আর্কাইভগল্প

গল্প : চাঁপাকথা : কুলদা রায়

নতুন বাড়িটার চিলেকোঠাটা বেশ বড়। সেটা মেয়ে বেছে নিয়েছে। সঙ্গে রয়েছে একটা স্টোর রুম। পুরোনো বাড়িওয়ালা সেটা পরিষ্কার করে দিয়েছে। শুধু রেখে গেছে বড় একটা সিন্দুক। রাজকীয় তার সাজ। এটাও ফেলে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এন্টিক বলে আমার মেয়ে রেখে দিয়েছে।

সেদিন ঠিক দুপুর পড়ে এলে মেয়েটা এটিক থেকে চেঁচিয়ে উঠল। ছুটে গিয়ে দেখলাম ঝুঁকে পড়ে সে একটা অয়েল পেইন্টিং দেখছে। সেটা সিন্দুকের মধ্যে ছিল। ফ্রেম বেশ পুরোনো। ছবিতেও বেশ ময়লা পড়েছে। সেটা পরিষ্কার করতেই, একটি সাদা তরুণীর ছবি ভেসে উঠল। তার গোলাপি চিবুক। হাল্কা সোনালি চুল। কানে হীরের দুল।

হাসি হাসি মুখ। যেন এখনি কথা কয়ে উঠবে।

আমার মেয়েই আবিষ্কার করল, ছবির নিচে ইটালিক অক্ষরে লেখা আছে―রোজ ট্রেমেইন। এটা শিল্পীর নাম নয়। শিল্পীর স্বাক্ষর আছে নিচে ডান দিকে―উইলিয়ামস ট্রেমর। এই হেতু ছবির মেয়েটিরই নাম রোজ।

আগের বাড়িওয়ালি হাবিবা রুথ কালো। এরকম সোনালি চুলের কেউ তার থাকার নয়। তাকে ফোন করে ছবিটার কথা জিজ্ঞাসা করলাম। সে জানাল, ওই সিন্দুকটার মালিক সে নয়। তার দাদি বুড়ি যার কাছ থেকে কিনেছিল তাদের কাছ থেকেই ছবিটা পেয়েছিল। তারাও বলতে পারেনি ছবিটা কার।

তবে রুথের পরামর্শ মোতাবেক স্থানীয় কুইনস লাইব্রেরিতে খোঁজ নিলাম। তারা কম্পিউটার আর্কাইভে সার্চ দিয়ে রোজ ট্রেমেরিনের খোঁজ দিল―

রোজ ট্রেমেরিন, জন্ম ১৯৪৩ সালের ২ আগস্ট। লন্ডনে। তার পরদাদাজানের নাম উইলিয়াম থমাস। তিনি ইয়র্কের আর্যবিশপ হিসেবে জয়েন করেন ১৮৬২ সালে। সে সময়ে জোড়াসাঁকোতে নাতির প্রথম জন্মদিন উপলক্ষে লেট প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর নামে এক ভারতীয়ের পক্ষে টেগোর এন্ড কোং-এর ট্রাস্টি বাকিংহাম প্যালেসে একটি পার্টি দিয়েছিল। সেই নাতি ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্যে নোবেল অর্জন করেন। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে তিনি মারা যান। আর উইলিয়ামসের ছেলের নাতনি রোজ এর দু বছর পরে জন্ম নিয়ে ইংরেজি ভাষার বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ছোটগল্পকার হিসেবে বিখ্যাত হন।

রোজ সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য পাওয়া গেল―

রোজের ব্যক্তিত্ব ছিল দ্যুতিময়। ব্যবহার ছিল গোলাপ ফুলের মতো কোমল। তিনি গোলাপপ্রেমী হিসেবে ইরান দেশ থেকে মোগলাই গোলাপগাছ এনে বাগানে রোপন করেছিলেন। এজন্য স্থানীয় বৌদ্ধিক পরিষদে তিনি রোজ কুইন ওরফে গোলাপ সুন্দরী নামে পরিচিত ছিলেন।

রোজের কবরের ঠিকানাও তারা দিতে পারল। রিচমন্ড হীলের শান্ত মনোরম কবরস্থানে রোজ ঘুমিয়ে আছে। তার নামের নিচে জন্ম-মৃত্যু তারিখ। আর তার নিচে লেখা কবি, গল্পকার। আর রয়েছে কয়েকটি গোলাপের ঝাড়। গোলাপ ফুটেছে। চারিদিকে ঘ্রাণ ভেসে যাচ্ছে। এপিটাফে লেখা―

ঙহপব সবঃ হবাবৎ ভড়ৎমড়ঃঃবহ.

 মেয়ে শুধাল, রোজ নামটি কি সুন্দর তাই না বাবা ?

হ্যাঁ। আমি তার চুলে হাত দিয়ে জবাব দিলাম।

মেয়েটি কুইনস ম্যাথ অ্যান্ড সায়েন্স হাই স্কুলে যায়। তার ক্লাসে পৃথিবীর নানা দেশের ছেলেমেয়েরা পড়ে। সে হিসেব করে বের করল, তাদের ক্লাসে তিনজনের নাম ফুলের নামে। ডেইজি―সুইডেনের মেয়ে। নারগিস―ইরানি। সে সুন্দর গান করে। আরেকটি মেয়ের নাম টিউলিপ। বাড়ি হল্যান্ড। তাদের পারিবারিক টিউলিপ ফুলের ফার্ম আছে। ফিলিপাইনের মেয়েটির নাম চেরি। সে ছবি আঁকতে পারে। ক্যালকুলাসের হালকা পাতলা টিচারকে সবাই জিনিয়া বলে ডাকে।

জিনিয়া নামে আমাদের পাড়ায় একটি মেয়ে ছিল। আমার মেয়েকে বলি। সে ছিল নতুন মিয়ার ভাস্তি। আমাদের চেয়ে বড়। বেলবটম প্যান্ট পরত। ভয়ডর ছিল না। একবার কে একটা ছেলে খারাপ কথা বলেছিল তাকে। সেজন্য জিনিয়া আপা তাকে পিট্টি দিয়েছিলেন।

শুনে আমার মেয়ে হেসে ফেলে। বলে কুংফু জানত জিনিয়া ?

না। সেকালে কুংফু ব্যাপারটা মফসসলে আসেনি। এরপরে জিনিয়ার বিয়ে হয়েছিল এক দারোগার সঙ্গে―চট্টগ্রামে। সেখানে দুটি বাড়ি আছে। গাড়ি আছে।

গাড়ি চালাতে জানতেন উনি ?

না মনে হয়। ড্রাইভার আছে। গাড়ি করে মাঝে মাঝে বেড়াতে আসতেন।

মেয়েকে বলি, তবে রোজ নামটা মেয়েদের হয় না। রোজি হয়। সিনেমায় রোজি সামাদ নামে একজন অভিনেত্রী ছিলেন। তিনি মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করতেন। এজন্য পাশের পাড়ার সালেক চাচা মেয়ের নাম রেখেছিলেন রোজি। আমাদের বয়সী হলেও তাকে রোজি খালা বলে ডাকা হতো। এটা তার পছন্দ ছিল না। আমাদের সঙ্গে খুব ঝগড়াঝাটিও করেছিল। তার বিয়ে হয়েছিল একজন বয়স্ক লোকের সঙ্গে। এই দুঃখে সে বাপের বাড়িই আসত না। খুব অল্প বয়সেই সে বিধবা হয়। তিনটি ছোট ছোট ছেলেমেয়ে হয়েছিল। সালেক চাচা তাকে বাড়িতে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রোজি আসেনি। শুনেছি―একটি স্কুলের আয়ার কাজ নিয়েছিল। স্কুলের ছোট ছেলেমেয়েরা তাকে রোজি খালাই ডাকত। এই ডাকে সে খুশিই হতো।

ডেইজি নামের কেউ ছিল না ? শুধায় মেয়ে।

ছিল। ছিল। আমি একটু চিন্তা করে বলি। ডেইজি আর শিউলি―দুই বোন। নতুন স্কুলের পাশে দেওয়াল ঘেরা বাড়ি। ডেইজি গান করত। আর শিউলি কবিতা আবৃত্তি করত। শিল্পকলা একাডেমির রবীন্দ্র নজরুল জন্মজয়ন্তীতে ডেউজি গান গেয়েছিল―শিউলি ফুল, শিউলি ফুল,

কেমনে ভুল।

আর শিউলি পড়েছিল রবি ঠাকুরের ক্যামেলিয়া নামের কবিতা।

ক্যামেলিয়া ? মেয়ে অবাক হয়। বাহ, খুব সুন্দর তো। গুগল ঘেটে ক্যামেলিয়া ফুলটি দেখে নিল। গোলাপ ফুলের মতো দেখতে। তবে পাপড়ি কয়েক স্তবকে সাজানো। ডালে কাঁটা নাই। বড় বড় পাতা।

আমার মেয়েটি একটু দুঃখ করে বলল, তাদের ক্লাসে ক্যামেলিয়া নামের কেউ নাই।

এমনি সারা স্কুলেও খুঁজে পায়নি ক্যামেলিয়া নামের কোনও মেয়েকে। কৌতূহল ভরে জিজ্ঞেস করল, ক্যামেলিয়া নামে কি কাউকে তুমি চেনো ?

ক্যামেলিয়া ? ক্যামেলিয়া নামে রবীন্দ্রনাথের কবিতাটি শোনাই,―

‘নাম তার কমলা,

দেখেছি তার খাতার উপরে লেখা।

সে চলেছিল ট্রামে, তার ভাইকে নিয়ে কলেজের রাস্তায়।

আমি ছিলেম পিছনের বেঞ্চিতে।

মুখের এক পাশের নিটোল রেখাটি দেখা যায়,

আর ঘাড়ের উপর কোমল চুলগুলি খোঁপার নিচে।

কোলে তার ছিল বই আর খাতা।

যেখানে আমার নামবার সেখানে নামা হলো না।’

শুনে মুগ্ধ হয়ে গেল সে। ‘ক্যামেলিয়া নামের অর্থ নির্দেশক লাইনটি যখন এল, তখন সে অবাক হয়ে জানতে চাইল সত্যি সত্যি এই ফুলের সহজে মন মেলে না ?’

আমি হেসে ফেলি। বলি, এটা কবির কল্পনা। তাকে বলি, আমাদের কালে ক্যামেলিয়া মুস্তাফা নামে একজন এই কবিতাটি টেলিভিশনে আবৃত্তি করেছিলেন। সেই থেকে মনে গেঁথে আছে।

মেয়েটি বিড়বিড় করে বলল, ক্যামেলিয়া ফুলের গাছ ফ্রন্ট ইয়ার্ডে জানালার পাশে লাগাবে।

কিন্তু বহু সন্ধান করেও এখানকার কোনও নার্সারিতে তার চারা পাওয়া গেল না।

ফুলের নামে আমার পরিচিত আর কে কে আছে সেটা বলতে আমার ছোট মেয়ে বায়না ধরল। লক্ষ করলাম, আমার পাঁচ বোনের কারও নামই ফুলের নামে নয়। এক পিসি ছিল নাম পদ্ম। রান্নায় তার খুব নাম ছিল। এলাকায় বিয়েবাড়ি, অন্নপ্রাশন, জামাই ষষ্ঠীতে তার ডাক পড়ত। এক সময়ে লঞ্চঘাটে একটা হোটেলও খুলেছিলেন পিসেমশাই। পদ্ম হোটেল ছিল তার নাম। খুব জনপ্রিয় ছিল হোটেলটি।

পদ্মপিসি কি বেঁচে আছেন ?

জানি না। দূর সম্পর্কের পিসি। বিদেশ থেকে খবর নেওয়া হয় না।

মেয়ে বলল, কোনও সমস্যা নাই। ফেসবুকে সার্চ করো নিশ্চয়ই পেয়ে যাবে।

হা হা করে হেসে উঠি। পদ্মপিসি লেখাপড়াই জানতেন কি না সন্দেহ। ফেসবুকে নাম লেখানোর কোনও প্রশ্ন আসে না।

মেয়ে অবাক হলো। জানাল―একালে সবারই ফেসবুক আছে। ওর পাকিস্তানি বন্ধু হাসনা হেনার দাদি আম্মারও ফেসবুক একাউন্ট আছে। হেনাই খুলে দিয়েছে। সেখানে দাদি আম্মার ছবিটবি শেয়ার করে। তার মেয়েজামাই নাতি-নাতনি সেটা দেখে। দাদি আম্মার হালফিল সম্পর্কে ওয়াকফহাল থাকে।

জিজ্ঞেস করলাম, হাসনার নামটি কে রেখেছে, তুমি জানো ?

মেয়ে বলল, দাদি আম্মা। বলেছে হাসনা।

আমার মেয়েকে বলি, আমাদের প্রতিবেশী লিচুর দুই বোনের একজনের নাম হাসনা। আরেকজনের নাম হেনা। হাসনা খুব শান্ত। একটু বড় হয়ে গেলে দিনের বেলায় তাকে আর দেখা যেত না। ছোট হেনা বাড়ির সামনে পেয়ারাতলায় খেলত সারাদিন। আর সন্ধ্যাকালে গভীর জ্যোৎস্না উঠলে হেনা হাততালি দিয়ে উঠত, হাসনা। হাসনা।

তখনি হাসনাদের দোতলার জানালা খুলে যেত। সেখানে আলো-ছায়া। তার মধ্যে একটি হাসি হাসি মুখ। সেই মুখ হাসনার। অপার বিস্ময় নিয়ে বর্ষার সন্ধ্যায় ভেজা জ্যোৎস্নায় হাসনাহেনা ফুল দেখতে চাইছে। এর মধ্যে হেনা উচ্চস্বরে বলত, হাসনা ফুটেছে।

বাস্না ছুটেছে।

সেটা শুনে ভেতরবাড়ি থেকে ওদের দাদিজান গাঢ় স্বরে ডেকে উঠত, হাসনা, পর্দা ভেঙ্গো না।

তখনি খোলা জানালাটা বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু চারিদিকে হাসনাহেনা ফুলের সৌরভ ভেসে বেড়াত।

এই মায়াময় সৌরভে গর্ত থেকে সাপ বের হয়ে আসে। সেই সাপ বড় বিষধর। এই ভয়ে হাসনাহেনাদের বাড়ির কাছে কেউ ঘেষতে সাহস পেত না। তাদের বাড়ির গেটটাও থাকত তালা মারা।

সাপের কথা শুনে আমার ছোট মেয়েটি একটু ভয় পায়। বলে, হাসনাহেনাদের ভয় করত না ?

না। আমি মেয়েকে বলি। তারা ভয় পেত না। সাপ তো তাদের চিনত। তাছাড়া আমরা পাড়ার ছেলেরা শুনেছিলাম, এই সাপগুলো আসলে সাপ নয়। কোহেকাফের কালো জিন। হাসনাহেনাদের দিকে যাতে কেউ নজর না দিতে পারে সেজন্য দাদিজানের এক পিরবাবা জাদু দিয়ে দুটো কালো জিনকে সাপ বানিয়ে রেখেছিল। কেউ দু বোনকে ঝামেলা করতে এলেই ঠোক্কর দেবে। ফিনিশ।

এইসব জিনপরি তোমরা বিশ্বাস করো ?

সেকালে করতাম। কিন্তু এখন করি না। তবে―

তবে কী বাবা ?

একবার বর্ষা থেমেছে। চারিদিকে ভেজা পাতা থেকে জল ঝরছে। ফিনিক দিয়ে জ্যোৎস্না উঠেছে। ঠান্ডা পেয়ে দাদিজান ঘুমিয়ে পড়েছে। দরোজা খুলে হাসনা একা একা দোতলা থেকে উঠানে নেমে এসেছে। এসেছে হাসনা হেনা গাছটির কাছে গেছে।

তখনও ফুল ফোটেনি। ফুটবে ফুটবে করছে। বহুদিন পরে একটু নিচু হয়ে কলিগুলোর কাছে মুখটি নিয়েছে। একটা হাওয়া উঠেছে পুব দিক থেকে। গভীর ঘুম এসেছে তার চোখেমুখে।

পরদিন ভোরবেলায় লিচুদের বাড়ির উঠানে ঝরে থাকা হাসনাহেনা ফুলের ভেতরে এলিয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেল হাসনাকে। হাসি হাসি মুখ। চারিদিকে ফুলের সৌরভ।

দাদিজান আছাড়ি-বিছাড়ি খেয়ে কালো জিন দুটোকে শাপশাপান্ত করছে। নিচুপাড়ার সাপুড়ে ওঝা হরিশচন্দ্র এসে হাসনার মুখটিকে ভালো করে দেখল। ঠোঁটের নিচে দুটো রক্তের ফোঁটা। ওঝা কিছু না বলে চলে গেল। বাড়ির গেটটা খোলাই রইল। পাড়ার সবাই খবর পেয়ে খোলা গেট দিয়ে দেখতে এল। তাদের মুখগুলো ছিল কালো।

এই প্রথম আমরা পাড়ার ছেলেরা বড়বেলার হাসনাকে নিয়ে গোরস্থানের দিকে রওনা হয়েছিলাম। আমাদের চোখে ছিল বৃষ্টির মতো জল।

শুনে আমার মেয়ের মন খারাপ হয়ে গেল। বলল, ভেরি স্যাড। ভেরি স্যাড।

আমার মেয়ের মন ভালো করার জন্য এবার তাকে বকুলদের কথা বলি।

বকুলদের বাড়ি ব্যাঙ্কপাড়া। বিকেল হলেই বকুল একটি কালো সাইকেল নিয়ে বের হতো। সঙ্গে ওর মা। মায়ের নাম শিমুল। গার্লস স্কুলের দিদিমনি। খুব রাশভারী। তাকে দেখলে ছেলেপেলেরা কাছে ঘেষত না। গোল পুকুর পাড়ের চারিদিকে বকুল সাইকেল চালাত। ওদের বাড়ির সামনে একটি আরবি ঘোড়াও বাঁধা থাকত। ঘুরে ঘুরে ঘাস খেত। আর মাঝে মাঝে আকাশের দিকে মুখ করে হ্রি হ্রি করে ডাক দিত। সেই ডাক শুনে বকুলের বাবা হাক ছাড়তেন, ওয়ার্দা। ওয়ার্দা।

ঘোড়াটির নাম ওয়ার্দা। নিজের নাম শুনে ঘোড়াটির কেশর ফুলে উঠত। তার রঙ হালকা গোলাপি। ওয়ার্দা আরবি শব্দ। অর্থ গোলাপ। তারপর গোল পুকুরের পাড়ে বকুলের পাশে ঘোড়ার পিঠে চড়ে ধীর ধীর হাওয়া খেত ওর বাবা। গলায় বাঁধা থাকত একটি গোলাপি স্কার্ফ।

বকুল পরে ঢাকায় পড়তে যায়। সেখান থেকে লন্ডনে।

ব্যারিস্টার হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার শাখার পরিচালক। নিউ ইয়র্কে বছর পাঁচেক আগে দেখা হয়েছিল। গুগল সার্চ দিয়ে ব্যারিস্টার বকুলের ছবিসহ প্রোফাইল খুঁজে বের করল আমার মেয়ে।

বকুলদের বাসার পাশেই ছিল চামেলি দিদির বাসা। তার বাবা ছিলেন পুরোনো কমিউনিস্ট। জেল খাটতে খাটতে তার জীবন গেছে পুরো পাকিস্তান আমলের ২৪ বছর। ছাড়া পেলেও জেল গেট থেকেই আবার গ্রেফতার হতেন। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় মুক্তি পান। তবে একাত্তর সালে তাকে খান সেনারা গুলি করে হত্যা করে। দেশ স্বাধীনের পরে চামেলি দিদি কলেজে পড়ত। বাবার মতোই মিছিল-মিটিং করে বেড়াত। বক্তৃতা দেওয়ার সময় নাজিম হিকমতের জেলখানার চিঠি থেকে উদ্ধৃতি দিত। এই চামেলি দিদির কাছ থেকেই আমরা গোর্কির মা উপন্যাসটি পড়েছি। পড়েছি তুর্গেনিভ। দস্তয়েভস্কি। তলস্তয়। একবার জেলেও গিয়েছিলেন তিনি। অনেক রাত্রিরে জ্যোৎস্নাকালে জেলখানার পাশে গেলে শোনা যেত দৃপ্ত ভঙ্গিতে চামেলি দিদির গলা―

‘যে সমুদ্র সব থেকে সুন্দর

তা আজও আমরা দেখেনি

সব থেকে সুন্দর শিশু আজও বেড়ে ওঠেনি

আমাদের সব থেকে সুন্দর দিনগুলো

আজও আমরা পাইনি

মধুরতম যে কথা আমি তোমাকে বলতে চাই―

সে কথা আজও আমি বলিনি।’…

শুনে আমার মেয়ে মুগ্ধ। শুধালো, তোমার চামেলি দিদি এখন কোথায় ?

সেটা তো জানি না। উত্তরে বললাম। আমি যখন ময়মনসিংহে পড়তে চলে যাই তখনও তিনি জেলেই ছিলেন। তার বিরুদ্ধে অস্ত্রমামলা ছিল। নানা জেলখানায় বদলি হতেন। বিয়ে করারও সময় পাননি। বলতেন, বিপ্লবীর আবার বিয়ে কীরে!

তবে―

তবে ?

চামেলি দিদিদের বাড়ি ছিল মধ্যপাড়ায়। বেশ বড় তাদের বাড়ি। তার মা আর একটা ছোট ভাই ছিল।

স্কুলে পড়ত। নাম ছিল অশোক। অশোক ফুলের নামে নাম। কিন্তু চামেলি দিদি বলত, অশোক ফুল নয়―ওর নামের অর্থ ন-শোক। যার শোক পেতে নাই। কোনও কিছুতেই শোক পাবে না। বাবাকে হারিয়েছে। জেঠাকে হারিয়েছে। মাকে হারাবে। আমাকেও হারাবে। কিন্তু অশোক থাকবে অবিচল। বুক চিতিয়ে বিপ্লবের পথে এগিয়ে যাবে।

আমার মেয়ে শুনে বলে, বাহ। একদম চে গুয়েভারার মতো।

আমাদের ছোট সেই শহরে, ফুলের নামের ছিল ছড়াছড়ি। কেতকী, মাধবী, জুই, বেলি, টগর, অপরাজিতা, কামিনী, অতসী, লিলি, মহুয়া, কেয়া। আরেকটি মেয়ের নাম ছিল গুলমোহর বানু। ওরা বিহার প্রদেশ থেকে এসেছিল। লেপ তোষকের দোকান ছিল ওদের।

গুলমোহর মানে কি ?

কৃষ্ণচূড়া ফুল। বানু মানে মেয়ে। কৃষ্ণচূড়া ফুলের মেয়ে।

মেয়ে বলে, বাহ। কী সুন্দর নাম।

কিন্তু বিহারি বলে ওদের সঙ্গে শহরের লোকজন বিশেষ মিশত না। তবে কেউ ওদের ঘাটাতও না। ওদের বাপ-দাদারা সব সময় কোমরে ছুরি গুঁজে রাখত। যখন তখন যে কাউকে খুন করে বসতে পারে। কিন্তু গুলমোহর ছিল খুব মিষ্টি মেয়ে। পাড়ার ভাই-ব্রাদাররা লুকিয়ে ভালোবাসত তারে। আর তাদের শুনিয়ে শুনিয়ে সে গাইত, ‘হাওয়া মে উড়তা যায়ে

মেরা লাল দোপাট্টা মল মল…’

মেয়ে হেসে ফেলে। বলে, গুলমোহর বানু কি লাল ওড়না পরত ?

না, তাকে কখনও লাল রঙের ওড়না পরতে দেখিনি। বাড়ির বাইরে এলে বোরকা পরত। চোখের জায়গায় কালো গ্লাস পরা থাকত বলে তার মুখ দূরে থাকুক চোখ দুটোও কেউ দেখতে পেত না।

এই গুলমোহরের চোখ দুটো আমার দেখার সুযোগ ঘটেছিল একবার। ঠিক একবার নয়―দুবারই হবে মনে হয়।

আমাদের কাকিমার নাম ছিল পারুল। তিনি সুন্দর করে পাঁচালি পড়তেন। বাড়ি বাড়ি তার ডাক পড়ত। পারুল কাকিমা কিছু তুকতাক জানতেন। কারও চোখ উঠলে, বাও বাতাস লাগলে, হাম হলে বা ভয় পেলে কাকিমা ফু-ফা দিত। তাতেই সবাই ভালো হয়ে যেত। এমনকি কাকিমা মেয়েদের হিস্টিরিয়া রোগেরও নিদান দিতে পারতেন। এটা নিয়ে কিছু লুকোছাপা ছিল।

সে সময়কার এক ভোর ভোর বাড়ির সামনে একটি রিকশা থামল। রিকশাটির চারিদিকে কাপড় দিয়ে ঘেরা। ভেতরে কারা আছে দেখা যায় না। সবে আমাদের ঘুম ভেঙ্গেছে। উঠানে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছি কেউ নামছে না। কাছে যেতেই রিকশার ভেতর থেকে উর্দু টানে একজন মহিলা বললেন, পারুল দিদি আছে ?

আছে। একটু উঁচু স্বরে বললাম। বাড়ির মধ্যে আইসা পড়েন।

আমার গলা শুনে পারুল কাকিমা তুলসিতলা থেকে উঠে এলেন। তাকে দেখে কাপড়ের ঘের থেকে বয়স্ক বোরকাওয়ালি বেরিয়ে এলেন। কাকিমাকে সালাম জানিয়ে ব্যাকুল গলায় জানালেন, তার মেয়েটিকে মাঝে মাঝে জিনে ধরে। কোর্ট মসজিদের ইমাম সাহেব ফিকির করেছিলেন। কিন্তু ভালো বোধ হচ্ছে না। তাই পারুল দিদির কাছে নিয়ে এসেছে। তিনিই এখন শেষ ভরসা।

মেয়েটি মায়ের গায়ে এলিয়েছিল। তার কাছে এসে পারুল কাকিমা মেয়েটির মুখের কালো নেকাবটি তুলতে গেলেন। আর তার মা আঁতকে চেঁচিয়ে উঠল, নেহি নেহি। বেয়াব্রু না কর।

কিন্তু ততক্ষণে নেকাবটি পারুল কাকি খুলে ফেলেই আবার ঝপ করে বন্ধ করে দিলেন। আমরা ততক্ষণে তার মুখটি দেখে ফেলেছি। ক্লান্ত মুখ। দুই চোখে কালো চশমা। কালি কালি তাদের চারিপাশ। মরে যেতে দেরি নাই।

পারুল কাকিমা মেয়েটিকে ঘরের মধ্যে নিয়ে গেলেন। তার মাকেও ঢুকতে দিলেন না। ঘণ্টাখানেক পরে মেয়েটিকে নিয়ে পারুল কাকিমা বেরিয়ে এলেন। তার মায়ের হাতে দিয়ে বললেন, আর ভয় নাই। ভুত তাড়িয়ে দিয়েছি।

দাঁড়ানো রিকশায় বোরকাওয়ালি মা আর মেয়েটি উঠে পড়ল। যেতে যেতে একবার মেয়েটি পিছন ফিরে মুখের নেকাবটি খুলে আমাদের দিকে তাকাল। চশমাটি নাই। সেই ক্লান্তি নাই। উজ্জ্বল দুটি চোখ। কৃষ্ণচূড়ার রঙ মাখা মুখ। আমাদের দিকে তাকিয়ে ফিচ করে নিঃশব্দে হেসেও উঠল। তার মা কড়া করে ধমকে উঠল, গুলমোহর। আব্রু কর।

আর মেয়েটির মুখ আবার ঢাকা পড়ল। রিকশাটি চলে গেল। যেতে যেতে এক ফাঁকে তার সেই কালো চশমাটি ছুড়ে ফেলে দিয়ে গেল। আর কখনও দেখা হয়নি এ শহরে। পারুল কাকিমাই বলেছিলেন, গুলমোহরের বিয়ে হয়ে গেছে খুলনায়। ভালো আছে। ঝামেলা নাই।

আমাদের প্রতিবেশী হরেণ মোক্তারের মেয়ের নাম ছিল মালতিবালা। আমাদের সঙ্গেই পড়ত। খুব হাসিখুশি ছিল। ক্ষণে ক্ষণে খিল খিল করে গড়িয়ে পড়ত। নিজেদের বাড়িতে থাকতই না। ছুটে ছুটে আমাদের বাড়িতে আসত। সেই মালতিবালাই গুলমোহরের কালো চশমাটি কুড়িয়ে নিয়েছিল। ওড়নায় ঘষে সাফসুতরো করে রাখত। কিন্তু কখনওই চোখে দেয়নি। কেন দেয়নি তার কোনও কারণও বলেনি। বললেই হেসে হেসে গেয়ে উঠত―

‘মধু মালতি ডাকে আয় ফুল ও ফাগুনের এ খেলায়,

যূথী কামিনী কত কথা গোপনে বলে মলয়ায়।।

চাঁপা বনে অলি সনে লুকোচুরি গো লুকোচুরি,

আলো ভরা কালো চোখে গো কি মাধুরী গো কি মাধুরী।

মন চাহে যে ধরা দিতে তবু সে লাজে সরে যায়।।’

‘চাঁপা’ শব্দে এসে একটু হেসে উঠত। সেটা দেখে আমরা অবাক হয়ে শুধাতাম, হাসলি কেন ?

গান থামিয়ে হাসি হাসি মুখেই বলত, চাঁপা হলো চাঁপা। দোলনচাঁপা, কাঁঠালিচাঁপা, ভূঁইচাঁপা, কনকচাঁপা, স্বর্ণচাঁপা, নাগেশ্বর চাঁপা, গুলঞ্চ চাঁপা, হিমচাঁপা।

এগুলো ফুলের নাম। এর কোনও কোনওটি আমাদের এলাকায় আছে। আর কোনও কোনও নাই। কিন্তু নাম শুনেছি। এর মধ্যে গুলঞ্চ চাঁপা হলো কাঠগোলাপ। আর হিমচাঁপা হলো উদয় পদ্ম। চাঁপা জানে। ওর মামা বোটানির শিক্ষক। থাকেন বরিশালে। এই মামার কাছ থেকেই চাঁপা নামের ফুলের কথা জেনেছে মালতি।

তবে মালতি বলে, এই গানের চাঁপা ফুলটি হলো ফুলবদিনা গ্রামের মেয়ে। তার দূর সম্পর্কের পিসাতো বোন। হরিদ্রা বর্ণের মুখ তার। সে হেঁটে গেলে মিষ্টি ঘ্রাণ ভেসে আসে। এই ঘ্রাণ কাঁঠালিচাঁপা ফুলের। এই চাঁপা এলে গুলমোহরের চশমাটি তাকে দেবে। তার চোখেই মানাবে। সে কখনও শহরে আসেনি।

শুনে আমাদের শ্বাস ঘন হয়ে আসে। নাকে ঘাম জমে। শুধাই, কবে, কবে আসবে চাঁপা ?

আসবে। আসবে। কোনও এক গ্রীষ্মে। বর্ষায়। অথবা হেমন্তে। নেচে নেচে গান শোনাবে।

আমরা সারা শহর তন্ন তন্ন করে কাঁঠালি চাঁপা ফুলের গাছ খুঁজতে শুরু করি। ছত্তার মোল্লার বাসায় দুটো কাঁঠালিচাঁপার গাছ ছিল। বন্যায় মরে গেছে। চন্দ্র গোসাইর আশ্রমে অনেক ফুলের গাছ আছে। গোসাই বলেন, এ গাছটি ছিল বটে। কিন্তু বাগের হাটের আমিরুদ্দিন খাঁ মাটি খুড়ে নিয়ে গেছে। আমাদের ঘোরাঘুরি দেখে মালতিবালা বলে, ফুলবদিনা গ্রাম থেকে আসার সময় চাঁপা কাঁঠালিচাঁপা নিয়ে আসবে।

শুধু ফুল ?

ফুলও আনবে। আবার চারাও আনবে। নিজের হাতে চারা লাগাবে। এ শহর কাঁঠালিচাঁপার ঘ্রাণে ভেসে বেড়াবে।

আমরা চাঁপার জন্য অপেক্ষা করি। চাঁপা ফুলটির জন্য অপেক্ষা করি। অপেক্ষা করি চাঁপা গাছটির জন্য। অপেক্ষা করি গ্রীষ্মে, বর্ষায় এবং হেমন্তে। অপেক্ষা করি বছর থেকে বছর। আমরা হাফ প্যান্ট ছেড়ে ফুল প্যান্ট ধরি। আমাদের ঠোঁটের উপরে গোঁফ ঘন হয়ে ওঠে। গলা ভেঙ্গে যেতে থাকে। মালতি শাড়ি পরে মাঝে মাঝে মালতিবালা হয়ে ওঠে।

এরই মধ্যে একদিন মালতিদের বাড়ির চারিদিকে তড়িঘড়ি করে উঁচু বেড়া ওঠে। সামনে গেট। গেটে তালা পড়ে। বাড়ির লোকজন সতর্ক হয়ে চলাফেরা করে। মনে হয় কী একটা গুপ্ত ঘটনা ঘটে চলেছে অগোচরে।

মালতিকেও আর বাড়ির বাইরে দেখা যায় না। মাঝে মাঝে তার গলা শোনা যায়। আগের মতো ফুল্ল গলা নয়―চাপা গলা। চাপা লয়ে ভেতরবাড়িতে কথা বলে। একদিন বেড়ার ফোকর থেকে তাকে ধরি। শুধাই, কী হয়েছে ?

বেড়ার ওপাশ থেকে মালতি ফিসফিস করে বলে, সে এসেছে।

আমরা অবাক হয়ে বলি, কে এসেছে ?

চাঁপা এসেছে।

চাঁপাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন ?

এর জবাব মালতি দিল না। তার বদলে বেড়ার উপর দিয়ে একটি সাদা মুখের বেড়াল উচিয়ে দেখাল। বেড়ালটি গলায় কুঁচফুলের মালা পরানো। এ বিড়ালটি এ পাড়ায় কখনও দেখিনি। আমাদের উদ্দেশ্যে মালতি বলে, ঘ্রাণ পাচ্ছ ?

কিসের ঘ্রাণ ?

কাঁঠালিচাঁপার ঘ্রাণ।

আমরা মাথা নাড়ি। কোনও ঘ্রাণ পাই না। মালতি তাড়াহুড়া করে বলে, সময় নাই। বাবা এসে পড়বে। জোরে জোরে শ্বাস টানো।

আমরা জোরে জোরে শ্বাস টানি। ঘরের ভেতর থেকে মালতির মায়ের গলা শুনতে পাই। সে বিড়ালটি নিয়ে সাৎ করে চলে যায়। আমরা ঘ্রাণ পাই না। তবে কিছুক্ষণ বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। মালতি যেতে যেতে ফিসফিসিয়ে বলে গেছে, পাবে পাবে। কোনও ভুল নাই। চাঁপা এসেছে। কুঁচফুলের মালা গলায় দিয়ে চাঁপার বিড়ালটি এসেছে। কাঁঠালিচাঁপাও এসেছে।

এরপরে সেই আধো অন্ধকারে শান্ত স্নিগ্ধ মৃদু জ্যোৎস্নায় আমরা সত্যি সত্যি যেন কাঁঠালিচাঁপা ফুলের ঘ্রাণ পেতে শুরু করেছি।

সেই ঘ্রাণের সঙ্গে ভেসে আসছে কিন্নর কণ্ঠ―

মালা হয়ে প্রাণে মম কে জড়ালো কে জড়ালো,

ফুল রেণু মধু বায়ে কে ঝরালো কে ঝরালো।

জানি জানি কে মোর হিয়া রাঙালো রাঙা কামনায়।।

আমরা অপেক্ষা করি, এ বাড়ির দেওয়াল উবে যাবে। বাইরে জ্যোৎস্না উঠবে। তার মধ্যে ঘুঙুর পরে চাঁপা বেরিয়ে আসবে। নেচে নেচে গানটি গাইবে।

আমাদের সারা শহরের মানুষজন এই বাড়ির দিকে অদ্ভুতভাবে তাকাতে লাগল। কেউ কেউ সন্দেহ করল, এ বাড়িতে গ্রাম থেকে কোনও একটি মেয়েকে নিয়ে আসা হয়েছে। সে হয়তো কোনও যুবকের প্রেমে পড়েছিল। হয়তো সে যুবকটির সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার ষড় করেছিল। হয়তো পালিয়েও গিয়েছিল। পরিবারের লোকজন তাকে ধরে এনে রেখেছে এ বাড়িতে। তাকে তার প্রেমিকের সঙ্গে যেতে দিতে চায় না। কেউ কেউ ভাবল, এ মেয়েটিকে হয়তো কেউ জোর করে বাড়ি থেকে তুলে নিতে চায়। জোর করে বিয়ে করতে চায়। বাবা-মা এই নাবালিকা মেয়েটিকে রক্ষা করতে শহরে নিয়ে এসেছে। কারও কারও ধারণা, মেয়েটিকে কে বা কারা ধর্ষণ করতে পারে। হয়তো ধর্ষিত হয়েছে। কেউ কেউ আরেকটু এগিয়ে ভাবল, মেয়েটি গর্ভবতী হয়েছে। তবে কারও কারও বিশ্বাস, এলাকার নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় আক্রান্ত হতে পারে ভেবে ঘরবাড়ি ছেড়ে মেয়েদের নিয়ে শহরে পালিয়ে এসেছে। এইরকম নানা গুজবে সারা শহর জুড়েই ফিসফাস হতে লাগল। এগুলো আমাদের ভালো লাগল না। আমাদের মনে হলো, ও বাড়িতে যাওয়া দরকার। ওদের খোঁজখবর নেওয়া দরকার। চাঁপাকে দেখা দরকার। দরকার তার কাছ থেকে কাঁঠালিচাঁপা ফুলগুলো নেওয়া―চারাটির দেখভাল করা। শহরের লোকজন বাড়িটিকে দূর থেকে নজর করছিল। তারা আমাদেরকে যেতে বাধা দিল। বলল, পরিস্থিতি সুবিধাজনক নয়। ঝামেলা হতে পারে।

কী ঝামেলা সেটা বোঝার মতো বয়স আমাদের হয়নি। আমরা ততদিনে চাঁপা ফুলটির জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছি। মনে হলো এইভাবে দূরে থাকলে চাঁপা ফুলটিকে হারিয়ে ফেলব। চাঁপাকে চোখের দেখা পাব না। একদিন খুব ভোর ভোর মালতিকে বেড়ার বাইরে থেকে ডাক দিলাম। কোনও উত্তর এল না। ওদের গেটের তালাটির কাছে আসতেই দেখা হলো তালাটিতে চাবি দেওয়া হয়নি। ঘরের দরোজা সামান্য ঠেলতেই খুলে গেল। তখনও অন্ধকার হয়ে আছে। আমরা দরোজার দিকে মুখ করে জোরে জোরে হেঁকে উঠলাম― চাঁপা। চাঁপা!

কোনও সাড়া এল না। আমাদের ভয় করতে লাগল। একটা বদ হাওয়া ঘুরে এল। আর ঘরের দরোজাটিও ক্যাচ ক্যাচ শব্দে খুলে গেল। বাঁড়িটি ফাঁকা। রান্নাঘরে কয়েকটি কাটা সবজি গামলায় পড়ে আছে মাত্র। মালতিও নাই― চাঁপাও নাই। দুটি চুল বাঁধা ফিতে বিছানার উপর গড়াচ্ছে। কেউ কোথাও নাই। হাওয়ায় উবে গেছে। সেটা দেখে আমাদের কান্না পেল। সেই প্রথম আমরা সবাই সত্যিকারের কান্না করতে শুরু করলাম। বুঝতে পারলাম কান্না ছাড়া আমাদের আর কিছুই নাই। সেটা ভেবে আজ আবার এই মধ্যবয়সে কান্না এল।

দেখে আমার মেয়ে অবাক হয়ে বলল, কাঁদছ কেন ?

বললাম, কাঁদছি না তো। বলতে বলতে আবার চোখ বেয়ে জল ঝরতে লাগল।

মেয়ে কী বুঝল কে জানে। বলল, দেশ থেকে ঘুরে এসো। নিশ্চয়ই চাঁপার সন্ধান পাবে।

হয়তো পেতে পারি। নাও পেতে পারি। তবে চাঁপার জন্য যাওয়া ছাড়া উপায় নাই।

বহু বছর পরে দেশে ফিরছি রিপ ভ্যান উইংক্যালের মতো। চেনা শহরটি আর নাই। গাছপালা, রাস্তাঘাট, বাড়িঘর আর মানুষও সব পালটে গেছে।

শহরে ঢোকার মুখে একটি ঘোড়ার ভাস্কর্য বসেছে। কেশরটা হালকা গোলাপি। বাংলায় লেখা―ওয়ার্দা। জন্ম―। মৃত্যু―১৯৮৫ ইসায়ি সাল।

তোমার তরে হয়েছিলাম শিশুবেলার পরি।

সেই গরবে ওয়ার্দা তোমায় সারা জীবন স্মরি।।

স্থানীয় লোকজন জানালেন, ঘোড়াটি কিছুদিন অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। পশুচিকিৎসক তার শেষ ক্ষণ ঘোষণা দিয়ে যান। তখন এলাকার লোকজন ঘোড়াটিকে ভিড় করে দেখতে আসত। আসত দূর-দূরান্তেরও লোকজন। মারা গেলে সাত দিনব্যাপী জেয়াফতের আয়োজন করা হয়েছিল। মাননীয় সংসদ সদস্যও এসেছিলেন সে উপলক্ষে। প্রতি বছর মৃত্যুদিবস ঘটা করে পালন করা হয়। ঘোড়াটি নির্মাণ করেছেন বিশিষ্ট ভাস্কর শামীম শিকদার। তবে বকুলের বাবা ঘোড়াটির মৃত্যুশোক বেশি দিন সইতে পারেননি। ছ’মাসের মাথায় তিনি অজানা রোগে মারা যান।

লিচুদের বাড়িতে আরও দুটো বিল্ডিং হয়েছে। সামনে খোলা উঠানটা নাই। তবে হাসনাহেনা ফুলগাছটি আছে। বেশ লম্বা হয়েছে। লিচু জানালো হেনা মালয়েশিয়া থাকে। তার তিন সন্তান। সন্তানদের একজনের নাম রেখেছে হাসনা। বড় বোনটিকে হারিয়ে যেতে দেয়নি।

চামেলি দিদিদের বাড়িটা নাই। সেখানে একটি ইংরেজি কেজি স্কুল। চামেলি দিদিই তার অধ্যক্ষ। দিদির চেহারা অনেকটা পালটে গেছে। বেশ ভারী হয়েছেন। সিঁথিতে সিঁদুর নাই। বিয়ে করেছেন কি না বোঝা যায় না। বললেন, তার ছোট ভাই অশোক নিখোঁজ হয়ে গেছে। তারপর বাড়িটি শত্রু সম্পত্তি হয়ে গিয়েছিল। অনেক চেষ্টা-তদ্বির করে সেটা রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। এজন্য তিনি তার পার্টি কমরেড আকমল চৌধুরীকে বিয়েও করেছিলেন। একটু মুখ নিচু করলেন চামেলি দিদি। আর্দ্র গলায় বললেন, বিয়ের তিন বছর পরে পুলিশের এনকাউন্টারে তিনি নিহত হন।

একে একে সবার খবরই পাওয়া গেল। রোজি খালা এখনও বাপের বাড়ি আসে না। তার বড় মেয়েটি ডাক্তার হয়েছে। ছেলেটি ম্যাজিস্ট্রেট। জিনিয়া আপা খুলনা ছেড়ে ঢাকায় চলে গেছেন। গেলবার তিনি হেলিকপ্টারে করে এ শহরে এসেছিলেন। ডেইজি আর শিউলি আর গান করে না। এক পিরের মুরিদ হয়েছে। কঠিন পর্দা করে। পরপুরুষের সামনে যায় না।

সবারই খবর পাওয়া গেল। শুধু চাঁপার পাওয়া গেল না। কেউ মনেই করতে পারল না, চাঁপা নামে এ শহরে কেউ এসেছিল। তবে স্থানীয় থানার দারোগা বললেন, এসেছিল কি না―গায়েব হয়েছিল কি না তার কোনও তথ্য তাদের কাছে নাই। তিনি একটু হাসি হাসি মুখ করে বললেন, চাঁপা নামে যদি কেউ এসেও থাকে সে সময়ে তবে নিশ্চয়ই তাকে নিয়ে তার পরিবার ওই পারে চলে গেছে।

কোন পারে ?

তিনি একটু গম্ভীর স্বরে বলেন, ওই পারে মানে ওই পারে।

সেটা বর্ডারের পার হতে পারে। আবার পরপারও হতে পারে। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি তিনি।

একটু মরিয়া হয়ে শুধাই, পুরোনো ফাইলপত্র খুঁজে কি দেখা যেতে পারে ?

এবারে একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, এরকম চাঁপাদের সংখ্যা এত বেশি যে তাদের নামে ফাইল খুললে থানা ভরে যাবে। আর কোনও কাজ করা যাবে না।

চাঁপার সন্ধান পাওয়া যাবে না। মন খারাপ হয়ে গেল। মনে হলো মালতিদের বাড়িটা দেখে যাই। সেখানে চাঁপা এসেছিল।

বাড়িটার কোনও পরিবর্তিন হয়নি। চালের টিনগুলো শুধু পুরোনো হয়েছে―জং ধরেছে। দরোজায় টোকা দিলাম। ক্যাচ ক্যাচ করে খুলে গেল। ভেতর থেকে একজন মধ্যবয়সী মহিলা বের হলো। মুখভর্তি পান। চেনা চেনা মনে হলো। চিনতে পারছি না। মনে হলো ফিরে যাই।

সে-ই আমাকে চিনে ফেলল। সে বিহারিদের মেয়ে গুলমোহর বানু। ভিন্ন পাড়ার চৌধুরীদের ছেলের সঙ্গে তার প্রেম হয়েছিল। কিন্তু বিয়েতে তার বাবা মা রাজি হবে না জেনে হিস্টিরিয়া রোগের অভিনয় করেছিল। পারুল কাকিমার পরামর্শে গুলমোহর ছেলেটিকে নিয়ে পালিয়ে যায়। বিয়ে করে। দু বছর এখানে-ওখানে থেকেছে। মালতিদের বাড়িটা ফাঁকা পেয়ে গুলমোহর বানু বাড়িটিতে উঠে পড়েছে। এইভাবেই আছে। তাদের আর্থিক অবস্থা খুব বেশি ভালো নয়। ভালো হলে বিল্ডিং তুলবে।

বসার ঘরে বসিয়ে রেখে গুলমোহর বানু চা-নাস্তা বানাতে গেল। যেতে যেতে বলে গেল, চাঁপা এসেছে।

চমকে উঠি। চাঁপার খোঁজেই দেশে আসা। বললাম, চাঁপা কোথায় এসেছে ?

বাইরে। উঠানে। জানালা খুলে দেখো।

জানালাটি পর্দা দিয়ে ঘেরা ছিল। খেয়াল করা হয়নি। সেদিকে তাকাতেই কানে ভেসে এল, ওপাশে শাড়ির খসখস শব্দ। আর একটি বিড়ালের অল্পস্বরে মিঁউ মিঁউ ডাক। বিড়ালটিকে মৃদু ধমকে শান্ত থাকতে বলছে।

জানালার কাছে গেলাম। পর্দা তুললেই আমাদের চাঁপাকে দেখতে পাওয়া যাবে। আমাদের স্বপ্ন পূর্ণ হবে। মন ভালো হয়ে যাবে।

থরথরে পর্দাটা তুললাম। জানালার ওপাশে কেউ নাই। ফাঁকা। উঠানের প্রান্তে একটি গাছ দেখা গেল। মৃদু হাওয়ায় নড়ছে তার পাতা। তার নিচে মিঁউ মিঁউ করছে একটি বিড়াল। গলায় কুঁচফুলের মালা। হাওয়ায় একটি মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে। খুব চেনা।

গুলমোহর বানু চা নাস্তা দিতে দিতে বলল, চাঁপাফুলের গন্ধ―কাঁঠালিচাঁপা।

সচিত্রকরণ : শিকদার সৈকত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button