আর্কাইভগল্প

গল্প : উড়ে যায় আমার শৈশব : পলি শাহীনা

একজোড়া গভীর চোখ নিঃশব্দে আমাকে দেখছে। ও যেন এক মায়াবৃক্ষ, ওর সর্বাঙ্গে মায়াবন বিছানো। ওর জুলজুল চাহনির গভীরতা মনে হয় মহাশূন্যের চেয়েও বিশাল। আমি একটা আশ্চর্য ওম অনুভব করি, একটা নেশা ধরা ঘ্রাণ পাই। আমার জীবনে দেখা সকল মানুষের মধ্যে তুমি সেরা সুন্দর, কাঁধের দুই পাশে দুই বেণী ঝুলানো তুলতুলে মেয়েটির দিকে অপলক চেয়ে থেকে অবচেতনে বিড়বিড় করে উঠি। ও তখনও আমাকে নিবিড়ভাবে দেখছে। একজন অপরিচিত মানুষ বাড়িতে ঢুকেছে, সুটকেস হাতে দাঁড়িয়ে আছে, এসব নিয়ে ওর মধ্যে কোনও ভাবনা দৃশ্যমান হলো না। অনুরণিত নরম বিকেলের সোনা রোদ নীরবে শুয়ে আছে আমার দীর্ঘ ছায়ায়। মেয়েটি আমার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এবার আমার ছায়ার দিকে তাকায়। আমি এবং মেয়েটি, দুজন চুপচাপ দুজনকে দেখছি। আমার কাছে মেয়েটিকে একজন ধ্যানমগ্ন ঋষি মনে হয়। আমি ধীরে ধীরে ওর আলতা পরা ছায়া ঘেঁষে দাঁড়াতেই পাশে রাখা পুতুলের বাক্স হতে ও আমার হাতে অনেকগুলো নীল, সবুজ, হলুদ রঙের মার্বেল তুলে দেয়। মার্বেলগুলো চোখের সামনে ধরতেই এই বাড়ির ফেলে আসা সকাল-দুপুর-রাতের দৃশ্যগুলো বড় জীবন্ত হয়ে ফিরে আসে আমার স্মৃতিতে।

মেয়েটা যে জায়গায় বসে খেলছিল, এতটা সময় ধরে আমাকে দেখছিল, অতঃপর হাত প্রসারিত করে আমাকে মার্বেলগুলো দিলো, ঠিক সেই জায়গায় ছিল আমার রঙিন শৈশবের স্বর্গীয় চৌচালা টিনের ঘরটি। হাড় কাঁপানো পৌষের শীতে মায়ের বুকের ওমে ভাইবোনের মাঝখানে ঘুমিয়ে পড়তাম কাঁথা-কম্বল ছাড়াই। রাতভর তখন কত সুখস্বপ্ন দেখতাম। স্বপ্ন দেখার মাঝে কখনও আমার ঘুম ভাঙত না। আজ আমি আর কোনও পরিপূর্ণ স্বপ্ন দেখি না, কিংবা দেখার সুযোগও পাই না। যন্ত্রজীবনে ইট-কাঠের ফাঁকফোকর গলে কোনও স্বপ্ন এলে মুহূর্তেই পৃথিবীর কোনও না কোনও ত্রুটিপূর্ণ যান্ত্রিক গোলযোগে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়, সঙ্গে স্বপ্নও।

মনে পড়ে, এই গ্রামে কোনও পাকা রাস্তা ছিল না, এই বাড়িতে কোনও বিদ্যুৎও ছিল না। সন্ধ্যা নামার আগে চিমনি পরিষ্কার করে হারিকেনের নরম আলোয় বিজ্ঞান বই খুলে গলা ফাটিয়ে কিছু সময় বাংলা কবিতা পড়েই উঠানে খোলা আকাশের নিচে শীতল পাটি বিছিয়ে দাদার কোলে শুয়ে তাঁর পুথি পাঠ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম। ঘুম ভাঙত ভোরের সূর্য উঁকি দিলে। মা নাকি দাদা, কে বিছানায় এনে শুইয়ে দিতেন, জানি না। আসলে জীবনে অনেক কিছুই জানা হয় না আমাদের। কিন্তু স্পষ্ট মনে আছে, রাত নিশীথে মা কেরোসিনের কুপি হাতে মশারির ভেতর হতে মশা মারতেন। সেই সময়টায় মায়ের চুল ভর্তি সিন্ড্রেলা তেলের সুবাসে আমি বিভোর হয়ে যেতাম। মাঝেমধ্যে চোখ মেলে বিদেশ থেকে বাবার পাঠানো সুরমা পরা কাজল কালো চোখের মায়ের শান্ত চাঁদমুখ দেখে পুনরায় ঘুমে কাদা হয়ে পড়তাম।

এই বাড়িতে তখন একটাই ঘর ছিল। বাড়ির শরীর ঘেঁষে অন্য কোনও বাড়িও ছিল না। উঠান ভর্তি হাঁস, মুরগি ছিল, আর ছিল ফুলগাছ। আমার শৈশবে কম মানুষের আনাগোনায় কিছুটা অমিশুক স্বভাবে বেড়ে উঠলেও ভীষণ প্রকৃতি প্রেমিক ছিলাম। সকাল বেলায় আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে দলবেঁধে উত্তর দিক হতে দক্ষিণ দিকে উড়ে যাওয়া পাখিদের গুণে রাখতাম। সন্ধ্যা নামার আগে দক্ষিণ দিক হতে উত্তর দিকে নীড়ে ফেরা পাখিদের সংখ্যা কম হলে মন খুব বিষণ্ন হত। রাতে ওদের কথা ভেবে মন আরও বিষণ্নতর হয়ে উঠলে মা বলতেন, ‘ওরা হয়তো কোনও আত্মীয়ের বাড়িতে রয়ে গেছে, আগামীকাল ঠিক নীড়ে ফিরবে।’ মায়ের কথা শুনে মন ভালো হয়ে গেলে পড়ায় মনোযোগ দিতাম।

সেসব দিনে দুপুর বেলায় মা আমাদের খাইয়ে যখন কিছুটা সময়ের জন্য বিশ্রাম নিতেন, তখন লেইস-ফিতা, কটকটি ওয়ালা, হাঁড়িপাতিলসহ শাড়ির ফেরিওয়ালা আসতেন। এগুলোর প্রতি আমার তেমন আকর্ষণ ছিল না। তাঁরা কিছু সময় ডেকে ডেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরে যেতেন। আমি একা একা ঘরের বারান্দায় বসে আপন মনে খেলতাম। কথা বলতাম কবুতর, কাক, চড়ুইয়ের সঙ্গে। ওদের স্বর নকল করে নিজের সঙ্গে নিজে হাসতাম। এই নিঃসঙ্গতা, আপন মনের খেলা, নিজের সঙ্গে থাকা আমাকে কল্পনাপ্রিয় করে তুলেছিল। শান্ত দুপুরে আমার সাথী হত বাদামি রঙের বিড়ালটা। আমি যখন পুতুলের বাক্স খুলতাম, ও তখন বড় বড় চোখ করে বাক্সের উপর লাফিয়ে উঠত, দুষ্টমি করত। আমি যেদিকে যেতাম ও আমার পায়ে পায়ে ঘুরত। শৈশবে আমি দলবেঁধে খেলার সুযোগ পাইনি।

মায়ের কাছে শুনেছি, আমি নানার বাড়ি বেড়াতে গেলে বিড়ালটা নাকি সারাক্ষণ চিৎকার করত, সে চিৎকার অসহায় কান্নার মতো শোনাত। ও বুকের সঙ্গে মানুষের বাচ্চার মতো লেপ্টে ঘুমাত। দাদার কাছে শুনেছি, মা বিড়ালটিকে অরুণ দাদার কাছ থেকে নিয়েছিলেন। মানুষের ভেতর ধর্ম নিয়ে কত রকমের দাঙ্গা, ফ্যাসাদ বাঁধে, কেউ হিন্দু, কেউ মুসলিম, কেউ খ্রিস্টান। কিন্তু অন্য প্রাণ, ফুল-পাখি-প্রকৃতির কোনও ধর্ম নেই, তাদের মধ্যে হিংস্রতাও নেই। মানুষের পৃথিবীতে প্রকৃতি তার সৌন্দর্যের যে ছাপ ফেলে গিয়েছে মনে ছোটবেলায়, আমার মস্তিষ্কের রন্ধ্রে রন্ধ্রে  আজও তা আন্দোলিত হয়। খুব মনে পড়ে, বিকেল যখন লাল শাড়ি অঙ্গ জড়িয়ে অপরূপ সাজে সজ্জিত হয়ে মাটি লেপা উঠানে গোলাপ হয়ে ফুটত, মা তখন ছুটতেন হাঁস, মুরগির পেছনে, কিংবা নাইলনের দড়িতে টান করে শুকাতে দেওয়া সারি সারি কাপড় গোছানোর কাজে। আমি তখন গুটি গুটি পায়ে ছুটতাম সেই বটগাছটার কাছে, যে বটগাছটা আমার ভাবনায় ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু আর বিশাল এক মহীরুহ। যে গাছের ডালপালা আশ্চর্য এক সুরে মর্মরিত হতো, সেই সুরের দ্যোতনায় আমি মগ্ন হয়ে পড়তাম। বটগাছের তলে দাঁড়িয়ে ছোট্ট আমি কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করতাম, যেন মৃত্যুর সময় এই সুর শুনতে শুনতে আমি বিদায় নিতে পারি পৃথিবী থেকে। সেই বয়সে মৃত্যু নিয়ে ভাবার কোনও কারণ না থাকলেও মৃত্যুকে ভয় পেতাম। মনে হতো, এমন স্বর্গীয় সুর মৃত্যুভয় ছিন্ন করে দিতে পারবে। অন্ধকার নামার আগে গাছটির শাখা-প্রশাখা চেনা-অচেনা পাখির কল-কূজনে ভরে উঠলে চারপাশটাকে এক রহস্যের জগৎ মনে হতো।

সেই বিশাল বিস্তৃত বটবৃক্ষের তলা হতে ঝরে পড়া বটফল কুড়িয়ে এনে পড়ার টেবিলে ফুলের আকৃতি দিয়ে ওদের সাজাতাম, খেলতাম। আমি কখনও ছোট-বড় কারও সঙ্গেই হৈ-হুল্লোড় করে খেলিনি, প্রকৃতির সঙ্গে খেলেছি, বেড়ে উঠেছি আপন মনে। সন্ধ্যা রাতে ঘরের শরীর ঘেঁষে বেড়ে ওঠা লেবু গাছের ঝাড়ে জোনাকির জ্বলা-নেভা সেই বয়সে আমার কাছে ম্যাজিক মনে হতো। আমি ওদের ধরতে যেতাম না, দূরে দাঁড়িয়ে ওদের আলোর ম্যাজিক দেখতাম। কখনও কখনও চোখ বুজে ঢুকে পড়তাম অজস্র জোনাকির রাজ্যে, চারপাশ এমন উজ্জ্বল হয়ে উঠত, নিজেকে মনে হত আলোর রানি। আসলে আমার শৈশবের স্মৃতিতে সশব্দে বিরাজ করছে শুধুই প্রকৃতি।

এই বাড়ি আমার বড় প্রিয়। এই বাড়ির প্রতিটি কোনায় আমার অগণন স্মৃতি রয়েছে। পৃথিবীর কত জায়গা ঘুরেছি, থেকেছি, এই বাড়ির মতো আনন্দ কোথাও পাইনি। এই বাড়ি সদা আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আজ বাড়ি এসে মনে হলো, পৃথিবীর ছাদ ফুটো হয়ে শৈশবের স্মৃতিরা বৃষ্টি হয়ে আমাকে ভিজিয়ে যাচ্ছে। আচম্বিতে মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া উড়োজাহাজের বিকট শব্দে আমার মুঠাভর্তি রঙিন মার্বেলগুলো ঝুনঝুন শব্দ তুলে নিচে পড়ে যায়।

মার্বেলগুলো পড়ে যেতেই আমার দুহাত শূন্য হয়ে পড়ে। সম্বিৎ ফিরেই ও খুকি ও খুকি, আমি ডাকতে থাকি মেয়েটিকে। ওর নামটাও জানা হলো না ভেবে মন কেমন করে ওঠে। শৈশবে আপন মনের খেলার মতো করে আপন মনে মেয়েটার নাম দিই খুকি। ওকে ডেকে ডেকে, খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। মেয়েটা আমার স্মৃতির সমুদ্রে ঘাঁই মেরে কোথায় গেল! চোখের সামনে থেকে কখন, কীভাবে উধাও হলো মেয়েটি, ভেবে হতভম্ব হয়ে যাই! 

রাতের আঁধার চিরে একটার পর একটা বাস, টেম্পু, ট্রাক, টেক্সি, মোটর বাইক কানের কাছে বাজখাঁই শব্দ তুলে গন্তব্যে ছুটে চলছে। কল্পনার ডানায় বিচরণ করা আমি ছোট্ট মেয়েটিকে হারিয়ে বাস্তবে ফিরে আসি। আমার শৈশবের দিন-রাত্রিগুলো, সেই বাড়ি, সেই ঘর, কাঁচা রাস্তা, মাটির উঠান কবেকার বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে, কিছুই বর্তমানে নেই।

পূর্ণ চাঁদ রাত, মসলিনের মতো সেই চাঁদের আলোয় সিক্ত হবার উপায় নাই। সোডিয়ামের উজ্জ্বল  আলোয় চাঁদের আলো ফুটে উঠতে পারছে না। আকাশটা কী যে স্বচ্ছ, আর দারুণ দেখাচ্ছে, উঠান ছেড়ে ঘর নামক ইঁট-কাঠের খাঁচায় ঢুকতে মন একদম চাইছে না। ভাবি, চারপাশে দেয়াল আর দেয়াল, ঘরে ঢুকলেই আকাশটা পাওয়া দুষ্কর হয়ে যাবে।

হলুদ রঙের তেতলা বিল্ডিংয়ের একতলার বারান্দায় বসে পড়ি। শ্যাওলা পড়া দেয়ালের ইটের ফাঁকে বেড়ে ওঠা পাকুড় গাছের ছায়ার দিকে ভিখারির মতো চেয়ে থাকি। অদ্ভুত শীতল হাওয়া বইছে। সেই হাওয়ায় আমার চুলগুলো উড়ে এসে চোখ ঢেকে দিলে আলো-আঁধারিতে আবারও মেয়েটির সহজ সরল শান্ত মুখটি বিদ্যুৎ ঝলকের মতো এক পলক মূর্তমান  হয়েই পুনরায় হারিয়ে যায়। চোখের কার্নিশ ভরে ওঠে জলে। যত দূর দৃষ্টি যায় আমি প্রেমময় লক্ষ্মী মেয়েটিকে খুঁজতেই থাকি, পাই না। রাতজাগা নাম না জানা একটা পাখি উড়ে যায়। আত্মগোপনে বলি, ও খুকি ও খুকি, পাখির মতো উড়ে উড়ে কোথায় চলে যাচ্ছিস রে ? মেঘ-পাহাড়ের চূড়ায় কোনও দূর নির্জন নদীর ধারে, নাকি কোনও প্রাচীন বিশাল বটবৃক্ষের ছায়ায় ? পাঁজর বিদীর্ণ করা আমার প্রশ্নের কোনও উত্তর আসে না। নিজের ক্লান্ত খোলসের ভেতর আহত পাখির মতো মুখ থুবড়ে পড়ে থাকি। আমার শৈশব দীর্ঘশ্বাসে রূপান্তরিত হয়ে চারদিকে বিচিত্র মেঘের মতো উড়তে থাকে বাতাসে।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button