প্রচ্ছদ রচনা : আহমদ রফিকের ভাবনায় কবি বিষ্ণু দে : বেগম আকতার কামাল

প্রচ্ছদ রচনা : ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক―গ্রন্থ আলোচনা
বিশিষ্ট প্রবন্ধকার ও কবি আহমদ রফিক বিচিত্র বিষয়ক গ্রন্থপ্রণেতা। তিনি ছাত্রজীবনেই সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিমনস্ক ছিলেন। এবং ভাষা-আন্দোলনেরও অন্যতম সংগঠক ছিলেন। প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকায় তাঁর শিক্ষাজীবন বিপর্যস্ত হয়েছে। তবু মননশীল চিন্তাচর্চা করে গেছেন। তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থগুলো যেমন বিষয়বৈচিত্র্যে, ব্যাপ্তিতে এবং চিন্তাশীলতায় সমৃদ্ধ, তেমনি আহমদ রফিকের সুষ্ঠু চিন্তার নানামুখী প্রকাশধন্য; যেমন ভেবেছেন সমাজ-সংস্কৃতি নিয়ে, রবীন্দ্রনাথ নিয়ে, তেমনি তিরিশের আধুনিকতাবাদী ধারার সঙ্গেও থাকেন নান্দনিক ও মননময় ভাবনায় সংশ্লিষ্ট।
তাঁর বিষ্ণু দে কবি ও কবিতা গ্রন্থটি তেমনি একটা রচনাকর্ম। বিষ্ণু দে-র মার্কসীয় কাব্যচেতনা নিঃসন্দেহে আহমদ রফিককে আকৃষ্ট করেছে। বিষ্ণু দে তিরিশের পাঁচ কবির মধ্যে সবচেয়ে বেশি সদর্থক জীবনবাদী কবি, যাঁর তত্ত্ববিশ্ব ও কাব্যমনন গড়ে উঠেছে মার্কসীয় ভাবাদর্শ দ্বারা। এই কবি মননকে আবেগের চলমানতা দিয়েছেন, আবার আবেগকে সর্বাধিক যুক্তিশাণিত মননযুক্ত করেছেন। রবীন্দ্রনাথের মতোই শুভ কল্যাণময় সমাজ-স্বপ্ন তাঁকে প্রেরণায়িত করেছে। তবে তা ছিল দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী মতাদর্শ দিয়ে গঠিত সাম্যবাদী সমাজভাবনার প্রকাশ। প্রকাশটিও সরল বা সেøাগান হয়ে ওঠেনি, হয়েছে শব্দের নতুন ডিকশনে, মিথপ্রতিমাযুক্ততায়, আঙ্গিক-নৈপুণ্যে উন্মুখর। বিশেষত মিথের প্রচ্ছদে ও বিভিন্ন ক্ল্যাসিক চরিত্রের নির্মোকে তিনি তার স্বকীয় প্রকরণরীতি গড়ে তুলেছিলেন। আহমদ রফিক প্রণীত উক্ত গ্রন্থে মোট ছয়টি প্রবন্ধসমৃদ্ধ মননচিন্তার উৎসারণ ঘটেছে। বিষ্ণু দের প্রাথমিক কাব্যপ্রয়াসের মধ্যে ছিল যে ব্যক্তিময়তা―যে ব্যক্তিময়তা সকল কবির কবিতায় বিদ্যমান এবং যা তিরিশের কবিতার বিশেষ ধর্ম তার পটপ্রেক্ষায় এসেছে বিষ্ণু দের ক্রমাগত উত্তরণের দিশা ও রূপ-রূপান্তর―কাব্য থেকে কাব্যান্তরে।
রবীন্দ্রনাথ যেমন পূর্ববাংলার প্রাকৃতায়িত ও ঐতিহ্যের মধ্যে এসে ঔপনিবেশিক নগর কলকাতার জীবন থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন তেমনি বিষ্ণু দেরও যাত্রারম্ভ হয় কলকাতা থেকে; পরে রিখিয়া ও সাঁওতাল পরগনার আদিবাসী জীবন এবং সংস্কৃতির অভিজ্ঞতায় মননকে তিনি পুষ্ট করেছিলেন। ঔপনিবেশিক কলকাতার নাগরিক জীবনের খণ্ডতা-ক্ষুদ্রতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার দৃশ্যকল্প আছে তাঁর প্রথম দুই কাব্য―উর্বশী ও আর্টেমিস এবং চোরাবালি-তে। লৌকিক ঐতিহ্যকে বিষ্ণু দে ধারণ করেছিলেন মার্কসীয় দ্বান্দ্বিকতায়, যেখানে রবীন্দ্রনাথকে দেখি তার লোকায়তিক জীবনভাবনা ও তার রূপায়ণ-কলায় ছিল প্রকৃতি, নগর কলকাতার ‘কেজো’ পরাধীন জীবনের বিকল্পে মুক্ত প্রকৃতির আবহমানতায় ঋদ্ধ। তিনি চিরায়ত বাংলার মুখশ্রীকে অনাহত রূপে দেখেছিলেন পূর্ববাংলার প্রকৃতিতেই।
বিষ্ণু দের কবিতায় প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের যে ব্যবহার আহমদ রফিক চিহ্নিত করেছেন তা ছিল এই কবির প্রবল বৈদগ্ধ্য ও বিশ্বসাহিত্যের পরিগ্রহণের দ্বারা অন্তর্গঠিত। তাঁর কবি স্বভাবের আরেকটি দিক ছিল ক্ল্যাসিকাল সংগীতে সমৃদ্ধচেতনা ও চিত্রকলার পরিপ্রেক্ষিত, রং-টোন ইত্যাদি দ্বারা বিগঠিত। আহমদ রফিক ‘ব্যক্তিচেতনার বৃত্তাবদ্ধতা থেকে সমষ্টিচেতনায় উত্তরণ’―এই শিরোনামে ধরতে চেয়েছেন বিষ্ণু দের আত্মসংকট- মুক্তির প্রয়াসকে, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের ধরনকে। বস্তুত তিরিশের কবিতার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের রূপটিতে ছিল নিজস্বতা প্রতিপাদনের জন্য দুর্বোধ্য জটিল মননশীল রূপচেতনা―ব্যতিক্রম জীবনানন্দ। তাঁর কবিতায় মননশীলতা এক অন্তর্লীন অন্তর্নিঃসহায়তা ও ধূসর সময়ের বেদনাক্ষতে ছিল বিষণ্ন। আহমদ রফিক বিষ্ণু দে-কে দেখেন―‘প্রগতিবাদী বিশ্বের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড়ানো’ কবি হিসেবে। ইউরোপের ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে গণপ্রজাতন্ত্রী স্পেনের পক্ষে বিষ্ণু দে কবিতা লিখেছিলেন, লিখেছিলেন হিটলারের রাশিয়া আক্রমণ নিয়েও। আন্তর্জাতিক বিশ্বমৈত্রীর ধারণাসমৃদ্ধ বিষ্ণু দে তৎকালীন প্রগতিশীল কাব্যধারায় সংশ্লিষ্ট হয়ে বাংলা কবিতাকে আন্তর্জাতিক চেহারা দিয়েছিলেন। প্রথম কাব্যদুটির অবক্ষয়ী জীবনবোধ থেকে এই যে তাঁর আন্তর্জাতিক স্তরে উদ্বর্তন, একই সঙ্গে দেশজ প্রকৃতি ও মানুষের সংগ্রাম, জীবনদ্বন্দ্ব ও স্বপ্নের সঙ্গে লিপ্ততা তা এই কবিকে উন্নীত করেছে বহুমুখী বিশ্বচেতনার স্তরে।
বিষ্ণু দের আরেক দ্বান্দ্বিকতা ছিল প্রিয় কবি এলিয়টের সঙ্গে। তাঁর প্রথম জীবনে এলিয়ট-মুগ্ধতা থাকলেও পরবর্তী কবিতায় এলিয়ট বর্জনের কারণ ছিল ‘ধর্মীয় মহিমার আশ্রয়ে অন্বিষ্টকে খুঁজে পাওয়ার রাজন্যবাদিতায়’। চল্লিশের দশকের শেষ দিকে বিষ্ণু দে এলিয়টের পোড়োজমির বন্ধ্যাত্ব পরিহার করেন। প্রসঙ্গত আহমদ রফিক স্মরণ করেন বিষ্ণু দের কবিতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের উক্তি―‘দুর্ভেদ্য কেল্লা’। রবীন্দ্রনাথ যেমন নিজের সাহিত্যিক ভাষা তৈরি করে নিয়েছিলেন তেমনি বিষ্ণু দে-ও তাঁর কবিতার ডিকশনে উল্লিখন, তথ্যসংকেত, মিথ আর ইতিহাস পরিভাষার সম্মিলনে ঘটিয়েছিলেন এক ধরনের বিপ্লব। তাই এই ‘দুর্ভেদ্য কেল্লার’ অভিধাপ্রাপ্ত হলেন রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক। রবীন্দ্রনাথের কাব্যপঙ্ক্তির বিচূর্ণ প্রয়োগ ঘটান বিষ্ণু দে। আবার তিনি বুদ্ধদেব বসুর কবিতাকেও ব্যঙ্গ করেন ‘পশ্চিম হাওয়া’, বুর্জোয়া, ‘বৃথা ধামা বওয়া’ ইত্যাদি শব্দগুচ্ছ দিয়ে। স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গ ছিল বিষ্ণু দের কবিতায় আরেকটি প্রকাশরীতি।
আহমদ রফিক বিষ্ণু দের ব্যক্তিময়তার উচ্চারণ থেকে সরে আসার ব্যাপারটিকে বিক্ষিপ্তভাবে কবির বিভিন্ন কাব্য পরিক্রমা করে চিহ্নিত করেছেন। যার ভাবনাগতিতে আছে, বিষ্ণু দের স্বাদেশিকতাকে অনুধাবন, সমাজচিত্রায়ণের ইতিনেতি রূপ ইত্যাদিকে কবির আন্তর্জাতিক বৈশ্বিক চেতনার সঙ্গে, ব্যক্তিপ্রেমযুক্ততায় স্বদেশপ্রেমের একাত্মতায় কীভাবে গ্রন্থিত হয়েছে তার পথরেখা চিহ্নিত করা। এখানে আহমদ রফিকের নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গিও ফুটে উঠেছে কবির চিত্রকল্প ও প্রতীক ব্যবহারের উল্লেখে। বুদ্ধিবাদী কবি বিষ্ণু দে’র পাণ্ডিত্য ও আবেগময়তার দিকটি কোন বিন্দুতে এসে আবদ্ধ হলো সে সম্পর্কে প্রবন্ধকার এখানে কোনও ব্যাখ্যা দেননি।
২.
‘দুই স্রোতের বৈপরীত্যে সন্দ্বীপের চর’ শিরোনামের প্রবন্ধটিতে আলোচিত হয়েছে কবির ‘শ্রেণিচেতনা ও ঐতিহ্যচেতনা-নির্ভর স্বাদেশিকতা’। ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৭―সন্দ্বীপের চর-এর সময়দেশ। এই সময় পরিসরে সংঘটিত “রাজনৈতিক পাশা খেলা, সামাজিক―রাজনৈতিক দুর্যোগ বিশেষ করে দুর্ভিক্ষ মহামারী, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাজনিত বিদ্বেষ বিরূপতা এবং সেই সঙ্গে বিপরীত চরিত্রের তেভাগা ও কৃষক আন্দোলন, শ্রমজীবী ও বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণির সামাজিক প্রগতির পক্ষে আন্দোলন ও অবস্থান গ্রহণ ‘সন্দ্বীপের চর’ কাব্যগ্রন্থের মূল সুর।” এই দুই বিপরীতধর্মী বাস্তবতাকে বিষ্ণু দে দ্বান্দ্বিক নিয়মেই কবিতাগত করেন এবং রচনা করেন দীর্ঘ কবিতা। কবির বয়ান যেন অনিঃশেষ, প্রবহমান স্রোতের মতো সম্মুখগতিতে চলমান। আহমদ রফিক এখানে বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করেন উক্ত দুই বিপরীত ধারার পটচিত্র, কবিতার মধ্যে তার প্রয়োগ-বিন্যাসকেও দেখান। চিহ্নিত করেন দাঙ্গা নিয়ে, শ্রমজীবী আন্দোলন নিয়ে বিষ্ণু দে-র চিন্তাকে ও তার নান্দনিক রূপায়ণকে। সমালোচক আহমদ রফিক দেখিয়ে দেন সব কিছুর সঙ্গে যুক্ত আছে শ্রেণিসংগ্রামের প্রতি কবির অকুণ্ঠ সমর্থন ও রাজনৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত মানবিকতার রূপটি। বিষ্ণু দের সমগ্র কাব্যভাবনাটিই মানবিকতার দ্বারা আলোকিত। এমনকি প্রকৃতিকেও তিনি মার্কসের যঁসধহরুধঃরড়হ ড়ভ হধঃঁৎব-এই প্যারাডাইমে গ্রহণ করেছিলেন। আদিবাসী সাঁওতাল, ওরাওঁ কবিতার অনুবাদ করেন লোকায়ত-মানসে দীর্ঘকালের জীবনীশক্তি বষবসবহঃধষ ভড়ৎপব ড়ভ ষরভব হিসেবে প্রতিবাদী সুরযুক্ত মানবিকতার লড়াইটিকে।
এরপর আহমদ রফিক তুলে ধরেন এইসব দ্বান্দ্বিকতা, শ্রেণিসংগ্রাম ও মানবিকতার নান্দনিকায়ন কীভাবে ঘটেছে সেই প্রকাশরূপটি। কবিতার বিশ্লেষণে অবশ্যই নান্দনিকতার ব্যাখ্যা আবশ্যক। কেননা তত্ত্ব বা ভাব কবিতা নয়, কবিতা হলো এসবের রূপায়ণে নির্মিত নান্দনিকতা, যে-সূত্রে আসে কবিতার চিত্রকল্প, দীর্ঘ পঙ্ক্তি ও দীর্ঘ কবিতার নান্দনিকায়নের প্রশ্নটি। ক্রমশ বিষ্ণু দে-র কবিতার সারল্যের দিকটি―যার শুরু সাত ভাই চম্পা কাব্য থেকে তাও আলোচিত হয়। শব্দবৈচিত্র্য ও পুরাণ ঐতিহ্যের অনুষঙ্গ সন্ধানে আহমদ রফিক এড়িয়ে গেছেন কবির প্রতীকের দিকটি, বিষ্ণু দে-র কবিতায় অনেক চিত্রকল্পই প্রতীক, বলা চলে সেগুলি চিত্রকল্পাত্মক প্রতীক।
পরের প্রবন্ধটি ‘রাজনৈতিক অনাচার ও আত্মদ্বন্দ্বের চালচিত্রে অবিনাশী অন্বিষ্ট’। এই কাব্যটি কবির মধ্যপর্যায়ের কবিতাবলিতে সমৃদ্ধ। আহমদ রফিকের অন্বেষণ হচ্ছে উক্ত কাব্যটিতে বিষ্ণু দে-র মন্থর ও হার্দ্য সুরকে চিহ্নিত করা। সমসাময়িক রাজনীতির অপচ্ছায়া ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা আছে রচিত কবিতাগুলোতে, পরিবর্তে কবির কী অন্বিষ্ট তারও বয়ান আছে। সন্দ্বীপের চর-এর জনমুখী চেতনা থেকে এ সময়ে কবিতা সরে এল ভিন্নপথে। সে পথটা হলো ব্যক্তিবৃত্ত তৈরি করে কবিতা―লেখাকে বিষ্ণু দের নিজ ভাবাদর্শের ঘেরাটোপে আবৃত করে রাখার প্রয়াস। যদিও আহমদ রফিক বলেন যে, এই কাব্যটি এক রকম ‘বাঁক ফেরা’ তবু আমরা লক্ষ্য করি অন্বিষ্ট পূর্ববর্তী কাব্যের মূলসুর শ্রেণিসংগ্রাম ও প্রকৃতিতে প্রত্যাবর্তনের দিকগুলো অস্বীকার করে না। বরং নতুন মাত্রিকতা দেয়। এখানে বরং প্রকৃতিচেতনা হয়ে ওঠে সরল ও মমতাঘন শুশ্রƒষা―কবির আত্মদ্বন্দ্ব প্রশমনে। কেন এই আত্মদ্বন্দ্ব ? শুধুই আদর্শের স্বপ্নায়ন থেকে বিচ্যুতি নয়, কবিতারও নিরাশ্রয়ী হওয়ার ভয় জেগেছিল। ইতোমধ্যে পঞ্চাশের কবিবৃন্দ আবির্ভূত হচ্ছেন তাদের ‘মেধাবী লিরিক’ নিয়ে। বিষ্ণু দের কাছে এই সময়টা হচ্ছে শিল্পের জন্য দুস্থ অবস্থা; পঞ্চাশের কবিতার আত্মকেন্দ্রিকতাই কি তাকে সংকটে ফেলেছে ? নাকি নিজেরই কবিতা সংকটাপন্ন ? কিন্তু আমরা তো এ কাব্যে ‘জল দাও’-এর মতো অসাধারণ জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তবতার দীর্ঘ কবিতা পাচ্ছি। তবে এই সময় বিষ্ণু দে স্বদেশ-সন্ধান করছিলেন, বাস্তবে যা ছিল দুস্থ ভগ্ন স্বপ্নের জগৎ।
আহমদ রফিকের এই বিষ্ণু দে পরিক্রমা এ যাবৎ লিখিত বিষ্ণু দে বিষয়ক লেখালেখিরই পথ ধরে এগিয়েছে; বলার ভঙ্গিটুকু নতুন বিন্যাসে শুধু লেখনিবদ্ধ। এ ছাড়া প্রবন্ধকারের উপায়ও ছিল না। তিনি যদি সমকালীন পঞ্চাশের কবিকুলের সঙ্গে একটি প্রতিতুলনা উপস্থাপন করতেন তবে ভিন্ন মেজাজ তৈরি হতো এবং বিষ্ণু দের আত্মসংকট ও কবিতাসংকটের মূল প্রেক্ষাপটটি স্পষ্ট হতো। দেশমাতৃকার নতুন রূপকল্পনির্মাণে বিষ্ণু দের কৃতিত্ব অবশ্য তিনি আমাদের ধরিয়ে দিয়েছেন।
‘ঐতিহ্য ও স্বদেশচেতনার নান্দনিক যাত্রা’ শীর্ষক প্রবন্ধটিও ধারাবাহিকভাবে বিষ্ণু দে’র কাব্যপরিক্রমা করেছে, পরবর্তী কাব্য নাম রেখেছি কোমল গান্ধার-এ এসে বিষ্ণু দে প্রগতিস্বপ্ন ও তা বাস্তবায়নের অটুট সংকল্প অব্যাহত রাখেন সহজ শব্দায়নে। বিষ্ণু দে ব্যক্তিপ্রেম, স্বদেশপ্রেম ও আন্তর্জাতিকতার সম্মিলনে কীভাবে নিজের ওই অটুট সংকল্পে ধারণ করেন তাঁর কবিতায়নকে আহমদ রফিক বিবেচনা করেছেন। দীর্ঘ কথকতা ছিল সন্দ্বীপের চর-এ, আর এখানে কবি ‘সংক্ষিপ্ত বাক্যবিন্যাসের সংহত বয়ানে জীবনের যন্ত্রণা ও সংগ্রামী চেতনাকে’ পরিস্ফূট করে তোলেন। রফিকের আলোচনার এ পর্যায়ে বিষ্ণু দের ব্যক্তিপ্রতীক সৃষ্টির প্রসঙ্গটির কথা এসেছে, যেমন―আষাঢ়, আশ্বিন, বিটপী, আকাশ, নদী ইত্যাদি। রঙের প্রতীকও বিষ্ণু দের কবিতায় তত্ত্বভাবনাযুক্ত, যেমন―সবুজ ও লাল। এর ফলে অটুট স্বপ্ন ও সংগ্রামচিন্তার বয়ানে বিষ্ণু দে’র মধ্যে পুনরাবৃত্তির প্রকাশ ঘটেছে। ধারাবাহিকতা যেমন আছে, তেমনি আছে পুনরাবৃত্তিও। আর আছে ইতিনেতির দ্বান্দ্বিকতা ও দিশানির্দেশনা―জীবনের, দেশ ও সমাজের। আহমদ রফিক তাঁর আলোচনায় ধারাবাহিকতা ভঙ্গ করে আগে-পরের কাব্য ব্যাখ্যা করে দেখান যে, প্রগতির পথযাত্রী বিষ্ণু দের পূর্বাপর কবিতায় বৈষম্যহীন সেই মানবিক সমাজগঠনের ডিকশনই নানা ধারায় উৎসারিত হয়েছে। স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যতের মতো গুরুত্ববহ জটিল চিন্তাক্রম ও কাব্য-রচনারীতির আলোচনা আহমদ রফিকের গ্রন্থে অনুপস্থিত।
৩.
তাঁর পঞ্চম প্রবন্ধটি গুরুত্বপূর্ণ, শীর্ষ নাম ‘কবি বিষ্ণু দে তার চৈতন্যের দূরদেশি সহোদর’। এখানে ইউরোপের আধুনিক কবি এজরা পাউন্ড, এলিয়ট, পল এলুয়ার, লুই আরাগ প্রমুখের কাব্যাদর্শের প্রতি বিষ্ণু দের অনুরাগ ও পঠনপাঠনকে ধরা হয়েছে, যা কবির চেতনা ও কবিতাকে ঋদ্ধ করেছিল। ১৯২২ সালে টি. এস. এলিয়টের ঞযব ডধংঃব ষধহফ কাব্যটি প্রকাশের পর পরই কলকাতায় চলে আসে, তিরিশের কবিবর্গ―বিশেষত বিষ্ণু দে এই কাব্যগ্রন্থটি পড়ে প্রাণিত হন এবং নিজের কবিতা রচনার সঙ্গে অন্তঃগ্রথিত করে নেন। আহমদ রফিক প্রসঙ্গত আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করান এলিয়টের কালের ইউরোপীয় সমাজকাঠামোর দিকে। এইরকম বুর্জোয়া ক্ষয়িত সমাজকাঠামো তিরিশের কালেও বিষ্ণু দে দেখতে পান কলকাতার নাগরিক জীবনে। বিশেষ করে এলিয়টের ঐতিহ্যচিন্তা ও ব্যক্তিপ্রতিভা সম্পর্কিত ভাবনায় তিনি দীক্ষিত হয়েছিলেন। বিষ্ণু দে এলিয়ট ও পাউন্ডের চিত্রকল্পেরও অনুরাগী, পাউন্ডের ছন্দচেতনা তাঁকে আকৃষ্ট করে, বিশেষ করে ‘পাউন্ডের কাব্যচিত্রকল্প, বাক্যবিন্যাসের সংহতি’ তাঁর কাব্যজগতে বিশেষ প্রভাব রাখে। উক্ত দুই ইংরেজ কবি চেয়েছিলেন রোমান্টিকতার আবেগ বর্জন করে কবিতাকে মননশীল করতে। বিষ্ণু দেও তাই করেন, তাঁর প্রথম কাব্য উর্বশী ও আর্টেমিস-এ রোমান্টিকতাকে চূর্ণ করার অভিপ্রায়-এর আরম্ভ। আহমদ রফিক এই দুই কবির কবিতার প্রাকরণিক রূপ আলোচনা করে দেখান তাঁদের সঙ্গে বিষ্ণু দের সামীপ্য। এলিয়টের ‘স্যাটায়ার, অবক্ষয় চিত্রণ, বৈপরীত্যের ব্যবহার, প্রেমবিষয়ক অবিশ্বাস ও ব্যঙ্গবিদ্রƒপের অনুসরণ’ বিষ্ণু দের কবিতায় লক্ষণীয়, বিশেষ করে এলিয়টের মিথচর্চা তাঁর কবিতার অন্যতম আঙ্গিকে পর্যবসিত হয়। আহমদ রফিক বিষ্ণু দের কাব্য ব্যাখ্যা করে উদাহরণ দিয়ে তুলে ধরেন এই আঙ্গিক-রূপ। পরেও এই কবি এলিয়টের কাব্যাদর্শ পরিহার করলেও আঙ্গিককে একেবারে বাদ দেননি।
ফ্যাসিস্টদের হাতে নিহত কবি লোরকার অনুসরণ সমালোচক দেখতে পান বিষ্ণু দের চেতনায় ও কবিতায়। লোরকার লিরিসিজম তাঁর দীর্ঘ কবিতার অংশে-অংশে অনুশীলিত। লোরকার জনচেতনার কবিতার অনুরূপ বিষ্ণু দের জনচেতনামূলক কবিতা। প্রসঙ্গত প্রবন্ধকার আলোচনায় আনেন লুই আরাগঁকে এবং ব্যাখ্যা করেন পরাবাস্তবতার ইতিহাস ও বিবর্তনকে; নির্দেশ করেন পল এলুয়ারের দেশ ও প্রিয়ার ঐকাত্ম্য রচনামূলক কবিতা বিষ্ণু দে’র কাব্যেও অন্তঃপ্রবিষ্ট। তিনি আরও দেখান প্রেমের কবি পাবলো নেরুদার গীতিকবিতার সঙ্গে বিষ্ণু দের সাযুজ্য। ঐতিহ্য স্বাদেশিকতা ও সমাজতান্ত্রিক চেতনায় নেরুদার কবিতা ঋদ্ধ। কাজেই তিনি বিষ্ণু দের অন্তর্সঙ্গী। তবে সব বৈদেশিক কবিই বিষ্ণু দের নিজস্ব ডিকশনে ও কবিতায়নে আত্তীকৃত হয়েছে। বিশেষ করে সমাজ পরিবর্তনের নান্দনিক বিশ্বাস তাঁকে করে দৃপ্ত ও কবিতায় অন্তর্বয়নের দক্ষতায় অকুণ্ঠ। আহমদ রফিক রবীন্দ্রবিরোধিতার দিকে ইঙ্গিত করলেও বিষ্ণু দের রবীন্দ্রনাথের প্রতি যে প্রত্যাবর্তন ঘটেছিল সে দিকে ইঙ্গিত করেননি। রবীন্দ্রনাথের মতোই বিষ্ণু দে চিরায়ত প্রেমিকাকে খোঁজেন তবে কর্মিষ্ঠারূপে, আর তাঁরই মতো জীবনের আশাবাদে, প্রত্যয়ী।
এর পরে গ্রন্থটির জরুরি বিষয় ‘মার্কসীয় সাহিত্যবিতর্কে বিষ্ণু দে’-এই শিরোনামে তৎকালীন বঙ্গদেশে মার্কসবাদীদের সঙ্গে বিষ্ণু দের বিতর্ক-বিরোধিতার ইতিহাসটি আলোচনা করেন। এদেশের বাম রাজনীতির সঙ্গে বিষ্ণু দের প্রত্যক্ষ যোগ ছিল না, তিনি দ্বান্দ্বিক সাম্যবাদী সুধীজন হিসেবেই কবিতা লিখে গেছেন। ইতিহাস বলে যে, তিনি শুধু ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে একবার শরিক হয়েছিলেন মাত্র। কিন্তু ওই কালে এবং আমরণ তিনি ছিলেন সাম্যবাদী-প্রত্যয়ী। আহমদ রফিক আলোচনায় আনেন এদেশে বাম রাজনীতির হঠকারিতা, দ্বন্দ্ব, মতবিভেদ ইত্যাদি। বিশেষ করে সাহিত্য নিয়ে বামপন্থিদের মতাদর্শকে যা বিষ্ণু দের মনঃপূত ছিল না, এর প্রেক্ষাপটে ছিল সাহিত্য কী হবে তা নিয়ে আরাগঁ ও রজার গারোদির মতদ্বৈধ। পরিচয় পত্রিকায় প্রাবন্ধিক-বুদ্ধিজীবী নৃপেন্দ্র গোস্বামী এ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন। রজার গারোদির মত ছিল রসতত্ত্বে কমিউনিস্ট পার্টির লাইন বলে কিছু থাকবে না, সাহিত্যশিল্পী ধরাবাঁধা ছকে সাহিত্যচর্চা করবেন না, আর আরাগঁর বক্তব্য ছিল শিল্পীকে তত্ত্ব ও দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের মাপকাঠিতে যাচাই করে নিতে হবে। চল্লিশের দশকে বিষ্ণু দের মার্কসবাদী ভাবাদর্শ নিয়ে কোনও তর্ক ওঠেনি। কিন্তু উক্ত লেখা প্রকাশিত হওয়ার পর বামপন্থি মহলে প্রবল মতান্তর দেখা দেয়। আরেক মার্কসবাদী লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ১৩৫৪-এর পরিচয় পত্রিকায় বিষ্ণু দে লিখিত ‘গল্পে উপন্যাসে সাবালক বাংলা’ প্রবন্ধের তীব্র সমালোচনা করেন। বিষ্ণু দের উক্ত প্রবন্ধে কল্লোলের লেখক অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা হয়েছিল। তৎকালীন বামপন্থী নীহার দাশগুপ্ত বিষ্ণু দের লেখার সমালোচনা করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প ‘গায়েন’-এর প্রশংসা করে অচিন্ত্যকুমারের ‘মুচিগায়েন’ গল্পটিকে ‘নির্জীব নিষ্প্রাণ’ মানুষের চরিত্রভিত্তিক রচনা বলেন। এতে বিষ্ণু দে ক্ষুব্ধ হন এবং তিক্ততার সঙ্গে নীহারের প্রবন্ধকে আখ্যায়িত করেন ‘ভ্রান্তি বিলাস’ বলে। বিষ্ণু দের সম্পূর্ণ প্রবন্ধে আরও যেসব গল্পকারের আলোচনা ছিল তা বাদ দিয়ে অচিন্ত্যকুমারবিষয়ক নিজের মূল্যায়নের বিরোধিতা করায় বিষ্ণু দে অযৌক্তিক কিছু অভিযোগও উত্থাপন করেন। তখন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, অনিলকুমার সিংহ কমিউনিস্টদের বাদ-প্রতিবাদ নিয়ে প্রবন্ধ লেখেন। মানিকের আলোচনা ছিল বস্তুনিষ্ঠ এবং সে সঙ্গে আত্ম- সমালোচনামূলক। তাঁর মতে, সাহিত্য রচনায় ‘চাষীর জীবনের বাস্তবতাতে খুঁজতে হবে তার মর্ম।’ এখানে আহমদ রফিক বিষ্ণু দে’র সাহিত্য সমালোচনা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তাঁকে কিছুটা অভিযুক্তই করেন। বিষ্ণু দে বিরক্ত হয়ে কমিউনিস্টের সঙ্গ পরিত্যাগ করেন, পরিচয় পত্রিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে সাহিত্যপত্র নামে পত্রিকা প্রকাশ করেন। এ পত্রিকায় তিনি মানিকের বক্তব্যকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেন। তাঁর ‘রাজায় রাজায়’ প্রবন্ধে এর স্বাক্ষর আছে। দুই পক্ষের সমালোচনা করে তিনি অবস্থান নেন ‘ত্রিভুজের শীর্ষবিন্দুতে। অর্থাৎ মার্কসবাদী সাহিত্যনীতির বিতর্কে দ্বিতীয় পক্ষ অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টি-সংশ্লিষ্ট লেখক-শিল্পীদের প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজের মার্কসবাদী সাহিত্যতত্ত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়েছেন।’ তীব্র আক্রমণাত্মক এই প্রবন্ধে মার্কসের বিভিন্ন মতবাদ ও তত্ত্ব নিয়ে জোর আলোচনা থাকলেও তিনি ঘুরেফিরে অচিন্ত্যকুমার ও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রশংসা করেন এঙ্গেলস ও লেনিনের উদ্ধৃতি সহযোগে। এই প্রবন্ধেও বিষ্ণু দের স্ববিরোধিতাকে চিহ্নিত করেন আহমদ রফিক। তিনি কবির এইসব সাহিত্যসমালোচনার ব্যাপক বিশ্লেষণ করেন যা তথ্যগুণে সমৃদ্ধ। এই প্রবন্ধটি গ্রন্থের সেরা প্রবন্ধ এবং তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন যে মার্কসবাদীদের এসব বিতর্ক প্রগতিশীল সাহিত্যরচনাকেই দুর্বল করেছে। এই বিতর্কের জের ধরে মার্কসীয় চেতনার বৈপরীত্য যেমন প্রকাশ পেয়েছিল তেমনি চুলচেরা ‘বিশ্লেষণে বাংলা সাহিত্যের কিছু অপ্রকাশিত রূপ এবং চরিত্রও বেরিয়ে এসেছিল, যা অপ্রিয় হলেও সত্য। এখানেই এই বিতর্কের ইতিবাচক দিক।’
৪.
আহমদ রফিকের ভাবনায় বিষ্ণু দের কবিতা সম্পর্কে জীবনঘনিষ্ঠ প্রগতিশীল ধ্যানধারণার রূপায়ণ বিধৃত হয়েছে। তবে ওই শেষ প্রবন্ধটিতে বিষ্ণু দের স্ববিরোধিতা নিয়ে প্রবন্ধকারের তীক্ষè সমালোচনাও আছে। মনে হয়, প্রবন্ধগুলো আলাদা-আলাদাভাবে রচিত। তাই কাব্যালোচনার পথপরিক্রমায় বিষয়ের পুনরাবৃত্তি আছে, কারণ স্বয়ং বিষ্ণু দে’র দীর্ঘ কাব্যযাত্রায় এই পুনরাবৃত্তি রয়ে গেছে। আহমদ রফিক যেমন নান্দনিকবোধে ও প্রগতিভাবনায় বিষ্ণু দে’কে ধারণ করেছেন তেমনি তাঁর সাহিত্য সমালোচনার বিভ্রান্তি নিয়েও কথা বলেছেন। এর ফলে গ্রন্থটিতে আমরা ইতিনেতি দুই বিষ্ণু দেকেই পাই, তার জটিল কাব্যরীতিতে এলিয়ট-পাউন্ড-লোরকা-এলুয়ার-নেরুদা প্রমুখের অনুপ্রাণনাও লক্ষ করি।
প্রবন্ধকারের এই ভাবনায় প্রকাশ পেয়েছে মেধাবী মনন ও কাব্যবোধের গরিমা, তাঁর বিষ্ণু দে-ভাবনা এই দিক থেকে গুরুত্ববহ যে আহমদ রফিক এদেশের প্রথিতযশা একজন চিন্তাবিদ, গদ্যশিল্পী ও সাহিত্যিক। তাঁর অভিমত বিশ্লেষণ গ্রন্থটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের সমালোচনা সাহিত্যের জন্যও জরুরি। বাংলাদেশে বিষ্ণু দে-চর্চায় একাডেমিক পর্যায়ে গবেষণা হয়েছে, কিন্তু খুব বেশি আলোচনা হয়নি তাঁকে নিয়ে। সেই অভাব পূরণ করলেন আহমদ রফিক। তাঁকে আমাদের কৃতজ্ঞতা জানাই।
লেখক : প্রাবন্ধিক



