আর্কাইভপ্রচ্ছদ রচনা

প্রচ্ছদ রচনা : ভাষা আন্দোলনের ঐতিহ্যে আহমদ রফিক : সনৎকুমার সাহা

প্রচ্ছদ রচনা : ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক―মূল্যায়ন

তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় নেই বললেই চলে। শুধু একবার দেখেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের কোনও আলোচনা অনুষ্ঠানে। টুকটাক একটু-আধটু কথা হয়েছে। তাঁর মনে থাকার কথা নয়। সামনে থেকে তাঁকে দেখলাম, এ আমার সৌভাগ্য। নাম জানতাম আহমদ রফিক। সক্রিয় ছিলেন ভাষা-আন্দোলনে। আলাদা সমীহ জাগে তাতে। শুনেছি, পেশায় চিকিৎসক। এ নিয়ে কিছু ভাবিনি। কিন্তু এখনও, নব্বই ছুঁই ছুঁই বয়সে, মেধার কর্ষণায় তিনি যে সক্রিয়, সমাজ-সাহিত্য-সংস্কৃতি চিন্তায় গভীরভাবে নিবিষ্ট, রবীন্দ্রনাথের অনুধাবনে ক্লান্তিহীন, বিবিধ অনুশীলনে নিরাসক্ত, এসবই ব্যতিক্রমী। আমাদের অবাক করে বই কি!

ভাষা আন্দোলন আমাদের আবেগ ও সংগ্রামের এক শিখর-চূড়া। আক্ষরিক অর্থেই স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে গণমানসে আকাক্সক্ষার ও অর্জনের দিকচিহ্ন ধাপে ধাপে অগ্রসর হয় সেখান থেকেই। সব পবিত্র সংকল্পের তা মূলভূমি যেন। ঘটে যাবার পর নিজেই নিজের পরিচয়। ঘটনার কলা-কুশলীরা ক্রমশ পশ্চাৎপটে দূরে সরেন। যদিও শহীদস্মৃতি অমর থেকে যায়।

তবে সময়ের সঙ্গে চলমান জীবন নানাভাবে জড়ায়। শ্রেয় ভাবনায় সরল বিশ্বাস সবার চিরকাল বজায় থাকে না। ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের পাশা-খেলায়, অথবা কায়েমি স্বার্থের প্রলোভনে তাড়িত হয়ে কিংবা সংকীর্ণতার কানাগলিতে সিঁধিয়ে গিয়ে দিগি¦দিক কাঁপানো কত মহৎ সংগ্রামের নায়কেরা জমাটবাঁধা অন্ধকারে যে হারিয়ে গেছেন, অথবা পারস্পরিক হানাহানিতে বিনষ্ট হয়েছেন, তার ইয়ত্তা নেই। মানব ইতিহাসের যুগান্তকারী রক্তক্ষয়ী বহু ঘটনা এর সাক্ষী। যে ফরাসি বিপ্লব মানবচৈতন্যে অক্ষয় ছাপ রেখে যায়, তার প্রধান নায়কেরা প্রায় সবাই পারস্পরিক দ্বন্দ্বে একের পর এক গিলোটিনে প্রাণ হারান। রুশ বিপ্লবের পরিণতি আরও ভয়াবহ। খন্দকার মোশতাক তো ছিলেন কাগজে-কলমে আমাদের মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম নেতা। আলজিরিয়াতেও স্বাধীনতার স্থপতি বেনবেল্লা বা বেনখেদ্দা ক্ষমতার কেন্দ্রভূমি থেকে অপসারিত হন, লক্ষ্য অর্জনের অল্প পরেই অসম্মানের অবতলে। সাম্প্রতিক ইতিহাস এমন উদাহরণ মেলে ধরে আরও অনেক।

তবে লক্ষ্য যদি মানবমুক্তির অভিমুখী হয় এমন সব ডামাডোলের পরেও তা ধ্রুবতারার মতো স্থির থেকে জ্বলে। প্রেরণা তার ফুরোয় না। কালের সীমায় নেতৃত্বে প্রধান যাঁরা, তাঁদের ভূমিকা পরে যেমনই হোক। একে অতিক্রম করে গণমানুষের চেতনার মান সামনে এগোয়। সংগ্রামে-আন্দোলনে সরাসরি যাঁরা যোগ দেন, চিত্তভূমি তাঁদের সাড়া দিলে তাঁরা আর আগের সীমায় আটকে থাকেন না; ইতিবাচক রূপান্তরের সাথী হন। যে যেমন পারেন, নানা কাজে অবদান রাখেন। সমষ্টি-মানসে রূপান্তরের ছাপ পড়ে। ঘটনাস্রোত যদি আপাতদৃষ্টে বিপরীতমুখী হয়, তবু। নিকটে অথবা দূরে তার প্রকাশ অনিবার্য। মানব প্রকৃতি স্বাভাবিক জ্ঞান-বল-ক্রিয়ায় সব মিলিয়ে আলোকাভিসারী।

বাহান্নোর ভাষা আন্দোলন থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের পথ-পরিক্রমাতেও এমনটিই দেখি। ইতিহাসের বাঁকগুলো তাদের দ্বান্দ্বিক বাস্তবতা, সবার জানা। পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। একটু শুধু ফিরে তাকাই ওই সময়ে তার প্রধান নায়কদের দিকে। অনেকেই তাঁরা কালের নির্দেশ বোঝায় ব্যর্থ হয়েছেন। তাৎক্ষণিক লাভের আশায় পেছনমুখো ছুটেছেন। অথবা সমকালীন বাস্তবতাকেই চূড়ান্ত জেনে তার সঙ্গে আপস করেছেন। ইতিহাস তাঁদের মনে রাখেনি। কেউ কেউ আবার ভ্রান্তিবিলাসে ‘ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে’ চিৎপটাং হয়েছেন। সমূহ ক্ষতিও ডেকে এনেছেন। গণমানুষ এক-পাও এগোয়নি। নিরাসক্তভাবে আজ তাঁদের দিকে ফিরে তাকালে মনে হয়, ব্যক্তিগতভাবে অধিকাংশই তাঁরা ব্যর্থ জীবন, অথবা মিথ্যা জীবন কাটিয়েছেন। করুণা পাবার যোগ্যতাও হারিয়েছেন অনেকে।

একুশে ফেব্রুয়ারি স্বয়ং কিন্তু উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়েছে। আমাদের সকল অহংকারের, সকল অগ্রাভিযানের আদি-জননী যেন। চলমান জীবন ওই সংগ্রামের নায়কদের কথা, কারও-কারও বিপথগামিতার কথা সামান্যই মনে রাখে। যদিও যা ঘটে, তা অবিনশ্বর। যাঁরা ইতিবাচকভাবে শামিল হন, তাঁরা অনেকেই তা থেকে বেঁচে থাকার অর্থ আহরণ করেন। শুধু নিজেকে নিয়ে নয়, জনসমুদয়ের সবটাকে মাথায় রেখে। তাঁদের পথ চলার লক্ষ্য বদলে যায়। পথ প্রসারিত হয়। গণমানসও ক্ষুদ্র-বেষ্টনী থেকে মুক্তি খোঁজে। নিজের অজানতেই তা সামনে তাকায়। অগ্রসর হয়। বাস্তব হয় ও থাকে বহুবিধ নিষেধের কাঁটাতারে জড়ানো। দুঃখের তিমিরে ঢাকা। তবু মঙ্গল-আলোক জ্বলে। কোনও ব্যতিক্রম হিসেবে নয়। মানুষের ইতিহাসে ঘটে চলেছে এমনটিই। ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব, এরাও তাৎক্ষণিকভাবে কোনও প্রসন্ন প্রভাতের জন্ম দেয়নি। কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকার রূপ-কলা ভেতর থেকে বদলাতে শুরু করেছে। ছড়িয়েছে তারা গোটা পৃথিবীতেই। আমাদের বেলায় একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাবও এই রকম। ‘স্তব্ধ আসনে প্রহর’ গুনে চলে। পূর্ণতা পায় একাত্তরে চূড়ান্ত বাঁচা-না-বাঁচার সংগ্রামে। এখনও তা প্রাণদায়িনী।

যদ্দুর জানি, বাহান্নোর ভাষা-আন্দোলনে আহমদ রফিক বিশিষ্ট নায়ক ছিলেন। ভাষার ওই সংগ্রামে তিনি ছিলেন সজ্ঞানে আত্মনিবেদিত। এবং তা আবেগসর্বস্বমাত্র ছিল না। চৈতন্য-শাসিত শ্রেয়বোধও তাতে যুক্ত ছিল। ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির বিচার তিনি করেননি। প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। মিলিত প্রতিরোধে শামিল হয়েছেন।

‘ভালো-খারাপ, যাই হোক, আমি পাকিস্তানি। তার রাষ্ট্রীয় নির্দেশই চূড়ান্ত’―এই মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ তখনও তুমুল। আবেগ অন্ধ। কায়েমি স্বার্থের অঙ্গুলি হেলনে আক্রোশ নগ্ন। তিনি কিন্তু ভয় পাননি। আত্মদীপ জ্বেলে রেখেছেন। ভাষার সংগ্রামের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক লক্ষ্যে স্থির থেকেছেন। কোলাহল থেকে দূরে সরে আপন চিন্তা ও কর্মকে তার উদ্দেশে নিরলস নিবেদন করে চলেছেন। এখনও। তাঁর পেশার জগতে এমনটি অহেতুক হতে পারে, অবান্তর। তিনি পরোয়া করেননি। অবশ্য পেশার দাবিকে যে উপেক্ষা করেছেন, তাও নয়। সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে বৈষয়িক কর্মকাণ্ডে তিনি তাঁর দায়িত্ব যথাযথ পালন করে চলেছেন। কোথাও কোনও গোল বাধেনি। কখনও অশ্রদ্ধেয় হননি। আত্মমর্যাদা তাঁর পুরোপুরি বজায় থেকেছে। লোভের মরীচিকা তাঁকে টানেনি। গণজীবনে ঘূর্ণাবর্তের পৌনঃপুনিক অভিঘাতে তাঁর পদস্খলন ঘটেনি।

তবে ভাষাসৈনিকের পুণ্য স্মৃতি লালন করে তিনি বিকশিত হয়েছেন অন্যতর ও বৃহত্তর পরিমণ্ডলে। ভাষার সেবায় নিষ্ঠার সঙ্গে নিজেকে তিনি নিবেদন করে চলেছেন এখনও। ঢাকঢোল পিটিয়ে নয়। সহজ পথের হাতছানিতেও নয়। আপন মেধার ও চিন্তার নৈর্ব্যক্তিক প্রয়োগে আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রধান কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে। এবং এ সবই তাঁর আপন প্রাণের তাগিদে, যে তাগিদ, যে জিজ্ঞাসা তাঁর ভেতরে জেগে ওঠে আমাদের ভাষার সংগ্রামে অসংকোচ সাহসে যোগ দিয়ে। সহজ সুখের অন্বেষণ তাঁর নয়। জনপ্রিয় বা বিতর্কিত হয়ে পাদপ্রদীপের আলো নিজের ওপর ফেলার কসরৎ তিনি করেন না। বরং চিন্তার উৎকর্ষেই তাঁর আগ্রহ। তার পরিণাম ফল সামূহিক কল্যাণ কামনার অভিসারী।

আপাতদৃষ্টে এই সংযোগ-রেখা হয়ত প্রকট নয়। তাঁর অনুশীলনে এমন কোনও অভিপ্রায়ের ইংগিতটুকুও থাকে না। কিন্তু বিষয় নির্বাচন ও তার উপস্থাপনাই বলে দেয়, তিনি চান, তাঁর পাঠক যুক্তির পথে হাঁটুন। প্রয়োজনে তর্ক করুন। এই তর্ক কাউকে ছোট করে না। বরং প্রশ্ন―মীমাংসায় নৈর্ব্যক্তিকভাবে উপকারী। তাঁর এ মানসবৃত্তি একুশে ফেব্রুয়ারির আকাক্সক্ষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। তার অনুল্লেখিত এষণা ছিল অবশ্যই, বাংলাভাষা যেন উৎকৃষ্ট চিন্তার বাহন হয়; যেন আবেগের প্রাথমিক স্তরের উচ্ছ্বাসেই তা নির্বাপিত না হয়; যেন সৃষ্টিক্ষম কল্পনা তাতে মননেও ঋদ্ধ হয়। আহমদ রফিকের রচনার অভিমুখ এইগুলিই। আমরা যদি তরল আবেগের সরল সমীকরণে আটকে থাকি, তবে আহমদ রফিক আমাদের দৃষ্টিসীমায় এলেও হয়ত তাঁকে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইব। কিন্তু তা হবে একুশে ফেব্রুয়ারির সমন্বিত বার্তাকে উপেক্ষা করা। তা আমাদের সাবালক হতে বলে; সক্ষম হতে বলে; স্বাধীনভাবে চিন্তা করায় তৎপর হতে বলে।

ভাষার সমৃদ্ধির প্রয়োজন এখানেই। ভিন্ন ভাষা মাধ্যম হলে চিন্তার সঙ্গে সরাসরি অন্বয় তাতে ঘটে না। গণমানুষের কাছে তা পৌঁছে না। কতিপয়ের কালোয়াতিতে আটকে থাকে। বাহাদুরি দেখিয়ে অতিরিক্ত বাহবা মেলে হয়ত। কিন্তু প্রকৃত সংযোগ না থাকায় জনগণের সাড়া মেলে না। হয়ত হাত সাফাইয়ের খেলা দেখিয়ে তাদের হাততালি পাওয়া যায়। বিভ্রান্তি বাড়িয়ে তাদের হতচকিতও করা যায়। কিন্তু তাদের চিন্তার মান পৌরাণিক যুগেই আটকে থাকে। নতুন প্রশ্ন, নতুন সম্ভাবনা, এগুলো সরাসরি তাদের মনে জাগে না। পরের মুখে ঝাল খেয়ে তারা তাদের প্রতিক্রিয়া জানায়। বিভ্রান্তও হয়। এতেই অভ্যস্ত থাকে।

আহমদ রফিক প্রধানত বাংলা-ভাষাকেই তাঁর চিন্তার ও ভাব-প্রকাশের বাহন করেন। উৎকৃষ্ট চিন্তা সব। মেধার কর্ষণাও নিরলস ও গভীর। বিষয় যাই হোক, ফাঁকির কারবার তাঁর নেই। চটুলতার আমদানি করে রসিক সাজাতেও তিনি বিমুখ। নৈর্ব্যক্তিক চিন্তা ও সামূহিক কল্যাণ, এরাই তাঁর ভাবনার অবলম্বন ও উদ্দেশ্য। বিশেষ কারও মন জুগিয়ে লেখা তাঁর ধর্ম নয়। তাঁর বিষয়-ভাবনায় অন্যরাও শামিল হোক, অনুমান, এই তাঁর অভিপ্রায়।

তবে সেজন্যে অনুশীলনের প্রস্তুতি চাই। পরিশীলনের নিরন্তর প্রয়াসও। এরাও আমাদের ভাষার সংগ্রামের নির্দেশনা। আহমদ রফিক তাঁর দিক থেকে বরাবর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পাঠকসমুদয় যদি এই অঙ্গীকার তাঁদের দিক থেকেও মনে রাখেন, তবেই ভাবের আদান- প্রদান সমন্বয়ে আসে।

তাই বলে আহমদ রফিক ভাষাকে জটিল করেন না। স্পষ্ট উচ্চারণ। এবং তাতে কোনও ঘোরপ্যাঁচ নেই। তবে তা বিষয়ের অনুগামী। আর, সর্বতোভাবে তন্নিষ্ঠ। কোনও ব্যক্তিগত আবেগ, বা পছন্দ-অপছন্দ তাতে মাথা গলায় না। এই যে নিরাসক্ত বিবেচনা, তাকে ভাষায় প্রকাশের সক্ষমতা, এও একুশে ফেব্রুয়ারির অন্যতম প্রত্যাশা। তিনি তা মনে রাখেন। যদিও ভাষার নির্মাল্য ও প্রসাদগুণ হারায় না। আতিশয্য কোথাও প্রশ্রয় পায় না। এই শৃঙ্খলা পাঠকের অভিনিবেশ দাবি করে। তা অযৌক্তিক নয়। চিন্তার মুক্তি তেমনটিই চায়।

দেশ-কাল-সমাজ-সংসার, সবই তাঁর লেখায় ঘুরে-ফিরে আসে। সাময়িক প্রসঙ্গ অনেক বেশি ভাবায়। কিন্তু তাঁর দৃষ্টি তাৎক্ষণিকে আটকে থাকে না। দূরের আকাশেও চোখ যায়। অমঙ্গলের গতিরেখা তাঁকে উদ্বিগ্ন করে। যদিও আপাত শান্তি-কল্যাণের ঘোষণা আমাদের উৎফুল্ল থাকতে হুকুম দেয়।

ইতিহাস কি আমাদের কিছু শেখায় ? গত শতকে ষাটের দশকে এনএসএফ তাণ্ডবের কথা, ২০০১-এর পর চরদখলের মতো শিক্ষাঙ্গন সব দখলের কথা আমাদের তো ভুলে যাওয়া উচিত নয়। পরিণাম ফল কখন কী ঘটেছে তা-ও আমাদের জানা। তবু অসহিষ্ণুতার আগ্রাসন বন্ধ হয় না। বারবার ফিরে-ফিরে আসে। আহমদ রফিকের দূরদৃষ্টি এসবে পড়ে। তিনি চুপ করে থাকেন না। যদিও বানপ্রস্থ থেকে সন্ন্যাসের ব্যবস্থাপত্র সমাজপতিরা তাঁর হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চায়। এইরকম জাগর-আঁখি তাঁর বেঁচে থাকায় ও বাঁচিয়ে রাখায় প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ের ওপরও বাতিঘরের আলোর মতো ঘুরে-ঘুরে ফেরে। অকুণ্ঠে তিনি তাঁর কথা বলে যান। আমরা শুনি-বা-নাই শুনি। ভাষার সংগ্রাম তখন যে দিক-নির্দেশ করে, তিনি তা থেকে বিচলিত হন না।

এসব ছাড়া যে কারণে তাঁর নাম বিদগ্ধ মহলে বারবার উচ্চারিত হয়, তা হলো, তাঁর রবীন্দ্রচর্চা। এরও প্রেরণা কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি। তার যজ্ঞশিখা সব বাঙালির চেতনায় আত্মানুসন্ধানের আলো জ্বালাতে চায়। স্বরূপ সেখানে এমন, যেখানে জ্ঞান মুক্ত, যেখানে ‘গৃহের প্রাচীর আপন অঙ্গনতলে’ দিনরাত বসুধাকে ‘খণ্ড ক্ষুদ্র’ করে রাখে না। এ উপলব্ধি পূর্ণতা পায় রবীন্দ্রনাথে। তাঁর বাণী প্রকাশ করে তাঁকেই। একুশে ফেব্রুয়ারি তাই অনিবার্যভাবে আমাদের আত্মোপলব্ধির প্রয়াসে তাঁকেই অগ্রনায়কের ভূমিকায় সামনে আনে। আমরা বুঝতে শিখি, বাঙালি হওয়া মানে মুক্ত মানুষ হওয়া। তাঁর রচনাতেই পাই তার সমিধ। এইখানেই রবীন্দ্রানুশীলন গুরুত্ব পায়। জাতীয় জীবনে রবীন্দ্র-ভাবনাও। আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের ধারণা পূর্ণতা পায় তাঁকে কেন্দ্র করেই। তবে এ শুধুই রবি-প্রণাম নয়। তাঁরই মতো মুক্ত দৃষ্টিতে তাঁর ওপর সন্ধানী আলো ফেলা। শ্রদ্ধায় অবশ্যই। কিন্তু একই সঙ্গে পূর্ণ প্রাণের জিজ্ঞাসায়। রবীন্দ্রনাথে নিমজ্জিত হবার জন্যে নয়। তাঁকে অন্তরস্থ করে সামনে আরও এগিয়ে যাবার জন্য।

আহমদ রফিকের রবীন্দ্রানুশীলনের পেছনে, অনুমান, এমন মানসিকতাই কাজ করে। আরও লক্ষ করি, তা যতটা গুরুত্ব দেয় নান্দনিক প্রশ্নকে, তার চেয়ে অনেক বেশি দেয় ঐতিহ্যের আশ্রয়কে, সামাজিক সম্পর্ক-সম্বন্ধকে, প্রকৃতির বাস্তব অনুষঙ্গকে। আকুতি মূলত আপনাকে জানার; সেই সূত্রেই জানার আগ্রহ রবীন্দ্রনাথকে। তাঁর গ্রামোন্নয়ন কর্মকাণ্ড বিশেষ কৌতূহল জাগায়। কারণ, মাটির কাছাকাছি মানুষের সংযোগে তা আমাদের সমূহ জীবনের চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে গভীরভাবে জড়ানো। একই রকম আগ্রহের বিষয় এই বাংলার মাঠ-ঘাট নদীর সঙ্গে কবির আত্মিক সংযোগ। এ যেন কবির প্রাণবান অস্তিত্বে নিজেদের সত্তারই প্রতিফলন। কার্যত বিষয় সম্পূর্ণত রবীন্দ্রনাথ থাকে না। তাঁকে সামনে রেখে আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার উত্তরই তিনি খোঁজেন। কবিও আমাদের সামনে নতুন হয়ে ওঠেন। তা ব্যক্তিকে নয়, তাঁর অন্তর্গত মানুষকে চেনায়। অন্তত যতটা তাঁর দৃষ্টিতে ধরা পড়ে।

তবে এখানেও একটা বিষয় বলা দরকার। তাঁর রবীন্দ্রচর্চা অনুরাগী হিসেবে ততটা নয়, যতটা জিজ্ঞাসু হিসেবে। এবং তা নিরাসক্ত। গদ্য নির্মেদ, নিরহংকার ও যথাযথ। এমনটি অবশ্য তাঁর সব লেখারই বৈশিষ্ট্য। ভাল লাগে, যখন দেখি, তাঁর মেধা ও মননশীলতা এখনও সচল ও সক্রিয়। কোথাও মরচে পড়েনি এতটুকু। আর, রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাছে ‘সব পথ এসে মিলে গেল শেষে তোমার দুখানি নয়নে’―এমন নয়। পথই পথের ঠিকানা চেনায়। রসদ জোগান অবশ্য রবীন্দ্রনাথ। আজও তা অফুরান। আহমদ রফিক অসংখ্য জটাজালে কণ্টকিত প্রবহমান আপন বাস্তবতার মর্মোদ্ধারে তার শরণ নেন। এর আবশ্যিক প্রেরণা তাঁর অভিজ্ঞতায় আমাদের সবার স্মরণীয় ভাষা আন্দোলন। তাঁরই আলোর রেখা ধরে তাঁর বিরতিহীন পথচলা।

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button