আর্কাইভগল্প

গল্প : মায়াশালিক : মাসউদ আহমাদ

বৃষ্টি থামার পর, সন্ধ্যাটা ঘন হয়ে এল। পশ্চিমের আকাশ ঢেকে গেল ধূসর-কালো মেঘে। বাড়িতে ঢুকতেই রাহাত চৌধুরী শুনতে পেল, কেউ একজন খুব হাসছে। মৃদু নয়, তীব্র ধরনের হাসি।

বসার ঘরটা কালো বিড়ালের মতো অন্ধকারে ঢাকা। দরজা ঠেলে লাইট জ্বালাতেই সে খানিকটা চমকে ওঠে। অসময়ে বাতি নিভিয়ে অন্ধকারে মা শুয়ে আছেন, একা।

বাতি জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তিনি হাতের উল্টাপিঠে চোখ ঢাকলেন। বুঝতে অসুবিধে হয় না, হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে তাঁর বেশ অস্বস্তি হলো।

রাহাত কাছে গিয়ে মায়ের কপালে হাত রাখে। উদ্বেগ নিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কী হলো মা, শরীর খারাপ ?’

‘না, বাবা। কিছু হয়নি। এমনি শুয়ে আছি।’ বলেই তিনি বিছানায় উঠে বসতে বসতে একটা দীর্ঘশ্বাস আড়াল করলেন।

মা অসুস্থ। বছর কয়েক আগে স্ট্রোক করেছিলেন। প্রথম দিকে নিজে থেকে কিছু করতে পারতেন না। এমনকি কথাও খুব জড়িয়ে যেত। তাঁর ভাষা কেউ বুঝতে পারত না। শুধু ছোটবোনটা এসে দাঁড়ালেই মা একটু স্বাভাবিক কথা বলতেন। সেটাও কেউ ধরতে পারত না। তিনি হিব্রু ভাষায় কথা বলছেন, ছোট অনুবাদ করে দিচ্ছে। ব্যাপারটা এমন ছিল। আরও পরে, ধীরে ধীরে তাঁর ডানপাশটা প্রায় অকেজো হয়ে গেল। কথা ও ভাবনা পরিষ্কার হলো, কিন্তু ডান হাত ও পা অসাড়। মতের বিরুদ্ধে গেলে, তাঁর মনের মতো কিছু না হলে তিনি চুপ হয়ে যান। সারা মুখে অসহায় বিষণ্নতা ফুটিয়ে আড়ালে গিয়ে বসে থাকেন। 

রাহাত বলল, ‘বাড়ির ভেতরে কে এমন হাসছে, মা ?’

‘নিতু।’

‘নিতু ?’

রাহাতের পিঠেপিঠি বোন নিতু। শ্বশুরবাড়ি থেকে সে কখন এসেছে, রাহাত জানে না। সে বিকেলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। মাকে জিজ্ঞেস করতে গিয়েও কৌতূহল চেপে যায়। সে ভাবতে থাকে, এমন হাসির কী কারণ থাকতে পারে ?

রাহাত মায়ের পাশে আরও কিছুক্ষণ বসে থাকে। প্রথমে সে ঠিক ধরতে পারে না। হাসির ব্যাপারটা ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে। 

বাড়ির ভেতরে হঠাৎ ছোট বলল, ‘লে অত হাসিস ন্যা। দাঁত খুল্যা পড়্যা যাবে। পাটি বিছিয়্যা খ্যাতে বস।’

নিতু তবু হাসছিল।

কিছুক্ষণ পর, হাত-মুখ ধুয়ে রাহাত বারান্দায় দাঁড়িয়ে গামছায় মুখটা মুছে নিচ্ছে। ছোটকে বলল, ‘মাকে ডাক। একসঙ্গে খেয়ে নিই।’ এমন সময় নিতু আচমকা ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল।

‘এই, তোর কী হলো রে ?’

ছোটর কথায় নিতুর কান্না আরও বেড়ে গেল।

মা ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন, কিন্তু বারান্দায় বিছানো পাটিতে বসলেন না। একটা টুলে বসে দেয়ালে হেলান দিয়ে হাই তোলার মতো করে আর একবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। বললেন, ‘আবিদ দুবাই গেছে। কী যে করছে নাতিটা!’

ঈশিতা বেগমের চার ছেলেমেয়ের মধ্যে সবার বড় শাহেদ চৌধুরী। বড় সন্তানের জন্য মায়ের স্নেহ ও মায়াও বেশি। সে সরকারি হাইস্কুলে চাকরি করে। জেলা শহরের উপকণ্ঠে জমি কিনে বাড়ি বানিয়েছে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সেখানেই থাকে। আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপরের চূড়ান্ত বলতে যা বোঝায়, সে তাই। বউ ও সন্তান ছাড়া পৃথিবীর কাউকে চেনে না। বাবা-মাকেও নয়। যোগাযোগ প্রায় রাখে না। তার বউ আরও হিংসুটে। ছোটবেলা থেকেই রাহাত দেখে আসছে। প্রতিবেশীরাও ব্যাপারটা জানে। কেউ অবাক হয়, আড়ালে হাসে।

শাহেদের পুত্র আবিদ অনার্স নিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছে। পড়াশোনায় মন নেই, ঠিকমতো খায় না, ঘুমায় না, রাত করে বাড়ি ফেরে। নেশা করে। এসব নিয়ে পরিবারে খুব অশান্তি। পুলিশে যদি ছেলেটাকে ধরে নিয়ে যায়, বাবার চাকরিতেও টান পড়বে।

এর মধ্যেই ছেলেকে দুবাইয়ে একটা হোটেলে চাকরির ব্যবস্থা করেছে শাহেদ চৌধুরী। সবই গোপনে ঘটেছে, তাই কেউ জানে না। মা খুশি। নাতি চাকরি করতে বিদেশে গেছে। বোন খুশি। খোঁজখবর না করুক, বিদেশের হোটেলে ভাইপো ম্যানেজার। এসব নিয়ে খুব হাসাহাসি করছিল নিতু।

হঠাৎ ছোট বলল, ‘যে ছেলে ভাত খেয়ে নিজের থালা ধোয় না, জামাটা গায়ে থেকে খুলে ফেলে রাখে, সকাল দশটার আগে ঘুম ভাঙ্গে না, সে কীভাবে চাকরি করবে ?’

নিতুর হাসি থেমে গেল।

ছোট বলল, ‘কাজের কোনও অভিজ্ঞতা নাই, বয়সও কম। কে তাকে ম্যানেজারের চাকরি দেবে ? দুবাইয়ে সে হোটেল বয় হিসেবে কাজ করছে। টেবিলে খাবার সার্ভ করে।’

মা বললেন, ‘কীভাবে জানতে পারলি ?’

মুখে অদ্ভুত ভঙ্গি করে ছোট বলল, ‘এসব কথা কি গোপন থাকে ?’

পুরা ঘটনা শুনে নিতু হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছে।

মা পাটিতে খেতে বসে বললেন, ‘আবিদ শুধু কাঁদে। কাজ করতে কষ্ট হয়। ওর মন টেকে না। দেশে চলে আসবে।’

‘তোমাকে কে বলল ?’

মা সে কথার জবাব দিলেন না। হাত ধুয়ে থালাটা বাড়িয়ে দিলেন। ছোট সেই থালায় ভাত ও ইলিশ মাছের তরকারি তুলে দিতে লাগল।

নিতু আঁচলে চোখ মুছে নেয়। পাশে বসা পুত্রকে ভাত-মাংস তুলে দেয়। মাংস ছাড়া সে ভাত খায় না।

আড়চোখে একবার সবার মুখে তাকিয়ে রাহাত অল্প হাসল। সে মনে মনে হিসাবটা কষে নেয়, ভিসা থেকে শুরু করে ওয়ার্ক পারমিট, দালালের খরচ ও অন্যান্য; সবটা মিলে পাঁচ থেকে ছ লাখ টাকার ধাক্কা। পুরোটাই জলে গেল।

মায়ের বড় ছেলেটা, শাহেদ, বাইশ বছর ধরে চাকরি করছে, সারা জীবনেও কি সে বাবা-মায়ের জন্য পাঁচ লাখ খরচ করেছে ? পাঁচ হাজারও নয়। অথচ একমাত্র ধানের জমি বিক্রি করে তাকে চাকরি নিয়ে দেওয়া হয়েছিল। 

নাতি কেন দুবাই গেছে বা ফিরে আসছে, মায়ের মনটা ঠিক সে কারণে বিষণ্ন নয়।

ঈদের ছুটিতে মহল্লার সবাই বাড়িতে এসেছে। যারা দূর শহরে থাকে, তারাও। বড়ছেলেটা আসেনি। ছেলের শ্বশুরবাড়ি পাশের মহল্লায়। রিকশায় দশ পনের টাকা ভাড়া। হেঁটেই যাওয়া যায়। ছেলেটা শ্বশুরবাড়িতে আসে, দু-তিন দিন থাকে। অথচ মাকে দেখতে আসে না। ওদিক দিয়েই ফিরে যায়।

বছরখানেক হলো, শ্বশুর-শাশুড়ি মারা গেছেন। মা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন, সে এখন শ্বশুরবাড়িতেও আসে না।

এসব দুঃখ-বিরহে মায়ের মন ভালো নেই। আহার ও আলাপে শান্তি নাই। বাড়িভর্তি মানুষ, তবু একা বোধ করেন। কেউ গল্প করতে এলেও ভালো করে কথা বলেন না।

কোনও কোনও দিন ছোটকে ডেকে মা বলেন, ‘শাহেদকে একটু ফোন কর তো।’

ছোট মাকে ধমক দিয়ে বলে, ‘তোর নিজেরই তো ফোন আছে, তুই ফোন কর।’

মা বিরসমুখে বলেন, ‘আমি ফোন করলে সে ধরে না।’

বড় সন্তানের প্রতি মায়ের আলাদা টান থাকতেই পারে, তাই বলে এমন ? এটা দূষণীয়, না অসুস্থতা ? গবেষণা না করে বের করা অসম্ভব।

কথাটা ভাবতে ভাবতে রাহাত একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। 

খেতে বসে, খাওয়া থামিয়ে সে বলল, ‘ছোট, বড়ভাই তো ঈদে এল না। আগামীকাল মাকে নিয়ে ওঁর বাড়ি থেকে একটু বেড়িয়ে আয় তো। বড়ছেলেকে না দেখলে মায়ের মন শান্ত হবে না।’

‘আমি পারব না।’

একদম মুখের ওপর কথাটা বলে দিল ছোট। বলল, ‘এই নিতু, তোর তো কাজ নাই। মাকে নিয়ে বড়ভাইয়ের বাড়ি বেড়াতে যা। সারাদিন থাকবি। ভালো-মন্দ খাবি, আরাম করবি। সন্ধ্যায় চলে আসবি। তুই সকালেই মাকে লিয়ে যা।’

নিতু কিছু বলল না। ভাত খেতে খেতে ঠোঁটে কেমন লজ্জিত একটা ভঙ্গি করে অন্যদিকে তাকাল।

মা পুরো ব্যাপারটা নিঃশব্দে খেয়াল করলেন।

একটু পরে হঠাৎ প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে নিতু বলল, ‘তুই একটা বিয়ে শাদি করবি না ভাই ? বয়স পার হয়ে যাচ্ছে।’

রাহাত চোখ সরু করে তাকায়।

মা খাওয়া বন্ধ করে কান খাড়া করলেন, রাহাতের কথা শোনার জন্য। বিয়ের কথা বলতে বলতে তিনি ক্লান্ত। এখন আর খুব একটা বলেন না।

রাহাত বলল, ‘বিয়ে ? ধরা যাক, করলাম। বউটা পেলাম তোদের বড়ভাইয়ের বউয়ের মতো। লোভী ও স্বার্থপর। তাহলে ?’

নিতু মিনমিন করে বলল, ‘সব মেয়ে কি আর ভাবির মতো হয় ?’

ছোট ঠাট্টা করে বলল, ‘এতদিন তুমি শহরে থাকো, একটা প্রেমট্রেম করতে পারোনি ? এমন কোনও মেয়ে পাওনি, যে তোমাকে বুঝবে ?’

প্রেম ? খাওয়া শেষে হাত ধুতে ধুতে রাহাত গভীর করে শ্বাস নেয়। ভাবে, প্রেম তো একটা ছিলই। পাঁচ বছরের তো কম নয়। মেয়েটার নাম রানু। একসঙ্গে জীবন কাটানোর ইচ্ছে ছিল। আর স্বপ্ন। কিন্তু হলো না। যোগাযোগটা কমে আসছিল। একদিন মুখোমুখি জানতে চেয়েছিল, ‘কী হলো রানু ? তুমি হঠাৎ নীরব হয়ে গেলে ?’

রানু বলেছিল, ‘এখন আর এসব ভালো লাগে না।’

রাহাত দেখল, রানুর চোখ মুখ কেমন বদলে যেতে লাগল। আসলে তার চোখে অন্য পুরুষের ছায়া। রাহাত সব বুঝে গেল। সে নীরবে সরে এসেছে।

মা খাওয়া শেষ করে উঠে পড়লেন।

রাহাতও হাত ধুয়ে বসার ঘরে এসে টিভি ছাড়ল।

ছোট বোনটা পায়েস এনে বলল, ‘নাও।’

পায়েস রাহাতের খুব পছন্দের জিনিস। হাত বাড়িয়ে সে বাটিটা নিয়ে খেতে শুরু করল।

আঁচলে মুখ মুছে ছোট মায়ের পাশে বিছানায় বসল। যেন সে বড়বোন, এমন সুর ঝুলিয়ে বলল, ‘ছোটভাই, দেখ, প্রত্যেকেরই একটা সংসার লাগে। সেটা ভালো হোক বা মন্দ। জগতের কোনও মানুষই সব দিক থেকে সুখী হয় না। যখন তোমার আরও বয়স হবে, একা সব কাজ করতে পারবে না, অসুখের সময় কেউ পাশে নেই, বিছানায় পড়ে থাকবে, জীবনটা একঘেয়ে ও অসহায় লাগবে। বোঝা মনে হবে। এসব ভেবে হলেও বিয়েটা কর।’ 

পায়েস শেষ করে রাহাত বাটিটা টেবিলে রাখল। গম্ভীর মুখে বলল, ‘হুম। দেখি।’

মা একটু জোর দিয়ে বললেন, ‘দেখি আবার কী ?’

রাহাত সে কথার উত্তর দিল না। মনে মনে বলল, ‘সংসার ? সংসারেই তো আছি। অন্য সংসারে ঢুকে গেলে বুড়ো বাপ-মা, বোনদের কে দেখবে ? সুখেদুঃখে হঠাৎ কে ছুটে আসবে ?’

মনে মনে বলা কথাগুলো পরিষ্কার হয় না। কেউ বুঝতেও পারে না।

হঠাৎ দরজায় ঠকঠক শব্দ হয়।

মা বললেন, ‘তোর বাবা মনে হয় এল।’

দরজা খুলতেই বাবা হাসিমুখে ঘরে ঢুকলেন। বললেন, ‘কী খবর বাবারা, মায়েরা আমার ?’

নিতু বলল, ‘ভালো। গল্প করছি।’

‘এই নাও তোমার ওষুধ’; বলেই বাবা মাকে একটা ছোট প্যাকেট ধরিয়ে দিলেন।

বাবা ভেতরে চলে যেতেই ছোট হঠাৎ বসা থেকে উঠে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল। গলাটা চড়িয়ে বলল, ‘আচ্ছা মা, তোর মনের ভেতর কী আছে, বল তো ? সবার সংসার আছে। কাজ আছে। সবাই ব্যস্ত। তবু কোনও কিছু হলেই আমরা ছুটে আসি। সারাক্ষণ পাশে আছি। গল্প করি, রান্নাবান্না ও কাজে ডুবে থাকি। তোর মনে ভরে না। বড়ছেলের জন্য মুখটা পানসে করে বসে থাকিস। কেন ? সে তো আসে না। পরিবার থেকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা নিয়ে এখন কাউকে চেনে না। সে তোর এত আপন, তার বাড়িতে গিয়ে থাকিস না কেন ?’

মা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। কোনও কথা বলেন না। ছোটর গলা আরও চড়ে যায়। বলে, ‘আমরা কি তোর বানে ভেসে আসা ছেলেমেয়ে আর বড়টা তোর পেটের ছেলে ?’

‘নিতু, কী হলো মা ?’

বাবা বাড়ির ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করলেন। নিতু বলল, ‘কিছু হয়নি আব্বা।’

ছোট আবার বলল, ‘সে-ই বা কেমন পুরুষ, বাপ-মায়ের খোঁজ নেয় না ? অথচ শালিকে বাড়িতে রেখে কলেজে পড়ায় ? শ্বশুর-শাশুড়িকে শহরের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় ?’

নিতু এবং মা কেউ টুঁ শব্দটি করলেন না।

মা মুখে একটু হাসির ভাব করে বললেন, ‘এমনিতে ভালোবাসা আছে। সে আমাকে শ্রদ্ধা করে। এসব নিয়ে সমস্যা নাই।’

নিতু অবিশ্বাসের গলায় বলল, ‘কীভাবে বুঝলে, সে তোমাকে ভালোবাসে ?’

‘বোঝা যায়।’

‘একটু খুলে বলো না―’

মা বললেন, ‘মাসে মাসে ছেলেটা আসতে পারে না। বছরেও একবার আসে, তা নয়। কিন্তু ওর বাড়ি বেড়াতে গেলে খুব খুশি হয়। পাশে এসে বসে। গল্প করে।’

‘এতেই তুমি খুশি ?’

মা কি একটু সতর্ক হয়ে গেলেন ? একবার তিনি বড় করে দম নিলেন। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। কয়েক মুহূর্ত কোনও কথা বললেন না।

নিতু বলল, ‘চুপ হয়ে গেলে যে, মা ?’

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মা বললেন, ‘আমি মারা গেলে, খবর পেয়ে সে ছুটে আসবে। আমি হয়তো দেখতে পাব না। সে আসবে। আমার কবরে কিছু মাটি ছিটিয়ে দেবে। কষ্ট হচ্ছে খুব, বুকটা ভেঙে যাচ্ছে, মুখে এমন ভাব করে কবরের পাশে অন্য মানুষদের সঙ্গে সে দাঁড়িয়ে থাকবে। মরার খবর পেয়ে যদি আসতে না পারে, কোনও কাজে ঢাকায় বা ভারতে যায়, মাঝে মাঝে তো যায় চিকিৎসা করাতে। আমার মৃত্যুর পর যখন চল্লিশ দিন পূর্ণ হবে, চল্লিশায় সে ঠিক আসবে। বড় করে অনুষ্ঠান করবে। সেই অনুষ্ঠানে অনেক মানুষ খেতে আসবে।’ 

নিতু বলল, ‘এসব কী ভাবো তুমি, মা ?’

ছোট রাগে ফঁসতে লাগল। বলল, ‘আল্লাহ তোকে কী দিয়ে বানিয়েছে ? তোর মনে কি এতটুকু রাগ-ঘৃণা কিছু নাই ? তুই মরার পর যদি তোর বড় ছেলে এ বাড়িতে আসে, ভ্যাক ভ্যাক করে কাঁদে, হাতের কাছে যা পাব তাই দিয়ে পিটিয়ে বের করে দেব।’

ভাইবোনের মধ্যে ছোটই একমাত্র মাকে তুই করে বলে। রাগ বা অবহেলা থেকে নয়, মাকে সে সবচেয়ে ভালোও বাসে। কেননা ছোটবেলা থেকে সে-ই মায়ের পাশে বেশি ছিল। মায়ের সেবা-যত্ন সে-ই বেশি করেছে।

বসার ঘরে ফিরে এসে বাবা নিরীহ গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে ?’

ছোট ধুপধাপ পা ফেলে অন্য ঘরে চলে গেল।

নিতু বলল, ‘মা, তুমি যেসব কথা বলেছ, একদম ঠিক নয়। এসব খুব খারাপ কথা।’

জুন মাসে অফিসে বেজায় কাজের চাপ। এমন একটা দিনে মায়ের ফোন পেয়ে রাহাতকে জরুরিভিত্তিতে বাড়ি আসতে হলো।

বিকেলের দিকে মা ফোন করে বললেন, ‘তোর বাবা মরে গেছে…’

একটা কর্পোরেট অফিসে কাজ করে রাহাত। ঠান্ডা ঘরে মুঠোফোনের ইথারে ভেসে আসা মায়ের কণ্ঠ শুনে কম্পিউটারের কি-বোর্ডে হাতের আঙুল যেন বৈদ্যুতিক শক খায়। সে থতমত গলায় বলল, ‘কী বলছ, মা ?’

‘তোর বাবা খুব অসুস্থ। কাল রাতে প্রায় মারা গেছিল। মাঝরাতে মাথায় জল ঢেলে, ডাক্তার ডেকে স্যালাইন দেওয়া হয়েছে।’

রাহাতের দম বন্ধ হয়ে আসে, ‘এখন কেমন ?’

‘শুয়ে আছে। সারাদিন কিছু খায়নি।’

বাবার প্রেসারটা ফল করেছিল। বয়সও হয়েছে। ব্যথা ও জ্বরের ট্যাবলেট খেয়ে অসুখ গোপন করে গেছেন। কী অসুখ ? কাউকে জানাননি।

শহরের ভালো ডাক্তারের কাছে নেওয়ার জন্য জোরাজুরি করল রাহাত। বাবা বললেন, ‘শরীরটা বেশ ভালো লাগছে। এখন থাক।’

দুদিন পর শরীর আবার খারাপ করল। অফিসে যোগ দিতে দেরি হচ্ছে। আরও কটা দিন বাড়িতে থেকে যেতে হলো।

সংসারের কোথাও একটা ভাঙনের নিঃশব্দ ঢেউ আছড়ে পড়ছে। রাহাত দূরে থেকেও টের পায়।

বাড়িতে এখন বাবা-মা ছাড়া আর কেউ থাকে না। সময়ে অসময়ে ফোন করে ডাকলেই কেউ ছুটে আসে না। সবাই নিজের কাজ ও সংসার নিয়ে ব্যস্ত।

বাবা কিছুটা সন্ন্যাসী আর মা আরও একা ও নীরব হয়ে গেছেন।  

মা একসময় স্বামী ও ছেলেমেয়েদের মুখে, বিশেষ করে বড় ছেলে যেহেতু সকালবেলায় অফিসে বেরিয়ে যেত, সাতসকালে উঠেই রান্নার কাজে লেগে যেতেন। প্রথমে ছেলেকে খাইয়ে বিদেয় দিয়ে অন্যদের খাওয়াতেন। নিজে খেতেন।

সেই মানুষটি আজ একা ও অবহেলায় দিনযাপন করেন। কেউ খেতে ডাকবে, কাছে ডেকে গল্প করবে; অপেক্ষা করেন। কিন্তু ভাগ্য এমনই শকুন, ওঁর নুন জোটে না। সময়মতো খাবারটা পান না। বাবা ভাত রাঁধেন আর হিজিবিজি তরকারি। মা খেতে পারেন না।

বেলাশেষে, মায়ের চুলটা বেঁধে দেন বাবা। তিনি পুরুষ মানুষ, শরীর ভালো থাকলে কোথায় বেরিয়ে যান, ফেরেন রাতে। সন্ধ্যার মুখে মাথায় তেল দিয়ে মায়ের চুলটা বেঁধে দেবে, সেই মানুষটাও থাকে না।

মাঝে মাঝে অদ্ভুত কিছু কথা মনে আসে রাহাতের। মনে হয়, সংসারে মায়া বা টান নয়, সফলতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে টাকার সফলতা। বরিশালে জীবনানন্দ দাশ নামে একজন কবি ছিলেন, বেঁচে থাকতে সাফল্য পাননি, মৃত্যুর পর তাঁর খুব নাম হয়েছে। তিনি ‘সুতীর্থ’ নামে একটি উপন্যাসে এ নিয়ে চমৎকার কথা বলেছেন। তিনি লিখেছেন: ‘টাকা মানুষকে কথা বলায়, প্রেম নয়, প্রণয় নয়, লালসাও নয়।’

আজকাল বাবা-মা ও ভাইবোনের সম্পর্কে কেমন আলগা ও অচেনা হাওয়া এসে লাগে। কেন এমন হয় সে জানে না, কিন্তু ঠিক টের পায়। যেদিন থেকে টাকা, জামাকাপড় ও জিনিসপত্র আনা বন্ধ করেছে, সম্পর্কটাও কেমন আলগা আর খাপছাড়া হয়েছে।

হঠাৎ করে বাড়ি চলে আসত রাহাত। ব্যাগভরা জিনিসপত্র। মায়ের জন্য শাড়ি ও বড় ওড়না। বোনদের জন্য বাটিকের থ্রি পিস, ভাগ্নেদের জন্য জামা, খেলনা ও চকলেট। বাবার জন্য শার্ট, কখনও লুঙ্গি এবং মধু। ভালো মিষ্টান্ন। আরও কত কী। ফেরার সময় সবার হাতে কিছু টাকা দিত।

আবার কখনও বাড়িতে আসার দিনকয়েক আগেই রাহাত জানিয়ে দিত, সে আসছে। বাবা বলতেন, ‘সাবধানে আসিস। কারও জন্য কিছু আনার দরকার নেই।’ সেবার আর কিছু আনা হতো না। রাহাত টের পেত, সবার মুখ ভার। এমনকি মা-বাবারও। সবাই আশায় থাকে, সে আসবে, কিছু না কিছু নিয়ে আসবে। 

প্রথমে সে ব্যাপারটা ধরতে পারেনি। এত কাছে থাকে, তবু বাবা ও মা অসুস্থ জেনেও বোন-জামাই শ্বশুরবাড়ি আসা কমিয়ে দিল।

একদিন তো ছোটবোন ও তার জামাই ফোন করে বলল, ‘অনেক জিনিসপত্র নিয়েছি বাপু, আর কিছু নিব না। পরের জিনিসের প্রতি অত লোভ নাই।’

পরের জিনিস ? লোভ ? এসব কথার মানে কী ?

এক লাখ কুড়ি হাজার টাকায় ষোল কাঠা জমি নিয়ে দিয়েছে বোন-জামাইকে। বর্গা। বছরে দশ মণ করে দুবার ধান হয়, একবার শর্ষে। ওদের তো খুশি থাকার কথা। না, আরও চায়। না পেয়ে ঠেস মারা কথা শুনিয়ে দিল ?

খানিকটা থতমত খেয়েছিল রাহাত। সে রাগ করেনি। প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। একটু বোকা বনে গিয়েছিল।

আরও পরে নিজের মনকেই সে আশ্বস্ত করেছিল, সংসারে হয়তো এমন হয়। 

এক দুপুরে, বাইরের দরজায় কেউ কড়া নাড়ছে। বাবা দরজা খুলতেই একটা মেয়ে হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকল।

বাড়ির ভেতরে কাজ করছিল ছোট। বাবা বললেন, ‘তুমি কে মা ?’

‘আমি রাহাতের বউ।’

মা খুব খুশি। কিন্তু বাড়ির সবার চোখ কপালে উঠে গেল। কী বলছে অচেনা মেয়েটা ? রাহাত কবে বিয়ে করল ?

নিতু আন্তরিক ভঙ্গিতে মেয়েটার হাত ধরল। ‘এসো। কী নাম তোমার ?’

‘রানু।’

ছোট প্রায় দৌড়ে এল। বলল, ‘তোমার কথা তো ছোটভাই একদিন বলেছিল।’

রানু বলল, ‘বাবা, কিছু মনে করবেন না। একটু মিথ্যে বলেছি। আমি রাহাতের বউ নই। তবে বউ হতে চাই।’

রানুর কথা শুনে বাবা মৃদু হাসলেন।

মা এসে রানুর পাশে বসলেন। নাম কী, বাড়ি কোথায়, কী কর ইত্যাদি জিজ্ঞেস করলেন।

এমন নাটকীয় মুহূর্তের জন্য রাহাত প্রস্তুত ছিল না। বাইরে থেকে ঘর্মাক্ত মুখে ফিরে সে ক্লান্ত বোধ করছিল। ছোট ঠান্ডা জলের লেবুর শরবত এগিয়ে দিল। তার মধ্যেও একবার সে ভাবল, ‘আহা, মায়ের প্রিয় ছেলে শাহেদটা যদি এভাবে মায়ের কাছে ফিরে আসত!’

সময়, সংসার ও মনের আকাশ একটু একটু করে সবুজ কচি পাতায় ভরে উঠছে।

এক গভীর রাতে রাহাতের মুঠোফোনে খবর এল, ‘মা মারা গেছে।’

কল্পনার সমস্ত রঙ ধূসর হয়ে গেল। সবকিছু ভেঙ্গে পড়ল।

হেমন্তের শীতের ছোটদিনের বেলা, হাতে সময় কম। আত্মীয় ও অতিথি মিলে দুশো মানুষকে আমন্ত্রণ করা হয়েছে। তবু লোক কিছু বেশিও হতে পারে। আয়োজন দেখে বোঝার উপায় নেই, বিয়েটা কার, কনেপক্ষ নাকি বরপক্ষের ?

ভোর থেকেই মশলা বাটার শব্দ ও রান্নার আয়োজন চলছে। দুপুর গড়ালেই লোকজন খেতে বসবে। পুরা আয়োজনে কে কখন কী কাজ করবে, সবার দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। পরিবারের বড়ছেলে শাহেদ চৌধুরীর তাড়াহুড়োর শেষ নেই। এই বুঝি দেরি হয়ে যায়।

কিছুদিন বিছানায় পড়ে থাকার পর, ঈশিতা বেগম মারা গেছেন।

একটা দিনের কথা খুব করে মনে পড়ল রাহাতের। বাবা-মা অসুস্থ। ছোট ছুটে এসেছে। নিতু ও শাহেদ খবর নেয়নি। তিনশ মাইল দূর থেকেও রাহাত এসে গেল। যতটা সম্ভব বাবা-মাকে সারিয়ে তুলে সে কর্মস্থলে ফিরে গেছে।

একদিন মাকে ফোন করল রাহাত, ফোনটা ধরলেন বাবা। বললেন, ‘শাহেদ নাকি অসুস্থ। তোর মা সেই খবর পেয়ে নাওয়া-খাওয়া ভুলে বসেছিল। আজ নারকেল, আম ও কাঁঠাল নিয়ে ছেলেকে দেখতে গেছে।’

‘কার সঙ্গে গেল ?’

‘একটা ছেলেকে সঙ্গে পাঠিয়েছি।’

রাহাত দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ভাবে, ‘কী চমৎকার মা-ছেলের সম্পর্ক।’

ঈশিতা বেগমের দুঃখ তবু ঘোচেনি।

মায়ের স্মরণ অনুষ্ঠান উপলক্ষে ভাইবোন ও আত্মীস্বজন এসেছে। দীর্ঘদিন খেয়ে না খেয়ে, সেবাশুশ্রƒষাহীন বিছানায় তিনি প্রায় একা পড়েছিলেন। মেয়েদের কেউ সকালে এসে বিকেলে ফিরে গেছে। ছোট দিন কয়েক থেকেছে। সবার কাজ ও সংসার আছে, মায়ের কাছে থাকার অবসর নেই। 

বাড়িতে উৎসবের আমেজ। এখানে মাংস, ওখানে আদা-রসুন-মশলা বাটার কাজ চলছে, আরেক জায়গায় মাছ ও তরকারি কোটা হচ্ছে। বাড়িময় ঈশিতার ছেলেমেয়ে ও নাতিপুতিতে ভরে গেছে। তাদের চিৎকার, হাসি ও ছোটাছুটি।

বারান্দার এক কোনায় বসে আছে ছোট। মাকে নিয়ে, মায়ের বাড়িতেই এত আয়োজন, অথচ মা নেই। মা কি আড়ালে বসে কাঁদছে ? কাউকে বকছে ? আশীর্বাদ বা অভিশাপ দিচ্ছে ?

এসব কথা ভাবতে গিয়ে ওর বুক ভেঙে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। চোখ ফেটে জল নামে। অশ্রু লুকাতে সে ছাদের সিঁড়িতে চলে যায়।

মানুষজনের খাওয়া শেষ হতে বিকেল গড়িয়ে গেল। খেয়ে পরিতৃপ্ত মুখে ঢেঁকুর তুলে ফিরে যাচ্ছেন অতিথি ও আত্মীয়রা। 

আয়োজন শেষে ছেলেমেয়ে ও নাতিপুতিরা যে যার ঠিকানায় ফিরে যায়। কেবল বাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পথচারী ও প্রতিবেশীরা বলে, এই বাড়িতে প্রাণের স্পন্দন ছিল। মানুষের কলরব ছিল। এখন জনশূন্য। মানুষ নেই বলে সারা দুপুর, এমনকি সন্ধ্যা নামলেই নির্জনতা ও বিষণ্নতা ঝুলে থাকে বাড়িটিকে ঘিরে।

একদিন খুব ভোরে মহল্লার মানুষের ঘুম ভেঙ্গে যায়।

ভোরে কিছু মানুষের দরকারি কাজ থাকে, বেরিয়ে পড়তে হয়। আর সব লোকের এ সময় গভীর ঘুমে ডুবে থাকার কথা। প্রথমে মৃদু ও সশব্দ কান্নায় ঘুম ভেঙ্গে যায়। কে কাঁদছে ? প্রথমে কেউ বুঝতে পারেনি। কান্নার উৎস খুঁজতে গিয়ে মহল্লাবাসী কৌতূহলী হতে হতে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যায়।

ঈশিতার বড়ছেলে, শাহেদ চৌধুরী, দিনের আলো ফোটার আগে এই ভোরবেলায় মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। আকুল হয়ে কাঁদছে।

শহর থেকে সে কখন এসেছে ? কেউ জানে না।

প্রবল জলোচ্ছ্বাসে কিংবা আকস্মিক দুর্ঘটনায় সম্পদ ও পরিবারের মানুষকে হারিয়ে মানুষ বিপন্ন হয়ে পড়ে। অসহায় ভঙ্গিতে কাঁদে। শাহেদের কান্না, সেই কান্না থেকে কিছুতেই আলাদা করা যায় না।

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button