প্রচ্ছদ রচনা : বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে হরফ ষড়যন্ত্র : আহমদ রফিক

প্রচ্ছদ রচনা : ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক―আবার পড়ি : তাঁর রচনা থেকে
বলার অপেক্ষা রাখে না যে শিক্ষিত বাঙালি মুসলমানের মনে এমন এক দৃঢ় প্রত্যয় তৈরি হয়েছিল যে পাকিস্তান নীতিগতভাবে একটি গণতন্ত্রী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মর্যাদা সেখানে রক্ষিত হবে। তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে পাকিস্তানের প্রতিযোগিতাহীন পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু লীগ-নেতৃত্বের ভূমিকায় সে প্রত্যাশা আশঙ্কায় পরিণত হতে শুরু করে, এবং আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কয়েক মাস আগেই।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার (১৪ আগস্ট, ১৯৪৭) পর সে আশঙ্কার মেঘ তো কাটেনি, বরং তা আরও ঘনীভূত হতে থাকে। মূল রাষ্ট্রীয় নীতিমালা ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে পাক গণপরিষদের সূচনালগ্নে ১১ আগস্ট (১৯৪৭) পাকিস্তানের স্থপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর গণতান্ত্রিক ভাষণে, ‘You may belong to any religion or caste or crced―that has nothing to do with the business of the state…. we are starting in the days when there is no discrimination, no distinction between one community and another….we are starting with fundamental principle that we are all citizens and equal citizens of one state.’ (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র প্রথম খণ্ড)। যে আশ্বাস দেওয়া হয় গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা প্রসঙ্গে, তার সঙ্গে বাস্তবে রাষ্ট্রপরিচালনার রীতিনীতির কোনো মিল ছিল না। বৈষম্যই প্রতিটি ক্ষেত্রে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছিল পশ্চিম-পূর্বের পার্থক্য, পূর্বের প্রতি পশ্চিমের তথা কেন্দ্রের অবহেলা ও ভেদমূলক নীতি।
ছোট্ট একটি উদাহরণ। ঢাকায় গণপরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠানের এমনকি সম্প্রদায়গত প্রশ্নেও। প্রশ্নে পরিষদ-সদস্য রাজকুমার চক্রবর্তীর প্রস্তাব বাস্তব অসুবিধার কুযুক্তি দেখিয়ে এককথায় বাতিল করে দেন তমিজুদ্দিন খান। অথচ বেগম শাইস্তা সোহরাওয়ার্দী ইকরামউল্লাহ্ পূর্বোক্ত যুক্তি নাকচ করে দিয়ে বলেন যে, “বাস্তব অসুবিধা বা আর্থিক অসুবিধার পেছনে কোনো যুক্তি নেই। কারণ পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত সদস্যদের সংখ্যা পশ্চিমের তুলনায় বেশি। তাছাড়া পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিমের ‘কলোনি’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে”, ইত্যাদি (দলিলপত্র, ১৪ খণ্ড, পৃ. ৫২-৫৩)।
দুই
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ইতিপূর্বে বলা হয়েছে। সরকার এক্ষেত্রে পিছু হটে শুরু করে হরফ ষড়যন্ত্র। দেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির বিস্ফোরক চরিত্রের মধ্যেও পাকিস্তানি শাসকশ্রেণি (কেন্দ্রে এবং পূর্ববঙ্গে) স্বধর্মচ্যুত হয়নি, অর্থাৎ তারা তাদের নির্ধারিত পথ ধরেই এগিয়েছে। ভাষা সম্পর্কে তাদের মূলনীতি ছিল যে কোনো মূল্যে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা এবং আন্তঃপ্রাদেশিক সাধারণ ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। এ সরকার এবং মওলানা আকরম খাঁ, গোলাম মোস্তফা বা মীজানুর রহমানের মতো সমাজে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিগণ। বাদ যাননি তমিজউদ্দিন খানের মতো রাজনীতিকও।
কিন্তু আটচল্লিশের আন্দোলন তাদের বুঝিয়ে দিয়েছিল যে কাজটা খুব সহজ নয়। তাই কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের উদ্যোগে শুরু হয় ভাষাবিষয়ক নয়া ষড়যন্ত্র―আরবি হরফে বাংলা লেখার ব্যবস্থা করা এবং পূর্ববঙ্গে ব্যাপকভাবে কেন্দ্রীয় অর্থসাহায্যে উর্দু শিক্ষার প্রসার ঘটানোর চেষ্টা। বাঙালি সমাজে-সংস্কৃতিতে গুণগত পরিবর্তন আনার উদ্দেশ্য নিয়েই মুসলিম লীগ সরকারের এ প্রচেষ্টা, যাতে লক্ষ্য অর্জনের কাজ সহজ হয়ে ওঠে।
হরফ ষড়যন্ত্র ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ, এর মূল কারিগর কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান, বাকি লীগ নেতারা তার সহকারি। সঙ্গে সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করেছে বাংলাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা মোল্লা-মৌলবির দল। সমাজে তাদের প্রভাব, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে নেহাত কম ছিল না। মুসলিম লীগ সরকার পরবর্তী এক পর্যায়ে এদেরকেও ব্যবহার করতে চেয়েছিল। ইতঃপূর্বে করাচিতে অনুষ্ঠিত নিখিল পাকিস্তান শিক্ষক সম্মেলনে (২৭ ডিসেম্বর, ১৯৪৭) ভাষণ দিতে গিয়ে ফজলুর রহমান ইঙ্গিত রেখেছিলেন যে, ‘আরবী হরফে বাংলা লেখার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে শিক্ষাগত সামঞ্জস্য বিধান সহজ হবে।’
তাঁর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১২ ফেব্রুয়ারি (১৯৪৯) পেশোয়ারে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান শিক্ষা উপদেষ্টা বোর্ডের সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান গুরুত্বের সঙ্গে আরবি বর্ণমালা প্রবর্তনের কথা বলেন। শিক্ষাব্যবস্থার আদর্শভিত্তিক আমূল পরিবর্তনের ওপরও তিনি জোর দেন। সম্মেলনে গৃহীত এক প্রস্তাবে পাকিস্তান সরকারকে আরবি হরফে বাংলা লেখার পদ্ধতি প্রবর্তনের জন্য সুপারিশ করা হয়।
যুক্তি হিসেবে বলা হয়, ‘পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা বিভিন্ন, এবং এক অংশ অপর অংশের ভাষা গ্রহণ করিতে পারে না। কাজেই সিদ্ধান্ত করা হইয়াছে যে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা হইবে যথাক্রমে বাংলা ও উর্দু। এই দূরবর্তী দুই দেশের মধ্যে ভাষাগত পার্থক্য দূর করিবার একমাত্র উপায় উভয়ের মধ্যে একই অক্ষরের প্রবর্তন। বাংলা ও উর্দু উভয় ভাষাই আরবি অক্ষরে লেখা হইলে উর্দুভাষী বাংলা বই পড়িবার সুযোগ পাইবে আর বাংলাভাষী উর্দু বই পড়িতে পারিবে। এইভাবে পরিণামে বাংলা উর্দু ভাষার সমবায়ে ও সংমিশ্রণে এক নূতন ভাষা গড়িয়া উঠিবে’ (ঢাকা প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৯)। অর্থাৎ তৈরি হবে খিচুড়ি ভাষা।
ফজলুর রহমানের এ উদ্ভট পরিকল্পনার প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে বেশি দেরি হয়নি। ‘ঢাকা প্রকাশ’ কাগজেই জনৈক মুছলিম হুদা ১৩ মার্চ (১৯৪৯) এক চিঠিতে লেখেন, ‘সম্প্রতি পেশোয়ারে পাকিস্তানের শিক্ষা উপদেষ্টা বোর্ডের এক সম্মেলনে আরবি হরফে বাংলা ভাষা লিখিবার পদ্ধতি সম্বন্ধে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হইয়াছে। এবং বাংলা সরকারকে নাকি উহা প্রবর্তনের জন্য সুপারিশ করা হইয়াছে।
‘আমরা আশ্চর্য হইলাম যে, বাংলা ভাষার পরিবর্তনের বা সংস্কার সম্বন্ধে সম্মেলন হইল পেশোয়ারে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবার আগে পূর্ব বাংলার জনসাধারণের মতামত নেওয়া দূরে থাকুক, তাহাদের এ বিষয়ে পূর্ণ আলোচনা করিবার সুযোগও দেওয়া হয় নাই। যে ভাষা আজ ভারত ও পাকিস্তানের যে কোনো ভাষার চেয়ে সমৃদ্ধশালী এবং যাহা পাকিস্তানের শতকরা ৬০ জন লোকের মাতৃভাষা তাহার আমূল পরিবর্তনের কোনো প্রশ্ন উঠিলে তাহা পূর্ব বাংলার জনসাধারণের মতামতের উপরই সম্পূর্ণ নির্ভর করে।
‘এই রূপ পরিবর্তনের ফলে বাংলা ভাষা তার কৃষ্টি ও বৈশিষ্ট্য হারাইয়া ফেলিবে এবং ইহার সমৃদ্ধি দিন দিন ক্ষুণ্ন হইয়া পড়িবে। পূর্ব বাংলার শিক্ষা অন্ততপক্ষে ৫০ বৎসর পিছাইয়া পড়িবে, শিক্ষিত লোকদের আবার বর্ণমালা আয়ত্ত করিতে হইবে, তারপর লিখন ও পঠনের অভ্যাস করিতে কিছুকাল তাহাদের নষ্ট হইবে’ ইত্যাদি। পত্রলেখক আরবি ভাষায় বাংলা উচ্চারণের উপযোগী একাধিক হরফের অভাব, সংযুক্ত উচ্চারণের অসুবিধা ইত্যাদি উল্লেখ করেছেন তার চিঠিতে।
এ তো গেল একজন সাধারণ শিক্ষিত জনের বক্তব্য। এ সম্পর্কে ঢাকার বুদ্ধিজীবী মহলেও যুক্তিগ্রাহ্য প্রতিবাদ উত্থাপিত হয়। ছাত্র-শিক্ষক মহল থেকেও হরফ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ওঠে। কিন্তু ভবী ভোলবার নয়। কেন্দ্রীয় সরকার এ বিষয়ে কোনও প্রতিবাদের তোয়াক্কা না করে শুধু আরবি বর্ণমালা প্রবর্তনের চেষ্টাই অব্যাহত রাখে না, সেই সঙ্গে পূর্ববঙ্গে উর্দু শিক্ষার প্রসার ঘটানোর জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা শুরু করে।
মনে হয় আটচল্লিশ-মার্চের ভাষা আন্দোলনের ধারা নস্যাৎ করার জন্যই কেন্দ্রীয় সরকারের এসব অভিনব প্রচেষ্টা শুরু হয়, পূর্ববঙ্গ সরকারও তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে থাকে। অবাঙালি শিক্ষক বুদ্ধিজীবী ও তাদের বাঙালি সমর্থকগণ এ বিষয়ে জোর কদমে এগিয়ে যেতে থাকেন। ‘বাবায়ে উর্দু’ নামে পরিচিত ড. আবদুল হক একদিকে উর্দুশিক্ষার সর্বজনীন প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সারগর্ভ বক্তৃতা দেন (‘আজাদ’ ৩০ মার্চ ১৯৪৯); অন্যদিকে ঢাকা ক্লাবে আয়োজিত সংবর্ধনা সভায় প্রায় অপ্রাসঙ্গিকভাবেই মন্তব্য করেন যে, ‘পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সকলেই উর্দুর পক্ষে’ (‘আজাদ’, ৯ এপ্রিল, ১৯৪৯)। এই সঙ্গে সুর মিলিয়ে কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাদানি (‘আজাদ’, ১০ এপ্রিল ১৯৪৯)।
এমনকি বাংলা ভাষা সম্পর্কে এক বেতার বক্তৃতায় আপত্তিকর মন্তব্য করেন অধ্যাপক সাদানি। তার বক্তব্যের প্রতিবাদে ঢাকা মেডিকেল কলেজে অনুষ্ঠিত ছাত্রসভায় ঐ অধ্যাপকের পদচ্যুতির দাবি জানানো হয় (দৈনিক ‘আজাদ’, ৩ এপ্রিল ১৯৪৯)। এ ধরনের তৎপরতার ফলে রাষ্ট্রভাষা-বিতর্ক বর্ণমালা-বিতর্কে ঘিরে নতুন মাত্রা অর্জন করে। বাঙালি ছাত্র-শিক্ষিত মহল নতুন করে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। সম্ভবত এটাই উদ্দেশ্য ছিল ফজলুর রহমান, নাজিমুদ্দিন চক্রের। অর্থাৎ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি যাতে নতুন বিতর্কের ঘোলাটে আবহের টানে পেছনে পড়ে যায়, নতুন করে শক্তি অর্জন না করতে পারে।
বাস্তবিক গোটা ঊনচল্লিশ সাল বর্ণমালা বিতর্ক ও বাংলা বনাম উর্দু বিতর্কে শেষ হয়। যথেষ্ট উত্তাপ সঞ্চারিত হয় এ বাদ-প্রতিবাদে, মূলত পত্রপত্রিকায় লেখা ও বিবৃতিতে এবং নানা অনুষ্ঠানে বক্তৃতায়। এ উপলক্ষে জনাব আবদুল হকও পিছিয়ে থাকেননি। ‘আরবী হরফে বাংলা’ নিবন্ধে তিনি বলেন : ‘সম্প্রতি পাকিস্তান শিক্ষা-উপদেষ্টা বোর্ড-এর পেশোয়ার অধিবেশনে পাকিস্তানের সকল প্রাদেশিক ভাষাকে একই হরফে লেখার সুপারিশ করা হয়েছে। ‘একই হরফ’ বলতে আরবি হরফকেই বুঝানো হয়েছে।…
‘এই সুপারিশকে যতই উদ্ভট মনে হোক না কেন, আরবী হরফের প্রতি সাধারণ মুসলমানের দুর্বলতার কথা মনে রাখলে এর সপক্ষে প্রচারকার্যের ফলাফলের প্রতি উদাসীন থাকা ভুল হবে। বস্তুত ইতিমধ্যেই বাঙ্গালি মুসলমানদের মধ্যে এ সম্বন্ধে মতবিভেদের সূচনা হয়েছে। অনেকেই এই প্রচারণায় বিভ্রান্ত হচ্ছেন।
‘সম্ভবত উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গ্রহণ এবং পূর্ব পাকিস্তান অবশ্য-শিক্ষণীয় ভাষা রূপে চাপিয়ে দেওয়া থেকে আরবী হরফের সপক্ষীয় প্রচারণাকে আলাদা করে দেখা যায় না। পূর্ব পাকিস্তানীদের উপর জোর করে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় এখন আরবী হরফের নাম করে উর্দু অনুপ্রবিষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আসলে আরবী অক্ষরের প্রতি মুসলমানদের দুর্বলতার সুযোগে খিড়কির পথে তাদের উর্দুতে দীক্ষিত করে নেওয়াই এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য বলে মনে হয়’ (ইত্তেহাদ, ২০ মার্চ, ১৯৪৯)।
জনাব হক পাকিস্তানি শাসকদের সঠিক উদ্দেশ্যের বিন্দুতেই আঘাত করেছেন। আসলে এ বিষয়ে মুসলিম জাহানের সঙ্গে আত্মিক যোগসূত্র তৈরি কিংবা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানিদের পরস্পরের চেনাজানা সহজ করে তোলা ইত্যাদি কোনো যুক্তিই ধোপে টেকে না। ভাষা বিশেষজ্ঞ থেকে অবিশেষজ্ঞ কেউ বলতে দ্বিধা করেননি যে আরবি বর্ণমালায় বাংলা ভাষার যথার্থ প্রকাশের উপযোগী একাধিক অক্ষরের অভাব নতুন প্রস্তাবকে বরং সমস্যা-জটিল করে তুলবে।
এত সব প্রতিবাদের মুখেও কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে পাকিস্তান শিক্ষা উপদেষ্টা বোর্ডের একাধিক বৈঠক ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়। এবং প্রতিটি বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান তাঁর অভিনব পরিকল্পনার সারবত্তা ব্যাখ্যা করেন এবং জাতীয় ভাষা উর্দুর সর্বাঙ্গীন উন্নতির জন্য দেশবাসীকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। কিন্তু পূর্ব বাংলার সচেতন ছাত্র-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীদের এ সরকারি অভিসন্ধি বুঝতে অসুবিধা হয়নি, বিশেষ করে গোলাম মোস্তফা, সাজ্জাদ হোসায়েন, মীজানুর রহমান প্রমুখের বাংলা-বিরোধী ভূমিকার উদ্দেশ্য।
তাই পাকিস্তানি আজাদি দিবস (১৪ আগস্ট) উপলক্ষে ‘মাহেনও’ পত্রিকায় প্রকাশিত উর্দু ও আরবি হরফের পক্ষে মীজানুর রহমানের লেখা ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার নাম’ রচনাটির উদ্দেশ্য কারও কাছে অস্পষ্ট থাকেনি, যদিও বহু উদ্ভট বক্তব্য এতে সন্নিবিষ্ট হয়েছে। নিবন্ধের ভাষাও তাঁর উদ্দেশ্য গোপন রাখে না। সামান্য নমুনা পাঠকের জন্য উপভোগ্যই মনে হবে : ‘দুনিয়ার প্রত্যেক আজাদ রাষ্ট্রের নিজস্ব রাষ্ট্রভাষা রয়েছে এবং থাকা দরকার। এই বিষয়ে তর্ক-তকরারের গোনজায়েশ নাই।
‘…পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার সওয়াল স্বাভাবিকভাবেই উঠেছিল। কায়েদে আজম নির্দেশ দিয়ে গেছেন―উর্দ্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। কায়েদে আজমের নির্দেশ যুক্তিসঙ্গত। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবার কবেলিয়াত উর্দ্দুর রয়েছে।…রাষ্ট্র বা জাতির নামানুসারে হয়ে থাকে রাষ্ট্রভাষার নাম। এই হিসাবে আমার মতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার নাম হওয়া উচিৎ পাকিস্তানী। উর্দু ভাষাকে পাকিস্তানী বলে অভিহিত করাই আমার প্রস্তাব।’ এবার ঝুলি থেকে বেড়াল বেরিয়ে পড়েছে। এর পরও তাঁর বক্তব্য : ‘আরবী হরফে লিখিত হলে মুসলমানী বাংলা ও মুসলমানী উর্দুর সমবায়ে গঠিত হবে ঈড়সসড়হ ংপৎরঢ়ঃ-এ লেখা পাকিস্তানী বাংলা। মাশরেকী ও মাগরেবী পাকিস্তানের জবানী সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান এই পথে।’ উদ্দেশ্য খুবই স্পষ্ট। তাই হরফ-বিতর্ক সম্পর্কে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর এ সময়কার একটি লেখা বিতর্কের জবাব হিসাবেই উদ্ধৃত হলো (আজাদ, বৈশাখ ৬-৭, ১৩৫৬)।
তিন
‘আমাদের কয়েকজন মাননীয় রাজনীতিক এবং তাঁহাদের কয়েকজন অনুরক্ত ভক্ত পূর্ব পাকিস্তানে আরবী হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব তুলিয়াছে : (১) আমাদিগকে বাংলা, আরবী ও ইংরেজী হরফ শিখিতে হয়। উর্দু রাষ্ট্রভাষা হওয়ার ফলে দেশের হিন্দুদিগকেও বাংলা, দেবনাগরী ও ইংরেজী হরফের অতিরিক্ত আরবী হরফ শিখিতে হইবে। বাংলার পরিবর্ত্তে আরবী হরফের প্রচলন হইলে শিক্ষণীয় বর্ণমালার সংখ্যা কমিবে। (২) আরবী হরফ ইসলামী রাষ্ট্রসমূহের ও পশ্চিম পাকিস্তানের সহিত যোগসূত্ররূপে কার্য্য করিবে। (৩) আরবী হরফ বাংলা অপেক্ষা সরল এবং ছাপা, টাইপ রাইটার ও শর্টহ্যান্ডের জন্য অধিকতর উপযোগী। (৪) আরবী হরফের প্রচলন হইলে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানগণের মধ্যে অক্ষরজ্ঞান অনায়াসে ও অতিসত্বর বাড়িয়া যাইবে। এই সকল যুক্তি বিচার করিয়া দেখা যাউক।
(১) আরবি অক্ষর আয়ত্ত করিয়াও বাংলা অক্ষরজ্ঞানের আবশ্যকতা থাকিবে। এ পর্য্যন্ত যে সকল হিন্দু ও মুসলমান সাহিত্যিক অসংখ্য উপাদেয় জ্ঞানপূর্ণ পুস্তক রচনা করিয়াছেন, সেগুলিকে আরবীতে অক্ষরান্তরিত করা কখনই সম্ভবপর হইবে না। বিশেষতঃ পশ্চিবঙ্গের রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম, মোজাম্মেল হক, এস. ওয়াজেদ আলী, মৌলানা রুহুল আমীন প্রভৃতির পুস্তকগুলিকে আরবীতে অক্ষরান্তরিত করিবার অধিকার পূর্ব পাকিস্তানের কাহারও নাই, এমন কি সরকারেরও নাই। অধিকন্তু পুরাতন দলিল দস্তাবেজ ইত্যাদি আবশ্যকীয় কাজগপত্র পড়িবার জন্য বাংলা হরফের জ্ঞান অপরিহার্য্য। পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় ৩ ভাগের ১ ভাগ অধিবাসী হিন্দু। আইনের জোরে সংখ্যালঘুদিগকে বাংলা হরফের ব্যবহার ছাড়াইয়া আরবী হরফ ধরান যাইবে না। রাষ্ট্রের মঙ্গলের জন্য তাহাদের চিন্তাধারার সহিত আমাদের পরিচয় রক্ষা কর্ত্তব্য। তার পর পাঠ্যপুস্তকের বহির্ভূত বই ও সংবাদপত্রাদি কিছু পরিমাণ বাংলা অক্ষরেই থাকিবে এবং সেগুলির পড়া আইনের বলে বন্ধ করিয়া দেওয়া চলিবে না। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানগণের সহিতও আমাদের সম্পর্ক ত্যাগ করা চলে না। সুতরাং আমরা দেখিতেছি, আরবী হরফ দ্বারা বাংলা হরফের আবশ্যকতা একেবারে লোপ করা যাইবে না। অন্য পক্ষে ইহা বলিতে পারা যায়, যখন উর্দ্দু রাষ্ট্রভাষারূপে গৃহীত হইয়াছে, তখন উর্দ্দুকেই বাংলা হরফে লিখিয়ে অন্তত পূর্ব পাকিস্তানের এক কোটি হিন্দু এবং অধিকাংশ মুসলমানের পক্ষে রাষ্ট্রভাষা আয়ত্ত করিবার পথ সুগম হইবে। উর্দ্দু বাংলার ন্যায় প্রাকৃত হইতে উৎপন্ন একটি ভাষা। এই জন্য অনায়াসে তাহা বাংলা অক্ষরে লিখিতে পারা যায়। এখনো বাজারে বাংলা অক্ষরে উর্দ্দু গজল ইত্যাদির বই পাওয়া যায়। দুঃখের বিষয়, বাংলা অন্যতর রাষ্ট্রভাষারূপে আসন না পাওয়ায় আমাদের পশ্চিম পাকিস্তানের ভাইদের জন্য বাংলা জানা অপরিহার্য্য নয়। সুতরাং তাহাদের সুবিধা অসুবিধা অপেক্ষা পাকিস্তান রাষ্ট্রের শতকরা ৬০ জন বঙ্গবাসী লোকের সুবিধা অসুবিধা দেখা সর্ব্বপ্রথম কর্ত্তব্য।
(২) আরবী হরফে বাংলা লিখিলে সমস্ত জগতের সহিত, বিশেষ করিয়া পশ্চিম পাকিস্তানের সহিত আমাদের সম্পর্ক নিবিড় হইবে, এই বিশ্বাসের মূলে কোন তথ্য নাই। ইয়ুরোপের অধিকাংশ দেশে এবং আমেরিকায় একই ল্যাটিন অক্ষর থাকায় ঐ সমস্ত দেশের মধ্যে ঐক্য ও মৈত্রী জন্মিয়াছে? আমি জিজ্ঞাসা করি, যাঁহারা আরবী হরফের জন্য এই আগ্রহ দেখাইতেছেন, তাঁহারা কি কখনো মালয়ী, পুষ্তু, বালোচী, সিন্ধী প্রভৃতি আরবী হরফে (কিঞ্চিৎ পরিবর্তিতরূপে) লেখা ভাষা পড়িতে চেষ্টা করেন? এই সকল ভাষাভাষী অধিকাংশ মুসলমান এবং ইহাদের মধ্যে পুষ্তু, সিন্ধী, পাঞ্জাবী, বালোচী ও ব্রাহুই পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা। কাজেই বাংলা আরবী হরফে লিখিলেও অবাঙ্গালির কাছে তাহা অপরিচিত ও অপাঠ্যই থাকিবে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের যোগসূত্র রূপে রাষ্ট্রভাষা উর্দু হইয়াছে এবং সমস্ত ইসলামী রাষ্ট্রের মধ্যে যোগসূত্র ইসলাম ও আরবী ভাষা। আমি আমার সমস্ত জোর এই দুইটির উপরই দিতে চাই। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এখনো দেখিতেছি, পাকিস্তান রাষ্ট্রের বড় বড় ধুরন্ধররা বিজাতীয় পোষাকে ভূষিত (কিংবা কলঙ্কিত) এবং আরবী জ্ঞানবর্জিত। ইসলামের প্রতি তাঁহাদের আনুগত্য কতটা, তাহা আল্লাহতালাই জানেন। আমরা মানবীয় চোখে তাহার কোনো লক্ষণই দেখি না। যখন সাত সমুদ্র তের নদীর পারের ভিন্ন ধর্মীয় ভাষা ইংরেজি শুধু রাষ্ট্রভাষা হওয়ার কারণে আমাদের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় মাতৃভাষা হইয়া গিয়াছে তখন আল্লাহ ও রসূলের ভাষা আরবীকে সমস্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করিতে যাঁহারা আপত্তি করেন, তাঁহাদের ইসলাম-প্রীতি ও মুসলিম ঐক্যের বুলি কত দূর আন্তরিক, তাহা অনায়াসে বুঝিতে পারা যায়। আমরা পাকিস্তানে ইসলামের মতবাদকে কার্য্যে প্রযুক্ত দেখিতে চাই। এইজন্য অবিলম্বে ভারতীয় ভাষা উর্দ্দুর পরিবর্ত্তে আমরা ইসলামী ভাষা আরবীকেই রাষ্ট্রভাষারূপে দেখিতে চাই। ইহাতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অমুসলমানদের কোনও ন্যায়সঙ্গত আপত্তি থাকিতে পারে না। যাঁহারা এক কালে রাজভাষার খাতিরে ইংরেজি পড়িয়াছেন, তাঁহারা রাষ্ট্রভাষার খাতিরে আরবী পড়িবেন। মিসর, সিরিয়া, লেবানন প্রভৃতি দেশের খ্রীষ্টান আদিবাসীরাও আরবী ভাষা গ্রহণ করিয়াছে। অন্য পক্ষে ইহা দ্বারা সমস্ত ইসলাম জগতের সহিত আমাদের সম্পর্ক নিবিড় হইবে।
(৩) যাঁহারা বাংলা হরফে বাংলা লেখা অপেক্ষা আরবী হরফে বাংলা লেখা সহজ মনে করেন, তাঁহারা ধ্বনিতত্ত্ব সম্বন্ধে অজ্ঞ। বাংলার ব্যঞ্জনধ্বনি―খ, গ, ঘ, চ, ছ, ঝ, ট, ঠ, ড, ঢ, ড়, ঢ়, থ, ধ, প, ফ, ভ, ং এবং স্বরধ্বনি―এ, ও অ্যা―এইগুলির জন্য আরবী বর্ণমালায় নূতন হরফ সৃষ্টি করিতে হইবে। তাহার পর হ্রস্বস্বর―অ, ই, উ, স্বরচিহ্ন দিয়া আরবী ভাষায় লেখা হয়। বাংলায় হয় ঐ সমস্ত স্বরচিহ্ন ব্যবহার করিতে হইবে না হয় আরবী অক্ষরে বাংলা পড়িতে স্বর বন্ধ হইবে। স্বরচিহ্ন ব্যতীত দাল, নুন্―এই দুইটি অক্ষর দন, দান্, দিন, দুন, দোন, দেন―এই ছয় শব্দ রূপেই পড়া যাইতে পারে। স্বরচিহ্ন দিলে লেখা, ছাপা, টাইপ রাইটার সকল ক্ষেত্রেই আরবী হরফে বাংলা লেখা সরল না হইয়া কঠিন ও বিলম্বিত হইবে। বাংলা বর্ণমালায় জ ষ, ণ ন, শ ষ স এইগুলিতেই বানান ভুল হয়। আরবী হরফে বাংলা লিখিলে দুইটী ‘ক’ দুইটী ‘খ’ দুইটী ‘গ’, তিনটী ‘ত’ দুইটী ‘দ’, দুইটী ‘ফ’, তিনটী ‘স’, পাঁচটী ‘জ’, দুইটী ‘হ’, বানানে দেখাইতে হইবে। যেমন―জনাব, জোর, আজাব, জুলুম, কাজীÑ এই পাঁচটি শব্দ আমরা একটি ‘জ’ দিয়া লিখি। কিন্তু আরবী হরফে লিখিতে গেলে জীম, জে, জাল, জোয়, জোয়াদ―এই পাঁচটি হরফের দরকার হইবে। সালিস, সাল, আসল―এই তিনটীই আমরা একটি ‘স’ দিয়া লিখি। কিন্তু আরবী হরফে লিখিতে গেলে ‘সে’, ‘সীন’ ও ‘সোয়াদ’ এই তিনটী হরফের দরকার হইবে। আমি জিজ্ঞাসা করি, আরবী ভাষায় অনভিজ্ঞ মাতৃভাষা-জানা বাঙ্গালি বালক কিরূপে আরবী হরফে শুদ্ধরূপে বানান করিতে পারিবে? প্রায় প্রত্যেক আরবী অক্ষরের অসংযুক্ত এবং সংযুক্ত আদি, মধ্য, অন্ত্য চারটি রূপ হয়। ইহাতে বাংলা যুক্তবর্ণ অপেক্ষা ছাপার কার্য্য কঠিন হইয়া পড়ে। কেহ কেহ বলেন, যখন, আরবিতে একটি মূল হরফের আকৃতিতে কয়েকটি ‘নুকতা’ দ্বারা বিভিন্ন ধ্বনি প্রকাশ করা যায়, তখন ইহা খুব সহজ, যেমন―‘বে’, ‘তে’, ‘সে’, ‘পে’, ‘পে’―এই সমস্ত কেবল কয়েকটি ‘নুকতা’ দ্বারা প্রকাশ করা যায়। কিন্তু তাঁহারা শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্বটি ভুলিয়া যান যে, বিভিন্ন ধ্বনির জন্য প্রায় একরূপ হরফ হইলে অক্ষরজ্ঞানে গোলযোগ ও বিলম্ব ঘটে। ইহাতে লেখাপড়ার কাজ অনেক পিছাইয়া পড়ে। অবশ্য আমরা স্বীকার করিব, অতি অল্প আয়াসে বাংলা অক্ষর ও বানানকে সরল করা যাইতে পারে এবং তাহা এক মাসের মধ্যে কোন শিক্ষার্থীকে শিখান যাইতে পারে। এইজন্য আমি ইধংরপ ঊহমষরংয-এর অনুকরণে একটি ‘সোজা বাংলা’র পরিকল্পনা করিয়া বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ করিয়াছি। বর্তমান বর্ণমালা ও বানানেও বাংলা অক্ষরে বাংলা ভাষা শর্টহ্যান্ড, টাইপ রাইটার ও লিনোটাইপে যে কার্য্যকর, তাহা বোধ হয় আরবী পক্ষপাতিগণের জানা নাই। তাঁহারা বোধ হয় না যে শর্টহ্যান্ডের জন্য ধ্বনিজ্ঞানের প্রয়োজন, অক্ষরজ্ঞানের প্রয়োজন নয়। মহাপ্রাণ ধ্বনিগুলি উর্দ্দুতে ব্যঞ্জনবর্ণের পরে ‘হে’ হরফ দ্বারা প্রকাশ করা হয়। যেমন―পে, হে, লাম, ইহার দ্বারা ‘ফ’ লেখা হয়; ইহা কিরূপে আরবী হরফে প্রকাশ করিতে পারা যাইবে? একজন আরব এই পে হে লাম কখনও ‘ফল’ পড়িতেই পারিবে না। আরবী হরফ অন-আরবী ভাষার জন্য যে অনুপযোগী, তাহা তুর্কিতে ও ইন্দোনেশিয়ায় আরবী অক্ষরের পরিবর্ত্তে রোমান অক্ষরের প্রচলন দ্বারা প্রমাণিত হইয়াছে।
(৪) আরবী হরফের প্রচলন হইলে এ দেশের জনগণের অক্ষরজ্ঞান অতি শীঘ্রই বাড়িয়া যাইবে, এই বিশ্বাসের মূলেও কোন সত্য নাই। পাঞ্জাবী, সিন্ধু, বেলুচিস্তান, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং কাশ্মীর মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং আরবী অক্ষর (কিঞ্চিৎ পরিবর্ত্তিতরূপে) তদ্দেশীয় ভাষায় প্রচলিত আছে। কিন্তু ঐ সমস্ত স্থানের অক্ষর-জ্ঞানবিশিষ্ট লোকের সংখ্যা শতকরা পাঁচের ঊর্ধ্বে নয়। বাংলা অক্ষর শিখাইবার জন্য শিক্ষকের অভাব হইবে না; কিন্তু আরবী অক্ষরে বাংলা শিখাইবার জন্য কত জন শিক্ষক পাওয়া যাইবে? সমস্ত পূর্ব পাকিস্তানে শতকরা কত জন মুসলমান কুরআন শরীফ পড়িতে পারে, তাহার আদমশুমারী কখনো করা হয় নাই। কুরআন শরীফ পড়িতে পারিলেই যেমন কেহ উর্দু শিখিতে ও পড়িতে পারে না, সেইরূপ আরবী অক্ষরে লেখা বাংলাও পড়িতে পাবিবে না। ইহা উর্দুর ন্যায় পৃথকরূপে শিখিতে হইবে, তাহার জন্য যে সময় ব্যয় হইবে, তদপেক্ষা অল্প সময়ে বাংলা অক্ষরে বাংলা ভাষা আয়ত্ত করা যাইবে।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস অনভিজ্ঞ কয়েকজন লেখক বলিয়াছেন, যেহেতু মহাকবি আলাওল আরবী অক্ষরে তাঁহার কাব্য লিখিয়াছেন, অতএব আমরা কেন আরবী অক্ষরে বাংলা লিখিব না? একে তো এইটি একটী ভুল ধারণা, অন্যপক্ষে ইহার মূলে কোন যুক্তি নাই। আলাওল নিজে বাংলা অক্ষরেই কাব্য লিখিয়াছিলেন। এ পর্যন্ত কোন মুসলমান কবির বাংলা বই আরবী অক্ষরে পাওয়া যায় নাই, তবে যে আলাওলের ‘পদ্মাবতী’র একখানি মাত্র কপি আরবী অক্ষরে দেখা যায়, তাহার কারণ, কোন নকলকারী মৌলভী সাহেব বাংলা অক্ষরে তাদৃশ পারগ না থাকায় আরবী অক্ষরে লিখিয়াছেন। যাহা হউক, যদি এই একমাত্র যুক্তিতে আরবী অক্ষর প্রচলন করিতে হয়, তবে নাগরীও প্রচলন করিতে হয়। এখন পর্যন্ত সিলেটের অনেক মুসলমানী পুঁথি একপ্রকার নাগরী অক্ষরে লেখা ও ছাপা পাওয়া যায়। বাজারে বাংলা অক্ষরে লেখা উর্দ্দু ও আরবী কেতাবেরও অভাব নাই। তাহা হইলে বাংলা অক্ষরে উর্দ্দু কেন লেখা হইবে না, এ কথাও কেহ জিজ্ঞাসা করিতে পারে।
কেহ কেহ মনে করেন আরবী অক্ষরে বাংলা লিখিলে, আমাদের কুরআন শরীফের বিশুদ্ধ পাঠ অনায়াসে শেখা হইবে। কিন্তু আমার আশঙ্কা যে ইহাতে আমরা উচ্চারণে গলতই করিব। পারসী ও উর্দ্দু প্রভৃতি ভাষা আরবী হরফে লিখিত হওয়ায় ফল এই হইয়াছে যে ‘সে’, ‘সীন’, ‘সোয়াদ’ এইরূপ ‘জে’, ‘জাল’, ‘জোয়াদ’ এই সকল অক্ষরগুলি উচ্চারণ একই হইয়া গিয়াছে, ‘সোয়াদ’, ‘জোয়াদের’ অক্ষরের ন্যায় উচ্চারণ পাইয়াছে।
যাঁহারা মনে করেন আরবী হরফ দ্বারা আমাদের ধর্ম্মজ্ঞান বৃদ্ধি হইবে তাঁহারা হয়তো জানেন না যে আল্লাহর রহমতে পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান অপেক্ষা ধর্ম্মজ্ঞান ও ধর্ম্ম-আচরণে অগ্রগণ্য। ধর্ম্ম-জ্ঞানের জন্য ধর্ম্ম বিষয়ক পুস্তক পুস্তিকা ও পত্রিকার প্রয়োজন; ধর্ম্মজ্ঞান বিস্তারের জন্য অবিলম্বে ধর্ম্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক ও ধর্ম্মগ্রন্থের বাংলায় অনুবাদ হওয়া আবশ্যক। আরবী হরফ দ্বারা এই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইবে না।
নবীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য আমরা বহু সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক ও শিল্পী চাই। তাহার জন্য আশু প্রয়োজন, জ্ঞান বিস্তার। এই জ্ঞান বিস্তারের জন্যই অক্ষরজ্ঞান প্রয়োজন। আমার বিশ্বাস আরবী হরফ প্রবর্ত্তনের ফলে পূর্ব পাকিস্তানের জ্ঞানের স্রোত রুদ্ধ হইয়া যাইবে। ইহাতে পাকিস্তানের সর্বনাশ হইবে। এই জন্য যাঁহারা আরবী হরফের জন্য প্রস্তাব করিতেছেন, তাঁহাদিগকে সনির্ব্বন্ধ অনুরোধ করি, এই বিতর্কবহুল বিষয়ে চেষ্টার অপব্যয় না করিয়া বরং অনতিবিলম্বে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করিতে এবং দেশব্যাপী জনশিক্ষার জন্য চেষ্টিত হইতে যেন তাঁহারা পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা-বিভাগকে সক্রিয় করেন। যাঁহারা ধর্মের দোহাই দিয়া পাকিস্তানকে অজ্ঞানতার অন্ধকারে চিরনিমগ্ন রাখিতে চাহেন, তাঁহারাই পাকিস্তানের দুশমন, ইহাই আমার বিশ্বাস।” (আজাদ, ৬-৭ বৈশাখ, ১৩৫৬)।
শুধু ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতো ভাষাবিদ ধীমানই নন, পাকিস্তানি আদর্শের প্রতি অনুরক্ত শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খানও (তিনি তখন মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের সভাপতি) বাখরগঞ্জ জিলা শিক্ষক সমিতির অধিবেশনে ভাষণ দিতে গিয়ে ভাষা ও হরফ-বিতর্ক সম্পর্কে যুক্তিসঙ্গত মতামত তুলে ধরেন। উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকার করে নিয়েও তিনি বলেন : ‘বাংলা ভাষাকে উৎখাত করে তারই শূন্যস্থানে উর্দুকে বসাতে চাই না, উর্দু মুছলমানের ধর্মভাষা নয়, মুছলমানের ধর্মভাষা আরবী। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিদায় দিতে যাওয়া মানে বাংলা বাসিন্দার সর্বনাশ ডেকে আনা। পরদেশী ভাষা দিয়ে মাতৃভাষাকে স্থায়ীভাবে জয় করা দুনিয়ার ইতিহাসে কোন দেশে কোন যুগে সম্ভব হয় নাই।’
হরফ-সমস্যা সম্পর্কে তিনি বলেন :
কিছু দিন আগে পাকিস্তান শিক্ষা উপদেষ্টা বোর্ড বাংলা ভাষার জন্য আরবী হরফের সুপারিশ করেছেন। তাঁরা মনে করেন, (১) আরবী হরফে বাংলা ভাষা লিখলে বাংলা হরফ শিক্ষার বোঝা হতে মুক্তি পাওয়া যাবে, (২) আরবী হরফের মারফত পশ্চিম পাকিস্তান, আফগানিস্তান, আরব, পারস্যের সঙ্গে পূর্ব-পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা জমে উঠবে। (৩) এতে ইছলামী তমুদ্দুনের বিকাশ ঘটবে। আমরা শিক্ষা উপদেষ্টা বোর্ডের সঙ্গে একমত হতে পারি নাই। কেন পারি নাই, তাই সংক্ষেপে বলছি।
১. আরবী হরফে বাংলা ভাষা লিখতে গেলে অনেকগুলি নতুন অক্ষর যোগ করতে হয় যথা : ঘ, থ, ট, ঠ, ড, ঢ, ছ, ঝ, এ, ঐ, ও, ঔ ইত্যাদি। এই নতুন হরফগুলি শিক্ষার জন্য যতখানি শক্তি ক্ষয় হয়, তা ব্যয় করে বাংলা হরফ মোটামুটি লিখে দেওয়া চলে।
২. আরবী হরফে বাংলা ভাষা লিখলেই যদি আরব, পারস্য, ইরাক, মিসরের সঙ্গে বন্ধুত্ব গজিয়ে উঠত, তবে আগের কালে আরবে পারস্যে লড়াই হত না এবং ইদানীং ইংলন্ড, জার্মানী, ফ্রান্স, ইটালীতেও যুদ্ধ হত না; কারণ এই শেষোক্ত দেশগুলির বাসিন্দারা সবাই খ্রিস্টান এবং তাদের সবারই ভাষা রোমান হরফে লিখিত হয়।
৩. হরফ দ্বারা তমুদ্দুনের বিকাশ বা মিলন সংঘটিত হয় না; তার জন্য চাই পরস্পরের মধ্যে সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন ও আলোচনা মারফত ভাবের আদান প্রদান। আরবীতে বাংলা ভাষা লিখলেই কি বাঙ্গালিরা কাবুল, কান্দাহার, ইরান, আরব, মরক্কো, মিসর সব দেশের লোকের সঙ্গে কথা বলতে পারবে, তাদের সাহিত্য বুঝবে?
৪. হরফ হিসাবে বাংলা হরফই অধিকতর বিজ্ঞানসম্মত। বাংলা হরফ ধ্বনি-অনুগামী, আরবী হরফ ব্যাকরণ-অনুগামী। বাংলা হরফ দিয়ে লিখলে ব্যাকরণ-অজ্ঞদের পক্ষেও ভুল উচ্চারণের সম্ভাবনা নাই; কিন্তু ব্যাকরণ-অজ্ঞদের পক্ষে আরবী উচ্চারণ শুদ্ধভাবে করা কঠিন। আবদুর রহমান-এর উচ্চারণে ভুল হওয়ার পথ নাই; কিন্তু এই কথাই আরবীতে লেখা হবে―‘আবদ-আল্-রহমান―আর ব্যাকরণ মতে সন্ধি করে পড়তে হবে আবর্দু-রহমান। বাংলা ‘আমি’ শব্দকে যদি আরবী আলিফ, মীম, ইয়া দিয়ে লিখি তবে পড়াকালে তা আমি, ইমি―যে কোন উচ্চারণে পড়া চলবে। ইরাব বসিয়ে দিলে অবশ্য শব্দটিকে ফর্মার মধ্যে ফেলা যায় কিন্তু ইরাব দেওয়া সময় ও পরিশ্রম সাপেক্ষ এবং জিনিষটাও কিছু জঞ্জালে রকমের।
৫. প্রথমে, মধ্যে ও শেষে বসার জন্য আরবী হরফ রূপ পরিবর্তন করে। প্রথম শিক্ষার্থীর পক্ষে এই রূপান্তর ভেদ বিশেষ জটিল হবে এবং এর ফলে তাদের শিক্ষা অনেকাংশে ব্যাহত হবে।
৬. এ পর্যন্ত বাংলা ভাষায় যে হাজার হাজার পুঁথিপুস্তক লেখা হয়েছে কে তাদেরকে আরবি হরফে নতুন করে লিখবে?
এইসব কারণে আমাদের বিশ্বাস এই যুগপরিবর্তনের পরক্ষণে হরফ পরিবর্তনের বিশৃঙ্খলা উপস্থিত করলে পূর্ব পাকিস্তানের তামুদ্দনিক জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি হবে, তার রাষ্ট্রীয় জীবনও ষোলআনা রক্ষা পাবে না’ (রতনলাল চক্রবর্তী, ভাষা আন্দোলনের দলিলপত্র, পৃ. ৩১৬)।
আরবী হরফে বাংলা লেখাবিষয়ক বিতর্ক এবং ব্যাপকভাবে পূর্ববঙ্গে উর্দু প্রচলন ও স্কুলে উর্দু শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা ইত্যাদি ঘটনা যে পানি কতটা ঘোলা করেছিল এবং ফজলুর রহমানের দৌরাত্ম্যে ভাষা ও হরফ-বিতর্ক যে কতদূর ছড়িয়ে পড়েছিল মফস্বলের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষক বা অখ্যাত লেখকদের বিতর্কে অংশ নেওয়া থেকে তা বোঝা যায়। এদের অধিকাংশই ছিলেন বাংলার পক্ষে অর্থাৎ হরফ পরিবর্তনের বিরুদ্ধে, তবু কেউ মধ্যপন্থা কেউ ক্বচিৎ পরিবর্তনের পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন।
শুকদেব হাইস্কুলের শিক্ষক রুস্তম আলী এ সম্পর্কে বলেন যে, ‘শিক্ষার বাহন সহজ না হইলে শতকরা ৯৮ জনকে শিক্ষিত করিয়া তোলা যাইবে না। সুতরাং মাতৃভাষাকেই শিক্ষার বাহন করা একান্ত উচিত’ (ঢাকা প্রকাশ, ৩ জুলাই, ১৯৪৯)। হরফ-বিতর্ক মীমাংসার জন্য পূর্ববঙ্গ সরকার যে ভাষাকমিটি গঠন করেছিল তারা কয়েকটি বাংলাবিরোধী উদ্ভট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেও শেষ পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয়েছে যে, ‘উর্দু হরফে বাংলা ভাষা লিখিবার বিষয় কমিটি বিশেষভাবে বিবেচনা করিয়া এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছে যে, বর্তমানে উহা সমীচীন এবং সম্ভবপর নহে। তবে এই প্রদেশে উর্দু ভাষার যথেষ্ট পরিমাণ প্রসারের পর উক্ত বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করা যাইতে পারে’ (ঢাকা প্রকাশ, ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৫০)।
এর অর্থ সরকার-বংশবদ কমিটি জনমত ও সরকার উভয় পক্ষকে সন্তুষ্ট করার নীতি গ্রহণ করে। এজন্যই ছাত্রসমাজ বারবার এদেশের বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত শ্রেণিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে সমস্যা এখনও সজীব এবং এর বিরুদ্ধে সার্বক্ষণিক লড়াই চালিয়ে যেতে হবে যতক্ষণ সরকার তাদের পরিকল্পনা বাতিল না করে। সম্ভবত এজন্যই একদিকে ‘মর্নিং নিউজ’ যখন উর্দুর পক্ষে সরবে প্রচার চালায় যে এদেশের মানুষ উর্দুর পক্ষে তখন ছাত্র-শিক্ষকগণই শুধু প্রতিবাদ করেন যে, ‘ঢাকা প্রকাশ’-এর মতো কাগজও তির্যক ভাষায় সম্পাদকীয় লিখতে ভুল করে না যে “সহযোগী ‘মর্নিং নিউজি’ আদা-পানি খেয়ে নেমে গেছেন উর্দুর পক্ষে। উহার শ্রাদ্ধ শান্তি না হওয়া পর্যন্ত যে উনি ক্ষান্ত হবেন না, এদেশের লোক তা ভাল করেই জানে” (২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫১)।
একই কারণে ঢাকা কলেজের অধ্যাপক ইদ্রিস মিয়া ‘ঢাকা প্রকাশ’-এ দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে সিদ্ধান্তে আসেন যে, ‘প্রত্যেকটি মানুষকে স্বাতন্ত্র্যবোধে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে বাংলা ভাষার দ্বারস্থ হতে হবে। এই ভাষার মারফৎ রাষ্ট্রীয় উন্নতি তার কৃষ্টিগত উন্নতি, ধর্ম্মীয় উন্নতি, কৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য, তার প্রাচীন ইতিহাস উদ্ধার প্রভৃতি সম্ভব হতে পারে। যিনি ধার-করা ভাষায় নিজের উন্নতির আশা করেন তিনি ভ্রান্ত। মাতৃভাষার মাধ্যমে যে শিক্ষা উহাই মানুষকে পূর্ণভাবে শিক্ষিত করে তুলতে পারে’ (১৫, ২২ এপ্রিল, ১৯৫১)।
চার
আরবি হরফে বাংলা লেখার ষড়যন্ত্র―আসলে উর্দুকে নানা কৌশলের পালকিতে চড়িয়ে একক রাষ্ট্রভাষার আসনে বসিয়ে দেবার চেষ্টার বিরুদ্ধে যেমন ভাষাবিদ বা পণ্ডিত ব্যক্তি তেমনি বেশ কিছুসংখ্যক শিক্ষাবিদ ও শিক্ষক ধীর, স্থির, যুক্তিনিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণ করেন। ছাত্রদের প্রতিবাদী ভূমিকা তো ছিলই। তাই সরকারি, বেসরকারি পর্যায়ে আরবি হরফ প্রচলন ও উর্দু শিক্ষার বিস্তার ঘটানোর উদ্দেশ্যমূলক প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে অনেকেই সোচ্চার হয়ে ওঠেন। পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদেও কংগ্রেস দলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয় যদিও সরকারি বেঞ্চ থেকে সদুত্তর মেলেনি।
পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের তরফ থেকে নঈমুদ্দিন আহমদ এপ্রিলের প্রথম দিকে সংবাদপত্রে বিবৃতির মাধ্যমে বলেন যে, ‘বাংলা বর্ণমালা ও ভাষা সংস্কার সমস্যা আজ পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র, যুবা ও বুদ্ধিজীবী জনসাধারণের মনকে ভাবিয়ে তুলছে। … উর্দুর জন্য সামনের দুয়ার যখন রুদ্ধ তখন আরবী বর্ণমালার জিগির তুলে পশ্চাৎ দুয়ার দিয়ে উর্দু প্রবর্তনের চেষ্টা হচ্ছে এবং পরিষদে গৃহীত প্রস্তাব ও বাংলা ভাষাকে খতম করবার ষড়যন্ত্র চলছে।…. পূর্ব পাকিস্তানের যুবক, ছাত্র ও জনসাধারণ এ ব্যাপারে জনমত গঠনের জন্য এগিয়ে আসবেন এবং এর প্রতিবাদ জানাবেন এ বিশ্বাস আমার আছে’ (বশীর আলহেলাল)।
এরপর শিক্ষাবিদ ফেরদৌস খান তাঁর ‘বাংলা বনাম আরবি হরফ’ প্রবন্ধে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘বিজ্ঞানসম্মতভাবে বাংলা বর্ণমালা আরবীর চাইতে অনেকাংশে শ্রেয়। বাংলা হরফের গঠনশীলতা অনেক বেশি, লেখনদ্রুতিও কমে-দাঁড়াবে না, উচ্চারণ পদ্ধতি খুবই ভাল, অক্ষর সংখ্যাও বেশি নয়। কাজেই বাংলা বর্ণমালা বাদ দিয়ে আরবী হরফ গ্রহণে লাভ তো হবেই না বরং বহু ক্ষতির সম্ভাবনা’ (‘আজাদ’, ৯ এপ্রিল, ১৯৪৯)।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্ররা আরবী হরফ প্রবর্তনের বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘ যুক্তিনিষ্ঠ স্মারকলিপি পাকিস্তান শিক্ষা-উপদেষ্টা বোর্ডের কাছে পেশ করেন (সৈনিক, ২২ এপ্রিল, ১৯৪৯)। ইতোমধ্যে ১৪ এপ্রিল পাকিস্তান অবজার্ভার এ প্রসঙ্গে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, ঢাকা কলেজ ও জগন্নাথ কলেজের ছাত্রছাত্রীরাও হরফ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশগ্রহণ করে। বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন কলেজের ছাত্রছাত্রীদের প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘কেন্দ্রীয় বর্ণমালা সংগ্রাম পরিষদ’ নামে একটি সংগঠনও তৈরি হয়। (সৈনিক, ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৪৯)। এভাবে ছাত্রসমাজ হরফ ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার লক্ষ্যে তাদের কর্মতৎপরতা অব্যাহত রাখে, যেজন্য সরকার এ সম্পর্কে ধীরে চলার নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।
প্রকৃতপক্ষে ১৯৪৯ সাল থেকে হরফ ষড়যন্ত্রের বাদ-প্রতিবাদের উত্তাপ ছড়িয়ে শেষ হয়। ভাষা আন্দোলন নতুন করে সংগঠিত হতে না পারা সত্ত্বেও তার ধীর পায়ে চলা বন্ধ হয়নি। কেন্দ্র থেকে পূর্ববঙ্গ সরকার তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পেরে জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে পরিচালনার চেষ্টা চালায়। আর জনচেতনায় আটচল্লিশের প্রভাব ততটা ব্যাপ্ত বা গভীর হয়ে না ওঠায় শাসকশ্রেণির পক্ষে সম্ভব হয়েছিল ১৯৪৮ থেকে ১৯৫০-এর মধ্যে বেশ কয়েকটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মদদ জোগানো।
দাঙ্গার রক্তক্ষয়ী বর্বরতার সুবাদে শহরে-বন্দরে ব্যবসা-বাণিজ্য, বাড়িঘর বা দোকানপাটের সহজ অন্যায্য অধিকার হাতে আসে, প্রধানত মোহাজের নামীয় অবাঙালির হাতে, সেই সঙ্গে স্থানীয় সমাজবিরোধীদের হাতে। অন্যদিকে উপদ্রুত গ্রামেগঞ্জে পরিত্যক্ত বাড়িঘর, দোকান, জমিজমার অধিকার আসে স্থানীয় মুসলমানের হাতে। মানবিক চেতনা সেখানে কোনও প্রভাব ফেলে না, বরং শাসক ও প্রশাসনের উসকে দেওয়া আগুনে সেসব বোধ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আরও একটি তুরুপের তাস শাসকগোষ্ঠীর হাতে ধরা ছিল―বাঙালি অবাঙালি সংঘাত, শ্রমিক অঞ্চলে দাঙ্গা, যা প্রয়োজনে মানুষের দৃষ্টি ফেরাতে ব্যবহার করা যায়। ব্যবহার করেছেও পাকিস্তানি শাসকশ্রেণি।
এ অবস্থার মধ্যে ১৯৫০ সালে ছাত্র-যুব সমাজের কর্মতৎপরতার প্রকাশ ঘটে পাকিস্তান গণপরিষদ কর্তৃক গঠিত মূলনীতি কমিটির অগণতান্ত্রিক সুপারিশসমূহের (রাষ্ট্রভাষা উর্দুসহ) বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ-বিক্ষোভের আয়োজনে। ‘ঢাকার চিঠি’তে সরলানন্দ সেন জানাচ্ছেন, ‘গত ২৭ অক্টোবর স্থানীয় ভিক্টোরিয়া পার্কে মূলনীতি নির্ধারক কমিটির করাচী-ভিত্তিক আমলাতান্ত্রিক সুপারিশের বিরুদ্ধে আহূত ছাত্রসভায় মওলানা আকরম খাঁ এবং তাঁর দৈনিক পত্রিকা ‘আজাদ’-এর বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করা হয়েছে। ‘মর্নিং নিউজ’ এবং ‘আজাদ’ পত্রিকাকে কায়েমী স্বার্থের পদলেহনকারী বলে গাল দেওয়া হয়েছে এবং উভয়কে এই বলে শাসিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এরা তাদের নীতি পরিবর্তন না করলে এদের বয়কট করা হবে’ (যুগান্তর, ৬ নভেম্বর, ১৯৫০)।
মূলনীতি কমিটির সুপারিশের বিরুদ্ধে আর্মানিটোলা ময়দানে জনসভা অনুষ্ঠানের পর এতদুদ্দেশ্যে গঠিত সংগ্রাম পরিষদের ব্যবস্থাপনায় (১৯৫০) ৪ এবং ৫ নভেম্বর ঢাকা বার লাইব্রেরি মিলনায়তনে এক মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত সম্মেলনের দু দিনব্যাপী অধিবেশনে বিকল্প গণতান্ত্রিক মূলনীতি প্রণয়নের জন্য ‘সেন্ট্রাল কমিটি অব ডেমোক্রেটিক ফেডারেশন’ গঠন করা হয়। এ উপলক্ষে ১২ নভেম্বর (১৯৫০) সারা দেশ বিক্ষোভে প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে। বেগতিক দেখে সরকার সুপারিশ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।
মূলনীতি কমিটির সুপারিশের বিরুদ্ধে যে ক্ষুব্ধ প্রতিবাদ দানা বেঁধে উঠেছিল তা ক্রমশ আন্দোলনের পর্যায়ে পৌঁছে যেতে শুরু করেছে দেখেই সরকারের ঐ সতর্কতামূলক পদক্ষেপ। এর মধ্যে ৩ নভেম্বর (১৯৫০) পূর্বোক্ত ডেমোক্রেটিক ফেডারেশন ‘Will Janab Liaquat Ali Khan answer the following questions’ শীর্ষক একটি স্মারকলিপি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠায়। এর বক্তব্য ছিল বেশ তীক্ষè ও শাণিত। স্মারকলিপির ছয় সংখ্যক প্রশ্নে বলা হয়, ‘It is not absolutely arbitrary and in lfagrant violation of the demand of sixty two percent of the population to recommend Urdu as the only state language whereby the claim of Bengali has been completely turned down?’ (স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৮)।
বাংলা রাষ্ট্রভাষার দাবি অগ্রাহ্য করাকে স্বেচ্ছাচারিতা বলে আখ্যা দিয়েই গণতান্ত্রিক ফেডারেশন চুপ করে থাকেনি। পূর্ববঙ্গের অর্থনৈতিক অবনতির জন্যও কেন্দ্রীয় সরকারকে দায়ী করা হয়, দায়ী করা হয় শিক্ষা ক্ষেত্রে নৈরাজ্য ও কুটিরশিল্পের অবনতি ও দুর্দশার জন্য (৯ সংখ্যক প্রশ্ন)। কেন্দ্রীয় সরকারই শুধু নয়, পূর্ববঙ্গ সরকারের বিরুদ্ধেও এ ধরনের আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জ্ঞাপন যেন এক নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পূর্ববঙ্গে বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসাবে গ্রহণ করার পরও তা বাস্তবায়িত না হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের কাছে ২৩ ফেব্রুয়ারি (১৯৫১) একটি স্মারকলিপি পেশ করা হয়। তাতে বলা হয় :
‘পূর্ব বাংলার জনসাধারণের শতকরা একশত ভাগই বাংলা ভাষাভাষী এবং এ ভাষা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষা। …১৯৪৮ সালে খাজা নাজিমুদ্দিন প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে পূর্ববঙ্গ পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাকে সরকারি ভাষারূপে প্রবর্তন করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। তিন বৎসর অতিবাহিত হয়ে গেল, কিন্তু তা কার্যকর হয়নি।
‘১৯৫১ সালের ১লা এপ্রিল থেকে সমস্ত সরকারি কর্মচারীর কার্যাদি বাংলায় শুরু হোক। তারা সুচারুরূপে বাংলায় তাদের কাজ করতে পারবেন। যেসব কর্মচারী বাংলাভাষী নন তাঁরা একটা নির্দিষ্ট তারিখ পর্যন্ত ইংরেজিতে কাজ করতে পারবেন, কিন্তু তা এক বছরের বেশি হবে না। এর মধ্যে বাংলা শিখে ফেলতে হবে।….
‘বাংলার জনসাধারণের নিজস্ব ভাষায় সরকারী কার্যাদি শুরু হলে দেশবাসীর মধ্যে বিশেষ উদ্দীপনার সৃষ্টি হবে। তাই দেশবাসীর পক্ষ থেকে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানিয়ে পূর্ব বাংলার শিক্ষাবিদগণ এই স্মারকলিপি পেশ করছেন’ (নও বেলাল, ১ মার্চ, ১৯৫১)
এতে স্বাক্ষর দিয়েছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁ, ড. কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখ অধ্যাপক এবং সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী, ছাত্র, গণপরিষদ ও প্রাদেশিক সরকারের একাধিক সদস্য। ‘ঢাকার চিঠি’-তে এ বিষয়টিই ২৭ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন হিসেবে এসেছে। উক্ত প্রতিবেদন মতে স্মারকলিপি নিয়ে স্বাক্ষরদাতাদের একটি প্রতিনিধিদল মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং সকল অফিস-আদালতে বাংলা ব্যবহারের দাবি জানান (যুগান্তর, ১ মার্চ, ১৯৫১)।
পাঁচ
নতুন করে গঠিত বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ধীরগতিতে হলেও ভাষার প্রশ্নটিকে সজীব রাখতে চেষ্টা করে। সে উদ্দেশ্যে ১৯৪৮ সালের ভাষা-আন্দোলনের সূচনাদিন ১১ মার্চ উদ্যাপনের জন্য ব্যাপক আয়োজন করা হয়। ঐদিন সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত বিশাল ছাত্রসভায় বাংলাকে শিক্ষার সর্বস্তরে ব্যবহার, অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি বাস্তবায়ন ইত্যাদি দাবি জানানো হয়। জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়ে সরকারকে হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয়। গণপরিষদে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়ে ভূমিকা গ্রহণের জন্য পূর্ববঙ্গীয় সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। সভা, সমাবেশ, ছাত্র ধর্মঘট ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জেও অনুষ্ঠিত হয় (পাকিস্তান অবজার্ভার, ১২ মার্চ, ১৯৫১)।
‘ঢাকার চিঠি’র (১৯৫১) খবরে জানা যায়, ‘৫ই এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ঢাকা শহরের সর্বত্র যথোচিত গাম্ভীর্য সহকারে ‘রাষ্ট্রভাষা পতাকা দিবস’ উদ্যাপিত হয়ে গেছে। শহরের সমস্ত শ্রেণির লোক পতাকা-দিবসের প্রতি সমর্থন জানান। বহু অবাঙালীও এর দাবীর প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করেন এবং কর্মীদের নিকট আন্দোলনে সাহায্যদানের প্রতিশ্রুতি দেন” (যুগান্তর, ১৩ এপ্রিল, ১৯৫১)।
সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আবদুল মতিনের জবানিতে জানা যায়, ‘পতাকা দিবস পালনের মাধ্যমে কাজ শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি বিভিন্ন ধরনের প্রচার ও সাংগঠনিক কাজের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে বাংলা ভাষার আন্দোলন এগিয়ে নিয়েছিল’ (প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫)। তিনি আরও জানান ১১ মার্চ উদ্যাপন উপলক্ষে কমিটি ঢাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রচারপত্র বিলি করেছিল যার শিরোনাম ছিল ‘বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১১ই মার্চ ধর্মঘট পালন করুন’ (প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬)। উক্ত প্রচারপত্রে বলা হয়, ‘বন্ধুগণ, যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা কর্তৃপক্ষের ফ্যাসিস্ট মনোভাবকে সমূলে বিনষ্ট করে আমাদের বাংলার দাবি প্রতিষ্ঠিত করতে না পারি ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম ক্ষান্ত হতে পারে না।’ জনাব মতিনের বক্তব্যে জানা যায়, ১৯৫১ সালে তারা দেশব্যাপী ১১ মার্চ পালনের জন্যও প্রচারপত্র বিলি করেছিলেন (বাঙালি জাতির উৎসসন্ধান ও ভাষা আন্দোলন, পৃ. ২১)।
গোটা ১৯৫১ সাল ভাষাবিষয়ক কর্মতৎপরতায় পরিপূর্ণ। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্যদের কাছে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান। সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আবদুল মতিনের ভাষায় স্মারকলিপিটি এক ‘ঐতিহাসিক দলিল’। গণপরিষদের পশ্চিমা সদস্যরা অবাঙালি বিধায় স্মারকলিপিটি ইংরেজি ভাষায় লেখা হয়। স্মারকলিপি স্বাক্ষরের তারিখ ১১ এপ্রিল, ১৯৫১। এর মূল বক্তব্য ছিল :
‘সর্বশেষে আমরা সেই কথারই পুনরাবৃত্তি করব, যেকথা আমরা বারবার দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে আসছি। সেটা হলো : পাকিস্তানে যদি একটা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করা হয় তাহলে সেটাকে হতে হবে অবশ্যই বাংলা। আর যদি একাধিক ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করা হয় তাহলে বাংলাকে হতে হবে তার অন্যতম।
‘আমরা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে দাবি করছি… আমরা কখনোই উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসাবে মেনে নেব না। আমরা পূর্ব বাংলাকে উপনিবেশে পরিণত করার উদ্দেশ্যে বিরাট যে ষড়যন্ত্র চলছে তা উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
‘আমরা…জনগণের সেই সব প্রতিনিধিদের, যারা রাষ্ট্রপরিচালনার শীর্ষে অধিষ্ঠিত আছেন তাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, যতদিন না বাংলা ভাষার ন্যায়সঙ্গত দাবিকে প্রদেশ এবং কেন্দ্রে পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে ততদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তথা ছাত্রসমাজ ক্ষান্ত হচ্ছি না’ (অনুবাদ স্বাক্ষরকারীর)।
‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির স্মারকলিপি সমগ্র পাকিস্তানে আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল। সীমান্ত প্রদেশের প্রভাবশালী দৈনিক ‘খাইবার মেইল’ তার সম্পাদকীয়তে স্মারকলিপির বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। স্মারকলিপির বক্তব্যে অনুপ্রাণিত পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থানরত বাঙ্গালিদের বক্তব্য পাকিস্তান টাইমস-এ প্রকাশিত হয়েছিল” (আবদুল মতিন)। ‘খাইবার মেইল’-এ প্রকাশিত (২০ এপ্রিল, ১৯৫১) সম্পাদকীয় বক্তব্যের অংশবিশেষ।
‘বাংলা ভাষার দাবি অবহেলা করা যায় না। পাকিস্তানের জনসংখ্যার অধিকাংশ পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসী এবং বাংলা ভাষার নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাহিত্য রহিয়াছে। উর্দুকে কাহারও উপর চাপাইয়া দেওয়া চলে না। … আমরা মনে করি যে বাংলা এবং উর্দু উভয় ভাষাকেই পাকিস্তানের সরকারি ভাষা রূপে স্বীকার করা উচিত’ (নও বেলাল, ১০ মে, ১৯৫১)।
ঢাকার দৈনিক অবজার্ভার-এ (৫ মে, ১৯৫১) এক সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশিত হয় এবং লাহোরের পাকিস্তান টাইমস পত্রিকায় এ বিষয়ে প্রতিবেদন ছাপা হয়।
পাকিস্তান অবজার্ভার প্রসঙ্গত বাংলা রাষ্ট্রভাষার পক্ষে এ সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মওলানা আকরম খাঁর এক বক্তব্যের প্রতিবাদে ১৮ এপ্রিল (১৯৫১) এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে (‘জাতীয় ভাষা’) নিম্নোক্ত বক্তব্য প্রকাশ করে :
রিপোর্ট অনুযায়ী মওলানা আকরম খাঁ উর্দু সম্মেলনে বলেছেন যে, পূর্ব বাংলায় যারা উর্দুর বিরোধিতা করে তারা ইসলামের শত্রু। ধরে নেওয়া যেতে পারে যে তিনি এই ‘শত্রুদের মধ্যে’ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতো যারা উর্দুর বদলে আরবিকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষপাতী তাদেরকেও অন্তর্ভুক্ত করেন …
আমাদের একথা মনে করারও কোনও দরকার নেই যে উর্দু প্রেমিকদের সম্মেলনে উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে মওলানা আকরম খাঁ যা বলেছেন এ প্রদেশে ফিরে এসে তিনি তার পুনরাবৃত্তি করবেন।
পাকিস্তান উর্দু সম্মেলনে মওলানা আকরম খাঁ প্রমুখ রাজনীতিক উর্দুর পক্ষে তথা বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে যে বক্তব্য রাখেন তার প্রতিবাদ জানান দেশের ছাত্র-বুদ্ধিজীবীদের একাংশ এবং সে সুবাদে পাকিস্তান অবজার্ভার ৭ মে এবং ৮ মে (১৯৫১) দুই দফায় ‘রাষ্ট্রভাষা’ শীর্ষক প্রতিবাদী সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। প্রথমটিতে বলা হয় :
রাষ্ট্রভাষার উপর এই দুঃখজনক বিতর্ক ইতোমধ্যেই যথেষ্ট তিক্ততার সৃষ্টি করেছে। … যদি বাংলা এবং উর্দু উভয়কেই রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয় তাহলে পাকিস্তানের দুই অংশের জনগণের পারস্পরিক বোঝাবুঝি সহজতর, অধিকতর স্বাস্থ্যকর ও সুখকর হবে।
এভাবে ১৯৫১ সাল বাংলা ভাষার দাবি নিয়ে আন্দোলনের সূচনা ঘটাতে না পারলেও ভাষা আন্দোলনের মরাগাঙে কিছুটা জোয়ারের পরিবেশ সৃষ্টি করে। ছাত্রদের মধ্যে আবার দেখা দেয় অস্থিরতা ও উদ্দীপনা। এ অবস্থার পেছনে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এবং বিশেষভাবে দু-একটি কলেজের ছাত্রদের কর্মতৎপরতা। এ সম্পর্কে ‘ঢাকার চিঠি’র প্রতিবেদন (শিরোনাম ‘বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি’) উল্লেখযোগ্য :
ঢাকা ১৬ সেপ্টেম্বর―সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ভবনে এক ছাত্রসভায় পাকিস্তানের শতকরা ৫৬ জন অধিবাসীর মাতৃভাষা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব পুনরায় গ্রহণ করা হয় এবং আগামী শারদীয় অবকাশে পূর্ব বাংলার প্রতিটি পল্লীগ্রামে অনুকূল জনমত সৃষ্টি করার পরিকল্পনা গৃহীত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের আহ্বায়ক জনাব মতিন এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, ‘উর্দুর বিরুদ্ধে তাঁদের কোন অভিযোগ নেই। উর্দুর সঙ্গে বাংলাও রাষ্ট্রভাষা হোক, এটাই তাঁদের দাবি। আরবী হরফে বাংলা চালাবার নীতি ত্যাগ করা হোক, এই অনুরোধ তিনি সরকারকে জানান এবং বলেন যে, কোন জাতিকে জোরজবরদস্তি করে তার মাতৃভাষা থেকে বঞ্চিত করার অর্থ তার সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করা। সেই সঙ্গে তিনি আরো বলেন, আরবী হরফে বাংলা প্রচলনের নীতি ব্যর্থ হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার কারেন্সী নোটের উপর বাংলা ভাষার স্থান দিয়ে আরবী হরফের ব্যর্থতা প্রমাণ করেছেন। এখন আরবী হরফের পেছনে টাকা খরচ করার মানে টাকার অপব্যয়।’
এ সম্পর্কে সরলানন্দ সেন আরও বলেন :
‘বস্তুতঃ বাঙলা পাকিস্তানের অন্যতম ভাষা হোক, এই দাবি তুললেই বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়াশীল মহল এই বলে চিৎকার করতে থাকেন যে এর পিছনে পাকিস্তান-বিরোধীদের ষড়যন্ত্র রয়েছে। পাকিস্তানের অধিকাংশ অধিবাসী যে-ভাষায় কথা কয়, সেই ভাষা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হোক, এই দাবি নিঃসন্দেহে ন্যায়সঙ্গত, স্বাভাবিক এবং গণতান্ত্রিক দাবি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে উর্দুর উৎকর্ষ স্বীকার করেও, নিঃসন্দেহে এবং বিদ্বেষমুক্ত চিত্তে আমরা বাঙালিরা বাঙলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় দেখতে চাই’ (যুগান্তর, ১৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৫১)।
এ সময় ভাষা আন্দোলন একুশের পটভূমি রচনায় দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার অবদানও কম ছিল না। পাটের বাজারে সমস্যা, খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, প্রাথমিক শিক্ষকদের সমস্যা, চাষবাসে আকালের ছোঁয়া, বাঙালি চিকিৎসকদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে ধর্মঘট, বাঙ্গালির বেকারত্ব ও চাকরি ক্ষেত্রে বৈষম্য, প্রাথমিক স্কুলের দুরবস্থা, ধর্মঘটের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের সব কটি মেডিকেল স্কুল সরকার কর্তৃক অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা (এপ্রিল ১৯৫১), খুলনায় দুর্ভিক্ষাবস্থা (এপ্রিল ’৫১), প্রাথমিক শিক্ষকদের ধর্মঘট, পাটের মূল্য হ্রাস ও পাটচাষিদের দুরবস্থা, সরকারি কর্মচারীদের একাংশের (পূর্ত, যোগাযোগ, সেচ, জনস্বাস্থ্য) বিক্ষোভ, লবণ সংকট ইত্যাদি সমস্যা সমাজে অস্থিরতার সৃষ্টি করে। সরকারের পক্ষে সম্ভব হয়নি সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান।
এ পরিপ্রেক্ষিতে ভাষা ও হরফ নিয়ে ছাত্র ও শিক্ষিত শ্রেণিতে বিক্ষোভ, ধর্মঘট, আন্দোলন, অস্থির পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে ঢাকায় (১৯৪৮) ও চট্টগ্রামে সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্মেলন (মার্চ ১৯৫১) সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ধারা বিকাশে ভূমিকা রেখেছে। এ দুটো সম্মেলন সম্পর্কেই রক্ষণশীল সংবাদপত্রগুলোর নিন্দা ও সমালোচনা ছিল লক্ষ করার বিষয়। এসব কিছু নিয়ে এবং শাসকশ্রেণির অব্যাহত অর্বাচীন পদক্ষেপে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের ক্ষুব্ধ পটভূমি তৈরি হয়েছিল।
সচিত্রকরণ : রজত



