প্রচ্ছদ রচনা : আহমদ রফিক : সংগ্রামে ও সৃজনে : বিশ্বজিৎ ঘোষ

প্রচ্ছদ রচনা : ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক―মূল্যায়ন
সংগ্রামে ও সৃজনে নিবেদিতপ্রাণ যেসব নাম আমাদের সামনে আসে, আহমদ রফিক―আমাদের রফিক ভাই, তাঁদের অন্যতম। আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতি রাজনীতি ও মননচর্চার ধারায় তিনি নিজেই হয়ে উঠেছেন একটি প্রতিষ্ঠান। এদেশে যাঁরা অন্যের স্বার্থের জন্য নিজের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়েছেন, আহমদ রফিক সেই বিরলপ্রজ ব্যক্তিত্বের একজন। সাধারণ মানুষের স্বার্থকে, শোষিত-বঞ্চিত মানুষের কল্যাণকে রফিক ভাই নিজের স্বার্থ নিজের কল্যাণ ভেবেছেন। তাঁর কাছে, আমাদের প্রিয় রফিক ভাইয়ের কাছে আমরা পাই আশ্রয় ও আশ্বাস।
আহমদ রফিক পড়ালেখা করেছেন চিকিৎসাশাস্ত্রে, কিন্তু কখনওই পেশা হিসেবে ওই বিদ্যাকে কাজে লাগাননি। ওই বিদ্যা কাজে লাগালে জাগতিক উন্নতি হতো―এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তিনি চিকিৎসাশাস্ত্র পাঠ করেছেন বিগত শতকের পঞ্চাশের দশকে। আহমদ রফিক, প্রকৃত প্রস্তাবে, জীবনে কোনও পেশাকেই গ্রহণ করেননি। বরং বলা যায়, লেখাটাকে গ্রহণ করেছেন নেশা হিসেবে। একাডেমিক জগতের লোক না হয়েও সৃজনশীল সাহিত্য রচনার পাশাপাশি তিনি গবেষণামূলক অনেক অসাধারণ বই লিখেছেন। সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, চিত্রকলা, রাজনীতি ও সমাজ প্রভৃতি ক্ষেত্রে তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ রচনা বাঙালির মননচর্চার দীপ্র স্বাক্ষর হয়ে বহুকাল টিকে থাকবে।
কৈশোর থেকেই আহমদ রফিকের চেতনায় বাসা বেঁধেছিল সংগ্রাম ও সৃজনের যুগল সত্তা। বাঙালি সত্তায় তাঁর বিশ্বাস দেখা দিয়েছিল স্কুলজীবন থেকেই। প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক জীবন-বিশ্বাস তিনি ধারণ করেছেন কৈশোর থেকেই এবং সুদীর্ঘ নব্বই বছরের সাধনায় তা ক্রমে হয়ে উঠেছে অনেক দৃঢ় ও গভীর। এখন আহমদ রফিক নামটাই আমাদের কাছে হয়ে উঠেছে প্রগতিচেতনা ও অসাম্প্রদায়িক ভাবনার প্রতীক, দীপ্র জ্ঞানবৃক্ষের স্মারক। শত প্রলোভন আর প্রতিকূলতার মুখেও নিজের আদর্শ থেকে একচুল বিচ্যুত হননি। মানব কল্যাণকেই তিনি ভেবেছেন নিজের কল্যাণ। অর্থ আর বিত্তের ব্যাপারে তিনি সর্বদা আছেন নির্মোহ। চারদিকে যখন আত্মসাৎ আর লুণ্ঠনের মহোৎসব, তখন তিনি গবেষণার জন্য উত্তর-প্রজন্মকে উৎসাহিত করার মানসে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠন করেছেন একের পর এক ট্রাস্ট ফান্ড। গবেষণার জন্য উত্তর-প্রজন্মকে উৎসাহিত করতে এই যে অর্থ প্রদান―এমন দৃষ্টান্ত তো আমাদের সমাজে খুব একটা নেই।
স্কুলজীবন থেকেই আহমদ রফিক সংশ্লিষ্ট হন প্রগতিশীল বাম-রাজনীতির সঙ্গে। তিনি লিখেছেন―‘স্কুলজীবনে পড়াশোনা ও প্রগতিশীল রাজনীতি আমাকে আকর্ষণ করে। কমিউনিস্ট পার্টি প্রকাশিত ‘ভগত সিং ও তার সহকর্মীরা’ নামে একটি পুস্তিকার কথা আজও মনে পড়ে। বইটি পড়ে খুব অভিভূত হয়েছিলাম। স্বাধীনতা আন্দোলনও আমার মাথায় ঢুকেছিল বেশ ভালো করেই।… আমার জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মূল কারণ সুভাষচন্দ্র বসু ও কাজী নজরুল ইসলাম। সুভাষ বসুর স্বদেশচেতনা, স্বাধীনতার স্পৃহা আমাকে মুগ্ধ করে। এই দুজন আমার কৈশোরে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়াশোনার সময় আহমদ রফিক বাম-রাজনীতির সংগঠক হিসেবে বিশেষ দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। উত্তরকালে ভাষাসংগ্রামীদের সংঘবদ্ধ করা এবং ওই আন্দোলনের চেতনা বিস্তারেও আহমদ রফিক পালন করেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। কিন্তু বাম-রাজনীতিতে মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব ও নানামাত্রিক তাত্ত্বিক বিভাজন তাঁকে পীড়িত করে এবং একসময় ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে রাজনীতির জগৎ থেকে তিনি নিজেকে সরিয়ে নেন। তবে সুস্থ রাজনীতির প্রতি তিনি সর্বদাই আছেন শ্রদ্ধাশীল।
আহমদ রফিক একজন নিষ্ঠ গবেষক। ভাষা-আন্দোলন ও রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে তাঁর গবেষণা বাঙালির অনন্য সম্পদ। এই দুই ধারায় গবেষণাকর্মের জন্য বাংলাভাষী মানুষের কাছে তিনি চিরকাল বরণীয়-স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। একথা ভাবলে বিস্মিত হতে হয় যে, উভয় বাংলায় রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে গ্রন্থপ্রণেতা হিসেবে, সংখ্যার দিক থেকে, তিনি আছেন সবার শীর্ষে। রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর সাহিত্য বিষয়ে আহমদ রফিকের বইয়ের সংখ্যা বিশের অধিক। রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে আহমদ রফিকের অনেক লেখা এখনও অগ্রন্থিত অবস্থায় আছে। একই কথা প্রযোজ্য ভাষা-আন্দোলন নিয়ে তাঁর গবেষণাকর্ম প্রসঙ্গে। এ ক্ষেত্রেও তাঁর নিষ্ঠা ও সাধনা রীতিমতো বিস্ময়কর। চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী আহমদ রফিক বই লিখেছেন কাজী নজরুল ইসলাম, বিষ্ণু দে, চে গুয়েভারা, বাংলাদেশের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, দেশবিভাগ, মুক্তিযুদ্ধ―এসব ব্যক্তি ও বিষয় নিয়ে। তাঁর প্রতিটি বইয়ে আছে নিষ্ঠা ও পাণ্ডিত্যের পরশ। তিনি কবিতা লিখতেন, আছে তাঁর একাধিক কবিতার বই, লিখেছেন কলাম, সম্পাদনা করেছেন নাগরিক নামের উচ্চ-রুচির সাহিত্যপত্র।
বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর সাহিত্যচর্চায় আহমদ রফিক পরিণত হয়েছেন দীপ্র এক প্রতিষ্ঠানে। এ ক্ষেত্রে তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্রের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। রবীন্দ্রনাথের পতিসরকে নতুনভাবে আবিষ্কার তাঁর উল্লেখযোগ্য এক কাজ। একসময় রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র উভয় বাংলায় রবীন্দ্রনাথ-বিষয়ক উল্লেখযোগ্য এক সংগঠনের রূপ পরিগ্রহ করেছিল।
২.
নানা বিষয়ে বই লিখলেও, ব্যক্ত হয়েছে যে, একক বিষয় হিসেবে রবীন্দ্রনাথের উপর আহমদ রফিকের বইয়ের সংখ্যা বিশের অধিক। রবীন্দ্রনাথ-বিষয়ক আহমদ রফিকের কয়েকটা বই সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা এখানে উপস্থাপন করা যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে আহমদ রফিকের প্রথম বই আরেক কালান্তরে (১৯৭৭)। বিচ্ছিন্ন কিছু প্রবন্ধের সংকলন এ গ্রন্থ। আহমদ রফিক সমাজবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে রবীন্দ্রনাথকে বুঝে নেবার চেষ্টা করেছেন সংকলনভুক্ত প্রবন্ধগুচ্ছে, যে কথা তাঁর বয়ানে উঠে এসেছে এভাবে : ‘কবি প্রবন্ধকার চিন্তাবিদ রবীন্দ্রনাথকে বুঝে নেবার চেষ্টা মূলত মার্কসবাদী চিন্তার আলোকে সেখানে রবীন্দ্রনাথ ব্রাত্য নন। আসলে উদ্দেশ্য ছিল রবীন্দ্র- বিরোধিতা ও জেহাদের বিরুদ্ধে নান্দনিক জবাব দেওয়া…।’ রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রচিন্তা ও বাংলাদেশ (১৯৮৭) গ্রন্থে আহমদ রফিক রবীন্দ্র-প্রবন্ধের আলোকে তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন এবং সে প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করেছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রনৈতিক চরিত্র্য। ২০০২ সালে প্রকাশিত হয় আহমদ রফিকের প্রবন্ধ-সংকলন প্রসঙ্গ : বহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথ। এই―গ্রন্থে আহমদ রফিক বিজ্ঞানচেতনার আলোকে রবীন্দ্র- আধুনিকতা মূল্যায়নের প্রয়াস পেয়েছেন। তিনি লিখেছেন :
‘রবীন্দ্রনাথ বরাবরই বিজ্ঞানচেতনার ধারক, তবু যন্ত্রযান্ত্রিকতা সম্পর্কে তাঁর ধারণার অপব্যাখ্যা কম হয়নি। এসব দিক থেকে রবীন্দ্রনাথ একজন পরিপূর্ণ আধুনিক ব্যক্তিত্ব―বিজ্ঞাপন-ধানণা থেকে চিত্রকলার চরিত্র পর্যন্ত তাঁর আধুনিক চেতনার প্রকাশ লক্ষ্য করার মতো।’
রবীন্দ্রনাথের গ্রাম-সংগঠন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আহমদ রফিক লিখেছেন একাধিক গ্রন্থ। এ বিষয়ে তার গবেষণাগ্রন্থ রবীন্দ্রভুবনে পতিসর (১৯৯৮) বিশেষভাবে উলেখযোগ্য। শিলাইদহ কিংবা শাহজাদপুরে (রবীন্দ্র-বানানে সাজাদপুর) রবীন্দ্রনাথের গ্রামোন্নয়ন― বিষয়ক একাধিক প্রামাণ্য গ্রন্থ থাকলেও, পতিসরে রবীন্দ্রনাথের কর্মকাণ্ড বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোনও গ্রন্থ ছিল না। এই অভাবটাই পূরণ করেছে রবীন্দ্রভুবনে পতিসর। এই বই রচনা প্রসঙ্গে আহমদ রফিকের ভাষ্য এখানে প্রণিধানযোগ্য : ‘… যে-পতিসরে কবির নিজস্ব জমিদারি, যেখানে তার সফল গ্রামোন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কৃতিত্ব সেই কুঠিবাড়ি ও সংলগ্ন এলাকা ছিল অবহেলিত, জীর্ণদশা নিয়ে পরিত্যক্ত। পথের দুর্গমতার জন্য পতিসর ছিল রবীন্দ্রভক্তদের দৃষ্টির বাইরে। সেই পতিসরকে সংস্কৃতি অঙ্গনের ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা এবং শেষ পর্যন্ত প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে ন্যস্ত করার (১৯৯৪) কঠিন কাজটি সম্পন্ন করা ও এর মধ্যে একাধিকবার ঐ দুর্গম এলাকায় যাওয়া ও কিছু দুর্লভ সাক্ষাৎকারের পরিপ্রেক্ষিতে পতিসর নিয়ে লেখা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। কয়েকবার সেখানে যাতায়াতের ফসল রবীন্দ্রভুবনে পতিসর। রবীন্দ্রনাথের গ্রামোন্নয়ন ভাবনা ও কর্মকাণ্ড নিয়ে আহমদ রফিকের দ্বিতীয় গ্রন্থ রবীন্দ্রভাবনায় গ্রাম : কৃষি ও কৃষক (২০০৮)। এ গ্রন্থকে লেখক রবীন্দ্রভুবনে পতিসর গ্রন্থের পরিপূরক গ্রন্থ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পূর্ববঙ্গে জমিদারি দেখভালের কাজে রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ-সাজাদপুর-পতিসর জীবন এ গ্রন্থে তথ্যঋদ্ধ হয়ে উন্মোচিত হয়েছে। গ্রামীণ এই অভিজ্ঞতা কীভাবে রবীন্দ্রসৃষ্টিলতাকে পরিবর্তিত করে দেয়, তা-ও চমৎকার ভাষ্যে বিশ্লেষিত হয়েছে বক্ষ্যমাণ গ্রন্থ। কবি ও কর্মী রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে হলে আহমদ রফিকের এ গ্রন্থদ্বয় অবশ্যই পাঠ করা প্রয়োজন বলে আমরা বিবেচনা করি।
১৮৯০ থেকে ১৯০০ সাল―দীর্ঘ দশ বছর জমিদারি দেখভালের জন্য রবীন্দ্রনাথ নদীবিধৌত পূর্ববঙ্গে অবস্থান করেন। এ সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এস্টেটে ব্যাপক ভ্রমণ করেন―পদ্মা ইছামতি নাগর বড়াল করতোয়া আত্রাই নদীতে বোটে ভেসে- ভেসে তিনি দেখেছেন গ্রামীন জীবন ও জনপদ, শিলাইদহ-সাজাদপুর-পতিসরে গ্রামীণ মানুষদের সান্নিধ্যে এসে জেনেছেন ভিন্ন এক জীবনকে। রবীন্দ্রনাথের নতুন এই অভিজ্ঞতা শিল্পিতা পেয়েছে পূর্ববঙ্গ বাসকালে রচিত তাঁর অনেক ছোটগল্পে। পূর্ববঙ্গ বিশেষত পদ্মা নদীবিধৌত জীবন ও জনপদকে নিয়ে রচিত ছোটগল্পের বিষয় ও শিল্পরূপ ব্যাখ্যা করে আহমদ রফিক লিখেছেন অসামান্য এক গবেষনা-গন্থ ছোটগল্পের শিল্পরূপ: পদ্মাপর্বের রবীন্দ্রগল্প (১৯০২)। আলোচ্য গ্রন্থের উপজীব্য সম্পর্কে আহমদ রফিক লিখেছেন : ‘… এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে বাংলা ছোটগল্পের প্রকৃত সূচনা, রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প রচনার উৎস, প্রেক্ষাপট হিসেবে নদীমাতৃক বাংলা অঞ্চলে (পদ্মা ইচ্ছামতি আত্রাই ও নাগর নদীতীরে) তাঁর বসবাসের অভিজ্ঞতা, কবিচৈতন্যে সে অভিজ্ঞতার প্রতিক্রিয়ায় গল্পকার রবীন্দ্রনাথের জন্ম এবং তাঁর এ পর্বের প্রধান গল্প ও গল্পরীতির বৈশিষ্ট ও চরিত্র-লক্ষণ আলোচনায় স্থান পেয়েছে।’
রবীন্দ্রসাহিত্যে নারীর যে রূপ ও মনস্তত্ত্ব প্রকাশিত হয়েছে তা আহমদ রফিকের ব্যাখ্যায় নিষ্ঠভাবে উঠে এসেছে রবীন্দ্র-সাহিত্যের নায়িকারা : দ্রোহে ও সমর্পণে (২০০৩) শীর্ষক গ্রন্থে। রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় নারীর যে রূপ ও চারিত্র্য তা ব্যাখ্যা করা এবং সে-ভাবনা তাঁর সাহিত্যকর্মে কীভাবে শিল্পিতা পেয়েছে তা আলোচনা করাই বর্তমান গ্রন্থের অন্বিষ্ট বিষয়। রবীন্দ্রসৃজনে নারীর সামূহিক পরিচয় ব্যাখ্যা শেষে আহমদ রফিক এ বিষয়ে তাঁর অন্তিম সিদ্ধান্ত তুলে ধরেছেন এভাবে : রবীন্দ্রসাহিত্যে ‘সত্যিকার বিদ্রোহী নায়িকারা সংখ্যায় খুবই অল্প, কিছুসংখ্যক দুই ধারার মধ্য অবস্থানে ঠাঁই নিয়েছে, অন্যদিকে দলে ভারী সনাতন পন্থার অনুসারী নায়িকারা। এর কারণ বিদ্রোহী নায়িকারা প্রায়শ নানা কারণের বশবর্তী হয়ে আত্মনিবেদনে বা সমর্পণে অবস্থান পরিবর্তন করেছে।’
১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয় আহমদ রফিকের উল্লেখযোগ্য গবেষণা গ্রন্থ রবীন্দ্রনাথের চিত্রশিল্প। বক্ষ্যমাণ গ্রন্থে আহমদ রফিক বিশ্বচিত্রকলার ঐতিহাসিক বিকাশধারার প্রেক্ষাপটে ঠাকুরের ছবি আঁকার প্রেরণা ও প্রস্তুতি, তাঁর চিত্রভাবনা এবং রবীন্দ্র-চিত্রকলার বিষয় ও শিল্পবৈশিষ্ট্য বিশদ আলোচিত হয়েছে। ঐতিহ্যিক এবং সমসাময়িক বাস্তবতার পটভূমিতে চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়নে এ গ্রন্থে আহমদ রফিক স্বকীয় প্রতিভার স্বতন্ত্র এক প্রান্ত উন্মোচন করেছেন। এ গ্রন্থ রচনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে আহমদ রফিক লিখেছেন : ‘এদেশ রবীন্দ্রসাহিত্যের আলোচনা যতটা হয়েছে সে তুলনায় রবীন্দ্রচিত্রকলার অধ্যয়ন, বিচার, বিশ্লেষণ কমই হয়েছে। অথচ রবীন্দ্রনাথের বিশাল সাহিত্যমর্মের তুলনায় গুণগতমানে তাঁর ছবির গুরুত্ব অবহেলার নয়।’ বস্তুত, রবীন্দ্র-চিত্রকলা সম্পর্কে বিচার বিশ্লেষণের এই ন্যূনতা দূর করার উদ্দেশ্যেই আহামদ রফিক রচনা করেছেন রবীন্দ্রনাথের চিত্রশিল্প। রবীন্দ্র-চিত্রকলা মূল্যায়ন শেষে আহমদ রফিক অন্তিম যে সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করেছেন তা এ রকম : ‘রবীন্দ্রনাথ সর্ব বিচারে প্রথামুক্ত চিত্রশিল্পী। প্রচলিত রীতির বাইরে চলা তাঁর স্বভাবের অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য, তার চিত্ররীতি কোনো ঘরানার অন্তর্ভুক্ত নয়, কোনো ঘরানা সৃষ্টিও করে না, বরং ঘরানা ভাঙ্গার শিক্ষাই দেয়, উদ্দীপনা জোগায় নিজস্ব ধারা সৃষ্টির ক্ষেত্রে। এখানেই চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথের বৈশিষ্ট্য ও মহত্ত্ব।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তি, বাংলা ও ইংরেজি গীতাঞ্জলির স্বাতন্ত্র্য, এবং পুরস্কার-বিষয়ক নানামাত্রিক তথ্য ও বিতর্ক নিয়ে আহমদ রফিক রচনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ, গীতাঞ্জলি ও নোবেল পুরস্কার (২০১৫)। পশ্চিমা ভুবন রবীন্দ্রনাথ : ব্যক্তিবলয়ে ও সংবাদপত্রে, নোবেল পুরস্কার : সুইডিশ অ্যাকাডেমির অন্দরমহলে, পুরস্কারের প্রতিক্রিয়া : ব্যক্তিমানসে সংবাদমাধ্যমে, নোবেল পুরস্কার : স্বদেশে সম্মাননা ও বিরূপতা, গীতাঞ্জলি, বনাম গীতাঞ্জলি ও রাবীন্দ্রিক ভক্তিবাদ, গীতাঞ্জলির অনুবাদ : বিদেশে স্বদেশে―এইসব নিয়ে আহমদ রফিকের বক্ষ্যমাণ গ্রন্থ। গ্রন্থটি সম্পর্কে আহমদ রফিকের নিজের ভাষ্য এরকম : গীতাঞ্জলি ও নোবেল পুরস্কার নিয়ে ঘটন-অঘটনের সংক্ষিপ্ত ইতিকথা ও প্রতিক্রিয়া ভালো-মন্দ সংক্ষিপ্ত বয়ানে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে… রবীন্দ্রনাথ, গীতাঞ্জলি ও নোবেল পুরস্কার বইটিতে।
বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা এবং রবীন্দ্রচর্চার জন্য প্রতিষ্ঠিত ‘রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র’-এর ইতিহাস ও কার্যক্রম নিয়ে আহমদ রফিক রচনা করেছেন দুটি গ্রন্থ―বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চার একটি অধ্যায় (২০১০) এবং রবীন্দ্রচর্চা : বাংলাদেশ (২০১৩)। দুটি গ্রন্থেই আহমদ রফিকের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র-এর গঠন ও কার্যক্রম সম্পর্কে বিশদ আলোচনা সন্নিবেশিত হয়েছে, যা বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চার ইতিহাস পুনর্গঠনে জরুরি উপাদান হিসেবে গবেষকদের কাজে লাগবে বলে আমাদের বিশ্বাস। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনী নিয়ে আহমদ রফিক রচনা করেছেন দুটি গ্রন্থ―কিশোরদের রবীন্দ্রনাথ : জীবন ও সৃষ্টি (২০১৬), এবং শিশুদের রবীন্দ্রনাথ : জীবন ও সৃষ্টি (২০১৬)। এ ছাড়াও তিনি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত রবীন্দ্রজীবনীর তৃতীয় ও চতুর্থ খন্ড রচনা করেছেন। রবীন্দ্রজীবনী সংগঠনে আহমদ রফিকের পাঠবিস্তৃতি, নিষ্ঠা ও সত্যানুসন্ধান মানসিকতা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়।
রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে আহমদ রফিকের আরও কিছু গ্রন্থ রয়েছে, রয়েছে অগ্রথিত শতাধিক প্রবন্ধ। রবীন্দ্রজীবন ও সৃজন সম্পর্কে আহমদ রফিকের জীবনব্যাপী নিষ্ঠা ও পরিশ্রম আমাদের দেশে মননচর্চার ইতিহাসে উজ্জ্বল এক অদ্যায় হিসেবে সকলের কাছে স্বীকৃতি পেয়েছে।
৩
বহুমাত্রিক প্রতিভাধর আহমদ রফিকের সঙ্গে কবে প্রথম পরিচয় হয়েছিল, আজ তা আর মনে নেই। তবে শুরুটা যে রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র সূত্রে সে কথা মনে আছে। এর পূর্বে তাঁর নাম শুনেছি, ছাত্রজীবনে তাঁর একাধিক বই মনোযোগসহকারে পাঠ করেছি। কিন্তু এসব ছিল পরোক্ষ সূত্র। ১৯৮৭ সালের কোনও এক শীত বিকেলে রফিক ভাই যোগাযোগ করলেন রবীন্দ্রচর্চা নিয়ে কথা বলতে। সেই শুরু। তারপর রফিক ভাইয়ের সিদ্ধেশ্বরীর বাসায় বহুবার গিয়েছি, অনেক কথা হয়েছে―শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র। কেন্দ্রের ক্লাস নেওয়া, পাঠক্রম রচনা―কত কাজ তখন আমাদের। আমরা মাত্র কয়েকজনে রফিক ভাইয়ের নেতৃত্বে একটা স্বপ্নের কেন্দ্র রচনা করেছিলাম। বিজয়নগর, শান্তিনগর, পরীবাগ হয়ে শাহবাগ―কত জায়গায় আমরা ক্লাস নিয়েছি। সর্বত্রই আছেন আমাদের প্রিয় রফিক ভাই মূল দায়িত্ব নিয়ে। কেন্দ্রের মুখপত্র ‘রবীন্দ্রচর্চা’ কিংবা রবীন্দ্র গ্রন্থাগার পরিচালনায়ও রফিক ভাই আমাদের কাজে লাগিয়েছেন। সন্দেহ নেই, সে-সময়টা ছিল আমাদের একটা স্বপ্নের সময়।
রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্রের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা আর একটা বিশেষ কারণে উল্লেখযোগ্য। কেন্দ্রের প্রথম সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছিলাম আমি। ১৯৯০ সালের মে মাসে গণগ্রন্থাগারের শওকত ওসমান মিলনায়তনে ‘আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামে প্রবন্ধ উপস্থাপন করি। পরে অভিন্ন নাম নিয়ে বর্ধিত কলেবরে প্রবন্ধটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ১৯৯৭ সালে কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউটেও আমরা অংশগ্রহণ করি। কলকাতায় আমি ও রফিক ভাই একই কক্ষে থাকতাম। কলকাতা সম্মেলনে রফিক ভাইয়ের সঙ্গে ছিলাম আমি, রফিকউল্লাহ খান, মঈনউদ্দিন খালেদ, হারুন-রশিদ প্রমুখ। সে-সম্মেলনে আমি ‘রবীন্দ্রনাথ, গান্ধী এবং সুভাষ বসু’ শিরোনামে প্রবন্ধ উপস্থাপন করি। রফিক ভাই কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ সূত্রেই এসব লেখায় আমি প্রয়াসী হয়েছিলাম সে কথা আজ কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করি।
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পঞ্চাশ বছরপূর্তি উপলক্ষে রফিক ভাই ও আমি মিলে সম্পাদন করি একটা স্মারকগ্রন্থ। এই স্মারকগ্রন্থ প্রকাশসূত্রেও রফিক ভাইয়ের সিদ্ধেশ্বরীর বাড়িতে আমি বহুবার গিয়েছি। রফিক ভাইয়ের সেই বিশাল কুকুরটার কথা এখনও মনে পড়ে। পাহারাদার সেই কুকুরটার পাশ কাটিয়ে সিঁড়িতে উঠতে প্রতিবারই রফিক ভাইয়ের সাহায্য নিতে হতো। সিদ্ধেশ্বরীর চিলেকোঠায় রফিক ভাইয়ের লেখার টেবিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটেছে আমাদের। সেখানেই দেখেছি তাঁর সম্পাদিত নাগরিক পত্রিকার সব কপি। পরবর্তী সময়ে রফিক ভাই যখন ইস্কাটনের ফ্ল্যাটে উঠলেন―সেখানেও বহুবার গেছি আমি। রফিক ভাইয়ের বাসায় কত রকমের যে মিষ্টি খেয়েছি। তাঁকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করতে রইস ভাইয়ের সঙ্গে অনেকটা সময় কেটেছে তাঁর বাসায় আমাদের।
একটা সময় আহমদ রফিক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করলেন নাম দিলেন ‘রবীন্দ্র ট্রাস্ট ফান্ড’। আমাকে সে-ফান্ডের অন্যতম ট্রাস্টি হিসেবে মনোনীত করেন রফিক ভাই। সে-সূত্রেও রফিক ভাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক স্মৃতি। ভাষাসংগ্রামীদের সম্মেলনেও রফিক ভাইয়ের আহ্বানে আমি প্রবন্ধ পাঠ করেছি। ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকের সূত্রেই উত্তরকালে পরিচয় ঘটেছে অনেক ভাষাসংগ্রামীর সঙ্গে। বিষ্ণু দে কবি ও কবিতা শিরোনামে একটি উচ্চমানের গবেষণা গ্রন্থ আহমদ রফিক উৎসর্গ করেছেন আমাকে―আমার প্রতি তাঁর ভালোবাসার এটিও একটি অকৃত্রিম স্মারক।
৪.
নিভৃতচারী, নিরাসক্ত, নির্লোভ, নির্মোহ এবং মর্মে-মর্মে নিঃসঙ্গ ও অন্তর্মুখী আহমদ রফিক আমাদের কালের ব্যতিক্রমী এক মানুষ, অনুসরণীয় এক ব্যক্তিত্ব। সুস্থধারার উন্নত রুচি এবং প্রগতিশীল জীবনবিশ্বাসের আলোয় সুদীর্ঘ পঁচানব্বই বছর তিনি আছেন আমাদের সঙ্গে, বাঙালির পাশে। সংগ্রাম ও সৃজনের যুগলবন্দি মানুষ আমাদের সমাজে খুব বেশি নেই। এমন মানুষ আমাদের পাশে থাকা মানেই আমরা সাহসী মানুষ, সংগ্রামী মানুষ, সৃজনশীল মানুষ। তাই সংগ্রামে আমাদের সতেজ রাখার জন্য, সৃজনে সক্রিয় থাকার আহ্বান জানানোর জন্য আহমদ রফিককে আরও কয়েকটা বছর আমাদের সঙ্গে থাকতে হবে, থাকতে হবে বাঙালি জাতিসত্তার সঙ্গে।
লেখক : গবেষক-প্রাবন্ধিক



