প্রচ্ছদ রচনা : পিতৃতুল্য আহমদ রফিকের জন্য শ্রদ্ধা : সাজ্জাদ আরেফিন

প্রচ্ছদ রচনা : ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক―গ্রন্থ আলোচনা
কৈশোর উত্তীর্ণ বয়স। মফস্সলে বাস করা বালকের প্রাণপণ চেষ্টা―কবি হতে হবে। হাতের নাগালে পাওয়া―ধার করা কবিতার বই―যা পেয়েছি গো-গ্রাসে গিলেছি। সুকান্তের ছাড়পত্র কবিতার বই তো নয়―যেন স্বর্গ হাতে পাওয়া।
প্রিয় কবি তালিকায় কাজী নজরুল ইসলাম-সুকান্ত ভট্টাচার্য―তারপর এক দুনিয়া ফারাক আসাদ চৌধুরী, মুহম্মদ নূরুল হুদা, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা পেরিয়ে রফিক আজাদ। বয়স বাড়ে। জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলা আরেক দুনিয়ার দ্বার খুলে দেয়।
স্কুল পেরিয়ে কলেজ। কবিতার নেশা ছাড়ে না। মুক্তধারার আট টাকা দশ টাকা বার টাকা দামের বাংলাদেশের কবিদের বইয়ের পাহাড় জমে। টেবিলে―বইয়ের শেলফে ষাট ও সত্তরের দশকের কবিদের মেলা―ঘাসের ঘটনা থেকে আবদুল মান্নান সৈয়দের শ্রেষ্ঠ কবিতা। কবিতা লিখতে গেলে ছন্দ জানতে হয়। ছন্দ মানে কবিতার অন্ত্যমিল নয়। এ তথ্যও ততদিনে জেনে গেছি। মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের বাংলা কবিতার ছন্দ আর নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতার ক্লাস কত বার যে পড়েছি। গুনে গুনে মুক্তাক্ষর বদ্ধাক্ষর―মাত্রা হিসাব করা। তিন রকম ছন্দে মাত্রা গণনার নিয়ম―বিস্ময়ের পর বিস্ময়।
আমার সেইসব বিস্ময়মুগ্ধ সময়ে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বিক্রয় কেন্দ্রে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর এক রঙে আঁকা নেশাধরা প্রচ্ছদের একটি কবিতার বই পেয়ে যাই। নাম বাউল মাটিতে মন। কবির নাম আহমদ রফিক। আগে কখনও এই কবির নাম শুনিনি। গ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘পূর্বলেখ’র দু লাইন মনে তোলপাড় তোলে :
প্রাণের আবেগে ফোটে যে-শিমুল কিংবা
কোমল ক্যানভাস জুড়ে ঝলসানো কৃষ্ণচূড়া
গ্রাম নদী মাঠ―সারি সারি শিমুলের গাছ―ফুলে ফুলে শালিকের চঞ্চল ওড়াউড়ি―আমার শৈশব সামনে এসে দাঁড়ায়। মেঘনা পাড়ের বিশাল এলাকা জুড়ে ধান কাউন আর তিল-তিশির খেত―মাতাল বাতাসে উথালপাথাল―হাতছানি দিয়ে ডাকে। আমার চোখ স্থির হয়ে থাকে―বাউল মাটিতে মনের কবিতার পর কবিতার চরণে চরণে। আমার মুগ্ধতা কাটে না। এক রোমান্টিক বিপ্লবী কবিকর্মী ঘুরে বেড়ায় আমার চেতনা জুড়ে। শহরে উদ্বাস্তু বিপ্লবী―মন তার পড়ে থাকে গ্রামের নিসর্গে―আলপথে― ফসলের মাঠে। কবির নিজের ভাষ্য : ‘চিরদিনকার বাংলার পায়ে চলা পথের সারল্যে মাঠ বন নদী গ্রাম ভাঙা মঠ মিনার বুনো ঝোপ ভাট কচু শাপলা শালুকের বিচিত্র বৈভব নিয়ে ঘর-জাগা মানুষ আমার পরম বিস্ময়।’
এইসব ঘর-জাগা মানুষের জন্য―তাদের মুখের হাসি অটুট রাখার জন্য কবির নিরন্তর চেষ্টা―তাঁর রাজনীতি-তাঁর লেখালেখি―সমস্ত আয়োজন। ফেরার পালিয়ে বেড়ানো দিন―বিপ্লবের স্বপ্ন বুকে এক রোমান্টিক কবিকর্মীর রচনা বাউল মাটিতে মনের অধিকাংশ কবিতা আবহমান বাংলাদেশের নিসর্গ আর নস্টালজিয়ার সমাহার।
বইটি সম্পর্কে প্রকাশকের কথা : ‘বাংলার গ্রাম আর তার প্রাণের বহিরঙ্গে উদ্ভাসিত অপরূপ বিচিত্র নিসর্গের প্রেক্ষাপটে যে প্রাণের দ্যোতনা, শব্দে-সুরে, বর্ণে-গন্ধে হৃদয়ের যে সজীব আকুলতা মাটির মমতা ছুঁয়ে ছুঁয়ে ঐতিহ্যের ধারা বহন করে চলেছে―তার বহিঃপ্রকাশ একান্তভাবেই বাঙালিয়ানায় সিক্ত, কখনও লোকায়তিক সহজিয়া আবেগে আপ্লুত, কখনও-বা সাহসে-সংগ্রামে প্রাণবন্ত।
চিরায়ত বাংলার নদী-মাঠ, খাল-বিল, গাছ-গাছালি ও প্রান্তরের ঐশ্বর্য এবং তার বুকে জীবনের কলতান চিত্রময় অভিব্যক্তি নিয়ে বাউল মাটিতে মন কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় সজ্জিত ও প্রাণবন্ত।’
বাউল মাটিতে মন থেকে কয়েকটি উদাহরণ দিই―যেসব কবিতার লাইন আজও আমাকে দিশেহারা করে তাড়িয়ে নিয়ে যায় শৈশবে-কৈশোরে ―প্রথম যৌবনের দিনগুলিতে :
ক. প্রাণে ও নিসর্গে মেশা প্রাকৃত সহজে পাবে মানবিক রাগ-রাগিণীর
সুরে ও ছবিতে মূর্ত অবিনাশী তানের বিস্তারে
… … …
নিসর্গ সঙ্গীতে দ্যাখো চৈতন্যের পূর্ণ পাপড়িগুলো
চলেছে নিশ্চিন্তে ভেসে পৃথিবীর শুদ্ধতম দিগন্তের দিকে।
খ. অজারছবির রঙে হৃদ্যতায় উদ্ভাসিত মুখের নিসর্গ। বারবার তার
কাছে ফিরে ফিরে আসি। সুরে গন্ধে আলোকিত মুখগুলো কত
পরিচিত!…
গ. বাংলার গ্রাম আর বাংলার নিসর্গ যেন এক অবাক মমতায়
হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে মাটির গন্ধ আর পায়ে
চলা পথের সারল্য আমাকে আকুল করে তোলে। ধসনামা খাড়া
পায়ে দাঁড়িয়ে জলের নরম শব্দ কানে আসে, ওপারের চরে কোমল
স্নিগ্ধতায় রসালো সবুজের ঝিলিমিলি, আরো দূরে অস্পষ্ট নীলাভ
মায়ার হাতছানি দূরযাত্রার বিষণ্ন রেশ বুলিয়ে দেয় প্রাণে।
ঘ. অপরূপ এই সোনার বাংলা আমাদের একান্ত আপন, মমতার
গভীর বন্ধনে বাঁধা, নিরবচ্ছিন্ন গর্বের, পরম শ্লাঘার বিষয়। এর
ধুলোমাখা বাতাস বুকে নিয়েই আমাদের যাত্রা শুরু, চিরদিনকার
আসা-যাওয়ার পরিক্রমা।
ঙ. নীলে ও সবুজে বোনা বাংলার প্রতিটি প্রান্তর
নদী ও বন ঘাস ফুল গাছ-গাছালির
অবাক উচ্ছল রূপ লোকায়ত প্রাণের সারল্যে
বিন্যস্ত, শিশিরভেজা পথে মাঠে
আকাশের রঙিন বাসনা
খুঁজে ফেরে চেনামুখ হৃদয়ের পরিচিত ছবি।
চ. আমি যাবো সেই মাঠে নবান্নের দেশে
আষাঢ়ের আউল বৃষ্টিতে
ঝরে গান
অভিষেকে,
সবুজ সবুজ ঢেউ যৌবনের থই থই প্রাণ
ভাদরের ভরা কূল দু-বাহুর আকুল আশ্লেষ
পার হয়ে শরতের সমৃদ্ধ মধুর
রোদের নীলায় ভেসে,
ধরা দেয় আমনের কুয়াশায়
সিক্ত মুখ হেমন্তের সোনালি হলুদে।
ছ. শীতল পাটিতে বোনা বাংলার মুখের নিসর্গ
অথই ইশারা দীপ্তি পিপাসায় ডেকেছিল গভীর নিকটে
তার টানে ভেসে গেছে বাউল যৌবন
হৃদয়ের অনীহা-অস্থির নৈরাজ্যিক নিঃসঙ্গ প্রহর―
বাউল মাটিতে মন কবি আহমদ রফিকের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। তাঁর কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ১০টি। প্রায় সব কটি কাব্যগ্রন্থই আমার সংগ্রহে আছে। পড়েছি। বাউল মাটিতে মন ছাড়া কোনও গ্রন্থ একাধিকবার পড়িনি। বাউল মাটিতে মন এখনও আমাকে আগের মতোই টানে।
দুই
গত শতকের নয়ের দশকের মাঝামাঝি। আহমদ রফিকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন সেলিনা হোসেন―আমাদের সেলিনা আপা। তিনি তখন বাংলা একাডেমির সংকলন উপবিভাগের প্রধান। আমি তখন ঐ উপবিভাগের তরুণ কর্মকর্তা। বাংলা একাডেমি থেকে আহসান হাবীব রচনাবলি প্রকাশিত হবে। সম্পাদক আহমদ রফিক। তাঁর সাথে একাডেমির পক্ষে সকল যোগাযোগের দায়িত্ব পড়ে আমার ওপর।
সেই শুরু। আড়াই দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। নানাভাবে তাঁকে দেখার―তাঁর কাছে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। তিনি কবি, ভাষাসংগ্রামী, গবেষক, প্রাবন্ধিক, গল্পকার ও রবীন্দ্রগবেষক, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী―এইসব প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের বাইরের যে আহমদ রফিক―তাঁকে দেখার দুর্লভ সুযোগ আমার হয়েছে। সন্তানের জন্য একজন পিতার যে আকুলতা―যে স্নেহ-ভালোবাসা-কল্যাণ কামনা―আমি তার সবটুকুই পেয়েছি।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক



