আর্কাইভপ্রচ্ছদ রচনা

প্রচ্ছদ রচনা : ঢাকার বাইরে ভাষা আন্দোলন : আহমদ রফিক

প্রচ্ছদ রচনা : ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক―আবার পড়ি : তাঁর রচনা থেকে

কথাটা আগেই বলা হয়েছে যে ঢাকার পাশাপাশি পূর্ববঙ্গের জেলা ও মহকুমা শহরে ভাষা আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্ত প্রেরণায় জ্বলে উঠেছিল। আটচল্লিশে সীমাবদ্ধভাবে, বায়ান্নে ব্যাপক আকারে। বায়ান্নের আন্দোলিত শিখা গ্রামে-গঞ্জের শিক্ষায়তনগুলোকে পর্যন্ত স্পর্শ করেছিল। কোনও কোনও শহরে ছাত্রদের সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষ ও জনতার অংশগ্রহণ আন্দোলনে গুণগত পরিবর্তন ঘটায়।

ঢাকার অদূরে অবস্থিত নারায়ণগঞ্জ মহকুমা শহর, সেই সঙ্গে বন্দর শহর নারায়ণগঞ্জের ভাষা আন্দোলন তার প্রমাণ। যেমন ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের তেমনি ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জের ভূমিকা অনন্য। বিশেষ করে বায়ান্নর আন্দোলনে সংগঠক মমতাজ বেগমকে কেন্দ্র করে। নারায়ণগঞ্জের ভাষা আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ছিল ঢাকার তুলনায় ব্যাপক হারে ছাত্রী ও মহিলাদের অংশগ্রহণ এবং তা মূলত মমতাজ বেগমের নেতৃত্বে।

দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য শ্রমজীবী শ্রেণির অংশগ্রহণ। রাজনৈতিক নেতা শামসুজ্জোহার পাশাপাশি আলমাস আলী, শফি হোসেন, ফয়েজ আহমদ প্রমুখ শ্রমিকনেতার কারণে নারায়ণগঞ্জের জনসভায় অনেক সময়ই ছিল শ্রমিক-প্রাধান্য। নারায়ণগঞ্জও হয়ে উঠে মিছিলের শহর। কিন্তু সেখানকার শিল্পাঞ্চল থেকে হাজার হাজার শ্রমিক জনসভায়, কখনও মিছিলে যোগ দেয়।

ব্যবসাকেন্দ্রিক শহর হওয়ার কারণে শহুরে গৃহিণীদের আন্দোলনের জন্য অর্থসাহায্য ছিল ব্যতিক্রমী ঘটনা। অবশ্য তাদের অনেকে জনসভায়ও যোগ দিয়েছেন, কেউ কেউ মিছিলে। তবে ছাত্রীরা ব্যাপকভাবে ছিল সভা-সমাবেশে ও মিছিলে। পূর্ববঙ্গীয় আইনসভার সদস্য ওসমান আলীর সমর্থন আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। নারায়ণগঞ্জের আন্দোলন সম্বন্ধে ইতিপূর্বে বলা হয়েছে।

বন্দরনগরী চট্টগ্রাম, বিপ্লবী সূর্য সেনের চট্টগ্রাম এ আন্দোলনে পিছিয়ে থাকেনি। তবে ১৯৪৮ মার্চের তুলনায় বায়ান্নর আন্দোলন ছিল ব্যাপক। এবং তাতে ছাত্র ও শিক্ষিত শ্রেণি অর্থাৎ সাহিত্যকর্মী ও বুদ্ধিজীবীর সচেতন অংশের সঙ্গে ছিল শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনের বামপন্থি নেতা, যেমন রেলওয়ে শ্রমিক লীগের নেতা চৌধুরী হারুন-উর-রশীদ। যেমন ছিলেন প্রগতিবাদী সাহিত্যিক মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী, তেমনি আওয়ামী মুসলিম লীগের এম. এ. আজিজ বা জহুর আহমদ চৌধুরী কিংবা তমদ্দুন মজলিসের আজিজুর রহমান। ছিলেন বিপ্লবী বিনোদ দাশগুপ্ত, বামপন্থী সাহিত্যিক গোপাল বিশ্বাস প্রমুখ।

ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতায় উল্লেখযোগ্য নাম মুসলিম লীগের ফজলুল কাদের চৌধুরী প্রমুখ। সরকারি দমনীতিতে গ্রেপ্তার হন অনেকে। তবু সারা দেশের মতো চট্টগ্রামেও ভাষার লড়াই বিশেষ মাত্রা স্পর্শ করে। এর প্রভাব পড়ে রাজনৈতিক মহলে। যেজন্য ১৯৫৪ সালে নির্বাচনী বক্তৃতা দিতে গিয়ে লালদিঘি ময়দানে নাজেহাল হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন। সেই সঙ্গে চট্টগ্রাম হয়ে ওঠে প্রগতিশীল সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্র। প্রসঙ্গত স্মর্তব্য, স্বনামখ্যাত কবিয়াল রমেশ শীল, প্রখ্যাত গণসংগীতশিল্পী মলয় ঘোষদস্তিদার প্রমুখ চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

ভাষা আন্দোলনকারীদের দৃপ্ত পদচারণায় ঢাকার মতোই যেমন চট্টগ্রামের শহুরে পথে ধুলো উড়েছে, তেমনি রাজনৈতিক অঙ্গনের স্বনামখ্যাত লালদিঘিতে জনসমাবেশের উদ্দামতা ঢেউ তুলেছে। চল্লিশ হাজারের অধিক লোকের সমাবেশ তখনকার পরিবেশে ছিল স্মরণীয় ঘটনা। সেøাগানে সেøাগানে আকাশ-বাতাস স্পন্দিত।

ময়মনসিংহ ঢাকার নিকটবর্তী বলেই বোধ হয় ঢাকার ঘটনা দ্রুত সেখানে পৌঁছে যায়, উদ্দীপ্ত করে ছাত্র-জনতার চেতনা। ১৯৪৮ মার্চের আন্দোলন সভা-সমাবেশ-মিছিলে যথেষ্ট উত্তাপ ছড়িয়েছিল। জিন্নাহ সাহেবের রেসকোর্সের বক্তৃতা ছাত্র-জনতার মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। শুরু হয় সভা, সমাবেশ, মিছিল, সেøাগান। উল্লেখযোগ্য রফিকউদ্দিন ভুঁইয়ার সভাপতিত্বে বিপিন পার্কে ছাত্রসভা।

কিন্তু ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারির আন্দোলন ছিল অনেক ব্যাপক। অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট সব বন্ধ। বন্ধ বাজার-হাট। প্রকৃতপক্ষে ২১ ফেব্রুয়ারির পর থেকে আন্দোলন ক্রমে জমজমাট হতে থাকে, ছড়িয়ে পড়ে থানা পর্যায়ে। ত্রিশাল, ঈশ্বরগঞ্জ হয়ে মহকুমা শহর জামালপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ সর্বত্র আন্দোলনের ব্যাপ্তি, অন্যদিকে ঢাকার কিছুটা নিকটবর্তী টাঙ্গাইলে। ময়মনসিংহ আন্দোলনের একটি ব্যতিক্রমী দিক ছিল পুলিশ লাইনের সদস্যদের আন্দোলন চালনায় গোপন অর্থ সাহায্য।

আন্দোলনের গুরুত্ব বিচারে শহর রাজশাহীর ছিল খুবই উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। ১৯৪৮ সাল থেকে আন্দোলনের সূচনা, ভুবনমোহন পার্কে ছাত্রছাত্রীদের সভা। এরপর মিছিল, সেøাগান। অবশ্য আন্দোলন বানচাল করতে উর্দু-সমর্থক ও সরকারের ভাড়াটিয়া গুন্ডাদের আক্রমণও ছিল স্থানিক বাস্তবতা। এ পর্যায়ে স্কুল-কলেজগুলো ছিল আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। ছাত্রনেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আতাউর রহমান, একরামুল হক, মোহাম্মদ সুলতান, আবুল কাশেম চৌধুরী, তোফাজ্জল হোসেন প্রধান প্রমুখ।

রাজশাহীতেও চট্টগ্রামের মতোই প্রগতিশীল সাহিত্যচক্র ‘দিশারী’ বিশেষ ভূমিকা রাখে (১৯৫০)। নতুন ছাত্র নেতৃত্বে গোলাম আরিফ টিপু, এস. এ. বারি এ. টি., আবুল কালাম চৌধুরী, এম. এ. গাফফার (মেডিকেল ছাত্র) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য নাম। ১৯৫২ সাল নাগাদ প্রগতিশীল সাহিত্য সংস্কৃতির মেধাবী ছাত্রযুবাদের ভূমিকা আন্দোলনের জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারির সভা শুধু ঢাকাতেই নয়, রাজশাহীতেও ছাত্রদের প্রতিবাদী কর্মসূচিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। সেদিন ঐ সভায় বক্তৃতা করেন আনোয়ারুল আজিম (মুক্তিযুদ্ধে শহীদ), মোহসেনা বেগম, মমতাজউদ্দিন আহমদ প্রমুখ। স্কুল-কলেজে চলে ধর্মঘট। ১০ ফেব্রুয়ারির জনসভার পর গঠিত সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটিতে যুক্ত ছিলেন প্রগতিশীল চিন্তার এম. এল. এ মাদারবখশ। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২। আতাউর রহমান, গোলাম আরিফ প্রমুখের সঙ্গে আরও অনেক যোগ দেন প্রগতি শিবিরে। শক্তি বাড়ে তাদের।

২১ ফেব্রুয়ারি। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট, অর্থাৎ হরতাল পালিত হয় রাজশাহী শহরে। দোকানপাট, বাজার, রিকশা, টমটম সব বন্ধ। শহরে বন্দুকধারী পুলিশের টহল। বেলা ১১টা থেকে ছাত্র-জনতার মিছিল শেষে বিকেল ৪টায় ভুবনমোহন পার্কে জনসভা। ঢাকায় ছাত্র-জনতার ওপর গুলির খবরে জনসভার চরিত্র পাল্টে যায়। মাদারবখশসহ কয়েকজন মুসলিম লীগ নেতা ভাষার পক্ষে জনসভায় বক্তৃতা করেন। পুলিশ তাঁদের গ্রেফতার করে। পরে মাদারবখশ আইনসভা থেকে পদত্যাগ করেন।

বগুড়ায় একইভাবে ১৯৪৮ মার্চের আন্দোলন থেকে ভাষা আন্দোলনের সূচনা। যথারীতি প্রতিবাদ সভা, হরতাল, বিক্ষোভ মিছিল। কবি আতাউর রহমানকে আহ্বায়ক করে ভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। ১১ মার্চের মিছিলে অধ্যক্ষ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ যোগ দেন, এমনকি সভায় বক্তৃতাও করেন।

আটচল্লিশের ধারাবাহিকতা নিয়ে বগুড়ায় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। স্থানীয় কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে মজিরউদ্দিন আহমদকে সভাপতি ও গোলাম মহিউদ্দিনকে সম্পাদক মনোনীত করে ১৭ সদস্যবিশিষ্টি সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন। আন্দোলনের সূচনায় নির্ধারিত কর্মসূচি শুরু হলেও ঢাকায় গুলিবর্ষণের সংবাদ আন্দোলনে তীব্রতা ও ব্যাপকতা তৈরি করে। ২৩ ফেব্রুয়ারির গণজমায়েতের ধারাবাহিকতায় আন্দোলন বগুড়া শহরের আশপাশের এলাকা, এমনকি নিকটবর্তী গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

বগুড়ায় বাহান্নর ভাষা আন্দোলন প্রকৃত অর্থেই ছিল সর্বদলীয় চরিত্রের। মুসলিম লীগ-সমর্থক বাদে সবাই এতে অংশ নিয়েছেন, যেমন ছাত্রছাত্রী, সাহিত্যিক, আইনজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ। রাজশাহীতে ১৯৫২ সালে ছোটখাটো শহিদ মিনার তৈরি হলেও বগুড়ায় তৈরি হয় ১৯৫৩ সালে।

পাবনা ভাষা আন্দোলনের সূচনা ১৯৪৮ মার্চ থেকে। এর সূচনা ঘটায় পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্ররা। কিন্তু গণতান্ত্রিক যুবলীগ, ছাত্রলীগ, ছাত্র ফেডারেশন, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র কংগ্রেস প্রভৃতি সংগঠনের চেষ্টায় এ আন্দোলন রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে গড়ে ওঠে। মাহবুবুর রহমান খান ও আমিনুল ইসলাম বাদশাকে যুগ্ম আহ্বায়ক মনোনীত করে আন্দোলন পরিচালনার জন্য সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়।

গ্রেফতার, জুলুম, দমননীতি সত্ত্বেও আন্দোলন বন্ধ হয়নি। এমনকি আটচল্লিশের জের ধরে ১৯৪৯ এবং তার পরও ১১ মার্চ পালিত হয়। ভাষা আন্দোলনের প্রভাবে ১৯৫০ সালে পাবনায় ‘শিখা সংঘ’ নামে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে ওঠে, যা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে বিশেষ প্রভাব রাখে। বায়ান্নর আন্দোলনেও এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্রদের ছিল বলিষ্ঠ ভূমিকা। ২০ ফেব্রুয়ারি (১৯৫২) প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করলে ছাত্র-জনতা পরদিন ১৪৪ ধারা অমান্য করেই মিছিল বের করে। এ আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট ছাত্রীদের মধ্যে সুফিয়া বেগম, জাহানারা প্রধান, নূরজাহান বেগম, হালিমা খাতুন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। পাবনায় প্রথম শহীদ মিনার তৈরি হয় ১৯৫৪ সালে।

ঢাকার মতোই রংপুরে ভাষা আন্দোলন ১৯৪৮ মার্চেই যথেষ্ট উদ্দীপনায় সংঘটিত হয়েছিল। মতিউর রহমান, ইদ্রিস লোহানী, ইউনুস লোহানী, ভিখু চৌধুরী প্রমুখের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল কর্মীদের হাত ধরে আন্দোলনের বিস্তার। এতে কারমাইকেল কলেজের ছাত্রদের ছিল প্রধান ভূমিকা। ১১ মার্চের আন্দোলনে সরকারি ছাত্রলীগ ও ভাড়াটিয়া গুন্ডারা যথারীতি মিছিলে হামলা চালায়।

তুলনামূলক বিচারে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন অধিকতর বলিষ্ঠতা ও ব্যাপকতা নিয়ে শুরু হয় স্কুল ও কলেজের ছাত্রছাত্রীদের আবেগের টানে। কারমাইকেল কলেজের তৎকালীন উর্দুভাষী অধ্যক্ষের বাধা সত্ত্বেও ছাত্ররা ঠিকই আন্দোলনে যোগ দেয়। বায়ান্নর আন্দোলনে রংপুরে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মতিউর রহমান, সুফি মোতাহার হোসেন, শাহ তোফাজ্জল হোসেন প্রমুখ। ছাত্রীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অবদান মাসুদা চৌধুরী, ডলি, মিলি চৌধুরী (একাত্তরে শহীদ) প্রমুখের।

এ আন্দোলন শুধু রংপুরেই নয় গাইবান্ধা, ধলগাছা, পাটগ্রাম, পীরগঞ্জ, নলডাঙ্গা, লক্ষ্মীপুর, বালাবাড়ি, হারাগাছা প্রভৃতি অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। ভাষা আন্দোলন কেন্দ্র করে রংপুরে প্রগতি চেতনায় সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। সংস্কৃতিচর্চায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন নুরুল ইসলাম, অজিত রায় শামিমা জামান, চিত্রা দাসগুপ্ত, পূর্বোক্ত ডলি ও মিলি।

দিনাজপুর, দেশের সর্বউত্তর প্রান্তে হওয়া সত্ত্বেও ভাষা আন্দোলনে পিছিয়ে থাকেনি। শহর দিনাজপুরেই নয়, আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল জেলার মহকুমা ছাড়িয়ে গ্রামে-গঞ্জে। নুরুল হুদা কাদেরবখশ প্রমুখের নেতৃত্বে দিনাজপুরের প্রগতিশীল ছাত্রসমাজ ও সংগ্রামী জনতা মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে। গণতান্ত্রিক যুবলীগের দবিরুল ইসলামও ছিলেন নেতৃত্বে।

১৯৫২ ফেব্রুয়ারিতে একইভাবে দিনাজপুরের ছাত্রসমাজ পথে নামে। আন্দোলন বানচাল করতে জেলা প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু ঢাকার মতোই ছাত্ররা বাধা মানেনি। সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ছাত্ররা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ঢাকায় গুলিবর্ষণের সংবাদ দিনাজপুরে পৌঁছালে ২৩ ফেব্রুয়ারি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল হয়। প্রতিবাদ সভায় আবেগপূর্ণ বক্তৃতা দেন মির্জা নুরুল হুদা, দবিরুল ইসলাম, আবদুল হাফিজ প্রমুখ। সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ছাত্রছাত্রীরা ১৯৫৩ সালে ছোটখাটো একটি শহীদ মিনার তৈরি করে।

যশোরের ভাষা আন্দোলনে ১৯৪৮ সাল একটু ব্যতিক্রমী ধারায় পরিস্ফুট। অর্থাৎ কোনও কোনও জেলার তুলনায় একটু ভিন্ন। আটচল্লিশ এখানে বায়ান্নর তুলনায় কিছুটা বেশি সংগ্রামী। কারণ, আটচল্লিশি কমিউনিস্ট রণনীতির প্রভাব। ১৯৪৮ ফেব্রুয়ারিতেই যশোরে শতাধিক ছাত্রের উপস্থিতিতে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। ঐ সভায় বক্তৃতা করেন ছাত্র ফেডারেশনের পক্ষে সুবীর রায়, হামিদা রহমান ও রণজিৎ মিত্র এবং ছাত্রলীগের পক্ষে আলমগীর সিদ্দিকী ও সৈয়দ আফজল হোসেন। আলমগীর সিদ্দিকী ও রণজিৎ মিত্র সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক।

যশোরে ভাষা আন্দোলনের সূচনা ১৯৪৮ মার্চের প্রথম দিকে। ১১ মার্চের কর্মসূচি রুখতে ম্যাজিস্ট্রেট নোমানির ১৪৪ ধারা জারি ১০ মার্চ। ছবিটা ঢাকার বায়ান্নর মতো। প্রতিক্রিয়ায় ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত নেয়। একমাত্র কমিউনিস্ট পার্টি বাদে কোনও রাজনৈতিক দল ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে ছিল না। তবু সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্তে মিছিল বের হয়। মিছিলের সামনে হামিদা রহমানের নেতৃত্বে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ছাত্রী। যোগ দেন সাধারণ মানুষ। এক মাইল লম্বা মিছিল। শহরে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল।

ছাত্র-জনতা বনাম পুলিশের সংঘাতে সেবার পুলিশ গুলি ছোড়ে, আটচল্লিশে একমাত্র যশোরেই গুলি চলে, যদিও কেউ হতাহত হয়নি। অন্যদিকে সশস্ত্র অবাঙালিরা শহরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। চেষ্টা চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটানোর। কিন্তু ছাত্রনেতৃত্বের বিচক্ষণতা ও জনসাধারণের সমর্থনে কোনও অঘটন ঘটেনি। ঢাকায় চুক্তির কারণে আটক ছাত্রকর্মীরা মুক্তি পায়।

তুলনায় বায়ান্নর আন্দোলন যশোরে ততটা সংগ্রামী চরিত্রের ছিল না, কিন্তু নির্ধারিত কর্মসূচি যথারীতি পালিত হয়েছে। যশোরের মহকুমা শহর নড়াইল, মাগুরা, ঝিনাইদহে ভাষা আন্দোলন ব্যাপক তৎপরতায় পালিত হয় বলে সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে প্রকাশ। দূর গ্রামাঞ্চলের শিক্ষায়তনেও চলেছে ছাত্রদের প্রতিবাদী তৎপরতা।

খুলনা সীমান্ত শহর হওয়ার কারণে বা অন্য কোনও প্রভাবে ১৯৪৮-এর আন্দোলনে অন্যান্য জেলা শহরের মতো বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারেনি। আরেক কারণ সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রবলতা ও সরকারি দমননীতি। তবু স্কুল-কলেজে ঠিকই ধর্মঘট পালিত হয়।

তবে বায়ান্নে অবস্থা কিছুটা ভিন্ন। ঢাকায় গুলিবর্ষণের প্রতিক্রিয়ায় ২৩ ফেব্রুয়ারি পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। পরদিন ১১ সদস্যের সংগ্রাম কমিটি গঠন করে আন্দোলন সংগঠিত করার চেষ্টা চলে। অন্যদিকে দৌলতপুর কলেজ ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। তবে খুলনায় সবুর খান প্রমুখের বিরূপ ভূমিকার কারণে ভাষা আন্দোলন কোনও পর্যায়েই বলিষ্ঠ প্রতিবাদী হয়ে ওঠেনি।

ফরিদপুরে ভাষা আন্দোলনও ১৯৪৮ সালের মার্চ থেকে শুরু ১১ মার্চ আংশিক হরতালের মধ্য দিয়ে। রাজেন্দ্র কলেজ ছিল আন্দোলনের কেন্দ্র। আশ্চর্য, ঢাকায় ১৯৪৮ মার্চে ১৪৪ ধারা জারি না হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশে জেলা শহরে স্থানীয় প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে আন্দোলন বন্ধ করতে চেষ্টা করেছে, যেমন ফরিদপুরেও। তবু ১৪৪ ধারা সত্ত্বেও পথে মিছিল বেরিয়েছে, হরতালও পালিত হয়েছে, তবে সংগ্রামী তীব্রতা নিয়ে নয়। কারণ, হতে পারে বাম রাজনৈতিক সংগঠনের অনুপস্থিতি।

বায়ান্নর আন্দোলনও ফরিদপুরে একই চরিত্রের। একজন সংগঠকের ভাষায়, ‘২১ ফেব্রুয়ারি নানা বাধাবিপত্তির মধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালন করি।’

নোয়াখালীর ভাষা আন্দোলন মূলত চৌমুহনী, মাইজদী, ফেনী প্রভৃতি এলাকার আন্দোলনের সমনি¦ত প্রকাশ। চৌমুহনী কলেজ, ফেনী কলেজ, নোয়াখালী বার অ্যাসোসিয়েশন আন্দোলন সংগঠিত করার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখে। ফেনী তমদ্দুন মজলিসের ঘাঁটি হলেও বায়ান্নে আন্দোলন চলেছে যুবলীগ, ছাত্রলীগ, তমদ্দুন মজলিস, জাতীয় কংগ্রেস, ফেনী সংস্কৃতি সংসদ প্রভৃতি সংগঠনের সমনি¦ত চেষ্টায়।

বরিশালে ভাষা আন্দোলনের প্রকাশ প্রধানত ১৯৫২ সালে। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ছাত্র ফেডারেশন ও ছাত্রলীগের সমনি¦ত চেষ্টায় আন্দোলন সংঘটিত হয়। তবে কাজী বাহাউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে ১৯৪৮ সালের মার্চে স্কুল-কলেজে ধর্মঘট পালিত হয়, প্রতিবাদী সভা-সমাবেশ চলে মূলত বি. এম. কলেজকে কেন্দ্র করে। এ পর্যায়ে আন্দোলন পরিচালনা করেন শামসুল হক চৌধুরী।

১৯৫২ ফেব্রুয়ারি। এবারও আন্দোলনের মূল চালিকা শক্তি বি. এম. কলেজের ছাত্রবৃন্দ। একুশে ফেব্রুয়ারি শহরে পূর্ণ হরতালসহ নির্ধারিত কর্মসূচি পালিত হয়। ব্যাপকভিত্তিক সংগ্রাম কমিটি এ আন্দোলন পরিচালনা করে। ঢাকায় ছাত্র হত্যার সংবাদে আন্দোলন আরও বিস্তৃতি পায়। এবারের বিশেষত্ব বহুসংখ্যক মহিলা ও ছাত্রীর আন্দোলনে যোগদান। এদের নেতৃত্বে ছিলেন মিসেস হামিদউদ্দিন, হোস্নে আরা নীরু, মঞ্জুশ্রী, মাহে নূর বেগম, রানী ভট্টাচার্য প্রমুখ। ২৪ ফেব্রুয়ারি টাউন হলের সামনে শহিদ মিনার গড়া হয়।

কুমিল্লায় ভাষা আন্দোলনের সূচনা যথারীতি ১৯৪৮ মার্চেই। কুমিল্লা রাজনীতিসচেতন শহর, সেই সঙ্গে বামপন্থি রাজনীতির যথেষ্ট প্রভাব। হয়তো তাই ১১ মার্চের দিন কয় আগেই কুমিল্লায় ভাষা আন্দোলনের সূচনা। ১১ মার্চ যথারীতি হরতাল, মিছিল, সেøাগান। সেদিন সারা শহর পোস্টারে ছেয়ে যায়। নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে উল্লেখযোগ্য চিত্ত বোস, ফয়েজ উল্লাহ, সুখেন্দু চক্রবর্তী প্রমুখ। গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ভূমিকাও তাঁদের উদ্দীপ্ত করে।

১৯৫২ ফেব্রুয়ারিতেও কুমিল্লা রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে উত্তপ্ত। ২৭ জানুয়ারির পর থেকে প্রতিদিন সভা, সমাবেশ, মিছিল। স্কুলছাত্ররাও এতে অংশ নেয়। মিছিলে মোহাজের কলোনির উর্দুভাষীদের হামলা আন্দোলনের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দেয়। ২১ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি হরতালে কুমিল্লা শহর অচল। শিক্ষকদের মধ্যে অধ্যাপক আবুল খায়ের, শওকত আলী, হাসান ইমাম, আবদুল গণি, আবুল হোসেন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।

ফেব্রুয়ারি পেরিয়ে মার্চেও (১৯৫২) কুমিল্লায় আন্দোলন অব্যাহত থাকে। এমনকি শুরু থেকেই আন্দোলন মহকুমা ও থানা পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। দাউদকান্দি, বুড়িচং, নবীনগর, মুরাদনগর, ফরিদাবাদ, রামচন্দ্রপুর প্রভৃতি প্রান্তিক এলাকায়ও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। সুদূর গ্রামের স্কুলে (শ্যামগ্রাম) পর্যন্ত ধর্মঘট, মিছিল ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। মহকুমা শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আন্দোলন যথেষ্ট ব্যাপকতা লাভ করে।

সিলেটও এ আন্দোলনের বাইরে ছিল না। বরং ১৯৪৭ নভেম্বরে ভাষাভিত্তিক বিতর্কে আয়োজিত সভায় সৈয়দ মুজতবা আলী বক্তৃতা করেন। তবে সে সভা পণ্ড হয় মুসলিম লীগ গুন্ডাদের আক্রমণে। ১৯৪৮ জানুয়ারিতে মন্ত্রী আবদুর রব নিশতার সিলেটে এলে তাকে বাংলা ভাষার পক্ষে স্মারকলিপি দেন আবদুস সামাদ প্রমুখ। সিলেটের নারীসমাজও এ বিষয়ে পিছিয়ে থাকেনি। তবে ১১ মার্চ সিলেটে সরকারি দমননীতি ছিল তীব্র, ২ মাসের জন্য ১৪৪ ধারা।

১৯৫২ সালে পীর হাবীবুর রহমানকে আহ্বায়ক করে ‘রাষ্ট্রভাষা কমিটি’ পুনর্গঠিত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রহত্যার সংবাদে আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। শোকমিছিল, গায়েবানা জানাজা, এমনকি নারীদের প্রতিবাদ সভা। বক্তৃতা করেন যোবেদা খাতুন প্রমুখ নারীনেত্রী। আশ্চর্য যে এ আন্দোলন মার্চের ১০ তারিখের পরও চলতে থাকে। বামপন্থি নেতারাও এ আন্দোলনে যোগ দেন। মহিলাদের মধ্যে হাজেরা মাহমুদ, যোবেদা খাতুন, নজিবুন্নেছা, শাহেরা বানু, লুতফুন্নেছা, রাবেয়া খাতুন, ছালেহা খাতুন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button