
প্রচ্ছদ রচনা : গল্পসংখ্যা ২০২৪―গল্প
আমার সামনে সোফায় বসে সানজানা খুব কাঁদছিল, কান্নার দমকে ন’ড়ে উঠছিল ওর শরীর, কখনও ফোঁপাচ্ছিলো, নাক টানছিল, আবার কখনও দুই হাত দিয়ে গাল বেয়ে নেমে আসা চোখের পানি মোছার বৃথা চেষ্টা করছিল। কান্নার কারণ জানি না বলে ঠিক কী বলে সান্ত্বনা দেব, কীভাবে সামলাব ওকে বুঝতে পারছিলাম না। শুধু নীরবে টিস্যু বক্সটা এগিয়ে দিয়েছিলাম। এই বিরামহীন কান্নার সামনে খুব অসহায় লাগছিল আমার। সমস্যা, সংকট এসব তো আমার জীবনেও কম নেই। পারিবারিক ঝড়ঝাপটায় এখনও আমি বেশ অনেকটাই বিপন্ন আর বিপর্যস্ত হয়ে আছি। তাই হয়তো একটু অধৈর্য হয়েই ধমকে উঠি,
‘আরে, বাল! কান্না থামা! … কী হইছে, বলবি তো! কখন থেকে শুধু ফ্যাৎ ফ্যাৎ করে কেঁদেই যাচ্ছিস! কিছু না বললে বুঝব কেমনে কী হইছে ?’
এবার কাঁধ থেকে ওড়নাটা সরিয়ে বাম হাতটা সোজা করে কামিজের হাতা টেনে তার কচি কলাগাছের মতো সুডৌল উন্মুক্ত বাহু আমার সামনে মেলে দিয়ে কান্না জড়ানো ভেজা গলায় সানজানা বলল, ‘এই যে দেখ, আমাকে মেরে কী করেছে ইমরান, মুখেও মেরেছে দেখ…’
দেখলাম, সানজানার ফর্সা বাহুতে প্রহারের নির্মম চিহ্ন লাল হয়ে ফুটে আছে। সে তার মুখটা ঘুরিয়ে আলোর কাছে নিয়ে এলে দেখলাম ওর ঠোঁটের একপাশে কেটে গেছে, চোখের নিচে কালশিটে দাগ, গালে গলায় পাঁচ আঙুলের আঘাতের ছাপ গাঢ় হয়ে বসে গেছে।
‘কী বলিস ? ইশ্্! ইমরান ভাই তোকে এমন পাষণ্ডের মতো মারতে পারল ? … এটাও সম্ভব ? ছিঃ, ছি তাকে তো ভদ্রলোক বলেই জানতাম!’
উত্তর না দিয়ে গুঙ্গিয়ে উঠল সানজানা। আবার অঝোর কান্নায় ভেঙে পড়ল। এবার ওকে দুই হাত বাড়িয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলাম আমি। পিঠে সান্ত্বনার হাত বুলিয়ে দিলাম। এতে আরও বেড়ে গেল ওর কান্না। বাধা না দিয়ে কাঁদতে দিলাম ওকে। তারপর নরম গলায় জানতে চাইলাম, ‘কী হয়েছিল, বলতো! হঠাৎ এমন হিংস্র হয়ে উঠলেন কেন উনি ? আগে তো কখনও তোর গায়ে হাত তোলার কথা শুনি নাই … এবারই প্রথম!’
সানজানা এবার নিজেকে সামলে নিয়ে চোখ-মুখ মুছে, হেঁচকি তুলতে তুলতে কান্না ভেজা ছেঁড়া ছেঁড়া এলোমেলো বাক্যে যা বলল তা জোড়াতালি দিয়ে আমি আমার মতো করে ঘটনা বুঝে নিলাম।
সঙ্গে সঙ্গে কল্লোলের কথা মনে পড়ে গেল আমার আর বুক চিরে একটা অদ্ভুত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। হ্যাঁ, কল্লোল আমার সঙ্গে যা করেছে সানজানা ঠিক একই কাজ করেছে ইমরানের সঙ্গে। কল্লোলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওকে তখন মারতে পারিনি আমি, কিন্তু সেই মুহূর্তে ওর টুঁটি চেপে ধরে ওকে মেরে কেটে রক্তাক্ত করার দুর্মর একটা ইচ্ছা প্রচণ্ড হয়ে জেগে উঠেছিল আমার ভেতরে। ইচ্ছা করছিল আমার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ওকে আঘাত করতে। দুই হাতে গলা টিপে ধরতে। আঁচড়ে খামচে একাকার করে নিজের মনের সমস্ত জ্বালা মিটাতে।
সানজানার জন্য কেন যেন এখন আর একটুও মায়া লাগছে না আমার। দুঃখ তো হচ্ছেই না বরং বিরক্ত লাগছে। ভয়ানক রাগ হচ্ছে ওর ওপর। যে প্রশ্নটা কল্লোলকে করেছিলাম শান্ত ভঙ্গিতে সেই একই প্রশ্ন করলাম সানজানাকে।
‘ইমরান ভাইয়ের সঙ্গে তো তোর সম্পর্কটা যদ্দুর জানি ভালোই চলছিল, তাহলে নাদিমের সঙ্গে আবার জড়িয়ে পড়লি কেন ? নাদিমের সঙ্গে তোকে দেখতে পেয়েই তো ইমরান ভাই এমন ক্ষেপে গেল! রাগ সামলাতে না পেরেই না এমন করে মারল তোকে!’
সানজানা মাথা নিচু করে বসে রইল। কল্লোলও ঠিক এভাবেই আমার সামনে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে রেখেছিল, যখন আমি তীব্র কণ্ঠে জানতে চেয়েছিলাম, ‘স্ত্রী হিসেবে আমার মধ্যে এমন কি অপূর্ণতা আছে যার জন্য তুমি নাসরিনের কাছে যাও ? বলো!’
‘আমি কি মানসিকভাবে তোমাকে যন্ত্রণা দিই ? তোমার মনের উপর কোনও চাপ প্রয়োগ করি ? আমার ব্যবহারে কষ্ট পেয়েছ কখনও ? আমাকে কি জীবনসঙ্গী হিসেবে অযোগ্য মনে হয় তোমার ?’
কল্লোলের উত্তর নেই।
‘শারীরিকভাবে তুমি কি অতৃপ্ত ? বলো… তোমার চাহিদা পূরণ হচ্ছে না ? কোথাও কি ঘাটতি আছে আমার… খামতি আছে ? বঞ্চনা আছে ? বলো খোলাখুলি, আমি শুনতে চাই,’ জোরে জোরে ডানে বামে মাথা নেড়েছিল কল্লোল। অস্ফুট কণ্ঠে বলেছিল, ‘না, না, সেরকম কিছু না।’
‘তাহলে ?’
কল্লোল নিরুত্তর। তার চোখ ভরে উঠেছিল পানিতে।
একইভাবে আমার সামনে জবুথবু হয়ে বসে থাকা সানজানার কাছেও জানতে চাইলাম আমি।
‘ইমরান ভাইয়ের সঙ্গে তোর আসলে সমস্যাটি কি, বল তো! চার বছরের সংসার তো ভালোই চলছিল, ফেসবুকে এত রোমান্টিক সব ছবি পোস্ট দিতি! মনে হতো, সুখে বাকবাকুম করছিস দুজনে …! এর মাঝখানে নাদিম ঢুকল কীভাবে ? গ্যাপটা কোথায় ছিল ?’
‘ব্যাপারটা তুই যে রকম ভাবছিস তেমন না।’ সানজানা এবার সোজা হয়ে বসে স্বাভাবিকভাবেই বলল।
‘নাদিমের সঙ্গে আমি মাঝে মাঝে একটু আধটু কথাবার্তা বলি, সেটা ঠিক। বিয়ের আগে থেকেই বলতাম। আসলে ওর সঙ্গে গল্প করতে ভালো লাগে সেই জন্য। একদিন শুধু একটা ক্যাফেতে বসে নাদিমের সঙ্গে কফি খেয়েছিলাম। সম্পর্কটা এই পর্যন্তই। আর ইমরানের সঙ্গে আমার সেরকম বড় কোনও সমস্যা নাই। কিন্তু তুই তো জানিস, ব্যবসার কাজে ও কত ব্যস্ত থাকে! আর আমার শাশুড়ি তো আছেনই, অশান্তি করতে ওস্তাদ, সারাক্ষণ আমার দোষ খুঁজে বেড়ান, এসব নিয়ে একটু ঝগড়া বা বলতে পারিস কথা কাটাকাটি হয়েছিল, সেজন্য কয়দিন ধরে বাবার বাড়িতে এসে থাকছি।’
আমি সানজানার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি, যেভাবে কল্লোলের দিকে তাকিয়েছিলাম। দেখছিলাম তার মুখের প্রতিটি অভিব্যক্তি, প্রতিটি ভাঁজ, প্রতিটি ভঙ্গি, প্রতিটি কম্পন, প্রতিটি সত্য লুকানোর প্রাণান্ত চেষ্টা…
‘এর মধ্যে শোন, কালকে সন্ধ্যায় নাদিম আসছে আমাদের বাসায়। তো আমরা ড্রইং রুমে বসেই চা খাচ্ছি, গল্প করছি এমন সময় হঠাৎ ইমরান এসে হাজির। ইমরানকে দেখে নাদিম আর বেশিক্ষণ থাকে নাই, চলে গেছে। তারপর ইমরান শুরু করল জেরা করা। নাদিম কে ? কত দিনের পরিচয় ? কী সম্পর্ক ওর সঙ্গে ? কতদিন ধরে সম্পর্ক ? তারপর নাদিমকে জড়িয়ে যাচ্ছেতাই বলতে শুরু করল আমাকে। দুশ্চরিত্র, মিথ্যেবাদী আরও কিসব বলতে শুরু করল। আমিও, বুঝিস-ই তো, এতসব মিথ্যে বাজে অপবাদ শুনে চুপ করে থাকিনি। রাগের চোটে ওকেও ইচ্ছামতো গালিগালাজ করেছি। এক পর্যায়ে তো কথায় না পেরে ঘরের দরজা বন্ধ করে ও মারপিট শুরু করল। আমিও ছাড়ি নাই খামচায়া কামড়ায়া একদম রক্ত বের করে দিছি।’
‘তারপর ?’
‘তারপর আর কি, চিৎকার শুনে ভাইয়া ভাবি আম্মা সবাই এসে দরজা ধাক্কাতে থাকল। ইমরান বলল, সে আমার মুখ আর দেখতে চায় না। তারপর কাউকে কিছু না বলে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল! বল, এটা কি ও ঠিক করছে ?’
আমি এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। বান্ধবী হিসেবে আমার তো সানজানার পক্ষই নেওয়া উচিত। কিন্তু কেন যেন মন সায় দিচ্ছে না। মন বলছে, সানজানা দোষী। তবে এটাও ঠিক, সানজানার প্রতি ইমরান যে সহিংসতা দেখিয়েছে সেটা অবশ্যই অন্যায় হয়েছে। মুখে বলি, ‘এইভাবে নাদিমের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া তোর একদম ঠিক হয়নি। ইমরান তো রিএ্যাক্ট করবেই!’
সানজানা দুই হাতে তার মাথার লম্বা চুলগুলো টেনে একটা খোপা বাঁধতে বাঁধতে বলল, ‘কী আবোল তাবোল বলছিস এসব, নাদিমের সঙ্গে জড়াব কেন ? ওরও তো সংসার আছে, বাচ্চা আছে … জড়ানোর প্রশ্নই আসে না! এক এলাকাতে থাকি, বহুদিনের চেনা জানা …’
আমার মনে পড়ল, কল্লোলও ঠিক এভাবেই নিজের সাফাই গাইছিল, বলেছিল, ‘বিশ্বাস করো, আসলে নাসরিনের সঙ্গে আমার তেমন কোনও সম্পর্ক, মানে তুমি যেমন ভাবছ সেরকম কিছু নেই। নাসরিন খুব ভালো মেয়ে। ওর হাজবেন্ডও ভালো। ওই একটু এডজাস্টমেন্টের সমস্যা হচ্ছে ওদের। সেসব নিয়ে আমার সঙ্গে মাঝে মাঝে আলাপ আলোচনা করে আর কি …’
‘জগতে এত মানুষ থাকতে তোমার কাছে কেন আসতে হবে ? তুমি কি কাউন্সিলার ? সাইকিয়াট্রিস্ট ? বলো ? নাকি তোমার সিমপ্যাথি আদায় করতে আসে ?’
কল্লোল নিশ্চুপ।
‘সত্যি করে বলো, ওর প্রতি কোনও দুর্বলতা নেই তোমার …’
‘নাহ! প্রশ্নই আসে না!’
কল্লোল এক কথায় উত্তর দেয়। এবার সত্যিই রাগ উঠে যায় আমার।
‘তাহলে সারাক্ষণ ওর সঙ্গে ইনবক্সে কি মেসেজ চালাচালি করো ? ফোনে দুইজনের কী এত গোপন কথা ? যেসব কথা আমার সামনে বলা যায় না! সারাক্ষণ তোমার টেবিলের সামনে বসে ও কী বলে, শুনি ? বলো, নাসরিনের মধ্যে কী এমন আছে যা আমার মধ্যে তুমি পাও না !’
কল্লোল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, ‘তুমি যেরকম নির্দিষ্ট করে প্রশ্ন করছো, সেরকম নির্দিষ্ট কোনও উত্তর আমার কাছে নেই। ফোনে, ইনবক্সে তেমন কোনও গোপন কথাও বলি না। চাইলে তুমি দেখতে পারো।’
কল্লোল তার ফোন এগিয়ে দেয়। সব মেসেজ টেসেজ মুছে ফেলা ফোন আমি কি চেক করব ? এইসব চেক করার রুচিও নেই আমার।
কল্লোল গাঢ় কণ্ঠে বলে, ‘আমি তোমাকেই ভালোবাসি, তোমার সঙ্গেই থাকতে চাই। আবার হ্যাঁ, তোমার কাছে অস্বীকার করব না, নাসরিনকেও আমার ভালো লাগে। কিন্তু সেটা উদ্দেশ্যহীন, নীরব অন্য রকম একটা ভালো লাগা। একটা সহানুভূতির মতো! কিংবা নিছক একট বন্ধুত্ব! মানুষের মন বড্ড জটিল, রিয়া, বড্ড রহস্যময়। তুমি এখানে সব সময় দুইয়ে দুইয়ে চার মিলাতে পারবা না।’
‘দেখো তোমার এইসব ভাবের কথা আমি বুঝি না। হয় এসপার নয় ওসপার! হয় রিয়া নয় নাসরিন। একজনকে বেছে নিতে হবে তোমার। বুঝতে পেরেছ ? দুই নৌকায় পা রাখলে চলবে না। একবার এদিকে, একবার সেদিকে… নো! হবে না! ঘরে একজন বউ থাকবে আর বাইরে থাকবে প্রেমিকা, কী চমৎকার ব্যবস্থা! এসব আমি বরদাস্ত করব না। নিজের মনকে জিজ্ঞেস করো কাকে চাও ? ব্যস!’
একই কথা সানজানাকেও বললাম আমি।
‘ইমরানকে চাস, নাকি নাদিমকে ? সেটা ঠিক কর আগে…’
‘আরে, ওরা কি কোনও বস্তু নাকি ? বলে দিলি, আলমারি চাও নাকি ড্রেসিং টেবিল ? আম নেবে, নাকি কলা ? এমনভাবে জানতে চাইছিস, যেন কত সহজ এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া। তুই না আর ঠিক হলি না, রিয়া! সব প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া যায় না, হ্যাঁ এবং নায়ের মাঝখানে আরও আনেক কিছু থাকে। এটাই তুই বুঝিস না!’
এবার আমার উপরেই ধমকে উঠল সানজানা। কল্লোল আর সানজানার কথায় কাজে অনেক মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম আমি।
কল্লোলকে বলেছিলাম, ‘এসবই নিজের অপকর্ম ঢাকার জন্য বলছ তুমি! দুর্জনের ছলনা এইসব!’
কল্লোল খুব কাতর কণ্ঠে বলেছিল, ‘বিষয়টা এত সোজা নয় রিয়া, মানুষের মন খুব বিচিত্র! এইখানে যেমন তুমি জবরদস্তি করতে পারো না, তেমনি আবার সব কিছুকে নেহায়েৎ প্রেম ভালোবাসার মধ্যে বেঁধে ফেলতে পাবো না। এর বাইরেও সম্পর্কের আরও নানা ধরন আছে।’
‘দেখো, আমি প্রেম বলতে সহজভাবে একনিষ্ঠতাকেই বুঝি। হয় ভালোবাসবে নয়তো নয়। হয় সাদা, নয় কালো। মাঝামাঝি কিছু নেই। ’
ঠোঁট চেপে বলেছিলাম আমি। আমার কথায় বিরক্তি প্রকাশ করেছিল কল্লোল।
‘উফ! তুমি সবকিছু খুব মোটা দাগে দেখো! একজন মহিলা আমার সঙ্গে কথা বলতে এলে আমি তাকে তাড়ায়া দিবো ? একটু কথা বলতে পারবো না ?… তুমি সামান্য কিছুতেই দোষ ধরে ফেলো! নিজের মতো সিদ্ধান্ত দিয়ে দেও! এ জন্যই তোমার সঙ্গে আমার মিলছে না।’
‘না মিললে নাই। স্পষ্ট করে বল! আমি সম্পর্কের স্বচ্ছতায় বিশ্বাস করি। এইসব সূক্ষ্ম প্রতারণা আমি আর একটুও নিতে পারছি না।’
‘তুমি তাহলে আমাকে প্রতারক বলতে চাইছ ? এত সংকীর্ণ একরৈখিক চিন্তা ভাবনা তোমার ? আমি প্রতারণা করি তোমার সঙ্গে ? এমন কথা বলতে পারলে তুমি ? এতদিনে আমার সম্পর্কে তোমার এই ধারণাই হয়েছে তাহলে ? বেশ থাকো তুমি তোমার ধারণা নিয়ে ..!’
কল্লোল রাগ করে বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে তাও আজ প্রায় তিন দিন হতে চলল। কোথায় গেছে, কার কাছে গেছে, কী করে, কিছুই জানি না। ফোন তো করেই না। কোন খবরও দেয় না। ইচ্ছা করলে আমি ওর অফিসে ফোন করে খবর নিতে পারি, কিন্তু আমারইবা কি দায় পড়েছে অত খোঁজ খবর নেওয়ার! যদি অন্য কারও দিকে তোমার মন ছুটে যায়, যদি আমাকে ভালোই না বাসো তবে এই রুগ্ণ তিক্ত সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখার কোনও কারণ দেখি না আমি। বরং বিচ্ছেদই ভালো।
সানজানার বোধহয় এতক্ষণে খেয়াল হয় যে কল্লোল বাসায় নেই।
‘এই, কল্লোল ভাই কোথায়রে ? আজকে না ছুটির দিন!’ সে জানতে চায়।
‘কোথায় আবার ? জাহান্নামে! তোর মতো একই কেস! ইমরান ভাই তো তবু তোকে মাইরা পিটায়া মনের ঝাল মিটাইতে পারছে, আমি তো তাও পারি নাই! একা একা ফুঁসতেছি!’
‘ওফ! তুই একটা যা তা! কল্লোল ভাইয়ের মতো ভালো মানুষকে তুই সন্দেহ করিস!’
চিৎকার করে উঠল সানজানা। সেই চিৎকারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই যেন আমার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। চমকে উঠলাম, নিশ্চয়ই কল্লোল। অপরিচিত নম্বর ধরতেই ওপাশ থেকে পুরুষ কণ্ঠস্বর শুনলাম।
‘রিয়া, আমি ইমরান। সানজানাকে প্লিজ আরেকটু সময় আপনার কাছে আটকে রাখেন না! আমি এখনি আপনার বাসায় আসছি!’
আমি কিছু বলার আগেই ওপাাশ থেকে ফোনটা কেটে গেল। ইমরান আসবে শুনে গজগজ শুরু করল সানজানা।
‘ইশ, আসলেই বা কি ? ওর সঙ্গে আমি আর নেই। এটাই ফাইনাল! অনেক হয়েছে। একটা সন্দেবাতিকগ্রস্ত লোক! অসভ্য! ইতর! জীবনটা ছারখার করে দিল আমার!’
ভেবেছিলাম সানজানা বুঝি রেগেমেগে এক্ষুনি চলে যাবে। কিন্তু ঠিকই এটা সেটা গল্প করে ইমরান না আসা পর্যন্ত বসেই রইল ও।
কলিং বেলের শব্দ পেয়ে দরজা খুলে, উস্কুখুস্ক বিষণ্ন চেহারায় দাঁড়িয়ে থাকা ইমরানকে দেখে ঝাঁঝিয়ে উঠলাম আমি, ‘ছিঃ, আপনার কাছে কখনও এমনটা আশা করিনি, এইভাবে ওকে মারতে পারলেন, আপনি ? ভদ্রলোকেরা কখনও স্ত্রীর গায়ে হাত তোলে ? তাও এভাবে! ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স করছেন আপনি। পুলিশে দেয়া দরকার আপনাকে।’
ভদ্রলোক তার ক্ষতবিক্ষত ডান হাতটা সামনে বাড়িয়ে দিলেন, ‘এই দেখেন, আপনার বাঘিনী বান্ধবীর কামড়ের দাগ! রক্ত জমে কেমন লাল হয়ে আছে! আরও দেখতে চান ? এই যে েেদখেন গলার উপর এগুলো ওর নখের খামচির চিহ্ন…’
‘বা বা! তাহলে তো ভালোই হলো! কেউ কারে নাহি ছাড়ে, সমানে সমান! দুজন দুজনকে মেরেছেন, শোধ বোধ হয়ে গেছে!’
‘কিসের শোধ বোধ এ্যাঁ ? ওর সঙ্গে অনেক হিসাব নিকাশ বাকি আছে আমার!’
পেছন থেকে হুংকার দিয় উঠল সানজানা। ওদেরকে নিজেদের হিসাব নিকাশ মিটাতে ড্রইং রুমে রেখে ভেতর দিকের দরজাটা টেনে বন্ধ করে আমি চলে এলাম রান্নাঘরের নির্জনে, আমার নিজস্ব এলাকায়। ফ্রোজেন কাবাব আর সমুচা নামালাম। পাথরের মত শক্ত হয়ে আছ। বরফ গলতে অনেক সময় নেবে। নিক। সবকিছুকেই স্বাভাবিক হতে উপযুক্ত সময় দিতে হয়। কল্লোল আমার হাতে তৈরি করা পুডিং খেতে পছন্দ করে। সেই কথা ভেবে চুলায় দুধ জ্বাল দিতে বসালাম। এখন খুব সজাগ থাকতে হবে। নইলে দুধ উথলে উঠে পাত্রের বাইরে গড়িয়ে পড়ে সব শেষ। ঘণ্টাখানেক লাগিয়ে ঘন দুধ ঠান্ডা করে, কয়েকটা ডিম ফেটিয়ে, পরিমাণমতো চিনি, এলাচ গুঁড়া আর ভ্যানিলা এসেন্স মিলিয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা স্টিম করে চমৎকার একটা পুডিং বানালাম। ওদিকে বরফ গলে নরম হয়ে আসা সমুচা আর কাবাব গরম তেলে মুচমুচে করে ভেজে তুললাম। ফ্রিজ থেকে আপেল নামিয়ে টুকরো টুকরো করে কেটে প্লেটে রাখলাম। চা বানালাম। সবশেষে ট্রেতে চা নাস্তা সাজিয়ে ড্রইং রুমের দরজায় নক দিলাম।
বেশ স্বাভাবিকই মনে হলো সানজানা আর ইমরানকে। যেন প্রচণ্ড ঝড়ের তাণ্ডব শেষে প্রকৃতি শীতল হয়ে এসেছে। ভ্যাপসা গরমের পর চারিদিকে মৃদু মিষ্টি ভেজা ভেজা হাওয়া বইছে। দূর থেকে মৃদু ভেসে আসছে অচেনা কোন ফুলের সুগন্ধ।
‘কিরে, শেষ পর্যন্ত ঝগড়া মিটলো তোদের ?’ হাল্কা গলায় জানতে চাই আমি।
‘আসলে মানে একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। দাম্পত্য সম্পর্কে এমনটা তো হয়ই, এখন আলোচনা করে, কথা বলে সব কিছু ঠিক হয়ে গেছে ভাই। দুজনই নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছি।’
ইমরান কুণ্ঠিত গলায় বলল। সানজানাও দেখলাম মাথা নিচু করে ইমরানের কথায় নীরবে সায় দিচ্ছে।
চোখে নবদম্পতির মতো লজ্জা, ঠোঁটের কোণায় মিটি মিটি হাসি, চেহারায় বেশ একটা শান্ত সুশীল গদ্্গদ্্ ভাব ঝুলিয়ে হাত ধরাধরি, গা ঘেঁষাঘেষি করে বিদায় নিলো দুজন। বাহ বেশ একটা ‘মধুরেণ সমাপয়েৎ’ হলো বটে!
দরজা বন্ধ করে খালি ঘরের দিকে তাকিয়ে কল্লালের জন্য হঠাৎ বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল আমার। কোন পাষাণ বুকে নিয়ে সে এতদিন ধরে দূরে সরে আছে ? একবারও কি তার নিঠুর প্রাণ আমার জন্য নিঃশব্দে কেঁদে ওঠে না ? চোখের পানি সামলে নিয়ে মোবাইল ফোনটা হাতে তুললাম আমি, এবার বোধহয় রাগ-অভিমান ভুলে কল্লোলকে একটা কল করার সময় হয়েছে।
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



