
তিনটা রিং হতেই ফোনটা ধরে ফেলল ভীষণ গুরুগম্ভীর গলার এক পুরুষকণ্ঠ। রাশার ধড়ে পানি এল। তাও যে ক্যাবে ফেলে আসা ফোনটা কেউ পেয়েছে। একেবারে বেহাতে চলে যায়নি। এবার জিজ্ঞেস করা যাক।
হ্যালো ? জি বলুন।
জি, এই কিছুক্ষণ হলো আমি আমার মোবাইলটা ভুলে একটা কালো ক্যাবে ফেলে এসেছি। তাড়াহুড়ায় ব্যাগ থেকে ভাড়া বের করতে গিয়ে, কী করে যে ফেলে এসেছি! বাড়ি ঢুকেও বেশ কিছু সময় খেয়াল করিনি। একটা জরুরি ফোন করার প্রয়োজন হতেই, খোঁজাখুঁজি করে আর ফোনটা পাচ্ছি না। মনে পড়ল ভুলে হয়তো ক্যাবেই ফেলে এসেছি।
কিছু সময় নিস্তব্ধতা ছেদ দিল।
জি। আমি শ্যামলী যাব বলে ক্যাবটা ঠিক করেছিলাম। দেখলাম খুব অনাদরে অবহেলায় এক পাশে মন মরা হয়ে পড়ে আছে মোবাইলটা। মালিক আপনি ?
জি এটা আমার ফোন। দয়া করে যদি ফোনটা আমাকে ফিরিয়ে দেন তবে খুব উপকার হয়। রাশার গলায় এক ধরনের আকুতি ঝড়ে পড়ে।
আপনার মোবাইল আমি নিয়ে নেবার তো কারণ নেই। নিশ্চয়ই আমি আপনাকে ফেরত দিয়ে দেব। তবে তার আগে কিছু উপযুক্ত প্রমাণ দিলে আমি আশ্বস্ত হতে পারি, আপনিই এর যথার্থ মালিক।
রাশার খানিকটা বিরক্তি লেগে ওঠে। কী নচ্ছার লোকটা। ওর মোবাইল না হলে, কী করে নম্বর জেনে হারানো মাত্রই ফোনটার খোঁজে এই নম্বরে ফোন দিল ও। যাক, এখন ভদ্রলোকের সঙ্গে এমন কিছু উলটা-পালটা কথা বলে কাজ নেই। তার চেয়ে জিনিস উদ্ধার করাই বড় কথা।
আমার নাম রাশা। আপনি দেখুন আমার সেটের গায়ে ছোট একটা জ স্টিকার লাগান আছে। সঙ্গে কয়েকটা স্মাইলি হলুদ রঙের স্টিকার।
আপনি যদি কিছু মনে না করেন তবে বলি, আমার প্রথম যে নম্বরটা সেভ করা আছে সেটা আকাশলীনা নামের একটি মেয়ের আর শেষ নম্বরটা যুবায়ের নামের একটা ছেলের।
সরি, রাশা আমার একটা জরুরি ফোন এসেছে। আমি আপনাকে কিছু সময় পরে ফোন করি কেমন। তখন কথা হবে। আমি এই নম্বরেই আপনাকে ফোন করব।
খট করে ফোনটা কেটে দিল।
ভীষণ মন খারাপ করে খাটের একপাশে বসে থাকল রাশা। কী কষ্ট করে তিল তিল করে টাকা জমিয়ে এই ফোনটা কিনেছে। নিজের কিছু অহেতুক অস্থিরবুদ্ধির কারণে প্রায় সময় ওকে খেসারত দিতে হয়। আর এসব কারণে অহেতুক মনের হা পিত্যেশ বড়ই অশান্ত করে তোলে ওকে। আজ মে মাসের সাত তারিখ। আগামী সাতাশ তারিখ থেকে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা। মনে হতেই পায়ের নিচে শর্ষে দানা সুড়সুড়ি দেওয়ার মতো এক অনুভূতি ওকে পেয়ে বসে। কী কপাল! কী কপাল! আদৌ মোবাইলটা যথাসময়ে ও পাবে কি না কে জানে।
দোদুল্যমানতার পেণ্ডুলাম ওর মনের মাঝে অতি দ্রুত দুলতে থাকে। সারা ঘরে পায়চারি করে রাশা।
এক সময় বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। সামনের বাড়ির ছাদে আজও যথাসময়ে উঠতি কিশোরীরা পাঁচ-ছয়জন উঠেছে। কারণে-অকারণে হেসে গড়িয়ে পড়ছে এ ওর উপর। এর মাঝে হঠাৎ একজন এক দৌড়ে একটা মোবাইল নিয়ে ছাদের কোনায় দাঁড়ানো মেয়েটাকে দিতে গেল। বুঝি বা তারই ফোন এসেছে।
রাশার সারা মনের মাঝে কেবল মোবাইলের জন্যে টাইফুন। থেকে থেকে মন আকাশে হলুদাভ আশার আলো সে মোবাইল ফিরে পাবেই।
মোবাইল হারানোর ঘটনাটা এখনও মাকে জানায়নি। মাকে কোনও একটা কিছু বলার নানা ফ্যাসাদ। মুহূর্তে আটলান্টিকের ওপারে পৌঁছে যাবে সে খবর এক দণ্ডে। বড় খালা, মেজ খালা এভাবে এক নিমিষে মহামারি। মামারাও জেনে যাবে। তাতে আরেক ঝামেলা। অনেকেই মোবাইল কিনে দেবার জন্যে এগিয়ে আসবে। রাশার এসব একেবারেই পছন্দ না।
বাবা চলে যাবার পর থেকে এ বাড়িতে তিনটে মানুষ ওরা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামলে বাড়িটা যেন শুনশান হয়ে পড়ে। এ সময় বাড়িটার হৃৎপিণ্ড যেন কিছু সময় বিশ্রামে থাকে। হাতের কড় গুনে দেখে বাবা চলে গেছে আজ সাত বছর। অথচ এখন সন্ধেবেলা হলেই মনে হয় কলিং বেল বাজলে বুঝি হাতে দুই ব্যাগ বাজার নিয়ে বাবা ঢুকবে। বিরাট করে ডাক দিয়ে উঠবে, ‘রাশা, মিশেল এই তোরা সব কোথায় ? এই দেখ নতুন লিচু উঠেছে। সেই লিচু নিয়ে এসেছি।’ বাবার কথা মনে হতেই মনের মাঝের সেই দুঃখকাতর ঘুঘুর ডাক আবার শুনতে পায়।
এ বাড়ির ছাদে মার অনেক শখের গাছগাছালি। কবুতর, পাখি। এক পাশে তিন কোনা করে সবজিবাগান। লাউ, কুমড়ো, পুঁইলতা, ডাঁটাশাক এসব গাছগাছালি। বিকেলের সিকি ভাগ সময় নিচে কাটিয়ে মা নিড়ানি হাতে কাজের মেয়েটাকে নিয়ে ছাদেই সময় কাটান। বাগান আর মা যেন দুই সই।
সন্ধ্যার আলো সরে গিয়ে কালো হয়ে উঠছে চারিদিক। রাশার মনে পড়ে ঘণ্টা দুয়েক হয়ে গেছে কই ওই ভদ্রলোক তো ফোন করেনি। মার ফোন থেকে ফোন করেছিল। ভদ্রলোকের নাম ধাম, ফোন নম্বর কিছুই তো রাখা হয়নি। সে সুযোগও পায়নি।
আবার মনের মধ্যে ফোন হারানোর ব্যথাটা ককিয়ে ওঠে।
মা তোমার ফোনটা আমার কাছে আজ থাক। বলেছি তো আমার ফোনটা একটু ডিস্টার্ব করছিল তাই সারাতে দিয়েছি।
মার পরনে চাপা রঙের ধনেখালি একটা শাড়ি। নামাজ পড়ে উঠেছেন মনে হয়। ডাইনিং টেবিলে রাখা খাবারগুলো সরপোশ দিয়ে ঢেকে রাখছেন মা। খাবার ঘরের আধো অন্ধকারে মার মুখটা কেমন শুকনো দেখাল। ডায়াবেটিসটা কি বেড়েছে নাকি ?
কী রে এত সুন্দর করে বেলের শরবত করে রাখলাম। খেয়ে দেখ ?
হ্যাঁ মা। খাচ্ছি। তুমি খেয়েছ ?
হাত বাড়িয়ে গ্লাসটা এগিয়ে দেয় মা। মার হাতের দুটো চুড়ি। কী সুন্দর লাগছে। একবার সংসারের টানাপোড়েনে বন্ধক দিতে হয়েছিল। কত কষ্ট করে মা একটু করে টাকা জমিয়ে পাঁচ বছর পর এই চুড়ি জোড়া ছাড়িয়ে এনেছিলেন সে গল্প অনেকবার করেছেন।
মানুষের জীবনের স্মৃতির ভাগাড়ে কতই না আবর্জনা। সব কি আর টাটকা মুচমুচে স্বাদের রসদ!
বেলের শরবতটা খেয়ে ভালোই লাগল রাশার।
বুবু, আসো আজ একটা মুভি দেখি। নতুন একটা মুভি এনেছি।
মিশেলের সঙ্গে ওর বয়সের ব্যবধান বছর ছয়েকের হলেও দুই ভাই বোনে ভালোই দোস্তি। চুপি চুপি মোবাইল হারানোর ঘটনাটা মিশেলকে বলে রেখেছে। কারণ দরকারে বেদরকারে কত-কেউই না ফোন করতে পারে। মার ফোন আর কতদিন বা আটকে রাখা যাবে।
না। আজ মুভি দেখব না। আমি তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাব। তুই মার মশারিটা আজ একটু খাটিয়ে দিস।
রাতে ঘুমাতে যাবার আগে একবার গোসল করে নেওয়া ওর পুরানো অভ্যেস। চুলগুলো অনেক লম্বা হয়ে গেছে। পিঠ ছাড়িয়ে অনেকটাই নেমে গেছে। মিশ কাল ঘন চুল ওর। ডিউক ওর চুল খুব পছন্দ করে। ঘন কাল চুলে হাত দিয়ে বিলি কাটে আর মুখে আওড়ায় ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা’। চুল কাটলে ভীষণ ক্ষেপে যায় ও। এবার গরমে চুল কাটতে চেয়েছিল। অনুমতি মেলেনি। বিষয়টা নিয়ে এত বেশি মন খারাপ করে আর সম্পর্কের আবহাওয়া বদলে যায় যে, এক রকম চুল না কাটার বিষয়টা মেনেই নিয়েছে রাশা।
এত বড় বাড়ির এক কোণে ওর ঘরটা। গোছানো পরিপাটি। আজ এত গরম পড়েছে। দক্ষিণ দিকের পর্দাগুলো টেনে দিয়েও একটুও দখিনা বাতাস জুটল না কপালে।
বিছানায় আধশোয়া হতেই মার ফোনটা কড় কড় করে বেজে উঠল। ফোনটা হাতে নিতেই রাশা দেখে অপরিচিত একটা নম্বর। নিজের গলাটা কেশে পরিষ্কার করে নিয়ে ফোনটা ধরল।
হ্যালো, রাশা বলছেন ? আমি আপনার মোবাইল পাওয়া সে-জন।
অদ্ভুত সুন্দর ভার ভারিক্কি প্রেমালু গলা। গলার প্রতি পরতে পরতে আবেগের দাপাদাপি।
আধশোয়া রাশার কানে যেন কোনও সুদূর থেকে ভেসে এল ভরাট এক প্রেমিক কণ্ঠ। বহু প্রতীক্ষার।
এ কণ্ঠ কোনও এক ইথার থেকে প্রতি রোমকূপের গোড়ায় গোড়ায় শীত শিহরণ এনে দিল মুহূর্তেই।
জি। আমি রাশা।
২.
মোবাইলের বিষয়ে অচেনা ভদ্রলোকের সঙ্গে বেশ খানিক সময় কথা হয়েছে। পরিচয় না থাকায় নামটা ছাড়া আর কিছুই জিজ্ঞেস করা হয়নি। নাম জিজ্ঞেস করতেও একটু সংকোচ কাজ করছিল। সব জড়তা ভেঙে জানা গেল ওনার নাম আশেক রহমান। রাশা নিশ্চিত মোবাইলটা ফেরত পাওয়া যাবে।
আশেককে কী বলে সম্বোধন করবে তা নিয়ে নিজের ভেতরেই কেমন একটা খচখচানি কাজ করছিল। কোনও কিছু ডাক ছাড়াই মোবাইলের বিষয়ে জরুরি কথা হলো গোটা দশেক বাক্যের বিনিময়ে ।
আশেক সাহেব মানুষটির সঙ্গে কথা বলে ভদ্রই মনে হলো। মোবাইলটি তিনি কীভাবে ফেরত দিতে পারেন, সে বিষয়ে অতি উৎকণ্ঠিত বলে মনে হলো। কীভাবে তার জিনিসটি সে ফেরত পাবে এ বিষয়টির পরিকল্পনা তড়িঘড়ি করে জানানো ঠিক হবে না ভেবে অল্প কিছু কথা বলে আশেকের ফোন নম্বরটি রেখে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল রাশা।
সকালে মেঘের গুরু গুরু আওয়াজে ঘুমের দেবী বোধ করি আটঘাট বেঁধে রেখেছে এত সময়। দেয়ালঘড়িতে তাকিয়ে দেখে বেলা সাড়ে এগারটা। যাহ! মেজাজটাই বিগড়ে গেল। কাল ডিউককে বলে রেখেছিল আজ দশটায় বেইলি রোডে দেখা করবে। এর মাঝে মোবাইল হারিয়ে গিয়ে সব কিছু লণ্ডভণ্ড। ডিউককে মার ফোন থেকে ছোট করে মোবাইল হারাবার ঘটনাটাই কেবল বলেছে। আর ওই ফোনে রাশা না বলা পর্যন্ত ফোন করতে মানা করে দিয়েছে।
আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠতে গিয়ে বালিশের পাশে মোবাইলটা হাতে নিয়ে ডিউককে একটা ফোন করল।
কী কারণে যেতে পারেনি তার অর্ধেকটা বলার আগেই ডিউক বলা নাই কওয়া নাই ফোন কেটে দিল। রাশার আজ খবর আছে। ভীষণ বেবুঝ এই ছেলেকে। এই ঘটনার জন্যে অনেক বেগ পোহাতে হবে। এত বেশি মান-অভিমানের দড়ি টানাটানি খেলা ওর মোটেও আর ভালো লাগে না। কথায় কথায় ওকেই কেবল মান ভাঙ্গাতে হবে। এত রোমান্টিকতা আর ছেলেমি আহ্লাদের ডোবায় এলোপাথাড়ি নাকানি চুবানি খেতে আর ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে চার বছরের এই সম্পর্ক থেকে কীভাবে বের হয়ে আসা যায় তাও ভাবে।
পর্দা সরিয়ে দেওয়ায় ঘরময় রোদের ঘুঙুর নাচন। বৃষ্টির পর হিমেল বাতাসে মনটাও কেমন যেন ময়ূরের পেখমের মতো ডানা মেলে দিয়েছে।
কী মনে হতেই মার মোবাইলটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকল। মনের ময়ূর আজ এ কী কথা বলছে। নিজের মনের কম্পাস কোন দিকে তাক করে বসে আছে।
মনের সমস্ত দ্বিধা এক ধাক্কায় পেছনে সরিয়ে আশেককে ফোন করে বসে রাশা।
ফোনে রিং হচ্ছে, সেই সঙ্গে হৃদয়ের ধুকপুকুনি ক্রমেই বাড়ছে। আর কিছু নয়, কী সুন্দর গম্ভীর ওই গলা একবার শুনলেই মনের অমাবস্যা তিথিতে একটু হলেও আলো ঝলকাবে।
হ্যালো। রাশা, কেমন আছেন ?
আসসালামু আলাইকুম আশেক ভাই। জি আছি ভালো।
আজ সকালে খুব সুন্দর বৃষ্টি, দেখেছেন! আমি আমার অফিসের আঠারো তলার ওপর থেকে খুব মজা করে বিজলি, বৃষ্টি দেখলাম। কিছু বৃষ্টিজল ট্রেতে জমিয়ে রাখলাম। চমৎকার একটা সকাল আজ।
গমগমে গলার মানুষটি, যাকে ও কখনও দেখেনি, কেবল গতকাল সন্ধে থেকে দুই-তিনবার কথা হয়েছে, তার এমন কথাগুলো গল্পের বইয়ের পাতায় লিখে রাখা গোছানো শব্দ যেন। ওর কানে বার বার কী যেন ঢেলে দিচ্ছে।
মোবাইলটা নেবেন না ? বাড়ির ঠিকানা বললে অবশ্য আমি আমার পিওনকে দিয়ে পৌঁছে দিতে পারি। আপনি ইচ্ছে করলে আমার অফিসেও চলে আসতে পারেন।
না। আমার বাসায় কষ্ট করে কাউকে দিয়ে পাঠাতে হবে না। আমার পক্ষে আপনার অফিসে যাওয়াটা ঠিক শোভন হবে বলে মনে…।
কথাটা শেষ করবার আগেই হা হা অট্টহাসির রোলে আশেক সাহেব ফেটে পড়ে।
আপনি নেহায়েত সনাতন চিন্তা ধারণ করেন। ঠিক আছে, বলুন কীভাবে আমি আপনাকে এটা দিতে পারি ?
রাশার মাথায় হঠাৎ করে তেমন কিছুই আসে না। কিছু সময় জমাট বরফগুলো গলা বন্ধ করে রাখে।
আজ বিকেল পাঁচটায় বেইলি রোডের পিজা ইনে দেখা করে তুলে নিই।
ঠিক আছে। আমাকে চিনতে পারবেন তো ? আমি আপনার গোলাপি কাভারে মোড়ানো মোবাইলটা টেবিলের উপরে রেখে একলা একটা গোল টেবিলে একাই থাকব। আগে পৌঁছে গেলে খানিক অপেক্ষা করবেন, কেমন ?
ঠিক আছে তাহলে বিকেল পাঁচটায়। আমার সঙ্গে এই মোবাইলটাও থাকবে। প্রয়োজনে ফোন করতে পারেন।
ঠিক আছে প্রয়োজন মনে করলে না হয় করব। দেখা হবে রাশা।
রাশা ফোনটা হাতে নিয়ে মিনিট কুড়ি বসে থাকে ঠায়।
মনে হচ্ছে সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়ালে, পায়ের নিচে যেমন বালি সরে যেতে থাকে, ঠিক তেমনি অনুভূতি হচ্ছে।
রাজ্যের কৌতূহল আর অদেখা বিস্ময়ের রংগুলোর রুবিক্স কিউবের রঙ মেলানোর চিন্তায় বিভোর মন।
বুড়ো আঙুলের নখ দিয়ে সাদা মেঝেতে আঁকিবুঁকি কেটে মনের অস্থিরতা কমায় কিছুটা।
গোসল সেরে আলমারি থেকে অভ্রনীল রঙের খুব প্রিয় একটা মনিপুরী শাড়ি বের করল। ছোট লাল রঙের মনিপুরী পাড়। ড্রেসিং টেবিলে ঝুঁকে লাল ছোট টিপ লাগানোর সময় নিজেকে দেখে নিজেই লজ্জা পেল। অজানা অচেনা আশেকের জন্যে এই সাজে নিজের মনের গহিন থেকে উঠে এল লাজুকলতা রাশা। রিকশায় উঠে বার বার বার ঘড়ি দেখতে থাকল। পাছে লেট করে ফেলে একটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে। ফুলের দোকান থেকে আট-দশটা বেলি ফুলের মালা মাথার এক পাশে লাগিয়ে নিল। পিজা ইনের দরজা ঠেলে চারিদিকে চোখ বোলাতে কোনও দিকেই কাউকে তেমন দেখতে পেল না। হঠাৎ কোনার দিকে একটা টেবিলে একলা একজনকে দেখে আস্তে আস্তে আগাতে থাকল।
ঠিক এমন সময়ই হাতের মোবাইলটা বেজে উঠল। রাশা দেখল পিছন ফেরা এক ভদ্রলোক কানে ফোন কাউকে ফোন করছেন। সামনে না গেলে তাঁর চেহারার কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই চোখে চোখে চোখাচুখি হওয়া মাত্রই তিনি বললেন, ‘কেমন আছেন রাশা ?’
পিজা ইনের এত শোরগোলের মাঝে রাশার কানে যে কথাগুলো প্রবেশ করল তা ওকে স্তম্ভিতই করল না, কেমন এক নেশাও ধরিয়ে দিল।
জি ভালো।
দু শব্দের এই কথাগুলি দিয়ে শুরু হলো আশেকের সঙ্গে কথার সূচনা।
৩.
আশেক সাহেবের সঙ্গে দেখা হবার আগে নিজ মনে তার একটা ছবি সে এঁকে রেখেছিল। সামনাসামনি মানুষটির সঙ্গে যখন দেখা হলো কল্পনায় আঁকা মানুষটার একেবারেই কোনও মিল হলো না।
টেবিলের সামনাসামনি বসে সরাসরি ব্যক্তিটিকে দেখে কেমন হোঁচট খেল সে।
ডিউকের সঙ্গে গত কয়েক দিন সম্পর্কটা একেবারেই ভালো যাচ্ছে না। মনের অতলের রঙিন মানুষকে নিয়ে স্বপ্ন বোনায় কেমন এক ছেদ পড়েছে। নিজের কাছে স্বীকার করতে ক্ষতি নেই আশেকের কথা বলা আর গলার প্রক্ষেপণে সে কেমন এক বাঁধা পড়ে গিয়েছিল।
মাঝারি গড়নের গোলগাল ধরনের বছর পঁয়ত্রিশ বা তার চেয়ে একটু বেশি বয়সের এই ভদ্রলোকের সঙ্গে পিজা ইনের এই টেবিলে বসে আছে ভাবতেই তার নিজেকে কেমন যেন হাল্কা বলে মনে হলো। নিজের হাতের ব্যাগটা টেবিলে এক পাশ থেকে আরেক পাশে সরিয়ে কিছু স্বাভাবিক হলো।
আশেকের পরনে খাকি রঙের প্যান্ট আর খুব উজ্জ্বল রয়েল ব্লু শার্ট। দামি কাপড়-চোপড়। কালো মুখাবয়বে তেমন ভারিক্কি চেহারা না হলেও, আকর্ষণীয় কোনওভাবেই বলা যাবে না।
আপনি মনে হয় না বলেকয়ে এমন অপরিচিত একজনের সঙ্গে এমন হঠাৎ দেখা হওয়ায় কেমন অস্বস্তি বোধ করছেন, তাই না ?
জি। খানিকটা।
আপনার নিজেকে গুটিয়ে রাখার কোনওই কারণ নেই। আমি খুব খোলামেলা মনের একজন মানুষ। যদিও আপনার সঙ্গে আমার বয়সের অনেক ব্যবধান। আমি লেখাপড়া করেছি বিদেশে। আমার অফিস মতিঝিলে। ছোট খাটো একটা চাকরি করি বলতে পারেন। আমি কাছেই ইস্কাটনে থাকি।
কী খাবে বলো ? আপনি আসলে এত ছোট আপনাকে তুমি করেই বলি কেমন ?
না, না ঠিক আছে। তুমি করেই বলুন। আমি অনার্স দেব এই সাতাশ তারিখে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি। কিছু না খেলে চলে না ?
কী যে বলেন, মোবাইল ফেরত পেয়েছেন তাই আমাকে আপনার খাওয়াবার কথা কিন্তু, ছাত্রী মানুষের কাছ থেকে কিছু খাওয়াটা বোধহয় ঠিক হবে না। হা হা হা…।
খুব জোরে আবার সেই আত্মখোলা হাসি যা রাশাকে আবারও ধাঁধা ধরিয়ে দেয়।
অনেক কিছু অর্ডার করে আশেক সাহেব। রাশার আপত্তি কিছুতেই টেকে না।
ওয়েটার চলে যেতেই গোলাপি মোবাইলটা ওর হাতে তুলে দেয়।
আর এটা ? চোখে রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করে আরেকটি সুন্দর প্যাকেটের দিকে তাকিয়ে।
বাহ! অন্যের জিনিস আমার কাছে দুদিন থাকল তার একটা ভাড়া আছে না ? এটা সেই ভাড়া। আমি নিজে পছন্দ করে কিনেছি। আপনি পড়বেন মনে করে। খুব খুশি হব।
অজানা, অচেনা একজন মানুষের সঙ্গে এত অল্প পরিচয়ে সামনাসামনি বসে বিব্রত হবার কোনও মানে হয় না। দেখতে শুনতে যদি সুন্দর একজন কেউ হতো।
রাশা এ যুগের বুদ্ধিমতী একটি মেয়ে। এই অল্প সময়েই সে খেয়াল করেছে আশেক তাকে খুব নিবিড়ভাবে খেয়াল করে দেখে নিয়েছে। যে দেহ-গায়ে কোনও পাপ নেই, কোনও মোহ নেই। কেবল জ্বলজ্বলে সুন্দরের পরিপূর্ণ রূপ তারিয়ে তারিয়ে দেখে নেওয়া। আর হয়তো ফুরফুরে একটা বিকেলে একজন নারীর সূর্যতাপে একটু ওম ওম করে নেওয়া।
অনেক কথা বলেন আশেক সাহেব নিজের সম্পর্কে, অনেক কিছুই বলে গেলেন। কোথায় থাকেন, কী করেন, জীবনে কী চান, কী চেয়েও পান নাই অনেকটাই।
বলার ভঙ্গি, ঢঙ, কায়দা, সঞ্চালন সব মিলিয়ে রাশা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে গেল। এখন মাকে নিয়ে বাড়িতে থাকেন। পছন্দের কাজের তালিকায় কী আছে না আছে সব নিয়ে কী চটপট তথ্যপ্রদান। কিন্তু কিছুতেই এ আশেককে তার বাচাল বলে মনে হলো না।
রাশা নিজের সম্পর্কেও নিজে থেকে বলে গেল, বাবা মারা গেছেন সাত বছর। মা আর ছোট একটা ভাই নিয়ে ওদের জীবন। ডিউকের ব্যাপারটা বলা বাহুল্য হয়ে যাবে মনে করে ও ব্যাপারে কিছুই বলল না।
অনেক খাবারের অর্ডার। খাওয়া অস্তেই আশেক যথাযথ আতিথ্য প্রদর্শনেও কমতি দেখাল না। রাশা বরাবর কম খায়। নতুন একজন অসম বয়স্ক মানুষের সঙ্গে বসে খেতে তেমন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করল না। কীভাবে সময় গড়িয়ে প্রায় সাতটা। এক সময় ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে উঠতে চাইল।
খাওয়ার এই সময়টাতে আশেক তার জীবনের টুকরো টুকরো অনেক গল্প করল। এত হাস্যরসাত্মক গল্পগুলো শুনে কেবলই হেসে লুটিয়ে পড়ল। রাশার মনে হলো আজ বিকেলের এই সময়টাতে যেন ওর জানালায় এক কাঠবিড়ালি এসে কুট কুট করে বাদাম খাচ্ছে। আর সে বাদাম খাবার ভাগীদার হবার জন্যে ওকে ইতিউতি ডাকছে।
নিচে নেমে রাশা একটু দাঁড়িয়ে খুব বিনয়ী ভঙ্গিতে কৃতজ্ঞতা জানায়। হাতে ধরে থাকা প্যাকেটটায় কী আছে ও জানে না। কিন্তু এটার কোনও দরকার ছিল না বলে দ্বিধা প্রকাশ করে।
কিছু মনে না করলে আমি নামিয়ে দিতে পারি ?
না আমি একা চলে যেতে পারব। এই তো কাছেই আমাদের বাসা।
রিকশা নাও।
রাশা রিকশা ঠিক করে আশেক এক মনে দাঁড়িয়ে থাকে। কী ভদ্র আর সৌজন্যবোধ তার। রাশা মুগ্ধ হয়ে যায়।
রিকশা না ছাড়া পর্যন্ত ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে আশেক।
রাশা! যোগাযোগ রাখবেন কেমন ?
রিকশা টান দিতেই এ কথাগুলো বলে গাড়ির দরজার নবে চাবি ঢোকায় আশেক।
সামনের রিকশার চাকাটা ঘুরতেই থাকে। আর রাশার মন নদীতে পাল তোলা এক নৌকা জোয়ারের উল্টো স্রোতে পাল টানতে থাকে।
রাশার একদিকে তাকিয়ে থাকা দৃষ্টি এক সময় কিছুই দেখে না। বুঝে উঠতে পারে না মনপাখি তার ডানা ঝাপটে কোন দ্রাঘিমায় গিয়ে পড়েছে।
রাতে কিছু না খেয়ে নিজের রুমে ঘুমিয়ে পড়ার পাঁয়তারা করে।
হাতের সুন্দর প্যাকেট খুলে দেখে সুন্দর একটি পারফিউম। মন থেকে আশেকের ভূত ছাড়ানো সমস্যা হয়ে দাঁড়াল তো ?
মার ফোনটা চেক করে দেখে ডিউকের অনেক মিসড কল। সেই দুপুরের দিকের। নচ্ছার এই ছেলেকে কিছু শাস্তি দেবে ও। আর ফোন করবে না।
‘আধো রাতে যদি ঘুম ভেঙে যায়
মনে পড়ে মোরে প্রিয়’।
হাল্কা ভলিউমে গান ছেড়ে ঘুমানোর চেষ্টা করে রাশা। ড্রেসিং টেবিলের উপর বেলিফুলের মালার মিষ্টি গন্ধ পুরো ঘরটা ভরিয়ে রেখেছে।
রাত বারোটা।
মার মোবাইল থেকে আশেকের নম্বরটা নিয়ে নিজের মোবাইলে সেভ করে। আশেক নামে একবার সেভ করে, নামটা মুছে দেয়। আশেকের নম্বরটা কী নামে রাখা যেতে পারে ভাবতেই চট করে সে ‘ইথার ডাহুক’ নামেই রেখে দেয়। ঘুমের রানি আজ আড়ি নিয়েছে বোধ করি। কিছুতেই ঘুম আসছে না। এক পর্যায় সব লজ্জার আড় ভেঙে ‘ইথার ডাহুক’-এর উপর আঙুল রেখে কল বাটনে চাপ দেয় রাশা।
হ্যালো, রাশা ?
এত রাতে মাথার কাছে ফোনের আওয়াজে একটু চমকে উঠল আশেক। মোবাইলের স্ক্রিনে জ¦ল জ¦ল করে ভাসছে রাশা। হাত বাড়িয়ে ফোনটা কয়েকবার বাজতেই ধরে ফেলল। দরদ ঢেলে দিয়ে বলল হ্যালো, রাশা ?
ওপাশে সাড়া নেই শব্দ নেই। কেউ একজন মোবাইল নিয়ে বসে আছে বোঝা যাচ্ছে। আশেক ভাই, আমার ঘুম আসছে না, অনেকক্ষণ জেগেছিলাম। তারপর আপনাকে ফোন করলাম।
কেন ঘুম আসছে না, রাশা ? গল্পের বই পড়, তুমি ঘুমিয়ে যাবে।
মোবাইলটা হাতে নিয়ে অন্ধকারে পা টিপে টিপে ঘরের লাগোয়া বারান্দাটায় চলে এল আশেক।
কিছু মনে না করলে, আপনি কথা বলুন আমি শুনি।
আশেক এ কথায় কিছুটা অবাক হয়। ত্রিশ পেরোনো বয়সের একটা পুরুষের জীবনে নানা ঘটনা ও দুর্ঘটনার পাহাড় জমে থাকে। অনেক গল্প থাকে, যার কোনও না কোনও একটার সঙ্গে যেন অন্য একটার জোড় বেঁধে যায়। কিন্তু আজকের ঘটনাটা একেবারেই অন্য রকম মনে হচ্ছে।
রাশা খুব সাদামাটা কিন্তু ভীষণ সম্মোহিত করে ফেলার মতো একটা মেয়ে। কী পরিমিতিবোধ আর গুছিয়ে নিজেকে উপস্থাপন করার ভঙ্গি। আজ বিকেলে অফিস শেষে এই দেখা করার ব্যাপারে তেমন করে আর দ্বিতীয়বার ভেবে দেখেনি। মেয়েদের কাছে ক্ষণে বিক্ষণে অনেক পুরুষই নানা বয়সে বালকসুলভ। আর তাই বুঝি বিদায়কালে বোকার মতো যোগাযোগের কথা বলায় বুলেট গতিতে ফোন।
আশেক নিজ মনের কাছে অস্বীকার করতে পারল না। ঘুমুতে যাবার আগে ছেলেমি উছিলা দেখিয়ে তারও রাশাকে ফোন করতে ইচ্ছে করেছিল। এই বয়সে হ্যাংলাপনা ঠিক কেমন হবে ভেবে, মাথা থেকে চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলেছে।
বারান্দায় আয়েশ করে চেয়ারে বসে চাঁদের হাটে বেনিয়ার মত পসরা সাজিয়ে বসে কত পসরাই না বিনে পয়সায়, নগদে মোটেও নয়, কেনাবেচা হলো।
শুধু একটা কথাই পেট পর্যন্ত এলেও গলা দিয়ে বের হলো না, রাশা আমাকে এত রাতে তুমি কী মনে করে ফোন করলে ?
এ প্রশ্নের উত্তর আশেকেরও জানা নেই। হয়তো রাশার মনেও জানা নেই। তবু মনুষ্যমনের জটাধারী বুড়ি কত কিছু জপতেই না রাত-বিরেতে ঠেলে দেয়। রাত-বিরেতে কত অসাধ্য কাজ মানুষকে দিয়েই করিয়ে নেয়। মানুষের অমোঘ মন সকালে উঠেই বিষয়টি ভেবে লজ্জার ধূম্রজালে মুখ লুকায়। অমাবস্যার রাতেও তো অজপাড়া গাঁয়ে কিশোরী মেয়ে পা টিপে টিপে মায়ের বিছানার পাশ থেকে উঠে পিচ্ছিল পুকুরঘাটে সাঁঝ বেলায় কথা দিয়েছিল যে মরদকে, তার বাবড়ি চুলের গন্ধ নিতে কী দুঃসাহসী হয়ে ওঠে। শুধু বাবড়ি চুলে হাত বুলিয়েই খান্তি দেয় না, ঘুঘুর মতো মুখ গুঁজে থাকে কী আশ্বাসে ওই বুকে। নিজ কানে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস মাপে। আর দমকে দমকে ভালোবাসার আশায় দাপাদাপি করে সাঁতার কাটে।
মধ্যরাতের এই ফোন আশেককে প্রায় সারা রাত জাগিয়ে রাখে। কথা বলার বেশির ভাগ সময়ই সে বারান্দায় বসে কথা বলে। ভোরবেলায় পাখিদের কিচির-মিচির শুনে বিছানায় গিয়ে বালিশে মাথা রাখে।
সকালে ঘুম ভেঙে ঘড়ির দিকে চোখ পড়তেই দেখে সকাল সাড়ে এগারটা। রাশার সঙ্গে শেষের দিককার কথার কিছুই আর মনে করতে পারে না আশেক। শুধু মনে আছে ঘুম কাতর চোখে রেখে দিতে চাচ্ছিল। আশেকের পীড়াপীড়িতেই রাশার আবোল-তাবোল কথাই আশেকের কানে ভৈরবী রাগের প্রাক অনুশীলন চালায়।
বেহালভাবে পড়ে আছে আশেক। চোখে-মুখে রাজ্যের ক্লান্তি। অফিসে আজ কী জরুরি মিটিং ছিল। তাড়াতাড়ি হাতে ফোনটা নিয়ে যোগাযোগে ব্যস্ত হয়ে পড়ে আশেক।
ডিউকের ফোনে ঘুম ভাঙ্গে রাশার। মনের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছুই করতে ভালো লাগে না। এক দানা পরিমাণ ইচ্ছে করল না ডিউকের ফোনটা রিসিভ করতে। আড়মোড়া ভেঙ্গে ধরল ফোনটা।
কী ? ফোন করো না কেন ? ফোন করলে তো রিসিভ করা বাদ দিয়ে দিয়েছ। কী সাপের পাঁচ পা দেখেছ নাকি ? কোথায় থাকো আজকাল ?
ডিউকের গুলির ছররার মত কথাগুলো আগে হলে হৃদয় এ ফোঁড় ও ফোঁড় করে দিত। আজ আর তা হলো না। কোনও ধরনের রাগ, দুঃখ, ক্ষোভ কিছুই কাজ করল না ওর ভেতর। কিছু সময় চুপ করে থেকে খুব নির্লিপ্ততার সঙ্গে বলল, ‘সাতাশ তারিখ থেকে আমার পরীক্ষা। আমি ব্যস্ত।’
ডিউক স্বভাবসুলভ বকাবাজি করল যারপরনাই। তারপর এক সময় ধম করে ফোন রেখে দিল।
নাস্তা সেরে নিজেকে গুছিয়ে মন স্থির করল, এ কদিন খুব ভালো করে লেখাপড়া করবে।
টেবিল গুছিয়ে পরীক্ষার রুটিন টাঙিয়ে লেখাপড়া করবে মন স্থির করল।
টেবিলে বসে বার বার রাশার হাত চলে গেল মোবাইলের দিকে।
কাল রাতে না বুঝে কী এক কাজ করল। আশেকের সঙ্গে কথার ফুলঝুরিতে রাত কাটাল।
কিন্তু রাতের কথাগুলো মনে করতেই নিজের মধ্যে আলগা সুখ বুড়বুড়ি কাটছে। তেমন কোনও অনুশোচনা কাজ করছে বলে মনে হয় না।
দিন গড়িয়ে যায়। রাশা আর আশেকের সঙ্গে একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কেউ কাউকে ভালোবাসে মুখ ফুটে না বললেও একটা অলেখা সম্পর্ক তাদের মাঝে লেখা হয়ে গেছে। আবেগের বেড়াজালে দুই জন দু-জনকে এক মোহজালে আটকে ফেলে। ডিউককে কিছুই বলা হয় না। অনেক ঝগড়া-ফ্যাসাদের পর ডিউক অনেকটাই নির্বিকার হয়ে পড়েছে। তবু রাশার সব সময় ভয় কাজ করে বাউণ্ডুলে এই ছেলে না জানি কখন কী করে বসে।
এক সময় এই পাগল ছেলেটার পাগলামিই তাকে মাতিয়ে রাখত।
আস্তে আস্তে রাশা বুঝতে পারে ডিউক অস্থির এক মানুষ। সে প্রেম বোঝে। প্রেমের পরিণতির সুড়ঙ্গপথ ধরে হাঁটতে জানে না। কিন্তু পথ শেষে বেরিয়ে কোথায় যেতে হবে, জানা নেই তার। ডিউককে ভালোবাসা যায় কয়েক ঘণ্টা। কিন্তু আশেকেকে ভালোবাসা যায় হাজার বছর।
পঁয়ত্রিশ বছরের এই হিসেবি পুরুষের সঙ্গে দুই আর দুই চার মিলাতে যাওয়াতেই বোকামি।
মাও এর মাঝে বিয়ে নিয়ে একে ওকে বলে। রাশার এ ধরনের আলাপে মাথা ধরে আসে। পরিষ্কার করে মাকেও আশেকের কথা বলতে পারে না।
খুব ভোরে আজ আশেকের ফোনে ঘুম ভেঙে যায় রাশার।
রাশা, আমি আজ ফার্স্ট ফ্লাইটে ইন্ডিয়া যাচ্ছি।
হঠাৎ, কী কারণে আশেক!
আহরারের খুব জ্বর ক’দিন ধরে। এক শ ছয় এর উপরে উঠে যাচ্ছে। এখানকার ডাক্তাররা কিছুই ধরতে পারছে না।
মানে ? আহরার কে ? রাশার গলার উদ্বেগ তাকে মরুপাড়ের ধূলিঝড়ে ফেলে দেয়।
আহরার আমার ছেলে। ওর বয়স সাত। তোমাকে ওর ব্যাপারে কিছুই বলা হয়নি। আমি রাখি। আমার মাথা কাজ করছে না কিছুতেই। দোয়া করো আমার জন্যে।
কথা হবে।
রাশার সামনে বারান্দায় রাখা টবের ফণিমনসা গাছের কাঁটাগুলো যেন নিজের গায়েই গজিয়ে গেল। কিছুদূর পর পর সেই কাঁটা। রাশার সারা শরীর শিউরে ওঠে।
আশেক বিবাহিত ? সাত বছরের একটি সন্তান আছে তার ?
৪.
অনেকদিন পর রাশা আর মিশেল দুই ভাইবোন সিনেপ্লেক্সে ছবি দেখতে গেল। রাশার ব্যস্ত সময়ের অনেকটাই আগে কেটে যেত আশেকের সঙ্গে কথা বলে। হিসেব করে দেখে আজ কাল পরশু মনে হলেও সময়ের হিসাবে কখন যে প্রায় ছয় মাসের লেজ ছুঁই ছুঁই হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের কাছেই অবাক লাগে।
ছোট্ট ভাইটি তার। বাবা মারা যাবার পর থেকে যেন আরও বেশি লেজে লেজে। সারা সময় বুবু বুবু করে সাহচর্য খোঁজে। দুই ভাইবোনের নিবিড় বন্ধনে ডিউক এসে যেন থার্ড ব্র্যাকেটের একটি যোগের মাথায় রেখা বন্ধনী হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে।
আজ তারা সিনেপ্লেক্সে কি মজা করেই না একটা ইংরেজি মুভি দেখল। একবারের জায়গায় মিশেল দুই বার পপকর্ন খেল। মুভি শেষে টি-শার্টের দোকানে ছোট ভাইটি ঘোরাঘুরি করল। দুই একজন চেনা পরিচিত বন্ধুর সঙ্গে দেখা হতেই হ্যান্ডশেক করে বুবুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। মনে হলো যেন ভাইটি তার হঠাৎ করেই বেশ বড় হয়ে গেছে। আর বড় বোনের সঙ্গেও তার একটা আড়াল তৈরি হয়েছে যেন কবে। রাশা মনে করতে পারে কি পারে না, কী এর কারণ। তবু অদ্ভুত কষ্টগুলো বারবার ঢেঁকুর তোলে। চোখে পানি আসে। কী কারণ এই পানি আসার ? কষ্টের এই শ্রাবণ কি মিশেলের খানিক দূরত্বে চলে যাওয়ায়, ডিউকের সঙ্গে অকারণেই ব্যর্থ সম্পর্কের গ্লানি টেনে আশেকের মাঝে শেষ সুখ খুঁজে না পাবার দারুণ আঘাতে ? না কি বাবার অকাল প্রয়াণে!
রাশা জীবনের ছোট ছোট সুখগুলো আজ তার খুব আদরের ভাইয়ের সঙ্গে চেটেপুটে নেয়। একেবারে সমান ভাগে। বিরাট মল থেকে বের না হতেই যতগুলো ফোন আসে মিশেলের, ফোন রিসিভ করেই সে কী এক গর্বভরে বলে, ‘না, আজ পারব না দেখা করতে। বুবু আর আমি সিনেমা দেখতে বের হয়েছি। মুভিটা যা জোস না, না রে দোস্ত আরেক দিন’।
গেটের কাছে এসে, রাশার গা ঘেঁষে বলে, ‘বুবু ক্যান্ডি ফ্লস খাবে ?’
দুই ভাইবোনের হাতে ক্যান্ডি ফ্লস। ক্যান্ডি ফ্লস হাতে নিয়ে হালকা গোলাপি রেশমি ঘূর্ণির এই মিঠাইয়ের দিকে তাকিয়ে রাশার কেবলই মনে হয় তাহলে কি আশেকের সঙ্গে তার সম্পর্কটা এমন ফাঁপানো ছিল ? ক্যান্ডি ফ্লসটা যেমন মুখে দিতেই নাই, স্থায়িত্ব নেই―তেমন।
কী জানি সব কিছু ঘুরে ফিরে আশেক আর ডিউকে কেন গিয়ে খাবি খাচ্ছে ?
বুবু উবার কল করলাম। দেখো কী মজা!
দুই ভাইবোন উবারে উঠে মুভি নিয়ে টুকটাক কথা বলতে বলতে বাড়ি ফেরে। রাশা খেয়াল করে তার ছোট ভাইয়ের স্নিকার্স একদিক ফুটো হয়ে গেছে। আহা!
নিজের ভেতর থেকেই কষ্টের কাতরানি বের হয়ে এলেও ধামাচাপা দিয়ে রাখে।
বাড়ির গেটে নেমে ভাড়া দিতে গেলে মিশেল রাশার হাত চেপে ধরে।
বুবু, এটুকু আমি দিই।
সিঁড়িতে কথার ফুলঝুরি ছুটিয়ে দুই ভাই বোন ঘরে ফেরে।
রাত হলেই চারিদিকের সব কাজ গুছিয়ে একা হয়ে গেলেই রাশার চারপাশে একাকীত্ব ভর করে। প্রতি রাতে আশেকের সঙ্গে তার নিত্য কথা হতো। আজ দশ দিন হয়ে গেল। আশেক ইন্ডিয়া গেছে। যাবার আগে সেই ফোন আর পিলে চমকানো তথ্য। তার পরের সপ্তাখানেক রাশার মানসিক অবস্থা যে কীভাবে কেটেছে, একা সেই জানে। একেক সময় মনে হয়েছে ডিউকের সঙ্গে কথা বলে নিজেকে হাল্কা করে নিক। আবার মিটমাট করে ফেলুক সব। কিন্তু আর কবার ? ডিউক ছন্নছাড়া এক ছেলে। এ ধরনের ছেলেরা আনন্দ দিতে পারে কিন্তু শান্তি দিতে পারে না। এত অভিমানী আর খুঁতখুঁতে স্বভাবের ছেলে নিয়ে বড় অসুবিধা।
একলা ঘরে রাশা দুশ্চিন্তার পাহাড় কাটে কেবল। আশেকের ছেলেটার জন্যেও তার কেমন এক কষ্ট হয়।
কেমন আছে ছেলেটা ? ছেলেটার রোগটা শেষ পর্যন্ত ধরতে পারল তো ? ঠিক চিকিৎসা পেল কি ? সুস্থ হয়ে উঠেছে তো ছেলেটা। কী নাম বলেছিল যেন, আহরার।
স্মৃতির পাতারা সব কিন্তু স্বচ্ছ নয়। বেশির ভাগ পাতাই বেশ পুরু। পাতা উল্টাতে উল্টাতে আশেকের সঙ্গে তার এতদিনের আলাপচারিতার কথাগুলোকে নানা ভাঁজে ফেলেও এ সম্পর্কটাকে কী নামে আখ্যায়িত করবে বুঝে উঠতে পারে না।
রাশাভাবে দুজনের কেউ কাউকে কথা দেয়নি। অথচ প্রতিদিন তিন-চার বার করে ফোনে কথা হয়েছে। অফিসের কাজে দেশের বাইরে যেবার গেল আশেক, হোটেল থেকে কথা বলেছে বেশ কবার।
মানুষের জীবনে এমন কিছু সঙ্গ বা বলা যেতে পারে সাহচর্য আসে যা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। পারস্পরিক নির্ভরশীলতার চরম সীমায় পৌঁছে একের নিশ্বাস অন্যের প্রশ্বাস হয়ে বের হয়। এমন মানুষ কেবল ভালোবাসার প্রেমিক হয়ে দাঁড়ায় তা নয় বিশ্বাস ও আস্থার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়। এর কোনও নাম নেই, কোনও শর্তে সে বেড়ে ওঠে না। আস্থাশীল একজন মানুষের পাশে ছায়া হয়ে থাকা আরেক মানুষ। বড়ই নির্ভার ঠেকে নিজকে। আর চোখ বন্ধ করে তার সঙ্গ সম্ভোগের বস্তু হয়ে দাঁড়ায়।
খুব সুন্দর করে বিছানা ঝেড়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিতে যাবার মুহূর্তে আশেকের অফিসের ডায়রিটা হাতে পড়ল।
রাশা লাল রঙের ডায়রিটা হাতে নিয়ে চুপচাপ কিছু সময় বসে থাকে। অফিসের নামটা দেখে। মতিঝিলের সেনাকল্যাণে অফিস। আঠার তলা। ডায়রিটা খুলতেই প্রথম পাতার লেখাটা চোখে পড়ে। আশেকের নিজের হাতে লেখা, ‘পাতায় পাতায় থাক দিনের গল্প’―ইথার ডাহুক।
গল্পে গল্পে কত কথাই না বলেছে। আশেকের নামটা যে রাশা ইথার ডাহুক নামে সেভ করেছে তাও বলেছে। আর আশেক নিমিষেই ধরে ফেলেছে এর পেছনের কারণ।
কতদিন তারা দুপুরবেলা একসঙ্গে লাঞ্চ করেছে। নাটক দেখেছে। জোর করে তাঁতের শাড়ি কিনে দিয়েছে আশেক। সব এমনি এমনি। রাশা হিসাব করে দেখে এই মানিপ্ল্যান্টটাকে সে নিজেই যত্ন করেছে। রোদে দিয়েছে। আলো দিয়েছে, পানি দিয়েছে। দিনে দিনে এ গাছটিও লতিয়ে গেছে আগাছা হয়ে নয়, পরম নির্ভরতায়।
কিছুতেই ঘুম আসে না রাশার। মনে মনে ভাবে কাল অফিসে ফোন করে খবর নেবে। নয়তো অফিস থেকে বাসার টেলিফান নম্বর নিয়ে ওর মার সঙ্গে কথা বলবে।
নীল ডিম লাইটের আলোতে কত রাতই না ওর কেটেছে তীব্র আনন্দে। সেই একই নীল ওর ভাবনায় স্থবিরতা এনে দেবে কে জানত ?
চোখের পাতা কখন যে বুজে এল, শরীর শিথিল হয়ে এল।
কে ?
রাশার ফোন বাজছে অনেকক্ষণ ধরে। ঘুমের ঘোরে শুনতে পায়নি। ঘুম চোখে তাড়াহুড়োয় ফোনটা ধরল।
গাঢ় অন্ধকারে স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে ইথার ডাহুক।
হাঁপাতে হাঁপাতে রাশা বলে, ‘হ্যালো।’
‘রাশা। কেমন আছ তুমি ?’
আশেকের সঙ্গে প্রায় মিনিট বিশেক কথা হলো। রাশা এদিকে ঝিমঝাম ছিল। তেমন কথাও বলেনি। প্রশ্নও করেনি। মনের ঘুটঘুটে অন্ধকার থেকে পাক খেয়ে খেয়ে যে কৌতূহলগুলো উপরে উঠে আসছিল, বহু কষ্টে তা দমিয়ে রাখল।
ফোন রাখার আগে কেমন অস্থিরতা থেকে একটা কথাই বারবার বলল আশেক, আমার ছেলেটার জন্যে দোয়া করো।
রাতের খুব চেনা মুহূর্তই কেমন মুখোশ পরে অচেনা হয়ে যায়। অন্য অনেক রাতের সময়ের ঘটনার সঙ্গে বিপ্রতীপ কোণে অবস্থান নেয়। অতি চেনা মানুষটা পলকেই কেমন অচিন দেশের তেপান্তরে কোনও দূরে চলে যায়। জীবন্ত মানুষও কেমন অস্থিমজ্জা ছাড়া নেহাত ফসিল। কেবল গলার স্বর তাও অচেনা। শব্দের পিঠে শব্দ বুনে লোমকূপ খাড়া করে দেওয়া বাক্যগুলো হয়ে যায় বাস্তবতা ভিত্তিক কেবল সত্যভাষণ। কিন্তু রাতের বেলায় দু চোখের পাতা বুজলে ‘আয় আয় চাঁদ মামা’ বলে আলতো পরশ বুলায় না।
নদীর কূলে এসে চোখের সামনে ছেড়ে যাওয়া স্টিমারের ভেঁপু শোনায়। আর বুকের ভেতর গোঙানি তোলে।
আশেকের গলায় সর্বদা মুগ্ধ মেয়েটি সেদিনের ঘুম তাড়ানিয়া কিছু কথোপকথনে সারা রাত জেগে থাকে। অন্তত এটুকু আশ্বস্ত হয় সাত বছরের ছেলেটির এ দেশে দুরারোগ্য ব্যাধি নির্ণয় ছিল ভুল। তবে ভালোই এক কঠিন রোগের সঙ্গে যুদ্ধ করছে ছেলেটি।
ফজরের নামাজের আজান হতেই রাশা ওজু করে নামাজ পড়ে। সঙ্গে নানা রকম দোয়া পড়ে। নিজের অজান্তেই এক ধরনের শান্তির পায়রা কাছেপিঠে ডানা ঝাপটায়।
ঘর থেকে বের হয়ে আজ মাকে রুটি বানাতে সাহায্য করার জন্যে রান্নাঘরে উঁকি দেয়। দেখে মা নাই। ঘরে ঘুমাচ্ছে। আজ কদিন মা’র শরীরটা ভালো যাচ্ছে না।
দুই সপ্তাহ পার হতেই আশেকের ফিরে আসার দিন চলে আসে। রাতে আবার ‘ইথার ডাহুক’ নামে ফোন আসে।
ছেলের অসুখের আদ্যোপান্ত সবটুকুনই ফোনে শোনে। গল্পের বইয়ের কয়েক পাতা যেমন বাদ দিয়ে পড়ে যায় ফাঁকিবাজ পাঠক, আশেক বলার সময় কিছু কথা বাদ রাখে। তবে এটুকু বোঝে, ফিরে এসে ছেলে ভালোই আছে।
সময় গড়িয়ে যায়। বিবাহিত একটা মানুষের সামিয়ানার নিচে আস্তে আস্তে যেন ক্রমেই ঢুকে পড়ে। ঢাকনা দেওয়া ঘটির দুধ মায়াবী কথায় উথলে ওঠে। আবার নিবিড় পরিচর্যায় ঢাকনি ভেতরের ভালোবাসা ওম ওম রাখে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবার রাগ, ক্ষোভ, দ্বিধা সব হাত পা গুটিয়ে নেয়। রাত হলেই ইথার ডাহুক ডাকে। আর রাশার ইন্দ্রিয় টান টান হয়ে ওঠে।
কবিতাপাগল মেয়েটা জয় গোস্বামীর কবিতার আবৃত্তি শোনে :
‘সে যদি তোমাকে অগ্নিতে ফেলে মারে
বিনা চেষ্টায় মরে যাব একেবারে
সে যদি তোমাকে মেঘে দেয় উত্থান
বৃষ্টিতে আমি বৃষ্টিতে খান খান’
দিনে দিনে যেন অগ্নিতেই পুড়ে মরছে এই মেয়েটা। কিন্তু কেউ তো তাকে জোর করে ফেলেনি। নিজেকে নিজেই অগ্নির খুব কাছে নিয়ে অগ্নি উপাসনা করছে। উত্তাপে নিজেকে আরাম দিচ্ছে। অগ্নিসুখ বলে কি তবে কিছু আছে ?
অনেক ভেবেছে। নিজের মনের সঙ্গে অনেক যুজেছে। তারপর মন আঁটসাঁট বেঁধে ঠিক করেছে আশেকের সঙ্গে সামনাসামনি দেখা করে না বোঝা ঘোলাটে কিছু জায়গা নিজে জিজ্ঞেস করে মনকে হালকা করে নেবে।
হালকা কমলা রঙের তাঁতের শাড়ি পরে দেখা করতে যাওয়ার আগে নিজেকে হালকা সাজে সাজিয়ে নেয়। সারা জমিনে তাসের ছোট ছোট নকশা। খুব শখ করে কিনে দিয়েছিল আশেক। কোনও দিন পরা হয়নি রাশার। হাসি তামাশায় বলেছিল, এই শাড়ি যখন পরবে সারা শরীরে তখন তাসের রাজা তোমাকে পেঁচিয়ে রাখবে আর টেক্কা তখন কার হাতে ?
গুলশানের এই রেস্তরাঁয় অনেকবার ওরা দেখা করেছে। আজ আশেক দেরি করে ফেলেছে। পথে জ্যাম। আড়ালের এক রুমে জায়গা করে নেয় তিন জনের এক টেবিলে। পাশের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সময় কাটায় রাশা।
আশেক কিছু সময় পরেই ঢোকে। মোচ দাঁড়ি গজিয়ে এ কী হাল হয়েছে আশেকের ? অনেক দিন পর প্রথম দেখায় কেমন চমকে ওঠে রাশা। ছেলেকে নিয়ে মানসিক এই ধকল তো সে একাই সামলেছে। কী কী সব সময় গেছে ওর উপর দিয়ে। অনেকটাই রোগা হয়ে গেছে এতগুলো দিনে।
খেতে খেতে স্বভাবগত সেই ভালোবাসার আতিশয্য। প্লেটে খাওয়া তুলে দেওয়া। মিটি মিটি হেসে সব ছোট ছোট গল্পে হাসির খোরাক।
খাবার খেতে খেতে এক ফাঁকে হঠাৎ করেই রাশা প্রশ্ন করে, তুমি বিবাহিত ? একটা ছেলে আছে তোমার ? একেবারেই অপ্রস্তুত হয় না আশেক, একটু থেমে উত্তর দেয়,―হুম। আমার বিবাহিত জীবন চার বছরের। আহরারের মা আমাকে ছেড়ে চলে যায়। ছেলেটা আমার কাছেই ছিল প্রথমে। কিন্তু বছর দুয়েকের একটা বাচ্চা সামলানো আমার জন্যে খুব কষ্টকর হয়ে যাচ্ছিল। তাই…।
প্লেটে মুরগির ছোট ছোট টুকরোগুলো নাড়াচাড়া করে আশেক।
কিছু সময় দুজনের খাওয়ায় ছেদ পড়ে।
চোখাচোখি হবার ভয়ে দুজনেই প্লেটের খাবারগুলোকে কেবল নাড়ে।
আচ্ছা আশেক, তোমার আর আমার সম্পর্কটাকে কী নাম দেয়া যায় ?
এই প্রশ্নের কোনও উত্তর আমার জানা নেই। আমি তোমাকে ভালোবাসি। নিখাদ ভালোবাসা। কিন্তু আমার এ ভালোবাসার সম্পর্কের শেষ গন্তব্যের পথনকশা আমার জানা নেই। কারণ আমি বিবাহিত। আমার আহরার আছে। আর তুমি অবিবাহিতা।
প্রথম দুই তিন দিন কথা বলেই বুঝে গেছি আমি বাঁধা পড়ে গেছি আবার। হুম, পাগলাটে ভালোবাসায় পৃথাকেও আমি ঘরে এনেছিলাম। কিন্তু হয়নি, ভালোবাসার সে ঘর টেকেনি। আশেকের এ কথাগুলো হতাশার, দুঃখের, ব্যর্থতার গ্লানিতে ভরা।
পৃথা চলে গেল কেন ?
আশেক এ প্রশ্নের জন্যে মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
আমাদের বনিবনা হয়নি। হ্যাঁ, আমি ইচ্ছে করলেই ওর বিরুদ্ধে অনেক কথা বলতে পারব। পৃথাও নিশ্চয়ই অনেক অভিযোগ দিতে পারবে। কিন্তু আমাদের খাপে খাপে মেলেনি।
পুরো রাস্তা গাড়িতে সেদিন রাশা কোনও কথা বলেনি। থমথমে সারা পথ গাড়িতে ক্যাসেটে বাজল :
‘আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা
আর কতকাল আমি রব দিশেহারা’।
রাতে আশেকের ফোন বাজে। খুব খুশি মনে রাশা ইথার ডাহুকের ডাকে সাড়া দেয়। খলবলিয়ে অনেক কথা বলে। ফোন রাখার আগে আশেক বার বার বলে, আরেকটু ভেবে দেখো।
রাশা দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বলে, আমি তোমাকেই বিয়ে করব। আহরার আমাদের সঙ্গেই থাকবে।
বড় মামা, মামি, খালা, ফুপু এমন আরও অনেক মুরুব্বি জনের মানা সত্ত্বেও রাশা বিয়ের সিদ্ধান্তে অটল থাকে।
আশেকের সঙ্গেই সে ঘর করবে―এ ব্যাপারে কারও কোনও কথা শুনতে চায় না।
হলুদের পিঁড়িতে বসা রাশাকে যেন অনেক অনেক সুন্দর লাগে। একটু পর পর মোবাইল ফোনে সেই ডাক বাজে।
বিয়ের বাড়িতে অনেক লোকজন আর কেবল হইচই। সানাইয়ের সুর।
বাবা না থাকা মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েটির বিয়েটা ভালো জাঁকজমক করেই দেওয়ার চেষ্টা করে খালা, মামারা।
কনে আর বরের পাশে সাত বছরের একটি ছেলেও এই বিয়েতে খুব মজা করে। সব ছবিতেই সে আছে। রাশাও খুব কাছে টেনে নেয় তাকে। বীরদর্পে নিজের ছেলে বলেই পরিচয় দেয়।
কনে বিদায়পর্বে রাশার মাকে সামলানো নিয়ে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা। বিধবা এই মহিলা কেবল আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।
খুব হাসিখুশি কনে শেষ এইক্ষণে এসে এদিক-ওদিক তাকিয়ে মিশেলকে ডাকে। ছোট ভাইটির খোঁজে সে পানি পানি চোখে এদিক-ওদিক তাকায়। তাকে না দেখে সে যাবে না এমন আবদারও করে।
মিশেলের খোঁজে সারা বিয়েবাড়িতে হুল্লোড় পড়ে যায়।
সারা বিয়েবাড়িতে মিশেল কখনওই ছিল না। কারও চোখে পড়েনি। সবাই মিলে অনেক খুঁজে খুঁজে দেখে কমিউনিটি সেন্টারের এক কোনায় ডুকরে ডুকরে কাঁদছে মিশেল। ময়লা মেঝেতে নিচে হাঁটু গেড়ে বসা। ভাঁজ করা হাঁটুতে দুই হাত বেঁধে মাথা গুঁজে ছেলেটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
সচিত্রকরণ : রজত



