হেডকোয়ার্টারস থেকে এই কেসকে হাই প্রায়োরিটি দিয়ে ইনভেস্টিগেট করতে বলেছে। অতিরিক্ত যদি কিছু করে থাকি সেজন্য ক্ষমাপ্রার্থী। এখন যাচ্ছি। প্রয়োজন পড়লে আবার আসব।
ইলোরা ঘর থেকে বের হয়ে চলে গেলেন।
সিকিউরিটি হেডকোয়ার্টারসের প্রধান ক্রিস্টিনা বসে আছেন বিজ্ঞান একাডেমির প্রধান মলির সামনে। তাকে বিশেষ চিন্তিত দেখাচ্ছে। তিনি চোখের কোনায় ভাঁজ নিয়ে বললেন, থিয়াকে এই অবস্থায় মহাকাশে পাঠানো কি ঠিক হচ্ছে! মিডিয়া কি ছেড়ে দেবে ? থিয়া মহাকাশে যাওয়ার প্রশিক্ষণে আছে বলে মিডিয়াকে এড়িয়ে যাচ্ছেন। আর কতদিন এড়িয়ে থাকতে পারবেন ?
মলি বললেন, পৃথিবী এখন আছে গভীর সংকটে। মহাকাশে যে মিশন পাঠানো হচ্ছে তা সাধারণ কোনও মিশন নয়। থিয়ার মতো এমন চৌকস আর বুদ্ধিদীপ্ত নভোচারী আমাদের আর একজনও নেই যে এই কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারবে। পৃথিবীর প্রয়োজনে তাকে মহাকাশে পাঠাতে হচ্ছে।
ক্রিস্টিনা বললেন, থিয়া যদি আর ফিরে না আসে তাহলে আয়ান মিসিং কেস আরও জটিল চেহারা ধারণ করবে সেটা কি আপনি বুঝতে পারছেন!
থিয়া ফিরে আসবে। তার ওপর আমার ভরসা আছে।
সেটা আপনার বিশ্বাস। আমার মনে হয় আয়ান মিসিং কেসে থিয়ার স্টেটমেন্ট রেকর্ড করে রাখা জরুরি।
মলি বললেন, থিয়ার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চাপ পড়ে এমন কোনও কিছুর অনুমতি এখন দিতে পারব না।
ক্রিস্টিনা বললেন, তবে তার জিম্মাদার রইলেন আপনি। থিয়া যদি ফিরে না আসে তাহলে আয়ান মিসিং কেস আপনাকে ফেস করতে হবে। বাসবদি থেকে আয়ানকে নিয়ে আসা। আচমকা এক বাস এসে তাকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া। থিয়ার মহাকাশে চলে যাওয়া তখন এক সুতোয় গাঁথা হয়ে যাবে।
মলি বিরক্ত বোধ করছেন। সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান কাজ মনে হয় সবসময় অন্যকে সন্দেহ করা। মলি চুপ করে আছেন। তিনি কোনও কথা বলছেন না। তার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।
ক্রিস্টিনা বললেন, আপনি অযথা চিন্তা করবেন না। আয়ান মিসিং কেস আমি ডিল করছি। জ্যান্ত অজগর সাপের পেটের নিচ থেকে ডিম বের করে নিয়ে এসে খেলা পাবলিক আমি। আয়ানকে আমরা খুঁজে বের করব। আপনারা পৃথিবীকে বাঁচানোর কাজে মনোযোগ দিন।
জানালা দিয়ে রোদ এসে পড়েছে ঘরের মেঝেতে। সেই রোদ মাড়িয়ে ক্রিস্টিনা চলে যাচ্ছেন। তার চলে যাওয়া পথের দিকে মলি তাকিয়ে আছেন। মনের ভেতর থেকে কেউ বলে উঠল, পৃথিবীর আশ্চর্য সৃষ্টি এই মানুষ। যাকে কখনও চেনা যায় না। পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ ভালো। তাদের বাঁচাও। পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখো।
৬.
আকাশে কালো মেঘ জমাট বাঁধছে। অন্ধকার হয়ে আসছে চারপাশ। ঘন কালো মেঘে পুরা আকাশ ছেয়ে গেছে। জোর বাতাস হচ্ছে। যেন ঝড় শুরু হয়েছে। ঝড়ো বাতাসে আকাশে কালো মেঘগুলো এলোমেলোভাবে ছোটাছুটি করছে। মেঘেদের ভেতর অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। কোথাও কোনও আলো নেই। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে দম বন্ধ হয়ে আসছে।
আয়ান হেঁচকি তোলার মতো আওয়াজ করে বিছানায় পিঠ বাঁকা করে ফেলল। পিংক রে সরে যাওয়ার পর হেলথ সিকিউরিটি ভলান্টিয়াররা তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। আয়ানকে যখন হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় তখন তার পুরো শরীর আগুনে ঝলসে যাওয়ার মতো চেহারা হয়ে ছিল। ইমার্জেন্সিতে ডাক্তাররা তখুনি আয়ানের পুরো শরীর ব্যান্ডেজ করে দিয়েছেন। শুধু দুই চোখ আর মুখের জায়গা খোলা।
আয়ান আকাশে কালো মেঘ জমাট বাঁধা স্বপ্ন দেখে মুখ দিয়ে হেঁচকি তোলার মতো শব্দ করে ঘুম থেকে জেগে উঠেছে।
ডিউটি ডাক্তার কোদণ্ড পাশে ছিলেন। একজন ডাক্তারকে আয়ানের কেবিনে সবসময়ের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। তিনি আয়ানের শারীরিক এবং মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন।
আয়ানের অবস্থা দেখে ডাক্তাররা বিস্মিত হয়েছেন। তার শরীর আগুনে পুড়ে যাওয়ার মতো দগদগে অবস্থা হয়েছিল। কিন্তু আয়ানের শরীরে আগুনে পোড়ার কোনও লক্ষণ নেই। ডাক্তাররা বুঝতে পারছেন না তার শরীর আগুনে না পুড়লে কীসে পুড়েছে। সবচেয়ে বড় খটকা হচ্ছে ডাক্তাররা মনে করছেন আয়ানের শরীর আদতে পুড়ে যায়নি। তাহলে কেন তার শরীরে অমন আগুনে পোড়া দগদগে চেহারা হয়েছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে শরীরে কোনও জ¦ালাযন্ত্রণা নেই। ব্যথা নেই। আয়ান পুরোপুরি স্বাভাবিক। তবে ডাক্তাররা চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আয়ানের শরীর থেকে ব্যান্ডেজ খুলে দিতে পারছেন না।
আয়ানের হেঁচকি তোলা মতো শব্দ শুনে ডাক্তার কোদণ্ড তার মুখের কাছে ঝুঁকলেন। নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন, পানি দেব, পানি খাবে ?
আয়ান বলল, কালো মেঘ, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
ডাক্তার ইশারা করলেন। নার্স এগিয়ে এসে আয়ানকে পানি খাইয়েছে। আয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে ডাক্তার কোদণ্ড বললেন, আবারও কি সেই একই স্বপ্ন দেখেছ ?
আয়ান বলল, চারদিক অন্ধকার। কোথাও আলো নেই। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। খুব কষ্ট।
হাসপাতালে আসার পর থেকে আয়ান ঘুমুচ্ছে। মাঝে মাঝে অস্থিরতা নিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠছে। ঘুম থেকে জেগে উঠেই আতঙ্কিত গলায় বলছে, কালো মেঘ। আকাশ ঢেকে ফেলেছে।
বিজ্ঞান একাডেমি থেকে প্রধান বিজ্ঞানী মলি, বিজ্ঞানী তানিয়া আর তরুণ বিজ্ঞানী দিয়া এসেছিল। আয়ানের ঘটনা বিজ্ঞান একাডেমিকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। আয়ান প্রথম শিশু যাকে পিংক রে আক্রমণ করেছে। কিন্তু আয়ানের শরীরে পিংক রেতে আক্রান্ত হওয়ার কোনও লক্ষণ নেই।
বিজ্ঞানী দিয়া বলল, আকাশের গোলাপি মেঘ আর পিংক রে শিশুর ব্রেইনে জটিল ধরনের গল্প তৈরি করেছে। গোলাপি মেঘ কোনও বিশেষ কারণে তাকে অতিরিক্ত আতঙ্কিত করে তুলেছে। যার জন্য সে মেঘ দেখছে কালো।
তানিয়া বললেন, তার অতীত হিস্ট্রি জানা দরকার।
ডাক্তার কোদণ্ড বললেন, সে এখন পর্যন্ত নিজের নাম বলেনি। নাম ঠিকানা জানতে চাইলে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ছে। একই স্বপ্ন বারবার দেখছে। তবে আগের থেকে পরের স্বপ্নের ভয়াবহতা বেশি বলে মনে হচ্ছে।
বিজ্ঞানী মলি বললেন, কোনও অস্বাভাবিকতা দেখলে জানাবেন।
ডাক্তার কোদণ্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এখন দেখা স্বপ্নের কথা তিনি বিজ্ঞান একাডেমিকে জানাবেন। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া বা শ্বাসকষ্ট হওয়ার মতো কোনও ঘটনা ঘটেনি। তার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি স্বাভাবিক। অক্সিজেন স্যাচুরেশন ঠিক আছে। তবু তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। এটা বড় ধরনের অস্বাভাবিকতা।
ডাক্তার বুস্ট এসেছেন। তাকে খবর দিয়ে আনা হয়েছে। তিনি প্রধান চিকিৎসক। বিজ্ঞান একাডেমি থেকে বিজ্ঞানী মলি, তানিয়া আর দিয়া এসেছে। তারা ব্যান্ডেজের ভেতর আয়ানের শরীর দেখছেন। সেখানে পোড়া দগদগে অবস্থা নেই। পুরোপুরি স্বাভাবিক। ডাক্তার বুস্ট ব্যান্ডেজ খুলে দিতে বললেন।
আয়ান স্বপ্ন দেখে জেগে উঠেছে। তার চোখে প্রচণ্ড আতঙ্ক। মনে হচ্ছে সে ভীষণ ভয় পেয়েছে। শুকনো গলায় বলল, পানি, পানি খাব।
নার্স তাকে পানি দিয়েছে। সে গ্লাসের সবটুকু পানি খেয়েছে। স্থির হয়ে বলল, কালো ধোঁয়া। গাছের পাতা মরে যাচ্ছে। গাছ মরে যাচ্ছে। পাখি মরে যাচ্ছে। কাঠবিড়ালি মরে যাচ্ছে। কেউ বাঁচবে না। নদী শুকিয়ে গেছে। পানি নেই। মাঠ ফেটে গেছে।
বিজ্ঞানী মলি বললেন, তার কথাগুলো রেকর্ড করার ব্যবস্থা করুন।
ডাক্তার কোদণ্ড দ্রুত আয়ানের কথাগুলো রেকর্ড করার ব্যবস্থা করে ফেললেন। আয়ান চুপ করে আছে। আর কিছু বলছে না। বিজ্ঞানী মলি বললেন, তুমি স্বপ্নে আর কিছু দেখেছ ?
আয়ান বলল, স্বপ্ন না, ঘটছে। এখন ঘটছে। কেউ বাঁচবে না। মেঘগুলো মেঘ না, ওগুলো কারখানার কালো ধোঁয়া। বাতাস খুব গরম। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। নদীর পানি খুব ঠান্ডা। মাছগুলো মরে গেছে। নদী শুকিয়ে গেছে। বরফ গলে পানি হয়ে যাচ্ছে। সমুদ্র মহাসমুদ্র হয়ে গেছে। সমুদ্রের পানি বেড়ে যাচ্ছে।
বিজ্ঞানী আর ডাক্তাররা ভয়াবহ বিভ্রান্তিতে পড়ে গেলেন। আয়ান একই সঙ্গে প্রচণ্ড গরম আর খুব ঠান্ডার কথা বলেছে। ডাক্তার বুস্ট বললেন, এখুনি ব্যান্ডেজ খুলে ব্রেইনের সিটি স্ক্যান করুন।
বিজ্ঞানী মলি বললেন, রেকর্ডার অন রাখবেন। তার কথাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। সে স্বপ্ন দেখছে নাকি হ্যালুসিনেশন বলতে পারছি না।
আয়ানের ব্রেইনে অদ্ভুত এক অবস্থা দেখা গেল। সুচের আগার মতো অতি চিকন কোনও কিছু। সেটা ধীরে ধীরে এগুচ্ছে। ব্রেইনের যেখানে সেটা দেখা যাচ্ছে তাকে বলা হয় ব্রোকা এরিয়া। মস্তিষ্কের সামনের বাঁয়ে তার অবস্থান। এখানে নিউরনের মাধ্যমে তথ্য প্রক্রিয়া, সরবরাহ আর সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে।
সুচাগ্রের মতো সেটা যে-পথে এগুচ্ছে সেই পথে কিছুক্ষণ পরপর রক্তজমাট বেঁধে থাকার মতো ছোট্ট ক্লট। অবাক হয়ে সবাই সেই সুচাগ্রের এগিয়ে যাওয়া দেখছে। সকলের ভেতর বিস্ময় এবং উত্তেজনা। আগে কখনও এমন ঘটনা তারা দেখেননি। সুচাগ্র ধীর গতিতে সামনে জমাট রক্তের ভেতর প্রবেশ করছে।
কেঁপে উঠেছে আয়ান। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, সতর্ক হও সকলে। এ বিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাবে শিগগিরই। কালো ধোঁয়া ঢেকে ফেলেছে সব। বাতাস শুকিয়ে গেছে। প্রচণ্ড গরম, ভীষণ শীত। কেউ বাঁচব না আমরা। সবাই মরে যাব।
ক্লান্ত হয়ে এসেছে আয়ান। তার কাঁপুনি থেমেছে। অবসন্ন গলায় বলল, পানি খাব।
আয়ানকে পানি দেওয়া হয়েছে। সে শান্তভাবে পানি খাচ্ছে। ডাক্তার আর বিজ্ঞানীরা পরস্পরের দিকে তাকাচ্ছেন। তাদের চোখে অনিশ্চয়তা। আয়ানের ব্রেইনের ব্রোকা এলাকায় যা দেখা গেছে সেটা স্বাভাবিক নয়। সে যা বলছে তাকে নিছক স্বপ্ন বা হ্যালুসিনেশন বলে এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না।
আয়ান বিছানায় আবার পিঠ বাঁকা করে ফেলেছে। ডাক্তার কোদণ্ড বললেন, সুচাগ্র আরেকটি ব্লাড ক্লটে প্রবেশ করছে।
আয়ান এবার শীতল গলায় বলল, তেল পুড়ছে, কয়লা পুড়ছে, গ্যাস পুড়ছে। বন পুড়ছে, মাটি পুড়ছে, মানুষ পুড়ে যাচ্ছে।
ব্লাড ক্লট ছিল ছোট। সুচাগ্র সেখান থেকে বের হয়ে এসেছে। সামনে আরেকটা রক্ত জমাট বাঁধা জায়গা। সুচাগ্র এবার সেখানে ঢুকে গেল। আয়ান বলল, ঝড় হচ্ছে, বৃষ্টি হচ্ছে, জোয়ার হচ্ছে। লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে সবকিছু। কেউ বাঁচবে না। সূর্য থেকে সবাই সরে যাচ্ছে। পৃথিবীকে না বাঁচালে কেউ বাঁচবে না। পৃথিবীকে বাঁচাও।
বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে আয়ান ঘুমিয়ে পড়ল। তার ব্রেইনের ব্রোকা এরিয়াতে কাছাকাছি আর কোনও ব্লাড ক্লট নেই। সূচাগ্র এগুচ্ছে ধীরে। পরের জমাট বাঁধা রক্তের কাছে যেতে তার যথেষ্ট সময় লাগবে।
ডাক্তার বুস্ট বললেন, সাধারণ চিকিৎসার কিছু নেই। তাকে পরীক্ষা করে দেখেছি। সে সম্পূর্ণ সুস্থ। তবে ব্রেইনের ভেতর যা ঘটছে সেটা অস্বাভাবিক। চিকিৎসাবিজ্ঞানের আওতাভুক্ত নয়। বিজ্ঞান একাডেমি সিদ্ধান্ত নেবে এই সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে।
বিজ্ঞানী দিয়া বললেন, আমি অন্য কিছু ভাবছি।
সবাই দিয়ার দিকে তাকালেন। দিয়া বলল, সে যা বলছে তার সঙ্গে গ্রিন হাউজ ইফেক্টের সম্পর্ক আছে। সে বলেছে, সূর্য থেকে সবাই সরে যাচ্ছে। এই সবাই মানে কী ? আবার বলেছে, পৃথিবীকে না বাঁচালে কেউ বাঁচবে না। কেউ মানে কি শুধু পৃথিবীর প্রাণি নাকি অন্য আরও কোনওখানের প্রাণি। যারা পৃথিবীর গ্রিন হাউজ ইফেক্টের কারণে সূর্য থেকে সরে যাচ্ছে। তাই তারা পৃথিবীকে বাঁচাতে বলছে।
ডাক্তার বুস্ট বললেন, আপনার কেন এমন মনে হচ্ছে ?
দিয়া বলল, তার নিউরনে যা দেখলাম তা অস্বাভাবিক। মস্তিষ্কের যে ঘটনা দেখলাম তা অস্বাভাবিক। এমন তো হতে পারে এই পুরো প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে পৃথিবীর বাইরে গ্রহ থেকে।
চিন্তিত চোখে বিজ্ঞানী মলি বললেন, ভিনগ্রহের প্রাণি!
বিজ্ঞানী তানিয়া নাক দিয়ে বাতাস বের করার মতো হালকা শব্দ করে বললেন, ক্লাসে এখন ছেলেমেয়েরা জলবায়ু পরিবর্তন, গ্রিন হাউজ ইফেক্ট সম্পর্কে পড়ছে। তারা যে স্বপ্নে তেমন কিছু দেখবে সেটা অস্বাভাবিক নয়। একজন স্বপ্ন বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে জানা হোক ব্রেইনের কোন অবস্থায় মানুষ কী ধরনের স্বপ্ন দেখে। নিউরনে ব্লাড ক্লটিংয়ের ঘটনা স্পষ্ট হওয়া দরকার।
বিজ্ঞানী মলি বললেন, এই মুহূর্তে সবাইকে জানাতে হবে পিংক রে শিশুকে আক্রমণ করেনি। আকাশে গোলাপি মেঘ দেখা গেলে কেউ যেন শিশুকে নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে না পড়েন। পিংক রে এখন পর্যন্ত কোনও শিশুকে আঘাত করেনি। সকল শিশু পিংক রে থেকে মুক্ত। তবে সবার আগে নিজ সতর্কতা জরুরি।
সিকিউরিটি প্রধান ক্রিস্টিনা হাসপাতালে এসেছেন। তাকে বেশ উত্তেজিত দেখাচ্ছে। তিনি কেবিনে ঢুকেই বললেন, একবার সেই শিশুর সঙ্গে কথা বলতে চাই। তার সন্ধান বের করে ফেলেছি।
ডাক্তার কোদণ্ড বললেন, সে ঘুমুচ্ছে। মাত্রই ঘুমিয়েছে। ভীষণ ক্লান্ত। তার ওপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে।
বিজ্ঞানী মলি বললেন, ক্রিস্টিনা, শান্ত হয়ে বসুন। আমাদের বলতে পারেন আপনি কী জেনে এসেছেন।
ডাক্তার বুস্ট কেবিনের বাইরে মিটিংরুমে সকলের বসার আয়োজন করেছেন। ক্রিস্টিনা বসেননি। তিনি এখনও উত্তেজিত হয়ে আছেন। হাত নেড়ে বললেন, প্রথমে সেই বাসের ড্রাইভারকে ধরেছি। বাসের ড্রাইভার বলেছে রাস্তার পাশ থেকে সে তাকে বাসে তুলে নিয়েছে। তখন আকাশে গোলাপি মেঘ ছিল। বাস ড্রাইভার তাকে উদ্ধার করেছে। পরে গেছি যেখানে সেদিন এক্সিডেন্ট হয়েছিল। বাস থেকে নেমে ছেলে মিসিং হয়ে গেল। প্রত্যেকটি বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করেছি। খুঁজতে খুঁজতে দুজন প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া গেছে। একজন সেই পথের পাশে এক বাড়ির মালিক আর আরেকজন সেদিন সেই বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তি দুই সন্তানের মা রিদা। ঘটনা তার সামনে ঘটেছে। সে ছিল কাচের দরজার পাশে। পিংক রে যখন ছুটে আসে তখন দু জন বাড়ির দিকে দৌড়ে আসছিল। তাদের পেছনে আসছিল একজন শিশু।
ডাক্তার কোদণ্ড মিটিংরুমে ছুটে এসেছেন। অস্থির গলায় বললেন, স্বপ্ন দেখছে। কিছু বলছে।
সবাই আবার আয়ানের বিছানার পাশে চলে এসেছেন। আয়ান বলল, তোমাদের হাতে সময় খুব কম। তোমরা পৃথিবী রক্ষা করে নিজেদের না বাঁচালে আমরা তোমাদের ধ্বংস করে পৃথিবীকে বাঁচাব। পৃথিবী রক্ষা না পেলে আমরা বাঁচব না।
আয়ান আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল তাকে থামিয়ে দিয়ে উত্তেজিত গলায় ক্রিস্টিনা বললেন, তোমার নাম কী ?
এই প্রথম আয়ান তার নাম বলেছে।
ক্রিস্টিনা জানতে চাইলেন, আয়ান, তোমার বাড়ি কোথায় ?
আয়ান বলল, বাসবদি। আমার দাদা এবাদত গায়েন। বাবা ফরহাদ গায়েন। মা কুসুম আর বোন শান্তা।
বলে আয়ান ঘুমিয়ে গেল। ক্রিস্টিনাকে বেশ প্রশান্ত দেখাচ্ছে। তিনি দুই হাত দু পাশে প্রসারিত করে আয়েশের সঙ্গে বললেন, যাক সব মিলে গেছে। আর কোনও জটিলতা নেই। ঘরের ছেলে এখন ঘরে ফিরে যাবে।
বিজ্ঞানী মলি, তানিয়া আর দিয়া গভীর চিন্তা নিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে এল। তারা এখন যাবেন বিজ্ঞান একাডেমিতে। আয়ানের রেকর্ড করা কথা নিয়ে এসেছেন। সেই কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
৭.
সারা দেশে আজ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। প্রধান নগরের সঙ্গে অন্যান্য শহরের যোগাযোগ স্থগিত করেছে নগর কর্তৃপক্ষ। নভোযান স্পেস ডিএম যাচ্ছে মহাকাশে। সেখানে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা পিংক রের উৎস সন্ধান করা হবে।
বিজ্ঞান একাডেমি শুধু জানিয়েছে মহাকাশে এবারের অভিযান সাধারণ নয়, বিশেষ। মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে ছুটে আসা গোলাপি রশ্মির উৎস এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি। মহাকাশে তার সন্ধান আছে কি না বিজ্ঞান একাডেমি জানে না। পৃথিবীর শক্তিশালী টেলিস্কোপে তেমন কিছু ধরা পড়েনি। মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র কেবল অনুমান করছে। তাদের ধারণা এই পিংক রে প্রাকৃতিক নয়, কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর তাই যদি হয় তাহলে যারা কৃত্রিমভাবে এই রে তৈরি করে পৃথিবী ধ্বংস করে দিতে চাইছে তারা মহাকাশে অভিযান মেনে নেবে না। অতএব যে দুজন নভোচারী মহাকাশে যেতে রাজি হয়েছেন তাদের পৃথিবীতে ফেরা অনিশ্চিত। এই অনিশ্চিত ফেরার কথা জেনেই তারা যাচ্ছেন।
পৃথিবীতে বিজ্ঞান একাডেমি আর নেতাদের মত নিয়ে হট্টগোল শুরু হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, বিজ্ঞান একাডেমি দুজন মানুষকে মরণের মুখে ফেলে দিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে।
নিউজ পোর্টাল ঘন ঘন থিয়া আর ক্রিসানার ছবি এবং তাদের জীবনবৃত্তান্ত জানিয়ে খবর পরিবেশন করছে। তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করছে বিজ্ঞান একাডেমি দুজন মেধাবী মানুষকে ইচ্ছে করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। নিউজ পোর্টালে খবর পেয়ে অনেকে বিজ্ঞান একাডেমি আর বিশ্বনেতাদের এহেন সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সোস্যাল মিডিয়ায় নিন্দার ঝড় তুলে দিয়েছে।
কেউ বলছে, মানুষ না পাঠিয়ে মহাকাশ অভিযানে রোবট পাঠানো দরকার ছিল।
অনেকে বলছে, এসব করে মানুষের চোখে ধুলো দেওয়া হচ্ছে। পিংক রে থামানোর বুদ্ধি বিজ্ঞান একাডেমির নেই। তারা মানুষকে ধোঁকা দিয়ে সময় পার করছে।
তাদের ভেতর বিরাট একটি অংশের মানুষ বলেছে, এত টাকা খরচ করে অনিশ্চিত কোনও অভিযানে নভোযান না পাঠিয়ে সেই টাকা পিংক রে থেকে বাঁচার ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য দেওয়া উচিত ছিল।
মহাকাশে পিংক রের উৎস সন্ধানের এই অভিযানের পক্ষে খুব কম মানুষ সাড়া দিয়েছে। বরং মিডিয়া মানুষজনকে আরও ক্ষেপিয়ে তুলেছে। তারা বলেছে কোনও প্রস্তুতি ছাড়া বিশ্বনেতা আর বিজ্ঞান একাডেমি মহাকাশে যুদ্ধের জন্য নভোযান পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে পৃথিবীর অবস্থা আরও নাজুক হয়ে যাবে। বিজ্ঞান একাডেমির ক্ষমতা নেই পৃথিবীকে রক্ষা করার। তারা বোকার মতো অনিবার্য যুদ্ধের ডাক দিয়ে পৃথিবীকে অনিরাপদ করে তুলল।
মিডিয়ার এমন খবর পেয়ে পৃথিবীর মানুষ খেপে উঠেছে। তারা মহাকাশে নভোযান স্পেস ডিএম পাঠানোর বিরোধিতা করছে। আটকে দিতে চাইছে নভোযান স্পেস ডিএম-এর উৎক্ষেপণ।
পুরো নগরজুড়ে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মানুষের চলাচল সীমিত হয়ে গেছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে বাড়ি থেকে বের হতে দেওয়া হচ্ছে না।
বাসবদিতে খবর এসে পৌঁছেছে আয়ানের সন্ধান পাওয়া গেছে। সে সুস্থ আছে। তাকে নগর প্রধান হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যার ভেতর রাখা হয়েছে। শিগগিরই তাকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে।
শান্তা প্রধান নগরে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু প্রধান নগরে যাওয়া-আসার সমস্ত ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় যেতে পারেনি।
এবাদত গায়েন নিউজ পোর্টালের সামনে বসে আছেন। তিনি মাঝে-মাঝে দম ফেলে বলছেন, আজ কোথাও যাসনে। থিয়াকে দেখাবে মনে হয়। আহা কী সুন্দর মানুষ। কী সুন্দর তার মন। আহা, পৃথিবীকে বাঁচাতে মেয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে যাচ্ছে।
এবাদত গায়েনের চোখে পানি চলে এসেছে। তিনি কাঁদছেন। চোখ মুছলেন। তাতে কোনও লাভ হলো না। চোখ উপচে আবার পানি চলে এল।
থিয়া এসেছে সামনে। তার পাশে ক্রিসানা। থিয়া হাত নাড়ছে। পৃথিবীর মানুষদের কাছ থেকে সে বিদায় নিচ্ছে। এবাদত গায়েন হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। শান্তা তাকে জড়িয়ে ধরে আছে। তিনি কান্না থামাতে পারছেন না।
ক্রিসানা কথা বলছে। ক্রিসানাকে দেখে মনে হলো সে থিয়ার থেকে বয়সে বছর দশেকের বড় হবে। বিয়াল্লিশ বছর বয়স হলেও তাকে দেখে থিয়ার সমবয়সী মনে হচ্ছে। ক্রিসানা বলল, পৃথিবীর মানুষ, আপনারা রইলেন। আমরা চললাম। জানি না ফিরে আসতে পারব কি না। তবে মরতে যদি হয় তাহলে পিংক রে কোথা থেকে আসছে তার সন্ধান বের করতে পারলে সেই উৎস ধ্বংস করেই মরব।
এবাদত গায়েন আবার শব্দ করে কেঁদে উঠেছেন। শান্তা বলল, দাদা এত কান্নাকাটি করলে তাদের কথা তো কিছুই শুনতে পাব না।
কাঁদতে কাঁদতে এবাদত গায়েন বললেন, তাদের জন্য কষ্ট হয়। মানুষ এত ভালো! ভালো মানুষের ভালোবাসা দেখে শান্তিতে চোখ ভিজে আসে। কান্না পায়।
শান্তা বলল, তোমার আদরের থিয়া কথা বলছে। এবার তার কথা শোনো।
থিয়ার মুখে নির্মল হাসি। তাকে অপূর্ব দেখাচ্ছে। এবাদত গায়েন কান্না বন্ধ করতে পারলেন না। তার চোখ উপচে পানি চলে এসেছে। পানি গড়িয়ে পড়ছে গালে। তিনি কাঁদতে কাঁদতে শুনলেন থিয়া বলছে, আমরা ফিরে আসব। পৃথিবীকে যারা ধ্বংস করতে চায় তাদের মোকাবিলা করেই ফিরে আসব। আমরা শুধু দুজন নই। আপনারা আছেন পৃথিবীর সাড়ে সাতশ কোটি মানুষ আমাদের সঙ্গে। আমরা যখন একসঙ্গে আছি তখন কোনও শক্তি আমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। পৃথিবীতে ফিরব বলেই মহাকাশে রওনা হচ্ছি।
তারপর থিয়া কী বলেছে তা এবাদত গায়েনের কান্নার আওয়াজে শোনা গেল না। এবাদত গায়েন হাউহাউ করে কাঁদছেন আর বলছেন, মা, আমার মা। ও মা।
পৃথিবীর মানুষ যারা এই মহাকাশ অভিযানের বিপক্ষে ছিল তারা থিয়ার কথা শোনার পর আর বিপক্ষে রইল না। সকলে হইহই করছে। তারা থিয়া আর ক্রিসানাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। পৃথিবীর জন্য তাদের ভালোবাসার প্রশংসা করছে। পুরো পৃথিবীর মানুষ শিগগিরই ভালো কোনও খবর শোনার প্রত্যাশা নিয়ে ঘরে ফিরে গেল।
বাড়ির বাইরে খটখট শব্দ হচ্ছে। খবিরউদ্দিনের ক্রাচের শব্দ। খবিরউদ্দিন আসছে। শান্তা ঘর থেকে বের হয়েছে। বের হয়েই সে খবিরউদ্দিনের মুখোমুখি হলো। খবিরউদ্দিনের মুখে বিস্ময় আর আনন্দ মিশে আছে। শান্তাকে দেখে খবিরউদ্দিন বলল, ও শান্তা, ঘটনা কি সত্য! লোকমুখে শুনলাম, যে মেয়ে আজ মহাকাশে গেল সে এসেছিল তোমাদের বাড়িতে। সে-ই নাকি তোমাকে আর আয়ানকে নিয়ে গিয়েছিল নগরে!
শান্তা বলল, ঘটনা সত্য। আপনি ঠিক শুনেছেন।
খবিরউদ্দিনকে বসতে দেওয়া হয়েছে। সে বসে আছে এবাদত গায়েনের সামনে। খবিরউদ্দিনকে দেখে এবাদত গায়েনের কান্না বন্ধ হয়েছে। তার মেজাজ খারাপ লাগছে। এই লোক যখনই আসে তখন কোনও যন্ত্রণা সঙ্গে নিয়ে আসে। এখন কোন যন্ত্রণা সঙ্গে নিয়ে এসেছে বুঝতে পারছেন না।
খবিরউদ্দিন বলল, শুনলাম আয়ানকে মহাকাশে নিয়ে গেছে। তাকে নিয়ে যাবে বলেই এত ঘটনা ঘটিয়েছে। তা না হলে অত বড় মানুষ এখানে কেন আসবে ?
এবাদত গায়েন বললেন, খবিরউদ্দিন শোনো, শোনা কথায় বিশ্বাস করবে না। আয়ান আছে নগর প্রধান হাসপাতালে। তার সংবাদ গতকাল আমাকে দেওয়া হয়েছে। সে ভালো আছে।
কিছুটা আমতা আমতা করে খবিরউদ্দিন বলল, আপনাকে কি আয়ানের সঙ্গে দেখা করিয়েছে, ভিডিও কলে ?
এবার এবাদত গায়েন থমকে গেলেন। আয়ানকে ভিডিও কলে তার সঙ্গে দেখা করানো হয়নি।
কঠিন গলায় শান্তা বলল, আয়ানকে মহাকাশে নিয়ে গিয়ে কী করবে ?
খবিরউদ্দিন বলল, মহাকাশ গবেষণায় অনেক কিছু দরকার হয়। লাইকার নাম শুনেছ ? ঘেউ ঘেউ করে। রাশিয়ান কুকুর। তাকে সোভিয়েত নভোযানে মহাকাশে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরীক্ষার জন্য। আয়ানকে কী পরীক্ষার জন্য নিয়ে গেছে তা লোকজন কিছু বলেনি। তবে তাকে যে নিয়ে গেছে সে বিষয়ে নিশ্চিত।
শান্তা বলল, যখন নিউজ পোর্টালে থিয়া আর ক্রিসানাকে দেখাচ্ছিল তখন সেখানে কি আয়ানকে দেখা গেছে ?
খবিরউদ্দিন বলল, কেউ কেউ তো নিশ্চয়ই দেখেছে। তা না হলে বলছে কেন! মানুষ তো আর বানিয়ে কোনও কথা বলবে না।
এবাদত গায়েনের বিরক্ত লাগছে। তিনি বিরক্ত মুখে বললেন, খবির তুমি এখন যাও। আমার বিশ্রামের প্রয়োজন।
খবিরউদ্দিন উঠতে উঠতে বলল, নিজের কথা বলছি না। লোকমুখে শুনেছি তাই বললাম।
এবাদত গায়েন বললেন, আগামীকাল সকালে শান্তা নগরে যাচ্ছে। সে আয়ানকে সঙ্গে নিয়ে বাসবদি আসবে। তুমি এসে দেখা করে যেয়ো।
খবিরউদ্দিন আর কিছু না বলে ক্রাচে খটখট শব্দ তুলে চলে গেল।
নভোযান স্পেস ডিএম উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। নভোযানে আছে থিয়া আর ক্রিসানা। বিজ্ঞানী আর বিভিন্ন দেশের নেতারা বিজ্ঞান একাডেমির বিশাল এক হলঘরে বসে আছেন। সেখান মনিটরে স্পেস ডিএম-এর গতিপথ দেখা যাচ্ছে।
বিজ্ঞান একাডেমি মানুষকে রক্ষার জন্য কাজ করছে তা প্রচার করার জন্য এই ঘটনা কিছুক্ষণ আগে পৃথিবীর সকল নিউজ পোর্টালে সরাসরি দেখানো হয়েছে। সাংবাদিকদের জানানো হয়েছে, নির্দিষ্ট সময় পরপর তাদের ধারাবাহিকভাবে নভোযানের গতিবিধি ও অবস্থান সম্পর্কে অবগত করা হবে।
বিজ্ঞানী আর নেতারা আগ্রহ নিয়ে হলরুমের বিশাল মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছেন। স্পেস ডিএম সুন্দরভাবে ছুটে যাচ্ছে মহাকাশে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে খুব শিগগিরই পিংক রে সৃষ্টির রহস্য জানা যাবে। মনে প্রশান্তি নিয়ে বিশ্ব নেতারা ফিরে গেলেন। বিজ্ঞান একাডেমিও নির্ভার মনে খানিকটা নিশ্চিত থাকলেন। পিংক রে সমস্যার সমাধান তারা করে ফেলতে পারবেন। এখন শুধু দরকার সবকিছু ঠিকঠাক থাক।
সবকিছু ঠিক থাকল না। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে বিজ্ঞান একাডেমির মনিটরে দেখা গেল এক ভয়াবহ ঘটনা। স্পেস ডিএম নিজস্ব গতি হারিয়ে প্রবলবেগে ছুটে যাচ্ছে সামনের দিকে। সামনে নীল তিমির মতো কিছু বিশাল হা করে আছে। কোনও স্পেস টেলিস্কোপে আকাশে নীল তিমির মতো এমন কিছুর উপস্থিতি আগে দেখা যায়নি। স্পেস ডিএম সেই নীল তিমির খোলা মুখের ভেতর ঢুকে গেল। তারপর সবকিছু স্বাভাবিক। যেন কোথাও কিছু ঘটেনি।
৮.
অজানা গহ্বরের ভেতর নভোযান স্পেস ডিএম ঢুকে হারিয়ে যাওয়ার কথা বিজ্ঞান একাডেমি কাউকে জানতে দিল না। তারা কড়া নিরাপত্তায় সেই ঘটনা নিজেদের ভেতর রেখে দিয়েছে। পৃথিবীর নেতারাও এ সম্পর্কে কিছু জানে না। বিজ্ঞান একাডেমি প্রথমে নিজেরা নিশ্চিত হতে চায় ঘটনা কী ঘটেছে সে ব্যাপারে। নিশ্চিত না হয়ে কিছু বললে তা থেকে নানা কথার ডালপালা ছড়াতে থাকবে। তখন কাজ করতে অসুবিধা হবে।
মিডিয়া সবসময় কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চায়। স্পেস ডিএম থেকে নজর সরিয়ে মিডিয়াকে ব্যস্ত রাখার ব্যবস্থা বিজ্ঞান একাডেমি করে ফেলেছে। বাসবদি থেকে শান্তা এসেছে। হাসপাতাল থেকে আয়ানকে নিয়ে আসা হয়েছে। তারা এখন আছে থিয়ার বাড়িতে। তাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য মিডিয়াকে উন্মুক্ত অনুমতি দেওয়া হয়েছে। মিডিয়া স্পেস ডিএম-এর কথা ভুলে গিয়ে আয়ানকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
অনলাইন নিউজ চ্যানেলে আয়ানের সাক্ষাৎকার প্রচারিত হচ্ছে। একজন সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করল, তোমার দিকে যখন পিংক রে ছুটে এল তখন তোমার কেমন লাগছিল ?
আয়ান বলল, পিংক রে ছুটে আসা আমি দেখিনি। রেল স্টেশন থেকে বের হয়ে গোলাপি মেঘ দেখেছিলাম। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ভয় পেয়ে সেখান থেকে দৌড়ে কোথাও যেতে চাইছিলাম। কিন্তু পিংক রে আমি দেখিনি। ঘটনার সময় আমার সামনে দুজন মানুষ ছিলেন। তাদের তখন কষ্ট হচ্ছিল। সেই দুজন মানুষকে বাঁচানোর জন্য তাদের দিকে ছুটে যাচ্ছিলাম।
সেই সাংবাদিক বলল, কিন্তু তোমার পুরো শরীর আগুনে পুড়ে গিয়েছিল। বজ্রপাতের মতো আগুন। তুমি পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছিলে। তারপর তোমার পুরো শরীর দগদগে লাল হয়ে গেছে। তাতে তোমার খুব যন্ত্রণা হওয়ার কথা। তুমি ঘাসের ওপর শুয়ে ঘুমিয়ে গেলে! কী হয়েছিল তোমার ? অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে ?
আয়ান শান্ত গলায় জানতে চাইল, আপনি সেখানে ছিলেন ?
সাংবাদিক বিব্রত হয়েছে। সে বলল, না মানে, আমি ছিলাম না, যারা ছিলেন তারা বলেছেন।
আয়ান বলল, কোনও আগুন এসে আমাকে পুড়িয়ে দেয়নি। বাস থেকে নেমে দৌড়ে যাচ্ছিলাম। অনেক জোরে দৌড়ে তখন আমি ক্লান্ত ছিলাম। তাই সেখানে ঘুমিয়ে পড়েছি।
সাংবাদিকরা আয়ানকে আরও প্রশ্ন করতে চাইছিল। ডাক্তার কোদণ্ড আর সিকিউরিটি অফিসার ক্রিস্টিনা নতুন আর কোনও প্রশ্ন করতে দিলেন না। ক্রিস্টিনা বললেন, তদন্তের স্বার্থে তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টের জিজ্ঞাসাবাদ হয়ে গেলে আপনারা আবার তার ইন্টারভিউ নেবেন।
ডাক্তার কোদণ্ড বললেন, সার্বক্ষণিক আয়ানের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হচ্ছে। তার স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর তাকে প্রশ্ন করবেন।
সাংবাদিকরা আয়ানকে ছেড়ে দিয়েছে। আয়ানের সঙ্গে শান্তা চলে গেছে। তবে সাংবাদিকরা সিকিউরিটি অফিসার ক্রিস্টিনা আর ডাক্তার কোদণ্ডকে ছাড়লেন না। ডাক্তার কোদণ্ড হাসপাতালে পুরোটা সময় আয়ানের সঙ্গে ছিলেন। ক্রিস্টিনা খুঁজে বের করেছেন আয়ান সেদিন কোথা থেকে কোথায় গেছে।
বিজ্ঞান একাডেমি থেকে দিয়া সেখানে ছিল। সে সাংবাদিকদের আর আয়ানের খেয়াল রাখছিল। ক্রিস্টিনা আর ডাক্তার কোদণ্ডকে দিয়া বলল, আয়ান আর শান্তাকে নিয়ে আমরা ভেতরে আছি। ডাক্তার বুস্ট আসছেন। বিজ্ঞানী মলি আর তানিয়াও থাকবেন। আপনারা যতক্ষণ পারেন মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলুন। হাসপাতালে আয়ানের স্বপ্ন দেখার কথা বেশি বেশি বলুন। স্বপ্ন দেখে আয়ান কী কী জানিয়েছে বিস্তারিত বলবেন। পিংক রে যেদিন ছুটে এল, আয়ান মিসিং হলো সেদিনের কথা সব বলুন। কোথা থেকে আয়ান কোথায় গেল। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গার দূরত্ব। স্বাভাবিক সময়ে সেখানে যেতে কতক্ষণ সময় লাগে। আয়ান কত সময়ে সেখানে গেছে সব ইন ডিটেইলস মিডিয়াকে জানান।
দিয়া চাইছে মিডিয়া এসব নিয়ে অধিক সময় ব্যস্ত থাকুক।
থিয়ার মা আমান্দা মুন নিজ বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে আছেন। বিজ্ঞান একাডেমির প্রধান বিজ্ঞানী মলি, বিজ্ঞানী তানিয়া, দিয়া, ডাক্তার বুস্ট আছে এই ঘরে। তারা একসঙ্গে কিছুক্ষণ আয়ান আর শান্তার সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন। আয়ান আর শান্তাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে।
শান্তা বিজ্ঞানী মলিকে জানিয়েছিল তাদের দাদার সঙ্গে আয়ানের ভিডিও কলে দেখা করাতে। এবাদত গায়েনকে ভিডিও কল করা হয়েছে। ওপাশে শুধু এবাদত গায়েনকে দেখা গেল না। তার সঙ্গে খবিরউদ্দিনকেও দেখা গেছে। খবিরউদ্দিন শুকনা মুখে বসে আছে।
আয়ানকে দেখে এবাদত গায়েন ‘দাদুভাই’ বলে জোরে কেঁদে উঠলেন। আয়ান বলল, তুমি কেঁদো না, দাদা। আমরা আসছি।
ভিডিও কলে মরিয়ম চাচিকে দেখা যাচ্ছে। মরিয়ম চাচিও আয়ানকে দেখে কান্নাকাটি শুরু করেছেন। শান্তা বলল, চাচি কান্নাকাটির কিছু হয়নি। আমার শিগগিরই বাড়ি চলে আসছি।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে খবিরউদ্দিন জোরে হাউমাউ শব্দে কান্না শুরু করল। শান্তা কিংবা আয়ান বুঝতে পারছে না খবিরউদ্দিন কেন কাঁদছে। সে কাঁদতে কাঁদতে তার পোড়া পা ওপরে তুলে নাচাচ্ছে আর বলছে, আজ যদি গোলাপি রশ্মি এসে আমার এই পা পুড়িয়ে না দিত তাহলে শান্তার সঙ্গে গিয়ে আয়ানকে নিয়ে আসতে পারতাম। কর্তৃপক্ষ আমার পায়ের দিকে নজর দিল না। আমি অসহায় একজন মানুষ গোলাপি রশ্মিতে পুড়ে পঙ্গু হয়ে কর্মহীন হয়ে পড়লাম। সংসার চালানো এখন কষ্টের হয়ে গেছে। কর্তৃপক্ষের সাহায্য পাব কি না জানি না।
শান্তা ভিডিও কল অফ করে দিয়েছে। খবিরউদ্দিন আরও কী বলছিল তা শোনা গেল না।
দিয়া কিছুক্ষণ রুমে ছিল না। সে রুমে ফিরে এসেছে অস্থির অবস্থায়। স্থিরভাবে কোথাও বসতে পারছে না। ঘরের ভেতর হাঁটাহাঁটি করছে। বিজ্ঞান একাডেমির প্রধান বিজ্ঞানী মলি শান্ত চোখে দিয়ার দিকে তাকালেন। দিয়া কিছু বলেনি। মলি বুঝতে পারছেন না আচমকা দিয়ার কী হলো! সে এরকম করছে কেন ?
আয়ান আর শান্তার দিকে তাকিয়ে বিজ্ঞানী মলি বললেন, তোমরা কয়েক দিন আমান্দা মুনের কাছে থেকে যেতে পারলে ভালো হয়। আয়ানের দেখা স্বপ্নগুলো আমরা ভালোভাবে বিশ্লেষণ করেছি। আমাদের মনে হয়েছে স্বপ্ন দেখে আয়ানের বলা কথার সঙ্গে পিংক রের সম্পর্ক আছে। কী সম্পর্ক সেটা এখনও বের করা সম্ভব হয়নি। তার জন্য সময় লাগবে।
আয়ান কিংবা শান্তা কিছু বলল না। আমান্দা মুন বললেন, আশা করি এখানে তোমাদের যত্নের কোনও অভাব হবে না।
শান্তা বলল, আমার এখানেই থেকে যেতে ইচ্ছে করছে।
আয়ান বলল, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি এখানেই থাকব।
সবাই ভীষণ খুশি হয়েছে।
দিয়া দাঁড়ানো অবস্থা থেকে বসে পড়েছে। বসেছে খানিক শব্দ করে। যেন শরীর ছেড়ে দিয়ে বসল। সবাই দিয়ার দিকে তাকিয়েছে। দিয়া বলল, তাহলে তারা দুজন এখানে থাকুক। চলুন আমরা একাডেমির রুমে যাই।
ডাক্তার বুস্ট গম্ভীর গলায় বললেন, আয়ানের ব্রেইনে যা দেখা গিয়েছিল সেটা নিয়েও গবেষণার দরকার আছে। সময় প্রয়োজন। তাদের কিছুদিনের জন্য এখানে থাকতে হবে।
শান্তা বলল, আমরা আজ বাড়ি যাব। বাসবদি। দাদার সঙ্গে দেখা করব। সেখানে কয়েক দিন থাকব। দাদা আবার সিনিয়র সিটিজেন হোমে চলে যাবেন। তখন আমরা এখানে চলে আসব। থিয়া এসে দেখবে আমরা এখানে আছি।
কথাগুলো বলে শান্তা সুন্দরভাবে হাসল। সবাই চুপচাপ বসে আছে। আয়ান এখন চলে গেলে তাদের কী অসুবিধা হতে পারে তাই ভাবছে।
দিয়া তাড়াতাড়ি বলল, আপনারা অনুমতি দিলে তাদের বাসবদি যাওয়ার ব্যবস্থা করি। আমাদের এখন নভোযান স্পেস ডিএম-এর দিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার। মিডিয়াকেও বেশি সময় আটকে রাখা যাবে না। বিশ্বনেতারাও হইচই শুরু করে দেবে শিগগিরই। থিয়া আর ক্রিসানার কী হয়েছে আমরা জানি না।
আয়ান আর শান্তাকে বাসবদি যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞানী মলি বুঝতে পারছেন ঘটনা কিছু ঘটেছে। তাদের শিগগিরই বিজ্ঞান একাডেমিতে যাওয়ার দরকার। আমান্দা মুনের দিকে তাকিয়ে মলি বললেন, তারা যাওয়ার আগে আপনি যদি আলাদাভাবে তাদের নিয়ে কিছুক্ষণ সময় কাটান তাহলে তারা ফিরে যাওয়ার আগে ভালো বোধ করবে।
আমান্দা মুন উঠে পড়েছেন। তিনি শান্তা আর আয়ানকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির ভেতর চলে গেলেন। বাড়ির পেছনে মন ভালো করার মতো সুন্দর লন আছে। সেখানে তাদের নিয়ে গিয়ে খানিকক্ষণ গল্প করবেন।
বিজ্ঞানী মলি তখন দিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, কী হয়েছে! ছটফট করছ কেন অমন ?
দিয়া বলল, স্পেস টেলিস্কোপ থেকে বিশেষ সিগন্যাল পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে সিগন্যাল এসেছে নভোযান স্পেস ডিএম থেকে। সিগন্যাল স্থায়ী হচ্ছে না। এসেই সিগন্যাল বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
বিজ্ঞানী তানিয়া বললেন, আর কিছু জানা গেছে ?
দিয়া বলল, আমাদের এখুনি একাডেমিতে যাওয়া জরুরি।
তানিয়া বললেন, সেটাই উচিত। থিয়া কিংবা ক্রিসানা স্পেস ডিএম থেকে বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করতে পারে। আবার কেউ যদি এর ভেতর স্পেস ডিএম-এর দখল নিয়ে থাকে তারাও সিগন্যাল পাঠাতে পারে।
বিজ্ঞানী মলি কিছুটা রাগী গলায় বললেন, তোমার কী মনে হচ্ছে, তানিয়া!
শান্ত গলায় তানিয়া বলল, অন্য গ্রহের প্রাণি স্পেস ডিএম-এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে সেটা বলেছি। মহাকাশ দস্যু আক্রমণ করে মোটা অংকের মুক্তিপণ দাবি করবে। মিডিয়াকে সামলানো মুশকিল হয়ে যাবে। আমাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকার দরকার আছে।
দুই সন্তানকে নিয়ে রিদা এসেছে। সে কিছুক্ষণ আগে নিউজ পোর্টালে আয়ানকে দেখেছে। নিউজ চ্যানেলে যোগাযোগ করে আমান্দা মুনের বাড়ির ঠিকানা সংগ্রহ করেছে।
রিদা এসে উত্তেজনায় ছটফট করতে করতে বলল, আয়ান কোথায় ? সেদিন যখন আকাশ থেকে পিংক রে ছুটে আসছিল তখন ঘরের ভেতর থেকে আয়ানকে আমি দেখেছি। তাকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য ইমার্জেন্সিতে ফোন করতে বলেছিলাম।
ছটফট করছে রিদা। তার ছেলেমেয়ে দুজনও অস্থির হয়ে গেছে আয়ানকে দেখার জন্য। তারা ভেবেছিল আয়ানের সঙ্গে তাদের আর কোনওদিন দেখা হবে না। আয়ান ফিরে এসেছে শুনে তাকে আপনজন বোধ হচ্ছে।
রিদার তখন তখুনি আয়ানকে দেখতে আমান্দা মুনের বাড়ির ভেতরে যাওয়া সহজ হলো না। নিউজ পোর্টালের সাংবাদিকরা তাকে আর তার দুই সন্তানকে ছেকে ধরল। তারা কখন কীভাবে কোথায় আয়ানকে দেখেছে। আয়ান কীভাবে সেখানে আসছিল। এসে কী করল ইত্যাদি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানতে চাইছে।
বিজ্ঞানী মলি, তানিয়া আর দিয়া বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দেখতে পেয়েছে রিদা হাত নেড়ে নেড়ে প্রবল উৎসাহ নিয়ে নিউজ চ্যানেলের কাছে আয়ানকে দেখার কথা বলে যাচ্ছে। সঙ্গে তার দুই ছেলে মেয়ে কার আগে কে কী বলবে তাই নিয়ে অস্থির হয়ে গেছে। তিনজনই কী দেখেছে সেটা আগে বলতে চাইছে।
তাদের পাশ কাটিয়ে আমান্দা মুনের বাড়ি থেকে বের হয়ে বিজ্ঞানী মলি, তানিয়া আর দিয়া বিজ্ঞান একাডেমিতে চলে গেলেন। সাংবাদিকরা রিদা আর তার দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে এত ব্যস্ত ছিল যে তারা বিজ্ঞানীদের চলে যাওয়া খেয়াল করল না।
৯.
থিয়া আর ক্রিসিনার সামনে আচমকা সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল। নভোযান এভাবে অন্ধকার হয়ে যাওয়ার সুযোগ নাই। পৃথিবী ছেড়ে ৭৬ মিলিয়ন কিলোমিটার পথ অতিক্রম করার পর স্পেস ডিএম-এর নিয়ন্ত্রণ আর তাদের কাছে থাকল না। তারা নির্দিষ্ট গতিপথ থেকে ছিটকে পড়েছে। হঠাৎ নভোযানের গতি বেড়ে গেছে। যে কোনও সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
ক্রিসানা দ্রুত নভোযানের সবকিছু পরীক্ষা করেছে। কোথাও কোনও ত্রুটি নেই। থিয়ার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। আতঙ্কে তার দুই চোখ বড় হয়ে আছে। মনে হচ্ছে এখুনি চোখ দুটা কোটর থেকে ছিটকে বের হয়ে আসবে। নিচের ঠোঁট ঝুলে পড়েছে। সে হতভম্ব হয়ে স্থির চোখে কন্ট্রোল প্যানেলের দিকে তাকিয়ে থাকল। তার চোখে পলক পড়ছে না। তাদের নভোযান স্পেস ডিএম পৃথিবীর রাডার থেকে বিছিন্ন হয়ে পড়েছে। স্পেস টেলিস্কোপে তাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না।
ঝাঁকুনি খেয়ে থিয়া নড়ে উঠেছে। ক্রিসানা বলল, কী হয়েছে ?
থিয়া বলল, কীভাবে হয়েছে জানি না। তবে আমরা বিছিন্ন হয়ে গেছি। এখন বড় কোনও ঘটনা ঘটলেও পৃথিবীর মানুষ তা জানতে পারবে না।
ক্রিসানা বলল, কমিউনিকেশন মডিউল।
থিয়া আরও একবার পরীক্ষা করে বলল, কাজ করছে না। সমস্ত সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কিন্তু এরকম হওয়ার কথা ছিল না।
ক্রিসানা বলল, কোথাও কোনও ত্রুটি নেই। ত্রুটি যদি না থাকে তাহলে নভোযান ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশংকা নাই।
থিয়া বলল, তুমি কি খেয়াল করেছ আমরা অন্ধকারে আছি। নভোযান অন্ধকার হয়ে যাওয়ার কথা নয়।
ক্রিসানার মনে হলো এটা বৃহৎ আকারের সংকট। কিন্তু কোন ত্রুটির জন্য নভোযান অন্ধকার হয়ে গেছে তা খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারা দুজন নভোযানে এত অভ্যস্ত যে অন্ধকারে কাজ করতে তাদের অসুবিধা হচ্ছে না।
থিয়া বলল, কন্ট্রোল প্যানেল অন্ধকার হয়ে আছে। বুঝতে পারছি না আমরা এখন কোন দিকে যাচ্ছি। নভোযানের গতি কত!
ক্রিসানা বলল, অথচ মহাকাশে এমন কোনও গহ্বরের খবর আমাদের কাছে নেই যেখানে প্রবেশের পর ধ্বংস হয়ে না গিয়ে মহাকাশযান অন্ধকার হয়ে যাবে।
মনিটর বন্ধ হয়ে আছে। বাইরের অবস্থা দেখার জন্য দুজন একসঙ্গে ইমার্জেন্সি উইন্ড শিল্ডের ঢাকনা সরিয়ে বাইরে তাকাল। বাইরে তাকিয়ে তারা চমকে গেছে।
নভোযানের সামনে বিশাল কিছু হা করে আছে। দেখতে অনেকটা সমুদ্রের নীল তিমির মতো। মহাকাশে নীলতিমির মতো দেখতে এমন কিছু আছে বলে তাদের জানা নেই। স্পেস ডিএম সেই নীল তিমির মতো মুখ খোলা বিশাল হা-য়ের ভেতর ঢুকে গেল। তখুনি নভোযানের সব আলো জ¦লে উঠেছে। মনিটরে বাইরের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। বাইরে জমাট অন্ধকার। কোথাও কোনও আলো নাই। নভোযানের গতি নির্ধারক কাঁটা শূন্যতে স্থির হয়ে আছে। তার মানে নভোযান চলছে না। ল্যান্ডিং স্পেস ছাড়া মহাশূন্যে নভোযান কীভাবে ভেসে আছে তা থিয়া কিংবা ক্রিসানা বুঝতে পারল না।
তন্ন তন্ন করে তারা দুজন নভোযানের কন্ট্রোল প্যানেল পরীক্ষা করল। সবকিছু ঠিক আছে। কেবল রাডার থেকে কোনও সংকেত পাওয়া যাচ্ছে না। কমিউনিকেশন মডিউল চালু হয়েছে। তবে পুরোপুরি সক্রিয় হয়নি। কমিউনিকেশন মডিউল ব্যবহার করে পৃথিবীতে বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করল। বার্তা পাঠাতে পারল না। কানেকশন স্থির হচ্ছে না।
ক্রিসানা বলল, সম্ভাব্য ঘটনা কী কী হতে পারে ?
থিয়া বলল, আমরা দুজন ঘুমিয়ে আছি। একসঙ্গে আতঙ্কিত হয়ে ওঠার মতো স্বপ্ন দেখছি।
তুমি কি যথেষ্ট শিশুদের মতো কথা বলছ না ?
নভোযানে যখন কোনও ত্রুটি দেখা যাচ্ছে না। যখন নভোযান আমাদের নিয়ন্ত্রণে নাই তখন শিশুর মতো কথা ছাড়া অন্য কিছু মনে আসছে না।
আর কিছুই মনে আসছে না ?
থিয়া বলল, আসছে। ক্ষুধা পেয়েছে। মনে হচ্ছে কিছু খেতে হবে। ব্রেইনে অক্সিজেন কমে গেলে চিন্তাভাবনা করা যায় না। খেয়ে ব্রেইনে অক্সিজেন পাঠিয়ে চিন্তা করে তারপর জানাচ্ছি।
ক্রিসানা বলল, তুমি বড্ড বেশি হেঁয়ালি করছ।
থিয়া কিছু বলল না। তার সত্যি ক্ষুধা পেয়েছে। প্রবল উত্তেজনা কমে আসার পর ক্ষুধা বোধ হচ্ছে। যখন বুঝেছে তাদের কিছু করার নেই তখন শরীর বিশ্রাম চেয়েছে। শরীর বিশ্রাম চাইতেই কিছু খেতে ইচ্ছে হয়েছে।
ক্রিসানা অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল থিয়া নিশ্চিন্ত মনে খাবার খাচ্ছে। যেন কিছু হয়নি। সবকিছু ঠিক আছে। যেন উইক এন্ডে তারা দু’জন তাদের লিভিংরুমে বসে আছে। বসে বসে রিল্যাক্স মুডে গল্প করছে আর খাবার খাচ্ছে। থিয়াকে শিশুর মতো দেখাচ্ছে।
থিয়া বলল, কোনও কারণ ছাড়া কিছু ঘটে না, তুমি জানো। এই যে আমরা আটকা পড়ে গেছি, তার কারণ আছে। পৃথিবীর এত কাছে মহাশূন্যে কোনও টার্বুলেন্স আছে আমরা তার খবর জানি না এমন হতেই পারে না। তার মানে ঘটনা প্রাকৃতিকভাবে ঘটেনি।
বুকের ভেতর আটকে রাখা বাতাস ছেড়ে দেওয়ার মতো আওয়াজ করে ক্রিসানা বলল, তাহলে!
থিয়া বলল, তুমি আমার সঙ্গে কিছু খাও তাহলে বলব।
ক্রিসানা বলল, তুমি আবার হেঁয়ালি করছ।
থিয়া বলল, তুমি বলেছিলে আমরা আর পৃথিবীতে ফিরব কি না জানা নাই। যদি পৃথিবীতে আর না ফিরি, নভোযানের কমিউনিকেশন মডিউল কাজ করছে না, তাতে আমার এই হেঁয়ালির কথা বিজ্ঞান একাডেমি জানতে পারবে না। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হেঁয়ালি করার ভেতর আনন্দ আছে। নরম বালিশে মাথা দিয়ে ঘুমানোর মতো আরাম বোধ হয়।
ক্রিসানা উঠে গিয়ে নিজের জন্য খাবার নিয়ে এল। তার মন ভার হয়ে আছে। সে এই সংকটের কোনও সমাধান খুঁজে পাচ্ছে না। খাবার মুখে দিয়ে মনে হলো তারও ক্ষুধা লেগেছিল। সে বেশ খানিকটা খাবার খেয়ে ফেলল।
থিয়া বলল, ঘটনা ঘটেনি। ঘটনা ঘটানো হয়েছে। আমার ধারণা আমরা ঠিক জায়গায় আছি। যারা পৃথিবীকে ধ্বংস করে দিতে চাইছে তারা আমাদের আটকে ফেলেছে।
ক্রিসানা মুখের খাবার গিলে নিয়ে বলল, তুমি এতটা নিশ্চিত হয়ে বলছ কীভাবে ? অন্য কেউ আমাদের পথ ঘুরিয়ে দিতে পারে। তাদের খারাপ কোনও উদ্দেশ্য আছে হয়তো।
থিয়া বলল, সেই অন্য কেউ হোক আর পৃথিবী যারা ধ্বংস করতে চাইছে তারা হোক―আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। নাহলে এতক্ষণ নভোযান ধ্বংস করে দিত। এখন আমাদের একমাত্র কাজ হচ্ছে তাদের জন্য অপেক্ষা করা।
কমিউনিকেশন মডিউল পুরোপুরি চালু হয়ে গেছে। সেখান থেকে মৃদু আওয়াজ আসছে। ক্রিসানা আর থিয়া উঠে কমিউনিকেশন মডিউলের সামনে গিয়ে বসল। পৃথিবী থেকে বার্তা এসেছে। তারা বলেছে, তোমাদের কথা জানাও। আমরা তোমাদের হারিয়ে ফেলেছি।
ক্রিসানা সংক্ষেপে পুরো ঘটনা জানাল। থিয়ার ধারণা সম্পর্কেও তাদের জানিয়েছে। এখন পর্যন্ত কেউ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি তারা বলল। এ পর্যন্ত আসতে কোনও গোলাপি মেঘের সন্ধান পায়নি বলেও উল্লেখ করেছে।
থিয়া বলল, পৃথিবী থেকে ৭৬ মিলিয়ন কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার পর আমরা বিছিন্ন হয়ে পড়েছি। এখন আমাদের অবস্থান পৃথিবী থেকে ৯৪ মিলিয়ন কিলোমিটার। যদি আমরা সোজা এসে থাকি তাহলে আমাদের অবস্থান এখন শুক্রগ্রহের বলয়ে। আর যদি শেষ ১৮ মিলিয়ন কিলোমিটার এক জায়গায় ঘুরে থাকি কিংবা অন্য কোনও পথে গিয়ে থাকি তাহলে সেটা অনিশ্চিত। শেষ সময়ের দিক নির্ধারণ করতে পারলে বুঝতে পারতাম।
বিজ্ঞান একাডেমি জানাল রাডারে নভোযান স্পেস ডিএম দেখা যাচ্ছে না। সিগন্যাল যাচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীত দিক থেকে। সম্ভবত কয়েকটা বেইস স্টেশন ব্যবহার করে নভোযান স্পেস ডিএম থেকে পৃথিবীতে সিগন্যাল পাঠানো হচ্ছে। যারা এই কাজ করছে তারা যথেষ্ট বুদ্ধিমান এবং প্রযুক্তিতে উন্নত। নিজ অবস্থান আড়াল করে ফেলেছে।
ক্রিসানা জানাল, তাদের অবস্থান শূন্য হয়ে আছে। সিগন্যাল পৃথিবীতে যাওয়া এবং ফিরে আসার গতি হিসাব করা যাচ্ছে না। একেক সময় একেক রিডিং দেখাচ্ছে। তাতে একেবারেই বোঝা যাচ্ছে না তারা কোথায় আছে।
থিয়া বলল, পৃথিবীর খবর কী ?
প্রধান বিজ্ঞানী মলি যোগাযোগ করছেন। তিনি বললেন, নভোযান স্পেস ডিএম পৃথিবী থেকে ছেড়ে আসার পর আর পৃথিবীতে গোলাপি মেঘ দেখা যায়নি। গোলাপি মেঘ দেখা যায়নি বলে পিংক রে আঘাত হানেনি।
থিয়া খুব আন্তরিক গলায় কিছুটা ভয় নিয়ে জানতে চাইল, আয়ানের কোনও সন্ধান পাওয়া গেছে ?
মলি বললেন, সেদিন পিংক রের আঘাতে মুমূর্ষু যে শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সে আয়ান। পিংক রে তাকে আঘাত করেনি। আয়ান সুস্থ আছে। শান্তা এসেছে। তারা আমান্দা মুনের কাছে থাকবে বলে জানিয়েছে। তবে কয়েক দিনের জন্য এখন বাসবদি যাবে।
থিয়ার বুকের ওপর থেকে দম বন্ধ হয়ে আসার মতো ভারী পাথর যেন নেমে গেল। সে বেশ হালকা বোধ করছে। আয়ানকে নিয়ে যথেষ্ট চিন্তার মধ্যে ছিল। কোনও কাজে মনোযোগ দিতে পারছিল না। এখন তার মনে আর সেই ভার নেই।
বিজ্ঞানী মলি বললেন, আয়ানের ব্রেইনের নিউরনে সুচাগ্রসদৃশ কিছু দেখা গেছে। সেটা এগিয়ে যাচ্ছিল। যখন এগুচ্ছিল তখন কোথাও ব্লাড ক্লটের মতো কিছুর ভেতর ঢুকে পড়ছিল। সেই সময়ে আয়ান…।
এ পর্যন্ত বলতেই কমিউনিকেশন মডিউল বন্ধ হয়ে গেল। সংযোগ বন্ধ হয়ে গেছে নাকি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বোঝা গেল না। তবে পৃথিবী থেকে নভোযান স্পেস ডিএম আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল। নভোযানে শুনসান নীরবতা। কোথাও কোনও শব্দ নেই। কমিউনিকেশন মডিউল, প্যানেল মনিটর সব সাদা হয়ে আছে। কোথাও কোনও রিডিং দেখা যাচ্ছে না। শুধু নভোযান অন্ধকার না হয়ে গিয়ে আলোটুকু আছে।
থিয়া আর ক্রিসানা অপেক্ষা করছে। কেউ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। কেউ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে না। তারা কত সময় অপেক্ষা করছে তাও বোঝা যাচ্ছে না। নভোযানে সময় থমকে আছে। তাদের মনে হলো তারা যেন কয়েক বছর ধরে এখানে অপেক্ষা করে আছে।
১০.
নভোযানের একদম পেছনের দিকের দরজা খুলে গেছে। বাইরে থেকে আলো এসে পড়েছে নভোযানে। অপেক্ষা করতে করতে থিয়া আর ক্রিসানার দুই চোখ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তারা চোখ বন্ধ করে ছিল। বাইরের তীব্র আলো এসে চোখে পড়তেই চোখ খুলে তাকাল। অমনি চোখ ধাঁধিয়ে গেছে। কিছু দেখতে পাচ্ছে না।
আলোতে যখন চোখ সয়ে এল তখন দেখতে পেয়েছে দুজন কেউ নভোযানে প্রবেশ করছে। যে দুজন এসেছে তারা দেখতে বেশ অদ্ভুত। থিয়া আর ক্রিসানার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অনেকটা মানুষ আকৃতির। তবে বলা যেতে পারে গাছমানব। তাদের শরীরে লতানো গাছের ছোট ছোট পাতার মতো দেখা যাচ্ছে। মানুষ হলে এগুলোকে হাত-পায়ের লোম বলা যেত। মাথায় চুলের জায়গায় সবুজ গাছ। অনেকটা ধানগাছের মতো।
সামনে দাঁড়ানো দুজনের মধ্য থেকে একজন বলল, তোমরা এখন আছো তোমাদের দেওয়া নামের শুক্রগ্রহের ল্যাবস্টেশনে। গোলাপি রশ্মি আমরাই পাঠাচ্ছি পৃথিবীতে। যার উৎস সন্ধানে তোমরা এখানে এসেছ।
ক্রিসানা বলল, কিন্তু কেন তোমরা আমাদের মানুষকে হত্যা করছ ?
গাছমানব বলল, তোমরা নিজেরাই হত্যা করছ তোমাদের মানুষদের। ধ্বংস করছ পৃথিবী। ধ্বংস করছ নভোমণ্ডল।
থিয়া জিজ্ঞেস করল, কিন্তু কীভাবে ?
গাছমানব বলল, অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ করছ। তাতে নভোমণ্ডলে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। তোমাদের চাঁদ সরে যাচ্ছে দূরে। প্রভাব ফেলছে সূর্যের ওপরেও। তার পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে আমাদের। এখন শুধু সতর্ক করার জন্য পিংক রে পাঠিয়েছি পৃথিবীতে। বিশ্বনেতাদের বলো, তারা যদি কার্বন নিঃসরণ বন্ধ না করে তাহলে ধ্বংস করে দেব পৃথিবীর সব মানুষ।
কথা বলছে একজন। আরেক জন কোনও কথা বলেনি। সম্ভবত সে এসেছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। তাদের সঙ্গে আরও বিস্তারিত কথা বলা দরকার। তারা দুই গ্রহের প্রাণি। পৃথিবী আর শুক্র। তবু তাদের পরস্পরের কথা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না। এই ঘটনা ঘটিয়েছে শুক্রগ্রহের প্রাণিরা। নিশ্চিত হওয়া গেছে তারা প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়ে গেছে। যদিও পৃথিবীর জন্যও এটা এখন অতিসাধারণ ঘটনা।
থিয়া মনে মনে ভাবল, তারা যে শুক্রগ্রহের প্রাণি সে ব্যাপারে প্রথমে নিশ্চিত হতে হবে। তারা এসেই তাদের দাবির কথা বলেছে। কোনও ভূমিকা করেনি। পৃথিবীতে কার্বন নিঃসরণের ফলে চাঁদ দূরে সরে যাচ্ছে এ ঘটনা বিজ্ঞান একাডেমি জানে। তারা বিশ্বনেতাদের এ ব্যাপারে অনেক আগে সতর্ক করেছে। তবে যারা নিজেদের শুক্রগ্রহের প্রাণী বলে দাবি করেছে তারা কী জানে এবং তাতে শুক্রগ্রহ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সে সম্পর্কে তাদের কাছ থেকে বিস্তারিত জানা দরকার।
মাথা ঝাঁকিয়ে থিয়া বলল, তোমাদের পেয়ে আমরা ভীষণ আনন্দিত। তোমরা ইতোমধ্যে জেনে গেছ তোমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেই আমরা এসেছি। আমরা কি কিছুটা সময় তোমাদের সঙ্গে কথা বলতে পারি ? এখানে এই নভোযানে কিংবা তোমাদের গ্রহে কোথাও।
গাছমানব বলল, আমাদের গ্রহে গেলে তোমরা বাঁচতে পারবে না। তোমাদের ফুসফুস এবং ত্বক সেভাবে তৈরি নয়। আমরা এখানেই কথা বলতে পারি।
ক্রিসানা আচমকা জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম কী ?
গাছমানব হাসছে। এই প্রথম তার মুখে হাসি দেখা গেল। আর তাকে আগের মতো ভীতিকর কেউ মনে হলো না। মনে হচ্ছে সে খুব সাধারণ একজন। মুখে হাসি ঝুলিয়ে রেখে গাছমানব বলল, পৃথিবীর মানুষের ভেতর যে ব্যাপারটি প্রবল তা হচ্ছে আবেগ। তুমি আমার নাম জানতে চেয়েছ আমাকে আরও কাছাকাছি এনে কথা বলার জন্য। খানিকটা খুব কাছের আত্মীয়র মতো। আমার নাম ছাতিম।
সঙ্গে যে এসেছে তাকে দেখিয়ে বলল, তার নাম কদম।
থিয়া বলল, এগুলো আমাদের গাছের নাম।
ছাতিম বলল, তাতে তোমাদের বুঝতে সুবিধা হবে। এখন তোমরা বিশ্রাম নাও। তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে তোমাদের হিসাবে আরও তিন ঘণ্টা পর। তবে যতক্ষণ এখানে থাকবে ততক্ষণ কমিউনিকেশন মডিউল বা রাডার, মনিটর কিছু চালু হবে না। তোমরা সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ভেতর আছ। নিশ্চিন্তে থাকবে। চাইলে তিন ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিতে পারো।
ছাতিম আর কদম চলে যাচ্ছে। তারা নভোযানে ঢোকার পর দরজা একাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ঢোকার সময়ও দরজা তারাই খুলেছে। এখন বেরিয়ে যাওয়ার সময়ও তারা দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। বেরিয়ে যাওয়ার পর দরজা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
ক্রিসানা বলল, নভোযান থেকে বের হওয়ার নিয়ন্ত্রণও আমাদের কাছে নেই। আমরা আছি বন্দি অবস্থায়।
থিয়া কিছু বলল না। তার ঘুম পাচ্ছে। ঘণ্টাখানেক সময় ঘুমাবে। ঘুম থেকে উঠে চিন্তাভাবনার জন্য আরও দুই ঘণ্টা সময় পাওয়া যাবে।
নিজের কিউবিকলে গিয়ে বিছানায় পাশ ফিরে শুয়ে থিয়া ঘুমিয়ে পড়ল। ক্রিসানা একা একা পুরো নভোযানে ঘুরে বেড়াতে থাকল। যখন মনে হয়েছে তারা বন্দি অবস্থায় আছে তখন থেকে তার অস্থির বোধ হচ্ছে। কিছুটা শ্বাসকষ্ট হওয়ার মতো।
থিয়া ঘুম থেকে উঠে দেখে সবকিছু আগের মতোই আছে। নভোযানের আলোর কোনও পরিবর্তন হয়নি। ক্রিসানা চুপচাপ বসে আছে কমিউনিকেশন মডিউলের পাশে। কেউ যোগাযোগ করবে সেই আশায়। কেউ যোগাযোগ করেনি। কমিউনিকেশন মডিউল থেকে কোনও সাড়াশব্দ আসছে না। নিস্তব্ধ হয়ে আছে।
ঘুম থেকে উঠে থিয়া বেশ আরাম বোধ করছে। শরীরে কোনও জড়তা নেই। হালকা লাগছে। কতক্ষণ ঘুমিয়েছে বুঝতে পারছে না। নভোযানের সব ঘড়ি বন্ধ হয়ে গেছে। থিয়ার মনে হলো সময় বুঝতে পারা জরুরি। সে বালুঘড়ি ধরনের কিছু বানাবে। ঘড়ি ছাড়া সেকেন্ডের হিসাব সে করতে পারে। তাই দিয়ে ঘণ্টার হিসাব করে ফেলতে পারবে। এরা যন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেললেও প্রাকৃতিক কোনও কিছুকে প্রভাবিত করতে পারবে না।
থিয়ার আবার ক্ষুধা লেগে গেল। কিছু খাওয়া দরকার। তার আগে বুঝতে হবে সে যতক্ষণ ঘুমিয়েছে ততক্ষণ কিছু হয়েছে কি না। ক্রিসানার সামনে গিয়ে থিয়া বলল, তাদের আসতে আর কতক্ষণ সময় বাকি আছে বলে তোমার মনে হয় ?
ক্রিসানা উদাসীন গলায় বলল, কাদের আসতে, কত সময় বাকি আছে ?
ছাতিম আর কদমের।
ক্রিসানা হেসে ফেলেছে। নভোযানে ভয়াবহ এমন অবস্থা তৈরি হওয়ার পর ক্রিসানা প্রথম হাসল। হেসে বলল, তাদের অদ্ভুত নাম। আমার কী মনে হয় জানো! এরা যতটা বুদ্ধিমান তার চেয়ে বেশি চালাক। পৃথিবী সম্পর্কে সব তথ্য জোগাড় করেছে। সেসব জেনে আমাদের কাছে এসেছে। আমাদের নিয়ে তারা ইঁদুর-বিড়াল খেলছে। আমাদের বানিয়েছে ইঁদুর আর তারা হয়েছে বিড়াল।
কথাগুলো বলতে বলতে ক্রিসানার গলার আওয়াজ কঠিন হয়ে গেল। সে বলল, তোমার মনে হয় ছাতিম আর কদম তাদের আসল নাম! তারা আমাদের বিভ্রান্ত করার জন্য এসব বলছে। এরপর এসে একজন বলবে আমার নাম যমুনা। তোমাদের নদীর নামে নাম। সঙ্গে যারা আসবে তাদের দেখিয়ে বলবে তার নাম টেমস। সে আমাজন। ও সুন্দরবন। বলে হাহা করে হাসবে। আরেকজন এলে তার নাম বলবে নিউজিল্যান্ড।
ক্রিসানা রেগে গেছে। সে বিড়বিড় করে ফাজিল বা শয়তান কিংবা খবিসের দল টাইপের কিছু বলেছে। বিড়বিড় করে বলেছে বলে শোনা যায়নি। তবে থিয়ার ভালো লাগছে। ক্রিসানা রেগে গেলেও সে পরিস্থিতি মেনে নিয়েছে। এখন যে কাউকে সহজে মোকাবিলা করা যাবে। পরিস্থিতি মেনে না নিলে কাউকে মোকাবিলা করা যায় না।
থিয়া বলল, এসো খাই। কাজ না করলে শরীর আর মন অবশ হয়ে যাবে। খাওয়া হচ্ছে কাজ করা।
ক্রিসানা কিছু বলল না। থিয়া দুজনের জন্য খাবার নিয়ে এল। তারা কোনও কথা না বলে সামান্য খাবার দীর্ঘসময় ধরে চুপচাপ খেয়ে গেল। তাদের কাছে মনে হয়েছে দীর্ঘ সময়। আসলে তারা খাবার খেয়েছে খুব কম সময় নিয়ে।
খাবার শেষ করে থিয়া বলল, সময় খুব জরুরি ব্যাপার। সৃষ্টি আর ধ্বংসের সঙ্গে সময় জড়িয়ে আছে। তোমার কি মনে হচ্ছে না সময় জানার জন্য আমাদের প্রাকৃতিক ঘড়ি বানিয়ে ফেলা দরকার!
শীতল গলায় ক্রিসানা বলল, আমাদের সময় শুরু হবে কখন ? বলতে পারবে তুমি আমরা কতক্ষণ তাদের এই ল্যাবস্টেশনে আটকে আছি ?
লাফিয়ে উঠেছে থিয়া। উচ্ছ্বসিত গলায় বলে উঠল, তুমি গ্রেট ক্রিসানা। পৃথিবীকে রক্ষা করার জন্য তুমিই যথেষ্ট।
ক্রিসানা ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেছে। সে থিয়ার কথা বুঝতে পারছে না। তার মনে হচ্ছে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থিয়া আবার হেঁয়ালি করতে শুরু করেছে। থিয়া আনন্দমাখা গলায় বলল, আমরা তাদের ল্যাবস্টেশনে আছি। ছাতিম বলে গেছে। কথাটা ভুলে গিয়েছিলাম। আমাদের উচিত হবে তাদের ল্যাবস্টেশন ঘুরে দেখা।
ক্রিসানা বলল, তোমার ধারণা যারা আমাদের আটকে রেখেছে তারা তাদের ল্যাবস্টেশন আমাদের দেখার জন্য খুলে রেখেছে ?
আগের মতো গলায় উচ্ছ্বাস নিয়ে থিয়া বলল, হতেই পারে। তারা ভেবেই নিয়েছে আমরা আর কোনওদিন এখান থেকে পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারব না। তাই তারা তাদের অমূল্য রতন আমাদের জন্য উন্মুক্ত করে রেখেছে। যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখো তাই, পাইলে পাইতে পারো অমূল্য রতন। সবাই তার শ্রেষ্ঠ অর্জন দেখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যেন ইচ্ছে নেই। হেলাফেলা দেখা গেছে, তবু।
বলেই থিয়া শূন্যে লাফ দেওয়ার মতো ভঙ্গি করে ঘুরে গেল। ক্রিসানা উঠে পড়েছে। ক্রিসানা বলল, তুমি যখন ঘুমুচ্ছিলে তখন পুরো নভোযান ঘুরে দেখেছি। কোথাও কিছু নেই।
যেতে যেতে থিয়া নিচু হয়ে কোনও কিছুর দিকে ইঙ্গিত করে বলল, তবে এটা ছিল না। এখন আছে।
দুজনে দেখল নভোযানের ভেতর এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার পথের পাশে নভোযানের ওয়ালে গোলাকার তামার পাতের মতো কিছু লাগানো। তাতে ত্রিকোণাকার ইমেজ। থিয়া ইমেজের ওপর হাত রাখল। গোলাকার তামার পাত সরে গেছে। ওপাশে সরু টানেল। অন্ধকার নয়। সেখানে আলো আছে। টানেল দিয়ে হেঁটে বা হামাগুড়ি দিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। ভেসে যেতে হবে।
থিয়া বলল, এসো। আমরা যেন সেখানে ঢুকি তারা সেটা চেয়েছে। হয়তো সামনে আমাদের জন্য আরও ভয়ংকর কিছু অপেক্ষা করছে। এটা হতে পারে তাদের ইঁদুর ধরা ফাঁদ। আবার এমনও হতে পারে সেখানে গিয়ে আমরা এমন কিছু পেয়ে যাব যা আমাদের নতুনভাবে বাঁচতে সাহায্য করবে।
ক্রিসানা কিছু বলল না। দুজনে ভেসে টানেলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেল। সামনে যেতেই সিঁড়ি পেয়েছে। সিঁড়ি উঠে গেছে ওপরে। থিয়া আর ক্রিসানা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল।
উপরে উঠে দুজনে ভীষণভাবে চমকে গেছে। প্রকাণ্ড বড় ল্যাবরেটরি। প্রচুর জিনিস রাখা আছে সেখানে। সত্যি যেন অমূল্য রতন।
ক্রিসানা বলল, তাদের আসার সময় হয়ে গেছে। আমাদের ফিরতে হবে।
থিয়া জিজ্ঞেস করল, তুমি কীভাবে বুঝতে পারছ তাদের আসার সময় হয়ে গেছে ?
ক্রিসানা বলল, ব্রেইনে ঘড়ি সেট করে নিয়েছি। আমি আমার ব্রেইনের ওপর বিশ্বাস রাখি। তাদের ফিরে আসার তিন ঘণ্টা সময় হতে আর দশ মিনিট বাকি আছে।
থিয়া আর ক্রিসানা ল্যাবরেটরি থেকে ফিরে নভোযানে চলে এল।
১১.
ছাতিম এসেছে। কদম আসেনি। ছাতিমের সঙ্গে অন্য একজন মেয়ে এসেছে। নাম বলেছে স্বর্ণলতা। তার নাম গামারি বা মেহগনি হলেও মানিয়ে যেত। পেটানো দড়ি পাকানো কাঠকাঠ শরীর। দেখে মনে হচ্ছে রাগ হলে সে যে কাউকে তুলে নভোযান থেকে মহাশূন্যে ছুড়ে ফেলে দিতে পারবে।
স্বর্ণলতা বলল, এই নভোমণ্ডলে যত গ্রহ আছে আর সেসব গ্রহে যত প্রাণি আছে তার মধ্যে পৃথিবীর মানুষ হচ্ছে সবচেয়ে বড় বেকুব। তোমরা হচ্ছো মহাবেকুব প্রাণি।
মেজাজ খারাপ হচ্ছে থিয়ার। মেজাজ খারাপ করা যাচ্ছে না। স্বর্ণলতা নামের এই মেয়ের মেজাজ মনে হচ্ছে আরও বেশি খারাপ। সে রেগে গেলে মুহূর্তে সব ধ্বংস করে দিতে পারে।
থিয়া নিজের মেজাজ খারাপ অবস্থা লুকিয়ে রেখে বলল, তোমার কাছে নিশ্চয়ই আমরা ন্যূনতম শ্রদ্ধা আশা করতে পারি!
স্বর্ণলতা বলল, অন্য কোনও গ্রহের প্রাণি যে পাতে খায়, সেই পাত ফুটো করে না। শুধু পৃথিবীর মানুষ করে। ফুটো নয়, তারা গর্ত করে ফেলে। তোমরা তোমাদের আবাসের জায়গা পৃথিবীকে ধ্বংস করে দিচ্ছ। পৃথিবী মেরামতের কোনও চেষ্টা করছ না। পৃথিবী ছেড়ে গিয়ে অন্য কোনও গ্রহে বাস করা যায় এখন সেটার সন্ধানে আছো। তোমরা হচ্ছো আহাম্মক। মহা আহাম্মক।
থিয়া বা ক্রিসানা কোনও কথা বলেনি। ছাতিমও কথা বলছে না। স্বর্ণলতা একা কথা বলে যাচ্ছে। সে থিয়ার দিকে তাকিয়ে কর্তৃত্বের সুরে বলল, অ্যাই মেয়ে, পৃথিবীতে রাত-দিন কত সময়ে হয় ?
থিয়া বুঝতে পারছে রাগ করে কিছু করা যাবে না। স্বর্ণলতাকে দেখে মনে হচ্ছে সে প্রাইমারি ইশকুলের টিচার। থিয়া পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। তাকে পড়া জিজ্ঞেস করেছে। কোনও হইচই না করে থিয়া বলল, ঘড়ির কাঁটায় ২৪ ঘণ্টাকে এক দিন হিসাবে গণনা করে থাকি আমরা।
স্বর্ণলতা বলল, চাঁদ একসময় পৃথিবীর কাছে ছিল। তখন পৃথিবীতে ১৮ ঘণ্টায় দিন হতো। পৃথিবী থেকে চাঁদ আরও সরে যাচ্ছে। কয়েক দিন পর পৃথিবীতে তোমাদের ঘড়ির কাঁটায় দিন হবে ২৫ ঘণ্টায়। কী বলছি বুঝতে পারছ ?
থিয়া বলল, বুঝতে পারছি। এ ঘটনা আমরা জানি। চাঁদ প্রতি বছর প্রায় দেড় ইঞ্চি দূরে সরে যাচ্ছে।
স্বর্ণলতা বলল, না বুঝতে পারছ না। কিছুই বুঝতে পারছ না। তোমরা জানোও না কিছু। বুঝলে কিংবা জানলে তোমরা এতটা নির্বোধ হতে না। চাঁদের দেড় ইঞ্চি সরে যাওয়া অনেক পুরাতন হিসাব। তুমি দেখছি মহামূর্খ। কিছুই জানো না।
ক্রিসানার দিকে তাকিয়ে স্বর্ণলতা বলল, অ্যাই মেয়ে, তুমি বলো, পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা কেন হয় ?
ক্রিসানা ভালো স্টুডেন্টের মতো বলল, চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সমুদ্রের পানির ওপর টান তৈরি করে। সেই টান পৃথিবীর ঘূর্ণনকে ধীর করে দেয়। পৃথিবীর জড়তা চাঁদের মাধ্যার্কষণ থেকে শক্তিশালী। পৃথিবী আর চাঁদের টানাটানিতে জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি হয়।
স্বর্ণলতা বলল, তোমাদের পছন্দ হয়েছে। যেনতেন পছন্দ নয়। বেশি পছন্দ। স্টুডেন্ট হিসেবে তোমরা উন্নত প্রজাতির।
কোথাও খটখট ধরনের শব্দ হচ্ছে। কিসের শব্দ অনুমান করা যাচ্ছে না। ছাতিম সেখান থেকে চলে গেল। সে গেছে যেদিক থেকে শব্দ আসছে সেদিকে। ছাতিম চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর খটখট শব্দ বন্ধ হয়ে গেল।
ক্রিসানা বা থিয়ার কিছু করার নেই। স্বর্ণলতা আর ছাতিম যা বলবে এখন তাদের তাই অনুসরণ করে যেতে হবে। স্বর্ণলতা এতক্ষণ নতুন কিছু বলেনি। পুরাতন পড়া পড়াচ্ছে।
ছাতিম ফিরে এসেছে। স্বর্ণলতা বলল, তোমরা ল্যাবে গিয়েছিলে। ভালো করেছ। তবে ফেরার সময় সেখান থেকে বেরুনোর পর উইন্ডো বন্ধ করে আসা উচিত ছিল। ভবিষ্যতে এরকম বেখেয়াল হবে না। অমনোযোগী যে কারও জন্য শাস্তি অবিশ্বাস্য ভয়ংকর। কতটা ভয়ংকর তা না শুনলেও তোমাদের চলবে।
থিয়ার মনে পড়েছে ফেরার সময় তাড়াহুড়ো আর উত্তেজনায় পিতলের গোলাকার দরজা বন্ধ করে আসা হয়নি। ল্যাব থেকে নিশ্চয়ই শব্দ আসছিল। তবে স্বর্ণলতার কথা শুনে মনে হচ্ছে তাকে যতটা ভয়ংকর দেখাচ্ছে সম্ভবত সে ততটা ভয়ংকর নয়। নিজেকে ভয়ংকর হিসেবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করে।
স্বর্ণলতা বলল, তোমরা পৃথিবীর বন উজাড় করে দিয়েছ। তেল-গ্যাস পুড়িয়ে পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলেছ। অতিরিক্ত কার্বনের চাপে পৃথিবী টালমাটাল হয়ে গেছে। আমি কী বলছি বুঝতে পারছ ?
ক্রিসানা ওপর-নিচ মাথা ঝাঁকাল। থিয়া মুখে বলল, বুঝতে পারছি।
স্বর্ণলতা বলল, কিছুই বুঝতে পারছ না। বুঝতে পারার মতো বুদ্ধি তোমাদের নেই। তোমরা বোকা। শুধু বোকা নও। নিরেট বোকা। পৃথিবীতে অত্যধিক কার্বন নিঃসরণের ফলে পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। তাতে পৃথিবীর ঘূর্ণনগতিতে প্রভাব পড়ছে। তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে বরফ গলে যাচ্ছে। পৃথিবীর মহাসাগরে পানির পরিমাণ বেড়ে গেছে। মহাসাগরের ওপর চাঁদের আকর্ষণ বেশি। আর তাতে পৃথিবী আগের চেয়ে ধীরে ঘুরছে। পৃথিবীর এই ঘোরাঘুরি ধীর হয়ে যাওয়ার জন্য নভোমণ্ডলের কক্ষপথে ঝামেলা দেখা দিয়েছে। আমাদের গ্রহকে আদর করে তোমরা বলো বোনগ্রহ! এ তোমাদের মেকি ভালোবাসা। ভান করা আদর। তোমাদের মূর্খের মতো কাজে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছি আমরা। তোমাদের আদরের বোনগ্রহ এই শুক্রগ্রহ।
স্বর্ণলতার শেষের কথাগুলো রাগ নয় বরং অভিমান আর হাহাকারের মতো শোনাল। যেন সে আকুতিভরে পৃথিবীর কাছে আর্জি জানাচ্ছে কার্বন নিঃসরণ বন্ধ করতে।
থিয়া অসুন্ধানী গলায় বলল, তোমরা পৃথিবীতে পিংক রে পাঠাচ্ছ কেন ?
পৃথিবীকে সতর্ক করে দিতে। যদি তোমরা কার্বন নিঃসরণ বন্ধ না করো তাহলে আমরা পৃথিবী ধ্বংস করে দেব।
সেই বার্তা তোমরা পৃথিবীর কাছে পৌঁছে দাওনি।
স্বর্ণলতা বলল, দিয়েছি। আয়ানের মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়েছি। নিরেট নির্বোধ মানুষের পক্ষে তা বোঝা সম্ভব হয়নি। সম্ভব হয়নি কারণ তারা তা বুঝতে চায়নি। তারা সেটুকুই বুঝতে চায় যা তাদের স্বার্থের পক্ষে থাকে। এবার প্রশ্ন করো কেন আমরা পিংক রে দিয়ে শিশুদের আক্রমণ করিনি।
থিয়া জিজ্ঞেস করল, কেন তোমরা শিশুদের পিংক রে দিয়ে আক্রমণ করোনি ?
স্বর্ণলতা বলল, শিশুরা পরম সত্য বলে। বড়রা নিজের মতো করে সত্য বানিয়ে নেয়। যেজন্য কোনও এক বিষয়ে এক এক জনের কাছে সত্য এক এক রকম। আমরা মানুষ ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনও প্রাণি বা প্রকৃতিকে আঘাত করিনি। তারা পৃথিবীর কোনও ক্ষতি করছে না। পৃথিবীর ক্ষতি করছে মানুষ। বড় মানুষ। আবার সব মানুষ নয়, কিছু মানুষ। যারা কল-কারকাখার মালিক। অর্থের লোভে পৃথিবীতে কার্বন ছড়িয়ে বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে পৃথিবী।
ক্রিসানা অনেকক্ষণ চুপ করে আছে। সে আর ধৈর্য ধরে থাকতে পারল না। অধৈর্য গলায় বলল, এখন আমাদের কী করতে হবে ?
স্বর্ণলতা বলল, তোমাদের কমিউনিকেশন মডিউল চালু করে দিচ্ছি। তোমরা পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ করবে। তাদের বলবে পৃথিবীতে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনতে যৌক্তিক ও দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে। যদি তারা তা করে তাহলে তোমরা ফিরে যাবে তোমাদের পৃথিবীতে।
পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছে। শুক্রগ্রহের পক্ষে স্বর্ণলতা, ছাতিম ছাড়াও আরও তিনজন গাছমানব তাদের দাবি জানিয়েছে।
প্রধান বিজ্ঞানী মলি ছাড়াও প্ল্যানেটোলজির সেকশন চিফ হানায়জা, অ্যাটমোসফেরিক বিজ্ঞানী জিয়ানা, বিজ্ঞানী ক্রিস, তানিয়া আর দিয়া উপস্থিত হয়েছে। নাসুম্মা বিশ্বের আরও কয়েকজন নেতাকে নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন।
তাদের কাছে শুক্রগ্রহের পক্ষ থেকে পৃথিবীতে দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার দাবি জানানো হয়েছে। স্বর্ণলতা, ছাতিম, কদম বাদে অন্য এক গাছমানব শুক্রগ্রহের পক্ষে দাবি জানিয়েছে। কেন তারা এই দাবি জানাচ্ছে তার পক্ষে জোরালো যুক্তি দেখিয়েছে। দাবি না মানলে পৃথিবীর পরিণতি কী হবে তাও বলেছে। তারা জানিয়েছে শুক্রগ্রহের জন্য এ এক বাঁচা মরার লড়াই। ধ্বংসের দিকে শুক্রগ্রহের এগিয়ে যাওয়ার জন্য তারা দায়ী নয়, দায়ী পৃথিবী। অথচ ভুগতে হচ্ছে তাদের। শুক্রগ্রহ এটা কোনওভাবেই মেনে নিচ্ছে না।
বিশ্বনেতারা জানালেন, আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কীভাবে কত দিনের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনা যেতে পারে সে ব্যাপারে দিকনির্দেশনা তৈরি করতে হবে। সময় লাগবে। শুক্রগ্রহ থেকে যেন পৃথিবীতে পিংক রে পাঠানো বন্ধ করা হয়।
স্বর্ণলতা বলল, আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ তোমাদের পুরাতন অভ্যাস। তোমরা সুন্দর মুখে চাতুর্যপূর্ণ কথা বলো। তোমাদের জানাচ্ছি তোমরা এখুনি নিজেদের মধ্যে কথা বলো। কথা বলে তোমাদের অঙ্গীকার আমাদের জানাও। তারপর তোমরা বসে দিকনির্দেশনা তৈরি করো অসুবিধা নেই।
বিজ্ঞানীরা কিছু বলতে চাইছিলেন। বিশ্বনেতারা বিজ্ঞানীদের কিছু বলার সুযোগ দিলেন না। বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কোনও আলোচনা না করেই বিশ্বনেতারা শুক্রগ্রহের দাবি মেনে নেওয়ার অঙ্গীকার করে বসলেন।
কমিউনিকেশন মডিউল বন্ধ হয়ে গেছে। নভোযানে আবার নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। থিয়া ভাবছে বিশ্বনেতাদের আচরণ শুক্রগ্রহের প্রাণিরা কীভাবে নিয়েছে! তারা বিশ্বনেতাদের বিশ্বাস করেছে বলে মনে হচ্ছে না। স্বর্ণলতা বিশ্বনেতাদের চতুর বলেছে।
ক্রিসানা বুকের ভেতর জমে থাকা বাতাস বাইরে ছড়িয়ে দিল। বুকের ভেতর খানিক ফ্রেশ বাতাস টেনে নিয়ে স্বর্ণলতার দিকে তাকিয়েছে। স্বর্ণলতা কেন জানি তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ক্রিসানা বলল, এবার তবে আমাদের যেতে দাও।
স্বর্ণলতা কঠিন গলায় বলল, যতদিন পর্যন্ত পৃথিবীর অঙ্গীকারের দৃশ্যমান চেহারা দেখতে না পাব, ততদিন তোমরা এখানে থাকবে।
থিয়া বলল, আমাদের কাছে বেশিদিনের খাবার নেই।
গাছমানব থমথমে গলায় বলল, পৃথিবীতে খবর পাঠাও। তারা যদি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে অধিক সময় নেয়, তাহলে তোমাদের জন্য খাবার পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। তবে বলে দেবে, ততদিন পর্যন্ত গোলাপি রশ্মি পৃথিবীতে যাওয়া বন্ধ হবে না।
স্বর্ণলতা আর ছাতিম তাদের রেখে চলে গেল।
১২.
বিশ্বনেতারা মিটিংয়ে বসেছেন। বিশ্বের প্রভাবশালী দেশ থেকে গুরুত্বপূর্ণ নেতারা একত্র হয়েছেন। সেখানে উপস্থিত নেতা ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অনলাইনে আরও অনেক নেতা যুক্ত হয়েছেন। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং হচ্ছে।
বিশ্বনেতাদের মিটিংয়ে শুক্রগ্রহের দাবি নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। কারিগরি আলোচনার প্রয়োজনে সেখানে বিজ্ঞান একাডেমি থেকে বিজ্ঞানীদের ডেকে আনা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, যত দ্রুত সম্ভব পৃথিবীতে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
বিশ্বনেতা নাসুম্মা বললেন, কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার ব্যাপারটা গাছের শুকনো পাতার মতো নয়, যে ঝাঁকি দেবেন আর ঝুরঝুর করে পড়ে যাবে। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে না গেলে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনা সম্ভব নয়। মানুষ যে জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে সেই জীবন থেকে তাদের সরিয়ে আনা যাবে না।
প্রধান বিজ্ঞানী মলি বললেন, যাদের অনেক টাকা আছে তারা আরও টাকা বানানোর জন্য এই অবস্থাকে জিইয়ে রাখতে চাইছে। বিজ্ঞান একাডেমি থেকে অনেক দিন ধরে আমরা পৃথিবীর সম্ভাব্য বিপর্যয়ের কথা বলে আসছি। কেউ সেটা নিয়ে কোনও কাজ করছে না।
হলরুমে গুঞ্জন হচ্ছে। শুরুতে একজন তরুণ নেতা পৃথিবীর পরিস্থিতি প্রতিবেদন পাঠ করেছেন। সেখানে বিশ্বের বর্তমান অবস্থার কথা জানানো হয়েছে। শুক্রগ্রহের দাবির কথা বলা হয়েছে। সমাধানের সম্ভাব্য উপায় জানানো হয়েছে। তবে সেসব দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
পৃথিবীর একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা বললেন, কার্বন শোষণের জন্য বৃহৎ প্ল্যান্ট তৈরি করা হয়েছে। তা যদি প্রয়োজনীয় কার্বন শোষণ করতে না পারে তাহলে আমাদের এই মুহূর্তে করণীয় আর কী আছে! আমরা তো উদ্যোগ নিয়েছি। চেষ্টা করেছি। আমাদের কার্বন শোষণ প্ল্যান্টের কথা শুক্রগ্রহকে জানানো হোক।
বিজ্ঞানী ক্রিস বললেন, একটি জীবন্ত গাছ যতখানি কার্বন শোষণ করতে পারে, গাছ কেটে তার মৃত কাঠ দিয়ে প্ল্যান্ট তৈরি করলে সেই কাঠ সেই পরিমাণ কার্বন শুষে নিতে পারবে না।
এই কথা শুনে নেতা রেগে গিয়ে বললেন, প্ল্যান্টের ডিজাইন আমরা করিনি। প্ল্যান্টের ডিজাইন করেছেন আপনারা, বিজ্ঞানীরা।
বিজ্ঞানী মলি বললেন, পৃথিবীতে গাছের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
বিশ্বনেতা নাসুম্মা তার উত্তরে বললেন, পৃথিবীতে এত বিশাল বিশাল বন তা দিয়েও আপনাদের হচ্ছে না। আপনারা কি বসতবাড়িকেও জঙ্গল বানিয়ে ফেলতে চাইছেন!
বিজ্ঞানী আর বিশ্বনেতাদের ভেতর উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের কথা বিশ্বনেতারা মানতে চাইছেন না। বিশ্বের একজন প্রভাবশালী নেতা বললেন, গবেষণাগারে কাজ করা আর পৃথিবী পরিচালনা করা এক কাজ নয়। আপনাদের পৃথিবী পরিচালনার দায়িত্ব দিলে পৃথিবীকে ডিমভাজা বানিয়ে ফেলবেন।
দিয়া বিশ্বনেতাদের এ ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা সহ্য করতে পারল না। সে উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছে। স্থির গলায় বলল, বিশ্বনেতাদের আহ্বান জানাচ্ছি আপনারা একদিন গবেষণাগারে আসুন। গবেষণাগারের একটি জিনিসও যদি চিনতে পারেন তবে বুঝব আপনারা সক্ষম মানুষ।
হলঘরে আবার হইচই শুরু হয়েছে। বিশ্বনেতাদের সক্ষমতা নিয়ে বিজ্ঞানীরা প্রশ্ন তুলেছে। হইচইয়ের মধ্যে কয়েকজন নেতা বললেন, আমরা থাকব না পৃথিবীতে। পৃথিবী গরমে পুড়ে যাক আর শীতে কুঁকড়ে যাক, আমাদের তাতে কিছু যায় আসে না।
কয়েকজন বিজ্ঞানী তখন সেই গণ্ডগোলের ভেতর উঁচু গলায় বললেন, আপনারা কি কাঠের গাড়িতে চড়ে মহাকাশ পাড়ি দিয়ে অন্য গ্রহে যাবেন ? বিজ্ঞানীদের প্রয়োজন হবে না, আপনাদের!
কোনও একজন নেতা বললেন, টাকা দিলে বহুত কাঙাল বিজ্ঞানী পাওয়া যাবে। নভোযান তারা বানাবে। আমরা অন্য গ্রহে যাওয়ার জন্য ভ্রমণ মহাকাশযান ব্যবহার করব। আপনাদের লাগবে না।
নেতা আর বিজ্ঞানী মুখোমুখি অবস্থানে চলে এসেছে। প্রধান বিজ্ঞানী মলি বললেন, থিয়া আর ক্রিসানার কথা ভেবে, বিশেষ করে পিংক রে থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে এতক্ষণ অনেক অপমান সহ্য করে বসে ছিলাম। আশা করেছিলাম সমাধান পাওয়া যাবে। আর বসে থাকা যাচ্ছে না।
কোনও সিদ্ধান্ত ছাড়া মিটিং শেষ হয়ে গেল। বিজ্ঞানীরা মনে কষ্ট নিয়ে মিটিং থেকে চলে এসেছেন।
বিশ্বনেতা আর বিজ্ঞানীদের ব্যর্থ সভার কথা গোপন থাকল না। মিডিয়াতে ফলাও করে প্রচার করা হলো। মিটিংয়ের ব্যর্থতার জন্য বিশ্বনেতারা বিজ্ঞানীদের দায়ী করেছেন।
এই ঘটনার সন্ধান করতে গিয়ে নভোযান স্পেস ডিএম শুক্রগ্রহে আটকে থাকার কথা মিডিয়া জেনে ফেলেছে। মিডিয়া সারা বিশ্বকে সেই কথা জানিয়ে দিল।
উত্তাল হয়ে উঠেছে বিশ্ব। বিশ্বের মানুষ নেতাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করে দিয়েছে দ্রুত সমস্যা সমাধানের জন্য। নেতারা আগের মতো অনড় থেকে গেছেন। তারা কোনও উদ্যোগ গ্রহণ করলেন না।
কিছুদিন বিরতির পর পৃথিবীর আকাশে আবার গোলাপি মেঘ দেখা দিল। মেঘ দেখে মানুষজনের ভেতর আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। আতঙ্কিত মানুষ জীবন বাঁচাতে দিগি¦দিক ছোটাছুটি করে যাচ্ছে।
গোলাপি মেঘ এবার আর গোলাপি দেখাচ্ছে না। কালচে লাল মতো হয়ে আছে। পিংক রে নেমে এসেছে পৃথিবীতে। তার ভয়াবহতা আগের থেকে অনেক বেশি। পিংক রে আগে কখনও শিশুকে আহত করেনি। এবার পিংক রে শিশুকেও আক্রান্ত করছে। পিংক রের কারণে কোনও শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। তবে তাদের শরীরে ফোস্কা ওঠার মতো অবস্থা দেখা গেছে। পৃথিবীর দিকে পিংক রে ধেয়ে আসছে ঘন ঘন।
বিজ্ঞানী মলি গভীর চিন্তায় ডুবে আছেন। বিজ্ঞানী দিয়া এসেছে তার কাছে। এখন কথা বলা যাবে কি না বুঝতে পারছে না। মলি মাথা তুলে তাকিয়েছেন। তার দুই চোখ লাল হয়ে আছে। মনে হচ্ছে কয়েক দিন তিনি না ঘুমিয়ে আছেন। চোখের চারপাশ কালো হয়ে আছে। চোখ ঢুকে গেছে গর্তের ভেতর।
ক্লান্ত গলায় বিজ্ঞানী মলি বললেন, বলো, কী বলতে এসেছ।
দিয়া বলল, পৃথিবীকে রক্ষা করা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত মানছি। তবে আমাদের এ কথাও স্বীকার করে নিতে হবে বিশ্বনেতারা সারা পৃথিবীতে যুদ্ধ বাঁধিয়ে রাখা ছাড়া আর কিছু করতে পারেননি। তারা সবসময় নিজেদের স্বার্থ দেখেছেন। টাকা দেখেছেন। মানুষ দেখেননি।
মলি আবারও ক্লান্ত গলায় বললেন, তুমি কী বলতে চাইছ ?
দিয়া বলল, বিশ্বনেতাদের ছাড়াই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পৃথিবীকে কীভাবে রক্ষা করব সেই সিদ্ধান্ত নেব আমরা।
মলি বললেন, সিদ্ধান্ত আমরা নিতেই পারি। কিন্তু বিশ্বনেতাদের উদ্যোগ ছাড়া তা বাস্তবায়ন করা যাবে না।
দিয়া হতাশ গলায় বলল, তাহলে কি বিশ্ব বাঁচবে না!
দিয়ার কথার ভেতর কিছু ছিল। তার কথা শুনে মলি কিছুটা সুস্থ বোধ করছেন। তিনি সোজা হয়ে বসলেন। গলা পরিষ্কার করে বললেন, তুমি এসে ভালো করেছ। আজই আমরা জরুরি সভা করব। সেখানে পৃথিবীকে রক্ষা করার সম্ভাব্য সব উপায় আলোচনা করব। তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখব। বিশ্বনেতাদের কোনওভাবে রাজি করাতে পারলেই যেন সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু করে দেওয়া সম্ভব হয়। তখন প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হবে না।
ভালো লাগছে দিয়ার। সে উঠে পড়েছে। বিজ্ঞানী মলি বললেন, পৃথিবীকে রক্ষা করার প্রস্তুতি আর বিশ্বনেতাদের রাজি করানোর কাজ একসঙ্গে চলতে থাকবে। এখুনি মিটিংয়ের নোটিশ পাঠিয়ে দিচ্ছি।
দিয়া চলে যাচ্ছে। তার চলে যাওয়ার ভেতর বিজয়ীর ভাব আছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে পৃথিবীকে রক্ষায় বিজ্ঞানীরা অনেকখানি এগিয়ে গেল। দিয়াকে দেখে বিজ্ঞানী মলির ভালো লেগেছে। তিনিও নিজের মনে শক্তি পাচ্ছেন।
সারা বিশ্বে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কয়েক লক্ষ শিশু পিংক রে’তে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আতঙ্কে তারা কাঁদছে। শিশুদের কান্নায় পৃথিবীর বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
সন্তানদের কষ্ট অভিভাবকরা সহ্য করতে পারলেন না। তার রাস্তায় নেমে এসেছেন। বিশ্বনেতাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রকাশ করছেন। দ্রুত শুক্রগ্রহের প্রস্তাব মেনে নিয়ে বিজ্ঞানীদের সঙ্গে পৃথিবী থেকে কার্বন নিঃসরণের দাবি জানাচ্ছেন।
শিশুরা প্লাকার্ড হাতে নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছে। ইশকুল কলেজ বন্ধ হয়ে গেছে। পুরো পৃথিবীতে লণ্ডভণ্ড অবস্থা বিরাজ করছে। শুধু তাই নয়, বিশ্বনেতারা আছেন জীবনের ঝুঁকির মধ্যে। অনেক দেশে কয়েকজন নেতাকে জনগণ আটক করে শুক্রগ্রহের প্রস্তাবের পক্ষে কাজ করার জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বনেতা নাসুম্মা পিংক রের আঘাতে মৃত্যুবরণ করেছেন। পৃথিবীর প্রভাবশালী দেশের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের পিংক রে আক্রমণ করেছে। এবার গোলাপি রশ্মিতে আক্রান্ত হয়ে মিল- কলকারখানার মালিক মারা গেছেন মাত্র কয়েকজন। যারা মারা গেছেন তাদের বেশিরভাগ বিশ্বনেতা।
পৃথিবীর নাজুক পরিস্থিতিতে বিশ্বের পরবর্তী প্রজন্মের নেতারা সভায় একত্র হয়েছেন। একজন নেতা দাঁড়িয়ে বললেন, গত কয়েক দিনের পিংক রে-র আক্রমণে পৃথিবীর মোট পঁচিশ জন নেতা মারা গেছেন। এভাবে চলতে থাকলে পৃথিবী শিগগিরই নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়বে।
আরেকজন নেতা বললেন, আমাদের উচিত হবে শুক্রগ্রহের প্রাণিদের সঙ্গে আলোচনায় বসা। তাদের দাবি মেনে নিয়ে আমরা কী ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছি তা জানানো। আর তারা যেন পৃথিবীতে আড়ি না পাতে সে ব্যাপারে আমাদের নিশ্চয়তা দেওয়া। পৃথিবীর আর কোনও গোপনীয়তা এখন নেই।
একজন তরুণ নেতা জানতে চাইলেন, কীসে আপনার মনে হচ্ছে শুক্রগ্রহের কাছে পৃথিবীর গোপনীয়তা ফাঁস হয়ে গেছে।
আগের সেই নেতা বললেন, বিশ্বনেতারা মিটিং করেছে। কোনও সিদ্ধান্ত ছাড়া মিটিং শেষ হয়ে গেছে। সেখানে নেতারা পৃথিবীতে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার কোনও উদ্যোগ নিয়ে জোরালো কথা বলেননি। তারপরই পৃথিবীতে নেমে এল ভয়াবহ পিংক রে। এ থেকে সহজেই বোঝা যায় শুক্রগ্রহ আমাদের ওপর নজর রাখছে। আমাদের সব খবরাখবর তাদের কাছে আছে।
তরুণ নেতা বললেন, শুক্রগ্রহের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছেন বিজ্ঞান একাডেমির বিজ্ঞানীরা। বিশ্বনেতাদের সঙ্গে মিটিংয়ের পর শুক্রগ্রহের প্রাণিরা যখন বিজ্ঞান একাডেমির কাছে সিদ্ধান্ত জানতে চেয়েছে, তখন তারা তাদের কাছে বিশ্বনেতাদের নামে ভুল তথ্য দেয়নি সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত হচ্ছি কীভাবে ? তারা নিশ্চয়ই শুক্রগ্রহের প্রাণিদের বলেছে পৃথিবী থেকে কার্বন নিঃসরণের সবচেয়ে বড় বাধা বিশ্বনেতারা। আর তাতেই পিংক রে নেমে এসেছে সব বিশ্বনেতাদের ওপর। শিশুদের আক্রান্ত করে তারা বিশ্বকে অস্থিতিশীল করে তুলতে চাইছে। এখানে বিজ্ঞানীদের ভূমিকা আলোচনা হওয়া দরকার। একজন বিজ্ঞানীও পিংক রে’তে আক্রান্ত হয়নি। কেন ?
সভায় উপস্থিত বিজ্ঞানীরা এমন কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলেন। তারা তথ্য ফাঁস করার অভিযোগের প্রমাণ দাবি করছেন। নেতাদের এহেন আচরণের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছেন।
প্রধান নেতা বললেন, এখন পরস্পরকে দোষারোপ করার সময় নয়। পৃথিবীকে বাঁচাতে এখন একসঙ্গে কাজ করার সময়। আশা করি আপনারা আপনাদের অভিমান, রাগ, মতভেদ ভুলে গিয়ে পৃথিবীকে বাঁচানোর উদ্যোগ নেবেন।
সারা বিশ্ব থেকে জড়ো হওয়া মানুষজন বিশ্বনেতাদের মিটিংয়ের জায়গা ঘিরে ফেলেছে। নিরাপত্তা কর্মীরা অসহায় বোধ করছে। কয়েক লক্ষ মানুষকে তারা সরিয়ে দিতে পারছে না। বিশ্বের মানুষজন পৃথিবী বাঁচাতে স্লোগান দিচ্ছে। শিশুদের বাঁচাতে স্লোগান দিচ্ছে। থিয়া আর ক্রিসানাকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে বলছে।
জবাবে বিশ্বনেতারা বলেছেন তারা মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবেন। মানুষজন জায়গা ছেড়ে যেতে চাইছেন না। সিদ্ধান্ত নিতে যত সময় লাগে তারা তত সময় অপেক্ষা করবে বলেছে।
১৩.
ল্যাবে যাওয়ার পথের কাছে দাঁড়িয়ে থিয়া আর ক্রিসানা থমকে গেল। তারা ল্যাবে ঢুকতে চাইছিল নতুন আরও কিছুর সন্ধান পাওয়া যায় কি না দেখতে। ল্যাবরেটরিতে মনে হচ্ছে একসঙ্গে অনেকে কাজ করছে। তারা উচ্চস্বরে কথা বলছে। কথা বুঝা যাচ্ছে না। সম্ভবত এটা শুক্রগ্রহের ভাষা, যা তাদের অজানা।
ল্যাবের ভেতরের প্রাণিদের ভাষা বোঝা যাচ্ছে না বলে তারা কী নিয়ে এমন ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তাও জানা গেল না। তবে তাদের ভেতর উত্তেজনা দেখা দিয়েছে সেটা বোঝা যাচ্ছে। তাদের কণ্ঠস্বর বেশ উত্তেজিত শোনাচ্ছে।
থিয়া বলল, আমরা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছি।
ক্রিসানা বলল, কেন তোমার সেকথা মনে হচ্ছে ?
থিয়া বলল, এটা শুক্রগ্রহের ল্যাবস্টেশন। এখান থেকেই পৃথিবীতে পিংক রে পাঠানো হয়। এখানে কারও কোনও সাড়াশব্দ ছিল না। যখন আমরা ভেতরে গিয়েছিলাম তখনও সেখানে কাউকে দেখিনি। এখন আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তার মানে আবার পৃথিবীতে পিংক রে পাঠানোর আয়োজন হচ্ছে। তাদের উত্তেজিত কথা শুনে মনে হচ্ছে এবার আগের চেয়েও সাংঘাতিক ক্ষতিকর পিংক রে তারা পৃথিবীতে পাঠাবে।
নভোযানের শেষ মাথা দিয়ে আলো ঢুকেছে। এই পথ দিয়ে শুক্রগ্রহের প্রাণিরা নভোযানে যাতায়াত করে। থিয়া আর ক্রিসানা ল্যাবে যাওয়ার পথ থেকে সরে এল।
স্বর্ণলতা এসেছে। সঙ্গে এসেছে কদম। স্বর্ণলতা বলল, তোমাদের জন্য খারাপ খবর আছে। পৃথিবীর নেতারা আমাদের কথা মানতে রাজি হয়নি। তারা আমাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে। তারা ভেবেছে আমরা রূপকথার গল্প। আমরা যে রূপকথার গল্প নই সেটা এবার তাদের বুঝিয়ে দেব।
থিয়া জানতে চাইল, বিশ্বনেতারা যে তোমাদের কথা মেনে নেয়নি তা কীভাবে জানতে পেরেছ ?
মাস্টারি গলায় স্বর্ণলতা বলল, শোনো মেয়ে, আমরা ঘাসে মুখ দিয়ে চলি না। আমরা চলি মাথা উঁচু করে। অর্র্ধেক কাজ করা আমাদের পছন্দ নয়। পৃথিবীকে যখন আমরা প্রজেক্ট হিসেবে নিয়েছি তখন পুরো পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ আমরা নিয়ে নিয়েছি। পৃথিবীতে আমাদের অনেক টাওয়ার আছে। যার মাধ্যমে আমরা পৃথিবীর সংবাদ সংগ্রহ করি। এই টাওয়ারগুলো হচ্ছে ডার্ক টাওয়ার। পৃথিবীর নেতারা বিরাট ভুল করল।
ক্রিসানা বলল, তোমরা কি আমাদের মেরে ফেলবে ? ধ্বংস করে দেবে আমাদের নভোযান ?
স্বর্ণলতা বলল, সেটা পরের ঘটনা। এবার অভিযান চালাব পৃথিবীর নেতাদের ওপর। তারা বুঝবে কত রঙে কত গোলাপি। তোমাদের নেতারা চাঁদ দেখেছে, শুক্র দেখে নাই।
স্বর্ণলতা আর কদম যেভাবে এসেছিল তারা সেভাবে ফিরে যাচ্ছে। কথাগুলো বলেই ঘুরে হাঁটা শুরু করেছে। থিয়া পেছন থেকে নরম গলায় ডাকল, স্বর্ণলতা শুনছ!
ডাক শুনে স্বর্ণলতা দাঁড়িয়ে পড়েছে। সে ঘুরে থিয়ার মুখোমুখি হলো। থিয়া বলল, আমাদের কি একবার পৃথিবীতে কথা বলতে দেবে ? কমিউনিকেশন মডিউল চালু করলে আমরা বিজ্ঞান একাডেমির কারও সঙ্গে কথা বলতে পারতাম।
কর্কশ গলায় স্বর্ণলতা বলল, তোমরা আর কোনও কথা বলবে না। পৃথিবীর সঙ্গে কথা যা বলার এখন আমরা বলব।
বলেই কদমকে সঙ্গে নিয়ে স্বর্ণলতা নভোযান থেকে বের হয়ে গেল।
পৃথিবীতে ঘটনা কী ঘটেছে তা থিয়া আর ক্রিসানা বুঝতে পারছে না। কেন পৃথিবীর নেতারা কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনতে রাজি হয়নি কেন বিজ্ঞান একাডেমি আরও জোর দিয়ে বিশ্বনেতাদের কাছ থেকে কথা আদায় করে নিতে পারেনি সব অজানা রয়ে গেল।
ক্রিসানা গম্ভীরভাবে নভোযানের কমিউনিকেশন মডিউলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। থিয়া জিজ্ঞেস করল, কী ভাবছ ?
ক্রিসানা বলল, পৃথিবীতে ঘটনা কী ঘটেছে জানা জরুরি।
থিয়া বলল, জানার তো কোনও উপায় নেই।
ক্রিসানা বলল, সেই উপায় নিয়ে ভাবছি।
চমকে উঠেছে থিয়া। কমিউনিকেশন মডিউল কীভাবে চালু করা যেতে পারে ধারণা করতে পারছে না। চালু করা গেলেও তা দিয়ে এখানকার প্রাণিদের এড়িয়ে পৃথিবীতে বার্তা পাঠানো সম্ভব হবে না। যারা এখানে বসে ডার্ক টাওয়ারের মাধ্যমে পৃথিবীতে নজরদারি করতে পারে তারা কীভাবে তাদের ওপর নজর রাখছে সে বিষয়ে অনুমান করা সম্ভব হচ্ছে না।
ক্রিসানা বলল, এনার্জি প্রয়োজন। এনার্জি জেনারেট করতে পারে এমন যা কিছু নভোযানে আছে তাকে কাজে লাগাতে হবে। নভোযানে আলো জ¦লছে। এই এনার্জিকে ট্রান্সফার করতে হবে কমিউনিকেশন মডিউল চালু করার এনার্জিতে।
থিয়ার চোখ-মুখে উজ্জ্বলতা দেখা দিয়েছে। এরকম সম্ভাবনার কথা সে ভেবে দেখেনি। এটা খুব সহজেই করা যেতে পারে। এমন কতগুলো ম্যাটেরিয়াল জোগাড় করতে হবে যা অল্প এনার্জিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। সে ধরনের ম্যাটেরিয়াল নভোযানে আছে।
এনার্জি জেনারেট করে কমিউনিকেশন মডিউল চালু করতে যত কষ্ট হবে ভেবেছিল, কষ্ট হয়েছে তার থেকে অনেক কম। বলা যেতে পারে কোনও কষ্টই হয়নি। সহজেই কমিউনিকেশন মডিউল চালু হয়ে গেছে।
বিজ্ঞান একাডেমির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। তবে সেখানে শুধু বিজ্ঞানী মলি আর দিয়াকে পাওয়া গেছে। ক্রিসানা বলল, অত্যধিক গোপনে আমরা এই কাজ করেছি। তারা জানতে পারলে আমাদের কী হবে জানি না। তবে আর কোনও উপায় ছিল না। তারা জানিয়েছে বিশ্বনেতারা তাদের দাবি মেনে নেয়নি। পৃথিবীর ওপর তারা এখন মারাত্মক ধরনের ক্ষতিকর হামলা চালাবে। পৃথিবীর অবস্থা সম্পর্কে আমাদের জানান।
বিজ্ঞানী মলি বললেন, আমাদের দুর্ভাগ্য বিশ্বনেতারা একমতে আসতে পারেননি। তারা সময় নিচ্ছেন। পৃথিবীর মানুষ বিশ্বনেতাদের ওপর খেপে গেছে। পুরো পৃথিবীজুড়ে শুরু হয়েছে বিশৃঙ্খল অবস্থা। তবে আমরা বিজ্ঞান একাডেমি থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করা উদ্যোগ নিচ্ছি।
বিজ্ঞান একাডেমি পৃথিবীকে রক্ষা করার কী উদ্যোগ নিচ্ছে তা জানা গেল না। তার আগেই কমিউনিকেশন মডিউল বন্ধ হয়ে গেছে। থিয়া আর ক্রিসানা ভেবেছিল এনার্জি ফুরিয়ে গেছে। তারা ভাবতেই পারেনি তাদের কমিউনিকেশন মডিউল বন্ধ করে দিয়েছে শুক্রগ্রহের প্রাণিরা।
নভোযানের পেছনের দরজা আবার খুলে গেছে। সেখান দিয়ে স্বর্ণলতা আসছে। সে একা আসছে না। তার সঙ্গে আরও পাঁচজন এসেছে। এই পাঁচজন আগে আসেনি। তাদের প্রত্যেকের চেহারা ভয়ংকর। যেন তারা মারামারি করতে এসেছে বলে মনে হচ্ছে।
স্বর্ণলতা হিসহিস করে বলল, বলেছিলাম পৃথিবীর মানুষ অতি চতুর। ধূর্ত। ধুরন্ধর এবং বোকা। আকাট বোকা। তারা নিজেদের ভালো বোঝে না। যে পাতে খায়, সেই পাত গর্ত করে। তোমরা হাতেহাতে তার প্রমাণ দিয়েছ।
থিয়া আর ক্রিসানা বুঝতে পারছে তাদের কমিউনিকেশন মডিউল চালু করার ব্যাপার ধরে ফেলেছে। কমিউনিকেশন মডিউল মাঝপথে তারাই বন্ধ করে দিয়েছে।
স্বর্ণলতা বলল, তোমরা এই গ্রহের প্রাণি হলে তোমাদের এখুনি শাস্তি দিতাম। মৃত্যুদণ্ড। তবে তোমাদের বাঁচিয়ে রাখার দরকার আছে। পৃথিবী সম্পর্কে তোমাদের কাছ থেকে আরও কিছু জানতে হবে। আর সেজন্য তোমাদের বাঁচিয়ে রাখছি। পৃথিবীর ঝামেলা আগে মিটিয়ে নিই। তারপর তোমাদের ব্যবস্থা নেব। এখন শাস্তি হিসেবে তোমাদের জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে সর্বনিম্ন মাত্রার এনার্জি। এর চেয়ে বেশি এনার্জি আশা করবে না।
ছয়জন একসঙ্গে নভোযান থেকে বেরিয়ে গেল। বেরিয়ে যাওয়ার সময় শব্দ করে নভোযানের দরজা বন্ধ করেছে। মনে হলো চিরদিনের জন্য এই দরজা বন্ধ হয়ে গেছে।
থিয়া আর ক্রিসানা বুঝতে পেরেছে তারা আটকা পড়ে গেছে। অনুমতি না নিয়ে কমিউনিকেশন মডিউল চালু করাতে শুক্রগ্রহের প্রাণিরা ভীষণ রেগে গেছে। আর কোনওদিন হয়তো তাদের পৃথিবীতে ফেরত যাওয়া হবে না। তাছাড়া বিজ্ঞান একাডেমি পৃথিবী রক্ষার কী উদ্যোগ নিয়েছে তাও জানা গেল না। বিজ্ঞান একাডেমির উদ্যোগ বিশ্বনেতারা মানবেন এমন নিশ্চয়তা নেই। আর যদি মেনেও নেন তাহলেও কার্বন নিঃসরণ বন্ধের দৃশ্যমান চেহারা পৃথিবী কতদিনে দেখাতে পারবে তা অনুমান করা যাচ্ছে না।
গভীর চিন্তার মাঝখানে থিয়া বলল, আমরা এখান থেকে চলে যাব।
ক্রিসানা বিষণ্ন গলায় জানতে চাইল, কীভাবে ?
থিয়া বলল, কমিউনিকেশন মডিউল চালু করতে গিয়ে এনার্জি ট্রান্সফরমেশনের সময় এই ভাবনা মাথায় এসেছে। পরে আমি একা আবার ল্যাবে গিয়েছিলাম। পুরো ল্যাব ঘুরে দেখেছি। তাদের অপারেটিং মডিউল পড়েছি। পিংক রে পাঠানোর এটাই শুক্রগ্রহের একমাত্র ল্যাব। তারা চব্বিশ বছর সময় ব্যয় করে ল্যাব বানিয়েছে। পিংক রে তৈরির মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছে এন্টিম্যাটার।
ক্রিসানা বলল, এখান থেকে যাওয়ার কী চিন্তা করছ ?
থিয়া বলল, ল্যাবের স্টোরে প্রচুর পরিমাণে এন্টিম্যাটার আছে। আমাদের নভোযানে আছে ম্যাটার। আমরা আমাদের নভোযানের সামনের দেয়ালে যথেষ্ট ম্যাটার জোগাড় করে রাখব। তারপর সেখানে এন্টিম্যাটার ছুড়ে দেব।
ক্রিসানা অস্থির গলায় বলল, তাতে ঝুঁকি অনেক বেশি। আমাদের নভোযান ধ্বংস হয়ে যেতে পারে!
থিয়া বলল, ঝুঁকি না নিলে এখানে আমরা না খেয়ে মারা যাব।
ক্রিসানা অবাক হয়ে বলল, না খেয়ে!
থিয়া বলল, আমাদের নভোযানের খাবার ফুরিয়ে আসছে। এখানকার প্রাণিরা কী খায় জানি না। তারা আমাদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়ার জন্য বাঁচিয়ে রাখলেও খাবার দিতে পারবে না।
ক্রিসানা বলল, তুমি সত্যি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হেঁয়ালি করতে পারো।
থিয়া বলল, বোন আমার, ভরসা রাখো। আমরা বেঁচে পৃথিবীতে ফিরব। আর বাঁচিয়ে যাব পৃথিবীকে। এখন অপেক্ষা তাদের ল্যাব ফাঁকা হওয়ার। ল্যাব থেকে তারা সরে গেলেই আমরা সেখানে ঢুকে প্রয়োজনীয় এন্টিম্যাটার নিয়ে আসব।
ক্রিসানা বলল, তারা আমাদের ওপর তীক্ষè নজর রেখেছে। একবার ধরা পড়েছি। আবার ধরা পড়লে তারা আমাদের মেরে ফেলবে।
থিয়া বুকের ভেতর গভীর শ্বাস টেনে নিয়ে বলল, আসার সময় পৃথিবীর মানুষকে কথা দিয়ে এসেছি পৃথিবীকে রক্ষা করেই ফিরব। শুধু মনে রাখো পৃথিবীর সাড়ে সাতশ কোটি মানুষ আমাদের সঙ্গে আছে।
ক্রিসানা দুই চোখ বন্ধ করে বুকের ভেতর বাতাস টেনে নিল। অনেক দিন পর থিয়া আর ক্রিসানা পাশাপাশি বসে প্রার্থনা করল। নভোমণ্ডলের কোথাও মহাশক্তি লুকিয়ে আছে। ডার্ক এনার্জি। সেই শক্তি থেকে সামান্য শক্তি তারা চেয়ে নিল।
১৪.
টানা আটচল্লিশ ঘণ্টা ল্যাব শান্ত হয়ে আছে। এই আটচল্লিশ ঘণ্টার হিসাব থিয়া আর ক্রিসানা বের করে ফেলেছে তাদের বানানো ঘড়ির মাধ্যমে। বালুঘড়ির আদলে তারা জিপসাম দিয়ে ঘড়ি বানিয়েছে। সেই ঘড়ি থেকে সময় বুঝে তারা দিনরাতের হিসাব করে যাচ্ছে।
ল্যাব হয়ে আছে শুনসান। গত আটচল্লিশ ঘণ্টায় কেউ তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেনি। থিয়া আর ক্রিসানা সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা ল্যাবে একসঙ্গে যাবে না। একজন একজন করে যাবে। একজন ল্যাবে থাকা অবস্থায় যদি এখানে কেউ আসে তাকে কিছুক্ষণ আটকে রেখে সংকেত পাঠাবে। তখন ল্যাবে যে আছে সে চলে আসবে। আবার ল্যাবে ঢুকে কেউ যদি অসুবিধায় পড়ে যায় সেও একইভাবে সংকেত পাঠাবে। তারা নিজেদের মধ্যে সংকেত আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করেছে।
পরবর্তী ছত্রিশ ঘণ্টা কেউ তাদের খোঁজ নিতে আসেনি। এই ছত্রিশ ঘণ্টায় তারা দুজনে ভাগ করে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিম্যাটার নিয়ে এসেছে। নভোযানের সামনের দেয়ালে প্রচুর পরিমাণে ম্যাটার জোগাড় করে রেখেছে। এখন বিষয়টা অংকের।
থিয়া বলল, ম্যাটার আর এন্টিম্যাটারের সংঘর্ষে নভোযানের সামনের অংশ খুলে চলে যাবে।
ক্রিসানা বলল, তাতে বিশেষ অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। সামনের অংশ নভোযানের প্রতিরক্ষা চেম্বার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাই না ? পৃথিবীতে ফেরার সময় আবহাওয়া অনুকূল থাকলে আমাদের সেটার প্রয়োজন হবে না আশা করছি।
থিয়া বলল, আমাদের দুটো কাজ করতে হবে। প্রথম কাজ হচ্ছে নভোযানের সিকিউরিটি চেম্বার আর নভোযানের মেইন বডির মাঝের অংশ হালকা করে দিতে হবে। যাতে ম্যাটার আর এন্টিম্যাটারের সংঘর্ষে সিকিউরিটি চেম্বার ছুটে যাওয়ার সময় মেইন বডিকে টেনে ধরতে না পারে এবং এত জোরে মেইন বডিকে ধাক্কা দেয় যাতে নভোযান ছিটকে মহাশূন্যে গিয়ে পড়ে।
ক্রিসানা জানতে চাইল, আর দ্বিতীয় কাজ ?
থিয়া বলল, দ্বিতীয় কাজ হচ্ছে কতখানি ম্যাটার এখানে আছে। তাতে কী পরিমাণ এন্টিম্যাটার ছুড়ে দিলে আমরা যা চাইছি সেই ফলাফল পাওয়া যাবে। যাতে ম্যাটার আর এন্টিম্যাটারের সংঘর্ষে নভোযানের মূল অংশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আবার ল্যাবস্টেশন যেহেতু এখানে, সেই ল্যাবস্টেশন চিরদিনের জন্য ধ্বংস হয়ে যায় সেই হিসাব করা।
ক্রিসানা আর থিয়া সেই অংক নিয়ে গভীর চিন্তায় ডুবে গেল।
স্বর্ণলতা এল ছত্রিশ ঘণ্টা পর। এসে বলল, তোমাদের কী খবর ?
থিয়া বলল, আমাদের খাবার শেষ হয়ে আসছে। কিছু প্রোটিন দরকার। আর গ্লুকোজ। ভিটামিন, মিনারেল লাগবে না।
স্বর্ণলতা বিভ্রান্ত হয়ে গেছে। সে ভেবেছিল থিয়া আর ক্রিসানা তাদের ধরে কান্নাকাটি শুরু করবে। তারা আছে খাবার চিন্তায়।
স্বর্ণলতা বলল, তোমাদের জন্য প্রোটিন আর গ্লুকোজের ব্যবস্থা করা হবে। আর কিছু চাই তোমাদের ?
ক্রিসানা কিছু বলল না। থিয়া বলল, সারা দিন রাত এখানে ঝিম ধরে বসে থাকি। ভালো লাগে না। হয় আমাদের নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলো, নাহয় বিনোদনের ব্যবস্থা করো।
আবার বিভ্রান্ত হয়ে গেছে স্বর্ণলতা। রেগেমেগে বলল, অ্যাই মেয়ে, আমার সঙ্গে ফাজলামি করো! তোমার ফাজলামি দাঁতের ফাঁক দিয়ে বের করে দেব। তুমি স্বর্ণলতাকে চেনো নাই। স্বর্ণলতা কী জিনিস এখনও বোঝো নাই।
থিয়া শান্ত গলায় বলল, যদি দুটো বই দিয়ে যেতে তাহলে দুজনে বই পড়ে সময় কাটাতে পারতাম। শুক্রগ্রহের লোককাহিনি।
স্বর্ণলতা কিছু বলল না। সে ঘুরে ঘটঘট করে ফিরে চলে গেল।
ক্রিসানা বলল, তাকে রাগিয়ে দিলে কেন ?
থিয়া বলল, তার চিন্তায় জট পাকিয়ে দিয়েছি। যদি সে এক ঘণ্টার ভেতর রাগ দেখাতে ফিরে না আসে তাহলে এক দিনের ভেতরও আসবে না। সে চব্বিশ ঘণ্টা আর এখানে না আসুক সেটা চাইছি।
এক ঘণ্টার ভেতর স্বর্ণলতা ফিরে এল না। এই সময়ে শুক্রগ্রহের কোনও প্রাণি নভোযানে আসেনি।
তরুণ বিশ্বনেতারা কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন। তারা ঘোষণা দিয়েছেন পৃথিবীতে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ গাছ নিশ্চিত করা হবে। বন উজাড় করা যাবে না। জীবাশ্ম জ¦ালানির ব্যবহার কমিয়ে দেওয়া হবে। তেল, গ্যাস পোড়ানো সীমিত করা হবে। কার্বন-ডাই অক্সাইড আর মিথেনের মতো ক্ষতিকারক গ্যাস নির্গমন বন্ধ করা হবে। নবায়নযোগ্য জ¦ালানি ব্যবহার করা হবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা হবে। বাতাস থেকে গ্রিন হাউজ গ্যাস দূর করা হবে। বাড়িতে এসি, ওয়াশিং মেশিন ব্যবহার বন্ধ করে মানুষ প্রাকৃতিক পরিবেশে থাকবে। বাড়িতে বাতাস চলাচলের স্বাভাবিক ব্যবস্থা থাকবে। কাপড় শুকানো হবে রোদ্দুরে।
তরুণ বিশ্বনেতাদের এই সিদ্ধান্ত পৃথিবীর মানুষ মেনে নিয়েছে। বিজ্ঞান একাডেমি খুশি হয়েছে। তরুণ বিশ্বনেতাদের নিয়ে বিজ্ঞান একাডেমি শুক্রগ্রহের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করল। যোগাযোগ করা সম্ভব হলো না। শুক্রগ্রহ পৃথিবীর সঙ্গে সব রকমের যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। আনন্দের সঙ্গে পৃথিবীতে গভীর বিষাদ নেমে এল। পৃথিবীর মানুষ বুঝতে পারছে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়ার কারণে থিয়া আর ক্রিসানাকে চিরদিনের মতো হারিয়ে ফেলেছে।
পৃথিবীর স্পেস টেলিস্কোপে হতবাক করার মতো দৃশ্য ধরা পড়েছে। হা করা বিশাল নীল তিমির মতো কোনও কিছুর ভেতর থেকে ছুটে বের হয়ে আসছে নভোযান স্পেস ডিএম। আকাশে উলটেপালটে পাক খাচ্ছে। পাক খেতে খেতে প্রবল বেগে নভোযান আকাশের অনেক নিচে পৃথিবীর কাছাকাছি চলে এসেছে।
ওদিকে নীল তিমির মতো দেখতে ভয়ংকর সেই দানবের চেহারার কিছু দাউদাউ করে জ¦লছে। মহাকাশে গনগনে লাল আগুন ছড়িয়ে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
শুক্রগ্রহের প্রাণিদের মতো পৃথিবীর মানুষও ধারণা করতে পারেনি শুক্রগ্রহের ল্যাবস্টেশনে পৃথিবী ধ্বংসের জন্য মজুদ করে রাখা বিপুল পরিমাণ এন্টিম্যাটার সেখানকার ম্যাটারের সঙ্গে সংঘর্ষে শুক্রগ্রহের কী বিশাল ক্ষতি করেছে। আগামী কয়েক শত বছরেও শুক্রগ্রহের পক্ষে এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। ম্যাটার আর এন্টিম্যাটারের সংঘর্ষে যে প্রচণ্ড শক্তির বিকিরণ হয়েছে তাতে শুক্রগ্রহের আগামী কয়েক প্রজন্ম শারীরিক ও মানসিক অস্বাভাবিকতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করবে।
নভোযান স্পেস ডিএম ধীরে ধীরে নিজস্ব গতি ফিরে পাচ্ছে। বিজ্ঞান একাডেমিতে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। তারা থিয়া আর ক্রিসানার সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে।
নভোযান স্পেস ডিএম স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে আসছে পৃথিবীর দিকে। থিয়া আর ক্রিসানা পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছে। শেষ কয়েক দিনের ঘটনা বিজ্ঞান একাডেমিকে জানিয়েছে। ফিরে আসার আগে তারা পৃথিবীতে পিংক রে পাঠানোর উৎস শুক্রগ্রহের ল্যাবস্টেশন ধ্বংস করে দিয়ে এসেছে বলেও জানাল।
থিয়া আর ক্রিসানার কথা বিজ্ঞান একাডেমি তখুনি তরুণ বিশ্বনেতাদের জানিয়ে দিয়েছে। তাদের কয়েকজন থিয়া আর ক্রিসানার সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
বিজ্ঞান একাডেমি তরুণ বিশ্বনেতাদের সঙ্গে থিয়া আর ক্রিসানার কথা বলার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। বিশ্বনেতারা আবেগ মেশানো গলায় বললেন, হে সাহসী বীর মানব সন্তান, পৃথিবী তোমাদের অভিনন্দন জানাচ্ছে। তোমরা পৃথিবীর উষ্ণ অভিবাদন গ্রহণ করো। পৃথিবীকে রক্ষা করে তোমরা পৃথিবীর সাড়ে সাতশ কোটি মানুষকে কৃতজ্ঞ করেছ। তোমরা অমর হয়ে রইবে পৃথিবীর ইতিহাসে। অধীর আগ্রহে পৃথিবী তোমাদের ফিরে আসার প্রতীক্ষা করছে।
থিয়া বলল, জয় এখনও আমাদের পুরোপুরি আসেনি। পৃথিবীতে শুক্রগ্রহের তথ্য সংগ্রহের অনেকগুলো গোপন টাওয়ার আছে, ডার্ক টাওয়ার। সেগুলো খুঁজে দ্রুত ধ্বংস করতে হবে। সেই সঙ্গে শুক্রগ্রহের সঙ্গে যোগাযোগ করে আগামীতে ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে তাদের বিরত থাকতে আহ্বান জানাতে হবে। অবশ্য শুক্রগ্রহ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তরুণ বিশ্বনেতারা বিজ্ঞান একাডেমির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এই কাজ করবেন বলে জানালেন।
নিউজ পোর্টালের সামনে বসে এবাদত গায়েন আবার কান্না শুরু করেছেন। থিয়া আর ক্রিসানা পৃথিবীতে ফিরে আসছে সেই খবর নিউজ পোর্টাল সরাসরি সম্প্রচার করছে। এবাদত গায়েন, শান্তা, আয়ান আর মরিয়ম চাচি বসে আছে। খবিরউদ্দিন এসে তাদের পাশে বসেছে।
খবিরউদ্দিন বলল, শান্তা শোনো, থিয়া পৃথিবীতে ফিরে আসার পর তুমি আর আয়ান কি তার কাছে চলে যাবে ?
শান্তা বলল, সেরকম কথা তাদের দিয়ে এসেছি।
খবিরউদ্দিন কাতর গলায় বলল, আমার একখানা আর্জি আছে। তোমরা চলে যাওয়ার পর তোমাদের দাদার দায়িত্ব আমি নিতে চাই। তিনি হোমে যাবেন না। বাড়িতে আমার কাছে থাকবেন। যতদিন বাঁচি তার সেবাযত্ন করে যেতে চাই।
এবাদত গায়েন রাজি হয়েছেন। তিনি খবিরউদ্দিনকে তার বাড়িতে রেখে দেবেন।
তরুণ বিশ্বনেতারা থিয়া আর ক্রিসানা ফিরে আসা উপলক্ষে পৃথিবীতে তিন দিনের ছুটি ও উৎসব ঘোষণা করেছেন। পৃথিবীর মানুষ থিয়া আর ক্রিসানাকে অভ্যর্থনা জানানোর বিশাল আয়োজন করেছে। সেই আয়োজনে শামিল হয়েছেন এবাদত গায়েন, খবিরউদ্দিন, মরিয়ম চাচি, শান্তা আর আয়ান।
পৃথিবীর সবাইকে এমন গভীর কোনও আনন্দ একসঙ্গে অংশ নিতে আগে কখনও দেখা যায়নি। আজ পৃথিবীর সকল মানুষ নিজেদের ভেতরের ভেদাভেদ ভুলে এক হয়ে গেছে।
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



