আর্কাইভপ্রচ্ছদ রচনা

প্রচ্ছদ রচনা : সাহিত্যে নোবেলজয়ী হান কাং : মনোজগতের শব্দকারিগর : জীবিত ও মৃত আত্মার সংযোগকারী অন্তর্ভেদী কবি ও কথাশিল্পী : মোহিত কামাল

সাহিত্যে তিনি শুধু নোবেলই জয় করেননি, তার আগে অর্জন করেছেন বুকার পুরস্কার (২০১৬), বিখ্যাত ফরাসি পুরস্কারও। নোবেল জয়ের কয়েক দিনের মধ্যে তাঁর ১০ লাখ বই বিক্রি হয়ে যায়। খুব সাধারণ উদাহরণ নয় এটি। তাঁর লেখার গুণগত মানটা আবিষ্কার করাও সাহিত্যপ্রেমীদের আগ্রহের বিষয় বলে মনে করি। বই বেশি বিক্রি হলে তাঁকে ‘জনপ্রিয় লেখক’ বলে তকমা দিয়ে হেয় করার প্রবণতা প্রচলিত আছে সাহিত্যজগতে। সেই নির্লজ্জ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে ঈর্ষা-হিংসার ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদের অহংবোধ ও পাণ্ডিত্য নিজের মধ্যে সংযত রেখে প্রকৃত সাহিত্য-বোদ্ধারা সাহিত্যের মূল রসটা আবিষ্কার করবেন―এমনটাই প্রত্যাশা করেন সাধারণ লেখক-পাঠক। যে কোনও সৃষ্টিশীল কাজ শতভাগ শুদ্ধ হবে, শতভাগ সবার মন রক্ষা করবে, তা নয়। তবে সৃষ্টিশীলতার সর্বোচ্চ নির্যাসটুকু অনুসন্ধান করে তা বের করতে হবে এবং তার আলোচনা করতে হবে। প্রশংসাযোগ্য বিষয় নিয়ে কথা বলা অবশ্যই  মানুষের মহৎ গুণ, হেয় বা নিন্দা করা নয়।

হান কাংয়ের নোবেলপ্রাপ্তির পরপরই আমাদের দেশের কয়েকজন সাহিত্যবোদ্ধা তাঁর সাহিত্যের মান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন, ‘তেমন কিছু হয়নি’, ‘হালকা মানের লেখা’ ইত্যাদি মন্তব্য করেছেন। মনে হয়েছে তাঁরা গুণীজন হয়েও মূল সাহিত্যের ভেতরে প্রবেশ না-করে নিজেদের ভালো-মন্দ প্রজেক্ট করেছেন। সেটা তাঁদেরই দৃষ্টিভঙ্গি।

কিন্তু একজন ক্ষুরধার পাঠক নিশ্চয়ই ধীরে ধীরে নোবেল কমিটির বিচারকদের বিজয়ীর সাহিত্য-মূল্যায়নের অর্থ অনুধাবন কিংবা বোঝার চেষ্টা করবেন। সেখান থেকে নিজের বোধ-বুদ্ধি মিশিয়ে গভীর ও বিস্তৃত পাঠের মাধ্যমে তা অন্যের সামনে তুলে ধরবেন।

বই বিক্রির প্রত্যাশিত স্রোত-প্রবাহ দেখে বোঝা যাচ্ছে নেট কিংবা মোবাইলে ডুবে থাকলেও বিশ্বজুড়ে বই পড়ার হার বাড়ানো যাবে। কমবে না। জীবনঘনিষ্ঠ, অন্তর্ভেদী, কাব্যময় মনোজাগতিক গদ্যসাহিত্য/কাব্য রচনার মধ্য দিয়ে তা অর্জন করা সম্ভব।

হান কাং-এর নোবেল জয়ের পর তাঁর সাহিত্য নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করি শব্দঘর-পরিবারের পক্ষ থেকে।

এই রচনার শুরুতে তার সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো। পরের অংশে থাকবে হান কাংয়ের সাহিত্যের উদ্ধৃতি এবং তাঁর সাহিত্য বিশ্লেষণ।

বিশ্বের ১২১তম নোবেল প্রাইজটি অর্জন করলেন দক্ষিণ কোরিয়ার কথাসাহিত্যিক ৫৩ বছর বয়সি হান কাং। তিনি সাহিত্যে নোবেলপ্রাপ্ত প্রথম এশীয় নারী।

এর আগে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার অর্জন করেছেন : ইম্পসিবল গুডবাই-এর জন্য বিখ্যাত  ফরাসি পুরস্কার আর দ্য ভেজিটারিয়ান উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন বুকার পুরস্কার (২০১৬)।

১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ, ছোটগল্পের সংকলন। তখনই সাহিত্যিক হিসেবে তিনি গৃহীত হন বোদ্ধামহলে, পাঠকের নজর কাড়েন।

কী তাঁর অনন্য সাহিত্যবৈশিষ্ট্য ?

তিনি মনোজগতের কারিগর।

অনুসন্ধিৎসু মনের অধিকারী।

খুঁড়ে খুঁড়ে আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন মানবজীবনের নানা অজানা দিক। তাঁর সৃষ্টির সীমানা ব্যাপক। নির্দিষ্ট গণ্ডি কিংবা ছকে বেঁধে ফেলা যায় না তাঁর জীবনঘনিষ্ঠ গভীরতম উপস্থাপনা।

পিতৃতন্ত্রের নানা বিষয়ের সঙ্গে তাঁর সাহিত্যে উঠে এসেছে জঘন্যতম সহিংসতা, দুঃখ-কষ্ট-যাতনা।

সঙ্গীত ও শিল্পকলার প্রতি অনুরাগী তিনি অন্তর্ভেদী লেখক হিসেবে আখ্যা পেয়েছেন।

তাঁর গদ্য তীক্ষè, কাব্যময়।

শক্তিশালী কাব্যিক গদ্যে তিনি ইতিহাসের যন্ত্রণাময় ঘটনার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন, বোঝার চেষ্টা করেছেন, এবং তা পাঠকের জন্য উন্মোচন করে দিয়েছেন। অর্থাৎ ঐতিহাসিক যন্ত্রণাদায়ক বিষয়কে উপজীব্য করে নির্মাণ করেছেন অনন্য সাহিত্য।

ঠুনকো মানবজীবনের ভঙ্গুরদর্শনতত্ত্বও তিনি উপস্থাপন করেছেন। মানুষের দেহ ও আত্মার সংযোগ, জীবিত ও মৃতের যোগাযোগ বিষয়ে ‘কাব্যিক ও নিরীক্ষাধর্মী’ উদ্ভাবক হিসেবে সমসাময়িক গদ্যসাহিত্যে নিজের অবস্থান আলাদা করে তুলতে পেরেছেন।

তাঁর সাহিত্যমূল্য বুঝতে হলে কয়েকটি শব্দের ব্যাখ্যা খোলাসা হওয়া দরকার :

এক. অন্তর্ভেদী

দুই. অনুসন্ধিৎসু

তিন. আত্মা

চার. কাব্যময় গদ্য

বাংলা অভিধান মতে, অন্তর্ভেদী শব্দের অর্থ অন্তর ভেদ করে এমন; মনের গুপ্তভাব জানতে পারে এমন, অন্তর্ভেদী দৃষ্টি।

অনুসন্ধিৎসু লেখক বা পাঠক বা যে কোনও ব্যক্তি এক ধরনের অনুসন্ধানী মনের অধিকারী, যিনি প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা করেন; জ্ঞানের জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠেন―বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে কৌতূহলী মনের অধিকারী হয়ে থাকেন।

আত্মার নানা ব্যাখ্যা আছে। মন আর আত্মা এক নয়।

‘আত্মা’ absolutely an abstract concept. ধর্মীয় বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, আত্মা হচ্ছে দেহের নির্যাস। মৃত্যুর পর তা পৌঁছে যায় মহান আল্লাহর কাছে, স্রষ্টার কাছে।

আর ‘মন’ হচ্ছে প্রত্যক্ষণ, মোটিভেশন বা প্রেষণা, আবেগ, মেমোরি, চিন্তন, কগনিশন, মেধা, বুদ্ধি, বিশ্বাস, মনোভাব―এসব মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ের যোগফল, যার সৃজন উৎস হলো ব্রেন; বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত মানুষের ভেতরের মনোজাগতিক প্রক্রিয়া। বাইরের আচরণে তার প্রকাশভঙ্গি ঘটে।

আমার ধারণা হয়েছে ‘দেহ ও আত্মা’ এবং ‘জীবিত ও মৃতের’ মধ্যে যোগাযোগের বিষয়ে সচেতন হতে গিয়ে হান কাং কাব্যময় অনন্য গদ্যশৈলী উপহার দিয়েছেন বিশ্বসাহিত্যে। সেক্ষেত্রে তাঁর অনুসন্ধিৎসু অন্তর্ভেদী মন বেশি ভূমিকা রেখেছে। এজন্য সাহিত্য বিশ্লেষকরা তাঁকে ‘মনোজগতের কারিগর’ হিসেবে শনাক্ত করেছেন কিংবা উপাধি দিয়েছেন।

মনে হয়েছে ক্রিয়েটিভ imagination বা সৃজনশীল কল্পমেধা স্বতঃস্ফূর্ত ঢঙে ব্যবহার করার কারণে তাঁর গদ্যে শক্তিশালী কাব্যসত্তার উদগীরণ ঘটে গেছে। এজন্য হান কাং বিশ্বের বাঘা বাঘা বিচারকদের চোখে নতুন আলো ঢেলে দিতে পেরেছেন―এটাও হতে পারে সৃজনশীল কাব্যময় গদ্যের একটি ব্যাখ্যা।

মুগ্ধতা!

নোবেল প্রাইজ কমিটি থেকে ফোন করা হয়েছিল হান কাং-কে!

কী বিনয়ী ভাষায় কী অসাধারণ কথা বলেন তিনি! বিশ্বজয়ের পরেও আবেগের কী অনন্য নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ছড়িয়ে দিলেন মধুর স্বরে।

এটুকু বলা যায় অহংকারকে তুলোর মতো উড়িয়ে দিয়ে নম্রতা এবং প্রাজ্ঞতার বিজয়ধ্বনি ওয়েবের মাধ্যমে তিনি ছড়িয়ে দিলেন বিশ্বজুড়ে!

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তা বিশ্লেষণ করে বলা যায়: She has expressed her achievement with high Emotional Intelligence (EQ) which is controlled and reflecting her inner soothing and intellectual status of mind!

‘দেহ ও আত্মা’ এবং ‘জীবিত ও মৃতের’ মধ্যে যোগাযোগের বিষয়ে সচেতন হতে গিয়ে হান কাং কী কাব্যময় গদ্যশৈলী উপহার দিয়েছেন ? তাঁর অনুসন্ধিৎসু অন্তর্ভেদী মনের সন্ধান আমরা কীভাবে পাব তার গদ্যশৈলীর ভেতর থেকে ?

উদ্ধৃতি ১

এ প্রসঙ্গে হান কাংয়ের দ্য হোয়াইট বুক থেকে উদ্ধৃতি দিতে চাই। (অনুবাদক : বাংলা, অহ নওরোজ। ইংরেজি : দেবোরোহ, স্মিথ)

“নবজাতকের গাউন

আমাকে বলা হয়েছিল, আম্মার প্রথম সন্তান জন্মের মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই মারা যায়।

আরও বলা হয়েছিল, নবজাতকটি ছিল মেয়ে, তার মুখ ছিল অর্ধচন্দ্রাকার পুলিপিঠার মতো সাদা। দুমাসের প্রিম্যাচিওর হলেও ছোট্ট মেয়েটির আকার পুরোপুরি বোঝা যাচ্ছিল। মা বলছিল, যে মুহূর্তে শিশুটি দুটি কালো চোখ খুলে আমার মুখের দিকে তাকিয়েছে, সে মুহূর্তের কথা আমি কখনও ভুলতে পারব না।

তখন আমার বাবা-মা গ্রামাঞ্চলে প্রাইমারি স্কুলের কাছে একটি বাড়িতে থাকত। বাড়িটি লোকালয় থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল। বাবার চাকুরি ওই স্কুলে। ডাক্তারের কথানুসারে তখন ডেলিভারির দিন অনেক বাকি, ফলে মা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত। এক সকালে হঠাৎ তার ব্যথা ওঠে, জল ভাঙে। আশেপাশে কেউ নেই। গ্রামের একমাত্র টেলিফোন বাসস্টপের পাশে একটি ছোট দোকানে―মিনিট বিশেক দূরে। অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে বাবার আরও ছয় ঘণ্টা বাকি।

শীত তখন সবে শুরু, বছরের প্রথম তুষার পড়তে শুরু করেছে। আমার ২২ বছর বয়সী মা অর্ধশোয়া অবস্থায় পা টানতে টানতে রান্নাঘরে ঢোকে, দুটো কাঁচি জীবাণুমুক্ত করার জন্য কিছু জল ফোটায়, তারপর সেলাইয়ের বাক্স হাতড়িয়ে নবজাতকের গাউন তৈরির জন্য কিছু কাপড় খুঁজে পায়। কাপড়ের রং শ্বেতশুভ্র। একদিকে প্রচণ্ড ভয় আর ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে অন্যদিকে তার হাতের সুই চলছে, চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে ঝরঝরিয়ে। ছোট্ট গাউন বানানো শেষ হয়। হাতের কাছে পাওয়া যায় পাতলা একটা কম্বল; ব্যান্ডেজ হিসেবে কাজে লাগবে। যতবার ব্যথা বাড়ে সে দাঁতে দাঁত চেপে রাখে। ব্যথা বাড়ে, আরও তীব্র হয়।

অবশেষে ডেলিভারি হয়। এখনও সে একা, নিজেই নাড়ি কেটে ফেলে। কাঁপতে থাকা রক্তাক্ত ছোট্ট দেহটাকে গাউন পরিয়ে বাহুর ভেতরে জড়িয়ে ধরে। ‘খোদার দোহাই, মরে যেও না’, সরু গলায় মন্ত্রের মতো সে অবিরাম বিড়বিড় করতে থাকে। এভাবে ঘণ্টাখানেক কেটে যাওয়ার পর শিশুটির আঁটসাঁট চোখের পাতা হঠাৎ খুলে যায়। তখনই মায়ের সঙ্গে তার প্রথম দেখা হয়। ঠোঁট আবারও কেঁপে ওঠে, ‘খোদার দোহাই, মরে যেও না’। এর প্রায় আরও এক ঘণ্টা পর নবজাতক চলে যায়। তারা রান্নাঘরের মেঝেতে পড়ে থাকে। আমার মা ছোট্ট মৃতদেহটাকে বুকের কাছে তবু জাপটে ধরে রাখে। তার মনে হতে থাকে ধীরে ধীরে মাংসের ভেতর দিয়ে হাড়ের মজ্জায় ঠান্ডা ছড়িয়ে পড়ছে। কোথাও কোনও ক্রন্দন নেই।”

বিশ্লেষণ

আমরা লক্ষ করি, কথকের মায়ের প্রথম সন্তান জন্মের মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে মারা যায়। পুরো ঘটনার যে উপস্থাপনা তা আমাদের ভেতরের সত্তাকে সমূলে নাড়িয়ে দেয়, চেতনাবোধে প্রচণ্ড এক ঝাঁকি দেয়। একই সঙ্গে লেখকের অন্তর্ভেদী অনুসন্ধিৎসু মনের ভেতর লুকোনো শক্তিশালী আত্মার চোখ ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের চেয়েও স্বচ্ছভাবে পাঠকের চোখের সামনে তুলে ধরে। পাঠকের অন্তর্জগৎ কাঁপিয়ে দেয়। কথক এখানে লেখক। উত্তম পুরুষে আখ্যানটুকু নির্মিত হয়েছে। মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে যাদের ধারণা কম তারা হয়তো বলবেন, লেখক এখানে আবেগের ছড়াছড়ি ঘটিয়েছেন। কিন্তু অনুসন্ধানী পাঠক লক্ষ করবেন এখানে লোকালয়ের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন একটি বাড়ির ভেতরের কী জরুরি অবস্থা তৈরি হয়েছে তা সহজ কথায় বাহুল্য বর্জন করে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেই ঘটনা এতই মর্মভেদী যে পাঠকের বোধের মধ্যে তীব্রভাবে নাড়া দেয়, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেতিবাচক আবেগ, কষ্টের অনুরণন ছড়িয়ে দেয়, সঙ্গে ভয়ও। এটাই হচ্ছে ঘটনার সৃষ্টিশীল উপস্থাপনা; আবেগ জাগানিয়া সস্তা কোনও ঘটনার বর্ণনা নয়। উপস্থাপনার কারণে মৌলিক আবেগ জোয়ারের ঢেউয়ের মতো জেগে ওঠে, পাঠকমন প্লাবিত করে দেয়। এটাই হচ্ছে আবেগের শৈল্পিক প্রকাশ। সাহিত্যসৃজনে এই শিল্প  মহামূল্যবান অলংকার।

প্রসঙ্গক্রমে আমরা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের দুটি গল্পের ছোট্ট দুটি অনুষদ উল্লেখ করতে পারি : পোস্ট্মাস্টার চলে যাচ্ছেন। নৌকার পাল উঠে গেছে। অথচ রতন বাড়ির চারপাশে ঘুরছে। ঘুরছে! কী আশায়? যাবার সময় পোস্ট্মাস্টার কিছু অর্থ দিতে চেয়েছিলেন। রতন তা ফিরিয়ে দিয়েছে। অর্থের বিনিময়ে সে মমতা বিকিয়ে দেয়নি! ছোট্ট ঘটনার ভিতর দিয়ে মৌলিক আবেগের জোয়ার জাগে পাঠকের মনে। পাঠক আর কেবল পাঠকই থাকেন না; রতন হয়ে যান। রতনের মধ্যে বিলীন হয়ে রতনের কষ্টে আচ্ছন্ন হয়ে ছল ছল করে কেঁদে ওঠেন। শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ চরিত্রের একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে ‘রতন’ চরিত্রটি।

‘ছুটি’ গল্পের শেষ কয়েকটি লাইনে আমরা দেখি অতি জ্বরের ঘোরে ডুবে গেলেও মায়ের উপস্থিতি টের পেয়ে ফটিক প্রশ্ন করছে, ‘আমার ছুটি হয়েছে মা?’

কোন ছুটির কথা বলছে ফটিক ? স্কুলছুটি, না কি জীবনের ছুটি ? লেখক খোলাসা করেননি। কিন্তু পাঠকহৃদয় উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। আবেগের ঘোরে ডুবে যায়।

এসব হচ্ছে সাধারণ ঘটনার মধ্য দিয়ে অনির্বচনীয় জীবনবোধ সৃজন করার উদাহরণ, মনস্তাত্ত্বিক ঐশ্বর্য।

প্রিয় পাঠক, আসুন আরেকটু এগিয়ে যাই। হান কাংয়ের আখ্যানের আরও দুই/চারটি বাক্য কিংবা শব্দের ব্যাখ্যা করি।

লেখক নবজাতকের মুখটি তুলনা করছেন : ‘অর্ধচন্দ্রাকার পুলিপিঠার মতো সাদা’।

আরও দেখুন : … শিশুটির আঁটসাঁট চোখের পাতা হঠাৎ খুলে যায়, তখনই মায়ের সঙ্গে তার প্রথম দেখা হয়। ঠোঁট আবারও কেঁপে ওঠে, ‘খোদার দোহাই, মরে যেয়ো না।’

মাতৃত্বের এই চিরন্তন সত্যের উজ্জ্বল উদ্ভাস দেখার সুযোগ ঘটে আমাদের। মা যেমন ভুলতে পারবেন না হঠাৎ খুলে যাওয়া শিশুটির দুটি কালো চোখ, তারপর হারিয়ে যাওয়া, পাঠকও অনিবার্যভাবে নিজের চোখ দিয়ে দেখবেন শ্বেতশুভ্র কাপড়ের গাউন পরা সেই দৃশ্য। মায়ের মতোই তাঁদের অন্তরের ভেতর থেকে জেগে উঠবে আত্মার স্বর। সে স্বর সংযোগ ঘটিয়ে দেবে নবজাতক অথচ মুহূর্তেই মৃত শিশুটির কথা। কোথাও ক্রন্দন নেই। অথচ এক ঐশ্বরিক জগতের ভেতর থেকে মা ধীরে ধীরে অনুভব করতে থাকেন তার মাংসের ভেতর দিয়ে হাড়ের মজ্জায় ঠান্ডা ছড়িয়ে পড়ছে।

বর্ণনাটিতে নীরব কান্নার স্নায়ুবাহিত অনুভূতি পাঠকের পুরো সত্তা কাঁপিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ঐশ্বরিক অনুভব জাগিয়ে তোলে! কী মহান শিল্প দেখার সুযোগ ঘটে আমাদের মর্মচোখে।

‘মানুষের দেহ ও আত্মার সংযোগ, জীবিত ও মৃতের যোগাযোগ বিষয়ে কাব্যিক ও নিরীক্ষাধর্মী’ উদাহরণটিকে আমরা আরেকটু দীর্ঘ করতে পারি। তাঁর সাহিত্যে এমন প্রবণতা রয়েছে বলে  নোবেল- বিচারকমণ্ডলী স্বীকার করেছেন। হান কাংয়ের পুরো সাহিত্যসম্ভার পড়ার সুযোগ না ঘটলেও এইখানে উদ্ধৃত দ্য হোয়াইট বুক থেকে আরেকটু আখ্যানের আলোকে আমরা আরও তলিয়ে দেখতে পারি।

উদ্ধৃতি ২

“চন্দ্রাকার পুলিপিঠা

গত বসন্তে একটি রেডিওর সাক্ষাৎকারে একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, আপনি যখন ছোট ছিলেন তখন কোনও অভিজ্ঞতা আপনাকে দুঃখের কাছে এনেছিল ?

সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে মায়ের কাছে শোনা এই ঘটনাই আমার মনে এল। আমি এই গল্পের ভেতরেই বড় হয়েছি। চন্দ্রাকার পুলিপিঠার মতো সাদা ছোট্ট শিশু, সে যেখানে মরে গিয়েছে সেখানেই আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা।

‘চন্দ্রাকার পুলিপিঠা’র অর্থ আমি প্রথম বুঝি মায়ের সঙ্গে বসে উৎসবের জন্য চালের পিঠা তৈরির সময়। তখন আমার বয়স ছয়, পিঠা তৈরিতে সাহায্যের জন্য যথেষ্ট বড় আমি। ময়দা পাকিয়ে ছোট ছোট অর্ধচন্দ্র বানাচ্ছিলাম। ভাপানোর আগে, চালের ময়দার ওই উজ্জ্বল শুভ্র অর্ধচন্দ্রগুলো এত সুন্দর মনে হতো যে, ওগুলো যেন এই পৃথিবীর নয়। কিন্তু যখন সেগুলো থালায় করে চিকন পাইন পাতায় সাজিয়ে পরিবেশন করা হতো, তখন সেই অনিন্দ্য সুন্দর পিঠাগুলো স্বাভাবিক ও সাধারণ খাবারে পরিণত হতো। এরপর পিঠাগুলো যখন তিলের তেলে ভেজে উঠানো হতো সেগুলো ঝলমল করত ঠিকই, খেতে সুস্বাদু হতো ঠিকই, কিন্তু হারিয়ে যেত তার জাদুকরী আলো।

এখন বুঝি ‘পুলিপিঠার মতো সাদা’ বলতে মা কী বোঝাতো―চমকে ওঠার মতো একটি অপ্রস্তুত মুখ। এইসব ভাবনাই আমার হৃদয় লোহার মতো কঠিন করে দিয়েছিল।”

বিশ্লেষণ

‘চন্দ্রাকার পুলিপিঠা’র মতো সাদা ছোট্ট শিশু যেখানে জন্ম হয়েছে, যেখানে মারা গেছে, সেখানেই বড় হয়েছেন কথক কিংবা লেখক। ছয় বছর বয়স থেকে উৎসবের সময় মাকে পুলিপিঠা বানানোয় সহায়তা করতে শুরু করেছিলেন তিনি।

‘পুলিপিঠার মতো সাদা’―তিন শব্দের বাক্যটি তার হৃদয় লোহার মতো কঠিন করে দিয়েছিল।

পিঠার সঙ্গে সাদৃশ্যময় মৃত শিশুর মুখ চমকে ওঠার মতো একটি অপ্রস্তুত মায়ের মুখ ফুটিয়ে তোলে। তা মৃত শিশুটির অস্তিত্ব এবং আত্মার সংযোগ ঘটিয়ে দেয়, যেমন মায়ের আত্মার সঙ্গে, তেমনি লেখকেরও। বাহিরের উদ্দীপক, ‘কিউ’ বা এক্সটার্নাল স্টিমুলাস হিসেবে মস্তিষ্কের স্মৃতিঘরে সংরক্ষিত নিউরনের সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে দেয়! ক্রোমোজোমের মধ্যে সংরক্ষিত ডিএনএর ভেতর থেকে পুরো ঘটনাকে জীবন্ত আর বাস্তব করে তোলে এই ‘কিউ’। ‘চন্দ্রাকার পুলিপিঠা’― সাহিত্যের তুলনামূলক এই উপমাকে মনস্তাত্ত্বিক মতবাদের সঙ্গে একাকার করে দিয়ে সফলভাবে ব্যবহার করেছেন হান কাং।

মরে গেলেও আমরা মরি না, ভালোবাসার মানুষের হৃদয়ের বা আত্মার স্বর হিসেবে বেঁচে থাকি। এই সংযোগ কেবল অনুভবের নয়, এই সংযোগ বাস্তবতার উজ্জ্বল সংযোগেরও। এই সংযোগটা হান কাংয়ের সাহিত্যে আর কাব্যে উন্মোচিত করেছেন নোবেল পরিষদের বিচারকমণ্ডলী।

আমরা কষ্ট না-পেয়ে বড় হতে চাই। আঘাত না-পেয়ে বড় হতে চাই। দুঃখ না-পেয়ে বড় হতে চাই। বড় হই। হঠাৎ করে কোনও ঘটনা ঘটলে, দুঃখ পেলে, আমরা ভেঙে পড়ি, বিধ্বস্ত হয়ে যাই। দিশাহার হয়ে যাই। যারা অল্প আঘাত পেয়ে পেয়ে বড় হয়, হঠাৎ সৃষ্ট মর্মান্তিক ঘটনাও তাদের মধ্যে কষ্টের সহনশীলতা বাড়িয়ে তোলে, তারা ভেঙে পড়ে না, বিধ্বস্ত হয় না, বরং পাথরের মতো শক্ত আর কঠিন হয়ে, আলোকিত হয়ে সেই সংকটকে মোকাবিলা করে, করতে পারে। নিজের মাথা উঁচিয়ে রেখে চলতে পারে। এটাই হচ্ছে মনস্তত্বের গূঢ় এক রহস্য। হান কাং সৃষ্ট চরিত্রের এসব নানা মনস্তাত্ত্বিক বিষয় বিশ্লেষণ করে বলা যায়, তিনি সত্যিই মনোজগতের শব্দ-কারিগর, অনুসন্ধিৎসু আর অন্তর্ভেদী মনের শব্দ-চিত্রকর, দেহ-আত্মা ও জীবিত-মৃতের মধ্যে সংযোগকারী শব্দ-জাদুকর।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, অধ্যাপক সাইকোথেরাপি, বাংলা একাডেমি ফেলো

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button