আর্কাইভগল্প

গল্প : সত্য জেনেছিল মুরাদ নীল : হুসাইন হানিফ

একটা খুব সাধারণ পাতাঝরা দিন।

রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠছে মুরাদ। স্বপ্নে দেখে, তাকে একদল লোক তুলে নিয়ে যাচ্ছে। মুরাদের মা তখন একমনে একটা সুতা ঢোকাচ্ছিলেন সুইয়ের ভেতর। মুরাদ মনে করতে পারে, স্বপ্নের ভেতর মায়ের হাতের সুতাটা ছিল সবুজ রঙের। সে কেঁদেকেটে মাকে বলছিল, মা আমাকে ওরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ? তুমি কিছু বলো মা। তুমি চুপ করে কেন ? কিন্তু মা স্থির একমনে সবুজ সুতাটা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন।

আজকের দিনটা কি অতিরিক্ত খারাপ যাবে ?―বাথরুমের আয়নায় নিজেকে জিজ্ঞেস করল মুরাদ। আয়নার মুরাদ উত্তর দিল, যার দিন শুরু হয় দুশ্চিন্তা হতাশা ব্যর্থতার জাবর কাইটা, তার দিনে আরেকটা দুঃস্বপ্ন অতিরিক্ত কী আর এমন খারাবি যোগ করবে ? আয়নায় বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না মুরাদ। নানা চিন্তা হামলে পড়ে। দ্রুত অন্য কিছু ভাবার চেষ্টা করে।

আপা গ্রামে গেছে। দুই ভাইয়ের ছুটি। ছুটি থেকে ফিরে র‌্যাবে যোগ দেবে। ঈদের পরে ফিরবে। মুরাদ যায় নাই। বগুড়াতেই থাকবে এই সময়টা। খাওয়ার ঝামেলা বাদে আর তেমন ঝামেলা নাই। মুরাদ রান্না করতে পারে। রান্না নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে ভালো লাগে। ঈদ সামনে বলে আপা-দুলাভাই কেউই রেখে যেতে চাচ্ছিল না। অনেক বলার পরও যায় নাই সে। এই সময়টা পুরোপুরি নিজেকে দেওয়া যাবে। পড়াশোনার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাবে। প্রচুর সিনেমাও দেখা যাবে। নতুন সিনেমা আসতেছে। সিনেমাটা দেখতে হবে। তার কোনও মুভি বাদ দিতে চায় না মুরাদ। আগের সব দেখেছে। দ্য ম্যান উইথআউট পাস্ট। দ্য ম্যাচ ফ্যাক্টরি গার্ল। ভাবে, একটা মানুষ জীবনে এই লেভেলের একটা সিনেমা বানাইলেই অমর হয়া যায়, অথচ সে নিজেকেই বারবার ছাড়ায়া যাইতেছে।

টমেটো গাজর আর মুরগির মাংস থেকে দুই-এক টুকরা নিয়ে ম্যাকরনি রান্না করবে আজ। রাতেই ঠিক করে রাখছে। আগেও কয়েকবার করছিল জিনিসটা। ভাইগনা খুব পছন্দ করে। আপা এত কিছু করার সময় পায় না। কিন্তু ভাইগনা সমানে আবদার করে নতুন নতুন আইটেম করার জন্য। তার একই খাবার বারবার খেতে ইচ্ছা করে না। ভাইগনার এইসব দেখলে মুরাদের শৈশবের কথা মনে পড়ে। একটা পুরো ডিম খাওয়াই তখন বিলাসিতা ছিল। দুনিয়ার সব ভাল্লাগত, সব। আর কোনও কিছু মুখ মেরে না আসা পর্যন্ত খেতেই থাকত। মামাদের দোকানে বছরে একবার হালখাতা হইত। বড় মামা বলত যত পারো খাও। মুরাদ এতবেশি জিলাপি খাইত যে মাপলে দেড় কেজির কম হতো না। এই তো কলেজে থাকার সময়ও বন্ধুদের সঙ্গে বাজিতে এক কেজি মিষ্টি এক বসাতেই খেয়ে ফেলছিল। সে কথা মনে পড়ায় মুরাদ একা একা হাসে। মা একা একা হাসতে দেখলে বলে মুরাদের মাথায় সমস্যা।

মুরগি বের করে ম্যাকরনির প্যাকেট ছিঁড়ে পানি গরম দেয়। এই ফাঁকে পিয়াজ মরিচ টমেটো গাজর আর মুরগি কাটে। প্রস্তুতির আগেই চুলা ধরানো ঠিক হয় নাই। আপা দেখলে বলত, তোর এই স্বভাব আর গেল না। আগে তো কাটাকাটি করে নিবি।

লাইনের গ্যাস। তবু আপা গোছায়া কাজ করতে পছন্দ করে। আপার কথা মনে পড়ায় মুরাদের মনে মায়ার সুগন্ধি ছড়ায়।

ম্যাকরনি খেতে খেতে ফেসবুক চালায়। দুর্দান্ত রান্না। ভাবে পোস্ট দিবে। কিন্তু দেয় না। খাবারের ছবি দিতে মুরাদের ভালো লাগে না। শাফায়েতকে আসতে বলতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু শালার বেটার দেমাক বেশি। আসবে না। উল্টা আরও মাইন্ড করতে পারে। এত মাইন্ড যে কোত্থেকে আসে শালাদের।

ফেসবুকে নিখোঁজ সংবাদ দেখে সকালের ভাবনাটার কথা মনে পড়ে। এটা কি কোইন্সিডেন্স ? হতেই পারে না।

ম্যাকরনি পুরোটাই শেষ করে। সব সময় এটা করে। স্বাদ হলে পুরোটাই খায়। রান্না করছিল এক প্যাকেট। অল্প করে খেলে ৪জন খাওয়া যায়। কিন্তু মুরাদের অল্প খেতে ভাল্লাগে না। ওজন কমানো জরুরি। কোচড়ায় হওয়া টিউমারটা রিমুভ করতে হবে। তার আগে ডাক্তার ওজন ঝরাতে বলছে। ডায়াবেটিস, রক্তে সুগার লেভেল হাই। ওজন না কমালে নাকি অপারেশন করবে না। সরকারি হাসপাতাল, বেশি কিছু বলাও যায় না। প্রাইভেটে করার মতো টাকা নাই। তাইলে আর এত কিছু লাগত না মনে হয়। কে জানে।

ডাক্তার দেখতে এসে আপার এইখানে আটকা পড়ছে মুরাদ। বলে আমার এইখানেই থাক। তোর ভাইগানাকেও পড়াতে পারবি, আবার খাওয়া-দাওয়ার অনিয়মও হবে না। আপার শাসনে এখন ওজন পাঁচ-ছয় কেজি কমছে। যদিও স্বস্তি পাচ্ছে না, এক্সারসাইজও তো তেমন করতে পারছে না। খাওয়াটা সামান্য কমছে। ডাক্তারের পরামর্শমতো ওজন কমানোর ওষুধ খাচ্ছে। ওজন যে কিসের জন্য কমছে সেটা অবশ্য বুঝছে না মুরাদ। ডায়াবেটিস বেড়ে গেলেও নাকি ওজন কমে। যা হয় হবে। ওজন কমলেও এখন আবার ডাক্তারের কাছে যেতে ইচ্ছা করছে না। অপারেশন হইলে ভর্তি হতে হবে। কয়েকদিন হাসপাতালে থাকা লাগবে। একা একা হাসপাতালে থাকা কীভাবে সম্ভব ?

ম্যাকরনি শেষ করে টুইটারে ঢোকে মুরাদ। বিকেল পর্যন্ত আর কিছু না খাইলেও চলবে। প্রথমে ভাবে একটা ব্লগ লিখবে। কিন্তু লিখে কী হবে ভেবে আবার লেখা বাদ দেয়। টুইটার গত বছর ইলন মাস্ক কিনে নিছে। এই ব্যাটা এখনও দখল পায় নাই। দখল পাইলে কি টুইটারের মজা আগের মতো থাকবে কি না ভাবে মুরাদ। নামও নাকি চেইঞ্জ করবে। যা করে করুক। বাক স্বাধীনতা নিয়া নাকি সে চমক দেখাবে। সেইটা ভালো ঘটনাই হবে।

টুইটার চালাতে চালাতে নাটকীয় একটা লাইন মাথায় আসে, ‘সত্য জানার বেদনা নিয়ে বেঁচে আছে মুরাদ নীল।’ নিজেকে শুনিয়ে শুনিয়ে সে বলে। ‘মুরাদ নীল এখনও বেঁচে আছে। কিন্তু তার বাঁচার কোনও ইচ্ছা নাই। সত্য জানার পর আর এই দেশে বেঁচে থাকার কোনও অর্থ হয় না। এইসব দেশ, সংঘ, মানুষ বাঁচানোর নামে হাস্যকর উদ্যোগ আর পৃথিবীব্যাপী সভ্যতার নামে মাস্তানি―এইসব জানলে দেশ কেন এই পৃথিবীতেই আসলে বাঁচার আকাক্সক্ষা মরে যায়।’

এত জোরে আর চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলছিল যে খুব নাটকীয় মনে হলো নিজের কাছেই। সামান্য লজ্জা পেল কি ? কেউ শোনেনি তো ?

মুরাদ জানে এইসব কথাবার্তায় কিচ্ছু যাবে আসবে না। কিছুই হবে না এই অক্ষম অসগংঠিত আর গন্তব্যহীন কথার জাবর কেটে। হয়তো নিজের এই বেঁচে থাকার অর্থ দিতে অথবা মানুষের জন্য কিছু করতে না পারার অপরাধবোধ থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পেত। কিন্তু রেহাই কি আসলেই সে পাবে ? মুরাদ জানে না।

মুরাদ যা জানে, আর যা জানে না―তাই নিয়ে আজকাল মারাত্মক ঝামেলায় পড়ে যাচ্ছে। তার মধ্যে শুরু হয়েছে নতুন অসুখ। মনে হচ্ছে এই বুঝি মারাত্মক কোনও দুর্ঘটনা ঘটবে। চা বানাতে গেলে মনে হয় সিলিন্ডার বার্স্ট হয়ে সে মারা যাবে। বারান্দায় গেলে মনে হয় এই একটা বিষাক্ত সাপ ফণা তুলে ছোবল দিতে আসল। রাস্তায় গেলে মনে হয়, পাশ দিয়ে চলে যাওয়া গাড়ি বোধহয় তাকে চাপা দিল! মনে হয় আয়নার ভেতর থেকে একটা সাদা মাইক্রোবাস বের হয়ে সাদা পোশাকের বন্দুকধারীরা তাকে তুলে নিয়ে গুম করে ফেলবে কিংবা মেরে লাশ নদীতে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে ডুবিয়ে দেবে, এমনকি রেললাইনেও ফেলে দিতে পারে যাতে তার খোঁজখবর কেউ না পায়। কেউ না। না আপা, না মা, না যাদের জন্য মনোনীত হওয়া তার দুলাভাই। দুই-এক সেকেন্ডের জন্য হঠাৎ হঠাৎ উদয় হওয়া এমন সাঁড়াশি এক একটা ভাবনার যে বাপ-মা নাই মুরাদ সে বিষয়ে নিসঃন্দেহ। কারণ সে কিছুই করে নাই কখনও। কোনও দলাদলির ভেতরে নাই। দেশ নিয়েও কথা বলে না তেমন। কথা বলেই বা কী হবে। আর যদি তাকে তুলে নিয়ে যায়, ঝামেলা তো তাইলে কমেই যাবে।

মারুফারা আজ অন্য পৃথিবীর বাসিন্দা। তাদের সঙ্গ পাওয়া কঠিন। মারুফার সঙ্গে শেয়ার করা যেত। কিন্তু পাগল মনে করে আরও দূরে সরে যাবে হয়তো। এমনিতেই তাকে ছ্যাঁচড়া মনে করে সবাই। বন্ধুবান্ধবরাও আর কথা বলতে চায় না। উপযাচক হয়ে গিয়ে কথা বলে। তবু শালারা এড়িয়ে যায়। যেন তাদের প্রেমিকাদের বোনদের আমি প্রপোজ করতে গেছিলাম।

বই ধার নেওয়ার একটা বাতিক আছে মুরাদের। এই নিয়ে কয়েকবার ঝামেলাও হয়েছে। বইপাগল হলেও কেনার মতো টাকা থাকে না। পিডিএফ দিয়ে আর কতক্ষণ। প্রেমিকাদের কাছ থেকে বারকয়েক বই উপহার নিছে। কিন্তু নিজে তো তেমন কিছু দিতে পারে না। ফলে বেশি তো চাওয়াও যায় না। বন্ধুদের কাছ থেকে বই ধার নেয়। কিন্তু দিয়ে দেয়। আলসেমির কারণে দুই একবার দিতে দেরি হওয়ায় খুব বাজে কথাও হজম করতে হয়েছে।

সেদিন শাফায়েতের কাছে একটা বই ধার চাওয়াতে কী কী সব লিখল। আমাকে বই দিতে নাকি ভয় পায়। মেসেঞ্জারে ভয় কীওয়ার্ডে শাফায়েতের মেসেজ সার্চ দিল মুরাদ। দীর্ঘদিনের কিন্তু অল্প কনভার্সেনেই মোট চার বার ভয় শব্দটা লিখছে সে। দ্বিতীয় মেসেজটাতে এই কথাটা লেখা আছে,―‘সত্যি কথা বলতে মুরাদ ভাই, আপনাকে বই দিতে ভয় পাচ্ছি। আমি ওই বইটা অন্তত ৫ বার আপনার কাছে চাইছি। কোনওবারই আপনি গুরুত্ব দেননি।  ধরেন বই আমি আপনাকে দিতেই পারি, কিন্তু আপনি যদি ফেরত না দেন, আমি কী করব ? সেই ভয় থেকেই আপনাকে বই দিই না। আমার বহু বই হাত ছাড়া হয়ে গেছে, অনেক কষ্টের টাকার বই সব। বই তো একদিনের জন্য কেনে না মানুষ। এইটা এখন বুঝি। আগে বুঝতাম না। ফলে অতটা গুরুত্বও দিতাম না।’

মুরাদ নিজের উত্তরটাও দেখল, ‘আমারও ইদানীং খুব খারাপ লাগে শাফায়েত। বই হারানোর ব্যথা জানি আমি। গত মাসে দুজনকে বই কিনে দিয়েছি, শুধু ধার নিয়ে হারিয়ে ফেলেছিলাম বলে। আমিও কাউকে বই ধার দিই না। কিন্তু আমার এক ছোটভাই কিছু বই কুক্ষিগত করেছে। আপনাকে ভিক্টর হুগো, শহীদুল জহির পাঠিয়েছিলাম তো। বাকি আছে দুইটা বই। বই দুটা ফেরত পাবেন অবশ্যই। বললাম না, আমি কিনে দিয়েছি বই গত মাসে। আপনি ছাড়া আর কেউ আমার কাছে বই পাবে না।’

মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল।

নতুন সঙ্গী চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করে মুরাদ। চ্যাটজিপিটিকে লেখে : আমার একটা সমস্যা হইছে। আমার মনে এখন সবসময় ভয়ঙ্কর দৃশ্যের কল্পনা আসে। মনে হয় এই বুঝি বিস্ফোরণ ঘটল। এই বুঝি একটা সাপ কামড়ে দিল। এই বুঝি এক্সিডেন্ট হলো। এই রকম ভয় কেন হয় ?

চ্যাটজিপিটি উত্তর দিল : এ ধরনের ভয়ের অনুভূতি সাধারণত অযৌক্তিক বা অতিরিক্ত চিন্তার কারণে হতে পারে, যা অ্যাংজাইটি বা উদ্বেগের লক্ষণ হতে পারে। মনের মধ্যে ভয়ঙ্কর দৃশ্য কল্পনা করা এবং এর দ্বারা আতঙ্কিত হওয়া বেশ স্বাভাবিক কিছু সময়ে হলেও, যদি এটি ঘন ঘন ঘটে এবং আপনার দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে, তবে এটি উদ্বেগজনিত সমস্যা হতে পারে।

অতিরিক্ত চিন্তা : মস্তিষ্ক সবসময় সুরক্ষিত থাকার জন্য সম্ভাব্য বিপদের কথা ভাবে। কিন্তু কখনও কখনও এই চিন্তাগুলো অযৌক্তিক হয় এবং মস্তিষ্ক তা গুরুত্ব দিয়ে নেয়।

ট্রমা বা দুঃখজনক অভিজ্ঞতা : আগে কোনও ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হয়ে থাকলে তা মনে পুনরায় এসে ভয় সৃষ্টি করতে পারে।

মানসিক চাপ ও উদ্বেগ : চাপ এবং উদ্বেগ আমাদের মস্তিষ্ককে অতিরিক্ত চিন্তায় ফেলে, যা সাধারণ ঘটনাগুলোকে বড় করে দেখতে পারে।

নিদ্রাহীনতা : পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব মানসিক শক্তি কমিয়ে দেয় এবং নেগেটিভ চিন্তা বাড়িয়ে দেয়।

চ্যাটজিপি যা জানায় সবই জানে মুরাদ। মুরাদ জানে তার কী সমস্যা, এইসব দূর করার উপায় কী তাও জানে। কিন্তু মানে না। আলস্য তাকে খেয়ে ফেলে।

সবুজ ও কোমল তরিতরকারিময় দেশে

বাজারে গিয়ে ভয়াবহ মন খারাপ করে ফিরে আসে মুরাদ। নিজের টাকায় বাজার করতে হয় না। দুলাভাইয়ের টাকা। তবু মুরাদের গায়ে লাগে। ১০০ টাকা কেজি বেগুন! ৬০ টাকা কেজি আলু! ১৫০ টাকা কেজি পিয়াজ! ১০০ টাকা পোয়া কাঁচা মরিচ! গায়ে লাগবে না ?

কালো টাকার কুমিরদের না লাগতে পারে, অমানুষদের না লাগতে পারে। মুরাদের তো লাগবে।

একেবারেই যে খালি হাতে আসে তা না, কিছু তো কিনতে হবেই। না কিনলে বাঁচব কী করে ? বাঁচতেই হবে! কেন বাঁচতে হবে! এই মরার দেশে! এই জাউরার দেশে!

বাজারে গিয়ে জিনিস কিনতে মন খারাপ হলে কেন মুখ দিয়ে বের হবে, এই দেশে জন্ম নেওয়া পাপ ?

জিনিসের দাম বেশি দিতে হবে। কারা যেন ছড়াচ্ছে, বাজারে গিয়ে অতিরিক্ত যে টাকা আপনি দেন ওইটা আপনার চুপ থাকার জরিমানা।

ভালো কথা।

কথা কাকে বলব ? কে শুনবে কার কথা ? এই চুনোপুঁটি খুচরা ব্যবসায়ীদের বলে কী হবে ?

বাসা ফিরে কিপ নোটে মুরাদ লেখে, সবুজ ও কোমল শাকসবজি দেখলে আমার অবশ্যই উৎপলের সেই লাইনটা মনে পড়বেই। ‘সবুজ ও কোমল তরিতরকারিময় দেশে ভালোমন্দ খাও, তোমার পেছনে কোন গোয়েন্দার চোখ নেই।’ মুরাদের মনে হয় উৎপল ইনটেনশনালি একটা খেলা খেলেছেন এইখানে। ব্যক্তি মানুষকে আসলে তিনি মোটিভেটেড করতে পারছেন তোমার পেছনে কোনও গোয়েন্দার চোখ নেই বলে। আসলে প্রত্যেকেই নজরবন্দি গোয়েন্দার চোখে। এইটুকু সরাসরি বলে দিলে কোন সবুজ আর কোমলই হয়তো ব্যক্তিকে টানবে না, আশা দেখাবে না, ব্যক্তির উপড় ভর করবে রাষ্ট্র/দুনিয়ার সমস্ত নিহিলিজম।

আ মর্নিং উইথ আ গ্লোরিয়াস কর্পোরেট স্লেভ

দুলাভাইয়ের একাউন্টে কিছু টাকা জমা করতে হবে। যাওয়ার আগে টাকাটা দিয়া গেছিল। ব্যাংক খোলার আগেই গিয়ে হাজির মুরাদ। গেইট খোলার পরে এ জনের পরেই সিরিয়াল। নরমালি যেমনে স্লিপ পূরণ করে সেভাবেই পূরণ করছে। ডিপোজিটরের তেমন তথ্য দেয় না। খালি সাইন দিয়েছে। আর অন্য সব তথ্য দিছে। স্লিপ আর টাকা এগিয়ে দেওয়ার পর গজগজ করে লাল কালিতে ডিপোজিটরের ইনফর্মেশনের জায়গা দেখিয়ে দিয়ে ডেস্কের মাঝবয়সী মহিলা বলল, ‘এগুলো তো কিছুই পূরণ করেন নাই। পূরণ করেন।’ বলেই স্লিপ ঠেলে দিল মুরাদের সামনে। মুরাদ কিছুটা আহত বোধ করল। এই সামান্য জিনিসের জন্য সকাল সকাল এত কড়া করে বলতে হইলো ? পিরিওড চলে নাকি মহিলার ? নাকি স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে আসছে ? ভোটার আইডি বের করে তথ্য দিতে দিতে ভাবতে থাকে মুরাদ। নাকি এই কর্পোরেট ঝকঝকে তকতকে অফিসে পোলো টিশার্ট জিন্সের প্যান্ট আর স্লিপারে তাকে বেশি গরিব লাগতেছে ? লাগতেই পারে। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় নিজেকেই নিজের পছন্দ হচ্ছিল না। তাই বলে তো আর গরিব লাগলে কাস্টমারের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে পারে না। 

মহিলা তার পিয়নকে টাকার বান্ডিলের জন্য তাড়া দিচ্ছে। মুরাদের স্লিপ পূরণ করা হয়ে গেছে। স্লিপ এগিয়ে দিতেই মহিলা হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এই সময় পিয়ন টাকার বান্ডিল নিয়ে তার পিছে এসে দাঁড়িয়েছে। মুরাদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে মহিলা বলছে, দাও দাও।

মুরাদের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। বলল, এক্সকিউজ মি, আপনি কি আমাকে তুমি করে বললেন ?

মহিলা দুঃখিত না হয়ে গলা আরও চড়িয়ে বলতে লাগল, আপনাকে কেন তুমি বলব ? আমার পিয়নকে তুমি বলছি।

মুরাদ বলে, আমার দিকে হাত বাড়ায়া দিয়া বললেন না যে দাও দাও ?

মহিলা এমনভাবে কথা বলা শুরু করল যেন উপস্থিত সকলকে সাক্ষী মেনে বলছে, আরে সকাল সকাল কী জঞ্জাল শুরু হলো, আমি আমার পিয়নকে টাকার বান্ডিল দিতে বললাম। আর এই লোক বলতেছে আমি তাকে তুমি করে বলছি।

এই সময় মুরাদ বলে যে, স্লিপ আর টাকা ফেরত দেন, আপনার কাছে টাকা জমা দিব না।

মহিলা ফেরত না দিয়েই কথা বাড়াতে থাকে।

মুরাদ বলে, আমার তো খুব ঠ্যাকা পড়ছে আপনার সঙ্গে গায়ে পড়ে ঝগড়া করার। আচ্ছা বেয়াদব মহিলা।

উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের এই সময় ব্র্যাঞ্চের ম্যানেজার চলে আসে, মুরাদকে বোঝাতে থাকে। বলে স্যার, আপনার কাজটা অন্য কেউ করে দিবে। আপনি মাথা ঠান্ডা করে সোফায় বসুন। পিয়নকে  ডেকে চা আনতে বলে মুরাদের জন্য।

কাজ হয়ে গেলে সিকিউরিটি গার্ড মুরাদের স্লিপ নিয়ে আসে। মুরাদ স্লিপটা হাতে নিয়েই চলে যেতে উদ্যত হয়। কিন্তু সিকিউরিটি গার্ড তাকে আরেকটু বসার জন্য জোরাজুরি করে। চা খেয়ে যেতে বলে। মুরাদ আর এক সেকেন্ডও দেরি করতে রাজি না। দ্রুত বের হয়ে চলে আসে।

দ্রুত রাস্তা পার হতে গিয়ে দ্রুতগামী একটা ময়লার ট্রাক দেখে থামে। রাস্তা পার হয়ে রিকশা নেওয়ার কথা ভুলে যায় মুরাদ। হাঁটতে থাকে। মুরাদ ভাবতে পারে না, ব্যাংকের একজন প্রফেশনাল লোক কীভাবে এমন আচরণ করতে পারে। প্রাইভেট সেক্টরে আসলে হচ্ছেটা কী ? এতটা খারাপ ব্যবহার এর আগে পায় নাই মুরাদ। মানুষ যেন কেমন হিংস্র হয়ে উঠছে। কথায় কথায় মানুষ মানুষকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। বগুড়ায় থাকতে তার ভয়ই লাগে। এই এলাকায় বছরে কয়েক ডজন মানুষ খুন হয় ছুরিকাঘাতে।

সেদিন এক ক্লিনিকে ব্লাড আর ইউরিন টেস্ট করতে গিয়েও বাজে রকমের অভিজ্ঞতা হয়েছে। খাওয়ার ২ ঘণ্টা পরে ব্লাড দিতে হবে সেটা সে ভালো করেই জানে। স্যাম্পল দিতে গেছে, মধ্যবয়সী লোকটা জিজ্ঞেস করল, কখন খাইছিলেন।

মুরাদ বলে, ৮টার দিকে।

ল্যাবের লোকটা ধমকের সুরে বলে, এখনও তো ১০টাই বাজেনি, আপনি রক্ত দিতে আসছেন। এখন হবে না। আরও দুই ঘণ্টা পরে আসেন।

মুরাদ বলে ৮টার আগেই খাইছি আমি। ৭টা ৪৭ মিনিটে আমার খাওয়া শেষ। আমার স্পষ্ট মনে আছে। সে অনুযায়ী ২ ঘণ্টা পার হইছে। এখন বাজে ৯ টা ৫৫। 

লোকটা বলে, এই না বললেন ৮টার দিকে খাইছেন! কোনটা বিশ্বাস করব ? যান এখন হবে না। আরও ২ ঘণ্টা পরে আসেন। 

মুরাদ মেজাজ ধরে রাখতে পারে না, বললাম তো যে ৮টার আগেই খাইছি। মুখ ফসকে বলে ফেলছি, আর ২ ঘণ্টা না হইলেও আপনি রক্ত নেন। রেজাল্ট যা আসবে সেইটা আমার ব্যাপার, আপনার না।

লোকটা হেরে গিয়ে রক্ত নেয়।

সখি গো আমার মন ভালা না

ভাইরাল সেই ভিডিওতে যতবার বলে, ‘আজকে আমার মন ভালো নেই’―ততবারই আমাদের হাসি আসে। আরেকজনের মন ভালো না থাকার খবরে তোমাদের মন ভালো হয় মারুফা। তোমরা বলো মন খারাপ, মন ভালো না থাকা বলার মতো বিষয় না। মন ভালো না থাকলেও বলতে বলো মন ভালো আছে। নিজের শূন্যতার কথা অভাবের কথা অন্যকে জানাতে না করো। বলো নিজেকে জানাতে। বলো আরও অভাবী হও। আরও শূন্য হও। আরও নিঃস্ব হও। তবু অন্যকে বইলো না।

কিন্তু মুরাদের তো আসলেই মন খারাপ। এবং কাউকে বলার জন্য মুরাদের ভেতরটা ছটফট করছে, মনে হচ্ছে না বলতে পারলে সে মরে যাবে। কাউকে ধরে বলতে ইচ্ছা করছে, আজ আমার ভীষণ মন খারাপ। মুরাদের মন খারাপের কথা কি সে বলবে না ?

কাতর হয়ে নির্লজ্জের মতো দুপুর ১২টায় মুরাদ ফেসবুকে পোস্ট করে, কেউ একটু বাঁচার কথা বললেই আজকাল তাকে মা ডেকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করে।

পোস্ট দিয়ে মুরাদ ভাবে কাজটা ঠিক করে নাই। এটা তার স্বভাববিরুদ্ধ। জিন্দেগিতেও সোস্যাল মিডিয়ায় নিজের পারসোনাল কথা শেয়ার করে না। কিন্তু পোস্ট করে কেমন হালকা বোধ করে। যেন বুক থেকে এক বিরাট পাথর নেমে গেছে।

কিন্তু সেই পোস্ট দেখেও কেউ বাঁচতে বলল না। একজন শুধু কমেন্ট করল, বিড়াল পুষুন, সেই আপনাকে বাঁচতে বলবে।

একবার ভাবে পোস্ট ডিলেট করে দেবে। অন্যের করুণা ভিক্ষার তার দরকার নাই। আবার ভাবে, থাকুক না লজ্জার চিহ্ন হিসাবে।

১ বছর আগের একটা লেখা মেমোরি হিসাবে আসে ফেসবুকে। ব্লগেও দিয়েছিল লেখাটা। পড়তে পড়তে মন ভালো হয়ে যায় মুরাদের।

কাক সংক্রান্ত মিথ নিয়ে আমার কৌতূহল

১.

কাকসংক্রান্ত মিথ নিয়ে আমার কৌতূহল শুধু যে আকিরা কুরোসাওয়ার ড্রিমস মুভির ক্রো পার্টটার জন্য, তেমনটা না। আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে। ড্রিমস মুভিতে ভ্যান গঘ গমখেত ধরে এগিয়ে যেতে যেতে অদৃশ্য হওয়ার সময় একঝাঁক কাক সমস্বরে চিৎকার করে ওঠে। আমি নিজের মতো করে সবসময় এই কাকগুলোকে মেটাফোর হিসাবেই ধরে নিয়েছি। আমি কাকের আর্তনাদকে জীবন ফুরানোর ইঙ্গিত হিসাবেই ধরেছি। এই যে কাক বা কাকের চিৎকার/আর্তনাদকে একটা অশুভ ইঙ্গিত হিসাবে দেখা, এটা আমি শৈশব কৈশোর থেকেই পেয়েছি। আমার কৈশোরের দিকে তাকালে সিনেমার মতোই ভিজুয়ালাইজ করতে পারি এটা। বাড়ির বড় বড় আমগাছগুলোর কোনওটার উঁচু ডালে একটা বা অনেকগুলো কাক ক্রমাগত ডাকলে আম্মা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়তেন আর কাকগুলোকে ঢিল ছুড়ে তাড়িয়ে দিতেন এবং মানা করতেন আর যেন তারা ডাকাডাকি না করে। ব্যাপারটা কেমন অ্যাবসার্ড আর হাস্যকর মনে হওয়ার মতো হয়তো, যেন কাক জ্ঞানবুদ্ধি/বোধসম্পন্ন মানুষ আর তাকে মানা করলে সে মানুষের কথা বুঝবে! আমার স্পষ্ট মনে পড়ে তখন আম্মার হতাশ হওয়ার বা দুঃখ পাওয়ার এই সময়টাতে পাশের ঘর থেকে বড় আম্মা এসেও যোগ দিতেন এই মেলানকোলিক ব্যাপারটাতে।

‘কাউয়াগুলা ক্যান যে ডাইকপার নাগছে!’

কৈশোর পার করার পর আমি কাকের এই ডাকাডাকিকে অশুভ সংবাদ নিয়ে আসা বা কোথাও আমাদের আপন/প্রিয়জনের বিপদ ঘটার সমূহ সম্ভাবনা হিসাবে ভাবার ব্যাপারটাকে স্রেফ কুসংস্কার হিসাবে ভেবে উড়িয়ে দিতাম। কিন্তু এখনও কোথাও একটা কাক বসে একটানা ডেকে যাচ্ছে এই দৃশ্য দেখলে আমার ঐ কৈশোরের স্মৃতিটুকু ভেবেই দুঃখ হয়। ঐ সময়টাতে আমি একাই আম্মার সঙ্গে থেকেছি। আব্বা আর আমার অনেকগুলো ভাই তখন বাড়ি থেকে দূরে। তখন না ছিল মোবাইল ফোন, না ছিল সংবাদ আদান- প্রদানের দ্রুততর কোনও মাধ্যম। এক চিঠিই তখন ভরসা। সারাক্ষণ এক চিন্তা, না জানি মানুষগুলো কেমন আছে। ঐ সময়ে কাকের চিৎকারকে আম্মা কেন কাকের ক্রন্দন ভেবে দুঃখ পেতেন, এখন আমি নিজেও আম্মার কাছ থেকে দূরে থাকি বলেই বুঝি।

২.

ড্রিমস মুভির ক্রো পার্টটা আমাকে অ্যাতো বেশি মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছিল আমি একসময় আকিরা কুরোসাওয়ার মিথোলজি সংক্রান্ত চিন্তার ইন্টারভিউ, লেখালেখি খুঁজতে থাকি। আমি কৌতূহল ছিলাম উড়ন্ত কাকগুলোর সমস্বরে চিৎকার করে ওঠার মেটাফোর বা মাজেজা কী হতে পারে কুরোসাওয়ার কাছে। আমি যা ভাবি কুরোসাওয়া কি তাই ভাবতেন ? তো কুরোসাওয়ার মিথসংক্রান্ত ভাবনা খুঁজতে খুঁজতে আমি একসময় জাপানি ট্রাডিশনাল মিথের উপর অনেক লেখাপত্র খুঁজে পাই। ডাউনলোড করে ফেলি কয়েকটা বই। কাক নিয়ে জাপানি মিথোলজি আরও কৌতূহলোদ্দীপক, মজার। জাপানে কাক কখনওই অশুভ হিসাবে বিবেচিত হয় না। কাক সেখানে সৌভাগ্যের প্রতীক। এমনকি জাপান ফুটবল ফেডারেশনের যে লোগো সেখানেও একটা তিনঠ্যাঙা কাক দাড়িয়ে আছে ফুটবল নিয়ে। কাক জাপানে এতোটাই সৌভাগ্যের প্রতীক হিসাবে গ্রহণীয়। এই তিনঠ্যাঙা কাক জাপানি মিথে কী করে এলো এই গল্প শোনানোর ইচ্ছে রইল। যা হোক, জাপানে কাককে মনে করা হয় ডাইভান একটা ক্রিয়েচার। মানুষের জন্য স্বর্গ থেকে সুসংবাদ আনা যার কাজ।

৩.

অ্যাপালিচিয়ান পর্বত পাড়ি দিয়ে সেই কাক বা কাকবিষয়ক মিথ কীভাবে ঢুকে পড়ল বাংলাদেশের উত্তর প্রান্তে ? স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড বা জার্মানির দিকে এখনও লোকালয় দিয়ে একঝাঁক কাক উড়ে গেলে মান্ষুজন মনে করে মহামারি বা রোগ, অসুস্থতার ইঙ্গিত। একটা কাক যদি কোনও একটা বাড়ির উপর দিয়ে তিনবার উড়ে যায় বা ডাকে, ধরে নেওয়া হয় ঐ বাড়িতে মৃত্যু আসন্ন। একদম ভোরে কোনও পাখি গান গাওয়ার আগে যদি কাক ডেকে ওঠে, ধরে নেওয়া হয় বৃষ্টি হবে। এই অঞ্চলে এখনও কিছু ট্রাইবে একটা ব্যাপার চালু আছে, কাক যদিও অশুভ ইঙ্গিত কিন্তু কেউ যদি অজান্তেও একটা কাক মেরে ফেলে, তাকে সেই কাকের সৎকার করতে হবে এবং সৎকার করার সময় অবশ্যই কালো কাপড় পরতে হবে।

৪.

কাক মিথোলজি নিয়ে যে কয়েকটা বই পড়ার অভিজ্ঞতা হলো সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বইটার নাম জধাবহংড়হম—অ হধঃঁৎধষ ধহফ ভধনঁষড়ঁং যরংঃড়ৎু ড়ভ ৎধাবহং ধহফ পৎড়ংি নু ঋবযবৎ-ঊষংঃড়হ, ঈধঃযবৎরহব. ২০০৫ সালে পেঙ্গুইন থেকে প্রকাশিত। কাক যে শুধু অশুভরই প্রতীক এমনটা না, অনেক মিথ আর অঞ্চলে কাক প্রফেসির বার্তা বহন করে। বহন করে মানুষের জন্য শুভ বার্তা। কাক শুভ না অশুভ এটা ডিপেন্ড করে কাকের সংখ্যা কয়টা তার উপর এমন মিথও আছে। যেমন অনেক অঞ্চলেই এক কাক দেখাকে বিপদ আর দুই কাককে শুভ ইঙ্গিত মনে করা হয়। বাংলাদেশে যে জায়গা দখল করে আছে শালিক পাখি!

৫.

‘কার্নিশে করুণ কাক দেখলেই মনে হয় মা

জন্ম জন্মান্তরে আমি তারই ছা।’

রণজিৎ দাশের কবিতার লাইন। এই কবিতার লাইনের সঙ্গে আমার পরিচয় বছর দুয়েক আগে। করোনা, টাইফয়েডে যখন আমি একমাস ঘরবন্দি। আম্মা ছাড়া আমার কাছে কেউ তখন ঘেষতো না। আর তখনও কাক ডেকে উঠলে আমার মা কেঁদে কেঁদে জায়নামাজ ভাসিয়ে ফেলতেন চোখের জলে। আম্মা যখন আমার পাশে থাকত না তখন আমি ঘুমাতাম। ঘুম না ধরলে কবিতা। কবিতা না ধরলে জানালা খুলে জবাফুলের দিকে চেয়ে থাকতাম।

এখনও জানালা খুলে দিলে চোখের সামনে ইলেকট্রিক খুঁটি বা তারে একটা কাকের বসে থাকা, ইতস্তত ওড়াওড়ি দেখলে শুধু কুরোসাওয়া, কিয়ারোস্তমি, ভ্যান গগ, রণজিৎ দাশকে মনে হয় না। মনে হয় বছর বিশেক আগের একটা গ্রাম। তারহীন। চিঠিযুগ। প্রকাণ্ড আম গাছের নিচে বসে আমার মা ছাই দিয়ে বাসন মাজছে, আমগাছের ডালে একটানা ডেকে যাচ্ছে একটা কাক। আর আমার মা যেন করুণ স্বরে বলতেছে যা! দূরে যারে কাক!

সুইসাইড

দেশের প্রথম সারির এক টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক সারাহ্ রাহ্নুমার আত্মহত্যায় সারা দেশ আবার নড়েচড়ে উঠছে। এর আগে তানভীর ফুয়াদ রুমির আত্মহত্যায় বাংলাদেশের শিল্পী সাহিত্যিকদের ভেতর একটা হালকা ধাক্কা লাগছিল। রুমি রুয়েটের ছাত্র ছিল। খুবই সম্ভাবনাময় একটা তরুণ। এত জানাশোনা, এত বোধবুদ্ধি, জীবন নিয়ে এত গভীর বোঝাপড়া থাকার পরও একজন মানুষ কীভাবে আত্মহত্যা করতে পারে সেটা কেউই বুঝছিল না। রুমির মৃত্যুর পর ৩টা বই প্রকাশ হয় ওর। ফেসবুকে ওর প্রফাইলে ঢুকে জানতে পারলাম। ফেসবুকে আমরা ফ্রেন্ড ছিলাম। কখনও কথা হয় নাই। ২১ জন মিউচুয়াল ফ্রেন্ড আমাদের। রকমারিতে গিয়ে রুমির ২টা বই থেকে একটু পড়লাম। এখনও ওর বন্ধুরা ওকে মনে করে। 

দুপুর ০৩:২৮ মিনিটে মুরাদ লেখে।

দুদিন ধরে একটা মিম পেজের স্টিল ফটো ঘুরতেছে আমার নিউজফিডে। ফিশবোল বা অ্যাকুয়ারিয়াম থেকে একটা মাছ লাফিয়ে পড়েছে বাইরে। একজন বলতেছেন মাছটা আসলে কমফোর্ট জোনের খোঁজে বাইরে লাফ দিয়েছে। কেউ বলতেছেন বোল বা অ্যাকুয়ারিমটাা ছিল মাছটার কাছে একটা লাইফটাইম ট্র্যাপ। তার মুক্তি দরকার ছিল, সুইসাইডই করেছে সে নিশ্চিত।

আমি অনেক দিন পর আবার জঁ পিয়েরে জুনেটের অ্যামিলি (অসবষরব) সিনেমাটার কিছু প্রিয় দৃশ্য রিওয়াইন্ড করে দেখলাম। কী নাম ছিল গোল্ডফিশটার ? খ্বু সম্ভবত ইষঁননবৎ বা এরকম একটা নাম।

দীর্ঘদিন একটা ফিশবোলের ভেতর আটকে পড়া একটা মাছ আসলে লাফিয়ে পড়ে আত্মাহুতি দেয় আসলে কিসের জন্য ? আসলেই কি আত্মাহুতি ? নাকি কমফোর্ট জোনের খোঁজ ? মুক্তির জন্য ? এইটা আমি ভেবেছি বহুদিন।

প্রথম যখন আমি পিংক ফ্লয়েডের সংস্পর্শে আসি তখন ডরংয ুড়ঁ বিৎব যবৎব গানটা দিনরাত বাজাতাম। তখনও সিড ব্যারেটের নাম জানতাম না। আমি গানটা বাজাতাম মূলত বিগত প্রেমিকাকে ভেবে।

ডব লঁংঃ ষড়ংঃ ঃড়ি ংড়ঁষং, ংরিসসরহম রহ ধ ভরংযনড়ষি ুবধৎ ধভঃবৎ ণবধৎ…. প্রচণ্ড প্রেমের একটা বিষণ্ন, দুঃখের গান হিসাবে বাজাতাম। পরে সিড ব্যারেট, এই গানের অরিজিন যখন জানলাম তখনও আমার ফিলিংস একই রকম ছিল।

আত্মহত্যাকে গ্লোরিফাই বা নিন্দা কোনওটাই করি না। খুবই সাংঘর্ষিক মনে হয় এই কথাকে ? ওয়েল, আত্মহত্যা কার কাছে পরাজয় আর কার কাছে মুক্তি এটা তো আমরা জানি না। ধরেন একজন প্রচণ্ড রকমের পরাজিত, ট্রমাটিক লোক শুধু মুক্তির জন্যই সুইসাইড করল, ব্যাপারটাকে আপনি কীভাবে দেখবেন ? জয় নাকি ব্যর্থতা ?

তবে আমি বাঁচার পক্ষেই বলব সদা। দুনিয়া, জিন্দেগি, যাপন এইসবরে যদি স্রেফ একটা ফিশবোল, অ্যাকুয়ারিয়াম বা বিরাট বড় ট্র্যাপ/ প্যারাডক্স মনে করি, তবু এই গোলকধাঁধার মধ্যেই ঘুরতে থাকাটারেই প্রেফার করব আমি। কমফোর্ট জোনের খোঁজে লাফ দিয়ে শেষে দেখা যাবে লিভিং জোনের বাইরে বের হলেই মৃত্যু।

আদতে যদিও একটা বোলবন্দি মাছ আর মানুষের মধ্যে ফারাক নাই বললেই চলে, কিন্তু মাছের মন তো মানুষের নেই, তাই লাফিয়ে পড়া মাছের ভাবনার ভেতর মানুষের ঢুকে পড়ার সুযোগ নেই। পুরনো একটা জেন গল্প মনে পড়ল আবার―

একদিন চুয়াংজু এবং তাঁর বন্ধু নদীর পাশ দিয়ে হাঁটছিলেন। নদীর পানির দিকে তাকিয়ে চুয়াংজু তাঁর বন্ধুকে বললেন, ‘দ্যাখো! দ্যাখো! সাঁতরানো মাছ দুটোকে দ্যাখো। তারা আসলেই এই সাঁতার কাটা ব্যাপারটা উপভোগ করছে।’

চুয়াংজুর বন্ধু বললেন, ‘তুমি তো মাছ নও। তাই তুমি আসলে ঘটনাটা জানো না, তারা সত্যিই ব্যাপারটা উপভোগ করছে কি না।’

চুয়াংজু বললেন, ‘তুমি তো চুয়াংজু নও। তাহলে তুমি কীভাবে জানো, আসলে মাছ দুটো ব্যাপারটা উপভোগ করছে কি না, এটা আমি জানি না।’

পারফেক্ট ডেইজ

ভাইগনার পরীক্ষা চলছে। রাতে আর সকালে ভালোভাবে পড়াতে হয়। সারাদিন ফ্রি। বিকালে শাফায়েত দাওয়াত দিয়েছে। শুধু মুরাদকে দাওয়াত দিল, নাকি আপা দুলাভাইসহ বোঝা গেল না। দুপুর থেকেই তাড়া দিচ্ছে। কিন্তু মুরাদ কী করবে এখনও ঠিক করে নাই। যাওয়ার কথাই বলছে। যাবে বলে মনে হয় না। যার সঙ্গে মুরাদের কথা বলতে ইচ্ছা করে সেখানে তৃতীয় কাউকে সহ্য হয় না। ভালো মন্দ যাই হোক। এইটা একটা বাজে দিক, মুরাদ জানে। কিন্তু হেল্পলেস। থাকে না কিছু সমস্যা, যেইটার সঙ্গেই মানুষ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তেমনই।

রাতে যাওয়ার কথা থাকলেও মুরাদ না করে দেয় শাফায়েতকে। ভাইগনার পরীক্ষার কথা বলে এড়িয়ে যায়।

সবাই ঘুমিয়ে গেলে মুরাদ লিখতে শুরু করে।

ঘুমের ভেতর একটা হলুদ পাখি হাওয়াইন গিটারের সুরে ডেকে ফুরুৎ করে উড়ে গিয়েছিল। আর ঘুম ভেঙ্গে দেখেছিলাম পাশের বাসার ছাদে ডালিমগাছে সত্যি সত্যি একটা হলুদ পাখি। গাছে কটা পাকা ডালিম। সুপক্ক লাল ডালিম দেখে আমার এক জেনগুরুর কথা মনে পড়েছিল। গুরুজির সঙ্গেও দেখা হয়েছিল স্বপ্নেই। গুরু রাত্রে স্বপ্নে দেখেছিলেন আয়না-দৃশ্যে ঝুলছে পাকা ফল। সকালবেলা শিষ্যদের বিদায় বলে গুরু হাঁটা ধরেছিলেন, যে গন্তব্য তিনি ছাড়া আর কেউ জানতো না।

মনে পড়েছিল শৈশবে তিস্তা বা ভরট দেশ থেকে হেমন্তের কালে এক বৃদ্ধ আসতেন গ্রামে। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। তিনি ছেলে-ছোকরাদের সঙ্গে কখনও গল্প করতেন না, তবু তাঁকে আমরা বলতাম রেডিও দাদু।

রেডিও দাদু আমাদের আঙিনায় জোড়া ডালিমগাছের নিচে এক সকালে বসেছিলেন। আমি আর আমার পিঠাপিঠি বোনটা দাদুর সঙ্গে বসে আছি। আম্মা রান্ধন ঘরের চালের বাতা ধরে করুণা করতেছিলেন আমার ৪ নম্বর ভাইটার জন্য। আমি তাকে ছোট ভাই বলতাম। ছোট ভাই কেন ? বড় ভাই, মেজো ভাই, সেজোভাই এর পর ছোট ভাই ছাড়া ডাকার আর কিছু ছিল না বলেই সে আমার ছোটভাই। ছোটভাইকে আমি শৈশবে অল্প কদিন দেখেছি। কারণ সে ছিল জিনে ধরা, নিশিরাতে বাড়ি ছেড়ে পালাতো। ব্যাটাছেলেকে কি জিন ধরে ? তাকে মনে হয় পরিতে পেয়েছিল। হয়তো সেই আশ্চর্য সুন্দর পরিটা তারে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যেত। ছোটভাইকে যদি পরিই ধরত তাহলে তার দুঃখ কিসের ছিল ? ও বাড়ি ছেড়ে নিরুদ্দেশ হওয়ার পর আব্বা একটা টিনের তোরঙ্গে তার হাইস্কুলের বইগুলো তালাবদ্ধ করে রেখেছিল। আম্মা তোরঙ্গ খুলে সেইগুলো নেড়েচেড়ে দেখতেন, যেন তার জিন/পরি ধরা ছেলেটারে নেড়েচেড়ে দেখছেন। আমি তখনও স্কুল যাওয়া শুরু করিনি। আম্মা আমার কাছে একটা বিরাট বড় স্কুল ছিলেন। আমি বাংলা, ইংরেজি পড়তে আর লিখতে পারতাম। ছোটভাই’র সেভেন ক্লাসের বাংলা বইটার খসখসে সিমেন্ট বস্তার পেপার মলাটে নীল কালিতে এই লাইনটা পড়েছিলাম। লেখা ছিল, ‘নীড় হারা পাখি আমি।’ আমি সেভেন ক্লাসে উঠতে উঠতে বা বিটিভির সাদাকালো সিনেমা দেখে পরে বুঝতে পেরেছি আমার নিশিপাওয়া ভাইটা প্রায় স্কুল ফাঁকি দিয়ে সিনেমা হলে যেত। স্কুল পালানোর শাস্তি হিসাবে দুলাল স্যার তারে পেটাতো আচ্ছাছে। আর এক তরফা বাড়ি ফিরে সে আব্বার পিটুনি খেতো।

আবারও ডালিমগাছের নিচে। ছোটভাই দিন, মাস এভাবে একসময় বছরের পর বছর নিরুদ্দেশ। তার কোনও খোঁজ নাই। আম্মা শুধু কানতেন। পোস্টম্যান গ্রামে ঢুকলে আম্মা, আব্বা দুজনই অস্থির হতেন। কিন্তু কোনও জিন, পরির দেশ থেকে চিঠি আসত না। আম্মা তখন তার ছেলেরে পাওয়ার জন্য দুনিয়ার সকল তুকতাকে বিশ্বাস করা শুরু করলেন। তো ঐরকম এক সকালে যেদিন আমি আর আমার বোন রেডিও দাদুর সঙ্গে বসে আছি, আম্মা রান্ধনঘরের দরজায় চালের বাতা ধরে আমাদের দিকে চেয়ে আছেন। দাদু দুইটা ছোট কাগজ নিয়া অদ্ভুত একটা খেলা শুরু করলেন। দাদু আম্মাকে বলেছিলেন দুইটা কাগজের টুকরায় তিনি আছে এবং নাই শব্দ দুইটা লিখে একটা কৌটায় রেখে নাড়াচাড়া করে মাটিতে ফেলবেন। আমরা ভাই বোন দুজন দুটা কাগজ তুলব। আমার হাতে যে কাগজটা আসবে, সেটাতে যা লেখা থাকবে আমার ভাইয়ার কপালে তাই ঘটে থাকবে। যদি আছে লেখা কাগজটা তুলি তবে সে বেঁচে আছে কোথাও, আর নাই লেখা কাগজটা উঠলে সে আর বেঁচে নাই। দাদু যখন স্টারশিপ কনডেন্সড দুধের পুরান কৌটার ভেতর কাগজের টুকরা দুটো রেখে ঝাঁকাচ্ছিলেন আমার কাছে মনে হচ্ছিলো ভরট বা তিস্তা দেশটাও একটা জাদুর দেশ। সে দেশ থেকে এক সাদা দাড়িওয়ালা জাদুকর একটা জাদুর কৌটার ভেতর থেকে জাদু বের করবেন। যে জাদু বলে দেবে আমার ছোটভাই বেঁচে আছে কি নাই। দাদু কৌটা ঝাঁকিয়ে কাগজ ফেললেন। আমি একটা টুকরা তুলে খুললাম। দাদু বললেন, জোরছে পড়! আমি বললাম, আছে! দাদু আম্মার দিকে তাকিয়ে বললেন, বেঁচে আছে!

আমি যখন ১৪ বছরের কিশোর তখন একদিন বাড়িতে তুমুল আনন্দ আর হৈচৈ, আমার ছোটভাই ফিরে এসেছে বাড়ি। মাঝখানে কেটে গেছে ৯ বছরের মতো।

রেডিও দাদু যতদিন বেঁচেছিলেন, সুস্থ ছিলেন গ্রামে আসতেন। আমি ততদিনে জেনে গেছি তিস্তা নদীতে চর পড়লে সে এলাকাটাকে ভরট, ভট্ট বলে। সেটা রূপকথার, জাদুর কোনও দেশ না। দাদুকে এক হেমন্তে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি সত্যিই জানতেন কি না আমার ছোটভাই সত্যিই বেঁচেবর্তে ছিল কোথাও, কাগজে যে আছে লেখা উঠেছিল। দাদু আমার পিঠে আলতো আদুরে একটা চাপ দিয়ে বলেছিল, দুইটা কাগজেই ‘আছে’ লিখেছিলাম রে বোকা, কারণ তোর মা-ও বেঁচে ছিল তখন সেই ‘আছে’ লেখা কাগজটুকুর জন্যই!

ছুটির দিন

বিয়ে খেতে গতকাল গ্রামে গেছে আপা দুলাভাই। রংপুর থেকে পরশু ফিরছে মুরাদ। শাফায়েতের বই দুইটা ফেরত দিয়েছে আজ। আগের দুর্ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চাইল যদিও। আড্ডাও হলো কিছুক্ষণ। শাফায়েত প্রায় বউ নিয়ে বনানী হাট করতে যায়। মুরাদের হাটে যেতে ইচ্ছা করে। পরে যদি বনানি যায় তাহলে যেন মুরাদকে জানায় শাফায়েত। বনানীতে নাকি ভালো জিলাপি পাওয়া যায়। তাছাড়া শাফায়েত বইয়ের রয়ালিটির টাকা পেয়েছে। ট্রিট তো বনতা হি হ্যায়। আজ রাতে মুরাদ শাফায়েতকে দাওয়াত দিল খিচুরির। শাফায়েত থাকবে না এতক্ষণ। আগের বসের বদমেজাজি নিয়া কী একটা উদাহরণ দিতে গিয়ে বলল, ধরেন আপনাকে আর কতক্ষণ সহ্য করতে হবে, সেইটাও একটা ব্যাপার। অপমানিত বোধ করে মুরাদ। কিন্তু কিছু বলে না। তবে আড্ডা আর দীর্ঘ হয় না।

শাফায়েত চলে যাওয়ার পর মুরাদ ভাবে কেন বারবার অপমান সহ্য করছে এই হারামজাদাটার কাছে। সহজেই উত্তর পায়। এই একজন মানুষই আপাতত হাতের কাছে যার সঙ্গে আড্ডা দেওয়া যায়। একসময় কত বন্ধুবান্ধব ছিল মুরাদের। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে কাজ করার দিনগুলিতে সারাদিন হইহুল্লোড় করে কাটত। রংপুর সিলেটের দিনগুলিতে কী জীবনটাই না কেটেছে। কিন্তু বগুড়ায় একেবারেই নিসঃঙ্গ মুরাদ। যদিও একাকী জীবন সে উপভোগ করে। রং রস নিঙড়ে দেখা যায় জীবনের।

রাতে খিচুরি খেয়ে শুয়ে পড়ে মুরাদ। খাওয়ার পরপরই শুতে হয় না। মিনিমাম আধাঘণ্টা। কিন্তু শুয়ে পড়ে সে। লিখতে ইচ্ছা করছে। শুয়ে শুয়ে আরেকটা পোস্ট দেয়।

দুধকুসি (চিচিঙ্গা), আলু, টমেটো, পেঁপে, পুঁইশাক, ডিম, মসুর ডাল, চাল হালকা মশলাসমেত মাখাইলাম। মশলা বলতে হলুদ, গরম মশলার পাউডার, জিরা। দুটো তেজপাতা।

খিচুরি রান্নার নিমিত্তে এই সমস্ত হালকা তেল ছড়িয়ে কুকারে চাপিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। ধনেপাতা ছড়িয়ে দিলাম কিছু।

পেঁপে, পুঁইশাক, ধনেপাতা নিজের চাষ করা যেহেতু অদ্ভুত আনন্দ কাজ করতেছে।

কমলা থাকলে এক্সপেরিমেন্ট করতাম। মসুর ডাল আর আলুভাজি কমলা খোসাসহ রান্না করা শিখেছিলাম সিলেটে। সিলেটি রান্না যদি মিস করি তাহলে দুইটা, একটা হচ্ছে সাতকড়ার স্লাইস দিয়ে গোমাংস, আরেকটা কমলাখোসাসহ মসুরডাল/ভাজি।

একটা কমলা কিনতে পাওয়া যাবে না মনে হয়। যদিও আমার দরকার মূলত কমলার খোসা। কমলার বিকল্প হিসাবে টবে লাগানো মাল্টাগাছ থেকে দুটো কচি মাল্টা আর দুটো কচি পাতা ছড়িয়ে দিলাম। যে ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে সেটার তুলনা চলে শুধু জীবনানন্দের আট বছর আগের একদিনের সঙ্গে।

ডিশ সংযোগ কেটে দিলাম। আই লাভ ক্রিকেট। যদিও এই সাবকন্টিনেন্টে মাঠের বাইরে ক্রিকেটের যে চরিত্র সেটাকে মোস্টলি ঘেন্নাই করি। আজ ক্রিকেট দেখে উত্তেজিত হতে চাই না। কোনও ক্রিকেটারের আগ্রাসী এক্সপ্রেশন আর গ্যালারিতে দুদলের মুখোমুখি দর্শকের উত্তেজনা দেখে মন খারাপ করতে চাই না।

খিচুরি খেয়ে কিছুক্ষণ ঘরের দরজার সামনে বসে থাকবো। সুন্দর ব্যাপার আমার ঘরের দরজার সঙ্গে একটা পাকুড় গাছ, ঘরটা পাকুড়গাছের নিচে। দরজার সঙ্গেই পার্কের সিমেন্টে বাঁধানো বেঞ্চের মতো একটা পাটাতন।

একবার ভাবেন তো, কমলার ঘ্রাণমাখা খিচুরি খেয়ে বসে আছেন ঘরের সামনে। মাথার উপরে পাকুড়গাছ তার ডালপাতা দোলাচ্ছে। আর পাতার ফাঁক গলে চুঁইয়ে পড়ছে জ্যোৎস্না!

প্রেফার দ্য প্রেজেন্ট মুরাদ নীল। রান্ধো নীল, বাঁচো নীল। প্রয়োজনে মগজটাকে করে নাও বুলেটপ্রুফ।

শাফায়েতের দুঃখ

৩০ মে, ২০২৩

ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পারলাম মুরাদ আত্মহত্যা করছে। ও যে বাসায় থাকত সে বাসায় গেলাম জবাকে সঙ্গে করে নিয়ে। রাত সাড়ে ১১টা বাজে তখন।

যেতে যেতে ভাবলাম, যখন যাওয়ার দরকার ছিল তখন গেলে হয়তো বেচারা আরও কিছু দিন পরে চলে যাইতো!

গিয়ে দেখি সুনসান। মেইন গেইটে তালা দেওয়া। সবই আগের মতো। সবাই হয়তো ঘুমাচ্ছে।

মুরাদ নীল যে বাসায় থাকত সেই বাসার সবগুলো লাইট জ্বালানো।

মুরাদ এই দেশ নিয়ে চিন্তা করত। এবং হতাশ হইত। এই দেশের নষ্ট রাজনীতিবিদের অকথ্য ভাষায় গালাগালি করত। আমি সেইটা পছন্দ করতাম।

শেষ যেদিন দেখা হলো, মুরাদ নিজ হাতে চা বানায়া খাওয়াইলো। আমাদের আড্ডায় ঘুরেফিরে আসত রাজনীতি সাহিত্য সিনেমা ধর্ম দর্শন। অনেক কথা হলো। কিংবা হলোই না কথা।

এ দেশে লিখে ভাত পাওয়া যায় না বলে মুরাদ দুঃখ করত। সাহিত্যিকদের নোংরা রাজনীতি নিয়ে খুব মন খারাপ করত। কত কথা।

মুরাদ বলত, নীল তিমির কথা বলত। বলত, নীল তিমিদের কখনও স্বাভাবিক মৃত্যু হয় না। তিমি প্রচণ্ড অনুভূতিসম্পন্ন প্রাণি। সেই কথা নিয়া আর ভাবি নাই অত। ভাবা উচিত ছিল।

একবার বলছিল, মরণোত্তর দেহদানের কথা। ধর্মে মুরাদের বিশ্বাস ছিল না। এলাকার সবাই ওকে নাস্তিক হিসাবেই চেনে। একবার কয়েকজন মিলে আটকাইছিলও। তাই ওর লাশ দাফনে সমস্যা হইতে পারে।

আত্মহত্যার ভাবনা আছে কি না জিগাইলে বলছিল, আরে না। আমি বেঁচে থাকার পক্ষে। কোনও অবস্থাতেই আত্মহত্যা না। মুরাদকে বিশ্বাস করা ঠিক হয় নাই। মুরাদ বিশ্বাসের যোগ্য ছিল না!

২/৩ টা বিষয় নিয়ে আমাদের ভেতর দ্বন্দ্ব ছিল। তবু মুরাদ নক দিত। আমি নক দিতাম। একদিন দাওয়াত দিলাম। আসার কথা ছিল। রান্নাবান্না করে ফোন দিলাম। বলল ভাগনের পরীক্ষা আজ যেতে পারব না ভাই।

গত মঙ্গলবারে নক দিল মুরাদ। ভাই চলেন বনানী হাটে যাই। জিলাপি খেতে চাইছিল হয়তো। বই বিক্রির টাকা পাইছি মর্মে পোস্ট দিছিলাম একটা, সেখানে কমেন্ট করছিল জিলাপি খাওয়া নিয়া। আমি বললাম আজ তো হাট না। সোমবার আর শুক্রবার বনানী হাট।

ভাবলাম হাতে টাকা হলে মুরাদকে সঙ্গে নিয়ে হাটে যাব। কিন্তু মুরাদ আর হাটে যাবে না। সে যাবে কবরে।  আজ তো হাট না। আজ মঙ্গলবার। আমি হাট করে আসছি গতকাল। মুরাদকে সঙ্গে নিই নাই। টাকা ছিল না ? ছিল। মনে ছিল না ?  ছিল। অর্ধেক রাস্তায় গিয়ে মনে পড়ল। ভাবলাম কল দিই। আবার ভাবলাম কল দিলে কী না কী মনে করে! বের হয়ে তারপর কল দিলে পছন্দ করবে ?

এইসব না ভেবে কি কলটা আমার দেওয়া উচিত ছিল না ? ছিল। দেওয়া হয় নাই।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button