আর্কাইভপ্রচ্ছদ রচনা

ধূমকেতুর সারথী : বিনোদ ঘোষাল

প্রচ্ছদ রচনা : নজরুলের ধূমকেতু আঁধারে অগ্নিসেতু

(কথামুখ―বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ধূমকেতু পত্রিকা পরাধীন ভারতবর্ষে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে তুলেছিল। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ওই সময়কার প্রায় সকল কবি-সাহিত্যিক সাংবাদিক গুণীজন স্বাগত জানিয়েছিলেন এই পত্রিকাকে। নজরুল নিজে এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। যদিও তিনি নিজেকে সম্পাদক বলতেন না, বলতেন সারথী। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকার লেখাগুলি ব্রিটিশ সরকারের রাতের ঘুম ছুটিয়ে দিয়েছিল। এই পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়েছিল নজরুলের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি, যার জন্য ব্রিটিশ সরকার কবিকে গ্রেফতার করে এবং কবির এক বছরের কারাদণ্ড হয়। ভারতবর্ষের সংবাদপত্রের ইতিহাসে তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ধূমকেতু পত্রিকার গুরুত্ব অপরিসীম। ধূমকেতু পত্রিকার পরিকল্পনা, তার প্রকাশ এবং শেষ পর্যন্ত নজরুলের গ্রেফতারি―এই সময়টুকুকে কাহিনির মাধ্যমে এই লেখাটিতে তুলে ধরার প্রয়াস।)

নজরুল মুজফ্ফর আহমদকে বলল, কিছু একটা করতে হবে আহমদ সাহেব। আর চুপ করে বসে থাকা চলবে না। সময় চলে যাচ্ছে। নবযুগ, সেবক ঢের হলো, নিজের কথা বলা হচ্ছে না। এমন একটা কাগজ দরকার যেখানে নিজের কথা বলতে পারব।

তো, কী ভাবছেন ? জিজ্ঞাসা করলেন মুজফ্ফর।

অনেকটাই ভেবেছি। আজ ভালো সময়েই এসেছেন আপনি। একজনের আসার কথা। তিনি একটা কাগজ করার জন্য টাকা দেবেন বলেছেন। আমি চাই আপনিও সঙ্গে থাকুন আমার।

বাহ! সে তো খুব ভালো কথা। কে তিনি ?

হাফিজ মাসউদ আহমদ। আপনাকে চেনে। আপনিও চেনেন তাকে।

হাফিজ মাসউদ… নামটা ভালোভাবেই জানা মুজফ্ফরের। দিন পনেরো আগে পরিচয় হয়েছিল ভদ্রলোকের সঙ্গে। চট্টগ্রামে বাড়ি। দেওবন্দ মাদ্রাসায় পড়াশোনা করতেন। উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুর জেলায় দেওবন্দ মাদ্রাসায় ধর্মের ভিত্তিতে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী গড়ে তোলার কাজ চলে, সে কথা জানেন মুজফ্ফর। লোকটি সেই ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ। মাসউদ লোকটির কুরআন পুরো মুখস্ত ছিল বলে তার নামের আগে হাফিজ যুক্ত হয়েছিল। তাকে বেশ কয়েকবার বিভিন্ন জায়গায় দেখেছিলেন মুজফ্ফর। কিন্তু মাসউদ নিজে বাঙালি হয়ে অন্য বাঙালিদের সঙ্গে উর্দুতে কথা বলছেন দেখে তাকে বিশেষ পছন্দ করেননি। তো যাই হোক, একদিন বিকেলে মুজফ্ফর ধর্মতলা স্ট্রিটের ফুটপাথে দাঁড়িয়েছিলেন, হঠাৎই সেই মাসউদ আহমদ কোথা থেকে উদয় হয়ে মুজফ্ফরের সঙ্গে খাস চাটগাঁর বুলিতে গল্পগাছা শুরু করে দিলেন। প্রাথমিক পরিচয়টি সারার পরই মাসউদ বলেছিলেন, আপনি তো ফজলুল হক সাহেবের নজরুলের কাগজটির সম্পাদনা এবং ম্যানেজারি করেন সে খবর আমি জানি, আপনাকে আমি আসলে একটি বিশেষ কারণে খুঁজছিলাম, ভালোই হলো এখানে দেখা হয়ে গেল, আসলে আমি একটা কাগজ বার করতে চাইছি, পুরো পলিটিকাল কাগজ হবে। খলিফা ওমর যে সোশালিজমের খানিকটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন সেটার প্রসঙ্গও তুলেছিলেন। মুজফ্ফর সব শুনে বললেন, সবই তো বুঝলাম কিন্তু টাকা ?

উনি বললেন, আমার কাছে আড়াইশো টাকা রয়েছে।

মাত্র আড়াইশ টাকায় কাগজ হয় নাকি ? মুজফ্ফর সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছিলেন। সেই মাসউদ আসছেন নজরুলের সঙ্গে দেখা করতে। মানে হিসেবটা এবার স্পষ্ট।

মুজফ্ফর বললেন, হ্যাঁ চিনেছি। লোকটি আমার কাছেও এসেছিলেন। কাগজ করার ব্যাপারে। কিন্তু মাত্র আড়াইশো টাকা পুঁজি। ওতে কি আর কাগজ হয় ?

কথার মাঝেই মাসউদ উপস্থিত। ঘরে মুজফ্ফরকে দেখে মাসউদ একটু অস্বস্তি বোধ করলেন, কিন্তু নজরুল পরিবেশটা হাল্কা করে দিল। চা নিয়ে ঢুকল নজরুলের ভাবশিষ্য শান্তিপদ। সেও মাসউদকে দেখে চিনতে পারল। এই দিন দশেক আগের ঘটনা। তখনও নজরুল সেবকে কাজ করে। একদিন কাজ সেরে নজরুল আর শান্তি সেবক থেকে ফিরছে। মাসউদ সাহেব এসে পরিচয় করলেন নজরুলের সঙ্গে। দুই-চার কথার পরেই কাগজ করার প্রস্তাব। তিনি যে আগে মুজফ্ফর সাহেবের কাছে গিয়েছিলেন সেই কথা ঘুণাক্ষরেও বললেন না। মাসউদ বললেন কাজী সাহেব আমি আপনার ব্যাপারে সবই জানি, কাগজের সব দায়িত্ব আপনারই। আমি শুধু টাকা দেব ব্যস, বাকি সব সিদ্ধান্ত আপনার।

নজরুল এমনিও তখন সেবকে কাজ করে ক্লান্ত, কোনও চাকরিতেই পুর্ণ স্বাধীনতা থাকে না, নিজের সব কথা বলা যায় না। ফলে হাঁফিয়ে উঠছিল। তাই এমন একটা প্রস্তাব পেয়ে ও বেশ নড়েচড়ে উঠেছিল। মাসউদ সাহেব শিয়ালদা পর্যন্ত গিয়ে আদাব আরজ করে ফিরে গেলেন, তবে সেদিনই নজরুলের কাছ থেকে কথা আদায় করে নিয়েছিলেন যে কাগজ হবে। এবং মাসউদ নজরুলকেও ওই আড়াইশো টাকা দিতে পারবেন বলেছিলেন। নজরুল তাতেই রাজি।

মাসউদ ফিরে যাওয়ার পর শান্তিপদ বলেছিল, এটা কী হলো! তুমি মাত্র আড়াইশো টাকায় কাগজ করতে রাজি হয়ে গেলে! এত কম টাকায় কাগজ হয় ?

আরে শুনলি না, এখন আড়াইশো দেবে বলছে পরে প্রয়োজন হলে আরও দেবে।

আর যদি পরে না দেয়, তখন কী করবে ?

কুছ পরোয়া নেহি, ওই আড়াইশো টাকায় গোটা দুই সংখ্যা বেরিয়ে গেলে তারপর আর চিন্তা করতে হবে না, গ্রাহক আর বিজ্ঞাপনের টাকাতেই কাগজ চলবে।

শান্তি আর কথা বাড়ায়নি, বুঝে গিয়েছিল নজরুলের মাথায় একবার ঢুকেছে মানে করেই ছাড়বে।

মাসউদকে ঘরে আসতে দেখে দে গরুর গা ধুইয়ে বলে হৈ হৈ করে উঠল নজরুল―বসুন মাসউদ সাহেব, আপনার সঙ্গে তো এদের দুইজনের পরিচয় রয়েছেই, সুতরাং চলুন চা খেতে খেতে কাজের কথা শুরু করা যাক।

শুরু হয়ে গেল মিটিং। নজরুল প্রথমেই ঘোষণা করল কাগজের নাম হবে ধূমকেতু।

শুনে শান্তিপদ মুচকি হাসল। ও জানে এই নাম নজরুলের অনেক দিন ধরে মাথায় জমানো, সেই যখন ৩/৪ সি, তালতলা লেনের ঠিকানায় মুজফ্ফর সাহেব কুতুবুদ্দিন সাহেবের সহযোগিতায় ন্যাশনাল জার্নালস নামে একটা অফিস করেছিলেন, তখন থেকেই নজরুলের মাথায় ধূমকেতু নামটা গেঁথে গিয়েছিল। মুজফ্ফরকেও অনেকবার নজরুল বলেছে―বুঝলেন আহমদ সাহেব, যদি কখনও নিজের একটা কাগজ করার সুযোগ মেলে তাহলে নাম দেব ধূমকেতু।

এমন নাম ভাবার কারণ জিজ্ঞাসা করেছিল শান্তি। ধূমকেতু নাম কেন ?

নজরুল উত্তর দিয়েছিল এই নাম আমি প্রথম দিচ্ছি না। আজ থেকে প্রায় উনিশ বছর আগেই একজন ধূমকেতু নামের একটি পত্রিকা করেছিলেন। তার প্রথম সংখ্যাটি আমি একদিন দেখেছিলাম। ভূমিকায় লেখা ছিল―‘উপপ্লবায় লোকানাং ধূমকেতুরিবোত্যিতঃ।’ শাস্ত্রকরেরা বলেছেন যে, ধূমকেতুর উদয়ে অমঙ্গল সূচিত হয়। পৃথিবী যখন পাপাচারে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে, পৃথিবীর সব জীব তখন অসার সুখে উন্মত্ত হয় এং অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়ে, তখন বিশ্বনিয়ন্তার রোষানলের কটাক্ষরূপে ধূমকেতুর আবির্ভাব হয়। এবং প্রলয় বা বিপ্লবের কাল সমাগত―তার ইঙ্গিত দেয়। সেই জন্য ধূমকেতুর আবির্ভাব অশুভ হলেও তার পরিণাম মঙ্গলপ্রদ। ভারতবর্ষ দীর্ঘকাল ধরে অন্ধকারে ডুবে রয়েছে, বিপ্লবের সময়কাল এবার উপস্থিত। তারই সূচনা করবে ধূমকেতু।

মুগ্ধ হয়েছিল শান্তিপদ। বুঝেছিল নজরুলকে আপাতদৃষ্টিতে খামখেয়ালি, হুজুগে মনে হলেও তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের আড়ালে গভীর ভাবনা থাকে।  

সবকিছু ঠিক হয়ে গেল। সপ্তাহে দুই দিন বেরোবে ধূমকেতু, ছাপা হবে মনি ঘোষের মেটকাফ প্রেসে। অফিস হবে ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিট, মুদ্রাকর এবং প্রকাশক দুইজনেই হবেন আফজল উল হক। কাগজের মাপ ক্রাউন সাইজের, মানে ১৫X১০ এবং আট পৃষ্ঠার। দাম ঠিক হলো প্রতি সংখ্যা এক আনা। বার্ষিক পাঁচ টাকা। কাগজের সারথী বা সম্পাদক হবে নজরুল আর ম্যানেজার হবে শান্তিপদ। এত বড় দায়িত্ব পেয়ে শান্তিপদ গদগদ।

মুজফ্ফর বললেন, কাগজের একটা বিজ্ঞাপন তো দিতে হয়।

হ্যাঁ, সে তো দিতেই হবে। আমি ভেবেছি প্রথম বিজ্ঞাপনটা যাবে আনন্দবাজার পত্রিকায়। বিজ্ঞাপনের বয়ানও আমি ঠিক করে ফেলেছি, পত্রিকা প্রকাশ পেতে চলেছে এই কথা লেখা থাকবে না, শুধু একটা কৌতূহল সৃষ্টিকারী লাইন থাকবে।

কী লাইন সেটা ? জিজ্ঞাসা করলেন মাসউদ।

নজরুল বলল,

‘শীঘ্রই প্রলয়ংকর

ধূমকেতু দেখা দিবে

হুঁশিয়ার হউন।’

তা বেশ। এবার তাহলে শুরু করে দিন।

মুজফ্ফর চুপ করে শুনছিলেন, সবই ঠিক হলো কিন্তু টাকার কথা একবারও মাসউদ সাহেব উল্লেখ করছেন না, নজরুলও কিছু বলছে না দেখে তিনি নিজেই বললেন, সবই তো ঠিক হলো, এবার টাকা-পয়সার কথাটাও হয়ে যাক। শুরু করতে কিছু টাকা তো লাগবে।

সে তো বটেই। আমি আড়াইশো টাকা জোগাড় করেছি, আশা করি পরে আরও জোগাড় করতে পারব, তবে আজ সঙ্গে কিছু নেই। আগামীকাল এসে একশো টাকা আপাতত দিয়ে যাব। শুরু করুন, বাকিটাও কয়েক দিনের মধ্যে দিয়ে দিচ্ছি।

নজরুল হই হই করে বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ আপাতত একশোতেই হবে।’

বেশ তাহলে এই কথাই রইল। উঠলেন মাসউদ সাহেব।

নজরুল আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল, চালাও পানসি বেলঘরিয়া!

মাসউদ আহমদ কথামতো একশো টাকা পরদিন দিয়ে গেলেন। শুরু হয়ে গেল কাজ। আফজল গেলেন লালবাজারে পুলিশের হুকুমনামা আনতে, শান্তিপদ গেল বিজলী, আত্মশক্তির মতো আরও চার-পাঁচটা কাগজে বিজ্ঞাপন দিতে। বিপ্লবী নেতা ভূপতি মজুমদার তখন স্পোর্টসম্যান কাগজের সম্পাদক। তিনি অ্যাডভার্টাইজিং এজেন্সি নামের একটি বিজ্ঞাপন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিলেন, যত বিজ্ঞাপন তারাই তুলবে, বদলে কমিশন পাবে। সুবোধ মুখোপাধ্যায় নামের এক কাগজের এজেন্টের সঙ্গে রফা হলো তিনি কাগজ সাপ্লাই করবেন এবং একটি কাগজের দাম বাকি রাখবেন। মেটকাফ প্রেসের মালিকও প্রতিশ্রুতি দিলেন, তিনিও একটা সংখ্যা কাগজের দাম ফেলে রাখবেন, ফলে প্রথম সংখ্যা বেরোতে তেমন কোনও খরচই লাগবে না। কাগজ বেরোনোর তোড়জোড় চলতে লাগল পুরোদমে। চারু রায় ধূমকেতুর প্রচ্ছদপটের ডিজাইন করে দিলেন, শান্তিপদ স্টেটসম্যানে গিয়ে ব্লক করিয়ে আনল। এরমধ্যেই আচমকা একদিন নজরুলের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেল নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। নৃপেন তখন সিটি কলেজে আইএ পড়ে আর আরপুলি লেনের বাড়িতে ছাত্র পড়ায়, ওই বাড়ির দুই-তিনটে বাড়ি পরেই কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচির বাড়ি। ওই বাড়িতে সন্ধেবেলায় মজলিশ বসে। লেখক-শিল্পী গায়করা আসেন। ছাত্র পড়িয়ে ফেরার সময়ে সেই মজলিশ শুনতে পায় নৃপেন। ইচ্ছে করে ভেতরে ঢুকতে কিন্তু সংকোচ হয়। একদিন এক ছাত্র খবর দিল, জানেন মাস্টারমশাই আজ রাতে যতীনবাবুর বাড়িতে কাজী নজরুল ইসলাম আসছেন।

সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠল নৃপেন। বলো কী! নাহ আজ সব সংকোচ ফেলে যেতেই হবে। সন্ধে হতেই নৃপেন চলে গেল বাগচি মশাইয়ের বাড়ি। গিয়ে দেখে লোকে লোকারণ্য। সকলেই এসেছেন নজরুলকে দেখতে। নজরুল এসে গিয়েছে। গানও শুরু করে দিয়েছে। নৃপেন ভিড় ঠেলে ঢুকে পড়ল ভেতরে। আহা গান তো নয়, যেন প্রবল গ্রীষ্মের প্রবল দাবদাহে সহসাই আছড়ে পড়া কালবৈশাখী। সে ঝড় যেমনই প্রবল তেমনই মিঠে! সকলে মন্ত্রমুগ্ধ।

শেষ হলো গান, তারপর শুরু হলো সাহিত্যচর্চা। সেই আলোচনায় নিজেরই অজান্তে কখন যেন যোগ দিয়ে ফেলল নৃপেন। সাহিত্যপাঠ তারও কিছু কম নয়। জমে উঠল আলোচনা। নৃপেনের চমৎকার বাগ্মিতা আর সাহিত্যরসে সকলেই অবাক। নজরুলেরও নজর গেল ছেলেটির ওপর। এই ছেলে তো শুকনো পণ্ডিত নয়, ভেতরে রস রয়েছে, একে দরকার।

সভা শেষে নৃপেন ফিরে যাচ্ছে, তখন পিছন থেকে ডাক এল, ভাই শুনুন।

চমকে উঠে পিছন ফিরে নৃপেন দেখল স্বয়ং বিদ্রোহী কবি ডাকছেন তাকে!

আপনার নাম কী ভাই ?

নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়।

আমি নজরুল ইসলাম।

সূর্যকে কি আর নিজেকে চেনানোর দরকার রয়েছে ?

শুনে হা হা করে হেসে উঠল নজরুল, তারপর দুজনে হাঁটতে হাঁটতে গল্প শুরু। কথার মধ্যেই নজরুল বলল, আমি কাগজ বার করতে চলেছি, ধূমকেতু। আপনি আমাদের সঙ্গে আসবেন ?

আমি!

হ্যাঁ আপনি। আপনাকে দরকার ভাই। আমার কাগজে আমি হব মহাকালের তৃতীয় নয়ন আর আপনি হবেন ত্রিশূল।

নৃপেন তখন উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে।

আমি রাজি। শুধু একটা প্রশ্ন ?

কী প্রশ্ন ভাই ?

আপনার ঈশ্বরের আশীর্বাদ নিয়েছেন তো ?

আমার ঈশ্বর ?…প্রশ্নটা করে নিজেই চমকে যায় নজরুল। তাই তো! এত বড় একটা কাজে গুরুদেবের আশীর্বাদ না হলে কী করে হবে!

নৃপেনের পিঠে চাপড় দিয়ে নজরুল বলে ওঠে, সাবাশ ভাই সাবাশ। আমি ঠিক মানুষ চিনেছি। আপনি আমার চোখ খুলে দিলেন। আজই টেলিগ্রাম করব গুরুদেবকে। তার আশীর্বাদ ছাড়া যে সবই বৃথা।

দুপুরে ঘরে একা বসেছিল নজরুল। তার দুই হাতে ভরা নক্ষত্ররাজি। আকাশের সকল উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কই এখন তার দুই হাতের তালুতে। সর্বাগ্রে রয়েছে জগতের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রটি। হ্যাঁ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশীর্বাণী। নজরুলের কাছে এ যেন স্বপ্নাতীত। নৃপেনের কাছে সেই দিন শোনার পর গুরুদেবকে তার করেছিল নজরুল। গুরুদেব, কাগজ করছি। নাম দিয়েছি ধূমকেতু। আপনার আশীর্বাদ না পেলে সব আয়োজন ব্যর্থ। প্রিয় শিষ্যটির এই অনুরোধ ফেরাতে পারলেন না কবিন্দ্র। লিখে পাঠালেন :

‘কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু,

আয় চলে আয় রে ধূমকেতু

আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,

দুর্দিনের এই দুর্গশিরে

উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন!

অলক্ষণের তিলক রেখা,

জাগিয়ে দে রে চমক মেরে

আছে যারা অর্ধচেতন!’

গুরুদেবের কাছ থেকে এই আশ্বাসবাণী পেয়ে নজরুল আবেগে দিশেহারা। স্বয়ং গুরুদেব লিখে পাঠিয়েছেন এর থেকে বড় কথা আর কী-ই বা হতে পারে! শুধু গুরুদেব নন, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখে পাঠিয়েছেন :

‘পরম কল্যাণীয়েষু,

তোমার কাগজের দীর্ঘজীবন কামনা করিয়া একটিমাত্র আশীর্বাদ করি, যেন শত্রুমিত্র নির্বিশেষে নির্ভয়ে সত্য কথা বলিতে পার। তার পরে ভগবান তোমার কাগজের ভার আপনি বহন করিবেন।

তোমাদের শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।’

বারীন ঘোষ লিখেছেন :

‘ভাই পাগল,

আশীর্বাদ করি তোমার ধূমকেতু দেশের যাঁরা সাচ্চা সোনা তাঁদের খাদ পুড়িয়ে উজ্জ্বল করে তুলুক।’

বিরজাসুন্দরী দেবী, ফজলুল হক, কবি কালিদাস রায়, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো আরও অনেক চেনা অচেনা খ্যাত অখ্যাত মানুষ শুভেচ্ছায় ভরিয়ে দিয়েছেন নজরুলকে। সেই সব চিঠি হাতে নেড়েচেড়ে দেখছিল নজরুল আর মনে মনে উদ্বুদ্ধ হচ্ছিল। এত মানুষের আশা, শুভেচ্ছা বৃথা যাবে না। এই কাগজের মাধ্যমেই দেশবাসীর বুকে নতুন করে আগুন জ্বালতে হবে। সকলেই কথা দিয়েছেন ধূমকেতুতে লিখবেন। নজরুল ঠিক করেছে গুরুদেবের আশীর্বাণীটি ব্লক করে প্রতি সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপানো হবে। আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। তারপরেই প্রকাশিত হবে স্বপ্নের কাগজ। আজ আনন্দবাজার পত্রিকায় ধূমকেতুর বিজ্ঞাপন পাঠানো হবে। নজরুল নিজে হাতে সেই বয়ান লিখেছে :

সাপ্তাহিক সংবাদপত্ররের পুরাতন সংবাদ পাঠে অতৃপ্ত এবং অধিক মূল্য দিয়া দৈনিক কাগজ পাঠে অসমর্থ মফঃস্বলবাসীদিগের জন্যই বাঙ্গালায় এই সম্পূর্ণ অভিনব অর্ধসাপ্তাহিক পত্র ধূমকেতুর আবির্ভাব।

ধূমকেতু প্রতি সপ্তাহে শুক্র ও মঙ্গলবারে বাহির হইবে। বার্ষিকমূল্য ডাকমাসুলসহ ৫টাকা। ষান্মাষিক পৌনে তিন টাকা। তিন মাসের জন্য দেড় টাকা। তিন মাসের কম সময়ের জন্য গ্রাহক করা হয় না। প্রতি সংখ্যার নগদ মূল্য এক আনা। ভি পি তে ধূমকেতু পাঠানো হয় না।

এর নিচে লেখা, মফস্সলের সর্বত্র ধূমকেতু-র জন্য এজেন্ট আবশ্যক। এজেন্ট হইবার নিয়ম―এজেন্টগণকে প্রত্যেক ২৫ খানা কাগজের জন্য ১০ টাকা হিসাবে অগ্রিম জমা দিতে হয়। জমার টাকা এজেন্সি ত্যাগের সময় ফেরত দেওয়া হয়। এজেন্টগণকে শতকরা ২৫ টাকা হিসেবে কমিশন দেওয়া হয়। ২৫ খানির কম কাগজ লইলে কাহাকেও এজেন্সী দেওয়া হয় না। অবিক্রীত কাগজ আমাদের নিকট পৌঁছান চাই। দ্বিতীয় মাসের প্রথম সংখ্যা কাগজ যাইবার পুর্বেই পূর্ব মাসের গৃহীত কাগজের মূল্য অর্থসচিবের নিকট পাঠাইয়া দিতে হইবে।

ধূমকেতু কেন্দ্র―৩ নং কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা।

প্রথম সংখ্যার জন্য সম্পাদকীয় নিবন্ধটিও লেখা হয়ে গেছে। নজরুল লিখবে সারথীর পথের খবর, নৃপেন লিখবে ত্রিশূল ছদ্মনামে এবং মুজফ্ফর লিখবেন দ্বৈপায়ন নামে। প্রথম সম্পাদকীয় আজই আজই প্রেসে যাবে। তার আগে আরেকবার নিজের লেখাটাই পড়তে নিল―শুরুতেই একটি কবিতা :

‘আমি যুগে যুগে আসি

আসিয়াছি পুনঃ বিপ্লবহেতু

আমি স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু।’

এরপর লেখা :

‘মাভৈঃ বাণীর ভরসা নিয়ে জয় প্রলয়ঙ্কর বলে ধূমকেতুকে রথ করে আমার আজ নতুন পথের যাত্রা শুরু হলো। আমার কর্ণধার আমি। আমার যাত্রা শুরুর আগে আমি সালাম জানাচ্ছি, নমস্কার করছি আমার সত্যকে।…দেশের যারা শত্রু, দেশের যা কিছু মিথ্যা, ভন্ডামি, মেকী, তা দূর করতে ধূমকেতু হবে আগুনের সম্মার্জনী। ধূমকেতু কোন সাম্প্রদায়িক কাগজ নয়। মনুষ্য ধর্মই সবচেয়ে বড় ধর্ম। হিন্দু মুসলমানের মিলনের অন্তরায় বা ফাঁকি কোনখানে তা দেখিয়ে দিয়ে এর গলদ দূর করা এর অন্যতম উদ্দেশ্য।’

তবে সেই মাসউদ সাহেব প্রথম দিন একশ আর কিছুদিন পর পঞ্চাশ টাকা ঠেকিয়ে সেই যে পালে হাওয়া দিয়ে উধাও হলেন তাকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। সুতরাং মাত্র দেড়শো টাকা পুঁজি নিয়েই কুছু পরোয়া নেহি বলে ময়দানে নজরুল। তবে বিজ্ঞাপন কিছু এসেছে, গ্রাহক এবং এজেন্টদের পাঠানো মানি অর্ডার থেকেও বেশ কিছু টাকা এসেছে। অবশ্য তা থেকে খরচও হয়েছে যথেষ্ট। 

বার দুয়েক লেখাটায় চোখ বোলাল নজরুল। সন্তুষ্ট হলো। নিজের কাগজের জন্য প্রথম সম্পাদকীয় বলে কথা। অনেক স্বপ্ন জড়িয়ে রয়েছে এই কাগজকে ঘিরে। গুরুদেব যা বলেছেন, অর্ধচেতনদের ঘা মেরে জাগাতে হবে―সেই ব্রত নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। মোট কথা ধূমকেতু হবে নির্ভীক, যে নিজেকে ছাড়া আর কাউকে পরোয়া করবে না, সত্য কথা বলতে, প্রতিবাদে গর্জে উঠতে কালমাত্র দ্বিধা করবে না সেটা প্রথম দিন থেকেই সকলকে বুঝিয়ে দিতে হবে।

ঘরে ঢুকল শান্তিপদ। তোমার লেখাটা দাও এবার। সকলের লেখা প্রেসে চলে গেছে।

এই নে। নিজের লেখাটা শান্তিপদর দিকে বাড়িয়ে দিল নজরুল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, কেমন বুঝছিস ?

চারদিকে সকলের একটাই প্রশ্ন, কবে ধূমকেতু দেখা যাবে ? বলে মুচকি হাসল শান্তি।

আর নজরুল দুই হাত তুলে সোল্লাসে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘দে গরুর গা ধুইয়ে।’

প্রকাশ পেল ধূমকেতু। প্রথম সংখ্যাই পাঁচ হাজার কপি ছাপানো হলো। অফিসঘর কাগজে ভর্তি। নিয়ম হলো ছাপা হলেই কাগজ আগে পুলিশ কমিশনারকে পাঠাতে হবে। তাই শান্তিপদ দুটো কাগজ নিয়ে কমিশনারের অফিসে গিয়ে দিয়ে এল। তারপর ডাকে পাঠানোর কাগজগুলো প্যাক করে দিয়ে এল ডাকে। রেলে পাঠানোর কাগজ হাওড়া ও শিয়ালদা স্টেশনে বুক করে দিয়ে এল। এইসব কিছু করে ফিরল অফিসে। এসেই মাথায় হাত। এ কী, এখনও যে প্রায় সব কাগজই পড়ে রয়েছে! নগদ বিক্রির গ্রাহক কই ? কাগজের স্তূপ অফিস ঘরের সিলিং ছুঁয়েছে। একশোটা কাগজ বিক্রি করলে কমিশন উঠবে চার টাকা এগারো আনা, আর নিজেরা যদি ফেরি করা যায় তাহলে পাওয়া যাবে ছয় টাকা চার আনা। কাগজের রিম সাপ্লায়ার সুবোধবাবু এসে বসে রয়েছেন। পরের সংখ্যার জন্য কাগজ দিয়ে আজকের সংখ্যার বিলের টাকা নিয়ে যাবেন কিন্তু টাকা কই ? যেটুকু উঠেছে তাতে বিলের চার আনাও শোধ হবে না। শান্তিপদর মাথায় হাত! ওদিকে নজরুল আজ সকালেই গিয়েছে কবি গিরিজা বসুর বাড়ি, সেখানে তার নেমন্তন্ন। আফজল সাহেব গত দুই দিন ছাপাখানা সামলে আজ গিয়েছেন নিজের বইয়ের দোকানে। অফিসে লোক বলতে শুধু শান্তিপদ আর মুজফ্ফর আহমদ। এই বিশাল পরিমাণে কাগজের কী গতি হবে ভেবে অস্থির হয়ে গেল শান্তিপদ।

মুজফ্ফর বললেন, দেখুন আমার মনে হয় কাগজটা ঠিকঠাক পাবলিসিটি পায়নি। পাঠকের কাছে, কাগজওয়ালাদের কাছে সরাসরি পৌঁছনোর ব্যবস্থা করতে হবে।

আপনি কী সাজেস্ট করছেন ? জিজ্ঞাসা করল শান্তিপদ।

বড় বড় রাস্তার মোড়ে যে কাগজের হকাররা থাকে তাদের কাছে এখন কাগজ দিয়ে এলে কিছু নগদ আসবে আর তাদের ধূমকেতু বেরোনোর তারিখ ও বার জানিয়ে দিয়ে বলে আসতে হবে তারা যেন এর পর দিন থেকে এসে নিয়ে যায়।

সুবোধবাবু এবং শান্তিপদ দুজনেই মুজফ্ফরের প্রস্তাবে সহমত হয়ে শান্তিপদ একশটা কাগজের একটা বাণ্ডিল আর সুবোধবাবু পঞ্চাশটা কাগজের একটা বান্ডিল ঘাড়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। প্রথম গন্তব্য বউবাজারের মোড়। সেখানে বিক্রি হলো পঞ্চাশখানা। তারপর সেখান থেকে কলেজ স্ট্রিটের হ্যারিসন রোড। সেখানে পঁচিশটা বিক্রি হলো, তারপর শিয়ালদার মোড়ে আরও পঁচিশ। সব মিলিয়ে একশোটা কাগজ বিক্রি করে চার টাকা এগারো আনা হাতে নিয়ে বুক ফুলিয়ে আবার অফিসে ঢুকল শান্তিপদ। সুবোধবাবুর মাথায় হাত। এই সামান্য টাকায় কী হবে! শান্তিপদ বলল, কোনও চিন্তা করবেন না সুবোধবাবু, আজকের টাকা তিনি আগামীকাল দুপুরের মধ্যেই পেয়ে যাবেন কিন্তু দ্বিতীয় সংখ্যার কাগজ যেন তিনি আজই প্রেসে পাঠিয়ে দেন। অগত্যা তাইই করলেন সুবোধবাবু। সেদিনের মতো হাঁফ ছেড়ে বাঁচল শান্তিপদ। কী হবে কাগজের ভবিষ্যৎ কে জানে ? সেই আশঙ্কা সন্ধেবেলায় নজরুলের কাছে প্রকাশ করতেই নজরুল জোর গলায় বলে উঠল কিচ্ছু চিন্তা করিস না, দুটো দিন যেতে দে, লোকে লাইন দিয়ে আমাদের কাগজ কিনবে। শান্তি মাথা নাড়লেও মনের দুরুদুরু গেল না।

কিন্তু নজরুলের কথাই সত্যি হলো। দুই-তিন সংখ্যা থেকেই ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে পড়তে থাকল ধূমকেতুর কথা। চারদিকে শুধু ধূমকেতুর জয়গান। পত্রপত্রিকাগুলিও সোচ্চারে জয়ধ্বনি দিতে শুরু করল ধূমকেতুর নামে। অমৃতবাজার পত্রিকা ধূমকেতু সম্পর্কে লিখল : ‘“Dhoomketu’ fully sustain the reputation of the soldier poet and the collections he has been able to make are in tune with the fire and energy of his own writings. There is something novel, something enthralling in this new venture. We hope, the ‘Dhoomketu’ or comet will not simply be an emblem of destruction in the hand of the soldier poet but will create something that is beautiful, something that is abiding and holy.”

আনন্দবাজার বলল, ‘বাঙ্গালার জরাগ্রস্ত যৌবনকে নবজীবনের উদ্দাম আবেগে কর্মচঞ্চল করিয়া তুলিবার প্রত্যেক আয়োজনের সহিতই আমাদের আন্তরিক সহানুভূতি আছে। ধূমকেতুর সাধু সঙ্কল্প জয়যুক্ত হউক’।

হিতবাদী, দৈনিক বসুমতি, আত্মশক্তি, মোহম্মদী থেকে সব পত্রিকায় শুধু ধূমকেতুর জয়গান। বিক্রির সংখ্যাও বাড়তে থাকল লাফিয়ে লাফিয়ে। নাওয়া খাওয়ার সময় নেই নজরুলের। এতদিন পর অন্তরের সমস্ত জ্বালা, সমস্ত ক্ষোভ উগড়ে দেওয়ার মতো একটা পাত্র পেয়ে সেই খানেই তপ্ত, গলিত সিসের মতো শব্দ, অক্ষর ঢালতে থাকল। অসহযোগ আন্দোলনের অপমৃত্যু যে জাতীয় আন্দোলনের জোয়ারকে বেশ কিছুটা স্তিমিত করে দিয়েছিল ধূমকেতু একাই যেন সেই নিভন্ত চুল্লিতে ফুঁ দিয়ে তাকে আবার দাউ দাউ জ্বালিয়ে তুলল। যেদিন কাগজ বেরুবে সেদিন ভোর থেকেই রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে তরুণের দল। কখন বেরোবে ধূমকেতু। হকাররা অফিস থেকে কাগজসমেত বেরুনোমাত্র কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। আমার চাই। আমাকে একটা দিন। মুহূর্তে নিঃশেষ। আর বিজ্ঞাপনের অপেক্ষায় থাকে না ধূমকেতু, সার্কুলেশনের টাকাতেই দিব্বি চলে যায়। এক কপি কাগজ নিয়ে পাড়ার মোড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা চলে। ছাত্র রোয়াকে, বৈঠকখানায়, ভাতের হোটেল, অফিস কাচারি সর্বত্র শুধু ধূমকেতু নিয়ে কথা। সহসাই যেন জেগে উঠল সকলে। প্রতিটি সংখ্যাই যেন এক একটি নতুন অবিরত লাভা উদ্গিরণকারী আগ্নেয়গিরি। অকুতোভয় ধূমকেতু সোচ্চারে প্রথম দাবি করল ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা। সারথীর কলমে নজরুল লিখল :

‘ধূমকেতু ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা ও কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশীর অধীন থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়ের হাতে। তাতে কোন বিদেশীর মোড়লী করবার অধিকারটুকু থাকবে না। যাঁরা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এদেশে মোড়লী করে দেশকে শ্মশানভূমিতে পরিণত করেছেন, তাঁদের পাততাড়ি গুটিয়ে, বোঁচকা পুঁটুলি বেঁধে সাগরপাড়ে পাড়ি দিতে হবে। প্রার্থনা বা আবেদন নিবেদন করলে তাঁরা শুনবেন না। তাঁদের অতটুকু সুবুদ্ধি হয়নি এখনও। আমাদেরও এই প্রার্থনা ভিক্ষা করার কুবুদ্ধিটুকু দূর করতে হবে।

পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে সকল কিছু নিয়ম-কানুন-বাঁধন-শৃঙ্খলা- মানা-নিষেধের বিরুদ্ধে। আর বিদ্রোহ করতে হলে সকলের আগে আপনাকে চিনতে হবে। বুক ফুলিয়ে বলতে হবে, আমি আপনারে ছাড়া করিনে কাহারে কুর্ণিশ। বলতে হবে, যে যায় যাক সে আমার হয়নি লয়।’

এমন নির্ভীক, দ্বর্থ্যহীন পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি ঘোষণা আগে কেউ কখনও করেনি। এমন সোচ্চার বিদ্রোহই উদ্দীপ্ত করে তুলল বাংলার প্রতিটি তরুণকে। কখনও ‘রক্তাম্বরধারিনী মা’, কখনও ‘বিষবাণী’, কখনও বা ‘ম্যায় ভুখা হু। আমি ক্ষুধার্ত’ কিংবা ‘আমি সৈনিক’―নজরুলের এক একটি লেখা যেন অর্জুনের গাণ্ডীব হতে ছুটে আসা তীর হয়ে সরাসরি হৃদয়কে বিদ্ধ করে।    

বাংলার সন্ত্রাসীদের মধ্যেও নতুন প্রাণের জোয়ার নিয়ে এল। সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী আন্দোলনের ও কংগ্রেসের নেতা শ্রীভূপতি মজুমদারও ধূমকেতুকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এলেন। ধূমকেতুর অফিসে আনাগোনা শুরু হলো যুগান্তর, অনুশীলন দলের অনেক নেতা ও কর্মীরা।

মুজফ্ফর একদিন বিকেলে গল্প করতে করতে বলেই ফেললেন, কাজী সাহেব ধূমকেতু কি তবে সন্ত্রাসীদের মুখপত্র হয়ে উঠল ?

কেন, তা কেন হবে ? অবাক হলো নজরুল।

যুগান্তর দলের লোকেরা তো প্রকাশ্যেই বলছে যে ধূমকেতু তাদের কাগজ।

নজরুল হাঁটু চাপড়ে বলে ওঠে দে গরুর গা ধুইয়ে। এমনটা যদি তারা মনে করে তবে ধূমকেতুর জন্ম সার্থক আহমদ সাহেব। এটাই তো ভেবেছিলাম যে ধূমকেতুকে সকলে যেন তার নিজের কাগজ বলে মনে করে। সেটাই হচ্ছে! আবার জেগে উঠছে সকলে।

হুঁ শুধু বিপ্লবীরা, বা সাধারণ মানুষ নয়, আরও অনেকেই জেগে উঠেছেন। মৃদু হেসে বললেন মুজফ্ফর।

ঠিক বুঝলাম না।

যা খবর রয়েছে পুলিশ মহল এবং ব্রিটিশ সরকারও জেগে উঠেছে আপনার ধূমকেতুর জ্বালায়। শুনেছি এই দপ্তরে কারা আসা যাওয়া করছে সেই নজরও রাখা হচ্ছে।

বলেন কী! উত্তেজিত হয়ে পড়ল নজরুল।

হুঁ, শুধু তাই নয়, আমার আরও একটা সন্দেহ হচ্ছে যে ওই যে মাসউদ সাহেব কিছুটা টকা দিয়ে উধাও হলেন তিনিও আসলে পুলিশের চর। আপনাকে স্রেফ ওই সামান্য টাকা দিয়ে কাগজ করতে উস্কানি দিয়েই কেটে পড়েছেন।

তাতে লাভ ?

লাভ একটাই, আপনাকে ভালোভাবে ওয়াচ করা, এবং এখানে কারা কারা আসছে, কী উদ্দেশ্য এগুলো খেয়াল করা। তারপর সুযোগ বুঝে জাল গুটিয়ে ছোট বড় সব মাছকে একসঙ্গে ধরা।

নজরুল বলল, হুম, বুঝলাম। হোক আমি ভয় পাই না। ধূমকেতু পিছোবে না।

সে না হয় পিছোবে না। কিন্তু গতকাল শীলবাবু যেটা বলে গেলেন তার কথা কী ভাবলেন ?

নজরুল হো হো করে হেসে উঠে বলল, দুবেজি ঠিক কিছু একটা ব্যবস্থা করে ফেলবেন আশা করি। আজ বিকেলেই দুবেজির আসার কথা। একটা ঘর দেখেছেন উনি। দেখাতে নিয়ে যাবেন।

আসলে ব্যাপার হলো, এই ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিট বাড়িটা মস্ত। বাড়ির যে অংশটুকু শীল পরিবারের তারা তাদের অংশটুকু ভাড়া দিয়েছিল বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতিকে। সমিতি আবার একটা ঘর সাবলেট দিয়েছে ধূমকেতুকে। চলছিল বেশ। কিন্তু বেশ কিছুকাল আগে থেকে ধূমকেতুর দপ্তরে বিপ্লবীদের আনাগোনা এবং কাগজের জ্বালাময়ী বিষয় দেখেশুনে শীল পরিবারের এক উকিল এসে বেশ রাগতস্বরেই নজরুলকে পাকড়াও করে বলেছেন দ্রুত তাকে এই বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে। আসল কারণটা তিনি উল্লেখ না করে বলেছেন সাবলেট দেওয়া বেনিয়ম। নজরুল পড়ল ফাঁপড়ে, এখন সে যাবে কোথায় ? সকলকেই বলা কওয়া করতে থাকল। সাহায্যের হাত বাড়ালেন দুবেজি। দুবেজি হলেন ধূমকেতুর হকারদের প্রধান। এর আগে দৈনিক নবযুগ পত্রিকারও ডিস্ট্রিবিউশনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। সেই সূত্রে নজরুল এবং মুজফ্ফরের সঙ্গে তার সুন্দর সখ্য গড়ে ওঠে। তাই ৩২ নম্বরের ঘর ছেড়ে দিতে হবে এই কথা দুবেজির কানে যেতেই তিনি কথা দিয়ে বসলেন সাত দিনের মধ্যে এই অঞ্চলেই তিনি ঘরের ব্যবস্থা করে দেবেন। সেই আশাতেই নজরুল রয়েছে।

আজ দুবেজি এলে আপনাকেও সঙ্গে নিয়ে যাব আহমদ সাহেব।

বেশ যাওয়া যাবেখন। এখন উঠি। বলে উঠতে গিয়েও একটু থামলেন তিনি, তারপর বললেন গত সংখ্যায় দেখলাম ধূমকেতুর প্রথম পাতায় ছাপিয়েছেন ‘কলকাতায় সব কাগজের চেয়ে বেশি কাটতি’ ওটা কি নিছকই বিজ্ঞাপন না সত্যিই ?

এটা আমার বানানো তথ্য নয় আহমদ সাহেব। হকার, এজেন্ট সকলেই বলছেন এই মুহূর্তে কলকাতায় ধূমকেতুর থেকে বেশি বিক্রি কোনও কাগজের নেই।

তাহলে তো আপনি কয়েক দিনের মধ্যেই কলকাতার অন্যতম ধনী ব্যক্তি হয়ে উঠবেন।

তাই শুনে ছাদ ফাটিয়ে হেসে উঠল নজরুল। বলল, মা সরস্বতী যদিও বা আমার প্রতি খানিক কৃপাবর্ষণ করেছেন কিন্তু তাঁর বোন কোনওকালেই আমার প্রতি সদয় নন। এই কারণে লক্ষ্মীদেবীর প্রতি আমার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। যদিও তিনি কর্ণপাত করেন না। 

এবার হেসে উঠল দুই বন্ধুই। মুজফ্ফর বললেন, আপনার যেমন মা লক্ষ্মীর প্রতি অভিযোগ রয়েছে তেমনই আমারও আপনার প্রতি একটি অভিযোগ রয়েছে।

আমার প্রতি! কী অভিযোগ এখনই বলুন।

ধূমকেতু কি শুধু ভাঙ্গনের গানই গাইবে, শুধু প্রত্যক্ষ রাজনীতির কথাই বলবে, একমাত্র সরব বিপ্লবীদের পাশেই দাঁড়াবে ?

আপনি কী বলতে চাইছেন দ্বৈপায়ন ? মুজফ্ফরকে জিজ্ঞাসা করল নজরুল।

বলতে চাইছি যারা প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে নেই, আমাদের দৃষ্টির তলায় রয়েছে, যাদের কথা বলার বা শোনার কেউ নেই সেই নিপীড়িত বঞ্চিত মেহনতি মানুষের কথা কি ধূমকেতু বলবে না ?  আর শত্রু কি শুধু দেশের বাইরে থেকেই আসে ? ঘরের শত্রু কি নেই ? ইংরাজ বাইরের শত্রু, তাকে দূর করে দিলেই কি দেশের নিপীড়িত শ্রমিক কৃষকের সমস্যা মিটে যাবে ? যাবে না। কারণ সুদখোর মহাজন, জোতদাররা শোষণ করবে সাধারণ মানুষদের। তারা দেশীয় হয়েও দেশের মানুষের শত্রু। ধূমকেতু কি তাদের বিরুদ্ধেও গর্জে উঠবে না ?

মুজফ্ফরের কথা শুনে মাথা ঝাঁকাল নজরুল। বলল, হ্যাঁ বলতে হবে। নিশ্চয়ই বলতে হবে। আমি আজই লিখব। এর পরের সংখ্যার জন্যই লিখব। আপনাকে ধন্যবাদ দ্বৈপায়ন। আপনি চিরকালই সঠিক সময়ে সঠিক পরামর্শটি দিয়েছেন। আজও তাই দিলেন।

মুজফ্ফর বললেন, চলি তাহলে।

হ্যাঁ আসুন।

মুজফ্ফর চলে গেলেন। আর নজরুল কাগজ কলম টেনে নিয়ে ভাবতে বসল। কিছুক্ষণ পর খসখস করে আঁচড় কাটতে শুরু করল সাদা কাগজের গায়ে। লিখতে লিখতে একসময়ে ডুবে গেল নিজের জগতে ‘…ভারতবর্ষে শতকরা সত্তরজন চাষী। তারা আজ অহরহ পরিশ্রম করিয়া দুবেলা খাবার অন্ন যোগাড় করিতে পারে না। মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকেরা অসদউপায়েও স্ত্রীপুত্রের মুখে ভাত তুলিয়া দিতে পারে না। রোগ লইয়া দুর্ভিক্ষ ঘরে ঘরে মহাজনের মত ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। এদিকে কেমন আছে? লক্ষ্মী মহাত্মার পালিতা নীচ জাতীয়া কন্যা। তিনি লক্ষ্মীর নামে সকল নীচ জাতির কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন।

‘কে আছো পতিত, লাঞ্ছিত, কে আছো দীন, হীন, ঘৃণিত, এসো। যে শক্তি বলে তোমার ভাইরা ফরাসীর হাজার হাজার বছরের অতাচার ও আভিজাত্য দুইদিনে লোপ করিয়া দিয়াছিল, যে বন্যায় সাইবেরিয়ার লক্ষ বন্দী, সন্ত্রাসদাতা, দুর্ধর্ষ সুপ্রতিষ্ঠিত শাসন ভাসিয়া গিয়াছিল, যে শক্তিময়ীর হাস্য সমস্ত জগতের অত্যাচারকে উপহাস করিয়া ধনগর্বিতদের গৃহে গৃহে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে, সেই শক্তিময়ী, সেই সর্বনাশের বন্যা লইয়া তোমার দুয়ারে উপস্থিত। ওঠো, ভাই, মাকে বরণ করিয়া লও।’

লেখা শেষ করে বাইরে তাকাল। ঝকঝকে আকাশ।

কথা রাখলেন দুবেজি। কয়েক দিনের মধ্যেই ধূমকেতুর জন্য  ঘরের ব্যবস্থা হয়ে গেল। ৭ নম্বর প্রতাপ চাটুজ্জে লেনের দোতলার তিনটি খুব বড় বড় ঘর হলো ধূমকেতুর অফিস ও নজরুলের মাথা গোঁজার ঠাঁই। বাথরুম আর পায়খানা নিচে। মেডিকেল কলেজের সামনের এই গলিতে ঢুকে বাঁদিকের শেষ বাড়িটি হলো সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের। এমন গলিতে ঘর পেয়ে নজরুল আনন্দে আত্মহারা আর এমন প্রশস্ত জায়গা পেয়ে সাহিত্যিক থেকে বিপ্লবী সকলের আনাগোনাই বেড়ে গেল। রোজ সন্ধের পর বসতে থাকল আড্ডার আসর। মধ্যমণি নজরুল। রাস্তা থেকে শোনা যায় নজরুলের গান, হা হা প্রাণখোলা হাসি। সকলের অবারিত দ্বার। শুধু গান-গল্প নয়, ধূমকেতুর চর্চা। দেশের রাজনৈতিক চর্চা। বারীন ঘোষ চিঠি লিখে নজরুলকে সাবধান করেছেন, দেখো বেশি গরম গরম লিখে জেলে যেও না, নজরুল তাতে বিচলিত নয়, প্রতিটি সংখ্যাই তার পূর্বের সংখ্যাকে যেন ছাপিয়ে যাচ্ছে। সেই উত্তাপে উদ্দীপ্ত নবীন থেকে প্রবীণ। কেউ আসে লেখা জমা দিতে, কেউ আসে আদর্শের ঐক্য স্থাপন করতে, কেউ বা প্রেরণা নিতে। সকলের জন্য বরাদ্দ মাটির ভাঁড়ে চা। একদিন সদ্য প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করা এক কিশোর এল। বাড়ি ফরিদপুর, নাম হুমায়ুন কবীর। যোগ দিল আড্ডায়। তাকেও দেওয়া হলো মাটির ভাঁড়ে চা। তার পাশে বসেছিল পবিত্র। সে সরল মনে পবিত্রকে জিজ্ঞাসা করেই ফেলল, প্রতিবার ভাঁড়ে কেন চা দেওয়া হচ্ছে। পবিত্র মুচকি হেসে বলল, কারণটা একটু পরেই বুঝতে পারবে।

কিছুক্ষণ পর আড্ডায় যেই নলিনীকান্ত ঢুকেছে অমনই নজরুল তার হাতে ধরা আধ-ভরতি চায়ের ভাঁড় শূন্যে ছুড়ে দিয়ে সোল্লাসে বলে উঠল দে গরুর গা ধুয়ে। এসো নলিনীদা এসো। হুমায়ুন অবাক। পবিত্র তখন মুচকি হেসে বলল, এবার বুঝেছ ভাই এখানে ভাঁড়ে চা খাওয়ার রেওয়াজ কেন ? গরুর গা ধুয়ে দিতে দিতে প্রথম তিন দিনেই দুই ডজন কাপের পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটেছে। কাপভাঙ্গার মিঠে আওয়াজ শোনার জন্য নিত্যনতুন কাপ কেনা হবে এমন কাপ্তেন আমাদের মধ্যে কেউ নেই।

এ কথা শুনে হুমায়ুনও হেসে উঠল হা হা করে।

আজ সন্ধেবেলাতেও বসেছে জমজমাট আড্ডার আসর। প্রায় সকলেই উপস্থিত। আড্ডায় আজও একটি আঠেরো-বিশ বছর বয়েসী তরুণ এসে ঘরের এক কোণে চুপ করে বসে শুনছে সকলের কথা। ধূমকেতু পত্রিকা সে রোজ পড়ে, প্রতিটি সংখ্যাই তার রক্তে আগুন ধরিয়ে দেয়, বিশেষ করে নজরুলের লেখা। আজ সে নজরুলকে নিজের চোখে দেখতে চলে এসেছে। কিছুক্ষণ পর পর চলছে ভাঁড়ের চা। ছেলেটির দিকে এক ভাঁড় চা এগিয়ে দিল একজন।

ছেলেটি বলল, আমি চা খাই না।

চা খাই না। কথাটা কানে গেল পবিত্রর। সে ছেলেটির দিকে ঘুরে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল কেন ভাই ? চা কী দোষ করল ?

চা বিলিতি জিনিস, ওই জিনিস আমি ছুঁই না।

ওহ, বেশ, তা কী নাম তোমার ?

গোপীনাথ সাহা।

হুঁ, আজ তোমাকে প্রথম দেখছি। কী কারণে এসেছ ভাই ? লেখা দিতে ?

না, আমি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিতে চাই, আমার মনে হয়েছে ধূমকেতু সেই সংগ্রামের পথ নির্দেশ আর প্রেরণা দিতে পারে। সেই কারণেই এসেছি।

গোপীনাথের কথা শুনতে পেয়ে সকলেই তাকাল তার দিকে।

করিম বলল, দেখো ভাই কোনও পথনির্দেশ বা প্রেরণালাভের জায়গা কিন্তু এটা নয়। প্রাণের প্রাচুর্য ঘোষণা করার এবং দেশের মানুষের প্রতি অন্যায় অত্যাচারের দিকে আঙুল তুলে ধরাই ধূমকেতুর উদ্দেশ্য।

আর ভাঙ্গনের জয়গান করা। বলল তরুণ রেজাউল করিম।

প্রাণের প্রাচুর্যের প্রকাশ আর ভাঙ্গনের জয়গান কি এমন হৈহুল্লোড় পরিবেশের মধ্যে সৃষ্টি হয়! বুঝতে পারল না সদ্য তরুণ গোপীনাথ। পালটা প্রশ্ন করল, ভেবেছিলাম এখানে বুঝি অনেক সিরিয়াস বিষয় নিয়ে আলাপ হয়, অনেক শিক্ষণীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু এ তো দেখছি পুরো উলটো! আপনাদের মনে এত আনন্দ আসে কোথা থেকে ?

ছেলেটির এমন কথায় তাজ্জব হয়ে যায় সকলে।

আর নজরুল এই অচেনা যুবকের এমন স্পষ্ট নির্ভীক বচনে চমৎকৃত হলো। দে গরুর গা ধুইয়ে বলে নিজের হাঁটুতে চাপড় মেরে বলল, ভাই আমাদের এত আনন্দ তা কোথা থেকে আসে তার উত্তর সত্যিই দিতে পারব না, কিন্তু নিরানন্দই বা কেন হবে সেটার জবাব তোমার কাছ থেকে একটু শুনি।

গোপীনাথ জোর গলায় দৃঢ় ভঙ্গিতে জবাব দিল। দেশ পরাধীন, সাহেবদের অত্যাচার জুলুম প্রতিদিন বেড়ে চলেছে, সেই জ্বালার মধ্যে এমন আনন্দ জাগে কী করে ? প্রত্যেকটি ইংরেজ আমাদের শত্রু, তারা বুক ফুলিয়ে আমাদের চারপাশে বিচরণ করবে আর আমরা আনন্দে এইভাবে হাসব গাইব!

নজরুল খুব মন দিয়ে গোপীনাথের কথা শুনল, তারপর ঝামর চুল বার দুয়েক নাড়িয়ে উত্তর দিল, উঁহু প্রত্যেকটি ইংরেজ নয়, বল সমগ্র ইংরেজ সমাজ আমাদের শত্রু। তাদের ভাসিয়ে দিতে হলে চাই প্রাণবন্যা, তারই আবাদ করছি আমরা এখানে।

গোপীনাথ সেই উত্তর শুনে কিছু বলল না। তবে ওর চোখমুখ দেখে বোঝা গেল সে নজরুলের কথায় সন্তুষ্ট হয়নি। আবার আড্ডা যখন জমে উঠেছে তখন আরেক প্রস্থ চা আসার আগেই গোপীনাথ কাউকে কিছু না বলে নিঃশব্দে উঠে চলে গেল। নজরুল খেয়াল করল ব্যাপারটা, ওর ইচ্ছে ছিল ছেলেটির মাথায় যে ভাবনা পাথরের মতো চেপে বসেছে তা হাল্কা করা দরকার। দম আটকে কোনও বড় কাজ করা যায় না। ভেবেছিল সবশেষে গোপীনাথের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলবে। সেই যুযোগ আর হলো না। আর হয়তো আসবে না।

আনন্দবাজার পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক মৃণালকান্তিবাবু নজরুলের পাঠানো ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা বার দুয়েক পড়লেন, তারপর বুঝলেন এই কবিতা তাদের কাগজে ছাপানো হলে ব্রিটিশের রোষানল থেকে পার পাওয়া যাবে না। সেই ভয়ে তিনি কবিতাটি বাতিল করলেন। কবিতা ছাপানো হবে না শুনে নজরুল আর একমুহূর্ত দেরি করল না। সঙ্গে সঙ্গে সেটা দিয়ে দিল ধূমকেতুতে ছাপানোর জন্য। প্রকাশ পেল আনন্দময়ীর আগমনে। প্রকাশ পাওয়ামাত্র আবার ঝড় উঠল বাংলার আকাশে বাতাসে। আগুনের ঝড়। ব্রিটিশ সরকার এবার বুঝল সময় হয়ে এসেছে নজরুলকে ও তার ধূমকেতুকে থামানোর। ধূমকেতুর প্রথম সংখ্যা থেকেই প্রতিটি কপি গোপনে সরকারের বাংলা অনুবাদকের অফিসে জমা করা হত। সেখানে ধূমকেতুর প্রতিটি রচনাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে তা পাঠানো হচ্ছিল হোম ডিপার্টমেন্টের পলিটিকাল সেকশনের অফিসারদের টেবিলে। প্রতিটি লেখার ওপর নোটস লিখতেন অফিসাররা। তারপর সেটা ফাইলবন্দি হতো। কাগজে রাষ্ট্রদ্রোহী কিছু লিখলে ভারতের দণ্ডবিধি আইনের ১২৪-এ ধারা অনুসারে মোকদ্দমা করা যায়। তবে সেই মোকদ্দমা পুলিশ সরাসরি করতে পারে না। তার জন্য প্রাদেশিক বা কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতি লাগে। বাংলা সরকারের এই অনুমতি দেওয়ার অধিকার জুডিশিয়াল বিভাগের। বাংলায় গভর্নরের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের জুডিশিয়াল ডিপার্টমেন্টের ভারপ্রাপ্ত মেম্বার আবদুর রহিম সবকিছু দেখেশুনে আর দেরি করলেন না, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন মামলা করার সুযোগ যখন রয়েছে তখন এখনই দায়ের করা হক। গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ব্যবস্থা শুরু হয়ে গেল।

পুলিশ বিভাগে বেশ কিছু অফিসার রয়েছেন যারা গোপনে ধূমকেতু ও নজরুলকে সাপোর্ট করেন। তাদের মাধ্যমেই খবর বেরিয়ে গেল ধূমকেতুর সম্পাদক কাজী নজরুল ইসলাম ও মুদ্রাকর-প্রকাশক আফজালুল হকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আসছে।

এই খবর মুজফ্ফরের কানে পৌঁছানো মাত্র তিনি উতলা হয়ে উঠলেন। নজরুলকে কীভাবে বাঁচানো যায় তার চেষ্টা শুরু করলেন। কলকাতায় নজরুল নিরাপদ নয়, একবার পুলিশের হাতে ধরা পড়লে তারপর কী হবে, কীভাবে মুক্তি পাবে তার কোনও ঠিক নেই, ধূমকেতু ও বাংলা সাহিত্য জগতের মস্ত ক্ষতি হয়ে যাবে। অনেকেই নজরুলকে পরামর্শ দিলেন গা ঢাকা দেওয়ার জন্য। নিজের জন্য নয়, ধূমকেতুর ক্ষতি হতে পারে ভেবে নজরুল সিদ্ধান্ত নিল সে কিছুদিনের জন্য অন্তরালে চলে যাবে। কিন্তু কোথায় ? মুজফ্ফর যোগাযোগ করলেন মানবেন্দ্রনাথ রায়ের সঙ্গে। কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের তরফ থেকে রায় চার্জে রয়েছেন, তিনি মুজফ্ফরের চিঠিতে সব জেনে পরামর্শ দিলেন নজরুলকে ইউরোপে পাঠিয়ে দিতে। মুজফ্ফরের এই প্রস্তাব পছন্দ হলো। তিনি স্থির করলেন নজরুলকে যেভাবে হোক বুঝিয়ে আপাতত দেশের বাইরে পাঠাতে হবে।

আজ বিকেলে প্রতাপ চাটুজ্জে লেনের ঘরে মিটিং বসেছে। আলোচনার বিষয় নজরুল ও ধূমকেতুকে কীভাবে পুলিশের কোপ থেকে রক্ষা করা যায়। বন্ধুবান্ধব সকলেই রয়েছেন মিটিংয়ে। মুজফ্ফর সকলের সামনেই নজরুলকে বললেন, আমি নজরুলের ব্যাপারে রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। উনি জানিয়েছেন আমরা যদি কোনওভাবে নজরুলকে ইউরোপে পাঠিয়ে দিতে পারি বাকিটা উনি দেখে নেবেন। আপনাদের কী মত ? আর কাজী সাহেবেরই বা কী মত ?

বন্ধুদের বেশ কয়েকজন মানবেন্দ্রনাথ রায়ের প্রস্তাবে সহমত হলেও নজরুল নিজেই বেঁকে বসল। না আমি কিছুতেই দেশান্তর হব না। যা হবে দেখা যাবে।     

নজরুল যে তক্তপোষে বসে রয়েছে ওর পাশেই রাখা রয়েছে বেশ কয়েক কপি অগ্নিবীণা আর যুগবাণী। দুটি গ্রন্থই কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রকাশিত হয়েছে। অগ্নিবীণা নজরুলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ, প্রকাশক ও নিজেই। ‘বিদ্রোহী’, ‘রণভেরি’, ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘আগমনী’, ‘কামাল পাশা’র মতো সব আগুনে কবিতায় ঠাসা বইটি ও উৎসর্গ করেছে বিপ্লবী বারীন ঘোষকে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিকল্পনায় প্রচ্ছদ এঁকেছেন বিশ্বেশ্বর সেন। আর যুগবাণী নজরুলের প্রবন্ধসংগ্রহ। বছর দুয়েক আগে দৈনিক নবযুগে থাকার সময়ে যেসব প্রবন্ধ লিখেছিল তারই কিছু লেখা নিয়ে বইটা তৈরি। দুটো বইই মেটকাফ প্রেস থেকে ছাপানো। নজরুল নিজেই প্রকাশক। বই দুটি প্রকাশ হওয়া মাত্র ঝড়ের বেগে বিক্রি শুরু হয়েছে।  

 মুজফ্ফর ওই বই দুটোর দিকে আঙুল তুলে বললেন, আমার কানে আরও একটা খবর এসেছে আপনার যুগবাণী নিয়ে, আপনিও হয়তো শুনেছেন যে এই বইটাও শিগগরিই বাজেয়াপ্ত হতে পারে।

যুগবাণী বাজেয়াপ্ত হবে! দে গরুর গা ধুইয়ে! চুরানব্বই পৃষ্ঠার একটা বইয়ের এত ক্ষমতা যে সে ব্রিটিশকে ভয় পাইয়ে দিতে পারে! হো হো করে হেসে উঠল নজরুল।

শৈলজানন্দ ধমকাল। বলল নুরু ব্যাপারটা সিরিয়াসলি নে। বিষয়টা আর হাসিঠাট্টার মধ্যে নেই।

তো আমি কী করব ? পুলিশের ভয়ে পালিয়ে যাব ?

পালাতে বলছি না, আপাতত কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকার কথা বলছি। এবং সেটা ধূমকেতুর স্বার্থেই। বললেন মুজফ্ফর। আপনি এখন গ্রেফতার হয়ে গেলে কাগজটার মস্ত ক্ষতি হয়ে যাবে। হাজার হাজার মানুষ কিন্তু এই কাগজে আপনার লেখা পড়ার জন্য অপেক্ষায় থাকেন।

নজরুল মুজফ্ফরের কথাটা বুঝল।

এই ঘরে যখন জোরদার মিটিং চলছে তখন শান্তিপদ দ্রুতপদে প্রতাপ চাটুজ্জ্যে লেনের দিকে হেঁটে আসছিল। আজ ও গিয়েছিল বউবাজার স্ট্রিটের বিজলীর অফিসে। ওই বিল্ডিঙের একতলায় ছাপাখানা, দোতলায় অফিস আর তিনতলায় থাকে বিজলীর কর্মচারীরা, যারা প্রায় সকলেই কালাপানি ফেরত। বিল্ডিংয়ের অন্যদিকে থাকেন অরবিন্দ ঘোষের বোন সরোজিনী দেবী এবং বারীন্দ্রকুমার। বিজলীর সম্পাদক শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তর আস্তানাও এখানেই। একতলার প্রেসে কাজ করছিলেন শচীনবাবু, শান্তিপদকে দেখেই বললেন, এই তো শান্তি এসেছিস, শিগগির ওপরে যা। তোকে বারীনদা খুঁজছে, লোকও পাঠিয়েছেন বোধহয়…

এত আর্জেন্ট যে লোক পাঠিয়েছেন বারীনদা! শান্তিপদ তখনই গেল বারীনদার ঘরে। বারীন শান্তিপদকে দেখেই বললেন, তোর কাছে এখনই লোক পাঠাচ্ছিলাম। কাজী কি বাড়িতে রয়েছে ?

শান্তি ঘাড় নেড়ে বলল, হ্যাঁ আমি যখন রওনা দিলাম তখন রয়েছে দেখেছি। অনেকে এসেছে।

বেশ। তুই তাহলে এখনই ফিরে যা, গিয়ে বল বারীনদা বলেছে ও যেন আজই কলকাতা ছেড়ে চলে যায়। ওয়ারেন্ট তৈরি হয়ে গেছে। দু-একদিনের মধ্যেই ওকে ধরে নিয়ে যাবে। ধূমকেতুর একটা ব্যবস্থা আগে করে নিয়ে তারপর যেন ধরা দেয় তার আগে নয়।

এই খবর শোনার পর শান্তি আর এক মুহূর্তও ওখানে দাঁড়ায়নি। সঙ্গে সঙ্গে রওনা হলো প্রতাপ চাটুজ্জে লেনের দিকে।

ঘরে ঢুকে সকলের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল শান্তি। নাহ সকলেই চেনা পরিচিত। নজরুলের দিকে তাকিয়ে শান্তি হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, কাজীদা তোমাকে পালাতে হবে, বারীনদা বললেন, আজই কলকাতা ছেড়ে পালাতে। ওয়ারেন্ট হয়ে গেছে।

আজই ?

হ্যাঁ।

বারীন ঘোষকে নজরুল ঈশ্বরের মতো শ্রদ্ধা করে। তাঁর আদেশকে আর অমান্য করার জো নেই।

বেশ, বারীনদা বলেছেন যখন তাহলে চলে যাচ্ছি।

শৈলজা জিজ্ঞাসা করল কোথায় যাবি কিছু ঠিক করলি ?

ভাবছি কুমিল্লা চলে যাই।

বেশ তাই কর। সায় দিল সকলেই।

মুজফ্ফর বললেন, আপনি তাহলে গোছগাছ করে নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। আমরা উঠছি। বলে মুজফ্ফর উঠে দাঁড়ালেন। বাকিরাও উঠল। পবিত্র এগিয়ে এসে নজরুলের কাঁধে হাত রেখে বলল, সাবধানে।

নজরুল হেসে বলল, কিছু চিন্তা নেই।

সকলে বেরিয়ে যাওয়ার পর নজরুল কাগজে খসখস কয়েক লাইন লিখে শান্তিপদর হাতে কাগজটা দিয়ে বলল এটা শরৎদার হাতে দিয়ে বলবি আমার এখনই কিছু কাপড় দরকার।

শরৎদা মানে শরৎচন্দ্র গুহ, আর্য পাবলিশিং হাউজের মালিক। ওর বইয়ের দোকানের সঙ্গে কাপড়ের ব্যবসাও রয়েছে।

শান্তিপদ চিঠিটা হাতে নিয়েও দাঁড়িয়ে রইল।

কিছু বলবি ?

হুঁ। নিশানবরদারের কী হবে ?

ধূমকেতুর আগামী সংখ্যার শিরোনাম হবে নিশানবরদার। গত সংখ্যার কাগজে তার বিজ্ঞাপনও প্রকাশ হয়ে গেছে। নজরুলের কাছ থেকে প্রতি সংখ্যার লেখা আদায় করে নেওয়া শান্তিপদর একটা কঠিন কাজ। একেবারে শেষ মুহূর্তে কবি লেখা দেয়। প্রতিবারই মনে হয় এবার বুঝি আর লেখা পাওয়া গেল না। তবে শেষ মুহূর্তে হলেও লেখাটি ঠিক যেভাবেই হোক শান্তির হাতে তুলে দেয় নজরুল। কিন্তু এবার কী হবে জানা নেই।

নজরুল বলল, চিন্তা করিস না। লেখা ঠিক পেয়ে যাবি। তুই যা এখন।

শান্তি বেরোল। কলেজ স্ট্রিট মার্কেটে আর্য পাবলিশিং হাউজে গিয়ে শরৎবাবুর সঙ্গে দেখা করে কাপড় বাছাবাছি করছে এমন সময় নজরুল নিজেই গিয়ে হাজির হলো সেখানে।

শরৎবাবু বললেন, যা লাগে নিয়ে যান।

নজরুল অনেকগুলো জামাকাপড় বাছল, তার মধ্যে অনেকগুলো শাড়ি।

শান্তিপদ একবার ভাবল এতগুলো শাড়ি নিয়ে কী হবে ? তারপরেই মনে পড়ল কুমিল্লায় সেনগুপ্ত পরিবারের কথা। সেই পরিবারের মহিলাদের কথা ভেবেই শাড়ি নিয়েছে নিশ্চয়ই।

নজরুল শাড়ি কাপড় বেছে দিয়ে শান্তিকে বলল তুই এগুলো নিয়ে অফিসে চলে যা, আমি একটু বাদেই আসছি।

শান্তিপদ কাপড়ের মোট ঘাড়ে করে ফিরে এল।

প্রায় ঘণ্ঠাখানেক পর নজরুল এল। রিকশার ছমছমির শব্দ শুনে অফিসঘরের জানলা থেকে বাইরে তাকাল শান্তিপদ। রাস্তায় গ্যাসের আলোতে দেখতে পেল নজরুল রিকশা থেকে নামছে। সঙ্গে একগাদা জিনিস। শান্তিপদকে দেখতে পেয়ে নজরুল বলল, বাইরে আয়।

শান্তি বেরিয়ে এল।

শোন এই সব জিনিস একসঙ্গে পুঁটুলি করে রাখ। আমি চট করে একবার বারীনদার সঙ্গে দেখা করেই ফিরছি।

শান্তি দেখল নজরুলের গায়ের পাঞ্জাবিটা সপসপে ভিজে, ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে তুমুল উত্তেজিত হয়ে রয়েছে।

শান্তি বলল, ঠিক আছে তুমি যাও, আমি সব রেডি করে রাখছি।

ওই রিকশায় চেপেই নজরুল চলে গেল বারীন ঘোষের সঙ্গে দেখা করতে।

প্রায় ঘণ্ঠাখানেক পরে ফিরল ট্যাক্সিতে। ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকে টুকিটাকি কিছু জিনিস একটা সুটকেসে ভরে নিয়ে শান্তিকে জিজ্ঞাসা করল সব রেডি তো ?

হুঁ।

সব মাল ট্যাক্সিতে তোল। আর তুইও ওঠ।

শান্তিপদ সব মোট গাঁটরি ট্যাক্সিতে তুলল, তারপর নিজেও চেপে বসল। নজরুলও গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে বলল, হাওড়া স্টেশন চল।

গাড়ি ছুটল স্টেশনের দিকে। লোডশেডিং হয়েছে, অন্ধকার রাস্তা। মাঝে মাঝে মোটর গাড়ির আলোর ঝলক। নজরুল চুপ করে বসে। মাথার ভেতরে শত সহস্র চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। আজ বারীনদা বার বার বলে দিয়েছেন আগে ধূমকেতুর ব্যবস্থা করবে তারপর ধরা দেবে। নইলে কাগজটার সর্বনাশ হয়ে যাবে। এই কাগজ দেশের মানুষের মনে নতুন করে আগুন জ্বালিয়েছে, তাকে কোনওভাবেই নেভানো যাবে না। বারীনদাই বলে দিয়েছেন ধূমকেতুর স্বত্ত্ব অন্য কাউকে লিখে দাও, তাহলে তুমি জেলে গেলেও কাগজ বন্দি হবে না। এই কথা শুনে নজরুল তখনই ঠিক করে নিয়েছে কাগজের স্বত্ত্ব কাকে লিখে দেবে। গতকালই গিরিবালাদেবীর চিঠি এসেছিল, উনি দুলিকে নিয়ে সমস্তিপুরে রয়েছেন তার ভাইয়ের কাছে। নজরুল ওর প্ল্যান ঠিক করে নিয়েছে এখন ট্রেনে করে যাবে সমস্তিপুর। সেখান থেকে ওদের দুইজনকে নিয়ে যাবে কুমিল্লা। 

শান্তিপদর মাথায় শুধু একটাই চিন্তা। কাজীদার লেখা কী করে আদায় করবে ?

ট্যাক্সি যখন হাওড়া ব্রিজে উঠবে তখন শান্তিপদ আবার জিজ্ঞাসা করল, কাজীদা তাহলে তোমার লেখাটা কী করে পাব ?

নজরুল হেসে বলল, ভাবিস না, কাল দুপুরের ডাকে ঠিক পেয়ে যাবি। আমি ট্রেনে বসে লিখে বর্ধমান কিংবা আসানসোলে আর এম এস গাড়িতে বেশি ডাক খরচা দিয়ে পাঠিয়ে দেব। এগারোটার ডাকেই তুই লেখা পেয়ে যাবি। প্রুফটা শুধু সাবধানে দেখে নিস।

নজরুল অসম্ভব দ্রুত লিখে ফেলতে পারে এই ভরসাতেই শান্তিপদ নিরুপায় হয়েই মাথা ঝাঁকাল। কপালে কী রয়েছে কে জানে…

জিজ্ঞাসা করল, তুমি যে এত দূরে যাচ্ছ, কতদিন থাকবে তাও ঠিক নেই, টাকা-পয়সা রয়েছে কিছু সঙ্গে ?

হুঁ, শরৎদা একশো টাকা দিয়েছেন, আর আমার কাছেও সামান্য যা ছিল কাচিয়ে নিয়ে এসেছি।

ট্যাক্সি থামল হাওড়া স্টেশনে। নজরুল চারদিকে একবার দেখে নিল। এখন রাত হয়েছে স্টেশনে খুব বেশি ভিড় নেই। গাড়ি ভাড়া মিটিয়ে মালপত্র সব নামানোর পর নজরুল শান্তিপদর হাতে টাকা দিয়ে বলল, যা তো চট করে কিউল স্টেশনের একটা টিকিট কেটে আন।

কিউল!

অবাক হলো শান্তি। তুমি যাবে তো কুমিল্লা। কিউল কেন ?

কিউলে নেমে সমস্তিপুর যাব আগে। সেখান হয়ে কুমিল্লা যাব। দুলি আর ওর মা এখন সমস্তিপুরে রয়েছে।

ওহ তাই বল। নিশ্চিন্ত হলো শান্তিপদ। বলল, তুমি দাঁড়াও আমি টিকিটটা কেটে আনি।

নজরুল সামনে একটা চায়ের দোকান থেকে এক ভাঁড় চা কিনে চুমুক দিল আর শান্তিপদ গেল টিকিট কাটতে। দুজন সিপাই হেঁটে গেল ওর পাশ দিয়ে। ধরা পড়তে মোটেও ভয় নেই, কিন্তু ধূমকেতুর ব্যবস্থা আগে করতেই হবে। নজরুল ঠিক করে ফেলেছে  ধূমকেতুর স্বত্ব বিরজাসুন্দরীদেবীকে লিখে দেবে।

চলো টিকিট হয়ে গেছে। শান্তিপদ এসে বলল।

চল।

দুজনে মালপত্রগুলো নিয়ে ঢুকল স্টেশনে। প্ল্যাটফর্মে ট্রেন দাঁড়িয়ে। বেশ ফাঁকা। শান্তিপদ মালপত্র সব সাজিয়ে দিয়ে আবার মিনমিন করে মনে করাল সম্পাদকীয়র কথা।

নজরুল বলল, আরে ঘাবড়াচ্ছিস কেন ? গাড়ি ছাড়লেই লিখতে বসে যাব। বর্ধমানে পোস্ট করে দেব। চিন্তা করিস না, সঠিক সময়ে লেখা পেয়ে যাবি।

শান্তিপদ একরাশ চিন্তা নিয়ে মাথা নাড়ল।

ট্রেন ছাড়ল। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে যতক্ষণ চোখে দেখা গেল দেখল, তারপর মোকদ্দমায় হারার পর আদালত থেকে যেভাবে মানুষ বিধ্বস্ত হয়ে বেরিয়ে আসে, সেইভাবেই স্টেশন থেকে বেরোল শান্তিপদ। কবির নামে ওয়ারেন্ট বেরিয়েছে মানে আজ না হোক কাল ধরা পড়বেই, ফলে কাগজের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তার থেকেও বড় কথা আগামীকাল আদৌ কবির সম্পাদকীয় এসে পৌঁছবে কি না। না হলে ওই স্পেসে কী লেখা যাবে ? কিছুই তৈরি নেই। এইসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন যে হাওড়াপুল, হ্যারিসন রোড পায়ে হেঁটে কলেজ স্ট্রিটে পৌঁছল শান্তিপদ নিজেরই খেয়াল রইল না। অফিসে পৌঁছে কর্মচারী বর্মনকে র‌্যাপার লিখতে বলে দিয়ে বাড়ি ফিরে গেল। সারা রাত ঘুম হলো না।

পরদিন সকাল হতেই অফিসে চলে এল। মনে উৎকণ্ঠা। আটটার ডাকে কিছু চিঠি এল সেখানে নজরুলের চিঠি নেই। বেলা এগারোটার ডাকেও কিছু এল না। এরপর বিকেল পাঁচটার সময় আবার ডাক, তখনও আসবে কি না সন্দেহ রয়েছে। শান্তির মাথায় হাত। কী হবে এবার সম্পাদকীয়র ? বেলার দিকে অফিসে ভূপতি মজুমদার এলেন, উনি ধূমকেতু পত্রিকার একজন অন্যতম অভিভাবক, কাগজের নানা বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকেন, তাঁর সঙ্গে ধূমকেতুর নিয়মিত লেখক বীরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্তও এলেন। ওদের দুজনকেই শান্তিপদ বলল, সমস্যার কথা। সব শুনেটুনে ভূপতিবাবু বললেন, শোনো শান্তি আর অপেক্ষা করে লাভ নেই, কাজী কোথায় কী অবস্থায় রয়েছে আমরা কেউ জানি না, তার চেয়ে বীরেনবাবু এবারের সম্পাদকীয়টা লিখে দিক, নিশানবরদার না হয় পরের সংখ্যায় নিয়ো।

শান্তি রাজি হলো, এ ছাড়া আর উপায় নেই। ও বীরেনবাবুকে বলল, আমি তাহলে প্রেসে চলে যাচ্ছি, আপনার লেখাটা হয়ে গেলে প্রেসেই পাঠিয়ে দেবেন।

বীরেন্দ্রনাথ বললেন, বেশ তাই হবে।

শান্তি চলে গেল প্রেসে। বিস্তর কাজ পড়ে রয়েছে। রাত আটটা-নটার মধ্যে সব কাজ সেরে না ফেললে আগামীকালের কাগজ বেরুবে না। প্রেসে গিয়ে সব কাজ চটপট শেষ করে শেষ প্রুফের জন্য অপেক্ষা আর নিশানবরদার নিয়ে কী করা তাই ভাবতে লাগল।

রাত আটটা বেজে যাওয়ার পরেও বীরেনবাবুর লেখা এল না যখন আর অপেক্ষা না করে নিজেই কাগজ কলম নিয়ে বসল শান্তিপদ। বুক ঢিপঢিপ করছে উত্তেজনায়, ভয়ে। কী করা যায় ? কী লেখা যায় ? যেখানে স্বয়ং কাজী নজরুল ইসলাম লেখেন সেখানে শান্তিপদর মতো অচেনা চুনোপুটির লেখা…। কিন্তু আজ আর উপায় নেই। বীরেনদার লেখা আর আসবে না, নিজেকেই যা করার করতে হবে। নজরুলের গরম লেখাগুলো সব এখান ওখান থেকে বার করে, সেগুলো বার বার পড়ে ওই স্টাইলে একটা প্রবন্ধ তৈরি করল, বার কয়েক পড়ল। নজরুলের লেখার যে স্পিরিট সেটার কিছুটা হলেও এই প্রবন্ধে রয়েছে কি না যাচাই করতে থাকল। মনে খুঁতখুঁতুনি নিয়েই রাত নটা নাগাদ লেখাটি ছাপতে দিয়ে দিল শান্তিপদ।

পরদিন সকালে সেই প্রথম কাজী নজরুল ইসলামের নামে শান্তিপদর লেখা সম্পাদকীয় প্রকাশ পেয়ে গেল। আর তার ঠিক দুই দিনের মাথাতেই ঘটল বিপদ।

চাঁদনীর তিন নম্বর গুমঘর লেন। এখানেই এখন এক ছাত্রের বাড়িতে থাকেন মুজফ্ফর। সকালে ঘুম ভাঙার পর চোখ মুখ ধুয়ে ঘরে বসেছিলেন তিনি। তখন বন্ধু আবদুল হালীম এলেন। তিনিও কমিউনিস্ট, পাশেই থাকেন। মুজফ্ফর আর হালীম পরস্পরকে কমরেড বলে ডাকেন। হালীমকে দেখে মুজফ্ফর বললেন, চলুন কমরেড চা খেয়ে আসা যাক।

হ্যাঁ চলুন।

দুজনে গল্প করতে করতে বাইরে একটি দোকানে গিয়ে চা খেলেন। তারপর মুজফ্ফর ঠিক করলেন একবার ধূমকেতুর অফিসে গিয়ে শান্তিপদর কাছে নজরুলের খোঁজ নেওয়া যাক।

বছর শেষ হতে আর কিছুদিন বাকি। সকালের কলকাতায় হাল্কা শীতের আমেজ। এখনও দিনের ব্যস্ততা তেমনভাবে শুরু হয়নি। ভিস্তিওলা রাস্তায় জল দিচ্ছে। রাস্তার ধারের চায়ের দোকানগুলির কোনওটি সবে খুলেছে। উনুন থেকে গলগল করে ধোঁয়া উঠছে। প্রায় ফাঁকা ট্রাম ঘন্টি বাজিয়ে চলেছে রাস্তায় ঘসটানোর ভারী শব্দ তুলে।  হাঁটতে হাঁটতে সাত নম্বর প্রতাপ চাটুজ্জে লেন। দোতলায় ধূমকেতুর অফিসে গিয়ে বেশ অবাক হলেন মুজফ্ফর। এত সকালেও বীরেনবাবু এসে পড়েছেন, ঘাড় গুঁজে ধূমকেতুর জন্য লেখা লিখছেন। মুজফ্ফর আর হালীমকে দেখে একবার মৃদু হাসলেন, তারপর আবার কাজে ডুবে গেলেন। শান্তিপদ কাগজপত্র গুছোচ্ছে। মুজফ্ফর আর হালীমকে দেখামাত্র শান্তিপদ প্রথমেই জিজ্ঞাসা করল, আহমদ সাহেব  সম্পাদকীয়টা পড়ে কেউ বোঝেনি তো ? 

মুজফ্ফর হেসে বললেন, না ভাই এখনও পর্যন্ত কেউ বোঝেনি বলেই মনে হয়। তুমি তো দেখছি দ্বিতীয় কাজী সাহেব হয়ে উঠেছ। ধূমকেতুর আর কোনও চিন্তা রইল না।

মুজফ্ফরের কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠলেন আবদুল হালীম।

আপনি হাসছেন ? কাজীদার এক একটা লেখা যে আমি কীভাবে আদায় করেছি তার অভিজ্ঞতা লিখতে গেলে আস্ত একটা বই হয়ে যাবে। কিন্তু এবার একেবারে নিরুপায় হয়েই নাম ভাঁড়াতে হলো।

তবে লেখাটি কিন্তু হয়েছে বেশ―মুচকি হেসে বললেন আবদুল হালিম।

নজরুল কোথায় গেছে, আর কোনও খবর এসেছে কি না ইত্যাদি নিয়ে আলোচনার মাঝেই আচমকা শোনা গেল সিড়িতে অনেকগুলো ভারী বুটের শব্দ। কারা যেন দ্রুত ওপরে উঠে আসছে। এত সকালে কারা আসছে দল বেঁধে ?

ভাবার আর সময় পাওয়া গেল না। মুহূর্তের মধ্যে উর্দিপরা আট-দশজন পুলিশ এসে ঘিরে ফেলল অফিসটা। সকলেই হতচকিত। মুজফ্ফর খেয়াল করলেন, পুলিশ ঢোকামাত্র বীরেনবাবু নিমেষের মধ্যে কোথায় যেন উবে গেলেন।

পুলিশ অফিসার ভদ্রলোক মুজফ্ফরের দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, কাজী নজরুল ইসলাম কে ?

মুজফ্ফর বললেন, উনি তো নেই।

কোথায় পাব ?

উনি কয়েক দিন আগেই কাজের সূত্রে বাইরে গেছেন।

কোথায় গেছেন ?

তা আমরা জানি না।

হুম। আপনি কে ?

আমি কাজী সাহেবের বন্ধু।

হালীম বললেন, আমিও তাই।

এখানে কী করতে এসেছেন ?

কাজী সাহেব এসেছেন কি না খোঁজ নিতে এসেছিলাম।

কোথায় থাকেন আপনারা ? কী করেন ?

মুজফ্ফর এবং হালীম দুজনেই নিজের আস্তানা এবং কাজের কথা বললেন। মুজফ্ফর যে দ্বৈপায়ন ছদ্মনামে ধূমকেতুতেও লেখেন সেটা আর ইচ্ছে করেই জানালেন না।

অফিসার এবার ঘুরলেন শান্তিপদর দিকে। বেচারা শান্তিপদ এতজন পুলিশ দেখে বেজায় ঘাবড়ে গিয়েছে।

শান্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল পুলিশ।

মুজফ্ফর ভয় পাচ্ছিলেন জেরার মুখে বাচ্চা ছেলেটা আবার নজরুল কোথায় গিয়েছে তা না বলে দেয়। কিন্তু শান্তি বেশ দক্ষতার সঙ্গেই জেরা সামলাল। কোনওভাবেই প্রকাশ করল না নজরুল কোথায় রয়েছে। মনে মনে শান্তিকে ধন্যবাদ দিলেন মুজফ্ফর।

হালীম জিজ্ঞাসা করলেন, অফিসার, আপনাদের এখানে আসার এবং নজরুল ইসলামের খোঁজ নেওয়ার কারণ কি জানতে পারি ?

হ্যাঁ নিশ্চয়ই পারেন, কাজী নজরুল ইসলামের নামে গ্রেফতারি এবং এই ধূমকেতুর অফিস সার্চের পরোয়ানা রয়েছে।

অ, তা কী জন্য জানতে পারি ?

এই যে দেখুন, বলে গভর্নমেন্টের অর্ডারটা মুজফ্ফরের সামনে মেলে ধরলেন অফিসার। মুজফ্ফর কাগজটা দেখে হেসে উঠলেন। ওখানে লেখা রয়েছে ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা ও ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ত’ শীর্ষক প্রবন্ধ বাজেয়াপ্ত করার আদেশ।

আপনি হাসছেন! একটু বিরক্ত হয়েই অফিসার বললেন।

হাসব না! নজরুল ধূমকেতুতে এর মধ্যে কত আগুন ঝরানো লেখা লিখেছেন আর সরকার কি না আজ থেকে মাস দুয়েক আগের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি বাজেয়াপ্ত করার কথা লিখেছে আর এটা কী! এই ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ত’ লেখাটি কার জানেন ? একটি এগারো বছর বয়েসের বাচ্চা মেয়ে লিখেছে প্রবন্ধটি।

হোয়াট! মুখ কুঁচকে অবিশ্বাসের ভঙ্গি করলেন অফিসার।

আমি ঠিকই বলছি অফিসার, এই লেখাটি অধ্যাপক সাতকড়ি মিত্রের ছোটবোন লীলার লেখা। এই বয়েসেই চমৎকার লেখার হাত মেয়েটির। তাই কাজী সাহেব এই লেখাটি ছাপিয়েছিলেন। তো ইংরাজ সরকারের কী এমন দুরবস্থা হলো যে সে একটি নাবালিকার লেখাকেও ভয় পেতে শুরু করেছে! খুবই লজ্জার কথা।

শান্তিপদ চোখ বড় বড় করে তাকিয়েছিল মুজফ্ফর আহমদের দিকে। কী অকুতোভয় এই শীর্ণকায়, মৃদুভাষী মানুষটি। এতগুলো পুলিশের সামনে একটুও না ঘাবড়ে চোখে চোখ রেখে শান্ত অথচ নির্ভীকভাবে কথা বলে যাচ্ছে। এতটুকু বাড়তি উত্তেজনা নেই!

আপনি শিয়োর এই লেখার লেখকের বয়স এগারো ? পুলিশ অফিসার আবারও প্রশ্ন করলেন।

হ্যাঁ আমি শিয়োর।

অফিসারটি একবার কাঁধ ঝাঁকালেন, তারপর সিপাইদের নির্দেশ দিলেন, এই তোমরা সার্চ শুরু কর।

সিপাইরা মিলে অফিসঘর তছনছ করা শুরু করল।

ওরা তিনজন চুপ করে বসে রইলেন।

প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে আতিপাতি করে খুঁজে মাত্র কয়েকটাই ধূমকেতুর ওই সংখ্যাটি পেল, সেইগুলোই বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে গেল। যাওয়ার আগে অফিসারটি মুজফ্ফরের হাতে সার্চ লিস্টটি ধরিয়ে দিলেন। এবার যাওয়ার আগে আবারও জিজ্ঞাসা করলেন, নজরুল ইসলাম কোথায় লুকিয়েছেন আপনি জানেন না তাই না ?

মুজফ্ফর ভাবলেশহীন মুখে বলল, না জানা নেই।

অফিসার বললেন, যাবে আর কোথায় ? শিগগিরই তাকে দেখতে পাবেন। চলি।

পুলিশ চলে যাওয়ার মিনিট পাঁচেক পরই দেখা গেল বীরেনবাবু হাসতে হাসতে অফিসের পুব দিকের মেডিকেল ছাত্রদের বোর্ডিং হাউজ থেকে বেরিয়ে আসছেন।

মুজফ্ফরের সামনে এসে উনি জিজ্ঞাসা করলেন, আপদ গেছে ?

হুঁ তা গেছে, কিন্তু আপনি এক মুহূর্তে কোথায় ভ্যানিশ হলেন ?

ওই যে ওই পথে, বলে বারান্দার দিকে আঙুল তুললেন বীরেনবাবু। ধূমকেতুর অফিসের বারান্দা আর মেডিকেল ছাত্রদের বোর্ডিং হাউজের বারান্দা একটা কাঠের দরজা দিয়ে বিভক্ত। সেটা এমনি বন্ধই থাকে। পুলিশকে ঢুকতে দেখে উনি ওই বারান্দাপথেই দরজার ওপারে অন্তর্হিত হয়েছিলেন।

আসলে ধূমকেতুর লেখাই লিখছিলাম। একেবারে গরম লেখা, একেবারে হাতেনাতে ধরা পড়ে যেতাম না পালালে, বুঝলেন কি না।

হুঁ সে তো বটেই। যাক চলি। বলে উঠলেন মুজফ্ফর। হালীমও উঠলেন। সবে বেরোতে যাবেন, দেখলেন পবিত্র হাঁফাতে হাঁফাতে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে।

কী ব্যাপার এত উত্তেজিত কেন ? জিজ্ঞাসা করলেন বীরেন।

বলছি… আগে অফিসে যা যা গোপনীয় কাগজপত্র রয়েছে সব সরাতে হবে এখনই। ‘আনন্দময়ী’ যে ইস্যুতে বেরিয়েছিল সেই কাগজ কটা রয়েছে, ওগুলো এখনই সরিয়ে ফেলা দরকার। পুলিশ আসতে পারে যে কোনও মুহূর্তে। এক নিশ্বাসে বলল পবিত্র।

হালীম বললেন, পুলিশ এসেছিল, যে কটা কাগজ পেয়েছে নিয়ে গেছে। খুব বেশি ছিল না। কিন্তু পুলিশ আসবে আপনি জানলেন কী করে ?

পবিত্র ধপ করে চেয়ারে বসল, তারপর বলল, ওহ এসে চলেও গেছে। তার মানে ওরা একই সঙ্গে দুই জায়গায় হানা দিয়েছিল আজ।

দুই জায়গায় মানে ?

৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে আজ সকালে পুলিশের রেইড পড়েছিল।

মানে সাহিত্য সমিতির অফিসে ? জিজ্ঞাসা করলেন বীরেন।

হুঁ। ওখানেও কয়েকটা কপি ধূমকেতু উদ্ধার করেছে আর আফজালুল হক সাহেবকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে।

হক সাহেবকে! কেন ? অবাক হলেন হালীম। উনি তো কিছু লেখেননি! বা এখন উনি মুদ্রক প্রকাশক কোনওটাই নন।

মুজফ্ফর বললেন আমি বুঝেছি কেন, হক সাহেব ধূমকেতুর ওই সংখ্যাটির সময়ে মুদ্রাকর ও প্রকাশক ছিলেন। কাজী সাহেব গত মাস থেকে হক সাহেবের নাম বদলে নিজের নাম দিচ্ছেন কিন্তু ওই ইস্যুতে হক সাহেবের নাম ছিল,  সেই কারণেই…

হ্যাঁ ঠিক বলেছেন আপনি। হক সাহেবের গ্রেফতারের খবরটা পেয়েই আমি ছুটে এলাম… কিন্তু এখন শুনছি… তার মানে আজ একই সঙ্গে দুই জায়গায় হানা দিয়েছিল ওরা।

হুঁ, কাজী সাহেবও ধরা পড়লেন বলে। তবে তার আগে ধূমকেতুর ব্যবস্থাটা যদি করে ফেলতে পারেন তাহলেই মঙ্গল।

হক সাহেব শুনলাম অ্যারেস্টেড হয়ে খুবই ঘাবড়ে গিয়েছেন।

স্বাভাবিক, উনি রাজনীতির মানুষ নন, ফলে তার ঘাড়ে রাজদ্রোহিতার দায় চাপালে ঘাবড়াবেন তো বটেই। তবে আমার মনে হচ্ছে কাজী সাহেব ধরা পড়লে হক সাহেবকে ওরা ছেড়ে দেবে। বললেন মুজফ্ফর। যাক চলি।

সকলে পরস্পরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মাথায় ভর্তি চিন্তা নিয়ে বিদায় নিলেন। শান্তিপদ অফিসঘরে চুপ করে বসে রইল একা। ও বুঝতে পারল ধূমকেতুর আলো আর গতি এবার দুটোই রোধ করার ব্যবস্থা শুরু হয়ে গেছে। আর এগোনোর উপায় নেই। এটাই কি তবে শেষ সংখ্যা ? আর বেরোবে না ধূমকেতু ? কাজীদার ভাগ্যেই বা কী রয়েছে কে জানে…

না, থামল না ধূমকেতু। নজরুল সমস্তিপুরে গিয়ে গিরিবালা দেবী আর দুলিকে নিয়ে রওনা হলো কুমিল্লার পথে। কুমিল্লা যাওয়ার আগে আর্য পাবলিশিং হাউজের শরৎচন্দ্র গুহর কাছ থেকে লেখার সম্মানী বাবদ কিছু টাকাও নিয়ে নিল, তারপর পৌঁছল কুমিল্লায়। ওখানে গিয়েই আগে বিরজাসুন্দরী দেবীর কাছে গিয়ে বলল, মা আমার স্বপ্নকে, আমার অস্ত্রকে আমি তোমায় দান করতে চাই। একমাত্র তুমিই পারো একে রক্ষা করতে ?

কী করতে হবে বলো ?

আমার নামে শমন বেরিয়েছে। তাই ধূমকেতু আর আমার নামে রাখা যাবে না। ওটার স্বত্ব তোমার নামে লিখতে দিতে চাই।

বিরজাসুন্দরী সঙ্গে সঙ্গে রাজি। নজরুল কাগজে কলমে আগে স্বত্ব দান করে দিল, তারপর ছদ্মনাম নিল অমরেশ কাঞ্জিলাল। ওই নামে লেখা ডাকে পাঠাল শান্তিপদর কাছে। ধূমকেতুর ২১তম সংখ্যায় সারথী কলামে আর কাজী নজরুল ইসলাম নয়, লেখা প্রকাশ পেল ধূমকেতুর দ্বিতীয় সম্পাদক অমরেশ কাঞ্জিলালের নামে। শুধু কাগজের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে নজরুলের নাম। আত্মগোপন করেই নজরুল ধূমকেতুর জন্য লিখল… ক’দিন আগে সকালবেলা লালবাজারের গ্রহ ধূমকেতু কেন্দ্রে উদয় হয়েছিলেন। একই সময়ে আর এক দল প্রেসেও দেখা দিয়েছিলেন। তারা কাজী নজরুল ইসলামকে চাইলেন। কিন্তু অনুপস্থিত থাকায় দেওয়ালী ও আগমনী সংখ্যার সব কাগজ চিঠিপত্র ও হিসেব ইত্যাদি নিয়ে যান। সবে গ্রহণ লাগা শুরু হলো।

আজ সকালে ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রাবাসে জোরদার মিটিং চলছে। মধ্যমণি নজরুল। নজরুলের আগমনে স্বাভাবিকভাবেই মাহমুদসহ কলেজের তরুণ ছাত্ররা উল্লসিত। কুমিল্লায় আসা ইস্তক নজরুল প্রায় দুই বেলাই চলে আসে এই কলেজ হস্টেলে। গান-আড্ডার আসর বসায়। আজও বসেছে। আলোচনা হচ্ছিল ধূমকেতু নিয়ে। মাহমুদ বলছিল, কাজীদা আপনার ধূমকেতুর প্রতিটি সংখ্যা সত্যিই আমাদের ভেতরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। শুধু আমাদের কেন আমার তো মনে হয় যারাই ধূমকেতুর পাঠক তারা সকলেই…

উঁহু আমি আপত্তি জানাচ্ছি একটু। বলে উঠল মাহমুদের সহপাঠী ধূমকেতু আগুন জ্বালিয়েছে সেটা মানছি, কিন্তু সেই আগুন যে সকলের ক্ষেত্রে একই রকম সেটা মানতে পারছি না।

ঠিক বুঝলাম না তোর কথা। বলল আজিজুর।

দাঁড়া বোঝাচ্ছি, বলে উঠে গিয়ে একটা ইসলাম দর্শন পত্রিকার সংখ্যা নিয়ে এসে বলল, একটা লেখার কিছুটা অংশ তোদের পড়ে শোনাচ্ছি, কাজীদা হয়তো পড়েছেন কিন্তু তোরা জানিস কিনা জানি না। পত্রিকাটির একটা পৃষ্ঠা বার করে পড়তে শুরু করল আজিজুর :

‘হিন্দুয়ানী মাদ্দায় ইহার মস্তিষ্ক পরিপূর্ণ… মুসলমানের ঔরসেও অনেক নাস্তিক শয়তান জন্মগ্রহণ করিয়াছে, মুসলমান সমাজ তাহাদিগকে আস্তাকুঁড়ের আবর্জনার ন্যায় বর্জন করিয়াছে, সুতরাং এ যুবক কোন ছার!… নরাধম ইসলাম ধর্মের মানে জানে কি ? খোদাদ্রোহী নরাধম শয়তানের পূর্ণাবতার।…একটা ধর্মজ্ঞান্য বুনো বর্বরের নিকট―আকাট মূর্খ পাষণ্ডের নিকট আর কি আশা করা যাইতে পারে! এমন অনেক পাষণ্ডই পৃথিবীতে জন্মিয়াছে এবং শেষটা নিকৃষ্ট জীবের মওত মরিয়া স্বীয় পাপ লীলার অবসান করিয়াছে। খাঁটি ইসলামী আমলদারি থাকিলে এই ফেরাউন বা নমরুদকে শূলবিদ্ধ করা হইত বা উহার মুণ্ডপাত করা হইত নিশ্চয়।’

এইটুকু পড়ে থামল আজিজুর। ঘরভর্তি নীরবতা। কারওই বুঝতে বাকি নেই এত কুৎসিত আক্রমণের লক্ষ্য নজরুল।

আচমকাই হা হা করে ঘর ফাটিয়ে হেসে উঠল নজরুল। বলল, আরে এই লেখাটা তো তুমি খাপছাড়া পড়লে, ভূমিকার অংশটা থেকেই আসল মজা। ওখানটাও একবার পড়ে শোনাও সকলকে।

আপনি হাসছেন কাজীদা! এ কী ছোটলোকের ভাষা! এমন ভাষা কোনও কাগজে বেরোতে পারে ?

আরে এই পত্রিকা তো আমাকে স্বেচ্ছাচারী সারথী আর ধূমকেতুকে অমঙ্গলের অগ্রদূত আখ্যা দিয়েছিল। দাও দেখি কাগজটা, বলে আজিজুরের হাত থেকে ইসলাম দর্শন পত্রিকাটি নিয়ে বলল এই যে লেখাটা আজিজুর পড়ে শোনাল, এই নিবন্ধের নাম হলো লোকটা মুসলমান বা শয়তান। অর্থাৎ মুসলমান ছাড়া বাকি সকল মানুষ শয়তান বলে এই নিবন্ধকার মুন্সী মোহাম্মদ রেয়াজুদ্দিন আহমদের ধারণা। যাই হোক লেখার ভূমিকার অংশ কিছুটা শোনো :

‘ধূমকেতুর ধর্মদ্রোহিতা ও উহার সারথীর স্বেচ্ছাচারিতা এত বাড়িয়া গিয়াছে―রক্তাম্বর ধারনি মা ও ভৃগু বন্দনা হইতে আরম্ভ করিয়া মা ভৈঃ ব্যোম কেদার ব্যোম ভোলানাথ হলো বল রাম স্কন্ধে বোল হরি হরি বোল প্রভৃতি কুফরী কালাম তাহার মুখ দিয়া অনর্গল এত অধিক পরিমাণে নির্গত হইতেছে যে আমরা বাধ্য হইয়া ভাবিয়াছিলাম যবন হরিদাসের এরূপ উৎকট অবতারকে সমালোচনা করিয়া সংযত করিবার চেষ্টা করা পণ্ডশ্রমমাত্র। সেইজন্য ঐ শ্রেণির পদার্থ বা ঐ জাতীয় জীবের আর কোন সমালোচনা করিব না বলিয়াই স্থির করিয়াছিলাম। কিন্তু দুষ্ট ধূমকেতু ও উহার দুর্বিনীত সারথী এখন কেবল হিন্দু পুরাণের চর্বিত চর্বনে ক্ষান্ত না থাকিয়া পবিত্র ইসলাম ধর্ম ও ইসলামী শরা-শরীয়তের উপর পর্যন্ত শয়তানী আক্রমণ আরম্ভ করিয়া দিয়াছে। তাই ধর্মপ্রাণ মুসলমান সমাজ চঞ্চল ও অধীর হইয়া উঠিয়াছেন।’

এইটুকু পড়ে পত্রিকাটি বন্ধ করে নজরুল মুচকি হেসে ছেলেদের বলল, কী বুঝলে ?

মাহমুদ তার প্রাণপ্রিয় কাজীদা সম্পর্কে এমন বিষোদ্গার শুনে বলল, লোকটা মুসলমান না, শয়তান।

শুনে হা হা করে হেসে উঠল নজরুল। বলল আসলে ইংরাজ হলো দেশের বাইরের শত্রু, আর এরা হলো দেশের ভেতরের শত্রু। এরা না জানে কোরান না জানে পুরাণ, এরা হিন্দুও নয়, মুসলমানও নয়, ভারতবাসীও নয়।

আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি কাজীদা, ধূমকেতুর মতো কাগজেরো ব্রিটিশ ছাড়া শত্রু থাকতে পারে! বলল সতীশ।

কেন থাকবে না ? এ তো একটা নমুনা দেখলে। আমার বিদ্রোহী কবিতা নিয়েও যে কত আক্রমণ করা হয়েছে তা তোমরা জানো না। সেই গল্প বলব একদিন। যাক গে এইসব বাদ দাও। আগামীকাল তাহলে মিছিল করছি তো আমরা ?

হ্যাঁ কাজীদা। কাল গোটা কুমিল্লার তরুণদল তোমার নেতৃত্বে মিছিলে হাঁটবে।

সাবাশ, হাঁটু চাপড়েয়ে বলে উঠল নজরুল।

কিন্তু আমার একটা কথা রয়েছে, বলল রফিকুল।

কী কথা ?

কাজীদার কি এই মিছিলে থাকা উচিত ? পুলিশ আপনাকে খুঁজছে, কাল মিছিল বেরোবে সকলেই জানে, আপনিও জানেন, তারপরেও…

নজরুল মুচকি হাসল, বলল পুলিশ খুঁজছে জানি, আর আমার আসল কাজও হয়ে গিয়েছে। ধূমকেতুর ব্যবস্থা করে ফেলছি আর আমার চিন্তা নেই।

কাজীদা ধূমকেতুর গতবারের সংখ্যায় তোমার লেখা ম্যায় ভুখা হুঁ পড়লাম আহা কী অসাধারণ লেখা! চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এসেছিল আমার!

কোনটা বাদ দিবি বল ? ভিক্ষা দাও ওগো পুরবাসী ভিক্ষা দাও! তোমাদের একটি সোনার ছেলে ভিক্ষা দাও! আমাদের এমন একটি ছেলে দাও যে বলবে আমি ঘরের নই, আমি পরের, আমি আমার নই আমি দেশের…আহা জানেন কাজীদা আপনার এই লেখাটি আমাদের কুমিল্লার প্রতিটি যুবকের মুখে মুখে ঘোরে।

নজরুল জিজ্ঞাসা করল, কাল তারা সকলে মিছিলে আসছে তো ?

কাল বোধহয় গোটা কুমিল্লা তোমার সঙ্গে হাঁটবে।

সাবাশ, এই তো চাই!

আরেক প্রস্থ চা এল। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে নজরুল বলল, ভাইসব আমি জানি না কাল মিছিলেই তোমাদের সঙ্গে আমার শেষ দেখা কি না। যদি তাইই হয়, তাহলে আজ তোমাদের একটা টাটকা কবিতা শুনিয়ে দিই, সমস্তিপুর যাওয়ার পথে এইটা লিখেছিলাম।

নজরুলের কণ্ঠে তারই নতুন কবিতা শোনার আগ্রহে হৈ হৈ করে উঠল ছেলের দল।

নজরুল একবার মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকড়া চুল পিছনে সরিয়ে নিল। তারপর পকেট থেকে ওর লেখার খাতাখানি বার করে খোলা গলায় পড়তে শুরু করল :

‘এবার আমার জ্যোতির্গেহে তিমির প্রদীপ জ্বালো

আনো অগ্নিবিহীন দীপ্তিশিখার তৃপ্তি অতল কালো।

তিমির প্রদীপ জ্বালো…

দিনের আলো কাঁদে আমার রাতের তিমির লাগি

সেথায় আঁধার বাসর ঘরে তোমার সোহাগ আছে জাগি…’

বেলা সাড়ে দশটা। কুমিল্লার কান্দিরপাড়ের পথে হাজার হাজার মানুষ। এত বড় মিছিল কুমিল্লার মানুষ আগে কখনও দেখেনি। মিছিলের সর্বাগ্রে নজরুল। পরনে ঘোড়সওয়ারের সামরিক পোশাক। গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে উদাত্ত কণ্ঠে গাইছে : 

‘বিধির বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান―

তুমি কি এমন শক্তিমান!

আমাদের ভাঙাগড়া তোমার হাতে এমন অভিমান

তোমাদের এমনি অভিমান ॥’

নজরুলের সঙ্গে গলা মেলাচ্ছে অসংখ্য মানুষ :

‘চিরদিন টানবে পিছে, চিরদিন রাখবে নিচে

এত বল নাই রে তোমার, সবে না সেই টান ॥’

যে রাস্তা দিয়ে মিছিল যাচ্ছে তার দুই পাশে যত বাড়ি-ঘর সেখানের মেয়ে বউরা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ শাঁখ বাজাচ্ছেন, কেউ উলু দিচ্ছেন, কেউ দুই হাত জড়ো করে প্রণাম করছেন মিছিলকে আর সবার সামনে মাথা ঝাঁকিয়ে প্রাণখোলা গলায় গাইতে থাকা টগবগে তরুণটিকে দেখে মুগ্ধ হয়ে ভাবছেন, হ্যাঁ এমন ছেলেই তো চাই। এই ছেলেরাই পারবে ভারতমায়ের সম্মান বাঁচাতে। মিছিলের মধ্যেই মিশে রয়েছে সাদা পোশাকের অসংখ্য পুলিশ। আজ শুধু সময়ের অপেক্ষা। মিছিল যখন ঝাউতলার পুব দিকের মোড়ের মাথায় পৌঁছল নজরুল দেখল অন্তত দুই-তিনশ উর্দিপরা পুলিশ দাঁড়িয়ে রয়েছে। নজরুলের পাশে থাকা মাহমুদ ফিসফিস করে বলল, কাজীদা, পালাও, তোমাকে ধরবে।

নজরুল কোনও উত্তর দিল না, শুধু মুচকি হেসে আবার গাইল―

‘শাসনে যতই ঘেরো আছে বল দুর্বলেরও

হও না যতই বড়ো আছেন ভগবান।’

শত-সহস্র কণ্ঠে মুখরিত হলো কান্দির আকাশ বাতাস :

আমাদের শক্তি মেরে তোরাও বাঁচবি নে রে

বোঝা তোর ভারী হলেই ডুববে তরীখান

বিধির বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান…।’

মিছিল এসে থমকে গেল মোড়ের মাথায়। পুলিশ রাস্তা ব্যারিকেড করে দাঁড়িয়ে। মাহমুদ বুঝল কাজীদার জন্যই আজ এত পুলিশ এসেছে। নজরুল মিটিমিটি হাসছে।

দুই তিনজন পুলিশ অফিসার এগিয়ে এলেন সামনে। নজরুলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কাজী নজরুল ইসলাম আপনি ?

হ্যাঁ।

আপনার নামে শমন রয়েছে।

জানি।

আমাদের সঙ্গে আপনাকে যেতে হবে ?

মিছিলটা শেষ হোক তারপর।

নাহ, এখনই।

আশপাশের ছেলেরা গর্জে উঠল। নজরুল হাত তুলে থামাল তাদের। পুলিশও জানে এই বিপুল জনতা নজরুলকে তাদের ভগবান মানে, তার একটা ইশারা পেলেই সকলে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, অন্তত নজরুলকে গ্রেফতার করতে বাধা দিতে পারে। আর এই বিপুল জনতাকে আটকানোর ক্ষমতা মুষ্টিমেয় পুলিশের নেই। তবে এই মিছিল শান্তিপূর্ণ এবং পুলিশের কাছে খবর রয়েছে নজরুল বিচক্ষণ ব্যক্তি। সে পুলিশকে আক্রমণ করার মতো কাজে লিপ্ত হবে না।

নজরুল বলল বেশ, যাচ্ছি। একটু সময় দিন। বলে মিছিলের দিকে ঘুরে দাঁড়াল সে। দুই হাত তুলে বলল, আমার ভাইয়েরা, ইংরাজ সরকারের পুলিশ আমাকে নিয়ে যেতে এসেছে। আর আমাকে যেতেও হবে। দেশদ্রোহিতার অপরাধে হয়তো বিচারে আমার কারাদণ্ড হবে, কিন্তু তাতে আমার এতটুকুও আফশোস নেই। কারণ আমি জানি, বাংলার প্রতি ঘরে প্রতিদিন ক্ষুদিরাম, বাঘা যতীন জন্ম নিচ্ছে। জন্ম হচ্ছে তিলক, চিত্তরঞ্জন, গান্ধীজির। এই মিছিলের প্রতিটি মুখে আমি যে বিদ্রোহের আগুন দেখতে পাচ্ছি তা দেশ স্বাধীন হওয়ার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত যেন না নেভে। মিছিল যেন না থামে, এগিয়ে চলুক।

সকলেই ফুঁসছিল। কেউ নজরুলকে এইভাবে ছেড়ে দিতে রাজি নয়। কে একজন চিৎকার করে উঠল, এইভাবে আপনাকে পুলিশের হাতে তুলে দিলে গোটা কুমিল্লাকে মানুষ চিনবে কাপুরুষ হিসেবে। আমরা কিছুতেই আপনাকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে পারি না।

প্রিয় বন্ধুরা, কুমিল্লার মাটি বীরের। এখানে শত শত যোদ্ধা রয়েছে তা কারও অজানা নয়, আমি ধরা দিচ্ছি স্বেচ্ছায়। কারণ দেশের জন্য একবার অন্তত কারাবরণ করা মস্ত গৌরবের। আমি জানি আপনারা কেউ আমাকে সেই গৌরব অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করবেন না।

ভারত মাতা কি জয়, বন্দে মাতরম ধ্বনিতে মুখরিত হলো চারদিক। সকলের সামনেই নজরুলের কোমরে দড়ি আর হাতে হাতকড়া পরিয়ে এগিয়ে চলল পুলিশ। পিছনে হাজার হাজার ক্ষুব্ধ জনতা দেশমাতৃকার, নজরুলের জয়ধ্বনি দিতে দিতে এগোতে থাকল। সে এক অসামান্য দৃশ্য। নজরুলের ঠিক পিছনেই হাঁটছিল মাহমুদ। ওকে ইশারায় পাশে ডাকল নজরুল। বলল শোন, সেনবাড়িতে খবর দিয়ে দে, আর হ্যাঁ তাকে বলে দিস সে যেন চিন্তা না করে, মন খারাপ না করে, কাজী নজরুল ইসলাম তাকে ভালোবাসে।

মাহমুদের বুঝতে অসুবিধা হলো না সেন বলতে কাকে বোঝাতে চাইছে কাজীদা। দুলিকে মনে মনে ভাবিই ডাকে মাহমুদ। ঘাড় নাড়ল ও।

কুমিল্লা থানায় নিয়ে আসা হলো নজরুলকে। গোটা থানাকে ঘিরে রইল পুলিশ। বিপুল জনতার তুলনায় সামান্যই পুলিশ। নজরুলকে হাজতে ভরে দেওয়া হলো প্রথমেই। জীবনে প্রথমবার গরাদের ভেতরে প্রবেশ করেই নজরুল  চিৎকার করে দুই হাত তুলে বলে উঠল বন্দে-এ-এ-এ মাতরম!

হাজতে যে কয়েকজন বন্দি ছিলেন তারাও সমস্বরে বলে উঠল বন্দে মাতরম।

নজরুলের কণ্ঠ শুনে বাইরের জনতাও কণ্ঠ ছাড়ল। কেঁপে উঠল পুলিশের বুক। নজরুল পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে এই খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে।

জরুরি মিটিং বসল। ওপরওলার অর্ডার রয়েছে আজ নজরুলকে হাজতে রেখে আগামীকাল কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার। কিন্তু পরিস্থিতি সুবিধার নয়। শুধু মিছিলের লোক নয়, নজরুলকে পুলিশ ধরেছে তা কানে পৌঁছনোমাত্র আবালবৃদ্ধবনিতা সকলেই এসে জমায়েত হচ্ছে থানার সামনে। বেলা বারোটা নাগাদ গ্রেপ্তার করা হয়েছিল নজরুলকে। এখন একটাও বাজেনি। গোটা কুমিল্লা ও তার আশপাশের অঞ্চল থেকেও ক্রমাগত মানুষ এসে জড়ো হচ্ছে। বাড়ছে ক্ষোভ। যে কোনও মুহূর্তে উত্তেজিত জনতা বিপদ ঘটিয়ে ফেলতে পারে। চৌরিচোরার ঘটনা কারও অজানা নয়। মুহূর্মুহু স্লোগান উঠছে নজরুলকে অবিলম্বে ছেড়ে দিতে হবে। পুলিশকর্তারা যোগাযোগ করলেন কলকাতা হেড অফিসে। পরিস্থিতি আন্দাজ করতে পেরে নির্দেশ এল, নজরুলকে কুমিল্লায় রাখার দরকার নেই। আজই রওনা হতে হবে নজরুলকে নিয়ে। আজই মানে রাতের চট্টগ্রাম মেল। শিয়ালদা স্টেশন পৌঁছবে আগামী কাল সকালে। কলকাতা পৌঁছনো না পর্যন্ত স্বস্তি নেই।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল। চারদিকে মানুষের ঢল। পুলিশকর্তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। এই ক্ষুব্ধ জনতার স্রোত পেরিয়ে নজরুলকে রেলস্টেশনে নিয়ে যাওয়া দুষ্কর। ইতোমধ্যে আরও দুই ব্যাটেলিয়ন পুলিশ এসে গেছে। কিন্তু ওই বিশাল জনতার তুলনায় খুবই সামান্য। হাওয়াতে শীতের ছোঁয়া সবে লেগেছে, ইদানীং দিনের আলো নিভছে দ্রুত। তাই বিকেল হতেই অন্ধকার নেমে এল। এবার নজরুলকে নিয়ে স্টেশনে যেতে হবে। বেরুনোর সময় কিছু একটা বিপদ হতে পারে এই আশঙ্কা করলেন পুলিশ কর্তৃপক্ষ। কোনও উপায় না বার করতে পেরে পুলিশ কর্তারা শেষে নজরুলেরই শরণাপন্ন হলেন, বললেন, আপনি নিজে গিয়ে জনতাকে শান্ত হতে বলুন, সরকারের কাজে বাধা দিলে সকলেরই সমস্যা হবে, আর আমাদের অবস্থাটাও একটু বুঝুন। আমরা হুকুমের চাকর।

পুলিশের এমন কাচুমাচু অবস্থা দেখে হো হো করে হেসে উঠল নজরুল, তারপর বলল চলুন যাচ্ছি। সকলে তৈরি হয়ে নিল। নজরুলকে হাজত থেকে বার করে থানার বাইরে আনা হলো। ওকে দেখে আবার আকাশ কাঁপিয়ে ধ্বনি উঠল, বন্দে মাতরম!

নজরুলও কণ্ঠ মেলাল। তারপর যখন অগুণতি মানুষ নজরুলকে এখনই ছেড়ে দিতে হবে এই বলে সোচ্চারে দাবি তুলল তখন দুই হাত তুলে তাদের শান্ত করে। জোর গলায় বলল, দেশের জন্য লড়াই করে কত শত বিপ্লবী প্রতিদিন গ্রেফতার হচ্ছে, জেলে যাচ্ছে, শহিদ হচ্ছে। তাই আমার এই গ্রেপ্তারি গৌরবের, আজ আমার প্রকৃত স্বাধীনতা সংগ্রামী রূপে দীক্ষা হলো। আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ, আমাকে এই গৌরব অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করবেন না।

নজরুলের কথা শান্ত হয়ে শুনল সকলে। তারপর ওর নামে ভারতবর্ষের নামে জয়ধ্বনি উঠল। নিশ্চিন্ত হলো পুলিশ মহল। প্রখর পুলিশি পাহারায় রাতের চাটগাঁ ট্রেনে ওঠার ঠিক আগের মুহূর্তে চারদিকে তাকাল নজরুল। প্ল্যাটফর্মে ওকে দেখতে আসা, বিদায় জানাতে আসা প্রতিটি মানুষকে দেখে ওর মনে হলো প্রমীলা অশ্রু টলোমলো চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ফিস ফিস করে বলল, বিদায় প্রমীলা, জানি না আবার কবে তোমার কাছে আসতে পারব, কিন্তু প্রেয়সী আমার, তুমি অপেক্ষায় থেকো।

 লেখক : কথাসাহিত্যিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button