আর্কাইভপ্রবন্ধ

নিবন্ধ : চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণের ৫০০তম আসরপূর্তি উপলক্ষে : চর্যাপদ পুনর্জাগরণ উৎসব ২০২৪ : গৌতমচন্দ্র বর্মন

চর্যাপদ বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রাচীনতম ভাবসম্পদ। বাংলাদেশের মাটি চর্যাপদের উৎসভূমি হিসেবে স্বীকৃত। পালবংশের দ্বিতীয় রাজা শ্রীধর্মপাল দেবের রাজত্বকালে ৭৮১-৮২১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে গড়ে ওঠা প্রাচীন সোমপুর মহাবিহার বা ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারে চর্যাপদের শ্রেষ্ঠ কবি কাহ্নপা ও বিরূপা অধ্যাপনা করতেন বলে জানা যায়। মূলত এই প্রাচীন বিহার থেকে চর্যাপদের সংস্কৃতি তথা সঙ্গীত, নৃত্য, নাট্য ও সাধনার ধারা পুরো ভারতবর্ষ ছাড়িয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এখনও অনেক দেশে চর্যাপদের সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত পরিবেশনরীতি, সাধন-পদ্ধতি চর্চিত হলেও বাংলাদেশের জনসংস্কৃতি থেকে চর্যাপদের জীবন্ত পরিবেশনাশিল্পের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। সেই বিলুপ্ত সংস্কৃতির পুনর্জাগরণে উদ্যোগী হয়ে ভাবনগর ফাউন্ডেশন ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (বাংলা একাডেমির প্রবেশদ্বারের ঠিক বিপরীতে) ভাবনগর সাধুসঙ্গের প্রবর্তন করে।

প্রথম দিকে প্রতি সপ্তাহে দুইদিন করে, সোমবার ও বুধবার এই সাধুসঙ্গ অনুষ্ঠিত হতো, পরবর্তীকালে প্রতি সপ্তাহের বুধবার বিকাল ৫টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়ম করে আদি পদ্ধতিতে ভাবনগর সাধুসঙ্গে ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণের আসর অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

ইতোমধ্যে ভাবনগর সাধুসঙ্গের ১০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে এবং অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশের ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণের ৫০০তম আসর। ভাবনগর সাধুসঙ্গের ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণের আসরটি বাংলাদেশের বাউল-ফকির ও সাধক-শিল্পীদের মধ্যে যেমন নতুন একটি উদ্দীপনা সঞ্চার করেছে তেমনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এই আসরটি সম্মানজনক স্থান গ্রহণ করেছে। ভাবনগর সাধুসঙ্গের শিল্পীরা আমন্ত্রিত হয়ে ভাবসাধকদের চর্যাপদের গান পরিবেশন করেছে, বাংলা একাডেমিসহ বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে। এমনকি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও পরিবেশনবিদ্যা বিভাগে ভাবনগর সাধুসঙ্গের সাধক-শিল্পী শাহ আলম দেওয়ান ও বাউল অন্তর সরকার চর্যাপদের গানের প্রশিক্ষণ প্রদানের গৌরব অর্জন করেছেন। শুধু তাই নয়, দেশের সীমারেখা ছাড়িয়ে ভাবনগর সাধুসঙ্গের সাধক-শিল্পী সাধিকা সৃজনী তানিয়া আমেরিকার দি ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর সঙ্গীত বিভাগে চর্যাপদের গানের প্রশিক্ষণ দেবারও গৌরব অর্জন করেছেন। পাশাপাশি তিনি আমেরিকার শিকাগো, জাপানের ওসাকা, নেপালের ললিতপুর এবং ভারতের বহরমপুর, চব্বিশ পরগনা, বীরভূম, কলকাতা প্রভৃতি স্থানে চর্যাপদের গান পরিবেশন করেছেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদেও ভাবনগর সাধুসঙ্গের ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ সম্পর্কে তথ্য উপস্থাপিত হয়েছে। এছাড়া, ভাবনগর সাধুসঙ্গের সাপ্তাহিক সাধুসঙ্গে ভারতের প্রাক্তন কূটনীতিক অধ্যাপক মুচকুন্দে দুবেসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অধ্যাপক-গবেষকগণ অংশগ্রহণ করেছেন। এমনকি ভাবনগর সাধুসঙ্গের ভাবসাধকদের চর্যাপদের গান কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন ফ্রান্সের অধ্যাপক জেরেমি কদ্রন।

 গত ১ মে ২০২৪ ভাবনগর সাধুসঙ্গের ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের ৫০০তম আসরপূর্তি হয়। এ আসরে যোগদানের জন্য জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজের অধ্যাপক ড. মাসাহিকো তোগাওয়া স্ব-উদ্যোগে বাংলাদেশে এসছিলেন। আসরে তিনি বলেন, ‘এটা একটা ইতিহাস, ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণের ৫০০তম আসর অতিক্রম করছে। আমি নিজেও একজন সাধক হিসেবে এই আসর আরও চলতে থাক, আরও এগিয়ে যাক, এই কামনা করি।’

ভাবনগর সাধুসঙ্গের ৫০০তম আসরপূর্তি উপলক্ষে ভাবনগর ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সহযোগিতায় গত ৮ মে থেকে ১০ মে পর্যন্ত ৩দিনব্যাপী ‘চর্যাপদ পুনর্জাগরণ উৎসব ২০২৪’ আয়োজন করে। এই উৎসবের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সাধুসঙ্গে ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের আসর, চর্যাসঙ্গীত শোভাযাত্রা, চর্যাপদ বিষয়ক ৫ঘণ্টাব্যাপী সেমিনার, চর্যাপদ প্রশিক্ষণ কর্মশালা এবং বিভিন্ন স্থান থেকে আগত ভাবসাধকদের চর্যাপদের সঙ্গীতানুষ্ঠান ও চর্যাপদ প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সনদ বিতরণ করা হয়।

ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণের ইতিহাসের একটি পূর্বপ্রেক্ষাপট আছে। খ্রিস্টীয় ঊনবিংশ শতকের অন্তেও আধুনিক শিক্ষিত বাঙালিদের প্রাচীন বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতির নিদর্শন চর্যাপদ সম্পর্কে তেমন কোনও স্পষ্ট ধারণা ছিল না। এই পরিপ্রেক্ষিতের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ইতিহাস নির্মাণের লক্ষ্যে ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজ দরবরের গ্রন্থশালা থেকে চর্যাপদের একটি খণ্ডিত পুঁথি উদ্ধার করেন। তাঁর সংগৃহীত অন্যান্য পুঁথির সঙ্গে চর্যাপদের প্রাচীনতম পাণ্ডুলিপিটি ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে (বাংলা ১৩২৩) সম্পাদনার মাধ্যমে তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা’ নামে প্রকাশ করেন। এই গ্রন্থের ভূমিকাতে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, চর্যাপদের গানগুলো কীর্তনের মতো পরিবেশন করা হতো। পরবর্তীকালে সঙ্গীত-গবেষক রাজ্যেশ্বর মিত্রসহ অনেকে প্রমাণ করেছেন, চর্যাপদ লোকায়ত সঙ্গীত ঐতিহ্যের অংশ ছিল। গবেষকদের এ ধরনের সিদ্ধান্তকে অনুসরণ করে ভাবনগর ফাউন্ডেশন প্রাচীন বাংলার চর্যাপদসমূহ ভাবসাধকদের মধ্যে পুনর্জাগরণে উদ্যোগী হয়।

বাংলার প্রাচীন ও মধ্যযুগের প্রায় সকল সাহিত্যিক নিদর্শন যেমন― পদ্মাপুরাণ, গাজী-কালু-চম্পাবতীর পুথি, রামায়ণ, মহাভারত, শ্রীকৃষ্ণকীর্তনসহ মঙ্গলকাব্যের বিভিন্ন ধারার চর্চা এ দেশের সাধারণ মানুষের ভেতর বিচিত্র পরিবেশনশিল্প- আঙ্গিকে প্রত্যক্ষ করা যায়। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের আদি নির্দশন চর্যাপদের কোনও জীবন্ত পরিবেশনরীতি বাংলাদেশে দৃষ্টিগোচর ছিল না, চর্যাপদ কেবল গৃহীত ছিল উচ্চ শিক্ষায় বাংলা বিভাগের পাঠক্রমের অংশ হিসেবে, কিংবা চাকুরির পরীক্ষার প্রয়োজনীয় তথ্য হিসেবে। এই বিষয়টি লক্ষ করে ভাবনগর সাধুসঙ্গের ভাবসাধক শিল্পীরা চর্যাপদের বাণীতে সুর-সংযোজন করেন এবং লোকায়ত সংস্কৃতির মধ্যে চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ ঘটাতে উদ্যোগী হন। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ভাবনগর সাধুসঙ্গ প্রতি সপ্তাহে নিয়ম করে ঢাকাতে যেমন ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের আসর করে আসছে, তেমনি বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের লোকায়ত শিল্পীদের মধ্যে, এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চর্যাপদের গানের সাঙ্গীতিক রূপ ছড়িয়ে দিতে প্রশিক্ষণ কর্মশালা পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে চর্যাপদের উৎসভূমি ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার এলাকাসহ কিশোরগঞ্জ, ঝিনাইদহ, পাবনা, কুমিল্লা, চুয়াডাঙ্গা, সুনামগঞ্জ, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, মানিকগঞ্জ প্রভৃতি জেলায় গড়ে উঠেছে ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণের কেন্দ্র। প্রতিটি কেন্দ্রেই বহু লোকায়ত সাধকশিল্পী নিয়মিতভাবে চর্যাপদের গানের চর্চা করে আসছেন।

চর্যাপদ পুনর্জাগরণ উৎসব ২০২৪-এর আদি-অন্ত

ভাবনগর ফাউন্ডেশন গত ৮ মে ২০২৪ তারিখ বিকাল সাড়ে ৫টায় ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (বাংলা একাডেমির প্রবেশদ্বারের বিপরীতে) ভাবনগর সাধুসঙ্গের ৫০১তম আসরের মাধ্যমে চর্যাপদ পুনর্জাগরণ উৎসবের সূচনা করে। সাধুসঙ্গের শুরুতে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধকশিল্পীদের মধ্যে বরিশালের শাহ আলম দেওয়ান, মাদারীপুরের ইউসুফ মিয়া, মানিকগঞ্জের বাউল অন্তর সরকার, পটুয়াখালীর ফকির আনিস মুন্সী, কিশোরগঞ্জের জাকির চিশতি, সিদ্দিক ফকির, উজ্জ্বল মিয়া, জিল্লুর সরকার, সুনামগঞ্জের মনীন্দ্র দাস, শরিয়তপুরের শিলা মল্লিকসহ সাধিকা সৃজনী তানিয়া প্রমুখ সমবেত কণ্ঠে যথাক্রমে লুইপা রচিত চর্যাপদের প্রথম পদ ‘কাআ তরুবর পঞ্চবি ডাল’, ভাবনগর সাধুসঙ্গের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণের নিয়ে সাধক কবি ইউসুফ মিয়ার রচিত ‘সাধুর ভাব জেনে নাও ভাবনগর যাও’ এবং কাহ্নপা রচিত চর্যাপদের ৭সংখ্যক পদের সমকালীন রূপান্তরিত গীতবাণী ‘হাওয়া দমের পথ বন্ধ কেন হয়’ গান ৩টি পরিবেশন করেন। গান পরিবেশনের ফাঁকে চর্যাপদ পুনর্জাগরণ উৎসব ২০২৪-এর প্রধান অতিথি আমেরিকান ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির রিলিজিয়াস স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. রেবেকা জে মানরিং-কে তাজা ফুলের মালা পরিয়ে বরণ করে নেন ভাবনগরের সভাপতি ড. সাইমন জাকারিয়া। ভাবসাধকদের পাশাপাশি সাধুসঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন বাংলাদেশ ফিল্ম আরকাইভের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. মোফাকখারুল ইকবাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. রবিউল ইসলাম, প্রাচ্য-চিত্রকলা অনুশীলন সংঘের উপদেষ্টা ও বুক ডিজাইনার মিখাইল আই ইসলাম, প্রথম আলোর সাংবাদিক সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম, ভাবনগর ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক নূরুননবী শান্ত, কবি শাহেদ কায়েস, কবি ও সুফি সাধক নজরুল ইশতিয়াক, আবৃত্তি শিল্পী সানজিদা স্মৃতিসহ বিভিন্ন স্তরের বিশিষ্টজন ও মিডিয়াকর্মীগণ।

চর্যাপদ পুনর্জাগরণ উৎসবের দ্বিতীয় পর্বে ভাবনগর সাধুসঙ্গ চত্বর থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রাকৃতিক পরিবেশের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রাঙ্গণ পর্যন্ত চর্যাসঙ্গীত শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত চর্যাসঙ্গীত শোভাযাত্রায় বাংলাদেশের সাধকশিল্পীদের সঙ্গে যোগদান করেন প্রধান অতিথি রেবেকা জে. মানরিং। শোভাযাত্রায় দেশীয় বাদ্যযন্ত্র একতারা, দোতারা, সারিন্দা, ঢোল, খঞ্জনি, প্রেমজুড়ি, করতাল বাজিয়ে পায়ে হেঁটে উচ্চ স্বরে নেচে নেচে ভাবসাধকশিল্পী ও অংশগ্রহণকারীরা একে একে চর্যাপদের প্রথম পদ ‘কাআ তরুবর’সহ ‘বিশ্বকে ছড়াইয়া দেবো চর্যাপদের গান’ এবং ‘হাওয়া দমের পথ’ গেয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রকৃতিকে মাতিয়ে তুলেছিলেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত প্রায় অর্ধশতাধিক সাধকশিল্পী, বাদ্যযন্ত্রী, গবেষক, সংগঠকের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীদের অনেকে চর্যাসঙ্গীত শোভাযাত্রাকে প্রাণবন্ত করে তোলেন। চর্যাসঙ্গীত শোভাযাত্রাটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটের সম্মুখভাগের গেট দিয়ে বের হয়ে দক্ষিণ দিকের ফুটপাথ দিয়ে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের প্রাচীর ঘেষে মৎস্যভবনের সামনে দিয়ে জাতীয় সঙ্গীত, আবৃত্তি ও নৃত্যকলা ভবনের প্রবেশপথ দিয়ে  বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ভেতরে প্রবেশ করে। শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী শিল্পী-বাদ্যযন্ত্রীদের চর্যাপদের গানের সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণ। জাতীয় নাট্যশালা ভবনের ষষ্ঠতলায় সেমিনার কক্ষে গিয়ে চর্যাসঙ্গীত শোভাযাত্রাটি সমাপ্ত হয়। সেখানে অতিথি আপ্যায়নের দেশীয় ঐতিহ্য অনুসারে সবাইকে লেবুর শরবত, খই-মুড়ি, খুরমা, বাতাসা প্রভৃতি দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়।

সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সেমিনার কক্ষে শুরু হয় চর্যাপদ পুনর্জাগরণ উৎসব ২০২৪-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আমেরিকান ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি-ব্লুমিংটনের রিলিজিয়াস স্টাডিজের অধ্যাপক ড. রেবেকা জে. মানরিং। সম্মানিত ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যথাক্রমে গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির মাননীয় উপাচার্য ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান ও চর্যাপদ পুনর্জাগরণ উৎসব ২০২৪-এর উপদেষ্টা মিখাইল আই ইসলাম। সূচনা বক্তব্য প্রদান করেন ভাবনগর ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক নূরুননবী শান্ত এবং সভাপতিত্ব করেন ভাবনগর ফাউন্ডেশনের সভাপতি ড. সাইমন জাকারিয়া।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শুরুতে চর্যাপদের ৪৯সংখ্যক ‘বাজ ণাব পাড়ী পঁউআ খাল বাহিউ / অদঅ বঙ্গালে দেশ লুড়িউ’ গানটি একতারা-বায়া ও ঘুঙুর সহযোগে আদিভাষায় মল্লারী রাগে পরিবেশন করেন সাধিকা সৃজনী তানিয়া। এরপর আমন্ত্রিত প্রধান অতিথি, সম্মানিত অতিথি, বিশেষ অতিথি, সূচনা বক্তা ও সভাপতিকে কাঁচা ফুলের মালায় বরণ করে নেওয়া হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য প্রদান করেন ভাবনগর ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক নূরুননবী শান্ত। তিনি ভাবনগর ফাউন্ডেশন আয়োজিত ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণের ৫০০তম আসরপূর্তি উপলক্ষে চর্যাপদ পুনর্জাগরণ উৎসব ২০২৪ আয়োজনের প্রেক্ষাপট এবং ৩দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য প্রদান করেন। সেই সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, ভাবনগর ফাউন্ডেশন এই চর্যাপদ পুনর্জাগরণ উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গীত-সাংস্কৃতিক ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা করল। বাংলাদেশের ভাবসাধকগণ যে প্রকৃত অর্থে চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন এই উৎসবের ভেতর দিয়ে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। কেননা, এই উৎসবে প্রাচীন বাংলার চর্যাপদের গানের উৎসভূমি সোমপুর মহাবিহার তথা ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের শিল্পীরা যেমন চর্যাপদের গান পরিবেশন করবেন, তেমনি কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, ঝিনাইদহ, মানিকগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, বরিশাল, শরিয়তপুর, মাদারীপুর প্রভৃতি জেলার সাধকশিল্পীরাও চর্যাপদের গান পরিবেশনের পাশাপাশি চর্যাপদ প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশগ্রহণ করবেন।

সম্মানিত অতিথি ড. আনিসুজ্জামান বলেন, আমি এসেছি ভাবসাধকদের এই বিশাল ও বিপুল কর্মউদ্দীপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে। আমাদের দেশের ঐতিহ্যগত জ্ঞান, সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অমিয়ভাণ্ডার চর্যাপদ। কিন্তু চর্যাপদের গানের তো কোনও জীবন্ত রূপ বাংলাদেশে চলমান ছিল না, আমি যখন জানতে পারলাম ভাবনগর ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বাংলাদেশের ভাবসাধকেরা এই গানের পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছেন তখন আমার নৈতিক দায়িত্ব মনে করেছি এই সাধকদের উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করা। ভাবনগর সাধুসঙ্গের ৫০০তম আসরপূর্তি ঘটেছে, আমার বিশ্বাস এই আসর আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাবে, আরও বেশি মানুষকে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হবে।

শুভেচ্ছা বক্তা মিখাইল আই ইসলাম বলেন, বর্তমান পৃথিবীতে নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে যেমন যুদ্ধ, ধ্বংসযজ্ঞ, পরিবেশ বিপর্যয়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের বৌদ্ধ দর্শন ও সাধনার কাছে ফিরে যেতে হয়। চর্যাপদের গানের ভেতর আদি বৌদ্ধ দর্শন ও সাধনার মন্ত্র লুকিয়ে আছে। তাই চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণকে আমাদের আরও গুরুত্ব দিতে হবে।

তাঁর বক্তব্যের পর চর্যাপদের ৫০সংখ্যক পদের সমকালীন বাংলায় রূপান্তরিত গীতবাণী ‘গগনে গগনে ওই তো গগনে তোমার তৃতীয় বাড়ি’ পরিবেশন করেন ভাবনগর সাধুসঙ্গের শিল্পী শিলা মল্লিক। তাঁর সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রে সহযোগিতা করেন বাউল অন্তর সরকার, মণীন্দ্র দাশ, জ্ঞানহীন নাইম, জাকির চিশতি, আনিচ মুন্সীসহ অনেকে।

এরপর, চর্যাপদ পুনর্জাগরণ উৎসব ২০২৪ উপলক্ষে প্রকাশিত উৎসব-স্মারক ‘ভুসুকু বঙ্গালী’র মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ও সভাপতিসহ অন্যান্য আমন্ত্রিত অতিথি ও বক্তাবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। উৎসব-স্মারক ‘ভুসুকু বঙ্গালী’তে বাংলাদেশের ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ সম্পর্কে দেশ-বিদেশের ১৫জন খ্যাতিমান গবেষক-অধ্যাপকদের মধ্যে আমেরিকার দি ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর অধ্যাপক দীপেশ চক্রবর্তী, রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইভা লেকারেভা, ভারতের অধ্যাপক অসীমানন্দ গঙ্গোপাধ্যায়, শেখ মকবুল ইসলাম, বাংলাদেশের প্রয়াত অধ্যাপক ও সঙ্গীত তাত্ত্বিক করুণাময় গোস্বামী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর প্রমুখের অভিমত-সমৃদ্ধ প্রবন্ধ-নিবন্ধ, ২জন সাধক-কবির গান এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. পবিত্র সরকারের শুভেচ্ছাবাণী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব খালিল আহমদ, বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর বাণী ও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ প্রসঙ্গে প্রশ্নোত্তর সংকলন করা হয়েছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে ভাবনগর ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ড. রেবেকা জে. মানরিং-কে সম্মান জানিয়ে যথাক্রমে বাংলাদেশের তাঁতিদের হস্ত-পদ চালিত তাঁতে বোনা গামছা, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পোস্টার এবং ক্রেস্ট উপহার প্রদান করা হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে ড. রেবেকা জে. মানরিং বলেন―‘এটাই আমার প্রথমবার চর্যাপদ শোনা। আপনাদের চর্যাগান শুনে আমি অনেক আনন্দ পেয়েছি। খুব ভালো লেগেছে। পুরানো ভাব অনুভব করতে পেরেছি। আপনাদের কাছে এসে আমি খুবই কৃতজ্ঞ।’

সভাপতির ভাষণে ড. সাইমন জাকারিয়া বলেন, বাংলাদেশের ভাবসাধকগণ ভাবনগর সাধুসঙ্গের আহ্বানে সাড়া দিয়ে চর্যাপদের গানকে কণ্ঠে তুলে নিয়ে একদিকে যেমন নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, অন্যদিকে তেমনি আমাদের কৃতজ্ঞ করেছেন। ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের বিস্তার আজ বাংলাদেশের সীমারেখা ছাড়িয়ে আমেরিকার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনেস্কোর গবেষণা প্রতিষ্ঠান জাপানের ওসাকার আইআরসিআই, নেপালের ললিতপুর কাঠমান্ডু, ভারতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। সবখানেই অভিনন্দিত হয়েছে চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণের গানগুলো। আমাদের মূল লক্ষ্য বাংলাদেশের প্রতিটি সাধকশিল্পীর কণ্ঠে চর্যাপদের গান তুলে দেওয়া। কেননা, প্রায় সহস্রাধিক কাল আগে এ দেশের সঙ্গীতের গৌরব অর্জিত হয়েছিল চর্যাপদের গানের কারণে, অথচ এ দেশের সাধকশিল্পীরা চর্যাপদের গানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না, আমরা নতুন করে প্রাচীন ঐতিহ্যকে নবায়ন করতে আগ্রহী। বাংলাদেশের যে সকল ভাবসাধকগণ এই গানের ঐতিহ্যচর্চায় আত্মনিবেদন করেছেন আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি সমাপ্ত হয় সাধিকা সৃজনী তানিয়ার গাওয়া কাহ্নপা রচিত ১০সংখ্যক চর্যাপদ ‘নগর বাহিরি রে ডোম্বি তোহোরি কুড়িআ’ গানটির মাধ্যমে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্টজনদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রাচ্যকলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মলয় বালা, সহকারী অধ্যাপক অমিত নন্দী, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. মোঃ রবিউল ইসলাম, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের শিক্ষক রিফাত মুনমুন, সঙ্গীতগুরু তপন মজুমদার, শান্তিধাম চর্যা চর্চা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আহমদ ফকির, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডর ডেপুটি কমিশনার মো. মারফত আলী, আবৃত্তিশিল্পী সানজিদা স্মৃতি, লেখক নির্বাণ পাল, কবি শাহেদ কায়েস, কবি নজরুল ইশতিয়াক প্রমুখ।

ভাবনগর সাধুসঙ্গের ৫০১তম আসরসহ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রতিটি পর্ব যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন কবি সাইদ হাফিজ ও নাট্য-গবেষক ওয়াহিদা সুলতানা আশা।

চর্যাপদ পুনর্জাগরণ উৎসব ২০২৪-এর দ্বিতীয় দিন ৯ মে বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সেমিনার কক্ষে ‘চর্যাপদের পুনর্জাগরণবিষয়ক সেমিনার’ অনুষ্ঠিত হয়। এই পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, সভাপতিত্ব করেন মঞ্চসারথি আতাউর রহমান।

‘চর্যাপদ পুনর্জাগরণবিষয়ক সেমিনারে’র শুরুতে ভাবনগর সাধুসঙ্গের শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে লুইপা রচিত চর্যাপদের প্রথম পদ ‘কাআ তরুবর পঞ্চবি ডাল’ পরিবেশন করেন।

প্রধান অতিথির ভাষণে কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বলেন, এক হাজার বছর আগে শুধু চর্যাপদ দিয়ে বাংলা ভাষা শুরু হয়নি। পাশেই বাংলা একাডেমিতে গেলেই বর্ধমান হাউজের নিচতলায় ডান দিকের দরজাই ঢুকে বামে তাকালেই উপরে দেখবেন বাংলা ভাষার পরিভ্রমণ পথ। কিন্তু এটাও ঠিক ‘আজি ভুসুকু বঙ্গালী ভইলি’ বলে চর্যাপদে যে উক্তি আছে, সেখান থেকে বাঙালির ইতিহাসকে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই। ভাবসাধকদের মাধ্যমে বাঙালির প্রাচীনতম পরিচয় চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ কার্যক্রম নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

প্রধান অতিথির ভাষণের পর ভাবনগর ফাউন্ডেশন প্রকাশিত ভাবনগর : ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব বেঙ্গল স্টাডিজের ১৭তম খণ্ডের ২০তম সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন করেন প্রধান অতিথি ও সভাপতিসহ সেমিনারের প্রাবন্ধিক, আলোচকবৃন্দ।

সভাপতির ভাষণে মঞ্চসারথি আতাউর রহমান বলেন, চর্যাপদ আমাদের গর্বের অংশ। নেপাল থেকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদ আবিষ্কার করেন। পরে আমাদের দেশের জ্ঞানতাপস ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ চর্যাপদ নিয়ে গবেষণা করেন, অবশ্য আরও অনেকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে চর্যাপদ নিয়ে গবেষণা করেছেন। চর্যাগীতির ভেতর আধ্যাত্মিকতাবাদের কথা রয়েছে। আমরা যতই আধুনিক হই না কেন, আমাদের ভাবতে হবে মাটির কথা, ঐতিহ্যের কথা। ভাবনগর ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে চর্যাপদ পুনর্জাগরণ উৎসব আমাদের সেই ঐতিহ্যের কাছেই ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এখানে আমাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির প্রাচীন ঐতিহ্য ও তার পুনর্জাগরণ নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে, তা আমাদের নিজেদের চিনতে সাহায্য করবে।

সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের আগে সাধিকা সৃজনী তানিয়া বীণাপা রচিত চর্যাপদের ১৭সংখ্যক পদ ‘সূজলাউ সসি লাগেলি তান্তী’র ব্যাখ্যাসহ একতারা, বায়া ও ঘুঙুরের বাদন-সমন্বয়ে পরিবেশন করেন।

সেমিনারে প্রথম প্রবন্ধটি উপস্থান করেন উপমহাদেশীয় সংস্কৃতি প্রসার কেন্দ্র সাধনার শৈল্পিক পরিচালক, নৃত্যশিল্পী ও নৃত্যগবেষক লুবনা মারিয়াম। তিনি ‘ঈযধৎুধ ঘৎরঃুধ : ‘বসনড়ফরবফ শহড়ষিবফমব’ ভৎড়স সবফরবাধষ ইবহমধষ’ শীর্ষক প্রবন্ধে মূলত চর্যানৃত্যের পুনর্জাগরণের প্রাসঙ্গিকতা ও করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করেন। ভিডিও প্রজেক্টরে মাধ্যমে বড় দেওয়ালে প্রদর্শিত পাওয়ার-পয়েন্টে স্থির ও ভিডিও চিত্র সহযোগে তিনি নেপালের কৃত্যমূলক চর্যানৃত্যের সাধন-সংস্কৃতির বিভিন্ন পর্যায় উপস্থাপনের মাধ্যমে বলেন, ‘চর্যানৃত্যে কৃত্যের মধ্য দিয়ে মূলত শরীর আর মনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। নাচ গতিশীল একটা ঘটনা, যেটাকে বলি জীবনের বাস্তব ঘটনা। সারা বিশ্বেই ঐতিহ্যবাহী কৃত্য নিয়ে নাচ আছে। বালাদেশেও কৃত্যমূলক নৃত্যের বহুরূপ প্রচলিত রয়েছে। নিশ্চয় এই নৃত্যের সঙ্গেও প্রাচীন ঐতিহ্যের কোনও না কোনও সম্পর্ক রয়েছে, যা আমাদের অনুসন্ধান করে দেখতে হবে। তা হলে চর্যাপদের গানের মতো চর্যানৃত্যেরও পুনর্জাগরণের নানা সূত্র বেরিয়ে আসতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গৌতম বুদ্ধ ১৪ বছর ধ্যানস্থ হয়ে বললেন যে, পৃথিবীকে সুস্থ করতে হলে প্রয়োজন করুণা। সেই জন্যে বৌদ্ধতত্ত্বে পুরুষতত্ত্ব হলো করুণা, আর নারীতত্ত্ব হলো জ্ঞান। করুণা আর জ্ঞানের যখন সংমিশ্রণ হয় তখন আমরা সত্যকে উপলব্ধি করতে পারি। আমি সবসময় বলি আমাদের দেশ হলো করুণার দেশ। এই আপনারা সাধকেরা আসছেন, আপনারা জানেন, মূল তথ্য হলো করুণা। এই কথাটি প্রথম যে গ্রন্থে লেখা আছে সেটা হলো হেবজ্রতন্ত্র। একটি বৌদ্ধতত্ত্ব। সেটা পরবর্তীকালে আমাদের দেশে থেকে গেছে স্বতন্ত্র একটি দর্শন হিসেবে।’

সেমিনারে ‘ফোকলোর তত্ত্ব, সঙ্গীতনৃবিদ্যা ও ইউনেস্কো কনভেনশনের আলোকে চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ প্রসঙ্গ’ শীর্ষক দ্বিতীয় প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ভাবনগর ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক এবং বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও ফোকলোরতাত্ত্বিক নূরুননবী শান্ত। তিনি বলেন, ‘চর্যাপদ একক কোনও পরিবেশনা শিল্প নয়, বরং সুনির্দিষ্ট মৌলিক কর্মকাণ্ড, এর সঙ্গে সাধনসঙ্গীত, নৃত্য, নাট্য, কৃত্যমূলক পরিবেশনার সমন্বয় রয়েছে, আর একথাও উল্লেখ্য, চর্যাপদে আত্মশুদ্ধি অর্জনের প্রেরণা ও পদ্ধতি ব্যক্ত রয়েছে। আসলে, আত্মশুদ্ধি সাধনার মাধ্যমে মানুষ হয়ে ওঠার পন্থা প্রচীনকালে থেকেই অনুসৃত হতো। বাংলাদেশে চর্যাগান চর্চায় মূলত আত্মশুদ্ধির সেই প্রেরণা লক্ষ করা গেছে। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে মূলত লোকায়ত সুর ব্যবহৃত হলেও শাস্ত্রী সুরকে অবজ্ঞা করা হয়নি। সেই বিচারে চর্যাগানের পুনর্জাগরণের প্রচেষ্টা একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। এই উদ্যোগের তাত্ত্বিক ভিত্তি ফোকলোরতত্ত্ব ও ইউনেস্কোর ইন্টানজিবল কালচারাল হেরিটেজের কনভেশনে সুস্পষ্টভাবে রয়েছে।’

সেমিনারে ‘ভাবসাধকদের চর্যাপদ গানের পুনর্জাগরণের ইতিহাস ও প্রকৃতি’ শিরোনামে তৃতীয় প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ভাবনগর ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও বাংলা একাডেমির উপপরিচালক ড. সাইমন জাকারিয়া। তিনি বাংলাদেশের ভাবসাধকদের মধ্যে চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণের ইতিহাস বর্ণনায় বলেন, ‘২০১৪ খ্রিস্টাব্দে সাংগঠনিকভাবে ভাবনগর ফাউন্ডেশন বাউল-ফকিরদের মধ্যে চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ কার্যক্রম শুরু করে। এই কার্যক্রমে বাংলাদেশের বাউল-ফকির সাধকশিল্পীরা নতুন করে চর্যাপদের গানে সুর-সংযোজন ও পরিবেশনায় অসামান্য কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছেন। এর মধ্যে প্রায় ৬ ধরনের প্রক্রিয়ায় চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ ঘটেছে, যথা―১. লোকায়ত সুরে আদি চর্যাপদের পরিবেশনা, ২. লোকায়ত সুরে সমকালীন ভাষায় প্রাচীন চর্যাপদের রূপান্তরিত গীতবাণীর পরিবেশনা, ৩. লোকায়ত সুরে আদি ও সমকালীন ভাষায় চর্যাপদের পরিবেশনা, ৪. রাগাশ্রয়ী সুরে সমকালীন বাংলায় চর্যাপদের রূপান্তরিত গীতবাণীর পরিবেশনা, ৫. রাগাশ্রয়ী সুরে প্রাচীন চর্যাপদের পরিবেশনা, এবং ৬. রাগাশ্রয়ী সুরে আদি ও সমকালীন ভাষায় চর্যাপদের পরিবেশনা। বাংলাদেশের ভাবসাধকদের মধ্যে প্রাণবন্তভাবে চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ ঘটেছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ কেন্দ্র ভাবনগর সাধুসঙ্গ চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণের ৫০০ আসর সম্পন্ন করেছে। যে আসরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গবেষক, অধ্যাপকদের পাশাপাশি শিল্পীরা অংশ নিয়েছেন এবং চর্যাপদ গানের প্রশিক্ষণও নিয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, চর্যাপদের এক একটি গান বিভিন্ন রাগে পরিবেশনের নতুন ইতিহাস নেপালে প্রাপ্ত বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি ও প্রকাশনায় আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। এছাড়া, নেপালে লোকায়ত সংস্কৃতি চর্যাপদের পরিবেশনায় তেমন কোনও রাগের অনুসরণ করা যায় না।

সেমিনার পর্বে পর পর তিনটি প্রবন্ধ পাঠ শেষে সমকালীন বাংলায় চর্যাপদের ১৭সংখ্যক গান পরিবেশন করেন ভাবনগর সাধুসঙ্গের সাধক শিল্পী শিলা মল্লিক। তাঁর সঙ্গে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে ও সমবেত কণ্ঠ দিয়ে সহযোগিতা করেন―শাহ আলম দেওয়ান, ফকির আবুল হাশেম, বাউল অন্তর সরকার, ইউসুফ মিয়া, আনিস মুন্সী, সিদ্দিক ফকির, উজ্জ্বল ফকির, রোকনউদ্দিন, জ্ঞানহীন নাইম, ফতেহ কামাল, নজরুল ইসলাম রানা প্রমুখ। এরপর ডুগি ও একতারা সহযোগে মল্লারী রাগে ‘করুণ মেহ নিরন্তর ফরিআ’ শীর্ষক চর্যাপদের ৩০ সংখ্যক গানটি এককভাবে আদিভাষায় পরিবেশন করেন সাধিকা সৃজনী তানিয়া।

এরপর শুরু হয় পঠিত প্রবন্ধের ওপর আলোচনাপর্ব। শুরুতেই আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শোয়াইব জিবরান। তিনি বলেন, মুদ্রণ সংস্কৃতি আসার আগে হস্তলিখিত পুথি সংস্কৃতি এবং তারও আগে মৌখিক সাহিত্যের ঐতিহ্য চলমান ছিল। প্রাচীন চর্যাপদ একই সঙ্গে মৌখিক ও লৈখ্য-সংস্কৃতির নিদর্শন। চর্যাপদের পুনর্জাগরণ ভাবসাধকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে ভাবনগর ফাউন্ডেশন এক বিস্ময়কর ভূমিকা পালন করে আসছে। আমি প্রথম থেকেই ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণের কার্যক্রমকে সমর্থন করে আসছি। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে ভাবনগর সাধুসঙ্গের সাধকশিল্পীদের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ আসর অনুষ্ঠান হয়েছে বহু আগেই। আজ ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ কার্যক্রম বিশ্বব্যাপী সম্প্রসারিত হচ্ছে দেখে গর্ব অনুভব করি।

আলোচনায় অংশ নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. গোলাম রাব্বানী বলেন, আমি বেশ কয়েকবার ভাবনগর ফাউন্ডেশনের ভাবনগর সাধুসঙ্গে যোগ দিয়েছি। সেখানে ভাবসাধকদের চর্যাপদের গান শুনে প্রথম থেকে মুগ্ধ ছিলাম। এই মুগ্ধ হবার একটি ঐতিহাসিক কারণ আছে, আমরা দেখেছি বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ইতিহাসবিমুখ। বিশেষ করে চর্যাপদের মতো উচ্চস্তরের ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি ও সাহিত্যের কথা প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ তেমনভাবে জানত না। কিন্তু ভাবনগর ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে প্রাচীন বাংলার চর্যাপদের গান এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের ভাবসাধকেরা কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন। এতে করে বাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের প্রাচীন সূত্রের সঙ্গে আমরা যুক্ত হবার প্রত্যক্ষ একটি সুযোগ পাচ্ছি।

আলোচক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. ইউসুফ হাসান অর্ক বলেন, ‘লুবনা মারিয়াম তাঁর প্রবন্ধে বলেছেন, এতদিন জানতাম, শুনেছি অনেকের আছে―পারফর্মিং আর্ট শরীর দিয়ে শিখতে হয়, শরীর দিয়ে অনুধাবন করতে হয়। ড. আহমদ শরীফ যখন বলছেন যে, সাংখ্য-যোগতন্ত্রের কথা, বা সহজযান বা সহজিয়া ধর্মের কথা বা আমাদের বৈষ্ণব মতবাদের নানা ব্যাখ্যা করছেন। শুধু আহমদ শরীফ নন, সুকুমার সেনসহ আরও অনেকেই। তখনও কিন্তু বই পড়ে যেটা অনুধাবন করা যায়নি সেটা আমি আজ সেমিনার রুমে ঢুকে সেমিনারের বাতাসটা দিয়ে অনুধাবন করতে পারলাম। আমার মনে হয় চর্যাপদ বুঝতে হলে এরকম বাতাস দরকার।… ভাবনগর ফাউন্ডেশন যে কাজটা করছে, যেটা আসলে ট্রান্সমিশনের কাজ করছে। ট্রান্সমিশনটা কি ? আমি ছোট করেই বলছি। ‘গান’ কথাটা আমরা যদি কলিম খান বা রবি চক্রবর্তীর ক্রিয়াভিত্তিক অভিধান যেখানে গান ধাতু আসছে গৈ থেকে এসেছে। সেখানে ব্যাখ্যার মধ্যে বলা হচ্ছে যে, প্রাচীন বাংলায় যখন নৌকা দিয়ে পণ্য পরিবহন করা হতো। এক রসুলপুরের পণ্য যখন রঘুনাথপুরে যেত তখন তো সঙ্গে মানুষ যেত। সেই পণ্যগুলোর বাণিজ্য করতে তারা ৭-১০দিন থাকত। তখন কি শুধু পণ্যই যেত ? আসলে, শুধু পণ্য যেত না, রসুলপুরের গল্পটাও কিন্তু পণ্যের সঙ্গে যেত। সেই গল্প তারা কী করে কমনিকেট করত। গান দিয়ে করতো। এই জন্য আমাদের বাউলরা বা গায়েনরা যখন আমরা গ্রামে যাই তখন তারা বলেন―গান তো জ্ঞান। আমরা চর্যাপদের প্রতিটি পদে কিন্তু এটা আরও বেশি করে অনুভব করি। যে দেহসাধনা, যে ভাবসাধনার মধ্য দিয়ে যে অনুভূতি আমাদের শরীর মন তন্ময়তার ভেতরে আমরা অনুভব করি, কিন্তু বলতে পারি না, আমাদের সেই চর্যাকাররা তা বলেছেন। সেটা কিন্তু লেখেননি আসলে। ব্যাপারটা হচ্ছে, ওই যে ধ্রুবপদ দেওয়া। ওই রাগটা দেওয়া। তারা গানের মাধ্যমেই কিন্তু জ্ঞানটাকে পরিবাহন করছেন। সেই গুরুদায়িত্বটা আমাদের আধুনিককালে এসে বন্ধুবর সাইমন জাকারিয়া করছেন। কঠিন একটা কাজ। এই কঠিন কাজটা অসম্ভব তা নয়। সেই কঠিন কাজটা করার জন্য সাইমন জাকারিয়া কিছু মেথড এখানে বলেছেন।… অন্যদিকে, নূরুননবী শান্ত তার প্রবন্ধে সুন্দরভাবে অনেকগুলো সংকটের কথাও তুলে ধরেছেন।… আমার একটিই পয়েন্ট, সেটা ট্রান্সমিশন নিয়ে। চর্যাপদের পদগুলো কোনও ইম্পেরিয়াল কোর্টে (রাজদরবারে) রচিত হয়নি। লোক মানুষের তো! আমি নিজেও কয়েকটি চর্যার সুর করেছি। তারপর চর্যাকারদের সম্পর্কে জেনেছি―তাদের যে প্রত্যাহিকতা থেকে এই ভাবের পর্যায়ে তার কবিসত্তা দিয়ে হোক, তার ধ্যান দিয়ে হোক, তার সমাজমনস্কতা দিয়ে হোক, তার মগ্নতা দিয়ে হোক―এই চর্যাগুলো তারা মুখে মুখে রচনা করেছেন। তখন ছিল ওরালিটির যুগ। কিন্তু চর্যার ওই সুরটার করার সময় তার ভেতরে, শরীর-মনের কি অনুভূতি হয়েছিল ? সেটা আমরা কি করে ট্রান্সমিট করবো ? আমরা দর্শনগুলো ট্রান্সমিট করতে পারছি। ট্রান্সমিশন করতে গিয়ে আপনারা অনেকে বললেন যে, আমরা নিজেরা সুর করছিÑরাগ দেখে বা রাগ ভেঙে। কোনও অসুবিধা নেই। কেন অসুবিধা নেই ? কারণ এটা ‘লোক’। লোক বিষয়টা কিন্তু তার স্বতঃস্ফূর্ত বিবর্তনেই যাবে। মাঝখানে কিছু মধ্যখণ্ডন হয়েছিল, মধ্যখণ্ডনে যেটাকে আমরা বিলুপ্ত ঘোষণা করছি। বিলুপ্ত ঘোষণা করেছি, কিন্তু প্রয়োজনীয়। তাহলে সেই প্রয়োজনীয় উদ্যোগটা সাইমন জাকারিয়া নিচ্ছেন। লুবনা আপা যেটা দেখে বললেন―‘সাবধান’। এই সাবধান কিন্তু পিয়োরিটি নিয়ে নয়, এটা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বা মার্গীয় সঙ্গীত নয়―যেটার নোটেশন, স্টাফনোটেশন মেনেই আমাকে চলতে হবে। তার মানে আবার এই নয় যে, আমার বাঙালিয়ানা এটার মধ্যে একেবারেই থাকবে না। সেটা নয়। তাহলে নিউক্লিয়াসটা ঠিক রেখে আমরা এই দর্শনটাকে আমার পারফর্মিং আর্টের ফিলোসফি দিয়ে দেহ এবং মন দিয়ে অনুভব করে নতুন করে যদি নবায়ন করি তাহলে কিন্তু ক্ষতি নাই। এই যে সাধকশিল্পীরা বসে আছেন, তাদের প্রত্যেককে দেখেই বোঝা যায় তারা ভাবেই আছেন। আজকে যখন সৃজনী তানিয়া গান করছেন, যখন ইন্সট্রুমেন্টটা ধরছেন, যখন মাথাটা নিচু করে চোখ বন্ধ করছেন, তখনই বোঝা যায় তিনি ভাবে আছেন। ভাবে না থেকে আমরা যেটা করছি সেটা ফোকলোরিস্ট মাত্র হচ্ছে, যেমন শান্ত বলছেন―সঙ্গীত পণ্যে পরিণত হচ্ছে, বিক্রয়ের জন্য। এটাও কিন্তু একটা ধারা। পণ্যে পরিণত হবেই। যে গ্লোবাল ভিলেজের যুগ চলছে, মার্কেটিংয়ের যুগ, চকচকে জিনিসের দিকে আকর্ষণ থাকবেই। তাহলে কিছু লোক থাকবে―যারা সাবধান। সাবধান মানে কিন্তু রিজিড নয়। সাবধানতা কোন জায়গায়―আমার বাঙালিয়ানার প্রতি, আমার জনপদের প্রতি, আমার জনপদের স্বকীয়তার প্রতি, আমাদের ঐতিহ্যের প্রতি। ঐতিহ্য কোনও স্ট্র্যাটেজিক জিনিস নয়, ঐতিহ্যেরও নবায়ন হয়। কে করে ? আসমান থেকে কেউ নেমে এসে করে না, লোকে করে। আমরা সেই লোক। আমরা মনে করি, সাইমন জাকারিয়ার সঙ্গে আমরা সবাই যে যার জায়গা থেকে যদি বোধ দিয়ে এটাকে অনুধাবন করি তাহলে কিন্তু এই চর্যাপদের পুনর্জাগরণ বা পুনর্নবায়ণের কাজটা সাবধানেই করা সম্ভব।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রভাষক জোবায়ের আবদুল্লাহ বলেন, ‘২০১৪ সালে যখন ভাবনগর সাধুসঙ্গে চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণের কার্যক্রম শুরু হয় তখন থেকেই আমি বিভিন্ন সময়ে সেখানে যোগ দিয়েছি। নিজেও সেখানে আলোচনায় অংশ নিয়েছি। আমরা মধ্যযুগের যে সব সাহিত্য-নিদর্শন দেখি তার অধিকাংশই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে পরিবেশিত হয়ে আসছে। কিন্তু চর্যাপদই এদিক থেকে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল, যার কোনও পরিবেশনরীতি বাংলাদেশে ছিল না। কিন্তু চর্যাপদ আবিষ্কার ও প্রকাশনার ১০০ বছর অতিক্রান্ত হবার পরে আজকে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে চর্যাপদ শুধু দেশের নানা প্রান্তে না, বিদেশেও একরকম আন্তর্জাতিকতার মাত্রা পাচ্ছে।  বলতে হয় যে, ভাবনগর ফাউন্ডেশন চর্যাপদ পুনর্জাগরণের কার্যক্রম যে উদ্দেশ্যে করে আসছে তা অনেকাংশে সফল হয়েছে।’  

সরকারি সঙ্গীত কলেজের লোকসঙ্গীত বিভাগের সভাপতি ড. কমল খালিদ বলেন, ‘আমাদের সংস্কৃতি বহমান। পনেরো সালের রাগকে নির্ভর করে অনেক গান হচ্ছে। কিন্তু চর্যাপদের গানের গায়কী কী রূপে ছিল তা আমাদের জানা নেই। কিন্তু দেহ ও আত্মাকে এক করে যথাযথ সুরে ও তালে চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ করলে তার গ্রহণযোগ্যতা আর বাড়বে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইম রানা জাপানের বৌদ্ধধর্মীয় সৌম্য-সংগীতে পরিবেশনের মাধ্যমে বলেন, ‘প্রাচীন কালে বৌদ্ধ সাধকরা যেভাবে বিচরণ করতেন, বিশেষ করে তাদের যাত্রাপথের চলার ভঙ্গি বা অবগাহনের যে ঝোঁক সেটা কিন্তু জাপানের প্রাচীন বৌদ্ধধর্মীয় সৌম্য-সঙ্গীতে পাওয়া যায়। আমি জাপানে সৌম্য-সঙ্গীত চর্চা করতে গিয়ে একসময় অনুভব করি, এই সৌম্য-সঙ্গীত হলো―চর্যা। তিব্বতিয়ান স্কলাররা বলছেন, আমাদের প্রবোধচন্দ্র বাগচীসহ আরও অনেকে বলছেন, আসলে ‘সৌম্য’ এই শব্দটি চর্যা। আমি জাপানে এগুলো সংস্কৃত টেক্সট আকারে দেখেছি, প্রথমে আমি মনে করেছি, এটা দোহাকোষ কিনা বা অন্য কোনো ফর্মের বৌদ্ধ স্তোস্ত্র কিনা। কিন্তু আসলে, চর্যাপদ ৫০সংখ্যক আছে তা নয়, আরও অসংখ্য চর্যাপদ আরও পূর্বে রচিত হয়েছে। তার পরবর্তীতেও রচিত হয়েছে। চর্যা অর্থই হচ্ছে শব্দবিদ্যা।…ভাবনগর ফাউন্ডেশনের চর্যাপদের পুনর্জাগরণ কার্যক্রমের সঙ্গে এসব বিষয়কে বিবেচনায় নিলে আরও ভালো হবে বলে মনে করি।”

আলোচকদের মধ্যে কবি শাহেদ কায়েস বলেন, ‘চর্যাপদ প্রায় বিলুপ্ত শিল্পে পরিণত হয়েছিল; প্রায় সোয়াশত আগে নতুন করে আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে সমকালীন ভাষায় অনূদিত হয়ে চর্যাপদ শুধুই পুস্তকে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু আমরা জানি এক সময় এই বাংলায় চর্যাপদ চর্চা জীবন-যাপন এবং প্রার্থনার অংশ ছিল। আমরা ধন্যবাদ জানাই সাইমন জাকারিয়ার নেতৃত্বে ভাবনগরের ভাবসাধকদের এই প্রচেষ্টাকে; তাঁরা চর্যাপদের গানের ৫০০তম আসর পূর্ণ করেছে। আমার প্রত্যাশা ভাবনগর ফাউন্ডেশন-এর উদ্যোগটি একদিন ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাবে।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের সভাপতি ড. আলী এফ এম রেজোয়ান বলেন, ‘চর্যাপদ একই সঙ্গে প্রাচীন বাংলার একটি সঙ্গীতধারা তেমনি নৃত্যধারা আবার সাহিত্যনিদর্শন। চর্যাগীতি সহজিয়াধারার গান এবং এটা তন্ত্রধারার গান। সুরের ধারার দিকে দিয়ে বিবেচনায় নিলে শাস্ত্রীয় সংগীতের ঐতিহ্য অনুসরণ করলে বেশি ভালো।’

ছায়ানট সঙ্গীত ভবনের লোকসঙ্গীত শিক্ষক তপন মজুমদার বলেন, ‘চর্যাপদের গান এক জায়গায় বসে লেখা হয়নি। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করতে করতে চর্যার কবিরা এই গানগুলো লিখেছেন, গেয়েছেন। তাদের সুরের ধারা নিশ্চয় আমাদের দেশের আঞ্চলিক সঙ্গীতঐতিহ্যের মধ্যেই আছে। তাই বাউল-ফকিরদের এই চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ আমার কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য উদ্যোগ মনে হয়েছে।’

কবি নজরুল ইশতিয়াক বলেন, ভাবসাধকদের মধ্যে চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণের এই উদ্যোগ বিচ্ছিন্ন কোনও তৎপরতা নয়। প্রায় ৩ যুগের সাধনায় সাইমন আজ বাউল-ফকিরদের সঙ্গে নিয়ে চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ করে যাচ্ছেন। এটা অবশ্যই অভিনন্দনযোগ্য।

ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণের অন্যতম সাধকশিল্পী শাহ আলম দেওয়ান বলেন, আজকে এখানে যে আলোচনা হচ্ছে। তাতে আমি নিজেকে ভাবতে পারি না যে, আমি আছি কি নাই, হারিয়ে গেছি। দাবি করতে পারি না যে, আমি আছি। যা হোক, বাউলশিল্পী হিসেবে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে দুচারটা গান করি। সে দিক দিয়ে আমাদের কথা কিছু মানুষ জানে। আসলে, আমাদের কোনও সঙ্গীতবিদ্যা নেই। নেই বললেই চলে। প্রান্তিক সঙ্গীত। কোনও একাডেমিক শিক্ষা আমাদের নেই। কোনও সুর সম্পর্কে আইডিয়া নেই। কোনও রাগ সম্পর্কে তো আইডিয়া নেই-ই। খুব ভালো আলোচনা এখানে হয়েছে। আমার মনের মধ্যে একটি প্রশ্ন বারবার উত্থাপন হয়েছে। প্রশ্নটা হলো―সুরকার, গীতিকার। এই যে, সুরকার আর গীতিকার। দুইটা বিষয়। গীতিকার যিনি তিনি বাণীবদ্ধ করেন কাগজ আর কলম দ্বারা। এটাকে সঙ্গীতে রূপ দেবার জন্য ছন্দে রূপান্তরিত করে, ছন্দে মিল দেন। যিনি লেখাগুলো লিখলেন―উনি কিন্তু একটা ভাবে লিখেছেন। উনার ভেতরে কিন্তু একটা সুর জেগেছিল। এই লেখাগুলো যদি একজন সুরকারের কাছে চলে যায়―ভাই দেখেন এটা আমি লিখছি একটু সুর করে দেন। তিনি কি আমার সেই ভাবটা বুঝবে ? অবশ্যই বুঝবেন না। আমি যে ভাবে লিখেছি সে ভাবের সঙ্গে যে সুরটা আসে সেটা একেবারে কথার সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে আসে। কিন্তু সুরকারের পক্ষে সেই ভাব সব সময় অনুভব করা সম্ভব নয়।

সভাপতির বক্তব্যে অভিনেতা, নাট্য সংগঠক মঞ্চসারথী আতাউর রহমান বলেন, ‘আমরা জাতি হিসেবে গর্বিত, আমাদের যে পুথিপাঠ হত, মেলা হত; তা নিয়ে আমরা গর্বিত। চর্যাপদ বাংলা ভাষার আদি রূপ। চর্যাপদ থেকেই তো আজকে আমাদের ভাষা এই পর্যায়ে এসেছে। আমাদের এ অঞ্চলে কালিদাসের জন্ম হয়েছিল। সেই কালিদাস প্রেমিকার কাছে বার্তা পাঠিয়েছেন মেঘের মাধ্যমে। যখন টেলিফোন ছিল না, তখন মেঘ উড়ে উড়ে সেই বার্তা নিয়ে যাচ্ছে। এই যে কাব্যিক সাধনা, তার মনের প্রকাশ; এসব আমাদের গর্বিত অতীত। আমাদের আদিরূপটা কেমন ছিল, তা জেনেই আমাদের সম্মুখে চলতে হবে।’

সেমিনার অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কবি সাইদ হাফিজ ও গবেষক ওয়াহিদা সুলতানা আশা।

চর্যাপদ পুনর্জাগরণ উৎসব ২০২৪-এর তৃতীয় ও শেষ দিন ছিল ১০ মে  শুক্রবার। এই দিনের অনুষ্ঠানমালা দুইভাগে বিভক্ত ছিল। প্রথম পর্বে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ১ নম্বর মহড়া কক্ষে বেলা ৩টা থেকে ৬টা পর্যন্ত চর্যাপদ প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এই পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নাট্যনির্দেশক, চলচ্চিত্রকার, লেখক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসিরউদ্দিন ইউসুফ। কর্মশালায় বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত সাধকশিল্পীদের পাশাপাশি ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিচিত্র পেশাজীবী অর্ধশতাধিক সঙ্গীতশিল্পী ও গবেষক প্রাচীন বাংলার চর্যাপদের গানের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ কর্মশালাটির উদ্বোধনী পর্বে সূচনা বক্তব্য প্রদান করেন ড. সাইমন জাকারিয়া। তিনি বলেন, প্রাচীন বাংলাদেশের চর্যাপদের গানের মূল উত্তরাধিকার বাংলাদেশের বাউল- সাধকগণ। এতদিন চর্যাপদ শুধু প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার অংশ ছিল। ভাবনগর ফাউন্ডেশন সাধুসঙ্গ আয়োজনের মাধ্যমে চর্যাপদের গানকে ভাবসাধকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় তিন দিনব্যাপী চর্যাপদ পুনর্জাগরণে উৎসবের শেষ দিন চর্যাপদ প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করেছে। যেন এই গান আপামর জনসাধারণের ভেতর ছড়িয়ে যায়।

চর্যাপদ প্রশিক্ষণ কর্মশালার প্রধান অতিথি নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বলেন― ‘আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, শিল্পকর্ম বা সংস্কৃতির ইতিহাস রাজনীতির চেয়েও জরুরি।’ জরুরি এই জন্যেই যে, এর মধ্যে নিহিত আছে সময়ের কথা, মানুষের বেদনার কথা, ভালোলাগার কথা, বিধানের কথা, সিদ্ধান্তহীনতার কথা, সিদ্ধান্ত নিয়ে সফল হওয়ার কথা। ইতিহাসের কথা যদি বলেন, সাধারণত ইতিহাস আমরা পড়ি না। কেন পড়ি না, ভালো লাগে না। কারণ তা খুব কাঠখোট্টা, ও একটা এমন কুঠুরিতে আছে যেখানে সে মৃতপ্রায়, মানুষের স্পর্শ না পেলে সে জীবন্ত হয় না। আর শিল্প মানুষের স্পর্শে জন্ম হয়েছে, এবং মজার ব্যাপারটি হচ্ছে, শিল্প সেটা বুকে ধারণ করে থাকে। যার জন্য একটু আগে সাইমন জাকারিয়া চর্যাপদ থেকে নিয়ে যে কথাটি বললেন―‘নাচন্তি বাজিল গান্তি দেবী/বুদ্ধ নাটক বিষমা হোই।’ এর অর্থ হচ্ছে, বজ্রধর নৃত্য করল, দেবী গান করল, সেই জন্য বুদ্ধ নাটক কঠিন। আসলে, বুদ্ধ নাটক শুধু নয় যে কোনও নাটকই কঠিন। কারণ, আপনাকে নৃত্যপর হতে হবে, আপনাকে সঙ্গীতে পারদর্শী হতে হবে এবং আপনাকে অভিনয়ে পারদর্শী হতে হবে। সবমিলিয়ে তো কঠিন কাজ।… চর্যাপদের চর্চার মাধ্যমে আমরা আমাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারি। যে ঐতিহ্যে গান, নাচ ও নাটকের পাশাপাশি সঙ্গীত পরিবেশনের বাদ্যযন্ত্র ও নাটকের আহার্য সম্পর্কেও তথ্য পাই, সেই সঙ্গে বাউল-ফকির সাধনার প্রাচীনত্বের সঙ্গে যুক্ত হতে পারি।’

চর্যাপদের প্রশিক্ষণ কর্মশালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইম রানা পটমঞ্জরী রাগে ‘আলিএ কালিএ বাট রুন্ধেলা’ শীর্ষক চর্যাপদের ৭ সংখ্যক পদ; সাধিকা সৃজনী তানিয়া ‘কাআ তরুবর পঞ্চবি ডাল’ শীর্ষক চর্যাপদের ১ সংখ্যক পদ আদি বাংলায় এবং শাহ আলম দেওয়ান ‘ত্রিশরণ এই নৌকা আমার’ শীর্ষক ১৩ সংখ্যক চর্যাপদ ও বাউল অন্তর সরকার ‘দেহের নৌকায় মনের বৈঠা আছে’ শীর্ষক চর্যাপদের ৩৮ সংখ্যক পদ সমকালীন বাংলায় রূপান্তরিত চর্যাসংগীতের প্রশিক্ষণ প্রদান করেন।

এই দিন (১০ মে) সন্ধ্যা ৭টায় শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে তিনব্যাপী চর্যাপদ পুনর্জাগরণ উৎসব ২০২৪-এর সমাপনীপর্বে চর্যাসঙ্গীতানুষ্ঠান ও প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সার্টিফিকেট বিতরণ করা হয়। এই পর্বের শুরুতে ভাবনগর ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক নূরুননবী শান্ত তাঁর সূচনা বক্তব্যে বলেন―‘চর্যাপদের গান আত্মশুদ্ধির গান। এই গানের পুনর্জাগরণের মাধ্যমে নতুনভাবে ভাব বিপ্লব সাধিত হচ্ছে’। সূচনা বক্তব্যের পর সমবেত কণ্ঠে চর্যাপদের প্রথম পদটি পরিবেশন করেন বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত সাধক শিল্পী। এরপর পর্যায়ক্রমে সাধিকা সৃজনী তানিয়া আদিভাষায় রাগাশ্রয়ী সুরে ‘তিনি ভুঅণ মই বাহিঅ হেলেঁ’ শীর্ষক ১৮সংখ্যক চর্যা এবং সমকালীন ভাষায় বরিশালের শাহ আলম দেওয়ান ‘ত্রিশরণ এই নৌকা আমার’ শীর্ষক ১৩সংখ্যক চর্যা, পাবনার ফকির আবুল হাশেম ‘হাওয়া-দমের পথ বন্ধ কেন হয়’ শীর্ষক ৭সংখ্যক চর্যা,  চুয়াডাঙ্গার আব্দুল লতিফ শাহ ‘দেহের নৌকায় মনের বৈঠা আছে’ শীর্ষক ৩৮সংখ্যক চর্যা, শরিয়তপুরের শিলা মল্লিক ‘গগনে গগনে ওই তো গগনে’ শীর্ষক ৫০সংখ্যক চর্যা, কিশোরগঞ্জের অন্ধ আল আমিন সরকার পিপাসী ‘এই ভব নদী গম্ভীর বেগে’ শীর্ষক ৫সংখ্যক চর্যা, নওগাঁর ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের বাবুল আক্তার বাচ্চু ‘আঁধার নিশিতে ইঁদুরেরা চরে ঘরে’ শীর্ষক ২১ সংখ্যক চর্যা, পটুয়াখালীর আনিস মুন্সী ‘তিনটি ভুবন পার করে দেয় হেলা-অবহেলায়’ শীর্ষক ১৮সংখ্যক চর্যা, মানিকগঞ্জের বাউল অন্তর সরকার ‘চাঁদ শোভা পায় আকাশের গায়’ শীর্ষক ২৪সংখ্যক চর্যা, কিশোরগঞ্জের সিদ্দিক ফকির ‘তুলা ধুণি আঁসুরে আঁসু’ শীর্ষক ২৬সংখ্যক চর্যা, নওগাঁর আফজাল হোসেন ‘র্কাবা ছেড়ে র্কাবা নিয়ে’ শীর্ষক ৬সংখ্যক, কিশোরগঞ্জের উজ্জ্বল মিয়া ‘একটি শুণ্ডিনী দুই ঘরেতে’ শীর্ষক ৩সংখ্যক চর্যা, নওগাঁর ফারুক হোসেন ‘মন-ইন্দ্রিয় পবন-গতি যেখানে নষ্ট হয়’ শীর্ষক ৩১সংখ্যক চর্যা ও বেল্লাল হোসেন ‘সদ্গুরু বোধে দাবা খেলে জিতি’ শীর্ষক ১২সংখ্যক চর্যা, কিশোরগঞ্জের রোকনউদ্দিন ‘কাছিম দুইয়ে পাত্রে না ধরা যায়’ শীর্ষক ২সংখ্যক চর্যা, এবং পঞ্চগড়ের রবিউল হক আদি ও সমকালীন বাংলায় ‘সুনে সুন মিলিও জবেঁ’ বা ‘শূন্যে শূন্য যখন মিলিত’ শীর্ষক ৪৪সংখ্যক চর্যা পরিবেশন করেন।

চর্যাসঙ্গীতানুষ্ঠানে শুধু চর্যাপদের গানই নয় তার পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের কয়েকজন সাধক কবি ভাবনগর সাধুসঙ্গ ও ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ নিয়ে তাঁদের স্বরচিত গান পরিবেশন করেন। যেমন―মাদারীপুরের ইউসুফ মিয়া চর্যাপদের পুনর্জাগরণ সম্পর্কে তাঁর স্বরচিত ‘সাধুর ভাব জেনে লও ভাবনগর যাও’ শীর্ষক গান, কুমিল্লার বাউল তাহমিনা ‘চলোরে মন ত্বরায় যাই বিলম্বের আর সময় নাই’ শীর্ষক ভাবনগর সাধুসঙ্গের চর্যাপদের পুনর্জাগরণ বিষয়ক স্বরচিত গান, কিশোরগঞ্জের জিল্লুর সরকার সাধকশিল্পী আল আমিন সরকার রচিত ভাবনগর সাধুসঙ্গের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ বিষয়ক গান এবং ঝিনাইদহের জ্ঞানহীন নাইম যৌথভাবে ফতেহ কামালের সঙ্গে নিজের রচিত ‘ভাবের ভাবুক যারা ভাবনগরে আসে তারা’ শীর্ষক ভাবনগর সাধুসঙ্গ ও ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ বিষয়ক গান পরিবেশন করেন। ভাব ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ কার্যক্রম বাংলাদেশের প্রান্তিক পর্যায়ের লোকমানুষের মধ্যে অভিনন্দিত হবার পূর্বাপর ইতিহাস ধরা পড়ে উপর্যুক্ত সঙ্গীত পরিবেশনের ভেতর দিয়ে। জানা যায়, উপর্যুক্ত সাধক কবিদের বাইরেও বাংলাদেশের আরও অনেক সাধক কবি ভাবনগর সাধুসঙ্গের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ সম্পর্কে গান লিখেছেন এবং তা বিভিন্ন সংগীতের আসরে পরিবেশন করে থাকেন। এই সকল ঘটনা ও গানের মাধ্যমে ভাবসাধকদের চর্যাপদের পুনর্জাগরণের গ্রহণযোগ্যতার স্বীকৃতি মিলেছে। এই দিক বিচারে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সহযোগিতায় ৩দিনব্যাপী চর্যাপদ পুনর্জাগরণ উৎসব ২০২৪ সার্বিকভাবে বাংলাদেশের চর্যাপদ পুনর্জাগরণের ইতিহাস এবং বর্তমান চালচিত্র তুলতে ধরতে সক্ষম হয়েছে।

এছাড়া, সুনামগঞ্জের মনীন্দ্র দাস সাধক কবি সেকেন শাহ রচিত ‘মন আমার জঙ্গলা হাতি’ শীর্ষক একটি গান পরিবেশন করেন। গানটি চর্যাপদের ৯, ১২ ও ১৬ সংখ্যক গানের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। উল্লেখ্য, চর্যাপদের এই তিনটি পদেই মত্ত তথা অবাধ্য হাতির কথা বর্ণিত হয়েছে।

চর্যাসঙ্গীতানুষ্ঠানে কণ্ঠশিল্পীগণ ঐতিহ্যগত বাদ্যযন্ত্র একতারা, দোতারা, সারিন্দা, বেহালা, ডুগি, প্রেমজুড়ি, বাঁশি, ঢোল, মন্দিরা বাদন করেন। কণ্ঠশিল্পীদের পাশাপাশি দোতারা বাদন করেন প্রখ্যাত বাদ্যযন্ত্রশিল্পী অনুপম বিশ্বাস। ঢোল ও বংশি বাদন করেন যথাক্রমে হাসান মিয়া ও রানা।

চর্যাসঙ্গীতানুষ্ঠান শেষে চর্যাপদ পুনর্জাগরণ প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সনদপত্র বিতরণ করেন চর্যাপদ পুনর্জাগরণ উৎসব ২০২৪-এর উপদেষ্টা মিখাইল আই. ইসলাম, উপমহাদেশের প্রখ্যাত বাউল শিল্পী আব্দুল লতিফ শাহ, ভাবনগর ফাউন্ডেশনের সভাপতি ড. সাইমন জাকারিয়া ও আবৃত্তি শিল্পী সানজিদা স্মৃতি।

 লেখক : গবেষক-প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button