আর্কাইভপ্রচ্ছদ রচনা

প্রচ্ছদ রচনা : সংক্ষিপ্ত, কিন্তু সারবান : ভাষা-আন্দোলন বিষয়ে আহমদ রফিকের দুটি বই : মুহিত হাসান

প্রচ্ছদ রচনা : ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক―গ্রন্থ আলোচনা

আহমদ রফিক ভাষা-আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বে  গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে অনতিতিরিশ বয়সেই এক অনন্য উচ্চতায় পৌছেছিলেন, পরবর্তীকালে সক্রিয় থেকেছেন ভাষা-আন্দোলনের বস্তুনিষ্ঠ, বহুমাত্রিক ও অন্যতর প্রেক্ষিতময় ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রেও। ভাষা-আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী তথা ‘ফুট সোলজার’দের মধ্যে ওই অগ্নিগর্ভ সময়ের এমন নির্মোহ ইতিহাসচর্চার উদাহরণ খুব বেশি সুলভ নয়, ওয়াকিফহাল পাঠকমাত্রেই তা জানবেন। ফলত ভাষা-আন্দোলন নিয়ে আহমদ রফিকের গবেষণাকর্ম তথা লেখালেখির বিশিষ্টতা ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত।

ভাষা-আন্দোলন নিয়ে আহমদ রফিক যেমন বিস্তারিত গড়নের একাধিক বই লিখেছেন, তেমনি বাংলাদেশের ইতিহাসের অতীব গুরুত্বপূর্ণ ওই সময়ের ইতিহাস সর্বসাধারণের―বিশেষত নতুন প্রজন্মের বা কিশোর-তরুণদের উপযোগী করে লিখবার আকাক্সক্ষাও তাঁর মনে জাগরূক ছিল। সেই লক্ষ্যেই তিনি লিখলেন ভাষা-আন্দোলন (প্রথমা প্রকাশন, ২০০৯) শীর্ষক বইটি। পঁচিশটি সংক্ষিপ্ত অধ্যায়ে বিভক্ত ৮৬ পৃষ্ঠার বইটি লিখবার নেপথ্যের উদ্দেশ্য তিনি খুব স্পষ্ট করেই জানিয়ে দেন ভূমিকায় ‘যথাসম্ভব সহজ ভাষায় সংক্ষেপে লেখা ভাষা-আন্দোলনের এ ইতিকথা, জোর দিয়েই বলতে পারি, আন্দোলনের সঠিক তথ্য ও ঘটনানির্ভর ছোটখাটো ইতিহাস, যে লেখার পেছনে রয়েছে নিরপেক্ষ, ইতিহাসনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি। লেখকের প্রত্যাশা, ছোট পরিসরে লেখা এ ইতিহাস ব্যাপক পরিসরে পাঠকদের এ দেশে সংঘটিত ভাষা-আন্দোলনের সঠিক ঘটনাবলি জানতে সাহায্য করবে।’

সংক্ষিপ্ত আকারে ইতিহাস রচনা করতে বসলেও আহমদ রফিক ভাষা-আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ ও তাকে ঘিরে সমকালীন ঘাত-অভিঘাতের কোনও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের কথাই এ গ্রন্থে অনুল্লেখিত রাখেননি। ভাষা-আন্দোলনের প্রেক্ষাপটের কথা বলতে গিয়ে তিনি সেই দেশভাগের সময় থেকেই যে ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ উন্মাদনার গায়ে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার উদ্ভট প্রস্তাবও প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক চক্র উচ্চারণ করে আসছিল―তা-ও তৎকালীন পত্র-পত্রিকার সূত্র ধরে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন। আরও দেখান, তখনই ওইরকম ‘মামাবাড়ির আবদার’-এর বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন আবদুল হকের মতো সাহসী প্রগতিমনা বুদ্ধিজীবী-লেখকরাও। পরে, দেশভাগ হওয়ার পর, ভাষা-আন্দোলনের সম্ভাব্য আঁচ অনুভব করতে পেরেই যে সদ্যগঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ‘দেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশ দূষিত করার চেষ্টা চালায়’ এবং বিরুদ্ধ মতের তথা বাংলা ভাষার পক্ষের রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর নির্যাতন চালায়―সেই প্রসঙ্গটিও তিনি তুলে ধরতে ভোলেননি।

আবার ভাষা-আন্দোলনের আদিপর্বে ‘ব্যাপক’ ভূমিকা রাখা সম্পর্কে তমদ্দুন মজলিস নামক সংগঠনটি নিয়ে যা কিছু রঙ চড়িয়ে লেখা হয়, আদতে তা যে কতটা ফাঁকা ও ভিত্তিহীন―সেটাও আহমদ রফিক সোজা-সাপটা ভাষায় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে দ্বিধা করেন না (পৃ.২৮)।

২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ছাত্ররা যদি ১৪৪ ধারা অমান্য করে মিছিল না করতেন, তাহলে হয়তো ভাষা-আন্দোলন কাক্সিক্ষত রূপ পেত না, এমন মন্তব্য লেখকের। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ফলে আন্দোলনে গুলি চালনা, আর তা থেকে সাধারণ মানুষের বিপুল বিক্ষোভে ভাষা-আন্দোলনের সর্বজনীনতা লাভ। লেখক এই বিষয়ে শুধু উপর্যুক্ত গ্রন্থে নিছক মন্তব্য সাজিয়েই থেমে যাননি, নিজের বক্তব্যকে রীতিমতো যুক্তি ও ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত তুলে ধরে পোক্ত করেছেন। নির্ভরযোগ্য ও মান্যসূত্রের সমাহার ছাড়াও, এই বইতে আহমদ রফিকের আপন অভিজ্ঞতা থেকে লব্ধ ভাষা-আন্দোলনের কিছু মুহূর্তের বর্ণনাও বইটিকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। যেমন, এক জায়গায় পাই বাহান্নর ২১ ফেব্রুয়ারির পরের দিন (২২ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা শহরে ছাত্রদের গণ-আন্দোলনের ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ সংলগ্ন এলাকা ‘মুক্ত এলাকায় পরিণত’ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এক পুলিশ কর্মকর্তার ক্ষুব্ধ মন্তব্যের কথা। তৎকালীন ডিএসপি সিদ্দিক দেওয়ান উদ্ভূত বেসামাল অবস্থা দেখে তখন ছাত্রদের উদ্দেশে মন্তব্য করেছিলেন, ‘দ্যাশ তো এখন আপনারাই চালাচ্ছেন’ (পৃ. ৫৪)। বাস্তবের মাটি থেকে পাওয়া এমন একটি ছোট্ট বাক্যই যেন বাহান্নর সেই রক্তঝরা তীব্র সময়কে আগাপাশতলা চিনিয়ে দেয়। এখানেই যেন আহমদ রফিকের মুন্সিয়ানা।

আর এ গ্রন্থের শেষ অধ্যায় তথা উপসংহার ‘কী পেয়েছি একুশের আন্দোলন থেকে ?’ ভাষা-আন্দোলনের চূড়ান্ত অর্জন ও প্রভাব সম্পর্কে আহমদ রফিকের উভয় মন্তব্য যুগপৎ ভাবনাসঞ্চারী ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বৈকি : ‘একুশে আমাদের জাতীয় জীবনে যা দিয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভাষা ও সাহিত্যক্ষেত্রে এক নয়া চেতনার প্রকাশ, যা একাধারে গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিবাদী চরিত্রের।… বাঙালির জাতীয়তাবোধক আত্ম-অন্বেষা ও আত্মচেতনার ধারা একান্তভাবে একুশের দান।… একুশের ভাষা-আন্দোলন শুধু ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই ছিল না, ছিল গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের নেপথ্য শক্তি।’ (পৃ. ৮৫-৮৬)

ভাষা-আন্দোলন বইটির পরিপূরক হিসেবে পড়া যেতে পারে আহমদ রফিকের আরেকটি বই, একুশের মুহূর্তগুলো (প্রথমা প্রকাশন, ২০১৭)। আকারেও এটি পূর্বোক্ত বইটির প্রায় সমান, ৮০ পৃষ্ঠা। এ বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে ভাষা-আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিত বর্ণনায় আরও অতীতে পদচারণ লেখকের। মধ্যযুগের বাঙালি কবিরা কীভাবে মাতৃভাষার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন তার বিবরণ দিয়ে তাঁর মন্তব্য : ‘তখনকার সমাজব্যবস্থায় কারও পক্ষে বাংলা ভাষাবিরোধীদের পক্ষে এতটা জোরালোভাবে সওয়াল করা সহজ কাজ ছিল না। তবু সাহসে ভর করে তাঁরা তা করেছেন।’ (পৃ. ১১) ‘অগ্নিকণার মতো ছোট ছোট ঘটনা’ কী করে চল্লিশের দশক থেকেই ভাষা-আন্দোলনের অনল একটু একটু করে তৈরি করছিল, বিবরণ দিয়েছেন তারও। অবশ্য, ভাষা-আন্দোলন গ্রন্থে যেসব প্রসঙ্গ এসেছে সেসবের কয়েকটি এই বইতেও মিলবে। তবে শহিদ মিনার প্রতিষ্ঠা ও বাহান্ন-পরবর্তী বছরগুলোতে একুশের প্রভাতফেরি বিষয়ে আলোচনা এখানে কিছুটা সবিস্তারে ও নবীনদের নিকট স্বল্পজ্ঞাত তথ্যসমেত লভ্য। উদাহরণ হিসেবে প্রভাতফেরির গানের আদিপর্ব সম্পর্কে রচিত অনুচ্ছেদটি এখানে তুলে ধরা যেতে পারে :

“প্রথম প্রভাতফেরির গান ছিল ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের লেখা ‘মৃত্যুকে যারা তুচ্ছ করিল ভাষা বাঁচাবার তরে/আজিকে স্মরিও তারে’। সে গানে ছিল করুণ অনুভূতির প্রকাশ। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মিছিলে প্রধানত শোনা গেছে ছাত্রনেতা গাজীউল হকের লেখা গান ‘ভুলবো না, ভুলবো না এ ফেব্রুয়ারি ভুলবো না’। এই গানটিতে ছিল প্রতিবাদী বলিষ্ঠতার প্রকাশ।” (পৃ. ৭৩)

আরও পাই ১৯৫৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির এক গুরুত্ববাহী অথচ কম-জানা ঘটনার উল্লেখসমেত ওই বছর শহিদ দিবস পালনের চালচিত্র :

“সেদিন আজিমপুর কবরস্থানে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটে। শহিদ আবুল বরকতের শোকার্ত মা হাসিনা বেগমকে সেখানে উপস্থিত মওলানা ভাসানী সান্ত্বনা দেন। তাঁকে আখ্যা দেন ‘বাংলার সাড়ে চার কোটি সন্তানের জননী’ বলে। এ বছর অনেক বেশি মহিলাকে কালোপাড় শাড়ি পরে শহিদদের কবরে ফুল দিতে দেখা যায়। সেদিন প্রভাতফেরিতে কেউ কেউ তফাজ্জল হোসেনের লেখা ‘শহীদি খুন ডাক দিয়েছে আজকে ঘুমের ঘোর’ গানটি গান।” (পৃ. ৭৯)

ভাষা-আন্দোলন নিয়ে আহমদ রফিকের এই যুগল গ্রন্থ এক ভিন্নতর দায় মেটানোর লক্ষ্যে রচিত বলে আমরা ধারণা করতে পারি। ইতিহাস তো কোনও অনড় বস্তু নয়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এর মর্ম ও শিক্ষা প্রবহমান হলেই তা সার্থকতা পায়। আহমদ রফিক নিজে ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসের সাক্ষী এবং সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী। ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস-বিকৃতি তাঁকে ব্যথিত করে, তেমনি ভাষা-আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস নবীনদের হাতে পৌঁছে দেবার প্রয়োজনীয়তাও তিনি অনুভব করেন। তাই সেই প্রয়োজনীয়তা মেটাতেই তাঁর উপর্যুক্ত গ্রন্থদ্বয় রচনায় ব্যাপৃত হওয়া।

আহমদ রফিকের ব্যক্তিত্বের স্বাতন্ত্র্য ও ঋজুতা এই দৃষ্টান্ত থেকে আমরা পুনর্বার অনুভব করতে পারি। কিশোর-তরুণদের কাছে ইতিহাসের দায় এড়িয়ে যাওয়া নয়, বরং ইতিহাসের সত্য ও তথ্য তুলে ধরাই যে এই অস্থির-বিক্ষুব্ধ সময়ে বুদ্ধিজীবীর জন্যে সত্যিকার বড় কাজ―এই কথাটি তিনি আমাদের ফের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এই গ্রন্থদ্বয় ভাষা-আন্দোলনের পূর্বাপর সংক্ষেপে হলেও যেমন জানায়, তেমনি এঁর রাজনৈতিক-সামাজিক অভিঘাতের কথাও তরুণদের মর্মে গেঁথে দেয়। এ কারণেই বই দুটি আকারে সংক্ষিপ্ত হলেও প্রকারে সারবান। ভাষা-আন্দোলন বিষয়ে আহমদ রফিকের লেখনীর যে বহুমাত্রিকতার কথা এই নিবন্ধের গোড়ায় তুলেছিলাম, এখানেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। বস্তুত, বই দুটির শক্তিমত্তা ও সার্থকতা এখানেই নিহিত―এমনটি বললে অত্যুক্তি হয় না।

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button