প্রচ্ছদ রচনা : ভাষা আন্দোলনের ছয় দশক : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি : আহমদ রফিক

প্রচ্ছদ রচনা : ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক―আবার পড়ি : তাঁর রচনা থেকে
ভাষা আন্দোলনের ৬০ বছরের বেশি সময়, সঠিক বিচারে ৬৪ বছর অতিক্রম করতে চলেছে। আন্দোলনের সংগঠিত রূপ সুস্পষ্টভাবে প্রথম দেখা গেছে ১৯৪৮-এর ১১ মার্চ। এরপর ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে এর পূর্ণরূপের প্রকাশ ঘটে। একুশে ফেব্রুয়ারিতে পুলিশের গুলিবর্ষণের ফলে কয়েকটি মৃত্যু পরিস্থিতি পাল্টে দেয়। ছাত্র আন্দোলন পরিণত হয় ছাত্র-জনতার দুর্দান্ত গণ-আন্দোলনে। ছাত্র-জনতার সঙ্গে যোগ দেন শ্রমজীবী মানুষ। আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে যায় দেশময়। একুশে ফেব্রুয়ারি চিহ্নিত হয় শহিদ দিবস হিসেবে।
আমরা জানি, ভাষা আন্দোলনে রক্তচিহ্নিত পথ ধরে বাঙালি জাতীয়তাবোধের যাত্রা ষাটের দশকে স্বায়ত্তশাসনের দাবি নিয়ে ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান পেরিয়ে একাত্তরে রণাঙ্গনে পৌঁছে। রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। তার সংবিধানে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। দীর্ঘকাল পর (১৯৯৯ খ্রি.) এ অর্জনের সঙ্গে যুক্ত হয় মর্যাদার নতুন মাত্রা―২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে ইউনেস্কো। একুশের অস্তিত্ব, একুশের মর্যাদা এর ফলে বিশ্বময় ছড়িয়ে যায়।
ভাষা আন্দোলনের ছয় দশক পেরিয়ে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ করতে গেলে প্রত্যাশার তুলনায় অপ্রাপ্তিই বড় হয়ে দেখা দেয়। একুশের প্রত্যাশা একাত্তরের প্রত্যাশায় অভিন্ন রূপ নেওয়ার পরও দেখা যাচ্ছে রাষ্ট্রের বিকাশের সঙ্গে জাতীয় জীবনে প্রত্যাশার বাস্তবায়ন সামান্যই। দীর্ঘ সময় ধরে একুশেকে আমরা শুধু আবেগ দিয়ে বরণ করেছি কাজের বাস্তবতায়, জীবিকার বাস্তবতায় নয়।
একুশের প্রত্যাশা রূপ পেয়েছিল কয়েকটি সেøাগানে―যেমন ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’, ‘সর্বস্তরে বাংলা চাই’-এর আবেগঢালা উচ্চস্বরে। আন্দোলন ও জনদাবির চাপে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানি শাসকেরা সংবিধান রচনা উপলক্ষে উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সেটা ছিল কাগুজে স্বীকৃতি। রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রকৃত স্বীকৃতি আসে ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে।
কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বস্তরে মাতৃভাষা বাংলার প্রচলন দেখা যায়নি। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবির পাশাপাশি এর সুস্পষ্ট পরিপূরক দাবি ছিল জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষাসহ শিক্ষার সর্বস্তরে এবং প্রশাসনে, আদালতে বাংলা মাধ্যমের ব্যবহার। যদিও সচিবালয়ের দাফতরিক কাজে এবং শিক্ষাক্ষেত্রে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা চালু হয়েছে―তবু এর বাইরে সর্বত্র ইংরেজি ভাষাই চলছে।
‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য চরিত্রগুণে রাষ্ট্রিক ও সামাজিক এবং ‘সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের’ দাবির তাৎপর্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক। কিন্তু দুটির সঙ্গে জাতীয় জীবনের দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে। সে সম্পর্ক জাতীয় পর্যায়ে সর্বজনীন উন্নতির। এখানে আর্থসামাজিক উন্নতির বিষয়টিই প্রধান। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এটা নিছক মর্যাদার প্রশ্ন।
পরস্পর-সংশ্লিষ্ট দাবি দুটি বাস্তবায়িত হলে উচ্চশিক্ষার সর্বস্তরে শ্রেণিবিশেষের বদলে সর্বসাধারণের জন্য আর্থসামাজিক সুবিধা অর্জিত হওয়ার কথা, কিন্তু উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে ইংরেজি মাধ্যম সচল থাকার ফলে তা ব্যাহত হয়েছে। সেই সঙ্গে অসংখ্য ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষায়তন কিন্ডারগার্টেন থেকে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে দেশের শিক্ষার্থীসমাজ বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
এটা জাতীয় উন্নতি, সর্বসাধারণের উন্নতির ক্ষেত্রে বড় একটা বাধা। কারণ ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা খুবই দুর্মূল্য, একমাত্র বিত্তবান শ্রেণির সন্তানদের পক্ষেই সে শিক্ষাগ্রহণ সম্ভব। সম্ভব নয় সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির সন্তানদের পক্ষে সে শিক্ষাগ্রহণ। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা এভাবে শ্রেণিবিভাজন ও শ্রেণিগত সুবিধা-অসুবিধার দিকগুলো স্পষ্ট করে তুলেছে। এর ফলে পিছিয়ে পড়েছে বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে দুর্বল শ্রেণির তরুণসমাজ।
এ তো গেল উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যবধানমূলক নীতি গ্রহণের কথা। তাছাড়া আরও একটি বিষয় বিবেচনার দাবি রাখে। যে রাষ্ট্রের জাতীয় ভাষা বাংলা সে রাষ্ট্রের প্রধান কর্তব্য রাষ্ট্রভাষায় জাতির জন্য, জনগণের জন্য শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া অর্থাৎ রাষ্ট্রের অধিবাসী জনসাধারণকে শিক্ষিত করে তোলা। সেই জাতীয় কর্তব্যও বাংলাদেশ রাষ্ট্র পুরোপুরি পালন করতে পারেনি। তবে এর মধ্যে কিছু ছোটখাটো কর্তব্য সম্পাদন, যেমন ঘোষণা শোনা গেছে অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা স্কুলের অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার―এটা অবশ্যই সদর্থক অর্জন।
কিন্তু উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহারের বড় দাবিটাই এখনও পর্যন্ত অনর্জিত রয়ে গেছে। যেমন রয়ে গেছে উচ্চ আদালতে বাংলার ব্যবহার প্রচলন। এখানে সবই ইংরেজি। তাই সুবিচার প্রার্থী সাধারণ মানুষ উচ্চ আদালতে এসে অসুবিধার সম্মুখীন হন, তারা জিম্মি হয়ে পড়েন ইংরেজি শিক্ষিত আইনজীবীদের কাছে। ভাষা আন্দোলনের ফসল বাংলাদেশ রাষ্ট্রে এটা একেবারেই প্রত্যাশিত ছিল না, তবু তা ঘটছে।
কেন ঘটছে, এ প্রশ্নের জবাবে নানা মত লক্ষ করা যায়। তবে একটি কথা সবাই বলে থাকেন―এর প্রধান কারণ শাসকশ্রেণির সদিচ্ছার অভাব। শাসকশ্রেণি থেকে তারা যাদের প্রতিনিধি সেই শিক্ষিত শ্রেণি পর্যন্ত অর্থাৎ আমলা, পেশাজীবী ধনিক-বণিক, ব্যবসায়ী-শিল্পপতি পূর্ব প্রচলিত ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত। এখনও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজি মাধ্যমের প্রাধান্য। উচ্চস্তরের জীবিকায় ইংরেজি শিক্ষার প্রাধান্য। তাই এসব শ্রেণিতে বাংলার প্রতি অনাগ্রহ।
আর তাই সমাজের সর্বস্তরে মাতৃভাষা বাংলার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষা ও ইংরেজি শিক্ষা মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত। সেটা আরও হয়েছে জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে। বাংলা তাই জাগতিক ক্ষেত্রে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। বিজ্ঞান শিক্ষা ও বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। জীবিকার ক্ষেত্রে, সামাজিক স্তরে বাংলার অবস্থান বিরাজমান পরিস্থিতির কারণে এখন নিচে। ক্রমশই নিচের দিকে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নানা স্তরের শাসনব্যবস্থায় উপস্থিত প্রধানরা পূর্ব প্রচলিত ইংরেজি ধারা ব্যবস্থায় শিক্ষিত বলে তাদের প্রতিনিধিস্থানীয় রাজনীতিবিদেরা পূর্ব অবস্থায় থাকতে আগ্রহী। তারা শ্রমসাধ্য বাংলা মাধ্যমের নয়া শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলনে ইচ্ছুক নন। পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাঙালি শিক্ষিত শ্রেণির স্বার্থভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজন ছিল বাংলা ভাষার অধিকার আদায় ও বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর স্বাধীন রাষ্ট্রের পক্ষে লড়াই চালানো। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রে সে প্রয়োজন মিটে যাওয়ায় বাংলা প্রচলনে তাদের আর কোনও আগ্রহ নেই।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মিছিলে মিছিলে আরেকটি উচ্চারিত দাবি ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’। এর তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য কারাগারে আটক রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি। কিন্তু এর নিহিত তাৎপর্য ছিল স্বৈরাচারী শাসকশ্রেণির হাত থেকে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে জনগণ গণতান্ত্রিক অধিকার কতটা ভোগ করতে পারছে এবং রাষ্ট্রে ও সমাজে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে নির্দলীয় বুদ্ধিজীবী ও জনসাধারণের।
দুই
পরিস্থিতি বিচারে ভাষা আন্দোলনের দাবিগুলো আদায়ে আমাদের কী করণীয় এমন প্রশ্ন অনেকে করে থাকেন। এ সম্পর্কে প্রথম কথা, শাসকশ্রেণি অর্থাৎ যাদের হাতে ক্ষমতা (তা যে দলই হোক) তারা প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে এগিয়ে আসবেন বলে মনে হয় না। একমাত্র যারা রাজনৈতিক মতাদর্শের টানে অথবা সমাজ পরিবর্তনে বিশ্বাসী তাদেরই বৃহত্তর জনসাধারণকে এ লক্ষ্যে সচেতন করে তুলতে এগিয়ে আসতে হবে। ঠিক যেভাবে রাষ্ট্রভাষা বাংলার অধিকার আদায়ে একশ্রেণির মানুষ একসময় এগিয়ে এসেছিলেন।
তারা যদি যুক্তি দিয়ে, তথ্য দিয়ে সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের পক্ষে জনসাধারণকে উদ্দীপ্ত করতে পারেন তাহলে বৃহত্তর জনশ্রেণির দাবিতে হয়তো প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটতে পারে। তাই দরকার বাংলা প্রচলনের পক্ষে ছাত্র-জনতার ঐক্য। কাজটা কঠিন। তবে অসম্ভব নয় যদি বাংলা ভাষা ও বাঙালিয়ানার টানে বাঙালিদের উদ্দীপ্ত করা যায়।
বিরাজমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে আরও একটি কথা বলা দরকার যে, বাস্তবতার কারণেই আমরা ইংরেজি বর্জনের পক্ষপাতী নই। যে যার প্রয়োজনে ইংরেজি ভাষা শিখবে, তবে তা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে, মাতৃভাষার বিকল্প হিসেবে নয়। জীবিকা বা অন্য কোনও প্রয়োজনে সমাজের একশ্রেণির মানুষ ইংরেজি শিখবেন দেশের শিক্ষানীতিতে সে ব্যবস্থা থাকবে।
সবশেষে একটি কথা, দেশের পুরো জনসংখ্যাকে শিক্ষিত করে তোলা সবচেয়ে বড় জরুরি বিষয়। পুরো দেশ শিক্ষিত হওয়ার একাধিক সুবিধা। তাতে অর্থনৈতিক উন্নতির প্রসার ঘটবে, জনসংখ্যা বিস্ফোরণের সমস্যা সমাধানের পরোক্ষ উপায় তৈরি হবে, শিক্ষিত কর্মরত নারীর সেখানে থাকবে বিশেষ ভূমিকা। এ দাবির পক্ষে জনমত তৈরিতে শিক্ষিত শ্রেণিকেই প্রধান ভূমিকা নিতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা পূরণের অন্যতম প্রধান উপায় ব্যাপক শিক্ষা নিশ্চিত করতে উপযুক্ত শিক্ষানীতি প্রণয়ন, যে শিক্ষানীতির মূল লক্ষ্য হবে সর্বজনীন সুশিক্ষা, একুশের আবেগ নয় একুশের দাবি বাস্তবায়নে সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটানো।
শিক্ষা প্রসঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা না বলা হলে আলোচনা অসম্পূর্ণ থাকবে, যদিও তা একুশের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত নয়। মাতৃভাষা বাংলায় সর্বজনীন শিক্ষার যে দাবি বাংলাভাষাীদের ক্ষেত্রে যুক্তিসংগত, একই দাবি সেই নীতিতে অনস্বীকার্য এ দেশের আদিবাসী জাতিসত্তাগুলো সম্পর্কে। তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ-সুবিধায় রাষ্ট্র সহায়তা দেবে এটাও আমাদের দাবি ও প্রত্যাশা। যেমন প্রত্যাশা অবহেলিত সেসব জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি। কারণ তারাও এই বাংলাদেশ ভূখণ্ডের অধিবাসী, এই রাষ্ট্রের নাগরিক।
সচিত্রকরণ : রজত



