আর্কাইভগল্প

অলকানন্দা, মাধবীলতা অথবা মার্চি : মোস্তফা তারিকুল আহসান

প্রচ্ছদ রচনা : গল্পসংখ্যা ২০২৪―গল্প

নতুন বাসায় ওঠার পর থেকেই দুই ভাই-বোনের মন খারাপ। মন খারাপ আমারও কম নয় তবে বলতে পারি না কাউকে। ওদের বাবা তো আসতে চাইত না কখনও। তবে টাকা-পয়সার টানাটানিতে সে আর না করেনি। শেষ পর্যন্ত নানা ধার দেনা করে এই নতুন বাসাতে উঠতে পারলাম আমরা। বাসা ছোট হলেও নিজের তো! তবে একসঙ্গে আঠাশ জনের অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের চার তলার ডি ব্লকে আমাদের বাসা। ভেতরে জায়গা কম। চৌদ্দশ স্কয়ার ফিটেরও কম। আমি ঠিক মাপটা জানি না। ছেলেমেয়েদের দুটো রুম আর আমাদের এক রুম জুটল যেটা আসলে একটা গেস্ট রুম। খুব ছোট। খাট পাতলে আর নড়াচড়ার জায়গা থাকে না, খাট থেকে নামলে বাথরুমের দরজার সঙ্গে গা লেগে যায়। আমি তো একসময় বলেছিলাম ওদের বাবাকে, তোমার কোন মিস্ত্রি এই রকম ঘর বানালো ? এর চেয়ে আমি বানালে তো ভালো ডিজাইন করতে পারতাম। রমার বাবা বলেছিল, তাই নাকি ? তোমার পেটে যে এত বিদ্যে তা তো জানতাম না।

খুব চকচকে না হলেও আর অন্যদের মতো খুব আধুনিক না হলেও আমাদের বাসাটা মোটামুটি সাজানো হয়েছে। রঙ থেকে শুরু করে আসবাব বেশ পছন্দসই বলা যায়। মেঝে বাথরুম ও রান্নাঘরের টাইলস বা গ্রানাইট আমরা পছন্দ করে কিনেছি। যদিও সব দেশি। বিদেশি কেনার ইচ্ছে হলেও কেনার ক্ষমতা ছিল না। দরজা মেহগনি কাঠের তবে ডিজাইনগুলো আমরা ঠিক করে দিয়েছিলাম। ছেলের ইচ্ছে অনুযায়ী যে ঘরটাতে সে থাকবে তার বাথরুমে একটা বাথটাব বসিয়ে দিয়েছি। এটাতে রমার বাবার আপত্তি ছিল। আমি বলেছি, ওদের তো এমনিতেই ফ্লাট পছন্দ না, তার ওপর যখন একটা দাবি করেছে  চলো সেটা মেটাই। বেশ খরচা হলো। ঝামেলাও হলো। বাথরুমের ফিটিংস দেশি তবে বেশ দামি আর পছন্দের। আমি মোটামুটি সন্তুষ্ট তবে রমার বাবার বইপত্রের জন্য নতুন কোনও আলমারি বানানো হয়নি এখনও। জায়গাও তেমন নাই রাখার। পুরনোগুলোই ঘসে মেজে রাখা হয়েছে। বইয়ের সংখ্যা তো কম নয়। টাকা পেলে বই কেনে, ভালো বই পেলে বাকিতেও কেনে। বাবার দেখাদেখি দুই ভাইবোনও ইদানীং বই কিনছে। তারা খুব পড়ে না। তাদেরও দুটো ছোট আলমারি আছে। সেগুলো ওদের ঘরে রাখা হয়েছে মানানসই করে। ও বলেছে, টাকা-পয়সা ম্যানেজ করে আরও আলমারি বানাবে। আপাতত রান্নাঘরের ওপরের কার্নিশে, মাস্টার বেডের বাথরুমের ফলস ছাদে অনেক বই স্তূপ করে রাখা হয়েছে। চারটে পুরনো  আলমারি রং করে খাড়া করে রাখা হয়েছে ড্রয়িং রুমের দেয়ালে ঠেস দিয়ে। সেখানে তার প্রিয় বইগুলোর জায়গা হয়েছে মোটামুটি। তবে এখানে বইয়ের আলমারি রাখা নাকি ঠিক নয়। পাশের বাসার শাহানা ভাবি বলেছে এটা নাকি ফ্ল্যাটের থিমের সঙ্গে যায় না। আমি রমার বাবাকে একবার বলেছিলাম। সে বলেছে, বাদ দাও তো। কে কী বলল, কীভাবে কী করল তা দেখে আমাদের কি ? আমি বললাম, তোমার বাড়িতে অন্য ফ্ল্যাটের লোকজন আসবে না ? তারা দেখে কী বলবে ? তুমি তোমার বন্ধু রাতুলের বাসা দেখেছ ? আমি গিয়েছিলাম। কী সুন্দর করে সাজানো। রমার বাবা বলে, দেখো, অনেক করেছি, আরও করব। এত মন খারাপ করার কিছু নেই।’ আমি জানি ওর অবস্থা। গলা সমান দেনা। তারপর দুজনের লেখাপড়ার খরচ দিন দিন বাড়ছে। বাজার খরচ বাড়ছে, ওদের চাহিদা বাড়ছে। রমা কলেজ শেষ করেছে,ভর্তি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে, কপাল ভালো এখানেই পড়ছে, না হলে খরচ আরও বাড়ত। আফসান তো কলেজে। সব মিলিয়ে ওর বাবার ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। আমি আর কিছু বলি না। সে তখন বলে, মৃত্তিকা, শোনো, আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখবা।

আজ রাত আমরা প্রথম এ বাসাতে কাটাব। বাইশ বছরের বেশি কোয়ার্টারে ছিলাম। ক্যাম্পাসে মোট চারটে বাড়িতে আমরা বিভিন্ন মেয়াদে থেকেছি। শেষে যে বড় দোতলা বাড়িতে ছিলাম, সেটাও প্রায় আট-নয় বছরের মতো। কেন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। দুই ভাইবোন ডাইনিং টেবিলে খেয়ে নিয়েছে চুপচাপ, কোনও কথা বলেনি। অন্য সময় হলে কত কথা বলত। রাজনীতি, গান, সিনেমা, সরকার, বিশ্বপরিস্থিতি কত কিছু। খাওয়া-দাওয়া নিয়েও অনেক আপত্তি তোলে দুজন। একজন হয়তো বলবে মাছ খাব না। আরেক জন বলবে তরকারি বিচ্ছিরি হয়েছে। তবু আমি যখন বলি শেষ পর্যন্ত খেয়ে নেয় বা বিকল্প কিছু করি তৎক্ষণাৎ। কিন্তু আজ কোনও কথা বলল না কেউ। কোনও রকমে নাকে-মুখে অল্প একটু গুঁজে দিয়ে চলে গেছে। রমার বাবাও ছেলেমেয়েদের চুপচাপ ভাব দেখে থেমে ছিল। তার হাবভাব বোঝা গেল না। আমি দু-একটা কথা বলতে গিয়ে কোনও উত্তর না পেয়ে চুপ করে ছিলাম। এত গম্ভীর পরিবেশ খাওয়ার টেবিলে আমাদের সংসারের চব্বিশ বছরে প্রথম দেখলাম। দুই ভাইবোন তাদের ঘরে গিয়ে দরজা দিয়ে দিল। বোঝা যাচ্ছে রাগে দরজা দিচ্ছে। রাগ থামলে খুলবে। কখন থামবে জানি না। আমি টেবিলে বসলাম। রমার বাবা আমাদের ঘরে গিয়ে সম্ভবত ওয়াশ রুমে উঁকি দিয়ে চলে এল। বসল আমার সামনে।

বাসা পাল্টানোর ঝামেলা ছিল। বেশির ভাগ জিনিসপত্র গতকালকেই এখানে আনা হয়েছিল। আজ বাকিগুলো এনে আমরা বিকেলে উঠলাম। তার পর থেকে থমথমে ভাব। আগেভাগেই যদিও সবাই জানে, দেখেছে কয়েকবার, তবু বাসায় ওঠার পর যেন মনে হচ্ছে কিছুই ঠিক নেই। নতুন এক গ্রহে যেন উঠেছে সবাই। আমার কথা আমি আলাদা করে বলতে পারছি না। কার সঙ্গেই বা বলব। রমার বাবা একটা পত্রিকা নিয়ে বসেছে। বুঝতে পারি তারও কথা বলার মুড নেই। ও বাড়িতে ওর একটা ছোট্ট পড়ার ঘর ছিল রান্নাঘরের পাশে। সেখানে সে সময় পেলে পড়তে বসত। এলোমেলো বই খাতা টেবিল চেয়ার; ছোট্ট একটা ডিভানে তার কিছু কাপড়চোপড় স্তূপ করে রাখা। ওপরে উঠে জামা কাপড় আনার ঝামেলা বলে এখানেই রেখে দেয়। আর ঝটপট পরে চলে যায়। আমি অনেকবার বলেছি গোছাতে, সে সেকথা শোনে না। দু’একবার বলেছে, গোছানোর সময় কখন, ততক্ষণে দুএক-পাতা বই পড়তে পারি।

আমি বললাম, কী পড় ?

সে বলে, কিছুই না।

তারপর আবার বলে, জানো, মৃত্তিকা, গোটা পৃথিবীতে একটা লোক নেই যে ইসরাইলকে থামায়। প্রতিদিন কয়েক শ করে লোক মারা যাচ্ছে। চল্লিশ হাজার মানুষ মারা গেল। জাতিসংঘ ঠুঁটো জগন্নাথের মতো বসে আছে। তার কোনও ক্ষমতা নেই। আমেরিকা অস্ত্র দিচ্ছে মানে বিক্রি করছে। আর মারা যাচ্ছে বেশির ভাগ শিশু ও নারী। হাসপাতালে স্কুলে বোমা ফেলছে, লোকজনের খাবার নেই, ওষুধ নেই, রক্তাক্ত মানুষজন চিৎকার করছে। বোমার ভয়ে নিরাপাত্তর জন্য হন্যে হয়ে ছুটছে মানুষ। একটা বাচ্চা মেয়ের সাক্ষাৎকার পড়ছিলাম, সে চিৎকার করে,তার মুখে তীব্র ঘৃণার চিহ্ন, সে চোখের জল মুছতে মুছতে বলে, আপনারা গাজায় আসুন, দেখুন, আমরা কীভাবে মারা যাচ্ছি, কোনও মানুষ কি নাই আমাদের পাশে দাঁড়াবার ? আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। এই কথা সে এখন কেন বলছে ? এসব তো অনেক দিন ধরে চলছে। পরে মনে হলো আমরা যে মন খারাপ করে বসে আছি, আমাদের কিছু বিলাসিতা কমে যাচ্ছে বলে, তাই কি সে এই প্রসঙ্গ তুলল ? নাও হতে পারে। আবার হতেও পারে। আমি কোনও উত্তর দিলাম না। সে পেপারটা রাখল। তারপর বলল, তোমার মনে পড়ছে না, রাতে খাবার পর, আমরা যখন কয়েকবার পায়চারি করতাম তখন মাধবীলতা আর হাসনুহেনার সৌরভে সারা বাড়ি মাতোয়ার হয়ে যেত। এখানে তো কোনওদিন তা আর পাবে না। আমি উত্তর দেবার প্রস্তুতি নেব ভেবেছি তখন সে আবার বলে, আমার চেয়ে, ছেলেমেয়েদের চেয়ে তোমার কষ্ট তো আরও বেশি। সব কিছুতেই তো তোমার যুক্ততা ছিল সবচেয়ে বেশি। আমি বললাম, কোনদিকের কথা বলছো ? সে বলে, ধরো, তুমি চল্লিশটা ফুলের টব নিয়ে এসেছ, আরও চল্লিশটা তো আনতে পারনি, কত রকমের ফুল, কতভাবে তুমি সংগ্রহ করেছ, পুরনো বাসা থেকে মাটিসুদ্ধ, কখনও টবে এনেছ, আমি অনেকগুলোর নাম পর্যন্ত জানি না, তোমার কত শখের গাছপালা―সফেদা, আতা, নারকেল, জামরুল, পেয়ারা. কামরাঙা, লেবু, করমচা, সজনে, এলাচ, মেহেদি, চেরি আরও কত কী ? তোমার বড় একটা চাড়িতে শাপলার ফুল ফুটত বর্ষাতে ? সেটাও তো রেখে এসেছ, তাই না ? বটের বনসাইটা আনতে পারনি তো, কত করমের অর্কিড ছিল, ফণিমনসার মতো কাঁটাযুক্ত পাথরের মতো ছোট গাছটা ছিল, আনতে পারছ ? আমি বলি, এই সব কথা এখন থাক। মার্চিকে আনতে পারিনি সেটাই আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট। ছেলেমেয়েরা তো কান্নাকাটি করল। কত চেষ্টাই না করলাম। তুমি তো তখন ছিলে না, লোকজনের পিছন পিছন ঘুরছ। কোনও জিনিস যাতে নষ্ট না হয়, হারিয়ে না যায় সে কথা আমিই তোমাকে বলেছিলাম। তুমি বোধ হয় মার্চির কথা ভুলে গিয়েছিলে ? সে  ঢাকনা দেওয়া প্লাস্টিকের বড় ঝুড়িতে ঢুকবে না কিছুতেই। রমা ওকে কোলে করে রাখল অনেকক্ষণ, মার্চি ওর মুখের দিকে তীব্রভাবে তাকিয়ে আছে। তারপর গাড়িতে তোলার চেষ্টা করল, সে চিৎকার করে ওর গায়ে আঁচড় দিল, ও ছেড়ে দিল। সে বেরিয়ে গেল। একটা পাটের বস্তার মধ্যে আটকাতে চেয়েছিলাম, সে গেল না কোনওভাবেই। ম্যাও ম্যাও করে সে লেজ ঘষতে লাগলো আমার পায়ে। চোখটা রাগে কেমন যেন হয়ে গেছে। কীভাবে যেন তাকাচ্ছে। আমরা ওকে একা রেখে আমাদের বাড়িটা ছেড়ে চলে আসব সেটা সে মানতেই পারেনি। ও তো এখানে এসে থাকতেও পারবে না। সে আর কথা বলে না। আমি কী একটা বলতে গেলে আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, শোনো আর কদিন থাকলে তোমার বাতাবি লেবু ধরত, কাঁঠাল ধরত, নারকেল ধরত, মৌসুন্ডির কথা তো মনে আছে, কী বাহারি ফুল ফুটবে কদিন পরে, করবীর গাছটা বড় হয়েছে, এবার ফুল ফুটত, রক্তকাঞ্চনের গাছটা আমরা সাত নম্বর থেকে এনেছিলাম, চাপার গাছটাও কত বড় হয়েছে। একটা বনকাঁঠালের চারা এনেছিলে, বাড়ির পেছন দিকে কলাগাছের কাছে লাগালে। আমগাছগুলো তো আমরা লাগাইনি, ওদের জন্য তোমার মায়া কম একটু, তাই না ? আমি বলি, তুমি এত কথা মনে করিয়ে দিচ্ছ কেন ? তোমার উদ্দেশ্য কী ? আমাকে তো সব ভুলে যেতে হবে, নাকি ? তুমি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সব তুলে আনতে চাও কেন ? সে বলে, না আসলে, কেন জানি সব মনে পড়ছে, ভাবতাম গাছপালা ফুল ফল জঙ্গল মিলে ও বাড়িটা ছাড়লে তেমন কিছু হবে না, কিন্তু মনে হচ্ছে এদের অনেক শক্তি। সে ঝিম মেরে থাকে। আর কথা বলে না। আমি চুপ করে থাকি।

আঠাশ পরিবারের অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে কে কোথায় আছে, কে কী করে, কার নাম কি আমি কিছুই জানি না। রমার বাবা জানে মোটামুটি। তবে সবার সঙ্গে ওর ঘনিষ্ঠতা নেই। দুএকজনের সঙ্গে একটু অন্তরঙ্গ সম্পর্ক আছে। প্রায় আটবছর ধ’রে হচ্ছে কাজ। আরও আগে হতে পারত। কী সব ঝামেলায় হয়নি। আমাদের টাকা-পয়সা ছিল না সেজন্য একটু সুবিধাই হয়েছে দেরি হওয়াতে। আর ততদিনে আমরা ক্যাম্পাসের কোয়ার্টারে আরও বেশিদিন থাকতে পেরেছি। ক্যাম্পাসের সর্বশেষ বাসাটা যে খুব আহামরি তা নয়। রমা যখন হয় তখন আমরা শহর থেকে একদিন হুট করে চলে এলাম। ওর বাবা স্থানীয় এক গুন্ডার ব্যবহারে ক্ষিপ্ত হয়ে চলে আসে। এমনিতেই আসতাম ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাওয়া শুরু করলে। সেটা ছিল একটা টিনের ঘর। বৃষ্টির দিনে টিনের চালে বৃষ্টি হলে খুব আনন্দ হতো। বাড়ির সামনে পিছনে বারান্দা, দুটো বড় ঘর আর বারান্দায় আরও একটা ছোট ঘর ছিল। রান্নাঘর আলাদা। ভেতরের বারান্দায় বড় একটা বাথরুম। পিছন দিকে পাকা একটা উঠান। সেখানে রান্না করার একটা ঘর ছিল। সেই ঘরের সঙ্গে মাজা ভাঙ্গা একটা আমগাছ। তার পেছন দিকে চার-পাঁচ কাঠা লম্বা জমি। কয়েকটা আম গাছ একটা সজনে গাছ আর একটা কাঁঠাল গাছ। বাড়ির সামনেও একটা কাঁঠাল গাছ ছিল। রমা তখন কোলে কোলে থাকে। মাটিতে রাখলেই চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। এখানে এসেই আমার গ্রামের বাড়ির কথা মনে পড়ে। আমাদের বাড়িটাও টিনের ছিল আর আম্মা বাইরের উঠানে রান্না করত। আব্বা বাজার করে আনে আর আম্মা রান্না করে। আমার বাড়ির কথা মনে হয়, আপার কথা মনে হয়, ফুফির কথা মনে হয়, ছোট দুটো ভাইয়ের কথা  মনে হয়। ভাইগুলো এখন অনেক বড় হয়েছে।

আমি ভাবতে থাকি। দেখি রমার বাবা দু কাপ চা নিয়ে এসেছে। এখন তার ঘুম আসবে না। আমি চা খাব না জেনেও নিয়ে এসেছে, যদি খাই। সে বলল, মৃত্তিকা চা খাও, কিছু ভাবছিলে মনে হয় ? আমি চায়ে অভ্যাসবশত এক চুমুক দিলাম। আমি বললাম, বাইশ বছরের বেশি ক্যাম্পাসের কোয়ার্টারে ছিলাম, সব মনে পড়ছে। কত কথা কত কিছু কত মানুষ কত গল্প। টিনের বাড়িটার কথা ভাবছিলাম। ওখানে আমরা কতদিন ছিলাম ? রমার বাবা বলল, প্রায় চার বছর। ওখান থেকেই তোমার রমা প্রথম স্কুলে গেল। প্লেতে ভর্তি হলো সাড়ে তিন বছর বয়সে। তোমার মনে আছে বড় দিঘিটার পাশ দিয়ে বোটানিকাল গার্ডেনকে পূর্ব পাশে রেখে আমি ওর হাত ধরে স্কুলে যেতাম। সে হা করে চারদিক দেখত। পুকুরের মাছ, হাঁস, সাপ, বেজি, কাঠবেড়ালি, শেয়াল, কুকুর সব দেখত। প্রথম দিন রিকশা দেখেই আমাকে একদিন বলল, বাবা এতা কি ? আমি বলি রিকশা, সে বলে, রিস্কা। আমি হাসলে সে বলে, হাছো কেন ? আমি বলি, তুমি যেদিন যেতে পারতে না সেদিন আমি যেতাম, আমার সঙ্গেও একই রকম করত। যা দেখে তাতেই বিস্ময়। আচ্ছা একটা সত্যি কথা বলো তো, তুমি বাইরে না থেকে সারাটা জীবন ভাঙাচোরা এই ক্যাম্পাসের বাসায় থাকতে চাইলে কেন ? তোমার তো টাকার সমস্যা। বাইরে তো প্রায় তিনভাগের একভাগ ভাড়া ছিল। তাহলে ? প্রশ্ন করেই আমার মনে হলো আমাকে এই প্রশ্নের জবাব সে বহুবার দিয়েছে। এমনকি যখন খুব অভাব গেছে আর দিন চলে না তখন বাসা খুঁজতেও গেছে আমার কথামতো। কয়েকবার বাসা ঠিক করার পরও আমরা শেষ পর্যন্ত যেতে পারিনি। সেটা অবশ্য দুই ছেলেমেয়ের জন্য। একবার তো সবকিছু ঠিক হলো। তখন আমরা রমা আর আফসানের পছন্দ অনুযায়ী একটা বড় দিঘির পিছনে লম্বা একটা বাসায় থাকি। রক্ষণাবেক্ষণের খরচসহ প্রায় বিশ হাজার টাকা মতো ওদের বাবার বেতন থেকে কেটে নেয়। বাসা ঠিক হলো আট হাজার টাকায়। ওর বাবা একটু হাফ ছেড়ে বাঁচবে। তিনতলায় চারটা রুম, দুটো বাথরুম, ডাইনিং-ড্রইং। বেশ সুন্দর বাসা। আমরা সবাই মিলে দেখতে গেলাম। কে কোন রুমে থাকব সব ঠিক হলো। মাসের প্রথম তারিখ উঠব। অ্যাডভান্সও দেওয়া হলো। বাড়ি ফিরে এসে মুখ গম্ভীর করে দুই ভাইবোন বসে থাকল। রাতে কিছু খাবে না বলে ঘোষণা দিল। আমি রমাকে জিজ্ঞেস করলাম। বলো তো কী হলো মা। সে বলে, ও বাসায় যাব না। আমি বলি কেন ? সে বলে, আমার পুুকুরের কী হবে। ও তখন ক্লাস সিক্সে আর আফসান ফোরে। আমি কী বলব খুঁজে পাই না। আমি জানি পুকুরটা ওদের খুব প্রিয়। ওখানে ওরা বাবার কাছে সাঁতার শিখেছে। প্রায়ই দুজন সাঁতার কাটে। সাইকেল চালানোও বোধ হয় এখানে শিখেছে। সাঁতারের আগেই সাইকেল চালানো শিখল। সারা ক্যাম্পাস সাইকেল চালিয়ে ঘুরে বেড়ায় বার চৌদ্দজন একসঙ্গে। অন্য খেলা তো আছেই। আমাদের বাড়ি হলো সবার খেলাঘর বা ক্লাবঘর। সব সরঞ্জাম আমাদের বাসায় থাকে, খেলা শুরু হয় এখান থেকে; খেলার ফাঁকে ফাঁকে হাঁফাতে হাঁফাতে ওরা ফিরে এসে পানি চাইলে আমি বিস্কুট চানাচুর মুড়ি দিই পানির সঙ্গে। এই সময় আমিও ওদের সঙ্গে খেলতাম। ওর বাবা অবশ্য কখনও না করেনি।

রমার বাবা বলে, আমাকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে কেন ? আমার তো মনে হয় ক্যাম্পাসের ওই ভাঙাচোরা বাসা আমার চেয়ে ছেলেমেয়েদের চেয়ে তোমার কম পছন্দ না। তুমি তো মনে মনে কখনও চাওনি যে আমরা বাইরে থাকি। এই গাছপালা ফুল ফল পাখি তরুলতা পোকামাকড় সব মিলে একটা আলাদা জগৎ, একটা বোবা অথচ শক্তিমান জগৎ। তুমি তো ধীরে ধীরে একাত্ম হয়ে গেছ। আর শোন বাড়ি বা গৃহ হলো গ্রহের একটা অংশ, একটা গ্রহে যা থাকবে বাড়িতে তাই থাকবে, না হলে বাড়ি কেন ? পৃথিবীর সব চঞ্চলতা, মুখরতা আর প্রকৃতির অবগাহন না হলে বাড়ি কেন ? সেখানে ছেলেমেয়েরা হৈ চৈ করবে, লুটোপুটি করবে, খেলা করবে, গান করবে, বেড়াল কুকুর পশু পাখি হাওয়া বাতাস মিলে একটা আনন্দযজ্ঞ তৈরি হবে, প্রাণ ভরে উঠবে আনন্দে, সেটাই তো গৃহ, না হলে শিশু কীভাবে মানুষ হয়ে উঠবে, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে হেসে খেলে সে বড় হবে, সেটাই তো মানুষের আদি বাসস্থান। ছোট একটা ঘরে বন্দি হয়ে থাকার মধ্যে কোনও জীবন তো বাঁচতে পারে না, তোমার মন মস্তিষ্ক তো বড় হবে না। আমি বললাম থামো, তোমার ওই দার্শনিক কথাবার্তা আমার শোনার দরকার নেই। হ্যাঁ, তোমাকে আজ সত্যি করে বলি, আমিও থাকতে চাইতাম। প্রথম থেকেই আমি এই ক্যাম্পাসের প্রকৃতির প্রেমে পড়েছিলাম। আমি এখানে আগেও এসেছি পড়ার সময়। তবে এখন থাকার পরে এর আসল রহস্যটা বুঝতে পেরেছি ধীরে ধীরে। আচ্ছা চলো তো ওরা দুজন ঘুমিয়েছে কিনা দেখি।

আমরা দুজন রমা আফসানের দরোজার কাছে দাঁড়ালাম। সে আমার দিকে তাকায় আমি ওর দিকে। আমি ওকে ইশারা করলে ও রমার দরজায় টোকা দেয়, আমিও আফসানের দরোজায় টোকা দিই। কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে সাড়া শব্দ না পেয়ে আবার টোকা দিই। ‘কী হলো ?’ জাতীয় একটা শব্দ পেলাম। আফসান বেরিয়ে এল, একটু পরে রমাও এল। রমা এসে প্রথম কথা বলল, তোমরা দুজন এখানে কী করছ ? ওদের বাবা কিছু বলে না, আমি বললাম এমনি, কোনও কাজ নেই। দেখলাম তোমরা ঘুমিয়েছ কিনা। সাধারণত ওদের আমরা তুমি করে বলি না, তুমি করে বললে ওরা সন্দেহ করে যে আমরা কোনও মতলবে এসেছি। আফসান একটু আড়মোড়া ভেঙে বলে, আপুর ঘরে ছিলাম কিছুক্ষণ, তারপর ঘুমাতে এলাম। ঘুম আসে না। মার্চি তো আমার পায়ের কাছে ঘুমায়, মনে হচ্ছে মার্চি নেই, ও আর কোনওদিন আসবে না। রমা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। বয়সে দুবছরের বড় হলেও এখন লম্বায় দুজন সমান সমান। সে বলে, শুধু তো তোর কাছে ঘুমায় না, আমার খাটেও তো ঘুমায়। আমারও তো খুব মন খারাপ, সে নিশ্চয়ই না খেয়ে আমাদের গ্রিলের কাছে চুপচাপ বসে আছে। আল্পনাদের বাসায়ও যাবে না, খাবে না কিচ্ছু, না খেয়ে মারা যাবে। ‘তোমরা তো ওকে বিড়ালের কারখানায় রেখে আসতে পারতে।’ দুই ভাইবোনের সঙ্গে মার্চিও নানা ধরনের খুনসুটি হয়। তিনবেলা রমার বাবা ওকে খেতে দেয় বলে খিদে লাগলে ওর পেছন পেছন ঘোরে। তবে থাকে সবসময় দুই ভাইবোনের আশেপাশে। মার্চির কত রকমের ভঙ্গি ও ছবি যে আছে ওদের মোবাইলে তার ইয়ত্তা নেই। সে আদর খাওয়ার জন্যও ওদের পিছু পিছু ঘোরে। তাই দুজন ওর কথা ভুলতে পারছে না। শহরে একটা বিড়াল রাখার বাড়ি আছে তারা যত্ন করে বিড়াল রাখে, খেতে দেয়, চিকিৎসা করায়, বিনিময়ে কিছু টাকা নেয়। রমা বলে বিড়ালের কারখানা। আমরা ওকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছি কয়েকবার, তবে যেহেতু কোথাও লম্বা সময়ের জন্য যাইনি তাই কারখানায় রাখার দরকার হয়নি। ওদের বাবা বলে, চলো ডাইনিংয়ে গিয়ে বসি, আলাপ করি কী করা যায়।

ছেলেমেয়ে আমাদের সামনাসামনি বসে। রাত এগারোটা পার হয়ে গেছে। এখন তো কিছু খাবারও দেবার নেই, ওরা কিছু খেত কিনা জিজ্ঞেস করা দরকার। সংকোচ বা একটু ভয়েই কিছু বলতে পারি না। রমার বাবা বলে, আমরা চা খেয়েছি তোরা খাবি। দুজন মাথা ডানে বামে দোলায়, মানে খাবে না। চা তাদের প্রিয় তবে এখন তো মুড অফ, আর  ওদের বাবাও সৌজন্য করে বলেছে। সেটা তারা বুঝে ফেলেছে কিনা জানি না। আমি বললাম, মার্চির জন্য তোদের মন খারাপ সেটা তো বুঝি তবে আমাদের কী করণীয় আছে বল ? ওদের বাবা বলে, তোদের কোনও প্রস্তাব থাকলে বল। ওরা কিছু বলে না। আমি বলি, দেখ, একটা বিড়াল কত দিন বাঁচে ? তোদের না হয় আরেকটা বিড়াল এনে দেব। ওরা কিছু বলে না। আমাদেরও দুটো বিড়াল ছিল। কুকুরও তো আছে দুটো। তবে ওদের শুধু খেতে দিলেই হতো। ওরা সারাদিন কোথায় থাকে জানি না তবে খাবার সময় আসে। আর রাতের বেলা বাড়ির সামনে পেয়ারাতলায় শুয়ে থাকে। আমরা বাইরে গেলে  পেছন পেছন হেঁটে যায় অনেক দূর। তারপর আমরা বললাম, মকু দুকু বাড়ি যা, ওরা তারপর একটু যায়, আবার বললে বাড়ি ফিরে আসে। মার্চি আর কিকোকে পাশের বাসার শফিক সাহেব বাসা ছেড়ে যাবার সময় আমাদের দিয়ে গিয়েছিল। ওরা মাঝে মাঝে আসত আমাদের বাসায়। তখন খুব ছোট। কেবল ওদের জন্ম হয়েছে। মা বেড়ালটা কয়েক দিন পর হাওয়া হয়ে যায়। আমরা খানিকটা অমতে ওদের নিলাম। তিনি যাবার আগে কিছু টিপস দিয়ে গেলেন আমাদের। রমা আফসান খুব খুশি হলো। আগেও আমাদের বিড়াল ছিল তবে সেগুলো পুরো পোষা না। আসত যেত খেত, বাড়িতে থাকত না। কদিন পর কিকোর খুব জ্বর হলো, মার্চিরও হলো। আমার ভেটের কাছে নিয়ে গেলাম। খাবার ও ইনজেকশন দেওয়া হলো। শীতের জন্য খুব গরম জায়গায় রাখার ব্যবস্থা হলো। তবু একদিন লেবুতলায় রমা দেখতে পেল কিকো মরে আছে। মনে হয়েছিল সে ঘুমিয়ে আছে। তখন তার জ্বর আর ছিল না। আমরা ভেবেছিলাম সে টিকে গেল। রমা খুব কাঁদল। বুকে করে নিয়ে সে কি কান্না। মার্চি বোনের মৃত্যুতে বোবা হয়ে থাকল প্রায় দুদিন। বাড়ির সামনে ওকে আমরা কবর দিলাম। আর তারপর মার্চি খুব ন্যাওটা হলো দুই ভাইবোনের।

আমি বললাম তোদের বিড়াল একটা এনে দেব। মার্চির মতো সাদা কালো। ওরা বিশ্বাস করল না। ওদের বাবাও বলল। তবু রমা বলল, তোমরা আসলে খুব পচা। তোমরা চেষ্টা করলে কারও সাহায্য নিয়ে ওকে আনতে পারতে। আফসান বলল, আপু চলো যাই। সত্যি তারা দুজন উঠে চলে গেল। আমরা কিছুক্ষণ স্থাণুর মতো বসে থাকলাম। কারও মুখে কোনও কথা নেই। কথা বলার শক্তি যেন হারিয়ে ফেলেছি। রমার বাবার অবশ্য পরিশ্রম হয়েছে অনেক। সে তো কথা বলেই। এখন বলতে পারছে না। আমাকে বলল, মৃত্তিকা চলো, ঘুমাই। দেখ সকালে সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি বললাম, হলেই ভালো।

বিছানায় আমি পরে গেলাম। মানে পাঁচ ছয় মিনিট পর। দেখি ও নাক ডাকাচ্ছে। তার মানে প্রবল ঘুমে। আমার কয়েকটা কথা বলার ছিল। মনে পড়েছে। বলতে পারলাম না। শুয়ে পড়লাম। সাধারণত ওর নাক ডাকাতে আমার কিছু আসে যায় না। অনেক দিনের অভ্যেস। তবে আজ যেন কোনওভাবেই ঘুম আসছে না। চোখ বুজে আছি অনেকক্ষণ। ডানকাত বামকাত করে আবার চিত হয়ে চেষ্টা করলাম। আধো ঘুমের একটা আস্তরণ চোখে এল বলে মনে হলো। আমাদের পুরনো বাসাটা দেখতে পাচ্ছি চোখের সামনে। আট বছর আগে  প্রথম যেদিন দেখতে এসেছিলাম সেই রকম যেন দেখতে গেছি। কী সুন্দর বাসা, চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে। সামনে দিয়ে রাস্তা চলে গেছে পুবে-পশ্চিমে, বাসার সামনে লাইন দিয়ে জারুল পলাশ শিমুল করবী গাছ আর বড় একটা শ্বেতচন্দন। প্রায় দুই বিঘার ওপর জমি। মাঝখানে দোতলা বাড়ি। সামনে পেছনে দশকাঠার মতো জায়গা। লোহার ফেন্স দিয়ে সামনের অংশ ঘেরা। পেছনের অংশে পাকা প্রাচীর। সামনে তারকাটার ওপর দিয়ে চিকন গুল্মের আস্তরণ। একটা চেরি ও বরই গাছের সঙ্গে মিলে গেছে একটা পেয়ারা গাছের ডালপালা। প্রধান ফটকে ঢোকার সময় একটা পেয়ারা গাছ হেলান দিয়ে আছে। ওদের বাবাই এই ব্যবস্থা করেছিল। একদিন ঝড়ে পেয়ারাগাছটা পড়ে গেলে সে বড় ডালটা ধরে প্রাচীরের বড় খুটির ওপর তুলে দিয়েছিল। পেয়ারা, মাধবীলতা, আর অলকানন্দা মিলে একটা বড় বিশাল মনোহর ফুলের তোরণ। তোরণে ঢোকার আগে আমরা লাগিয়েছিলাম হাসনুহেনা, বেলি আর কামিনী। প্রাচীরের ভেতরে ওদিকে আছে বেলির ঝাড়, তার পাশে কেয়া। ঠিক সন্ধে হলেই মাধবীলতা আর হাসনুহেনা তাদের গন্ধে মাতোয়ারা করে তোলে চারদিক, আর অলকানন্দার সোনালি আভায় প্রাণ ভরে যায়। রবীন্দ্রনাথ নাকি নামটা দিয়েছিলেন। বিদেশি আ্যালামন্ডা হয়ে গেল অলকানন্দা। এই নামে একটা নদী আছে। এক কবি লিখেছিলেন ‘হৃদি ভেসে যায় অলকাননদা জলে।’ আমরা প্রতিদিন সন্ধেবেলা একবার এই দৃশ্য ও সৌরভের মুখোমুখি হই। বাড়িতে ঢুকতেই রাস্তার দু পাশে দু হাত করে ঘর পর্যন্ত অজস্র ফুলের গাছ। আমি বহুদিন ধরে লাগিয়েছি। কিছু ছিল আগে। রক্তজবা, লিলি, টিউলিপ, দোপাটি, কসমস, পিটুনিয়া, গ্লাডিওলাস, টগর, নয়নতারা, যূথী, রজনীগন্ধা, টপি, সিনথিয়া, জেসমিন। মাঝে মাছে শীতের সময় আরও কিছু লাগানো হয়। সূর্যমুখী খুব প্রিয় ওর বাবার। সে কোথা থেকে চারা নিয়ে আসে। গাদা যে কত রকম হতে পারে তা না দেখলে বোঝা যাবে না। বাড়ির ঠিক সামনে চওড়া উঠানের বাম দিকে টবে আছে আরও পঁচিশ ত্রিশ রকমের নানা ছোট ছোট গাছ। কোনওটার ফুল হয় কোনওটার হয় না। অর্কিডগুলো চোখে পড়ার মতো। কাটাগুল্ম, গোলাপ তো আছে, আছে নানা রকমের পাতাবাহার। আমি সব দেখতে পাই। ফুল গাছপালা যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বাড়ির পেছনে আমড়া জামরুল বেল আম কলা আর কাঁঠাল গাছগুলো বেশ পুরনো হলেও আমি অনেকগুলো লাগিয়েছি : তারা আকাশের দিকে চেয়ে আছে। গোটা  প্রাচীরের পাশ দিয়ে ছোট ছোট লেবুগাছ আর পাতাবাহার, রঙ্গন; ছবির মতো। বাড়ির সামনে ঘাসের লনে আমরা বিকালে বসেছি অনেক দিন। ওখানে দুভাইবোন ব্যাডমিন্টন খেলে শীতের সময়। একটু খোলা জায়গায় শখ করে লাগানো দুএকটা সবজি। চোখটা সবুজ হয়ে যায়। বিশেষ করে বর্ষার সময়, গাছপালা লাফিয়ে লাফিয়ে ওঠে যেন। আমি বাড়ির পেছনে তাকাতে দেখি সব পাখিরা মাটিতে খাবার খুঁজছে আর কিচিরমিচির করছে। কিছু আছে আতা গাছে আর পেয়ারা গাছে। টুনটুনি, বাবুই, দোয়েল, বুলবুলি, শ্যামা, ছাতারে, পেঁচা, সাতবায়লা, কাঠঠোকরা, ল্যাজঝোলা, হলুদিয়া, শালিক সব আপন মনে ঘুরছে। সবার নাম জানিনে। প্রতি সকালে ওদের ডাকে আমার ঘুম ভাঙে। বড় একটা কাঠবিড়ালি ঘুঘুর পাশে ঘুর ঘুর করছে। ঘুঘু দুটো খুব বিরক্ত। বউ কথা কও ডেকে উঠল। গৃহস্থের খোকা ডাকল কয়েকবার। ঝগড়া পাখিটা জোরে ডেকে উঠলে আমার তন্দ্রা ভেঙে গেল।

ভাবলাম রমার বাবাকে ডাকি। আবার মনে হলো মানুষটা যেভাবে ঘুমাচ্ছে, ডাকা ঠিক হবে না। বাথরুমে গিয়ে ঘাড়ে পিঠে জল দিয়ে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। এবার মনে হচ্ছে ঘুম হবে। একটা প্রশান্ত আবহ তৈরি হচ্ছে। বাড়িটার ছবি আর নেই। আম্মার কথা মনে হচ্ছে, আম্মা আবার জর্দা দিয়ে পান খাচ্ছে, আমি প্রায় বলি, এটা ঠিক না। আম্মা হাসে। আবার আব্বাকে দেখি। বাজার থেকে বড় মাছ নিয়ে এসেছে। আপা কোথায় ? আর কাউকে দেখতে পাচ্ছি না।

রমার বাবার ডাকে সকালে ঘুম ভাঙে। সে বার বার বলছে, ‘মৃত্তিকা, আমাকে কিছু খেতে দাও। আমাকে বের হতে হবে। আমার অনেক জরুরি কাজ। ব্যাংকে যাব। কিস্তি দিতে হবে।’ আমি উঠে দেখি প্রায় নয়টা বাজে। ছেলেমেয়েরা হয়তো উঠেছে। আমি কি খেতে দেব ভেবে রান্নাঘরে গেলাম। রাতের পুরনো ভাত আছে। পেয়াজ মরিচ তেল দিয়ে গরম করতে থাকি, তার সঙ্গে একটা ডিম ছেড়ে দিই। প্লেটে করে ওর সামনে দিই একগ্লাস পানি দিয়ে। সে দ্রুত খেয়ে নেয়। দ্রুত বলে, ‘আমার আসতে দেরি হতে পারে। নতুন বাসায় কেউ আসতে পারে। বিকালে মিলাদ দেব ভাবছি। মিষ্টি কিনে আনব। আগেই দেওয়া উচিত ছিল। আমি সব ব্যবস্থা করব। তুমি চিন্তা করো না। দুপুরে তোমরা খেয়ে নিও। আমি আগে আসতে পারলে একসঙ্গে খাব, না হলে নয়।’ সে একটা পুরনো ফতুয়া পরে চলে গেল। ও বেরিয়ে যাবার পরে ওকে দেখা যাবে না। আগের বাসায় রাস্তা পর্যন্ত ওকে দেখতে পেতাম। সেদিকে তাকিয়ে থাকতাম, সে হাত নাড়াত, আমিও হাত নাড়াতাম। আমি দরজা টেনে দিয়ে দরোজার দিকেই কেন যেন তাকিয়ে থাকলাম। ছেলেমেয়েরা  উঠেছে কিনা ভাবতেই ওদিকে যেতে শুরু করি। রমার দরজা খোলা, ওর ঘরে গেলাম। সে ‘মা’ বলে আমাকে জড়িয়ে ধরলো, সারা জীবনের অভ্যেস। ছেলেও তাই করে, বোনকে দেখে শিখেছে। আফসানকে নিয়ে রমার ঘরে গেলাম। বললাম, এখন কেমন অবস্থা, ঘুম হলো ? দুজন চোখ দিয়ে ইশারা করে বোঝায় ঘুম হয়েছে। আমি বললাম, তোরা এখন কী খাবি ? আফসান বলে, যা দাও তাই। রমা বলে, পরোটা খাব। অগত্যা পরোটা আলু ভাজি আর ডিম দিয়ে নাস্তা হলো।

সন্ধ্যার আগেই সব ঝামেলা শেষ হলো। আমরা ডাইনিং টেবিলে চা নিয়ে চারজন বসলাম। মুড়ি চানাচুর মাখিয়ে দিলাম এক বাটি। মিষ্টি খাবে কিনা দুজনকে জিজ্ঞেস করলাম। দুইজনই না করল। রমার বাবাকে বললাম, সে বলল, থাক। আরেক দিন খাব। মিষ্টিটা ভালই ছিল। সবাই প্রশংসা করেছে। চা খেতে খেতে রমার বাবা বলল, ‘তাহলে রমা, আফসান সব ঠিকঠাক আছে না। কারও সঙ্গে আলাপ হলো ?’ রমা বলল, ‘বাবা ছোটরা তো কেউ আসেনি।’ সে আরও বলল, ‘বাবা তুমি আমাদের আজকে ওই বাড়িতে একটু নিয়ে যেতে পার না ?’ আফসান নিঃশব্দে ওর মতে মাথা নাড়াল। রমার বাবা বলল, ‘যাওয়া যায়, চল যাই।’ দুইজন আনন্দে লাফিয়ে উঠল। আমিও মনে মনে চাইছিলাম যে একবার দেখে আসি। ওদের বাবা অবশ্য কথা দিয়েছিল ওদের ইচ্ছে হলে ক্যাম্পাসে নিয়ে যেতে হবে, ওই বাসার সামনে দিয়ে পুকুর পাড় দিয়ে হাঁটতে দিতে হবে।

নিচে নেমে একটা অটো পেয়ে গেলাম। বিশ মিনিটের মধ্যেই আমরা পুরনো বাসার সামনে নামলাম। অন্ধকার হয়ে এসেছে। রাস্তার লাইটগুলো জ্বলছে তবে বাসায় কোনও আলো জ্বলছে না। জ্বলার তো কথা না। নেমেই আমরা মাধবীলতা আর হাসনুহেনার  সৌরভে পুলকিত হলাম। অলকানন্দা সোনার আভা ছড়িয়ে স্বাগত জানালো। রমা আর আফসান দৌড়ে অন্ধকারেই ভেতরে চলে গেল। আর দুজনেই মার্চি! মার্চি! বলে ডাকতে লাগলো। ওরা কলাপসিপল গেটের কাছে যেতেই মার্চি  বড় আম গাছের গোড়া থেকে দৌড়ে চলে এল। আর ওদের চারপাশে পায়ের কাছে চক্কর দিতে লাগল, ওরা দুজন মার্চিকে ডাকতে থাকলে সে এতক্ষণে মিঁয়াও মিঁয়াও করে সাড়া দিল। সড়ক বাতির আলোয় দেখলাম সে শুকিয়ে গেছে। যে খাবারগুলো রাখা ছিল তা ওভাবে পড়ে রয়েছে। রমা ওকে কোলে তুলে নিলে সে ওর ঘাড়ে মুখ ঘষতে থাকে।

অন্ধকারে বাড়িটা ভুতুড়ে মনে হচ্ছে। গাছপালা ফুল পাখি লতাগুল্মগুলো আমাদের নাকে উত্তেজনা ছড়াতে শুরু করল। খুব চেনা গন্ধ। বাতাসটাও চেনা। চাঁদের মৃদু আলোটাও আমাদের পরিচিত। রমা বলল ওর বাবাকে, ‘আমি এখন যেভাবে হোক মার্চিকে নিয়ে যাব।’

ওদের বাবা বলল, ‘আচ্ছা।’

সচিত্রকরণ : রজত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button