
বিশেষ সম্পাদকীয়
দ্বাদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা ফেব্রুয়ারি ২০২৫
শব্দঝড় উড়িয়েছে ধূমকেতুর দ্রোহী পতাকা
শ্রাবণ মাসের ২৬ তারিখ, ১৩২৯ বঙ্গাব্দ (১৯২২ সালের ১১ আগস্ট) প্রথম প্রকাশিত হয়ে সর্বপ্রথম ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতা দাবি করে নজরুলের ধূমকেতু।
সপ্তাহের দুই দিন শুক্রবার ও মঙ্গলবার, প্রকাশকাল থেকে ভারতবর্ষে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল নজরুল-সম্পাদিত পত্রিকাটি। সম্পাদক হিসেবে নয়, নিজেকে ধূমকেতুর সারথী হিসেবে পরিচয় দিতেন তিনি।
সর্বশেষ সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালের ২৭ জানুয়ারি। প্রকাশের শত বছর পেরিয়ে গেলেও স্বল্পকাল স্থায়ী এই পত্রিকা ওই সময় অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো আবির্ভুত হয়। অমঙ্গলনাশক হিসেবে সর্বযুগের অসচেতন-অর্ধচেতন মানুষের জন্য পত্রিকাটি অগ্নিসেতু রূপে সংযোগ স্থাপন করেছে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের এবং বর্তমানের সঙ্গে ভবিষ্যতের। প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দেশবাসীকে স্বাধীনতা ও মানবতার বিপ্লবী ডাকে উজ্জীবিত করা।
ধূমকেতু পত্রিকার ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯২২ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় দুঃশাসনবিরোধী নজরুলের রাজনৈতিক কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’। ব্রিটিশ মসনদের ভিত কেঁপে ওঠে তখন। বিপ্লবের গণজোয়ারে ঢেউ ছড়িয়ে যায় সমগ্র ভারতবর্ষে। সংখ্যাটি নিষিদ্ধ করা হয়।
২৩ নভেম্বর তাঁর যুগবাণী প্রবন্ধগ্রন্থও বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং একই দিনে তাঁকে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। কারারুদ্ধ অবস্থায় নজরুল আদালতে জবানবন্দি প্রদান করেন যা কেবল জবানবন্দি নয়, সাহিত্যমূল্যেও অনন্য এক নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত।
অভিযুক্ত রাজবিদ্রোহী হিসেবে তিনি বলেন,…‘আজ ভারত পরাধীন। তার অধিবাসীবৃন্দ দাস। এটা নির্জলা সত্য। কিন্তু দাসকে দাস বললে, অন্যায়কে অন্যায় বললে এ রাজত্বে তা হবে রাজদ্রোহ। এ তো ন্যায়ের শাসন হতে পারে না। এই যে জোর করে সত্যকে মিথ্যা, অন্যায়কে ন্যায়, দিনকে রাত বলানো―এ কি সত্য সহ্য করতে পারে? এ শাসন কি চিরস্থায়ী হতে পারে? এতদিন হয়েছিল, হয়তো সত্য উদাসীন ছিল বলে। কিন্তু আজ সত্য জেগেছে, তা চক্ষুষ্মান জাগ্রত-আত্মা মাত্রই বিশেষরূপে জানতে পেরেছে। এই অন্যায়-শাসন-ক্লিষ্ট বন্দি সত্যের পীড়িত ক্রন্দন আমার কণ্ঠে ফুটে উঠেছিল বলেই কি আমি রাজদ্রোহী? এ ক্রন্দন কি একা আমার? না―এ আমার কণ্ঠে ঐ উৎপীড়িত নিখিল-নীরব ক্রন্দসীর সম্মিলিত সরব প্রকাশ? আমি জানি, আমার কণ্ঠের ঐ প্রলয়-হুঙ্কার একা আমার নয়, সে যে নিখিল আত্মার যন্ত্রণা-চিৎকার। আমায় ভয় দেখিয়ে মেরে এ ক্রন্দন থামানো যাবে না। হঠাৎ কখন আমার কণ্ঠের এই হারাবাণীই তাদের আরেক জনের কণ্ঠে গর্জন করে উঠবে।’*
নজরুলের বয়ানের ভেতর থেকে মনস্তাত্ত্বিক প্রজ্ঞার অন্য আলোও আমরা দেখতে পাই অনুসন্ধিৎসু পাঠক হিসেবে। তিনি বলতে পেরেছেন, ‘আজ ভারত পরাধীন না হয়ে যদি ইংল্যান্ডই ভারতের অধীন হতো এবং নিরস্ত্রীকৃত উৎপীড়িত ইংল্যান্ড-অধিবাসীবৃন্দ স্বীয় জন্মভূমি উদ্ধার করবার জন্য বর্তমান ভারতবাসীর মতো অধীর হয়ে উঠত, আর ঠিক সেই সময় আমি হতুম এমনি বিচারক এবং আমার মতোই রাজদ্রোহ অপরাধে ধৃত হয়ে এই বিচারক আমার সম্মুখে বিচারার্থে নীত হতেন, তাহলে সে সময় এই বিচারক আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যা বলতেন, আমিও তাই এবং তেমনি করেই বলছি।’*
বিচারককে তিনি আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে প্রকৃত বিচার কাজ পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছিলেন। যে কোনও সংকট মোকাবেলায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মনোচিকিৎসাবিদ্যায় ক্লায়েন্টের কগনিশন বা অবহিতি কিংবা বুদ্ধিভিত্তিক অনুষদের দরজা খুলে দেওয়ার জন্য এ ধরনের কৌশল ব্যবহার করা হয়। যথাযথ বিচার-বিশ্লেষণ ও যুক্তি প্রয়োগ করার ক্ষমতা তখন বেড়ে যায়। এভাবে সঠিক বিচার করে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিজে গ্রহণ করতে পারে সমস্যার জটে জড়িয়ে থাকা ব্যক্তি। নজরুল আপন প্রজ্ঞার ভেতর থেকে রাজবন্দি হয়েও প্রবল সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন, স্বতঃস্ফূর্তভাবে মনস্তাত্ত্বিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন নিজের জীবনের বোধ থেকে।
নজরুলের ধূমকেতু এ পত্রিকার সম্পাদকের শৈশবে একটি সাহিত্য পত্রিকা সৃষ্টির গোপন প্রণোদনার বীজও বপন করে দিয়েছিল। সংখ্যাটি নিয়ে বিশেষ আয়োজন করতে পেরে আমরা গর্বিত। দেশ-বিদেশের নজরুল বিশারদ কয়েকজন বোদ্ধা লেখক-গবেষকের অনন্য আলোচনায় ঋদ্ধ হয়েছে সংগ্রহে রাখার মতো সংখ্যাটি। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
*(সূত্র: নজরুল সমগ্র, ত্রয়োদশ খণ্ড, প্রকাশক নজরুল ইনস্টিটিউট, প্রথম সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি ২০২১, পৃষ্ঠা : ৫৫-৫৬)
শব্দঘর-এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা, মতামত, বিশ্লেষণ, মতাদর্শ বা দৃষ্টিভঙ্গি লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব




