
সরকারি ইশকুলে ভালো ছাত্রছাত্রীরা পড়ে, এই রকম একটা ধারণা অত ছোটকালে আমাদের মাথায় কী করে গেঁথে গেল তার সূত্র আমরা খুঁজে পাই নাই। তখন পাই নাই, তার পরেও যে পাইছিলাম সেরকমও না। কারণ তখন বাংলা সিনেমার নায়িকা শাবানা একটা গান গেয়ে আমাদের আরও বেশি ধন্দে ফেলে দিয়েছিল। ওই সিনেমার নায়ক ছিল আলমগীর। ইয়া লম্বা, প্রেমিক প্রেমিক চেহারা ছিল আলমগীরের। নায়িকা শাবানা ডোরাকাটা শাড়ি পরে মাটির ওপর প্রায় গড়াতে গড়াতে গান গেয়েছিল―
লেখাপড়া করে যে/ গাড়ি চাপা পড়ে সে…
এই গান দেখার পরে সরকারি ইশকুল আমাদের মনে বড় বেশি দাগ কাটতে আর পারে নাই। ইশকুল দাগ না কাটলেও সরকারি ইশকুলে পড়ুয়া ছেলেদের নাম আমার বয়সী সকল বালিকার মনে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো স্থায়ী হয়ে গেল। আমরা দেশ প্রাণি মাছ ফুল পাতা নাম খেলার টাইমে মানুষের নাম লেখার ঘরে ওদের নাম বসিয়ে দিতাম। যদিও আমাদের এই নাম বসানো সম্পর্কে ওই ছেলেগুলা একেবারেই ওয়াকিফহাল ছিল না। আমরা যখন ‘হ’ বর্ণ নিয়া খাতার ছেঁড়া পাতাটা বাম হাত দিয়ে ঢেকেঢুকে খেলাটা চালিয়ে নিতাম, আমি লিখতাম ‘হ’ তে হাঙ্গেরি, হাঁস, হাস্নাহেনা, হামিম। খেলার টাইম শেষ হলে যখন নাম মিলাতাম, তখন আমার আর রিতার পয়েন্ট কাটা পড়ত। আমরা দুজনই মানুষের নামের জায়গায় আধখেঁচড়া বর্ণে লিখেছি ‘হামিম’। এ নিয়ে কেউ হাসাহাসি করত না। কারণ তাতে খেলাটা ভণ্ডুল হয়ে যেতে পারে। আমরা কোনওমতেই খেলার আনন্দ মাটি করতে দিতাম না। এখন ‘হ’ দিয়ে হামিম ছাড়াও হাসান লেখা যেত বা হারিস। কিন্তু আমরা চাইতাম সরকারি ইশকুলে পড়ে, এমন কারও নাম লিখতে। কোনওদিন এমন হতো যে, আমরা চারজনই নামের ঘরে ‘হামিম’ লিখে নাম্বার কম পেতাম। এক একটা ঘরে ছিল ৫ পয়েন্ট করে। আমরা তখন ৪০ বা ৪৫ বা তারও কম পয়েন্ট নিয়ে গম্ভীর হওয়ার ভান করতাম। একই নাম লিখবার কারণে আমাদের পয়েন্ট কাটা গেলেও কারও মন খারাপ হতো না। ‘হামিম’ লিখেছি এটা মিলে গেলে বুঝতাম এই হামিম নামের ঢেউ সহসা আমাদের ছেড়ে যাওয়ার নয়। এটা তো সত্য ছিল, আমাদের পাড়ার হামিম সরকারি ইশকুলে পড়ত। এবং সে আর আমি একই ক্লাসের স্টুডেন্ট। যদিও গার্লস ও বয়েজ ইশকুল ছিল আলাদা। আমার খেলার সাথীদের দুজন আমার চাইতে বড় ক্লাসের ছাত্রী এবং একজন আমার চাইতে এক ক্লাস নিচে। এবং আমি আর আরেকজন বড় ক্লাস ছিল সরকারি ইশকুল।
খাতার ছেঁড়া পাতা শেষ হয়ে গেলে আমাদের দেশ প্রাণি মাছ ফুল পাতা নাম খেলারও ইতি ঘটত। তখন দুপুরের রোদ মরে গিয়ে চাল-ধোয়া জলের মতো আলোয় ভরে উঠেছে ঘরের বাইরেটা। আমরা ইচিংবিচিং খেলতে পারব কি না এমন ভাবনা নিয়ে উঁকিঝুঁকি মারছি। আর রিতার বড় ভাই ঝারি দিয়ে জল দিচ্ছে ওর বাগানে। রিতার বড় ভাইয়ের নাম রাতুল। উনি কই জানি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। আমরা কি অতশত বুঝি ? উনি ছুটিছাটায় বাড়ি এলে উনাকে দেখি, কিন্তু কথা বলি না। উনার সঙ্গে আমাদের কীসের কথা ? এরকম ভুইট্টা একটা লোক। যার কি না নাকের তলায় ঘন ও লম্বা গোঁফ আছে। রাতুল ভাইয়ের বাগানে কী নাই ? সারি সারি দোপাটি ফুল। জিনিয়া আর সূর্যমুখী। ডালিয়া আর দোলনচাঁপাও আছে। আছে গ্যান্দা। হাস্নাহেনা। শীতের বিকেলগুলিতে রাতুল ভাইয়ের ফুলবাগানে নির্ঘাত ফুলপরিরা নাচতে নামে। এত ফুল ফোটে যে, আমাদের হাত নিশপিশ করতে থাকে। আমরা চোরের মতো তাকিতুকি করি, রাতুল ভাই ঘরে ঢুকলেই হাস্নাহেনার ডাল ভেঙ্গে নিয়ে চম্পট দিব। হাস্নাহেনার ডাঁটা ফুলদানির জলে ভিজিয়ে রাখলে রাতভর ফুলেরা সৌরভ বিলাতে থাকে। তখন আমরা নিজেদেরই ফুলপরি ভাবতে পারি। যেন ডানা খুলে রেখে আমরাই দারুণ সব নাচের মুদ্রা ফুটিয়ে ত্লুতে পারব।
রাতুল ভাই আমাদের সঙ্গে কথা কয় না। আমরাও কই না। উনি সরকারি ইশকুল থেকে ম্যাট্রিক পাস দিয়েছেন কি না আমরা জানি না। জানলেও আমাদের কিছুই যায় আসে না। কারণ এই ভুইট্টা-লোক নিয়ে আমাদের আগ্রহী হওয়ার কোনও কারণ ঘটে নাই। হামিমের বয়সী উনি হলে আমরা হয়তো দেশ প্রাণি মাছ ফুল পাতা নাম খেলার টাইমে ‘হামিম’ না লিখে লিখতাম ‘রাতুল’। এমন হওয়ার জো ছিল না। কারণ হামিম আর রাতুলের আদ্যক্ষর এক নয়। ‘র’ দিয়ে প্রাণি লিখতাম রাজহাঁস। আর দেশের নাম নিয়ে খটকায় পড়তাম। ভেবেচিন্তে হয়তো লিখে ফেলতাম রাশিয়া। বাংলা ভার্শনে রাশিয়ার চমৎকার পত্রিকা ‘উদয়নের’ পাতা দিয়ে আমরা তখন নতুন বইয়ের মলাট করতে শিখে গিয়েছি। নতুন বইয়ে মলাট লাগিয়ে নিয়ে আমরা বইয়ের যত্ন করি। যাতে আমাদের হাতের ধূলিবালিতে বইয়ের প্রচ্ছদ অপরিচ্ছন্ন হয়ে উঠতে না পারে।
রাতুল ভাই সারি সারি দোপাটি ফুলের গাছ ঝারির জলে ভিজিয়ে দেয়। এতে করে গোলাপি ও ম্যাজেন্টা রঙের ফুলগুলি আগের চাইতেও তরতাজা দেখায়। এতটাই পুষ্ট, যেন হাতের স্পর্শ পেলে মট করে ভেঙ্গে যাবে। আর হাস্নাহেনার ঝাড় থেকে সুগন্ধ ভেসে আসে। সূর্যমুখীর হলুদ রঙের বড় বড় পাপড়িগুলি মাটির দিকে নুয়ে পড়ছে। রোদের কিরণ ছাড়া এরা মাথা তুলে তাকায় না। যেন সূর্য এদের জীবন।
রিতার বড় বোন মিতা আপা বিকেল হলেই হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করে―
আমি সূর্যমুখী ফুলের মত দেখি তোমায় দূরে থেকে / দলগুলি মোর রেঙে ওঠে তোমার হাসির কিরণ মেখে/ নিত্য জানাই প্রেম-আরতি / যে পথে নাথ তোমার গতি /ওগো আমার ধ্রুব-জ্যোতি/ সাধ মেটে না তোমায় দেখে…
এই গান শুনে রাতুল ভাইয়ের ঝারির জল আরও খানিকটা নুইয়ে পড়ে। এমনকী রাতুল ভাই হঠাৎ ফুলবাগান ফেলে হনহনিয়ে পাশের পালানে ঢুকে পড়ে। যেখানে লাইশাকের সবুজ-পাতা পুষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। লাইয়ের পাশে ফুলকপি আর বাঁধাকপির বেড। একটা পাঁচন হাতে নিয়ে রাতুল ভাই সব্জির বেডগুলির মাটি নিড়িয়ে দিতে শুরু করে। তখন হয়তো সূর্যাস্তের লালাভা রাতুল ভাইয়ের পালানে ঢুকে পড়েছে। আমরা চোখের কোণ দিয়ে দেখি, রাতুল ভাইয়ের মুখে রক্ত ঝলসে উঠেছে। এমন কী ঘটল যাতে রাতুল ভাইয়ের মুখ এত লাল হয়ে উঠতে পারে ? রাতুল ভাই ফুলবাগান ছেড়ে সব্জির বাগানে আরও রাঙ্গা হতে হতে ক্রমশ যেন রাত্রি নামিয়ে আনে! আমাদের তখন ভয় লাগতে শুরু করে, এই রে এক্ষুনি ফিরতে হবে বাড়ি। মাগরিবের আজান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই খোঁজাখুঁজি শুরু হয়ে যাবে আমরা কে কোথায় আছি ? পড়ার টেবিলে না পেলে আব্বা হলুস্থুল কাণ্ড ঘটিয়ে ছাড়বে।
বাড়িতে ঢুকেই আমাদের কি না রাতুল ভাইকে মনে পড়ে। এ কী ফ্যাসাদ শুরু হলো ? এখন ইংরেজি বা পাটিগণিত নিয়ে আব্বা পড়ার টেবিলে এলে আমাদের মাথা থেকে রাতুল ভাই উনার ফুলবাগানসহ হাপিস হয়ে যাবে। এমনকি সূর্যাস্তের আলোয় দেখা উনার রাঙ্গা মুখখানিও। তখন হামিম থাকলেও থাকতে পারে। হামিম না হয়ে ক্লাস টিচার হামিদা খাতুনের রাগান্বিত মুখ মনে করে আমরা সব পড়া গুলিয়ে ফেলতে পারি।
পরের দিন ইশকুল। ইশকুলের লালবাস ঠিক আটটায় এসে আমাদের বাড়ির সামনে ভোঁ ভোঁ করে হর্ন বাজাবে। যেন কোনও ইস্টিমার ঘাট ছেড়ে যাবে এখুনি। তাই ভোঁ ভোঁ করে তাড়া দিচ্ছে। কিংবা কোনও দলছুট হাঁসা ঘ্যাসঘ্যাসে গলায় ডেকে মরছে হারিয়ে যাওয়া হাঁসিটির জন্য। ওই ডাক শুনেই আমি ব্যাগ বোঝাই বই নিয়ে পড়ি কি মরি করে ছুটব বাসে ওঠার জন্য। আমার বইগুলি ‘উদয়নের’ পাতা দিয়ে মলাট করা। নিভাঁজ ও নান্দনিক। পায়ের সাদা কেডসের ফিতা বাঁধতে ভুলে গেলে উষ্ঠা খেয়ে দুই-চারবার পড়ে গিয়েও বাসের ভিতরে পৌঁছানো যাবে। আমি উঠে যাওয়া মাত্রই কন্ডাকটর বাসের শরীরে জোরে জোরে চাপড় মেরে বলবে―
উস্তাদ, যাইব যাইব যাইব।
ড্রাইভার ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে শুরু করলেই আমার গা গুলিয়ে বমি উঠে আসবে।
বাসের পেট্রোল, ডিজেল নাকি ধোঁয়া আমাকে সাত-সকালেই রোগী বানিয়ে তোলে।
হামিমদের ইশকুলের কোনও বাস নাই। রাতুল ভাই কোন শহরে পড়তে যায় ভালো করে জেনে নিতে হবে। উনি কি বাসে করে যাতায়াত করে সেই দূরবর্তী শহরে ? অবশ্য জানব কী করে ?
রিতা যদি বলে বসে―
আমার ভাই কই পড়ে তাতে তোমার কীসের এত দরকার ?
শীত শেষ হলেই রাতুল ভাইয়ের ফুলবাগানের জৌলুস কমে যায়। সূর্যমুখীর মরা ফুল আর দোপাটির ঝরা পাপড়িতে বাগান লণ্ডভণ্ড দেখায়। জিনিয়া ফুলের পাপড়িগুলি শুকিয়ে চামচিকের মতো হয়ে থাকে। ডালিয়া রঙ হারিয়ে বাদামি হতে হতে লাউয়ের পাছায় ঝুলে থাকা মরা ফুলের মতো একরত্তি হয়ে যায়। এসবই আদতে গরমকাল আসার পূর্বাভাস।
২.
ক্লাস ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষার আগে আগে হামিমের সঙ্গে আমার কথাবার্তা শুরু হলো। এই কথাবার্তার সূত্রধর হিসেবে ছিল সরকারি ইশকুল ও একই ক্লাসে পড়া। আব্বা আমাকে বৃত্তি পরীক্ষার গাইড বই কিনে দিয়েছে, নাম ‘ছাত্রসখা’। এদিকে হামিমের আব্বা কিনে দিয়েছে ‘ছাত্রবন্ধু’। হামিম মিলিয়ে দেখতে চায় কোন বইয়ের সাজেশন উত্তম। আমি এসব চাই না। আমার এত পড়াশোনা করতে ভালো লাগে না। বই নিয়ে পড়ে থাকার চাইতে কত কাজ আছে আমার! বিকালবেলা রিতাদের বাড়ি গিয়ে ইচিংবিচিং খেলা। বা দড়িলাফ। চোর-পলান্তি। খেয়াল রাখা রুনা লায়লার গানের স্পেশাল অনুষ্ঠান কবে হবে ? আমাদের বাড়িতে কোনও টেলিভিশন নাই। আব্বা বলে―টেলিভিশন কিনলে পড়ালেখা গোল্লায় যাবে। এইগুলা যেরকম খাটাস, সারাদিন খালি নাচা-গানা-নাটক দেইখাই টাইম লস করবে।
আমাদের টেলিভিশন নাই তো কী ? রিতাদের আছে। হামিমদের আছে। রুনা লায়লা ‘ও জীবন রে ও জীবন’ গাইতে থাকলে আমি বান্ধা দড়ি ছিঁড়ে দৌড় লাগাই।
কিংবা পান খাইয়া ঠোঁট লাল করিলাম বন্ধু পাগল হইলো না…
রুনা লায়লার আঙ্গুলগুলি কী যে সুন্দর! আর আঙ্গুল বোঝাই আংটি। আংটিগুলি কি হিরার নাকি পোখরাজ পাথরের ? নাকি মুক্তার ? আমার আম্মার হিরার আংটি নাই, কিন্তু মুক্তা বসানো আংটি আছে। আর আছে লাল রুবি ও ধবধবে শাদা পোখরাজ পাথরের আংটি। আম্মার পান্না বসানো আংটিও আছে। আর কানের ভারিসারি ঝুমকা। হাতে গোলাপবালা। রুনা লায়লার নখগুলি কি মেনিকিওর করা ? আম্মা বাসায় সিনে পত্রিকা চিত্রালী আর পূর্বাণী রাখে। পুরা হপ্তার ঢাকাই সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের সব খবরাখবর থাকে এসব পত্রিকায়। পত্রিকা পড়েই আমি জানি, ববিতার নখগুলি মেনিকিওর করা। তাই অত সুচালো আর সুন্দর। আর গ্লেজ দেয়।
হামিম আমার ‘ছাত্রসখা’ নিয়ে গেলে আমি বলি―
“তোর ‘ছাত্রবন্ধু’ আমারে দিয়া যাবি”
হামিম হাসতে হাসতে বলে―
‘আরে দিমু দিমু, ভাবিস না।‘
মনে মনে আমার খুব রাগ হয়। আমি চাই না আমার বইপত্র অন্য কেউ নিয়ে যাক। কিন্তু মুখে হাসি দিয়ে বলি―
‘মনে কইরা দিয়া যাইস’।
হামিম ‘ছাত্রসখা’ ফেরত দেওয়ার আর নাম করে না। এদিকে আমাকে ওর ‘ছাত্রবন্ধু’ও দিয়ে যায় না। হামিমকে আমার আর ভালো লাগে না। একটা ছেলে এত শয়তান কীভাবে হয় ? আমার বই নিয়ে গেছে অথচ নিজের বইটাও আমাকে দিয়া যায় নাই ?
হামিমের সঙ্গে দেখা করার কোনও উপায় আমার নাই। আমি যখন তখন ওর বাসায় যেতে পারি না। আব্বা খুবই অপছন্দ করে। তাই হামিমই নিজ থেকে আসে। এসে আব্বাকে বলে―
‘খালুজান, লেখাপড়া নিয়া বীথিকার লগে আলাপ করতে আসলাম।’
আব্বা বলে―
‘খুব ভালো। খুব ভালো। অংকে কি লেটার পাইছিলা ষান্মাসিকে ?’
হামিম মাথা নিচু করে বলে―
‘না, পরীক্ষা খারাপ হইসিল।’
আব্বা অজু করতে চলে গেলে হামিম আমার দিকে তাকিয়ে হাসে। দেখে আমার রাগে গা জ্বলে যায়। শয়তান একটা। আমার বৃত্তি গাইড নিয়া আটকাইয়া রাখছে।
হামিম বলে―
‘ওই আমি একটা বেলিফুলের চারা আনছি।’
কীসের বৃত্তি আর কীসের কী। হামিম আমার ‘ছাত্রসখা’ নিয়া যাক। কিন্তু আমার বেলিফুলের চারা লাগবে। আহ! বেলি! বেলির চাইতে সুন্দর ফুল আর একটাও নাই।
‘কই থিকা আনছিস ? আমারে আইন্যা দিবি একটা ?’
বলে আমি হামিমের শার্টের হাতা ধরে টান মারি। হামিম হাত সরিয়ে নেয় না। মিচকে শয়তানের হাসি দিয়ে বলে―
‘দেখি আর পাই কি না ?’
‘পাই মানে কী ? আইন্যা দিবি।’
হামিম কথা ঘুরিয়ে বলে―
‘বৃত্তির জন্য কেমন পড়তেছিস ?’
আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। রেগেমেগে বলি―
‘তুই তো আমার গাইডবই নিয়া রাখছস। কী আর পড়মু ?’
হামিম যেন কানেই শুনতে পায় নাই। আস্তে করে বলে―
‘দেখি বেলিফুলের চারা পাই কি না ?’
আমি উত্তর দেওয়ার আগেই ও চলে যায়।
হপ্তাখানেক চলে গেলেও হামিম আসে না। আমিও অপেক্ষায় থেকে থেকে দেশ প্রাণি মাছ ফুল পাতা নাম খেলি। এবং নামের ঘরে হামিমের নাম না লিখে লিখি হাসান।
হাসান সরকারি ইশকুল না। না হোক। আমার গাইড বই নিয়ে শয়তানি তো করে নাই সে।
একদিন ইশকুল থেকে ফিরে দেখি আমাদের বাইরের ঘরের টেবিলের ওপর একগুচ্ছ বেলিফুল রাখা। ফুলের ডাঁটা আর পাতাগুলি লাল রঙের সুতায় বেঁধে দেওয়া।
আম্মাকে জিজ্ঞাসা করি―
‘আম্মা, ফুল কে দিল ?’
আম্মা অবাক হয়ে বলে―
‘কই ? কীসের ফুল ? আমি তো কিছুই জানি না।’
আমি মনে মনে ভয় পাই। এখন আমাকে জিজ্ঞাসা করলে আমি কী জবাব দিব ? আমিও তো জানি না। তবু আম্মা যদি আমাকেই সন্দেহ করে। আর এসে থাপ্পড় মেরে বলে―
তুই জানস না, তাইলে জানে কে ?
কেন যেন আমার মনে হয়, এই ফুল হামিম রেখে গেছে। সে হয়তো গাছের চারা ম্যানেজ করতে পারে নাই। হামিমের ওপর রাগ সরে গিয়ে আমার কেমন এক অচেনা অনুভূতি হয়। এই প্রথম কোনও ছেলে আমাদের বাড়িতে ফুলের গুচ্ছ রেখে গেল।
এর দিন পনের পর আবার একদিন বেলিফুলের গুচ্ছ টেবিলের ওপর দেখি। কিন্তু কে দিয়ে গেছে এ ব্যাপারে আম্মা কিছুই বলতে পারে না। এদিকে হামিম যে ডুব মেরেছে, মেরেছেই। ওর সঙ্গে আমার দেখা হয় না। আরে জাহান্নামে যাক হামিম, আমার ‘ছাত্রসখা’ দিয়ে যায় না কেন ও ? হারামজাদা একটা।
আম্মার লাগানো লাউগাছের মাচানের নিচে বসে আমি ঠাকুরমার ঝুলি পড়তে পড়তে দেখি হামিম ঢুকল আমাদের বাড়িতে। ওকে দেখে রাগে আমার শরীর চিড়বিড় করে।
‘হারামজাদা, আইছে এতদিন পর।’
হামিমের হাতে আমার ‘ছাত্রসখা’। ম্লান হাসি দিয়ে বলে―
‘দিতে দেরি হইল। কিচ্ছু মনে করিস না।’
কথার জবাব না দিয়ে আমি ওরে দেখি। হামিমের চেহারাটা খুব সুন্দর। মেটে-কমলা রঙের হাফহাতা পরিষ্কার শার্ট পরে আছে। শার্টের তলায় ইংলিশ প্যান্ট। দুই পা উদাম উরু অবধি। এদিকে আমি পরেছি পায়জামা আর ফ্রিল দেওয়া ফ্রক। আমি ওর দিকে তাকাই। আর হামিম তাকায় আম্মার পালানের মাটির দিকে। মাটির দিকে তাকিয়েই ও বলে―
‘আমি তোরে একটা কথা বলতে চাই।’
রাগে আমি ঝাঁঝাঁ করে উঠি―
‘কীসের কথা ? আমার বেলির চারা কই ?’
হামিম ধীরেসুস্থে বলে―
‘চারা পাই নাই। তুই আমারটাই নিস।’
‘না আমি তো কারওরটা নিব না। তুই আলাদা করে এনে দিবি। এজন্যই তোরে আমি একদম পছন্দ করি না।’
হামিমের কী হয় কে জানে ? মুখটা অন্ধকার করে উঠে যায়।
এদিকে ‘ছাত্রসখা’ দেখে আমার রাগ আগুন হয়ে ওঠে। ছিঁড়েভিড়ে কিরকম দুরবস্থা করেছে আমার বইয়ের! পুটের ওপর যেখানে আমার নাম লেখা ছিল, ওই জায়গার কাগজ কে যেন কেটে নিয়ে গেছে। রাগেদুঃখে আমার কান্না এসে যায়।
পরের বই নষ্ট করতে হয় না, এইটাও জানে না। অসভ্য একটা ছেলে। আমি আর ওর সঙ্গে কথাই বলব না।
বার্ষিক পরীক্ষা আর বৃত্তি পরীক্ষার পড়ার চাপে আমার রাগ কমে যেতে শুরু করে।
তবে হামিমের সঙ্গে আমি আর কথাই বলব না। ভারি একটা ফুলের চারা, এই নিয়ে কী একটা ভাব যে ধরেছে সে! হ্যাহ!
৩.
আমাদের পাশের বাড়িতে নতুন একটা ছেলে এসেছে। সে কে, কার কী হয় কিচ্ছু জানি না। শুধু জেনেছি, ওর নাম নাকি কাজল। কাজল আর আমি একই ক্লাস। কিন্তু সরকারি ইশকুলে ও চান্স পাবে কি না জানি না। ভর্তি পরীক্ষা দিলে বোঝা যাবে। কাজলের উচ্চতা আমার কাছাকাছি হবে। হামিম আবার খর্বাকৃতি। আমার চাইতেও মাথায় ছোট দেখায় ওকে। বয়সের তুলনায় বেঁটে বলে হামিমের ওপর আমার আরও রাগ ধরে। এত রাগ ধরে যে, ওকে আমি একদিন সামনাসামনি ‘বাইট্টা’ বলে ভোঁ দৌড় দিব। যাতে আমাকে ও পালটা কিছু বলতে না পারে।
বিকাল বেলায় রিতাদের বাড়িতে খেলতে যাওয়ার সময় আমি কাজলকে দেখি। পথের পাশে ছাতিম গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকে। আর আমার দিকে নিষ্পলকে তাকায়। ওর চোখের মণি খুব কালো। আর পল্লবগুলি দীর্ঘ। আমি অবাক হয়ে দেখি, ওর চোখের মণি একদম নড়ে না। সামনের দাঁতগুলি কি উঁচা ? এজন্যই হয়তো ও দাঁত বের করে হাসে না।
একদিন ও আমার গা ঘেঁষে হাঁটতে শুরু করলে আমার ভয় লাগে। আব্বা যদি দেখে এক ছোকরা আমার পাশে হেঁটে যাচ্ছে, তাহলে কী ঘটবে, আমি কল্পনাও করতে পারি না। কাজল ধীরে ধীরে হাঁটে আর জিজ্ঞেস করে―
‘আপনি কোন ক্লাসে পড়েন ?’
আমি পালটা প্রশ্ন করি―
‘তুমি কোন ক্লাসে পড় ?’
মনে মনে বলি, ঘুঘু তুমি জানো না, না ? কোন ক্লাসে আমি পড়ি ? তা তুমি জানো না ? চালাকি মারার আর জায়গা পাও না ?
কাজল মাথা নিচু করে বলে―
‘আমি তো এখনও ভর্তি হই নাই।’
আমি ওর কথা হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে জোরে হাঁটতে চাই। আর তখুনি কি না ভজঘট ঘটে। আমার স্পঞ্জের স্যান্ডেলের এক পাটির ফিতা খুলে যায় নাকি ছিঁড়ে যায়। কী মুছিবত রে বাবা! আব্বা যদি দেখে ছাতিম গাছের নিচে আমি এক অপরিচিত ছেলের সঙ্গে কথা বলতেছি, তাইলে পিঠের চামড়া উঠে রক্ত বেরোতে শুরু করবে। কাজল কী যেন দ্যাখে। তেমনই ধীর গলায় বলে―
‘আপনের কি স্যান্ডেলের ফিতা ছিঁড়া গেছে নাকি খুলে গেছে ?’
বলে সে নিচু হলে আমি স্যান্ডেল থেকে পা বের করে নিই। কাজল নিচু হয়ে কী জানি করে। কিছুক্ষণ বাদে আমার স্যান্ডেল ফিরিয়ে দিয়ে বলে―
‘বটকুলি খুইল্যা গেছিল। লাগায়া দিছি। আপনে এখন যাইতে পারবেন।’
কী বলে এই ছেলে ? আপনি, আজ্ঞে করছে! ফের কি না আমার স্যান্ডেল সারাই করে দিল! আমি স্যান্ডেলে দ্রুত পা গলাই। আরেহ্! আগের মতোই হয়ে গেল কীভাবে ? এই ছেলে দেখছি বেশ কাজের। একই ক্লাসের হলেও আমার চাইতে বুদ্ধিমান।
রিতাদের বাসায় গিয়ে দেখি রাতুল ভাই ব্যাডমিন্টনের ব্যাট নিয়ে কী যেন করছে। পাশে দুইটা কর্ক এলিয়ে রয়েছে বকফুলের মতো। আর উনার ফুলের বাগানে এন্তার গোলাপ গাছের কাটা ডাল পুতে দেওয়া। ডালের মাথায় গোবরের টুপি পরানো। আমি জানি, এই গোবরের টুপি ভেদ করে জাম রঙের ছোট ছোট পাতা উঁকি দিবে। অইগুলাই গোলাপ গাছের কুশিপাতা। ডাল কেটে নিয়েই গোলাপের চারা বানাতে হয়।
আমি আজ কী মনে করে রাতুল ভাইকে বলি―
‘কী করেন ?’
‘এই তো ব্যাট সারাই করি।’
‘ব্যাটের কী হইছে ?’
আমি বুঝতে না বুঝতেই রাতুল ভাই উঠে দাঁড়ায়। আর ব্যাটটা আমার মাথা গলিয়ে গলায় আটকে দেয়। উনার আর আমার মাঝে মাত্র এক হাত দূরত্ব। আজব! এসবের মানে কী ?
রাতুল ভাই হাসতে হাসতে বলে―
‘দেখলা কী হইছে ব্যাটের ?’
ব্যাটের ভিতরের নাইলনের সুতার জাল যে খুলে আছে আমার সেসব জানার কথা নয়। কিন্তু এটা কী ধরনের আচরণ। আমার গলায় ব্যাট আটকে দেওয়া ? এখন রাতুল ভাই যদি ব্যাটের হ্যান্ডেল ধরে টান দেয় আমি হুড়মুড়িয়ে উনার বুকের ওপর গিয়ে পড়ব। হুড়মুড়িয়ে না পড়েও আমি কিরকম অচেনা ঘ্রাণ পাই। এটা কি রাতুল ভাইয়ের শরীরের ঘ্রাণ নাকি সিগারেটের ঘ্রাণ ? বুঝতে না পেরে ভয়ে আমি চোখ বন্ধ করে বলি, ‘আমারে ছাড়েন। এভাবে ব্যাট দিয়া আটকাইছেন ক্যান ?’
ওরকম একটা ভুইট্টা লোক এরকম করতে পারে ? রাতুল ভাই ব্যাট ঘুরিয়ে আমার মুখ উনার মুখামুখি নিয়ে বলে―
‘এত রাগ দেখাইলে তো ছাড়া যাবে না।’
আমি ভয়ে ভয়ে বলি―
‘রাগ কই দেখাইলাম। আপনে আমারে এইভাবে ব্যাটের ভিতর আটকাইছেন ক্যান ?’
আমার কাঁদো কাঁদো মুখে দেখে রাতুল ভাই আমার গলা থেকে ব্যাটের ফাঁস উঠিয়ে নেয়। হো হো করে হেসে বলে―
‘এক্কেবারে শাবানা!’
আমি ছাড়া পেয়ে বাড়ির দিকে দৌড় দিই। আজব। এত বুড়া একটা লোক এরকম তামাশা কীভাবে করতে পারে ? আবার আমাকে বলে কি না ‘শাবানা!’
বাড়ির দিকে আসতে আসতে তীব্র সুগন্ধে আমি চমকে উঠি। দীর্ঘ শ্বাস টানলে বুঝতে পারি ছাতিমফুল ফুটতে শুরু করেছে। এই ছাতিমফুল বড় অদ্ভুত। এত তীব্র এর ঘ্রাণ! বহুদূর থেকেও বাতাসের টানে ভেসে নাকে এসে লাগে। আর গুচ্ছাকারে ফোটে বলে গাছের পাতা প্রায় দেখাই যায় না। ছাতিমের পাতাগুলিও ভারি সুন্দর। পুরু আর ঔজ্জ্বল্যে ভরপুর। যখন ফুল থাকে না তখন পাতাকেই ফুলের মতো দেখায়।
পরদিন রিতাদের বাড়িতে খেলতে যাওয়ার সময় ফের কাজলকে দেখি। ও আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে। আমি পাশ কাটিয়ে যেতে শুরু করলে কাজল এগিয়ে আসে। আর আমার ডান হাতে কী যেন গুঁজে দেয়। আমি ভয়ে আধমরা হয়ে যাই। আল্লারে, এত সাহস এই ছ্যামড়ার ? আব্বা দেখলে ওরে-সহ আমাকেও গরু-পিটানি দিয়ে দিবে। রিতাদের বাড়ির দিকে আমি আর এগোতে পারি না। ফিরে আসি। আম্মার পালানে বসে ডান হাতের মুঠো ভয়ে ভয়ে খুলি। আর খুলেই চমকে যাই।
ছাতিম গাছের পুরু পাতা কেটে লেখা―বীথিকা!
কাজল গাছের পাতা কেটে আমার নাম লিখেছে। কিন্তু এরকম সুন্দর করে কীভাবে লিখতে পারল ও ? দীর্ঘ ‘ই’ কার বা কীভাবে দিল ?
আমি ভয়ে-ভাবনায় ইতিউতি তাকাই। আর দেখি হামিম ঢুকছে আমাদের গেইট দিয়ে। ওর হাতে কীসের যেন পোটলা।
আমাকে পালানে দেখে হেসে বলে―
‘ও তুই এইখানে ? আইজ যাস নাই খেলতে ?’
আমি চুপ করে থাকি। হামিম আমার পাশে দাঁড়িয়ে বলে―
‘এই নে বেলির চারা। বহু কষ্টে জোগাড় করছি।’
আমি হাত বাড়াব কী করে ? আমার হাতে লুকিয়ে রাখা ছাতিম পাতার বীথিকা।
হামিম বেলির চারার পলিথিন একপাশে রেখে বলে―
‘ভুতের মতো খাড়ায়া আছস ক্যান ? আয় বসি।’
দুইটা ইট পাশাপাশি ফেলে ও একটাতে বসে। অগত্যা আমাকেও ওর পাশে বসতে হয়।
হামিমকে আজ দারুণ সুন্দর দেখাচ্ছে। ইস্ত্রির ভাঁজ সদ্য ভেঙ্গে পরা ক্রিম কালারের শার্ট। আগের মতোই দুই পা উদাম করে ইংলিশ-প্যান্ট পরা। আমি বসতেই ও পকেট হাতড়ে কী যেন বের করে আমাকে দিতে চায়। কিন্তু আমি নেব কী করে ? ফলে আমি বাম হাত বাড়াই। দেখি ‘ছাত্রসখার’ পুটে আমার অপরিপক্ক হস্তাক্ষরে লেখা সেই ‘বীথিকা’। রাগে আমার মাথা ঝাঁঝাঁ করে। কতবড় শয়তান এই ছেলে! আমার হস্তাক্ষরে আমার নাম আমারই বই থেকে কেটে নিয়েছে। এখন ওটা কি না ফের আমাকেই দিচ্ছে ?
না, হামিম আমাকে আমার নাম ফেরত দেয় না। আলগোছে ফের পকেটে পুরে ফেলে। তড়াক করে উঠে বলে―
‘ওই বেলির চারাটা লাগিয়ে দিস।’
ব্লেড দিয়ে ছাতিম পাতা কেটে লেখা কাজলের ‘বীথিকা’ আমি ছাত্রসখার পৃষ্ঠা খুলে রেখে দিই।
আর খালি হয়ে যাওয়া ডানো দুধের টিনে বেলির চারাটা মাটি-গোবর সারে রোপণ করি।
আমাদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলে বৃত্তি পরীক্ষাও শেষ হয়ে যায়। শীতের টানা ছুটি কাটানোর পর একদিন দলছুট হাঁসার মতো ঘ্যাসঘ্যাসে গলায় লাল বাসের ডাক শোনা যায়। ইশকুল ইউনিফরম পরতে গিয়ে আমি পড়ি বিপাকে। বুকের কাছটায় এত আঁটসাঁট হয়ে বসেছে যে, আমার লজ্জা লাগে। আমি তাকিয়ে দেখি জামরুলের মতো স্ফীত হয়ে ওঠা স্তনকুঁড়ি সাদা ফ্রকের ওপর নির্লজ্জভাবে ফুটে আছে। এদিকে বাস ঘন ঘন ভোঁ বাজায়। যেন সে এক্ষুনি ঘাট ছেড়ে চলে যাবে কোনও অজানার উদ্দেশে।
আম্মা কোথা থেকে যেন উড়ে এসে নাইলনের একটা ওড়না আমার দিকে ছুড়ে দেয়। রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বলে―
এখন থিক্যা ওড়না পইরা বাইরে যাইতে হইব।
বাসের ভেঁপু ফের বেজে উঠলে আম্মার কথা পেছনে ফেলে আমি দৌড়াই ।
ইশকুল ছুটির পর বাড়ি ফিরে দেখি হামিমের দেওয়া বেলির চারায় একজোড়া সাদা ফুল ফুটে আছে। আমার এত আনন্দ হয় যে, রিতাকে এই খবরটা দিতেই হবে। ফের ছাতিম তলা দিয়ে যাওয়া। কাজল অন্যদিনের মতো করেই আমার দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। নাটকীয় কায়দায় দুই পা এগিয়ে এসে আমার ডান হাতের মুঠোয় কী যেন গুঁজে দেয়। আমি ভয়ে কাঠ হয়ে চারপাশে তাকাই। আব্বা দেখলে কী ঘটতে পারে ভেবেই আমার জ্বর জ্বর অনুভূত হয়। ফের আমি উল্টাপথে হাঁটা দিই। বাড়ি ফিরি। সন্ধ্যার কালসিটে আলোতে ডান হাত মেলে ধরি―
ছাতিম পাতায় অদ্ভুত সুন্দর করে লেখা―বীথিকা!
সহসা আমার দুই চোখ অশ্রুতে ভরে ওঠে। সরকারি ইশকুলের ছাত্র হামিমের পরিপাটি পোশাক আর সুন্দর চেহারার কথা মনে করে আমার ফুঁপিয়ে কান্না আসে। দেশ প্রাণি মাছ ফুল পাতা নাম খেলার সময় আমি কি আর ‘হ’ তে হামিম লিখব ? লিখতে পারব ? কে জানে ? মিতা আপা গত হপ্তা থেকে একটা নতুন গান গাইছেন। হারমোনিয়াম আর তবলায় সঙ্গত করে।
এই বালুকাবেলায় আমি লিখেছিনু / একটি সে নাম আমি লিখেছিনু/ আজ সাগরের ঢেউ দিয়ে তারে যেন মুছিয়া দিলাম…
এই গানের সুর এত যে করুণ! মিতা আপা যখন এই গান গায় রাতুল ভাইকে দেখি ফস করে ম্যাচ জ্বালিয়ে সিগারেট ধরায়। আচ্ছা রাতুল ভাইয়ের সিগারেটের নাম কী ?
ক্যাপস্ট্যান নাকি স্টার ? নাকি ৫৫৫ ? দেখতে হবে একদিন। রাতুল ভাইয়ের সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে ইদানীং কেমন যেন লাগে আমার। পা যেন চলতে চায় না কিছুতেই। যদি সে ব্যাটের ফাঁসি আমার গলায় পরিয়ে বলে―
‘এত রাগ দেখাইলে তো ছাড়া যাবে না।’
এদিকে হামিমের বেলিফুলের চারাটা বেশ বড় হয়ে উঠেছে। আর তাতে ঝেঁপে ফুল ধরেছে। আমি কি গাছটা হামিমকে ফেরত দিয়ে দিব ? ফেরত দিয়ে বলব―
‘আমারই হাতে লেখা আমার নাম পকেটে নিয়া ঘুরস ক্যান ? আমার নামটাও কি নিজে লিখতে শিখিস নাই তুই ?’
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



