
ভারী পাথরের মতো শ্বাসরোধ করা নীরব সময়; যে সময়ে কথা বলতে না পারায় জিহ্বায় জং ধরে, কানে আর্তনাদের বদলে শোনা যায় শীতল নীরবতা। শূন্যতাবোধের প্রবল ঝাঁকুনিতে বিগলিত হয়ে মানুষ অস্তিত্বহীনতার ভেতরে মিশে যায়। যুবকরা নিঃসঙ্গ, হতাশায় ভেঙ্গে চুরমাচুর হয়,বয়স্করা কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে বিরূপ ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করতে থাকে, জনপদবধূরা কলহাস্য করতে ভুলে যায়, তরুণীরা তাদের অমসৃণ ঠোঁটে ল্যাকমে লিপস্টিক মাখার বদলে সরু নালায় গড়িয়ে যাওয়া নোংরা পানি দেখে অস্বস্তিকর সময় পার করে। এই সময় রাজাপুকুর লেন, শান্তিবাগ অথবা হালিশহর আবাসিক এলাকার বাসিন্দা ওবায়দুল করিম কিংবা তাবিব হোসেন বুধবার সকালে ঘুম থেকে উঠে বিছানায় আড়মোড় ভেঙ্গে দীর্ঘ হামি তোলে, অভ্যাসবশত হা-করা মুখে দুই আঙুল জড়ো করে দুইটা টুকি বাজায়। তখন সে অনুভব করে তার ঘাড়ে মাথা নেই, নেই মানে নেই।
ব্যাপারটা কি স্বপ্নের না বাস্তবের ? এটা পরখ করার জন্য নিজের গায়ে নিজেই চিমটি কেটে দেখে। এ সময় রক্তমাতাল একটা মাছি তার গায়ে ভনভন করে একবার বসছে, একবার উড়ছে। বিরক্তিকর মাছিটাকে কয়েকবার মারতে গিয়ে ব্যর্থ হয় এবং খুব অস্বস্তিবোধ করে, তখন দ্বিতীয়বার তার মনে হয় ‘আমার তো মাথা নাই।’
টুথব্রাশে পেস্ট মাখিয়ে প্রতিদিনের মতো সে লুকিং গ্লাসের দিকে তাকায় এবং মুণ্ডহীন ধড় দেখে সে নিজেই চমকে উঠে―‘এ কি! মাথা গেল কোথায় ?’
প্রতি রাতে ওবায়দুল করিম কিংবা তাবিব হোসেন ঘুমের ভেতর নানা দুঃস্বপ্ন দেখে। দেখে রাস্তায়, রেস্তোঁরায়, স্টেশনে, ফুটপাথে, মাছবাজারে, বাণিজ্যবিতানে গিজগিজ করছে অজস্র মানুষ কিন্তু কারও ঘাড়ে মাথা নেই। মাথাহীন মানুষের পাগুলো শুধু হেঁটে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে তার ভ্রম হয়―এটা কি তার স্বপ্নে দেখা কোনও দৃশ্য ? নাকি অবচেতন মনের কল্পনা ? মুণ্ডহীন শরীর নিয়ে মানুষগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে সারা শহরে, কেউ মোটা, কেউ পাটখড়ি চিকনা, কেউ বেঁটে-বামন, লম্বা, ফর্সা অথবা শ্যামলা। ওবায়দুল করিম কিংবা তাবিব হোসেন বুঝতে পারে না সে কি আসলে ঘুমের ভেতর স্বপ্নে আছে, না অবচেতন কল্পনায় দেখছে এসব ? তখনই কলিংবেল বেজে উঠলে তার শ্রুতি কিংবা বোধে ভোরে সূর্য ওঠার দৃশ্য দর্পিত হয় এবং সে দরোজা খোলে।
‘ভেতরে আসব স্যার ?’
সে চমকে উঠে তাকায়। দরজার সামনে যে লোকটি দাঁড়িয়ে আছে তারও মাথা নেই!
কপালের নিচে চোখ আছে বটে। চোখের দৃষ্টি স্বচ্ছ, এক্স-রে মেশিনের মতো। চোখের দিকে তাকালেই মানুষের ভেতরটা যেন দেখতে পায়। মনে মনে মানুষটা কী ভাবছে তা-ও অনায়াসে বলে দিতে পারবে। এ ধরনের লোকের দিকে তাকিয়ে কথা বলা ভারী মুশকিল। প্রবল গাম্ভীর্য নিয়ে কথা বলতে গেলেও অকারণে থতমত খেতে হয়। সে বলল―‘হ্যাঁ ভেতরে আসুন।’ সোফায় বসতে বসতে সে বলল―‘আমার নাম আবদুল বাসেত।’
নাম শুনেই ওবায়দুল করিম কিংবা তাবিব হোসেনের ভেতরটা কেঁপে উঠল। আবদুল বাসেত খুন হয়েছে এগার বছর আগে। মৃত লোক আবার ফিরে আসে কীভাবে ? ওবায়দুল করিম কিংবা তাবিব হোসেন মনে মনে ভাবে, তার কোথাও ভুল হচ্ছে অথবা বুধবার দিনটা আসলে খুব ঝামেলার। না হলে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে কেন ? কলিংবেলের আওয়াজ শুনে তার স্ত্রী মনিকা অথবা গুলনাহার ড্রয়িং রুমে আসে এবং সোফায় বসা লোকটার জন্য চা-নাস্তা পাঠায়। আবদুল বাসেত চা খাওয়ার ফাঁকে গ্রামের মসজিদ সংস্কার, জমি নিয়ে তোরাব আলির সঙ্গে বিরোধ, বাজারের জায়গাটার উপর চেয়ারম্যানের পোলার নজর পড়ছে―এসব কথা বলতে গিয়ে কেউ শুনে ফেলার ভয়ে কানের কাছে মুখ এনে খুব সাবধানে ফিসফিসিয়ে যা বলে, সবই এগার বছর আগের ঘটনা। দেবরামপুর গ্রামে আবদুল বাসেত খুনের কথা এখন বিস্মরণে ডুবে গেছে। তারপর নিতাই বাবুর ছেলে রুবেল মজুমদারের ‘জনসেবা মাইক্রোক্রেডিট’ এনজিও থেকে দু’শ কোটি টাকা নিয়ে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া, কলেজছাত্রী সামিয়া ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় থানা-পুলিশ, টিভি-মিডিয়ায় দেশব্যাপী আলোড়ন তোলে। দেশে একটার পর একটা চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে, তখন পূর্বের ঘটনা চাপা পড়ে যায়। বাসেত-খুনের ঘটনা এখন আর কারও মনে নেই। গুলনাহার চায়ের কাপ নিতে এসে দেখে, ড্রয়িং রুমে কেউ নেই, তাবিব হোসেন একা একাই প্রসঙ্গহীন কথা বলছে।
‘তুমি কার লগে কথা কও ? কাউরে তো দেহি না! রাতের বেলায় ঘুমের মধ্যেও তুমি কার লগে ডাক পাড়ো, চিল্লাপাল্লা করো, কিছুই তো বুইঝতাম পারি না। তুমার হইছে কী ?’
গুলনাহারের জিজ্ঞাসার উত্তরে ওবায়দুল করিম কিংবা তাবিব হোসেন কিছু বলে না, নির্বিকার চোখে তাকিয়ে থাকে। মনিকা অথবা গুলনাহারের মনে তখন দুশ্চিন্তা ঢেউ খেলে যায়, সে বলে―
‘চলো, আজই তুমারে ডাক্তর দেহাইতে লইয়া যামু।’
উপশম ক্লিনিকে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মহসিনের চেম্বার, বাইরে অপেক্ষমাণ রোগীদের দীর্ঘ সিরিয়াল। বিয়াল্লিশ নম্বর সিরিয়াল আসতে বিরক্তিকর লম্বা একটা সময় তাদের পার করতে হয়। সিরিয়ালের ডাক আসতেই গুলনাহার স্বামীকে নিয়ে ভেতরে ঢোকে। ডাক্তার মহসিন জিজ্ঞাসা করলেন―‘বলুন আপনার সমস্যাটা কী ?’
‘আমার একটাই সমস্যা, আমার মনে হয়, দীর্ঘদিন থেকে আমার ঘাড়ের উপর মাথা নেই।’
‘মাথা না থাকলে আপনি কথা বলছেন কী করে ?’
যন্ত্রপাতি নিয়ে ডাক্তার বললেন―‘হা করেন।’ তাবিব হোসেন হা করল।
টর্চলাইট দিয়ে তার টনসিল, কানের ফুটো দেখলেন। টাং ডিপ্রেসর দিয়ে জিভ টেনে দেখলেন। জিজ্ঞেস করলেন―‘নাকে গন্ধ পান ?’
‘জি, গন্ধ পাই।’
ওবায়দুল করিম কিংবা তাবিব হোসেন খুব স্বাভাবিক গলায় বলল―‘ডাক্তারসাব আমার নাকে-কানে কোনও সমস্যা নেই।’
হাতের যন্ত্রপাতি রেখে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন―‘কতদিন ধরে আপনার এই সমস্যা ?’
‘প্রায় এগারো বছর ধরে। বিশ্বাস করেন ডাক্তারসাব, আমাকে নিয়ে সবাই হাসাহাসি করে। কেউ কেউ বলে, আমি নাকি পাগল হয়ে গেছি। পাড়ার ছেলেরা আমাকে দেখলেই ক্ষেপায়―
‘ওই দ্যাখ, দ্যাখ তাবিব হোসেন যায়, তার ঘাড়ে মাথা নাই, হা হা হা…’
‘আপনার সমস্যা তো শারীরিক নয়, মানসিক। আমি লিখে দিচ্ছি, ঢাকায় জাতীয় মানসিক হাসপাতালে আমার বন্ধু বিখ্যাত সাইকিয়াট্রিস্ট ডাক্তার মাসুদ কামাল আছেন। তার কাছে গিয়ে আপনার সমস্যার কথা সব খুলে বলবেন। তাকে চিঠিটা দিয়ে বলবেন, আমি পাঠিয়েছি।’
বাইরে অপেক্ষমাণ রোগীরা ক্ষুব্ধ হয়ে সহকারীর সঙ্গে তর্কযুদ্ধ শুরু করছে। চিঠিটা তাবিব হোসেনের হাতে দিয়ে ডাক্তার বলেন―
‘মাসুদ কামাল কী বলেন, আমাকে জানাবেন।’
তাবিব হোসেন ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বেরিয়ে যায়। অন্য রোগীর দিকে মনোযোগ দেন ডাক্তার।
২
মেঘহীন আকাশে প্রবল তেজে জ্বলছিল সূর্য। নৈঃশব্দ্য তখন একচ্ছত্র রাজত্ব করছে, সেখানে ছিল রক্ত, আদিম নৈঃশব্দ্যের ভেতর ঝরে পড়ছিল রক্ত কিন্তু সে মূর্ছা যায় না, কারণ অস্পষ্টভাবে ওবায়দুল করিম কিংবা তাবিব হোসেনের মনে হয় সময় এখন ছিন্নভিন্ন, হয়তো জীবন এরকমই, সে ভাবে এবং মনে মনে হাসে। প্রতিবেশীর বাড়িতে নতুন শিশুর জন্মগ্রহণের সাধারণ খবরের মতোই সহজভাবে জীবন ও মৃত্যুকে অস্বীকার করা তার পক্ষে সম্ভবপর হয় না। ডাক্তার মাসুদ কামালের সামনে রোগীর চেয়ারে বসলে ওবায়দুল করিম কিংবা তাবিব হোসেনকে টুকটাক প্রশ্ন করেন―
‘কবে থেকে মনে হয় আপনার মাথা নেই ?’
‘অনেক বছর, দশ/এগারো বছর হবে।’ ডাক্তার মাসুদ কামাল পুরানো প্রেসক্রিপশন দেখেন, নরটিন-১০, ইনডেভার-১০, রিভোল্টিন-০.৫ দেওয়া হয়েছে।
‘আপনার ঘুম কেমন হয় ? কানে কি কোনও আওয়াজ বা কথা শুনতে পান ?’
ওবায়দুল করিম কিংবা তাবিব হোসেন জবাব দেয় না, চুপ করে থাকে। তার চেহারা উদ্বাস্তুদের মতো বিপর্যস্ত দেখায়। ডাক্তার মাসুদ কামাল তার স্ত্রী মনিকা অথবা গুলনাহারের দিকে তাকিয়ে বলেন―‘উনাকে মানসিক হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করাতে হবে। সেটা ধৈর্য এবং একটু সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, আমি লিখে দিচ্ছি আজই ওয়ার্ডে ভর্তি করে নিন।’
ওয়ার্ডে ভর্তি করানোর পর তার স্ত্রী মনিকা অথবা গুলনাহার রোজ একবার দেখতে আসেন, আসার সময় বাসা থেকে রান্না করে খাবার নিয়ে আসেন। নিজে বসে থেকে স্বামীকে খাওয়ান, সিস্টারদের থেকে খবরাখবর নেন। এভাবে কিছুদিন যাওয়ার পর তার স্ত্রী লক্ষ করেন, ওবায়দুল করিম কিংবা তাবিব হোসেন আস্তে আস্তে নীরব হয়ে গেছে, জিজ্ঞাসা করলেও কোনও কথা বলে না, স্ত্রীর মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকে। শরীরের ওজন দিন দিন কমে যাচ্ছে, চোখের পাতায় ঘুম না হওয়াজনিত কালো দাগ গাঢ়তর হচ্ছে, চেহারায় জমাট হয়ে আছে বিষাদ। মনিকার বুকটা অজানা অশঙ্কায় হুহু করে ওঠে। সে ডাক্তার মাসুদ কামালের কাছে ছুটে যায়। মাসুদ কামাল তাকে প্রবোধ দিতে চেষ্টা করেন―‘আপনি চিন্তা করবেন না, উনি চিকিৎসার মধ্যে আছেন, ধৈর্য ধরেন, কিছুদিন পরে সাইকোথেরাপিতে নিলে সুস্থ হয়ে যাবেন।’ রাজাপুকুর লেন, শান্তিবাগ অথবা হালিশহর আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের তখন মনে পড়ে, ওবায়দুল করিম কিংবা তাবিব হোসেন নেই কেন ? আবাসিক এলাকার লোকেরা রাস্তায় রেস্তোঁরায় কোথাও ওবায়দুল করিম কিংবা তাবিব হোসেনকে না দেখে খুব হতাশার মধ্যে পড়ে যায়। তখন আলি আকবর একবার খবর নিতে তার বাসার দোতলায় উঠে তালাবন্ধ পায় এবং নিচে ভাড়াটিয়া মৌসুমী মা’র কাছে জানতে পারে যে ওবায়দুল করিম ঢাকায় মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে। আবাসিক এলাকার লোকদের মনে তখন আগের বিশ্বাস আরও গাঢ়তর হয়, তারা ভাবে, ওবায়দুল করিম কিংবা তাবিব হোসেন পাগল না হলেও মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল। তাদের বিশ্বাস দৃঢ়তর হওয়ার আগেই খবর আসে ওবায়দুল করিম কিংবা তাবিব হোসেন ঢাকার মানসিক হাসপাতাল থেকে পালিয়েছে এবং এখবর চাউর হলে আবাসিক এলাকার মানুষদের মনে বহু দিন পর এক ধরনের মনস্তাপ তৈরি হয়, তারা বিচরাইয়া দেখে যে, ওবায়দুল করিম কিংবা তাবিব হোসেন শান্তিবাগ অথবা হালিশহর আবাসিক এলাকায় আসেনি। পালিয়ে সে কোথায় যেতে পারে ? এই প্রশ্ন কারও কারও মনে উঁকি দিলেও আলি আকবর ভাবে―‘যাইব কই, ঘুইরা ফিইরা হেই হালিশহরই আইব।’ কিংবা মৌসুমীর মা আফসোস করে বলে―‘পাগল মানুষের কোনও ঠিকঠিকানা আছে ? আহারে! এমুন মানুষটা হারাইয়া গেল ?’
৩
তখন কী ঘটেছিল ? সমান্তরাল রেখা ধরে চলছিল ট্রেন, গ্রামগুলো চাকার নিচে ঘুরে ঘুরে পাক খাচ্ছিল, জীবনকে মনে হচ্ছিল হ্যাঙ্গারে লটকানো শার্ট, শরীরহীন মানুষের অবয়ব, তখন ওবায়দুল করিম কিংবা তাবিব হোসেন ঘৃণা ও ক্রোধে লাফিয়ে ওঠে, মুণ্ডহীনতা সত্যি তার জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে। গাঢ় সবুজ মাঠ, উঁচু টিলা, ঘন জঙ্গল, নাম না জানা বৃক্ষ, গহিন অরণ্যে ঢুকে যায় সে। মনুষ্য সমাজ থেকে দূরে, তখন তার কানের কাছে কে যেন ফিসফিস করে আশ্বাসবাণী শোনায়―‘একদম চিন্তা করবি না, আমি কী দশা করব দেখ।’ সে সামনে এগিয়ে যায়, এখানে ওখানে খোঁজে, গাছের গুঁড়ির তলায় উঁকি দেয়, ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায় এবং দেখে সামনে থরে থরে সাজানো আনেকগুলো মাথার খুলি। সে ভয়ে কিংবা ত্রাসে হকচকিয়ে যায়, এ কি ভৌতিক দৃশ্য অপেক্ষা করছে তার জন্য ? এতগুলো খুলি! দুনিয়ার সব দেহহীন মানুষের খুলিগুলো জড়ো করা হয়েছে এখানে! খুলিগুলো তখন চর্মহীন দন্ত বিকাশ করে হাসে। মুণ্ডহীন ওবায়দুল করিম কিংবা তাবিব হোসেনের শরীরে শীত ছড়িয়ে পড়ে, গায়ে রোম খাড়া হয়ে যায়, আতঙ্কে কিংবা মমতায় একটি করোটিতে হাত রেখে প্রশ্ন করে―‘নাম কী তোমার ? গহিন জঙ্গলে কী করে এলে তুমি ?’
‘দেবরামপুরের আবদুল বাসেত আমি, এলাকার উঠতি বয়সী ছেলেরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ায়, স্থানীয় মুরুব্বিদের নিয়ে মাদক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটা মানববন্ধন করেছিলাম, তাছাড়া বাজারের জায়গাটার ওপর চেয়ারম্যানের পোলার নজর পড়েছিল, ২২ জুন বাজার থেকে ফেরার পথে আমাকে অপহরণ করা হয়। তারপর হত্যা করে দেহটা নদীতে, মাথাটাকে বিচ্ছিন্ন করে এখানে…।’ দেবরামপুর গ্রামে আবদুল বাসেত গুম হবার কথা ছড়িয়ে পড়লে তারা প্রতিবাদহীন জীবনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, কেননা কাছে তাদের আবদুল বাসেতের গুম হবার ইতিহাস হাজির আছে। ওবায়দুল করিম কিংবা তাবিব হোসেন তখন আরেকটা খুলিতে হাত রাখে, দেখে, করোটির একপাশে ফুটো দিয়ে বেরিয়ে আসছে মোমবাতি গলে পড়ার মতো মগজ। সে শুনতে পায়―‘ইন্সপেক্টর! আমি স-ব পুতে ফেলব। গুলি করে স-ব মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেব। এক হাজার ফুট মাটির নিচে পুতে ফেলব। ’
সাংবাদিক ছায়ামূর্তি : ‘তাতে কোনও লাভ হবে না। সবাই কবর খালি করে উঠে আসবে। ফুর্তি করে সবাই উঠে আসবে।’
নেতা : বেঁচে থাকতেও তুমি আমার বিরুদ্ধে বিস্তর রিপোর্ট লিখেছ, তোমার কারণে আমার ইমেজ নষ্ট হয়েছে, আমি চেতনা ও আদর্শের বিশ্বাসী একজন লোক, তুমি বিরুদ্ধে কলম ধরো কোন সাহসে ?’ নেতার রাগ এখেনও কমেনি। তিনি পুলিশের কানে কানে কী যেন বলছেন। তারপর গলা পরিষ্কার করে বলেন―‘তুমি তো অনেক লেখাপড়া করেছ, শিক্ষিত ছেলে, তোমার মাথা আছে…’
সাংবাদিক ছায়ামূর্তি : ‘মাথা ছিল, এখন নেই, গুলিতে খুলি উড়ে গেছে। মগজ রাস্তায় ছিটকে পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। দেখছেন না আমার মাথার বাঁপাশে ফুটো, হা হা হা…’ অট্টহাসিতে যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ছে। ওবায়দুল করিম কিংবা তাবিব হোসেন চিৎকার করে বলতে থাকে―‘আমার কোনও রাজনৈতিক বিশ্বাস নেই, বিশ্বাস নেই…’
সচিত্রকরণ : রজত



